📄 ক্ষুধার্তকে খাবার দান
চারিদিকে হাহাকার! মদীনায় দুর্ভিক্ষ চলছে। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর বনী আদম। আব্বাস ইবনে শুরাহবিল ক্ষুধায় কাতর। কি করবে কি খাবে কিছুই পাচ্ছে না সে। অবশেষে নিরুপায় হয়ে একটি ফলের বাগানে প্রবেশ করলো। সেখানে রকমারী ফল পেকে আছে। আব্বাস আর ক্ষুধার জ্বালা সইতে পারছে না। সে মালিকের অনুমতি ছাড়াই বাগানের ফল ছিড়ে খেতে লাগলো। ইতিমধ্যে মালিক টের পেয়ে এসে সেখানে হাযির হলো। আর যায় কোথায়? আব্বাসকে হাতে নাতে ধরে ফেললো বাগানের মালিক। আর অমনি শুরু হলো বেদম প্রহার। এক পর্যায়ে মালিক তার জামা খুলে নিয়ে গেলো।
এখানেই শেষ নয় মালিক লোকটি আব্বাসকে ধরে নিয়ে এলো প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে। বিচার দিলো তার নামে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে। নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব কথা শুনে এক পর্যায়ে ব্যথিত হলেন। বিবাদীর দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী কণ্ঠে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এ লোকটি অত্যন্ত ক্ষুধার্ত। সে শিক্ষা-দীক্ষা থেকে বঞ্চিত একজন মূর্খ মানুষ। সে অন্যের ফল না বলে খাওয়ার অপরাধ সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নয়। উপরন্তু ক্ষুধার জ্বালায় অস্থির হয়ে নিরুপায় অবস্থায় সে তোমার বাগানের অজস্র ফল থেকে দু'চারটি ফল খেয়েছে মাত্র। এজন্য তোমার তাকে প্রহার করা উচিত হয়নি বরং তোমার উচিত ছিলো এ ব্যাপারে তাকে জ্ঞান দান করা এবং তার ক্ষুধার্ত মুখে কিছু খাবার তুলে দেয়ার ব্যবস্থা করা।
এরপর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম মালিক লোকটিকে আব্বাসের জামা ফেরৎ দেয়ার নির্দেশ দিলেন। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হুকুম মত লোকটি জামা ফেরৎ দিলো। এবার দয়ার নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের পক্ষ থেকে ক্ষুধার্ত আব্বাস ইবনে শুরাহবিলকে ষাট ছা' (দুই শত দশ সের পরিমাণ) শস্য দান করে তাকে পরিতৃপ্ত করে দিলেন। এভাবেই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম অগণিত ক্ষুধার্তকে খাবার দান করেছেন। অসহায়কে সহায়তা দান করেছেন। দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। যা ছিলো উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য এক বাস্তব শিক্ষা। আমরা কি ভেবে দেখেছি, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সে শিক্ষা আমরা কতটুকু ধরে রাখতে পেরেছি। আমরা কি ক্ষুধার্ত-পীড়িতদের যথার্থ খোঁজ-খবর নিতে পারছি? আমাদের সমাজেও এ জাতীয় অজস্র মানুষ অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটায়। আমরা যেনো এক্ষেত্রে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মহান শিক্ষাকে স্মরণ করি।
📄 মোহনীয় আদর্শ
খাইবরের যুদ্ধে মুসলমানগণ বিজয়ী হলেন। অনেক গণীমতের মাল মুসলমানদের হস্তগত হলো। যার মধ্যে ছিলো অনেক স্বর্ণ-চান্দী। শীর্ষস্থানীয় সাহাবী হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রাযি.) বলেন, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাইবর যুদ্ধের গণীমতের মালের স্বর্ণ-চান্দিগুলো একত্রিত করার জন্য হযরত বিলাল (রাযি.)-এর কাপড়ের মধ্যে রাখতে থাকলেন। লক্ষ্য হচ্ছে, এভাবে সব স্বর্ণ-চান্দী একত্রিত করে পরে তা তার প্রাপকদের মাঝে বণ্টন করে দেয়া হবে। এ দৃশ্য দেখে একজনের মাঝে ভুল বুঝের সৃষ্টি হলো। সে ভাবলো নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম হয়তো সব স্বর্ণ-চান্দী হযরত বিলাল (রাযি.) কেই দিয়ে দিচ্ছেন। লোকটি তার ভুল ধারণার বহিঃপ্রকাশ ঘটালো। সে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললো, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! ইনসাফের সাথে বণ্টন করুন।
লোকটির এ কথাটি ছিলো প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি একটি বড় আক্রমণ। একটি মানুষের উপর চূড়ান্ত গোস্বা হওয়ার জন্য এ জাতীয় একটি কথাই যথেষ্ট হতে পারে। শক্তি থাকলে এ কথার প্রতিশোধ গ্রহণের স্পৃহাও মানুষের মাঝে জন্ম নিতে পারে। কিন্তু নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন দয়ার সাগর, তিনি লোকটির উপর কোনরূপ রাগ বা গোস্বা প্রকাশ করলেন না। তিনি শুধু অত্যন্ত শান্ত ভাষায় লোকটিকে বললেন, আল্লাহপাক তোমার মঙ্গল করুন আমিই যদি ইনসাফ না করলাম তবে কে আর ইনসাফ করবে? আমি যদি কোনরূপ ইনসাফ পরিপন্থী কাজ করি তবে তো আমি ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো।
সে সময় যেখানে উপস্থিত ছিলেন হযরত উমর (রাযি.)। নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি এহেন উক্তি তিনি বরদাস্ত করতে পারছিলেন না। অত্যন্ত গোস্বার সাথে তিনি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! লোকটির কথায় মনে হচ্ছে সে মুনাফিক, সুতরাং আপনার অনুমতি পেলে আমি এ বেয়াদবের গর্দান উড়িয়ে দিতে চাই। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত উমর (রাযি.) কে অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে বারণ করে বললেন, আমি কোন সাহাবীকে হত্যার নির্দেশ দেয়া থেকে আল্লাহ পাকের দরবারে পানাহ চাই। এই ছিলো নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মানুষের প্রতি মোহনীয় আখলাক প্রদর্শনের একটি ছোট্ট দৃষ্টান্ত। এভাবেই অসংখ্য মানুষ মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অতুলনীয় আদর্শের ঝর্ণা ধারায় সিক্ত হয়েছে বার বার।
📄 প্রসন্ন মন
ঐতিহাসিক হুনাইনের যুদ্ধ শেষ হলো। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফিরে এলেন মদীনায়। নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ঘিরে ধরলো গ্রাম্য সাহায্য প্রার্থীরা। তারা অনর্গল সাহায্য প্রার্থনা করতে থাকলো। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও দুই হাতে তাদেরকে সাহায্য সামগ্রী দিতে থাকলেন। লোকের ভীড় এত অধিক ছিল যে, তাদের চাপে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি গাছের সাথে গিয়ে লেগে গেলেন। এক পর্যায়ে কে বা কারা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর গায়ের চাদরটি খুলে নিয়ে গেলো। ভীড়ের আধিক্য হেতু চাদরটি কে নিয়ে গেলো তা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বুঝতে পারলেন না।
বিষয়টি স্বাভাবিক দৃষ্টিতে চিন্তা করলেও অত্যন্ত গোস্বার বিষয়। সাহায্য প্রার্থীদের ভীড় আর হৈ চৈ সহ্য করেও তিনি তাদেরকে সাহায্য দিয়ে যাচ্ছেন। এ জন্য তিনি যথেষ্ট কষ্টও স্বীকার করছেন। ভীড়ের চাপে তিনি একটি গাছের সাথে গিয়ে চেপে পড়েছেন, তারপর আবার তার নিজ ব্যবহৃত চাদরের উপর হস্তক্ষেপ। অন্য যে কোন মানুষ হলে এ সময় গোস্বায় ফেটে পড়তো এবং তাৎক্ষণিকভাবে সাহায্য বিতরণ বন্ধ করে দিয়ে চাদর ছিনতাইকারীকে খুঁজে বের করার জন্য তৎপর হয়ে উঠতো।
কিন্তু রহমতের নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন অন্য সকলের চাইতে ব্যতিক্রম। তিনি এ জন্য কোন গোস্বার ভাবই প্রকাশ করলেন না। বরং অত্যন্ত মোলায়েম কণ্ঠে বললেন, আমার গায়ের চাদরটি যেই নিয়েছো সেটি ফেরৎ দিয়ে দাও, কারণ প্রয়োজন ছাড়া আমি কোন বস্তুই রাখি না। তোমরা বিশ্বাস রাখ; আমার কাছে যদি এ মাঠের ঘাসের সংখ্যা পরিমাণের উট থাকতো এবং অসংখ্য পরিমাণের সম্পদও থাকতো তবে আমি তা সবই বণ্টন করে দিতাম। তোমাদের মধ্যে কেউই আমাকে সংকীর্ণমনা, কৃপণ কিংবা মিথ্যা ও অবাস্তব কথার প্রবক্তা হিসেবে পেতে না। এভাবেই তিনি নিজের গোস্বাকে অবদমিত করে মানুষের সাথে শান্তভাবে কথা বলতেন।
📄 সাহায্য দান
এক ব্যক্তি এসে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে হাযির হলো। সে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খিদমতে কিছু সাহায্য প্রার্থনা করলো। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে তখন কিছুই ছিলো না। তিনি অত্যন্ত মোলায়েম ভাবে লোকটিকে বললেন, এখন তো আমার কাছে তোমাকে দেয়ার মত তেমন কিছুই নেই, সুতরাং তুমি কারো কাছ থেকে আমার কথা বলে করয নিয়ে নাও। সে করয পরিশোধের দায়িত্ব আমার উপর থাকবে। যখনই আমার হাতে কিছু আসবে, আমি তার করয পরিশোধ করে দিব।
সেখানে উপস্থিত ছিলেন হযরত উমর (রাযি.)। তিনি নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামকে লক্ষ্য করে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! মহান আল্লাহ তো আপনাকে আপনার ক্ষমতার বাইরে কোন কাজের নির্দেশ দেননি। হযরত উমর (রাযি.)-এর এ কথা ঐ লোকটির কাছে ভাল লাগলো না। সে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামকে লক্ষ্য করে বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি খরচ করে যেতে থাকুন এবং এ কারণে আপনি দুঃস্থতার আশঙ্কা করবেন না। লোকটির এ কথা শ্রবণ করে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুখে মুচকী হাসি ফুটে উঠলো এবং তাঁর পবিত্র চেহারায় খুশির ছাপ প্রতিভাত হতে লাগলো।
এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে দান করার মত কিছুই না থাকা সত্ত্বেও তিনি অপরের কাছ থেকে ধার করে সাহায্যপ্রার্থী লোকটিকে সাহায্য করার ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু আজ আমরা ধন-সম্পদ পুঞ্জিভূত করে চলছি আর আমাদের পাশেই অনাথ-অসহায়রা ক্ষুধা-অনাহারে কষ্ট পাচ্ছে। আমরা কি পারি না মহানবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ মহান আদর্শ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে?