📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 প্রসন্ন মন

📄 প্রসন্ন মন


ঐতিহাসিক হুনাইনের যুদ্ধ শেষ হলো। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফিরে এলেন মদীনায়। নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ঘিরে ধরলো গ্রাম্য সাহায্য প্রার্থীরা। তারা অনর্গল সাহায্য প্রার্থনা করতে থাকলো। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও দুই হাতে তাদেরকে সাহায্য সামগ্রী দিতে থাকলেন। লোকের ভীড় এত অধিক ছিল যে, তাদের চাপে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি গাছের সাথে গিয়ে লেগে গেলেন। এক পর্যায়ে কে বা কারা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর গায়ের চাদরটি খুলে নিয়ে গেলো। ভীড়ের আধিক্য হেতু চাদরটি কে নিয়ে গেলো তা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বুঝতে পারলেন না।

বিষয়টি স্বাভাবিক দৃষ্টিতে চিন্তা করলেও অত্যন্ত গোস্বার বিষয়। সাহায্য প্রার্থীদের ভীড় আর হৈ চৈ সহ্য করেও তিনি তাদেরকে সাহায্য দিয়ে যাচ্ছেন। এ জন্য তিনি যথেষ্ট কষ্টও স্বীকার করছেন। ভীড়ের চাপে তিনি একটি গাছের সাথে গিয়ে চেপে পড়েছেন, তারপর আবার তার নিজ ব্যবহৃত চাদরের উপর হস্তক্ষেপ। অন্য যে কোন মানুষ হলে এ সময় গোস্বায় ফেটে পড়তো এবং তাৎক্ষণিকভাবে সাহায্য বিতরণ বন্ধ করে দিয়ে চাদর ছিনতাইকারীকে খুঁজে বের করার জন্য তৎপর হয়ে উঠতো।

কিন্তু রহমতের নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন অন্য সকলের চাইতে ব্যতিক্রম। তিনি এ জন্য কোন গোস্বার ভাবই প্রকাশ করলেন না। বরং অত্যন্ত মোলায়েম কণ্ঠে বললেন, আমার গায়ের চাদরটি যেই নিয়েছো সেটি ফেরৎ দিয়ে দাও, কারণ প্রয়োজন ছাড়া আমি কোন বস্তুই রাখি না। তোমরা বিশ্বাস রাখ; আমার কাছে যদি এ মাঠের ঘাসের সংখ্যা পরিমাণের উট থাকতো এবং অসংখ্য পরিমাণের সম্পদও থাকতো তবে আমি তা সবই বণ্টন করে দিতাম। তোমাদের মধ্যে কেউই আমাকে সংকীর্ণমনা, কৃপণ কিংবা মিথ্যা ও অবাস্তব কথার প্রবক্তা হিসেবে পেতে না। এভাবেই তিনি নিজের গোস্বাকে অবদমিত করে মানুষের সাথে শান্তভাবে কথা বলতেন।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 সাহায্য দান

📄 সাহায্য দান


এক ব্যক্তি এসে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে হাযির হলো। সে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খিদমতে কিছু সাহায্য প্রার্থনা করলো। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে তখন কিছুই ছিলো না। তিনি অত্যন্ত মোলায়েম ভাবে লোকটিকে বললেন, এখন তো আমার কাছে তোমাকে দেয়ার মত তেমন কিছুই নেই, সুতরাং তুমি কারো কাছ থেকে আমার কথা বলে করয নিয়ে নাও। সে করয পরিশোধের দায়িত্ব আমার উপর থাকবে। যখনই আমার হাতে কিছু আসবে, আমি তার করয পরিশোধ করে দিব।

সেখানে উপস্থিত ছিলেন হযরত উমর (রাযি.)। তিনি নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামকে লক্ষ্য করে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! মহান আল্লাহ তো আপনাকে আপনার ক্ষমতার বাইরে কোন কাজের নির্দেশ দেননি। হযরত উমর (রাযি.)-এর এ কথা ঐ লোকটির কাছে ভাল লাগলো না। সে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামকে লক্ষ্য করে বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি খরচ করে যেতে থাকুন এবং এ কারণে আপনি দুঃস্থতার আশঙ্কা করবেন না। লোকটির এ কথা শ্রবণ করে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুখে মুচকী হাসি ফুটে উঠলো এবং তাঁর পবিত্র চেহারায় খুশির ছাপ প্রতিভাত হতে লাগলো।

এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে দান করার মত কিছুই না থাকা সত্ত্বেও তিনি অপরের কাছ থেকে ধার করে সাহায্যপ্রার্থী লোকটিকে সাহায্য করার ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু আজ আমরা ধন-সম্পদ পুঞ্জিভূত করে চলছি আর আমাদের পাশেই অনাথ-অসহায়রা ক্ষুধা-অনাহারে কষ্ট পাচ্ছে। আমরা কি পারি না মহানবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ মহান আদর্শ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে?

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 অহংকার হীনতা

📄 অহংকার হীনতা


প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোথাও যাচ্ছেন। পথিমধ্যে একটি কবরের পাশে বসে একটি মহিলা কাঁদছে। দয়ার নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মনে ব্যথা লাগলো। তিনি এগিয়ে গেলেন ক্রন্দনরতা মহিলার কাছে। অত্যন্ত নম্র কণ্ঠে তিনি মহিলাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আল্লাহর বান্দী! তুমি অধৈর্য্য না হয়ে ধৈর্য্য ধারণ কর।

মহিলা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে চিনতো না বিধায় সে একজন সাধারণ লোক মনে করে তাঁকে বললো, যাও! এখান থেকে। আমার মনের অবস্থা যে কি তা তুমি কি করে বুঝবে? প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আর কথা বললেন না। তিনি চুপ করে তথা হতে প্রস্থান করলেন। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চলে যাওয়ার পর লোকেরা ঐ মহিলাকে বললো, তুমি কি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে চিনতে পারনি? এতক্ষণ তুমি যার সাথে কথা বলছিলে তিনিইতো আল্লাহ পাকের প্রিয় রাসূল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তুমি তাঁর সাথে এমন করে কথা বললে কেন?

এ কথা শুনামাত্র মহিলা অস্থির হয়ে উঠলো। তৎক্ষণাৎ সে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে ছুটে গিয়ে হযরতের খিদমতে আরয করলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি আপনাকে চিনতে পারিনি, তাই আপনার সাথে আমি গোস্তাখী করে ফেলেছি। আমাকে ক্ষমা করে দিন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহিলার কথার সরাসরি কোন জবাব না দিয়ে বললেন "বিপদ ও মুসীবতের শুরু অবস্থায় যে ধৈর্যধারণ করা হয়, তাই মূলতঃ প্রকৃত সবর ও ধৈর্য্য। এভাবেই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পূর্ণ নিরহংকার ও সাদাসিধা জীবন যাপন করেছেন। কখনো আত্মগরিমা বা অহংকার প্রকাশ করেননি।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 ওয়াদা পালন

📄 ওয়াদা পালন


প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জন্মের পূর্বেই তাঁর পিতা ইহ জগৎ ত্যাগ করেন আর জন্মের পর শৈশবে তিনি তার স্নেহময়ী মাতাকে হারান। অতঃপর প্রথমে হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দাদা আবদুল মুত্তালিব তাঁকে লালন পালন করেন। এরপর আবদুল মুত্তালিবেরও ইন্তিকাল হয়ে যায়। তখন হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চাচা আবু তালিব নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে লালন পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

আবু তালিব ছিলেন একজন নামজাদা ব্যবসায়ী। শিশু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিছুটা বড় হলে আবু তালিব তাঁকেও সিরিয়ার কাফেলাসহ বেশ কয়েকটি ব্যবসায়ী কাফেলার দায়িত্ব দিয়ে আশে পাশে পাঠাতে থাকেন এবং তাতে অত্যন্ত সন্তোষজনক লাভ হয়। লোকেরাও তার সততার অকুণ্ঠ স্বীকৃতি দিতে থাকে এবং তাকে সাদিক (সত্যবাদী) আমীন (বিশ্বস্ত) উপাধিতে ভূষিত করে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবিল খামসা (রাযি.) বর্ণনা করেন, আমি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওওত প্রাপ্তির পূর্বে যখন তার বয়স পয়ত্রিশ বৎসর তখন তার সাথে কিছু ক্রয়-বিক্রয় করি। কিন্তু কথা পুরোপুরি চূড়ান্ত হওয়ার পূর্বেই আমি একটি বিশেষ প্রয়োজনে কোথাও ক্ষণিকের জন্য চলে যাই। যাওয়ার সময় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলে গেলাম, আপনি এখানেই অপেক্ষা করুন—আমি অল্প সময়ের মধ্যেই ফিরে আসছি। তখন আমরা আমাদের বাকী কথা চূড়ান্ত করে নিব। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ঠিক আছে। এরপর আমি চলে গেলাম।

এখান থেকে যাওয়ার পর ঘটনাক্রমে আমি এ বিষয়টি সম্পূর্ণ ভুলে গেলাম। ফলে আমার আর সেখানে ফিরে আসা হলো না। এভাবে একটানা দু'দিন কেটে গেলো। তৃতীয় দিন আমি ঐ পথে কোথাও যাওয়ার সময় দেখলাম প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানেই দাঁড়িয়ে আছেন। এ অবস্থা দেখে আমি একদম হতভম্ব হয়ে গেলাম, আমার বাকশক্তি যেন রুদ্ধ হয়ে গেল। হঠাৎ আমি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কি বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। আমিও ভেবেছিলাম, তিনি আমাকে এজন্য আচ্ছা মত ধোলাই করবেন। কারণ আমার সাথে ওয়াদার কারণে একটানা তিন দিন তিনি এখানে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি আসবো বলে কথা দিয়েও আসিনি।

কিন্তু দয়ার সাগর, ক্ষমার আদর্শ, উত্তম চরিত্র মাধুরীর মূর্ত প্রতীক নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবদুল্লাহ (রাযি.) কে দেখে তেমন কিছুই বললেন না, কোন রাগ বা গোস্বাও প্রকাশ করলেন না। শুধু শান্ত কণ্ঠে তাকে বললেন, "তুমি আমাকে বেশ কষ্টের মধ্যে ফেলে দিয়েছো। তুমি যাওয়ার পর থেকে শুরু করে এ সময় পর্যন্ত আমি তোমার অপেক্ষায় এখানেই দাঁড়িয়ে আছি।"

এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকটিকে তার আসার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন বলে কথা দিয়েছিলেন, সে কথা রক্ষা করার জন্য একটানা তিনদিন তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলেন। ওয়াদা পালনের এহেন নযীর ইতিহাসের পাতায় দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে কি? নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ শিক্ষার আলোকে আমরা কি আমাদের জীবন গড়ে তুলতে পারি না? আমরা কি পারি না মিথ্যা, ধোঁকা, প্রতারণা পরিহার করে আমাদের ওয়াদার প্রতি যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করতে? হ্যাঁ পারি, নিশ্চয়ই পারি, মহান আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px