📄 সমবেদনা
বৃদ্ধ একটি গোলাম। ভারী কাজ তো দূরের কথা হালকা কাজ করাও তার পক্ষে এখন অসম্ভব প্রায়। কিন্তু সে যে গোলাম, তাকে অন্যের হাতে বিক্রীত হতেই হবে। কাজ করে যেতেই হবে সদা সর্বদা। এ স্বাভাবিক নিয়ম মতে বৃদ্ধ সে গোলাম বিক্রীত হলো এক ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছে, ধনাঢ্য সে লোকটি গোলামকে নিয়ে তার একটি বাগানে পানি দেয়ার কাজে নিয়োগ করলো।
বাগানটি ছিল বেশ বড়। পানিও ছিল অনেক দূরে। সেই দূর থেকে পানি এনে বাগানে দিতে ঐ বৃদ্ধ গোলামের সীমাহীন কষ্ট করতে হত। তা সত্ত্বেও সে গোলাম তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে অলসতা করতো না। একদিনের কথা—
বৃদ্ধ গোলাম বাগানে পানি দিচ্ছে। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে পথ ধরে কোথাও যাচ্ছিলেন। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নযরে পড়লো বৃদ্ধ গোলাম। দয়ার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মায়াভরা মন নিয়ে এগিয়ে গেলেন লোকটির কাছে। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখলেন, অনেক কষ্টে সে পানির পাত্র বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পানি বহন করে নিয়ে যাওয়ার কষ্টে তার পা দু'টো কাঁপছে। যেন এখনি মাটিতে পড়ে যাবে লোকটি।
এ দৃশ্য অবলোকন করে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মন ব্যথিত হয়ে উঠলো। তিনি লোকটির কাছে গিয়ে তাকে একটি গাছের ছায়ায় আরামে বসিয়ে দিলেন এবং নিজেই পানি বহন করে এনে বাগানে পানি দিতে লাগলেন। এক পর্যায়ে পুরো বাগানে পানি দেয়া শেষ হলো।
এবার হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুনরায় লোকটির কাছে এসে অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ ভাষায় তাকে বললেন, ভাই আজকের মত তোমার আর কাজ করতে হবে না। আমি পুরো বাগানে পানি দেয়া শেষ করেছি। তবে আজকের পর আবার যখন তোমার উপর কোন কঠিন কাজের দায়িত্ব ন্যস্ত হবে, তখন সে কথা তুমি আমাকে জানাবে, আমি এসে তোমার কাজ করে দিব।
আজো আমাদের সামনে এ জাতীয় অসংখ্য দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। আমরাও যদি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপরোক্ত টুকরো ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে মানুষের দুঃখ কষ্টে তাদের পাশে দাঁড়াতে শিখি, তবে আমাদের সমাজে আজো শান্তি, সমবেদনা সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
📄 সহমর্মিতা
জীর্ণ-শীর্ণকায় একটি গোলাম। স্বাভাবিক দর্শনেই রোগাক্রান্ত মনে হয়। বর্তমান অবস্থায় আরো অসুস্থ। মালিকের নির্দেশ তাকে আটা চূর্ণ করতে হবে, তাও আবার অনেক গম যা চূর্ণ করে আটা তৈরী করতে হবে এটা তার কাজ, তার দায়িত্ব। অপরাগ হয়ে সে আটা চূর্ণ করতে বসেছে। অনেক কষ্টে আটা চূর্ণ করছে আর শারীরিক কষ্টে কোঁকাচ্ছে। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রহমতের নযর পড়লো লোকটির উপর। সহসা কেঁপে উঠলো হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দয়ার দিল। তিনি এগিয়ে গেলেন গোলামের কাছে "কি হয়েছে ভাই তোমার তুমি কিসের কষ্টে কোঁকাচ্ছো? আমাকে বলো, আমি যদি তোমার কোন উপকার করতে পারি” অত্যন্ত দয়া ও মায়া ভরা কণ্ঠে কথাগুলো বললেন, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথায় লোকটি খানিকটা আশ্বস্ত হলো। খুব শান্ত কণ্ঠে সে বললো, আমি আজ ক'দিন অসুস্থ। সুস্থতার জন্য আমি আমার মুনিবের কাছে কয়েক দিনের জন্য ছুটি চেয়েছিলাম, কিন্তু অনেক কাকুতি-মিনতি করার পরেও মুনিব আমাকে ছুটি দিতে রাযী হয়নি বরং আমাকে নিয়মিত কাজ করতে বাধ্য করছে। আজ আমাকে আটা চূর্ণ করার নির্দেশ দিয়েছে। আমি যদি তা না করি তবে বিপদ হবে, তাই এ অসুস্থ শরীরেই আমি আটা গুড়ো করার কাজ করতে বাধ্য হচ্ছি।
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবার ঐ গোলামকে বললেন, ভাই তুমি একটু শুয়ে আরাম কর, তোমার কাজটা আমি করে দিচ্ছি। এই বলে হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আটা চূর্ণ করতে বসে গেলেন। ধীরে ধীরে বেশ সময়ে তিনি সবগুলো গম চূর্ণ করে আটা তৈরী করলেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবার গোলামকে আটা চূর্ণ সম্পন্ন হওয়ার সংবাদ দিয়ে বিদায় নিলেন। যাওয়ার পূর্বে তিনি ঐ গোলামকে বলে গেলেন, ভাই! আবার যখন তোমার কোন কাজে সহযোগিতার প্রয়োজন হবে সাথে সাথে আমাকে তুমি সংবাদ দিবে, আমি এসে তোমার কাজ করে দিয়ে যাবো।
আজ আমাদের সমাজে এ জাতীয় নির্যাতিত চাকর-বাকর আর দাস-দাসীর সংখ্যা কি কম? আমরা কি পেরেছি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদর্শের দীক্ষা নিয়ে তাদের দুঃখ কষ্টে তাদের পাশে দাঁড়াতে?
📄 নির্লোভতা
বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। মসজিদে নববীর চত্বরে রকমারী মালপত্রের বিশাল স্তুপ। বাহরাইন থেকে আসা মুসলিম সম্পদ এগুলো। যার মধ্যে বিভিন্ন ধরণের মূল্যবান আসবাবপত্র ছাড়াও ছিল উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্বর্ণ ও রৌপ্য।
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফজরের নামায পড়ার জন্য মসজিদে নববীতে এলেন। হযরত সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) অত্যন্ত আনন্দচিত্তে বাহরাইন থেকে আসা বিপুল পরিমাণ রাজস্ব সামগ্রীর সংবাদ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কর্ণগোচর করলেন। কিন্তু নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এতে সামান্যতমও প্রভাবিত হলেন না। তিনি যেন এক ভিন্ন ধ্যানে ধ্যানমৌন রইলেন। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন মসজিদ পানে। মসজিদে নববীর বিরাট আয়তনের চত্বরেই বিশাল স্তুপাকারে রাখা ছিল বাহরাইন থেকে আসা রাজস্ব সামগ্রী। কিন্তু পার্থিব লোভ-লালসা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত পুত চরিত্রের আধার মহানবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটিবার চোখ তুলেও সেদিকে তাকালেন না বরং তিনি সোজা মসজিদের মিহরাবের কাছে চলে গেলেন। ফজরের নামাযে তিনি ইমাম হয়ে নামায পড়ালেন।
নামায শেষ হলো। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবার ঐ বাহরাইন থেকে আসা রাজস্বের বিশাল স্তুপের পাশে এসে দাঁড়ালেন এবং সকলকে ডেকে তিনি ঐ রাজস্ব বিতরণ করতে শুরু করলেন। অবিরাম গতিতে বিলিয়ে চললেন সমুদয় সম্পদরাশি। ইতিমধ্যে দেখা গেলো সম্পদের স্তুপ শেষ হয়ে এসেছে। এক সময় দেখা গেলো বিপুল পরিমাণ রাজস্বের একটি সুতাও বাকি নেই, সবই বিতরণ করে দিলেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। নিজের জন্য, নিজের পরিবারবর্গের জন্য সামান্য কিছুও রাখলেন না তিনি।
পার্থিব লোভ-লালসামুক্ত নির্লোভ জীবনের এর চাইতে উত্তম ও পরিষ্কার দৃষ্টান্ত আর কি হতে পারে? আজ লোভলালসার কারণেই দুনিয়ায় কত রকম অঘটন ঘটছে, বিচ্ছিন্ন হচ্ছে কত আপন জন। শেষ করে দিচ্ছে কত আদম সন্তান তাদের দ্বীন-ঈমান। তাই আসুন! আমরা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্লোভ জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি, তবেই আমরা খুঁজে পাবো সত্যিকার আলোর সন্ধান, পাবো সকল বিপর্যয় থেকে পরিত্রাণ।
📄 তাক্ওয়া
চারটি উট। 'ফদাক' নামক অঞ্চল থেকে পাঠানো হয়েছে রাজস্ব সামগ্রী হিসেবে। ইতিপূর্বে সকলকেই রাজস্ব থেকে বন্টন করা হয়েছে। উটগুলো দেয়ার মত কাউকেও খুঁজে পাওয়া গেলো না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এ সংবাদ জানানো হলো। এখনো উটগুলো বন্টন করা হয়নি জেনে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অস্থির হয়ে গেলেন। পবিত্র মুখে উচ্চারণ করলেন, "দুনিয়াদারীর এ সম্পদ বণ্টিত হয়ে না যাওয়া পর্যন্ত আমি ঘরে ফিরে যাবো না।" নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে রাতে মসজিদে নববীতেই থেকে গেলেন।
আস্তে আস্তে রাত গভীর হলো। আরো সময় কাটলো। সুবহে সাদিক হয়ে গেলো। বিলালী কণ্ঠে ধ্বনিত হলো ফজরের নামাযের আযান। আযান শেষে নামায হলো, দিনের আলো ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে। হযরত বিলাল (রাযি.) ছুটে এলেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে। তিনি এসে জানালেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! গতকালের সে উটগুলো বণ্টন করে দেয়া হয়েছে। সংবাদ শুনে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। তিনি মহান আল্লাহর দরবারে শোকর আদায় করলেন এবং মানসিক প্রশান্তি নিয়ে বাড়ী চলে গেলেন।
অন্য একদিনের কথা— আসরের নামাযের জামা'আত চলছে। নামাযে ইমামতি করছেন স্বয়ং প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। নামায শেষ হলো। সাথে সাথেই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের হুজরা মোবারকে প্রবেশ করলেন। এ ব্যতিক্রমী বিষয়টি লক্ষ্য করে সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) বিস্মিত হলেন। সকলে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকলেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য। কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে এলেন তিনি। সকলের কৌতুহল মিটাতে তিনি বললেন, তোমরা আমার হাতে যে স্বর্ণের খণ্ডটি দেখতে পাচ্ছো, গতকাল থেকেই এটি আমার ঘরে ছিল। গতকালের মধ্যেই এটি কাউকে দান করে দেয়ার ইচ্ছা ছিল কিন্তু তেমন সুযোগ হয়ে উঠেনি, তাই এটি নিয়ে এলাম। এরপর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেটি দান করে দিলেন।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তিকাল শয্যায় শায়িত থাকা অবস্থার কথা। হঠাৎ হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্মরণে এলো যে, ঘরে কিছু আশরাফী (স্বর্ণ মুদ্রা) রয়ে গেছে। তৎক্ষণাৎ তিনি হুকুম করলেন, ওগুলো দান করে দাও। এরপর তিনি ইরশাদ করলেন, "মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য এটা শোভা পায় না যে, সে তার স্রষ্টা আল্লাহ পাকের দরবারে উপস্থিত হতে যাচ্ছে আর তখনো তার ঘরে আশরাফী পড়ে আছে।" আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার !!