📄 ক্ষেত্র বুঝে কাজ
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সহসা রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতেন না। খুব বেশী রাগের ভাব সৃষ্টি হলে তিনি বার বার দাড়ি মুবারকে হাত বুলাতেন। এটাই ছিলো হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রাগ বুঝার উপায়। কঠিন গোস্বার মুহূর্তেও তিনি কাউকে এমন কোন কথা বলতেন না, যা তার জন্য কষ্টের কারণ হতে পারে। এ ধরণের ক্ষেত্রে বরং প্রিয় নবী চুপ করে থাকতেন।
এক বারের কথা—একজন লোক এলো প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে। গায়ে তার জাফরানে রাঙানো একটি কাপড়। এ অবস্থা দেখে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মনে খুব গোস্বার সৃষ্টি হলো। তা সত্ত্বেও তিনি তাকে কিছুই বললেন না। কারণ এত লোকের মাঝে তাকে কিছু বললে সে হয়তো লজ্জিত হতে পারে। এছাড়া গোস্বার মুহূর্তে লোকটিকে কিছু বলতে গেলে হয়তো কোন কড়া কথাও এসে যেতে পারে। লোকটি চলে যাওয়ার পর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্যদের বলে দিলেন, তোমরা তাকে কৌশলে বলে দিও! সে যেনো আর কখনো এমন কাপড় ব্যবহার না করে।
যেখানে মানুষের স্বাভাবিক অভ্যাস হলো কাউকে কিছু বলার সুযোগ পেলে কেউ সে সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। কিন্তু উত্তম আদর্শের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নমূনা প্রিয়নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ক্ষেত্রে কত সুন্দর পদ্ধতি অবলম্বন করলেন যাতে লোকটিকে লজ্জিতও হতে না হয় আবার তার ত্রুটির সংশোধন হয়ে যায়। আর এ কারণেই তো বলা যায় "সকল গুনের আধার তিনি"।
📄 অনুকম্পা প্রদর্শন
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে নববীতে বসে আছেন। সাথে রয়েছেন সাহাবায়ে কিরামের (রাযি.) এক জামা'আত। একটি লোক মসজিদে প্রবেশ করলো। লোকটি গ্রাম্য মূর্খ, মসজিদের পবিত্রতা সম্পর্কে তার কিছুই জানা নেই। তার পেশাবের প্রয়োজন দেখা দিলে মসজিদের মধ্যে দাঁড়িয়েই সে পেশাব করতে শুরু করলো।
এ অবস্থা দেখে সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) আশপাশ থেকে তেড়ে গিয়ে তাকে ধরতে চাইলেন। কিন্তু প্রিয় নবী, করুণার ছবি হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বারণ করে বললেন, একে পেশাব করতে দাও!
পেশাব শেষে সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) তাকে প্রহার করে এ অন্যায়ের শাস্তি দিতে চাইলে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবারও বারণ করলেন। তিনি লোকটিকে ডেকে সুন্দরভাবে, শান্ত কণ্ঠে মসজিদের পবিত্রতা সম্পর্কে বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, এটি পেশাব করার জায়গা নয় বরং এটি হলো মহান আল্লাহ পাকের ইবাদত বন্দেগী করার জায়গা। এটি অত্যন্ত পবিত্র স্থান মসজিদ। এখানে পেশাব করা যায় না।
অতঃপর নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) কে হুকুম করলেন, তোমরা এক বালতি পানি এনে এ স্থানটি ধুয়ে পরিষ্কার করে দাও। মহান আল্লাহ আমাদেরকে মানুষের প্রতি কঠোরতা প্রদর্শনের জন্য প্রেরণ করেননি বরং নম্র ও সহজ আচরণের জন্যই প্রেরণ করেছেন।
একদম নিজস্ব পরিবেশে, অপরাধীকে শাস্তি দেয়ার সম্পূর্ণ ক্ষমতা ও শক্তি থাকার পরও এ ধরণের অপরাধীকে এভাবে ক্ষমা প্রদর্শন করে তার প্রতি এহেন অনুকম্পা প্রদর্শনের দুর্লভ নযীর স্থাপন শুধু উত্তম আদর্শের মূর্তপ্রতীক প্রিয়নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দ্বারাই সম্ভব। ওহে মানবমণ্ডলী! শিক্ষাগ্রহণ কর।
📄 সঠিকপন্থা নিরূপন
সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) ছিলেন প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রেমানলের পতেঙ্গা তুল্য। দেশ বিদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে পঙ্গপালের ন্যায় ছুটে এসে যারা জড়ো হয়েছিলেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে।
একদিনের কথা—নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম অযু করছেন। সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) তাঁর চারপাশে জড়ো হয়ে দণ্ডায়মান। তাঁরা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অঙ্গ নিঃসৃত পানি হাতে নিয়ে নিজেদের গায়ে মুছে দিচ্ছেন। নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা এরূপ করছো কেন? সকলে জবাব দিলেন, মহান আল্লাহ ও তদ্বীয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি মহব্বতের কারণে।
এর প্রেক্ষিতে প্রিয় নবী হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করলেন, যদি কেউ মহান আল্লাহ ও তার প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি মহব্বত করার আনন্দ লাভ করতে চায় তবে তার পদ্ধতি হবে—সে ব্যক্তি কথা বলার সময় যেনো সত্য কথা বলে এবং যথার্থ ভাবে আমানতদারী বজায় রাখে আর প্রতিবেশীর সাথে উত্তম আচরণ করে।
এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে, সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি অগাধ ভক্তি শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অঙ্গ নিঃসৃত পানি নিজেদের গায়ে মুছে দিচ্ছিলেন। যা ছিলো তাঁর প্রতি সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.)-এর চূড়ান্ত ভালবাসার নিদর্শন। কিন্তু প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন অনিয়মতান্ত্রিক ভক্তি শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ মেনে নিতে রাযী নন বিধায় তিনি তাদেরকে অত্যন্ত হিকমতের সাথে এ পদ্ধতি পরিহার করে সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন করার পন্থা বাতলে দিলেন।
এজন্য আমাদের উচিৎ কারো প্রতি আন্তরিকতা ও ভক্তি শ্রদ্ধা প্রকাশ করতে গিয়ে যাতে এমন কোন পথ ও পন্থা গ্রহণ না করি, যা শুধু আবেগ উচ্ছাসের বহিঃপ্রকাশ—নিষ্ফল আচরণ মাত্র। যার ফলে শুধু অতি ভক্তিই প্রকাশ পায় এ ছাড়া কোন সার্থক ফলাফল সেখানে লাভ করা যায় না।
📄 ঝগড়ার হৃদ্যতা
প্রিয় রাসূল হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মাহাতুল মুমিনীনগণের প্রতি অত্যন্ত স্নেহ ও মহব্বতের আচরণ করতেন। কখনো মহব্বতের কারণেই সামান্য গোস্বারও বহিঃপ্রকাশ ঘটতো। এমনি একদিনের কথা—
হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) বলেন, আমার মধ্যে এবং রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মধ্যে একবার কোন এক ব্যাপারে মতের কিছুটা ভিন্নতা দেখা দিলো। নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, এজন্য কোন একজনকে সালিস নিয়োগ করা হোক, যে আমাদের মাঝে বিষয়টি মীমাংসা করে দিবে। অতঃপর নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথমে হযরত আবু উবাইদা (রাযি.)-এর নাম প্রস্তাব করলে আমি তাকে অধিক নরম বলে প্রত্যাখ্যান করলাম। এরপর তিনি হযরত উমর (রাযি.)-এর নাম উল্লেখ করলে আমি তাকে অত্যন্ত রাগী মানুষ বলে উপেক্ষা করলাম। শেষ পর্যায়ে তিনি আমার আব্বা হযরত আবু বকর (রাযি.)-এর নাম প্রস্তাব করলে আমি তাতে সম্মত হলাম।
এরপর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম সংবাদ দিয়ে হযরত আবু বকর (রাযি.) কে হাযির করলেন এবং বললেন, আপনি আমাদের উভয়ের মাঝে মধ্যস্থতা করুন। হযরত আইশা (রাযি.) বলেন, এরই মাঝে আমি বলে উঠলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমার প্রতি যেন ইনসাফ করা হয়।
আমার একথা শুনেই আমার আব্বা হযরত আবু বকর (রাযি.) খুব রেগে গেলেন এবং বললেন, আল্লাহর নবী সম্পর্কে তোমার এহেন মন্তব্য! এই বলে তিনি আমাকে সজোরে এক চপেটাঘাত করলেন যার কারণে আমার নাক দিয়ে রক্ত বেরিয়ে পড়লো।
এ অবস্থা দেখে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুব ব্যথা পেলেন। তিনি হযরত আবু বকর (রাযি.) কে লক্ষ্য করে বললেন, আমরা আপনাকে শুধু মধ্যস্থতা করার জন্যই ডেকেছি, কাউকে প্রহার করার জন্য নয়। এ বলে তিনি দ্রুত তাঁর পবিত্র চাদর দ্বারা আমার নাকে-মুখের রক্ত মুছে পরিষ্কার করে দিলেন। আহ! কত মায়াময় সে দৃশ্য, কত স্নেহ ও মাধুরতাপূর্ণ পরিবেশ। নিজ স্ত্রীর প্রতি রাগের মুহূর্তেও এহেন আচরণ করতে হলে কতটা উদার ও আদর্শবান হতে হয় সেটাই এখানে ভাববার বিষয়।