📄 হযরত আবু বকর ও উমর (রা.)কে দেখে নবীজীর হাসি
হযরত আনাস (রা.) বলেন- নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুহাজির ও আনসার সাহাবাদের মধ্যে আবু বকর ও উমর (রা.)ও বসা থাকতেন। নবীজী আগমন করলে এ দু'জন ছাড়া আর কেউ তাঁর দিকে চোখ তুলে তাকাতেন না। এঁরা দু'জন নবীজীকে দেখতেন আর নবীজীও তাঁদেরকে দেখতেন। তাঁরা নবীজীকে দেখে হাসতেন। নবীজীও তাঁদেরকে দেখে মুচকি হাসি দিতেন।
হযরত বারা ইবনে আযিব (রা.) বলেন- আমরা নবীজীর মজলিসে এমনভাবে চুপচাপ বসে থাকতাম যেন আমাদের মাথায় পাখি বসে আছে, আর নড়লেই তা উড়ে যাবে। কেউ কোন কথা বলছে না। তখন হঠাৎ কিছু লোক নবীজীর কাছে আসলো। তারা জিজ্ঞেস করলো- আল্লাহ তাআলার কাছে সবচেয়ে প্রিয় বান্দা কে?
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- যে উত্তম চরিত্রের অধিকারী। [হাকীম, তিরমিযী, তাবারানী, ইবনে হিব্বান, আবু ইয়ালা, শিফা লিল কাযী ইয়াজ, তরজুমানুস সুন্নাহ, কানযুল উম্মাল ৭: ১১১, হায়াতুস সাহাবা: ২: ৩৬৪]
📄 হযরত সাফিনার কাজে নবীজীর হাসি
হযরত সাফিনাহ (রা.) বর্ণনা করেন, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার সিঙা লাগিয়ে বিষাক্ত রক্ত বের করালেন। সেটা আমাকে দিয়ে বললেন- এটা এমন জায়গায় মাটিচাপা দিয়ে দাও যেন কোন প্রাণী এর নাগাল না পায়। আমি নবীজীর থেকে সরে আড়াল হয়েই তা পান করে ফেললাম। পরে নবীজীকে ঘটনাটি বললে তিনি শুনে হেসে দিলেন।
হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বর্ণনা করেন- তাঁর পিতা মালিক ইবনে সিনান (রা.) ওহুদের যুদ্ধে যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহত হন এবং চেহারা থেকে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল তখন তিনি তাঁর রক্ত চুষতে ছিলেন। আর গিলে খাচ্ছিলেন।
তাঁকে বলা হলো, আপনি নবীজীর রক্ত চুষছেন? তিনি বলেন- হ্যাঁ, আমি হুযুরের রক্ত পান করছি। এটা শুনে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার রক্ত তার রক্তের সাথে মিশে গিয়েছে। এখন আর জাহান্নামের আগুন তার গায়ে লাগবে না। [তাবারানী, মাজমাউয যাওয়াইদ লিল হায়ছামী, হায়াতুস্ সাহাবা: ২ : ২৬৭]
📄 হযরত আবদুল্লাহর কাজে নবীজীর হাসি
হযরত উমর (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে আবদুল্লাহ নামে এক ব্যক্তি ছিল। লোকেরা তাকে গাধা বলতো। সে নবীজীকে পেলে হাসাত। মদ পান করার অপরাধে নবীজী তাকে বেত্রাঘাতও করেন। একদিন তাকে নবীজীর দরবারে মদপান করার অপরাধে হাজির করা হলো। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বেত্রাঘাত করার নির্দেশ দেন। এক ব্যক্তি বললো, হে আল্লাহ! তার প্রতি অভিশাপ নাযিল কর। তাকে বারবার একই অপরাধে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। (শাস্তি ভোগ করছে অথচ মদ ছাড়ছে না।)
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- তার প্রতি অভিশাপ দিও না। আল্লাহর কসম! তুমি জান না, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে বন্ধু মনে করে।
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, গাধা নামে প্রসিদ্ধ এক ব্যক্তি ছিল। সে নবীজীর জন্য ঘি এবং মধু পাত্র ভরে এনে হাদিয়া হিসেবে পেশ করতো। ঘি এবং মধু বিক্রেতা তার কাছে যখন এর মূল্য দাবী করতো তখন সে বিক্রেতাকে নিয়ে নবীজীর দরবারে হাজির হয়ে নবীজীকে বলতো- হে আল্লাহর রাসূল! তাকে তার পণ্যের মূল্য পরিশোধ করে দিন। তার এ কাজ দেখে নবীজী হাসতেন এবং এর মূল্য পরিশোধ করে দেয়া হতো। একদিন মদ পান করার অভিযোগে তাকে নবীজীর দরবারে হাজির করা হলো। এক ব্যক্তি বলে উঠলো- আল্লাহ তার প্রতি অভিশাপ করুন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- এমন বলো না। সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে। [বুখারী, ইবনে জবীর, বাইহাকী, আবু ইয়ালা, কানযুল উম্মাল: ৩ ১০৭, হায়াতুস্ সাহাবা: ২: ৪৭৯]
📄 আবু বকরের দিকে তাকিয়ে নবীজীর হাসি
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন- নবীজীর মজলিসে হযরত আবু বকর (রা.)-এর বিশেষ একটি সিট ছিল যা তিনি কখনও ছাড়তেন না। তবে আব্বাস (রা.) এলে তাঁর জন্য এটা ছেড়ে দিতেন। এতে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব খুশি হতেন। একদিন হযরত আব্বাস (রা.) আগমন করলে হযরত আবু বকর (রা.) তাঁর সিট ছেড়ে দেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন- তুমি তোমার জায়গা ছেড়ে দিলে কেন?
তিনি বলেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার চাচা এসে গিয়েছেন। নবীজী চাচার দিকে তাকালেন, আবার আবু বকর (রা.)-এর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসেন এবং বলেন- তিনি আব্বাস, তিনি তো সাদা কাপড় পরিধান করে এসেছেন। তাঁর পর তাঁর ছেলে কালো কাপড় পরিধান করবে এবং বারজন হাবশী দাসের মালিক হবে।
হযরত জাফর (রা.) তাঁর দাদার সূত্রে বর্ণনা করেন, তাঁর দাদা বলেন- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মজলিসে বসতেন তখন তাঁর ডানে বসতেন আবু বকর (রা.), বামে বসতেন উমর (রা.), সামনে বসতেন উসমান (রা.)। হযরত উসমান (রা.) ছিলেন নবীজীর প্রাইভেট সেক্রেটারী। হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রা.) আগমন করলে আবু বকর (রা.) তার জায়গা ছেড়ে দিতেন। সেখানে আব্বাস (রা.) বসতেন।
মুমিন জননী হযরত আয়েশা (রা.) বলেন- একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদেরকে নিয়ে বসে আছেন। নবীজীর দু'পাশে আবু বকর ও উমর (রা.) বসেছেন। দেখা গেল সামনে থেকে হযরত আব্বাস (রা.) আসছেন। তাকে দেখে হযরত আবু বকর তার জায়গা থেকে সরে পড়েন এবং আব্বাস (রা.) আবু বকর (রা.) ও নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাঝখানে সামনেই বসে পড়েন। এটা দেখে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- বড়দের মর্যাদা বড়রাই দিতে জানে। (বুঝা গেল, সাহাবায়ে কেরام, নবীজীর পরিবার-পরিজনের, সৎকর্মশীলদের এবং উলামায়ে কেরামের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো উম্মতের জন্য অত্যাবশ্যকীয়।) [তাবারানী, ইবনে আসাকির, কানযুল উম্মাল : ৫ : ২১৪, হায়াতুস্ সাহাবা ২ : ৫২১]