📄 আমানত দারী
যাকে জীবনে শেষ করে দেয়ার জন্য বোনা হচ্ছে হাজারো ষড়যন্ত্রের জাল। যার অস্তিত্ব, যার আদর্শের প্রসার এক মুহূর্তের জন্যও সহ্য হয় না। তার কাছেই গোপনে গচ্ছিত রাখা হচ্ছে নিজেদের টাকা-কড়ি। এ অবিশ্বাস্য বাস্তব বিষয়টিই সংঘটিত হয়েছে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যাপারে। কাফির বেঈমান গোষ্ঠী সর্বদাই নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ক্ষতি সাধনের চেষ্টায় লেগে থাকতো। আবার গোপনে তার কাছেই গিয়ে জমা রাখতো তাদের টাকা-কড়ি।
হিজরতের রাতের কথা। সে রাতে কাফিরদের ঐক্যবদ্ধ পরামর্শের ভিত্তিতে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দুনিয়া থেকে চিরদিনের জন্য বিদায় করে দেয়ার কুমতলবে নবী গৃহের চারপাশে যখন ওরা ওঁৎপেতে বসে গেলো তখন নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহান আল্লাহর নির্দেশে হিজরতের জন্য বেরোবার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু তাঁর কাছে যে রয়েছে অনেক কাফির মুশরিকের টাকা, যা তারা আমানত রেখেছে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আলী (রাযি.) কে নিজ বিছানায় শুইয়ে দিলেন। তাঁকে প্রধানতঃ দায়িত্ব দেয়া হলো নবীপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট কাফির কুরাইশদের আমানত রাখা টাকাগুলো তাদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য। টাকাগুলো যথাযথভাবে মালিকের হাতে পৌঁছে দেয়ার পর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকেও মদীনায় হিজরত করার জন্য বলে দিলেন।
হযরত আলী (রাযি.) যদিও হিজরতের সময় প্রিয় নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হিজরত সফরে সঙ্গী হওয়ার জন্যই এখনো মক্কায় থেকে গিয়েছিলেন। কিন্তু আরেকটি বিশেষ প্রয়োজনে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তাঁকে রেখে যাবেন বলে জানালেন, তৎক্ষণাৎ তিনি তাতে সম্মতি জানালেন এবং নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশ মতে আমানতকারীদের টাকা-কড়ি যথাযথভাবে পৌঁছে দিলেন এবং পরে তিনিও হিজরত করলেন। ঐতিহাসিক কোবা পল্লীতে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অবস্থানকালে তিনি তার সাথে গিয়ে মিলিত হলেন।
এভাবেই প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যথাযথ আমানতদারী সংরক্ষণ করেছেন। এমনকি জীবন নাশের চরম আশঙ্কাজনক মুহূর্তেও তিনি অন্যের রাখা আমানতের কথা ভুলে যাননি।
📄 গোলামের প্রতি দয়া
আপন গোলামকে বেদম প্রহার করে চলছেন একজন সাহাবী। নাম তার হযরত আবু মাসউদ আনসারী (রাযি.)। হয়তো কোন অন্যায় করেছে গোলাম। ইতিমধ্যেই সেখানে আগমন করলেন মমতার আধার রহমতে আলম প্রিয়নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। গোলামকে প্রহার করতে দেখে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হৃদয়মনে দারুণ ব্যথা পেলেন। হায় এতো অধীনস্থ গোলাম একে প্রহার করলে বাধা দেয়ার তো কেউ নেই। আর তাই হয়তো সে প্রহৃত হচ্ছে।
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, আবু মাসউদ! এ গোলাম তোমার অধীনস্থ। এর উপর তোমার যে পরিমাণ অধিকার রয়েছে, মনে রেখো তুমিও আল্লাহ পাকের অধীনস্থ, তোমার উপর মহান আল্লাহ পাকের এর চাইতেও বেশী অধিকার রয়েছে।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দয়া-মায়াপূর্ণ ভাষায় বলা এ কথাগুলো শ্রবণে হযরত আবু মাসউদ আনসারী (রাযি.) দারুণভাবে প্রভাবিত হলেন, অত্যন্ত অস্থির হয়ে তিনি বলতে লাগলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি এখনই এ গোলামকে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আযাদ করে দিলাম। এখন থেকে সে মুক্ত। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবু মাসউদ আনসারী (রাযি.)-এর এহেন উদারতা প্রদর্শনে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বললেন, তুমি যথার্থই করেছো, এমনটি না করলে পরকালে জাহান্নামের আগুন তোমাকে স্পর্শ করে বসতো।
এভাবেই নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাকর-গোলামদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করেছেন। গোলাম আযাদ করার প্রতি তিনি সকলকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করেছেন। এ কাজে তিনি অনেক ফযীলতের কথা শুনিয়েছেন। নিজেও অনেক গোলাম মুক্ত করে অন্যদেরকে গোলাম মুক্তির বাস্তব শিক্ষা দান করেছেন। যার ফলে ধীরে ধীরে সমাজ থেকে দাস-প্রথার বিলুপ্তি ঘটেছে। চাকর-গোলামেরা তাদের ন্যায্য অধিকার ও পাওনা লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। ভৃত্যদের প্রতি যত্রতত্র অত্যাচার বন্ধ হয়ে সমাজে সুখ-শান্তি ফিরে এসেছে।
📄 আদর-সোহাগ
করুণার আধার প্রিয়নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে শিশু হযরত হুসাইন (রাযি.) খেলা-ধূলা করছিলেন। দৃশ্যটি প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চোখে খুব ভাল লাগলো তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন সেখানে। এরপর এক সময় তিনি হযরত হুসাইন (রাযি.)-এর দিকে উভয় বাহু সম্প্রসারিত করে দিলেন। হযরত হুসাইন (রাযি.) খেলার ছলে প্রিয় নানাজীর দিকে হাসতে হাসতে দৌড়ে এলেন। কিছু দূর এসে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাতে ধরা না দিয়েই আবার পিছন দিকে ফিরে গেলেন।
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুনরায় শিশু হযরত হুসাইন (রাযি.)-এর দিকে উভয় হস্ত সম্প্রসারিত করে দিয়ে তাঁকে কাছে ডাকলেন। এবারও তিনি হাসতে হাসতে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দিকে এগিয়ে এসে হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর হাতে ধরা না দিয়ে পুনরায় পিছন দিকে ফিরে গেলেন। এভাবে কয়েকবার করার পর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার হযরত হুসাইন (রাযি.) কে ধরে ফেললেন, এবং তাকে স্বস্নেহে আদর করে চুমো খেলেন অতঃপর এক হাত মাথায় এবং অপর হাত থুতনীর উপর রেখে তাকে নিজ বক্ষে জড়িয়ে ধরলেন। আদর ও স্নেহের আতিশয্যে একবার নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে উঠলেন, “হুসাইন (রাযি.) আমার আর আমি হুসাইনের (রাযি.)"।
শিশুদের কাছে পেলে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যথেষ্ট আদর সোহাগ করতেন। তাদের কাছে টেনে কোলে নিতেন, আদর করে চুমো খেতেন। কোন মজলিসে কোন ভাল সুস্বাদু ফল হাদিয়া এলে সে মজলিসে কোন শিশু উপস্থিত থাকলে তিনি সে শিশুকেই তা দান করতেন। তাদের ভাল কিছু খাওয়াতে পারলে তিনি আত্মিক তৃপ্তি লাভ করতেন।
একদিনের কথা— প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কয়েকটি শিশুকে আদর সোহাগ করছিলেন, সে সময় সেখানে এক বেদুঈন এসে হাযির হলো। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শিশুদের প্রতি এহেন আদর সোহাগ করতে দেখে বেদুইন আশ্চর্য হলো, সে বললো, আপনারা শিশুদের এভাবে আদর-স্নেহ করেন অথচ আমার দশ-দশটি সন্তান থাকা সত্ত্বেও আমি কোনদিন তাদেরকে এভাবে আদর করিনি। বেদুঈনের কথায় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খানিকটা রাগ হলো, তিনি বেদুঈনকে লক্ষ্য করে বললেন, মহান আল্লাহ যদি তোমার অন্তর থেকে মায়া-মহব্বত ছিনিয়ে নিয়ে থাকেন, তবে আমি আর কি করবো?
📄 গরীবের প্রতি ভালবাসা
গরীব মুহাজিরদের এক জামাত বসে আছে মসজিদে নববীর এক পার্শ্বে। সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাযি.) একাকী বসে আছেন তার অদূরেই। এমনি সময়ে সেখানে উপস্থিত হলেন সাইয়্যেদুল কাওনাইন হযরত রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি অত্যন্ত আগ্রহ ভরে ঐ গরীব মুহাজিরের সাথে গিয়ে বসে পড়লেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাযি.) বলেন, নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বসতে দেখে আমিও আমার স্থান থেকে উঠে গিয়ে সে কাফেলার সাথে বসে পড়লাম। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবার উপস্থিত সকলকে লক্ষ্য করে ইরশাদ করলেন, গরীব মুহাজিরদের জন্য সুসংবাদ। কারণ তারা ধনী ও বিত্তবানদের চাইতে চল্লিশ বৎসর পূর্বে বেহেশতে প্রবেশ করবে।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র যবানে এ সুসংবাদ শুনে দুঃস্থ মুহাজিরগণ অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাযি.) বলেন, আমি লক্ষ্য করে দেখলাম, হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একথা শোনার পর উপস্থিত মুহাজিরগণের চেহারা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। কিন্তু আমার মনটা তখন আক্ষেপে ভরে উঠলো, আমি অনুশোচনাপূর্ণ মনে কল্পনা করতে থাকলাম, হায়! আমিও যদি এই সহায় সম্পদহীন গরীব মুহাজিরদের মত হতাম তবে তো আমিও এ সু সংবাদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারতাম।
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুঃস্থদের অত্যন্ত ভাল বাসতেন তাদেরকে কাছে রাখতেন এবং তাদের অভাব পূরণ করার চেষ্টা করতেন। একবার নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) কে বললেন, হে আইশা! তোমার দরজা থেকে কোন মিসকীনকে খালি হাতে ফেরৎ দিবে না। উপস্থিত যা আছে তাই তাদের হাতে তুলে দিবে। যদি আর কিছু দেয়া সম্ভব না হয় তবে অন্ততঃ এক টুকরা খেজুর হলেও তাদেরকে দান করবে।
নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন, হে আইশা! গরীব লোকদিগকে ভালবাসবে, এবং তাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা স্থাপন করবে। এমনটি করলে মহান আল্লাহও তোমাকে তার ঘনিষ্ঠজনদের অন্তর্ভুক্ত করে নিবেন। এভাবেই প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাজে কর্মে নিজেও যেমন গরীব দুঃখী অসহায়দের প্রতি দয়া-মায়া ও ভালবাসা প্রদর্শন করতেন তেমনি অন্যদেরকেও তা করার জন্য উৎসাহ-উদ্দীপনা দান করতেন।