📄 হযরত উবাই ইবনে কাব (রা.)-এর আত্মমর্যাদাবোধে নবীজীর হাসি
হযরত উবাই ইবনে কাব (রা.) বলেন, এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে হাজির হয়ে বললো, অমুক লোক আমার পিতার স্ত্রীর কাছে যাওয়া আসা করে। হযরত উবাই তখন বলে উঠলেন, যদি আমি হতাম তাহলে তার গর্দান তলোয়ার দিয়ে উড়িয়ে দিতাম। এটা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দিলেন। বললেন- হে উবাই! তুমি তো ভীষণ আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন ব্যক্তি। আমি তোমার চেয়ে বেশি আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন এবং আল্লাহ তাআলা আরও বেশি। (যার আত্মমর্যাদাবোধ নেই সে মানুষ নয়, গাধা।)
হযরত মুগীরা (রা.) থেকে বর্ণিত, হযরত সাদ ইবনে উবাদা (রা.) বলেন, আমি যদি আমার স্ত্রীর কাছে কাউকে পাই, তাহলে চার সাক্ষির অপেক্ষা করবো না। বরং তার গর্দান তলোয়ার দিয়ে উড়িয়ে দেব। আনসার সাহাবীরা নবীজীকে ব্যাপারটি বললে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা সাদ ইবনে উবাদাকে বকাঝকা করো না। সে খুব আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন ব্যক্তি। সে কখনও কুমারী ছাড়া কাউকে বিবাহ করেনি। আর যাকে সে তালাক দিয়েছে তাকে আবার তার সাথে বিবাহের ব্যবস্থা করিনি, তার মর্যাদাবোধের কারণে।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- তোমরা সাদ ইবনে উবাদার আত্মমর্যাদাবোধে আশ্চর্য হচ্ছো, আমি তার চেয়ে বেশি আত্মমর্যাদাবোধ করি এবং আল্লাহ তাআলা তারচেয়েও বেশি আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন সত্তা।
একবার হযরত আলী (রা.) বলেন, আমার কাছে তোমাদের স্ত্রীদের এ খবর কি আসেনি যে, তারা বাজারে গিয়ে অনারব লোকদের ধাক্কা খেয়ে চলে। তোমাদের কি আত্মমর্যাদাবোধ বলতে কিছু নেই! (যে তোমাদের স্ত্রীরা ঢ্যাং ঢ্যাং করে বাজারে ঘুরে বেড়ায়)। তারপর বলেন, যার মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ নেই তার মধ্যে কোন কল্যাণই নেই। [বুখারী, মুসলিম, ইবনে আসাকির, আবু ইয়ালা, আহমদ, কানযুল উম্মাল: ২: ১৬১, হায়াতুস সাহাবা: ২: ৭৪৬]
📄 হযরত উম্মে হাবীবা (রা.)-এর অবস্থা শুনে নবীজীর হাসি
হযরত উম্মে হাবীবা (রা.) বলেন, আমি হাবশায় হিজরত করে যাওয়ার কিছু দিন পরই আমার স্বামী খৃষ্টান হয়ে যায় এবং এ অবস্থায়ই মারা যায়। একদিন আমি স্বপ্নে দেখলাম, এক আগন্তুক ব্যক্তি আমাকে বললো, হে উম্মুল মুমিনীন! এটা শুনে আমি ঘাবড়ে গেলাম। আমি এর তাবির করলাম, অবশ্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বিবাহ করবেন।
উম্মে হাবীবা (রা.) বলেন- আমি ইদ্দত পালন শেষ করেছি মাত্র; আমার ধারণাও ছিল না। একদিন হাবশার বাদশাহ নাজ্জাশীর একজন দূত, যার নাম ছিল আবরাহা, সে আমার কাছে এলো। বললো, নাজ্জাশী বলেছেন, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে লিখেছেন যে, তুমি উম্মে হাবীবাকে আমার সাথে বিবাহের ব্যবস্থা করে দাও।
হযরত উম্মে হাবীবা (রা.) বলেন- আমি তাকে বললাম, আল্লাহ তোমাকে কল্যাণের সুসংবাদ দিন। দূত বললো, আপনি আপনার ওকীল বা প্রতিনিধি বাদশাহর কাছে প্রেরণ করুন, যিনি আপনাদের বিবাহ সম্পন্ন করবেন। উম্মে হাবীবা বলেন- আমি খালিদ ইবনে সাঈদ (রা.)-এর কাছে লোক পাঠিয়ে তাঁকে ডাকালাম। তাঁকে আমার প্রতিনিধি করে পাঠালাম। আমি দূতকে আনন্দচিত্তে দুটো চিরুনি, দুটো নূপুর এবং কয়েকটি আংটি উপহার দিলাম। সন্ধ্যার সময় নাজ্জাশী বাদশাহ জাফর ইবনে আবু তালিব (রা.) কে এবং সব মুসলমানকে ডেকে একত্রিত করেন এবং বিবাহের খুতবা প্রদান করেন। খুতবায় তিনি বলেন-
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য যিনি মালিক। যিনি পবিত্র। শান্তি ও নিরাপত্তা দানকারী। যিনি মহাপ্রতাপশালী। যিনি সর্বশক্তিমান। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসূল। তিনি ঐ মহামানব যার আগমনের সংবাদ দিয়েছেন হযরত ঈসা (আ.)।
যাক, যে কাজের জন্য তিনি আমাকে বলেছেন, আমি তা সম্পাদন করতে সচেষ্ট হয়েছি। আমি উম্মে হাবীবা (রা.) কে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিবাহ সম্পন্ন করে দিচ্ছি। আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি বরকত নাযিল করুন।
তারপর নাজ্জাশী বাদশাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ থেকে মহর বাবত চারশ' দিনার পরিশোধ করে দেন। এ টাকা হযরত খালিদের হাতে সোপর্দ করেন। মজলিসের সবাই বিদায় নেয়ার জন্য প্রস্তুত হলে নাজ্জাশী বলেন- আপনারা বসুন। নবীদের সুন্নত হলো, বিবাহে উপস্থিত লোকদেরকে খাবার পরিবেশন করা। তারপর সবাই খাওয়া- দাওয়া সেরে বিদায় নিলেন।
উম্মে হাবীবা বলেন- আমার হাতে যখন মহরের টাকা আসলো, আমি ভাবলাম যে, ঐ দূতকে কিছু দেব। কিন্তু সে বললো, বাদশাহ আমাকে কসম দিয়ে বলেছেন যেন আপনার থেকে কিছু না নেই। তারপর উম্মে হাবীবা (রা.)-এর দেয়া প্রথম হাদীয়াগুলোও সে ফেরত দিল। সে বললো- আমিও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ধর্ম ইসলাম গ্রহণ করেছি। আমি আল্লাহকে পাওয়ার জন্য ইসলাম গ্রহণ করেছি।
শহরের মহিলারা বিভিন্ন ধরনের পারফিউম এবং উপহার উপঢৌকন নিয়ে আসতে থাকেন। ঐ দূত বললো, আপনার সাথে আমার একটা জরুরি কথা আছে। তা হলো, নবীজীকে আমার সালাম বলবেন, তাঁকে সংবাদ দেবেন যে, আমি তাঁর দীন গ্রহণ করে নিয়েছি।
উম্মে হাবীবা (রা.) বলেন- ঐ দূত আমার সাথে দয়ার্দ্র আচরণ করেছে। আমাকে বিদায় জানিয়েছে। উপহার সামগ্রী পেশ করেছে। বারবার আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যেন তার কথা নবীজীকে অবহিত করি। ভুলে না যাই।
হযরত উম্মে হাবীবা (রা.) বলেন- আমি যখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে হাজির হই এবং বাগদান ও বিবাহের ঘটনা শুনালাম, আবরাহা নাম্নী দূতের ব্যাপারটি শুনে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দিলেন। আমি নবীজীকে তার সালাম পৌঁছালাম। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- আল্লাহ তাআলা তার প্রতি শান্তি রহমত ও বরকত নাযিল করুন। [হাকিম, ইবনে সাদ, আল বিদায়াহ: ৪: ১৪৩, হায়াতুস্ সাহাবা: ২: ৭৭৩]
📄 হযরত আয়েশা (রা.)-এর কাজে নবীজীর হাসি
হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, আমি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে হারীরা নামক এক ধরনের হালুয়া পেশ করলাম। যা আমি তাঁর জন্য রেঁধে ছিলাম। আমি হযরত সওদা (রা.) কে ডাকলাম। নবীজী আমার এবং তার মাঝখানে বসলেন। তিনি সওদা (রা.) কে বললেন, খাও। সওদা অস্বীকার করলেন। আমি বললাম, আপনাকে অবশ্যই খেতে হবে। যদি না খান তাহলে আমি এই হালুয়া আপনার চেহারায় লেপে দেব। তারপরও হযরত সওদা খেতে চাইলেন না। তখন আমি হাতে হালুয়া নিয়ে তার চেহারায় লেপে দিলাম। এটা দেখে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসতে থাকেন এবং আয়েশা (রা.)-এর হাত ধরে ফেলেন। [আবু ইয়ালা, হায়াতুস্ সাহাবা: ২: ২৯৯]
📄 হযরত সাওদা (রা.)-এর কাজে নবীজীর হাসি
হযরত সাওদা (রা.) বলেন, একবার হযরত আয়েশা (রা.) আমার চেহারায় হালুয়া লেপে দিয়েছিলেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- তুমিও আয়েশার চেহারায় লেপে দাও। আমি হালুয়া নিয়ে আয়েশা (রা.)-এর চেহারায় লেপে দিলাম। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দিলেন। তখনই হযরত উমর (রা.) পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- হে আবদুল্লাহ! হে আবদুল্লাহ! তিনি মনে করেছিলেন, উমর হয়তো ভিতরে চলে আসতে পারে। নবীজী বলেন- তোমরা গিয়ে মুখ ধুয়ে নাও। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, আমি সব সময়ই উমরের ব্যাপারে ভয়ে থাকি। কেননা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও উমর (রা.)-এর ভীতিজনক ব্যক্তিত্বের খেয়াল রাখতেন।