📄 জারুদ ইবনে মুআলা (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণে নবীজীর আনন্দ
জারুদ ইবনে মুআল্লা (রা.) কে অনেকে বলেন, তিনি ইবনে আ'লা। অনেকে বলেন, তিনি জারুদ ইবনে আমর। তিনি আবদুল কায়েস গোত্রের লোক ছিলেন।
তাঁর ডাক নাম ছিল আবুল মুনযির। অনেকে বলেন- আবু গিয়াস। অনেকে বলেন- আবু ইতাব। মোটকথা তাঁর নাম ও ডাকনামের ব্যাপারে যথেষ্ট মতবিরোধ রয়েছে। তাঁকে জারুদ এজন্য বলা হতো যে, তিনি জাহেলী যুগে বকর ইবনে ওয়াইলের সম্পদ লুটপাট করেছিলেন।
তিনি দশ হিজরী সালে নবীজীর দরবারে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি প্রথমে খৃষ্টান ছিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করাতে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনন্দিত হন। তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করেন। তাঁকে নৈকট্য দান করেন। ইরান বা নাহাওন্দ এলাকায় তিনি শাহাদত বরণ করেন। [উসুদুল গাবাহ: ১: ২৬১]
📄 হযরত আয়েশা (রা.)-এর আশ্চর্য হওয়া দেখে নবীজীর হাসি
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- আয়েশা! তুমি চারটি আমল না করে শুতে যেয়ো না।
১. কুরআন শরীফ খতম করে শোবে। ২. সব নবীকে নিজের জন্য সুপারিশকারী বানিয়ে শোবে। ৩. সব মুসলমানকে সন্তুষ্ট করে শোবে। ৪. একটি হজ এবং ওমরা করে শোবে।
তারপর নবীজী নামাযে দাঁড়িয়ে যান এবং হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, আমি বিছানায় শুয়ে থাকলাম। নবীজী নামায শেষ করার পর আমি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম- হে আল্লাহর রাসূল! অল্প সময়ে এত বড় চারটি কাজ কীভাবে সম্পাদন করব?
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হাসলেন। বললেন- সূরা ইখলাস তিনবার পাঠ করলে কুরআন মজীদ এক খতম হয়ে যায়। তুমি যখন আমার প্রতি এবং সব নবীগণের প্রতি দরূদ পাঠ করবে তখন সব নবী (আ.) কিয়ামতের দিন তোমার সুপারিশকারী হয়ে যাবেন। তুমি যদি মুমিনদের ক্ষমা প্রার্থনা কর, তাহলে সবাই তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন। আর যদি سُبْحَانَ اللَّهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ পাঠ কর, তাহলে তোমার একটি হজ ও ওমরা হয়ে যাবে। [দুররুন্নাসিহীন সূত্রে তাফসীরে হানাফী: ১: ২০৭]
📄 হযরত ইকরামা (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণে নবীজীর আনন্দ
হযরত ইকরামা ইবনে আবু জেহেল ইসলামের মারাত্মক একজন শত্রু ছিলেন। বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে কাজ করেছেন। এ যুদ্ধেই তাঁর পিতা আবু জেহেল মুয়াজ ও মুয়াওয়াজ (রা.) নামক দুই কিশোর সাহাবীর হাতে নিহত হয়। উহুদের যুদ্ধে ইকরামা এবং খালিদ শত্রুপক্ষের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ৫ম হিজরীতে আরবের সব মুশরিক যখন তাদের সব গোত্রের লোকদের একসাথে করে মদীনায় আক্রমণ চালায় তখন বনী কেনানাকে নিয়ে ইকরামা مسلمانوں পতন ঘটানোর জন্য গিয়েছিলেন। মক্কা বিজয়ের সময় মুষ্টিমেয় মৌলবাদী কাফের ছাড়া সবাই আত্মসমর্পণ করেছিল। মৌলবাদী কাফেরদের মধ্যে ইকরামাও ছিলেন।
মক্কা বিজয়ের পর যখন ইসলামের শত্রুদের শক্তি ভেঙে পড়ে। মক্কা এবং আশপাশের এলাকার লোকেরা দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করছিল। তখন ঐ মৌলবাদী গোটা কতক কাফের দেশ ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যায়। ইকরামাও তাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি ইয়ামানের উদ্দেশে পলায়ন করেন। তার স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি নবীজীর কাছে গিয়ে নিজের স্বামীর নিরাপত্তা কামনা করেন। নবীজী প্রস্তাব কবুল করেন। তখন স্ত্রী তার স্বামী ইকরামার খোঁজে বের হন। ইকরামা যখন ইয়ামানের উদ্দেশে জাহাজে আরোহণ করেন তখন বিপদমুক্তির জন্য 'লাত্' আর 'উজ্জা'-এর ধ্বনি তোলেন। সাথীরা বললো- এখানে লাত্ আর উজ্জা কোন কাজে আসবে না। এখানে শুধু এক আল্লাহকে ডাকতে হবে। সমুদ্রের উত্তাল উর্মিমালার বিপদ থেকে বাঁচতে হলে এক আল্লাহকেই ডাকতে হবে। এ কথাটি ইকরামার অন্তরে আঘাত হানল। কুফরির জগদ্দল পাথর ভেঙে চুরমার করে দিল। নিজেকে নিজে বলল- সমুদ্রে যদি এক আল্লাহ থাকেন তবে স্থলে কেন অন্য কেউ? সেখানেও তো তিনিই হবেন। তাই যদি হয়, তাহলে মুহাম্মদের কাছে কেন আমি ফিরে যাব না?
তার স্ত্রী তাকে খুঁজতে খুঁজতে তার কাছে গিয়ে পৌঁছলেন। তাকে বললেন- আমি এমন এক মানুষের কাছ থেকে এসেছি যিনি সবার চেয়ে ভালো। সবার চেয়ে উত্তম। আমি তাঁর পক্ষ থেকে তোমার নিরাপত্তা নিয়ে এসেছি। স্ত্রীর কথা শুনে ইকরামা মক্কার উদ্দেশে ফিরে চলেন। নবীজী তখন মক্কায় অবস্থান করছিলেন। ইকরামাকে দেখে নবীজী আনন্দে আত্মহারা হয়ে যান এবং 'মারহাবা' বলে তাকে সম্ভাষণ জানান।
ইকরামা জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি আমাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন?
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- তোমাকে নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে।
এমন দয়া আর ক্ষমা দেখে ইকরামা লজ্জা আর অনুশোচনায় মাথা নত করে নিলেন। আর ঘোষণা করলেন-
أَشْهَدُ أَنْ لَّا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ الله
[বুখারী, ইবনে সা'দ, সীরাতে ইবনে হিশাম ২: ২৬৫, সিয়ারুস্ সাহাবা: ৫: ১৬৮]
📄 এক ইহুদীর রাগ দেখে নবীজীর হাসি
হযরত যায়েদ ইবনে সা'য়না (রা.) ইহুদীদের বড় আলিমদের একজন ছিলেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী ছিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে অনেক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তাবুক যুদ্ধের সফরে তিনি পরলোক গমন করেন।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) থেকে বর্ণিত, হযরত যায়েদ ইবনে সা'য়না বলেন- আমি যখন নবীজীকে একবার দেখলাম। সাথে সাথে তাঁর নবুওয়তের সমূহ নিদর্শন এবং আলামত আমার সামনে স্পষ্ট হয়ে যায়। শুধু দুটো আলামত বুঝতে পারিনি। একটি হলো 'তাঁর ধৈর্য সব সময় রাগের উপর বিজয়ী থাকবে।' দ্বিতীয়টি হলো, 'কোন মূর্খ লোকের কঠোরতা সত্ত্বেও তাঁর ধৈর্য অটুট থাকবে।'
তিনি বলেন, ইচ্ছা জাগলো, কোনভাবে তাঁর সাথে এমন কোন কাজ-কারবার করবো যেন এ দুটো আলামতও আমার সামনে স্পষ্ট হয়ে যায়।
একদিন নবীজী ঘর থেকে আলী (রা.)-এর সাথে বের হন। গ্রাম থেকে এক লোক বাহনে চড়ে তাঁর কাছে আসলো। এসে বললো, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! অমুক মহল্লার লোক মুসলমান। তারা ক্ষুধার্ত। ভালো মনে করলে তাদের কাছে কিছু পাঠিয়ে দিন। নবীজী বলেন- আমি অবশ্যই পাঠাতাম; কিন্তু এখন তো আমার কাছে কিছুই নেই। হযরত যায়েদ ইবনে সা'য়না বলেন, এটা শুনে আমি নবীজীর কাছে গেলাম। বললাম, হে মুহাম্মদ! আপনি চাইলে আমার থেকে এখনই কিছু টাকা পয়সা নিয়ে নিন এবং দু'মাস পর পর বিনিময়ে খেজুর দিয়ে দেবেন। নবীজী বললেন- ঠিক আছে।
আমি তাঁকে আশি দিনার দিলাম।
হযরত যায়েদ বলেন- দুই মাস পূর্ণ হওয়ার দুই দিন বাকী। আমি নবীজীর কাছে গেলাম। তিনি একটা জানাযা পড়ানোর জন্য বের হয়েছেন মাত্র। তাঁর সাথে হযরত আবু বকর, হযরত উমর, হযরত উসমান (রা.) ছাড়াও অনেক সাহাবা ছিলেন। আমি তাঁর জামা ও চাদর টেনে ধরলাম এবং রাগান্বিত চেহারায় তাঁর দিকে তাকিয়ে বললাম, হে মুহাম্মদ! আমার পাওনা আদায় করে দাও। আল্লাহর কসম! তোমরা কুরাইশের লোকেরা ওয়াদা ভঙ্গকারী আর পাওনা পরিশোধে গড়িমসি কর। এ রকম আরো দু'চারটে কথা বললাম।
আমার দৃষ্টি যখন হযরত উমরের দিকে পড়লো, দেখলাম রাগে তিনি কটমট করছেন। উমর (রা.) বলেন- হে আল্লাহর দুশমন! তুমি কি নবীজীর সাথে এমনভাবে কথা বলছো, যা আমি শুনতে পাচ্ছি? আল্লাহর কসম! আমি তোমার গর্দান উড়িয়ে দেব।
নবীজী খুব ধীরস্থিরভাবে উমর (রা.)-এর দিকে তাকালেন এবং মুচকি হাসলেন। বললেন- উমর! এভাবে নয়; বরং তাকে ভদ্রভাবে আদায় করার নির্দেশ দাও এবং আমাকে পরিশোধ করার নির্দেশ দাও। আরো বলেন- হে উমর! তুমি তার সাথে যাও এবং তার প্রাপ্য পরিশোধ করে দাও এবং সাথে বাড়তি আরো বিশ সের দিয়ে দিবে। কেননা তুমি তাকে ভয় দেখিয়েছ।
হযরত যায়েদ বলেন- আমি উমর (রা.)-এর সাথে গেলাম। তিনি আমার প্রাপ্য পরিশোধ করলেন এবং সাথে বিশ সের বাড়তি দিলেন।
আমি বললাম- হে উমর! আপনি কি জানেন আমি এমন কেন করেছি? এর আগে নবীজীর সব আলামত আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। শুধু এ আলামত সম্পর্কে জানা বাকী ছিল। তাও এখন দেখে নিলাম। আপনি সাক্ষী থাকুন, আমি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ঈমান আনলাম। তারপর যায়েদ ইবনে সা'য়না (রা.) প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করেন। [উসদুল গাবাহ: ২: ২৩২]