📘 নবীজির দিনলিপি ﷺ > 📄 সালাতুল ইশা

📄 সালাতুল ইশা


ইশার আযান হওয়ার আগ পর্যন্ত নবীজি ঘরেই থাকতেন। ইশার নামায আদায়ে তিনি কিছুটা বিলম্ব করতেন। তিনি লোকদের জন্য অপেক্ষা করতেন। তারা তাড়াতাড়ি চলে আসলে তিনি তখনই সালাত আদায় করে নিতেন, আবার তারা আসতে কিছুটা দেরি করলে তিনিও ততক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন। যদিও তিনি ইশা কিছুটা দেরিতে আদায় করতে চাইতেন, কিন্তু এ জন্য লোকদের কষ্ট দেয়াকে তিনি পছন্দ করতেন না।
একবার তিনি ইশার সালাত আদায়ে বেশ দেরি করলেন। উমর রা. তখন এসে ডাক দিলেন, “ইয়া রাসুলাল্লাহ! নারী-শিশুরা ঘুমিয়ে পড়েছে।”
নবীজি ডাক শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন এবং তখন তাঁর মাথা থেকে ফোঁটা ফোঁটা হয়ে পানি ঝরছিল। তিনি সেই পানি মুছতে মুছতে বললেন, “এটাই সালাত আদায়ের উপযুক্ত সময়। তোমাদের কষ্ট হওয়ার ভয় না থাকলে এই সময়েই আমি তোমাদের ইশার সালাত আদায় করার নির্দেশ দিতাম।”
এক রাতে ইকামত দেয়ার পর একজন লোক দাঁড়িয়ে বলল, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনাকে আমার কিছু বলার ছিল।”
নবীজি তাঁর সাথে কথা বলতে বলতে দাঁড়ালেন। লোকেরা অপেক্ষা করতে করতে প্রায় তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিল তখন। তাই রাসূল নামায সংক্ষেপে কিন্তু নিখুঁতভাবে আদায় করলেন। আনাস রা. বললেন, “আমি এমন ইমামের সামনে আর কখনোই নামায আদায় করিনি, যার নামায রাসূলুল্লাহর থেকে বেশি সংক্ষিপ্ত কিন্তু নিখুঁত।”
নামায আদায়রত অবস্থায় অনেক সময় বাচ্চাদের কান্নার আওয়াজ আসত, যাদের মায়েরা সালাতে দণ্ডায়মান থাকতেন। তখন নবীজি ওই মায়েদের সুবিধার্তে ছোট সূরা দিয়ে নামায শেষ করে ফেলতেন। তিনি বলতেন, “আমি সালাত শুরু করি দীর্ঘ করার অভিপ্রায়ে। কিন্তু তখন আমি কোনো বাচ্চা ছেলের কান্নার আওয়াজ পাই এবং নামায সংক্ষিপ্ত করে ফেলি। কারণ, আমি উপলব্ধি করতে পারি তার জন্য তার মায়ের কী পরিমাণ উৎকণ্ঠা কাজ করছে।”
ইশার সালাত শেষ করার পর তিনি সাহাবীদের কোনো কিছু বলার থাকলে বলতেন। উদাহরণস্বরূপ, তাঁর ওফাতের কিছুদিন পূর্বে তিনি ইশার সালাত আদায় করে দাঁড়ালেন এবং বললেন, “আজকের রাতটি সম্পর্কে ভেবে দেখো, এই রাত থেকে এক শ বছরের শেষ দিকে আজকে যারা বেঁচে আছে তাদের কেউই তখন আর জীবিত থাকবে না।”
আরও একবার কিছুটা দেরিতে ইশার সালাত শেষ করে সাহাবীদের উদ্দেশে তিনি বললেন, “লোকেরা সালাত আদায় শেষ করে ঘুমোতে চলে গেছে। তোমরা ততক্ষণই সালাত আদায়ের মধ্যে ছিলে যতক্ষণ এর জন্য অপেক্ষা করছিলে।”
এক রাতে ইশার সালাতের ইমামতি করার জন্য তিনি অনেক বেশি বিলম্ব করলেন। সালাত শেষ করে লোকদের উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন, “একটু অপেক্ষা করো! উল্লসিত হও এ জন্য যে, এই সময়ে তোমরা ছাড়া আর কেউই সালাত আদায় করেনি। এর মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদের ওপর তাঁর করুণা বর্ষণ করেছেন।” সাহাবীরা এই খুশির সংবাদ পেয়ে অত্যন্ত আনন্দচিত্তে বাড়ি ফিরলেন।
নবীজি ইশার সালাতের পর সাহাবীদের সাথে খুব কম দিনই কথা বলতেন। কিন্তু যেদিন বলতেন, সেদিন অনেক সংক্ষেপে কথা শেষ করতেন। কারণ, তখন লোকেরা ক্লান্ত হয়ে পড়ত। তারা এই সময়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিত। সাধারণভাবে বলতে গেলে, তিনি ইশার সালাতের পর কথা বলা তেমন একটা পছন্দ করতেন না।
সালাত শেষ করার পর তিনি মহিলাদের মসজিদ ছেড়ে ঘরে পৌঁছা অব্দি স্বস্থানেই অপেক্ষা করতেন। যখন তিনি মসজিদ থেকে বাড়িতে যাওয়ার জন্য উঠতেন তখন পুরুষ সাহাবীরাও বের হয়ে যেতেন।

📘 নবীজির দিনলিপি ﷺ > 📄 সূর্যাস্তের পর

📄 সূর্যাস্তের পর


মাগরিবের আযানের সামান্য কিছু সময় পরই নবীজি ﷺ ঘর থেকে বের হতেন। মসজিদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তিনি সাহাবীদের সুন্নাত দুই রাকাত সালাত আদায়রত অবস্থায় দেখতেন, যা করার জন্য নবীজি তাদের উৎসাহিত করে বলেছিলেন, “মাগরিবের পূর্বে দুই রাকাত সালাত আদায় করো।” কিন্তু তিনি তিনবার এই কথার পুনরাবৃত্তি করে চতুর্থবার বললেন, “যদি তোমরা চাও।” এই দুই রাকাত খুবই সংক্ষেপে আদায় করতে হতো; কারণ, মাগরিবের আযান এবং ইকামাতের মধ্যে খুবই অল্প সময়ের ব্যবধান থাকত। ৮৫
নবীজি ﷺ মসজিদে প্রবেশের পর ইকামাত দেয়া হতো এবং সাথে সাথেই নামায শুরু হয়ে যেত। তিনি শুরুর ওয়াক্তেই মাগরিবের সালাতে দাঁড়াতেন এবং অন্ধকার নামার পূর্বেই শেষ করে ফেলতেন। এমনকি লোকেরা যখন সালাত শেষ করে বাড়ি ফিরত, তখনও দিনের আলো এত পরিমাণ থাকত যে কেউ একটি তির ছুড়লে সেটা কোথায় নামছে দেখা যেত।
অধিকাংশ সময়েই মাগরিবের সালাত নবীজি ﷺ খুব কম সময় নিয়ে শেষ করতেন এবং কুরআন তিলাওয়াত অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত করে ফেলতেন। তবে কদাচিৎ তিনি লম্বা আয়াতও তিলাওয়াত করতেন। একবার তিনি মাগরিবের সালাতে কুরআনের ৭ম সূরা 'আল-আরাফ' তিলাওয়াত করলেন এবং অন্য একদিন ৫২তম সূরা 'আত-তূর' তিলাওয়াত করেছিলেন। ওফাতের পূর্বে তিনি সর্বশেষ মাগরিবের সালাতের ইমামতি করেন এবং ওইদিন নবীজি ৭৭ তম সূরা 'আল-মুরসালাত' তিলাওয়াত করেছিলেন। ৮৬
অন্য সালাতের শেষে যেরকম নবীজি ﷺ সাহাবীদের সাথে কথা বলতেন মাগরিবের পর সে রকমটা করতেন না। কারণ, তখন মানুষের রাতের খাবার গ্রহণ করা এবং বিশ্রাম নেয়ার সময়। ফরজ সালাত শেষ করে ঘরে ফিরে তিনি দুই রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ আদায় করতেন। তারপর তিনি রাতের খাবার গ্রহণ করতেন; কারণ, এটাই ছিল তাদের নৈশভোজের নির্ধারিত সময়। অবশ্য সিয়াম পালন করলে তারা মাগরিবের নামায আদায়ের পূর্বেই খাবার সেরে নিতেন। উপরন্তু নবীজি ﷺ এ বিষয়ে নির্দেশও দিয়েছেন, "যদি তোমাদের সামনে রাতের খাবার উপস্থিত করা হয় তবে মাগরিবের সালাতের পূর্বেই খাবার গ্রহণ করে নাও। সালাত শেষ হওয়া পর্যন্ত নৈশভোজকে বিলম্বিত কোরো না।"
নবীজি ﷺ সাহাবীদের কোনো একজন দরিদ্র লোককে সাথে নিয়ে রাতের খাবার গ্রহণের জন্য উৎসাহিত করতেন। তিনি বলতেন, "যার কাছে দুই জনের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার আছে তার তৃতীয় এক জনকে খাওয়ানো উচিত এবং যার কাছে চার জনের জন্য পর্যাপ্ত খাবার আছে তার উচিত পঞ্চম অথবা ষষ্ঠ একজন লোককে সাথে নিয়ে যাওয়া।"
যথেষ্ট খাবার থাকলে নবীজি নিজেই অন্তত দশ জন মানুষের সাথে রাতের খাবার ভাগ করে নিতেন। আবার কখনো কখনো তাঁর ঘরে সামান্য ক'টা খেজুর এবং পানি ছাড়া খাওয়ার মতো আর কিছুই থাকত না। এমনকি দিনের পর দিন নবীজি -এর চুলায় আগুনও জ্বলত না।
একদিন এক ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত লোক এসে তাঁর কাছে কিছু খাবার চাইল। অনাহার আর চরম অবসাদের চিহ্ন তাঁর চেহারায় ছিল সুস্পষ্ট। সে তাঁর দিকে অসহায়ভাবে তাকিয়ে বলল, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি অত্যন্ত ক্ষুধার্ত।”
নবীজি সাথেই সাথেই একজন সাহাবীকে তাঁর কোনো একজন স্ত্রীর কাছে খাবারের সন্ধানে পাঠালেন। তাঁর স্ত্রী জবাব পাঠালেন, “সেই স্বত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন! আমার ঘরে পানি ছাড়া খাবার মতো আর কিছুই নেই।” তিনি আরেকজন স্ত্রীর কাছে লোক পাঠালেন এবং তিনিও একই জবাব দিলেন। এমনকি তিনি তাঁর প্রত্যেক স্ত্রীর কাছে খাবারের খোঁজে লোক পাঠালেন এবং তারা সবাই একই কথা বললেন, “তাদের কাছে পানি ছাড়া আর কিছুই নেই।”
রাসূল তখন সাহাবীদের দিকে ফিরে বললেন, “যে লোকটিকে আজ রাতের মেহমান হিসেবে গ্রহণ করবে আল্লাহ যেন তার ওপর রহম করেন।"
আবু তালহা আল-আনসারী রা. তৎক্ষণাৎ সেই প্রস্তাবটি লুফে নিলেন এবং বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি তাঁকে সাথে নেব।” আবু তালহা রা. তখন লোকটিকে তার মেহমান হিসেবে বাড়িতে নিয়ে গেলেন।
নবীজি -এর খাবার সব সময়ই মেঝেতে একটা চাটাই বিছিয়ে পরিবেশন করা হতো। তিনি কখনোই টেবিলে বসে খাবার গ্রহণ করেননি। তাঁর কাছে খাবার নিয়ে আসা হলে তিনি 'বিসমিল্লাহ' বলে খাওয়া শুরু করতেন এবং পাত্রের যে অংশ তাঁর নিকটে থাকত সেখান থেকে খাবার তুলে নিতেন। ৮৭ তিনি তিন আঙুল দিয়ে খাবার মুখে পুরতেন। কেউ তাঁর সাথে খেতে বসলে তাদেরও তিনি পাত্রের মাঝখান থেকে না খেয়ে বরং কাছের অংশ থেকে খাওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলতেন, “বরকত রয়েছে পাত্রের মধ্যখানে।”
নবীজি ﷺ খুব একটা ভোজনরসিক ছিলেন না। ঘরে যা থাকত তা-ই তিনি খেয়ে নিতেন। তিনি তাঁর স্ত্রীদের জিজ্ঞেস করতেন, “তোমাদের কাছে খাবার কিছু কি আছে?”
তারা হয়তো কখনো জবাব দিতেন, “আমাদের কাছে শুধু কিছু সিরকা আছে।” তিনি তখন বলতেন, “রুটির সাথে সিরকা মিলিয়ে খাওয়া তো স্বাস্থ্যকর।”
তিনি কখনোই কোনো খাবারের দোষ ধরতেন না। ভালো লাগলে খেতেন; আর ভালো না লাগলে তিনি খাওয়া থেকে উঠে যেতেন।
যখন তিনি সাহাবীদের সাথে খেতে বসতেন সেই মুহূর্তটাও কিছু খোশগল্প, অথবা সুন্দর কোনো আদব শিক্ষাদান, কিংবা জ্ঞানের প্রচার থেকে কখনোই বিরত থাকতেন না! এ বিষয়ে একটা উদাহরণ উল্লেখ করা যায়।
নবীজি -এর সৎ ছেলে উমর ইবনে আবি সালামাহ তাঁর গৃহেই প্রতিপালিত হন। তাঁর মা ছিলেন নবীজি -এর স্ত্রী উম্মে সালামাহ রা.। উমর রাসূল ﷺ এর সাথে একত্রে বসে খাওয়া-দাওয়া করতেন। একদিন খেতে বসে তিনি লক্ষ করলেন উমর প্লেটের সব জায়গাতেই তার হাত ঘুরাচ্ছেন। একেকবার একেক ধার থেকে গোশত উঠাচ্ছেন। নবীজি তাকে বললেন, “বালক, আল্লাহর নামে খাওয়া শুরু করো। ডান হাতে খাও এবং তোমার কাছের অংশ থেকে খাবার উঠাও।”
উমর পরবর্তীতে বলেছিলেন, “তখন থেকে আমি এভাবেই খেতাম।”
একদিন নবীজি -এর সামনে এক বাটি সারিদ এবং গোশত পরিবেশন করা হলো। তিনি ঘাড়ের অংশটা নিলেন, যা তিনি সব থেকে বেশি পছন্দ করতেন। গোশতের সেই অংশটা থেকে এক লোকমা নিয়ে তিনি বললেন, “বিচার দিবসে আমি মানবজাতির নেতা হব।"
তিনি অতঃপর আরও এক লোকমা খেলেন এবং পূর্বে বলা কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। কেউই তাঁকে এ ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করল না। তারপর তিনি বললেন, “তোমরা কি জানতে চাও না, কীভাবে? (আমি মানবজাতির নেতা হব)”
তারা তখন জিজ্ঞেস করলেন, “সেটা কীভাবে, ইয়া রাসূলাল্লাহ?” তিনি জবাব দিলেন, “বিচার দিবসে আল্লাহ পূর্বের এবং পরের সকল মানুষকে একই সমতলভূমিতে একত্র করবেন, যাতে করে তারা আহ্বানকারীর আহ্বান শুনতে পায় এবং স্বচক্ষে দেখতেও পারে। সূর্য তাদের মাথার খুব কাছে চলে আসবে এবং তারা গভীরভাবে এর প্রখর উত্তাপ অনুভব করবে। এটা যতই মাথার কাছে আসতে থাকবে তাদের দুর্ভোগ বাড়তে থাকবে। মানুষ ভয়ানক কষ্টের সম্মুখীন হবে। সেই কঠিন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা তা সহ্য করা তাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক হবে। তাদের কয়েকজন বলবে, “চলো, আমরা আদম (আ.)-এর কাছে যাই...।” রাসূল ﷺ তাদের সেই লম্বা হাদীসটি বলেন, যাতে তাঁকে আল্লাহর পক্ষ থেকে শাফায়াত প্রদানের সুযোগ দানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
খাবার গ্রহণের পর তিনি তাঁর আঙুলগুলো চাটতেন। ৮৯ তিনি সাহাবীদেরও প্লেট চেটে খাওয়ার নির্দেশ দিতেন। তিনি বলতেন, “তোমরা জানো না, খাবারের কোনো অংশে বরকত রয়েছে।” যখন খাবার গ্রহণের পর সরিয়ে নেয়া হতো তখন তিনি এক হৃদয়স্পর্শী দুআর মাধ্যমে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করতেন:
"সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর! এমন প্রশংসা, যা অঢেল ও পবিত্র এবং যাতে রয়েছে বরকত। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের আহারের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য এবং পান করার জন্য যথেষ্ট পানীয় প্রদান করেছেন। আমাদের রবের প্রতি কখনোই অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা যায় না। আর না আমরা কখনো তাঁকে অস্বীকার করতে পারি কিংবা তাঁর নিয়ামত থেকে অমুখাপেক্ষী হতে পারি। হে আমাদের রব, তুমিই আমাদের খাবার এবং পানীয় জোগান দিয়েছ, দিয়েছ সহায়-সম্পত্তি, জীবনোপকরণ এবং দেখিয়েছ সঠিক পথ। তোমার জন্যই সকল প্রশংসা সেই সবকিছুর জন্য, যা তুমি আমাদের দিয়েছ।”
নবীজি খাবার গ্রহণ এবং দুধ পান করার পর কুলি করতেন। তিনি বলেন, দুধের মধ্যে রয়েছে চর্বি।
নবীজি খাবার গ্রহণকালে সকাল থেকেই একটা পানীয় প্রস্তুত রাখা পছন্দ করতেন এবং দিনের শুরুর দিকে দুপুরের খাবার গ্রহণ করে ফেললে রাতের আগেই তিনি সেই পানীয় প্রস্তুত থাকা পছন্দ করতেন।
স্ত্রীদের সাথে খাবার গ্রহণকালে তিনি অত্যন্ত সরস কথোপকথন চালাতেন। এমনকি তিনি এই কাজকে উৎসাহিত করতেন। নবীজি বলেন, "স্ত্রীর মুখে এক লোকমা খাবার তুলে দেওয়াও সাদাকা।”
আয়িশা রা. তার সাথে রাসূল এর খাবার গ্রহণের একটা সুন্দর ঘটনা ব্যক্ত করেন, "আমার মাসিক চলাকালে আল্লাহর রাসূল তাঁর সাথে খাবার গ্রহণের জন্য ডাকতেন। তিনি গোশতযুক্ত একটা হাড় নিয়ে আমাকে সেটা থেকে খাওয়ার ওয়াদা করাতেন। আমি কিছুটা খেয়ে বাকি অংশ রেখে দিতাম। তারপর তিনি সেটা তুলে নিতেন এবং আমি যে জায়গা থেকে মুখ লাগিয়ে খেয়েছি তিনিও ঠিক সেই জায়গায় মুখ লাগিয়ে কিছু গোশত খেতেন। এরপর তিনি কখনো কিছু পানি চাইতেন এবং ওয়াদা নিতেন যাতে প্রথমে আমি পান করি। আমি সেটা নিতাম, পান করতাম এবং রেখে দিতাম। তারপর তিনি সেটা নিতেন এবং আমি পাত্রের ৯০ যেখানে মুখ লাগিয়ে পান করেছি তিনিও সেস্থানে মুখ লাগিয়ে পান করতেন।”
কতই-না প্রেমময় বার্তা এমন স্বামী তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীর কাছে পাঠাতেন! আর কী পরিমাণ আনন্দই-না তিনি তাকে দিতেন! নিঃসন্দেহে এই খাবার শরীরের সাথে মনকেও প্রফুল্ল রাখতো!

টিকাঃ
৮৫. মাগরিবের আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ে নফল নামায পড়ার বিধান নিয়ে ইমামদের মধ্যে দলীলের আলোকে মতানৈক্য রয়েছে। ফিকহে হানাফীতে এটি সুন্নত বা মুস্তাহাব নয়। তবে তা জায়েয আছে। খোলাফায়ে রাশেদীনসহ সাহাবায়ে কেরামের অনেকেই এ সময় কোনো নামায পড়তেন না। যেমন সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত আছে যে, আবদুল্লাহ ইবনু উমর রা.কে মাগরিবের ফরযের পূর্বে দুই রাকাত নামায পড়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে কাউকে উক্ত নামায পড়তে দেখিনি। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ১২৭৮) মুসান্নাফে আবদুর রাযযাকে সায়ীদ ইবনুল মুসায়্যিব রাহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুহাজির সাহাবীগণ মাগরিবের আগে দুই রাকাত নামায পড়তেন না। আর আনসারী সাহাবীগণ তা পড়তেন। (মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হাদীস: ৩৯৮৪) ইবরাহীম নাখায়ী রাহ. বলেন, আবু বকর, উমর ও উসমান রা. মাগরিবের পূর্বে দুই রাকাত নামায পড়তেন না। (মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হাদীস: ৩৯৮৫) হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইবরাহীম নাখায়ী রাহ.-কে মাগরিবের পূর্বে নফল নামায সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি আমাকে তা পড়তে নিষেধ করলেন এবং বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আবু বকর ও উমর রা. তা পড়েননি। (কিতাবুল আছার ১/১৬৩) সুতরাং খোলাফায়ে রাশেদীনসহ সাহাবায়ে কেরামের অনেকেই যেহেতু এ সময় কোনো নফল নামায পড়তেন না এবং এ সময়ের নফল নামাযের বিশেষ কোনো ফযীলতও হাদীসে বর্ণিত নেই; অন্যদিকে মাগরিবের নামায আযানের পর বিলম্ব না করে দ্রুত আদায় করার কথা অন্যান্য হাদীসে এসেছে তাই এসব বিষয়ের উপর ভিত্তি করে হানাফী, মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণ উক্ত দু' রাকাত নফল নামাযকে সুন্নত বা মুস্তাহাব পর্যায়ের আমল হিসেবে গণ্য করেননি। আর শাফেয়ী মাযহাবে এ ব্যাপারে দুটি মত রয়েছে। একটি মত অনুযায়ী এ সময় দু' রাকাত নফল পড়া মুস্তাহাব। আর অপর মত অনুযায়ী তা জায়েয। যারা মুস্তাহাব বলেন তারা এ সংক্রান্ত একটি হাদীস দ্বারা দলিল পেশ করেন। হাদীসটি হল- بين كل أذانين صلاة ، بين كل أذانين صلاة ، ثم قال في الثالثة : لمن شاء
(অর্থ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, প্রত্যেক আযান ও ইকামতের মাঝে নামায রয়েছে। প্রত্যেক আযান ও ইকামতের মাঝে নামায রয়েছে। অতপর তৃতীয়বার বললেন, 'যে ব্যক্তি চায়।' (সহীহ বুখারী: ৬২৭)
তবে ভিন্নমতের আলেমগণ বলেন যে, এটি শুধু জায়েয হওয়ার দলিল, মুস্তাহাব হওয়ার নয়। যাইহোক, এই সালাতকে যারা মাকরূহ বা অনুত্তম বলেছেন, তারা এর কারণ হিসেবে এটাও বলেছেন যে, যাতে করে মাগরিবের সালাত শুরু করতে বিলম্ব না হয়। কেননা মাগরিবের সালাত দ্রুত শুরু করা মুস্তাহাব। কোথাও যদি আযানের পর মাগরিবের জামাত শুরু করতে দেরি হয় আর এই ফাঁকে কেউ হাদীসের ওপর আমল করার আগ্রহে দুই রাকাত সালাতের আদায় শুরু করে তবে তাকে বাধা দেওয়া অনুচিত। কারণ এটি অনুত্তম হওয়ার যে কারণ, সেটি এখানে পাওয়া যাচ্ছে না। - সম্পাদক
৮৬. এটি কুরআনের ৭ম অধ্যায় যা ২৬ পৃষ্ঠায় সজ্জিত কুরআনের চতুর্থ দীর্ঘতম সূরা, যেখানে ৫২তম সূরাটি মাত্র আড়াই পৃষ্ঠার, ৭৭তম সূরাটি দেড় পৃষ্ঠার এবং নবীজি সূরা আরাফের মতো দীর্ঘ সূরাটি মাগরিবের প্রথম দুই রাকাতে শেষ করেছিলেন।
৮৭. পাত্রের উপরের অংশে থাকা খাবার
৮৮. আরবীতে এই কথার মানে হলো 'কেবল সামনের দাঁত দিয়ে এক লোকমা খাবার গ্রহণ করা।
৮৯. রাসুল এভাবেই খাবার অপচয় না করার গুরুত্ব শিক্ষা দিতেন। কোনোকিছুই ফেলে দেয়া যাবে না। এমনকি আঙ্গুলের সাথে লেগে থাকা সামান্য খাবারটুকুও শরীরের জন্য উপকারী এবং তা গ্রহণ করা উচিত। খাবার হচ্ছে আমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ। তাই আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দাবীই হচ্ছে আমরা যেন খাবারের কোন অংশই অপচয় না করি।
৯০. পানির সাথে খেজুর, কিশমিশ এবং মধু মিশিয়ে এই পানীয় প্রস্তুত করা হতো, তবে তা গাঁজানো হতো না। নবীজি কখনোই কোন মাদকদ্রব্য গ্রহণ করেন নি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00