📄 এক গ্রাম্য লোকের কথায় নবীজীর হাসি
নবীজীর মধ্যে মানবিক গুণাবলীর সমাহার ছিল। তন্মধ্যে একটি হলো, অন্যের প্রতি ক্ষমা। একদিন তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। তখন এক লোক আসলো। এসেই সে তার চাদর নবীজীর গলায় পেঁচিয়ে খুব জোরে চেপে ধরলো। ফলে নবীজীর গলায় দাগ পড়ে গেল। নবীজী বলেন- হে আল্লাহর বান্দা! কী ব্যাপার? সে বলল, যে সম্পদ আল্লাহ তোমাকে দিয়েছেন তা থেকে আমাকেও দাও। নবীজী বলেন- সম্পদ তো আমি দেব কিন্তু তুমি যে কষ্ট দিয়েছ তার বদলা আমি নেব।
সে বলল, না, না। আমি বদলা দেবো না। নবীজী বলেন, কেন?
সে বলল, আপনি তো মন্দ কাজের বদলা মন্দ কাজের দ্বারা নেন না।
এটা শুনে নবীজী হেসে দেন। সাহাবায়ে কেরামকে বলেন, এ লোককে এক উটে যব এবং আরেকটি উটে খেজুর তুলে দাও।
📄 হযরত তালহা (রা.)-এর কথা শুনে নবীজীর হাসি
হযরত হাসীন ইবনে উহু'হ্ (রা.) বলেন, যখন হযরত তালহা ইবনে বারা (রা.) নবীজীর সাথে সাক্ষাৎ করতেন তখন কোলাকুলি করতেন এবং পা মোবারকে চুমু খেতেন। এ অবস্থায় তিনি বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি যা পছন্দ করেন সে নির্দেশ আমাকে দিন। আমি কখনো অবাধ্য হবো না। নবীজী হেসে দিলেন। হযরত তালহা (রা.) তখনও যুবক। নবীজী বললেন- যাও, তোমার পিতাকে হত্যা করে আস। হযরত তালহা (রা.) শুনেই দৌড় দিলেন। যেন নবীজীর নির্দেশ পালন করে আসেন। নবীজী তাকে ডাকলেন এবং বললেন- আমি আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার জন্য আবির্ভূত হইনি।
একবার হযরত তালহা (রা.) অসুস্থ হলেন। নবীজী শীতের কারণে মোটা চাদর গায়ে দিয়ে তার শুশ্রূষার জন্য গেলেন। আর বলেন- হযরত তালহার মৃত্যু নিকটবর্তী মনে হচ্ছে। তোমরা অবশ্যই আমাকে জানাবে। আমি তার জানাযা পড়ব। আর তাকে দাফন করতে দেরী করবে না।
হযরত তালহা (রা.) বলেন- আমার মৃত্যু হয়ে গেলে আমাকে দাফন করে দেবে। আমাকে আমার প্রতিপালকের সাথে মিলিয়ে দেবে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানাবে না। কেননা রাস্তায় ইহুদীরা থাকতে পারে। এমন যেন না হয় যে, আমার কারণে তিনি বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েন। (তাঁর মৃত্যু হয়েছিল রাতে) সকালে নবীজীর কাছে খবর পাঠানো হলো। তিনি আগমন করেন এবং তাঁর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন- হে আল্লাহ! তুমি তালহার সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ কর, যেমন তুমি তাকে দেখে হাসছ এবং সে তোমাকে দেখে হাসছে। [উসুদুল গাবাহ: ২: ২]
📄 হযরত রশীদ আল্-হিজরীর কথা শুনে নবীজীর হাসি
হযরত রশীদ (রা.) একজন সাহাবী। তাঁকে ফারসীও বলা হতো। আবু উমর বলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধে নবীজীর সাথে ছিলেন। মুয়াবিয়া আল ফারসী পরিবারের ক্রীতদাস ছিলেন। যুদ্ধে তিনি বনী কেনানার (গোত্র) এক মুশরিকের সাথে মিলিত হলেন। সে লোহার আড় তৈরি করে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিল। সে এই বলে চিৎকার করে উঠল যে, 'আমি আওইফের সন্তান'। হযরত সা'দ, যিনি হাতিব গোত্রের ক্রীতদাস ছিলেন, তিনি তার সাথে লড়াই করার জন্য সামনে হাজির হন। মুশরিক লোকটি হযরত সা'দের উপর আক্রমণ করে এবং তাঁকে দু'টুকরো করে ফেলে। এটা দেখে হযরত রশীদ (রা.) তার দিকে তেড়ে গেলেন এবং তার ঘাড়ে তলোয়ারের আঘাত হানলেন। আক্রমণ বৃথা যায়নি। তার বাহু কেটে গেল এবং শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তারপর বলেন- (প্রতিশোধ!) আমি ফারসীর গোলাম। প্রিয় নবী ঘটনাটি অবলোকন করেন। বক্তব্যও শোনেন। তিনি বললেন- এমন বললে কেন? বলতে যে, আমি আনসারদের গোলাম। ঠিক তখন ইবনে আওইফের অন্য ভাই কুকুরের মত তেড়ে আসল। হযরত রশীদ বীর বিক্রমে তার উপর আক্রমণ চালান। সে লোহার টুপি পরিহিত ছিল। তার গলায় কোপ মেরে মাথা দ্বিখণ্ডিত করে দেন। আর বলেন- (প্রতিশোধ!) আমি আনসারের গোলাম। নবীজী এ কথা শুনে হেসে দেন এবং বলেন- হে আবদুল্লাহর পিতা! তুমি খুব ভালো করেছ, ভালো বলেছ। নবীজী তাঁকে আবদুল্লাহর পিতা বলেছেন অথচ তাঁর কোন সন্তান ছিল না। [উদুল গাবাহ: ২: ১৭৬]
📄 আবু লুবাবা (রা.)-এর তওবায় নবীজীর হাসি
হযরত রিফায়া আবদুল মুনযির (রা.) যার ডাক নাম ছিল আবু লুবাবা। বদরের যুদ্ধের সময় তিনি বয়সে ছোট ছিলেন। তাই তাঁকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। বনু কুরায়যা যখন দুর্গে লুকিয়ে ছিল, নবীজী তাদেরকে বললেন- তোমরা দুর্গ থেকে বেরিয়ে আস। বনু কুরায়যা বলল- আপনি আবু লুবাবাকে আমাদের কাছে পাঠান। আমরা ব্যাপারটা নিয়ে তার সাথে পরামর্শ করে নিই। নবীজী আবু লুবাবা (রা.) কে তাদের কাছে পাঠিয়ে দেন। আবু লুবাবা আওস গোত্রের সাথে সম্পর্ক রাখতেন। আর বনু কুরায়যা তাদের মিত্র। তিনি তাদের কাছে গেলে তাদের নারীরা এবং শিশুরা তাঁর সামনে কাঁদতে শুরু করে। এটা দেখে হযরত আবু লুবাবা (রা.)-এর অন্তর নরম হয়ে গেল। (কিন্তু এ নরম অনুভূতি নবীজীর চাহিদার বিপরীত ছিল) তারা জিজ্ঞেস করল, হে আবু লুবাবা! আমরা কি হযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথায় দুর্গ থেকে বেরিয়ে যাব? তিনি বলেন- হ্যাঁ। কিন্তু সাথে সাথে গলায় আঙ্গুলের ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন যে, তোমাদেরকে জবাই করা হবে। হযরত আবু লুবাবা (রা.) বলেন- আমি যখন বুঝতে পারলাম যে, আমি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের সাথে গাদ্দারী করেছি, তখন আমার পা কাঁপতে শুরু করে। আমি ফিরে আসলাম। নবীজী উপস্থিত ছিলেন না। আমি নিজেকে মসজিদের একটা খুঁটির সাথে বেঁধে নিলাম। আর মনে মনে বললাম, আল্লাহ তাআলা যতক্ষণ আমার তওবা কবুল না করবেন ততক্ষণ এ বাঁধন খুলবো না। আমি অঙ্গীকার করছি, আমি আর কখনো বনু কুরায়যার সাথে নরম ব্যবহার করবো না। এ খবর যখন নবীজীর কাছে পৌঁছল, তখন তিনি বলেন- নিজেকে বাঁধার আগে সে আমার কাছে আসলে তো আমি তার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতাম। এখন আমি তাকে খুলবো না যতক্ষণ আল্লাহ তাআলা তার তওবা কবুল না করেন।
আবদুল্লাহ ইবনে কাসীত বলেন- নবীজীর কাছে আবু লুবাবা (রা.)-এর তওবা কবুল হওয়ার সংবাদ নাযিল হলো। তিনি তখন উম্মে সালামার ঘরে ছিলেন।
হযরত উম্মে সালামা (রা.) বলেন- আমি আবু লুবাবা (রা.)-এর তওবা কবুল হওয়ার খবর শুনেছি। তখন নবীজী হাসছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহ আপনাকে সব সময় হাস্যোজ্জ্বল রাখুন। আপনি কেন হাসছেন? নবীজী বলেন- আবু লুবাবার তওবা কবুল করা হয়েছে। তাই হাসছি। নবীজী সকালে যখন নামাযের জন্য মসজিদে গেলেন তখন তাকে তার বাঁধন খুলে মুক্ত করে দেন। [উদুল গাবাহ্: ২: ১৮৩]