📄 গভীর রাতে নবীজি ﷺ-এর সাথে
মাঝরাতে বা এর কিছু আগে অথবা পরে নবীজি ﷺ জেগে উঠতেন। তিনি উঠে বসতেন এবং ঘুমের রেশ কাটাতে হাত দিয়ে নিজের মুখ মুছতেন। তারপর মেসওয়াক দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করতেন। এরপর আকাশের দিকে তাকিয়ে গভীর রাতের নিস্তব্ধ প্রকৃতির মাঝে মহান রবের সৃষ্টি-নৈপুণ্য নিয়ে ভাবনায় মগ্ন হতেন। এ সময় তিনি কুরআন থেকে নিচের অংশটুকু তিলাওয়াত করতেন :
إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمٰوٰتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيٰتٍ لِّأُولِي الْأَلْبَابِ ، الَّذِيْنَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيَامًا وَّقُعُودًا وَّعَلٰى جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُوْنَ فِي خَلْقِ السَّمٰوٰتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هٰذَا بَاطِلًا سُبْحٰنَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ ، رَبَّنَا إِنَّكَ مَنْ تُدْخِلِ النَّارَ فَقَدْ أَخْزَيْتَهُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ ، رَبَّنَا إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُنَادِيْ لِلْإِيمَانِ أَنْ آمِنُوا بِرَبِّكُمْ فَآمَنَّا رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ ، رَبَّنَا وَآتِنَا مَا وَعَدْتَّنَا عَلٰى رُسُلِكَ وَلَا تُخْزِنَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ ، فَاسْتَجَابَ لَهُمْ رَبُّهُمْ أَنِّي لَا أُضِيْعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِّنْكُمْ مِّنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثٰى بَعْضُكُمْ مِّنْ بَعْضٍ فَالَّذِيْنَ هَاجَرُوا وَأُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ وَأُوذُوا فِي سَبِيلِي وَقَاتَلُوا وَقُتِلُوا لَأُكَفِّرَنَّ عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ وَلَأُدْخِلَنَّهُمْ جَنّٰتٍ تَجْرِيْ مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهٰرُ ثَوَابًا مِّنْ عِنْدِ اللَّهِ وَاللَّهُ عِنْدَهُ حُسْنُ الثَّوَابِ لَا يَغُرَّنَّكَ تَقَلُّبُ الَّذِيْنَ كَفَرُوا فِي الْبِلَادِ ، مَتَاعٌ قَلِيلٌ ثُمَّ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمِهَادُ ، لٰكِنِ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ لَهُمْ جَنّٰتٌ تَجْرِيْ مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا نُزُلًا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ وَمَا عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ لِلْأَبْرَارِ ، وَإِنَّ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَمَنْ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِمْ خَاشِعِينَ لِلَّهِ لَا يَشْتَرُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ ثَمَنًا قَلِيلًا أُولَئِكَ لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ إِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ ، يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
“নিশ্চয় আসমান ও যমীন সৃষ্টিতে এবং রাত্রি ও দিনের আবর্তনে বোধসম্পন্ন লোকদের জন্যে নিদর্শন রয়েছে। যাঁরা দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং চিন্তা-গবেষণা করে আসমান ও জমিন সৃষ্টির বিষয়ে। (তারা বলে) পরওয়ারদেগার, এসব তুমি অনর্থক সৃষ্টি করোনি। সকল পবিত্রতা তোমারই, আমাদের তুমি দোযখের শাস্তি থেকে বাঁচাও। হে আমাদের পালনকর্তা, নিশ্চয় তুমি যাকে দোযখে নিক্ষেপ করলে তাকে সব সময়ে অপমানিত করলে; আর জালেমদের জন্যে তো সাহায্যকারী নেই। হে আমাদের পালনকর্তা, আমরা নিশ্চিতরূপে শুনেছি একজন আহ্বানকারীকে ঈমানের প্রতি আহ্বান করতে যে, তোমাদের পালনকর্তার প্রতি ঈমান আনো; তাই আমরা ঈমান এনেছি। হে আমাদের পালনকর্তা, অতঃপর আমাদের সকল গোনাহ মাফ করো এবং আমাদের সকল দোষত্রুটি দূর করে দাও, আর আমাদের মৃত্যু দাও নেক লোকদের সাথে। হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের দাও, যা তুমি ওয়াদা করেছ তোমার রাসূলগণের মাধ্যমে এবং কিয়ামতের দিন আমাদের তুমি অপমানিত কোরো না। নিশ্চয় তুমি ওয়াদা খেলাফ করো না। অতঃপর তাদের পালনকর্তা তাদের দুআ (এই বলে) কবুল করে নিলেন যে, আমি তোমাদের কোনো পরিশ্রমকারীর পরিশ্রমই বিনষ্ট করি না, তা সে পুরুষ হোক কিংবা স্ত্রীলোক। তোমরা পরস্পর এক। তারপর সে সমস্ত লোক, যারা হিজরত করেছে, তাদের নিজেদের দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে এবং তাদের প্রতি উৎপীড়ন করা হয়েছে আমার পথে এবং যারা লড়াই করেছে ও মৃত্যুবরণ করেছে, অবশ্যই আমি তাদের ওপর থেকে অকল্যাণকে অপসারিত করব। এবং তাদের প্রবিষ্ট করব জান্নাতে, যার তলদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত। এই হলো বিনিময় আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর আল্লাহর নিকট রয়েছে উত্তম বিনিময়। নগরীতে কাফেরদের চাল- চলন যেন তোমাদের ধোঁকা না দেয়। এটা হলো সামান্য ফায়দা, এরপর তাদের ঠিকানা হবে দোযখ। আর সেটি হলো অতি নিকৃষ্ট অবস্থান। কিন্তু যারা ভয় করে নিজেদের পালনকর্তাকে, তাদের জন্যে রয়েছে জান্নাত, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে প্রস্রবণ। তাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে সদা আপ্যায়ন চলতে থাকবে। আর যা আল্লাহর নিকট রয়েছে, তা সৎকর্মশীলদের জন্যে একান্তই উত্তম। আর আহলে কিতাবদের মধ্যে কেউ কেউ এমনও রয়েছে, যারা আল্লাহর ওপর ঈমান আনে এবং যা কিছু তোমার ওপর অবতীর্ণ হয় আর যা কিছু তাদের ওপর অবতীর্ণ হয়েছে সেগুলোর ওপর, আল্লাহর সামনে বিনয়াবনত থাকে এবং আল্লাহর আয়াতসমূহকে স্বল্পমূল্যের বিনিময়ে সওদা করে না, তারাই হলো সে লোক, যাদের জন্য পারিশ্রমিক রয়েছে তাদের পালনকর্তার নিকট। নিশ্চয়ই আল্লাহ যথাশীঘ্র হিসাব চুকিয়ে দেন। হে ঈমানদারগণ, ধৈর্যধারণ করো এবং মোকাবিলার দৃঢ়তা অবলম্বন করো। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাকো, যাতে তোমরা তোমাদের উদ্দেশ্য লাভে সমর্থ হতে পার।” ১০৩
নবীজি এরপর বিছানা থেকে উঠে দেয়ালে ঝুলানো পানির মশকটি নিয়ে তা থেকে কিছু পানি অন্য একটি পাত্রে ঢালতেন। যথাসম্ভব কম পানি দিয়ে অতঃপর তিনি তাঁর উযু সম্পন্ন করতেন। এরপর তিনি তাঁর জুব্বা পরিধান করতেন এবং শোয়ার সময় কোমরের নিচের অংশ ঢাকার জন্য পরা কাপড়টি খুলে ফেলতেন। অতঃপর তিনি তাঁর রাতের নামায শুরু করতেন।
রাত্রিকালীন ইবাদাতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে তিনি মাঝে মাঝে সালাতের পূর্বে কিছু দুআ এবং যিকির করতেন। আয়িশা রা. বর্ণনা করেন, ঘুম থেকে ওঠার পর নবীজি এই যিকিরগুলো দশবার করে পড়তেন: اللهُ أَكْبَر আল্লাহু আকবার, অর্থাৎ, 'আল্লাহ মহান'; الْحَمْدُ لِلَّهِ, অর্থাৎ, 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর'; سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ অর্থ, 'আল্লাহ মহাপবিত্র, তিনি মহামহিম'; سُبْحَانَ الْمَلِكِ الْقُدُّوسِ অর্থাৎ, 'রাজাধিরাজ মহাপবিত্র আল্লাহ মহান'; أَسْتَغْفِرُ اللهَ অর্থাৎ, 'আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি'; لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ অর্থাৎ, 'আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই'। তারপর আরও দশবার বলতেন :
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ ضِيقِ الدُّنْيَا، وَضِيقِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ
'আমার রব, আমি দুনিয়ার সংকীর্ণতা এবং আখেরাতের কঠিন অবস্থা থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাই।' এরপর তিনি নামায শুরু করতেন। ১০৪
দুই রাকাত সংক্ষিপ্ত সালাত দিয়ে তিনি কিয়ামুল লাইল শুরু করতেন। জামাতের সালাতে ইমামতি করার সময় তিনি নামায সংক্ষেপে আদায় করলেও একাকী অন্য যেকোনো মানুষের তুলনায় তাঁর সালাত দীর্ঘতর হতো। এমনকি তিনি রাতের সালাতের কিয়াম, রুকু-সিজদাহ, দুআ—সবকিছুই দীর্ঘ সময় ধরে আদায় করতেন। আর তিনি এ রকমটা করতেন আল্লাহরই নির্দেশে,
قُمِ الَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًا
“রাত্রিতে দণ্ডায়মান হোন কিছু অংশ বাদ দিয়ে।” ১০৫
তাঁর সমস্ত আবেগ-অনুভূতি এবং মনোযোগ নামাযেই কেন্দ্রীভূত থাকত। রাতের সালাতে তিনি এতটাই নিমগ্ন হয়ে যেতেন যেন তাঁর আত্মা রবের কাছ থেকে আসা জ্যোতির খোঁজ পেতে সর্বোচ্চ সম্মানিত বান্দাদের কাতারে মিলিত হতো। মনে হতো যেন তিনি আরশে আযীমের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর রবের সাথে নিভৃত আলাপে রত। তিনি সবচেয়ে সুস্পষ্ট ও সুন্দর বিশেষণে স্বীয় রবের প্রশংসা করতেন। তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষাও ছিল অনন্য। মানুষ যা কিছু আল্লাহর কাছে চাইতে পারে নবীজি -এর দুআ ছিল নিঃসন্দেহে সেই সমস্ত কিছুর সারাংশ।
মেরাজের রাতে তাঁর জন্যই ঊর্ধ্বাকাশের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়েছিল। তিনি এত ওপরে পৌঁছে গিয়েছিলেন যে, তাকদীর লেখক ফেরেশতাদের কলমের খসখস আওয়াজ পর্যন্ত শুনতে পেয়েছিলেন।
রাসূল আল্লাহর পক্ষ থেকে সর্বোত্তম জ্ঞান, নিখুঁত ঈমান এবং সংশয়হীন অন্তঃকরণ লাভ করেছিলেন। তাঁর বলা কথাগুলো সন্দেহাতীতভাবে সত্য। তাঁর ভাষায়, “তোমাদের মধ্যে আমিই সবচেয়ে বেশি আল্লাহকে জানি এবং তাঁকে সর্বাধিক ভয় করি।”
তিনি এমন একজন বান্দার মতো সালাত শুরু করতেন যে কিনা তাঁর রবের প্রশংসা করে, তাঁকে ভালোবাসে এবং তাঁর সাথে মিলিত হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা অন্তরে লালন করে। তাঁর সালাতের শুরুতেই থাকত ভাবাবেগপূর্ণ শব্দাবলি দিয়ে রবের প্রশংসা বর্ণনা। যেমন:
اللَّهُمَّ رَبَّ جِبْرِيلَ وَمِيكَائِيلَ وَإِسْرَافِيلَ فَاطِرَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ عَالِمَ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ أَنْتَ تَحْكُمُ بَيْنَ عِبَادِكَ فِيمَا كَانُوا فِيهِ يَخْتَلِفُونَ، اهْدِنِي لِمَا اخْتُلِفَ فِيهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِكَ إِنَّكَ أَنْتَ تَهْدِي مَنْ تَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ
“হে আমার রব, জিবরাইল, মীকাঈল এবং ইস্রাফীলের রব! আসমান-যমীনের সৃষ্টিকর্তা! দৃশ্য-অদৃশ্য সবকিছু সম্পর্কেই তুমি সবিশেষ অবহিত। তোমার বান্দারা যে সকল বিষয় নিয়ে বিবাদ করে তুমিই তার মীমাংসাকারী। মানুষ যে সকল বিষয়ে মতানৈক্য করে সে সকল বিষয়ের সঠিক দিক-নির্দেশনা তুমি আমাকে দাও। নিশ্চয়ই যাকে চাও তাকেই তুমি সৎপথ প্রদর্শন করো।” ১০৬
সালাতের শুরুতে করা তাঁর আরও একটি দুআ নিম্নরূপ :
اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ، أَنْتَ نُورُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ، وَلَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ قَيَّامُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ، وَلَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ رَبُّ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَنْ فِيهِنَّ أَنْتَ الْحَقُّ وَقَوْلُكَ الْحَقُّ وَوَعْدُكَ الْحَقُّ وَلِقَاؤُكَ حَقٌّ وَالْجَنَّةُ حَقٌّ وَالنَّارُ حَقٌّ وَالسَّاعَةُ حَقٌّ، اللَّهُمَّ لَكَ أَسْلَمْتُ وَبِكَ آمَنْتُ وَعَلَيْكَ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْكَ أَنَبْتُ وَبِكَ خَاصَمْتُ وَإِلَيْكَ حَاكَمْتُ، فَاغْفِرْ لِي مَا قَدَّمْتُ وَأَخَّرْتُ وَأَسْرَرْتُ وَأَعْلَنْتُ، أَنْتَ إِلَهِي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ
“হে আমাদের রব, সকল প্রশংসা শুধুই তোমার। আসমান এবং যমীনের মাঝে যা কিছু আছে তুমিই সে সবকিছুর আলো! সকল প্রশংসা তোমারই জন্যে। তুমিই আসমান-যমীন এবং-এতদুভয়ের মধ্যে অবস্থিত সমস্ত কিছুর রাজাধিরাজ। যাবতীয় প্রশংসা তোমার জন্য নির্ধারিত। তোমার কালিমা সত্য! জান্নাত সত্য! জাহান্নাম সত্য! নবী-রাসূল সত্য! মুহাম্মদ সত্য এবং কেয়ামতও সত্য! হে আল্লাহ, আমি তোমারই কাছে আত্মসমর্পণ করি, তোমার ওপরই নির্ভর করি এবং তোমাকেই বিশ্বাস করি, তোমার কাছেই আমার প্রত্যাবর্তন, তোমার ব্যাপারেই আমরা বিতর্ক করি, তোমারই কাছে সিদ্ধান্তের জন্য ধরনা দিই। আমার পূর্বের এবং পরের গোনাহসমূহ মাফ করে দাও। মাফ করে দাও সেসব গুনাহ, যা আমি গোপনে কিংবা প্রকাশ্যে করেছি এবং যা তুমি আমার থেকে বেশি জানো। তুমিই এগিয়ে দাও, তুমিই পিছাও। তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।” ১০৭
অন্য একটি দুআ হচ্ছে,
وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا مُسْلِمًا وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ، إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ، لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ، اللَّهُمَّ أَنْتَ الْمَلِكُ لَا إِلَهَ إلَّا أَنْتَ، أَنْتَ رَبِّي وَأَنَا عَبْدُكَ، ظَلَمْتُ نَفْسِي وَاعْتَرَفْتُ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لي ذُنُوبِي جَمِيعًا إِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ، وَاهْدِنِي لِأَحْسَنِ الْأَخْلَاقِ لَا يَهْدِي لِأَحْسَنِهَا إِلَّا أَنْتَ، وَاصْرِفْ عَنِّي سَيِّئَهَا لَا يَصْرِفُ سَيِّئَهَا إِلَّا أَنْتَ، لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ وَالْخَيْرُ كُلُّهُ فِي يَدَيْكَ، وَالشَّرُّ لَيْسَ إِلَيْكَ أَنَا بِكَ وَإِلَيْكَ، تَبَارَكْتَ وَتَعَالَيْتَ، أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ
“আমার মুখ পরিপূর্ণ আন্তরিকতার সাথে সেই সত্তার দিকে ঘুরালাম, যিনি আসমান এবং যমীনকে অস্তিত্ব দিয়েছেন। যারা আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করে আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নই। আমার সালাত, আমার জীবন এবং আমার মৃত্যু একমাত্র রবের জন্যই, যিনি সারা জাহানের প্রভু। তাঁর কোনো শরীক নেই। আমাকে এই নির্দেশই দেয়া হয়েছে এবং আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত, যারা রবের কাছে আত্মসমর্পণ করে। হে আমার রব, তুমিই শাহানশাহ! তুমি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। তুমিই আমার মালিক এবং আমি তোমার গোলাম। আমি নিজের ওপর জুলুম করেছি এবং নিজের কৃত গোনাহসমূহ স্বীকার করছি। আমার সমস্ত গোনাহ মাফ করে দাও। তুমি ব্যতীত আর কারওই গুনাহ মাফের ক্ষমতা নেই। আমাকে সর্বোত্তম রীতিনীতির শিক্ষা দাও, তুমি ছাড়া যা আর কেউই শিক্ষা দান করতে পারে না। খারাপ অভ্যাসসমূহ থেকে তুমি আমাকে দূরে রাখো; কারণ, তুমি ছাড়া সেগুলো থেকে দূরে রাখার ক্ষমতা আর কারও নেই। আমি তোমাকেই ডাকি। তোমার হাতেই সমস্ত কল্যাণের চাবি, আর না কোনো অকল্যাণ তোমার নাগাল পায়। আমি তোমার জন্যই বাঁচি। তুমি পবিত্র, মহিমান্বিত। আমি তোমার কাছেই ক্ষমা চাইছি এবং তোমার কাছেই তাওবা করছি।” ১০৮
রাতের নামাযে নবীজি স্পষ্টভাবে এবং ধীরে ধীরে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। যখনই তিনি আল্লাহর অনুগ্রহ-সম্বলিত কোনো আয়াত তিলাওয়াত করতেন তখন তিনি আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ চেয়ে দুআ করতেন, শাস্তির আয়াত তিলাওয়াতের সময় রবের কাছে শাস্তি থেকে আশ্রয় চাইতেন, আর যখন আল্লাহর গুণগান-সম্বলিত কোনো আয়াত তিলাওয়াত করতেন তখন তিনি আল্লাহর গুণকীর্তন করতেন।
নবীজি -এর রাতের নামায ছিল অনেক দীর্ঘ। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বর্ণনা করেন, "আমি আল্লাহর রাসূলের সাথে এক রাতে সালাত আদায় করলাম। তিনি এত দীর্ঘ সালাত আদায় করেছিলেন যে, আর একটু হলেই আমি অপ্রীতিকর কিছু একটা করে ফেলতাম।”
লোকেরা জিজ্ঞেস করল, 'তিনি কী করতে চাইছিলেন?'
আব্দুল্লাহ রা. জবাব দিলেন, “আমি নামায ত্যাগ করে বসে থাকার চিন্তা করেছিলাম।” নবীজি স্বল্পসংখ্যক রাকাতে লম্বা সূরা দিয়ে নামায আদায় করতেন। তাঁর রাতের নামায কখনোই তের রাকাতের বেশি হয়নি। তিনি যতক্ষণ দাঁড়ানো অবস্থায় কাটাতেন, রুকুতেও প্রায় ততক্ষণই থাকতেন। রুকুতে নবীজি বলতেন:
اللَّهُمَّ لَكَ رَكَعْتُ وَبِكَ آمَنْتُ وَلَكَ أَسْلَمْتُ وَعَلَيْكَ تَوَكَّلْتُ أَنْتَ رَبِّي خَشَعَ لَكَ سَمْعِي وَبَصَرِي وَمُنِّي وَعِظَامِي وَعَصَبِي
“হে আমার রব, আমি তোমারই জন্য রুকু করছি এবং তোমাতেই বিশ্বাস স্থাপন করছি; একমাত্র তোমার কাছেই আত্মসমর্পণ করছি এবং শুধু তোমারই ওপর নির্ভর করি। তুমিই আমার রব! আমার কান, আমার চোখ, আমার মস্তিষ্ক, আমার হাড়, আমার স্নায়ু তোমার ভয়ে শ্রদ্ধায় অবনত।” ১০৯
জীবনসায়াহ্নে এসে নবীজি প্রায়ই তাঁর রুকু-সিজদায় পড়তেন :
سُبْحَانَكَ اللهُمَّ رَبَّنَا وَبِحَمْدِكَ، اللهُمَّ اغْفِرْ لِي
“হে আল্লাহ, আমাদের প্রভু, তোমার পূতপবিত্রতা ঘোষণা করি, তোমার প্রশংসাসহ। হে আল্লাহ, আমায় তুমি মাফ করে দাও।” আয়িশা রা. তাঁর কাছে এ রকম করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, “আমার রব আমাকে বলেছিলেন যে, শীঘ্রই আমার সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন প্রকাশ পাবে। আর সেটা যখনই আমার দৃষ্টিগোচর হবে তখনই যেন আমি বলি :
سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ أَسْتَغْفِرُ اللهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ
‘সকল প্রশংসা এবং পূতপবিত্রতা আল্লাহরই। আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাঁর কাছেই প্রত্যাবর্তন করছি।'
আর আমি ইতিমধ্যে সেই নিদর্শন অবলোকন করেছি। তা হলো,
إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ (۱) وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّهِ أَفْوَاجًا (۲) فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا (۳)
“যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে এবং আপনি দলে দলে মানুষকে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে দেখবেন, তখন আপনি আপনার পালনকর্তার পবিত্রতা বর্ণনা করুন এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাকারী।” ১১০
এই আয়াতগুলো ছিল তাঁর আসন্ন মৃত্যুর সংকেত, তাঁর রব এবং সর্বোত্তম বন্ধুর সাথে মিলিত হওয়ার সুসংবাদবাহী।
তাঁর সিজদাহও ছিল প্রায় রুকুর মতোই দীর্ঘ। সিজদায় গিয়ে তিনি এই দুআগুলো বলতেন:
اللَّهُمَّ لَكَ سَجَدْتُ، وَبِكَ آمَنْتُ وَلَكَ أَسْلَمْتُ، سَجَدَ وَجْهِي لِلَّذِي خَلَقَهُ وَصَوَّرَهُ فَأَحْسَنَ صُورَتَهُ وَشَقَّ سَمْعَهُ وَبَصَرَهُ، وَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ
“হে আল্লাহ, আমি তোমারই জন্য সিজদা করছি, তোমারই প্রতি ঈমান এনেছি, তোমার জন্য নিজেকে সঁপে দিয়েছি। আমার মুখমণ্ডল সিজদায় অবনমিত সেই মহান সত্তার জন্য, যিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন, যিনি তাতে কান এবং চোখ স্থাপন করেছেন। মহিমান্বিত আল্লাহ সর্বোত্তম স্রষ্টা।” ১১১
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي كُلَّهُ، دِقَّهُ، وَجِلَّهُ، وَأَوَّلَهُ وَآخِرَهُ عَلَانِيَتَهُ وَسِرَّهُ
“হে আল্লাহ, আমার ছোট-বড়, পূর্বের-পরের, গোপন-প্রকাশ্য সমস্ত গুনাহ মাফ করে দাও।” ১১২
أَعُوذُ بِرِضَاكَ مِنْ سَخَطِكَ، وَأَعُوذُ بِمُعَافَاتِكَ مِنْ عُقُوبَتِكَ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْكَ ، لَا أُحْصِي ثَنَاءً عَلَيْكَ، أَنْتَ كَمَا أَثْنَيْتَ عَلَى نَفْسِكَ
হে আল্লাহ, আমি আশ্রয় চাই তোমার অসন্তুষ্টি হতে তোমার সন্তুষ্টির মাধ্যমে, আর আমি আশ্রয় চাই তোমার কাছে তোমার শাস্তি হতে। তোমার প্রশংসা গুনে শেষ করা যায় না। তুমি সেই প্রশংসার যোগ্য নিজের প্রশংসা যেরূপ তুমি নিজে করেছ।” ১১৩
سُبُّوحٌ قُدُّوسُ رَبُّ الْمَلَائِكَةِ وَالرُّوحِ
"ফেরেশতা এবং রুহুল কুদুসের প্রতিপালক স্বীয় সত্তায় পূত এবং গুণাবলিতেও পবিত্র।” ১১৪
কতই-না মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন নবী মুহাম্মদ ! তিনি বিনম্রচিত্তে নিস্তব্ধ গভীর রাতে তাঁর রবকে ডাকতেন। তিনি বারংবার তাঁকে ডাকতেন প্রশংসা এবং পবিত্রতাসহ, স্বীকারোক্তি দিতেন তাঁর প্রভুত্ব এবং ঐশ্বর্যের। বিনীতভাবে এই বাক্যগুলো আওড়ানোর সময় এবং আল্লাহর কাছে পরিপূর্ণভাবে নিজেকে সঁপে দেয়ার এই মুহূর্তে কী মহিমান্বিত মনোদিগন্তেই না নবীজি -এর রূহ উদ্ভাসিত হতো! আমাদের কল্পনায় যেন ভেসে ওঠে, পৃথিবীর সমস্ত কিছুই এ সময় তাঁকে শুনছে এবং আকাশের নক্ষত্ররাজিও তখন তাঁর দিকে অপলক তাকিয়ে রয়েছে। অতঃপর বিস্ময়াভিভূত চিত্তে একে অপরকে বলছে, এই সেই মানুষ, যার সম্বন্ধে আল্লাহ কুরআনে উল্লেখ করেছেন,
وَاذْكُرِ اسْمَ رَبِّكَ وَتَبَتَّلْ إِلَيْهِ تَبْتِيلً
“কাজেই তুমি তোমার প্রতিপালকের নাম স্মরণ করো এবং একাগ্রচিত্তে তাঁর প্রতি মগ্ন হও।” ১১৫
নবীজি ﷺ রাতের এক-ষষ্ঠাংশে পৌঁছার আগ পর্যন্ত একাগ্রচিত্তে তিলাওয়াত, আবেগপূর্ণ দুআ, আর মহান রবের প্রশংসায় রত থাকতেন। ততক্ষণে তাঁর রাতের নামায শেষ হয়ে যেত এবং শুধু বিতর সালাতই বাকি থাকত। তখন তিনি তাঁর স্ত্রীকে জাগিয়ে দিতেন, যাতে করে তিনিও নবীজি -এর সাথে বিতর আদায় করে নিতে পারেন। তিনি তিন রাকাত বিতর আদায় করতেন। সাধারণত তিনি প্রথম রাকাতে সূরা আল-আলা, দ্বিতীয় রাকাতে সূরা আল-কাফিরুন এবং তৃতীয় রাকাতে সূরা আল-ইখলাস তিলাওয়াত করতেন। বিতর সালাতের শেষে তিনি বলতেন :
أَعُوذُ بِرِضَاكَ مِنْ سَخَطِكَ، وَأَعُوذُ بِمُعَافَاتِكَ مِنْ عُقُوبَتِكَ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْكَ، لَا أُحْصِي ثَنَاءً عَلَيْكَ، أَنْتَ كَمَا أَثْنَيْتَ عَلَى نَفْسِكَ
“হে আল্লাহ, তোমার ক্রোধের বদলে আমি তোমার সন্তুষ্টি কামনা করছি এবং তোমার শাস্তির বদলে তোমার ক্ষমা। আমি আশ্রয় চাইছি তোমার কাছে তোমার শাস্তি থেকে। আমি তোমার নিয়ামতরাজি গুনে শেষ করতে অক্ষম, আর না আমি তোমার প্রশংসা করতে সক্ষম, ঠিক যেমনটা করা উচিত। আমি তদ্রূপ তোমার প্রশংসা করছি তুমি নিজে যেরূপ তোমার সম্বন্ধে করেছ।” ১১৬
বিতর শেষে তিনি তিনবার বলতেন:
سُبْحَانَ الْمَلِكِ الْقُدُّوسِ
“সকল প্রশংসা রাজাধিরাজ আল্লাহর, তিনি পবিত্র।” ১১৭
তিনি তৃতীয়বার একটু দীর্ঘ করে বাক্যটি বলতেন।
নবীজি এমন ঘরে রাতের নামায আদায় করতেন যেখানে আরাম-আয়েশের লেশমাত্র ছিল না। তাঁর ঘরে ছিল না কোনো আলোর বন্দোবস্ত। খড়ের চাটাই কিংবা স্ত্রীর তোশকই ছিল তাঁর সিজদার স্থান। নবীজি-এর সালাত আদায়কালে তাঁর স্ত্রী তাঁর সামনে শুয়ে থাকতেন। যখন তিনি সিজদায় যেতে চাইতেন তখন স্ত্রীকে স্পর্শ করলে স্ত্রী তার পা সরিয়ে নিতেন। নবীজি দাঁড়িয়ে গেলে তিনি আবার তাঁর পা প্রসারিত করতেন। কদাচিৎ নবীজি মসজিদে রাতের সালাত আদায়ের জন্য যেতেন। খুব সম্ভবত তাঁর স্ত্রীর ঘুম যাতে ভেঙে না যায় এ কারনেই তিনি মাঝে মাঝে মসজিদে যেতেন। আয়িশা রা. বর্ণনা করেন, “আমি একরাতে নবীজিকে বিছানায় না পেয়ে তাঁকে খুঁজতে বের হলাম। আমার হাত তাঁর পায়ের পাতা স্পর্শ করল যেহেতু তাঁর পদযুগল খাড়া হয়ে ছিল। ১১৮ তিনি বলছিলেন :
أَعُوذُ بِرِضَاكَ مِنْ سَخَطِكَ، وَأَعُوذُ بِمُعَافَاتِكَ مِنْ عُقُوبَتِكَ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْكَ ، لَا أُحْصِي ثَنَاءً عَلَيْكَ، أَنْتَ كَمَا أَثْنَيْتَ عَلَى نَفْسِكَ
“হে আমার রব, আমি তোমার অসন্তুষ্টির বদলে সন্তুষ্টি প্রার্থনা করছি, তোমার শাস্তির বদলে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমি তোমার কাছে তোমার শান্তি হতে পানাহ চাইছি। আমি তোমার প্রশংসা গুনে শেষ করতে অপারগ। তুমি নিজের যেরূপ প্রশংসা করেছ আমিও তদ্রূপ তোমার প্রশংসা বর্ণনা করছি।” ১১৯
তিনি আরও বলেন, “একরাতে নবীজিকে বিছানায় না দেখে আমি ভাবলাম তিনি বুঝি তাঁর অন্য স্ত্রীদের কাছে গিয়েছেন। আমি তাঁকে কিছুক্ষণ খোঁজার পর ঘরে ফিরে আসলাম। ঘরে ফিরে তাঁকে রুকু বা সিজদারত অবস্থায় বলতে শুনলাম :
سُبْحَانَكَ وَبِحَمْدِكَ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ
“সকল মহিমা এবং প্রশংসা শুধু তোমারই প্রভু। তুমি ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই।” তখন আমি চিন্তা করলাম, 'আপনি কতই-না আদর্শবান হে রাসূলুল্লাহ, আপনি কতই-না উত্তম কাজে ব্যস্ত ছিলেন যেখানে আমি আচ্ছন্ন ছিলাম পুরোই বিপরীত চিন্তায়।” ১২০
টিকাঃ
১০৩. সূরা আল-ইমরান ৩:১৯০-২০০
১০৪. আবূ দাউদ: ৫০৮৫
১০৫. সূরা মুজ্জাম্মিল ৭৩:২
১০৬. আবূ দাউদ: ৭৬৭
১০৭. তিরমিযী: ৩৪১৮
১০৮. মুসনাদ আহমদ: ৭২৯
১০৯. আবূ দাউদ: ৭৬০
১১০. সূরা আন-নাসর ১১০: ১-৩
১১১. আবূ দাউদ: ৭৬০
১১২. আবূ দাউদ: ৮৭৮
১১৩. আবূ দাউদ: ৮৭৯
১১৪. আবূ দাউদ: ৮৭২
১১৫. সূরা আল-মুযযাম্মিল ৭৩:৮
১১৬. আবু দাউদ: ৮৭৯
১১৭. আবু দাউদ: ১৪৩০
১১৮. এর মানে হচ্ছে নবীজি তখন সিজদারত ছিলেন।
১১৯. আবূ দাউদ: ৮৭৯
১২০. মুসনাদ আহমদ: ২৫১৭৮
📄 রাতের প্রথম প্রহরে
নবীজি ইশার সালাত শেষ করে ঘরে ফিরতেন এবং দুই রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ ৯২ আদায় করতেন। তারপর নিশ্চিন্তে বসে স্ত্রীর সাথে কিছুক্ষণ গল্প করতেন। এই সময়টা তিনি তাঁর পরিবারের সাথে খোশ-গল্পেই কাটাতেন। মাঝে মাঝে কোনো অবসর সন্ধ্যায় তিনি তাঁর সাহাবীদের সাথেও সাক্ষাৎ করতেন। কিছু রাতে তিনি আনসারদের সাথে সময় কাটানোর জন্য চলে যেতেন। আবার কখনো কখনো আবু বকর রা. এবং উমর রা. এর সাথে আবু বকর রা. এর বাড়িতে মিলিত হতেন। তখন তারা মুসলিম সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে আলোচনা করতেন। তিনি বাড়ির পথে রওনা হলে তারাও তাঁর সঙ্গ উপভোগের জন্য মসজিদ পর্যন্ত তাঁকে এগিয়ে দিতেন।
পথ চলার সময় মাঝরাতে কখনো কখনো তাঁর কানে ভেসে আসত সাহাবীদের কোরআন তিলাওয়াতের সুমধুর গুঞ্জন। তিনি তখন হাঁটা থামিয়ে সেই তিলাওয়াত শুনতে থাকতেন। একরাতে আবু মূসা আল-আশআরী রা. এর বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কুরআন তিলাওয়াতের মনকাড়া সুর নবীজি -এর কানে গিয়ে পৌঁছাল, পথচলা থামিয়ে তিনি তিলাওয়াত শুনতে লাগলেন। সকালে যখন ওই সাহাবীর সাথে তাঁর দেখা হলো তখন তিনি বললেন, "আবু মূসা, (তুমি অবশ্যই খুশি হতে, যদি দেখতে পেতে যে) গতরাতে আমি তোমার তিলাওয়াত শুনছিলাম। তোমার সুর শুনে মনে হচ্ছিল তুমি যেন দাউদ আ. এর তিলাওয়াতের একটি ছন্দ দিয়ে তিলাওয়াত করছিলে।”
একরাতে মসজিদে গিয়ে নবীজি আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রা. কে কিয়ামুল লাইল (রাতের নফল সলাত) আদায়রত অবস্থায় দেখতে পেলেন। তিনি কুরআনের ৪র্থ সূরা 'আন-নিসা' তিলাওয়াত করছিলেন। তিনি তখন আবু বকর এবং উমর রা. কে বললেন, “কেউ যদি কুরআনকে এমনভাবে তিলাওয়াত করতে ভালোবাসে যেভাবে এটা নাজিল করা হয়েছে, তার উচিত ইবনে উম্মে আবদকে অনুসরণ করা।” ৯৩
মসজিদে প্রবেশ করে তিনি যে আওয়াজে সালাম দিতেন তা একজন জেগে থাকা মানুষের শোনার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু সেই আওয়াজ ঘুমন্ত মানুষকে জাগিয়ে দিত না। মসজিদে সবসময় কিছু না কিছু দরিদ্র মুসলিমরা শুয়ে থাকত। তিনি ঘরে প্রবেশের পূর্বে মসজিদে সালাত আদায় করে নিতেন।
বাড়িতে পৌঁছে যখন ঘুমোতে চাইতেন তখন তিনি বিছানায় রাখা এক টুকরো কাপড় দিয়ে কোমরের নিচের অংশটুকু ঢেকে রাখতেন। তিনি তাঁর জুতা খুলে রাখতেন এবং স্ত্রীদের সাথে একই চাদরের নিচে শুয়ে পড়তেন। অতিশয় নরম তুলোর তৈরি তোশকই ছিল তাঁর বিছানা এবং একই উপাদানে তৈরি একটামাত্র বালিশ তিনি তাঁর স্ত্রীর সাথে ভাগ করে ঘুমোতেন। ঘুমোতে যাওয়ার সময় একটা মেসওয়াক তিনি বালিশের পাশে রেখে দিতেন, যাতে জেগে ওঠার পর তা ব্যবহার করতে পারেন। দিনে বা রাতে যখনই ঘুম থেকে উঠতেন তখনই তিনি মেসওয়াক করতেন। তাঁর মেসওয়াক করা শেষ হয়ে গেলে সেটা ধুয়ে রাখার জন্য আয়েশা রা.-এর কাছে দিতেন। কিন্তু আয়েশা রা. মেসওয়াকটি ধুয়ে রাখার পূর্বে নিজে ব্যবহার করে নিতেন, যাতে রাসূলের পবিত্র লালা তাঁর মুখে প্রবেশ করে। এরপর তিনি সেটা পরিষ্কার করে নবীজি ﷺ-এর কাছে ফিরিয়ে দিতেন। নবীজি ﷺ সব সময় মেসওয়াক হাতের কাছে রাখতেন, যাতে করে তিনি সর্বদাই মুখ পরিষ্কার রাখতে পারেন। তিনি এত বেশি দাঁত মাজতেন যে, মনে হতো এই বুঝি তাঁর দাঁতগুলো সব খুলে পড়ে যাবে। যেহেতু তাঁকে ফেরেশতাদের সাথে কথা বলতে হতো, তাই হয়তো-বা তিনি চাইতেন যে তাঁর মুখ সব সময় দুর্গন্ধমুক্ত থাকুক। উপরন্তু তিনি কটু গন্ধযুক্ত কোনো ধরনের খাবারই গ্রহণ করতেন না। তাঁকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলতেন, “আমি আল্লাহর ফেরেশতাদের সামনে লজ্জাবোধ করি। এই খাবারগুলো হারাম নয়, কিন্তু আমাকে তাদের সাথে কথা বলতে হয়, যাদের সাথে তোমাদের বলতে হয় না।” তাই তিনি ঘুমোতে যাওয়ার আগে মেসওয়াকটি পাশে রাখতেন, যাতে ঘুমানোর পূর্বে এবং ঘুম থেকে ওঠার পরমুহূর্তে দাঁত মাজতে পারেন। নবীজি ﷺ তখন তাঁর স্ত্রীদের সাথে কিছু সময় গল্প করতেন। গভীর রাতের নিস্তব্ধ মুহূর্তে রাসূলুল্লাহর মতো প্রেমময় এবং সুচিব্রতিবান স্বামী তাঁর প্রেয়সী স্ত্রীর সাথে কী রকম বাক্যালাপ করতে পারেন সেটা সহজেই অনুমেয়! সেই রোমান্টিক কথোপকথনে থাকত ভালোবাসা এবং সুখানুভূতির আদান-প্রদান, যা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার আত্মিক বন্ধনকে আরও বেশি দৃঢ় করে তুলত।
এই মিষ্টি-মধুর আলাপচারিতার পর জৈবিক চাহিদা অনুভব করলে তিনি স্ত্রীর সাথে সহবাস করতেন। এমনকি মাসিক চলাকালীন সময়েও নবীজি স্ত্রীকে আদর-সোহাগ থেকে বঞ্চিত রাখতেন না। তিনি তাঁর স্ত্রীকে কোমরের নিচের অংশ ভালোভাবে ঢেকে নিতে বলতেন ৯৪ এবং তাঁরা পরস্পরের সঙ্গ উপভোগ করতেন, কিন্তু সহবাস করতেন না। কাজেই এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এ রকম মেশামেশির ফলে স্ত্রী অনুভব করতে পারতেন, তিনি তাঁর স্বামীর পরম আকঙ্ক্ষিত। তাই সহবাস প্রতিরোধক এই প্রাকৃতিক উপায়ও (মাসিক) বিবাহিত দম্পতির ঘনিষ্ঠ হওয়ার মাঝখানে বাঁধা হতে পারে না। উম্মে সালামাহ রা. বর্ণনা করেন, “রাসূলুল্লাহর সাথে বিছানায় থাকাকালে আমার মাসিক শুরু হলো। আমি ধীরে ধীরে চাদরের নিচ থেকে বের হয়ে আসলাম। নবীজি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার কি মাসিক হয়েছে?”
আমি বললাম, “অন্যান্য নারীদের মতো আমারও মাসিক হয়েছে।”
তিনি বললেন, “এটা আল্লাহ সকল নারীদের জন্যই নির্ধারণ করে দিয়েছেন।”
আমি সরে পড়লাম এবং প্রয়োজনীয় কাজ সেরে আবার ফিরে আসলাম। নবীজি তখন আমাকে বললেন, “কাছে এসো এবং আমার সাথে চাদরের নিচে শুয়ে পড়ো।” সত্যিই তিনি আমাকে চাদরের নিচে নিজের খুব কাছে টেনে নিলেন।”
সাধারণত ঘুমোতে যাওয়ার পূর্বে তিনি ফরজ গোসল সেরে নিতেন। তবে এর বদলে কখনো কখনো শুধু ওযু করে ঘুমিয়ে পড়তেন। তারপর যখন জেগে উঠতেন তখন গোসল সম্পন্ন করতেন। মাঝে মধ্যে তিনি এবং তাঁর স্ত্রী উভয়ে একই পাত্রে হাত ডুবিয়ে ফরজ গোসল করতেন। স্ত্রী তাঁকে বলতেন, “আমার জন্য কিছু রেখে দিন।” আবার তিনিও স্ত্রীকে অনুরূপ কথা বলতেন। এই ঘটনাটা নবীজি এবং তাঁদের স্ত্রীদের মধ্যকার ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্কের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
যখন বিছানায় যেতেন তখন তিনি বলতেন,
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي كَفَانِي وَآوَانِي، وَأَطْعَمَنِي وَسَقَانِي، وَالَّذِي مَنَّ عَلَى وَأَفْضَلَ، وَالَّذِي أَعْطَانِي فَأَجْزَلَ، الْحَمْدُ لِلَّهِ عَلَى كُلِّ حَالٍ، اللهُمَّ رَبَّ كُلِّ شَيْءٍ، وَمَلِكَ كُلَّ شَيْءٍ، وَإِلَهَ كُلِّ شَيْءٍ، وَلَكَ كُلُّ شَيْءٍ أَعُوذُ بِكَ مِنَ النَّارِ
“সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদের আহার করিয়েছেন, পান করিয়েছেন, আমাদের প্রয়োজন পূর্ণ করেছেন এবং আমাদের আশ্রয় দিয়েছেন। কেননা, এমন বহু লোক আছে যাদের প্রয়োজন পূর্ণকারী কেউ নেই এবং যাদের আশ্রয়দানকারীও কেউ নেই। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমার ওপর তাঁর অনুগ্রহ বর্ষণ করেছেন এবং আমাকে বেহিসাব নিয়ামাত প্রদান করেছেন। সর্বাবস্থায় সকল প্রশংসা শুধু আল্লাহর। হে আল্লাহ, আমাদের রব ও প্রত্যেক বস্তুর রব, যার অধিকারে রয়েছে সমস্ত কিছু। আমি আপনার কাছে জাহান্নাম থেকে পানাহ চাই।” ৯৫
অতঃপর তিনি তাঁর হাত গোল করে কুরআনের শেষ তিনটি সূরা ৯৬ পড়ে ফুঁক দিতেন এবং সারা শরীরে হাত বুলাতেন। তিনি তিনবার এ রকম করতেন। বিছানায় নবীজি ডান কাত হয়ে শয়ন করতেন এবং তাঁর ডান হাত ডান গালের নিচে রেখে বলতেন,
اللَّهُمَّ بِاسْمِكَ أَمُوتُ وَأَحْيَا اللهُمَّ قِنِي عَذَابَكَ يَوْمَ تَبْعَثُ عِبَادَكَ
“হে আল্লাহ, আপনার নামে আমার মৃত্যু হয় এবং আমি জীবিত হই। ৯৭ হে আল্লাহ, আমাকে আপনার আযাব থেকে রক্ষা করুন, যেদিন আপনি আপনার বান্দাদের পুনর্জীবিত করবেন।” ৯৮
নবীজি ঘুমানোর পূর্বে আরও কিছু দুআ পড়তেন। এখানে কিছু উল্লেখ করা হলো :
اللَّهُمَّ رَبَّ السَّمَوَاتِ، وَرَبَّ الْأَرْضِ، وَرَبَّ كُلَّ شَيْءٍ، فَالِقَ الْحَبِّ وَالنَّوَى، مُنَزَّلَ التَّوْرَاةِ، وَالْإِنْجِيلِ، وَالْقُرْآنِ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ ذِي شَرِّ، أَنْتَ آخِذُ بِنَاصِيَتِهِ، أَنْتَ الْأَوَّلُ فَلَيْسَ قَبْلَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الْآخِرُ فَلَيْسَ بَعْدَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الظَّاهِرُ فَلَيْسَ فَوْقَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الْبَاطِنُ فَلَيْسَ دُونَكَ شَيْءٌ واقْضِ عَنِّى الدَّيْنَ، وَأَغْنِي مِنَ الْفَقْرِ
“হে আল্লাহ, হে সপ্ত আকাশের রব, যমিনের রব, মহান আরশের রব, আমাদের রব ও প্রত্যেক বস্তুর রব, হে শস্য-বীজ ও আঁটি বিদীর্ণকারী, হে তাওরাত, ইনজীল ও কুরআন নাযিলকারী, আমি প্রত্যেক এমন বস্তুর অনিষ্ট থেকে আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি, যার (মাথার) অগ্রভাগ আপনি ধরে রেখেছেন (নিয়ন্ত্রণ করছেন)। হে আল্লাহ, আপনিই প্রথম, আপনার পূর্বে কিছুই ছিল না; আপনি সর্বশেষ, আপনার পরে কোনো কিছু থাকবে না; আপনি সবকিছুর ওপরে, আপনার ওপরে কিছুই নেই; আপনি সর্বনিকটে, আপনার চেয়ে নিকটবর্তী কিছু নেই, আপনি আমাদের সমস্ত ঋণ পরিশোধ করে দিন এবং আমাদের অভাবগ্রস্ততা থেকে অভাবমুক্ত করুন।” ৯৯
بِسْمِ اللَّهِ وَضَعْتُ جَنْبِي اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي، وَأَخْسِئُ شَيْطَانِي، وَفُكَ رهَانِي، وَاجْعَلْنِي فِي النَّدِيِّ الْأَعْلَى
"আমার রব, আমার পাপসমূহ ক্ষমা করুন, শয়তানকে পর্যুদস্ত করুন, আমার ঋণ পরিশোধ করে দিন এবং আমার সৎকর্মের পাল্লা ভারী করে দিন এবং নেককারদের মধ্যে আমাকে শামিল করে নিন, যাদের আপনি সর্বোৎকৃষ্ট বন্ধুর ১০০ সাথে রাখবেন।” ১০১
اللهُمَّ إِلَيْكَ أَسْلَمْتُ نَفْسِي، وَفَوَّضْتُ إِلَيْكَ أَمْرِي ، وَأَلْجَأْتُ إِلَيْكَ ظَهْرِي، وَوَجَّهْتُ إِلَيْكَ وَجْهِي، رَهْبَةً مِنْكَ، وَرَغْبَةً إِلَيْكَ، لَا مَلْجَأَ وَلَا مَنْجَا مِنْكَ إِلَّا إِلَيْكَ، آمَنْتُ بِكِتَابِكَ الَّذِي أَنْزَلْتَ، وَبِنَبِيِّكَ الَّذِي أَرْسَلْتَ
“হে আল্লাহ, আমি নিজেকে আপনার কাছে সঁপে দিলাম। আমার যাবতীয় বিষয় আপনার কাছেই সোপর্দ করলাম, আমার চেহারা আপনার দিকেই ফিরালাম, আর আমার পৃষ্ঠদেশকে আপনার দিকেই ন্যস্ত করলাম; আপনার প্রতি অনুরাগী হয়ে এবং আপনার ভয়ে ভীত হয়ে। একমাত্র আপনার নিকট ছাড়া আপনার (পাকড়াও) থেকে বাঁচার কোনো আশ্রয়স্থল নেই এবং কোনো মুক্তির উপায় নেই। আমি ঈমান এনেছি আপনার নাযিলকৃত কিতাবের ওপর এবং আপনার প্রেরিত নবীর ওপর।” ১০২
তা ছাড়া তিনি কুরআনের কিছু সূরাও তিলাওয়াত করতেন। যেমন: সূরা আস-সাজদাহ, আল-মূলক, আয-যুমার, আল-ইসরা ইত্যাদি।
তারপর তিনি ঘুমিয়ে পড়তেন। তিনি ঘুমানোর পর কিছু সময় পর্যন্ত তাঁর নিশ্বাস শোনা যেত। দিনে ঘুমাতে গেলে তিনি বলতেন, “আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, যিনি সবকিছুর ওপর বিজয়ী, আসমান-যমিন এবং এতদুভয়ের মাঝে যা কিছু আছে সবকিছুর মালিক, সর্বশক্তিমান, ক্ষমাশীল।”
রাতে ঘুম ভেঙে গেলে পুনরায় শয্যা গ্রহণের পূর্বে নবীজি মেসওয়াক দিয়ে দাঁত মেজে নিতেন। তিনি মধ্যরাত্রি পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকতেন। খুব সম্ভবত এটাই রাসূলুল্লাহ -এর দীর্ঘতম ঘুমের সময়।
টিকাঃ
৯২. এই দুই রাকাত পড়া সুন্নাহ, ওয়াজিব নয়। পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ সালাতের সাথেই কিছু সুন্নাত আদায় করা হয়, যার রাকাত সংখ্যা আবার ভিন্ন ভিন্ন। এই নিয়মিত সুন্নাতগুলো ছাড়াও নবীজি আরও কিছু সুন্নাত আদায় করতেন। তবে সেগুলো তিনি এতোটা গুরুত্ব দিয়ে নিয়মিত আদায় করতেন না।
৯৩. ‘ইবনে উম্মে ‘আবদ’ এই নামে নবীজি ﷺ আদর করে শুধু আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-কে-ই ডাকতেন।
৯৪. ইসলামে স্ত্রীর মাসিক চলাকালীন সময়ে সহবাস জায়েয নয়, কিন্তু চুমু খাওয়া, আলিঙ্গন করা সহ পরস্পরের সব ধরনের সঙ্গ উপভোগ জায়েয।
৯৫. মুসনাদ আহমদ: ৫৯৮৩
৯৬. এই তিনটি সূরা হচ্ছে সূরা 'আন-নাস', 'আল-ফালাক' এবং 'আল-ইখলাস'
৯৭. ঘুম হচ্ছে মৃত্যুর ন্যায় এবং জেগে ওঠা হচ্ছে জীবিত হওয়ার ন্যায়।
৯৮. বুখারী: ৬৩১৪; মুসনাদ আহমদ: ৪২২৬
৯৯. আবূ দাউদ: ৫০৫১
১০০. সর্বোৎকৃষ্ট বন্ধু বলতে আল্লাহকে বুঝানো হয়েছে, যার কাছে আমাদের প্রত্যাবর্তন।
১০১. আবূ দাউদ: ৫০৫৪
১০২. মুসনাদ আহমদ: ১৮৬১৭
📄 গভীর রাতের ভ্রমণবীথি
রাত্রিকালীন ইবাদাতের সর্বোৎকৃষ্ট সময় অর্থাৎ, রাতের শেষ প্রহরের বেলায় নবীজি * কখনো কখনো কন্যা ফাতিমা রা. এবং তার স্বামী আলী রা. এর ঘরে যেতেন। তিনি তাদের ডেকে বলতেন, “তোমরা কি উঠে সালাত আদায় করবে না?” আলী রা. বর্ণনা করেন যে, তিনি একবার নবীজিকে বলেছিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমরা শুধু ফরজ সালাতগুলোই আদায় করি। আমাদের রুহ তো থাকে রবের কব্জায় (ঘুমের সময়)। তিনি যদি আমাদের জীবিত (জাগ্রত) করতে চান, তবে তিনি তা-ই করবেন।” আলী রা. যখন এই উক্তিটি করলেন তখন নবীজি তাঁর সাথে কোনো কথা না বলেই চলে গেলেন। আলী রা. শুনতে পেলেন, চলে যাওয়ার সময় নবীজি সজোরে তাঁর উরুতে আঘাত করে বলছেন, 'আমরা শুধু আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া ফরজ সালাতগুলোই আদায় করি। “মানুষ অধিকাংশ বিষয়েই বিতর্ককারী।”' ১২১
তাঁর জীবৎকালের শেষের দিকে নবীজি রাতের বেলা আল-বাকী গোরস্তানে কবরবাসীদের জন্য দুআ করতে যেতেন। আয়িশা রা. আল-বাকী গোরস্থানে যাওয়ার প্রথম রাতটি সম্পর্কে বর্ণনা করেন, “সে রাতে নবীজি আমার সাথে ছিলেন। তিনি পাশ ফিরলেন এবং ওপরের পোশাক খুলে ফেললেন। তারপর জুতা খুলে নিজের পায়ের কাছে রাখলেন এবং নিচের পোশাকের প্রান্তভাগ বিছানায় রেখে শুয়ে পড়লেন। আমি ঘুমিয়ে আছি ভাবার আগ পর্যন্ত তিনি এভাবেই থাকলেন। এরপর খুব সাবধানে তিনি তাঁর ওপরের পোশাক পরিধান করলেন, অতি শান্তভাবে জুতা জোড়া পরলেন এবং দরজা খুলে বের হয়ে গেলেন। অতঃপর কোনো শব্দ না করেই দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। আমি তৎক্ষণাৎ আমার জামা গায়ে চাপালাম, মাথা ঢাকলাম, জিলবাব ১২২ পরলাম এবং তাঁকে অনুসরণ করে চলা শুরু করলাম। তিনি আল-বাকী'তে গিয়ে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকলেন এবং তিনবার তাঁর হাত উত্তোলন করলেন। তিনি তারপর ঘুরে গেলেন এবং আমিও ঘুরলাম, দ্রুত হাঁটা শুরু করলেন এবং আমিও দ্রুত হাঁটা শুরু করলাম, তিনি ধীরে ধীরে দৌড়ানো শুরু করলেন এবং আমিও ধীরে দৌড়াতে থাকলাম, তারপর দ্রুত দৌড়ানো শুরু করলেন এবং আমিও সেটাই করলাম। আমি তাঁর থেকে দ্রুতগতিতে ঘরে পৌঁছে গেলাম। তিনি যখন ঘরে প্রবেশ করলেন তখন আমি বিছানায় প্রায় শুয়ে পড়েছিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'কী ব্যাপার আয়িশা? তোমাকে বিচলিত দেখাচ্ছে?'
আমি বললাম, 'কিছুই হয়নি।'
তিনি তখন বললেন, 'তুমি আমাকে বলবে নয়তো আল্লাহই আমাকে জানিয়ে দেবেন, যিনি সবকিছু সম্পর্কে অবহিত।'
আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল, অন্য সবার থেকে আপনিই আমার সবচেয়ে প্রিয়।' তারপর আমি তাঁকে সবকিছু খুলে বললাম।
তিনি তখন বললেন, 'তুমিই কি তবে সেই কালো ছায়া, যা আমি আমার সামনে দেখেছিলাম?'
আমি হ্যাঁ-সূচক জবাব দিলাম। তিনি আমার বুকে একবার মৃদু ধাক্কা দিয়ে বললেন, 'তুমি কি ভেবেছিলে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল তোমার প্রতি অবিচার করতে পারেন?'
আমি জবাব দিলাম, 'মানুষ যা কিছুই গোপন করে আল্লাহ তাঁর সবই জানেন। হ্যাঁ, আমি ভেবেছিলাম।'
নবীজি বললেন, 'যখন তুমি আমাকে দেখছিলে তখন জিবরাইল আ. আমার কাছে এসে বাইরে যাওয়ার জন্য ডাক দিলেন এবং তোমার কাছ থেকে বিষয়টা গোপন রাখলেন। আমিও তোমাকে না শুনিয়ে তাঁর ডাকের জবাব দিলাম। তুমি যখন তোমার কাপড় ছাড়ো তখন তিনি ঘরে প্রবেশ করেন না। আমি ভাবলাম, তুমি বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছ, তাই তোমাকে জাগাতে চাইনি। কারণ, আমি মনে করেছিলাম, আমি চলে যাওয়ার পর তুমি হয়তো একাকী অনুভব করবে। জিবরাইল আ. আমাকে জানালেন, আল-বাকীতে গিয়ে সেখানকার মৃতদের জন্য দুআ করতে আল্লাহ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন।"
আয়িশা রা. বলতে থাকলেন, 'আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম কেমন করে আমি কবরে শায়িত মৃতদের সম্বোধন করতে পারব। তিনি আমাকে এই দুআ করতে বললেন :
السَّلَامُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ، إِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لَاحِقُونَ
“এই স্থানের বিশ্বাসী মুসলিমদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ তাঁর রহমত বর্ষিত করুন তাদের ওপর, যারা আগে চলে গেছেন এবং যারা হবেন তাদের অনুগামী। আল্লাহ চাইলে শীঘ্রই আমরা আপনাদের সাথে মিলিত হব।” ১২৩
এরপর থেকে প্রতিরাতেই তিনি শেষ-রাতে আল-বাকীতে যেতেন। নবীজি বলতেন :
السَّلَامُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ دَارِ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ، فَإِنَّا وَإِيَّاكُمْ وَمَا تُوعَدُونَ غَدًا مُؤَجَّلُونَ، تُؤَجَّلُونَ، وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لَاحِقُونَ
“তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, বিশ্বাসী লোকেদের এই সমাগমে। তোমাদের সাথে যার প্রতিশ্রুতি করা হয়েছে তা তোমরা পেয়েছ। তোমরা অপেক্ষা করছ বিচার দিবসের। আল্লাহ চাইলে আমরাও তোমাদের সাথে মিলিত হব।” ১২৪
কতই-না দয়ার নবী তিনি, রাতের আঁধারে, যিনি প্রিয় সাহাবীদের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে দুআ করতেন। সেইসব সাহাবীদের কবরের সামনে, যারা মৃত্যুবরণ করেছিলেন ইসলামের বিজয় দেখার আগেই। যখন দলে দলে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছিল তাই তো তখন নবীজি তাঁর সহযোদ্ধা প্রিয় সহচরদের স্মরণ করছিলেন। তারা তাদের রবের সাথে মিলিত হয়েছিলেন যখন মুসলিমদের সংখ্যা ছিল হাতে-গোনা এবং এই সংখ্যালঘু মুসলিমরা তখন শত্রুদের অত্যাচার-নির্যাতনের কবলে অত্যন্ত কঠিন সময় পার করেছিলেন। তারা দুনিয়ায় কোনো প্রতিদান না পেয়েই বিদায় নিয়েছিলেন।
সেই সময়, নবীজি -এর কাছে সমগ্র আরব ভূখণ্ড থেকে দলে দলে প্রতিনিধিদল এসে ইসলাম গ্রহণ করছিল। অথচ ইসলামী ভূখণ্ডের সম্প্রসারণ কিংবা অসংখ্য জাতি-গোত্রের ইসলাম গ্রহণের পরও নবীজি তাদের কথা ভুলে যাননি, যারা আগেই পৃথিবী ত্যাগ করেছিলেন। তিনি তাঁর জীবনের শেষ ক'টা দিন নিয়মিত কিছুটা সময় তাদের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের কথা স্মরণ করে তাদের জন্য দুআ করে কাটিয়েছেন।
ওই সময়টাতে নবীজি তাঁর মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন। তিনি সর্বোত্তম বন্ধুর সাথে সাক্ষাতের প্রস্তুতি হিসেবে জীবিত এবং মৃত উভয় সাথিদের কাছ থেকে যেন বিদায় নিচ্ছিলেন।
টিকাঃ
১২১. সূরা আল-কাহাফ ১৮:৫৪
১২২. সর্বাঙ্গ-আচ্ছাদনকারী লম্বা পোশাক
১২৩. মুসনাদ আহমদ: ২২৯৮৫
১২৪. মুসনাদ আহমদ: ২৫৪৭১
📄 ভোরের পূর্বে ঈষৎ ঘুম
রাতের এক-ষষ্ঠাংশ বাকি থাকতে অর্থাৎ প্রায় শেষ প্রহরে নবীজি ﷺ দীর্ঘ কিয়ামুল লাইল, তাসবীহ, দুআ, নিকটাত্মীয়দের প্রতি স্নেহশীল আচরণ এবং মৃত সাথিদের কল্যাণকামনার পর কিছু সময় বিশ্রাম নেয়ার উদ্দেশ্যে আবার বিছানায় যেতেন। ফজর সালাত এবং দিনের কর্মব্যস্ততার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে তিনি তখন ভাতঘুম ঘুমাতেন। এভাবেই সুবহে সাদিকের প্রারম্ভের সময়টুকু নবীজি ﷺ-এর ঈষৎ ঘুমেই কেটে যেত। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা রা. বলেন, “নবীজি ﷺ যে রাতেই আমার সাথে থাকতেন, সুবহে সাদিকের শুরুর সময়টুকুতে তিনি নিদ্রা যেতেন।”
রাতের আঁধার কেটে ভোরের আলো ফোঁটার সময় বিলাল রা. এর সুমধুর আযানের ধ্বনি যখন মদীনার নিস্তব্ধতা ভেঙে দিত তখন নবীজি জেগে উঠতেন। প্রিয় রাসূল ﷺ তাঁর একেকটা নতুন দিন শুরু করতেন আযানের সুর শুনে, যা নববী সুসংবাদের বার্তা এবং ইসলামের আলোকিত বাণী বহন করে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতো মদীনা নগরীর অলিতে-গলিতে।