📄 উম্মে আম্মারা (রা.)-এর আক্রমণে নবীজীর হাসি
উম্মে আম্মারা আনসারিয়া (রা.) ঐ নারীদের একজন যাঁরা প্রথম যুগে মুসলমান হয়েছেন। আকাবার সপথে بيعة عقبة অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি অধিকাংশ জেহাদে শরীক ছিলেন। উহুদের যুদ্ধের কাহিনী বর্ণনা করেছেন- আমি পানির পাত্র ভরে নিয়ে ঘুরতাম, দেখতাম মুসলমানদের কী অবস্থা? কেউ পিপাসু বা আহত পেলে পানি পান করাতাম। তাঁর বয়স তখন তেতাল্লিশ বছর ছিল। তার স্বামী এবং দুই পুত্রও জেহাদে অংশ গ্রহণ করেছিল।
মুসলমানদের বিজয় ছিনিয়ে নিয়ে যখন কাফেররা বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে তখন আমি নবীজীর আশপাশে গিয়ে অবস্থান নিলাম। কোন কাফের নবীজীর দিকে আসতে চাইলে উম্মে আম্মারা (রা.) তাকে হটিয়ে দিতেন। প্রথমে তাঁর কাছে ঢালও ছিল না। পরে একটা ঢাল পেয়েছিলেন। যিনি আহত হতেন কোমরে রাখা কাপড়ের তেনা পুড়িয়ে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিতেন। তিনি নিজেও আহত হয়েছিলেন। প্রায় ১২/১৩ স্থানে আঘাত পেয়েছিলেন। তন্মধ্যে একটি ক্ষত খুবই মারাত্মক ছিল।
উম্মে সাঈদ বলেন, আমি তার কাঁধে গভীর একটা ক্ষত দেখেছি। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা কীভাবে হলো?
তিনি বলেন, উহুদ প্রান্তরে মানুষ যখন হতভম্ব হয়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছিল তখন ইবনে কুমাইয়া এই বলে চিৎকার দিতে দিতে আসছিল যে, মুহাম্মদ কোথায়? আমাকে কেউ বলে দাও, সে কোন দিকে আছে? আজ যদি সে বেঁচে যায় তাহলে আমার উপায় নাই। মুসআব ইবনে উমায়ের (রা.) এবং আরও কয়েক জন তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেলেন। আমিও তাদের মধ্যে ছিলাম। সে আমার কাঁধে তলোয়ার দিয়ে আঘাত করল। আমিও কয়েকটি আঘাত হানলাম। কিন্তু তার পায়ে দুই পল্লা লৌহবর্ম ছিল। তাই কোন আঘাতই তার গায়ে লাগছিল না। উম্মে আম্মারা বলেন, ঘাড়ের এ ক্ষত এত ভীষণ ছিল যে, পুরো বছর চিকিৎসা করেও ভাল হচ্ছিল না। এরই মাঝে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হামরাতুল আসাদ যুদ্ধের ঘোষনা দেন। আমিও তৈরি হয়ে গেলাম। যুদ্ধে যাওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। কিন্তু কাঁধের ক্ষতটা একদম কাঁচা ছিল। ফলে আর এ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে পারিনি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হামরাতুল আসাদ থেকে ফিরে আসলেন তখন সর্বপ্রথম উম্মে আম্মারা (রা.)-এর অসুস্থতার খবর নেন। যখন শুনলেন যে এখন তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ, তখন খুব খুশি হলেন।
উম্মে আম্মারা বলেন- এ ক্ষত ছাড়াও আরও কয়েক জায়গায় ক্ষত হয়েছিল। আসলে কাফেররা ঘোড়ায় আরোহণ করে যুদ্ধ করছিল আর আমরা ছিলাম বাহন ছাড়া। তারাও যদি বাহন ছাড়া থাকতো তাহলে কাজ হতো। তাহলে তারা বুঝতে পারতো আক্রমণ কাকে বলে? ঘোড়ায় চড়ে যখন কেউ এসে আমায় আক্রমণ করতো তখন আমি ঢাল ব্যবহার করে আক্রমণ প্রতিহত করতাম। পরে যখন ফিরে যেতো, তখন আমি তার ঘোড়ার পায়ে আঘাত হানতাম। পা কেটে ঘোড়া এবং বাহকও লুটিয়ে পড়তো। তখন নীবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ছেলেকে আমার কাছে আমার সাহায্যের জন্য পাঠিয়ে দিতেন। আর আমরা দু'জন মিলে তার কাম সারা করে দিতাম।
তাঁর ছেলে আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রা.) বলেন, আমার বাম বাহুতে আঘাত লেগেছে। রক্ত পড়া বন্ধ হচ্ছিল না। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- ব্যান্ডেজ করে নাও। আমার মা এসে কোমর থেকে কাপড় বের করে ব্যান্ডেজ বেঁধে বললেন, যা কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াই কর। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- হে উম্মে আম্মারা! এত সৎসাহস কে দেখাতে পারবে? যা তোমার কাছে দেখলাম।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে সময় তাঁর জন্য এবং তাঁর পরিবারের জন্য কয়েকবার দুআ করেন, আর খুব প্রশংসা করেন। উম্মে আম্মারা বলেন- ঐ সময় এক কাফের সামনে আসলো। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেন, ঐ লোকই তোমার ছেলেকে আঘাত করেছে। আমি সামনে অগ্রসর হয়ে তার পায়ের গোড়ালীতে আঘাত করলাম। সে আহত হয়ে একদম বসে পড়লো। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দিলেন। আর বললেন, ছেলের প্রতিশোধ নিয়ে নিয়েছো। এরপর আমরা সামনে চললাম এবং তাকে হত্যা করলাম। [তাবাকাতে ইবনে সা'দ]
📄 সুসংবাদ শুনে নবীজীর হাসি
হযরত বেলাল ইবনে হামামা (রা.) বলেন, একদিন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসতে হাসতে আগমন করলেন। আবদুর রহমান ইবনে আওফ (ра.) বললেন- হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কেন হাসছেন? নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একটি সুসংবাদ শুনে হাসছি। সুসংবাদটি আলী ও ফাতেমার ব্যাপারে। আল্লাহ তাআলা যখন আলী ও ফাতেমার বিবাহ সম্পন্ন কতে চাইলেন তখন জান্নাতের পাহারাদারকে নির্দেশ দিলেন শাজারায়ে তুবাকে (তুবা বৃক্ষ) নাড়াতে। তিনি জান্নাতের এ বিশাল বৃক্ষকে নাড়া দিলেন। ফলে তা থেকে মুক্তির পরওয়ানা ঝরে পড়লো। এর সংখ্যা ছিল দুনিয়াতে যত মানুষ নবীজীর বংশের লোককে ভালোবাসবে তাদের সমপরিমাণ। তারপর ঐ গাছ থেকে ফেরেশতা সৃষ্টি হলো। সবাই একটা করে পরওয়ানা হাতে নিলেন। যখন কেয়ামত সংঘটিত হবে তখন নবীজীর বংশকে যারা ভালোবেসেছে তাদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্তির ঐ পরওয়ানা দেয়া হবে। [উসুদুল গাবাহ: ১: ২০৬]
📄 উম্মে হারাম (রা.)-এর ঘরে নবীজীর হাসি
হযরত উম্মে হারাম (রা.) হযরত আনাস (রা.)-এর খালা ছিলেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায়ই তাঁর ঘরে গমন করতেন। এমনকি কখনও দুপুরের বিশ্রাম সেখানেই নিতেন।
একদিন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। হাসতে হাসতে শোয়া থেকে উঠেন। হযরত উম্মে হারাম (রা.) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা-মাতা আপনার প্রতি উৎসর্গিত হোন। কী ব্যাপারে আপনি হাসলেন?
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার উম্মতের কিছু লোক আমাকে দেখানো হলো যারা সমুদ্রে যুদ্ধ করার জন্য এমনভাবে আরোহী হয়েছে, যেন বাদশাহ তার সিংহাসনে বসে আছেন। উম্মে হারাম বলেন- হে আল্লাহর রাসূল! দুআ করুন, আল্লাহ তাআলা আমাকেও যেন তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তুমিও তাদের মধ্যে একজন। তারপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার বিশ্রামে যান। আবার হাসতে হাসতে ওঠেন। উম্মে হারাম কারণ জিজ্ঞেস করলেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একই জবাব দিলেন। আবার উম্মে হারাম দুআর দরখাস্ত করেন। নবীজী বলেন, তুমি প্রথম জামাতের মধ্যে একজন।
হযরত উসমান (রা.)-এর খেলাফতকালে সিরিয়ার গভর্নর ছিলেন হযরত মুয়াবিয়া (রা.)। তিনি সাইপ্রাস দ্বীপপুঞ্জে আক্রমণের অনুমতি প্রার্থনা করেন। হযরত উসমান (রা.) অনুমতি দিয়ে দেন। হযরত মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.) এক জামাত সাথে নিয়ে ঐ এলাকায় আক্রমণ চালান। তাঁদের মধ্যে উম্মে হারাম (রা.)ও ছিলেন। ফিরে আসার সময় এক খচ্চরে চড়ছিলেন। এমন সময় বাহন নড়াচড়া শুরু করলো। আর তিনি পড়ে গেলেন এবং ঘাড় ভেঙ্গে গেল। এতে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। সেখানেই তাঁকে দাফন করে দেয়া হয়। [বুখারী, হুল্যাতুল আওলিয়া: ২ : ৬১]
📄 গোয়েন্দা তৎপরতার খবর শুনে নবীজীর হাসি
হযরত হুযাইফা (রা.) বলেন, খন্দকের যুদ্ধে আমাদের একদিকে মক্কার কাফের দল এবং তাদের সাথে আরও অন্যান্য কাফের গোষ্ঠী যোগ দিয়েছিল। তারা আমাদের উপর আক্রমণ চালানোর জন্য এসেছিল এবং তারা আক্রমণের জন্যে প্রস্তুত। অন্যদিকে আমাদের মদীনায় বনু কুরায়জার ইহুদীরা আমাদের শত্রুতায় মত্ত হয়ে থাকে। তাদের ব্যাপারে সন্দেহ ছিল যে, মদীনা খালি দেখে তারা আবার আমাদের রেখে আসা পরিবার- পরিজনদের উপর আক্রমণ চালিয়ে বসে কি না। জেহাদের জন্য তো আমরা মদীনার বাইরে। আর আমাদের সাথে আসা মুনাফিকরা 'ঘর 'খালি'- এই বাহানায় অনুমতি নিয়ে মদীনায় ফেরত যাচ্ছিল। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুমতিপ্রার্থীদেরকে অনুমতি দিয়ে দিচ্ছিলেন। এমন সময় এক রাত এত অন্ধকার হলো যে রাতের বেলা নিজের হাত নিজে দেখতে পাচ্ছিলাম না। এমন অন্ধকার না আগে এসেছে, না তার পরে। শোঁ শোঁ শব্দে ভীষণ বাতাস বইছিল। মুনাফিকরা যার যার বাড়ি ফেরত যাচ্ছিল। আমরা তিনশ' জনের এক জামাত সেখানে ছিলাম। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক এক করে সবার খবরা খবর নিচ্ছিলেন। তখন নবীজী আমার পাশ দিয়ে অতিক্রম করেন। আমার কাছে শত্রু থেকে বাঁচার জন্য না কোন হাতিয়ার ছিল আর ঠাণ্ডা থেকে বাঁচার জন্য না কোন গরম কাপড়। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করেন, কে? আমি বললাম, হুযাইফা। তখন আমি ঠাণ্ডার কারণে উঠতে পারলাম না এবং লজ্জায় মাটির সাথে মিশে পড়েছিলাম।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- ওঠো, শত্রুদের অবস্থানস্থলে গিয়ে খবর নিয়ে আস। দেখ, সেখানে কী ঘটছে। আমি তখন অন্ধকারের ভয় এবং ঠাণ্ডায় সবচেয়ে বেশি কাতর ছিলাম। কিন্তু নির্দেশ পালনার্থে সাথে সাথে উঠে রওনা দিতে উদ্যত হলাম।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার জন্য দুআ করলেন- হে আল্লাহ! তুমি তার হেফাজত কর, তার সামনে পেছনে ডানে বামে উপরে এবং নিচে।
হযরত হুযাইফা (রা.) বলেন- তিনি দুআ শেষ করতেই আমার ভয় এবং ঠাণ্ডা কোথায় যে হারিয়ে গেল! কদম ফেলছি আর গরম অনুভব করছি। যাওয়ার সময় নবীজী এও বলেন- কোন সাড়া শব্দ করবে না। চুপচাপ দেখে চলে আসবে। শুধু দেখবে যে, কী হচ্ছে?
আমি সেখানে গিয়ে দেখি, আগুন জ্বলছে আর সবাই তাপ নিচ্ছে। এক ব্যক্তি আগুনে তার হাত গরম করছে। চারদিক থেকে 'চলো ফিরে যাই' এ আওয়াজ আসছে। সবাই তার গোত্রের লোকদেরকে চিৎকার দিয়ে দিয়ে বলছে- ফিরে চলো।
বাতাসের প্রচণ্ডতা চারদিক থেকে তাদের তাঁবুতে পাথর বর্ষণ করছিল। তাঁবুর রশিগুলো ছিঁড়ে যাচ্ছিল। ঘোড়া এবং অন্যান্য পশু মারা যাচ্ছিল। আবু সুফিয়ান যে তাদের বাহিনীর নেতা ছিল সেও আগুন পোহাচ্ছিল। আমার মনে হঠাৎ উদয় হলো, সুযোগটা খুবই অনুকূলে। তাকে শেষ করে দেই। এমনকি তীর ধনুকও তাক করে ফেললাম। তখন মনে হলো, নবীজীর অসিয়ত। তিনি বলেছেন যে, কোন সাড়া-শব্দ না করি। সাথে সাথে তীর ধনুক গুটিয়ে ফেললাম। তারও সন্দেহ হলো। সে জিজ্ঞেস করলো- তোমাদের মধ্যে কি কোন গোয়েন্দা আছে? প্রত্যেকে যার যার পাশের লোকের হাত ধরলো। তড়িৎগতিতে আমিও একজনের হাত ধরে জিজ্ঞেস করলাম তুমি কে? সে বললো- সুবহানাল্লাহ, তুমি আমাকে চেনো না! আমি অমুক।
আমি ফিরে আসলাম। এসে দেখি, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটা চাদর গায়ে দিয়ে নামায পড়ছেন। তাঁর নামায শেষ হলে আমি সেখানকার অবস্থা বিস্তারিত বললাম। আমার এ গোয়েন্দা তৎপরতার ঘটনা শুনে নবীজীর দাঁত মোবারক চমকে উঠলো। তিনি আমাকে তাঁর পায়ের কাছে শুইয়ে দিলেন। তাঁর চাদরের অংশ আমার গায়ে জড়িয়ে দিলেন। আমি আমার বুকের সাথে নবীজীর পায়ের তালু জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লাম। [তাফসীরে দুররে মানসুর।