📄 ফের মসজিদে
উম্মুল মুমিনীনদের সবার সাথে সাক্ষাৎ শেষে নবীজি আবার মসজিদে ফিরে আসতেন। মসজিদে প্রবেশ করে তিনি দুই রাকাত নফল সালাত আদায় করতেন। নবীজী সাধারণত 'মুহাজিরীন স্তম্ভ' নামক একটি স্তম্ভের পাশে দাঁড়িয়ে এই দুই রাকাত সালাত আদায় করতেন। এই স্তম্ভটির অবস্থান ছিল বরকতময় 'রিয়াযুল জান্নাহ' এর মধ্যবর্তী স্থানে। নফল সালাতের জন্য নবীজি প্রায়ই এ জায়গাটি পছন্দ করতেন।
তারপর তিনি 'রিয়াযুল জান্নাহ' নামক স্থানে বসতেন। তাঁর পিঠ থাকত আয়িশা রা. এর কক্ষের দিকে। সাহাবীগণ তখন প্রিয় নবীর চারপাশে জমায়েত হতেন। নবীজি এই সময়টাতে সাহাবীদের নিয়ে নিয়মিত বসতেন, তা সবার জানা ছিল। তাই কারও যদি নবীজির সাথে কোনো প্রয়োজন থাকত তবে তারা এই সময়ে মসজিদে এসে প্রিয় নবীর সাথে দেখা করতেন।
সাত-সকালের এ মজলিসে সাহাবীদের সংখ্যা কখনো কম আবার কখনো বেশি হতো। যখন সংখ্যা অল্প থাকত তখন তারা গোল হয়ে নবীজিকে ঘিরে বসতেন। আর সংখ্যায় বেশি থাকলে সাহাবীগণ নবীজিকে মাঝখানে রেখে ডানে ও বামে দুই কাতার করে বসতেন। ফলস্বরূপ কেউ যদি রাসূলের কাছে কোনো প্রয়োজনে আসতে চাইত বা কারও কোনো প্রশ্ন থাকত, তাহলে সে সহজেই রাসূলের নিকটে যেতে পারত। এ রকমই ছিল আমাদের প্রিয় নবীর বরকতময় মজলিস।
এ সময়টাতে রাসূল সাহাবীদের সাথে কথা বলতেন। লোকদের মধ্যে রাসূল ছিলেন সবচেয়ে বেশি বাগ্মিতার অধিকারী-সুবক্তা। সবাই তাঁর কথা শুনতে ভালোবাসত। নবীজির কথা বলার ধরন ছিল অত্যন্ত সুন্দর; না তিনি অতি দ্রুত কথা বলতেন, আর না তিনি অতি ধীরে কথা বলতেন-বরং তিনি প্রত্যেকটি শব্দ পরিষ্কারভাবে উচ্চারণ করতেন। তাই কেউ যদি গুনতে চাইত যে কোন কথা রাসূল ﷺ কয়বার বললেন, সে তা অনায়াসেই গুনতে পারত। আয়িশা রা. বলেন, "তোমরা যেভাবে কথা বলো, আল্লাহর রাসূল সেভাবে কথা বলতেন না। তিনি স্পষ্টভাবে কথা বলতেন। যাতে করে তাঁর কাছে বসে কথা শুনছেন এমন প্রত্যেকেই কথাগুলো মুখস্থ করে নিতে পারে।”
রাসূল ﷺ শুধু নিজেই কথা বলতেন না, প্রায়ই সাহাবীদের সাথে কথোপকথন করতেন। কখনো তিনি সাহাবীদের প্রশ্ন করতেন যাতে সাহাবীগণ উত্তর জানার ব্যাপারে আগ্রহ বোধ করেন।
একবার তিনি বললেন, "আমি কি তোমাদের বলব সবচেয়ে বড় গুনাহ কী?”
সাহাবীগণ বললেন, “দয়া করে আমাদের বলে দিন, হে আল্লাহর রাসূল!”
তখন রাসূল জবাব দিলেন, “আল্লাহর সাথে শরীক করা, মাতাপিতার অবাধ্য হওয়া এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া।”
আবার কখনো-বা রাসূল ﷺ সাহাবীদের কাছে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করতেন যাতে আরও গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যাপারে সাহাবীদের মনোযোগ আকর্ষণ করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রশ্ন করলেন, "তোমরা কী জানো, কে দেউলিয়া?”
সাহাবীগণ বললেন, “দেউলিয়া হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যার কোনো অর্থ বা সম্পত্তি নেই।”
তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, "আমার উম্মতের মধ্যে সে ব্যক্তি প্রকৃত দেউলিয়া, যে কিয়ামতের দিন সালাত, সাওম ও যাকাতের সওয়াব নিয়ে আসবে; অথচ (সে দুনিয়াতে) কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, অমুকের সম্পদ ভোগ করেছে, অমুককে হত্যা করেছে ও আরেকজনকে প্রহার করেছে। এরপর তার নেক আমলগুলো বদলা হিসেবে ওই লোকদের দিয়ে দেওয়া হবে। পাওনাদারদের হক পরিশোধের আগেই তার নেক আমল নিঃশেষ হয়ে গেলে তাদের পাপের একাংশ তাদের কাছ থেকে নিয়ে ওই ব্যক্তিকে দিয়ে দেওয়া হবে। পরিশেষে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।”
মাঝে মাঝে রাসূল সাহাবীদের প্রশ্ন করতেন, যাতে করে সাহাবীগণ উত্তরের ব্যাপারে গভীরভাবে চিন্তা করেন। একবার রাসূল সাহাবীদের প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা বলো তো কোন সে গাছ, যার প্রকৃতি মুসলিমদের মতো। সে তার পাতা কখনো বিসর্জন দেয় না আর সারাবছরই ফল প্রদান করে।”
সাহাবীগণ বিভিন্ন স্থানে জন্মানো নানা প্রজাতির গাছের নাম বললেন। কিন্তু প্রত্যেকবার রাসূল তাদের উত্তরকে নাকচ করে দিলেন। সেখানে যে দশ জন সাহাবী উপস্থিত ছিলেন তাদের মধ্যে বয়সের দিক থেকে সবার ছোট ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনু উমর রা.। তিনি ভাবলেন এর উত্তর হবে খেজুর গাছ। কিন্তু আশেপাশে তাকিয়ে তিনি আবু বকর আর নিজ পিতা উমরের মতো সাহাবীদের দেখে উত্তর দেয়ার সাহস পেলেন না। পরে রাসূলই বলে দিলেন, এটি হচ্ছে খেজুর গাছ।
রাসূল মাঝে মাঝে নিজের বক্তব্যের কিছু অংশ তিনবার বলতেন। তিনি এটি করতেন কোনো কথার গুরুত্ব বোঝাতে অথবা নিশ্চিত হতে যে, সবাই কথাটি বুঝতে পেরেছে। তিনি গুরুত্ব বোঝাতে তিনবারের বেশি একই কথার পুনরাবৃত্তি করেছেন এমন নজিরও আছে। উদাহরণস্বরূপ তিনি একবার কবিরা গুনাহ সম্পর্কে বলছিলেন। তখন বললেন, “আর ইচ্ছা করে মিথ্যা বলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য করাও (কবিরা গুনাহ)।” তিনি এ কথাটি এত বেশিবার পুনরাবৃত্তি করছিলেন যে উপস্থিত সবাই কামনা করছিল তিনি যাতে থামেন। সবাই বুঝতে পারছিল যে রাসূল অত্যন্ত কঠোরভাবে এ কাজগুলো করতে নিষেধ করছেন।
রাসূল মাঝে মাঝে সাহাবীদের হঠাৎ করে প্রশ্ন করতেন এবং সেই প্রশ্নের উত্তর থেকে এমন সিদ্ধান্তের দিকে ধাবিত হতেন, যা সাহাবীদের কল্পনাতেই থাকত না। দৃষ্টান্তস্বরূপ, রাসূল একবার সাহাবীদের প্রশ্ন করলেন, “আজ কে কে সিয়াম (রোযা) পালন করছ?” সাহাবীগণ তো এমন প্রশ্নের জন্য সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত ছিলেন। যদি তারা জানতেন আজই রাসূল এ প্রশ্ন করবেন, তবে হয়তো তাদের প্রত্যেকেই সেদিন রোযা রাখতেন। তাই তারা সবাই চুপ থাকলেন। আবু বকর রা. শুধু জবাব দিলেন যে, তিনি রোযা আছেন।
রাসূল ﷺ আবার প্রশ্ন করলেন, “তোমাদের মধ্যে কে কে আজ অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গিয়েছে?”
এবারও শুধু আবু বকর রা.-ই ইতিবাচক জবাব দিলেন। রাসূল ﷺ এবার আরেকটি প্রশ্ন করলেন, "তোমাদের মধ্যে কে আজ জানাযায় অংশগ্রহণ করেছ?”
আবু বকর ছাড়া এবারও সবাই চুপ থাকল। রাসূল ﷺ পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, "আজ কারা একজন দরিদ্র লোককে আহার করিয়েছ?”
উপস্থিত সবাই নীরব থাকলেন, কিন্তু আবু বকর জবাব দিলেন যে, তিনি আহার করিয়েছেন। তখন রাসূল ﷺ বললেন, "যদি একজন ব্যক্তি এ চারটি কাজ একই দিনে করে, তাহলে সে নিশ্চিতভাবে জান্নাতী।”
নবীজি ﷺ মাঝে মাঝে প্রতীকীভাবে কথা বলে কোনো বিষয়কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করতেন। একবার নবীজি মানুষের অন্তর থেকে ঈমান ও আমানতদারী উঠে যাবার ব্যাপারে কথা বলছিলেন। তিনি ﷺ বলেন, “একজন মানুষ হয়তো ঘুমোবে আর তখন তার অন্তর হতে আমানত তুলে নেয়া হবে। ফলে তার চিহ্ন থেকে যাবে একটি বিন্দুর মতো। এরপর আবার যখন সে ঘুমোবে তখন তার অন্তর থেকে আমানত তুলে নেয়া হবে। ফলে তার চিহ্ন ফোসকার মতো থেকে যাবে। যেমন একটি জ্বলন্ত অঙ্গারকে যদি তুমি তোমার পায়ে ওপরে রেখে দাও এতে পায়ে ফোসকা পড়ে যাবে এবং তুমি তা ফোলা দেখতে পাবে। অথচ তাতে (পুঁজ-পানি ব্যতীত) কিছু নেই। এ সময় মানুষ বেচাকেনা করবে ঠিকই, কিন্তু কেউ আমানত আদায় করবে না। (আমানতদার ব্যক্তি এত কমে যাবে যে,) বলা হবে, অমুক বংশে একজন আমানতদার আছেন। কাউকে বলা হবে সে কতই-না বাহাদুর, কতই-না হুঁশিয়ার আর বুদ্ধিমান; অথচ তার অন্তরে দানা-পরিমাণ ঈমানও নেই।”
মাঝে মাঝে নবীজি ﷺ কোনো চিহ্ন এঁকে সাহাবীদের তা দেখিয়ে কোনো বিষয় বিস্তারিত ব্যাখ্যা করতেন। একদিন নবীজি একটি চতুর্ভুজ আঁকলেন এবং এর মাঝখানে একটি রেখা টানলেন, যেটি চতুর্ভুজের বাইরে চলে গেল। তারপর দু-পাশ দিয়ে মাঝের রেখার সাথে ভেতরের দিকে কয়েকটা ছোট ছোট রেখা মেলালেন এবং সাহাবীদের জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কী জানো, এটা কী?”
সাহাবীগণ জবাব দিলেন, “আল্লাহ আর তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।”
তখন নবীজি বললেন, "এ মাঝামাঝি রেখাটা হলো মানুষ। আর ছোট ছোট রেখাগুলো নানারকম বিপদাপদ। এসব বিপদাপদ প্রত্যেক দিক থেকে তার নিকটে আসে। যদি সে এর একটাকে এড়িয়ে যায়, তবে অন্যটা তাকে আক্রমণ করে। আর অন্যটাকেও যদি এড়িয়ে যায়, তবে পরবর্তী অন্য একটি তাকে আক্রমণ করে। আর চতুর্ভুজটি হলো তার মৃত্যু; যা তাকে ঘিরে রেখেছে এবং একসময় তাকে ধরে ফেলবে। আর বাইরের দিকে বর্ধিত রেখাটি হলো তার আশা-আকাঙ্ক্ষা। সে এমন-সব জিনিসের আকাঙ্ক্ষা করে, যা তার জীবনের সীমাকে ছাড়িয়ে যায়; অথচ এর আগেই মৃত্যু এসে তাকে ধরে ফেলে।”
তারবিয়াত আর তাসাওউফের এ মজলিসগুলো ছিল সাহাবীদের জন্য শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের সময়। নবীজি শুধু নিজে বক্তৃতা দিয়ে একপেশোভাবে শিক্ষা দিতেন না; বরং তিনি দ্বিপাক্ষিক কথোপকথনে বেশি আগ্রহী ছিলেন। এতে শিক্ষার্থী সাহাবীগণও অংশ নিতে পারতেন। এই সময়টা ছিল প্রাণবন্ত এক অধিবেশন। আলোচনায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সাহাবীগণ তারবিয়াত লাভ করতেন ও নিজেদের আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতি সাধন করতে পারতেন।
এই অধিবেশনের আরেকটি উদ্দীপক বিষয় ছিল ঘন ঘন ইস্তেগফার পাঠ। সাহাবীগণ লক্ষ করতেন যে, তাদের প্রিয় রাসূল ক্রমাগত ইসতেগফার পাঠের মাধ্যমে মহান রবের দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। তারা কখনো কখনো গুনেও রাখতেন যে, একই অধিবেশনে রাসূল এক শ বার ইস্তেগফার পাঠ করেছেন। একবার তিনি এই দুআটি এক শ বার পাঠ করেন:
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
“হে আমার রব, আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার তাওবাহ কবুল করুন। আপনিই একমাত্র সত্তা, যিনি তাওবা কবুলকারী ও দয়াময়।"
সকালে নবীজি যখন মসজিদে অবস্থান করতেন, তখন ছোট শিশুদের তাঁর কাছে নিয়ে আসা হতো। তিনি তাদের জন্য দুআ করতেন। মাঝে মাঝে তিনি একটি খেজুর মুখে নিয়ে নরম করে তারপর শিশুদের মুখে দিতেন। এতে করে শিশুরাও খেজুরের সাথে লেগে থাকা নবীজি-এর বরকতময় থুতু মোবারকের সামান্য অংশ লাভ করত। তিনি মাঝে মাঝে শিশুদের নাম রেখে দিতেন এবং তাদের দুয়া করতেন।
একবার আবু উসায়েদ মালিক ইবনু রাবিয়াহ আল সাঈদী রা. নিজের নবজাতক শিশুকে এনে নবীজি-এর কোলে দিলেন। শিশুটি নবীজির কোলে ছিল আর আবু উসায়েদ রা. নবীজির পাশে বসে ছিলেন। তারপর নবীজি অন্য কাজে মনোযোগী হয়ে পড়লেন। আবু উসায়েদ ইশারা দিয়ে নিজের পরিবারের কাউকে দিয়ে বাচ্চাটিকে বাসায় পাঠিয়ে দিলেন। নবীজির হঠাৎ খেয়াল হলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, শিশুটি কোথায়? আবু উসায়েদ তখন বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমরা তাকে বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছি।”
নবীজি শিশুটির নাম জিজ্ঞেস করলেন। আবু উসায়েদ নাম জানালে নবীজি বললেন, “না, তাকে এই নামে ডাকবে না। তাকে আল-মুনযির নামে ডাকবে।” আবু উসায়েদ তারপর থেকে সেই সন্তানকে আল মুনযির নামেই ডাকতেন।
খেজুর ছিল মদীনার প্রধান ফল। মদীনাবাসীর প্রধান খাদ্যও ছিল খেজুর। তাই বছরে প্রথম যখন খেজুর পাকতে শুরু করত তা দেখে মদীনাবাসী খুবই প্রীত হতো। তারা সেই পাকা খেজুর নবীজি -এর জন্যই প্রথমে নিয়ে আসত। নবীজি তা নেওয়ার পর এই বলে দুআ করতেন :
اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي ثَمَرِنَا، وَبَارِكْ لَنَا فِي مَدِينَتِنَا، وَبَارِكْ لَنَا فِي صَاعِنَا، وَبَارِكْ لَنَا فِي مُدَّنَا، اللَّهُمَّ إِنَّ إِبْرَاهِيمَ عَبْدُكَ وَخَلِيلُكَ وَنَبِيُّكَ، وَإِنِّي عَبْدُكَ وَنَبِيُّكَ، وَإِنَّهُ دَعَاكَ لِمَكَّةَ، وَإِنِّي أَدْعُوكَ لِلْمَدِينَةِ بِمِثْلِ مَا دَعَاكَ لِمَكَّةَ، وَمِثْلِهِ مَعَهُ
অর্থ: “হে আল্লাহ, আপনি আমাদের ফল-ফলাদিতে বরকত দিন, আমাদের শহরে বরকত দিন, আমাদের সা তথা বড় পরিমাপক পাত্রে বরকত দিন, আমাদের মুদ্দ তথা ছোট পরিমাপক পাত্রে বরকত দিন। হে আমার রব, ইবরাহীম (আ.) ছিলেন আপনার বান্দা, বন্ধু ও নবী। আর আমিও আপনার বান্দা ও নবী। ইবরাহীম (আ.) আপনার কাছে মক্কা নগরীর জন্যে (সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার) দুআ করেছিলেন। আর আমি আপনার নিকট এই মদীনা নগরীর জন্য দুআ করছি। সেই দুআই যা, ইবরাহীম (আ.) মক্কা নগরীর ব্যাপারে করেছিলেন এবং তার দ্বিগুণ।”
তারপর নবীজি ﷺ সেখানে উপস্থিত হয়ে সবচেয়ে ছোট বাচ্চাকে ডাকতেন আর তার হাতে ফলটি দিতেন।
নবীজি ﷺ-এর মাহফিলে মাঝে মাঝে হাস্যরসিকতাও হতো। নবীজি রাশভারী ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন এবং সাহাবীগণ নবীজিকে অত্যন্ত সম্মান করতেন, আদব বজায় রাখতেন। কিন্তু তা সাহাবীদেরকে তাদের প্রিয় নবীজির সাথে স্বতঃস্ফূর্ত আন্তরিক ব্যবহার ও কথাবার্তা বলায় বাধা দিত না।
একদিন নবীজি সাহাবীদের সাথে কথা বলছিলেন এবং একজন বেদুইনও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। নবীজি ﷺ বলছিলেন, "জান্নাতবাসীদের কোনো একজন তার রবের কাছে চাষাবাদের অনুমতি চাইবে। তখন আল্লাহ তাআলা তাকে বলবেন, তুমি কি যা চাও, তা পাচ্ছ না?"
সে বলবে, “হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। কিন্তু আমার চাষ করার খুবই আগ্রহ।”
তারপর সে বীজ বুনবে এবং তার চারা জন্ম নেওয়া, গাছ বড় হওয়া ও ফসল কাটা সবকিছু পলকের মধ্যে হয়ে যাবে। আর তা (ফসল) হবে পাহাড়-সমান। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, “হে আদমসন্তান, এগুলো নিয়ে নাও। কোনো কিছুই তোমাকে তৃপ্তি দেয় না।"
নবীজির কথা শেষ হলে বেদুইন লোকটি বলে উঠল, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আল্লাহর কসম, এই ধরনের লোক আপনি কুরায়শী বা আনসারদের মধ্যেই পাবেন। কেননা, তারা চাষাবাদ পছন্দ করে। আর আমরা বেদুইনদের চাষাবাদের সাথে কোনো সম্পর্কই নেই।” এ কথা শুনে উপস্থিত সকল সাহাবীগণ এমনকি নবীজিও হেঁসে ফেললেন।
বিভিন্ন স্থান থেকে আগত প্রতিনিধিদলও সকালের এই সময়ে রাসূল ﷺ-এর সাথে দেখা করতে আসত। সফরকারী প্রতিনিধিদল সাধারণত রাতে মদীনার বাইরে অবস্থান করে সকালে শহরে প্রবেশ করে রাসূলের সাথে দেখা করতে মসজিদে আগমন করত। রাসূল তখন মসজিদেই সাহাবীদের সাথে অবস্থান করতেন। একবার মুদার গোত্র থেকে আগত একদল প্রতিনিধি নবীজি -এর সাথে দেখা করতে আসল। তখন দুপুর হয়ে গেছে। রাসূল তাদের দেখেই বুঝতে পারলেন যে, তারা দুর্বিষহ দারিদ্র্যের মাঝে দিনাতিপাত করছে। রাসূল-এর চেহারা অন্ধকার হয়ে গেল। যোহরের সালাত পড়ানোর পর তিনি সাহাবীদের সাদাকা প্রদানের জন্য উৎসাহ প্রদান করলেন। ফলে মুহূর্তের মধ্যেই তাঁর সামনে দুই স্তূপ কাপড় ও খাবার জমা হলো। পরে তিনি সেগুলো তাদের দিয়ে দিলেন।
আরেকবার আরবের পূর্বাঞ্চল থেকে আলহাসা নামক স্থানের আব্দুল কায়েসের গোত্র থেকে একদল প্রতিনিধি আসল। রাসূল তাদের স্বাগত জানিয়ে বললেন, “এই প্রতিনিধিদলকে অভিবাদন! না তোমরা কখনো অপমানিত হবে, আর না কখনো অনুশোচনা বোধ করবে।”
সম্ভবত সকালের এই বরকতময় সময়েই ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.) মানুষের বেশে রাসূল-এর সাথে সাক্ষাতে এসেছিলেন। সবাই তখন খুব অবাক হচ্ছিলেন। কারণ, উপস্থিত কেউ সেই মানুষটিকে চিনত না। উপরন্তু, তাঁর কাপড় ছিল অতিরিক্ত সাদা ও চুল ছিল অতিরিক্ত কালো। ভ্রমণের কোনো ক্লান্তি তাকে স্পর্শ করেনি। তিনি নবীজি -কে ইসলাম, ঈমান, ইহসান ও কেয়ামতের লক্ষণের ব্যাপারে প্রশ্ন করেন।
সম্ভবত এমন কোনো এক সকালেই দ্বিমাম ইবনু সালাবাহ রা. এসেছিলেন নবীজি -এর সাথে দেখা করতে। তিনি মসজিদের সামনে তার উটকে বসালেন আর উপস্থিত সবাইকে প্রশ্ন করলেন, "তোমাদের মধ্যে ইবনু আব্দুল মুত্তালিব কে?”
নবীজি জবাব দিলেন, “এই যে আমি।”
দ্বিমাম রা. বললেন, "আমি আপনাকে প্রশ্ন করতে চাই আর আমি শক্ত প্রকৃতির হব। তাই আমার কথাকে রূঢ়ভাবে নেবেন না।"
নবীজি বললেন, “তোমার যা-ই প্রশ্ন আছে, তা তুমি করতে পার।”
দ্বিমাম রা. বললেন, "আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করছি সেই প্রভুর নামে, যিনি আপনার রব এবং আপনার পূর্বে যারা এসেছিলেন তাদের সবারও রব, আপনাকে কি আল্লাহ সমগ্র মানবজাতির জন্য রাসূল বানিয়ে পাঠিয়েছেন?”
নবীজি জবাব দিলেন, “আল্লাহর কসম! তিনিই আমাকে পাঠিয়েছেন।”
তারপর তিনি নবীজিকে ইসলামের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন আর নবীজিও জবাব দিলেন। তারপর তিনি বললেন, "সেই আল্লাহর শপথ, যিনি আপনাকে সত্যের বার্তা দিয়ে পাঠিয়েছেন, আমি এগুলোর সাথে না নতুন কিছু অতিরিক্ত যোগ করব, না এগুলোর কিছু ছেড়ে দেব।”
দ্বিমাম ইবনু সালাবাহ রা. চলে গেলে নবীজি বললেন, “লোকটি উপকারী জ্ঞান শিক্ষালাভ করেছে। সে যদি তার কথার ব্যাপারে সত্যবাদী হয়, তাহলে সে জান্নাতী হবে।"
বিশেষ সময়ে বা জরুরি মুহূর্তে সকালের এই বরকতময় সময়টা মুসলিম উম্মাহর জন্য পরামর্শসভায় রূপ নিত। তখন সবাই ঘটমান বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতেন। উহুদ যুদ্ধের পূর্বে আক্রমণকারী কাফির বাহিনীকে কীভাবে মোকাবিলা করা হবে সে ব্যাপারে পরামর্শসভা এমন সময়েই হয়েছিল। কাফির ও ইহুদীদের সম্মিলিত বাহিনীর আক্রমণ থেকে মদীনা শহরকে প্রতিরক্ষা করার জন্য খন্দক খননের পরিকল্পনা এই সময়টাতেই নেয়া হয়েছিল। এ ছাড়া নানা সময়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলির প্রেক্ষাপটে নবীজি এ সময়টাতেই সাহাবীদের সাথে মাশোয়ারা (পরামর্শ) করতেন।
আর কোনো নেতারই এত বেশি মাশোয়ারা করার নজির নেই, যতটুকু মাশোয়ারা উম্মাহর বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে নবীজি সাহাবীদের সাথে করতেন। তিনি আল্লাহর আদেশ মেনেই এই মাশোয়ারা করতেন। আল্লাহ বলেন :
وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
"... এবং কাজকর্মের ব্যাপারে তাদের সাথে পরামর্শ করো। অতঃপর যখন তুমি সংকল্প করে নেবে, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ভরসাকারীদের পছন্দ করেন।”
সাহাবীদের অনেকে পালাক্রমে এই অধিবেশনে নবীজি-এর সাথে অংশ নিতেন। উমর ইবনুল খাত্তাব রা. থেকে বর্ণিত, "আমার একজন আনসারী প্রতিবেশী ছিলেন, যিনি মদীনার উঁচু এলাকায় বাস করতেন। আমরা পালাবদল করে করে নবীজির হালাকায় (আলোচনা সভা) অংশ নিতাম। একদিন তিনি যেতেন আর আরেকদিন আমি যেতাম। যেদিন আমি যেতাম সেদিন যা ঘটেছে তার সব আমি (ফিরে এসে) তার কাছে বর্ণনা করতাম এবং কুরআনের কোনো অংশ নাযিল হলে তাও বলতাম। যেদিন তিনি যেতেন, (ফিরে এসে) তিনিও একইভাবে (আমার কাছে বর্ণনা) করতেন।”
নবীজি ﷺ এসব হালাকাতে সাহাবীদের সাথে এমনভাবে বসতেন যেন তিনিও তাদেরই একজন। নবীজিকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার কোনো উপায় ছিল না। যখন কোনো অপরিচিত আগন্তুক আসত, সে চিনতে পারত না নবীজি আসলে কোনজন। হয়তো সে প্রশ্নও করত, “তোমাদের মধ্যে মুহাম্মাদ কে?”। সাহাবীরা নবীজির উজ্জ্বল চেহারার বর্ণনা দিয়েই তাকে পরিচয় করিয়ে দিতেন। তারা বলতেন, "আমাদের মাঝে বসে থাকা উজ্জ্বল চেহারাবিশিষ্ট ব্যক্তিটিই হলেন মুহাম্মাদ ﷺ।”
এসব বিষয় লক্ষ করে শেষতক সাহাবীরা নবী ﷺ-কে পরামর্শ দিলেন যে, তারা নবীজির জন্য কাদামাটি দিয়ে একটি নিচু আসন বানিয়ে দিতে চান, যাতে করে অপরিচিত কেউ আসলে সহজেই নবীজিকে চিনতে পারেন। নবীজি এতে সম্মতি দিলেন। এই ঘটনাটি অবশ্য নবীজির বরকতময় জীবনের শেষদিকের ঘটনা, হিজরী নবম সালের দিকে। সে বছর দলে দলে প্রতিনিধি মদীনায় আসছিল বলে ওই বছরকে 'প্রতিনিধিদলের বছর' বলা হয়।
নিজের মুচকি হাসি আর মনোযোগ নবীজি ﷺ যেন সকল সাহাবীদের মাঝে ভাগ করে দিতেন। যখন তারা নববী মজলিস থেকে ফিরে আসতেন, প্রত্যেক সাহাবীই মনে করতেন, তিনিই বুঝি নবীজির সবচেয়ে প্রিয় সাহাবী।
মাঝে মাঝে নবীজি ﷺ যখন সাহাবীদের সাথে উপবিষ্ট থাকতেন, তখন কেউ এসে নবীজিকে খাবার হাদিয়া দিত। তিনি সাহাবীদের সাথে তা ভাগ করে খেতেন। সামুরাহ ইবনু জুন্দুব রা. থেকে বর্ণিত, “আমরা একবার নবীজির সাথে ছিলাম। তখন নবীজির জন্য এক ট্রেতে করে কিছু ছারিদ নিয়ে আসা হলো। নবীজি ﷺ তা খেলেন। লোকেরাও সেখান থেকে তা খেল। দুপুর হওয়া পর্যন্ত একদলের পরে আরেক দল এসে তা খেতেই থাকল।"
বর্ণনাকারীকে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, “পাত্রতে যে খাবার ছিল, তা শেষ হয়ে গেলে কি কেউ আবার তা পূর্ণ করে দিচ্ছিল?”
তিনি জবাব দিলেন, “দুনিয়া থেকে তো কেউ দিচ্ছিল না। যদি কেউ পূর্ণ করে দিতে থাকেন, তবে তা আকাশ থেকেই হচ্ছিল।”
একবার নবীজি -কে একটি ভেড়া হাদিয়া দেয়া হলো। মদীনায় তখন খুব অভাব অনটন চলছিল। তিনি তাঁর পরিবারকে বললেন, "এই ভেড়াটি (রান্না করে) প্রস্তুত করো। এই রুটিগুলো নাও। ছোট ছোট টুকরো করো এবং এগুলো হতে ছারিদ প্রস্তুত করো।" নবীজির একটি বিশাল ট্রে ছিল যার নাম ছিল আলঘাররা। এটি বহন করতে ছয় জন মানুষ লাগত। সকালে যখন নবীজি এবং সাহাবীগণ সালাতুদ-দ্বোহা এর নফল সালাত আদায় করছিলেন, তখন ট্রেতে খাদ্য প্রস্তুত করে নবীজির সামনে নিয়ে আসা হলো। সবাই নবীজির আশেপাশে জড়ো হয়ে গেল। অনেক বেশি লোকসমাগম হওয়ায় নবীজি হাঁটু গেড়ে বসলেন। এক বেদুইন বলে বসল, “এটা কী ধরনের বসা!”
নবীজি বললেন, “আল্লাহ তাআলা আমাকে নিজের অতিথিপরায়ণ দাস হিসেবে বানিয়েছেন। তিনি আমাকে একগুঁয়ে ও স্বৈরাচারী বানাননি। এক প্রান্ত থেকে খাওয়া শুরু করো আর মাঝের অংশ রেখে দাও, এতে বরকত হবে।”
তারপর নবীজি আরও বললেন, "এখান থেকে নাও আর খাও। যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ তার শপথ, পারস্য আর বাইজান্টাইন এলাকা তোমাদের হাতে বিজিত হবে। তোমরা খাদ্যে এমন প্রাচুর্য লাভ করবে যে, মানুষ খাদ্য গ্রহণের পূর্বে আল্লাহর নাম নিতে ভুলে যাবে।”
অবস্থা, পরিবেশ আর পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে সকালের এই অধিবেশনটি কখনো দীর্ঘ আবার কখনো সংক্ষিপ্ত হতো। সকালের শেষদিকে নবীজি উঠে পড়তেন। বৈঠক শেষ হয়ে গেলে তিনি এই দুআটি করতেন,
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ
অর্থ : হে আল্লাহ, আমি আপনার প্রশংসা সহকারে আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করি। আমি সাক্ষ্য দিই যে, আপনি ছাড়া হক কোনো ইলাহ নেই। আমি আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং আপনার নিকট তওবা করি।
একবার কেউ জিজ্ঞেস করল, “আপনাকে তো আগে কখনো এ কথাগুলো বলতে শুনলাম না।"
নবীজি জবাবে বললেন, “এই কথাগুলো মজলিসে কোনো ভুল হয়ে গেলে তার কাফফারা নিশ্চিত করে।”
আয়িশা রা. একবার নবীজিকে প্রশ্ন করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি লক্ষ করেছি, আপনি বৈঠক অথবা তিলাওয়াত কিংবা সালাত শেষে এই দুআটি পাঠ করেন। কেন?” নবীজি জবাবে বললেন, “যে ব্যক্তি ভালো কথা বলল, তার উত্তম চরিত্রের ব্যাপারে এই কথাগুলো কেয়ামত পর্যন্ত সিলমোহর হয়ে রইবে। আর যে কোনো মন্দ কথা বলল, এই দুআ তার মন্দ কথাগুলো মুছে ফেলবে।”
খুব অল্প সময়ই এমন হয়েছে যে নবীজি সাহাবীদের বৈঠক শেষে উঠছেন আর নিম্নোক্ত দুআটি করেননি :
اللَّهُمَّ اقْسِمْ لَنَا مِنْ خَشْيَتِكَ مَا يَحُولُ بَيْنَنَا وَبَيْنَ مَعَاصِيكَ ، وَمِنْ طَاعَتِكَ مَا تُبَلِّغُنَا بِهِ جَنَّتَكَ ، وَمِنْ الْيَقِينِ مَا تُهَوِّنُ بِهِ عَلَيْنَا مُصِيبَاتِ الدُّنْيَا ، وَمَتِّعْنَا بِأَسْمَاعِنَا وَأَبْصَارِنَا وَقُوَّتِنَا مَا أَحْيَيْتَنَا وَاجْعَلْهُ الْوَارِثَ مِنَّا ، وَاجْعَلْ ثَأْرَنَا عَلَى مَنْ ظَلَمَنَا ، وَانْصُرْنَا عَلَى مَنْ عَادَانَا ، وَلَا تَجْعَلْ مُصِيبَتَنَا فِي دِينِنَا ، وَلَا تَجْعَلِ الدُّنْيَا أَكْبَرَ هَمِّنَا وَلَا مَبْلَغَ عِلْمِنَا ، وَلَا تُسَلِّطْ عَلَيْنَا مَنْ لَا يَرْحَمُنَا
অর্থ: হে আল্লাহ, আপনাকে ভয় করার সক্ষমতা আমাকে দান করুন, যা আপনার অবাধ্য হওয়া থেকে আমাকে আটকে রাখবে। আপনার বাধ্যগত হওয়ার সক্ষমতা দান করুন, যা আমাকে জান্নাতে পৌঁছে দেবে। আপনার বিশ্বাস থেকে আমাকে এ পরিমাণ অংশ দান করুন, যা আমার দুনিয়াবি বিপদাপদকে সহজ করে দেবে। আমার চোখ, আমার কান, আমার দৈহিক শক্তি ততদিন পর্যন্ত কর্মক্ষম রাখুন; যতদিন আমাকে জীবিত রাখবেন। পরেও এগুলোর উপকারিতা আমার জন্য অবশিষ্ট রাখুন। যারা আমার ওপর জুলুম করে আপনি তাদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করুন। আমার শত্রুর বিরুদ্ধে আমাকে বিজয় দান করুন। আমার দ্বীন পালনকে আমার জন্য বিপৎসংকুল করবেন না। দুনিয়াকে আমার জীবনের প্রধান লক্ষ্য এবং আমার জ্ঞানের শেষ বানাবেন না। আর আমাদের ওপর কোনো নিষ্ঠুর ব্যক্তিকে ক্ষমতাবান বানাবেন না।
তারপর সাহাবীগণ চলে যেতেন। কেউ জীবিকা নির্বাহের কাজে বেরিয়ে পড়তেন আর কেউ-বা কায়লুলার জন্য বাসায় রওনা দিতেন। নবীজি ﷺ হয়তো তখন কায়লুলার জন্য বাসায় যেতেন, নতুবা মদীনার রাস্তায় হাঁটতে বের হতেন। আবার কখনো কারও দাওয়াত রক্ষার্থে চলে যেতেন। কখনো-বা রোগী দেখতে বা অন্য কাজে রওনা হতেন।
টিকাঃ
৩৭. মুহাজির সেসব সাহাবীদের বলা হয়, যারা মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন। 'মুহাজিরীন স্তম্ভ' রিয়াযুল জান্নাহ নামক স্থানে অবস্থিত। আর রিয়াযুল জান্নাহ হচ্ছে নবীজির মসজিদে অবস্থিত তার গৃহ ও খুতবা দেয়ার স্থানের মাঝের জায়গাটুকু। রিয়াযুল জান্নাহকে নবীজি বেহেশতের বাগানের অংশ বলে অভিহিত করেছেন। এটি আর-রাওদাহ নামেও পরিচিত।
৩৮. মুসনাদ আহমদ: ২০৩৯৪; তিরমিযী: ১৯০১
৩৯. মুসনাদ আহমদ: ৮০২৯; তিরমিযী: ২৪১৮
৪০. মুসনাদ আহমদ: ৪৫৯৯; তিরমিযী: ২৮৬৭
৪১. ফাযাইলুস সাহাবাহ, আহমদ: ৬৬০০; আল-আদাবুল মুফরাদ: ৫১৫
৪২. হাদীসে আমানত বলতে ঈমানকে বুঝানো হয়েছে। সূরা আহযাবের ৭২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঈমানকে আমানত বলে উল্লেখ করেছেন। হাদীসে মানুষের অন্তরে ঈমান দুর্বল হয়ে যাওয়ার দিকে ইঙ্গিত করা হচ্ছে।
৪৩. সহীহ বুখারী: ৭০৮৬
৪৪. ইবনু মাজাহ: ৩৮১৪
৪৫. সহীহ বুখারী: ৬১৯১; আল-মুজামুল কাবীর: ৫৭৯৩
৪৬. সহীহ মুসলিম: ১৩৭৩
৪৭. মুসনাদ আহমদ: ১০৬৪২
৪৮. সূরা আল-ইমরান, ৩:১৫৯
৪৯. ছারিদ হচ্ছে আরবদের প্রধান খাদ্য, যা তারা রান্না করত। এটির প্রধান উপকরণ ছিল রুটি আর মাংস।
৫০. মুসনাদ আহমদ: ১০৪১৫; তিরমিযী: ৩৪৩৩
৫১. তিরমিযী: ৩৫০২
৫২. দুপুরে সামান্য সময়ের জন্য বিশ্রাম নেয়াকে কায়লুলা বলে। হযরত ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করিম সা. এরশাদ করেছেন, দিনের রোজা রাখতে রাতে সেহরি খাও এবং রাতের ইবাদতে মনোযোগী হতে দিনের বেলা কায়লুলা করো। (ইবনু মাজাজ: ১৬৯৩)
📄 মদীনার পথে
নবীজি যখন হাঁটতেন তখন তাঁর হাঁটার মাঝে শক্তিমত্তা ও দৃঢ়তার ছাপ ফুটে উঠত। আজকালকার জনপ্রতিনিধিদের মতো মেকিত্ব বা হামবড়া ভাব এতে ছিল না। হাঁটার সময় তিনি এমনভাবে পা তুলতেন যে দেখে মনে হতো তিনি বুঝি মাটি থেকে কোনো জিনিস টেনে তুলছেন। যখন তিনি সামনে অগ্রসর হতেন তখন মনে হতো বুঝি তিনি কোনো ঢালু জায়গা বেয়ে নামছেন। তাঁকে দেখলেই মানুষ বুঝতে পারত তিনি কোনো দুর্বল বা অলস লোক নন। যখন তিনি কোনো দিকে ফিরতেন সমগ্র শরীরকে সেদিকে ফেরাতেন। সাহাবীগণ কখনো নবীজির সামনে আবার কখনো-বা তাঁর পাশাপাশি হাঁটতেন। কিন্তু, কখনো নবীজির পেছনে হাঁটতেন না। এমন দুজন ব্যক্তির দেখা পাওয়া যাবে না, যারা নবীজির পেছনে দাঁড়াতে পেরেছে।
এটি ছিল প্রিয়নবীর বিনয়ের চিহ্ন। অন্য নেতাদের মতো তিনি কখনো তাঁর সাথিদের আগে আগে হাঁটতেন না। তিনি তো এটা মানতেই পারতেন না যে, তাঁর সাহাবীগণ তাঁকে পেছন থেকে নতজানু হয়ে অনুসরণ করবেন। তিনি সাধারণভাবে সাহাবাগণের সাথে, তাদেরই একজন হয়ে চলাফেরা করতেন।
হাঁটার সময় তিনি হয়তো একটি লাঠি বা খেজুর গাছের শাখা ব্যবহার করতেন। তিনি কখনো ছোট লাঠি বা অর্ধ-বৃত্তাকার মাথাবিশিষ্ট লাঠি ব্যবহার করতেন। এটি আরবদের রীতি ছিল। তৎকালীন আরব সমাজে এ ধরনের লাঠির বেশ প্রয়োজন পড়ত।
চলার পথে কোনো দাস-দাসীর সাথেও যদি প্রিয়নবী-এর দেখা হয়ে যেত আর সে কোনও সাহায্যের আবেদন জানাত, তাহলে নবীজি তার প্রয়োজন পূরণ করে দিতেন। কোনো গোলামের হাত ধরে তার প্রয়োজন পূরণ করতে প্রিয়নবী কুণ্ঠাবোধ করতেন না।
কারও সাথে মোলাকাত হলেই তিনি মুচকি হাসি উপহার দিতেন। জারির বিন আব্দুল্লাহ রা. বলেন, “আল্লাহর রাসূলের সাথে যতবারই আমার দেখা হয়েছে, তিনি আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসেছেন।”
তাঁর হাসি ছিল উজ্জ্বল, স্বাগতপূর্ণ। কেউ নবীজির সাথে সাক্ষাতের সময় ভাবত খাস করে শুধু তার দিকে তাকিয়েই বুঝি নবীজি এভাবে হাসছেন। জারির রা. তো ভেবেছিলেন যে, নবীজি এ রকম বিশেষ হাসি কেবল তাকেই উপহার দেন। তিনি প্রফুল্লচিত্তে তা হাদীসেও উল্লেখ করে গেছেন। বস্তুত, নবীজি সবার দিকে তাকিয়েই এভাবে মুচকি হাসতেন। আব্দুল্লাহ ইবনু আল-হারিছ ইবনু জায রা. বলেন, “আমি এমন কাউকে দেখিনি, যিনি রাসূলুল্লাহ থেকে অধিক মুচকি হাসতেন।”
পথ চলতে ছোট ছেলেদের সাথে দেখা হয়ে গেলে তিনি তাদের সালাম জানাতেন, স্বীয় হাত দ্বারা তাদের মুখমণ্ডল মুছে দিতেন। জাবির ইবনু সামুরাহ রা. হতে বর্ণিত, “নবীজি একদিন বের হলেন। আমিও সাথে ছিলাম। কতিপয় কিশোরের সাথে মোলাকাত হলো। তিনি প্রত্যেকের গাল মুছে দিলেন। এমনকি নবীজি আমারও গাল মুছে দিলেন। আমি খেয়াল করলাম তাঁর হাত শীতল এবং সুগন্ধিযুক্ত। মনে হচ্ছিল যেন আতরের ঝুড়ি থেকে তিনি মাত্র তাঁর হাত বের করে এনেছেন। আমার যে-গাল নবীজি মুছে দিয়েছিলেন তা আমার অন্য গাল থেকে ভালো ছিল।”
নবীজি অনেক সময় আনসারদের এলাকায় তাদের দেখতে চলে যেতেন। আনসারদের ছেলেরা তখন হয়তো তাঁর কাছাকাছি চলে আসত, সাথে সাথে হাঁটত। তিনি তাদের সালাম জানাতেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন এবং তাদের জন্য দুআ করতেন।
একদিন তিনি বনু নাজ্জার গোত্রের এলাকা দিয়ে হাঁটছিলেন। আনসারদের দাসীরা তাকে অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে আসল। তারা তখন তাম্বুরা বাজিয়ে গান গাচ্ছিল :
আমরা আন-নাজ্জারের দাসী
মুহাম্মাদ সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিবেশী
নবীজি তাদের বলেন, “আল্লাহ জানেন যে, আমার হৃদয় তোমাদের ভালোবাসে। হে আমার রব, তুমি তাদের সবাইকে বরকত প্রদান করো।”
একদিন তিনি মসজিদে গিয়ে একদল মহিলাকে সেখানে বসে থাকতে দেখলেন। তখন হাতের ইশারায় প্রিয় নবী তাদের সালাম জানালেন।
সাহাবাদের সাথে দেখা হলে আল্লাহর রাসূল আগে সালাম দিতেন। তাদের সাথে মুসাফাহা করতেন ও তাদের জন্য দুআ করতেন। মুসাফাহার সময় তিনি নিজ থেকে হাত সরিয়ে নিতেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত অন্য ব্যক্তি হাত না সরাতেন। যখন কারও সাথে নবীজির দেখা ও কথা হতো, তিনি তার থেকে নিজের মুখ ফেরাতেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত ওই ব্যক্তি মুখ ফিরিয়ে নিত।
কেউ যদি আল্লাহর রাসূলের সাথে কথা বলার জন্য তাকে থামাতে চাইত, তিনি থামতেন। কোনো দাসী বা মুক্ত মহিলা থামার জন্য আবেদন জানালেও তিনি তাদের সাথে কথা বলার জন্য থামতেন। আদি বিন হাতেম রা. নবীজির সাথে তার প্রথম সাক্ষাতের কাহিনি বিস্তারিত বর্ণনা করেন: "আমি নবীজির সাথে হাঁটছিলাম। একজন মহিলা, যার সাথে একটি ছোট বাচ্চাও ছিল, সে হঠাৎ নবীজিকে ডেকে বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের আপনার সাথে কিছু কথা বলার প্রয়োজন ছিল।'
তারা একান্তে নবীজির সাথে কথা বলল। নবীজি তাদের সাথে দাঁড়িয়ে থাকলেন। তারা দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলছিল, যতক্ষণ না আমি গিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ালাম। আমি ভাবলাম, 'এটি নিশ্চিত যে, তিনি আমার ধর্মের কিংবা নুমান ইবনু মুনযিরের ধর্মের কোনো অনুসারী নন। তিনি যদি কোনো রাজা হতেন তাহলে এত দীর্ঘ সময় কোনো ছেলে বা মহিলা তাকে দাঁড় করিয়ে রাখতে পারত না। আমি অনুভব করলাম আমার অন্তর নবীজির প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ছে।”
আল্লাহর রাসূল -এর হাঁটার ধরন খুবই স্বতঃস্ফূর্ত ছিল, এতে কোনো মেকি গাম্ভীর্যপনা বা আড়ম্বরতা ছিল না। একদিনের ঘটনা। তিনি এক যুবককে জবাইকৃত ভেড়ার চামড়া ছাড়াতে দেখলেন। কিন্তু, যুবকটি তার কাজ সঠিকভাবে করতে পারছিল না। নবীজি তার কাছে গিয়ে বললেন, "পাশে সরে দাঁড়াও, যাতে আমি তোমাকে শিখিয়ে দিতে পারি কীভাবে এ কাজ করতে হয়। আমি দেখতে পাচ্ছি তুমি এ কাজ সঠিকভাবে করতে পারছ না।” অতঃপর নবীজি তাঁর হাত ভেড়ার চামড়া আর মাংসের মাঝে রাখলেন এবং কাঁধ পর্যন্ত চামড়া ছাড়িয়ে দিলেন। তারপর বললেন, “এভাবে চামড়া ছাড়াতে হয়, হে যুবক।” অবশেষে তিনি প্রস্থান করলেন।
আমরা দেখতে পাই যে নবীজি বিভিন্ন প্রজন্মের, ভিন্ন ভিন্ন বয়সের মানুষের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে সমর্থ হতেন। তিনি তাদের অবস্থার প্রতি মনোযোগী ছিলেন, তাদের জীবনের আনুষঙ্গিক জিনিসগুলোর ব্যাপারেও তিনি স্পষ্টভাবে আগ্রহ দেখাতেন। আমরা অবাক হয়ে ভাবি, সেই যুবকটি তখন এ কথা ভেবে কতই-না পুলকিত বোধ করছিল যে, আল্লাহর রাসূল আমার ব্যক্তিগত সমস্যার ব্যাপারে এত আগ্রহ দেখাচ্ছেন আর তা সমাধানে আমাকে সাহায্যও করছেন!
একবার তিনি সাহাবীদের নিয়ে একজন সাহাবীর গৃহে অবস্থান করছিলেন। বিলাল রা. এসে বললেন, জামাতের সময় হয়ে গেছে। নবীজি মসজিদের উদ্দেশে রওনা হলেন। পথে এক লোককে দেখলেন, সে বিশাল একটি কড়াই রান্নার জন্য চুলোতে চড়িয়েছে। নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, "রান্না কি শেষ হয়ে গেছে?”
লোকটি জবাবে বলল, “হে আল্লাহর রাসূল, এটি প্রস্তুত হয়ে গেছে।”
তখন নবীজি এক কামড় মুখে তুলে নিলেন এবং হাঁটতে হাঁটতে তা চিবোতে লাগলেন। নামায শুরু করার আগ পর্যন্ত তিনি তা চিবুচ্ছিলেন।
আমরা এসব ঘটনার দর্পণে নবীজির ব্যক্তিজীবনকে সবচেয়ে অনাড়ম্বর ও স্বতঃস্ফূর্তরূপে খুঁজে পাই। এভাবেই তিনি সাহাবীদের সাথে জীবনযাপন করতেন। ঘটনাটি আবার ভেবে দেখুন, তিনি একজনের কাছ থেকে এক কামড় খাবার মুখে নিলেন এবং হাঁটতে হাঁটতে তা চিবুতে লাগলেন। অহংকারী, দাম্ভিক লোকদের সাথে এ আচরণের কতই-না তফাত! যে ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি খাবার নিয়েছিলেন, সে এতে খুবই খুশি হয়েছিল। সম্ভবত ওইদিন সে যাকেই দেখেছে তাকেই বলেছে কীভাবে আল্লাহর রাসূল তার খাবার থেকে এক লোকমা খাদ্য তুলে নিয়ে তারই সামনে মুখে পুরেছেন। এ ঘটনাটি যেন ওই ব্যক্তির জন্য একটা বিশেষ পুরস্কারের মতো। এ ধরনের অভূতপূর্ব ও স্বতঃস্ফূর্ত আচরণের দ্বারাই বোধহয় নবীজি সাহাবীদের এত কাছাকাছি আসতে পেরেছিলেন।
কাউকে দেখতে গেলে নবীজি কখনো দরজার দিকে মুখ করে দাঁড়াতেন না, ডানে বা বামে সামান্য সরে দাঁড়াতেন। তখনকার সময়ে ঘর ছোট ছিল, বাইরে কোনো পর্দা টানানো থাকত না। তাই দরজায় এসে দাঁড়িয়ে নবীজি বলতেন, 'আস সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুল্লাহ'। অর্থাৎ, আপনাদের ওপর আল্লাহর শান্তি, রহমত ও বারাকাহ বর্ষিত হোক। প্রথমবার সালামের জবাব না মিললে তিনি মোট তিনবার সালাম দিতেন। এরপরেও জবাব না আসলে তিনি ফিরে যেতেন।
একদিনের ঘটনা। নবীজি সাদ ইবনু উবাদাহ রা. কে দেখতে গেলেন। দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন, 'আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ'। সাদ রা. সালাম শুনে আস্তে করে জবাব দিলেন, যাতে নবীজি তা শুনতে না পান। নবীজি আবার সালাম দিলেন। সাদ রা. আবারও নীরবে জবাব দিলেন। নবীজি আরও একটিবার সালাম দিলেন আর সাদ রা.-ও একই কাজের পুনরাবৃত্তি ঘটালেন। নবীজি চলে যেতে উদ্যত হলে তড়িঘড়ি করে সাদ রা. এসে দেখা দিলেন এবং বললেন, "যিনি আপনাকে সত্য বার্তা দিয়ে প্রেরণ করেছেন সেই মহান সত্তার শপথ, প্রত্যেকবার আপনি সালাম দিয়েছেন আর আমি তার জবাব দিয়েছি। আমি তো শুধু এটা চাচ্ছিলাম যে, আপনি যেন আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য রহমত, বরকত আর শান্তির দুআ করুন।”
টিকাঃ
৫৩. সে আমলে আতর ব্যবসায়ীরা এক বিশেষ ধরনের ঝুড়িতে তাদের আতর রাখতো। এখানে এধরনের ঝুড়ির কথা বলা হচ্ছে।
৫৪. ইশারায় সালাম দেয়ার জন্য যেভাবে হাত তোলা হয়, সেভাবে।
৫৫. সুন্নত তরিকায় হাত মিলানো
📄 চারপাশ পরিদর্শন
নবীজি সকালের সময়টাতেই সাধারণত আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়তেন। উদাহরণস্বরূপ, তিনি মাঝে মাঝে তাঁর কন্যা ফাতিমা রা. ও দৌহিত্র হাসান ইবনু আলি রা. কে দেখতে তাদের গৃহে যেতেন।
আবূ হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, “একদিন মধ্য-সকালে নবীজি বের হলেন। তিনি আমাকে মসজিদে খুঁজে পেয়ে আমার হাত ধরলেন। আমিও তাঁর সাথে চলতে লাগলাম। তিনি আমার হাতের ওপর ভর দিচ্ছিলেন। এভাবেই আমরা হাঁটতে লাগলাম। কিন্তু কেউ কারও সাথে কথা বলছিলাম না। প্রথমে আমরা ইহুদী গোত্র বনু কায়নুকার বাজারে গেলাম। তিনি কিচ্ছুক্ষণ বাজারে ঘুরে সেখানে কী হচ্ছে তা অবলোকন করলেন। তারপর সেখান থেকে ফিরে এলেন। আমি আবারও তাঁর সাথে চলতে লাগলাম। তিনি ফাতিমা রা. এর গৃহের উঠোনে গিয়ে বসলেন। তারপর বললেন, 'ছোট্ট সোনামণিটি কোথায়? ছোট্ট সোনামণিটি কোথায়? ছোট্ট সোনামণিটি কোথায়? হাসান ইবনু আলিকে আমার কাছে আসতে বলো।'
তৎক্ষণাৎ ছোট্ট হাসান রা. তড়িঘড়ি করে ছুটে এলেন। তিনি লাফ দিয়ে নবীজির কোলে গিয়ে বসলেন। তারা দুজন একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন। নবীজি শিশু হাসানকে স্নেহভরে চুমু খেলেন এবং নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে রাখলেন। হাসান রা. তখন নবীজির দাড়িতে হাত বুলাতে লাগলেন। নবীজি মুখ খুললেন আর হাসানও নিজের মুখ নবীজির মুখের ভেতর রাখলেন। নবীজি বললেন, 'হে আমার রব, আমি তাকে ভালোবাসি; তাই তুমিও তাকে ভালোবেসো। যারা তাকে ভালোবাসবে তাদেরও তুমি ভালোবেসো।' এই দুআ নবীজি তিনবার করলেন।”
আবূ হুরায়রা রা. এই অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্যটি প্রায়ই স্মরণ করতেন। তিনি বলতেন, “যখনই আমি হাসানকে দেখি, আমার দু-চোখ আবেগে অশ্রুসিক্ত হতে শুরু করে।”
একদিন নবীজি ফাতিমার ঘরে গিয়ে ফাতিমার স্বামী আলি রা. এর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি ফাতিমাকে প্রশ্ন করলেন, "তোমার চাচাতো ভাই কোথায়?" ৫৬
ফাতিমা রা. বললেন, “আমাদের মাঝে কিছু মনোমালিন্য হয়েছে। তাই তিনি বাইরে চলে গেছেন।” তখন নবীজি আলি রা. কে খুঁজতে লোক পাঠালেন। একটু পর খবর এল যে, আলি রা. মসজিদে ঘুমোচ্ছেন। নবীজি মসজিদে গিয়ে দেখলেন যে, আলি রা. মাটিতে শুয়ে আছেন। আলি রা. এর গায়ের ওপরিভাগের জামা খুলে পাশে পড়ে আছে এবং শরীরে বালি লেগে আছে। তা দেখে নবীজি নিজেই বালি ঝাড়তে শুরু করলেন এবং বলতে লাগলেন, “উঠে পড়ো, ও আবু তুরাব, উঠে পড়ো, ও আবু তুরাব।” (তুরাব শব্দের অর্থ হচ্ছে বালু বা ধূলিকণা)
আমাদের নবীজি উম্মে আইমানের ঘরে নিয়মিত যেতেন। নবীজি যখন ছোট ছিলেন তখন উম্মে আইমান রা. নবীজিকে দেখাশোনা করতেন। একবার তিনি সেখানে গেলেন। উম্মে আইমান রা. কিছু খাবার বা পানীয় নিয়ে এলেন। নবীজি সম্ভবত রোযা ছিলেন অথবা কোনো কারণে খেতে ইচ্ছুক ছিলেন না। তাই কিছু না খেয়েই তিনি সেগুলো ফিরিয়ে দিলেন। উম্মে আইমান রা. এতে তীব্র আপত্তি জানিয়ে নবীজির দিকে এগিয়ে আসলেন, অসন্তুষ্ট হলেন, এমনকি গলাও চড়ালেন।
উম্মে আইমান রা. এ রকম করতে পারতেন তার মর্যাদার কারণে। যখন নবীজি ছোট্ট শিশু ছিলেন তখন তিনি তাঁর দেখভাল করতেন। তাই হয়তো, নবীজির প্রতি অপরিসীম মমত্ববোধ থেকেই তিনি এ রকম রাগ দেখাতেন; ঠিক যেমনটা কোনো মা তার সন্তানের সাথে করে থাকেন। সকল শান্তি ও সালাম বর্ষিত হোক প্রিয়নবী মুহাম্মাদ -এর ওপর, যিনি বিনম্র মুচকি হাসির মাধ্যমে সবকিছু সহ্য করে যেতেন।
রাসূলুল্লাহ সাহাবীদেরও দেখতে যেতেন। তিনি দুর্বল ও অসুস্থ সাহাবীদের মাঝে মাঝে দেখে আসতেন। তাদের দাওয়াত কবুল করতেন। কখনো তিনি একা যেতেন। একবার আনাস বিন মালিক রা. এর দাদি মুলাইকা রা. খাবার প্রস্তুত করে নবীজিকে দাওয়াত করলেন। নবীজি দাওয়াত গ্রহণ করে সেখানে গেলেন এবং তা খেলেন। খাওয়া শেষে বললেন, 'এখন উঠো, যাতে করে আমরা একসাথে সালাত পড়তে পারি।' আনাস রা. বলেন, 'আমি পুরোনো একটি খড়ের মাদুর তুলে নিলাম, যা দীর্ঘদিনের ব্যবহারের কারণে কালচে হয়ে গিয়েছিল। এটির ওপর আমি সামান্য পানি ছিটিয়ে দিলাম। নবীজি উঠে দাঁড়ালেন এবং আমি তাঁর পেছনে একজন এতিম ছেলের সাথে দাঁড়ালাম। বৃদ্ধা মহিলা আমাদের পেছনের কাতারে দাঁড়ালেন। নবীজির ইমামতিতে দুই রাকাত সালাত পড়ার পর তিনি চলে গেলেন।”
তিনি মাঝে মাঝে দাওয়াত গ্রহণ করতেন এবং সেখানে পরিবারের সদস্যদেরও নিয়ে যেতেন। আনাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, নবীজির এক পারসিক প্রতিবেশী ছিল, যার সুস্বাদু খাবার রান্নার জন্য বেশ নামডাক ছিল। আসলেই তার রান্না থেকে খুব মুখরোচক সুগন্ধ আসত। একদিন সে নবীজির জন্য কিছু খাবার রান্না করে এসে দাওয়াত করে বসল। নবীজি বললেন, “আমি কি আয়িশাকে আমার সাথে নিয়ে আসতে পারি?”
লোকটি না-বাচক জবাব দিল। তখন নবীজি দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করলেন। লোকটি আবার এসে দাওয়াত করল। নবীজি বললেন, “সে (আয়িশা) আমার সাথে আসছে।” লোকটি আবার বলল, “না।” নবীজি আবার তার দাওয়াত ফিরিয়ে দিলেন। লোকটি তৃতীয়বার দাওয়াত দিতে আসলে তখন সম্মতি দিল। পরবর্তী সময়ে নবীজি আয়িশাকে নিয়ে সেখানে খেতে গিয়েছিলেন।
একদিন একজন দর্জি নবীজি-কে দাওয়াত দিল। দর্জিটি একটি গোত্রের মিত্র ছিল। আনাস রা. বলেন, “আমি আল্লাহর রাসূলের সাথে ভোজে অংশ নিলাম। সে (দর্জি) নবীজির সামনে কিছু যবের রুটি এবং লাউ ও শুকনো মাংস দিয়ে সিদ্ধ করা কিছু খাবার রেখে কাজে চলে গেল। নবীজি লাউ খেলেন এবং তা পছন্দ করলেন। আমি দেখলাম তিনি থালা থেকে লাউ বেছে বেছে খাচ্ছেন। তা দেখে আমি আমার অংশের লাউগুলো না খেয়ে নবীজির পাতে তুলে দিলাম। এরপর থেকে আমি লাউ (খেতে) ভালোবাসি।”
নবীজি মাঝে মাঝে সাহাবীদেরও সাথে নিয়ে দাওয়াতে যেতেন। ইতবান ইবনু মালিক রা. এর ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে দেয়া যায়। ইতবান রা. আবেদন করলেন নবীজি যেন 'ইতবানের বাসায় সালাত পড়ার জন্য আসেন। ইতবান রা. এভাবে বলেছিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমার দৃষ্টিশক্তি মারাত্মক হ্রাস পেয়েছে। আমি আমার লোকদের সালাতে ইমামতি করাতাম। যখন বৃষ্টি হয়, আমার ও তাদের মাঝের উপত্যকাটি খুব দ্রুত ছুটতে থাকে (বলে মনে হয়) এবং আমি তাদের মসজিদে পৌঁছে সালাতে ইমামতি করাতে পারি না। আমার খুবই ভালো লাগবে যদি আপনি আমার ঘরে এসে সালাত আদায় করেন। তাহলে আপনি যে জায়গায় এসে সালাত পড়বেন (আমার ঘরের) সেই জায়গাকে আমি আমার সালাত পড়ার (নির্ধারিত) স্থান বানিয়ে নেব।” নবীজি জবাবে বললেন, “ইনশাআল্লাহ, আমি আসব।” ওইদিনই মধ্য-সকালে নবীজি সেখানে গেলেন। আবু বকর, উমরসহ আরও কয়েকজন সাহাবীও তখন সাথে ছিলেন। নবীজি ইতবান রা.-কে জিজ্ঞেস করলেন, “আমি তোমার ঘরের কোন স্থানে সালাত পড়ব বলে তুমি চাও?”
ইতবান রা. তখন একটি জায়গা দেখিয়ে দিয়ে সেখানে একটি খড়ের মাদুর বিছিয়ে দিলেন এবং মাদুরের কোনায় পানি ছিটিয়ে দিলেন। নবীজি দুই রাকাত সালাতে ইমামতি করলেন। ইতবান রা. তখন তাদের আরেকটু সময় সেখানে অবস্থান করে কিছু খাদ্য গ্রহণের অনুরোধ করলেন, যা তিনি আগেই প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। নবীজি আরও কিছুক্ষণ অবস্থান করলেন এবং তার প্রস্তুতকৃত খাবার খেলেন।
কেউ নিমন্ত্রণ জানালে তাকে খুশি করার জন্য নবীজি অত্যন্ত সচেষ্ট থাকতেন। তাঁর মহত্ত্ব সবার জন্য সম্প্রসারিত ছিল। নবীজি -এর উত্তম আখলাক আর চারিত্রিক মাধুর্য থেকে ছোট্ট শিশুরাও বঞ্চিত হতো না। আনাস রা. বলেন, "আখলাকের দিক দিয়ে নবীজি ছিলেন সর্বোত্তম ব্যক্তি। তিনি সামাজিকতা রক্ষার তাকিদে আমাদের নিকটে আসতেন। আমার এক ভাই ছিল, যার বয়স তখন মাত্র তিন বছর। আমরা তাকে আবু উমাইর নামে ডাকতাম। নবীজি আমাদের ঘরে আসলে তাঁর সাথে মজা করতেন, খেলতেন। একদিন তিনি এসে দেখলেন বাচ্চাটির মন খারাপ। তিনি আমার মাকে জিজ্ঞেস করলেন, “হে উম্মে সুলাইম, আবু উমাইরের কী হয়েছে? তাকে খুব দুখী আর বিমর্ষ দেখাচ্ছে।”
তখন তিনি (উম্মে সুলাইম) জবাব দিলেন, “তার খেলার সাথি নুগাইর মারা গেছে।” নবীজি তখন আবু উমাইরের কাছে গেলেন, তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “ও আবু উমাইর, কোথায় নুগাইর? ও আবু উমাইর, কোথায় নুগাইর?” (নবীজি এই কথাকে ছন্দের মাধ্যমে বলছিলেন যাতে আবু উমাইরের মন ভালো হয়ে যায়।) ৫৭
মাহমুদ ইবনু আর-রাবি রা. বলেন, "আমাদের ঘরের পাশের কুয়া থেকে পানি তোলার জন্য একটি বালতি ছিল। আমার এখনো মনে আছে যে নবীজি সেই বালতি থেকে সামান্য পানি নিয়ে আমার মুখ মুছে দিয়েছিলেন। তখন আমার বয়স মাত্র পাঁচ বছর ছিল।”
প্রিয় পাঠক, আমরা দেখতে পাচ্ছি এই মনোরম ঘটনাটি শিশু মাহমুদকে কতটুকু মুগ্ধ করেছিল যে, তিনি বহু বছর পরেও তা স্মরণে রেখেছিলেন। আমরা এটা ভেবে আশ্চর্য হয়ে যাই যে, এত এত ব্যস্ততার মাঝেও নবীজি কীভাবে একটি দুখী বাচ্চা শিশুর দুঃখ ঘোচাতে সমর্থ হতেন, তাকে তার ছোট্ট পাখিটির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেন অথবা অন্য বাচ্চাদেরই-বা কীভাবে খুশি করতে পারতেন। কচি কচি বাচ্চারা কতই-না খুশি হয়তো হতো যখন তারা নবীজি-কে তাদের নিকটে আসতে দেখত। তাদের মাতাপিতাও কতই-না উৎফুল্ল হতেন যখন দেখতেন আল্লাহর রাসূল তাদের বাচ্চাকে পছন্দ করছেন।
যখন নবীজি কোনো সাহাবাকে দেখতে যেতেন এবং তাদের গৃহে খাবার খেতেন, তখন তিনি তাদের জন্য এবং তাদের পরিবারবর্গের জন্য দুআ করতেন। একবার তিনি সাদ ইবনু উবাদাহ রা.-কে দেখতে গেলেন। সাদ রা. নবীজির সামনে কিছু রুটি আর তেল রাখলেন। তিনি তা খেলেন এবং বললেন :
أَفْطَرَ عِنْدَكُمُ الصَّائِمُونَ، وَأَكَلَ طَعَامَكُمُ الْأَبْرَارُ، وَصَلَّتْ عَلَيْكُمُ الْمَلَائِكَةُ
"রোজাদার মানুষ যেন তোমার ঘরে ইফতার করে, আবিদ লোকজন যেন তোমার (ঘরের) খাবার খায়; আর ফেরেশতারাও যেন তোমার জন্য দুআ করে।” ৫৮
একবার নবীজি বুসর ইবনু আবু বুসর রা.-কে দেখতে গেলেন। তার বাসার নিকটে গেলে বুসর এবং বুসরের স্ত্রী প্রিয়নবীকে অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে এলেন। তারা নবীজির বসার জন্যে একটি মখমলের কাপড় বিছিয়ে দিলেন। তারপর বুসর স্বীয় স্ত্রীকে খাবার নিয়ে আসতে বললেন। তখন তার স্ত্রী খাদ্যভর্তি একটি থালা আনলেন। তাতে ময়দা, মাখন, পানি ও লবণের সংমিশ্রণে বানানো একধরনের খাদ্য ছিল। নবীজি তাদের সাথে নিয়ে সেখান থেকে খেলেন। থালায় কিছু খাদ্য অবশিষ্ট ছিল। নবীজি তখন তাদের জন্য দুআ করলেন:
اللَّهُمَّ بَارِكْ لَهُمْ فِيمَا رَزَقْتَهُمْ، وَاغْفِرْ لَهُمْ وَارْحَمْهُمْ
“হে আমার রব, তাদের গুনাহ মাফ করে দিন, তাদের ওপর আপনার রহমত বর্ষণ করুন। বারাকাহ ও প্রচুর পরিমাণে রিযিক তাদের দান করুন।” ৫৯
একদিন নবীজি জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ রা.-কে দেখতে তার ঘরে গেলেন। জাবির রা. নিজের স্ত্রীকে বললেন, “আল্লাহর রাসূল দুপুর নাগাদ আসবেন। তুমি এমন কিছু করবে না যাতে তিনি অসন্তুষ্ট হন। তুমি কোনো কথা বলবে না এবং প্রশ্নও জিজ্ঞেস করবে না।”
তারপর তিনি নবীজিকে আপ্যায়ন করার জন্যে নিজের একটি মোটাতাজা ছাগল জবাই করলেন। পরবর্তী সময়ে যখন নবীজির সামনে খাদ্য পরিবেশন করা হলো তিনি জাবির রা. এর দিকে তাকিয়ে বললেন, "জাবির, মনে হচ্ছে তুমি জানতে যে, আমরা মাংস ভালোবাসি।”
নবীজি সাথের সাহাবীদের সবাইকে নিয়ে খাদ্য গ্রহণ করলেন। যখন নবীজির চলে যাওয়ার সময় হলো তখন জাবিরের স্ত্রী ঘরের ভেতর থেকে নবীজিকে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমার জন্য এবং আমার স্বামীর জন্য দুআ করুন।”
নবীজি তখন বললেন, “তোমার ও তোমার স্বামীর ওপর আল্লাহর শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক।”
তারপরের ঘটনা। জাবির নিজ স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, “আমি কি তোমাকে রাসূলুল্লাহর সাথে কথা বলতে মানা করিনি?"
জাবির রা. এর স্ত্রী কী জবাব দিয়েছিলেন, জানেন? তিনি জবাবে বলেছিলেন, "আপনি কি মনে করেছেন যে, আল্লাহ তাঁর রাসূলকে আমার ঘরে নিয়ে আসবেন এবং তিনি (খাবার খেয়ে) এমনি এমনি চলে যাবেন অথচ আমি তাঁর কাছে আমার ও আমার স্বামীর জন্যে দুআ করার আবেদন জানাতে ব্যর্থ হব?”
এই মহৎ মানুষেরাই ছিলেন নবীজি -এর মহান সহচরবৃন্দ। তারা প্রিয়নবীর কাছ থেকে দুআ ও বরকত গ্রহণ করে ধন্য হতে পেরেছিলেন। আল্লাহর রাসূল তাদের মাঝেই বসবাস করেছেন। এটা ছিল তাদের প্রতি আল্লাহ তাআলার অপার অনুগ্রহ।
ওপরের আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয়, নবীজি যখন সাহাবীদের ঘরে বেড়াতে আসতেন তখন বিষয়টি তাদের জন্য অত্যন্ত খুশির উপলক্ষ্য হতো। নবীজির আগমন প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ছিল মর্যাদার ব্যাপার, ছোটদের জন্য ছিল আদর-যত্ন পাওয়ার মোক্ষম সুযোগ আর সর্বোপরি তাদের সবার জন্যই তা পরিপূর্ণ বরকত নিয়ে আসত। পাশাপাশি নবীজি এ সময়টাতে সাহাবীদের শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করতেন। নবীজির অনন্য ও বিশুদ্ধ শিক্ষাপদ্ধতির লক্ষ্যই ছিল সাহাবীদের অন্তরে সঠিক মূল্যবোধের অবস্থান পাকাপোক্ত করে দেয়া।
আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনু রাবিআহ রা. থেকে বর্ণিত, “আমি যখন ছোট বালক ছিলাম তখন রাসূলুল্লাহ আমাদের দেখতে আসেন। আমি বাইরে গিয়ে খেলতে চাচ্ছিলাম। আমার মা তখন আমাকে বলেন, 'আব্দুল্লাহ, এদিকে আসো, আমি তোমাকে কিছু জিনিস দেব।'
নবীজি তখন মাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি তাকে কী দিতে চাও?' মা জবাবে বললেন, 'আমি তাকে কিছু খেজুর দিচ্ছি।'' নবীজি বললেন, 'যদি তুমি তা না দিতে তাহলে এই কথাটি তোমার আমলনামায় মিথ্যা হিসেবে লিপিবদ্ধ হতো।”
লক্ষ করুন, নবীজি কেমন করে একজন মা-কে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন, যাতে করে তিনি তার সন্তানের মনে দৃঢ়ভাবে সত্য কথা বলার মূল্যবোধের সঞ্চারণ ঘটাতে পারেন। সন্তানও তাই এ মূল্যবোধ সম্পূর্ণভাবে শিখতে পেরেছিল এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মাঝে বহু বছর পর হাদীসটিও বর্ণনা করতে পেরেছিল। এভাবেই প্রিয় পাঠক, আপনি এবং আমিও বিষয়টি শিখে ফেললাম।
আরেকবারের ঘটনা। নবীজি সাদ ইবনু উবাদাহ রা. এর ঘরে তাশরিফ আনলেন। সাথে অন্যান্য সাহাবাগণও ছিলেন। বাশির ইবনু সাদ রা. তখন একটি প্রশ্ন করলেন। তিনি বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ আমাদের নির্দেশ প্রদান করেছেন আমরা যেন আপনার প্রতি রহমতের দুআ করি। আমরা তা কীভাবে করব?” ৬০
নবীজি কিছু সময়ের জন্যে চুপ হয়ে গেলেন। উপস্থিত কেউ কেউ তখন চিন্তা করছিল এ প্রশ্নটি যদি নবীজির সামনে তোলাই না হতো তবে ভালো ছিল। তারপর নবীজি নীরবতা ভেঙে বললেন, "বলো :
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
'হে আল্লাহ, তুমি মুহাম্মাদ ও তাঁর বংশধরদের ওপর রহমত বর্ষণ করো, যেমনটি করেছিলে ইবরাহীম ও তাঁর বংশধরদের ওপরে। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসনীয় ও সম্মানীয়। হে আল্লাহ, তুমি মুহাম্মাদ ও তাঁর বংশধরদের ওপর বরকত নাযিল করো যেমন বরকত তুমি নাযিল করেছিলে ইবরাহীম ও তাঁর বংশধরদের ওপরে। অবশ্যই তুমি প্রশংসনীয় ও সম্মানীয়।' আর সালামের ব্যাপারটি তোমরা যেভাবে জানো সেভাবেই।” ৬১
নবীজির কিছুটা সময় চুপ থাকার ব্যাপারটি ভেবে দেখুন। সবাই উদ্গ্রীব হয়ে আকাশকুসুম কল্পনা করছিল। সবাই উত্তর জানার জন্য মুখিয়ে ছিল। আর তাই, যখন নবীজি জবাব দিলেন, তারা সকলেই সাগ্রহে শিখে নিলেন, যাতে কেউ তা ভুলে না যায়। কল্যাণের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের ওপর সকল রহমত, বরকত ও সালাম বর্ষিত হোক।
একবার নবীজি ইতবান ইবনু মালিকের ঘরে ছিলেন। সেখানে তখন সাহাবীদের বেশ বড় জামাত উপস্থিত ছিল। একজন বললেন, "মালিক ইবনু আদ-দুকশুমের কী হয়েছে? তাকে দেখা যায় না।”
আরেজন তখন জবাবে বললেন, "সে একটা মুনাফিক। সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে না।"
তখন নবীজি বারণ করে বললেন, "এ কথা বলবে না। তোমরা কী তাকে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলতে শোনোনি?"
যিনি এ কথা বলেছিলেন তিনি তখন বললেন, “আল্লাহ আর তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। আমরা তো তাকে মুনাফিকদের সাথে বন্ধুত্ব করতে ও কথা বলতে দেখি।”
নবীজি বললেন, “যে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এর সাক্ষ্য দেবে আল্লাহ তাঁর জন্য জাহান্নাম নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন।”
ঘটনাটি পর্যালোচনা করে দেখা উচিত। নবীজি যখন সাহাবীদের দেখতে যেতেন তখন তিনি সে সময়টুকু সাহাবীদের, এবং সর্বোপরি মুসলিম উম্মাহকে শিক্ষা দেয়ার কাজে কীভাবে ব্যবহার করতেন দেখুন। অন্য মুসলিমদের ইজ্জত-সম্মান রক্ষা করার শিক্ষা কত সুন্দরভাবেই-না তিনি দিচ্ছিলেন। মুসলিম ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তাকে নিয়ে খারাপ কথা না বলার শিক্ষাও এ থেকে পাওয়া যায়। নববী পাঠশালা থেকে আমরা আরও শিখতে পারি যে, আমাদের সর্বদা মানুষের ইতিবাচক দিকটি বিবেচনায় রাখা উচিত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস রাখা। এ ঘটনা থেকে এটাই সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। যার ব্যাপারে কথা বলা হচ্ছে সেই মানুষটি 'আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই'-এ সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। নবীজি শ্রোতাদের নজর তাই তো সেদিকেই ফিরিয়ে দিলেন।
ভাবুন তো, আমাদের মজলিস আর কথোপকথন কতই-না বিশুদ্ধতায় বদলে যাবে যখন আমরা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর সাক্ষ্য দেওয়া মুমিনদের অনুপস্থিতিতে তাদের ব্যাপারে খারাপ কথা বলা থেকে বিরত থাকব।
টিকাঃ
৫৬. আলী রা. আল্লাহর রাসূলের চাচাতো ভাই হওয়া সত্ত্বেও ফাতিমার চাচাতো ভাই বলে সম্বোধনের কারণ হচ্ছে আরবের প্রচলিত একটি সাধারণ পরিভাষা এটি। ফাতহুল বারি- ২/৪৪২
৫৭. আরবিতে 'নুগাইর' বলতে চড়ুই পাখির মত ছোট্ট পাখিকে বুঝায়
৫৮. আবূ দাউদ: ৩৮৫৪
৫৯. আবূ দাউদ: ৩৭২৯
৬০. বাশির রা. এর প্রশ্ন ছিল আল কোরআনের একটি আয়াত প্রসঙ্গে। আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি রহমত প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর জন্যে রহমতের তরে দোয়া কর এবং তাঁর প্রতি সালাম প্রেরণ কর।" [সূরা আল আহযাব, ৩৩:৫৬]
৬১. তিরমিযী: ৩২২০
📄 অসুস্থ ব্যক্তির পাশে
আল্লাহর নবী অসুস্থদের দেখতে যেতেন। কষ্ট-যাতনার দুঃসহ মুহূর্তগুলোতে প্রিয়নবীর উপস্থিতি যেন সাহাবাদের জন্য প্রলেপের কাজ করত, তাদের স্বস্তি জোগাত। যখন সাদ ইবনু উবাদাহ রা. অসুস্থ ছিলেন তখন নবীজি তাকে দেখতে যান। সাথে ছিলেন আব্দুর রহমান ইবনু আওফ, সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস এবং আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম। নবীজি কক্ষে ঢুকে সাদ রা. কে অচেতন অবস্থায় পেলেন। পরিবারের সবাই তখন তাঁর পাশে। নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, “সে কি মারা গেছে?”
তারা তখন জবাবে জানালেন, “না, সাদ এখনো মরেননি।”
এ সময় নবীজির চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে গিয়েছিল। উপস্থিত সবাই নবীজিকে কাঁদতে দেখে কান্না শুরু করলেন।
তখন নবীজি বললেন, "তোমরা কি শোনোনি যে, আল্লাহ কাউকে অশ্রুসজল দু-চোখের কারণে কিংবা ব্যথাকাতর অন্তরের জন্যে শাস্তি দেন না। তিনি শাস্তি দেন এই জিনিস (জিহ্বার দিকে দেখিয়ে) যা করতে পারে তার কারণে। নতুবা তিনি রহমত বর্ষণ করেন।"
নবীজি কতটুকু সহানুভূতিশীল ছিলেন তাঁর একটিমাত্র উদাহরণ এই ঘটনা। প্রিয়নবীর চোখ ভিজে গিয়েছিল শুধু তাঁর একজন সাহাবী জ্ঞান হারিয়েছেন এই কারণে। আমি অবাক হয়ে ভাবি, সাদ ইবনু উবাদাহ রা. এর কেমন লেগেছিল যখন জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর এবং সুস্থ হয়ে যাওয়ার পর তিনি এ কথা জেনেছেন। আল্লাহর রাসূল সাদ রা. কে দেখতে এসেছিলেন এবং তাঁর অবস্থা দেখে কেঁদে ফেলেছিলেন। সাদ রা. এর ছেলেদের, স্বজনদের এবং সাহাবাদের এ দৃশ্য দেখে কেমন লেগেছিল? তারা তো দেখছিলেন যে, আল্লাহর রাসূল তাদের কষ্ট আর দুশ্চিন্তাগুলোও ভাগ করে নিচ্ছেন। তাদের মতো একই অনুভূতি নবীজিরও হচ্ছিল। এ রকমই ছিল নবীজির মমত্ববোধ। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাঁর নবীকে জানেন এবং তাঁর ব্যাপারে যথার্থই বলেছেন:
لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ
“তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের নিকট একজন রাসূল এসেছেন, তোমাদের যা কিছু কষ্ট দেয় তা তাঁর নিকট খুবই কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি করুণাসিক্ত, বড়ই দয়ালু।” ৬২
এ ধরনের আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ রা. এর ঘটনা।
তিনি বলেন, “আমি অসুস্থ ছিলাম। নবীজি আবু বকর রা. কে সাথে নিয়ে আমাকে দেখতে আসলেন। তখন আমার স্বগোত্রের (সালামাহ গোত্র) লোকেরা আমার পরিচর্যা করছিল। তাঁরা যখন হেঁটে আসছিলেন তখন আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। নবীজি আমাকে অজ্ঞান হয়ে যেতে দেখেন। আমি অচেতন ছিলাম। নবীজি উযু করলেন এবং উযুর জন্য ব্যবহৃত কিছু পানি আমার ওপরে ছিটিয়ে দিলেন। আমি দ্রুত জ্ঞান ফিরে পেয়ে আল্লাহর রাসূলকে আমার পাশে দেখলাম। আমি তখন নবীজি-কে জিজ্ঞেস করলাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি আমার সম্পত্তি কীভাবে অছিয়ত করব? আমার তো সরাসরি উত্তরাধিকারী কেউ নেই। না আমার পিতা-মাতা আছেন আর না আছে সন্তান।' নবীজি আমার কথার জবাব দিলেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত না কুরআনের আয়াত নাযিল হলো। এ আয়াতে এ ধরনের অবস্থাতে উত্তরাধিকারের নিয়মকানুন বিবৃত হয়েছিল।”
আমরা জানি যে, জাবির রা., যিনি তখন অসুস্থ অবস্থায় ছিলেন এবং নবীজীকে প্রশ্ন করেছিলেন যে, এ অবস্থায় মারা গেলে সম্পত্তি কীভাবে বণ্টন করবেন; তিনি নবীজির ওফাতের পরেও প্রায় ৭০ বছর জীবিত ছিলেন। আর এ দৃশ্য তার স্মৃতিতে সর্বদাই অমলিন ছিল।
আমরা জাবির রা. এর উক্তিটির ব্যাপারে আরেকটু গভীরভাবে ভেবে দেখি। তিনি বলেছিলেন, “আমি দ্রুত জ্ঞান ফিরে পেয়ে আল্লাহর রাসূলকে আমার পাশে দেখলাম।” তিনি হাদীসটি এমনভাবে বর্ণনা করছিলেন যেন তিনি এইমাত্র জ্ঞান ফিরে পেয়ে অবাক হয়ে নবীজির দিকে তাকালেন।
এভাবেই নবীজি -এর স্মৃতি চিরভাস্বর হয়ে ছিল সাহাবাদের মনে-মগজে। রোগ- শোক কিংবা দুর্বলতায় নবীজি -কে পাশে পাওয়ার মতো আকুলতায় ভরা এ অনুভূতি আর কিছুতেই ছিল না। সাহাবাদের সাথে এমনই ছিলেন আমাদের নবীজি। দুঃখের সময় তারা কখনো নবীজির অভাব বোধ করেননি; বরং সাহাবাগণ সব সময় নবীজি- কে পাশে পেয়েছেন। তিনি সদা তাদের পাশে থেকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। একইভাবে, আনন্দের সময়েও সাহাবাগণ নবীজি-কে পাশে পেয়েছেন। তিনি সব সময় তাদের পাশে থেকে আনন্দও ভাগ করে নিতেন। তাই তো, সাহাবাদের ছিল নবীজি -এর জন্য এত অসম ভালোবাসা।
টিকাঃ
৬২. সূরা আত-তাওবাহ, ৯:১২৮