📄 বীরত্ব
সঙ্কাপূর্ণ এক ভয়াল রজনী। মদীনাবাসী ভীত শঙ্কিত। একটি ভয়ঙ্কর ভীতিপ্রদ শব্দ শ্রুত হলো। শত্রু আক্রমণের তীব্র আশঙ্কা। সকলেই অস্থির, হতভম্ব, হত বিহ্বল। কারো চোখে ঘুম নেই। কখনো বা কেউ একটু বিছানায় গা এলিয়ে দিচ্ছে আবার সাথে সাথে উঠে দাঁড়াচ্ছে। ডানে বামে তাকাচ্ছে, এই বুঝি আক্রমণ হলো। কারো মনে শান্তি নেই, নেই স্বস্তি। বিকট শব্দটি কিসের তা অনুসন্ধান করে জানা প্রয়োজন। কিন্তু কারোই সাহস হচ্ছে না সেদিকে অগ্রসর হতে।
অবশেষে তারা সকলে একত্রিত হয়ে ভয়ে ভয়ে সামনে অগ্রসর হওয়ার ইচ্ছা করলো। ইতিমধ্যেই দেখা গেল, যেদিক থেকে সে বিকট শব্দটি শ্রুত হয়েছিলো, সেদিক থেকে একজন ঘোড় সাওয়ার এগিয়ে আসছেন। কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়ালেন সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.)। দেখা গেল তিনি আর কেউ নন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। হাতে তার উন্মুক্ত তরবারী। তিনি ঐ বিকট ভয়ানক শব্দটি শোনার সাথে সাথে একাই তরবারী কাঁধে ঝুলিয়ে, ঘোড়ার পৃষ্ঠে আরোহণ করে সমগ্র শহরতলী এলাকা পরিদর্শন করে এসেছেন। সকলকে অভয় দিয়ে তিনি বললেন, তোমাদের আর অনুসন্ধান করতে যেতে হবে না, আমি একাই সম্পূর্ণ এলাকা ঘুরে তল্লাসী করে এসেছি, ভয়ের কোন কারণ নেই, তোমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ বাড়ীতে চলে যাও, গিয়ে আরাম করো, কোন সমস্যা হলে আমিই তা দেখবো ইনশাআল্লাহ।
এভাবেই প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেশের জনসাধারণ তথা উম্মতের নিরাপত্তা ও দেশ রক্ষার ক্ষেত্রে বিপদশঙ্কুল পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপ্রধান হয়েও ত্যাগ তিতিক্ষা এবং আত্মনিবেদনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন নির্ভীকচিত্তে। যে বীরত্ব ও সাহসিকতায় সকল অপশক্তির হৃদে কম্পন সৃষ্টি হয়েছে। ইসলাম বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে এক মহান ও বিজয়ী আদর্শ হিসেবে।
বর্তমান বিশ্বে এহেন ত্যাগ ও আত্ম নিবেদনের দৃষ্টান্ত শুধু দুষ্প্রাপ্যই নয় বরং তা অসম্ভবও বটে। চরম বিলাসিতা আর আরামপ্রিয়তায় আচ্ছাদিত বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধান আর প্রশাসকদের এসবকিছু ভাববার সময় কোথায়? প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ উন্নত ও আদর্শ শাসননীতি থেকে দীক্ষা গ্রহণের তৌফীক তাদের হবে কি?
📄 দৃঢ়তা
ইতিহাসখ্যাত হুনাইন যুদ্ধ। বার কিংবা চৌদ্দ হাজার মুসলিম সৈন্যের বিশাল বাহিনী। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন সে বাহিনীর প্রধান সেনাপতি। মুসলিম সৈন্য সংখ্যার আধিক্যে কাফের সৈন্যরা ভয় পেয়ে গেলো। তাই তারা এক গোপন ফন্দি আঁটলো। তারা একটি গুপ্তস্থানে লুকিয়ে থেকে তথা হতে হঠাৎ মুসলিম বাহিনীর প্রতি বৃষ্টির ন্যায় তীর নিক্ষেপ করতে লাগলো। মুসলিম সেনাবাহিনী কিছু বুঝে উঠার আগেই তাদেরকে ছত্র-ভঙ্গ করে দেয়া হলো।
কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে মুসলিম বাহিনী বিভিন্ন দিকে ছুটে পালাতে লাগলো। এ চরম বিভীষিকাপূর্ণ মুহূর্তেও দৃঢ়তার বেনযীর আদর্শ, নির্ভীক সিপাহসালার প্রিয়নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোড়ার পিঠ থেকে এক লাফে নেমে একাই মুকাবিলার জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন। মুসলিম সৈন্যরা যখন এদিক ওদিক ছুটে পালাচ্ছিলো তখন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শত্রুদের উদ্দেশ্যে সাহসী ও নির্ভীক কণ্ঠে বুলন্দ আওয়াযে বলতে লাগলেন, "আমি কোন মিথ্যা নবী নই, আমি আবদুল মুত্তালিবের বংশোদ্ভূত নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)।
হযরত আব্বাস (রাযি.) এ দৃশ্য অবলোকন করে (প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইশারায়) চিৎকার মেরে মুসলিম সৈন্যদের ডাকতে লাগলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই মুসলিম সেনা বাহিনীর চৈতন্য ফিরে এলো। তারা পুনরায় ক্ষুধার্ত ব্যাঘ্রের ন্যায় এসে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চার পাশে জড়ো হলো। ক্ষণিকের মধ্যেই যুদ্ধের মোড় পাল্টে গেলো। ময়দানে মুসলিম সৈন্যদের বিজয়ের পাল্লা ভারী হয়ে উঠলো। মুসলিম সৈন্যদের হাতে অমুসলিম বাহিনী সাংঘাতিকভাবে মার খেলো। তারা পালহীন মেষের ন্যায় এদিক ওদিক ছুটাছুটি করে পালিয়ে জীবন বাঁচালো।
এ কথা বাস্তব সত্য যে, এ যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয় অনেকটা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলো। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দৃঢ়চিত্ততা ও নির্ভীক মনোবলই আল্লাহপাকের সাহায্যে এ যুদ্ধে মুসলিম সৈন্যদের বিজয় লাভের পথ সুগম করেছে। মুসলমানদের নিশ্চিত পরাজয়ের হাত থেকে উদ্ধার করে তাদের বিজয় মাল্যে ভূষিত করেছে। বিশ্ব ইতিহাসে অসংখ্য দৃঢ়তার আলোচনা এসেছে। এ দুনিয়া অনেক সাহসিকতার ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে। কিন্তু নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এখানে যে দৃঢ়তা ও সাহসিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা নিঃসন্দেহে এক ব্যতিক্রমী ও বেনযীর দৃষ্টান্ত।
📄 বিলাস বিহীন জীবন
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলিম রাষ্ট্র সমূহের রাষ্ট্রপ্রধান। বাইতুল মালসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন অর্থ সম্পদ তারই হাতের মুঠোয়। যখন যা ইচ্ছা তিনি যে কোন খাতে ব্যয় করার পূর্ণ অধিকার রাখেন। কিন্তু তিনি তো তাঁর অধিকারকে হিসাব-নিকাশ করে প্রয়োগ করবেন। কারণ তিনি দুনিয়ায় প্রেরিত হয়েছেন গোটা বিশ্ব মানবের মু'আল্লিম বা শিক্ষকরূপে।
আর তাই রাষ্ট্র প্রধান হয়েও নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের ঘর তৈরী করলেন খেজুর গাছের খুঁটি আর আড়া দিয়ে। সে ঘর এতই সংকীর্ণ ছিলো যে, হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাহাজ্জুদের নামাযে দাঁড়ালে বিবি আয়িশা (রাযি.) তার সামনে শায়িত অবস্থায় থাকতেন। হযরত আয়িশা (রাযি.)-এর পা ছড়ানো থাকলে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিজদা করতে পারতেন না। হযরত আয়িশা (রাযি.) পা গুটালে তিনি সিজদা করতে পারতেন। উচ্চতাও এত কম ছিলো যে, মাত্র দশ বার বৎসরের কোন বালকও সে ঘরের ছাদ হাত দ্বারা নাগাল পেতো।
নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর গৃহের দরজায় লটকানো ছিলো লোমের চট। অনেক সময় এমন হতো যে দীর্ঘ একমাস ধরেও তাঁর চুলায় আগুন জ্বলতো না। শুধু শুকনো খেজুর আর পানি পান করেই পরিবারবর্গ জীবন যাপন করতেন। কখনো বা রুটি খেতেন, তবে তাও কোন উন্নতমানের মিহিন ময়দার রুটি নয় বরং তা ছিলো জবের খশখশে রুটি। গমের রুটি আর গোস্ত খুব কমই জুটতো। পাতলা চাপাতি রুটি তৈরীর কথা যেনো কল্পনাও করা যায় না। জামা কাপড় ছিড়ে গেলে তা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে তালী লাগাতেন। জুতা ছিড়ে গেলে তাও তিনি নিজ হাতেই সেলাই করতেন।
লক্ষ-কোটি সরকারী আয়ের মুদ্রা যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাতে বণ্টিত হতো। কত গরীব-অনাথ অসহায় তারই আর্থিক আনুকূল্য লাভে পরিতৃপ্ত হয়েছে। কিন্তু সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিজের অবস্থা একটু তাকিয়ে দেখলে, তার প্রতি একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে সুস্থ মনের অভ্যন্তরে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়, তাই একজন পথ ভোলা মানুষকে সঠিক পথে এনে দিতে সক্ষম হতে পারে। আমরা কি পারি না বিষয়গুলোকে একটু ভেবে দেখতে?
📄 শান্তি কামিতা
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আজ অসহায় নন। তার সাথে পনেরো শত জানবায সাহাবীর (রাযি.) এক বিশাল কাফেলা। একটি মাত্র আঙুলির ইশারায় তারা সব লণ্ড-ভণ্ড করে দিতে পারেন, কারণ এ পনেরো শত দুর্দমনীয় সৈন্যের মাত্র তিনশত তের জন সৈন্য বদর প্রান্তরের রণসাজে সজ্জিত প্রায় এক হাজার কাফির সৈন্যকে চরমভাবে পর্যুদস্ত করে দিয়েছিলেন।
ঐতিহাসিক হুদাইবিয়ার সন্ধির কথাই বলছিলাম। পনেরো শত সাহাবীর এক বিশাল বাহিনী নিয়ে তিনশত মাইল দীর্ঘপথ অতিক্রম করে মক্কার উপকণ্ঠে, মক্কানগরী থেকে মাত্র নয় মাইল দূরে অবস্থিত ঐতিহাসিক হুদাইবিয়ায় এসে পৌঁছেছেন (বর্তমানে যে স্থানটি সুমাইসিয়া নামে পরিচিত)। কিন্তু মক্কাবাসীরা আল্লাহর ঘর যিয়ারতে বাধা দিলো। তার গতিপথ রুদ্ধ করে দিলো, আর একটুও সামনে আগাতে দিবে না।
চরম উত্তেজনার এহেন মুহূর্তে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করলেন— "মহান আল্লাহর সম্মানিত নিদর্শনসমূহের সম্মান ক্ষুণ্ণ না হয়। এরূপ যে কোন শর্ত মুশরিকরা আরোপ করে— আজ আমি তা মেনে নিব।"
সন্ধির কথা আলোচনা হলো। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা মেনে নিলেন। সন্ধিপত্রের গায়ে "বিসমিল্লাহ” লিখায় মুশরিকরা আপত্তি জানালো। আর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামের সাথে "রাসূলুল্লাহ" শব্দ লিখায় তারা তার বিরোধিতা করলো। তিন শত মাইল অতিক্রম করে এত কাছাকাছি এসেও আল্লাহ পাকের ঘর যিয়ারত না করেই পুনরায় ফিরে যাওয়ার শর্ত আরোপ করলো।
শান্তির বার্তাবাহক, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার মহান অগ্রদূত, একমাত্র শান্তি রক্ষার মহান লক্ষ্যে উপরোক্ত কথাগুলোসহ আরো অনেক অবাঞ্ছিত ও অযৌক্তিক কথা-বার্তা সব মেনে নিয়ে মক্কার মুশরিকদের সাথে দশ বৎসর মেয়াদী 'যুদ্ধ নয় শান্তি' চুক্তি সম্পাদন করে পুনরায় ফিরে এলেন। শক্তি সামর্থ থাকা সত্ত্বেও এহেন অযৌক্তিক ও অন্যায় শর্তাবলী মেনে নিয়ে শুধু শান্তি প্রতিষ্ঠা ও তা অক্ষুন্ন রাখার জন্য প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে মহান ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিলেন, তা যুগ যুগ ধরে শান্তিকামী বিশ্ববাসীর কাছে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।