📄 হযরত আশআাস ইবনে কায়েসের কথা শুনে নবীজীর হাসি
ইবনে শিহাব বলেন- আশআস ইবনে কায়েস (রা.) বনু কিন্দ্দার প্রতিনিধি দলের সাথে নীবীজীর খেদমতে হাজির হন। দলে আশিজন লোক ছিল। তিনি যখন নবীজীর কাছে আসার প্রস্তুতি নিতে চুলে তেল মাখলেন, চুল আচড়ালেন, সুরমা লাগিয়ে পরিষ্কার জুতা পরিধান করলেন। সে জুব্বার কিনারায় রেশম মিলানো ছিল। যখন তিনি নবীজীর দরবারে উপস্থিত হলেন, তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- তুমি কি ইসলাম গ্রহণ করোনি? তিনি বললেন- কেন না? আমি তো ইসলাম গ্রহণ করেছি। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রেশম খুলে ফেলে দেন। তারপর আশআস ইবনে কায়েস (রা.) বলেন- হে আল্লাহর রাসূল! আমরা 'বনু আকিলুল মিরার” (বারবার খাবার গ্রহণকারী গোত্র)। আর আপনি 'ইবনু আকিলুল মিরার' (বারবার খাবার গ্রহণকারীর সন্তান)। এটা শুনে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসলেন। তারপর বলেন- এ বিশেষণ তোমরা আব্বাস (রা.) এবং রবীয়া (রা.) কে বল। কেননা, এরা উভয়ে ব্যবসায়ী ছিল। যখন দূরে কোথাও যেত তখন কেউ জিজ্ঞেস করলে তারা বলতো- আমরা 'বনু আকিলুল মিরার'। [সীরাতে ইবনে হিশাম ২৫৪]
টিকাঃ
১ এটা একটা আঞ্চলিক বিশেষণ।
📄 হযরত আয়েশা (রা.)-এর কথায় নবীজীর হাসি
হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাকী কবরস্থান থেকে ফিরলেন। তখন আমার মাথা ব্যথা ছিল। আমি বলছিলাম- হায় আমার মাথা! হায় আমার মাথা! নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- হে আয়েশা! হায় আমার মাথা! (ঠাট্টাচ্ছলে বলেন) তারপর বলেন- কোন অসুবিধা নেই। তুমি যদি এই মাথা ব্যথায় মারা যাও, তাহলে আমি তোমাকে কাফন পরাব, তোমার জানাযা পড়ে তোমাকে দাফন দেব।
হযরত আয়েশা (রা.) বলেন- আমি বললাম, আপনি কি চান, আমার পরে আপনি আমার ঘরে আরেকজন স্ত্রী আনবেন? এটা শুনে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দিলেন। [সীরাতে ইবনে হিশাম: ৪: ৩২১]
📄 হযরত জাফর আসাতে নবীজীর আনন্দ
হযরত জাফর ইবনে আবু তালিব (রা.) হাবশা থেকে ঐ দিন ফেরত আসেন যেদিন খায়বার বিজয় হয়। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কপালে চুমু খেলেন এবং কোলাকুলি করেন। নবীজী বলেন- আমি জানি না যে, আজ জাফর আসার কারণে আমার আনন্দ লাগছে? নাকি খায়বার বিজয় হওয়াতে আনন্দ লাগছে। [সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩: ৪১৪]
📄 হযরত যায়েদ (রা.)-এর ব্যাপারে ওহী অবতীর্ণ হওয়ায় নবীজীর হাসি
পঞ্চম হিজরীতে বনু মুসতালিকের বিখ্যাত যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তাতে একজন একজন মুহাজির এবং আনসার সাহাবীর মধ্যে ঝগড়া বাঁধল। সাধারণ ব্যাপার ছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে বাড়তে লাগলো। এমনকি প্রত্যেকে অন্যের বিরুদ্ধে যার যার গোত্রের লোকদের সাহায্য চাইতে লাগলেন। উভয়পক্ষে জামাত তৈরি হয়ে গেল। যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার আশংকা ছিল। তখন কিছু মধ্যস্ততাকারী মীমাংসা করে দেন। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই, মুনাফিকদের সরদার। মুসলমানদের বড় শত্রু ছিল। সে যেহেতু প্রকাশ্যে ইসলাম প্রকাশ করতো, এজন্য তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হতো না। সে যখন এ ঘটনা শুনলো, তখন নবীজীর ব্যাপারে ভীষণ বেয়াদবীমূলক কথা বলে। আর তার বন্ধুদেরকে বলে- এগুলো সবই তোমাদের হাতের কামাই। তোমরা তাদেরকে তোমাদের শহরে জায়গা দিয়েছ। নিজেদের সম্পদ আধাআধি বণ্টন করে দিয়েছ। যদি তোমরা ওদের সাহায্য করা ছেড়ে দাও, তাহলে ওরা এখনই চলে যেতে বাধ্য হবে। এটাও সে বললো, আল্লাহর কসম! আমরা যদি মদীনায় পৌঁছে যাই তাহলে আমরা সম্মানিতরা লাঞ্ছিতদেরকে এখান থেকে বের করে দেব। হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) অল্প বয়সী ছিলেন। তিনি সেখানে ছিলেন। এসব শুনে আর সহ্য করতে পারেননি। বলে ওঠেন- তুমি অপমানিত, লাঞ্ছিত। তোমাকে তোমার গোষ্ঠীতেই নিকৃষ্ট দৃষ্টিতে দেখা হয়। তোমার কোন সাহায্যকারী নেই। আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্মানী ব্যক্তি। আল্লাহর পক্ষ থেকেও সম্মান দেয়া হয়েছে এবং নিজ জাতির কাছেও সম্মানী।
আবদুল্লাহ ইবনে উবাই বললো, এ তো আশ্চর্য ছেলে! আমি তো এমনিতেই ঠাট্টা করে এসব বলেছি। কিন্তু হযরত যায়েদ (রা.) গিয়ে নবীজীকে সব জানিয়ে দেন।
হযরত উমর (রা.) আবেদন করেন, এ কাফিরদের গর্দান উড়িয়ে দেয়া হোক। কিন্তু নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুমতি দিলেন না। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই যখন খবর শুনলো যে, এটা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত চলে গিয়েছে। তখন নবীজীর দরবারে এসে মিথ্যা কসম খেতে শুরু করলো। আমি এসব কথা বলিনি। যায়েদ আমার নামে মিথ্যা অভিযোগ করেছে। আনসারদের কিছু লোক নবীজীর দরবারে আসেন। তারাও সুপারিশ করলো- হে আল্লাহর রাসূল! আবদুল্লাহ গোত্রের সরদার। বড় নেতা মনে করা হয়। এক বাচ্চার কথা তার ব্যাপারে গ্রহণযোগ্য নয়। হতে পারে সে শুনতে ভুল করেছে বা সে বুঝেইনি।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ওজর কবুল করে নেন। হযরত যায়েদ (রা.) যখন এটা শোনেন যে, সে মিথ্যা কসম খেয়ে তার সত্যতা প্রমাণ করে নিয়েছে এবং যায়েদকে মিথ্যা বানিয়ে দিয়েছে, তখন লজ্জায় বাইরে বের হওয়া ছেড়ে দেন। এমনকি লজ্জায় নবীজীর দরবারেও যাচ্ছেন না। পরিশেষে সূরা মুনাফিকুন অবতীর্ণ হয়, যার মাধ্যমে হযরত যায়েদের সত্যতা এবং আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের অত্যাচার এবং তার কসমের অসারতা প্রকাশ করে দেয়া হয়। হযরত যায়েদের মর্যাদা পক্ষ বিপক্ষ সবার কাছে বেড়ে গেল এবং আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের ব্যাপারটি সবার কাছে প্রকাশ পেয়ে গেল।
আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের ছেলে আবদুল্লাহ যিনি পাক্কা মুসলমান ছিলেন, তিনি মদীনার কাছাকাছি এসে তলোয়ার হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। তিনি তার পিতা মুনাফিক সরদারকে বলতে লাগলেন- ততক্ষণ তোমাকে আমি মদীনায় প্রবেশ করতে দেব না, যতক্ষণ তুমি নিজেকে নিকৃষ্ট লাঞ্ছিত না বলবে এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রিয় ব্যক্তি মনে না করবে। পিতা আশ্চর্য হলো যে, এই ছেলে সব সময় বাবার সাথে সম্মানের আচরণ করে। কিন্তু হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ব্যাপারে কোন কিছু সহ্য করতে পারে না। পরিশেষে সে তা স্বীকার করতে বাধ্য হলো। সে বললো- আল্লাহর কসম! আমি নিকৃষ্ট এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উৎকৃষ্ট। তারপর তাকে মদীনায় ঢুকতে দেয়া হলো।
এক বর্ণনায় এসেছে, যখন সূরা মুনাফিকুন নাযিল হয়, তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়েদকে ডেকে পাঠান। তার কান ধরে মুচকি হাসি দেন। বলেন- তোমার কান সত্য। কেননা, আল্লাহ তাআলা তোমাকে সত্যায়ন করে আয়াত নাযিল করেছেন। [তাফসীরে ইবনে কাসীর: 8 : ৪৪৬]