📄 আবু লুবাবা (রা.)-এর তওবায় নবীজীর হাসি
হযরত রিফায়া আবদুল মুনযির (রা.) যার ডাক নাম ছিল আবু লুবাবা। বদরের যুদ্ধের সময় তিনি বয়সে ছোট ছিলেন। তাই তাঁকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। বনু কুরায়যা যখন দুর্গে লুকিয়ে ছিল, নবীজী তাদেরকে বললেন- তোমরা দুর্গ থেকে বেরিয়ে আস। বনু কুরায়যা বলল- আপনি আবু লুবাবাকে আমাদের কাছে পাঠান। আমরা ব্যাপারটা নিয়ে তার সাথে পরামর্শ করে নিই। নবীজী আবু লুবাবা (রা.) কে তাদের কাছে পাঠিয়ে দেন। আবু লুবাবা আওস গোত্রের সাথে সম্পর্ক রাখতেন। আর বনু কুরায়যা তাদের মিত্র। তিনি তাদের কাছে গেলে তাদের নারীরা এবং শিশুরা তাঁর সামনে কাঁদতে শুরু করে। এটা দেখে হযরত আবু লুবাবা (রা.)-এর অন্তর নরম হয়ে গেল। (কিন্তু এ নরম অনুভূতি নবীজীর চাহিদার বিপরীত ছিল) তারা জিজ্ঞেস করল, হে আবু লুবাবা! আমরা কি হযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথায় দুর্গ থেকে বেরিয়ে যাব? তিনি বলেন- হ্যাঁ। কিন্তু সাথে সাথে গলায় আঙ্গুলের ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন যে, তোমাদেরকে জবাই করা হবে। হযরত আবু লুবাবা (রা.) বলেন- আমি যখন বুঝতে পারলাম যে, আমি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের সাথে গাদ্দারী করেছি, তখন আমার পা কাঁপতে শুরু করে। আমি ফিরে আসলাম। নবীজী উপস্থিত ছিলেন না। আমি নিজেকে মসজিদের একটা খুঁটির সাথে বেঁধে নিলাম। আর মনে মনে বললাম, আল্লাহ তাআলা যতক্ষণ আমার তওবা কবুল না করবেন ততক্ষণ এ বাঁধন খুলবো না। আমি অঙ্গীকার করছি, আমি আর কখনো বনু কুরায়যার সাথে নরম ব্যবহার করবো না। এ খবর যখন নবীজীর কাছে পৌঁছল, তখন তিনি বলেন- নিজেকে বাঁধার আগে সে আমার কাছে আসলে তো আমি তার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতাম। এখন আমি তাকে খুলবো না যতক্ষণ আল্লাহ তাআলা তার তওবা কবুল না করেন।
আবদুল্লাহ ইবনে কাসীত বলেন- নবীজীর কাছে আবু লুবাবা (রা.)-এর তওবা কবুল হওয়ার সংবাদ নাযিল হলো। তিনি তখন উম্মে সালামার ঘরে ছিলেন।
হযরত উম্মে সালামা (রা.) বলেন- আমি আবু লুবাবা (রা.)-এর তওবা কবুল হওয়ার খবর শুনেছি। তখন নবীজী হাসছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহ আপনাকে সব সময় হাস্যোজ্জ্বল রাখুন। আপনি কেন হাসছেন? নবীজী বলেন- আবু লুবাবার তওবা কবুল করা হয়েছে। তাই হাসছি। নবীজী সকালে যখন নামাযের জন্য মসজিদে গেলেন তখন তাকে তার বাঁধন খুলে মুক্ত করে দেন। [উদুল গাবাহ্: ২: ১৮৩]
📄 হযরত রি’ফায়া (রা.)-এর পিতার কসম শুনে নবীজীর হাসি
হযরত রিফা'য়া ইয়াসরাবী (রা.) বলেন, আমি আমার পিতার সাথে নবীজীর দরবারে উপস্থিত হলাম। নবীজী আমাকে দেখে আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করেন, এ কি তোমার ছেলে? পিতা বললেন- কা'বার রবের কসম! হ্যাঁ, আমি এর সাক্ষী দাঁড় করাতে পারব। এটা শুনে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দেন।... [উদুল গাবাহ: ২: ১৮৬]
📄 হযরত রি’ফায়ার স্ত্রীর ঘটনায় নবীজীর হাসি
হযরত রিফা'য়া (রা.) তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিয়েছিলেন। পরে তিনি হযরত আবদুর রহমান ইবনে যুবায়ের (রা.) কে বিয়ে করেন। মহিলা একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে উপস্থিত হন। বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! রিফা'য়া আমাকে তালাক দিয়েছিলেন। তা আমি আবদুর রহমান ইবনে যুবায়ের (রা.) কে বিয়ে করি। কিন্তু তাঁর কাছে কিছু নেই (অর্থাৎ তার যৌনাঙ্গ নিস্তেজ)। কাপড়ের এক কোণা ধরে বলেন- এর মত নির্জীব। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা শুনে হেসে দেন এবং বলেন, তুমি কি আবার রিয়া'য়ার কাছে যেতে চাও? তার কাছে তুমি ততক্ষণ যেতে পারবে না যতক্ষণ তুমি বর্তমান স্বামীর মজা না চাকবে এবং সে তোমার মজা না চাকবে। [উদুল গাবাহ: ৩: ২৩৯]
📄 হযরত আবু বকর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণে নবীজীর খুশি
হযরত আবু বকর (রা.) বলেন, আমি নবীজীর নবুওয়ত প্রাপ্তির পূর্বে ইয়ামান গিয়েছিলাম। ইদ গোত্রের এক আলিমের কাছে আমি হাজির হলাম। তিনি মানুষ সম্পর্কে অনেক কিছু জানেন। যখন ঐ শেখ আমাকে দেখলেন তখন বললেন- আমার মনে হয় তুমি মক্কার লোক। আমি বললাম- হ্যাঁ। তিনি বললেন, মনে হয় তুমি কুরাইশ বংশের লোক? আমি বললাম- হ্যাঁ। তিনি বললেন- মনে হয় তুমি তামীম গোত্রের লোক? আমি বললাম- হ্যাঁ। আমার নাম আবদুল্লাহ ইবনে উসমান ইবনে তামীম ইবনে মুররা। তিনি বলেন- ব্যস, আরেকটা আলামত বাকী আছে। তুমি তোমার পেট থেকে কাপড় উঠাও। আমি বললাম- কেন উঠাবো আগে বলুন। শেখ বললেন- আমি বিশুদ্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে এটা জানতে পেরেছি যে, মক্কায় একজন নবী আসবেন। তাঁর নবুওয়তের কাজে একজন যুবক এবং একজন বৃদ্ধ লোক সাহায্যকারী হবেন। যুবক যিনি হবেন তিনি তাঁর দুঃখ-দুর্দশার অংশীদার হবেন এবং বিপদাপদ থেকে রক্ষা করবেন। আর বৃদ্ধ ব্যক্তি ফর্সা হবেন। হালকা-পাতলা শারীরিক গঠন। তাঁর পেটে একটা তিল থাকবে। আর তার বাম রানে একটা চিহ্ন থাকবে।
এখন তুমি তোমার পেটের তিল দেখাও। রানের চিহ্ন দেখানোর দরকার নেই (কেননা এটা সতরের অংশ)। হযরত আবু বকর (রা.) বলেন- আমি আমার কাপড় পেট থেকে উঠালাম। তিনি আমার নাভীর উপর একটা তিল দেখতে পেলেন এবং বললেন- কা'বার প্রতিপালকের কসম! সেই ব্যক্তি তুমিই।
তারপর তিনি বললেন- আগে আগেই তোমাকে একটা কথা বলে রাখছি। শোন! ওটা থেকে বাঁচবে। আবু বকর বলেন- ওটা কী? তিনি বলেন- হেদায়াত থেকে দূরে সরে যাওয়া থেকে বাঁচবে এবং সঠিক পথ থেকে পিছুটান দেবে না। আল্লাহ তাআলা তোমাকে যা দান করবেন, তার ব্যাপারে মনে ভয় রাখবে।
হযরত আবু বকর (রা.) বলেন- আমি ইয়ামানে আমার কাজ শেষ করে ফেরার পথে ঐ শেখের সাথে সাক্ষাত করতে গেলাম। তিনি বলেন- আমি ঐ নবীর প্রশংসায় কাসীদা পাঠ করছি। তুমি শুনতে থাক। আমি বললাম, খুব ভালো।
হযরত আবু বকর (রা.) বলেন- আমি মক্কায় ফিরে দেখি হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়তের ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন।
আমার কাছে উকবা ইবনে আবু মুঈত, শাইবা, রবীয়া, আবু জেহেল, আবুল বুখতরী এবং কুরাইশের অন্য নেতারা আসলো। আমি তাদেরকে বললাম- কী ব্যাপার, কোন দুর্ঘটনা ঘটেছে? নাকি কোন গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রকাশ পেয়েছে?
তারা বলল- আবু বকর! এ যুগের বিখ্যাত খতীব আবু তালিবের ইয়াতীম ভাতিজা, সে মনে করে যে, সে একজন প্রেরিত নবী। আবু বকর! তুমি সফরে না থাকলে এত দিনে আমরা তার কাম খতম করে দিতাম। কোন অপেক্ষা করতাম না। এখন তুমি এসেছো। তোমার সিদ্ধান্ত আমাদের জন্য যথেষ্ট। আবু বকর (রা.) বলেন- আমি তাদেরকে বুঝিয়ে শুনিয়ে বিদায় দিলাম। আমি লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোথায়? তারা বলল- হযরত খাদীজার ঘরে। আমি সেখানে গেলাম। দরজায় শব্দ করলাম। নবীজী বের হয়ে আসেন।
আমি বললাম- হে মুহাম্মদ! আমি আপনাকে বাইরে আসার কষ্ট দিয়েছি। আপনি নাকি আপনার বাপ-দাদার ধর্ম ত্যাগ করেছেন?
তিনি বলেন- আবু বকর! আমি আল্লাহর রাসূল। তোমার প্রতি এবং সব মানুষের প্রতি। সুতরাং তুমি ঈমান আনো। বললাম- আপনার নবুওয়তের প্রমাণ কী? তখন তিনি বললেন- ঐ শেখ যার সাথে তুমি ইয়ামানে সাক্ষাত করেছ। আমি বললাম- আমি ইয়ামানে তো অনেক শেখের সাথেই সাক্ষাৎ করেছি। তিনি বলেন- ঐ শেখ যে তোমাকে কাসীদা দিয়েছে।
আমি বললাম- হে আমার হাবীব! এ খবর আপনাকে কে দিল?
তিনি বলেন- ঐ মহান সত্তা যিনি আমার পূর্বে অনেক নবী দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন।
হযরত আবু বকর বলেন- আমি বললাম, আপনার হাত বাড়ান। আমি ইসলামের বায়আত গ্রহণ করব। আর ঘোষণা করলাম- أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ وَأَنَّكَ رَسُولُ ٱللَّٰهِ -
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। আর নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসূল।
আবু বকর (রা.) বলেন- আমি ফিরে আসলাম এবং নবীজীকে আমার ইসলামের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত দেখেছি। আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে যান তিনি। [উসুদুল গাবাহ: ৩: ২০৮]