📄 অসুস্থ ব্যক্তির পাশে
আল্লাহর নবী অসুস্থদের দেখতে যেতেন। কষ্ট-যাতনার দুঃসহ মুহূর্তগুলোতে প্রিয়নবীর উপস্থিতি যেন সাহাবাদের জন্য প্রলেপের কাজ করত, তাদের স্বস্তি জোগাত। যখন সাদ ইবনু উবাদাহ রা. অসুস্থ ছিলেন তখন নবীজি তাকে দেখতে যান। সাথে ছিলেন আব্দুর রহমান ইবনু আওফ, সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস এবং আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম। নবীজি কক্ষে ঢুকে সাদ রা. কে অচেতন অবস্থায় পেলেন। পরিবারের সবাই তখন তাঁর পাশে। নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, “সে কি মারা গেছে?”
তারা তখন জবাবে জানালেন, “না, সাদ এখনো মরেননি।”
এ সময় নবীজির চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে গিয়েছিল। উপস্থিত সবাই নবীজিকে কাঁদতে দেখে কান্না শুরু করলেন।
তখন নবীজি বললেন, "তোমরা কি শোনোনি যে, আল্লাহ কাউকে অশ্রুসজল দু-চোখের কারণে কিংবা ব্যথাকাতর অন্তরের জন্যে শাস্তি দেন না। তিনি শাস্তি দেন এই জিনিস (জিহ্বার দিকে দেখিয়ে) যা করতে পারে তার কারণে। নতুবা তিনি রহমত বর্ষণ করেন।"
নবীজি কতটুকু সহানুভূতিশীল ছিলেন তাঁর একটিমাত্র উদাহরণ এই ঘটনা। প্রিয়নবীর চোখ ভিজে গিয়েছিল শুধু তাঁর একজন সাহাবী জ্ঞান হারিয়েছেন এই কারণে। আমি অবাক হয়ে ভাবি, সাদ ইবনু উবাদাহ রা. এর কেমন লেগেছিল যখন জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর এবং সুস্থ হয়ে যাওয়ার পর তিনি এ কথা জেনেছেন। আল্লাহর রাসূল সাদ রা. কে দেখতে এসেছিলেন এবং তাঁর অবস্থা দেখে কেঁদে ফেলেছিলেন। সাদ রা. এর ছেলেদের, স্বজনদের এবং সাহাবাদের এ দৃশ্য দেখে কেমন লেগেছিল? তারা তো দেখছিলেন যে, আল্লাহর রাসূল তাদের কষ্ট আর দুশ্চিন্তাগুলোও ভাগ করে নিচ্ছেন। তাদের মতো একই অনুভূতি নবীজিরও হচ্ছিল। এ রকমই ছিল নবীজির মমত্ববোধ। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাঁর নবীকে জানেন এবং তাঁর ব্যাপারে যথার্থই বলেছেন:
لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ
“তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের নিকট একজন রাসূল এসেছেন, তোমাদের যা কিছু কষ্ট দেয় তা তাঁর নিকট খুবই কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি করুণাসিক্ত, বড়ই দয়ালু।” ৬২
এ ধরনের আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ রা. এর ঘটনা।
তিনি বলেন, “আমি অসুস্থ ছিলাম। নবীজি আবু বকর রা. কে সাথে নিয়ে আমাকে দেখতে আসলেন। তখন আমার স্বগোত্রের (সালামাহ গোত্র) লোকেরা আমার পরিচর্যা করছিল। তাঁরা যখন হেঁটে আসছিলেন তখন আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। নবীজি আমাকে অজ্ঞান হয়ে যেতে দেখেন। আমি অচেতন ছিলাম। নবীজি উযু করলেন এবং উযুর জন্য ব্যবহৃত কিছু পানি আমার ওপরে ছিটিয়ে দিলেন। আমি দ্রুত জ্ঞান ফিরে পেয়ে আল্লাহর রাসূলকে আমার পাশে দেখলাম। আমি তখন নবীজি-কে জিজ্ঞেস করলাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি আমার সম্পত্তি কীভাবে অছিয়ত করব? আমার তো সরাসরি উত্তরাধিকারী কেউ নেই। না আমার পিতা-মাতা আছেন আর না আছে সন্তান।' নবীজি আমার কথার জবাব দিলেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত না কুরআনের আয়াত নাযিল হলো। এ আয়াতে এ ধরনের অবস্থাতে উত্তরাধিকারের নিয়মকানুন বিবৃত হয়েছিল।”
আমরা জানি যে, জাবির রা., যিনি তখন অসুস্থ অবস্থায় ছিলেন এবং নবীজীকে প্রশ্ন করেছিলেন যে, এ অবস্থায় মারা গেলে সম্পত্তি কীভাবে বণ্টন করবেন; তিনি নবীজির ওফাতের পরেও প্রায় ৭০ বছর জীবিত ছিলেন। আর এ দৃশ্য তার স্মৃতিতে সর্বদাই অমলিন ছিল।
আমরা জাবির রা. এর উক্তিটির ব্যাপারে আরেকটু গভীরভাবে ভেবে দেখি। তিনি বলেছিলেন, “আমি দ্রুত জ্ঞান ফিরে পেয়ে আল্লাহর রাসূলকে আমার পাশে দেখলাম।” তিনি হাদীসটি এমনভাবে বর্ণনা করছিলেন যেন তিনি এইমাত্র জ্ঞান ফিরে পেয়ে অবাক হয়ে নবীজির দিকে তাকালেন।
এভাবেই নবীজি -এর স্মৃতি চিরভাস্বর হয়ে ছিল সাহাবাদের মনে-মগজে। রোগ- শোক কিংবা দুর্বলতায় নবীজি -কে পাশে পাওয়ার মতো আকুলতায় ভরা এ অনুভূতি আর কিছুতেই ছিল না। সাহাবাদের সাথে এমনই ছিলেন আমাদের নবীজি। দুঃখের সময় তারা কখনো নবীজির অভাব বোধ করেননি; বরং সাহাবাগণ সব সময় নবীজি- কে পাশে পেয়েছেন। তিনি সদা তাদের পাশে থেকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। একইভাবে, আনন্দের সময়েও সাহাবাগণ নবীজি-কে পাশে পেয়েছেন। তিনি সব সময় তাদের পাশে থেকে আনন্দও ভাগ করে নিতেন। তাই তো, সাহাবাদের ছিল নবীজি -এর জন্য এত অসম ভালোবাসা।
টিকাঃ
৬২. সূরা আত-তাওবাহ, ৯:১২৮
📄 মদীনার বাগানে
মাঝে মাঝে প্রাতঃভ্রমণের এ সময়টাতে নবিজি মদীনার বাগানগুলোতে যেতেন। সেখানে তিনি সবুজ গাছের শীতল ছায়ায় বিশ্রাম নিতেন। অনেক সময় অন্তরঙ্গ অনেক সাহাবীদের সাথে সেখানেই দেখা হয়ে যেত। তিনি বায়রুহা নামক একটি বাগানে প্রায় যেতেন। বাগানটির মালিক ছিলেন আবু তালহা আল-আনসারি রা.। তিনি সেখানে গিয়ে গাছের ছায়ায় বসতেন এবং সেখানকার সুপেয় পানি পান করতেন। এ বাগানটি থেকে মসজিদ নবী ছিল উত্তর দিকে। বর্তমানে মসজিদ সম্প্রসারিত করার ফলে বাগানের স্থানটি মসজিদের ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
আনসারদের মালিকানাধীন অন্যান্য বাগানগুলোতেও কখনো কখনো প্রিয় নবী সময় কাটাতেন। এ রকম একটি ঘটনা আমরা জানতে পারি আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত একটি হাদিস থেকে।
আবু হুরাইরা রা. বলেন, “আমরা রাসুলুল্লাহ -এর সাথে বসে ছিলাম। আমাদের সাথে ছিলেন আবু বকর, উমর এবং আরও কয়েকজন সাহাবী। রাসুলুল্লাহ আমাদের সেখানে রেখে চলে গেলেন। তিনি দীর্ঘসময় অনুপস্থিত ছিলেন, সে জন্যে আমরা আশঙ্কা করছিলাম হয়তো তাঁর সাথে অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা ঘটল কিনা! আমরা চিন্তিত হয়ে উঠে পড়লাম। সবার প্রথম দুশ্চিন্তা এসেছিল আমার, তাই আমি প্রথমে উঠে রাসুলের খোঁজে বেরিয়ে পড়লাম। আনসারদের একটি বাগানের সামনে এসে সেখানে ঢোকার প্রবেশপথ খুঁজতে লাগলাম। চারপাশ ঘুরেও কোনো দরজা পেলাম না। বাগানের ভেতরের একটি কুয়া থেকে ছোট নালা দিয়ে বাইরে পানি আসছিল। আমি নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে নালার মধ্যে দিয়ে বাগানে ঢুকে পড়লাম, ঠিক যেভাবে খরগোশ ঢুকে থাকে। সেখানে প্রবেশ করে আল্লাহর রাসুল -কে খুঁজে পেলাম। তিনি আমাকে “আবু হুরাইরা” বলে ডাকলেন। আমি বললাম, “জি, আল্লাহর রাসুল!” তারপর তিনি আমাকে তাঁর জুতাজোড়া দিয়ে বললেন, “এই জুতাজোড়া নিয়ে বাইরে যাও। এই বাগানের বাইরে যার সাথেই তোমার দেখা হবে তাকে এ সুখবর জানিয়ে দিয়ো যে, কেউ যদি দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে ঘোষণা দেয়—'আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই'- তাহলে সে জান্নাতে থাকবে।”
কুবায় আগমন করলে নবীজি কখনো কখনো সেখানকার আরিস নামক কুয়ার নিকটে যেতেন। এটি মাসজিদুল কুবার পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। এটি সেই কুয়া, যেখানে তৃতীয় খলিফা উসমান রা. এর খিলাফতকালে নবীজি -এর আংটি পড়ে হারিয়ে যায়। শতাব্দীর পর শতাব্দী মুসলিম রাষ্ট্রগুলো এবং মুসলিম জনগণ এই কুয়াকে রক্ষণাবেক্ষণ করেছে। অবশ্য বর্তমানে এই কুয়াকে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে।
আবূ মুসা আল আশআরি রা. বর্ণনা করেন,
“একবার নবী প্রয়োজনবশত মদীনার (দেয়াল ঘেরা) বাগানগুলোর একটি বাগানের উদ্দেশ্যে বের হলেন। আমি তাঁর পেছনে গেলাম। তিনি যখন বাগানে প্রবেশ করলেন তখন আমি এর দরজায় বসে থাকলাম। দরজাটি শুকনো খেজুরের ডালপালা দিয়ে বানানো ছিল। আমি মনে মনে বললাম, আজ আমি নবীজি-এর প্রহরীর কাজ করব। অবশ্য তিনি আমাকে এর নির্দেশ দেননি। নবীজি ভেতরে গেলেন এবং স্বীয় প্রয়োজন সেরে উযু করে নিলেন। এরপর আরিস নামক কুয়ার পোস্তার (কুয়ার গাঁথুনি বা ঠেস) ওপর বসলেন এবং হাঁটুর নিচের অংশের কাপড় তুলে নিয়ে দু-পা কূপের মধ্যে ঝুলিয়ে দিলেন। এমন সময় আবু বকর রা. এসে তাঁর নিকট প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। আমি বললাম, "আপনি অপেক্ষা করুন, যতক্ষণ-না আমি আপনার জন্য অনুমতি নিয়ে আসছি।”
তিনি অপেক্ষা করতে লাগলেন। আমি নবীজি -এর নিকট এসে বললাম, “হে আল্লাহর নবী, আবু বকর আপনার কাছে প্রবেশের অনুমতি চাচ্ছেন।”
তিনি বললেন, “তাঁকে আসার অনুমতি দাও এবং তাঁকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও।”
আবু বকর আল্লাহর শোকর ও প্রশংসা করে ভেতরে প্রবেশ করলেন। তিনি নবীজির ডান পাশে কুয়ার ছোট দেয়ালে গিয়ে বসলেন। এরপর তিনিও হাঁটুর নিচের অংশ অনাবৃত করে উভয় পা কূপের মধ্যে ঝুলিয়ে দিলেন। এরপর উমর রা. আসলেন। আমি বললাম, “আপনি নিজ জায়গায় অপেক্ষা করুন। আমি আপনার জন্য অনুমতি নিয়ে আসি।" (অনুমতি প্রার্থনা করলে) নবীজি ﷺ বললেন, "তাঁকে আসার অনুমতি দাও এবং জান্নাতের সুসংবাদ দাও।”
তিনিও আল্লাহর হামদ ও শোকরগুজারী করে ভেতরে ঢুকলেন। তিনি নবীজির বামদিকে কুয়ার ছোট দেয়ালে বসলেন এবং হাঁটুর নিচের অংশ অনাবৃত করে দু-পা কূপের মধ্যে ঝুলিয়ে দিলেন। এতে কূপের পোস্তা পূর্ণ হয়ে গেল এবং সেখানে বসার আর কোনো স্থান অবশিষ্ট থাকল না। এরপর উসমান রা. আসলেন। আমি বললাম, “আপনি নিজ জায়গায় অপেক্ষা করুন, যতক্ষণ আমি আপনার জন্য অনুমতি নিয়ে না আসি।” নবীজি ﷺ বললেন, “তাঁকে আসার অনুমতি দাও এবং তাঁকে বিপদগ্রস্ত হওয়াসহ জান্নাতের সুসংবাদ দাও।"
আমি তাঁর (উসমানের) কাছে গিয়ে বললাম, “ভেতরে আসুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ আপনাকে এ খবর পাঠিয়েছেন যে, আপনি জান্নাতী। তবে (তার আগে) আপনাকে (দুনিয়ায়) নিদারুণ কষ্ট-যাতনার মধ্যে পড়তে হবে।”
জবাবে তিনি (উসমান) বললেন, “আমি আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করি। হে আমার রব, আমাকে বিপদের সময় অটল রাখুন।”
অতঃপর তিনিও ভেতরে গেলেন। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে বসার কোনো জায়গা পেলেন না। কাজেই তিনি উল্টো দিকে এসে তাঁদের মুখোমুখি হয়ে কুয়ার পাড়ে বসে গেলেন এবং হাঁটুদ্বয়ের নিচের অংশ অনাবৃত করে উভয় পা কুয়ার ভেতরে ঝুলিয়ে দিলেন। আমি তখন আমার অন্য এক ভাইয়ের (আগমন) কামনা করছিলাম এবং আল্লাহর নিকট দুআ করছিলাম যেন সে (এ মূহূর্তে) আগমন করে।”
মদীনার জলবায়ু অত্যন্ত গরম হওয়ার দরুন ছায়ার খোঁজে নবীজি ﷺ মদীনার বাগানগুলোতে যেতেন, সেখানে বিশ্রাম নিতেন। এই বিশ্রাম নবীজিকে স্বস্তি ও শক্তি জোগাত, যাতে তিনি তাঁর বাকি দৈনন্দিন কাজগুলো সুন্দরভাবে আঞ্জাম দিতে পারেন। বাগান-মালিকদের জন্যেও নিজেদের বাগানে প্রিয়নবী ﷺ-এর আগমন অত্যন্ত খুশির উপলক্ষ ছিল। তারা সানন্দে আল্লাহর রাসূলকে বরণ করে নিতেন। তারা এটি বুঝতে পেরেছিলেন যে, আল্লাহর রাসূলের উপস্থিতি তাদের বাগানে বরকত নিয়ে আসছে। তিনি তো বরকতময়, চাই যেখানেই তিনি থাকুন না কেন।
📄 প্রিয়নবীর কায়লুলা
সকালের শেষে যখন বেলা গড়াতে শুরু করত, তখন নবীজি উম্মুল মুমিনীনদের মধ্যে যার ভাগে থাকার তারিখ থাকত তাঁর কক্ষে যেতেন। প্রবেশ করে প্রথমে তিনি যে-দুটি কাজ করতেন তা হচ্ছে মিসওয়াক করা এবং ঘরের সবাইকে সালাম দেয়া। তারপর দোহার সালাত ৬৩ আদায় করতেন। কখনো চার রাকাত পড়তেন, কখনো-বা বাড়িয়ে ছয় কিংবা আট রাকাত পড়তেন।
সকালে নাশতা না করে থাকলে সেখানে যদি খাবার পাওয়া যেত, তবে সামান্য কিছু খেয়ে নিতেন। এমনও হয়েছে যে, নবীজি-কে রোযা থাকা অবস্থায় খাবার খেতে বলা হয়েছে আর তিনিও রোযা ভেঙে খাদ্য গ্রহণ করেছেন। ৬৪
আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে পাওয়া যায়, তিনি একদিন নবীজি -কে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, একজন আগন্তুক আমাদের জন্য একটি উপহার পাঠিয়েছেন। আমি আপনার জন্য (তা থেকে) কিছু রেখেছি।” রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, “কী জিনিস?” আয়িশা রা. জানালেন, “সেটি হচ্ছে হায়স।” ৬৫
নবীজি তখন তা নিয়ে আসতে বললেন। আয়িশা রা. তা নিয়ে আসলে তিনি তা খেলেন। তারপর বললেন, “আমি রোযা অবস্থায় আমার দিন শুরু করেছিলাম।”
শেষ সকালের এই সময়টাতেই নবীজি উম্মুল মুমিনীন জুয়াইরিয়াহ রা. কে এসে দেখেছিলেন যে, তিনি তাঁর সালাতের স্থানে বসে আল্লাহর হামদ (প্রশংসা) করছিলেন।
নবীজি সেদিন ভোরে ফজরের সালাত সমাপ্ত করেও সেখানে এসে তাকে (জুয়াইরিয়াহকে) একই জায়গায় দেখেছিলেন। এবার তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “আমি যে অবস্থায় তোমাকে ছেড়ে বাইরে গেলাম, সে অবস্থাতেই তুমি রয়েছ।”
তিনি হ্যাঁ-বাচক জবাব দিলেন। নবীজি তখন বললেন, “কিন্তু, তোমার নিকট থেকে যাবার পর আমি চারটি বাক্য তিনবার পড়েছি। যদি সেগুলো তোমার সকাল থেকে (এ যাবৎ) পঠিত দুআর মোকাবিলায় ওজন করা যায়, তাহলে তা পরিমাপে সমান হয়ে যাবে। তা হচ্ছে এই :
سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ عَدَدَ خَلْقِهِ، وَرِضَا نَفْسِهِ، وَزِنَةَ عَرْشِهِ، وَمِدَادَ كَلِمَاتِهِ
অর্থাৎ, “আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টিকুলের সমপরিমাণ মহাপবিত্র, আল্লাহ তাআলা তাঁর সত্তার সন্তোষ মোতাবেক মহাপবিত্র, আল্লাহ তাআলা তাঁর আরশের ওজনের সমপরিমাণ মহাপবিত্র, আল্লাহ তাআলা তাঁর কালামের সমান মহাপবিত্র।” ৬৬
এই সময়টা তিনি পরিবারের সাথে একান্তে কাটাতেন। এ সময় অন্য মুসলিমা নারীগণ তাদের দ্বীনি বিষয়ের সেসব প্রশ্নের উত্তর জানতে আসতেন, যা তারা অন্য পুরুষদের সামনে লজ্জাবশত নবীজিকে করতে পারতেন না। তারা নবীজিকে যখন প্রশ্ন করতেন তখন উম্মুল মুমিনীনগণ সেখানে উপস্থিত থাকতেন। এভাবেই আমরা নারীদের ব্যক্তিগত বিষয়াবলির ক্ষেত্রে দ্বীনের বিধানবলি জানতে পারি।
একবার নবীজি আয়িশা রা. এর ঘরে ছিলেন। তখন এক আনসারি মহিলা এসে জিজ্ঞেস করলেন, “মাসিক শেষ হয়ে গেলে নারীরা কীভাবে ফরয গোসল করবে?”
নবীজী তখন বললেন, “সে পানি এবং পরিষ্কার করার কাপড় সাথে নেবে এবং উযু করবে। তারপর মাথায় পানি ঢালবে এবং মাথা ভালোভাবে ঘষে নেবে, যাতে পানি চামড়ায় পৌঁছে যায়। তারপর সে এক টুকরো কস্তুরি লাগানো নেকড়া দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করে নেবে।”
মহিলা বললেন, “এটি দিয়ে কীভাবে পবিত্রতা অর্জন করব?”
আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, "তা দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করো।”
মহিলা (তৃতীয়বার) বললেন, “কীভাবে?”
আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, “সুবহানাল্লাহ, তা দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করো।” অতঃপর লজ্জাবশত অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।
আয়িশা রা. বলেন, “যখন আমি রাসূলুল্লাহকে লজ্জাবোধ করতে দেখলাম, তখন আমি তাকে (আনসারি মহিলাকে) নিজের দিকে টেনে নিলাম এবং বললাম যে, তুমি এটি দিয়ে তোমার রক্ত বের হওয়ার জায়গায় ঘষবে। তিনি (নবীজি) আমার কথা শুনলেন এবং প্রতিবাদ করলেন না।”
একদা নবীজি উম্মুল মুমিনীন উম্মু সালামা রা. এর সাথে ছিলেন। তখন উম্মু সুলাইম রা. এসে প্রশ্ন করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল, কোনো মহিলা যদি স্বপ্নে দেখে যে সে স্বামীর সাথে সহবাস করছে তবে কি তাকে গোসল করতে হবে?”
তখন উম্মু সালামা রা. বললেন, "হায় হায়! উম্মু সুলাইম! তুমি তো আল্লাহর রাসূলের সামনে মহিলাদের উন্মোচিত করে ফেললে।”
উম্মু সুলাইম জবাবে বললেন, “আল্লাহ সত্য প্রকাশে লজ্জাবোধ করেন না। আমাদের সমস্যাবলির ব্যাপারে নবীকে জিজ্ঞেস করা আমাদের জন্য গাফেল থাকার চেয়ে উত্তম।”
নবীজি উম্মু সুলাইমকে সমর্থন করে স্বীয় পত্নী উম্মু সালামাকে বললেন, “তোমাকেই বরং বলা উচিত, হায়! তোমাদের মধ্যে তারাই শ্রেষ্ঠ, যারা উদ্বিগ্নকারী বিষয়ের ব্যাপারে প্রশ্ন করে। হ্যাঁ, উম্মু সুলাইম, সে যদি বীর্য দেখে তবে তাকে অবশ্যই গোসল করে নিতে হবে।"
উম্মু সালামা রা. হাসলেন এবং বললেন, “আল্লাহর রাসূল, মেয়েদেরও কি স্বপ্নদোষ হয়?"
রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, "তা না হলে সন্তান তার মতো কীভাবে হয়?”
আনসারি মহিলাগণ প্রশ্ন করার ব্যাপারে রাখঢাক করতেন না, স্পষ্ট জবাব জানতে চাইতেন। আয়িশা রা. বলেন, “আনসারি মহিলগণ হচ্ছেন উত্তম নারী। লজ্জাবোধ তাদের দ্বীনি জ্ঞান লাভে বাধা দিতে পারেনি।” ৬৭
মাঝে মাঝে এ সময়টাতে ঘনিষ্ঠ সাহাবীগণ এসে নবীজির সাথে দেখা করতেন; বিশেষত যখন কোনো ঘটনা ঘটত। একবার নবীজি বিছানায় শুয়ে ছিলেন। তাঁর পরনে ছিল আয়িশা রা. এর একটি কাপড়। ৬৮ নবীজির উরু অথবা পায়ের নিম্নভাগ দেখা যাচ্ছিল।
আবু বকর রা. এসে প্রবেশের অনুমতি চাইলে তাকে অনুমতি দেয়া হলো, নবীজি আগের অবস্থানেই থাকলেন। তিনি তাঁর প্রয়োজন পূরণ করে চলে গেলেন। উমর রা. এসে প্রবেশের অনুমতি চাইলে নবীজি ﷺ তাকেও অনুমতি দিলেন। তখনো নবীজির আগের অবস্থাতেই ছিলেন। উমর প্রয়োজন পূরণ করে প্রস্থান করলেন। তারপর উসমান রা. এসে কক্ষে ঢোকার অনুমতি চাইলেন। তাকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেয়ার আগে উঠে বসে কাপড় ঠিকঠাক করে নিলেন। তারপর উসমান ভেতরে আসলেন, নবীজির সাথে কথা বলে যে প্রয়োজনে এসেছিলেন তা পূর্ণ করে চলে গেলেন। আয়িশা রা. বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আবু বকর আসলেন কিন্তু আপনি কোনো কিছু ঠিকঠাক করলেন না। তারপর উমর আসলেন এবং আপনি আগের মতোই থাকলেন। কিন্তু উসমান আসার আগে আপনি উঠে বসে নিশ্চিত হয়ে নিলেন যে, আপনার কাপড় ঠিকঠাক আছে কি না!”
নবীজি তখন বললেন, “আমি এমন লোকের সামনে এভাবে যেতে লজ্জাবোধ করলাম, যার উপস্থিতিতে ফেরেশতারাও লজ্জাবোধ করেন। উসমান একজন লজ্জাশীল ব্যক্তি। আমার আশঙ্কা হচ্ছিল যে, আমি যদি আগের অবস্থাতেই থাকি তাহলে তার লজ্জা তাকে আমার কাছে তার দরকারের কথা বলতে বাধা দেবে।"
ঘরের ভেতর স্ত্রীর সাথে নবীজি কীরূপ ছিলেন তা বর্ণনা করে গেছেন আয়িশা রা.। তিনি বলেন, “যখন তিনি ঘরে একান্তে থাকতেন তখন তিনি ছিলেন সবচেয়ে সহজ-সরল ও উদার মানুষ। তিনি তোমাদের মতোই একজন মানুষ ছিলেন; তবে তিনি প্রায়ই মুচকি হাসতেন। তিনি অন্য মানুষদের থেকে আলাদা ছিলেন না। তিনি সব সময় পরিবারের প্রয়োজন পূরণ করে দিতেন। তিনি নিজের জুতা এবং কাপড় নিজে সেলাই করতেন, নিজ হাতে ছাগলের দুধ দোয়াতেন এবং নিজের খাবার নিজেই পরিবেশন করতেন। তিনি ঘরে তা-ই করতেন, যা যেকোনো পুরুষ মানুষ করে থাকে।”
প্রিয় পাঠক, আপনারা এখানেও দেখতে পারবেন নবীজির ব্যক্তিজীবনে ধার্মিকতার মেলবন্ধন। নবীজির ঘর বলতে প্রত্যেক স্ত্রীর জন্য ছোট্ট একটা কক্ষ। ঘরের কাজ খুব অল্পই ছিল, যাতে তাঁর স্ত্রীদের সাহায্য করার দরকার পড়ত। তবুও তিনি গৃহস্থালি কাজে সহায়তা করতেন। প্রকৃতপক্ষে, নবীজি পরিবারের মানুষজন যে কাজই করতে থাকেন না কেন, তা ভাগ করে নিতেন। যাতে করে পরিবারের সবাই এটা অনুধাবন করতে পারে এই ঘর পরিবারের সব সদস্যের ঘর এবং তারা একই সাথে জীবন কাটাচ্ছেন। এভাবেই নবীজি পারিবারিক জীবনে মানসিক প্রশান্তির শিখরে পৌঁছে যেতেন। ঘরের ভেতর নবীজির কার্যাবলী আমাদের অনেকগুলো সুন্দর বার্তা প্রদান করে : একজন স্বামী স্ত্রীর কতটুকু যত্ন নেবে তা আমরা জানতে পারি; নবীজি পারিবারিক জীবনকে কতটুকু গুরুত্ব দিতেন তাও জানা যায়। সকল কল্যাণ তাঁর তরে, যিনি সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানুষ ছিলেন, যিনি নিজের পরিবারের মানুষদের কাছেও ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি।
নবীজির সংসারে যেমন ভালোবাসা ও মমত্ববোধের প্রাচুর্য ছিল; ঠিক তেমনি সংসারে নির্মল বিনোদনেরও কমতি ছিল না। আনন্দঘন স্বতঃস্ফূর্ত আচরণের উপলক্ষ্যও নবীপরিবারে আসত। একদিন উম্মুল মুমিনীন আয়িশা রা. এর ঘরে উম্মুল মুমিনীন সাওদা রা. বেড়াতে আসলেন। নবীজি উভয় স্ত্রীর মাঝে বসে ছিলেন। আয়িশা রা. হারিরাহ রান্না করেছিলেন, এটি একধরনের ঘন সুপ-জাতীয় খাবার, যা আটা দিয়ে বানানো হয়ে থাকে। তিনি তাঁর রান্না করা এ খাবার সাওদাহ রা.-কে খেতে দিলেন, কিন্তু সাওদাহ রা. বললেন, "আমার এটি পছন্দ নয়, আমি খাব না।”
তখন আয়িশা রা. বললেন, "তুমি এটি খাবে, নতুবা তা আমি তোমার মুখে ছুড়ে মারব।” সাওদাহ রা. তবুও খেতে অস্বীকৃতি জানালেন। আয়িশা কিছু খাদ্য হাতে তুলে নিয়ে তা সাওদাহ রা. এর মুখে মেখে দিলেন। নবীজি হেসে সাওদাহ রা.-কেও প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ করে দিলেন। তিনি পাত্র থেকে কিছু খাদ্য তুলে সাওদাহ রা.-কে দিয়ে বললেন, "তুমিও তার মুখে মেখে দাও।”
সাওদাহ রা. তখন তা নিয়ে আয়িশা রা. এর মুখে মেখে দিলেন। নবীজি তাদের শিশুসুলভ কাণ্ডকারখানা দেখে হাসতেই থাকলেন। তারা তিনজনই যখন হাসছিলেন তখন হঠাৎ মসজিদ থেকে উমর রা. এর গলা শোনা গেল। উমর রা. হাঁক দিয়ে নিজের ছেলেকে ডাকছিলেন, “ওহে আব্দুল্লাহ ইবনু উমর, আব্দুল্লাহ ইবনু উমর!”
ন নবীজি তখন তাঁর স্ত্রীদের বললেন, "যাও, মুখ মুছে আসো। উমর সম্ভবত আসতে চাচ্ছেন।"
উমর রা. নবীজির দরজার নিকটে এসে বললেন, "আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু, আপনাদের সবার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আমি কি আসতে পারি?"
নবীজি ভেতরে ঢোকার অনুমতি দিলেন।
এ ধরনের বিনোদনপূর্ণ ঘরোয়া পরিবেশ ইসলামী সংসারজীবনের স্বাধীনতা ও অকপট চরিত্রের দিকেই ইশারা প্রদান করে, যা নবীজি বাস্তবায়ন করে গেছেন। আমাদের ধর্ম বিনোদনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে।
যুহরের সালাতের আগ পর্যন্ত হালকা একটু ঘুমিয়ে নেয়া নবীজির অভ্যাস ছিল। তিনি সাধারণত নিজের ঘরেই ঘুমাতেন। নিজ স্ত্রীগণের ঘর ব্যতীত অন্য কোনো মহিলার ঘরে তিনি কখনো ঘুমাননি, তবে ব্যতিক্রম ছিলেন উম্মু সুলাইম। তিনি মাঝে মাঝে উম্মু সুলাইমের ঘরে যেতেন এবং সেখানে ঘুমাতেন। নবীজিকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলতেন, “আমি তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল, তাঁর ভাই আমার সাথে যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছেন।” ৬৯
এমনও হয়েছে যে নবীজি উম্মু সুলাইমের ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন, কিন্তু উম্মু সুলাইম ঘরে ছিলেন না। একবার উম্মু সুলাইম রা. বলেন যে, তিনি ঘরে গিয়ে দেখলেন নবীজি ঘুমিয়ে আছেন। তখন গরমের সময় ছিল, নবীজি দরদর করে ঘামছিলেন। তিনি এত বেশি ঘামছিলেন যে, তা বিছানার ওপরে রাখা এক টুকরো চামড়ায় গিয়ে জমা হচ্ছিল। উম্মু সুলাইম রা. নবীজির ঘাম জমা করে বোতলে ভরে নিলেন। নবীজি ঘুম থেকে উঠে তা দেখতে পেয়ে উম্মু সুলাইমকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি এসব কেন করছেন? উম্মু সুলাইম জবাব দিলেন, তিনি নবীজির ঘাম জমা করে বোতলে ভরে রাখছেন, যাতে বরকতের জন্য এই ঘাম মোবারক তিনি নিজ সন্তানদের দিতে পারেন। তখন নবীজি সম্মতি জানিয়ে তাদের জন্য দুআ করলেন।
টিকাঃ
৬৩. দোহা' )الضحى( আরবী শব্দ। এর অর্থ পূর্বাহ্ন বা দিনের প্রথম অংশ (forenoon)। ফাসী ভাষায় একে 'চাশু' বলা হয়। সূর্যোদয়ের পর থেকে দুপুরের পূর্ব পর্যন্ত সময়কে আরবীতে দোহা বলা হয়। সূর্যোদয়ের মুহূর্ত থেকে প্রায় ১৫/২০ মিনিট পরে দোহা বা চান্তের সালাতের সময় শুরু। দ্বিপ্রহরের পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের মধ্যে যে কোনো সময়ে এ সালাত আদায় করা যায়। 'দোহা'র সালাত দু রাক'আত থেকে বার রাক'আত পর্যন্ত আদায় করা যায়। তাহাজ্জুদ সালাতের পরে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাসনূন নফল সালাত দোহার সালাত।
৬৪. নফল রোযা এরকমভাবে ভাঙ্গা জায়েজ আছে। তবে হানাফী ফিকহ অনুসারে পরবর্তীতে ঐ রোযা অন্য কোন দিন কাযা করতে হবে।
৬৫. একধরনের খাদ্য যা খেজুর, পাস্তুরিত মাখন আর পনিরের সংমিশ্রণে প্রস্তুত করা হয়ে থাকে।
৬৬. তিরমীযী: ৩৫৫৫
৬৭. হায়েযের গোসল সংক্রান্ত হাদীসের শেষ অংশে তিনি এ কথা বলেছিলেন
৬৮. এখানে এমন ধরনের কাপড়ের কথা বলা হচ্ছে যা নারী-পুরুষ উভয়েই পরতে পারে। পুরুষরা এধরনের কাপড় শরীরের উপরিভাগ বা নিম্নভাগে পরতে পারে।
৬৯. আলিমগণ একমত যে নবীজি সা. উম্মু সুলাইমের ঘরে যেতেন; কারণ, উম্মু সুলাইম রা. নবীজির মাহরাম আত্মীয়া ছিলেন। তবে আলিমগণের মধ্যে বিয়ে হারাম হওয়ার কারণ নিয়ে মতভেদ আছে। ইমাম নববী রাহ. বলেছেন, "উম্মু সুলাইম এবং তাঁর বোন উম্মু হারাম নবীজির খালা ছিলেন। তারা রক্তসম্পর্কের কারণে অথবা রাদ্দার (শিশু অবস্থায় দুগ্ধপানের) কারণে নবীজির মাহরাম ছিলেন।" আন নববী, শারহ সাহীহ মুসলিম, খণ্ড ১৩।
📄 গন্তব্য যখন কুবা
প্রতি শনিবারের মধ্য-সকালে আমাদের প্রিয় নবী কুবায় যেতেন; তিনি কখনো হেঁটে আবার কখনো-বা বাহনে চড়ে যেতেন। সেখানে মসজিদ আল কুবায় তিনি সালাত আদায় করতেন। কুবার অধিবাসীরা আওফ ইবনুল হারিছের গোত্রভুক্ত ছিল। তারা নবীজিকে সে সময় দেখতে আসত, অভ্যর্থনা জানাত।
কুবায় গেলে নবীজি উম্মু হারাম বিনতে মিলহান রা.-এর ঘরে অবস্থান করতেন, সেখানে কায়লুলা করতেন। উম্মু হারাম হচ্ছেন উম্মু সুলাইমের বোন। তারা উভয়েই নবীজির মাহরাম ছিলেন। একবার নবীজি উম্মু হারামের ঘরে গিয়ে কিছু খাবার গ্রহণ করলেন এবং তারপর সেখানে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ পর মুচকি হেসে জাগ্রত হলেন। হযরত উম্মে হারাম রা. জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি কেন হাসছেন?”
রাসূলুল্লাহ বললেন, “আমি স্বপ্নে দেখলাম যে আমার উম্মতের কিছু লোক আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবে। তারা সমুদ্র সফর করবে এমনভাবে, যেভাবে বাদশাহগণ সিংহাসনের ওপর উপবিষ্ট থাকে।”
হযরত বিনতে মিলহান আরজ করেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আল্লাহর নিকট দোআ করুন, যেন আমাকেও তাদের মধ্যে শামিল করে দেন।”
রাসূলুল্লাহ দুআ করলেন, “হে আল্লাহ, বিনতে মিলহানকে তাদের মধ্যে শামিল করে দেন।” তিনি পুনরায় তন্দ্রাচ্ছন্ন হলেন এবং মুচকি হাসি দিয়ে জাগ্রত হলেন। হযরত বিনতে মিলহান রা. পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, এবার স্বপ্নে কী হলো?”
তিনি বললেন, “এবার স্বপ্নে দেখলাম, আমার উম্মতের অপর এক জামাতের অবস্থা, যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবে।”
হযরত বিনতে মিলহান আবার আরজ করলেন “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার জন্য দুআ করে দিন যেন আমাকে সেই জামাতেও অন্তর্ভুক্ত করে দেন।”
আল্লাহর রাসূল বললেন, “তুমি প্রথম জামাতে শামিল থাকবে (দ্বিতীয় জামাতে নয়)।”
বিনতে মিলহানকে নিয়ে করা নবীজির ভবিষ্যদ্বাণী পরবর্তী সময়ে সত্য প্রমাণিত হয়। মুয়াবিয়া ইবনু আবু সুফিয়ান রা. সাইপ্রাস দ্বীপে অভিযান পরিচালনা করার জন্য একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। স্বামী উবাদাহ ইবনে সামিত রা. এর সাথে বিনতে মিলহানও সেই বাহিনীতে যুক্ত হয়ে সমুদ্র সফর করেন। সাইপ্রাস অবতরণের পর তিনি তাঁর সওয়ারি (বাহন) থেকে পড়ে গিয়ে মারাত্মকভাবে আহত হন এবং শাহাদাত বরণ করেন। সেখানেই তাকে দাফন করা হয়।
মধ্য-আরবের ছোট্ট এক কুঁড়েঘরে বসে নবীজি কতই-না অভূতপূর্ব ভবিষ্যদ্বাণী করে গেলেন! তাও এমন একটা সময়ে যখন মুসলিম উম্মত অভাব আর দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল। আর তখন কিনা আল্লাহর রাসূল তাঁর সাহাবিয়াতকে (মহিলা সাহাবী) ভবিষ্যদ্বাণী করে গেলেন যে মুসলমানগণ একসময় ভূমধ্যসাগরে সমুদ্র অভিযান পরিচালনা করবে! শুধু তা-ই নয়, তারা তখন থাকবে এমন শক্তিশালী আর গৌরবান্বিত অবস্থায়, যেভাবে বাদশাহগণ সিংহাসনের ওপর উপবিষ্ট থাকেন।
পাঠক, আপনারা হয়তো জানেন না, ভূমধ্যসাগর মদীনা থেকে অনেক দূরবর্তী একটি সাগর। আমরা যে সময়ের কথা বলছি সে সময় সমুদ্রযাত্রার ব্যাপারটাই আরবদের জন্য অলীক কল্পনা ছিল; সমুদ্রে যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করা তো অনেক দূরের কথা।
কোন জিনিসটা বেশি চমকপ্রদ ছিল? সকল সম্ভাবনা, প্রত্যাশা এবং আশেপাশের পরিস্থিতির বিপরীতে নবীজির এমন বিস্ময়কর খবর প্রদান করা নাকি বিনা বাক্যব্যয়ে নিশ্চয়তার সাথে উম্মু হারামের সেই খবর গ্রহণ করে নেয়া? উম্মু হারাম রা. নবীজিকে কোনো প্রশ্ন করেননি, সন্দেহ পোষণ করেননি, জিজ্ঞেস করেননি যে, মুসলমানদের এমন নাজুক পরিস্থিতিতে এটা কীভাবে সম্ভবপর হবে! তিনি তো এটিও জিজ্ঞেস করেননি যে, এ ঘটনা কখন সংঘটিত হবে। তিনি সোজাসাপ্টাভাবে নবীজির কাছে আরজ করে বসলেন, নবীজি যেন দুআ করে দেন যাতে তিনি নিজে সে বাহিনীতে শামিল হতে পারেন। উম্মু হারাম রা. যেন চোখের সামনে ঘটনাটা ঘটতে দেখছিলেন। এমনই ছিল সাহাবীদের ঈমান। রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম।