📄 আসরের ওয়াক্তে
আসরের আযান হওয়ার পর নবীজি মসজিদে মুসল্লীদের জড়ো হওয়া অব্দি অপেক্ষা করতেন। তিনি সবাইকে ফরজের পূর্বে চার রাকাত সুন্নাত আদায়ের জন্য উৎসাহ দিতেন। নবীজি বলেন, “সেই ব্যক্তির ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক, যে আসরের পূর্বে চার রাকাত সালাত আদায় করে।” মসজিদ প্রাঙ্গণে সাহাবীরা একত্র হলে তিনি সালাতে ইমামতি করার জন্য ঘর থেকে বের হয়ে আসতেন। ওয়াক্ত শুরু হওয়ার সাথে সাথে সূর্য ঢলে পড়ার অনেক আগেই তিনি আসরের সালাত আদায় করতেন। আনাস রা. বর্ণনা করেন, “কখনোই অন্য কেউ আসর আদায়ের ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূল -এর থেকে অধিক তৎপর ছিলেন না।” যোহরের সালাতে তিনি যতটুকু কুরআন তিলাওয়াত করতেন আসরের ওয়াক্তে পড়তেন তার প্রায় অর্ধেক।
সালাত শেষ হওয়ার পর তিনি সাহাবীদের দিকে ঘুরে বসতেন এবং তাদের উদ্দেশে কোনো কিছু বলার থাকলে তা বলতেন। একবার আসরের পরে তিনি তাদের দিকে ফিরে বললেন, “তোমাদের কিছু বলা উচিত কি না সে বিষয়ে আমি দ্বিধান্বিত।” সাহাবীরা বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, যদি কল্যাণকর কিছু হয় তবে দয়া করে আপনি আমাদের সেটা বলুন। আর যদি কল্যাণকর না হয় তাহলে আল্লাহ এবং তার রাসূলই এ বিষয়ে সর্বাধিক অবহিত।”
নবীজি তখন বললেন, “যদি কোনো মুসলিম উত্তম এবং পূর্ণাঙ্গরূপে তার ওপর ফরযকৃত পবিত্রতা অর্জন করে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ সালাত আদায় করে, তাহলে এটি সালাতের মধ্যবর্তী সময়ে তার দ্বারা সংঘটিত পাপগুলোর ক্ষমা নিশ্চিত করে দেয়।”৭৫ একদিন নবীজি আসরের সালাত আদায় করে দাঁড়ালেন এবং সাহাবীদের সম্বোধন করে বললেন, “তোমাদের মধ্যে যে উত্তমরূপে ওযু করার পর বলে,
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ
অর্থ : 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রাসূল।'
তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেয়া হবে। সেগুলোর যেকোনোটি দিয়ে সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। কোনো মুসলিম যদি উত্তমরূপে ওযু করে এবং তারপর দাঁড়িয়ে পূর্ণ মনোযোগের সাথে দুই রাকাত সালাত আদায় করে তাকে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে।” ৭৬
যোহরের তুলনায় আসরের পর নবীজি অনেক কম কথা বলতেন। তিনি বুঝতে পারতেন যে, মানুষ ক্লান্ত। তা ছাড়া দিনের বাকি কাজটুকু শেষ করার জন্য এবং রাতের খাবার প্রস্তুতের জন্য তাদের অবকাশ দেয়া প্রয়োজন। আসরের সালাত শেষ করে তিনি তাঁর স্ত্রীদের কাছে যেতেন। তিনি একে একে তাদের সবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। প্রত্যেকের সাথে সহবাস ব্যতীতই তিনি ঘনিষ্ঠ হয়ে বসতেন, চুমু খেতেন অথবা খুনসুটি করতেন। যেদিন যার সাথে থাকার পালা থাকত তার ঘরে তিনি সবার শেষে যেতেন এবং ওই রাত তিনি সেই স্ত্রীর সাথেই কাটাতেন।
আর মাঝে মাঝে বাকি সব স্ত্রীরা যার পালা থাকত ওইদিন তার ঘরে জমা হতেন। খুব সম্ভবত তারা এটা শীতকালে করতেন, যখন দিন ছোট হতো এবং আলাদা করে প্রত্যেক স্ত্রীদের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য আসর ও মাগরিবের মাঝে যথেষ্ট সময় নবীজি -এর হাতে থাকত না। তাই তখন তিনি সবার সাথে একবারেই সাক্ষাৎ করতেন।
কোনো একবার তারা আয়িশা রা. এর ঘরে জমায়েত হলেন যেখানে যাইনাব বিনতে জাহাশ রা.ও উপস্থিত ছিলেন। রাসূল ঘরে প্রবেশের পর যখন যাইনাব রা. এর হাত ধরলেন তখন আয়িশা রা. বলে উঠলেন, “এটা যাইনাব।” সাথে সাথে নবীজি তার হাত ছেড়ে দিলেন। তাদের দুই জনই তর্ক শুরু করলেন, এমনকি তাদের আওয়াজ উঁচু হয়ে গিয়েছিল। একটু পরেই মসজিদে ছিল সালাতের জামাত। তাই আবু বকর রা. সেদিক দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের আওয়াজ শুনতে পেলেন। তিনি সজোরে বললেন, "সালাতের জন্য আসুন ইয়া রাসূলাল্লাহ এবং এদের মুখে ধুলো ছুড়ে দিন।"
রাসূল সালাতের জন্য বের হয়ে আসলেন। আয়িশা রা. বললেন, "সালাত আদায় করে আবু বকর রা. এখন এদিকেই আসবেন এবং আমার ওপর হাত তুলবেন।”
নবীজি যখন সালাত শেষ করলেন তখন আবু বকর রা. পুনরায় আয়িশা রা. এর কাছে গেলেন এবং রাগত স্বরে তাকে বললেন, “তুমি কীভাবে এমনটা করতে পার?”
কখনো কখনো আসরের সালাত শেষ করে নবীজি ঘরে যেতেন এবং দুই রাকাত সুন্নাত আদায় করতেন, যদিও আসর শেষ করার পর মাগরিব পর্যন্ত কোনো নফল সালাত আদায়কে তিনি নিরুৎসাহিত করেছেন। এ রকমটা ঘটেছিল যখন আব্দুল কায়েস গোত্রের একটা প্রতিনিধিদল মদীনায় রাসূল-কে তাদের সম্প্রদায়ের ইসলাম গ্রহণের কথা জানাতে এসেছিল। তিনি যোহর সালাতের পর তাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তাদের সাথে ব্যস্ত থাকায় যোহরের পরে নিয়মিত আদায় করা দুই রাকাত সালাত তার বাদ পড়ে গিয়েছিল। এই জন্যই তিনি আসরের পর যোহরের বাকি থাকা দুই রাকাত সুন্নাতের কাযা আদায় করেছিলেন। এরপর থেকে এই সালাত তিনি নিয়মিত আদায় করতেন। কেননা, একবার কোনো সুন্নাত আদায় করে ফেললে পরবর্তী সময়ে সেটা নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া তার অভ্যাস ছিল। আয়িশা রা. বর্ণনা করেন, “সেই সত্তার শপথ, যিনি তার প্রাণ জড়ো করেছেন, রাসূল স্বীয় রবের সাথে মিলিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এই দুই রাকাত কখনোই পরিত্যাগ করেননি ৭৮, অর্থাৎ আসরের পরের রাকাতগুলো।” ৭৯ অধিকাংশ ক্ষেত্রে আসরের পরের সময়টুকু তিনি তাঁর স্ত্রীদের সাথে অতিবাহিত করতেন।
নবীজি যখন স্ত্রীদের সাথে সময় কাটাতেন তখন অত্যন্ত আনন্দঘন পারিবারিক আবহ বিরাজ করত। অবসরের এই সময়টুকুতেও তারা ইলম অন্বেষণে করতেন, আলোচনা হতো বিবিধ সমস্যা কিংবা প্রশ্ন নিয়ে। রাসূল অত্যন্ত আগ্রহের সাথে এ ধরনের প্রশ্নগুলো শুনতেন এবং সেসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ জবাবও দিতেন। উদাহরণস্বরূপ, আয়িশা রা. এর করা একটি প্রশ্নের কথা উল্লেখ করা যায়। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিতে এবং মানুষকে সত্যের দিকে আকৃষ্ট করার প্রয়াস চালাতে গিয়ে নবীজির সর্বাধিক কষ্টের অভিজ্ঞতা কোনটা ছিল? তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি কি কখনো উহুদের দিনের চেয়েও বেশি কষ্টকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলেন?”
নবীজি জবাবে বললেন, “আমি তোমার সম্প্রদায়ের কাছ থেকে এর থেকেও বেশি দুর্ব্যবহার পেয়েছি। যার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অভিজ্ঞতাটি হয়েছিলো আকাবাহর দিনে আব্দ ইয়ালিল আব্দ কুলালের কাছে দাওয়াত পৌঁছানোর পর। সে আমার দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। আমি খুব হতাশ হয়ে ফিরে আসলাম এবং বুঝতেও পারছিলাম না আমি ঠিক কোন দিকে যাচ্ছি। কারণ, আস-সালিবে পৌঁছার পরই যেন আমার বোধশক্তি ফিরে পেলাম। ৮০ ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম আমার মাথার ওপর একখণ্ড মেঘ। আমি সেখানে জিবরাঈল আ. কে দেখতে পেলাম। তিনি আমাকে ডেকে বললেন, "আপনার সম্প্রদায়ের লোকেরা আপনাকে যা বলেছে এবং যেভাবে তিরস্কার করেছে তা আপনার রব শুনেছেন। তিনি পাহাড়ের দায়িত্বশীল ফেরেশতাকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন যেন তাদের ব্যাপারে আপনি তাকে আদেশ করেন। পাহাড়ের দায়িত্বশীল ফেরেশতা আমাকে সম্বোধন করে সালাম জানালেন এবং বললেন, “মুহাম্মাদ, আপনার লোকেরা আপনাকে যা বলেছে তা আপনার রব শুনেছেন। আমি পাহাড়ের দায়িত্বশীল ফেরেশতা। আপনার রব আমাকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন, যাতে আমি আপনার আদেশ পালন করতে পারি। আপনার যা ইচ্ছা আদেশ করুন। আপনি চাইলে তাদের এই দুই পাহাড়ের মধ্যে পিষে ফেলব।” ৮১
আমি বললাম, “না। আমি আশা পোষণ করি যে, আল্লাহ তাদের বংশধরদের মধ্য হতে এমন মানুষ সৃষ্টি করবেন, যারা কারও সাথে শরীক না করেই এক আল্লাহর ইবাদাত করবে।
রাসূল ﷺ এর সাথে আয়িশা রা. এর এ ধরনের আবেগপূর্ণ আলোচনা প্রমাণ করে যে, তিনি রাসূলের সাথে সম্পর্কিত ঘটনাগুলো জেনে নিতে কত আগ্রহী ছিলেন। নবীজি -এর সবচেয়ে কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতার কথা তিনি অবহিত হতে চেয়েছেন, যাতে করে তাঁর সেই পীড়াদায়ক অনুভূতিটুকু নিজেও কিছুটা অনুভব করতে পারেন।
এই ঘটনায় রাসূল -এর ব্যক্ত মনোভাব তাঁর রবের দ্বারা জমকালোভাবে পুরস্কৃত হয়েছিল। তাঁর মহিমামণ্ডিত জীবনাবসানের পূর্বেই সেই আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন ঘটানো হয়েছিল। মুর্তিপূজারি পিতা-মাতার সন্তান-সন্ততিদের ইসলাম গ্রহণ, এক আল্লাহর ইবাদাত, তাঁর সাথে শরীক স্থাপন না করা, এমনকি আল্লাহর রাসূল এবং তার প্রচারিত বাণীর প্রতিরক্ষায় তাদের স্বীয় জীবন বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত থাকাও তিনি স্বচক্ষে দেখে গেছেন।
একদিন কথাপ্রসঙ্গে নবীজি আয়িশা রা. কে বললেন, “বিচার দিবসে যার হিসাব চাওয়া হবে তার শাস্তি অবধারিত।”
আয়িশা রা. ইলম অন্বেষণে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। বিশেষ করে যখন কোনো বক্তব্য তার কাছে পরস্পরবিরোধী মনে হতো তিনি তখন সেই বিষয়ে প্রশ্ন করতেন। তাই রাসূল ﷺ এর এই মন্তব্য শোনার সাথে সাথেই তিনি এই বলে একটা প্রশ্ন উত্থাপন করলেন যে, “কিন্তু আল্লাহ মুমিনদের সম্পর্কে বলেছেন,
فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِيَمِينِهِ فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابًا يَسِيرًا
'অতঃপর যার আমলনামা তার ডান হাতে দেয়া হবে তার হিসাব সহজভাবেই নেয়া হবে'।” ৮২
নবীজি তখন বললেন, “এই আয়াত তো জবাবদিহিতার কথা বলছে না; বরং এটা হিসাব হস্তান্তরের কথা বলছে। যাকে তার কাজ সম্বন্ধে বিচার দিবসে প্রশ্ন করা হবে, তাকেই শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে।”
একদিন কথাপ্রসঙ্গে নবীজি হাফসা রা. কে বললেন, “যারা বদরের যুদ্ধ এবং হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় উপস্থিত ছিল তাদের কেউ জাহান্নামে প্রবেশ করবে না বলেই আমি আশা পোষণ করি।”
হাফসা রা.ও তখন বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, নিশ্চয়ই তাঁরা জাহান্নামে প্রবেশ করবেন না।"
নবীজি তার উক্ত কথার সমালোচনা করে বললেন, “আল্লাহ কি কুরআনে বলেননি:
وَإِنْ مِنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا كَانَ عَلَى رَبِّكَ حَتْمًا مَقْضِيًّا
'তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যাকে জাহান্নাম অতিক্রম করতে হবে না। এটা তোমার প্রতিপালকের অনিবার্য ফায়সালা।” ৮৩ তিনি আরও বললেন, “তুমি কি শোনোনি এর পরের আয়াতে আল্লাহ কী বলেছেন :
ثُمَّ نُنَجِّي الَّذِينَ اتَّقَوْا وَنَذَرُ الظَّالِمِينَ فِيهَا جِثِيًّا
'অতঃপর মুত্তাকীদের আমি রক্ষা করব আর যালিমদের তার মধ্যে নতজানু অবস্থায় রেখে দেব'।” ৮৪
উক্ত বর্ণনাগুলোই প্রমাণ করে যে, নবীজি স্ত্রীদের শুধু প্রশ্ন এবং বিতর্ক করার সুযোগই দিতেন না; বরং উৎসাহও দিতেন। তিনি প্রমাণ উপস্থাপন এবং মানুষকে ঈমানের দাওয়াত দেয়ার লক্ষ্যে আলোচনা এবং কথোপকথনকেই একমাত্র মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
সাহাবীরা মাঝে মাঝে আসরের পর নবীজিকে তাদের ঘরে দাওয়াত দিতেন। কারণ, কোনো একটা বিশেষ কাজ করার সময় নবীজি -এর উপস্থিতিকে তারা পছন্দ করতেন। তিনিও তাদের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করতেন না। একবার আসরের পর সালামাহ গোত্রের এক ব্যক্তি তাঁকে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা একটু পরেই একটা উট জবাই করব। আর আমরা খুব করে চাই, যেন আপনি আমাদের সাথে অংশগ্রহণ করেন।” তাদের জন্য পশু জবাই করাটাই যেন ছিল একটা উৎসব। কারণ, তাদের খাদ্যতালিকায় মাংসের দেখা কদাচিৎ মিলত। তাই রাসূল এই দাওয়াত গ্রহণ করলেন এবং কয়েকজন সাহাবীকে সঙ্গে নিয়ে তাদের সাথে রওনা দিলেন। পৌঁছার পর দেখা গেল উটটি তখনো জবাই করা বাকি। নবীজি এর আগমনের পর সেটা জবাই করা হলো এবং গোশতগুলো ভাগ করে কিছু অংশ তারা সূর্যাস্তের পূর্বে খাওয়ার জন্য প্রস্তুত করলেন।
এই মুহূর্তটির ব্যাপারে একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন। আল্লাহর রাসূল মদীনার দক্ষিণ দিকে শহরের প্রায় শেষপ্রান্তে মসজিদে নববী থেকে সবচেয়ে বেশি দূরত্বে অবস্থিত সালামাহ গোত্রের বসতিতে গিয়েছিলেন কেবল একটা উট জবাইয়ের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে। আমার মনে হয় তিনি হেঁটে হেঁটে এতদূর গিয়েছিলেন শুধু মানুষগুলোকে খুশি করার জন্য এবং তাদের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিতে। সুতরাং মুহূর্তটি তাদের জন্য কেবল পশু জবাইয়ের উপলক্ষ্য না থেকে রাসূলের সাথে চড়ুইভাতি করার মতো আনন্দময় উৎসবে রূপান্তরিত হলো। নিশ্চয়ই সালামাহ গোত্রের মানুষের মনে এই সুখময় স্মৃতি অনেক দিন পর্যন্ত জাগ্রত ছিল!
কতই-না অমায়িক, বদান্য আর সহৃদয়বান মানুষ ছিলেন আমাদের নবীজি ﷺ! মানুষকে পুলকিত করার এবং তাদের আনন্দানুভূতি বাড়িয়ে দেয়ার প্রত্যেকটা সুযোগই তিনি লুফে নিতেন। তাঁর এই অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমেই তিনি সাহাবীদের হৃদয়রাজ্য দখল করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
টিকাঃ
৭৫. সহীহ মুসলিম: ২৩১; শুয়াবুল ঈমান: ২৫৫৯
৭৬. মুসনাদ আহমদ: ১৭৩৯৩
৭৭. যাইনাব রাসূলের একজন স্ত্রী ছিলেন। যেহেতু জমায়েত আয়িশা রা.-এর ঘরে ছিলো সুতরাং সেদিন ছিলো তার পালা। তাই নবীজি যাইনাব রা. এর হাত ধরায় তিনি ঈর্ষান্বিত হয়ে এমনটা করেছিলেন। তদুপরি আয়িশা রা. ভীত ছিলেন এটা ভেবে যে, তার পিতা তার ওপর রাগ করবেন।
৭৮. আসরের পরে নফল পড়া জায়েজ নেই। কারণ, এটি মাকরূহ সময়। রাসুলুল্লাহ থেকে উল্লেখিত হাদীসে আসরের পর নামায পড়ার যে বিষয়টি জানা যায়, এটি শুধু তাঁর জন্যই খাস। ফাতহুল বারী (২/৬৪), ফাতওয়ায়ে লাযনা দায়িমা (৬/১৭৩)
৭৯. সহীহ বুখারি: ৫৯৩
৮০. এটা তাঈফের নিকটে অবস্থিত কারন আল-মানাযিলের অপর নাম যা হজ্জ্বযাত্রীদের মক্কায় প্রবেশের পূর্বে ইহরাম বাঁধার স্থান।
৮১. মক্কার সন্নিকটে কুবাইস এবং কুয়াইকিয়ান নামে নামে দুইটি পর্বত আছে। পাথরের কাঠিন্যের কারণেই এই পাহাড়দুটি বেশ পরিচিত।
৮২. সূরা ইনশিক্বাক ৮৪:৭-৮
৮৩. সূরা মারিয়াম ১৯:৭১
৮৪. সুরা মারিয়াম ১৯:৭২
📄 পরন্ত দুপুরে
নবীজি যদি যুহরের আগে ঘুমে থাকতেন তবে বিলালের রা. আযান শুনে জাগ্রত হয়ে যেতেন। তারপর তিনি আযানের শব্দগুলো পুনরাবৃত্তি করার মাধ্যমে আযানের জবাব দিতেন। যদি প্রয়োজন মনে হতো তাহলে তিনি তখন উযু করে নিতেন। তারপর ঘরের মধ্যেই যুহরের চার রাকাত সুন্নাহ সালাত আদায় করতেন। তিনি বলতেন, “এটা এমন একটা সময় যখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়। আর আমি পছন্দ করি তখন যেন আমার একটা ভালো আমল সেখানে পেশ করা হয়।”
জামাতের সময় হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আল্লাহর রাসূল বাসাতেই অপেক্ষারত থাকতেন। এই সময়টাতে মাঝে মাঝে তিনি নাতি-নাতনিদের সাথে খেলতেন। ফাতিমা রা. এর দুই পুত্র হাসান ও হুসাইন রা. এবং যাইনাব রা. এর কন্যা উমামাহ রা. হয়তো সেখানে প্রিয়নবীকে সঙ্গ দিতেন। বিলাল এসে যখন জানাতেন যে, সালাতের সময় হয়েছে, তখন নবীজি বাইরে বেরিয়ে আসতেন। সালাতে যাওয়ার আগে তিনি কখনো নিজ স্ত্রীদের চুমু খেতেন। নবীজিকে বেরিয়ে আসতে দেখলে বিলাল রা. সালাতের ইকামাত দিতেন। সাহাবাগণও প্রিয়নবীর আগমনে সালাতের জন্য উঠে দাঁড়াতেন।
তারা হয়তো অবাক হয়ে লক্ষ করতেন, আল্লাহর রাসূল হাসান, হুসাইন বা উমামাহকে কাঁধে করে নিয়ে সালাতের জন্য এসেছেন। ইমামতি করার সময় তিনি হয়তো তাদের পাশে বসিয়ে রাখতেন।
একবারের ঘটনা। তিনি হাসান বা হুসাইনকে কোলে নিয়ে সালাতের জন্য এগিয়ে গেলেন। নাতিকে পাশে বসিয়ে তিলি সালাত শুরু করলেন। সালাতে নবীজি একটি সিজদা অনেক বেশি দীর্ঘ করলেন। সাহাবী শাদ্দাদ ইবনুল হাদ রা. সিজদাহ থেকে সামান্য মাথা তুলে দেখলেন যে, হাসান বা হুসাইন নবীজির পিঠে চড়ে বসেছে। সালাত শেষে সাহাবীগণ নবীজিকে শুধালেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আপনি একটি সিজদা অনেক বেশি লম্বা করেছিলেন। আমরা তো ভেবেছিলাম আপনার কিছু হয়েছে অথবা আপনার ওপর ওহী নাযিল হচ্ছে।” নবীজি তখন বললেন, “না, এ রকম কিছুই হয়নি। আমার ছেলে (নাতি) আমার পিঠে চড়ে বসেছিল আর সে নিজে নিজে নেমে আসার আগে আমি তাকে তাড়া দিতে চাইনি।”
নবীজি হয়তো ছোট বাচ্চাকে কোলে নিয়েই সালাত শুরু করে দিতেন। রুকুতে যাওয়ার সময় তাদের নামিয়ে রাখতেন। আবার উঠে দাঁড়ানোর বেলায় তাদের কোলে তুলে নিতেন। নবীজি নিজের নাতনি উমামাহ বিনতে যাইনাবকে সাথে নিয়ে এভাবে সালাত আদায় করেছেন।
ওয়াক্তের শুরুতে যুহরের সালাত আদায় করে নেয়া নবীজির অভ্যাস ছিল। প্রথম দুই রাকাতে তিনি প্রায় ৩০ আয়াতের মতো তিলাওয়াত করতেন। প্রথম রাকাত দ্বিতীয় রাকাতের চেয়ে দীর্ঘ হতো। তিনি এ সালাত এত দীর্ঘ করতেন যে, ইকামাত হয়ে যাওয়ার পর কেউ যদি 'আলবাক্কি' নামক স্থানে নিয়ে প্রাকৃতিক প্রয়োজন সেরে তারপর নিজ বাসায় গিয়ে উযু করে মসজিদে ফিরে আসতেন, তবুও নবীজিকে প্রথম দুই রাকাতের মধ্যেই পেয়ে যেতেন। যুহরের সালাতে নবীজি মনে মনে তিলাওয়াত করতেন, তাঁর দাড়ির নড়াচড়া দেখে সাহাবীগণ বুঝে নিতেন যে তিনি তিলাওয়াত করছেন। মাঝে মাঝে তারা নবীজিকে একটি বা দুটি আয়াত জোরে তিলাওয়াত করতেও শুনতেন।
সালাতের পর নবীজি সাহাবাদের দিকে মুখ করে বসতেন। কোনো বিশেষ ঘটনা ঘটলে বা অপ্রীতিকর কোনো অবস্থার সৃষ্টি হলে এ সময়টাই ছিল সাহাবাদের সাথে নবীজির সাক্ষাতের সময়। কারণ, এ সময়টাতে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মুসল্লি উপস্থিত থাকতেন। দুপুরের ঘুমের পর সবাই সতেজ থাকতেন বিধায় তারা তখন নবীজির কথা পূর্ণ মনোযোগের সাথে অনুধাবন করতে পারতেন।
একবার এই সময়ে 'মুদার' গোত্র থেকে প্রতিনিধিদল আসল। তারা এত বেশি দারিদ্র্য আর অনাহারে ভুগছিল যে, তা দেখে আল্লাহর রাসূল বিচলিত হয়ে পড়লেন। যুহরের সালাতের পর তিনি মিম্বরে দাঁড়িয়ে উপস্থিত সবার উদ্দেশে কথা বলা শুরু করলেন। আল্লাহর শোকর ও প্রশংসা দ্বারা বক্তব্য শুরু করে অতঃপর তিনি বললেন, “আল্লাহ তাঁর কিতাব আল-কুরআনে নাযিল করেছেন :
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا
'হে মনুষ্য-সমাজ, তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি তোমাদের একটিমাত্র ব্যক্তি হতে পয়দা করেছেন এবং তা হতে তার জোড়া সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর সেই দুজন হতে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে তোমরা পরস্পরের নিকট (হক্ক) চেয়ে থাকো এবং সতর্ক থাকো জ্ঞাতি-বন্ধন সম্পর্কে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন।' ৭০
তিনি আরও বললেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
“মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো। প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত, আগামীকালের জন্যে সে কী প্রেরণ করে, তা চিন্তা করা। আল্লাহ তাআলাকে ভয় করতে থাকো। তোমরা যা করো, আল্লাহ তা'আলা সে সম্পর্কে খবর রাখেন।” ৭১
নবীজি বলতে থাকলেন যে, কেউ চাইলে নগদ অর্থ দান করতে পারে; অল্প হোক কিংবা বেশি। অথবা কেউ চাইলে কাপড় বা তার অংশ থেকে কিছু ময়দা বা খেজুরও দান করে দিতে পারে। তিনি এভাবে বলেই যাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে এসে বললেন, কেউ চাইলে একটি খেজুরের অর্ধেকও যদি সাদাকা করতে চায়, করতে পারে। তিনি সবাইকে সাদাকা করতে উৎসাহিত করছিলেন। অনুপ্রেরণা দিচ্ছিলেন, সবাই যাতে সাদাকা নিয়ে এগিয়ে আসেন।
একবার নবীজি ইবনু আল লুতবিয়াহকে রা. যাকাত আদায়ের কাজে প্রেরণ করলেন। তিনি ফিরে এসে জানালেন, “হে আল্লাহর রাসূল, এগুলো আপনাকে দেয়া হয়েছে আর এটি আমাকে উপহার দেয়া হয়েছে।” নবীজি সেদিন যুহরের সালাতের পর সবার উদ্দেশে ভাষণ প্রদান করলেন। শুরুতে আল্লাহর এককত্বের ঘোষণা দিলেন। অতঃপর আল্লাহর প্রশংসা আর শোকরের মাধ্যমে বক্তৃতা শুরু করলেন। তিনি বললেন,
“তোমাদের কাউকে আমি হয়তো কোনো একটি কাজের দায়িত্ব প্রদান করে পাঠালাম। তখন কর্মচারীর জন্য এটি সমীচীন নয় যে, আমি তাকে কর্মচারী নিয়োগ করে পাঠাব, আর সে ফিরে এসে বলবে, এই মাল তোমাদের এবং এই হাদিয়া আমাকে দেওয়া হয়েছে। যদি সে তার পিতার বা মাতার গৃহে বসে থেকে দেখতে যে, তাকে হাদিয়া দেওয়া হয় কি না? সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের কেউ যদি এমন কিছু গ্রহণ করো, যা নেয়ার অধিকার তার নেই, তাহলে সে কিয়ামতের দিন তা নিয়ে উপস্থিত হবে। যদি তা উট হয়, তবে সে উটের আওয়াজ করতে থাকবে। যদি বলদ অথবা গাভী হয়, তখন সে গরুর মতো হাম্বা-হাম্বা ডাক দিতে দিতে আসবে। আর যদি বকরি হয়, তবে তাও বকরির মতো ডাকতে থাকবে। আমি সে ডাক শুনে তাকে চিনতে পারব। এরপর তিনি তাঁর দু-হাত (দুআর জন্য) এত ওপরে উঠালেন যে, আমরা তাঁর বগলের সাদা অংশ দেখতে পেলাম। অতঃপর তিনি বলেন, ইয়া রব্বি, আমি কি (তোমার হুকুম) পৌঁছে দিয়েছি? ইয়া রব্বি, আমি কি (তোমার নির্দেশ) পৌঁছে দিয়েছি?” ৭২
একদিন যুহরের সালাতের পর রাসূলুল্লাহ মিম্বারে উঠে দাঁড়িয়ে কিয়ামত দিবসের আলামতের ব্যাপারে কথা বলা শুরু করলেন। তিনি বললেন যে, শেষ জামানায় মারাত্মক-সব ঘটনা সংঘটিত হবে। তারপর তিনি বললেন, “যে কেউ আমাকে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করতে চায়, সে যেন সামনে এগিয়ে আসে। আল্লাহর শপথ! যতক্ষণ আমি এভাবে দাঁড়িয়ে আছি, ততক্ষণ তোমরা আমাকে যে প্রশ্নই করো, আমি তার জবাব দেব।” অধিকাংশ উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম তখন কাঁদছিলেন। নবীজি কারও প্রশ্ন থাকলে তা করার কথা কয়েকবার বললেন। তখন সাহম গোত্রের আব্দুল্লাহ ইবনু হুযাইফা রা. উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “ও আল্লাহর রাসূল, আমার পিতা কে?”
আব্দুল্লাহ ইবনু হুযাইফার একবার কিছু লোকের সাথে ঝগড়া হয়েছিল। সে লোকগুলো দাবি করে তিনি হুযাইফার পুত্র নন। তাই তিনি রাসূলুল্লাহকে এ প্রশ্ন করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ জবাব দিলেন, “তোমার পিতা হচ্ছে হুযাইফা।”
নবীজি যখন বারবার কারও প্রশ্ন থাকলে তা করার জন্য বলছিলেন, তখন উমর রা. বসে পড়লেন এবং বললেন, “আমরা আল্লাহকে রব হিসেবে পেয়ে, ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পেয়ে এবং মুহাম্মাদ-কে নবী হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট।”
তারপর নবীজি একই কথার পুনরাবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত হলেন। অতঃপর বললেন, “আওলা, শপথ সেই সত্তার, যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, একটু আগে এই দেয়ালের বিপরীতে আমাকে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখানো হয়েছে। আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে, তাহলে তোমরা অল্পই হাসতে আর অনেক বেশি কাঁদতে।”
এ কথা শুনে সাহাবীগণ কেউ কেউ তাঁদের চেহারা ঢেকে নিলেন এবং তাদের কান্নার রোল আসতে লাগল। এটি ছিল আল্লাহর রাসূলের সাহাবীদের জন্য সবচেয়ে কঠিন একটি দিন।
অন্য বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ -এর কাছে সাহাবীদের কোনো কথা পৌঁছল। অতঃপর তিনি ভাষণ দিয়ে বললেন, “আমার নিকট জান্নাত ও জাহান্নাম পেশ করা হলো। ফলে আমি আজকের মতো ভালো ও মন্দ (একত্রে) কোনো দিনই দেখিনি। যদি তোমরা তা জানতে, যা আমি জানি, তাহলে কম হাসতে আর বেশি কাঁদতে।” সুতরাং সাহাবীদের জন্য সেদিনকার মতো কঠিনতম দিন আর ছিল না। তাঁরা তাঁদের মাথা আবৃত করে কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
মাইয রা. এর ওপর যিনার শাস্তি বাস্তবায়ন করার পরেও নবীজি সাহাবীদের উদ্দেশে বক্তব্য রেখেছিলেন। যুহরের সালাতের পর তিনি আল্লাহর প্রশংসার মাধ্যমে বক্তব্য শুরু করেন। তিনি বলেন, “সাবধান! আমরা যখন আল্লাহর পথে জিহাদের উদ্দেশ্যে গমন করি, তখন কেউ কেউ পেছনে থেকে যায় এবং পাঁঠার ন্যায় আওয়াজ করে (অর্থাৎ পাঁঠা যেমন সঙ্গমের সময় উচ্চৈঃস্বরে আওয়াজ করে তদ্রুপ) আর তাদের সে অল্প দুধ দেয়। (অর্থাৎ সঙ্গম করে, দুধের অর্থ বীর্য)। আল্লাহর শপথ! যদি আল্লাহ আমাকে এই শ্রেণির কোনো লোকের ওপর ক্ষমতা প্রদান করেন, তবে আমি তাকে অবশ্যই শাস্তি দেব।"
নবীজি মাইযের মাগফিরাতের জন্য কোনো দুআও করলেন না; আবার তার ব্যাপারে মন্দও বললেন না। (কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে যে পরবর্তী সময়ে তিনি সাহাবাদের মাইযের জন্য দুআ করতে বলেছিলেন।) ৭৪
যখন কোনো জরুরি ঘটনা ঘটত যার ব্যাপারে ত্বরিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন, তখনই নবীজি এ ধরনের বক্তব্য প্রদান করতেন। তিনি জরুরি ইস্যুকে পরবর্তী জুমআর খুতবায় আলোচনা করার জন্য ফেলে রাখতেন না।
তারপর নবীজি সাধারণত ঘরে ফিরে যুহরের দুই রাকাত সুন্নাত সালাত আদায় করতেন। ফরয সালাতের পর এ দুই রাকাত সুন্নাত সালাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা।
নবীজি হয়তো কিছুক্ষণ পর সাহাবীদের সাহচর্য দেয়ার জন্য আবার ঘর থেকে বেরিয়ে পড়তেন। আসরের ওয়াক্ত শুরু হওয়া পর্যন্ত তিনি তাদের সাথে থাকতেন। একবার আব্দ কায়েস গোত্র থেকে প্রতিনিধিদল আসলে তিনি তাদের সাথে যুহর থেকে আসরের মধ্যবর্তী সময়টুকু কাটান।
তিনি এ সময়টাতে সামাজিক সমস্যাবলি সমাধানেও তৎপর হতেন। একবার নবীজি খবর পেলেন কুবার অধিবাসীদের সাথে আমর ইবনু আওফের গোত্রের কলহ হয়েছে। তাদের মধ্যে ঝামেলা এত বেশি বেড়ে গিয়েছিল যে তারা একে অপরের দিকে পাথর পর্যন্ত ছুড়ে মারছিল। তিনি কিছু সাহাবীদের বলেন, “চলো আমরা সেখানে গিয়ে তাদের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে দিই।” তিনি বিলাল রা. কে বললেন, "যদি আসরের সালাতের সময় চলে আসে আর আমি ফিরে না আসি, তবে নামাজে ইমামতি করানোর জন্যে আবু বকরকে বলবে।”
আসরের সময় হয়ে গেল। নবীজি ফিরে আসলেন না। বিলাল রা. তখন আবু বকরকে ইমামতির অনুরোধ জানালেন। বিলাল রা. ইকামত দিলেন আর আবু বকর রা. এগিয়ে এসে সালাতে ইমামতি শুরু করলেন। মুসল্লিগণও সালাত শুরু করে দিলেন। সেই সময়ে নবীজি ফিরে আসলেন এবং প্রথম কাতারে এসে দাঁড়ালেন। মুসল্লিগণ হাত দিয়ে তালি বাজাচ্ছিলেন কিন্তু আবু বকর রা. ঘাড় ফেরালেন না। যখন হাত তালির পরিমাণ বেড়ে গেল তখন তিনি তার চেহারা হালকা কাত করে নবীজিকে দেখতে পেলেন। আবু বকর পেছনে চলে আসতে চাইলেন, যাতে করে নবীজি সালাতে ইমামতি করান। কিন্তু নবীজি হাতের ইশারায় আবু বকরকে স্বস্থানে থাকতে বললেন। আল্লাহর রাসূল আবু বকর রা. কে যেভাবে শিখিয়ে দিয়েছেন, সেভাবে তিনি আকাশের দিকে দু- হাত তুলে আল্লাহর প্রশংসা করলেন। তারপর পিছিয়ে এসে প্রথম কাতারে দাঁড়ালেন আর নবীজি ইমামের স্থানে গিয়ে সালাতে ইমামতি করলেন। সালাত শেষ হওয়ার পর নবীজি লোকদের দিকে ফিরে বললেন, “সালাতে কিছু ঘটলে তোমরা হাত তালি দিলে কেন? হাত তালি দেয়া তো মহিলাদের জন্য প্রযোজ্য। সালাতে কিছু ঘটলে তোমরা 'সুবহানাল্লাহ' বলবে। কেউ যখন তা শুনবে সে তখন চেহারা ফেরাবে।" তারপর নবীজি আবু বকর রা. কে জিজ্ঞেস করলেন যে, স্পষ্টভাবে তাকে সালাত চালিয়ে যাওয়ার সংকেত দেওয়ার পরও তিনি কেন ইমাম হিসেবে সালাত চালু রাখলেন না? আবু বকর রা. জবাবে বললেন, “নবী -এর উপস্থিতিতে আমি সালাতে ইমামতি করব এটি সমীচীন নয়।”
আরেকবার নবীজি 'আলবাকি'র উত্তরদিকে অবস্থিত আলআসওয়াফ নামক এলাকায় সাদ ইবনু আর-রাবির কন্যাদের সাথে দেখা করতে গেলেন। তারা ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের প্রথম মুসলিম মহিলা, যারা নিজেদের পিতা থেকে উত্তরাধিকারের সম্পদ ভোগ করেন। নবীজি তাদের পিতার সম্পত্তি ভাগ করে তাদের দিতে সেখানে গিয়েছিলেন। নবীজি দুপুরবেলা রওনা দিয়েছিলেন, সেখানে পৌঁছানোর পর তারা নবীজির নিকট কিছু রান্না করা গোশত আর রুটি পেশ করল। নবীজি তা সাথের সঙ্গীদের নিয়ে খেলেন। তারপর উযু করে যুহরের সালাতে ইমামতি করালেন। সালাত শেষে নবীজি সাদের কন্যাদের মাঝে জায়গা-জমি ও সম্পত্তি বণ্টন করে দেয়ার কাজে বসলেন, আসরের ওয়াক্ত আসার আগেই মিরাছের সম্পত্তি বণ্টনের কাজ সমাপ্ত হয়ে গেল। একই খাদ্য আবার নবীজি -এর সামনে পেশ করা হলো। তিনিও সাথের সাহাবীদের নিয়ে সে খাদ্য গ্রহণ করলেন। তারপর আসরের সালাতের জন্য উঠে দাঁড়ালেন। নবীজি কিংবা সাহাবীদের কারওই আবার নতুন করে উযু করার প্রয়োজন হয়নি।
টিকাঃ
৭০. সূরা নিসা, ৪:১
৭১. সূরা হাশর, ৫৯:১৮
৭২. সুনানে আবু দাউদ (ইসলামি ফাউণ্ডেশন), অধ্যায় ১৪, হাদীস নং ২৯৩৬
৭৩. আরবি শব্দ 'আওলা' সতর্কতা বুঝাতে ব্যবহৃত হয়। এখানে বুঝানো হয়েছে যে, "সাবধান, তোমরা অচিরেই তা দেখতে পাবে যা তোমরা অপছন্দ করো।"
৭৪. তুলনীয়ঃ সহীহ মুসলিম, ৬ষ্ঠ অধ্যায়, অপরাধের শাস্তি, হাদিস নং- ৪২৭৫