📄 গরীবের প্রতি ভালবাসা
গরীব মুহাজিরদের এক জামাত বসে আছে মসজিদে নববীর এক পার্শ্বে। সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাযি.) একাকী বসে আছেন তার অদূরেই। এমনি সময়ে সেখানে উপস্থিত হলেন সাইয়্যেদুল কাওনাইন হযরত রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি অত্যন্ত আগ্রহ ভরে ঐ গরীব মুহাজিরের সাথে গিয়ে বসে পড়লেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাযি.) বলেন, নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বসতে দেখে আমিও আমার স্থান থেকে উঠে গিয়ে সে কাফেলার সাথে বসে পড়লাম। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবার উপস্থিত সকলকে লক্ষ্য করে ইরশাদ করলেন, গরীব মুহাজিরদের জন্য সুসংবাদ। কারণ তারা ধনী ও বিত্তবানদের চাইতে চল্লিশ বৎসর পূর্বে বেহেশতে প্রবেশ করবে।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র যবানে এ সুসংবাদ শুনে দুঃস্থ মুহাজিরগণ অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাযি.) বলেন, আমি লক্ষ্য করে দেখলাম, হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একথা শোনার পর উপস্থিত মুহাজিরগণের চেহারা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। কিন্তু আমার মনটা তখন আক্ষেপে ভরে উঠলো, আমি অনুশোচনাপূর্ণ মনে কল্পনা করতে থাকলাম, হায়! আমিও যদি এই সহায় সম্পদহীন গরীব মুহাজিরদের মত হতাম তবে তো আমিও এ সু সংবাদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারতাম।
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুঃস্থদের অত্যন্ত ভাল বাসতেন তাদেরকে কাছে রাখতেন এবং তাদের অভাব পূরণ করার চেষ্টা করতেন। একবার নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) কে বললেন, হে আইশা! তোমার দরজা থেকে কোন মিসকীনকে খালি হাতে ফেরৎ দিবে না। উপস্থিত যা আছে তাই তাদের হাতে তুলে দিবে। যদি আর কিছু দেয়া সম্ভব না হয় তবে অন্ততঃ এক টুকরা খেজুর হলেও তাদেরকে দান করবে।
নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন, হে আইশা! গরীব লোকদিগকে ভালবাসবে, এবং তাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা স্থাপন করবে। এমনটি করলে মহান আল্লাহও তোমাকে তার ঘনিষ্ঠজনদের অন্তর্ভুক্ত করে নিবেন। এভাবেই প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাজে কর্মে নিজেও যেমন গরীব দুঃখী অসহায়দের প্রতি দয়া-মায়া ও ভালবাসা প্রদর্শন করতেন তেমনি অন্যদেরকেও তা করার জন্য উৎসাহ-উদ্দীপনা দান করতেন।
📄 কথা রক্ষা
ইসলাম ও মুসলমানদের একজন উঁচু দরের দুশমন। নাম তার কা'আব ইবনে যুহাইর। উত্তেজনাকর বক্তৃতা ও আকর্ষণীয় কবিতা পাঠে তার ব্যাপক প্রসিদ্ধি ছিলো। এসব কবিতা আবৃত্তি করে এবং ইসলাম ও প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়ে সে কুরাইশদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতো। কা'ব ইবনে জুহাইরের এ অবস্থা বেশী দিন স্থায়ী হলো না। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মোহনীয় আদর্শ ও অতুলনীয় চরিত্র মাধুরী তাকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করলো। সে নিজের ভুল বুঝতে পেরে সেজন্য অনুতপ্ত হলো এবং যথেষ্ট লজ্জা অনুভব করতে লাগলো। কিন্তু সে যে জঘন্য অপরাধী। তার সে অপরাধ কি ক্ষমার যোগ্য? মোটেই না। এ কারণে সে কিছুতেই প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে উপস্থিত হতে সাহস পেলো না।
একদিনের কথা— প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে নববীতে সমবেত সাহাবায়ে কিরামের (রাযি.) উদ্দেশ্যে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করছিলেন। কা'ব চিন্তা-ভাবনা করে একটি নুতন বুদ্ধি আবিষ্কার করলো। সে নিজের পোষাক-আষাক বদল করে নিজের সূরত পরিবর্তন করে ফেললো, এবং ভয়ে ভয়ে সে মজলিসে গিয়ে উপস্থিত হলো। কিছুক্ষণ চুপ-চাপ মজলিসে বসে থেকে এক পর্যায়ে সুযোগ বুঝে সে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছাকাছি চলে গেলো এবং হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি যদি কা'বকে আপনার দরবারে এনে হাযির করি, তবে আপনি কি তার অতীত অপরাধসমূহ মার্জনা করে তাকে গ্রহণ করবেন? প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হ্যাঁ— আমি তাকে গ্রহণ করবো এবং তার অতীত অপরাধসমূহ ক্ষমা করে দিব।
সুযোগ বুঝে সাথে সাথে কা'ব বলে উঠলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমিই সে হতভাগা কা'ব। ভয়ে আমি আমার সূরত পরিবর্তন করে এসেছি। কা'বের অপকর্মের কথা সকলেরই জানা ছিলো, তাই তার নাম শুনলেই মুসলমানগণ ক্ষেপে উঠতেন। এবার তাঁরা কা'বকে নিজেদের নাগালে পেয়ে এক্ষুণি তাকে নিঃশেষ করে দিতে চাইলেন। কিন্তু দয়ার নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকলকে বারণ করে দিয়ে বললেন “কা'ব যত বড় অপরাধী হোক না কেন আমি তাকে নিরাপত্তা দান করেছি, সুতরাং সে সম্পূর্ণ নিরাপদ। তোমরা তাকে কিছুই বলো না। আল্লাহু আকবার কত বড় ক্ষমার নযীর স্থাপিত হলো এখানে। কত উদার প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, কত মহান তিনি।
📄 উন্নত ব্যবহার
মক্কা বিজিত হলো। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন। এমনকি বড় বড় দাগী আসামীরাও প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সে অফুরন্ত ক্ষমার প্রস্রবণে শিক্ত হলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আদর্শের অভূতপূর্ব পরশে সকলেই অভিভূত হলো। তারা ইসলামের মাহাত্ম্য বুঝতে পেরে দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে লাগলো। গোত্রে গোত্রে তারা ইসলামী কাফেলায় শরীক হতে থাকলো।
একটি গোত্র এখনো ইসলাম গ্রহণ করেনি। সে গোত্রটির নাম "বনু হানীফা"। এটিই সে পাষণ্ড দুরাচারের গোত্র যে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবদ্দশায় ভণ্ড নবুওওতের দাবীদার হওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছিলো। সে পাষণ্ড ছিলো ভণ্ড মুসাইলামাতুল কায্যাব। সে বনু হানীফা গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলো সুমামা ইবনে আসাল। ঘটনাক্রমে সে বন্দী হলো। তাকে ধরে এনে মদীনায় প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে হাযির করা হলো। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে মসজিদে নববীর খুঁটির সাথে বেঁধে রাখার নির্দেশ দিলেন।
অতঃপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে নববীতে উপস্থিত হয়ে তার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে সে জবাব দিলো, আপনি যদি আমাকে হত্যা করেন তবে একজন খুনীকেই যে হত্যা করলেন, তাতে সন্দেহ নেই। আর যদি আমার প্রতি অনুগ্রহ করেন তবে আপনি একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির প্রতিই অনুগ্রহ করলেন। এছাড়া আমাকে মুক্ত করে দেয়ার পরিবর্তে আপনি যদি বিনিময় দাবী করেন তবে নিঃসন্দেহে আমি তা পূরণ করবো।
নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব শুনে কিছু না বলেই সেদিন চলে গেলেন। দ্বিতীয় দিন সুমামার অবস্থা সম্পর্কে পুনরায় জানতে চাইলে সে আজো একই জবাব দিলো। তৃতীয় দিন আবার নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলেন। আজো সে পূর্বের মতই জবাব দিলো। এবার প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুমামার বাঁধন খুলে তাকে মুক্ত করে দেয়ার আদেশ দিলেন। হুকুম মত তাকে মুক্ত করে দেয়া হলো।
সুমামা তার প্রতি এ অপ্রত্যাশিত অনুকম্পা প্রদর্শনে দারুণভাবে প্রভাবিত হলো। তৎক্ষণাৎ সে একটি গাছের আড়ালে গিয়ে গোসল করে পবিত্র হলো এবং মসজিদে নববীতে গিয়ে সকলের সামনে কালেমা পাঠ করে পবিত্র ইসলাম গ্রহণ করে নিলো। এরপর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে সে বললো, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! দুনিয়াতে আপনিই আমার কাছে সবচাইতে নিন্দার পাত্র ছিলেন। কিন্তু এখন দুনিয়াতে আপনার চাইতে অধিক প্রিয় আমার কাছে আর কেউ নেই। আপনার ধর্মই আমার কাছে ছিলো সব চাইতে নিন্দনীয় আর এখন আমার কাছে সে আনীত ধর্মই সবচাইতে অধিক প্রিয়। আপনার শহরটি আমার কাছে সবচাইতে অপ্রিয় ছিলো কিন্তু সেটিও এখন আমার কাছে সারা দুনিয়ার মাঝে শ্রেষ্ঠ জনপদ।
📄 অসাধারণ ধৈর্য্য
সম্পূর্ণ নির্লোভ, নিরহংকার প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। অসংখ্য সোনা-রূপার অলংকারাদি এনে হাযির করা হলো নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে। এসব দিয়ে তিনি কি করবেন? তিনি তো ধন-সম্পদ জমা করার জন্য দুনিয়ায় আসেননি। তৎক্ষণাৎ তিনি সেসব স্বর্ণ-চান্দীর অলংকারসমূহ অত্যন্ত ন্যায় ও ইনসাফের সাথে বণ্টন করে দিলেন।
এ অবস্থা দেখে একজন গ্রাম্য মূর্খ লোক সেখানে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত অভদ্র ভাষায়, বেয়াদবসুলভ ভঙ্গিতে বললো, ওহে মুহাম্মদ! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার তো ধারণা যে, আল্লাহ তা'আলা আপনাকে অবশ্যই ইনসাফ করার নির্দেশ দিয়েছেন, কিন্তু আমি তো আপনাকে সে ধরণের ইনসাফপূর্ণ আচরণ করতে দেখলাম না।
এ ক্ষেত্রে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম না হয়ে অন্য কেউ হলে এ গ্রাম্য মূর্খের তৎক্ষণাৎ বারটা বাজিয়ে ছাড়তো। তার বর্ণনাভঙ্গী এমন ছিলো যে, অন্য যে কেউ হলে তা সহ্য করতে পারতো না বরং নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতো। আর ঐ বেয়াদবকে কঠোর থেকে কঠোর শাস্তি প্রদান করতো। কিন্তু প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন ক্ষমা ও উত্তম আদর্শের মূর্ত প্রতীক। সদাচরণ ছিলো তাঁর মজ্জাগত। শত কষ্টের মোকাবেলায়ও সামান্য প্রতিশোধ পরায়নতা যিনি দেখাতে যাননি কোনদিন। বরং দুশমনকেও যিনি শান্তি ও নিরাপত্তা দিয়েছেন সর্বদা।
এ দুরাচার বেয়াদবের কথার জবাবে রহমতে আলম হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত দয়াদ্র কণ্ঠে বললেন, আল্লাহ পাক তোমার মঙ্গল করুন, আমিই যদি ইনসাফের সাথে কাজ না করি তবে আমার পরে আর কেইবা তোমার সাথে ইনসাফের আচরণ করবে? এরপর লোকটি যখন সেখান থেকে ফিরে যেতে লাগলো, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন অন্য একজনকে বললেন, ঐ লোকটিকে আমার কাছে ডেকে নিয়ে এসো। কথামত তাকে ডেকে আনা হলো। যখন লোকটি নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এলো তখন তিনি অত্যন্ত নম্র কণ্ঠে তাকে বণ্টনের বিষয়টি বুঝালেন এবং বিভিন্ন সান্ত্বনা বাণী তাকে শুনালেন। এভাবে অত্যন্ত নম্র ও সদাচরণের মাধ্যমে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকটির মধ্যকার সকল সংশয় ও সন্দেহ দূরীভূত করে দিলেন। এমনিভাবেই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত গোস্বা ও রাগের ক্ষেত্রগুলোতেও অসাধারণ ধৈর্য্য ও আশ্চর্য সদাচরণ প্রদর্শন করে মানুষের মন জয় করতেন। কারো অন্যায়ে তার উপর ক্ষেপে যেতেন না। কারো দুর্ব্যবহারে তার প্রতিশোধ নিতেন না।