📘 নবীজির দিনলিপি ﷺ > 📄 গন্তব্য যখন কুবা

📄 গন্তব্য যখন কুবা


প্রতি শনিবারের মধ্য-সকালে আমাদের প্রিয় নবী কুবায় যেতেন; তিনি কখনো হেঁটে আবার কখনো-বা বাহনে চড়ে যেতেন। সেখানে মসজিদ আল কুবায় তিনি সালাত আদায় করতেন। কুবার অধিবাসীরা আওফ ইবনুল হারিছের গোত্রভুক্ত ছিল। তারা নবীজিকে সে সময় দেখতে আসত, অভ্যর্থনা জানাত।
কুবায় গেলে নবীজি উম্মু হারাম বিনতে মিলহান রা.-এর ঘরে অবস্থান করতেন, সেখানে কায়লুলা করতেন। উম্মু হারাম হচ্ছেন উম্মু সুলাইমের বোন। তারা উভয়েই নবীজির মাহরাম ছিলেন। একবার নবীজি উম্মু হারামের ঘরে গিয়ে কিছু খাবার গ্রহণ করলেন এবং তারপর সেখানে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ পর মুচকি হেসে জাগ্রত হলেন। হযরত উম্মে হারাম রা. জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি কেন হাসছেন?”
রাসূলুল্লাহ বললেন, “আমি স্বপ্নে দেখলাম যে আমার উম্মতের কিছু লোক আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবে। তারা সমুদ্র সফর করবে এমনভাবে, যেভাবে বাদশাহগণ সিংহাসনের ওপর উপবিষ্ট থাকে।”
হযরত বিনতে মিলহান আরজ করেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আল্লাহর নিকট দোআ করুন, যেন আমাকেও তাদের মধ্যে শামিল করে দেন।”
রাসূলুল্লাহ দুআ করলেন, “হে আল্লাহ, বিনতে মিলহানকে তাদের মধ্যে শামিল করে দেন।” তিনি পুনরায় তন্দ্রাচ্ছন্ন হলেন এবং মুচকি হাসি দিয়ে জাগ্রত হলেন। হযরত বিনতে মিলহান রা. পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, এবার স্বপ্নে কী হলো?”
তিনি বললেন, “এবার স্বপ্নে দেখলাম, আমার উম্মতের অপর এক জামাতের অবস্থা, যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবে।”
হযরত বিনতে মিলহান আবার আরজ করলেন “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার জন্য দুআ করে দিন যেন আমাকে সেই জামাতেও অন্তর্ভুক্ত করে দেন।”
আল্লাহর রাসূল বললেন, “তুমি প্রথম জামাতে শামিল থাকবে (দ্বিতীয় জামাতে নয়)।”
বিনতে মিলহানকে নিয়ে করা নবীজির ভবিষ্যদ্বাণী পরবর্তী সময়ে সত্য প্রমাণিত হয়। মুয়াবিয়া ইবনু আবু সুফিয়ান রা. সাইপ্রাস দ্বীপে অভিযান পরিচালনা করার জন্য একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। স্বামী উবাদাহ ইবনে সামিত রা. এর সাথে বিনতে মিলহানও সেই বাহিনীতে যুক্ত হয়ে সমুদ্র সফর করেন। সাইপ্রাস অবতরণের পর তিনি তাঁর সওয়ারি (বাহন) থেকে পড়ে গিয়ে মারাত্মকভাবে আহত হন এবং শাহাদাত বরণ করেন। সেখানেই তাকে দাফন করা হয়।
মধ্য-আরবের ছোট্ট এক কুঁড়েঘরে বসে নবীজি কতই-না অভূতপূর্ব ভবিষ্যদ্বাণী করে গেলেন! তাও এমন একটা সময়ে যখন মুসলিম উম্মত অভাব আর দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল। আর তখন কিনা আল্লাহর রাসূল তাঁর সাহাবিয়াতকে (মহিলা সাহাবী) ভবিষ্যদ্বাণী করে গেলেন যে মুসলমানগণ একসময় ভূমধ্যসাগরে সমুদ্র অভিযান পরিচালনা করবে! শুধু তা-ই নয়, তারা তখন থাকবে এমন শক্তিশালী আর গৌরবান্বিত অবস্থায়, যেভাবে বাদশাহগণ সিংহাসনের ওপর উপবিষ্ট থাকেন।
পাঠক, আপনারা হয়তো জানেন না, ভূমধ্যসাগর মদীনা থেকে অনেক দূরবর্তী একটি সাগর। আমরা যে সময়ের কথা বলছি সে সময় সমুদ্রযাত্রার ব্যাপারটাই আরবদের জন্য অলীক কল্পনা ছিল; সমুদ্রে যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করা তো অনেক দূরের কথা।
কোন জিনিসটা বেশি চমকপ্রদ ছিল? সকল সম্ভাবনা, প্রত্যাশা এবং আশেপাশের পরিস্থিতির বিপরীতে নবীজির এমন বিস্ময়কর খবর প্রদান করা নাকি বিনা বাক্যব্যয়ে নিশ্চয়তার সাথে উম্মু হারামের সেই খবর গ্রহণ করে নেয়া? উম্মু হারাম রা. নবীজিকে কোনো প্রশ্ন করেননি, সন্দেহ পোষণ করেননি, জিজ্ঞেস করেননি যে, মুসলমানদের এমন নাজুক পরিস্থিতিতে এটা কীভাবে সম্ভবপর হবে! তিনি তো এটিও জিজ্ঞেস করেননি যে, এ ঘটনা কখন সংঘটিত হবে। তিনি সোজাসাপ্টাভাবে নবীজির কাছে আরজ করে বসলেন, নবীজি যেন দুআ করে দেন যাতে তিনি নিজে সে বাহিনীতে শামিল হতে পারেন। উম্মু হারাম রা. যেন চোখের সামনে ঘটনাটা ঘটতে দেখছিলেন। এমনই ছিল সাহাবীদের ঈমান। রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00