📄 হযরত তামীমে দারী (রা.)-এর ইসলাম ও দাজ্জালের ঘটনার ব্যাপারে নবীজীর হাসি
ফাতেমা ইবনে কায়েস (রা.) বর্ণনা করেন, আমি নবীজীর ঘোষণাকারীদের থেকে শুনেছি, তারা ঘোষণা করছে যে, এসো নামায শুরু হয়ে যাচ্ছে। আমি নামাযের জন্য বের হলাম। নবীজীর সাথে নামায আদায় করলাম। তিনি নামায শেষ করে মিম্বরে বসে গেলেন। তখন তাঁর চেহারায় মুচকি হাসির ঝলক ছিল। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- সবাই যার যার জায়গায় বসে থাক। তারপর বলেন- তোমরা কি জান, তোমাদেরকে কেন একত্রিত করেছি?
সবাই বললেন, আল্লাহ আর আল্লাহর রাসূলই ভালো জানেন। নবীজী ইরশাদ করেন- আল্লাহর কসম! আমি তোমাদেরকে সম্পদ বণ্টনের জন্য একত্রিত করিনি, জেহাদে অংশ নেয়ার জন্যও নয়।
তোমাদেরকে শুধু এজন্য একত্রিত করেছি যে, তামীমে দারী আগে খৃষ্টান ছিলেন। তিনি এসে মুসলমান হয়ে গিয়েছেন এবং আমাকে একটি ঘটনা বলেছেন। যদ্বারা দাজ্জালের ব্যাপারে তোমাদেরকে বলা আমার বর্ণনার সত্যায়ন হয়ে যাবে। তিনি বলছেন- তিনি একটি সমুদ্রযানে আরোহণ করেন। তাঁর সাথে 'লাম' এবং জুবাম গোত্রের আরও বিশজন লোক ছিলেন।
সামুদ্রিক ঝড় এক মাস পর্যন্ত তাদের সাথে তামাশা করতে থাকে। পরিশেষে তারা পশ্চিম দিকে একটা দ্বীপ দেখতে পান। যা দেখে তারা খুব আনন্দিত হন। ছোট বাহনে চড়ে তারা ঐ দ্বীপে অবতরণ করেন। সামনে তাদের দৃষ্টি পড়ল জানোয়ার আকৃতির এক প্রাণীর দিকে। যার পুরো শরীর জুড়ে লোম আর লোম। লোমের কারণে তার গোপনাঙ্গ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল না। লোকেরা তাকে বললো- হে হতভাগা! তুই আবার কেমন বালা?
সে বললো, আমি দাজ্জালের গোয়েন্দা। চলো ঐ গীর্জায় তাকে দেখতে পাবে, যার অপেক্ষা তোমরা করছো। তামীমেদারী বলেন- যখন সে এক লোকের কথা বললো, তখন আমাদের ভয় হলো, সে আবার কে? কোন জিন না তো? আমরা লাফ দিয়ে গীর্জায় গিয়ে পৌঁছলাম। সেখানে আমরা বিশালকায় এক লোককে দেখতে পেলাম। এর আগে আমরা কখনও এমন লোক দেখিনি। তার হাত ঘাড়ের সাথে মিলিয়ে এবং তার পা হাঁটু থেকে গোড়ালী পর্যন্ত লোহার শিকল দিয়ে খুব মজবুতভাবে বেঁধে রাখা হয়েছে। আমরা তাকে বললাম, তুই ধ্বংস হয়ে যা। তুই কে?
সে বললো- তোমরা তো আমার ব্যাপারে কিছু না কিছু জান। এখন বলো, তোমরা কারা?
তাঁরা বললেন, আমরা আরবের বাসিন্দা। আমরা একটা বড় জাহাজে সফর করছিলাম। সামুদ্রিক ঝড় এলো এবং তা এক মাস স্থায়ী হলো। তারপর আমরা এ দ্বীপে এসে উঠি। এখানে এসে আমরা একটা জানোয়ার দেখতে পাই। যার পুরো শরীরে লোম আর লোম।
সে বললো, আমি গোয়েন্দা। সে আমাদেরকে বললো, চলো ঐ গীর্জার দিকে যাই। সেখানে তোমরা একজনকে দেখতে পাবে। তাই আমরা যথশীঘ্র তোমার কাছে আসি।
সে বললো, আচ্ছা, তোমরা বল তো (শামের এক বস্তি) 'বিসান' এলাকায় খেজুর গাছে ফল আসে কি না?
আমরা বললাম, হ্যাঁ, আসে।
সে বললো, ঐ সময় নিকটবর্তী যখন সেসব গাছে ফল আসবে না। তারপর সে বললো, আচ্ছা, তাবরিয়া উপসাগরের ব্যাপারে বলো, তাতে কি পানি আছে?
আমরা বললাম, তাতে অনেক পানি আছে।
সে বললো, ঐ সময় নিকটবর্তী যখন তাতে পানি থাকবে না। সে বললো, সিরিয়ার এক গ্রাম 'যাবার'-এর ঝরনার ব্যাপারে বলো। তাতে পানি আছে কি না? ঐ গ্রামের লোকেরা তাদের ক্ষেতে ঐ ঝরনার পানি ব্যবহার করে কি না?
আমরা বললাম, তাতে অনেক পানি আছে। গ্রামবাসীরা ঐ ঝরনার পানি থেকে তাদের ক্ষেতে পানি প্রয়োগ করে।
সে বললো, আচ্ছা, 'নাবিয়্যুল আমীন'-এর কিছু হাল অবস্থা শোনাও।
আমরা বললাম, তিনি মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় চলে এসেছেন।
সে জিজ্ঞেস করলো, আরবের লোকেরা তার সাথে যুদ্ধ করেছে?
আমরা বললাম, হ্যাঁ।
সে বললো, আচ্ছা তাহলে ফলাফল কী হলো?
আমরা বললাম, তিনি তো তাঁর আশপাশের এলাকা জয় করে ফেলেছেন। লোকেরা তাঁর অনুসারী হয়ে গিয়েছে।
সে বললো, শোন! তাঁর ব্যাপারে এটাই ভালো যে, তাঁর অনুসারী হয়ে যাওয়া।
এখন আমি তোমাদেরকে আমার ব্যাপারে বলছি। আমি মসীহে দাজ্জাল। সে সময় নিকটবর্তী যখন আমাকে এখান থেকে বের হয়ে পড়ার অনুমতি দেয়া হবে। আমি বের হয়ে পুরো পৃথিবী ঘুরবো। চল্লিশ দিনের মধ্যে কোন অঞ্চলে আমার প্রবেশ হয়নি এমন জায়গা থাকবে না মক্কা মদীনা ছাড়া। কেননা, এ দু'জায়গায় আমার প্রবেশ নিষেধ। আমি যখন এ দুটো এলাকার কোন অঞ্চলে প্রবেশ করতে চাইবো তখন একজন ফেরেশতা খোলা তলোয়ার নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে যাবেন এবং প্রবেশে বাধা দেবেন। এ দুটো এলাকার অলিতে গলিতে ফেরেশতারা লোকদের হেফাজতের কাজে নিয়োজিত থাকবেন।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর লাঠি দিয়ে মিম্বরে আওয়াজ করে বলেন- ঐ তাইয়িবাহ হলো এ মদীনা। এটা নবীজী তিনবার বলেন। শোন! আমি কি তোমাদেরকে এ ঘটনা বর্ণনা করিনি? সবাই বললেন, হ্যাঁ। আপনি বলেছিলেন। তারপর বলেন, ঐ সিরিয়ার সাগর অথবা ইয়ামান সাবার পশ্চিম দিকে অবস্থিত। নবীজী ঐদিকে হাত দিয়ে ইশারা করেন। [মুসলিম, আবু দাউদ, তরজুমানুস্ সুন্নাহ: ৪:৪১১]
📄 এক গ্রাম্য লোকের কথায় নবীজীর হাসি
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সাঈদ আনাবিহী থেকে বর্ণনা করেন, আমরা মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.)-এর কাছে ছিলাম। ঐ মজলিসে লোকেরা হযরত ইসমাঈল (আ.) কে জবাই করার ঘটনা আলোচনা করছিল। তখন হযরত মুয়াবিয়া (রা.) বলেন, তোমরা সবাই চুপ হয়ে যাও। আমি বলছি শোন! আমরা একবার নবীজীর দরবারে উপস্থিত ছিলাম। এক ব্যক্তি আসলো। সে বললো, হে দুই জবাইকৃতের সন্তান! আল্লাহ তাআলা আপনাকে যা কিছু দান করেছেন তা থেকে গুনে আমাকেও দান করুন।
এটা শুনে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দেন। লোকেরা বললো, 'দুই জবাইকৃত'-এর ব্যাখ্যা কী?
হযরত মুয়াবিয়া (রা.) বলেন- যখন আবদুল মুত্তালিব যমযম কূপের সন্ধান করছিল, তখন সে কসম করেছিল যে, যদি কূপটি পেয়ে যাই তাহলে আমি আমার এক ছেলে আল্লাহর নামে কুরবানী করবো। কূপের সন্ধান পেয়ে যাওয়ার পর লটারী করা হলো। এতে নবীজীর পিতা আবদুল্লাহর নাম এলো। পরিশেষে তাঁর বদলে একশ' উট কুরবানী করা হলো। দ্বিতীয় জবাইকৃত ব্যক্তি হলেন ইসমাঈল (আ.)। [ইবনে জরির, ইবনে কাসীর: ৪: ২৪]
📄 উম্মতকে দেখে নবীজীর হাসি
হযরত আনাস (রা.) বলেন, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুশয্যায় শায়িত। সোমবার দিন তিনি হুজরার পর্দা ওঠালেন। আবু বকর (রা.) কে দেখলেন। তিনি নামাযে ইমামতি করছেন। হযরত আনাস (রা.) বলেন- আমি নবীজীর চেহারার দিকে তাকালাম। মনে হলো যেন রূপার পত্র। তিনি তখন হাসছিলেন। আমরা নামায ছেড়ে দিতে চাচ্ছিলাম। তাঁর সুস্থতার খুশিতে মন ভরে গিয়েছিল। তারপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্দা ফেলে দেন। ঐ দিনই তিনি এ নশ্বর দুনিয়া ছেড়ে তাঁর মহান রবের সান্নিধ্য লাভ করেন। [বিয়াদুন্নাজরা ফী মানকি বিল্ আশারা: ১: ২৩৮]
📄 হযরত সাওয়াদ ইবনে কারিব (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণে নবীজীর আনন্দ
একটি বর্ণনায় এসেছে, হযরত উমর (রা.) একদিন মসজিদে লোকদের সাথে বসে ছিলেন। এক ব্যক্তি উমর (রা.)-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করলো। উমর (রা.) কে বলা হলো, আপনি কি লোকটিকে চেনেন? তিনি বলেন- আমি জানতে পেরেছি এক ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা অদৃশ্য খবরের মাধ্যমে নবীজীর পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর নাম সাওয়াদ ইবনে কারিব। তিনি তাঁর গোত্রের সরদার। আমি তাকে দেখিনি। যদি সে জীবিত থাকে, তবে এই সেই ব্যক্তি হবে। তারপর হযরত উমর তাঁকে ডেকে বললেন- তুমি কি সাওয়াদ ইবনে কারিব? সে বললো, হ্যাঁ।
হযরত উমর তাকে বলেন- তুমি তোমার ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটি একটু শোনাও। সে বললো, হে আমীরুল মুমিনীন! আমি এক রাতে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে শুয়ে আছি। আমার কাছে আমার এক নারী জিন আসলো। সে পা দিয়ে নাড়িয়ে আমাকে জাগালো। বললো, হে সাওয়াদ ইবনে কারিব! ওঠো, চিন্তা কর! গবেষণা কর। তোমার বুদ্ধি আছে। লুয়াই ইবনে গালিব বংশে একজন নবী প্রেরিত হয়েছেন যিনি লোকদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করেন। তাঁর ইবাদতের প্রতি দাওয়াত দেন। তারপর সে এ কবিতা আবৃতি করে-
عَجِبْتُ لِلْجِنِّ وَلِجَسَا سِهَا ، وَشَاهَدَ هَا الْعَيْسُ بِأَحْلَا سِهَا تَهْوِى إِلَى مِلَّةٍ تَبْقِي الْهُدَى هِ مَا خَيْرُ الْجِنِّ كَأَنْجَا سِهَا فَأَرْحَلَ إِلَى الصَّفْوَةِ مِنْ هَاشِمٍ ه وَاسْمُ بَغْيَتِكَ إِلَى رَأْسِهَا
সে আবার দ্বিতীয় রাতে এলো। একই কথা বললো। তৃতীয় রাতেও এসে এসব কথা বললো। সাথে সাথে এ কবিতাও আবৃতি করে। এতে ইসলামের প্রতি আমার ভালোবাসা জন্মে যায়। সকালেই আমি সফরের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে মক্কার উদ্দেশে রওনা দিলাম। রাস্তায় খবর পেলাম যে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো মদীনায় হিজরত করে গিয়েছেন। তখন সেখান থেকেই মদীনার উদ্দেশে চললাম।
সেখানে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, নবীজী কোথায়? লোকেরা বললো, মসজিদে। আমি মসজিদে গেলাম। নবীজী আমাকে দেখে বললেন, কাছে আসো। বারবার তিনি এ কথা বলেন। আমি তাঁর সামনে গিয়ে বসলাম। তিনি বলেন- তোমার ঘটনাটি বর্ণনা কর। আমি ঘটনা বলে মুসলমান হয়ে গেলাম। নবীজী এবং মুসলমানরা ঘটনা শুনে খুশি হলেন। নবীজীর চেহারায় তাঁর খুশির বার্তা প্রকাশ করছিল। এটা শুনে হযরত উমর (रा.) উঠলেন। তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন- আমার ইচ্ছা, আমি ঘটনাটি তোমার মুখ থেকে শুনবো। এখনও কি এ ধরনের স্বপ্ন দেখ। তিনি বলেন- যেদিন থেকে কুরআন পড়া শুরু করেছি, সেদিন থেকে আর দেখি না। [রিয়াদুন্নাজিরা ফী মানাকিবিল আশারা: ১: ৩২৬]