📘 নবীজির দিনলিপি ﷺ > 📄 গভীর রাতের ভ্রমণবীথি

📄 গভীর রাতের ভ্রমণবীথি


রাত্রিকালীন ইবাদাতের সর্বোৎকৃষ্ট সময় অর্থাৎ, রাতের শেষ প্রহরের বেলায় নবীজি * কখনো কখনো কন্যা ফাতিমা রা. এবং তার স্বামী আলী রা. এর ঘরে যেতেন। তিনি তাদের ডেকে বলতেন, “তোমরা কি উঠে সালাত আদায় করবে না?” আলী রা. বর্ণনা করেন যে, তিনি একবার নবীজিকে বলেছিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমরা শুধু ফরজ সালাতগুলোই আদায় করি। আমাদের রুহ তো থাকে রবের কব্জায় (ঘুমের সময়)। তিনি যদি আমাদের জীবিত (জাগ্রত) করতে চান, তবে তিনি তা-ই করবেন।” আলী রা. যখন এই উক্তিটি করলেন তখন নবীজি তাঁর সাথে কোনো কথা না বলেই চলে গেলেন। আলী রা. শুনতে পেলেন, চলে যাওয়ার সময় নবীজি সজোরে তাঁর উরুতে আঘাত করে বলছেন, 'আমরা শুধু আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া ফরজ সালাতগুলোই আদায় করি। “মানুষ অধিকাংশ বিষয়েই বিতর্ককারী।”' ১২১
তাঁর জীবৎকালের শেষের দিকে নবীজি রাতের বেলা আল-বাকী গোরস্তানে কবরবাসীদের জন্য দুআ করতে যেতেন। আয়িশা রা. আল-বাকী গোরস্থানে যাওয়ার প্রথম রাতটি সম্পর্কে বর্ণনা করেন, “সে রাতে নবীজি আমার সাথে ছিলেন। তিনি পাশ ফিরলেন এবং ওপরের পোশাক খুলে ফেললেন। তারপর জুতা খুলে নিজের পায়ের কাছে রাখলেন এবং নিচের পোশাকের প্রান্তভাগ বিছানায় রেখে শুয়ে পড়লেন। আমি ঘুমিয়ে আছি ভাবার আগ পর্যন্ত তিনি এভাবেই থাকলেন। এরপর খুব সাবধানে তিনি তাঁর ওপরের পোশাক পরিধান করলেন, অতি শান্তভাবে জুতা জোড়া পরলেন এবং দরজা খুলে বের হয়ে গেলেন। অতঃপর কোনো শব্দ না করেই দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। আমি তৎক্ষণাৎ আমার জামা গায়ে চাপালাম, মাথা ঢাকলাম, জিলবাব ১২২ পরলাম এবং তাঁকে অনুসরণ করে চলা শুরু করলাম। তিনি আল-বাকী'তে গিয়ে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকলেন এবং তিনবার তাঁর হাত উত্তোলন করলেন। তিনি তারপর ঘুরে গেলেন এবং আমিও ঘুরলাম, দ্রুত হাঁটা শুরু করলেন এবং আমিও দ্রুত হাঁটা শুরু করলাম, তিনি ধীরে ধীরে দৌড়ানো শুরু করলেন এবং আমিও ধীরে দৌড়াতে থাকলাম, তারপর দ্রুত দৌড়ানো শুরু করলেন এবং আমিও সেটাই করলাম। আমি তাঁর থেকে দ্রুতগতিতে ঘরে পৌঁছে গেলাম। তিনি যখন ঘরে প্রবেশ করলেন তখন আমি বিছানায় প্রায় শুয়ে পড়েছিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'কী ব্যাপার আয়িশা? তোমাকে বিচলিত দেখাচ্ছে?'
আমি বললাম, 'কিছুই হয়নি।'
তিনি তখন বললেন, 'তুমি আমাকে বলবে নয়তো আল্লাহই আমাকে জানিয়ে দেবেন, যিনি সবকিছু সম্পর্কে অবহিত।'
আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল, অন্য সবার থেকে আপনিই আমার সবচেয়ে প্রিয়।' তারপর আমি তাঁকে সবকিছু খুলে বললাম।
তিনি তখন বললেন, 'তুমিই কি তবে সেই কালো ছায়া, যা আমি আমার সামনে দেখেছিলাম?'
আমি হ্যাঁ-সূচক জবাব দিলাম। তিনি আমার বুকে একবার মৃদু ধাক্কা দিয়ে বললেন, 'তুমি কি ভেবেছিলে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল তোমার প্রতি অবিচার করতে পারেন?'
আমি জবাব দিলাম, 'মানুষ যা কিছুই গোপন করে আল্লাহ তাঁর সবই জানেন। হ্যাঁ, আমি ভেবেছিলাম।'
নবীজি বললেন, 'যখন তুমি আমাকে দেখছিলে তখন জিবরাইল আ. আমার কাছে এসে বাইরে যাওয়ার জন্য ডাক দিলেন এবং তোমার কাছ থেকে বিষয়টা গোপন রাখলেন। আমিও তোমাকে না শুনিয়ে তাঁর ডাকের জবাব দিলাম। তুমি যখন তোমার কাপড় ছাড়ো তখন তিনি ঘরে প্রবেশ করেন না। আমি ভাবলাম, তুমি বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছ, তাই তোমাকে জাগাতে চাইনি। কারণ, আমি মনে করেছিলাম, আমি চলে যাওয়ার পর তুমি হয়তো একাকী অনুভব করবে। জিবরাইল আ. আমাকে জানালেন, আল-বাকীতে গিয়ে সেখানকার মৃতদের জন্য দুআ করতে আল্লাহ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন।"
আয়িশা রা. বলতে থাকলেন, 'আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম কেমন করে আমি কবরে শায়িত মৃতদের সম্বোধন করতে পারব। তিনি আমাকে এই দুআ করতে বললেন :
السَّلَامُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ، إِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لَاحِقُونَ
“এই স্থানের বিশ্বাসী মুসলিমদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ তাঁর রহমত বর্ষিত করুন তাদের ওপর, যারা আগে চলে গেছেন এবং যারা হবেন তাদের অনুগামী। আল্লাহ চাইলে শীঘ্রই আমরা আপনাদের সাথে মিলিত হব।” ১২৩
এরপর থেকে প্রতিরাতেই তিনি শেষ-রাতে আল-বাকীতে যেতেন। নবীজি বলতেন :
السَّلَامُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ دَارِ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ، فَإِنَّا وَإِيَّاكُمْ وَمَا تُوعَدُونَ غَدًا مُؤَجَّلُونَ، تُؤَجَّلُونَ، وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لَاحِقُونَ
“তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, বিশ্বাসী লোকেদের এই সমাগমে। তোমাদের সাথে যার প্রতিশ্রুতি করা হয়েছে তা তোমরা পেয়েছ। তোমরা অপেক্ষা করছ বিচার দিবসের। আল্লাহ চাইলে আমরাও তোমাদের সাথে মিলিত হব।” ১২৪
কতই-না দয়ার নবী তিনি, রাতের আঁধারে, যিনি প্রিয় সাহাবীদের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে দুআ করতেন। সেইসব সাহাবীদের কবরের সামনে, যারা মৃত্যুবরণ করেছিলেন ইসলামের বিজয় দেখার আগেই। যখন দলে দলে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছিল তাই তো তখন নবীজি তাঁর সহযোদ্ধা প্রিয় সহচরদের স্মরণ করছিলেন। তারা তাদের রবের সাথে মিলিত হয়েছিলেন যখন মুসলিমদের সংখ্যা ছিল হাতে-গোনা এবং এই সংখ্যালঘু মুসলিমরা তখন শত্রুদের অত্যাচার-নির্যাতনের কবলে অত্যন্ত কঠিন সময় পার করেছিলেন। তারা দুনিয়ায় কোনো প্রতিদান না পেয়েই বিদায় নিয়েছিলেন।
সেই সময়, নবীজি -এর কাছে সমগ্র আরব ভূখণ্ড থেকে দলে দলে প্রতিনিধিদল এসে ইসলাম গ্রহণ করছিল। অথচ ইসলামী ভূখণ্ডের সম্প্রসারণ কিংবা অসংখ্য জাতি-গোত্রের ইসলাম গ্রহণের পরও নবীজি তাদের কথা ভুলে যাননি, যারা আগেই পৃথিবী ত্যাগ করেছিলেন। তিনি তাঁর জীবনের শেষ ক'টা দিন নিয়মিত কিছুটা সময় তাদের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের কথা স্মরণ করে তাদের জন্য দুআ করে কাটিয়েছেন।
ওই সময়টাতে নবীজি তাঁর মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন। তিনি সর্বোত্তম বন্ধুর সাথে সাক্ষাতের প্রস্তুতি হিসেবে জীবিত এবং মৃত উভয় সাথিদের কাছ থেকে যেন বিদায় নিচ্ছিলেন।

টিকাঃ
১২১. সূরা আল-কাহাফ ১৮:৫৪
১২২. সর্বাঙ্গ-আচ্ছাদনকারী লম্বা পোশাক
১২৩. মুসনাদ আহমদ: ২২৯৮৫
১২৪. মুসনাদ আহমদ: ২৫৪৭১

📘 নবীজির দিনলিপি ﷺ > 📄 ভোরের পূর্বে ঈষৎ ঘুম

📄 ভোরের পূর্বে ঈষৎ ঘুম


রাতের এক-ষষ্ঠাংশ বাকি থাকতে অর্থাৎ প্রায় শেষ প্রহরে নবীজি ﷺ দীর্ঘ কিয়ামুল লাইল, তাসবীহ, দুআ, নিকটাত্মীয়দের প্রতি স্নেহশীল আচরণ এবং মৃত সাথিদের কল্যাণকামনার পর কিছু সময় বিশ্রাম নেয়ার উদ্দেশ্যে আবার বিছানায় যেতেন। ফজর সালাত এবং দিনের কর্মব্যস্ততার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে তিনি তখন ভাতঘুম ঘুমাতেন। এভাবেই সুবহে সাদিকের প্রারম্ভের সময়টুকু নবীজি ﷺ-এর ঈষৎ ঘুমেই কেটে যেত। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা রা. বলেন, “নবীজি ﷺ যে রাতেই আমার সাথে থাকতেন, সুবহে সাদিকের শুরুর সময়টুকুতে তিনি নিদ্রা যেতেন।”
রাতের আঁধার কেটে ভোরের আলো ফোঁটার সময় বিলাল রা. এর সুমধুর আযানের ধ্বনি যখন মদীনার নিস্তব্ধতা ভেঙে দিত তখন নবীজি জেগে উঠতেন। প্রিয় রাসূল ﷺ তাঁর একেকটা নতুন দিন শুরু করতেন আযানের সুর শুনে, যা নববী সুসংবাদের বার্তা এবং ইসলামের আলোকিত বাণী বহন করে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতো মদীনা নগরীর অলিতে-গলিতে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00