📄 আবু বকরের দিকে তাকিয়ে নবীজীর হাসি
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন- নবীজীর মজলিসে হযরত আবু বকর (রা.)-এর বিশেষ একটি সিট ছিল যা তিনি কখনও ছাড়তেন না। তবে আব্বাস (রা.) এলে তাঁর জন্য এটা ছেড়ে দিতেন। এতে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব খুশি হতেন। একদিন হযরত আব্বাস (রা.) আগমন করলে হযরত আবু বকর (রা.) তাঁর সিট ছেড়ে দেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন- তুমি তোমার জায়গা ছেড়ে দিলে কেন?
তিনি বলেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার চাচা এসে গিয়েছেন। নবীজী চাচার দিকে তাকালেন, আবার আবু বকর (রা.)-এর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসেন এবং বলেন- তিনি আব্বাস, তিনি তো সাদা কাপড় পরিধান করে এসেছেন। তাঁর পর তাঁর ছেলে কালো কাপড় পরিধান করবে এবং বারজন হাবশী দাসের মালিক হবে।
হযরত জাফর (রা.) তাঁর দাদার সূত্রে বর্ণনা করেন, তাঁর দাদা বলেন- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মজলিসে বসতেন তখন তাঁর ডানে বসতেন আবু বকর (রা.), বামে বসতেন উমর (রা.), সামনে বসতেন উসমান (রা.)। হযরত উসমান (রা.) ছিলেন নবীজীর প্রাইভেট সেক্রেটারী। হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রা.) আগমন করলে আবু বকর (রা.) তার জায়গা ছেড়ে দিতেন। সেখানে আব্বাস (রা.) বসতেন।
মুমিন জননী হযরত আয়েশা (রা.) বলেন- একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদেরকে নিয়ে বসে আছেন। নবীজীর দু'পাশে আবু বকর ও উমর (রা.) বসেছেন। দেখা গেল সামনে থেকে হযরত আব্বাস (রা.) আসছেন। তাকে দেখে হযরত আবু বকর তার জায়গা থেকে সরে পড়েন এবং আব্বাস (রা.) আবু বকর (রা.) ও নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাঝখানে সামনেই বসে পড়েন। এটা দেখে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- বড়দের মর্যাদা বড়রাই দিতে জানে। (বুঝা গেল, সাহাবায়ে কেরام, নবীজীর পরিবার-পরিজনের, সৎকর্মশীলদের এবং উলামায়ে কেরামের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো উম্মতের জন্য অত্যাবশ্যকীয়।) [তাবারানী, ইবনে আসাকির, কানযুল উম্মাল : ৫ : ২১৪, হায়াতুস্ সাহাবা ২ : ৫২১]
📄 হযরত আনাস (রা.)কে তাকিয়ে থাকতে দেখে নবীজীর হাসি
হযরত আনাস (রা.) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে সবার চেয়ে উত্তম ছিলেন। একদিন তিনি আমাকে কোন কাজের জন্য পাঠান। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি যাব না। কিন্তু মনে মনে ছিল যে, আমি যাব। আমি বের হলাম। আমি কয়েকজন ছেলের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলাম। তারা বাজারে খেলাধুলা করছিল। ঠিক তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেছন থেকে আমার মাথার পেছনের অংশ ধরলেন। হযরত আনাস (রা.) বলেন, আমি তাঁর দিকে তাকালাম। দেখি, তিনি হাসছেন। তিনি বলেন- হে আনাস! আমি তোমাকে যেখানে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলাম সেখানে কি গিয়েছিলে? আমি বললাম, জি হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! এখন যাচ্ছি।
হযরত আনাস (রা.) বলেন- আমি নয় বছর নবীজীর খেদমত করেছি। কোনদিন তিনি আমাকে এ কথা বলেননি যে, তুমি এটা করলে কেন? বা করলে না কেন?
মুসলিমের এক বর্ণনায় এসেছে, হযরত আনাস (রা.) বলেন- আমি দশ বছর নবীজীর খেদমতে ছিলাম। তিনি আমার কার্যকলাপে কখনও 'উহ্!' শব্দটিও উচ্চারণ করেননি। আমাকে কখনও গালমন্দ করেননি। যদি পরিবারের অন্য কেউ কিছু বলতে চাইতো তখন তিনি বলতেন- তাকে ছাড়। কেননা তাকদীরে এমন হওয়ার যদি হতো, তাহলে হয়ে যেতো।
হযরত আনাস (রা.) বলেন- আমি কয়েক বছর নবীজীর খেদমত করেছি। তিনি কখনও আমাকে মন্দ বলেননি, কখনও তিনি আমাকে মারধর করেননি। না কখনও ধমক দিয়েছেন, না কখনও রুষ্ট হয়েছেন। কখনও তিনি আমার অলসতার জন্য গালমন্দ করেননি।
হযরত আনাস (রা.) বলেন- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় শুভাগমন করেন তখন আমার বয়স আট বছর। আমার মা আমাকে নিয়ে তাঁর দরবারে উপস্থিত হন। আমার মা নবীজীকে বলেন- হে আল্লাহর রাসূল! আনসার পুরুষ নারী সবাই যার যার সাধ্যমত আপনার জন্য উপহার উপঢৌকন পেশ করেছে। আমার কাছে কিছুই নেই যে, আমি আপনাকে উপহার হিসেবে পেশ করবো। কিন্তু আমার শুধু এই ছেলেটিই আছে। আপনি একে গ্রহণ করুন। সে আপনার খেদমত ও সেবা-শুশ্রূষা করবে।
আনাস (রা.) বলেন- আমি দশ বছর নবীজীর খেদমত করেছি। তিনি আমাকে মারেনওনি, গালিও দেননি এবং রুষ্টও হননি। [বুখারী, মুসলিম, ইবনে সা'দ, আবু নাঈম, ইবনে আসাকির, কানযুল উম্মাল: ৭: ৯, হায়াতুস্ সাহাবা: ২: ৬৩৫]
📄 আবদুল্লাহ ইবনে উবাই মুনাফিকের জানাযার সময় নবীজীর হাসি
হযরত উমর (রা.) বলেন- মুনাফিকদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই-এর যখন মৃত্যু হয়, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানাযা পড়ানোর জন্য ডাকা হয়। নবীজী তার জানাযা পড়ানোর জন্য গেলেন এবং তার পাশে দাঁড়ালেন। যখন জানাযা পড়ানোর জন্য তৈরি হলেন, তখন আমি নবীজীর বুক মোবারক বরাবর গিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। আমি আবেদন করলাম- হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আল্লাহর দুশমনের জানাযা পড়াবেন? আপনি কি আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের জানাযা পড়াবেন? যে অমুক অমুক দিন অমুক অমুক কথা বলেছে। আমি তার ইসলামের প্রতি শত্রুতার ইতিবৃত্ত গোনে গোনে বলতে লাগলাম। হযরত উমর (রা.) বলেন- নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হাসছিলেন। আমি যখন এভাবে অনেক কিছু বলে ফেললাম, তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- উমর! তুমি সরে যাও। আমাকে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
إِنْ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ أَوْلَا تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ
যদি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন বা না করেন।
সুতরাং আমি আমার স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রয়েছি। হযরত উমর (রা.) বলেন- এরপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জানাযা পড়ান। জানাযার পর তার লাশের পেছনে পেছনে কবরের দিকে চলেন। তার দাফন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সাথে থাকেন।
হযরত উমর (রা.) বলেন- আমি আমার এ দুঃসাহসিক কাজের ব্যাপারে নিজেই নিজের উপর আশ্চর্যবোধ করলাম। কেননা, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলই তো বেশি জানেন। (তারপরও আমি এ দুঃসাহস কেন দেখালাম!) হযরত উমর (রা.) বলেন- অল্প কিছুক্ষণ পর নিম্নের দুটো আয়াত অবতীর্ণ হয়-
وَلَا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِّنْهُمْ مَاتَ أَبَدًا وَلَا تَقُمْ عَلَى قَبْرِهِ إِنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَمَاتُوا وَهُمْ فَسِقُونَ
وَلَا تُعْجِبُكَ أَمْوَالُهُمْ وَأَوْلَادُهُمْ إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ أَنْ تُعَذِّبَهُمْ بِهَا فِي الدُّنْيَا وَتَزْهَقَ أَنْفُسَهُمْ وَهُمْ كْفِرُونَ
তাদের কেউ যদি মারা যায় আপনি তার জানাযা পড়াবেন না এবং কাফনের জন্য তার কবরের পাশেও দাঁড়াবেন না। কেননা তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে কুফরী করেছে এবং কুফর অবস্থাতেই মারা যায়।
তাদের ধন-সম্পদ ও ছেলে সন্তান আপনাদের যেন আশ্চর্যের মধ্যে ফেলে না দেয়। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে দুনিয়াতে শাস্তি দিতে চান এবং চান যেন তারা কাফের অবস্থায়ই মারা যায়। [সূরা- তওবা]
এরপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আজীবন আর কোন মুনাফিকের জানাযায় অংশ গ্রহণ করেননি। [বুখারী, তিরিমিযী, আহমদ, হায়াতুস সাহাবা: ২: ৬৪৫]
📄 হযরত সা’দ (রা.)-এর তীর চালনা দেখে নবীজীর হাসি
হযরত আমির ইবনে সা'দ (রা.) বলেন- আমার পিতা হযরত সা'দ (রা.) বলেন- আমি খন্দকের যুদ্ধের দিন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এত হাসতে দেখেছি যে, তাঁর মাড়ির দাঁতগুলো দেখা যাচ্ছিল। বর্ণনাকারী বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এটা কীভাবে হলো?
হযরত আমির (রা.) জবাবে বলেন- এক ব্যক্তির কাছে ঢাল ছিল। আর সাদ (রা.) তো তীর চালনায় অভিজ্ঞ ছিলেন। ঐ ব্যক্তিটি তার ঢাল এদিক ওদিক ঘুরাচ্ছিল এবং তার কপালকে হেফাজত করতে সচেষ্ট ছিল। সাদ (রা.) তার জন্য তীর বের করলেন। যখন লোকটি তার মাথা উঁচু করলো, সাথে সাথে সা; (রা.) তার দিকে তীর ছুঁড়ে মারেন। তীর লোকটির কপাল ভুল করেনি। ফলে সে লুটিয়ে পড়লো এবং তার পা উপরের দিকে উঠে গেল। তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসতে থাকেন। এত হাসলেন যে, তাঁর মাড়ির দাঁত পর্যন্ত দেখা গিয়েছিল। আমি সাদ (রা.) কে জিজ্ঞেস করলাম, নবীজী কি কারণে হেসেছিলেন? হযরত আমির বলেন- লোকটির সাথে হযরত সাদ (রা.)-এর ঐ আচরণে নবীজী হাসছিলেন। [তিরমিযী- শামাইল অধ্যায়, হায়াতুস সাহাবা: ২: ৭৪৪]