📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 নির্লোভতা

📄 নির্লোভতা


বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। মসজিদে নববীর চত্বরে রকমারী মালপত্রের বিশাল স্তুপ। বাহরাইন থেকে আসা মুসলিম সম্পদ এগুলো। যার মধ্যে বিভিন্ন ধরণের মূল্যবান আসবাবপত্র ছাড়াও ছিল উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্বর্ণ ও রৌপ্য।

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফজরের নামায পড়ার জন্য মসজিদে নববীতে এলেন। হযরত সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) অত্যন্ত আনন্দচিত্তে বাহরাইন থেকে আসা বিপুল পরিমাণ রাজস্ব সামগ্রীর সংবাদ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কর্ণগোচর করলেন। কিন্তু নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এতে সামান্যতমও প্রভাবিত হলেন না। তিনি যেন এক ভিন্ন ধ্যানে ধ্যানমৌন রইলেন। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন মসজিদ পানে। মসজিদে নববীর বিরাট আয়তনের চত্বরেই বিশাল স্তুপাকারে রাখা ছিল বাহরাইন থেকে আসা রাজস্ব সামগ্রী। কিন্তু পার্থিব লোভ-লালসা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত পুত চরিত্রের আধার মহানবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটিবার চোখ তুলেও সেদিকে তাকালেন না বরং তিনি সোজা মসজিদের মিহরাবের কাছে চলে গেলেন। ফজরের নামাযে তিনি ইমাম হয়ে নামায পড়ালেন।

নামায শেষ হলো। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবার ঐ বাহরাইন থেকে আসা রাজস্বের বিশাল স্তুপের পাশে এসে দাঁড়ালেন এবং সকলকে ডেকে তিনি ঐ রাজস্ব বিতরণ করতে শুরু করলেন। অবিরাম গতিতে বিলিয়ে চললেন সমুদয় সম্পদরাশি। ইতিমধ্যে দেখা গেলো সম্পদের স্তুপ শেষ হয়ে এসেছে। এক সময় দেখা গেলো বিপুল পরিমাণ রাজস্বের একটি সুতাও বাকি নেই, সবই বিতরণ করে দিলেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। নিজের জন্য, নিজের পরিবারবর্গের জন্য সামান্য কিছুও রাখলেন না তিনি।

পার্থিব লোভ-লালসামুক্ত নির্লোভ জীবনের এর চাইতে উত্তম ও পরিষ্কার দৃষ্টান্ত আর কি হতে পারে? আজ লোভলালসার কারণেই দুনিয়ায় কত রকম অঘটন ঘটছে, বিচ্ছিন্ন হচ্ছে কত আপন জন। শেষ করে দিচ্ছে কত আদম সন্তান তাদের দ্বীন-ঈমান। তাই আসুন! আমরা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্লোভ জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি, তবেই আমরা খুঁজে পাবো সত্যিকার আলোর সন্ধান, পাবো সকল বিপর্যয় থেকে পরিত্রাণ।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 তাক্ওয়া

📄 তাক্ওয়া


চারটি উট। 'ফদাক' নামক অঞ্চল থেকে পাঠানো হয়েছে রাজস্ব সামগ্রী হিসেবে। ইতিপূর্বে সকলকেই রাজস্ব থেকে বন্টন করা হয়েছে। উটগুলো দেয়ার মত কাউকেও খুঁজে পাওয়া গেলো না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এ সংবাদ জানানো হলো। এখনো উটগুলো বন্টন করা হয়নি জেনে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অস্থির হয়ে গেলেন। পবিত্র মুখে উচ্চারণ করলেন, "দুনিয়াদারীর এ সম্পদ বণ্টিত হয়ে না যাওয়া পর্যন্ত আমি ঘরে ফিরে যাবো না।" নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে রাতে মসজিদে নববীতেই থেকে গেলেন।

আস্তে আস্তে রাত গভীর হলো। আরো সময় কাটলো। সুবহে সাদিক হয়ে গেলো। বিলালী কণ্ঠে ধ্বনিত হলো ফজরের নামাযের আযান। আযান শেষে নামায হলো, দিনের আলো ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে। হযরত বিলাল (রাযি.) ছুটে এলেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে। তিনি এসে জানালেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! গতকালের সে উটগুলো বণ্টন করে দেয়া হয়েছে। সংবাদ শুনে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। তিনি মহান আল্লাহর দরবারে শোকর আদায় করলেন এবং মানসিক প্রশান্তি নিয়ে বাড়ী চলে গেলেন।

অন্য একদিনের কথা— আসরের নামাযের জামা'আত চলছে। নামাযে ইমামতি করছেন স্বয়ং প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। নামায শেষ হলো। সাথে সাথেই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের হুজরা মোবারকে প্রবেশ করলেন। এ ব্যতিক্রমী বিষয়টি লক্ষ্য করে সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) বিস্মিত হলেন। সকলে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকলেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য। কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে এলেন তিনি। সকলের কৌতুহল মিটাতে তিনি বললেন, তোমরা আমার হাতে যে স্বর্ণের খণ্ডটি দেখতে পাচ্ছো, গতকাল থেকেই এটি আমার ঘরে ছিল। গতকালের মধ্যেই এটি কাউকে দান করে দেয়ার ইচ্ছা ছিল কিন্তু তেমন সুযোগ হয়ে উঠেনি, তাই এটি নিয়ে এলাম। এরপর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেটি দান করে দিলেন।

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তিকাল শয্যায় শায়িত থাকা অবস্থার কথা। হঠাৎ হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্মরণে এলো যে, ঘরে কিছু আশরাফী (স্বর্ণ মুদ্রা) রয়ে গেছে। তৎক্ষণাৎ তিনি হুকুম করলেন, ওগুলো দান করে দাও। এরপর তিনি ইরশাদ করলেন, "মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য এটা শোভা পায় না যে, সে তার স্রষ্টা আল্লাহ পাকের দরবারে উপস্থিত হতে যাচ্ছে আর তখনো তার ঘরে আশরাফী পড়ে আছে।" আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার !!

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 উত্তম লেনদেন

📄 উত্তম লেনদেন


প্রিয় নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাত খালী। কিছু টাকার প্রয়োজন। বাধ্য হয়ে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একজন ইয়াহুদী মহাজনের স্মরণাপন্ন হলেন। তার কাছ থেকে তিনি কিছু টাকা করয গ্রহণ করলেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিছু সময় নিয়ে টাকা পরিশোধের একটা তারিখ নির্ধারিত করে দিলেন। কেটে গেলো কিছুদিন।

করয দাতা ইয়াহুদী এসে হাযির হলো। অথচ করয পরিশোধের দিন এখনো আসেনি। করয পরিশোধের নির্ধারিত তারিখের এখনো তিনদিন বাকী। লোকটি এসে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে কর্কশ ভাষায় তার পাওনা টাকা চাইতে লাগলো। শুধু চেয়েই সে ক্ষান্ত হলো না, লোকটি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র শরীর থেকে চাদর ছিনিয়ে নেয়ার ধৃষ্টতা দেখালো। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাপড় ধরে টানা হেঁচড়া করতে লাগলো এবং অশ্লীল ভাষায় গাল-মন্দ করতে লাগলো।

পাশেই দাড়িয়ে ছিলেন হযরত উমর (রাযি.)। তিনি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে এহেন দুর্ব্যবহার বরদাশত করতে পারলেন না। তীব্র ক্ষোভে গর্জে উঠলেন "ওরে দুরাচার! তুই যদি আজ এ পবিত্র দরবারে না হয়ে অন্য কোথাও থাকতি আর এ ধরণের বেয়াদবী মূলক আচরণ করতি, তবে আমি তৎক্ষণাৎ তোর গর্দান উড়িয়ে দিতাম"

উত্তম আদর্শের মূর্তপ্রতীক প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত উমর (রাযি.) কে ধমক দিয়ে বললেন, উমর! (রাযি.) তুমি চুপ কর, তোমার একাজ আমার পসন্দ হয়নি। তোমার বরং উচিৎ ছিল, আমাকে তার পাওনা পরিশোধ করে দিতে বলা আর তাকে ভদ্র ভাবে তার পাওনা চাইতে শিক্ষা দেয়া। অতঃপর হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত উমর (রাযি.) কে বললেন, এ লোকটির পাওনা পরিশোধ করে দাও। আর তাকে যেহেতু তুমি ধমক দিয়েছো তাই তার নির্দ্ধারিত পাওনার পরিমাণ থেকে দেড়গুন পরিশোধ কর। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশ পেয়ে হযরত উমর (রাযি.) তাই করলেন।

হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এহেন অসাধারণ নম্রতা দেখে লোকটি অত্যন্ত প্রভাবিত হলো। আশ্চর্য সে উত্তম আচরণের পরশে তৎক্ষণাৎ লোকটি পড়ে নিল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ! এভাবে সে ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হলো। বর্তমানে আমরা এ সুমহান আদর্শপূর্ণ আচরণ থেকে কত দূরে। আর তাই আমরা আমাদের সমাজে হৃদ্যতার পরিবর্তে দেখতে পাচ্ছি বিবাদ-বিসংবাদ, হিংসা-বিদ্বেষ আর ঝগড়া-কলহ।

📘 নবী (ﷺ) জীবনের টুকরো কথা 📄 স্বনির্ভরতা

📄 স্বনির্ভরতা


রবিউল আউয়াল মাস। যে মাসে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ধরাধামে আবির্ভূত হয়ে ধূলীর ধরাকে ধন্য করেছিলেন। দুনিয়ার প্রচলিত প্রথায় যে মাসে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্মদিন উদযাপন করার কথা ছিল। কিন্তু জন্মদিন নয় বরং প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সে রবিউল আউয়াল মাসে জীবন রক্ষার কৌশল নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। জন্মদিন পালনের মত অহেতুক কাজে সময় নষ্ট করার মত সময় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাতে থাকবে কি করে? আর ইসলাম তো কোন অহেতুক কাজ কর্মে মত্ত থেকে সময়ের মত অমূল্য রত্ন বরবাদ করে দেয়ার বিষয়টি কোন দিনও সমর্থন করে না।

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মক্কা হতে মদীনায় হিজরত কালীন সময়ের কথাই বলছিলাম। সকলের সম্মিলিত পরামর্শের ভিত্তিতে কুরাইশ গোষ্ঠী নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে চিরতরে শেষ করে দেয়ার অশুভ নেশায় হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ঘরের চতুষ্পার্শে নগ্ন তরবারী হাতে দণ্ডায়মান। মহান আল্লাহর নির্দেশে হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ বাড়ি থেকে বেরিয়ে হযরত সিদ্দীকে আকবর (রাযি.)-এর বাড়ী গেলেন এবং বললেন, এখনই আমার সাথে তোমার হিজরত করতে হবে। হযরত সিদ্দীকে আকবর (রাযি.) পূর্ব থেকেই দু'টি উট হিজরতের জন্য প্রস্তুত রেখেছিলেন। তৎক্ষণাৎ উট দুটি হাযির করে তিনি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এ উট দু'টো আমি হিজরত সফরের জন্যই প্রস্তুত রেখেছি। এর একটিতে আপনি আরোহন করবেন, আর অপরটিতে আমি আরোহন করবো।

এহেন চরম সংকটাপন্ন মুহূর্তেও প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ স্বকীয়তা ও আত্মনির্ভরতাকে ভুলে যাননি। বরং তিনি তৎক্ষণাৎ হযরত আবুবকর সিদ্দীক (রাযি.) কে জিজ্ঞাসা করলেন, প্রতিটি উটের মূল্য কত পড়েছে? হযরত সিদ্দীকে আকবর (রাযি.) উটের মূল্য বলে দিলেন। সাথে সাথে হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত সিদ্দীকে আকবর (রাযি.) কে একটি উটের মূল্য পরিশোধ করে দিলেন এবং বললেন, একটিতে যেহেতু আমি চড়বো তাই একটির মূল্য দেয়া আমার কর্তব্য। এ মূল্য তিনি পরেও পরিশোধ করতে পারতেন, কিন্তু তিনি এমনটি চাননি যে, মূল্য পরিশোধের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা খানিকটা বিলম্বিত হোক। বরং টাকা পরিশোধ করেই তবে তিনি তাতে আরোহন করলেন। এ কঠিন সংকটের মুহূর্তেও স্বকীয়তা ও স্বনির্ভরতার প্রতি এতটুকুর সচেতন দৃষ্টি রাখার মত নযীর এটিই হয়তো প্রথম স্থাপিত হয়েছিল।

ফন্ট সাইজ
15px
17px