📄 নেতৃত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোতে নবীজীর হাসি
হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রা.) কে খরমুদাত পাহাড়ে গভর্নর নিয়োগ করেন। তিনি নবীজীর কাছে আসলে তাঁকে জিজ্ঞেস করেন গভর্নরীর কী অবস্থা?
হযরত মিকদাদ (রা.) বলেন- আমি দেখলাম লোকেরা আমাকে উচ্চৈ স্থান দেয়, প্রত্যেক কাজে আমাকে আগে বাড়িয়ে দেয়। এমনকি আমার ধারণা জন্মে যায় যে, আমি তো আর সেই মিকদাদ নেই। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- নেতৃত্ব এমনই। হযরত মিকদাদ (রা.) বলেন- ঐ সত্তার শপথ যিনি আপনাকে সত্য সহকারে প্রেরণ করেছেন, আমি আর কখনও নেতৃত্ব গ্রহণ করবো না, গভর্নর হবো না। লোকেরা যখন বলতো, আপনি সামনে যান, আমাদেরকে নামায পড়ান, তিনি তা প্রত্যাখ্যান করতেন। তাবারানীর বর্ণনায় এসেছে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে কোন এক যুদ্ধে আমীর বানিয়ে প্রেরণ করেন। (সম্ভবত তিনি মিকদাদ রা.ই ছিলেন)। যখন তিনি ফিরে আসেন তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করেন, নেতৃত্বকে কেমন দেখলে? তিনি বলেন, আমি জাতিরই একজন। অথচ যখন আমি কোন দিকে যেতে উদ্যত হতাম জাতিও আমার সাথে সাথে চলার জন্য তেরি হতো। আর আমি থেমে গেলে তারা থেমে যেতো।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- রাজা-বাদশাহ এবং নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা লোকদের নিন্দার শিকার থাকে। কিন্তু তারা ছাড়া যাদেরকে আল্লাহ তাআলা হেফাজত করেন। এটা শুনে তিনি বলেন- আল্লাহর কসম! আমি আর কখনও আপনারও গভর্নর হবো না এবং অন্য কারও গভর্নর হবো না।
এটা শুনে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসলেন। এমনকি তাঁর মাড়ির দাঁত দেখা যাচ্ছিল।
রাফে বলেন- আমি এক সফরে আবু বকরের সাথে ছিলাম। আলাদা হওয়ার সময় আমি তাঁকে বললাম, আমাকে উপদেশ দিন।
তিনি বলেন- নামায সময়মত আদায় করো। আত্মপ্রশান্তির সাথে যাকাত দাও। রমযান মাসের রোযা রাখ। হজ করো। হিজরত আর জিহাদ অনেক দামী জিনিস। কিন্তু তুমি কারও নেতা বা আমীর হয়ো না। আমীরের হিসাব-কিতাব কঠিন হবে। শাস্তিও হবে কঠিন। আর যে আমীর নয়, তার হিসাব হবে সহজ। [বায্যার, কিতাবুযু যুহদ ও হায়াতুস্ সাহাবা: ২: ৬০]
📄 এক আনসার সাহাবীর কথায় নবীজীর হাসি
হযরত উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে উপস্থিত হলো এবং তার কাছে কিছু চাইলো। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার কাছে তো কিছু নেই, আমি তোমাকে কী দেব! বরং তুমি আমার নামে কোন কিছু কিনে নিয়ে যাও। আমার হাতে যখন টাকা আসবে তখন আমি পরিশোধ করে দেব।
এটা শুনে হযরত উমর (রা.) বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি তাকে দিয়েছেন। কিন্তু যা আপনার হাতে নেই, আল্লাহ তাআলা তার দায়িত্ব আপনাকে দেননি।
উমর (রা.)-এর কথা নবীজীর ভালো লাগলো না। এক আনসার ব্যক্তি বললেন- হে আল্লাহর রাসূল! আপনি খরচ করুন এবং আরশের মালিকের পক্ষ থেকে কোন সংকীর্ণতার ভয় করবেন না। এটা শুনে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দিলেন। তাঁর পবিত্র উজ্জ্বল চেহারায় মুচকি হাসির ঝলক ফুটে উঠলো। তাঁর কথা হলো, তাঁকে এ কাজেরই নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এক বর্ণনায় এসেছে, হযরত জাবির (রা.) বলেন- এক ব্যক্তি হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে উপস্থিত হলো এবং কিছু চাইল। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দিলেন। তখনই আরেক ব্যক্তি আসলো। সেও কিছু চাইলো। তিনি তার সাথে ওয়াদা করে ফেললেন। এটা দেখে হযরত উমর (রা.) দাঁড়িয়ে গেলেন। বললেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার কাছে একজন চাইলো। আপনি দিলেন। আরেকজন চাইলো। আপনি দিলেন। তৃতীয় আরেকজন চাইলো। আপনি তার সাথে ওয়াদা করে ফেললেন।
উমরের কথাটি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভালো লাগলো না। আবদুল্লাহ ইবনে হুযাইফা সাহমী দাঁড়িয়ে বললেন- হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি খরচ করুন এবং আরশের মালিকের পক্ষ থেকে মুখপেক্ষিতার ভয় করবেন না। এটা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কর্মনীতি।
একবার হযরত বেলাল (রা.) কে বলেন- হে বেলাল! খরচ কর, আরশের মালিকের পক্ষ থেকে সংকীর্ণতার ভয় করো না।
হযরত আনাস (রা.) বলেন- হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে তিনটা পাখি হাদীয়া হিসেবে আসলো। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটা পাখি খাদেমার কাছে দিলেন। সে দ্বিতীয় দিন ঐ পাখিটি খাবারের সাথে নবীজীর সামনে হাজির করলো। তিনি বলেন- আমি কি তোমাকে কোন জিনিস আগামীকালের জন্য রেখে দিতে নিষেধ করিনি? আল্লাহ তাআলা প্রতিদিন আমার কাছে জীবিকা প্রেরণ করেন। [তিরমিযী, ইবনে জরীর, বায্যার, তাবারানী, আবু নায়ীম, আবু ইয়ালা ও হায়াতুস্ সাহাবা ২: ১৬৩]
📄 হাকীম ইবনে হায্যয়ানের কবিতা শুনে নবীজীর হাসি
হযরত উরওয়া (রা.) বলেন, হাকীম ইবনে হাযযাম ইয়ামন গেলেন। ফেরার সময় সেখান থেকে খুব দামি শাহী পোশাক কিনে আনলেন। ইসলাম গ্রহণ করার আগে তিনি মদীনায় গিয়ে নবীজীকে এ পোশাকটি উপহার হিসেবে পেশ করেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটা ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, আমরা মুশরিকের উপহার গ্রহণ করি না। ফলে হাকীম ইবনে হাযযাম পোশাকটি বিক্রি করতে গেলেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটা ক্রয় করার নির্দেশ দিলেন। কিনে আনার পর সেটা পরিধান করে মসজিদে গমন করেন। হাকীম বলেন- আমি কখনও তাঁর চেয়ে এত সুন্দর আর কাউকে দেখিনি। মনে হচ্ছিল যেন পূর্ণিমার চাঁদ। আমি যখন তাঁকে এ পোশাকে দেখলাম তখন আমি আমাকে হারিয়ে ফেলি। আমার অজান্তেই আমার মুখ থেকে বেরিয়ে পড়লো-
مَا تَنْظُرُ الْحُكَّامُ بِالْحُكْمِ بَعْدَهَا * بَدَا وَاضِعُ ذُوغَرَّةٍ وَحَجُولٍ
إِذَا وَاضَعُوهُ الْمَسْجِدَ رَبِّي عَلَيْهِمْ بِمُتَفَرِّعْ مَاءِ الذُّبَابِ سَخِيلٍ
“নির্দেশ দানকারী এরপর কী নির্দেশ দেবেন যখন এমন ঔজ্জ্বল্য প্রকাশ পেয়েছে, যাঁর কপাল হাত-পা সবই চমকাচ্ছে। যখন তাঁকে গভীর দৃষ্টিতে দেখা হয়, তাঁর ব্যক্তিত্ব, ভদ্রতা মানুষকে আরও প্রভাবিত করে। (মনে হয় যেন) স্বচ্ছ পরিষ্কার প্রবাহমান পানি তার উপর ঢেলে দেয়া হয়েছে।”
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, নবীজী পোশাকটি নিজেই তার কাছ থেকে কিনে নিয়েছিলেন। কিছুদিন পর হযরত উসামা (রা.) কে সেটা দিয়ে দেন। [ইবনে জরীর, হাকীম, কানযুল উম্মাল ৩: ১৭৭, হায়াতুস সাহাবা: ২: ২৭৫]
📄 আনসার সাহাবীদের একত্রিত হওয়া দেখে নবীজীর হাসি
হযরত আমর ইবনে আওফ আনসারী (রা.) থেকে বর্ণিত, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহকে বাহরাইন প্রেরণ করেন যেন তিনি সেখান থেকে জিযিয়া বা অমুসলিমদের উপর আরোপিত কর উসুল করে আনেন। তিনি সেখান থেকে জিযিয়া উসুল করে আনেন। যখন আনসার সাহাবীগণ জানতে পারলেন যে, আবু উবাইদা (রা.) এসেছেন, তখন তারা সবাই নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ফজরের নামায পড়ে তাঁর সামনে বসলেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে দেখে হেসে দিলেন। তারপর বলেন, আমার মনে হয়, তোমরা খবর পেয়েছ যে, আবু উবায়দা বাহরাইন থেকে কিছু নিয়ে এসেছেন। সাহাবারা জবাব দিলেন- জি হ্যাঁ ইয়া রাসূলাল্লাহ!
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদেরকে সুসংবাদ দিচ্ছি, তোমরা এমন ব্যাপারে আশান্বিত থাক যা তোমাদেরকে খুশি করে দেবে। আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের ব্যাপারে দরিদ্রতার ভয় করি না। বরং তোমাদের সামনে দুনিয়া প্রসারিত হওয়ার ব্যাপারে আমি ভীত। তোমাদের পূর্বসুরীদের সামনে যেভাবে দুনিয়া প্রসারিত হয়ে গিয়েছিল। তোমরা ধীরে ধীরে দুনিয়ার মোহে পড়ে যাবে। তোমাদের পূর্বসুরীদের মতো। তারপর দুনিয়া তোমাদেরকে ধ্বংস করে দেবে। যেমন তোমাদের পূর্বসুরীদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। [বুখারী, মুসলিম, তারগীব ও হায়াতুস সাহাবা: ২: ২৯২]