📄 আল্লাহ তাআলার হাসির কারণে নবীজীর হাসি
হযরত আলী ইবনে রবীয়া (রা.) বলেন, হযরত আলী (রা.) আমাকে তাঁর বাহনের পেছনে বসিয়ে হুররা'র দিকে রওয়ানা করেন। পথে তিনি তাঁর মাথা আকাশের দিকে উত্তোলন করে বলেন- اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذُنُوبِي إِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ أَحَدٌ غَيْرُكَ অর্থাৎ- 'হে আমার আল্লাহ! আমার গুনাহগুলো ক্ষমা করে দাও। নিশ্চয়ই তুমি ছাড়া আর কোন গুনাহ ক্ষমাকারী নেই।'
তারপর হাসতে হাসতে আমার দিকে তাকান। আমি বললাম, হে আমীরুল মু'মিনীন! আপনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন এবং হাসতে হাসতে আমার দিকে দৃষ্টি দিলেন। এটা কী? হযরত আলী (রা.) বলেন, একবার আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পেছনে তাঁর বাহনে চড়ে হুররা'র দিকে যাচ্ছিলাম। কিছুদূর যাওয়ার পর তিনি আকাশের দিকে মাথা উত্তোলন করে বলেন- اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذُنُوبِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ أَحَدٌ غَيْرُكَ তারপর আমার দিকে দৃষ্টিপাত করেন এবং হাসেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আপনার রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন এবং আমার দিকে হাসতে হাসতে দৃষ্টিপাত করলেন! (এটা কী?) তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- আমার রবের হাসি দেখে আমি হেসেছি। আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি আশ্চর্য হন। কারণ বান্দা জানে যে, তার গুনাহ ক্ষমাকারী আল্লাহ তাআলা ছাড়া আর কেউ নেই। [ইবনে আবি শায়বা, ইবনে মুনী', কানযুল উম্মাল: ১: ২১১, হায়াতুস্ সাহাবা: ৩: ৩৪৪]
📄 শয়তান নিজেই নিজের মাথায় মাটি ঢালার কারণে নবীজীর হাসি
হযরত আব্বাস ইবনে মরদাস (রা.) থেকে বর্ণিত, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফাতের ময়দানে সন্ধ্যাবেলায় তাঁর উম্মতের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং রহমত কামনা করে লম্বা দুআ করেন।
আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি ওহী প্রেরণ করেন যে, নিঃসন্দেহে আমি তোমার দুআ কবুল করেছি। তুমি যেমন চেয়েছো তেমন করে দিয়েছি। কিন্তু একের প্রতি অন্যের জুলুমের ব্যাপারটি ক্ষমা করিনি। কিন্তু যে গুনাহ আমার আর বান্দার সাথে সম্পৃক্ত তা ক্ষমা করে দিয়েছি।
নবীজী আবেদন করেন, হে আমার রব! নিশ্চয়ই তুমি এরও ক্ষমতা রাখ যে, মজলুমকে জুলুম করার বিনিময় স্বরূপ সওয়াব দিয়ে জালেমকে ক্ষমা করে দিতে। ঐ দিন সন্ধ্যায় এ দুআটি কবুল হয়নি।
মুযদালিফায় সকাল বেলা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার এ দুআ করেন। তখন আল্লাহ তাআলা এটা কবুল করে নেন এবং বলেন- নিশ্চয়ই আমি জালেমকেও ক্ষমা করে দিলাম। এতে নবীজী হেসে দিলেন।
সাহাবায়ে কেরام (রা.) জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এমন অবস্থায় হাসলেন, যে অবস্থায় কখনও হাসেন না!
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- দুশমন ইবলিসকে দেখে হাসছি। সে যখন বুঝতে পারলো যে, আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের ব্যাপারে আমার দুআ কবুল করে নিয়েছেন, তখন সে হতাশচিত্তে হায় ধ্বংস! হায় বিপদ! বলে বিলাপ করতে করতে নিজের মাথায় নিজেই মাটি ঢালছিল। [বাইহাকী, হায়াতুস্ সাহাবা: ৩: ৩৬৪]
📄 হযরত আয়েশা (রা.)-এর দুআ শুনে নবীজীর হাসি
হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, একদিন নবীজী ইরশাদ করেন- হে আয়েশা! তুমি কি জান, আল্লাহ তাআলা আমাকে এমন একটা নাম শিখিয়েছেন যার মাধ্যমে দুআ করলে তিনি তা কবুল করে নেন?
হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, আমি আবেদন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা-মাতা আপনার প্রতি উৎসর্গিত হোন! আমাকে দুআটি শিখিয়ে দিন।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আয়েশা! তোমার জন্য এটা উপযুক্ত নয়।
হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, আমি এক কোণায় চিন্তাগ্রস্ত হয়ে বসে ছিলাম। তারপর উঠলাম এবং নবীজীর মাথায় চুমু খেয়ে আবার আবেদন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাকে শিখিয়ে দিন।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাকে শিখিয়ে দেয়া যথোপযুক্ত নয়। আর তোমার জন্য উচিত নয় যে, তুমি এর মাধ্যমে দুনিয়াবী কোন কিছু চাইবে।
হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, এরপর আমি দাঁড়ালাম। ওযু করলাম। দু'রাকাত নামায পড়লাম এবং এ দুআ করলাম- اللَّهُمَّ إِنِّي أَدْعُوكَ اللَّهَ وَأَدْعُوكَ الرَّحْمَنَ وَأَدْعُوكَ الْبَدُ الرَّحِيمُ اَدْعُوكَ بِأَسْمَائِكَ الْحُسْنَى كُلَّهَا مَا عَلِمْتُ مِنْهَا وَمَالَمْ أَعْلَمُ أَنْ تَغْفِرَ لِي وَتَرْحَمْنِي
অর্থাৎ হে আমার আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি তোমাকে আল্লাহ বলে ডাকছি। তোমাকে রহমান বলে ডাকছি, তোমাকে ভালো এবং দয়ালু বলে ডাকছি, তোমাকে তোমার সব সুন্দর নাম নিয়ে ডাকছি, এর যা আমি জানি আর যা জানি না। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও এবং আমার প্রতি দয়া কর।'
হযরত আয়েশা (রা.) বলেন- এটা শুনে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দিলেন এবং বললেন, তুমি যেসব নাম উচ্চারণ করেছো এর মধ্যেই ঐ নামটি আছে। [হায়াতুস্ সাহাবা: ৩: ৩৬৩]
📄 হযরত উমর (রা.)-এর কথা শুনে নবীজীর হাসি
একবার প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পুণ্যাত্মা স্ত্রীগণের কিছু অশোভন কথার কারণে এক মাস তাদের কাছে না যাওয়ার কসম (إبلاء) করে ফেলেন। সবাইকে রেখে তিনি আলাদা এক বাড়িতে গিয়ে বসবাস করতে থাকেন।
সাহাবাদের মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়লো যে, নবীজী তাঁর সব স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিয়েছেন। হযরত উমর (রা.) এতে ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি নবীজীর কাছে গমন করেন, কিন্তু ভেতরে প্রবেশের অনুমতি মিলেনি। ফিরে আসেন। আবার যান। এবারও অনুমতি পাওয়া গেল না। আবার ফিরে আসেন। অস্থিরতা তাকে ঘিরে ধরে। তৃতীয়বার গিয়ে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি পেয়ে যান।
হযরত উমর (রা.) বলেন, আমি ভেতরে প্রবেশ করলাম। দেখি, নবীজী শুধু একটা পাটি বিছিয়ে তাতে বিশ্রাম নিচ্ছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি আপনার স্ত্রীগণকে তালাক দিয়ে দিয়েছেন? নবীজী মাথা ওঠালেন। বলেন, না।
আমি বললাম, আল্লাহু আকবার! হে আল্লাহর রাসূল! আমরা তো কুরাইশ গোত্রের লোক। আমরা দেখেছি আমাদের স্ত্রীরা সব সময় স্বামীর প্রতি অনুগতশীল রয়েছে। মদীনায় এসে দেখি, এখানকার আনসার সাহাবাদের স্ত্রীরা তাদের স্বামীদের উপর অগ্রাধিকার ভোগ করে। এসব দেখে আমাদের স্ত্রীরাও তাদের মত আচরণ শিখে ফেলে।
একদিন আমি আমার স্ত্রীর প্রতি রাগ করলাম। যে প্রতি উত্তর দিতে শুরু করে। আমার কাছে এটা খুব অপছন্দ হলো। সে বললো, আপনার কাছে আমার জবাব কেন খারাপ লাগলো? আল্লাহর কসম! নধীজীর পুণ্যাত্মা স্ত্রীগণ নবীজীর কথায় প্রতি-উত্তর করেন এবং দিনভর (অসন্তুষ্টির কারণে) তাঁর থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলেন। আমি বললাম, এ কাজ করলে সে ক্ষতিগ্রস্ত ও লাঞ্ছিত হবে। চাই সে যে মহিলাই হোক না কেন? হে আল্লাহর রাসূল! যদি আপনার রাগের কারণে আল্লাহর গযব নাযিল হয়ে যায়, তবে তো ঐ মহিলারা ধ্বংস হয়ে যাবে।
এটা শুনে নবীজী হেসে দিলেন। তখন আমি বললাম, আজ আমি হাফসার কাছে গিয়েছিলাম। আমি তাকে বললাম, এ ব্যাপারটি যেন তোমাকে ধোকায় না ফেলে যে, অমুক সতীন আমার চেয়ে সুন্দর এবং অমুক আমার চেয়ে বেশি প্রিয়, নবীজীর কাছে। এ কথা শুনে নবীজী আবার হেসে দিলেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আরেকটু কি প্রমোদ দেব?
নবীজী বললেন, হ্যাঁ। আমি বসে পড়লাম। মাথা উঁচু করে তাঁর এ ঘরটি দেখলাম। আল্লাহর কসম! নবীজীর সাথে মাত্র তিনটি আসবাব ছিল। আমি বললাম, আপনি দুআ করুন, আল্লাহ তাআলা যেন আপনার উম্মতকে সমৃদ্ধি দান করেন। পারস্য ও রোমকে তিনি সমৃদ্ধশীল করেছেন। অথচ তারা আল্লাহর ইবাদত করে না। তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোজা হয়ে বসেন। বলেন- হে খাত্তাবের ছেলে! তুমি কি এখনও সন্দেহে পড়ে আছো? এদেরকে তো ভালো জিনিস দুনিয়াতেই দিয়ে দেয়া হয়েছে। আর আমাদের জন্য পরকালে আছে। [আহমদ, বুখারী, মুসলিম, হয়াতুস্ সাহাবা: ২: ৮০৫]