📄 বেনযীর মমতা
ইয়াহুদীদের অসহ্য উৎপাৎ, সহ্যসীমা অতিক্রম করে গেছে যা অনেক আগেই। ওয়াদা ভঙ্গের অপরাধে যে গাদ্দারদের মদীনা হতে বহিষ্কার করে দেয়া হয়েছিল। মদীনা থেকে অপসারিত হয়ে তারা খাইবরে তাদের আস্তানা স্থাপন করলো। সেখানেও ওরা চুপ থাকতে পারলো না। বরং স্বভাব সুলভ ভাবে বিভিন্ন কৌশলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যেতে লাগলো। গোপনে প্রকাশ্যে করে চললো বিভিন্ন জ্বালাতন। শেষ পর্যায়ে মুসলমানগণ অতিষ্ঠ হয়ে খাইবর আক্রমণ করলেন। মহান আল্লাহ পাকের সীমাহীন নুসরতে সেখানে মুসলমানগণ বিজয়লাভ করলেন। খাইবর বিজিত হলো, তথায় উড্ডীন হলো ইসলামের হেলালী নিশান। ইয়াহুদীদের বড় বড় অনেক লিডার সেখানে মারা গেলো। অনেকে মুসলমানদের হাতে বন্দী হলো, ইয়াহুদীদের বড় সরদার হুয়াই ইবনে আখতাবও সেখানে মুসলিম সৈন্যদের হাতে মারা পড়লো।
বন্দীদের মধ্যে ইয়াহুদী নেতা হুয়াই ইবনে আখতাব-এর কন্যা সুফিয়াও ছিল। যে ছিল মুসলমানদের সবচাইতে বড় দুশমনের কন্যা। তরবারীর এক আঘাতে তাকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দেয়াই ছিল তৎকালীন সময়ের চাহিদা। কিন্তু এখানে বিষয়টি ঘটলো তার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে এসে লোকেরা আরয করলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! সুফিয়া ইয়াহুদ সরদারের কন্যা, যদি আপনি তাকে নিজের পত্নী হিসেবে বরণ করে নেন, তবে ইয়াহুদীদের মাঝে এর একটা ভাল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি সুফিয়ার প্রতিও খুব স্নেহ মমতা ও সদাচরণ প্রদর্শন করা হবে।
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন ক্ষমার আদর্শ। প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসা নয় বরং ন্যায় পরায়ণতা, ক্ষমা ও সদাচরণই হলো নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সহজাত অভ্যাস। তাই তিনি বিষয়টি নিয়ে ভাবলেন, তিনি চিন্তা করলেন যদি এর দ্বারা ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের মাঝে ইসলামের প্রতি কিছুটা আকর্ষণ সৃষ্টি হয় তবে তো আমার এ সামান্য কাজে ইসলাম উপকৃত হবে। অবশেষে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুয়াই ইবনে আখতাবের শত দুশমনী সত্ত্বেও তা ভুলে গিয়ে তারই কন্যা সুফিয়ার প্রতি চূড়ান্ত স্নেহ-মমতা ও অনুকম্পা প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। সুফিয়ার মনতুষ্টি ও তার সম্মান বৃদ্ধির মানসে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে নিজ পত্নী রূপে বরণ করে নিলেন। এভাবেই নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বেনযীর আদর্শ ও অনুকম্পার পরশে মুসলিম বিদ্বেষী হুয়াইুদী সরদারের কন্যা সুফিয়া পরিণত হলো মুসলিম রাহবর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পত্নীতে। সুফিয়া এখন পরিণত হলেন উম্মুল মুমিনীন হযরত সুফিয়া রাযিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা রূপে।
📄 শিক্ষানুরাগ
মাত্র তিন শত তের জন মুসলিম সৈন্য। কাফির সৈন্য সংখ্যা এর তিন গুনেরও বেশী। ঐতিহাসিক বদর প্রান্তর। যুদ্ধ শুরু হলো। সে ছিলো এক তীব্র লড়াই, বাহ্যিক দৃষ্টিতে সৈন্য সামন্তের বিবেচনায় এ ছিলো এক অসাধারণ ও অসম যুদ্ধ। নেমে এলো খোদায়ী নুসরত। অসাধারণ বিজয় অর্জিত হলো মুসলমানদের। কাফিরদের সত্তরজন মরলো, আরো সত্তরজন হলো বন্দী।
এ বন্দীদের নিয়েই কথা। হযরত উমর (রাযি.)-এর প্রস্তাব ছিলো ইসলামের এ দুশমনদের হত্যা করে ফেলা হোক। হযরত সিদ্দীকে আকবর (রাযি.)-এর প্রস্তাব ছিলো কিছু মুক্তিপণ গ্রহণ করে এদের মুক্ত করে দেয়া। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত সিদ্দীকে আকবর (রাযি.)-এর প্রস্তাব পসন্দ করলেন। সেমতে তিনি সামান্য মুক্তিপণের বিনিময়ে তাদেরকে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করলেন।
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন দারুণ শিক্ষানুরাগী, শিক্ষাকে সম্প্রসারিত করে নিরক্ষরতা দূরীকরণে তিনি ছিলেন একজন সফল কর্মবীর। বন্দীদের মাঝে কিছু লোক ছিলো শিক্ষিত। শিক্ষানুরাগী মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের শিক্ষার মূল্যায়ন করলেন। তিনি তাদের মুক্তির জন্য কোন আর্থিক মুক্তিপণ ধার্য করলেন না বরং তাদের জন্য তিনি যে মুক্তিপণ ধার্য করলেন তাই ছিলো প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শিক্ষার প্রতি অনুরাগ প্রকাশের এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। ইতিহাসে এহেন শিক্ষানুরাগের নযীর দ্বিতীয়টি আর নেই।
প্রিয় নবী হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে বললেন, তোমরা প্রত্যেকে দশজন করে আনসার ছেলে-মেয়েদের অক্ষর জ্ঞান শিক্ষা দিবে। এ শিক্ষাদান যখন শেষ হবে তখন তোমরা মুক্ত হয়ে চলে যাবে। নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ প্রস্তাবে তারা খুব খুশি হলো। এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, শিক্ষার মূল্যায়ন করতে গিয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম চরম শত্রুকেও শিক্ষকের মর্যাদা দানে কুণ্ঠাবোধ করলেন না। বরং শিক্ষা সম্প্রসারণের প্রথম সুযোগেই তিনি মদীনার কল্যাণ রাষ্ট্রে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে দিলেন। এভাবেই ধীরে ধীরে শিক্ষা সম্প্রসারিত হয়। বিভিন্ন পদক্ষেপে মহানবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জাতিকে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিয়ে তাদেরকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে উদ্ধার করতে থাকেন। সুতরাং নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপন সামগ্রিক গুণাবলীর সাথে সাথে নিরক্ষরতা দূরীকরণেও ব্যাপক অবদান রেখে একজন মহৎ শিক্ষানুরাগী হিসেবে বিশ্ব ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
📄 ক্ষুধার্তকে খাবার দান
চারিদিকে হাহাকার! মদীনায় দুর্ভিক্ষ চলছে। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর বনী আদম। আব্বাস ইবনে শুরাহবিল ক্ষুধায় কাতর। কি করবে কি খাবে কিছুই পাচ্ছে না সে। অবশেষে নিরুপায় হয়ে একটি ফলের বাগানে প্রবেশ করলো। সেখানে রকমারী ফল পেকে আছে। আব্বাস আর ক্ষুধার জ্বালা সইতে পারছে না। সে মালিকের অনুমতি ছাড়াই বাগানের ফল ছিড়ে খেতে লাগলো। ইতিমধ্যে মালিক টের পেয়ে এসে সেখানে হাযির হলো। আর যায় কোথায়? আব্বাসকে হাতে নাতে ধরে ফেললো বাগানের মালিক। আর অমনি শুরু হলো বেদম প্রহার। এক পর্যায়ে মালিক তার জামা খুলে নিয়ে গেলো।
এখানেই শেষ নয় মালিক লোকটি আব্বাসকে ধরে নিয়ে এলো প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে। বিচার দিলো তার নামে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে। নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব কথা শুনে এক পর্যায়ে ব্যথিত হলেন। বিবাদীর দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী কণ্ঠে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এ লোকটি অত্যন্ত ক্ষুধার্ত। সে শিক্ষা-দীক্ষা থেকে বঞ্চিত একজন মূর্খ মানুষ। সে অন্যের ফল না বলে খাওয়ার অপরাধ সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নয়। উপরন্তু ক্ষুধার জ্বালায় অস্থির হয়ে নিরুপায় অবস্থায় সে তোমার বাগানের অজস্র ফল থেকে দু'চারটি ফল খেয়েছে মাত্র। এজন্য তোমার তাকে প্রহার করা উচিত হয়নি বরং তোমার উচিত ছিলো এ ব্যাপারে তাকে জ্ঞান দান করা এবং তার ক্ষুধার্ত মুখে কিছু খাবার তুলে দেয়ার ব্যবস্থা করা।
এরপর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম মালিক লোকটিকে আব্বাসের জামা ফেরৎ দেয়ার নির্দেশ দিলেন। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হুকুম মত লোকটি জামা ফেরৎ দিলো। এবার দয়ার নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের পক্ষ থেকে ক্ষুধার্ত আব্বাস ইবনে শুরাহবিলকে ষাট ছা' (দুই শত দশ সের পরিমাণ) শস্য দান করে তাকে পরিতৃপ্ত করে দিলেন। এভাবেই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম অগণিত ক্ষুধার্তকে খাবার দান করেছেন। অসহায়কে সহায়তা দান করেছেন। দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। যা ছিলো উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য এক বাস্তব শিক্ষা। আমরা কি ভেবে দেখেছি, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সে শিক্ষা আমরা কতটুকু ধরে রাখতে পেরেছি। আমরা কি ক্ষুধার্ত-পীড়িতদের যথার্থ খোঁজ-খবর নিতে পারছি? আমাদের সমাজেও এ জাতীয় অজস্র মানুষ অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটায়। আমরা যেনো এক্ষেত্রে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মহান শিক্ষাকে স্মরণ করি।
📄 মোহনীয় আদর্শ
খাইবরের যুদ্ধে মুসলমানগণ বিজয়ী হলেন। অনেক গণীমতের মাল মুসলমানদের হস্তগত হলো। যার মধ্যে ছিলো অনেক স্বর্ণ-চান্দী। শীর্ষস্থানীয় সাহাবী হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রাযি.) বলেন, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাইবর যুদ্ধের গণীমতের মালের স্বর্ণ-চান্দিগুলো একত্রিত করার জন্য হযরত বিলাল (রাযি.)-এর কাপড়ের মধ্যে রাখতে থাকলেন। লক্ষ্য হচ্ছে, এভাবে সব স্বর্ণ-চান্দী একত্রিত করে পরে তা তার প্রাপকদের মাঝে বণ্টন করে দেয়া হবে। এ দৃশ্য দেখে একজনের মাঝে ভুল বুঝের সৃষ্টি হলো। সে ভাবলো নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম হয়তো সব স্বর্ণ-চান্দী হযরত বিলাল (রাযি.) কেই দিয়ে দিচ্ছেন। লোকটি তার ভুল ধারণার বহিঃপ্রকাশ ঘটালো। সে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললো, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! ইনসাফের সাথে বণ্টন করুন।
লোকটির এ কথাটি ছিলো প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি একটি বড় আক্রমণ। একটি মানুষের উপর চূড়ান্ত গোস্বা হওয়ার জন্য এ জাতীয় একটি কথাই যথেষ্ট হতে পারে। শক্তি থাকলে এ কথার প্রতিশোধ গ্রহণের স্পৃহাও মানুষের মাঝে জন্ম নিতে পারে। কিন্তু নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন দয়ার সাগর, তিনি লোকটির উপর কোনরূপ রাগ বা গোস্বা প্রকাশ করলেন না। তিনি শুধু অত্যন্ত শান্ত ভাষায় লোকটিকে বললেন, আল্লাহপাক তোমার মঙ্গল করুন আমিই যদি ইনসাফ না করলাম তবে কে আর ইনসাফ করবে? আমি যদি কোনরূপ ইনসাফ পরিপন্থী কাজ করি তবে তো আমি ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো।
সে সময় যেখানে উপস্থিত ছিলেন হযরত উমর (রাযি.)। নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি এহেন উক্তি তিনি বরদাস্ত করতে পারছিলেন না। অত্যন্ত গোস্বার সাথে তিনি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! লোকটির কথায় মনে হচ্ছে সে মুনাফিক, সুতরাং আপনার অনুমতি পেলে আমি এ বেয়াদবের গর্দান উড়িয়ে দিতে চাই। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত উমর (রাযি.) কে অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে বারণ করে বললেন, আমি কোন সাহাবীকে হত্যার নির্দেশ দেয়া থেকে আল্লাহ পাকের দরবারে পানাহ চাই। এই ছিলো নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মানুষের প্রতি মোহনীয় আখলাক প্রদর্শনের একটি ছোট্ট দৃষ্টান্ত। এভাবেই অসংখ্য মানুষ মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অতুলনীয় আদর্শের ঝর্ণা ধারায় সিক্ত হয়েছে বার বার।