📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 পরামর্শ দান

📄 পরামর্শ দান


একজন সাহাবী (রাযি.)। অত্যন্ত অসহায় জীবন যাপন করছেন। তিনি হাযির হলেন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র দরবারে। "হুযূর! আমাকে কিছু সাহায্য করুন আমি বড়ই অসহায়" অত্যন্ত বিনয়ের সাথে ফরিয়াদ জানালেন সাহাবী (রাযি.)।

প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভিক্ষাবৃত্তি পসন্দ করতেন না, বরং নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শিক্ষা ছিলো ভিক্ষা করা পরিহার করে নিজের বাহুবলে খেটে খাবে। তিনি সাহাবী (রাযি.) কে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কাছে বিক্রি করার মত কোন বস্তু আছে কি? সাহাবী (রাযি.) জবাব দিলেন, আমার কাছে একটি বিছানা আর একটি পেয়ালা আছে। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে সাহাবী (রাযি.) কে সেগুলো নিয়ে আসতে বললেন। হুকুম মত সাহাবী (রাযি.) বিছানা ও পেয়ালা এনে হাযির করলেন। অতঃপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপস্থিত সকলকে লক্ষ্য করে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের মধ্যে এ দু'টো বস্তু খরিদ করার মত কেউ আছে কি?

একজন সাহাবী বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমি এক দিরহাম মূল্যে এ বস্তুগুলো খরিদ করতে প্রস্তুত আছি। নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, এক দিরহামের চেয়ে বেশী মূল্যে খরিদ করার মত কেউ আছে কি? অন্য একজন সাহাবী (রাযি.) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি এ দুটি বস্তু দুই দিরহাম দিয়ে খরিদ করতে রাযী আছি। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দ্বিতীয় সাহাবীর (রাযি.) কাছে দুই দিরহামের বিনিময়ে তা বিক্রি করে তার কাছ থেকে মূল্য আদায় করে ঐ দুঃস্থ সাহাবী (রাযি.) কে তা দিয়ে বললেন, নাও এ দু'দিরহামের এক দিরহাম দিয়ে আজকের খানা-দানার ব্যবস্থা কর। আর এক দিরহাম দিয়ে বাজার থেকে একটি রশি ক্রয় করে আনো। (কোন কোন বর্ণনায় একটি কুঠার কিনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে) অতঃপর তা দ্বারা জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে এবং লাকড়ী কুড়িয়ে এনে বাজারে বিক্রি কর। এবং তার উপার্জন দ্বারা সংসার চালাতে থাক।

প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদেশ মতে সে সাহাবী (রাযি.) কাজ করতে লাগলেন, এবং আস্তে আস্তে মহান আল্লাহ তার সকল অভাব দূরীভূত করে দিলেন। ধীরে ধীরে তিনি কিছু অর্থ সঞ্চয় করতেও সক্ষম হলেন। এভাবে তিনি খুব আরামে দিন গুযরান করতে লাগলেন। প্রায় দু'সপ্তাহ পরে ঐ সাহাবীর (রাযি.) সাথে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাক্ষাত হলে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে তার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। উত্তরে সাহাবী (রাযি.) নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানালেন, হুযূর! আমি এখন যথেষ্ট আরামে আছি, আল্লাহপাক আমার অভাব দূরীভূত করে দিয়েছেন। এখনও আমার হাতে পনেরো দিরহাম সঞ্চিত রয়েছে।

নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবার ঐ সাহাবী (রাযি.) কে পরামর্শ দিলেন, ঐ সঞ্চিত অর্থের অর্ধেক দিয়ে তুমি তোমার স্ত্রী পুত্র পরিজনের জন্য ব্যবহারের কাপড় খরিদ কর। আর বাকী অর্ধেক দ্বারা ঘরের প্রয়োজনীয় খাবার ক্রয় করে নিয়ে যাও। অতঃপর প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে সাহাবী (রাযি.) কে জিজ্ঞাসা করলেন, এবার তুমি বলো তোমার কাছে কি এভাবে পরিশ্রম করে নিজের বাহুবলে জীবিকা উপার্জন করা ভাল মনে হয়, নাকি ভিক্ষাবৃত্তি অধিক পসন্দনীয় বলে মনে হয়? মনে রেখো দুনিয়াতে যারা ভিক্ষাবৃত্তি করবে পরকালে আল্লাহ পাকের দরবারে তারা অপমানিত হয়ে উঠবে।

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দেয়া উপদেশ ও পরামর্শ হযরত সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) দিল ও জানে মেনে নিতেন এবং তার উপর আমল করতেন। এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরামর্শের উপর কাজ করে তারা তার সুফল লাভ করেছেন। এভাবেই একজন অভাবগ্রস্ত লোককে প্রিয়নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভিক্ষাবৃত্তি থেকে ফিরিয়ে এনে স্বনির্ভর জীবন গড়ার পথ বাতলে দিলেন।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 দুঃস্থ জীবন যাপন

📄 দুঃস্থ জীবন যাপন


“দুঃস্থতাই আমার জন্য গৌরব”— প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের এ চিরন্তন বাণীর আলোকেই নিজ জীবন পরিচালনা করতেন। তিনি অধিক ধনবান হওয়ার প্রতি মোটেও আগ্রহী ছিলেন না। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে যা কিছু পাওয়া যেতো তাতেই তিনি সন্তুষ্ট থাকতেন। অল্পে তুষ্টি ছিলো নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একটি অন্যতম সার্বক্ষণিক আদর্শ।

একবার হযরত আবু তালহা (রাযি.) প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মসজিদের অভ্যন্তরে শুয়ে থাকা অবস্থায় দেখতে পেলেন। নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন ছিলেন খুবই ক্ষুধার্ত। হযরত আবু তালহা (রাযি.) বলেন, আমি দেখলাম— নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্ষুধার জ্বালায় বার বার শুধু এপাশ ওপাশ করে পার্শ্ব পরিবর্তন করছেন।

হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করতেন আদর্শ সন্তানের জন্য শুধু কয়েকটি বস্তুই যথেষ্ট। এ ছাড়া দুনিয়ায় তাদের আর কিছুর প্রয়োজন নেই ১. বসবাসের জন্য একটি ঘর। ২. দেহ আবৃত করে রাখার জন্য একটু কাপড়। ৩. জীবন ধারণের জন্য কিছু আহার্য ও পানীয়।

দু'জাহানের সরদার প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ঘরে অধিকাংশ সময়েই খাবার কিছুই থাকতো না। একাধারে কয়েকদিনও তিনি অভুক্ত থেকেছেন। হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) বলেন, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পূর্ণ জীবনে কোন দিনও দুইবেলা তৃপ্তি ভরে আহার গ্রহণ করেননি।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 আমানত দারী

📄 আমানত দারী


যাকে জীবনে শেষ করে দেয়ার জন্য বোনা হচ্ছে হাজারো ষড়যন্ত্রের জাল। যার অস্তিত্ব, যার আদর্শের প্রসার এক মুহূর্তের জন্যও সহ্য হয় না। তার কাছেই গোপনে গচ্ছিত রাখা হচ্ছে নিজেদের টাকা-কড়ি। এ অবিশ্বাস্য বাস্তব বিষয়টিই সংঘটিত হয়েছে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যাপারে। কাফির বেঈমান গোষ্ঠী সর্বদাই নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ক্ষতি সাধনের চেষ্টায় লেগে থাকতো। আবার গোপনে তার কাছেই গিয়ে জমা রাখতো তাদের টাকা-কড়ি।

হিজরতের রাতের কথা। সে রাতে কাফিরদের ঐক্যবদ্ধ পরামর্শের ভিত্তিতে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দুনিয়া থেকে চিরদিনের জন্য বিদায় করে দেয়ার কুমতলবে নবী গৃহের চারপাশে যখন ওরা ওঁৎপেতে বসে গেলো তখন নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহান আল্লাহর নির্দেশে হিজরতের জন্য বেরোবার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু তাঁর কাছে যে রয়েছে অনেক কাফির মুশরিকের টাকা, যা তারা আমানত রেখেছে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে।

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আলী (রাযি.) কে নিজ বিছানায় শুইয়ে দিলেন। তাঁকে প্রধানতঃ দায়িত্ব দেয়া হলো নবীপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট কাফির কুরাইশদের আমানত রাখা টাকাগুলো তাদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য। টাকাগুলো যথাযথভাবে মালিকের হাতে পৌঁছে দেয়ার পর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকেও মদীনায় হিজরত করার জন্য বলে দিলেন।

হযরত আলী (রাযি.) যদিও হিজরতের সময় প্রিয় নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হিজরত সফরে সঙ্গী হওয়ার জন্যই এখনো মক্কায় থেকে গিয়েছিলেন। কিন্তু আরেকটি বিশেষ প্রয়োজনে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তাঁকে রেখে যাবেন বলে জানালেন, তৎক্ষণাৎ তিনি তাতে সম্মতি জানালেন এবং নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশ মতে আমানতকারীদের টাকা-কড়ি যথাযথভাবে পৌঁছে দিলেন এবং পরে তিনিও হিজরত করলেন। ঐতিহাসিক কোবা পল্লীতে নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অবস্থানকালে তিনি তার সাথে গিয়ে মিলিত হলেন।

এভাবেই প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যথাযথ আমানতদারী সংরক্ষণ করেছেন। এমনকি জীবন নাশের চরম আশঙ্কাজনক মুহূর্তেও তিনি অন্যের রাখা আমানতের কথা ভুলে যাননি।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 গোলামের প্রতি দয়া

📄 গোলামের প্রতি দয়া


আপন গোলামকে বেদম প্রহার করে চলছেন একজন সাহাবী। নাম তার হযরত আবু মাসউদ আনসারী (রাযি.)। হয়তো কোন অন্যায় করেছে গোলাম। ইতিমধ্যেই সেখানে আগমন করলেন মমতার আধার রহমতে আলম প্রিয়নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। গোলামকে প্রহার করতে দেখে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হৃদয়মনে দারুণ ব্যথা পেলেন। হায় এতো অধীনস্থ গোলাম একে প্রহার করলে বাধা দেয়ার তো কেউ নেই। আর তাই হয়তো সে প্রহৃত হচ্ছে।

প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, আবু মাসউদ! এ গোলাম তোমার অধীনস্থ। এর উপর তোমার যে পরিমাণ অধিকার রয়েছে, মনে রেখো তুমিও আল্লাহ পাকের অধীনস্থ, তোমার উপর মহান আল্লাহ পাকের এর চাইতেও বেশী অধিকার রয়েছে।

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দয়া-মায়াপূর্ণ ভাষায় বলা এ কথাগুলো শ্রবণে হযরত আবু মাসউদ আনসারী (রাযি.) দারুণভাবে প্রভাবিত হলেন, অত্যন্ত অস্থির হয়ে তিনি বলতে লাগলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি এখনই এ গোলামকে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আযাদ করে দিলাম। এখন থেকে সে মুক্ত। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবু মাসউদ আনসারী (রাযি.)-এর এহেন উদারতা প্রদর্শনে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বললেন, তুমি যথার্থই করেছো, এমনটি না করলে পরকালে জাহান্নামের আগুন তোমাকে স্পর্শ করে বসতো।

এভাবেই নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাকর-গোলামদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করেছেন। গোলাম আযাদ করার প্রতি তিনি সকলকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করেছেন। এ কাজে তিনি অনেক ফযীলতের কথা শুনিয়েছেন। নিজেও অনেক গোলাম মুক্ত করে অন্যদেরকে গোলাম মুক্তির বাস্তব শিক্ষা দান করেছেন। যার ফলে ধীরে ধীরে সমাজ থেকে দাস-প্রথার বিলুপ্তি ঘটেছে। চাকর-গোলামেরা তাদের ন্যায্য অধিকার ও পাওনা লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। ভৃত্যদের প্রতি যত্রতত্র অত্যাচার বন্ধ হয়ে সমাজে সুখ-শান্তি ফিরে এসেছে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px