📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 শান্তি কামিতা

📄 শান্তি কামিতা


প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আজ অসহায় নন। তার সাথে পনেরো শত জানবায সাহাবীর (রাযি.) এক বিশাল কাফেলা। একটি মাত্র আঙুলির ইশারায় তারা সব লণ্ড-ভণ্ড করে দিতে পারেন, কারণ এ পনেরো শত দুর্দমনীয় সৈন্যের মাত্র তিনশত তের জন সৈন্য বদর প্রান্তরের রণসাজে সজ্জিত প্রায় এক হাজার কাফির সৈন্যকে চরমভাবে পর্যুদস্ত করে দিয়েছিলেন।

ঐতিহাসিক হুদাইবিয়ার সন্ধির কথাই বলছিলাম। পনেরো শত সাহাবীর এক বিশাল বাহিনী নিয়ে তিনশত মাইল দীর্ঘপথ অতিক্রম করে মক্কার উপকণ্ঠে, মক্কানগরী থেকে মাত্র নয় মাইল দূরে অবস্থিত ঐতিহাসিক হুদাইবিয়ায় এসে পৌঁছেছেন (বর্তমানে যে স্থানটি সুমাইসিয়া নামে পরিচিত)। কিন্তু মক্কাবাসীরা আল্লাহর ঘর যিয়ারতে বাধা দিলো। তার গতিপথ রুদ্ধ করে দিলো, আর একটুও সামনে আগাতে দিবে না।

চরম উত্তেজনার এহেন মুহূর্তে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করলেন— "মহান আল্লাহর সম্মানিত নিদর্শনসমূহের সম্মান ক্ষুণ্ণ না হয়। এরূপ যে কোন শর্ত মুশরিকরা আরোপ করে— আজ আমি তা মেনে নিব।"

সন্ধির কথা আলোচনা হলো। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা মেনে নিলেন। সন্ধিপত্রের গায়ে "বিসমিল্লাহ” লিখায় মুশরিকরা আপত্তি জানালো। আর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামের সাথে "রাসূলুল্লাহ" শব্দ লিখায় তারা তার বিরোধিতা করলো। তিন শত মাইল অতিক্রম করে এত কাছাকাছি এসেও আল্লাহ পাকের ঘর যিয়ারত না করেই পুনরায় ফিরে যাওয়ার শর্ত আরোপ করলো।

শান্তির বার্তাবাহক, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার মহান অগ্রদূত, একমাত্র শান্তি রক্ষার মহান লক্ষ্যে উপরোক্ত কথাগুলোসহ আরো অনেক অবাঞ্ছিত ও অযৌক্তিক কথা-বার্তা সব মেনে নিয়ে মক্কার মুশরিকদের সাথে দশ বৎসর মেয়াদী 'যুদ্ধ নয় শান্তি' চুক্তি সম্পাদন করে পুনরায় ফিরে এলেন। শক্তি সামর্থ থাকা সত্ত্বেও এহেন অযৌক্তিক ও অন্যায় শর্তাবলী মেনে নিয়ে শুধু শান্তি প্রতিষ্ঠা ও তা অক্ষুন্ন রাখার জন্য প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে মহান ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিলেন, তা যুগ যুগ ধরে শান্তিকামী বিশ্ববাসীর কাছে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 অপূর্ব আচরণ

📄 অপূর্ব আচরণ


ইসলাম ও মুসলমানদের বিরোধিতা করার কোন সুযোগই হাত ছাড়া করেনি ওরা, ছাড়েনি মুসলমানদের ক্ষতিসাধনের কোন ফাঁক-ফোকড়। ওরা মুনাফিক, ওদের সরদার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিরুদ্ধে সারাটা জীবন ষড়যন্ত্র করেছে। ধোঁকা-প্রতারণা করে মুসলমানদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টায় লিপ্ত ছিলো সদা সর্বদা। সর্বোপরি উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা সিদ্দীকা (রাযি.)-এর পবিত্র চরিত্রে কলঙ্ক লেপে দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টায়ও সে মুনাফিক সরদার মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।

এত কিছুর পরেও উত্তম আদর্শের মূর্তপ্রতীক প্রিয়নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সদা-সর্বদা তার প্রতি সদাচরণ প্রদর্শন করেছেন। এ মুনাফিক সরদার দুরাচার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই যখন অন্তিম শয্যায় শায়িত তখন স্বয়ং নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর কাছে এক বিশেষ আবদার জুড়ে দেয়। সে বলে, আমার একটি অন্তিম বাসনা হচ্ছে, আপনি দয়া করে আপনার একটি জামা আমার কাফন হিসেবে দান করুন এবং আপনার কাছে আমার অনুরোধ যে, আপনি আমার জানাযা নামায পড়াবেন।

আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই একথা ভাল ভাবেই জানতো যে, একমাত্র ইসলামই সঠিক ও সত্য ধর্ম, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই হক ও সত্যনবী কিন্তু সেতো আজীবন সে ধর্ম এবং তার বাহক নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে তার কুটিল স্বভাব হেতু বিদ্বেষ প্রদর্শন করেছে। এখন মউতের সময় সে কাফনের জন্য নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জামা দেয়ার জন্য এবং তার জানাযা স্বয়ং নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে পড়ানোর জন্য অনুরোধ করলো যাতে এ অসীলায় তার পরকালে নাজাতের পথ সুগম হয়।

হযরত উমর (রাযি.) মুনাফিক সরদারের অতীত অপকর্মসমূহের কথা উল্লেখ করে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার আবদার পূরণে সম্মত না হওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু রহমতে আলম, দয়ার সাগর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবনে উবাইর উভয় আবদারই পূর্ণ করতে সম্মত হলেন এবং পরে তা তিনি বাস্তবেও পূর্ণ করলেন। এবং বললেন, আমাকে যদি একথা বলা হতো যে, সত্তরের অধিকবার মাগফিরাতের দু'আ করলে তাকে ক্ষমা করে দেয়া হবে তবে আমি তার জন্য তার চাইতেও অধিক বার দু'আ করতাম। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অপূর্ব আচরণে মুনাফিকদের মাঝে দারুণ প্রভাবের সৃষ্টি হলো। তারা আস্তে আস্তে খাঁটি ও প্রকৃত মুসলমান হয়ে যেতে লাগলো।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 উদারতা

📄 উদারতা


প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকলকে কল্যাণের পথে ডাকছেন। ডাকছেন সত্যধর্ম ইসলামী আদর্শ গ্রহণের জন্য। কিন্তু কাফির বেঈমানদের জন্য তা ছিলো গাত্রদাহের কারণ। বাপ-দাদার ধর্মের দোহাই দিয়ে তারা হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক আনীত সঠিক ও সত্য ধর্ম ইসলামের আওয়াযকে স্তব্ধ করে দেয়ার চেষ্টায় লিপ্ত ছিলো অহর্নিশি। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনের দুশমন ছিলো তারা।

এমনি এক কাফির প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাড়ীতে মেহমান হলো। নবীজী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বেশ কয়েকটি দুধের বকরী ছিলো। প্রথমতঃ প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে আন্তরিকভাবে অতিথি হিসেবে বরণ করলেন, অতঃপর তিনি একটি বকরীর দুধ তাকে এনে দিলেন। লোকটি ছিলো কিছুটা পেটুক ধরণের। সে এক চুমুকেই তা সাবাড় করে আরো চাইলো। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরেকটি বকরীর দুধ এনে তার সামনে হাযির করলেন। লোকটি তাও পান করে নিলো এবং আরো দুধ চাইলো। এভাবে লোকটি একে একে ঘরের সাতটি বকরীর দুধ সব পান করে সাবাড় করলো।

কাফির লোকটি আসলে এধরণের অসৎ উদ্দেশ্য নিয়েই এসেছিলো, যাতে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ঘরের সকলকে সহ অভুক্ত থাকতে হয়। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কু মতলব টের পেয়েছিলেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি তাকে কিছুই বলেননি বরং তার কথা মত তাকে বার বার দুধ এনে দিয়েছেন। লোকটিও সব একের পর এক খেয়ে সাবাড় করেছে।

জীবনের দুশমন কাফিরের প্রতি এহেন উদার আতিথ্য প্রদর্শন শুধু প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দ্বারাই সম্ভব। কারণ তিনি ছিলেন সীমাহীন উদার। যে উদারতাকে আকাশের উদারতার সাথে তুলনা করলেও কম হয়। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এহেন বেনযীর উদারতায় ঐ কাফির লোকটি দারুণভাবে প্রভাবিত হলো। সে ভাবতেও পারেনি তার প্রতি এত সুন্দর আচরণ করা হবে। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ মোহনীয় আদর্শ তাকে আকর্ষণ করলো, সে দ্বীন ইসলামের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়লো। এক পর্যায়ে সে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাতে একমাত্র সত্যধর্ম ও জীবন বিধান ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হলো।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 সহযোগিত

📄 সহযোগিত


মক্কা বিজিত হওয়ার পর পবিত্র সে নগরী সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হলো। বিভিন্ন এলাকায় অবস্থানরত লোকেরাও তখন মক্কা নগরীতে প্রত্যাবর্তন করার সাহস ও সুযোগ পেলো। মক্কা বিজয় পরবর্তী সে সময়ে হাকীম ইবনে হিযাম ইসলামী ভূখণ্ডে প্রবেশ করলেন। তিনি ছিলেন আর্থিক দিক থেকে দুর্বল ও দুঃস্থ। একবার তিনি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে হাযির হয়ে কিছু সাহায্য সহযোগিতা চাইলেন। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কিছু সাহায্য দিয়ে দিলেন। তিনিও সেদিনের মত চলে গেলেন।

কিছুদিন পর আবারো একদিন তিনি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে এসে হাযির হলেন এবং পুনরায় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে কিছু সাহায্য প্রার্থনা করলেন। এবারও প্রিয় নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কিছু সহানুভূতি প্রদর্শন করলেন। সাহায্য পেয়ে এবারও আনন্দচিত্তে তিনি ফিরে গেলেন।

এরপর আবার একদিন তৃতীয় বারের মত তিনি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে কিছু সাহায্য প্রার্থনা করেন। এবার হযরত সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাকীম ইবনে হিযামকে উপদেশ দিয়ে বললেন, হাকীম! যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অন্যকে সাহায্য করে মহান আল্লাহ তার ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করে দেন। আর যার মধ্যে লোভ থাকে আর সে লোভের বশীভূত হয়ে অন্যের কাছে প্রার্থনার হাত প্রসারিত করে, সে সর্বদাই অতৃপ্ত থাকে এবং কখনোই পরিতৃপ্ত হতে পারে না। মনে রেখো, দাতার হাত গ্রহিতার হাত অপেক্ষা উত্তম। অর্থাৎ কারো দান পাওয়ার আশায় থাকার চাইতে কাউকে দান করতে পারা উত্তম।

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ নিষ্ঠাপূর্ণ উপদেশ বাণীতে হাকীম ইবনে হিযাম ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হলেন, তিনি তখনই প্রতিজ্ঞা করলেন, আর কোনদিন তিনি কারো কাছে দুনিয়ার কিছু প্রার্থনা করবেন না। এরপর থেকে তিনি আর কোনদিন কারো কাছে কিছুই চাননি। এমনকি কখনো প্রয়োজন বোধ করলেও তিনি অন্য কারো কাছে প্রার্থনা করা থেকে অত্যন্ত কঠোর ভাবে বিরত থেকেছেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px