📘 নবীজির দিনলিপি ﷺ > 📄 সাত-সকালে নবীর সাথে

📄 সাত-সকালে নবীর সাথে


ফজরের সালাত আর সকালের আযকার (মাসনুন দুয়া) শেষ হয়ে যাওয়ার পর সাহাবীদের সারিগুলো কাছাকাছি হয়ে যেত। তারা সবাই নবী -এর চারপাশে জড়ো হয়ে বসে পড়তেন। নবীজি তখনো সালাতের স্থানে বসে সকল সাহাবীদের দেখতেন। ভোরের আলো তাঁর চেহারার উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে দিত। তাঁর হাসিমাখা দীপ্তিমান চেহারা দেখে মনে হতো যেন সূর্য তাঁর মুখে প্রতিফলিত হচ্ছে। তাঁর চেহারার দিকে তাকিয়ে যে কেউই বুঝে ফেলত, এই চেহারা একজন সত্যবাদী মানুষের চেহারা।
আব্দুল্লাহ ইবনু সালাম রা. বলেন, "আমি যখন নবীজি -এর চেহারা পর্যবেক্ষণ করলাম, তখন আমি বুঝতে পারলাম, এই চেহারা মিথ্যাবাদীর চেহারা নয়।”
নবীজি প্রায়ই নাসীহাহর (সদুপদেশের) মাধ্যমে কথা বলা শুরু করতেন। ইরবাদ ইবনু সারিয়াহ রা. হতে বর্ণিত, “একদিন ফজরের সালাতের পর নবীজি আমাদের খুবই আবেগময় নাসীহাহ দিচ্ছিলেন। ফলে লোকদের চক্ষু বেয়ে অবিরত অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছিল।
কেউ একজন বলল, “হে আল্লাহর রাসূল, এটি তো মনে হচ্ছে কারও বিদায়বেলা দেয়া নাসীহাহ। আপনি আমাদের কী করতে আদেশ করেন?”
উত্তরে নবীজি বললেন, 'আমি তোমাদের তাকওয়া অবলম্বনের এবং আমীরের নির্দেশ শোনার ও মানার অসিয়ত করছি; এমনকি সে যদি আবিসিনীয় কালো দাসও হয় তবু। স্মরণ রাখবে, তোমাদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকবে তারা অনেক মতানৈক্য দেখতে পাবে। তোমরা ভ্রান্ত জিনিস থেকে সাবধান থাকবে। কারণ, তা তোমাদের পথভ্রষ্ট করে দেবে। সে সময় তোমাদের কর্তব্য হলো আমার সুন্নত ও হেদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের অনুসরণ করা। তোমরা একে মজবুতভাবে দাঁত দিয়ে কামড়ে আঁকড়ে ধরে থেকো।”
আদর্শ শিক্ষক নবীজি খুব ঘনঘন এ রকম নাসীহাহ দিতেন না; বরং তিনি তাদের অবস্থার প্রতি খেয়াল রাখতেন। যাতে করে তারা বিরক্ত না হন।
যখন সাহাবীগণ নবীজি -এর চারপাশে জড়ো হতেন, তখন তিনি তাদের জিজ্ঞেস করতেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ কি অসুস্থ আছে, যাকে আমি গিয়ে দেখে আসতে পারি?'
সাহাবীদের উত্তর না-বাচক হলে তিনি হয়তো জিজ্ঞেস করতেন, “কোনো জানাযা আছে নাকি, যেটিতে আমি অংশ নিতে পারি?”
কোনো সাহাবী উপস্থিত না থাকলে নবীজি সেই সাহাবীর ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতেন। এক কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা মসজিদ পরিষ্কার করত। নবীজি তাকে দেখতে না পেয়ে একদিন তার কথা জিজ্ঞেস করলেন। তখন তাকে জানানো হলো যে, সে তো মারা গেছে। নবীজি অনুযোগ করে বললেন, “তোমরা আমাকে কেন জানালে না!” সাহাবীগণ ভেবেছিলেন ওই মহিলার মারা যাওয়ার খবর রাসূল -কে সাথে সাথে জানাবার মতো জরুরি কিছু ছিল না। তারা বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, সে রাতে মারা গিয়েছিল এবং রাতেই তাঁকে দাফন করা হয়েছে। আমরা চাইনি আপনাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতে।”
নবীজী তখন সাহাবীদের নির্দেশ দেন মহিলার কবরস্থান দেখিয়ে দিতে। তারপর তিনি কবরস্থানে যান, জানাযার নামায আদায় করেন এবং মরহুমার জন্যে দুআ করেন।
একবার নবীজি খেয়াল করলেন সাবিত ইবনু কায়েস ইবনু শাম্মাস রা.-কে দেখা যাচ্ছে না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “আমরা সাবিত ইবনু কায়েসকে দেখছি না কেন? সে কি অসুস্থ?”
সাদ ইবনু মুয়াজ রা. বলেন, “সে আমার প্রতিবেশী আর তার অসুস্থতার ব্যাপারে কোনো সংবাদ আমি শুনিনি।”
সাদ রা. তাকে দেখতে গিয়ে দেখেন যে, তিনি নিজ বাসায় দরজা বন্ধ করে কাঁদছেন। তিনি কারণ জিজ্ঞেস করলে সাবিত রা. বললেন, “আল্লাহ বলেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ
بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَنْ تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تَشْعُرُونَ
‘মুমিনগণ, তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের ওপর তোমাদের কণ্ঠস্বর উঁচু কোরো না এবং তোমরা একে অপরের সাথে যেরূপ উঁচুস্বরে কথা বলো, তাঁর সাথে সেরূপ উঁচুস্বরে কথা বোলো না। এতে তোমাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তোমরা টেরও পাবে না।'
আমার কণ্ঠস্বর উঁচু। আমার তো ভয় হয়, আমার সব আমল বরবাদ হয়ে যাবে আর আমি জাহান্নামে পতিত হব।”
এ কথা যখন নবীজি -এর কানে গেল তখন তিনি তাঁকে বললেন, “না না, তুমি সেসব লোকদের মতো নও। তোমার জীবন ও মরণ উভয়ই কল্যাণকর। আর তুমি জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।”
রাসূলুল্লাহ এভাবেই সাহাবীদের খোঁজখবর রাখতেন, কাউকেই ভুলে যেতেন না। রাসূল-এর কাছে প্রত্যেকেরই আলাদা মর্যাদা ছিল। রাসূলের সাথে যিনিই সাক্ষাৎ করতে আসতেন তাকেই তিনি সাদরে, যত্নের সাথে গ্রহণ করতেন। কেউ অনুপস্থিত থাকলে তাকে ভুলে যেতেন না; বরং তার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেন। সে ব্যক্তি সুস্থ আছে কি না সেই বিষয়ে খোঁজখবর নিতেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ ধরনের নববী আচরণ সামাজিক বন্ধন ধরে রাখার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের আচরণের ফলেই সমাজের প্রত্যেক সদস্য দৃঢ়ভাবে অনুভব করে যে, সে নিজে এই সম্প্রদায়ের অংশভুক্ত।
সাত-সকালের এই সময়টাতে নবীজি কখনো কখনো সাহাবীদের কাছে তাদের স্বপ্নের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেন। তিনি বলতেন, "তোমাদের মধ্যে কেউ কোনো স্বপ্ন দেখে থাকলে আমাকে বলতে পার, আমি তোমাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দেব।" সাহাবীগণ তাদের স্বপ্নের বর্ণনা দিতেন আর নবীজি সেই স্বপ্নের তাবীর করে দিতেন অথবা এই সময়টাতে সাহাবীদের উপকারী কথা শিক্ষা দিতেন।
উদাহরণস্বরূপ আব্দুল্লাহ ইবনু সালাম রা. থেকে বর্ণিত হাদীসটি উল্লেখ করা যায়। তিনি বলেন,
"নবীজি জীবিত থাকতে একবার আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, আমি একটি চমৎকার ও বিশাল বাগানে আছি। বাগানের মাঝে একটি স্তম্ভ। স্তম্ভটি নীচের দিকে মাটির গভীরে আর তার ওপরিভাগ আকাশে পৌঁছে গেছে। স্তম্ভের ওপরিভাগে একটি হাতল। তখন আমাকে বলা হলো, ওপরের দিকে ওঠো। আমি বললাম, পারছি না। তখন আমার কাছে একজন খাদেম আসল এবং আমার কাপড় গুটিয়ে দিল। আমি ওপরের দিকে উঠতে উঠতে হাতলটি ধরে ফেললাম। আমাকে বলা হলো হাতলটি যাতে শক্ত করে ধরে রাখি। হাতলটি ধরে থাকা অবস্থায় আমি ঘুম থেকে জেগে গেলাম, মনে হচ্ছিল তখনো তা ধরে আছি।
তারপর এ স্বপ্ন নবী -এর কাছে বর্ণনা করলাম। তিনি বললেন, 'ওই বাগান ইসলামের বাগান, ওই স্তম্ভ ইসলামের স্তম্ভ, আর ওই হাতল হলো মজবুত হাতল। তুমি মৃত্যু অবধি ইসলামকে শক্তভাবে ধরে থাকবে।”
আব্দুল্লাহ ইবনু সালাম রা. ছিলেন একজন প্রাক্তন ইহুদী ব্যাবাই (ধর্মযাজক)। নবীজি মদীনায় হিজরত করার পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ওফাতের পর আব্দুল্লাহ ইবনু সালাম রা. প্রায় ৩৫ বছর বেঁচে ছিলেন। এই সময়ের মধ্যে আরবের অনেক গোত্র ইসলাম ত্যাগ করে এবং মুসলিম রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ করে, যা 'স্বধর্মত্যাগীদের যুদ্ধ' নামে ইসলামের ইতিহাসে পরিচিত। আব্দুল্লাহ ইবনু সালাম রা. সেই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়েও ইসলামের বন্ধন দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে ছিলেন, ঠিক যেমনটি রাসূলুল্লাহ ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন। আমৃত্যু তিনি এভাবেই দৃঢ়ভাবে ইসলামের ওপর অবিচল ছিলেন। রাসূলুল্লাহ স্বপ্নের যে ব্যাখ্যা প্রদান করেছিলেন তা এদিকেই ইশারা দেয় যে, তার ওফাতের পর ধর্মত্যাগের হিড়িক পরে যাবে, কিন্তু আব্দুল্লাহ ইবনু সালাম রা. মুরতাদদের সাথে যোগ দেবেন না। এই ঘটনাটিও রাসূল-এর নবুওয়াতের নিদর্শন প্রমাণ করে।
আরেকদিনের ঘটনা। রাসূলুল্লাহ সাহাবীদের কাছে জানতে চাইলেন কেউ কোনো স্বপ্ন দেখেছে কি না, যাতে তিনি সে স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দিতে পারেন। এক ব্যক্তি বলল, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি আজ রাতে স্বপ্নে একটি ছায়াদার মেঘ দেখেছি, যা থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় ঘি ও মধু পড়ছিল। লোকদের দেখলাম তারা হাতে তুলে নিয়ে তা পান করছে। কেউ বেশি পাচ্ছে এবং কেউ কম পাচ্ছে। আমি আরও দেখলাম আসমান থেকে জমিন পর্যন্ত একটি রশি ঝুলছে। আমি দেখলাম আপনি তা ধরে ওপরে উঠে গেছেন। আপনার পর আরেকজন তা ধরে ওপরে উঠে গেল, তার পরে আরেকজন তা ধরে ওপরে উঠে গেল। তার পরে আরেকজন তা ধরলে রশিটি ছিঁড়ে গেল। পুনরায় তা জোড়া লেগে গেল এবং সেও তা ধরে ওপরে উঠে গেল।”
আবু বকর রা. বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাকে এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে দিন।”
রাসূল বললেন, “আচ্ছা, তুমি এর ব্যাখ্যা করো।”
আবু বকর রা. বললেন, "মেঘখণ্ড হলো ইসলামের ছায়া। পতিত ঘি ও মধু হলো কুরআনের মাধুর্য ও কোমলতা। আর (সেখান থেকে) গ্রহণকারীরা হলো কুরআন থেকে বেশি ও কম লাভকারী। আসমান থেকে জমিন পর্যন্ত ঝুলন্ত রশি হলো সেই মহাসত্য, যার ওপর আপনি প্রতিষ্ঠিত। আপনি রশিটি ধরলেন এবং আল্লাহ আপনাকে ওপরে উঠিয়ে নিলেন। আপনার পর তা আরেকজন ধরবে এবং আল্লাহ তাকে ওপরে তুলে নেবেন। তার পরে আরেকজন ধরবে, সেও তা ধরে ওপরে উঠে যাবে। এরপর আরেকজন রশিটি ধরবে এবং তা ছিঁড়ে যাবে। আবার তা জোড়া লাগবে এবং সেও তা ধরে ওপরে উঠে যাবে।”
রাসুলুল্লাহ বললেন, "তুমি কিছু ঠিক বলেছ আর কিছু ভুল বলেছ।”
আবু বকর রা. বলেন, “ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনাকে শপথ দিয়ে বলছি, আমাকে বলে দিন, আমি কোথায় ঠিক করেছি এবং কোথায় ভুল করেছি।
নবী জবাবে বললেন, "হে আবু বকর, শপথ দিয়ে কথা বোলো না।”
একটি লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে, সাহাবীদের স্বপ্নগুলো সেই জিনিসগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকত, যে জিনিসগুলো নিয়ে তারা জাগ্রত অবস্থায় চিন্তামগ্ন থাকতেন। আর যে জিনিসটি তাদের সবচেয়ে বেশি ব্যতিব্যস্ত রাখত, তা ছিল তাদের ঈমান। তাদের জীবনের প্রধান আকর্ষণ ছিল তাদের ঈমান। তারা এই ঈমানের জন্যই দিনে সংগ্রাম করতেন। উপরন্তু সেই একই ফিকির তারা বিছানাতেও নিয়ে যেতেন। তাই তো তাদের স্বপ্নে সেই জিনিসগুলোই প্রতিফলিত হতো। আমরা রাসূলের সহচর সাহাবীদের কথা অবাক হয়ে চিন্তা করি, নবীজি -এর কতই-না নিকটবর্তী ছিলেন তারা! নবীজিকে নিয়ে কতই-না চিন্তামগ্ন থাকতেন তারা! বস্তুত তারা যেমন জাগ্রত অবস্থায় নবীজির ও ঈমানের চিন্তায় নিমগ্ন থাকতেন, তেমনি ঘুমের সময়গুলোতেও সেই একই নিমগ্নতা তাদের গ্রাস করে নিত। ফলে তাদের স্বপ্নেও সেই একই জিনিস ফুটে উঠত। মাঝে মাঝে নবীজি নিজের দেখা স্বপ্নবৃত্তান্ত সাহাবীদের কাছে বর্ণনা করতেন এবং সেই স্বপ্নের ব্যাখ্যাও বলে দিতেন। সামুরাহ রা. থেকে বর্ণিত, “রাসূলুল্লাহ ﷺ একদিন আমাদের জিজ্ঞেস করলেন আমরা কেউ কোনো স্বপ্ন দেখেছি কি না। আমরা না-বাচক উত্তর দিলাম। তিনি বললেন, 'গত রাতে আমি স্বপ্নে দেখি, দুজন ব্যক্তি আমার নিকট এসে আমাকে হাতে ধরে পবিত্র ভূমিতে নিয়ে যায়।” বিশদ এ হাদীসের বাকি অংশে আল্লাহর শাস্তি অবধারিত হয়ে গেছে এমন লোকদের পরকালীন অবস্থার কিছু বিবরণ এবং তাদের শাস্তির কারণ বিবৃত রয়েছে। এই হাদীসে কিয়ামত দিবসেরও কিছু বিবরণ রয়েছে।
সকালের এই সময়টাতে নবীজি সাহাবীদের সাথে আলাপচারিতায় কাটাতেন। কখনো তিনি সাহাবীদের কথোপকথন শুনতেন আবার কখনো-বা নিজেও তাতে যোগ দিতেন। সাহাবীরা হয়তো তাদের ইসলামপূর্ব জীবনের গল্প করতেন। তাঁরা কীভাবে জাহিলিয়াতে থাকতে অজ্ঞতাবশত অমূলক কাজকর্ম করতেন, কীভাবে সেসব কাজকর্মের অসাড়তা অনুভব করলেন এবং কীভাবে ইসলাম তাদের জীবনকে আলোকিত করল এসব ব্যাপার নিয়ে কথা বলতেন। মাঝে মাঝে তো তাঁরা তাদের ইসলামপূর্ব জীবনের অজ্ঞতাপূর্ণ কাজকর্মের কথা বলে নিজেরাই হাসতেন। নবীজি-ও মাঝে মাঝে মুচকি হেসে তাদের সাথে যোগ দিতেন। নবীজির হাসি মুচকি হাসিতেই সীমাবদ্ধ থাকত। তিনি সাধারণত সূর্যোদয় পর্যন্ত সময়কাল মসজিদেই অতিবাহিত করতেন। এ সময়টাতে তিনি খুব অত্যুজ্জ্বল অবস্থায় থাকতেন।
মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় তিনি পড়তেন:
بِسْمِ اللَّهِ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ اللَّهُمَّ اعْصِمْنِي مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ
অর্থ : আল্লাহর নামে (বের হচ্ছি)। আল্লাহর রাসূলের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। হে আল্লাহ, আপনি আমার গুনাহসমূহ মাফ করে দিন এবং আমার জন্য আপনার দয়ার দরজাগুলো খুলে দিন। হে আল্লাহ, আমাকে বিতাড়িত শয়তান থেকে হেফাযত করুন।'
এরপরে রাসূলুল্লাহ উম্মুল মুমিনীনদের কক্ষে যেতেন। গৃহে প্রবেশ করে প্রথমেই তিনি মিসওয়াক করতেন। পরিবারকে অভ্যর্থনা জানিয়ে বলতেন, “আসসালামু আলাইকুম, আপনারা কেমন আছেন, হে গৃহের অধিবাসীগণ?”
সকালের এই সময়টাতে রাসূলুল্লাহ প্রত্যেক স্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করতেন, তাদের অভ্যর্থনা জানাতেন এবং তাদের জন্য দুআ করতেন; কিন্তু কারও সাথেই বেশিক্ষণ থাকতেন না। তিনি যদি উম্মুল মুমিনীনদের কারও কক্ষে প্রবেশ করে তাদের ইবাদাতরত অবস্থায় দেখতেন, তাহলে সেভাবেই রেখে চলে আসতেন।
বর্ণিত আছে, নবীজি একবার জুয়ায়রিয়‍্যাহ রা. এর কক্ষে প্রবেশ করে তাকে ইবাদাতের স্থানে যিকিরমগ্ন অবস্থায় দেখতে পেলেন। তখন নবীজি সেখান থেকে বেরিয়ে পড়লেন, যাতে করে জুয়ায়রিয়্যাহ রা. স্বীয় ইবাদাত চালিয়ে যেতে পারেন। কখনো নবীজি -এর খেতে ইচ্ছা করলে স্ত্রীদের শুধু জিজ্ঞেস করতেন, “তোমাদের কাছে কী (খাওয়ার মতো) কিছু আছে?”
যদি তাদের কাছে খাদ্য থাকত, তাহলে তারা তা নিয়ে এসে নবীজিকে দিতেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ খাবারগুলো খুবই সাধারণ আর হালকা ধরনের হতো, যেমন: কিছু খেজুর, পনির অথবা হায়েস। কখনো কখনো এই সময় তাঁর খাদ্য হতো শুধু এক গ্লাস দুধ বা কিছু খেজুর বা মধুর মিশ্রণে বানানো আরবদের পান করা একধরনের পানীয়। যদি তাদের কাছে দেয়ার মতো কোনো খাবার না থাকত তখন নবীজি বলতেন, “তাহলে আমি আজ রোজা রাখছি।”

টিকাঃ
৩০. মুসনাদ আহমদ: ১৭১৪২, ১৭১৪৪; আবু দাউদ: ৪৬০৭
৩১. সূরা আল ফাতহ, ৪৯:২
৩২. মুসনাদ আহমদ: ২৩৭৮৭
৩৩. মুসনাদ আহমদ: ২১১৩; আবূ দাউদ: ৪৬৩২; তিরমিযী: ২২৯৩
৩৪. আবু দাউদ: ৪৬৫; ইবনু মাজাহ: ৭৭২
৩৫. হায়েস হচ্ছে খেজুর, পনির আর ঘিয়ের মিশ্রণে বানানো শুকনো খাদ্য, যা আরবরা সফরের সময় নিয়ে যেতো।
৩৬. এক বিশেষ ধরনের পানীয় যা খেজুর, কিশমিশ আর মধু মিশিয়ে বানানো হয়। এগুলোতে পানি মিশিয়ে একদিন বা কিছু বেশি সময় রেখে দেওয়া হয়। এধরনের পানীয় জায়েয যতক্ষণ না তা ওয়াইনের মৃত (মদ) না হয়ে যায়।

📘 নবীজির দিনলিপি ﷺ > 📄 দিনের প্রথম প্রহর

📄 দিনের প্রথম প্রহর


রাতের অন্ধকার চিরে ভোরের প্রথম আলো সবেমাত্র ফুটে উঠেছে। সুবহে সাদিকের এমন মুহূর্তেই বিলাল রা.-এর দরাজ গলা মদীনায় রাতের নীরবতা ভেঙে দিল। তিনি সুমধুর কণ্ঠে ফজরের আযান দিচ্ছেন। আল্লাহর রাসূল এই সময়টাতে ঘুমিয়ে আছেন, দীর্ঘরাত্রি নফল নামাযে দাঁড়িয়ে থাকার পর হালকা বিশ্রাম নিচ্ছেন। বিলাল রা.-এর আযান শুনে আল্লাহর রাসূল জাগ্রত হলেন। ঘুম থেকে উঠে তিনি প্রথম যে কাজটি করতেন তা হলো, তিনি মিসওয়াক হাতে নিয়ে দাঁত মাজতেন। তারপর বলতেন,
الْحَمْدُ للهِ الَّذِي أَحْيَانَا بَعْدَ مَا أَمَاتَنَا وَإِلَيْهِ النُّشُورُ
অর্থ : 'সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি (নিদ্রারূপ) মৃত্যুর পর আমাদের জীবিত করলেন, আর তাঁরই নিকট সকলের পুনরুত্থান।'
অতঃপর রাসূল আযানের জবাব দিতেন। মুয়াজ্জিন যখন বলতেন, 'আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার'-আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ! আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ!, সে সময় তিনিও একই কথা উচ্চারণ করতেন।
যখন মুয়াজ্জিন বলতেন, 'আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, তখন নবী বলতেন 'ওয়া আনা'-আমিও (একই সাক্ষ্য) দিচ্ছি।
মুয়াজ্জিন যখন বলতেন, 'আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ'-আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, তখন আল্লাহর রাসূল-ও আগের মতো অনুরূপভাবে একই সাক্ষ্য দিতেন।
মুয়াজ্জিন যখন মানুষকে আহ্বান জানিয়ে বলতেন, 'হাইয়্যা আলাস সালাহ, হাইয়্যা আলাল ফালাহ'-সালাতের দিকে আসো, কল্যাণের দিকে আসো, তখন আল্লাহর রাসূল ﷺ প্রত্যেকবার বলতেন 'লা হাওলা ওয়া লা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ'-মহান আল্লাহর সাহায্য ও সহায়তা ছাড়া আর কোনো আশ্রয় ও সাহায্য-ক্ষমতা নেই। এভাবে তিনি মুয়াজ্জিনের কথার পুনরাবৃত্তি করে আযানের বাকি অংশেরও জবাব দিতেন।
আযানের পরে তিনি ﷺ দুআ করতেন এই বলে:
اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ، وَالصَّلَاةِ الْقَائِمَةِ، آتِ مُحَمَّدًا الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ ، وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُودًا الَّذِي وَعَدْتَهُ، إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ
অর্থ : 'হে আল্লাহ, এই পরিপূর্ণ আহ্বান ও প্রতিষ্ঠিত সালাতের তুমিই রব। মুহাম্মাদ ﷺ-কে দান করো 'অসীলা' এবং সর্বোচ্চ মর্যাদা। আর তাঁকে মাকামে মাহমুদ তথা সর্বোচ্চ প্রশংসিত স্থানে পৌঁছে দাও, যার ওয়াদা তুমি তাঁকে দিয়েছ। নিশ্চয় তুমি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করো না।'
অতঃপর নবী ﷺ উঠে বসতেন। গোসলের প্রয়োজন হলে তিনি গোসল সারতেন আর উযুর প্রয়োজন হলে উযু করে নিতেন। মাঝে মাঝে তিনি উযু না করেই সালাতে রওনা হতেন। কেউ হয়তো তাকে প্রশ্ন করত, এ রকম করা ঠিক কি না? তার উত্তর ছিল, 'আমার চক্ষু শুধু ঘুমায়, কিন্তু অন্তর সদা জাগ্রত থাকে।'
তারপর তিনি ফজরের দুই রাকাত সুন্নাত সালাত আদায় করতেন। তিনি এই দুই রাকাত সালাত খুবই দ্রুততার সাথে আদায় করতেন, যা অন্য ওয়াক্তের সালাতের বেলায় সচরাচর দেখা যেত না। তিনি সাধারণত সূরা ফাতিহার পর প্রথম রাকাতে সূরা কাফিরুন পড়তেন। আর দ্বিতীয় রাকাতে পড়তেন সূরা ইখলাস।
তা ছাড়া মাঝে মাঝে রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রথম রাকাতে সূরা বাকারার ১৩৬ নং আয়াতটি তিলাওয়াত করতেন :
قُولُوا آمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنْزِلَ إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ
وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَى وَعِيسَى وَمَا أُوتِيَ النَّبِيُّونَ مِنْ رَبِّهِمْ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ
অর্থ: তোমরা বলো, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর ওপর এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের প্রতি এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তদীয় বংশধরের প্রতি এবং মূসা, ঈসা, অন্যান্য নবীকে পালনকর্তার পক্ষ থেকে যা দান করা হয়েছে, তৎসমুদয়ের ওপর। আমরা তাদের মধ্যে পার্থক্য করি না। আমরা তাঁরই আনুগত্যকারী।
আর দ্বিতীয় রাকাতে তিলাওয়াত করতেন সূরা আলে ইমরানের ৬৪ নং আয়াতটি :
قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ
অর্থ: বলুন, 'হে আহলে কিতাবগণ, তোমরা এমন একটি কথার দিকে আসো, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে সমান। তা হলো, আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করব না, তাঁর সাথে কোনো শরীক সাব্যস্ত করব না এবং একমাত্র আল্লাহকে ছাড়া কাউকে পালনকর্তা বানাব না। তারপর যদি তারা স্বীকার না করে, তাহলে বলে দাও যে, সাক্ষী থাকো-আমরা তো অনুগত।
অনেক সময় সূরা আল-ইমরানের ৫২ ও ৫৩ নং আয়াতও তিলাওয়াত করতেন :
فَلَمَّا أَحَسَّ عِيسَى مِنْهُمُ الْكُفْرَ قَالَ مَنْ أَنْصَارِي إِلَى اللَّهِ قَالَ الْحَوَارِيُّونَ نَحْنُ أَنْصَارُ اللَّهِ آمَنَّا بِاللَّهِ وَاشْهَدْ بِأَنَّا مُسْلِمُونَ
অর্থ: অতঃপর ঈসা (আ.) যখন বনি-ঈসরাঈলের কুফরী সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পারলেন, তখন বললেন, কারা আছে আল্লাহর পথে আমাকে সাহায্য করবে? সঙ্গী- সাথিরা বলল, আমরা রয়েছি আল্লাহর পথে সাহায্যকারী। আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি। আর তুমি সাক্ষী থাকো যে, আমরা হুকুম কবুল করে নিয়েছি। হে আমাদের পালনকর্তা, আমরা সে বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছি, যা তুমি নাযিল করেছ, আমরা রাসূলের অনুগত হয়েছি। অতএব আমাদের মান্যকারীদের তালিকাভুক্ত করে নাও।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ফজরের এই দুই রাকাত সুন্নাত সালাত অত্যন্ত আগ্রহ ও মনোযোগের সাথে আদায় করতেন। তিনি বলতেন, 'দুনিয়া এবং তার মধ্যে যা কিছু আছে সেসব কিছু হতেও এই দুই রাকাত সুন্নত সালাত আমার নিকট অধিক মূল্যবান।'
ফজরের সুন্নত সালাত আদায়ের পর রাসূল ﷺ যদি স্বীয় পত্নীকে জাগ্রত অবস্থায় পেতেন তবে তিনি তাঁর সাথে প্রীতি ও ভালোবাসার আলাপচারিতা করতেন। এমন একজন স্ত্রী কতই-না সুখী, যার দিন শুরু হয় আপন স্বামীর সাথে প্রেমময় আলাপনের মধ্য দিয়ে! যদি রাসূলুল্লাহ-এর স্ত্রী তখনো ঘুমিয়ে থাকতেন, তবে তিনি ফরজ সালাতের আগ পর্যন্ত ডান দিকে কাত হয়ে শুয়ে থাকতেন।
জামাতের সময় ঘনিয়ে এলে বিলাল রা. নবীজি ﷺ-এর কক্ষের নিকটে এসে ডাক দিয়ে বলতেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, সালাতের সময় হয়েছে।' তখন নবীজি ﷺ সালাত পড়ানোর জন্য বেরিয়ে আসতেন। তিনি যখন তাঁর কক্ষ থেকে বের হতেন, তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতেন,
بِسْمِ اللَّهِ تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَضِلَّ، أَوْ أُضَلَّ، أَوْ أَزِلَّ، أَوْ أُزَلَّ، أَوْ أَظْلِمَ، أَوْ أَظْلَمَ، أَوْ أَجْهَلَ، أَوْ يُجْهَلَ عَلَيَّ
অর্থ : “হে আল্লাহ, আমি আপনার নিকট পথভ্রষ্ট হওয়া বা পথভ্রষ্ট করা, পদস্খলিত হওয়া বা পদস্খলিত করা, উৎপীড়ন করা বা উৎপীড়িত হওয়া, অজ্ঞতা প্রকাশ করা বা অজ্ঞতা প্রকাশের পাত্র হওয়া থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।”
মসজিদে প্রবেশ করার পর বলতেন,
بِسْمِ اللَّهِ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ اللَّهُمَّ افْتَحْ لِي أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ
অর্থ : শুরু করছি আল্লাহর নামে। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর নবীর ওপর। হে আমার রব, আপনি আমার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিন। হে আল্লাহ, আপনি আমার জন্য আপনার রহমতের দরজাসমূহ খুলে দিন।
যখন বিলাল রা. নবীজিকে মসজিদে প্রবেশ করতে দেখতেন, তখন তিনি সালাতের ইকামাত দিতেন আর সাহাবীগণও (রাদ্বিয়াল্লাহু আজমাইন) কাতারবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে যেতেন।
রাসূল যখন সালাতের জন্য বেরিয়ে আসতেন, তখন হয়তো তার মাথা থেকে গোসলের পানি ঝরতে দেখা যেত। এমনও হয়েছে যে, ইকামাত ঘোষিত হয়ে গেছে, সাহাবীগণও রা. সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গেছেন আর নবীজি -ও সালাতের জন্য বেরিয়ে এসে নির্দিষ্ট স্থানে ইমামতির জন্য দাঁড়ালেন; এমন সময় তাঁর স্মরণ হলো যে, তিনি জানাবাতের হালতে আছেন।
রাসূল তখন হাত দিয়ে সাহাবীদের রা. ইশারা করতেন থামার জন্য আর বলতেন, 'তোমরা স্বস্থানে দাঁড়িয়ে থাকো।' অতঃপর তিনি নিজ গৃহে ফিরে গিয়ে তাড়াতাড়ি গোসল সেরে বেরিয়ে আসতেন। সে সময় তার মাথা বেয়ে গোসলের পানি গড়িয়ে পড়ত।
নবীজী না এসব ব্যাপার লুকোতেন, না তিনি লজ্জাবোধ করতেন। তিনিও তো একজন মানুষ ছিলেন, যার জীবনে মানবীয় সব দিকের প্রতিফলন ছিল। ঠিক যেমনটি কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,
وَلَوْ جَعَلْنَاهُ مَلَكًا لَجَعَلْنَاهُ رَجُلًا
অর্থ : যদি আমি কোনো ফেরেশতাকে রাসূল করে পাঠাতাম, তবে সে মানুষের আকারেই হতো।
রাসূল যখন নামাজে দাঁড়াতেন, তখন পেছনের মুসল্লিগণ সারিবদ্ধভাবে সোজা কাতারে দাঁড়িয়েছেন কি না তা প্রথমে নিশ্চিত হয়ে নিতেন। তিনি বলতেন, 'কাতার সোজা করো এবং একে অপরের নিকটবর্তী হয়ে দাঁড়াও। কাতার সোজা করা সালাতের পরিপূর্ণতার অংশ।' অতঃপর নবীজি 'আল্লাহু আকবার' বলে সালাত শুরু করতেন। তারপর তিনি বাম হাতের ওপর ডান হাত রেখে নামাজে দাঁড়াতেন আর নিঃশব্দে নিম্নোক্ত দুআটি করতেন :
اللَّهُمَّ بَاعِدْ بَيْنِي وَبَيْنَ خَطَايَايَ كَمَا بَاعَدْتَ بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ، اللَّهُمَّ نَقْنِي مِنْ خَطَايَايَ كَمَا يُنَقَّى الثَّوْبُ الْأَبْيَضُ مِنَ الدَّنَسِ، اللَّهُمَّ اغْسِلْنِي مِنْ خَطَايَايَ بِالثَّلْجِ وَالْمَاءِ وَالْبَرَدِ
অর্থ : হে আল্লাহ, আপনি আমার এবং আমার গুনাহসমূহের মাঝে এমন দূরত্ব সৃষ্টি করুন, যেরূপ দূরত্ব সৃষ্টি করেছেন পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে। হে আল্লাহ, আপনি আমাকে আমার গুনাহসমূহ থেকে এমনভাবে পরিষ্কার করে দিন, যেমন সাদা কাপড় ময়লা থেকে পরিষ্কার করা হয়। হে আল্লাহ, আপনি আমাকে আমার পাপসমূহ বরফ, পানি ও মেঘের শিলাখণ্ড দ্বারা ধৌত করে দিন।
তারপর রাসূল সশব্দে কুরআনের প্রথম সূরা তথা সূরা ফাতিহা তিলাওয়াতের মাধ্যমে সালাত শুরু করতেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে তিলাওয়াত করতেন এবং সূরা ফাতিহার প্রত্যেক আয়াত তিলাওয়াতের পর থামতেন। সূরা ফাতিহা তিলাওয়াতের পর তিনি কোরআনের যেকোনো অংশ থেকে তিলাওয়াত করতেন। প্রথম রাকাতের চেয়ে দ্বিতীয় রাকাতের তিলাওয়াত তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত হতো। তিনি এই দুই রাকাতে সব মিলিয়ে প্রায় ৬০ থেকে ১০০ আয়াত পর্যন্ত তিলাওয়াত করতেন। ফজরের সময় কুরআন তিলাওয়াত করার যে নির্দেশ কুরআনে দেয়া হয়েছে সেদিকে লক্ষ রেখেই রাসূল এমনটি করতেন। আল্লাহ বলেন :
أَقِمِ الصَّلَاةَ لِدُلُوكِ الشَّمْسِ إِلَى غَسَقِ اللَّيْلِ وَقُرْآنَ الْفَجْرِ إِنَّ قُرْآنَ الْفَجْرِ كَانَ مَشْهُودًا
অর্থ : সূর্য ঢলে পড়ার সময় থেকে রাত্রির অন্ধকার পর্যন্ত নামায কায়েম করুন এবং ফজরের কোরআন পাঠও (চালু রাখুন)। নিশ্চয় ফজরের কোরআন পাঠে (ফেরেশতারা) উপস্থিত হয়।
জুমার দিন রাসূল সাধারণত ফজরের ফরয সালাতের প্রথম রাকাতে সূরা আস-সাজদাহ আর দ্বিতীয় রাকাতে সূরা আল-ইনসান পাঠ করতেন।
যখন মুসলিম উম্মাহ কোনো কঠিন পরীক্ষা বা দুর্যোগের মুখোমুখি হতো, তখন প্রিয় নবী দ্বিতীয় রাকাতে উম্মতের জন্য দুআ করতেন। তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করতেন, যাতে আল্লাহ অশান্তি কাটিয়ে দেন এবং মুসলিম উম্মাহকে প্রশান্তি ও বিজয় দান করেন। কবি আব্দুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা রা., যিনি একজন আনসারী সাহাবী ছিলেন, তিনি এই দৃশ্য কাব্যের ভাষায় লেখেন,
“আমাদের মাঝে আছেন আল্লাহরই রাসূল, যেন ভোরের আঁধার নির্মূল করে দেয়া এক উজ্জ্বল আলো, তিনি আমাদের পড়ে শোনান আল্লাহরই কিতাব।”
রাসূলুল্লাহ সালাত শেষ হয়ে গেলে কিবলামুখী হয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকতেন, আর দুআ করতেন:
أَسْتَغْفِرُ اللهَ اللَّهُمَّ أَنْتَ السَّلامُ، وَمِنْكَ السَّلَامُ، تَبَارَكْتَ يَا ذَا الْجَلالِ وَالْإِكْرَامِ
অর্থ : আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি (আস্তাগফিরুল্লাহ, ৩ বার)। হে আল্লাহ, আপনি শান্তিময়। আপনার নিকট থেকেই শান্তি বর্ষিত হয়। আপনি বরকতময়, হে মহিমাময় ও সম্মানের অধিকারী।
তারপর তিনি ডান পাশে ফিরে (মাঝে মাঝে বাম পাশেও ফিরে) বসতেন। তিনি যখন সাহাবীদের দিকে ফিরে বসতেন, তখন সাহাবীগণ রাসূল -কে প্রথম যে কথা বলতে শুনতেন তা হলো : “হে আমার রব, যেদিন আপনি আপনার দাসদের পুনরুত্থিত করবেন, সেদিনের আযাব থেকে আমি পরিত্রাণ চাই।”
তারপর তিনি যিকিরে মশগুল হয়ে যেতেন। তিনি বলতেন,
لا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرُ
অর্থ : একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো হক ইলাহ নেই। তাঁর কোনো শরীক নেই। রাজত্ব তাঁরই। সমস্ত প্রশংসাও তাঁর। আর তিনি সকল কিছুর ওপর ক্ষমতাবান। হে আল্লাহ, আপনি যা প্রদান করেছেন তা বন্ধ করার কেউ নেই, আর আপনি যা রুদ্ধ করেছেন তা প্রদান করার কেউ নেই। আর কোনো ক্ষমতা-প্রতিপত্তির অধিকারীর ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি আপনার কাছে কোনো উপকারে আসবে না।
তারপর তিনি স্বাভাবিক নিয়মে 'সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার' পড়ে সকালের যিকির শুরু করতেন। তিনি কখনো বলতেন :
أَصْبَحْنَا وَأَصْبَحَ (أَمْسَيْنَا وَأَمْسَيا) الْمُلْكُ لِلَّهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ، رَبِّ أَسْأَلُكَ خَيْرَ مَا فِي هَذَا الْيَوْمِ هَذِهِ اللَّيْلَةِ) وَخَيْرَ مَا بَعْدَهُ (بَعْدَهَا)، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا فِي هَذَا الْيَوْمِ هَذِهِ اللَّيْلَةِ) وَشَرِّ مَا بَعْدَهُ (بَعْدَهَا)، رَبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْكَسَلِ وَسُوءِ الْكِبَرِ، رَبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابٍ فِي النَّارِ وَعَذَابِ فِي الْقَبْرِ
অর্থ : আমরা আল্লাহর জন্য সকালে উপনীত হয়েছি। অনুরূপ যাবতীয় রাজত্বও সকালে উপনীত হয়েছে আল্লাহর জন্য। সমুদয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো হক ইলাহ নেই, তাঁর কোনো শরীক নেই। রাজত্ব তারই এবং প্রশংসাও তাঁর। আর তিনি সকল কিছুর ওপর ক্ষমতাবান। হে রব, এই দিনের মাঝে এবং তার পরে যা কিছু কল্যাণ আছে আমি তা আপনার নিকট প্রার্থনা করি। আর এই দিনের মাঝে যা কিছু অকল্যাণ আছে, তা থেকে আমি আপনার আশ্রয় চাই। হে রব, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই অলসতা ও খারাপ বার্ধক্য থেকে। হে রব, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই জাহান্নামের আযাব হওয়া থেকে এবং কবরের আযাব হওয়া থেকে।
তিনি একই দুআ বিকালেও করতেন, শুধু দুআয় 'সকাল'-এর জায়গায় 'বিকাল' শব্দ যুক্ত হতো।
প্রিয়নবী সকাল-সন্ধ্যায় একটি দুআ করতে ভুলতেন না। দুআটি হলো:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ، اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ فِي دِينِي وَدُنْيَايَ وَأَهْلِي ، وَمَالِي، اللَّهُمَّ اسْتُرْ عَوْرَاتِي، وَآمِنْ رَوْعَاتِي اللَّهُمَّ احْفَظْنِي مِنْ بَينِ يَدَيَّ، وَمِنْ خَلْفِي، وَعَنْ يَمِينِي، وَعَنْ شِمَالِي، وَمِنْ فَوْقِي، وَأَعُوذُ بِعَظَمَتِكَ أَنْ أَغْتَالَ مِنْ تَحْتِي
অর্থ : হে আল্লাহ, আমি আপনার নিকট দুনিয়া ও আখেরাতে ক্ষমা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ, আমি আপনার নিকট ক্ষমা এবং নিরাপত্তা চাচ্ছি আমার দ্বীন, দুনিয়া, পরিবার ও অর্থ-সম্পদের। হে আল্লাহ, আপনি আমার গোপন ত্রুটিসমূহ ঢেকে রাখুন, আমার উদ্বিগ্নতাকে রূপান্তরিত করুন নিরাপত্তায়। হে আল্লাহ, আপনি আমাকে হেফাযত করুন আমার সামনে থেকে, আমার পেছন থেকে, আমার ডান দিক থেকে, আমার বাম দিক থেকে এবং আমার ওপরের দিক থেকে। আর আপনার মহত্ত্বের উসিলায় আশ্রয় চাই আমার নীচ থেকে হঠাৎ আক্রান্ত হওয়া থেকে।
তিনি সকাল-সন্ধ্যায় নিচের দুআটি তিনবার করতেন,
اللَّهُمَّ عَافِنِي فِي بَدَنِي، اللَّهُمَّ عَافِنِي فِي سَمْعِي، اللَّهُمَّ عَافِنِي فِي بَصَرِي، لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْكُفْرِ، وَالفَقْرِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ، لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ
অর্থ : হে আল্লাহ, আমাকে নিরাপত্তা দিন আমার শরীরে। হে আল্লাহ, আমাকে নিরাপত্তা দিন আমার শ্রবণশক্তিতে। হে আল্লাহ, আমাকে নিরাপত্তা দিন আমার দৃষ্টিশক্তিতে। আপনি ছাড়া কোনো হক ইলাহ নেই। হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই কুফর ও দারিদ্র্য থেকে। আর আমি আপনার আশ্রয় চাই কবরের আযাব থেকে। আপনি ছাড়া আর কোনো হক ইলাহ নেই।
ভোরের এই স্নিগ্ধ সময়টাতে সম্পূর্ণ মদীনার লোকজন পানিভর্তি পাত্র নিয়ে নবীজি -এর কাছে আসত। তারা তাকে অনুরোধ করত, যাতে তিনি পানিতে নিজের বরকতময় হাত ডুবিয়ে দুআ করে দেন আর এর দ্বারা তারা বরকত লাভ করতে পারে। মাঝে মাঝে যখন তীব্র শীতের সকালে পাত্র হাজির করা হতো, তখনও নবীজি হাসিমুখে প্রত্যেক পানির পাত্রেই হাত ডুবিয়ে দিতেন।
দৃশ্যটা খুবই মনোরম ছিল—নবীজি হাসিমুখে ছোট বাচ্চাদের কচি কচি হাতের দিকে তাকাতেন। নিষ্পাপ বাচ্চারাও রাসূল -এর কাছে বরকত চাইত। একটু দূর থেকে তাদের প্রিয় পিতামাতা হাসিমুখে দৃশ্যটি অবলোকন করতেন। বাচ্চারা পানিভর্তি পাত্র নিয়ে এগিয়ে যেত আর নবীজি হাসিমুখে পাত্রে হাত ডুবিয়ে দিতেন। এভাবে বাচ্চাদের অন্তরে নবীজি -এর প্রতি ভালোবাসা শিকড় গেড়ে নিত। কত সুখীই-না ছিল তাদের মুখখানা, যারা তাদের দিনের শুরু করত রাসূলুল্লাহ -এর হাসিমুখ দেখে!

টিকাঃ
১১. বুখারী ফাতহুল বারী ১১/১১৩, নং ৬৩১৪; মুসলিম ৪/২০৮৩, নং ২৭১১
১২. রাসূলুল্লাহ মৃত্যুকে ঘুমের সাথে তুলনা করতেন। তিনি বলতেন, 'ওয়াল্লাহি, তোমরা মৃত্যুবরণ করবে, ঠিক যেভাবে তোমরা ঘুমাও। আর তোমাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে, ঠিক যেভাবে তোমরা (ঘুম থেকে) জাগ্রত হও।'
১৩. সহীহ বুখারী, ১-২৫২; বায়হাকী, ১-৪১০
১৪. মুসনাদে আহমদ: ১৯১১, ২৪০৭৩; সহীহ বুখারী: ১১৪৭, ২০১৩
১৫. সূরা আল বাকারা, ২:১৩৬
১৬. সূরা আল ইমরান, ৩:৬৪
১৭. সূরা আল ইমরান, ৩:৫২,৫৩
১৮. সুনানে আবু দাউদ: ৫০৯৪; জামে তিরমিযী: ৩৪২৭; সুনানে ইবনু মাজাহ: ৩৮৮৪।
১৯. সুনানে আবু দাউদ: ৪৬৫; জামে তিরমিযী: ৩১৪
২০. 'জানাবাত' হচ্ছে বড় নাপাকির নাম। মূলত নাপাকি দুই ধরনের। জানাবাত আকবার বা বড় নাপাকি এবং জানাবাত আসগার বা ছোট নাপাকি। বড় নাপাকি বলতে বুঝানো হয় এমন অপবিত্র অবস্থাকে, যাকে যাকে দূর করার জন্য গোসল করার প্রয়োজন পড়ে। এই নাপাকি সৃষ্টির একটি কারণ হলো স্ত্রী-সহবাস করা। এমন নাপাকির হালতে থাকলে সালাত আদায়ের আগে অবশ্যই ফরজ গোসল করে নিতে হয়। আর ছোট নাপাকি বলতে বুঝানো হয় এমন অপবিত্র অবস্থাকে, যাকে দূর করার জন্য গোসলের প্রয়োজন হয় না। বরং অজু করে নেওয়ার দ্বারাই এই নাপাকি দূর হয়ে একজন ব্যক্তি সালাত আদায়ের জন্য পবিত্র হয়ে যায়। - সম্পাদক
২১. মুসনাদ আহমদ: ৭২৩৮, ৭৮০৪
২২. সূরা আল আনআম, ৬:৯
২৩. মুসনাদ আহমদ: ১২০১১, সহীহ বুখারী: ৭১৯
২৪. মুসনাদ আহমদ: ৭১৬৪; সহীহ বুখারী: ৭৪৪; আবূ দাউদ: ৭৮১
২৫. সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:৭৮
২৬. মুসনাদ আহমদ: ২২৪০৮; ইবনু মাজাহ: ১২৮
২৭. মুসনাদ আহমদ: ১৮১৫৮; আবূ দাউদ: ১৫০৫
২৮. মুসনাদ আহমদ: ৪১৯২
২৯. মুসনাদ আহমদ: ২০৪৩৯; আবু দাউদ: ৫০৯০

📘 নবীজির দিনলিপি ﷺ > 📄 ফের মসজিদে

📄 ফের মসজিদে


উম্মুল মুমিনীনদের সবার সাথে সাক্ষাৎ শেষে নবীজি আবার মসজিদে ফিরে আসতেন। মসজিদে প্রবেশ করে তিনি দুই রাকাত নফল সালাত আদায় করতেন। নবীজী সাধারণত 'মুহাজিরীন স্তম্ভ' নামক একটি স্তম্ভের পাশে দাঁড়িয়ে এই দুই রাকাত সালাত আদায় করতেন। এই স্তম্ভটির অবস্থান ছিল বরকতময় 'রিয়াযুল জান্নাহ' এর মধ্যবর্তী স্থানে। নফল সালাতের জন্য নবীজি প্রায়ই এ জায়গাটি পছন্দ করতেন।
তারপর তিনি 'রিয়াযুল জান্নাহ' নামক স্থানে বসতেন। তাঁর পিঠ থাকত আয়িশা রা. এর কক্ষের দিকে। সাহাবীগণ তখন প্রিয় নবীর চারপাশে জমায়েত হতেন। নবীজি এই সময়টাতে সাহাবীদের নিয়ে নিয়মিত বসতেন, তা সবার জানা ছিল। তাই কারও যদি নবীজির সাথে কোনো প্রয়োজন থাকত তবে তারা এই সময়ে মসজিদে এসে প্রিয় নবীর সাথে দেখা করতেন।
সাত-সকালের এ মজলিসে সাহাবীদের সংখ্যা কখনো কম আবার কখনো বেশি হতো। যখন সংখ্যা অল্প থাকত তখন তারা গোল হয়ে নবীজিকে ঘিরে বসতেন। আর সংখ্যায় বেশি থাকলে সাহাবীগণ নবীজিকে মাঝখানে রেখে ডানে ও বামে দুই কাতার করে বসতেন। ফলস্বরূপ কেউ যদি রাসূলের কাছে কোনো প্রয়োজনে আসতে চাইত বা কারও কোনো প্রশ্ন থাকত, তাহলে সে সহজেই রাসূলের নিকটে যেতে পারত। এ রকমই ছিল আমাদের প্রিয় নবীর বরকতময় মজলিস।
এ সময়টাতে রাসূল সাহাবীদের সাথে কথা বলতেন। লোকদের মধ্যে রাসূল ছিলেন সবচেয়ে বেশি বাগ্মিতার অধিকারী-সুবক্তা। সবাই তাঁর কথা শুনতে ভালোবাসত। নবীজির কথা বলার ধরন ছিল অত্যন্ত সুন্দর; না তিনি অতি দ্রুত কথা বলতেন, আর না তিনি অতি ধীরে কথা বলতেন-বরং তিনি প্রত্যেকটি শব্দ পরিষ্কারভাবে উচ্চারণ করতেন। তাই কেউ যদি গুনতে চাইত যে কোন কথা রাসূল ﷺ কয়বার বললেন, সে তা অনায়াসেই গুনতে পারত। আয়িশা রা. বলেন, "তোমরা যেভাবে কথা বলো, আল্লাহর রাসূল সেভাবে কথা বলতেন না। তিনি স্পষ্টভাবে কথা বলতেন। যাতে করে তাঁর কাছে বসে কথা শুনছেন এমন প্রত্যেকেই কথাগুলো মুখস্থ করে নিতে পারে।”
রাসূল ﷺ শুধু নিজেই কথা বলতেন না, প্রায়ই সাহাবীদের সাথে কথোপকথন করতেন। কখনো তিনি সাহাবীদের প্রশ্ন করতেন যাতে সাহাবীগণ উত্তর জানার ব্যাপারে আগ্রহ বোধ করেন।
একবার তিনি বললেন, "আমি কি তোমাদের বলব সবচেয়ে বড় গুনাহ কী?”
সাহাবীগণ বললেন, “দয়া করে আমাদের বলে দিন, হে আল্লাহর রাসূল!”
তখন রাসূল জবাব দিলেন, “আল্লাহর সাথে শরীক করা, মাতাপিতার অবাধ্য হওয়া এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া।”
আবার কখনো-বা রাসূল ﷺ সাহাবীদের কাছে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করতেন যাতে আরও গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যাপারে সাহাবীদের মনোযোগ আকর্ষণ করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রশ্ন করলেন, "তোমরা কী জানো, কে দেউলিয়া?”
সাহাবীগণ বললেন, “দেউলিয়া হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যার কোনো অর্থ বা সম্পত্তি নেই।”
তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, "আমার উম্মতের মধ্যে সে ব্যক্তি প্রকৃত দেউলিয়া, যে কিয়ামতের দিন সালাত, সাওম ও যাকাতের সওয়াব নিয়ে আসবে; অথচ (সে দুনিয়াতে) কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, অমুকের সম্পদ ভোগ করেছে, অমুককে হত্যা করেছে ও আরেকজনকে প্রহার করেছে। এরপর তার নেক আমলগুলো বদলা হিসেবে ওই লোকদের দিয়ে দেওয়া হবে। পাওনাদারদের হক পরিশোধের আগেই তার নেক আমল নিঃশেষ হয়ে গেলে তাদের পাপের একাংশ তাদের কাছ থেকে নিয়ে ওই ব্যক্তিকে দিয়ে দেওয়া হবে। পরিশেষে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।”
মাঝে মাঝে রাসূল সাহাবীদের প্রশ্ন করতেন, যাতে করে সাহাবীগণ উত্তরের ব্যাপারে গভীরভাবে চিন্তা করেন। একবার রাসূল সাহাবীদের প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা বলো তো কোন সে গাছ, যার প্রকৃতি মুসলিমদের মতো। সে তার পাতা কখনো বিসর্জন দেয় না আর সারাবছরই ফল প্রদান করে।”
সাহাবীগণ বিভিন্ন স্থানে জন্মানো নানা প্রজাতির গাছের নাম বললেন। কিন্তু প্রত্যেকবার রাসূল তাদের উত্তরকে নাকচ করে দিলেন। সেখানে যে দশ জন সাহাবী উপস্থিত ছিলেন তাদের মধ্যে বয়সের দিক থেকে সবার ছোট ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনু উমর রা.। তিনি ভাবলেন এর উত্তর হবে খেজুর গাছ। কিন্তু আশেপাশে তাকিয়ে তিনি আবু বকর আর নিজ পিতা উমরের মতো সাহাবীদের দেখে উত্তর দেয়ার সাহস পেলেন না। পরে রাসূলই বলে দিলেন, এটি হচ্ছে খেজুর গাছ।
রাসূল মাঝে মাঝে নিজের বক্তব্যের কিছু অংশ তিনবার বলতেন। তিনি এটি করতেন কোনো কথার গুরুত্ব বোঝাতে অথবা নিশ্চিত হতে যে, সবাই কথাটি বুঝতে পেরেছে। তিনি গুরুত্ব বোঝাতে তিনবারের বেশি একই কথার পুনরাবৃত্তি করেছেন এমন নজিরও আছে। উদাহরণস্বরূপ তিনি একবার কবিরা গুনাহ সম্পর্কে বলছিলেন। তখন বললেন, “আর ইচ্ছা করে মিথ্যা বলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য করাও (কবিরা গুনাহ)।” তিনি এ কথাটি এত বেশিবার পুনরাবৃত্তি করছিলেন যে উপস্থিত সবাই কামনা করছিল তিনি যাতে থামেন। সবাই বুঝতে পারছিল যে রাসূল অত্যন্ত কঠোরভাবে এ কাজগুলো করতে নিষেধ করছেন।
রাসূল মাঝে মাঝে সাহাবীদের হঠাৎ করে প্রশ্ন করতেন এবং সেই প্রশ্নের উত্তর থেকে এমন সিদ্ধান্তের দিকে ধাবিত হতেন, যা সাহাবীদের কল্পনাতেই থাকত না। দৃষ্টান্তস্বরূপ, রাসূল একবার সাহাবীদের প্রশ্ন করলেন, “আজ কে কে সিয়াম (রোযা) পালন করছ?” সাহাবীগণ তো এমন প্রশ্নের জন্য সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত ছিলেন। যদি তারা জানতেন আজই রাসূল এ প্রশ্ন করবেন, তবে হয়তো তাদের প্রত্যেকেই সেদিন রোযা রাখতেন। তাই তারা সবাই চুপ থাকলেন। আবু বকর রা. শুধু জবাব দিলেন যে, তিনি রোযা আছেন।
রাসূল ﷺ আবার প্রশ্ন করলেন, “তোমাদের মধ্যে কে কে আজ অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গিয়েছে?”
এবারও শুধু আবু বকর রা.-ই ইতিবাচক জবাব দিলেন। রাসূল ﷺ এবার আরেকটি প্রশ্ন করলেন, "তোমাদের মধ্যে কে আজ জানাযায় অংশগ্রহণ করেছ?”
আবু বকর ছাড়া এবারও সবাই চুপ থাকল। রাসূল ﷺ পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, "আজ কারা একজন দরিদ্র লোককে আহার করিয়েছ?”
উপস্থিত সবাই নীরব থাকলেন, কিন্তু আবু বকর জবাব দিলেন যে, তিনি আহার করিয়েছেন। তখন রাসূল ﷺ বললেন, "যদি একজন ব্যক্তি এ চারটি কাজ একই দিনে করে, তাহলে সে নিশ্চিতভাবে জান্নাতী।”
নবীজি ﷺ মাঝে মাঝে প্রতীকীভাবে কথা বলে কোনো বিষয়কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করতেন। একবার নবীজি মানুষের অন্তর থেকে ঈমান ও আমানতদারী উঠে যাবার ব্যাপারে কথা বলছিলেন। তিনি ﷺ বলেন, “একজন মানুষ হয়তো ঘুমোবে আর তখন তার অন্তর হতে আমানত তুলে নেয়া হবে। ফলে তার চিহ্ন থেকে যাবে একটি বিন্দুর মতো। এরপর আবার যখন সে ঘুমোবে তখন তার অন্তর থেকে আমানত তুলে নেয়া হবে। ফলে তার চিহ্ন ফোসকার মতো থেকে যাবে। যেমন একটি জ্বলন্ত অঙ্গারকে যদি তুমি তোমার পায়ে ওপরে রেখে দাও এতে পায়ে ফোসকা পড়ে যাবে এবং তুমি তা ফোলা দেখতে পাবে। অথচ তাতে (পুঁজ-পানি ব্যতীত) কিছু নেই। এ সময় মানুষ বেচাকেনা করবে ঠিকই, কিন্তু কেউ আমানত আদায় করবে না। (আমানতদার ব্যক্তি এত কমে যাবে যে,) বলা হবে, অমুক বংশে একজন আমানতদার আছেন। কাউকে বলা হবে সে কতই-না বাহাদুর, কতই-না হুঁশিয়ার আর বুদ্ধিমান; অথচ তার অন্তরে দানা-পরিমাণ ঈমানও নেই।”
মাঝে মাঝে নবীজি ﷺ কোনো চিহ্ন এঁকে সাহাবীদের তা দেখিয়ে কোনো বিষয় বিস্তারিত ব্যাখ্যা করতেন। একদিন নবীজি একটি চতুর্ভুজ আঁকলেন এবং এর মাঝখানে একটি রেখা টানলেন, যেটি চতুর্ভুজের বাইরে চলে গেল। তারপর দু-পাশ দিয়ে মাঝের রেখার সাথে ভেতরের দিকে কয়েকটা ছোট ছোট রেখা মেলালেন এবং সাহাবীদের জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কী জানো, এটা কী?”
সাহাবীগণ জবাব দিলেন, “আল্লাহ আর তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।”
তখন নবীজি বললেন, "এ মাঝামাঝি রেখাটা হলো মানুষ। আর ছোট ছোট রেখাগুলো নানারকম বিপদাপদ। এসব বিপদাপদ প্রত্যেক দিক থেকে তার নিকটে আসে। যদি সে এর একটাকে এড়িয়ে যায়, তবে অন্যটা তাকে আক্রমণ করে। আর অন্যটাকেও যদি এড়িয়ে যায়, তবে পরবর্তী অন্য একটি তাকে আক্রমণ করে। আর চতুর্ভুজটি হলো তার মৃত্যু; যা তাকে ঘিরে রেখেছে এবং একসময় তাকে ধরে ফেলবে। আর বাইরের দিকে বর্ধিত রেখাটি হলো তার আশা-আকাঙ্ক্ষা। সে এমন-সব জিনিসের আকাঙ্ক্ষা করে, যা তার জীবনের সীমাকে ছাড়িয়ে যায়; অথচ এর আগেই মৃত্যু এসে তাকে ধরে ফেলে।”
তারবিয়াত আর তাসাওউফের এ মজলিসগুলো ছিল সাহাবীদের জন্য শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের সময়। নবীজি শুধু নিজে বক্তৃতা দিয়ে একপেশোভাবে শিক্ষা দিতেন না; বরং তিনি দ্বিপাক্ষিক কথোপকথনে বেশি আগ্রহী ছিলেন। এতে শিক্ষার্থী সাহাবীগণও অংশ নিতে পারতেন। এই সময়টা ছিল প্রাণবন্ত এক অধিবেশন। আলোচনায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সাহাবীগণ তারবিয়াত লাভ করতেন ও নিজেদের আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতি সাধন করতে পারতেন।
এই অধিবেশনের আরেকটি উদ্দীপক বিষয় ছিল ঘন ঘন ইস্তেগফার পাঠ। সাহাবীগণ লক্ষ করতেন যে, তাদের প্রিয় রাসূল ক্রমাগত ইসতেগফার পাঠের মাধ্যমে মহান রবের দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। তারা কখনো কখনো গুনেও রাখতেন যে, একই অধিবেশনে রাসূল এক শ বার ইস্তেগফার পাঠ করেছেন। একবার তিনি এই দুআটি এক শ বার পাঠ করেন:
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
“হে আমার রব, আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার তাওবাহ কবুল করুন। আপনিই একমাত্র সত্তা, যিনি তাওবা কবুলকারী ও দয়াময়।"
সকালে নবীজি যখন মসজিদে অবস্থান করতেন, তখন ছোট শিশুদের তাঁর কাছে নিয়ে আসা হতো। তিনি তাদের জন্য দুআ করতেন। মাঝে মাঝে তিনি একটি খেজুর মুখে নিয়ে নরম করে তারপর শিশুদের মুখে দিতেন। এতে করে শিশুরাও খেজুরের সাথে লেগে থাকা নবীজি-এর বরকতময় থুতু মোবারকের সামান্য অংশ লাভ করত। তিনি মাঝে মাঝে শিশুদের নাম রেখে দিতেন এবং তাদের দুয়া করতেন।
একবার আবু উসায়েদ মালিক ইবনু রাবিয়াহ আল সাঈদী রা. নিজের নবজাতক শিশুকে এনে নবীজি-এর কোলে দিলেন। শিশুটি নবীজির কোলে ছিল আর আবু উসায়েদ রা. নবীজির পাশে বসে ছিলেন। তারপর নবীজি অন্য কাজে মনোযোগী হয়ে পড়লেন। আবু উসায়েদ ইশারা দিয়ে নিজের পরিবারের কাউকে দিয়ে বাচ্চাটিকে বাসায় পাঠিয়ে দিলেন। নবীজির হঠাৎ খেয়াল হলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, শিশুটি কোথায়? আবু উসায়েদ তখন বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমরা তাকে বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছি।”
নবীজি শিশুটির নাম জিজ্ঞেস করলেন। আবু উসায়েদ নাম জানালে নবীজি বললেন, “না, তাকে এই নামে ডাকবে না। তাকে আল-মুনযির নামে ডাকবে।” আবু উসায়েদ তারপর থেকে সেই সন্তানকে আল মুনযির নামেই ডাকতেন।
খেজুর ছিল মদীনার প্রধান ফল। মদীনাবাসীর প্রধান খাদ্যও ছিল খেজুর। তাই বছরে প্রথম যখন খেজুর পাকতে শুরু করত তা দেখে মদীনাবাসী খুবই প্রীত হতো। তারা সেই পাকা খেজুর নবীজি -এর জন্যই প্রথমে নিয়ে আসত। নবীজি তা নেওয়ার পর এই বলে দুআ করতেন :
اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي ثَمَرِنَا، وَبَارِكْ لَنَا فِي مَدِينَتِنَا، وَبَارِكْ لَنَا فِي صَاعِنَا، وَبَارِكْ لَنَا فِي مُدَّنَا، اللَّهُمَّ إِنَّ إِبْرَاهِيمَ عَبْدُكَ وَخَلِيلُكَ وَنَبِيُّكَ، وَإِنِّي عَبْدُكَ وَنَبِيُّكَ، وَإِنَّهُ دَعَاكَ لِمَكَّةَ، وَإِنِّي أَدْعُوكَ لِلْمَدِينَةِ بِمِثْلِ مَا دَعَاكَ لِمَكَّةَ، وَمِثْلِهِ مَعَهُ
অর্থ: “হে আল্লাহ, আপনি আমাদের ফল-ফলাদিতে বরকত দিন, আমাদের শহরে বরকত দিন, আমাদের সা তথা বড় পরিমাপক পাত্রে বরকত দিন, আমাদের মুদ্দ তথা ছোট পরিমাপক পাত্রে বরকত দিন। হে আমার রব, ইবরাহীম (আ.) ছিলেন আপনার বান্দা, বন্ধু ও নবী। আর আমিও আপনার বান্দা ও নবী। ইবরাহীম (আ.) আপনার কাছে মক্কা নগরীর জন্যে (সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার) দুআ করেছিলেন। আর আমি আপনার নিকট এই মদীনা নগরীর জন্য দুআ করছি। সেই দুআই যা, ইবরাহীম (আ.) মক্কা নগরীর ব্যাপারে করেছিলেন এবং তার দ্বিগুণ।”
তারপর নবীজি ﷺ সেখানে উপস্থিত হয়ে সবচেয়ে ছোট বাচ্চাকে ডাকতেন আর তার হাতে ফলটি দিতেন।
নবীজি ﷺ-এর মাহফিলে মাঝে মাঝে হাস্যরসিকতাও হতো। নবীজি রাশভারী ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন এবং সাহাবীগণ নবীজিকে অত্যন্ত সম্মান করতেন, আদব বজায় রাখতেন। কিন্তু তা সাহাবীদেরকে তাদের প্রিয় নবীজির সাথে স্বতঃস্ফূর্ত আন্তরিক ব্যবহার ও কথাবার্তা বলায় বাধা দিত না।
একদিন নবীজি সাহাবীদের সাথে কথা বলছিলেন এবং একজন বেদুইনও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। নবীজি ﷺ বলছিলেন, "জান্নাতবাসীদের কোনো একজন তার রবের কাছে চাষাবাদের অনুমতি চাইবে। তখন আল্লাহ তাআলা তাকে বলবেন, তুমি কি যা চাও, তা পাচ্ছ না?"
সে বলবে, “হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। কিন্তু আমার চাষ করার খুবই আগ্রহ।”
তারপর সে বীজ বুনবে এবং তার চারা জন্ম নেওয়া, গাছ বড় হওয়া ও ফসল কাটা সবকিছু পলকের মধ্যে হয়ে যাবে। আর তা (ফসল) হবে পাহাড়-সমান। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, “হে আদমসন্তান, এগুলো নিয়ে নাও। কোনো কিছুই তোমাকে তৃপ্তি দেয় না।"
নবীজির কথা শেষ হলে বেদুইন লোকটি বলে উঠল, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আল্লাহর কসম, এই ধরনের লোক আপনি কুরায়শী বা আনসারদের মধ্যেই পাবেন। কেননা, তারা চাষাবাদ পছন্দ করে। আর আমরা বেদুইনদের চাষাবাদের সাথে কোনো সম্পর্কই নেই।” এ কথা শুনে উপস্থিত সকল সাহাবীগণ এমনকি নবীজিও হেঁসে ফেললেন।
বিভিন্ন স্থান থেকে আগত প্রতিনিধিদলও সকালের এই সময়ে রাসূল ﷺ-এর সাথে দেখা করতে আসত। সফরকারী প্রতিনিধিদল সাধারণত রাতে মদীনার বাইরে অবস্থান করে সকালে শহরে প্রবেশ করে রাসূলের সাথে দেখা করতে মসজিদে আগমন করত। রাসূল তখন মসজিদেই সাহাবীদের সাথে অবস্থান করতেন। একবার মুদার গোত্র থেকে আগত একদল প্রতিনিধি নবীজি -এর সাথে দেখা করতে আসল। তখন দুপুর হয়ে গেছে। রাসূল তাদের দেখেই বুঝতে পারলেন যে, তারা দুর্বিষহ দারিদ্র্যের মাঝে দিনাতিপাত করছে। রাসূল-এর চেহারা অন্ধকার হয়ে গেল। যোহরের সালাত পড়ানোর পর তিনি সাহাবীদের সাদাকা প্রদানের জন্য উৎসাহ প্রদান করলেন। ফলে মুহূর্তের মধ্যেই তাঁর সামনে দুই স্তূপ কাপড় ও খাবার জমা হলো। পরে তিনি সেগুলো তাদের দিয়ে দিলেন।
আরেকবার আরবের পূর্বাঞ্চল থেকে আলহাসা নামক স্থানের আব্দুল কায়েসের গোত্র থেকে একদল প্রতিনিধি আসল। রাসূল তাদের স্বাগত জানিয়ে বললেন, “এই প্রতিনিধিদলকে অভিবাদন! না তোমরা কখনো অপমানিত হবে, আর না কখনো অনুশোচনা বোধ করবে।”
সম্ভবত সকালের এই বরকতময় সময়েই ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.) মানুষের বেশে রাসূল-এর সাথে সাক্ষাতে এসেছিলেন। সবাই তখন খুব অবাক হচ্ছিলেন। কারণ, উপস্থিত কেউ সেই মানুষটিকে চিনত না। উপরন্তু, তাঁর কাপড় ছিল অতিরিক্ত সাদা ও চুল ছিল অতিরিক্ত কালো। ভ্রমণের কোনো ক্লান্তি তাকে স্পর্শ করেনি। তিনি নবীজি -কে ইসলাম, ঈমান, ইহসান ও কেয়ামতের লক্ষণের ব্যাপারে প্রশ্ন করেন।
সম্ভবত এমন কোনো এক সকালেই দ্বিমাম ইবনু সালাবাহ রা. এসেছিলেন নবীজি -এর সাথে দেখা করতে। তিনি মসজিদের সামনে তার উটকে বসালেন আর উপস্থিত সবাইকে প্রশ্ন করলেন, "তোমাদের মধ্যে ইবনু আব্দুল মুত্তালিব কে?”
নবীজি জবাব দিলেন, “এই যে আমি।”
দ্বিমাম রা. বললেন, "আমি আপনাকে প্রশ্ন করতে চাই আর আমি শক্ত প্রকৃতির হব। তাই আমার কথাকে রূঢ়ভাবে নেবেন না।"
নবীজি বললেন, “তোমার যা-ই প্রশ্ন আছে, তা তুমি করতে পার।”
দ্বিমাম রা. বললেন, "আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করছি সেই প্রভুর নামে, যিনি আপনার রব এবং আপনার পূর্বে যারা এসেছিলেন তাদের সবারও রব, আপনাকে কি আল্লাহ সমগ্র মানবজাতির জন্য রাসূল বানিয়ে পাঠিয়েছেন?”
নবীজি জবাব দিলেন, “আল্লাহর কসম! তিনিই আমাকে পাঠিয়েছেন।”
তারপর তিনি নবীজিকে ইসলামের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন আর নবীজিও জবাব দিলেন। তারপর তিনি বললেন, "সেই আল্লাহর শপথ, যিনি আপনাকে সত্যের বার্তা দিয়ে পাঠিয়েছেন, আমি এগুলোর সাথে না নতুন কিছু অতিরিক্ত যোগ করব, না এগুলোর কিছু ছেড়ে দেব।”
দ্বিমাম ইবনু সালাবাহ রা. চলে গেলে নবীজি বললেন, “লোকটি উপকারী জ্ঞান শিক্ষালাভ করেছে। সে যদি তার কথার ব্যাপারে সত্যবাদী হয়, তাহলে সে জান্নাতী হবে।"
বিশেষ সময়ে বা জরুরি মুহূর্তে সকালের এই বরকতময় সময়টা মুসলিম উম্মাহর জন্য পরামর্শসভায় রূপ নিত। তখন সবাই ঘটমান বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতেন। উহুদ যুদ্ধের পূর্বে আক্রমণকারী কাফির বাহিনীকে কীভাবে মোকাবিলা করা হবে সে ব্যাপারে পরামর্শসভা এমন সময়েই হয়েছিল। কাফির ও ইহুদীদের সম্মিলিত বাহিনীর আক্রমণ থেকে মদীনা শহরকে প্রতিরক্ষা করার জন্য খন্দক খননের পরিকল্পনা এই সময়টাতেই নেয়া হয়েছিল। এ ছাড়া নানা সময়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলির প্রেক্ষাপটে নবীজি এ সময়টাতেই সাহাবীদের সাথে মাশোয়ারা (পরামর্শ) করতেন।
আর কোনো নেতারই এত বেশি মাশোয়ারা করার নজির নেই, যতটুকু মাশোয়ারা উম্মাহর বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে নবীজি সাহাবীদের সাথে করতেন। তিনি আল্লাহর আদেশ মেনেই এই মাশোয়ারা করতেন। আল্লাহ বলেন :
وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
"... এবং কাজকর্মের ব্যাপারে তাদের সাথে পরামর্শ করো। অতঃপর যখন তুমি সংকল্প করে নেবে, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ভরসাকারীদের পছন্দ করেন।”
সাহাবীদের অনেকে পালাক্রমে এই অধিবেশনে নবীজি-এর সাথে অংশ নিতেন। উমর ইবনুল খাত্তাব রা. থেকে বর্ণিত, "আমার একজন আনসারী প্রতিবেশী ছিলেন, যিনি মদীনার উঁচু এলাকায় বাস করতেন। আমরা পালাবদল করে করে নবীজির হালাকায় (আলোচনা সভা) অংশ নিতাম। একদিন তিনি যেতেন আর আরেকদিন আমি যেতাম। যেদিন আমি যেতাম সেদিন যা ঘটেছে তার সব আমি (ফিরে এসে) তার কাছে বর্ণনা করতাম এবং কুরআনের কোনো অংশ নাযিল হলে তাও বলতাম। যেদিন তিনি যেতেন, (ফিরে এসে) তিনিও একইভাবে (আমার কাছে বর্ণনা) করতেন।”
নবীজি ﷺ এসব হালাকাতে সাহাবীদের সাথে এমনভাবে বসতেন যেন তিনিও তাদেরই একজন। নবীজিকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার কোনো উপায় ছিল না। যখন কোনো অপরিচিত আগন্তুক আসত, সে চিনতে পারত না নবীজি আসলে কোনজন। হয়তো সে প্রশ্নও করত, “তোমাদের মধ্যে মুহাম্মাদ কে?”। সাহাবীরা নবীজির উজ্জ্বল চেহারার বর্ণনা দিয়েই তাকে পরিচয় করিয়ে দিতেন। তারা বলতেন, "আমাদের মাঝে বসে থাকা উজ্জ্বল চেহারাবিশিষ্ট ব্যক্তিটিই হলেন মুহাম্মাদ ﷺ।”
এসব বিষয় লক্ষ করে শেষতক সাহাবীরা নবী ﷺ-কে পরামর্শ দিলেন যে, তারা নবীজির জন্য কাদামাটি দিয়ে একটি নিচু আসন বানিয়ে দিতে চান, যাতে করে অপরিচিত কেউ আসলে সহজেই নবীজিকে চিনতে পারেন। নবীজি এতে সম্মতি দিলেন। এই ঘটনাটি অবশ্য নবীজির বরকতময় জীবনের শেষদিকের ঘটনা, হিজরী নবম সালের দিকে। সে বছর দলে দলে প্রতিনিধি মদীনায় আসছিল বলে ওই বছরকে 'প্রতিনিধিদলের বছর' বলা হয়।
নিজের মুচকি হাসি আর মনোযোগ নবীজি ﷺ যেন সকল সাহাবীদের মাঝে ভাগ করে দিতেন। যখন তারা নববী মজলিস থেকে ফিরে আসতেন, প্রত্যেক সাহাবীই মনে করতেন, তিনিই বুঝি নবীজির সবচেয়ে প্রিয় সাহাবী।
মাঝে মাঝে নবীজি ﷺ যখন সাহাবীদের সাথে উপবিষ্ট থাকতেন, তখন কেউ এসে নবীজিকে খাবার হাদিয়া দিত। তিনি সাহাবীদের সাথে তা ভাগ করে খেতেন। সামুরাহ ইবনু জুন্দুব রা. থেকে বর্ণিত, “আমরা একবার নবীজির সাথে ছিলাম। তখন নবীজির জন্য এক ট্রেতে করে কিছু ছারিদ নিয়ে আসা হলো। নবীজি ﷺ তা খেলেন। লোকেরাও সেখান থেকে তা খেল। দুপুর হওয়া পর্যন্ত একদলের পরে আরেক দল এসে তা খেতেই থাকল।"
বর্ণনাকারীকে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, “পাত্রতে যে খাবার ছিল, তা শেষ হয়ে গেলে কি কেউ আবার তা পূর্ণ করে দিচ্ছিল?”
তিনি জবাব দিলেন, “দুনিয়া থেকে তো কেউ দিচ্ছিল না। যদি কেউ পূর্ণ করে দিতে থাকেন, তবে তা আকাশ থেকেই হচ্ছিল।”
একবার নবীজি -কে একটি ভেড়া হাদিয়া দেয়া হলো। মদীনায় তখন খুব অভাব অনটন চলছিল। তিনি তাঁর পরিবারকে বললেন, "এই ভেড়াটি (রান্না করে) প্রস্তুত করো। এই রুটিগুলো নাও। ছোট ছোট টুকরো করো এবং এগুলো হতে ছারিদ প্রস্তুত করো।" নবীজির একটি বিশাল ট্রে ছিল যার নাম ছিল আলঘাররা। এটি বহন করতে ছয় জন মানুষ লাগত। সকালে যখন নবীজি এবং সাহাবীগণ সালাতুদ-দ্বোহা এর নফল সালাত আদায় করছিলেন, তখন ট্রেতে খাদ্য প্রস্তুত করে নবীজির সামনে নিয়ে আসা হলো। সবাই নবীজির আশেপাশে জড়ো হয়ে গেল। অনেক বেশি লোকসমাগম হওয়ায় নবীজি হাঁটু গেড়ে বসলেন। এক বেদুইন বলে বসল, “এটা কী ধরনের বসা!”
নবীজি বললেন, “আল্লাহ তাআলা আমাকে নিজের অতিথিপরায়ণ দাস হিসেবে বানিয়েছেন। তিনি আমাকে একগুঁয়ে ও স্বৈরাচারী বানাননি। এক প্রান্ত থেকে খাওয়া শুরু করো আর মাঝের অংশ রেখে দাও, এতে বরকত হবে।”
তারপর নবীজি আরও বললেন, "এখান থেকে নাও আর খাও। যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ তার শপথ, পারস্য আর বাইজান্টাইন এলাকা তোমাদের হাতে বিজিত হবে। তোমরা খাদ্যে এমন প্রাচুর্য লাভ করবে যে, মানুষ খাদ্য গ্রহণের পূর্বে আল্লাহর নাম নিতে ভুলে যাবে।”
অবস্থা, পরিবেশ আর পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে সকালের এই অধিবেশনটি কখনো দীর্ঘ আবার কখনো সংক্ষিপ্ত হতো। সকালের শেষদিকে নবীজি উঠে পড়তেন। বৈঠক শেষ হয়ে গেলে তিনি এই দুআটি করতেন,
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ
অর্থ : হে আল্লাহ, আমি আপনার প্রশংসা সহকারে আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করি। আমি সাক্ষ্য দিই যে, আপনি ছাড়া হক কোনো ইলাহ নেই। আমি আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং আপনার নিকট তওবা করি।
একবার কেউ জিজ্ঞেস করল, “আপনাকে তো আগে কখনো এ কথাগুলো বলতে শুনলাম না।"
নবীজি জবাবে বললেন, “এই কথাগুলো মজলিসে কোনো ভুল হয়ে গেলে তার কাফফারা নিশ্চিত করে।”
আয়িশা রা. একবার নবীজিকে প্রশ্ন করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি লক্ষ করেছি, আপনি বৈঠক অথবা তিলাওয়াত কিংবা সালাত শেষে এই দুআটি পাঠ করেন। কেন?” নবীজি জবাবে বললেন, “যে ব্যক্তি ভালো কথা বলল, তার উত্তম চরিত্রের ব্যাপারে এই কথাগুলো কেয়ামত পর্যন্ত সিলমোহর হয়ে রইবে। আর যে কোনো মন্দ কথা বলল, এই দুআ তার মন্দ কথাগুলো মুছে ফেলবে।”
খুব অল্প সময়ই এমন হয়েছে যে নবীজি সাহাবীদের বৈঠক শেষে উঠছেন আর নিম্নোক্ত দুআটি করেননি :
اللَّهُمَّ اقْسِمْ لَنَا مِنْ خَشْيَتِكَ مَا يَحُولُ بَيْنَنَا وَبَيْنَ مَعَاصِيكَ ، وَمِنْ طَاعَتِكَ مَا تُبَلِّغُنَا بِهِ جَنَّتَكَ ، وَمِنْ الْيَقِينِ مَا تُهَوِّنُ بِهِ عَلَيْنَا مُصِيبَاتِ الدُّنْيَا ، وَمَتِّعْنَا بِأَسْمَاعِنَا وَأَبْصَارِنَا وَقُوَّتِنَا مَا أَحْيَيْتَنَا وَاجْعَلْهُ الْوَارِثَ مِنَّا ، وَاجْعَلْ ثَأْرَنَا عَلَى مَنْ ظَلَمَنَا ، وَانْصُرْنَا عَلَى مَنْ عَادَانَا ، وَلَا تَجْعَلْ مُصِيبَتَنَا فِي دِينِنَا ، وَلَا تَجْعَلِ الدُّنْيَا أَكْبَرَ هَمِّنَا وَلَا مَبْلَغَ عِلْمِنَا ، وَلَا تُسَلِّطْ عَلَيْنَا مَنْ لَا يَرْحَمُنَا
অর্থ: হে আল্লাহ, আপনাকে ভয় করার সক্ষমতা আমাকে দান করুন, যা আপনার অবাধ্য হওয়া থেকে আমাকে আটকে রাখবে। আপনার বাধ্যগত হওয়ার সক্ষমতা দান করুন, যা আমাকে জান্নাতে পৌঁছে দেবে। আপনার বিশ্বাস থেকে আমাকে এ পরিমাণ অংশ দান করুন, যা আমার দুনিয়াবি বিপদাপদকে সহজ করে দেবে। আমার চোখ, আমার কান, আমার দৈহিক শক্তি ততদিন পর্যন্ত কর্মক্ষম রাখুন; যতদিন আমাকে জীবিত রাখবেন। পরেও এগুলোর উপকারিতা আমার জন্য অবশিষ্ট রাখুন। যারা আমার ওপর জুলুম করে আপনি তাদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করুন। আমার শত্রুর বিরুদ্ধে আমাকে বিজয় দান করুন। আমার দ্বীন পালনকে আমার জন্য বিপৎসংকুল করবেন না। দুনিয়াকে আমার জীবনের প্রধান লক্ষ্য এবং আমার জ্ঞানের শেষ বানাবেন না। আর আমাদের ওপর কোনো নিষ্ঠুর ব্যক্তিকে ক্ষমতাবান বানাবেন না।
তারপর সাহাবীগণ চলে যেতেন। কেউ জীবিকা নির্বাহের কাজে বেরিয়ে পড়তেন আর কেউ-বা কায়লুলার জন্য বাসায় রওনা দিতেন। নবীজি ﷺ হয়তো তখন কায়লুলার জন্য বাসায় যেতেন, নতুবা মদীনার রাস্তায় হাঁটতে বের হতেন। আবার কখনো কারও দাওয়াত রক্ষার্থে চলে যেতেন। কখনো-বা রোগী দেখতে বা অন্য কাজে রওনা হতেন।

টিকাঃ
৩৭. মুহাজির সেসব সাহাবীদের বলা হয়, যারা মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন। 'মুহাজিরীন স্তম্ভ' রিয়াযুল জান্নাহ নামক স্থানে অবস্থিত। আর রিয়াযুল জান্নাহ হচ্ছে নবীজির মসজিদে অবস্থিত তার গৃহ ও খুতবা দেয়ার স্থানের মাঝের জায়গাটুকু। রিয়াযুল জান্নাহকে নবীজি বেহেশতের বাগানের অংশ বলে অভিহিত করেছেন। এটি আর-রাওদাহ নামেও পরিচিত।
৩৮. মুসনাদ আহমদ: ২০৩৯৪; তিরমিযী: ১৯০১
৩৯. মুসনাদ আহমদ: ৮০২৯; তিরমিযী: ২৪১৮
৪০. মুসনাদ আহমদ: ৪৫৯৯; তিরমিযী: ২৮৬৭
৪১. ফাযাইলুস সাহাবাহ, আহমদ: ৬৬০০; আল-আদাবুল মুফরাদ: ৫১৫
৪২. হাদীসে আমানত বলতে ঈমানকে বুঝানো হয়েছে। সূরা আহযাবের ৭২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঈমানকে আমানত বলে উল্লেখ করেছেন। হাদীসে মানুষের অন্তরে ঈমান দুর্বল হয়ে যাওয়ার দিকে ইঙ্গিত করা হচ্ছে।
৪৩. সহীহ বুখারী: ৭০৮৬
৪৪. ইবনু মাজাহ: ৩৮১৪
৪৫. সহীহ বুখারী: ৬১৯১; আল-মুজামুল কাবীর: ৫৭৯৩
৪৬. সহীহ মুসলিম: ১৩৭৩
৪৭. মুসনাদ আহমদ: ১০৬৪২
৪৮. সূরা আল-ইমরান, ৩:১৫৯
৪৯. ছারিদ হচ্ছে আরবদের প্রধান খাদ্য, যা তারা রান্না করত। এটির প্রধান উপকরণ ছিল রুটি আর মাংস।
৫০. মুসনাদ আহমদ: ১০৪১৫; তিরমিযী: ৩৪৩৩
৫১. তিরমিযী: ৩৫০২
৫২. দুপুরে সামান্য সময়ের জন্য বিশ্রাম নেয়াকে কায়লুলা বলে। হযরত ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করিম সা. এরশাদ করেছেন, দিনের রোজা রাখতে রাতে সেহরি খাও এবং রাতের ইবাদতে মনোযোগী হতে দিনের বেলা কায়লুলা করো। (ইবনু মাজাজ: ১৬৯৩)

📘 নবীজির দিনলিপি ﷺ > 📄 মদীনার পথে

📄 মদীনার পথে


নবীজি যখন হাঁটতেন তখন তাঁর হাঁটার মাঝে শক্তিমত্তা ও দৃঢ়তার ছাপ ফুটে উঠত। আজকালকার জনপ্রতিনিধিদের মতো মেকিত্ব বা হামবড়া ভাব এতে ছিল না। হাঁটার সময় তিনি এমনভাবে পা তুলতেন যে দেখে মনে হতো তিনি বুঝি মাটি থেকে কোনো জিনিস টেনে তুলছেন। যখন তিনি সামনে অগ্রসর হতেন তখন মনে হতো বুঝি তিনি কোনো ঢালু জায়গা বেয়ে নামছেন। তাঁকে দেখলেই মানুষ বুঝতে পারত তিনি কোনো দুর্বল বা অলস লোক নন। যখন তিনি কোনো দিকে ফিরতেন সমগ্র শরীরকে সেদিকে ফেরাতেন। সাহাবীগণ কখনো নবীজির সামনে আবার কখনো-বা তাঁর পাশাপাশি হাঁটতেন। কিন্তু, কখনো নবীজির পেছনে হাঁটতেন না। এমন দুজন ব্যক্তির দেখা পাওয়া যাবে না, যারা নবীজির পেছনে দাঁড়াতে পেরেছে।
এটি ছিল প্রিয়নবীর বিনয়ের চিহ্ন। অন্য নেতাদের মতো তিনি কখনো তাঁর সাথিদের আগে আগে হাঁটতেন না। তিনি তো এটা মানতেই পারতেন না যে, তাঁর সাহাবীগণ তাঁকে পেছন থেকে নতজানু হয়ে অনুসরণ করবেন। তিনি সাধারণভাবে সাহাবাগণের সাথে, তাদেরই একজন হয়ে চলাফেরা করতেন।
হাঁটার সময় তিনি হয়তো একটি লাঠি বা খেজুর গাছের শাখা ব্যবহার করতেন। তিনি কখনো ছোট লাঠি বা অর্ধ-বৃত্তাকার মাথাবিশিষ্ট লাঠি ব্যবহার করতেন। এটি আরবদের রীতি ছিল। তৎকালীন আরব সমাজে এ ধরনের লাঠির বেশ প্রয়োজন পড়ত।
চলার পথে কোনো দাস-দাসীর সাথেও যদি প্রিয়নবী-এর দেখা হয়ে যেত আর সে কোনও সাহায্যের আবেদন জানাত, তাহলে নবীজি তার প্রয়োজন পূরণ করে দিতেন। কোনো গোলামের হাত ধরে তার প্রয়োজন পূরণ করতে প্রিয়নবী কুণ্ঠাবোধ করতেন না।
কারও সাথে মোলাকাত হলেই তিনি মুচকি হাসি উপহার দিতেন। জারির বিন আব্দুল্লাহ রা. বলেন, “আল্লাহর রাসূলের সাথে যতবারই আমার দেখা হয়েছে, তিনি আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসেছেন।”
তাঁর হাসি ছিল উজ্জ্বল, স্বাগতপূর্ণ। কেউ নবীজির সাথে সাক্ষাতের সময় ভাবত খাস করে শুধু তার দিকে তাকিয়েই বুঝি নবীজি এভাবে হাসছেন। জারির রা. তো ভেবেছিলেন যে, নবীজি এ রকম বিশেষ হাসি কেবল তাকেই উপহার দেন। তিনি প্রফুল্লচিত্তে তা হাদীসেও উল্লেখ করে গেছেন। বস্তুত, নবীজি সবার দিকে তাকিয়েই এভাবে মুচকি হাসতেন। আব্দুল্লাহ ইবনু আল-হারিছ ইবনু জায রা. বলেন, “আমি এমন কাউকে দেখিনি, যিনি রাসূলুল্লাহ থেকে অধিক মুচকি হাসতেন।”
পথ চলতে ছোট ছেলেদের সাথে দেখা হয়ে গেলে তিনি তাদের সালাম জানাতেন, স্বীয় হাত দ্বারা তাদের মুখমণ্ডল মুছে দিতেন। জাবির ইবনু সামুরাহ রা. হতে বর্ণিত, “নবীজি একদিন বের হলেন। আমিও সাথে ছিলাম। কতিপয় কিশোরের সাথে মোলাকাত হলো। তিনি প্রত্যেকের গাল মুছে দিলেন। এমনকি নবীজি আমারও গাল মুছে দিলেন। আমি খেয়াল করলাম তাঁর হাত শীতল এবং সুগন্ধিযুক্ত। মনে হচ্ছিল যেন আতরের ঝুড়ি থেকে তিনি মাত্র তাঁর হাত বের করে এনেছেন। আমার যে-গাল নবীজি মুছে দিয়েছিলেন তা আমার অন্য গাল থেকে ভালো ছিল।”
নবীজি অনেক সময় আনসারদের এলাকায় তাদের দেখতে চলে যেতেন। আনসারদের ছেলেরা তখন হয়তো তাঁর কাছাকাছি চলে আসত, সাথে সাথে হাঁটত। তিনি তাদের সালাম জানাতেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন এবং তাদের জন্য দুআ করতেন।
একদিন তিনি বনু নাজ্জার গোত্রের এলাকা দিয়ে হাঁটছিলেন। আনসারদের দাসীরা তাকে অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে আসল। তারা তখন তাম্বুরা বাজিয়ে গান গাচ্ছিল :
আমরা আন-নাজ্জারের দাসী
মুহাম্মাদ সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিবেশী
নবীজি তাদের বলেন, “আল্লাহ জানেন যে, আমার হৃদয় তোমাদের ভালোবাসে। হে আমার রব, তুমি তাদের সবাইকে বরকত প্রদান করো।”
একদিন তিনি মসজিদে গিয়ে একদল মহিলাকে সেখানে বসে থাকতে দেখলেন। তখন হাতের ইশারায় প্রিয় নবী তাদের সালাম জানালেন।
সাহাবাদের সাথে দেখা হলে আল্লাহর রাসূল আগে সালাম দিতেন। তাদের সাথে মুসাফাহা করতেন ও তাদের জন্য দুআ করতেন। মুসাফাহার সময় তিনি নিজ থেকে হাত সরিয়ে নিতেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত অন্য ব্যক্তি হাত না সরাতেন। যখন কারও সাথে নবীজির দেখা ও কথা হতো, তিনি তার থেকে নিজের মুখ ফেরাতেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত ওই ব্যক্তি মুখ ফিরিয়ে নিত।
কেউ যদি আল্লাহর রাসূলের সাথে কথা বলার জন্য তাকে থামাতে চাইত, তিনি থামতেন। কোনো দাসী বা মুক্ত মহিলা থামার জন্য আবেদন জানালেও তিনি তাদের সাথে কথা বলার জন্য থামতেন। আদি বিন হাতেম রা. নবীজির সাথে তার প্রথম সাক্ষাতের কাহিনি বিস্তারিত বর্ণনা করেন: "আমি নবীজির সাথে হাঁটছিলাম। একজন মহিলা, যার সাথে একটি ছোট বাচ্চাও ছিল, সে হঠাৎ নবীজিকে ডেকে বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের আপনার সাথে কিছু কথা বলার প্রয়োজন ছিল।'
তারা একান্তে নবীজির সাথে কথা বলল। নবীজি তাদের সাথে দাঁড়িয়ে থাকলেন। তারা দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলছিল, যতক্ষণ না আমি গিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ালাম। আমি ভাবলাম, 'এটি নিশ্চিত যে, তিনি আমার ধর্মের কিংবা নুমান ইবনু মুনযিরের ধর্মের কোনো অনুসারী নন। তিনি যদি কোনো রাজা হতেন তাহলে এত দীর্ঘ সময় কোনো ছেলে বা মহিলা তাকে দাঁড় করিয়ে রাখতে পারত না। আমি অনুভব করলাম আমার অন্তর নবীজির প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ছে।”
আল্লাহর রাসূল -এর হাঁটার ধরন খুবই স্বতঃস্ফূর্ত ছিল, এতে কোনো মেকি গাম্ভীর্যপনা বা আড়ম্বরতা ছিল না। একদিনের ঘটনা। তিনি এক যুবককে জবাইকৃত ভেড়ার চামড়া ছাড়াতে দেখলেন। কিন্তু, যুবকটি তার কাজ সঠিকভাবে করতে পারছিল না। নবীজি তার কাছে গিয়ে বললেন, "পাশে সরে দাঁড়াও, যাতে আমি তোমাকে শিখিয়ে দিতে পারি কীভাবে এ কাজ করতে হয়। আমি দেখতে পাচ্ছি তুমি এ কাজ সঠিকভাবে করতে পারছ না।” অতঃপর নবীজি তাঁর হাত ভেড়ার চামড়া আর মাংসের মাঝে রাখলেন এবং কাঁধ পর্যন্ত চামড়া ছাড়িয়ে দিলেন। তারপর বললেন, “এভাবে চামড়া ছাড়াতে হয়, হে যুবক।” অবশেষে তিনি প্রস্থান করলেন।
আমরা দেখতে পাই যে নবীজি বিভিন্ন প্রজন্মের, ভিন্ন ভিন্ন বয়সের মানুষের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে সমর্থ হতেন। তিনি তাদের অবস্থার প্রতি মনোযোগী ছিলেন, তাদের জীবনের আনুষঙ্গিক জিনিসগুলোর ব্যাপারেও তিনি স্পষ্টভাবে আগ্রহ দেখাতেন। আমরা অবাক হয়ে ভাবি, সেই যুবকটি তখন এ কথা ভেবে কতই-না পুলকিত বোধ করছিল যে, আল্লাহর রাসূল আমার ব্যক্তিগত সমস্যার ব্যাপারে এত আগ্রহ দেখাচ্ছেন আর তা সমাধানে আমাকে সাহায্যও করছেন!
একবার তিনি সাহাবীদের নিয়ে একজন সাহাবীর গৃহে অবস্থান করছিলেন। বিলাল রা. এসে বললেন, জামাতের সময় হয়ে গেছে। নবীজি মসজিদের উদ্দেশে রওনা হলেন। পথে এক লোককে দেখলেন, সে বিশাল একটি কড়াই রান্নার জন্য চুলোতে চড়িয়েছে। নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, "রান্না কি শেষ হয়ে গেছে?”
লোকটি জবাবে বলল, “হে আল্লাহর রাসূল, এটি প্রস্তুত হয়ে গেছে।”
তখন নবীজি এক কামড় মুখে তুলে নিলেন এবং হাঁটতে হাঁটতে তা চিবোতে লাগলেন। নামায শুরু করার আগ পর্যন্ত তিনি তা চিবুচ্ছিলেন।
আমরা এসব ঘটনার দর্পণে নবীজির ব্যক্তিজীবনকে সবচেয়ে অনাড়ম্বর ও স্বতঃস্ফূর্তরূপে খুঁজে পাই। এভাবেই তিনি সাহাবীদের সাথে জীবনযাপন করতেন। ঘটনাটি আবার ভেবে দেখুন, তিনি একজনের কাছ থেকে এক কামড় খাবার মুখে নিলেন এবং হাঁটতে হাঁটতে তা চিবুতে লাগলেন। অহংকারী, দাম্ভিক লোকদের সাথে এ আচরণের কতই-না তফাত! যে ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি খাবার নিয়েছিলেন, সে এতে খুবই খুশি হয়েছিল। সম্ভবত ওইদিন সে যাকেই দেখেছে তাকেই বলেছে কীভাবে আল্লাহর রাসূল তার খাবার থেকে এক লোকমা খাদ্য তুলে নিয়ে তারই সামনে মুখে পুরেছেন। এ ঘটনাটি যেন ওই ব্যক্তির জন্য একটা বিশেষ পুরস্কারের মতো। এ ধরনের অভূতপূর্ব ও স্বতঃস্ফূর্ত আচরণের দ্বারাই বোধহয় নবীজি সাহাবীদের এত কাছাকাছি আসতে পেরেছিলেন।
কাউকে দেখতে গেলে নবীজি কখনো দরজার দিকে মুখ করে দাঁড়াতেন না, ডানে বা বামে সামান্য সরে দাঁড়াতেন। তখনকার সময়ে ঘর ছোট ছিল, বাইরে কোনো পর্দা টানানো থাকত না। তাই দরজায় এসে দাঁড়িয়ে নবীজি বলতেন, 'আস সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুল্লাহ'। অর্থাৎ, আপনাদের ওপর আল্লাহর শান্তি, রহমত ও বারাকাহ বর্ষিত হোক। প্রথমবার সালামের জবাব না মিললে তিনি মোট তিনবার সালাম দিতেন। এরপরেও জবাব না আসলে তিনি ফিরে যেতেন।
একদিনের ঘটনা। নবীজি সাদ ইবনু উবাদাহ রা. কে দেখতে গেলেন। দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন, 'আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ'। সাদ রা. সালাম শুনে আস্তে করে জবাব দিলেন, যাতে নবীজি তা শুনতে না পান। নবীজি আবার সালাম দিলেন। সাদ রা. আবারও নীরবে জবাব দিলেন। নবীজি আরও একটিবার সালাম দিলেন আর সাদ রা.-ও একই কাজের পুনরাবৃত্তি ঘটালেন। নবীজি চলে যেতে উদ্যত হলে তড়িঘড়ি করে সাদ রা. এসে দেখা দিলেন এবং বললেন, "যিনি আপনাকে সত্য বার্তা দিয়ে প্রেরণ করেছেন সেই মহান সত্তার শপথ, প্রত্যেকবার আপনি সালাম দিয়েছেন আর আমি তার জবাব দিয়েছি। আমি তো শুধু এটা চাচ্ছিলাম যে, আপনি যেন আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য রহমত, বরকত আর শান্তির দুআ করুন।”

টিকাঃ
৫৩. সে আমলে আতর ব্যবসায়ীরা এক বিশেষ ধরনের ঝুড়িতে তাদের আতর রাখতো। এখানে এধরনের ঝুড়ির কথা বলা হচ্ছে।
৫৪. ইশারায় সালাম দেয়ার জন্য যেভাবে হাত তোলা হয়, সেভাবে।
৫৫. সুন্নত তরিকায় হাত মিলানো

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00