📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 উদারতা

📄 উদারতা


প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকলকে কল্যাণের পথে ডাকছেন। ডাকছেন সত্যধর্ম ইসলামী আদর্শ গ্রহণের জন্য। কিন্তু কাফির বেঈমানদের জন্য তা ছিলো গাত্রদাহের কারণ। বাপ-দাদার ধর্মের দোহাই দিয়ে তারা হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক আনীত সঠিক ও সত্য ধর্ম ইসলামের আওয়াযকে স্তব্ধ করে দেয়ার চেষ্টায় লিপ্ত ছিলো অহর্নিশি। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনের দুশমন ছিলো তারা।

এমনি এক কাফির প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাড়ীতে মেহমান হলো। নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বেশ কয়েকটি দুধের বকরী ছিলো। প্রথমতঃ প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে আন্তরিকভাবে অতিথি হিসেবে বরণ করলেন, অতঃপর তিনি একটি বকরীর দুধ তাকে এনে দিলেন। লোকটি ছিলো কিছুটা পেটুক ধরণের। সে এক চুমুকেই তা সাবাড় করে আরো চাইলো। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরেকটি বকরীর দুধ এনে তার সামনে হাযির করলেন। লোকটি তাও পান করে নিলো এবং আরো দুধ চাইলো। এভাবে লোকটি একে একে ঘরের সাতটি বকরীর দুধ সব পান করে সাবাড় করলো।

কাফির লোকটি আসলে এধরণের অসৎ উদ্দেশ্য নিয়েই এসেছিলো, যাতে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ঘরের সকলকে সহ অভুক্ত থাকতে হয়। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কু মতলব টের পেয়েছিলেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি তাকে কিছুই বলেননি বরং তার কথা মত তাকে বার বার দুধ এনে দিয়েছেন। লোকটিও সব একের পর এক খেয়ে সাবাড় করেছে।

জীবনের দুশমন কাফিরের প্রতি এহেন উদার আতিথ্য প্রদর্শন শুধু প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দ্বারাই সম্ভব। কারণ তিনি ছিলেন সীমাহীন উদার। যে উদারতাকে আকাশের উদারতার সাথে তুলনা করলেও কম হয়। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এহেন বেনযীর উদারতায় ঐ কাফির লোকটি দারুণভাবে প্রভাবিত হলো। সে ভাবতেও পারেনি তার প্রতি এত সুন্দর আচরণ করা হবে। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ মোহনীয় আদর্শ তাকে আকর্ষণ করলো, সে দ্বীন ইসলামের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়লো। এক পর্যায়ে সে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাতে একমাত্র সত্যধর্ম ও জীবন বিধান ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হলো।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 সহযোগিত

📄 সহযোগিত


মক্কা বিজিত হওয়ার পর পবিত্র সে নগরী সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হলো। বিভিন্ন এলাকায় অবস্থানরত লোকেরাও তখন মক্কা নগরীতে প্রত্যাবর্তন করার সাহস ও সুযোগ পেলো। মক্কা বিজয় পরবর্তী সে সময়ে হাকীম ইবনে হিযাম ইসলামী ভূখণ্ডে প্রবেশ করলেন। তিনি ছিলেন আর্থিক দিক থেকে দুর্বল ও দুঃস্থ। একবার তিনি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে হাযির হয়ে কিছু সাহায্য সহযোগিতা চাইলেন। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কিছু সাহায্য দিয়ে দিলেন। তিনিও সেদিনের মত চলে গেলেন।

কিছুদিন পর আবারো একদিন তিনি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে এসে হাযির হলেন এবং পুনরায় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে কিছু সাহায্য প্রার্থনা করলেন। এবারও প্রিয় নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কিছু সহানুভূতি প্রদর্শন করলেন। সাহায্য পেয়ে এবারও আনন্দচিত্তে তিনি ফিরে গেলেন।

এরপর আবার একদিন তৃতীয় বারের মত তিনি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে কিছু সাহায্য প্রার্থনা করেন। এবার হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাকীম ইবনে হিযামকে উপদেশ দিয়ে বললেন, হাকীম! যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অন্যকে সাহায্য করে মহান আল্লাহ তার ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করে দেন। আর যার মধ্যে লোভ থাকে আর সে লোভের বশীভূত হয়ে অন্যের কাছে প্রার্থনার হাত প্রসারিত করে, সে সর্বদাই অতৃপ্ত থাকে এবং কখনোই পরিতৃপ্ত হতে পারে না। মনে রেখো, দাতার হাত গ্রহিতার হাত অপেক্ষা উত্তম। অর্থাৎ কারো দান পাওয়ার আশায় থাকার চাইতে কাউকে দান করতে পারা উত্তম।

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ নিষ্ঠাপূর্ণ উপদেশ বাণীতে হাকীম ইবনে হিযাম ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হলেন, তিনি তখনই প্রতিজ্ঞা করলেন, আর কোনদিন তিনি কারো কাছে দুনিয়ার কিছু প্রার্থনা করবেন না। এরপর থেকে তিনি আর কোনদিন কারো কাছে কিছুই চাননি। এমনকি কখনো প্রয়োজন বোধ করলেও তিনি অন্য কারো কাছে প্রার্থনা করা থেকে অত্যন্ত কঠোর ভাবে বিরত থেকেছেন।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 পরামর্শ দান

📄 পরামর্শ দান


একজন সাহাবী (রাযি.)। অত্যন্ত অসহায় জীবন যাপন করছেন। তিনি হাযির হলেন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র দরবারে। "হুযূর! আমাকে কিছু সাহায্য করুন আমি বড়ই অসহায়" অত্যন্ত বিনয়ের সাথে ফরিয়াদ জানালেন সাহাবী (রাযি.)।

প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভিক্ষাবৃত্তি পসন্দ করতেন না, বরং নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শিক্ষা ছিলো ভিক্ষা করা পরিহার করে নিজের বাহুবলে খেটে খাবে। তিনি সাহাবী (রাযি.) কে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কাছে বিক্রি করার মত কোন বস্তু আছে কি? সাহাবী (রাযি.) জবাব দিলেন, আমার কাছে একটি বিছানা আর একটি পেয়ালা আছে। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে সাহাবী (রাযি.) কে সেগুলো নিয়ে আসতে বললেন। হুকুম মত সাহাবী (রাযি.) বিছানা ও পেয়ালা এনে হাযির করলেন। অতঃপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপস্থিত সকলকে লক্ষ্য করে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের মধ্যে এ দু'টো বস্তু খরিদ করার মত কেউ আছে কি?

একজন সাহাবী বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমি এক দিরহাম মূল্যে এ বস্তুগুলো খরিদ করতে প্রস্তুত আছি। নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, এক দিরহামের চেয়ে বেশী মূল্যে খরিদ করার মত কেউ আছে কি? অন্য একজন সাহাবী (রাযি.) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি এ দুটি বস্তু দুই দিরহাম দিয়ে খরিদ করতে রাযী আছি। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দ্বিতীয় সাহাবীর (রাযি.) কাছে দুই দিরহামের বিনিময়ে তা বিক্রি করে তার কাছ থেকে মূল্য আদায় করে ঐ দুঃস্থ সাহাবী (রাযি.) কে তা দিয়ে বললেন, নাও এ দু'দিরহামের এক দিরহাম দিয়ে আজকের খানা-দানার ব্যবস্থা কর। আর এক দিরহাম দিয়ে বাজার থেকে একটি রশি ক্রয় করে আনো। (কোন কোন বর্ণনায় একটি কুঠার কিনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে) অতঃপর তা দ্বারা জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে এবং লাকড়ী কুড়িয়ে এনে বাজারে বিক্রি কর। এবং তার উপার্জন দ্বারা সংসার চালাতে থাক।

প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদেশ মতে সে সাহাবী (রাযি.) কাজ করতে লাগলেন, এবং আস্তে আস্তে মহান আল্লাহ তার সকল অভাব দূরীভূত করে দিলেন। ধীরে ধীরে তিনি কিছু অর্থ সঞ্চয় করতেও সক্ষম হলেন। এভাবে তিনি খুব আরামে দিন গুযরান করতে লাগলেন। প্রায় দু'সপ্তাহ পরে ঐ সাহাবীর (রাযি.) সাথে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাক্ষাত হলে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে তার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। উত্তরে সাহাবী (রাযি.) নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানালেন, হুযূর! আমি এখন যথেষ্ট আরামে আছি, আল্লাহপাক আমার অভাব দূরীভূত করে দিয়েছেন। এখনও আমার হাতে পনেরো দিরহাম সঞ্চিত রয়েছে।

নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবার ঐ সাহাবী (রাযি.) কে পরামর্শ দিলেন, ঐ সঞ্চিত অর্থের অর্ধেক দিয়ে তুমি তোমার স্ত্রী পুত্র পরিজনের জন্য ব্যবহারের কাপড় খরিদ কর। আর বাকী অর্ধেক দ্বারা ঘরের প্রয়োজনীয় খাবার ক্রয় করে নিয়ে যাও। অতঃপর প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে সাহাবী (রাযি.) কে জিজ্ঞাসা করলেন, এবার তুমি বলো তোমার কাছে কি এভাবে পরিশ্রম করে নিজের বাহুবলে জীবিকা উপার্জন করা ভাল মনে হয়, নাকি ভিক্ষাবৃত্তি অধিক পসন্দনীয় বলে মনে হয়? মনে রেখো দুনিয়াতে যারা ভিক্ষাবৃত্তি করবে পরকালে আল্লাহ পাকের দরবারে তারা অপমানিত হয়ে উঠবে।

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দেয়া উপদেশ ও পরামর্শ হযরত সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) দিল ও জানে মেনে নিতেন এবং তার উপর আমল করতেন। এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরামর্শের উপর কাজ করে তারা তার সুফল লাভ করেছেন। এভাবেই একজন অভাবগ্রস্ত লোককে প্রিয়নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভিক্ষাবৃত্তি থেকে ফিরিয়ে এনে স্বনির্ভর জীবন গড়ার পথ বাতলে দিলেন।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 দুঃস্থ জীবন যাপন

📄 দুঃস্থ জীবন যাপন


“দুঃস্থতাই আমার জন্য গৌরব”— প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের এ চিরন্তন বাণীর আলোকেই নিজ জীবন পরিচালনা করতেন। তিনি অধিক ধনবান হওয়ার প্রতি মোটেও আগ্রহী ছিলেন না। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে যা কিছু পাওয়া যেতো তাতেই তিনি সন্তুষ্ট থাকতেন। অল্পে তুষ্টি ছিলো নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একটি অন্যতম সার্বক্ষণিক আদর্শ।

একবার হযরত আবু তালহা (রাযি.) প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মসজিদের অভ্যন্তরে শুয়ে থাকা অবস্থায় দেখতে পেলেন। নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন ছিলেন খুবই ক্ষুধার্ত। হযরত আবু তালহা (রাযি.) বলেন, আমি দেখলাম— নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্ষুধার জ্বালায় বার বার শুধু এপাশ ওপাশ করে পার্শ্ব পরিবর্তন করছেন।

হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করতেন আদর্শ সন্তানের জন্য শুধু কয়েকটি বস্তুই যথেষ্ট। এ ছাড়া দুনিয়ায় তাদের আর কিছুর প্রয়োজন নেই ১. বসবাসের জন্য একটি ঘর। ২. দেহ আবৃত করে রাখার জন্য একটু কাপড়। ৩. জীবন ধারণের জন্য কিছু আহার্য ও পানীয়।

দু'জাহানের সরদার প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ঘরে অধিকাংশ সময়েই খাবার কিছুই থাকতো না। একাধারে কয়েকদিনও তিনি অভুক্ত থেকেছেন। হযরত আইশা সিদ্দীকা (রাযি.) বলেন, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পূর্ণ জীবনে কোন দিনও দুইবেলা তৃপ্তি ভরে আহার গ্রহণ করেননি।

ফন্ট সাইজ
15px
17px