📄 চারপাশ পরিদর্শন
নবীজি সকালের সময়টাতেই সাধারণত আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়তেন। উদাহরণস্বরূপ, তিনি মাঝে মাঝে তাঁর কন্যা ফাতিমা রা. ও দৌহিত্র হাসান ইবনু আলি রা. কে দেখতে তাদের গৃহে যেতেন।
আবূ হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, “একদিন মধ্য-সকালে নবীজি বের হলেন। তিনি আমাকে মসজিদে খুঁজে পেয়ে আমার হাত ধরলেন। আমিও তাঁর সাথে চলতে লাগলাম। তিনি আমার হাতের ওপর ভর দিচ্ছিলেন। এভাবেই আমরা হাঁটতে লাগলাম। কিন্তু কেউ কারও সাথে কথা বলছিলাম না। প্রথমে আমরা ইহুদী গোত্র বনু কায়নুকার বাজারে গেলাম। তিনি কিচ্ছুক্ষণ বাজারে ঘুরে সেখানে কী হচ্ছে তা অবলোকন করলেন। তারপর সেখান থেকে ফিরে এলেন। আমি আবারও তাঁর সাথে চলতে লাগলাম। তিনি ফাতিমা রা. এর গৃহের উঠোনে গিয়ে বসলেন। তারপর বললেন, 'ছোট্ট সোনামণিটি কোথায়? ছোট্ট সোনামণিটি কোথায়? ছোট্ট সোনামণিটি কোথায়? হাসান ইবনু আলিকে আমার কাছে আসতে বলো।'
তৎক্ষণাৎ ছোট্ট হাসান রা. তড়িঘড়ি করে ছুটে এলেন। তিনি লাফ দিয়ে নবীজির কোলে গিয়ে বসলেন। তারা দুজন একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন। নবীজি শিশু হাসানকে স্নেহভরে চুমু খেলেন এবং নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে রাখলেন। হাসান রা. তখন নবীজির দাড়িতে হাত বুলাতে লাগলেন। নবীজি মুখ খুললেন আর হাসানও নিজের মুখ নবীজির মুখের ভেতর রাখলেন। নবীজি বললেন, 'হে আমার রব, আমি তাকে ভালোবাসি; তাই তুমিও তাকে ভালোবেসো। যারা তাকে ভালোবাসবে তাদেরও তুমি ভালোবেসো।' এই দুআ নবীজি তিনবার করলেন।”
আবূ হুরায়রা রা. এই অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্যটি প্রায়ই স্মরণ করতেন। তিনি বলতেন, “যখনই আমি হাসানকে দেখি, আমার দু-চোখ আবেগে অশ্রুসিক্ত হতে শুরু করে।”
একদিন নবীজি ফাতিমার ঘরে গিয়ে ফাতিমার স্বামী আলি রা. এর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি ফাতিমাকে প্রশ্ন করলেন, "তোমার চাচাতো ভাই কোথায়?" ৫৬
ফাতিমা রা. বললেন, “আমাদের মাঝে কিছু মনোমালিন্য হয়েছে। তাই তিনি বাইরে চলে গেছেন।” তখন নবীজি আলি রা. কে খুঁজতে লোক পাঠালেন। একটু পর খবর এল যে, আলি রা. মসজিদে ঘুমোচ্ছেন। নবীজি মসজিদে গিয়ে দেখলেন যে, আলি রা. মাটিতে শুয়ে আছেন। আলি রা. এর গায়ের ওপরিভাগের জামা খুলে পাশে পড়ে আছে এবং শরীরে বালি লেগে আছে। তা দেখে নবীজি নিজেই বালি ঝাড়তে শুরু করলেন এবং বলতে লাগলেন, “উঠে পড়ো, ও আবু তুরাব, উঠে পড়ো, ও আবু তুরাব।” (তুরাব শব্দের অর্থ হচ্ছে বালু বা ধূলিকণা)
আমাদের নবীজি উম্মে আইমানের ঘরে নিয়মিত যেতেন। নবীজি যখন ছোট ছিলেন তখন উম্মে আইমান রা. নবীজিকে দেখাশোনা করতেন। একবার তিনি সেখানে গেলেন। উম্মে আইমান রা. কিছু খাবার বা পানীয় নিয়ে এলেন। নবীজি সম্ভবত রোযা ছিলেন অথবা কোনো কারণে খেতে ইচ্ছুক ছিলেন না। তাই কিছু না খেয়েই তিনি সেগুলো ফিরিয়ে দিলেন। উম্মে আইমান রা. এতে তীব্র আপত্তি জানিয়ে নবীজির দিকে এগিয়ে আসলেন, অসন্তুষ্ট হলেন, এমনকি গলাও চড়ালেন।
উম্মে আইমান রা. এ রকম করতে পারতেন তার মর্যাদার কারণে। যখন নবীজি ছোট্ট শিশু ছিলেন তখন তিনি তাঁর দেখভাল করতেন। তাই হয়তো, নবীজির প্রতি অপরিসীম মমত্ববোধ থেকেই তিনি এ রকম রাগ দেখাতেন; ঠিক যেমনটা কোনো মা তার সন্তানের সাথে করে থাকেন। সকল শান্তি ও সালাম বর্ষিত হোক প্রিয়নবী মুহাম্মাদ -এর ওপর, যিনি বিনম্র মুচকি হাসির মাধ্যমে সবকিছু সহ্য করে যেতেন।
রাসূলুল্লাহ সাহাবীদেরও দেখতে যেতেন। তিনি দুর্বল ও অসুস্থ সাহাবীদের মাঝে মাঝে দেখে আসতেন। তাদের দাওয়াত কবুল করতেন। কখনো তিনি একা যেতেন। একবার আনাস বিন মালিক রা. এর দাদি মুলাইকা রা. খাবার প্রস্তুত করে নবীজিকে দাওয়াত করলেন। নবীজি দাওয়াত গ্রহণ করে সেখানে গেলেন এবং তা খেলেন। খাওয়া শেষে বললেন, 'এখন উঠো, যাতে করে আমরা একসাথে সালাত পড়তে পারি।' আনাস রা. বলেন, 'আমি পুরোনো একটি খড়ের মাদুর তুলে নিলাম, যা দীর্ঘদিনের ব্যবহারের কারণে কালচে হয়ে গিয়েছিল। এটির ওপর আমি সামান্য পানি ছিটিয়ে দিলাম। নবীজি উঠে দাঁড়ালেন এবং আমি তাঁর পেছনে একজন এতিম ছেলের সাথে দাঁড়ালাম। বৃদ্ধা মহিলা আমাদের পেছনের কাতারে দাঁড়ালেন। নবীজির ইমামতিতে দুই রাকাত সালাত পড়ার পর তিনি চলে গেলেন।”
তিনি মাঝে মাঝে দাওয়াত গ্রহণ করতেন এবং সেখানে পরিবারের সদস্যদেরও নিয়ে যেতেন। আনাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, নবীজির এক পারসিক প্রতিবেশী ছিল, যার সুস্বাদু খাবার রান্নার জন্য বেশ নামডাক ছিল। আসলেই তার রান্না থেকে খুব মুখরোচক সুগন্ধ আসত। একদিন সে নবীজির জন্য কিছু খাবার রান্না করে এসে দাওয়াত করে বসল। নবীজি বললেন, “আমি কি আয়িশাকে আমার সাথে নিয়ে আসতে পারি?”
লোকটি না-বাচক জবাব দিল। তখন নবীজি দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করলেন। লোকটি আবার এসে দাওয়াত করল। নবীজি বললেন, “সে (আয়িশা) আমার সাথে আসছে।” লোকটি আবার বলল, “না।” নবীজি আবার তার দাওয়াত ফিরিয়ে দিলেন। লোকটি তৃতীয়বার দাওয়াত দিতে আসলে তখন সম্মতি দিল। পরবর্তী সময়ে নবীজি আয়িশাকে নিয়ে সেখানে খেতে গিয়েছিলেন।
একদিন একজন দর্জি নবীজি-কে দাওয়াত দিল। দর্জিটি একটি গোত্রের মিত্র ছিল। আনাস রা. বলেন, “আমি আল্লাহর রাসূলের সাথে ভোজে অংশ নিলাম। সে (দর্জি) নবীজির সামনে কিছু যবের রুটি এবং লাউ ও শুকনো মাংস দিয়ে সিদ্ধ করা কিছু খাবার রেখে কাজে চলে গেল। নবীজি লাউ খেলেন এবং তা পছন্দ করলেন। আমি দেখলাম তিনি থালা থেকে লাউ বেছে বেছে খাচ্ছেন। তা দেখে আমি আমার অংশের লাউগুলো না খেয়ে নবীজির পাতে তুলে দিলাম। এরপর থেকে আমি লাউ (খেতে) ভালোবাসি।”
নবীজি মাঝে মাঝে সাহাবীদেরও সাথে নিয়ে দাওয়াতে যেতেন। ইতবান ইবনু মালিক রা. এর ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে দেয়া যায়। ইতবান রা. আবেদন করলেন নবীজি যেন 'ইতবানের বাসায় সালাত পড়ার জন্য আসেন। ইতবান রা. এভাবে বলেছিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমার দৃষ্টিশক্তি মারাত্মক হ্রাস পেয়েছে। আমি আমার লোকদের সালাতে ইমামতি করাতাম। যখন বৃষ্টি হয়, আমার ও তাদের মাঝের উপত্যকাটি খুব দ্রুত ছুটতে থাকে (বলে মনে হয়) এবং আমি তাদের মসজিদে পৌঁছে সালাতে ইমামতি করাতে পারি না। আমার খুবই ভালো লাগবে যদি আপনি আমার ঘরে এসে সালাত আদায় করেন। তাহলে আপনি যে জায়গায় এসে সালাত পড়বেন (আমার ঘরের) সেই জায়গাকে আমি আমার সালাত পড়ার (নির্ধারিত) স্থান বানিয়ে নেব।” নবীজি জবাবে বললেন, “ইনশাআল্লাহ, আমি আসব।” ওইদিনই মধ্য-সকালে নবীজি সেখানে গেলেন। আবু বকর, উমরসহ আরও কয়েকজন সাহাবীও তখন সাথে ছিলেন। নবীজি ইতবান রা.-কে জিজ্ঞেস করলেন, “আমি তোমার ঘরের কোন স্থানে সালাত পড়ব বলে তুমি চাও?”
ইতবান রা. তখন একটি জায়গা দেখিয়ে দিয়ে সেখানে একটি খড়ের মাদুর বিছিয়ে দিলেন এবং মাদুরের কোনায় পানি ছিটিয়ে দিলেন। নবীজি দুই রাকাত সালাতে ইমামতি করলেন। ইতবান রা. তখন তাদের আরেকটু সময় সেখানে অবস্থান করে কিছু খাদ্য গ্রহণের অনুরোধ করলেন, যা তিনি আগেই প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। নবীজি আরও কিছুক্ষণ অবস্থান করলেন এবং তার প্রস্তুতকৃত খাবার খেলেন।
কেউ নিমন্ত্রণ জানালে তাকে খুশি করার জন্য নবীজি অত্যন্ত সচেষ্ট থাকতেন। তাঁর মহত্ত্ব সবার জন্য সম্প্রসারিত ছিল। নবীজি -এর উত্তম আখলাক আর চারিত্রিক মাধুর্য থেকে ছোট্ট শিশুরাও বঞ্চিত হতো না। আনাস রা. বলেন, "আখলাকের দিক দিয়ে নবীজি ছিলেন সর্বোত্তম ব্যক্তি। তিনি সামাজিকতা রক্ষার তাকিদে আমাদের নিকটে আসতেন। আমার এক ভাই ছিল, যার বয়স তখন মাত্র তিন বছর। আমরা তাকে আবু উমাইর নামে ডাকতাম। নবীজি আমাদের ঘরে আসলে তাঁর সাথে মজা করতেন, খেলতেন। একদিন তিনি এসে দেখলেন বাচ্চাটির মন খারাপ। তিনি আমার মাকে জিজ্ঞেস করলেন, “হে উম্মে সুলাইম, আবু উমাইরের কী হয়েছে? তাকে খুব দুখী আর বিমর্ষ দেখাচ্ছে।”
তখন তিনি (উম্মে সুলাইম) জবাব দিলেন, “তার খেলার সাথি নুগাইর মারা গেছে।” নবীজি তখন আবু উমাইরের কাছে গেলেন, তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “ও আবু উমাইর, কোথায় নুগাইর? ও আবু উমাইর, কোথায় নুগাইর?” (নবীজি এই কথাকে ছন্দের মাধ্যমে বলছিলেন যাতে আবু উমাইরের মন ভালো হয়ে যায়।) ৫৭
মাহমুদ ইবনু আর-রাবি রা. বলেন, "আমাদের ঘরের পাশের কুয়া থেকে পানি তোলার জন্য একটি বালতি ছিল। আমার এখনো মনে আছে যে নবীজি সেই বালতি থেকে সামান্য পানি নিয়ে আমার মুখ মুছে দিয়েছিলেন। তখন আমার বয়স মাত্র পাঁচ বছর ছিল।”
প্রিয় পাঠক, আমরা দেখতে পাচ্ছি এই মনোরম ঘটনাটি শিশু মাহমুদকে কতটুকু মুগ্ধ করেছিল যে, তিনি বহু বছর পরেও তা স্মরণে রেখেছিলেন। আমরা এটা ভেবে আশ্চর্য হয়ে যাই যে, এত এত ব্যস্ততার মাঝেও নবীজি কীভাবে একটি দুখী বাচ্চা শিশুর দুঃখ ঘোচাতে সমর্থ হতেন, তাকে তার ছোট্ট পাখিটির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেন অথবা অন্য বাচ্চাদেরই-বা কীভাবে খুশি করতে পারতেন। কচি কচি বাচ্চারা কতই-না খুশি হয়তো হতো যখন তারা নবীজি-কে তাদের নিকটে আসতে দেখত। তাদের মাতাপিতাও কতই-না উৎফুল্ল হতেন যখন দেখতেন আল্লাহর রাসূল তাদের বাচ্চাকে পছন্দ করছেন।
যখন নবীজি কোনো সাহাবাকে দেখতে যেতেন এবং তাদের গৃহে খাবার খেতেন, তখন তিনি তাদের জন্য এবং তাদের পরিবারবর্গের জন্য দুআ করতেন। একবার তিনি সাদ ইবনু উবাদাহ রা.-কে দেখতে গেলেন। সাদ রা. নবীজির সামনে কিছু রুটি আর তেল রাখলেন। তিনি তা খেলেন এবং বললেন :
أَفْطَرَ عِنْدَكُمُ الصَّائِمُونَ، وَأَكَلَ طَعَامَكُمُ الْأَبْرَارُ، وَصَلَّتْ عَلَيْكُمُ الْمَلَائِكَةُ
"রোজাদার মানুষ যেন তোমার ঘরে ইফতার করে, আবিদ লোকজন যেন তোমার (ঘরের) খাবার খায়; আর ফেরেশতারাও যেন তোমার জন্য দুআ করে।” ৫৮
একবার নবীজি বুসর ইবনু আবু বুসর রা.-কে দেখতে গেলেন। তার বাসার নিকটে গেলে বুসর এবং বুসরের স্ত্রী প্রিয়নবীকে অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে এলেন। তারা নবীজির বসার জন্যে একটি মখমলের কাপড় বিছিয়ে দিলেন। তারপর বুসর স্বীয় স্ত্রীকে খাবার নিয়ে আসতে বললেন। তখন তার স্ত্রী খাদ্যভর্তি একটি থালা আনলেন। তাতে ময়দা, মাখন, পানি ও লবণের সংমিশ্রণে বানানো একধরনের খাদ্য ছিল। নবীজি তাদের সাথে নিয়ে সেখান থেকে খেলেন। থালায় কিছু খাদ্য অবশিষ্ট ছিল। নবীজি তখন তাদের জন্য দুআ করলেন:
اللَّهُمَّ بَارِكْ لَهُمْ فِيمَا رَزَقْتَهُمْ، وَاغْفِرْ لَهُمْ وَارْحَمْهُمْ
“হে আমার রব, তাদের গুনাহ মাফ করে দিন, তাদের ওপর আপনার রহমত বর্ষণ করুন। বারাকাহ ও প্রচুর পরিমাণে রিযিক তাদের দান করুন।” ৫৯
একদিন নবীজি জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ রা.-কে দেখতে তার ঘরে গেলেন। জাবির রা. নিজের স্ত্রীকে বললেন, “আল্লাহর রাসূল দুপুর নাগাদ আসবেন। তুমি এমন কিছু করবে না যাতে তিনি অসন্তুষ্ট হন। তুমি কোনো কথা বলবে না এবং প্রশ্নও জিজ্ঞেস করবে না।”
তারপর তিনি নবীজিকে আপ্যায়ন করার জন্যে নিজের একটি মোটাতাজা ছাগল জবাই করলেন। পরবর্তী সময়ে যখন নবীজির সামনে খাদ্য পরিবেশন করা হলো তিনি জাবির রা. এর দিকে তাকিয়ে বললেন, "জাবির, মনে হচ্ছে তুমি জানতে যে, আমরা মাংস ভালোবাসি।”
নবীজি সাথের সাহাবীদের সবাইকে নিয়ে খাদ্য গ্রহণ করলেন। যখন নবীজির চলে যাওয়ার সময় হলো তখন জাবিরের স্ত্রী ঘরের ভেতর থেকে নবীজিকে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমার জন্য এবং আমার স্বামীর জন্য দুআ করুন।”
নবীজি তখন বললেন, “তোমার ও তোমার স্বামীর ওপর আল্লাহর শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক।”
তারপরের ঘটনা। জাবির নিজ স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, “আমি কি তোমাকে রাসূলুল্লাহর সাথে কথা বলতে মানা করিনি?"
জাবির রা. এর স্ত্রী কী জবাব দিয়েছিলেন, জানেন? তিনি জবাবে বলেছিলেন, "আপনি কি মনে করেছেন যে, আল্লাহ তাঁর রাসূলকে আমার ঘরে নিয়ে আসবেন এবং তিনি (খাবার খেয়ে) এমনি এমনি চলে যাবেন অথচ আমি তাঁর কাছে আমার ও আমার স্বামীর জন্যে দুআ করার আবেদন জানাতে ব্যর্থ হব?”
এই মহৎ মানুষেরাই ছিলেন নবীজি -এর মহান সহচরবৃন্দ। তারা প্রিয়নবীর কাছ থেকে দুআ ও বরকত গ্রহণ করে ধন্য হতে পেরেছিলেন। আল্লাহর রাসূল তাদের মাঝেই বসবাস করেছেন। এটা ছিল তাদের প্রতি আল্লাহ তাআলার অপার অনুগ্রহ।
ওপরের আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয়, নবীজি যখন সাহাবীদের ঘরে বেড়াতে আসতেন তখন বিষয়টি তাদের জন্য অত্যন্ত খুশির উপলক্ষ্য হতো। নবীজির আগমন প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ছিল মর্যাদার ব্যাপার, ছোটদের জন্য ছিল আদর-যত্ন পাওয়ার মোক্ষম সুযোগ আর সর্বোপরি তাদের সবার জন্যই তা পরিপূর্ণ বরকত নিয়ে আসত। পাশাপাশি নবীজি এ সময়টাতে সাহাবীদের শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করতেন। নবীজির অনন্য ও বিশুদ্ধ শিক্ষাপদ্ধতির লক্ষ্যই ছিল সাহাবীদের অন্তরে সঠিক মূল্যবোধের অবস্থান পাকাপোক্ত করে দেয়া।
আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনু রাবিআহ রা. থেকে বর্ণিত, “আমি যখন ছোট বালক ছিলাম তখন রাসূলুল্লাহ আমাদের দেখতে আসেন। আমি বাইরে গিয়ে খেলতে চাচ্ছিলাম। আমার মা তখন আমাকে বলেন, 'আব্দুল্লাহ, এদিকে আসো, আমি তোমাকে কিছু জিনিস দেব।'
নবীজি তখন মাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি তাকে কী দিতে চাও?' মা জবাবে বললেন, 'আমি তাকে কিছু খেজুর দিচ্ছি।'' নবীজি বললেন, 'যদি তুমি তা না দিতে তাহলে এই কথাটি তোমার আমলনামায় মিথ্যা হিসেবে লিপিবদ্ধ হতো।”
লক্ষ করুন, নবীজি কেমন করে একজন মা-কে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন, যাতে করে তিনি তার সন্তানের মনে দৃঢ়ভাবে সত্য কথা বলার মূল্যবোধের সঞ্চারণ ঘটাতে পারেন। সন্তানও তাই এ মূল্যবোধ সম্পূর্ণভাবে শিখতে পেরেছিল এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মাঝে বহু বছর পর হাদীসটিও বর্ণনা করতে পেরেছিল। এভাবেই প্রিয় পাঠক, আপনি এবং আমিও বিষয়টি শিখে ফেললাম।
আরেকবারের ঘটনা। নবীজি সাদ ইবনু উবাদাহ রা. এর ঘরে তাশরিফ আনলেন। সাথে অন্যান্য সাহাবাগণও ছিলেন। বাশির ইবনু সাদ রা. তখন একটি প্রশ্ন করলেন। তিনি বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ আমাদের নির্দেশ প্রদান করেছেন আমরা যেন আপনার প্রতি রহমতের দুআ করি। আমরা তা কীভাবে করব?” ৬০
নবীজি কিছু সময়ের জন্যে চুপ হয়ে গেলেন। উপস্থিত কেউ কেউ তখন চিন্তা করছিল এ প্রশ্নটি যদি নবীজির সামনে তোলাই না হতো তবে ভালো ছিল। তারপর নবীজি নীরবতা ভেঙে বললেন, "বলো :
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
'হে আল্লাহ, তুমি মুহাম্মাদ ও তাঁর বংশধরদের ওপর রহমত বর্ষণ করো, যেমনটি করেছিলে ইবরাহীম ও তাঁর বংশধরদের ওপরে। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসনীয় ও সম্মানীয়। হে আল্লাহ, তুমি মুহাম্মাদ ও তাঁর বংশধরদের ওপর বরকত নাযিল করো যেমন বরকত তুমি নাযিল করেছিলে ইবরাহীম ও তাঁর বংশধরদের ওপরে। অবশ্যই তুমি প্রশংসনীয় ও সম্মানীয়।' আর সালামের ব্যাপারটি তোমরা যেভাবে জানো সেভাবেই।” ৬১
নবীজির কিছুটা সময় চুপ থাকার ব্যাপারটি ভেবে দেখুন। সবাই উদ্গ্রীব হয়ে আকাশকুসুম কল্পনা করছিল। সবাই উত্তর জানার জন্য মুখিয়ে ছিল। আর তাই, যখন নবীজি জবাব দিলেন, তারা সকলেই সাগ্রহে শিখে নিলেন, যাতে কেউ তা ভুলে না যায়। কল্যাণের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের ওপর সকল রহমত, বরকত ও সালাম বর্ষিত হোক।
একবার নবীজি ইতবান ইবনু মালিকের ঘরে ছিলেন। সেখানে তখন সাহাবীদের বেশ বড় জামাত উপস্থিত ছিল। একজন বললেন, "মালিক ইবনু আদ-দুকশুমের কী হয়েছে? তাকে দেখা যায় না।”
আরেজন তখন জবাবে বললেন, "সে একটা মুনাফিক। সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে না।"
তখন নবীজি বারণ করে বললেন, "এ কথা বলবে না। তোমরা কী তাকে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলতে শোনোনি?"
যিনি এ কথা বলেছিলেন তিনি তখন বললেন, “আল্লাহ আর তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। আমরা তো তাকে মুনাফিকদের সাথে বন্ধুত্ব করতে ও কথা বলতে দেখি।”
নবীজি বললেন, “যে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এর সাক্ষ্য দেবে আল্লাহ তাঁর জন্য জাহান্নাম নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন।”
ঘটনাটি পর্যালোচনা করে দেখা উচিত। নবীজি যখন সাহাবীদের দেখতে যেতেন তখন তিনি সে সময়টুকু সাহাবীদের, এবং সর্বোপরি মুসলিম উম্মাহকে শিক্ষা দেয়ার কাজে কীভাবে ব্যবহার করতেন দেখুন। অন্য মুসলিমদের ইজ্জত-সম্মান রক্ষা করার শিক্ষা কত সুন্দরভাবেই-না তিনি দিচ্ছিলেন। মুসলিম ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তাকে নিয়ে খারাপ কথা না বলার শিক্ষাও এ থেকে পাওয়া যায়। নববী পাঠশালা থেকে আমরা আরও শিখতে পারি যে, আমাদের সর্বদা মানুষের ইতিবাচক দিকটি বিবেচনায় রাখা উচিত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস রাখা। এ ঘটনা থেকে এটাই সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। যার ব্যাপারে কথা বলা হচ্ছে সেই মানুষটি 'আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই'-এ সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। নবীজি শ্রোতাদের নজর তাই তো সেদিকেই ফিরিয়ে দিলেন।
ভাবুন তো, আমাদের মজলিস আর কথোপকথন কতই-না বিশুদ্ধতায় বদলে যাবে যখন আমরা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর সাক্ষ্য দেওয়া মুমিনদের অনুপস্থিতিতে তাদের ব্যাপারে খারাপ কথা বলা থেকে বিরত থাকব।
টিকাঃ
৫৬. আলী রা. আল্লাহর রাসূলের চাচাতো ভাই হওয়া সত্ত্বেও ফাতিমার চাচাতো ভাই বলে সম্বোধনের কারণ হচ্ছে আরবের প্রচলিত একটি সাধারণ পরিভাষা এটি। ফাতহুল বারি- ২/৪৪২
৫৭. আরবিতে 'নুগাইর' বলতে চড়ুই পাখির মত ছোট্ট পাখিকে বুঝায়
৫৮. আবূ দাউদ: ৩৮৫৪
৫৯. আবূ দাউদ: ৩৭২৯
৬০. বাশির রা. এর প্রশ্ন ছিল আল কোরআনের একটি আয়াত প্রসঙ্গে। আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি রহমত প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর জন্যে রহমতের তরে দোয়া কর এবং তাঁর প্রতি সালাম প্রেরণ কর।" [সূরা আল আহযাব, ৩৩:৫৬]
৬১. তিরমিযী: ৩২২০
📄 অসুস্থ ব্যক্তির পাশে
আল্লাহর নবী অসুস্থদের দেখতে যেতেন। কষ্ট-যাতনার দুঃসহ মুহূর্তগুলোতে প্রিয়নবীর উপস্থিতি যেন সাহাবাদের জন্য প্রলেপের কাজ করত, তাদের স্বস্তি জোগাত। যখন সাদ ইবনু উবাদাহ রা. অসুস্থ ছিলেন তখন নবীজি তাকে দেখতে যান। সাথে ছিলেন আব্দুর রহমান ইবনু আওফ, সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস এবং আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম। নবীজি কক্ষে ঢুকে সাদ রা. কে অচেতন অবস্থায় পেলেন। পরিবারের সবাই তখন তাঁর পাশে। নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, “সে কি মারা গেছে?”
তারা তখন জবাবে জানালেন, “না, সাদ এখনো মরেননি।”
এ সময় নবীজির চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে গিয়েছিল। উপস্থিত সবাই নবীজিকে কাঁদতে দেখে কান্না শুরু করলেন।
তখন নবীজি বললেন, "তোমরা কি শোনোনি যে, আল্লাহ কাউকে অশ্রুসজল দু-চোখের কারণে কিংবা ব্যথাকাতর অন্তরের জন্যে শাস্তি দেন না। তিনি শাস্তি দেন এই জিনিস (জিহ্বার দিকে দেখিয়ে) যা করতে পারে তার কারণে। নতুবা তিনি রহমত বর্ষণ করেন।"
নবীজি কতটুকু সহানুভূতিশীল ছিলেন তাঁর একটিমাত্র উদাহরণ এই ঘটনা। প্রিয়নবীর চোখ ভিজে গিয়েছিল শুধু তাঁর একজন সাহাবী জ্ঞান হারিয়েছেন এই কারণে। আমি অবাক হয়ে ভাবি, সাদ ইবনু উবাদাহ রা. এর কেমন লেগেছিল যখন জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর এবং সুস্থ হয়ে যাওয়ার পর তিনি এ কথা জেনেছেন। আল্লাহর রাসূল সাদ রা. কে দেখতে এসেছিলেন এবং তাঁর অবস্থা দেখে কেঁদে ফেলেছিলেন। সাদ রা. এর ছেলেদের, স্বজনদের এবং সাহাবাদের এ দৃশ্য দেখে কেমন লেগেছিল? তারা তো দেখছিলেন যে, আল্লাহর রাসূল তাদের কষ্ট আর দুশ্চিন্তাগুলোও ভাগ করে নিচ্ছেন। তাদের মতো একই অনুভূতি নবীজিরও হচ্ছিল। এ রকমই ছিল নবীজির মমত্ববোধ। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাঁর নবীকে জানেন এবং তাঁর ব্যাপারে যথার্থই বলেছেন:
لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ
“তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের নিকট একজন রাসূল এসেছেন, তোমাদের যা কিছু কষ্ট দেয় তা তাঁর নিকট খুবই কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি করুণাসিক্ত, বড়ই দয়ালু।” ৬২
এ ধরনের আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ রা. এর ঘটনা।
তিনি বলেন, “আমি অসুস্থ ছিলাম। নবীজি আবু বকর রা. কে সাথে নিয়ে আমাকে দেখতে আসলেন। তখন আমার স্বগোত্রের (সালামাহ গোত্র) লোকেরা আমার পরিচর্যা করছিল। তাঁরা যখন হেঁটে আসছিলেন তখন আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। নবীজি আমাকে অজ্ঞান হয়ে যেতে দেখেন। আমি অচেতন ছিলাম। নবীজি উযু করলেন এবং উযুর জন্য ব্যবহৃত কিছু পানি আমার ওপরে ছিটিয়ে দিলেন। আমি দ্রুত জ্ঞান ফিরে পেয়ে আল্লাহর রাসূলকে আমার পাশে দেখলাম। আমি তখন নবীজি-কে জিজ্ঞেস করলাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি আমার সম্পত্তি কীভাবে অছিয়ত করব? আমার তো সরাসরি উত্তরাধিকারী কেউ নেই। না আমার পিতা-মাতা আছেন আর না আছে সন্তান।' নবীজি আমার কথার জবাব দিলেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত না কুরআনের আয়াত নাযিল হলো। এ আয়াতে এ ধরনের অবস্থাতে উত্তরাধিকারের নিয়মকানুন বিবৃত হয়েছিল।”
আমরা জানি যে, জাবির রা., যিনি তখন অসুস্থ অবস্থায় ছিলেন এবং নবীজীকে প্রশ্ন করেছিলেন যে, এ অবস্থায় মারা গেলে সম্পত্তি কীভাবে বণ্টন করবেন; তিনি নবীজির ওফাতের পরেও প্রায় ৭০ বছর জীবিত ছিলেন। আর এ দৃশ্য তার স্মৃতিতে সর্বদাই অমলিন ছিল।
আমরা জাবির রা. এর উক্তিটির ব্যাপারে আরেকটু গভীরভাবে ভেবে দেখি। তিনি বলেছিলেন, “আমি দ্রুত জ্ঞান ফিরে পেয়ে আল্লাহর রাসূলকে আমার পাশে দেখলাম।” তিনি হাদীসটি এমনভাবে বর্ণনা করছিলেন যেন তিনি এইমাত্র জ্ঞান ফিরে পেয়ে অবাক হয়ে নবীজির দিকে তাকালেন।
এভাবেই নবীজি -এর স্মৃতি চিরভাস্বর হয়ে ছিল সাহাবাদের মনে-মগজে। রোগ- শোক কিংবা দুর্বলতায় নবীজি -কে পাশে পাওয়ার মতো আকুলতায় ভরা এ অনুভূতি আর কিছুতেই ছিল না। সাহাবাদের সাথে এমনই ছিলেন আমাদের নবীজি। দুঃখের সময় তারা কখনো নবীজির অভাব বোধ করেননি; বরং সাহাবাগণ সব সময় নবীজি- কে পাশে পেয়েছেন। তিনি সদা তাদের পাশে থেকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। একইভাবে, আনন্দের সময়েও সাহাবাগণ নবীজি-কে পাশে পেয়েছেন। তিনি সব সময় তাদের পাশে থেকে আনন্দও ভাগ করে নিতেন। তাই তো, সাহাবাদের ছিল নবীজি -এর জন্য এত অসম ভালোবাসা।
টিকাঃ
৬২. সূরা আত-তাওবাহ, ৯:১২৮
📄 মদীনার বাগানে
মাঝে মাঝে প্রাতঃভ্রমণের এ সময়টাতে নবিজি মদীনার বাগানগুলোতে যেতেন। সেখানে তিনি সবুজ গাছের শীতল ছায়ায় বিশ্রাম নিতেন। অনেক সময় অন্তরঙ্গ অনেক সাহাবীদের সাথে সেখানেই দেখা হয়ে যেত। তিনি বায়রুহা নামক একটি বাগানে প্রায় যেতেন। বাগানটির মালিক ছিলেন আবু তালহা আল-আনসারি রা.। তিনি সেখানে গিয়ে গাছের ছায়ায় বসতেন এবং সেখানকার সুপেয় পানি পান করতেন। এ বাগানটি থেকে মসজিদ নবী ছিল উত্তর দিকে। বর্তমানে মসজিদ সম্প্রসারিত করার ফলে বাগানের স্থানটি মসজিদের ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
আনসারদের মালিকানাধীন অন্যান্য বাগানগুলোতেও কখনো কখনো প্রিয় নবী সময় কাটাতেন। এ রকম একটি ঘটনা আমরা জানতে পারি আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত একটি হাদিস থেকে।
আবু হুরাইরা রা. বলেন, “আমরা রাসুলুল্লাহ -এর সাথে বসে ছিলাম। আমাদের সাথে ছিলেন আবু বকর, উমর এবং আরও কয়েকজন সাহাবী। রাসুলুল্লাহ আমাদের সেখানে রেখে চলে গেলেন। তিনি দীর্ঘসময় অনুপস্থিত ছিলেন, সে জন্যে আমরা আশঙ্কা করছিলাম হয়তো তাঁর সাথে অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা ঘটল কিনা! আমরা চিন্তিত হয়ে উঠে পড়লাম। সবার প্রথম দুশ্চিন্তা এসেছিল আমার, তাই আমি প্রথমে উঠে রাসুলের খোঁজে বেরিয়ে পড়লাম। আনসারদের একটি বাগানের সামনে এসে সেখানে ঢোকার প্রবেশপথ খুঁজতে লাগলাম। চারপাশ ঘুরেও কোনো দরজা পেলাম না। বাগানের ভেতরের একটি কুয়া থেকে ছোট নালা দিয়ে বাইরে পানি আসছিল। আমি নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে নালার মধ্যে দিয়ে বাগানে ঢুকে পড়লাম, ঠিক যেভাবে খরগোশ ঢুকে থাকে। সেখানে প্রবেশ করে আল্লাহর রাসুল -কে খুঁজে পেলাম। তিনি আমাকে “আবু হুরাইরা” বলে ডাকলেন। আমি বললাম, “জি, আল্লাহর রাসুল!” তারপর তিনি আমাকে তাঁর জুতাজোড়া দিয়ে বললেন, “এই জুতাজোড়া নিয়ে বাইরে যাও। এই বাগানের বাইরে যার সাথেই তোমার দেখা হবে তাকে এ সুখবর জানিয়ে দিয়ো যে, কেউ যদি দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে ঘোষণা দেয়—'আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই'- তাহলে সে জান্নাতে থাকবে।”
কুবায় আগমন করলে নবীজি কখনো কখনো সেখানকার আরিস নামক কুয়ার নিকটে যেতেন। এটি মাসজিদুল কুবার পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। এটি সেই কুয়া, যেখানে তৃতীয় খলিফা উসমান রা. এর খিলাফতকালে নবীজি -এর আংটি পড়ে হারিয়ে যায়। শতাব্দীর পর শতাব্দী মুসলিম রাষ্ট্রগুলো এবং মুসলিম জনগণ এই কুয়াকে রক্ষণাবেক্ষণ করেছে। অবশ্য বর্তমানে এই কুয়াকে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে।
আবূ মুসা আল আশআরি রা. বর্ণনা করেন,
“একবার নবী প্রয়োজনবশত মদীনার (দেয়াল ঘেরা) বাগানগুলোর একটি বাগানের উদ্দেশ্যে বের হলেন। আমি তাঁর পেছনে গেলাম। তিনি যখন বাগানে প্রবেশ করলেন তখন আমি এর দরজায় বসে থাকলাম। দরজাটি শুকনো খেজুরের ডালপালা দিয়ে বানানো ছিল। আমি মনে মনে বললাম, আজ আমি নবীজি-এর প্রহরীর কাজ করব। অবশ্য তিনি আমাকে এর নির্দেশ দেননি। নবীজি ভেতরে গেলেন এবং স্বীয় প্রয়োজন সেরে উযু করে নিলেন। এরপর আরিস নামক কুয়ার পোস্তার (কুয়ার গাঁথুনি বা ঠেস) ওপর বসলেন এবং হাঁটুর নিচের অংশের কাপড় তুলে নিয়ে দু-পা কূপের মধ্যে ঝুলিয়ে দিলেন। এমন সময় আবু বকর রা. এসে তাঁর নিকট প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। আমি বললাম, "আপনি অপেক্ষা করুন, যতক্ষণ-না আমি আপনার জন্য অনুমতি নিয়ে আসছি।”
তিনি অপেক্ষা করতে লাগলেন। আমি নবীজি -এর নিকট এসে বললাম, “হে আল্লাহর নবী, আবু বকর আপনার কাছে প্রবেশের অনুমতি চাচ্ছেন।”
তিনি বললেন, “তাঁকে আসার অনুমতি দাও এবং তাঁকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও।”
আবু বকর আল্লাহর শোকর ও প্রশংসা করে ভেতরে প্রবেশ করলেন। তিনি নবীজির ডান পাশে কুয়ার ছোট দেয়ালে গিয়ে বসলেন। এরপর তিনিও হাঁটুর নিচের অংশ অনাবৃত করে উভয় পা কূপের মধ্যে ঝুলিয়ে দিলেন। এরপর উমর রা. আসলেন। আমি বললাম, “আপনি নিজ জায়গায় অপেক্ষা করুন। আমি আপনার জন্য অনুমতি নিয়ে আসি।" (অনুমতি প্রার্থনা করলে) নবীজি ﷺ বললেন, "তাঁকে আসার অনুমতি দাও এবং জান্নাতের সুসংবাদ দাও।”
তিনিও আল্লাহর হামদ ও শোকরগুজারী করে ভেতরে ঢুকলেন। তিনি নবীজির বামদিকে কুয়ার ছোট দেয়ালে বসলেন এবং হাঁটুর নিচের অংশ অনাবৃত করে দু-পা কূপের মধ্যে ঝুলিয়ে দিলেন। এতে কূপের পোস্তা পূর্ণ হয়ে গেল এবং সেখানে বসার আর কোনো স্থান অবশিষ্ট থাকল না। এরপর উসমান রা. আসলেন। আমি বললাম, “আপনি নিজ জায়গায় অপেক্ষা করুন, যতক্ষণ আমি আপনার জন্য অনুমতি নিয়ে না আসি।” নবীজি ﷺ বললেন, “তাঁকে আসার অনুমতি দাও এবং তাঁকে বিপদগ্রস্ত হওয়াসহ জান্নাতের সুসংবাদ দাও।"
আমি তাঁর (উসমানের) কাছে গিয়ে বললাম, “ভেতরে আসুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ আপনাকে এ খবর পাঠিয়েছেন যে, আপনি জান্নাতী। তবে (তার আগে) আপনাকে (দুনিয়ায়) নিদারুণ কষ্ট-যাতনার মধ্যে পড়তে হবে।”
জবাবে তিনি (উসমান) বললেন, “আমি আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করি। হে আমার রব, আমাকে বিপদের সময় অটল রাখুন।”
অতঃপর তিনিও ভেতরে গেলেন। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে বসার কোনো জায়গা পেলেন না। কাজেই তিনি উল্টো দিকে এসে তাঁদের মুখোমুখি হয়ে কুয়ার পাড়ে বসে গেলেন এবং হাঁটুদ্বয়ের নিচের অংশ অনাবৃত করে উভয় পা কুয়ার ভেতরে ঝুলিয়ে দিলেন। আমি তখন আমার অন্য এক ভাইয়ের (আগমন) কামনা করছিলাম এবং আল্লাহর নিকট দুআ করছিলাম যেন সে (এ মূহূর্তে) আগমন করে।”
মদীনার জলবায়ু অত্যন্ত গরম হওয়ার দরুন ছায়ার খোঁজে নবীজি ﷺ মদীনার বাগানগুলোতে যেতেন, সেখানে বিশ্রাম নিতেন। এই বিশ্রাম নবীজিকে স্বস্তি ও শক্তি জোগাত, যাতে তিনি তাঁর বাকি দৈনন্দিন কাজগুলো সুন্দরভাবে আঞ্জাম দিতে পারেন। বাগান-মালিকদের জন্যেও নিজেদের বাগানে প্রিয়নবী ﷺ-এর আগমন অত্যন্ত খুশির উপলক্ষ ছিল। তারা সানন্দে আল্লাহর রাসূলকে বরণ করে নিতেন। তারা এটি বুঝতে পেরেছিলেন যে, আল্লাহর রাসূলের উপস্থিতি তাদের বাগানে বরকত নিয়ে আসছে। তিনি তো বরকতময়, চাই যেখানেই তিনি থাকুন না কেন।
📄 প্রিয়নবীর কায়লুলা
সকালের শেষে যখন বেলা গড়াতে শুরু করত, তখন নবীজি উম্মুল মুমিনীনদের মধ্যে যার ভাগে থাকার তারিখ থাকত তাঁর কক্ষে যেতেন। প্রবেশ করে প্রথমে তিনি যে-দুটি কাজ করতেন তা হচ্ছে মিসওয়াক করা এবং ঘরের সবাইকে সালাম দেয়া। তারপর দোহার সালাত ৬৩ আদায় করতেন। কখনো চার রাকাত পড়তেন, কখনো-বা বাড়িয়ে ছয় কিংবা আট রাকাত পড়তেন।
সকালে নাশতা না করে থাকলে সেখানে যদি খাবার পাওয়া যেত, তবে সামান্য কিছু খেয়ে নিতেন। এমনও হয়েছে যে, নবীজি-কে রোযা থাকা অবস্থায় খাবার খেতে বলা হয়েছে আর তিনিও রোযা ভেঙে খাদ্য গ্রহণ করেছেন। ৬৪
আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে পাওয়া যায়, তিনি একদিন নবীজি -কে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, একজন আগন্তুক আমাদের জন্য একটি উপহার পাঠিয়েছেন। আমি আপনার জন্য (তা থেকে) কিছু রেখেছি।” রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, “কী জিনিস?” আয়িশা রা. জানালেন, “সেটি হচ্ছে হায়স।” ৬৫
নবীজি তখন তা নিয়ে আসতে বললেন। আয়িশা রা. তা নিয়ে আসলে তিনি তা খেলেন। তারপর বললেন, “আমি রোযা অবস্থায় আমার দিন শুরু করেছিলাম।”
শেষ সকালের এই সময়টাতেই নবীজি উম্মুল মুমিনীন জুয়াইরিয়াহ রা. কে এসে দেখেছিলেন যে, তিনি তাঁর সালাতের স্থানে বসে আল্লাহর হামদ (প্রশংসা) করছিলেন।
নবীজি সেদিন ভোরে ফজরের সালাত সমাপ্ত করেও সেখানে এসে তাকে (জুয়াইরিয়াহকে) একই জায়গায় দেখেছিলেন। এবার তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “আমি যে অবস্থায় তোমাকে ছেড়ে বাইরে গেলাম, সে অবস্থাতেই তুমি রয়েছ।”
তিনি হ্যাঁ-বাচক জবাব দিলেন। নবীজি তখন বললেন, “কিন্তু, তোমার নিকট থেকে যাবার পর আমি চারটি বাক্য তিনবার পড়েছি। যদি সেগুলো তোমার সকাল থেকে (এ যাবৎ) পঠিত দুআর মোকাবিলায় ওজন করা যায়, তাহলে তা পরিমাপে সমান হয়ে যাবে। তা হচ্ছে এই :
سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ عَدَدَ خَلْقِهِ، وَرِضَا نَفْسِهِ، وَزِنَةَ عَرْشِهِ، وَمِدَادَ كَلِمَاتِهِ
অর্থাৎ, “আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টিকুলের সমপরিমাণ মহাপবিত্র, আল্লাহ তাআলা তাঁর সত্তার সন্তোষ মোতাবেক মহাপবিত্র, আল্লাহ তাআলা তাঁর আরশের ওজনের সমপরিমাণ মহাপবিত্র, আল্লাহ তাআলা তাঁর কালামের সমান মহাপবিত্র।” ৬৬
এই সময়টা তিনি পরিবারের সাথে একান্তে কাটাতেন। এ সময় অন্য মুসলিমা নারীগণ তাদের দ্বীনি বিষয়ের সেসব প্রশ্নের উত্তর জানতে আসতেন, যা তারা অন্য পুরুষদের সামনে লজ্জাবশত নবীজিকে করতে পারতেন না। তারা নবীজিকে যখন প্রশ্ন করতেন তখন উম্মুল মুমিনীনগণ সেখানে উপস্থিত থাকতেন। এভাবেই আমরা নারীদের ব্যক্তিগত বিষয়াবলির ক্ষেত্রে দ্বীনের বিধানবলি জানতে পারি।
একবার নবীজি আয়িশা রা. এর ঘরে ছিলেন। তখন এক আনসারি মহিলা এসে জিজ্ঞেস করলেন, “মাসিক শেষ হয়ে গেলে নারীরা কীভাবে ফরয গোসল করবে?”
নবীজী তখন বললেন, “সে পানি এবং পরিষ্কার করার কাপড় সাথে নেবে এবং উযু করবে। তারপর মাথায় পানি ঢালবে এবং মাথা ভালোভাবে ঘষে নেবে, যাতে পানি চামড়ায় পৌঁছে যায়। তারপর সে এক টুকরো কস্তুরি লাগানো নেকড়া দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করে নেবে।”
মহিলা বললেন, “এটি দিয়ে কীভাবে পবিত্রতা অর্জন করব?”
আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, "তা দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করো।”
মহিলা (তৃতীয়বার) বললেন, “কীভাবে?”
আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, “সুবহানাল্লাহ, তা দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করো।” অতঃপর লজ্জাবশত অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।
আয়িশা রা. বলেন, “যখন আমি রাসূলুল্লাহকে লজ্জাবোধ করতে দেখলাম, তখন আমি তাকে (আনসারি মহিলাকে) নিজের দিকে টেনে নিলাম এবং বললাম যে, তুমি এটি দিয়ে তোমার রক্ত বের হওয়ার জায়গায় ঘষবে। তিনি (নবীজি) আমার কথা শুনলেন এবং প্রতিবাদ করলেন না।”
একদা নবীজি উম্মুল মুমিনীন উম্মু সালামা রা. এর সাথে ছিলেন। তখন উম্মু সুলাইম রা. এসে প্রশ্ন করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল, কোনো মহিলা যদি স্বপ্নে দেখে যে সে স্বামীর সাথে সহবাস করছে তবে কি তাকে গোসল করতে হবে?”
তখন উম্মু সালামা রা. বললেন, "হায় হায়! উম্মু সুলাইম! তুমি তো আল্লাহর রাসূলের সামনে মহিলাদের উন্মোচিত করে ফেললে।”
উম্মু সুলাইম জবাবে বললেন, “আল্লাহ সত্য প্রকাশে লজ্জাবোধ করেন না। আমাদের সমস্যাবলির ব্যাপারে নবীকে জিজ্ঞেস করা আমাদের জন্য গাফেল থাকার চেয়ে উত্তম।”
নবীজি উম্মু সুলাইমকে সমর্থন করে স্বীয় পত্নী উম্মু সালামাকে বললেন, “তোমাকেই বরং বলা উচিত, হায়! তোমাদের মধ্যে তারাই শ্রেষ্ঠ, যারা উদ্বিগ্নকারী বিষয়ের ব্যাপারে প্রশ্ন করে। হ্যাঁ, উম্মু সুলাইম, সে যদি বীর্য দেখে তবে তাকে অবশ্যই গোসল করে নিতে হবে।"
উম্মু সালামা রা. হাসলেন এবং বললেন, “আল্লাহর রাসূল, মেয়েদেরও কি স্বপ্নদোষ হয়?"
রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, "তা না হলে সন্তান তার মতো কীভাবে হয়?”
আনসারি মহিলাগণ প্রশ্ন করার ব্যাপারে রাখঢাক করতেন না, স্পষ্ট জবাব জানতে চাইতেন। আয়িশা রা. বলেন, “আনসারি মহিলগণ হচ্ছেন উত্তম নারী। লজ্জাবোধ তাদের দ্বীনি জ্ঞান লাভে বাধা দিতে পারেনি।” ৬৭
মাঝে মাঝে এ সময়টাতে ঘনিষ্ঠ সাহাবীগণ এসে নবীজির সাথে দেখা করতেন; বিশেষত যখন কোনো ঘটনা ঘটত। একবার নবীজি বিছানায় শুয়ে ছিলেন। তাঁর পরনে ছিল আয়িশা রা. এর একটি কাপড়। ৬৮ নবীজির উরু অথবা পায়ের নিম্নভাগ দেখা যাচ্ছিল।
আবু বকর রা. এসে প্রবেশের অনুমতি চাইলে তাকে অনুমতি দেয়া হলো, নবীজি আগের অবস্থানেই থাকলেন। তিনি তাঁর প্রয়োজন পূরণ করে চলে গেলেন। উমর রা. এসে প্রবেশের অনুমতি চাইলে নবীজি ﷺ তাকেও অনুমতি দিলেন। তখনো নবীজির আগের অবস্থাতেই ছিলেন। উমর প্রয়োজন পূরণ করে প্রস্থান করলেন। তারপর উসমান রা. এসে কক্ষে ঢোকার অনুমতি চাইলেন। তাকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেয়ার আগে উঠে বসে কাপড় ঠিকঠাক করে নিলেন। তারপর উসমান ভেতরে আসলেন, নবীজির সাথে কথা বলে যে প্রয়োজনে এসেছিলেন তা পূর্ণ করে চলে গেলেন। আয়িশা রা. বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আবু বকর আসলেন কিন্তু আপনি কোনো কিছু ঠিকঠাক করলেন না। তারপর উমর আসলেন এবং আপনি আগের মতোই থাকলেন। কিন্তু উসমান আসার আগে আপনি উঠে বসে নিশ্চিত হয়ে নিলেন যে, আপনার কাপড় ঠিকঠাক আছে কি না!”
নবীজি তখন বললেন, “আমি এমন লোকের সামনে এভাবে যেতে লজ্জাবোধ করলাম, যার উপস্থিতিতে ফেরেশতারাও লজ্জাবোধ করেন। উসমান একজন লজ্জাশীল ব্যক্তি। আমার আশঙ্কা হচ্ছিল যে, আমি যদি আগের অবস্থাতেই থাকি তাহলে তার লজ্জা তাকে আমার কাছে তার দরকারের কথা বলতে বাধা দেবে।"
ঘরের ভেতর স্ত্রীর সাথে নবীজি কীরূপ ছিলেন তা বর্ণনা করে গেছেন আয়িশা রা.। তিনি বলেন, “যখন তিনি ঘরে একান্তে থাকতেন তখন তিনি ছিলেন সবচেয়ে সহজ-সরল ও উদার মানুষ। তিনি তোমাদের মতোই একজন মানুষ ছিলেন; তবে তিনি প্রায়ই মুচকি হাসতেন। তিনি অন্য মানুষদের থেকে আলাদা ছিলেন না। তিনি সব সময় পরিবারের প্রয়োজন পূরণ করে দিতেন। তিনি নিজের জুতা এবং কাপড় নিজে সেলাই করতেন, নিজ হাতে ছাগলের দুধ দোয়াতেন এবং নিজের খাবার নিজেই পরিবেশন করতেন। তিনি ঘরে তা-ই করতেন, যা যেকোনো পুরুষ মানুষ করে থাকে।”
প্রিয় পাঠক, আপনারা এখানেও দেখতে পারবেন নবীজির ব্যক্তিজীবনে ধার্মিকতার মেলবন্ধন। নবীজির ঘর বলতে প্রত্যেক স্ত্রীর জন্য ছোট্ট একটা কক্ষ। ঘরের কাজ খুব অল্পই ছিল, যাতে তাঁর স্ত্রীদের সাহায্য করার দরকার পড়ত। তবুও তিনি গৃহস্থালি কাজে সহায়তা করতেন। প্রকৃতপক্ষে, নবীজি পরিবারের মানুষজন যে কাজই করতে থাকেন না কেন, তা ভাগ করে নিতেন। যাতে করে পরিবারের সবাই এটা অনুধাবন করতে পারে এই ঘর পরিবারের সব সদস্যের ঘর এবং তারা একই সাথে জীবন কাটাচ্ছেন। এভাবেই নবীজি পারিবারিক জীবনে মানসিক প্রশান্তির শিখরে পৌঁছে যেতেন। ঘরের ভেতর নবীজির কার্যাবলী আমাদের অনেকগুলো সুন্দর বার্তা প্রদান করে : একজন স্বামী স্ত্রীর কতটুকু যত্ন নেবে তা আমরা জানতে পারি; নবীজি পারিবারিক জীবনকে কতটুকু গুরুত্ব দিতেন তাও জানা যায়। সকল কল্যাণ তাঁর তরে, যিনি সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানুষ ছিলেন, যিনি নিজের পরিবারের মানুষদের কাছেও ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি।
নবীজির সংসারে যেমন ভালোবাসা ও মমত্ববোধের প্রাচুর্য ছিল; ঠিক তেমনি সংসারে নির্মল বিনোদনেরও কমতি ছিল না। আনন্দঘন স্বতঃস্ফূর্ত আচরণের উপলক্ষ্যও নবীপরিবারে আসত। একদিন উম্মুল মুমিনীন আয়িশা রা. এর ঘরে উম্মুল মুমিনীন সাওদা রা. বেড়াতে আসলেন। নবীজি উভয় স্ত্রীর মাঝে বসে ছিলেন। আয়িশা রা. হারিরাহ রান্না করেছিলেন, এটি একধরনের ঘন সুপ-জাতীয় খাবার, যা আটা দিয়ে বানানো হয়ে থাকে। তিনি তাঁর রান্না করা এ খাবার সাওদাহ রা.-কে খেতে দিলেন, কিন্তু সাওদাহ রা. বললেন, "আমার এটি পছন্দ নয়, আমি খাব না।”
তখন আয়িশা রা. বললেন, "তুমি এটি খাবে, নতুবা তা আমি তোমার মুখে ছুড়ে মারব।” সাওদাহ রা. তবুও খেতে অস্বীকৃতি জানালেন। আয়িশা কিছু খাদ্য হাতে তুলে নিয়ে তা সাওদাহ রা. এর মুখে মেখে দিলেন। নবীজি হেসে সাওদাহ রা.-কেও প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ করে দিলেন। তিনি পাত্র থেকে কিছু খাদ্য তুলে সাওদাহ রা.-কে দিয়ে বললেন, "তুমিও তার মুখে মেখে দাও।”
সাওদাহ রা. তখন তা নিয়ে আয়িশা রা. এর মুখে মেখে দিলেন। নবীজি তাদের শিশুসুলভ কাণ্ডকারখানা দেখে হাসতেই থাকলেন। তারা তিনজনই যখন হাসছিলেন তখন হঠাৎ মসজিদ থেকে উমর রা. এর গলা শোনা গেল। উমর রা. হাঁক দিয়ে নিজের ছেলেকে ডাকছিলেন, “ওহে আব্দুল্লাহ ইবনু উমর, আব্দুল্লাহ ইবনু উমর!”
ন নবীজি তখন তাঁর স্ত্রীদের বললেন, "যাও, মুখ মুছে আসো। উমর সম্ভবত আসতে চাচ্ছেন।"
উমর রা. নবীজির দরজার নিকটে এসে বললেন, "আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু, আপনাদের সবার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আমি কি আসতে পারি?"
নবীজি ভেতরে ঢোকার অনুমতি দিলেন।
এ ধরনের বিনোদনপূর্ণ ঘরোয়া পরিবেশ ইসলামী সংসারজীবনের স্বাধীনতা ও অকপট চরিত্রের দিকেই ইশারা প্রদান করে, যা নবীজি বাস্তবায়ন করে গেছেন। আমাদের ধর্ম বিনোদনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে।
যুহরের সালাতের আগ পর্যন্ত হালকা একটু ঘুমিয়ে নেয়া নবীজির অভ্যাস ছিল। তিনি সাধারণত নিজের ঘরেই ঘুমাতেন। নিজ স্ত্রীগণের ঘর ব্যতীত অন্য কোনো মহিলার ঘরে তিনি কখনো ঘুমাননি, তবে ব্যতিক্রম ছিলেন উম্মু সুলাইম। তিনি মাঝে মাঝে উম্মু সুলাইমের ঘরে যেতেন এবং সেখানে ঘুমাতেন। নবীজিকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলতেন, “আমি তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল, তাঁর ভাই আমার সাথে যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছেন।” ৬৯
এমনও হয়েছে যে নবীজি উম্মু সুলাইমের ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন, কিন্তু উম্মু সুলাইম ঘরে ছিলেন না। একবার উম্মু সুলাইম রা. বলেন যে, তিনি ঘরে গিয়ে দেখলেন নবীজি ঘুমিয়ে আছেন। তখন গরমের সময় ছিল, নবীজি দরদর করে ঘামছিলেন। তিনি এত বেশি ঘামছিলেন যে, তা বিছানার ওপরে রাখা এক টুকরো চামড়ায় গিয়ে জমা হচ্ছিল। উম্মু সুলাইম রা. নবীজির ঘাম জমা করে বোতলে ভরে নিলেন। নবীজি ঘুম থেকে উঠে তা দেখতে পেয়ে উম্মু সুলাইমকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি এসব কেন করছেন? উম্মু সুলাইম জবাব দিলেন, তিনি নবীজির ঘাম জমা করে বোতলে ভরে রাখছেন, যাতে বরকতের জন্য এই ঘাম মোবারক তিনি নিজ সন্তানদের দিতে পারেন। তখন নবীজি সম্মতি জানিয়ে তাদের জন্য দুআ করলেন।
টিকাঃ
৬৩. দোহা' )الضحى( আরবী শব্দ। এর অর্থ পূর্বাহ্ন বা দিনের প্রথম অংশ (forenoon)। ফাসী ভাষায় একে 'চাশু' বলা হয়। সূর্যোদয়ের পর থেকে দুপুরের পূর্ব পর্যন্ত সময়কে আরবীতে দোহা বলা হয়। সূর্যোদয়ের মুহূর্ত থেকে প্রায় ১৫/২০ মিনিট পরে দোহা বা চান্তের সালাতের সময় শুরু। দ্বিপ্রহরের পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের মধ্যে যে কোনো সময়ে এ সালাত আদায় করা যায়। 'দোহা'র সালাত দু রাক'আত থেকে বার রাক'আত পর্যন্ত আদায় করা যায়। তাহাজ্জুদ সালাতের পরে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাসনূন নফল সালাত দোহার সালাত।
৬৪. নফল রোযা এরকমভাবে ভাঙ্গা জায়েজ আছে। তবে হানাফী ফিকহ অনুসারে পরবর্তীতে ঐ রোযা অন্য কোন দিন কাযা করতে হবে।
৬৫. একধরনের খাদ্য যা খেজুর, পাস্তুরিত মাখন আর পনিরের সংমিশ্রণে প্রস্তুত করা হয়ে থাকে।
৬৬. তিরমীযী: ৩৫৫৫
৬৭. হায়েযের গোসল সংক্রান্ত হাদীসের শেষ অংশে তিনি এ কথা বলেছিলেন
৬৮. এখানে এমন ধরনের কাপড়ের কথা বলা হচ্ছে যা নারী-পুরুষ উভয়েই পরতে পারে। পুরুষরা এধরনের কাপড় শরীরের উপরিভাগ বা নিম্নভাগে পরতে পারে।
৬৯. আলিমগণ একমত যে নবীজি সা. উম্মু সুলাইমের ঘরে যেতেন; কারণ, উম্মু সুলাইম রা. নবীজির মাহরাম আত্মীয়া ছিলেন। তবে আলিমগণের মধ্যে বিয়ে হারাম হওয়ার কারণ নিয়ে মতভেদ আছে। ইমাম নববী রাহ. বলেছেন, "উম্মু সুলাইম এবং তাঁর বোন উম্মু হারাম নবীজির খালা ছিলেন। তারা রক্তসম্পর্কের কারণে অথবা রাদ্দার (শিশু অবস্থায় দুগ্ধপানের) কারণে নবীজির মাহরাম ছিলেন।" আন নববী, শারহ সাহীহ মুসলিম, খণ্ড ১৩।