📄 দ্রষ্টব্য
➡ বইটিতে যখন কোনো ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে, তখন কেবলমাত্র একটি বিবরণে লেখক নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেন নি; বরং একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন সহীহ বিবরণ একত্র করে সম্পূর্ণ ঘটনার একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। সে কারণে বইয়ের পরিশিষ্ট অধ্যায়ে রেফারেন্সের একটি বিশদ তালিকা যুক্ত করা হয়েছে, যার অধিকাংশই হাদীসের কিতাব। এসব কিতাবে বর্ণিত বিবরণগুলো একত্র করলে বইয়ে বর্ণিত ঘটনাবলির সত্যতা যাচাই করা যাবে। কিছু কিছু ঘটনা একাধিক উৎস থেকে সাহায্য নিয়ে লেখা হয়েছে। এ কারণে হাদীসের বর্ণনাভঙ্গি গতানুগতিক ধারা থেকে কিছুটা ভিন্ন।
➡ শুধুমাত্র সহীহ হাদীস থেকে বর্ণিত ঘটনাবলি সন্নিবেশিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিছু কিছু ঘটনার বিবরণের সনদে হালকা দুর্বলতা রয়েছে (যা সাধারণত সীরাতের বইয়ে থাকে)। কিন্তু বইটিতে শুধুমাত্র সেই বিবরণগুলোই উল্লেখ করা হয়েছে, যার সমার্থক বিবরণ সহীহ সূত্রে পাওয়া যায় অথবা যা সহীহ বর্ণনার পরিপূরক। এই বইয়ে কোনো জাল বিবরণ উল্লেখ না করার ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে।
📄 নবীজি ﷺ-এর সমগ্র দিনের কার্যবিধির আলোকে একটি পর্যালোচনা
নবীজি -এর একেকটা দিন যেন তাঁর সমগ্র জীবনের এক টুকরো প্রতিচ্ছবি। তাঁর কাটানো প্রতিটা মুহূর্তই ওহীর সুগভীর বার্তা ছড়িয়ে দিত :
এক.
নবুয়্যতের দায়িত্ব পালনের জন্য নবীজি প্রত্যেকটা দিনই পরিকল্পিতভাবে কাটাতেন। মানবেতিহাস কখনোই আল্লাহর প্রিয় হাবীব হযরত মুহাম্মদ এর মতো অন্য কারও থেকে এত ব্যাপক সফলতার সাক্ষী হতে পারেনি।
দুই.
নবীজি -এর নিত্যদিনের যে জিনিসটা প্রথমেই মন কেড়ে নেয় তা হলো নবীজির দিনলিপির নির্মল স্বচ্ছতা, যা সর্বদাই আলো বিকিরণ করে যায়। তাঁর জীবনের কোনো অংশই আমাদের অগোচরে রয়ে যায়নি। প্রিয় নবীজি -এর নববী জিন্দেগীর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশটুকুও আমাদের কাছে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। তিনি ঘরের ভেতরে কী করতেন, কীভাবে ঘুমাতেন, শয়নকালে স্ত্রীদের সাথে কীভাবে সময় কাটাতেন তার সবকিছুই আমরা জানি। এমনকি ঘুমের সময় তাঁর নিশ্বাসের শব্দটুকুও যেন আমাদের কানে ঝংকার তোলে। ঘুম ভেঙে নবীজি -এর পবিত্র মুখখানা দিয়ে প্রথমেই কী উচ্চারিত হতো তাও আমাদের অজানা নয়।
যখন নবীজি -এর দৈনিক কার্যাবলী অধ্যয়ন করা শুরু করেছিলাম, মনে হচ্ছিল নিজের জন্মদাতা পিতার থেকেও আমি তাঁকে বেশি চিনি। তাঁর ছিল এক জ্যোতির্ময় জীবন, যিনি ছিলেন দীপ্তিমান সূর্যের নিচে হেঁটে চলা এক কিংবদন্তি বার্তাবাহক।
তিন.
তাঁর দৈনন্দিন কার্যক্রম যখন আপনি অনুসরণ করতে শুরু করবেন, কেবল তখনই অনুধাবন করতে পারবেন তাঁর বাণীর মর্মার্থ: “সালাত হচ্ছে আমার চোখের শীতলতা।” সালাতেই তাঁর দিনের বড় একটা অংশ অতিবাহিত হতো; হোক সেটা ফরজ কিংবা নফল সালাত, অথবা কিয়ামুল লাইল। সালাতের সময়টুকু নবীজি -এর কর্মব্যস্ত দিনে মানসিক স্বস্তি এনে দিতে এক বিরাট ভূমিকা পালন করত। তাঁর গুরুদায়িত্ব পালনে যে অতিরিক্ত শক্তি এবং বরকতের দরকার ছিল; মনে হয় যেন সালাতের মাধ্যমেই তিনি তা লাভ করতেন। প্রতিবার সালাত আদায়ের পর তাঁর সংকল্পের দৃঢ়তা নবরূপ লাভ করত এবং মানসিক শক্তিও বৃদ্ধি পেত। সালাত ছিল তাঁর শক্তি এবং স্বস্তির উৎস। কোনো সালাত বাকি থেকে গেলে তিনি অবসর পাওয়ার সাথে সাথেই তা আদায় করে নিতেন। সালাতের প্রতি তাঁর আকুলতা প্রকাশ করে নবীজি বলেন, “বিলাল, আমাদের সালাতের প্রশান্তি দাও।” “সালাতের প্রশান্তি”—এই বাক্যাংশটাই সালাতের প্রতি তাঁর তীব্র আকাঙ্ক্ষা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে। সৃষ্টিকর্তার সাথে নবীজি-এর পূর্ণতাপ্রাপ্ত সম্পর্কের বাস্তবরূপই যেন এতে ফুটে ওঠে।
ইবনুল কায়্যিম রাহ. বর্ণনা করেন যে, নবীজি দৈনিক ৪০ রাকাত সালাত নিয়মিত আদায় করতেন। এর মধ্যে ছিল ১৭ রাকাত ফরয সালাত, ১০ বা ১২ রাকাত নিয়মিত সুন্নাত সালাত এবং ১১ অথবা ১৩ রাকাত কিয়ামুল লাইল। এর বাইরে কোনো নফল সালাতই তিনি নিয়মিত আদায় করেননি। সেগুলোর মধ্যে আছে সালাতুত দোহা এবং তাহিয়্যাতুল মসজিদ। এ ছাড়া নবীজি কোনো মানুষের সাথে দেখা করতে গেলে সেখানেও নফল সালাত আদায় করতেন। এই সালাতগুলো নিয়মিত আদায় করা যেকোনো মুসলিমের জন্যই কল্যাণকর। ভেবে দেখুন, আপনি যে দরজায় দৈনিক ৪০ বার ধরনা দিচ্ছেন, অন্য কোনো দরজা থেকে কি সেই দরজার চেয়ে দ্রুত জবাব আসবে কিংবা সে দরজার চেয়ে তাড়াতাড়ি খুলে যাবে?
চার. রাতের সালাতে তিনি খুব বেশি আত্মনিমগ্ন হয়ে যেতেন। যার ফলে রবের সাথে তাঁর রাতের আলাপন ছিল সবচেয়ে বেশি উপভোগ্য। এই মুহূর্তটা নবীজি -এর জন্য ছিল সুগভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা লাভের সুবর্ণ সুযোগ।
পাঁচ. এটা সত্যিই আশ্চর্যজনক যে, নবীজি-এর পূর্বের ও পরের সমস্ত গুনাহ মাফ হওয়ার নিশ্চয়তা সত্ত্বেও অবিরত আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন। তাঁর দিনের শুরুই হতো আল্লাহর কাছে ১০০ বার ক্ষমা চেয়ে। এক হালাকায় সাহাবীরা হিসাব করে দেখলেন যে, তিনি ১০০ বারেরও বেশি বলেছিলেন, “হে আমার প্রভু, আমাকে ক্ষমা করো, আমার তাওবা কবুল করো; তুমি ছাড়া গুনাহ মাফ এবং তাওবা কবুলের ক্ষমতা আর কারও নেই।” রাতের নামাযেও তিনি অত্যন্ত আবেগী ভাষায় আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন, “আমার রব, আমার পূর্বের-পরের, গোপন-প্রকাশ্য সমস্ত গুনাহ মাফ করে দাও। আমার সে সকল গুনাহও ক্ষমা করে দাও, যা তুমি আমার থেকে বেশি জানো। তুমিই সম্মুখে অগ্রসর করাও, তুমিই পশ্চাদগামী করো। তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তোমার ইচ্ছা ব্যতীত কোনো কিছুই হয় না।”
নবীজি -এর পূর্বের-পরের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়েছিল এবং তাঁকে সব ধরনের গুনাহ থেকেও সুরক্ষিত করে রাখা হয়েছিল। এরপরেও তিনি কত বেশি ক্ষমা চাইতেন আল্লাহর কাছে! আমাদের তাহলে কী করা উচিত, যেখানে একটামাত্র গুনাহ ত্যাগ করাও আমাদের জন্য চরম কষ্টসাধ্য হয়ে যায়? হে আমাদের রব, ক্ষমা করো আমাদের।
হয়.
নবীজি সব সময়েই তাসবীহ এবং যিকির পাঠ করতেন। আপনি অনুভব করতে পারবেন যে, রবের প্রতি ভালোবাসা আর তাঁর সাথে মিলিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষাই ছিল জীবনভর তাঁর সমস্ত কর্মোদ্দীপনার কেন্দ্রবিন্দু। রবের দীদার লাভের উচ্চাশা নবীজি -এর এত বেশি ছিল যে তিনি কখনোই তাঁর তাসবীহ পাঠ থেকে বিরত হতেন না। তিনি দিনের শুরু করতেন মহান আল্লাহর প্রশংসা বর্ণনা করে এবং ঘুমানোর আগে তাঁর শেষ কাজ ছিল রবের কাছে দুআ চাওয়া। তাঁর সকাল এবং সন্ধ্যা শুরু হতো রহমানের উচ্চকিত প্রশংসায়। আর এই স্তুতিবাক্যগুলো তিনি সারাদিনই আওড়াতে থাকতেন। তাঁর এই আচরণগুলোই প্রমাণ করে রবের প্রতি তাঁর ভালোবাসার গভীরতা ও আনুগত্য, প্রমাণ করে মহান মালিকের পবিত্র গুণাবলিসমূহের সাক্ষ্য প্রদানে তিনি কতটা সচেতন!
সাত.
নবীজি কেবল ইশা ব্যতীত সকল সালাতই ওয়াক্ত শুরু হওয়ার সাথে সাথেই আদায় করে নিতেন। ইশার সালাত আদায়ে তিনি মাঝেমধ্যে বিলম্ব করতেন।
আট. নবীজি সাধারণত ফরজ সালাতের পর সাহাবীদের সাথে কথা বলতেন, বিশেষ করে ফজর এবং যোহরের পর। কারণ, এই দুই সালাতের সময় ছিল রাতের গভীর ঘুম এবং মধ্য-দুপুরের ভাতঘুমের পরপরই। তাই ওই সময়গুলোতে মানুষ সতেজ এবং প্রাণবন্ত থাকত। আসর এবং ইশার পরে লোকেরা সাধারণত ক্লান্ত থাকত এবং বিশ্রাম নিতে চাইত। তাই এই সময়গুলোতে তিনি সচরাচর কথা বলতেন না। মাগরিবের পর তিনি সাহাবীদের সাথে কথোপকথন চালিয়েছিলেন বলেও কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। কারণ, তখন ছিল তাদের নৈশভোজের সময়। তাই মাগরিবের সালাত তিনি ওয়াক্তের শুরুতেই যথাসম্ভব সংক্ষেপে পড়তেন এবং এরপর সাহাবীদের উদ্দেশে কোনো বক্তব্যও রাখতেন না।
নয়. নবীজি তাঁর সকল কাজেই যথেষ্ট নিয়মানুবর্তী ছিলেন; স্বীয় দায়িত্ব পালন, দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন পূরণ, ব্যক্তিগত ইবাদাত, দ্বীন প্রচার, পরিবারের তত্ত্বাবধান, সাহাবীদের তারবিয়াত, নিজের খেয়াল রাখা এবং অন্য সকল কাজই যথাসময়ে আদায় করতেন। তাঁর প্রত্যেকটা কাজই ছিল অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। কোনো সঠিক কাজ আদায়ে কখনোই তিনি অলসতা কিংবা অপারগতা প্রকাশ করেননি। আপনি দেখবেন, তিনি প্রতিটা ব্যক্তিগত এবং সামাজিক দায়িত্ব অত্যন্ত সুচারুরূপে পালন করেছেন। আপনি আরও লক্ষ করবেন, মানুষকে তিনি যে সমস্ত কাজের নির্দেশ দিতেন, তা কতটা আন্তরিকতার সাথে নিজে সেই কাজগুলো করতেন: “তোমার শরীরের তোমার ওপর হক আছে, আছে তোমার চোখেরও; তোমার স্ত্রীর তোমার ওপর হক রয়েছে এবং হক রয়েছে তোমার অতিথিরও; সন্তানদের হক রয়েছে তোমার ওপর এবং তোমার ওপর হক রয়েছে তোমার বন্ধুদেরও।” তিনি নিজেই জীবদ্দশায় সকলের হক আদায়ের উত্তম আদর্শ স্থাপন করে গেছেন।
দশ. নবীজি প্রতিটি মুহূর্তই কোনো-না-কোনো কাজে ব্যস্ত থাকতেন। অথচ এত কর্মব্যস্ততা স্বত্ত্বেও তিনি কখনো কোনো কাজে ভুল করতেন না; বরং ঠান্ডা মাথায় সুন্দরভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করতেন। তাঁর জীবনে দুশ্চিন্তার কোনো অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে। তিনি কখনোই হতাশ হতেন না। আপনি যদি তাঁকে কোনো কাজ করার সময় দেখতেন তাহলে ভাবতেন, না এই কাজটি করার আগে তিনি কোনো কিছু করেছেন আর না এই কাজ শেষ হওয়ার পর তার অন্য কোনো কাজ করার আছে! পরিবারের সাথে তিনি যে মেজাজে থাকতেন তাতে বোঝার কোনো উপায়ই ছিল না যে বাইরে তাঁকে কত ভারী দায়িত্বের বোঝা বহন করতে হতো! তাঁর সাহাবীদের সাথে সময় কাটানো দেখলে আপনার মনে হতো অন্য কোনো কিছুতেই বুঝি আজ তাঁর মনোযোগ নেই, আর না তিনি অন্য কোনো বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন! নবীজি তাদের প্রতি পরিপূর্ণভাবে মনোনিবেশ করতেন এবং অত্যন্ত স্বচ্ছন্দ ভঙ্গিতে কথা বলতেন। তাঁর অভূতপূর্ব চারিত্রিক সৌন্দর্য তাই তাদের সকলেই অনুভব করতে পারতেন। তাঁর আচরণ দেখলে মনে হতো যেন সাথিদের সাথে মোলাকাত এবং তাদের প্রয়োজন পূরণই নবীজি -এর একমাত্র কাজ। সব ধরনের দায়িত্ব সহজ এবং উদ্বেগহীনভাবে সম্পাদনে তিনি নিখুঁত সামঞ্জস্য রক্ষা করতে সক্ষম ছিলেন।
এগারো. তাঁর জীবনযাত্রা ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, তবে মোটেও একঘেয়ে নয়। পরিস্থিতির প্রয়োজনে তিনি কখনো কখনো তাঁর দৈনন্দিন রুটিনে পরিবর্তনও আনতেন। নবীজি -এর জীবনে বিশৃঙ্খলা বা গোলমালের কোনো অস্তিত্বই ছিল না, আর না ছিল কঠোরতা বা নীরসতা। নমনীয়তা এবং নিয়মশৃঙ্খলার এই অপূর্ব সমন্বয় সম্ভব হয়েছিল পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ সালাতকে কেন্দ্র করে। সালাতের সময় নির্ধারিত থাকায় সেগুলোর মধ্যবর্তী সময়ে কী কী করতে হবে তা সহজেই ঠিক করে ফেলা যেত। পরিস্থিতি অনুযায়ী তিনি সাহাবীদের সাথে সাক্ষাতের সময়সূচি নির্ধারণ করতেন। এভাবেই নবীজি নিয়মানুবর্তিতার ইতিবাচক দিকগুলো থেকে উপকৃত হতেন এবং একঘেয়েমি আর কঠোরতার মতো নেতিবাচক দিকগুলো থেকে বেঁচে থাকতে পারতেন।
বারো. নবীজি -এর জীবনযাত্রা ছিল নিতান্তই সহজ-সরল। অস্বাভাবিক গাম্ভীর্য এবং কঠোরতার প্রান্তিকতা তাঁর আচরণের সাথে একদমই মানানসই ছিল না। অন্যদিকে স্বতঃস্ফূর্ততাই ছিল নবীজি -এর সহজাত বৈশিষ্ট্য। যে কারও খুশিতেই তিনি শরীক হতেন, ভালোবাসতেন সাহাবীদের সঙ্গ এবং আনন্দদায়ক সবকিছুই যে তিনি উপভোগ করছেন তা প্রকাশ করতেও তিনি তৎপর ছিলেন। দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর ভালোবাসার মানুষগুলো ফিরে আসলে তিনি যত শীঘ্র সম্ভব তাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে পছন্দ করতেন। তিনি এ কাজে এতই তাড়াহুড়া করতেন যে, দ্রুততার আতিশয্যে তাঁর পোশাকের ওপরের অংশ কাঁধ থেকে পড়ে যেত। পথ চলতে গিয়ে তিনি হয়তো রাস্তার পাশে থেমে যেতেন শুধু জবাইকৃত ভেড়ার চামড়া ছাড়ানো কোনো যুবকের সাথে একটু সময় কথা বলার জন্য। তিনি তাঁর জামার হাতা গুটিয়ে সেই যুবককে শেখাতেন কীভাবে সহজেই নিখুঁতভাবে ভেড়ার চামড়া ছাড়ানো যায়। হয়তো প্রিয় নবীজি এমন কারও পাশ দিয়ে কখনো যাচ্ছিলেন যে গোশত রান্না করছিল। তখন তিনি এগিয়ে গিয়ে লোকটিকে জিজ্ঞেস করতেন গোশত রান্না শেষ হয়েছে কি না। রান্না হয়ে গেলে তিনি পাতিল থেকে কিছু গোশত নিয়ে খেতেন।
মানুষের সাথে এত সহজভাবে মিশতে পারার দক্ষতাই দাওয়াহর পথে তাঁর সকল ধরনের প্রতিবন্ধকতা অনেকখানি দূর করে দিয়েছিল। তিনি খুব সহজেই সাহাবীদের সাথে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম ছিলেন। নবীজি এমনভাবে সাহাবীদের খেয়াল রাখতেন যেভাবে কোনো পিতা তাঁর পুত্রের ক্ষেত্রে করে থাকে।
তেরো. তাঁর পরিবার, বৈঠকের আসর এবং সাধারণভাবে বলতে গেলে তাঁর সমগ্র জীবনটাতেই অল্পবিস্তর আমোদপ্রমোদ এবং বিনোদনের উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়। বাড়িতে পরিবারের মানুষদের সাথে তিনি সব সময়ই হাসিখুশি থাকতেন। নবীজি -এর বৈঠকসমূহে প্রায় সময়ই হালকা রসিকতা এবং আনন্দদায়ক আলাপ-আলোচনার সুযোগ ছিল। তিনি মসজিদে আবীসিনীয়দের খেলা উপভোগ করতে তাঁর স্ত্রীকে সাথে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসতেন। তিনি তাদের বলতেন, “তোমাদের খেলা চালিয়ে যাও, হে বনী আরফিদাহ; যাতে করে ইহুদী-খ্রিষ্টানরা বুঝতে পারে আমাদের ধর্মে জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেরই স্থান রয়েছে। আমাকে এক পরিশুদ্ধ এবং সহনশীল বার্তাপ্রচারক হিসেবে পাঠানো হয়েছে।”
নিঃসন্দেহে তাঁর প্রচারিত সত্যের বাণী ছিল কোমল এবং তিনি মানুষকে বিনোদন এবং আমোদ-প্রমোদের যথেষ্ট সুযোগ দিতেন।
চৌদ্দঃ লক্ষনীয় যে, নবীজি -এর পারিবারিক জীবন ছিল অত্যন্ত আবেগময়। স্ত্রী-কে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেয়া কিংবা তার মুখে এক লোকমা খাবার তুলে দেয়া, রাতের রোমান্টিক কথোপকথন, পরিজনদের খোঁজ রাখতে দিনের ঝটিকা সফর, পরিবারের প্রয়োজনে যেকোনো সময় পাশে থাকা, বিছানায় এক চাদরের নিচে স্ত্রীদের সাথে ঘনিষ্ঠ সময় কাটানো এ রকম অসংখ্য ছোট ছোট কাজের মাধ্যমেই পরিবারের প্রতি তাঁর ভাবাবেগপূর্ণ আচরণ অভিব্যক্ত হয়।
পনেরো. মানুষের স্বভাব-বৈশিষ্ট্য, প্রয়োজন এবং গতিবিধি সম্পর্কে নবীজি -এর বোধশক্তি ছিল অবাক করার মতো। এমনকি ইবাদাতের সময়ও তিনি মানুষের প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ রাখতেন। জামাতের ইমামতি করার সময় তিনি সালাত অল্প সময়ে আদায় করতেন। কিন্তু যখন একা দাঁড়াতেন তখন লম্বা সময় ধরে সালাত আদায় করতেন। দীর্ঘ করার অভিপ্রায়ে সালাত শুরু করা সত্ত্বেও কোনো বাচ্চার কান্নার আওয়াজ কানে পৌঁছালে তিনি সালাত সংক্ষিপ্ত করে ফেলতেন। কারণ, তিনি এই কান্নারত শিশুর মায়ের উদ্বেগ অনুভব করতে পারতেন।
ষোল. নবীজি -এর দিনলিপি যথাযথভাবে অধ্যয়ন করলে আমরা দেখতে পাব যে, তাঁর সর্বাধিক প্রগাঢ় ইবাদাত, যাতে তিনি গভীরভাবে আত্মনিমগ্ন হয়ে যেতেন তা হচ্ছে কিয়ামুল লাইল, যা তিনি গৃহাভ্যন্তরে রাতের আঁধারে একাকী আদায় করতেন। সমগ্র জীবনভর নিয়মিত তিনি রাতের ইবাদাতের এই অভ্যাস অব্যাহত রখেছিলেন। উক্ত বিষয়টা বাস্তবিকই নবীজি -এর নবুয়্যতের একটা প্রমাণ। সারাটা জীবন ধরে এই মহামানবের মতো ইবাদাতের ক্ষেত্রে এ রকম একনিষ্ঠতা প্রদর্শন কোনো প্রতারকের পক্ষে কখনোই সম্ভব ছিল না। সুতরাং এটাই সেই সত্যের প্রতি গভীর বিশ্বাসের প্রমাণ বহন করে, যা তিনি প্রচার করে গেছেন।
সতেরো. নবীজি -এর কর্মতৎপরতাকে মোটামুটি তিনটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে বিভক্ত করা যায় : শেষ রাতের শান্ত সতেজতা এবং প্রাণশক্তির পর্যায়: ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ ঘুমের পর নবীজি এ সময় রাতের সালাত আদায় করতেন। দিনের প্রথম প্রহরেই তিনি ঘুমিয়ে যেতেন। রাতের সালাত শুরু করার পূর্বে নবীজি সর্বোচ্চ সজীবতা নিশ্চিত করতে চাইতেন। কারণ, এই সালাতই ছিল তাঁর অন্তরের প্রশান্তি এবং চোখের শীতলতা।
ফজর সালাতের পর : ভোরের ঈষৎ ঘুমের পরপরই এই পর্যায়ের শুরু। তিনি এ সময় ফজরের সালাত এবং সকালের জিকির সম্পন্ন করতেন। এরপর সাহাবীদের বিভিন্ন বিষয় শিক্ষা দিতেন এবং প্রয়োজনীয় উপদেশও দিতেন।
যোহর সালাতের পর : এই পর্যায় আরম্ভ হতো দুপুরের ভাতঘুমের পর। তিনি তখন যোহরের সালাত আদায় করতেন এবং কোনো সম্ভাব্য ঘটনা সম্পর্কে সাহাবীদের অবগত করতেন অথবা বিভিন্ন প্রয়োজন পূরণে তাদের সাথে বসতেন।
আঠারো. দৈনিক ফরজ নামাযগুলো ছিল সুস্পষ্টভাবে সময় বণ্টনের সন্ধিক্ষণ। দিনের সময় এই নামাযগুলো দ্বারা সুন্দরভাবে বিভক্ত। নিচে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের সময়কে কেন্দ্র করে নবীজি -এর দৈনিক কর্মসূচির সংক্ষিপ্ত বিবরণ উপস্থাপন করা হলো:
ফজর: ভোরের ভাতঘুম শেষ করে নবীজি জামাতে ফজরের সালাত আদায়ের পর সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত সাহাবীদের সাথে মসজিদে বসে থাকতেন। তারপর একে একে সকল স্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করতে যেতেন। সাক্ষাতের পর্ব শেষ হলে, সকালে সাহাবীদের দ্বীনী বিষয়-আশয় শিক্ষা দেয়ার জন্য একবার মজলিসে বসতেন। এরপর তিনি কারও-না-কারও সাথে দেখা করতে যেতেন। কখনো স্বীয় কন্যাদের সাথে, অথবা কখনো সাহাবীদের সাথে মিলিত হতেন। আবার কখনো নিজের কোনো প্রয়োজন থাকলে সেরে নিতেন। মধ্যদুপুর ছিল তাঁর ভাতঘুমের জন্য নির্ধারিত সময়। যোহরের আগেই তিনি বিশ্রাম গ্রহণ এবং রাতের সালাতের জন্য শরীরকে চনমনে করতে হালকা ঘুমিয়ে নিতেন।
যোহর : নবীজি দুপুরের হালকা ঘুম শেষ করে জামাতে যোহরের সালাত আদায় করতেন। ইতিমধ্যে কোনো কিছু ঘটে থাকলে সালাত শেষ করে তিনি সাহাবীদের সে সম্পর্কে অবহিত করতেন। সাহাবীদের উদ্দেশে বেশির ভাগ বক্তব্যই তিনি এই সময়ে দিতেন। তারপর ঘরে ফিরে তিনি যোহরের দুই রাকাত সুন্নাতে মুওয়াক্কাদাহ আদায় করতেন। সালাত শেষে তিনি আবার মসজিদে এসে সাহাবীদের সাথে কিছুক্ষণ বসতেন। আবার কখনো কখনো অন্য কোনো কাজ থাকলে তাও করতেন। যোহর এবং আসরের মধ্যবর্তী সময়টা ছিল তাদের প্রয়োজনীয় কাজ সেরে নেয়ার মুহূর্ত।
আসর: নবীজি আসরের নামায আউয়াল ওয়াক্তে ১২৫ শেষ করে সকল স্ত্রীর সাথে দেখা করতেন। কখনো তিনি আলাদা করে প্রত্যেকের ঘরে যেতেন, আবার কখনো স্ত্রীরা সকলে মিলে যার নির্ধারিত দিন থাকত তার ঘরে একত্র হতেন। আসর এবং মাগরিবের মধ্যবর্তী সময় তিনি মূলত পরিবারের সাথেই চিত্ত-বিনোদনে কাটাতেন।
মাগরিব : নবীজি মাগরিব শুরুর সাথেই সাথেই সালাত আদায় করে নিতেন। অতঃপর রাতের খাবার গ্রহণ করতেন। নৈশভোজই ছিল আরবদের দিনের প্রধান ভোজ।
ইশা : নবীজি জামাতে ইশার সালাত আদায় করে বাড়ি ফিরে যেতেন। এরপর হয় পরিবারের সাথে কিছু সময় কাটাতেন, নতুবা আনসারী কোনো সাহাবীর সাথে দেখা করতে চলে যেতেন। আবার কখনো কখনো আবু বকর রা. এবং উমর রা.-র বাড়িতে মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করে কিছু সময় অতিবাহিত করতেন। অতঃপর তিনি ঘরে ফিরে আসতেন এবং মধ্যরাত অব্দি ঘুমিয়ে কাটাতেন। জেগে উঠে এরপর রাতের সালাত আদায় করতেন। এই সময়টাতেই সবচেয়ে দীর্ঘ ঘুমের পর তিনি জেগে উঠতেন। ফলে তখন তিনি বেশি সতেজ থাকতেন। রাতের এক-তৃতীয়াংশ সময় নবীজি সালাত এবং দুআতেই অতিবাহিত করতেন। রাতের এক-ষষ্ঠাংশ বাকি থাকতে তিনি বিছানায় শুয়ে একটু জিরিয়ে নিতেন। ফজর সালাত পর্যন্ত এটাই ছিল তাঁর ভোরের হালকা ঘুম।
উনিশ, নবীজি -এর দিনলিপিই যেন তাঁর নবুয়্যতের একটা সুস্পষ্ট দলীল। যারা তাঁকে স্বচক্ষে দেখছে তারাই অনুধাবন করেছে যে, তিনিই আল্লাহর নবী, যার কাছ থেকে ঊর্ধ্বাকাশ থেকে ওহী নাযিল হয়। যারাই তাঁকে পর্যবেক্ষণ করেছে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে, তিনি কখনোই কারও সাথে মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হননি, কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি কখনোই তাঁর লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য ছিল না। মুসলিমরা সুমামাহ ইবনে 'উসালকে বন্দী করে মদীনায় নিয়ে আসে, যার কাছে নবীজিই ছিলেন সবচেয়ে ঘৃণিত মানুষ। বন্দী করে নিয়ে আসার পর নবীজি ﷺ তাকে মসজিদের একটি খুঁটিতে বেঁধে রাখার নির্দেশ দেন। যখন সুমামাহ নবীজির সমগ্র দিনের কার্যবিধি অর্থাৎ মসজিদে তাঁর আসা যাওয়া এবং মানুষের সাথে তাঁর আচরণ লক্ষ করল তখন সে অনুধাবন করল যে মুহাম্মদ ﷺ কোনো রাজা বা শাসক নন। সে নির্দ্বিধায় স্বীকার করে নিল যে, তিনিই আল্লাহর নবী। কিছুদিন তাঁকে এই অবস্থায় রাখার পর নবীজি ﷺ সুমামাহকে মুক্ত করে দেয়ার নির্দেশ দিলেন এবং স্বাধীনভাবে নিজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার অবকাশ দিলেন। সুমামাহ মুক্তি পেয়ে সোজা গিয়ে গোসল করে ফিরে আসলেন। তিনি নবীজি -এর সামনে গিয়ে বসে পড়লেন এবং বললেন, “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রাসূল। আল্লাহর শপথ! হে রাসূল, আপনার থেকে বেশি ঘৃণা আমি পৃথিবীর আর কাউকেই করতাম না। অথচ এখন আপনিই আমার কাছে সর্বাধিক প্রিয়। আপনার ধর্মের থেকে বেশি ঘৃণা আমি আর কোনো ধর্মকেই করতাম না। আর এখন আপনার ধর্মকেই আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। আপনার শহরের থেকে বেশি অপছন্দ আমি আর কোনো শহরকেই করতাম না। কিন্তু এখন এই শহরই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়।”
একই রকম অবস্থা হয়েছিল আদী ইবনে হাতিমের রা.; যিনি ছিলেন একজন খ্রিষ্টান এবং নিজ গোত্রের প্রধান। তিনি যখন নবীজি -এর সাথে হেঁটে যাচ্ছিলেন তখন বাচ্চাকে সাথে নিয়ে আসা এক নারী তাঁকে ডাকল। আদী রা. বললেন, "তারা গোপনে নবীজি -এর সাথে কথা বললেন, যেহেতু তিনি তাদের সাথে দাঁড়ানো ছিলেন। আমি তাঁর দিকে এগিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত দীর্ঘসময় তিনি তাদের সাথে কথাবার্তা চালালেন। আমি মনে মনে চিন্তা করলাম, "আমি নিশ্চিত যে, আপনি না আমার ধর্মের অনুসারী আর না নুমান ইবনে মুনযিরের ধর্মানুসারী। আপনি যদি কোনো রাজা হতেন তবে কোনো নারী বা বালক আপনাকে এত দীর্ঘসময় আটকে রাখতে পারত না। আপনার প্রতি আমার হৃদয়ের উষ্ণতা আমি তখনই অনুভব করতে পারলাম।” এই ঘটনার পরই আদী রা. ইসলাম গ্রহণ করেন।
বিশ. দিনলিপি থেকেই বোঝা যায় নবী মুহাম্মদ কতটা সুখী এবং মনোরম জীবনযাপন করতেন। যে সীমাহীন প্রশান্তি তিনি ঈমানের শক্তি থেকে লাভ করেছিলেন, তা আর কারও পক্ষেই অর্জন করা সম্ভব নয়। তিনিই সেই মহামানব, যিনি আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি জানতেন এবং আল্লাহর প্রতি এত দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করতেন, যা আর কেউই করতে সক্ষম নয়।
মেরাজের রাতে তিনি ঊর্ধ্বাকাশে এত উঁচুতে আরোহণ করেছিলেন যেখান থেকে ভাগ্যলেখক ফেরেশতাদের কলমের আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল, যারা রবের আদেশ লিপিবদ্ধ করতেন। তাঁকে জান্নাত দেখানো হয়েছিল, যার মাটি ছিল মিশকের সুগন্ধিযুক্ত এবং নুড়ি-পাথরগুলো ছিল মুক্তোর। তিনি জান্নাতের কিছু ফলও সংগ্রহ করতে চেয়েছিলেন। জান্নাতের আল-কাউসার নহরও নবীজি স্বচক্ষে দেখেছিলেন।
আমরা কি ভাবতে পারি, এত উচ্চ মর্যাদা লাভের পর নবীজি -এর কী রোমাঞ্চকর অনুভূতি হয়েছিল এবং এর ফলে তিনি কীভাবে রবের কাছে দুআ করেছিলেন, রবের হামদ-প্রশংসা বর্ণনা করেছিলেন? তিনি বলেছিলেন, “আমি সেই প্রভুর সাথেই থাকি, যিনি আমাকে খাওয়ান এবং পানীয় দান করেন।” নবীজি -এর ইবাদাতকালীন আনন্দানুভূতি কিংবা ঈমানের যে সুমিষ্ট স্বাদ তিনি অনুভব করেছেন, তা দুনিয়ার অন্য কোনো আনন্দ বা সুখানুভূতির সাথে তুলনীয় নয়।
তদুপরি তিনি তাঁর দুনিয়ার জীবন নিয়েও ছিলেন সন্তুষ্ট। তাঁর জীবনের প্রত্যেকটা পরতে পরতে আমরা সেই সুখের ছোঁয়া উপলব্ধি করতে সক্ষম হব। আর সেই প্রসন্নতার সমাদর এবং রহমানের কৃতজ্ঞতা আদায়ে তিনিও কখনো কার্পণ্য করেননি। আল্লাহই তাঁকে উদ্বেগ এবং দুঃখানুভূতি থেকে বাঁচিয়ে রেখেছেন এবং যাবতীয় রোগ-শোক থেকে হেফাজত করেছেন। শারীরিক এবং মানসিক সুস্থতাসম্পন্ন এক সুখী-সুন্দর জীবন উপভোগ করেছেন তিনি। তাঁর জীবনকে স্থায়ী এবং সামগ্রিকভাবে কল্যাণকর হিসেবেই চিত্রায়িত করা যায়। তিনি প্রেমময়ী স্ত্রী লাভ করেছিলেন যাদের সাথে নিজের ভালোবাসার আদানপ্রদান করতে পারতেন। নবীজি স্বীয় স্ত্রীদের সাথে নির্ভেজাল ভালোবাসা এবং মমতা ভাগাভাগি করে নিতেন। পুণ্যবতী কন্যা এবং দুই পুত্র ছিলেন তাঁর দুনিয়াবি জীবনে পাওয়া সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামাত। তাদের তিনি মাতাপিতার সুমিষ্ট ভালোবাসার স্বাদ উপভোগ করিয়েছেন। আবু বকর এবং উমর রা. এর মতো সর্বাধিক সত্যবাদী মানুষেরাই ছিলেন তাঁর সাথি। তাদের সাথে সারা জীবনের দায়িত্বের বোঝা ভাগ করে নিয়েছেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, “আবু বকর এবং উমরের সাথেই আমার শুরু; তাদের সাথেই আমি পথ চলেছি; আর আবু বকর এবং উমরের সাথেই আমার প্রস্থান।” তাঁর জামাতা আলী ইবনে আবু তালিবকে তিনি অত্যন্ত ভালোবাসতেন। স্বয়ং আল্লাহও যে তাকে ভালোবাসতেন এটি নবীজি -এর অজানা ছিল না। আলী রা. তাঁর কাছাকাছিই বাস করতেন। নবীজি -এর অন্যান্য জামাতারাও ছিলেন তাঁর প্রতি বিশ্বস্ত। তারা তাঁকে যা-ই বলতেন, নিষ্ঠার সাথে বলতেন এবং যে ওয়াদাই করতেন তা পূরণ করতেন। নবীজির অন্য দুই জামাতা ছিলেন উসমান ইবনে আফফান রা. এবং আবুল আস ইবনে আল-রাবী রা.। এ ছাড়াও নবীজির সঙ্গী ছিলেন অসংখ্য অনুগত সাহাবা। তাদের বিশ্বাস এবং হৃদয়ানুভূতির প্রশংসা করে মহান আল্লাহ বলেন,
فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنْزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ
“আল্লাহ জানতেন তাদের অন্তরে কী আছে, এ জন্য তিনি তাদের ওপর প্রশান্তি অবতীর্ণ করলেন।” ১২৬
এভাবেই নবীজি তাঁর সঙ্গী-সাথিদের নিয়ে ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। নবীজি সারা জীবন একের পর এক সাফল্য অর্জন করে গেছেন। আর জীবনের সবচেয়ে অধিক সুখানুভূতি সাফল্য লাভের মাধ্যমেই অনুভূত হয়। মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বানের গুরুদায়িত্ব তিনি সুচারুরূপে পালন করেছেন এবং দলে দলে মানুষকে ইসলামে প্রবেশ করতেও স্বচক্ষে দেখে গেছেন।
আমি কোনোভাবেই নবীজি -এর সেই পরিতৃপ্তি কল্পনা করতে পারব না, যা তিনি মসজিদে উত্তরোত্তর মুসল্লীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে দেখে এবং দুনিয়ায় ইসলামের ত্বরিত প্রসার দেখে কিংবা দলে দলে মানুষের ইসলাম গ্রহণ করা দেখে অনুভব করেছিলেন। এমনকি আমি নিজেই নিজের অনুভূতি বর্ণনা করতে সক্ষম নই, যখন আমি নবীজি -এর বিদায় হজ্বের অনুভূতি নিয়ে কল্পনা করার চেষ্টা করি। সেখানে তিনি সুবিশাল জনতার ভিড় অবলোকন করেছিলেন, যারা সমস্বরে ঘোষণা করেছিল, “আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর বাণী আমাদের নিকট পৌঁছে দিয়েছেন এবং স্বীয় দায়িত্ব পালন করেছেন।"
এই সকল কিছুই ছিল রবের পক্ষ থেকে তাঁর নিকট পৌঁছে দেয়া কিছু প্রাচুর্য। মহান আল্লাহ নবীজিকে সম্বোধন করে বলেছেন,
وَلَسَوْفَ يُعْطِيكَ رَبُّكَ فَتَرْضَى
“শীঘ্রই আপনার রব আপনাকে এত দেবেন যে আপনি খুশি হয়ে যাবেন।” ১২৭
তাঁর জীবনী অধ্যয়ন করলে আমরা দেখব, তিনি সুখ-সমৃদ্ধির কদর করেছেন, জীবনের সৌন্দর্য উপভোগ করেছেন এবং এত এত নিয়ামত বর্ষণ করায় রবের প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করেছেন। এক চুমুক পানীয় পানের পর কিংবা এক লোকমা খাবার গ্রহণের সাথে সাথেই তিনি আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপন করতে ভুলতেন না। তিনি বলতেন, “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি আমাদের যথেষ্ট খাবার এবং পানীয় দান করেছেন। আমাদের প্রভুর প্রতি কখনোই অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা যায় না। আমরা না তাঁর কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিই, আর না তাঁর নিয়ামতের প্রতি অমুখাপেক্ষিতা প্রদর্শন করতে পারি। হে আমাদের রব, তুমিই আমাদের খাদ্য-পানীয় ও ধন-সম্পদ দান করেছ এবং আমাদের পথপ্রদর্শন করেছ ও জীবন দান করেছ।”
যখন তিনি ঘুম থেকে জেগে উঠতেন তখনো ভালো ঘুম উপভোগের জন্য তাদের কথা চিন্তা করে রবের কৃতজ্ঞতা আদায় করতেন, যারা প্রতিনিয়তই নিদ্রাহীনতায় ভুগছে। তিনি পুরোপুরি সতেজ হয়ে ঘুম থেকে উঠতেন এবং এটা যে আল্লাহর অনুগ্রহের ফলেই সম্ভব হয়েছে তা স্মরণ করতেন। তিনি ঘুম থেকে জেগেই বলতেন,
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَحْيَانَا بَعْدَ مَا أَمَاتَنَا، وَإِلَيْهِ النُّشُورُ
“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেছেন। তাঁর কাছেই আমাদের প্রত্যাবর্তন।”
সচরাচর খাবার গ্রহণ এবং ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর তিনি অত্যন্ত পরিতৃপ্তি অনুভব করতেন এবং মুখেও তাঁর স্বীকৃতি প্রদান করতেন। অথচ প্রতিদিন নিয়ামাত উপভোগের ফলে এই অনুভূতি খুব সাদামাটা হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। তাহলে চিন্তা করে দেখুন তাঁর সেই পরিতুষ্টির মাত্রা, যা তিনি নতুন নতুন এবং ক্রমাগত নিয়ামত লাভের পর অনুভব করতেন। আমরা উপলবদ্ধি করতে সক্ষম হই, প্রতিবারই নিয়ামত লাভের পর তিনি যথাযথরূপে রবের কৃতজ্ঞতা আদায়ে তিনি কিছুটা সময় ব্যয় করতেন। আমরা প্রায়ই স্বীয় প্রভুকে স্মরণ করে তাঁকে বলতে শুনি, "সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমার ওপর তাঁর অনুগ্রহ বর্ষণ করেছেন এবং আমাকে সীমাহীন নিয়ামাত দান করেছেন। সকল পরিস্থিতিতেই সমুদয় প্রশংসা আল্লাহর।”
আমাদের কাছে একদম স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া জিনিসগুলোর মূল্য আমরা খুব একটা অনুধাবন করতে পারি না, কিন্তু তা যে আসলেই কতটা অমূল্য, সে দিকেই নবীজি *আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চেয়েছেন। যেমন: রাতের নিরাপদ ঘুম, দিনের খাবার কিংবা সুন্দর স্বাস্থ্য ইত্যাদি। তিনি বলেন, “যে-ই নিরাপদে ঘুম থেকে জেগে ওঠে, সুন্দর স্বাস্থ্য উপভোগ করে এবং দিনে খাবার গ্রহণ করতে পারে সে যেন দুনিয়ার যাবতীয় সুখই উপভোগ করল।” এই সাদামাটা জিনিসগুলোর কী অদ্ভুত সুন্দর প্রশংসাই-না তিনি করেছেন, যার অধিক প্রশংসা আর কেউই করতে সক্ষম নন।
আল্লাহপ্রদত্ত নিয়ামতসমূহ এবং তাঁর অনুগ্রহ যখন আমরা পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করব তখন এসবের মিষ্টতা আমরা আস্বাদন করব, এগুলো উপভোগের ফলে আমাদের সুখানুভূতি আরও বেশি বৃদ্ধি পাবে। এই অনুভূতি আমাদের জীবনকে আরও বেশি সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে ভরিয়ে তুলবে। সেই সত্তার প্রতি কৃতজ্ঞতায় আমাদের হৃদয় টইটুম্বুর হয়ে উঠবে, যিনি স্বীয় অনুগ্রহের বদৌলতে আমাদের এত সব নিয়ামাত দান করেছেন। এভাবেই একটি নিয়ামাতের কৃতজ্ঞতা আদায়ের ফলে আরও নিয়ামাত আসতে থাকে, যা আমাদের জীবনকে আরও অধিক সুখী, সমুজ্জ্বল এবং উর্বর করে তোলে।
বাইশ. চলুন দেখে আসা যাক, রাসূল -এর ব্যস্ত দিনলিপি এবং কীভাবে এই ব্যস্ততার সাথে তিনি সানন্দে মানিয়ে নিয়েছিলেন। তারপর স্মরণ করি, সেসব কষ্ট-ক্লেশের কথা, যা তাঁর জীবনে আঘাত হেনেছিল এবং কেমন করে তিনি সেই দুঃসময় পার করেছিলেন। শিশুকালে তাঁকে একের পর এক প্রিয়জন হারানোর ব্যথা সইতে হয়েছে। তিনি পিতা-মাতা এবং দাদাকে শৈশবেই হারিয়েছেন। নবুয়্যত প্রাপ্তির পর তাঁকে সীমাহীন নির্যাতন নিপীড়ন ভোগ করতে হয়েছে। উপরন্তু হারিয়েছিলেন তাঁর প্রথম স্ত্রী, প্রিয়তমা খাদিজা রা.-কে। জীবদ্দশায় তিনি ছয় সন্তানের মৃত্যু স্বচক্ষে অবলোকন করেছেন। যে শহরকে তিনি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন সেই শহর ত্যাগে তাঁকে বাধ্য করা হয়েছিল। উহুদের যুদ্ধে নবীজি অসংখ্য ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন এবং প্রিয় সাহাবীদের হারিয়েছিলেন। তাঁর হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল যখন তাঁর নিষ্কলঙ্ক প্রিয়তমা স্ত্রীকে ব্যভিচারের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। এ ছাড়াও তিনি আরও অনেক কষ্টকর মুহূর্তের সম্মুখীন হয়েছিলেন।
এতৎসত্ত্বেও, সব ধরনের নেতিবাচক অনুভূতিকে দূরে ঠেলে দেয়ার অভূতপূর্ব ক্ষমতা ছিল নবীজি -এর, ছিল জীবনকে পুনর্বার চালিত করার অপরিসীম সঞ্জীবনী শক্তি এবং প্রতিটা মুহূর্তের সাথে ইতিবাচকভাবে মানিয়ে নেয়ার মতো দক্ষতা।
এ কারণে তাঁর সমৃদ্ধ জীবনের প্রতি আলোকপাত করলে মনে হবে যেন, তিনি কখনোই কোনো কষ্টকর অভিজ্ঞতা বা পরীক্ষার সম্মুখীন হননি। অথচ সত্য এটাই যে, নবীজি এত নিশ্চিন্ত জীবন উপভোগ করেননি। তবে সকল ধরনের দুঃখ-যন্ত্রণা থেকে নিষ্কৃতি লাভের অভাবনীয় দক্ষতা ছিল তাঁর। তাঁর জীবনের প্রতিটা মুহূর্তেরই কোনো-না-কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিল। তথাপিও তিনি সে জীবনে আনন্দ খুঁজে পেয়েছেন। তাঁর জীবন যেন প্রতিটা মুহূর্তেই নবরূপ লাভ করত, নিরবচ্ছিন্ন ছিল এর ছুটে চলা। তিনি সেভাবেই জীবন কাটিয়েছেন যেভাবে কাটানো উচিত ছিল।
তেইশ. আমরা বিস্মিত হই, সাহাবীদের জীবনের মাঝেও যখন আমরা প্রিয় নবীর সচেতন ও সরব উপস্থিতি লক্ষ করি, যখন আমরা তাদের সাথে নবীজির প্রাণশক্তিপূর্ণ আলাপ-আলোচনা দেখি। আমরা তাই নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, প্রত্যেক সাহাবীর সাথেই নবীজি -এর কোনো বিশেষ ঘটনা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কথোপকথন আছে। তিনি তাদের নবজাতকদের দেখতে যেতেন, কোলে নিতেন। সেই নবজাতকেরা প্রথম যে জিনিসের স্বাদ নিত, তা ছিল নবীজি -এর পবিত্র থুতু মোবারক এবং তাঁর বরকত। তাদের দাসরা দিনের প্রথম প্রহরেই নবীজি-এর সাহচর্য পেতে তাঁর মসজিদে জড়ো হতো এবং তিনি তাঁর মোবারক হাত তাদের পানির পাত্রসমূহে ডুবিয়ে দিতেন। ছোট ছোট বাচ্চার সাথে রাস্তায় দেখা হলে তিনি তাদের চেহারায় হাত বুলিয়ে দিতেন এবং বলতেন তিনি তাদের কতটা ভালোবাসেন। তিনি কোনো বালকের চেহারায় পানি ছিটিয়ে দিয়েছেন, ছোট কোনো মেয়েকে রঙিন কাপড় পরিয়ে দিয়েছেন এবং এভাবেই প্রতিটি বাচ্চার জীবনেই কোনো-না-কোনো সুখস্মৃতির সাক্ষী হয়ে আছেন প্রিয় নবীজি । সাহাবীরা যখন তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতেন তখন তিনি তাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসতেন এবং মোবারক হাতের সুগন্ধ তাদের হাতে ছুঁইয়ে দিতেন। তিনি তাদের বাড়িতে যেতেন এবং তাদের সাথে খাবার খেতেন। তাদের আনন্দময় মুহূর্তে তিনি শরীক থাকতেন, যা তাদের আনন্দ বহুগুণ বাড়িয়ে দিত। গোশত ভক্ষণের জন্য উট জবাই করার মুহূর্তে তারা তাঁকে আমন্ত্রণ জানালেন। তিনি আসলেন, দেখলেন এবং তাদের জন্য অপেক্ষা করলেন। হাবশী গোলামদের মসজিদে খেলার দৃশ্য তিনি উপভোগ করেছেন এবং তাঁর অনুভূতি তাদের কাছে প্রকাশও করেছেন এই বলে যে, “খেলা চালিয়ে যাও, হে বনু আরফিদাহ।"
নবীজি রোগাক্রান্ত সাহাবীদের দেখতে যেতেন। তারা জেগে উঠলে দেখতে পেতেন যে প্রাণপ্রিয় রাসূল তাদের দিকে তাকিয়ে আছেন, তাঁর শীতল হাতের স্পর্শ তাদের ব্যথা দূর করে দিচ্ছে। তিনি তাদের জানাযায় অংশ নিতেন এবং তাদের প্রিয়জনদের কবরের পাশে দাঁড়াতেন। তাদের দুঃখে তিনি অশ্রুপাত করতেন। তারা চলে গেলে তিনি তাদের অভাব অনুভব করতেন। মজলিসে অনুপস্থিত সাহাবীদের খোঁজ নিতেন তিনি। সে বিষয়ে সেই সাহাবীদেরও অবহিত করা হতো। এভাবেই তাদের জীবনে ছিল নবীজি -এর অশেষ ভূমিকা। সাহাবীদের জীবন আলোকিত হয়েছিল তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি এবং গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শের বদৌলতে।
তাই তো মৃত্যুর পরও নবীজি বাস্তব ছিলেন তাদের চিন্তা-চেতনায়, জীবন্ত ছিলেন তাদের হৃদয়ে, জ্বলজ্বল করেছিলেন তাদের চোখের তারায়। প্রত্যেকের সাথেই নবীজি -এর আছে কিছু অবিস্মরণীয় স্মৃতি। তাঁর ব্যাপারে যখন সাহাবীরা আলোচনা করতেন তখন মনে হতো যেন তিনি সেই মুহূর্তে তাদের সামনে উপস্থিত আছেন। আপনি তাদের বলতে শুনবেন, “আমি যেন এই মুহূর্তে তাঁর পদযুগলের শুভ্রতা অবলোকন করছি..."; "যেন আমি তাঁর আংটির ঝলক দেখতে পাচ্ছি..."; "আমি এখনো তাঁর হাতের শীতলতা অনুভব করছি..."; "তাঁর হাত ছিল বরফের চেয়েও শীতল এবং মিশকের থেকেও বেশি সুগন্ধিযুক্ত..."; "আমি যেন এই মুহূর্তে তাঁর পায়ের শীতলতা আমার হাতে অনুভব করছি...।” সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
চব্বিশ. নবীজি -এর দৈনিক রুটিন অধ্যয়ন তাঁর সম্মানিত সত্তার প্রতি আমাদের ভালোবাসা আরও বাড়িয়ে তোলে। নিঃসন্দেহে তাঁর সাহাবীরা তাঁকে এতটা ভালোবাসতেন এবং শ্রদ্ধা করতেন যেমনটা অন্য কেউ কাউকে করেনি। এমনকি নবীজি -এর জীবনের যে দিকই সাহাবীরা অবলোকন করেছেন তা-ই তাদের অন্তর তাঁর প্রতি ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধায় ভরিয়ে দিয়েছে। নবীজি -এর জীবনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মুহূর্তের নিখুঁত বর্ণনা তাঁর প্রতি সম্ভ্রম বাড়িয়ে দেয় এবং তাঁর প্রতি আকর্ষণকে আরও শক্তিশালী করে। তারা যেভাবে জীবন অতিবাহিত করেছেন তেমনটা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না হলেও তা আমাদের জন্য জ্ঞানের উৎস নিঃসন্দেহে। সাহাবীরা যেভাবে নবীজিকে দেখেছেন এবং শুনেছেন, আমরা যত বেশি সে সম্পর্কে জানব এবং অনুধাবন করব তত বেশি আমরা সাহাবীদের মতো করেই নবীজিকে ভালোবাসতে পারব। নবীজি-এর পুরো দিনের কার্যবিধির পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা তাঁর ভালোবাসায় আমাদের হৃদয় সমৃদ্ধ করে। তিনি এমন একজন মানুষ, যাকে আপনি যত বেশি জানবেন তত বেশি ভালোবাসবেন। যত অধিক তাঁর সম্পর্কে অধ্যয়ন করবেন ততটাই তাঁকে দিব্যচোখে দেখার আশা জাগবে।
প্রায় সময়ই নবীজি -এর জীবনের কোনো একটা ঘটনা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করার জন্য আমি সময়ের ব্যবধানকে মিলিয়ে দিই যাতে করে সেই ঘটনা আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তখন আমি তাঁকে আমার খুব কাছে অনুভব করি এবং তাঁর আলোয় গভীরভাবে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। মনে হয় যেন আমি তাঁর নিঃশ্বাসের ঘ্রাণ নিতে পারছি। আমার তখন ইচ্ছে হয় নুয়ে পড়ে তাঁর হাতে চুমু খেতে এবং তাঁর হাতের তালুর শীতল ছোঁয়া পেতে। হৃদয়ের সবটুকু আবেগ দিয়ে বলতে ইচ্ছে হয়: “আল্লাহর শপথ, ওগো রাসূলাল্লাহ! আমি আপনাকে ভালোবাসি আমার নিজের থেকেও বেশি।”
হে প্রভু, আমরা তোমার রাসূল হযরত মুহাম্মদ এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছি, তাঁকে না দেখেই তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করেছি। ওগো প্রভু, তাঁর দর্শন লাভ হতে বিচার দিবসে আমাদের বঞ্চিত কোরো না। তাঁর অনুসারীদের সাথে আমাদের পুনরুত্থিত করো এবং আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করো, যাদের হয়ে তিনি তোমার কাছে শাফায়াত করবেন। তাঁর কাউসার থেকে পানি পানের এবং ফিরদাউসে আমাদের তাঁর সঙ্গ লাভের তৌফিক দিয়ো। আম্বিয়া (আ.), হেদায়াতপ্রাপ্ত, শহীদ এবং সৎকর্মশীলদের সাথে আমাদের থাকার তৌফিক দিয়ো, যাদের ওপর তুমি তোমার অপার অনুগ্রহ বর্ষণ করবে। কতই-না উত্তম তাদের সঙ্গ!
আমাদের রব, আমরা বিশ্বাস এনেছি সে সব জিনিসের ওপর, যা তুমি ঊর্ধ্বাকাশ থেকে আমাদের ওপর প্রেরণ করেছ এবং আমরা তোমার রাসূলের ওপরও বিশ্বাস স্থাপন করেছি। অতএব সাক্ষ্যদাতাদের সাথে আমাদের নাম লিখে নিয়ো।
ওগো মালিক, নবী মুহাম্মদ এবং তাঁর পরিবারবর্গের ওপর অনুগ্রহ বর্ষণ করো যেমনভাবে শান্তি এবং অনুগ্রহ বর্ষণ করেছ ইবরাহীম (আ.) এবং তাঁর পরিবারবর্গের ওপর। যাবতীয় প্রশংসার যোগ্য একমাত্র তুমি, তুমিই মহিমাময়।
টিকাঃ
১২৫. সালাতের ওয়াক্ত শুরুর সাথে সাথে
১২৬. সূরা আল-ফাতহ ৪৮:১৮
১২৭. সূরা দোহা ৯৩:৫
📄 গ্রন্থপঞ্জী
গ্রন্থপঞ্জী লেখকদের নামের বর্ণনাক্রম অনুসারে।
* আত তাবারানি, সুলাইমান ইবন আহমাদ; আল আহাদিস আত তিওয়াল।
* আত তাবারানি, সুলাইমান ইবন আহমাদ; আদ দুআ'।
* আত তাবারানি, সুলাইমান ইবন আহমাদ; আল মু'যাম আল আওসাত।
* আত তাবারানি, সুলাইমান ইবন আহমাদ; আল মু'যাম আল কাবির।
* আত তাবারানি, সুলাইমান ইবন আহমাদ; আল মু'যাম আস সাগির।
* আত তাবারানি, সুলাইমান ইবন আহমাদ; মাকারিম আল আখলাক।
* আত তাবারানি, সুলাইমান ইবন আহমাদ; মুসনাদ আশ শামিইয়্যিন।
* আত তাবারি, মুহাম্মাদ ইবনু জারির; তাযহিব আল আতহার।
* আত তাবারি, মুহিবুদ্দিন; আর রিয়াদ আন নাদিরাহ ফি মানাকিব আল আশারাহ।
* আত তাহাওয়ি, আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ; শারহ মা'আনি আল আতহার।
* আত তাহাওয়ি, আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ; শারহ মুশকিল আল আতহার।
* আত তায়ালিসি, আবু দাউদ সুলাইমান ইবন দাউদ; আল মুসনাদ।
* আত তিরমিযি, মুহাম্মাদ ইবন 'ইসা; আল জামি' আল মুখতাসার সুনান আত তিরমিযি।
* আত তিরমিযি, মুহাম্মাদ ইবন 'ইসা; কিতাব আল 'ইলাল আল কাবির।
* আদ দারাকুতুনি, আলি ইবন 'উমার; সুনান আদ দারাকুতুনি।
* আদ দারিমি, আব্দুল্লাহ; আল মুসনাদ।
* আদ দাইনুরি, আহমাদ ইবন মারওয়ান; আল মুজালাসাহ।
* আদ দুলাবি, মুহাম্মাদ ইবন আহমাদ; আল কুনা ওয়াল আসমাহ।
* আন নাসাঈ, আহমাদ ইবন শুয়াইব; আস সুনান আল কুবরা।
* আন নাসাঈ, আহমাদ ইবন শুয়াইব; সুনান আন নাসাঈ।
* আন নাবাওয়ি, ইয়াহিয়া ইবন শারাফ; শারহ সাহিহ মুসলিম।
আবু আওয়ানাহ, ইয়াকুব ইবন ইসহাক; আল মুসতাখরাজ।
আব্দুর রাজ্জাক আস-সান'আনি; আল মুসান্নাফ।
আব্দ ইবন হুমাইদ; আল মুসনাদ।
আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ; ফাদ্বাইল উসমান।
আবুল ফিদা', ইমাদ উদ্দিন ইসমাইল ইবন আলি; আল মুখতাসার ফি আখবার আল বাশার।
আবুল শাইখ; আখলাক আন নাবিঈ।
আবুল শাইখ; আল আজামাহ।
আবুল শাইখ; আল আমসাল।
আবু বকর আশ শাফিঈ; আল গাইলানিয়্যাত।
আবু দাউদ, সুলাইমান ইবন আল আশ'আছ; সুনান আবু দাউদ।
আবু নুয়াইম, আল ফাদল ইবন দুকাইন; আস সালাব।
আবু ইয়ালা, আহমাদ ইবনু আলি; আল মুসনাদ।
আবু ইউসুফ, ইয়াকুব ইবন ইবরাহিম; আল আছার।
আয যাহাবি, শামসুদ্দিন মুহাম্মাদ; সিয়ার আ'লামিন নুবালা।
আয যিরকলি, খাইরুদ্দিন; আল আ'লাম।
আর রাফি'ই, মুসতাফা সাদিক, ওয়াহয়ি আল কালাম।
আর রামহুরমুযি, মুহাম্মাদ ইবন হারুন; আল মুসনাদ।
আল আললা'ই- ইছারাত আল ফাওয়াইদ।
আল আমিরি; বাহজাত আল মাহফিল ওয়া বুগইয়াত আল আমাছিল ফি তালকিস আল- মু'যিজাত ওয়াআ সিয়াল ওয়াস শামাইল।
আল আইনি, বদর উদ্দিন মাহমুদ ইবন আহমাদ; উমদাত আল কারি।
আল আজিমাবাদি, মুহাম্মাদ শামসুল হক; আওন আল মা'বুদ শারহ সুনান আবু দাউদ।
আল আওদাহ, সালমান; ফিকহুল ইবাদাহ।
আল আজুররি, মুহাম্মাদ ইবনুল হুসাইন; আশ শারিয়্যাহ।
আল আলবানি, মুহাম্মাদ নাসির উদ্দিন; আসল সিফাত সালাতুন নাবিঙ্গ।
আল আলবানি, মুহাম্মাদ নাসির উদ্দিন; ইরওয়া আল গালিল।
আল আলবানি, মুহাম্মাদ নাসির উদ্দিন; সিলসিলাত আল আহাদিছ আস সাহীহাহ।
আল ওয়াহিদি, 'আলি ইবন আহমাদ; আসবাব আন নুযুল।
আল ক্বাদি, ইসমাইল; ফাদ্বল আস সালাহ আলা আন নাবি।
আল আসফাহানি, আবু নুয়াইম আহমাদ ইবন আব্দুল্লাহ; আল মুসতাখরাজ আলা সাহিহ মুসলিম।
আল আসফাহানি, আবু নুয়াইম আহমাদ ইবন আব্দুল্লাহ; দালাইল আন নুবুওয়াহ।
আল আসফাহানি, আবু নুয়াইম আহমাদ ইবন আব্দুল্লাহ; হিলইয়াত আল আওলিয়াহ।
আল আসফাহানি, আবু নুয়াইম আহমাদ ইবন আব্দুল্লাহ; মা'রিফাত আস সাহাবাহ।
আল আসফাহানি, আবু নুয়াইম আহমাদ ইবন আব্দুল্লাহ; সিফাতুল জান্নাহ।
আল আসফাহানি, ইসমাইল ইবন মুহাম্মাদ; আত তাগরিব ওয়াত তারহিব।
আল ইরাকি, আব্দুর রাহমান ইবনুল হুসাইন; মাহাজ্জাত আল কুরাব ইলা মাহাব্বাত আল আরব।
আল ক্বাসতালানি, আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ; ইরশাদ আস সারি।
আল কুরতুবি, আহমাদ ইবন 'উমার; আল মুফহিম।
আল কুতাই'য়ি, আহমাদ ইবন জাফর; জুয' আল আলিফ দিনার।
আল খাল্লাল, আবু বকর আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ; আল আমর বিল মা'রুফ ওয়ান নাহিহ আনিল মুনকার।
আল খারা'ইতি, মুহাম্মাদ ইবন জাফর; মাকারিম আল আখলাক।
আল খারা'ইতি, মুহাম্মাদ ইবন জাফর; মাসাওয়ি' আল আখলাক।
আল খাতিব আল বাগদাদি, আহমাদ ইবন আলি; আল ফাকিহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ।
আল খাতিব আল বাগদাদি, আহমাদ ইবন আলি; আল জামি' লি আখলাক আর রাওয়ি ওয়াল আদাব আস সামি'।
আল খাতিব আল বাগদাদি, আহমাদ ইবন আলি; আল মুবহামাত।
আল খাতিব আল বাগদাদি, আহমad ইবন আলি; আল মুত্তাক্কিফ ওয়াল মুফতারিক।
আল খাতিব আল বাগদাদি, আহমাদ ইবন আলি; গাওয়ামিদ আল আসমা আল মুবহামাহ।
আল খাতিব আল বাগদাদি, আহমাদ ইবন আলি; তারিখ বাগদাদ।
আল জানাদি, আল মুফাদ্দাল ইবন ইবরাহিম; ফাদ্বাইল আল মাদিনাহ।
আল তুরাইরি, আব্দুল ওয়াহাব; কিসাস নাবাওয়িয়াহ।
আল ফাকিহি, আখবার মাক্কাহ।
আল ফাসাওয়ি, ইয়া'কুব ইবন সুফিয়ান; আল মা'রিফাহ ওয়াত তারিখ।
আল ফিরইয়াবি, জাফর ইবন মুহাম্মাদ; দালাইল আন নুবুওয়াহ।
আল বাগাওয়ি, আল হুসাইন ইবন মাসউদ; শারহুস সুন্নাহ।
আল বায়হাকি, আহমাদ ইবন আল হুসাইন; আল আদাব।
আল বায়হাকি, আহমাদ ইবন আল হুসাইন; আল আসমা ওয়াস সিফাত।
আল বায়হাকি, আহমাদ ইবন আল হুসাইন; আল বা'ছ ওয়ান নুশুর।
আল বায়হাকি, আহমাদ ইবন আল হুসাইন; আদ দাওয়াতুল কাবির।
আল বায়হাকি, আহমাদ ইবন আল হুসাইন; আল ই'তিকাদ।
আল বায়হাকি, আহমাদ ইবন আল হুসাইন; আল কাদা ওয়াল ক্বাদর।
আল বায়হাকি, আহমাদ ইবন আল হুসাইন; আস সুনানুল কুবরা।
আল বায়হাকি, আহমাদ ইবন আল হুসাইন; দালাইল আন নুবুওয়াহ।
আল বায়হাকি, আহমাদ ইবন আল হুসাইন; ইছবাত আ'দাব আল কাবর।
আল বায়হাকি, আহমাদ ইবন আল হুসাইন; শুয়াবুল ইমান।
আল বাজার, আবু বকর; আল মুসনাদ।
আল বুখারি, মুহাম্মাদ ইবন ইসমাইল; আল আদাবুল মুফরাদ।
আল বুখারি, মুহাম্মাদ ইবন ইসমাইল; আক কিরা'আহ খালফ আল ইমাম।
আল বুখারি, মুহাম্মাদ ইবন ইসমাইল; আত তারিখুল কাবির।
আল বুখারি, মুহাম্মাদ ইবন ইসমাইল; খালক আফ’আল আল 'ইবাদ।
আল বুখারি, মুহাম্মাদ ইবন ইসমাইল; রাফউল ইয়াদাইন।
আল বুখারি, মুহাম্মাদ ইবন ইসমাইল; সাহিহ বুখারি।
আল মাকদিসি, আব্দুল গনি; আহাদিস আল শি'র।
আল মাকদিসি, আদ দিয়া'; আল আহাদিছ আল মুখতারাহ।
আল মারওয়াযি, মুহাম্মাদ ইবন নাসর; আস সুন্নাহ।
আল মারওয়াযি, মুহাম্মাদ ইবন নাসর; কিতাবুল উয়িতর।
আল মারওয়াযি, মুহাম্মাদ ইবন নাসর; কিয়ামুল লাইল।
আল মারওয়াযি, মুহাম্মাদ ইবন নাসর; তা'যিম ক্বাদর আস সালাহ।
* আল মিনাওয়ি, মুহাম্মাদ আব্দুর রউফ; ফাইদ আল ক্বাদির।
* আল হাকিম, আন নিশাপুরি, মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ; আল মুসতাদরাক আলা আস সাহিহাইন।
* আল হুমাইদি, আবু বকর আব্দুল্লাহ ইবন আল যুবাইর; আল মুসনাদ।
* আশ শাফিঈ, মুহাম্মাদ ইবন ইদরিস; আল মুসনাদ।
* আশ শাশি, হাইছাম ইবন কুলাইব; আল মুসনাদ।
* ইবন আব্দুল বার; আত তামহিদ।
* ইবন আছাকির, আলি ইবন আল হাসান; আল আরবা'ইন ফি মানাকিব উম্মাহাত আল মু'মিনীন।
* ইবন আছাকির, আলি ইবন আল হাসান; মু'জাম ইবন আছাকির।
* ইবন আছাকির, আলি ইবন আল হাসান; তারিখ দিমাশক।
* ইবন আবি আছিম, আহমাদ ইবন 'আমর; আল জিহাদ।
* ইবন আবি আছিম, আহমাদ ইবন 'আমর; আস সুন্নাহ।
* ইবন আবি আছিম, আহমাদ ইবন 'আমর; আল আহাদ ওয়াল মাছানি।
* ইবনু আবিদ দুনইয়া; আল 'ইয়াল।
* ইবনু আবিদ দুনইয়া; আস সামত।
* ইবনু আবিদ দুনইয়া; আত তাহাজ্জুদ ওয়াল কিয়ামুল লাইল।
* ইবনু আবিদ দুনইয়া; আত তা'ওয়াদু ওয়াল খুমুল।
* ইবনু আবিদ দুনইয়া; মাকারিম আল আখলাক।
* ইবনু আবিদ দুনইয়া; মুদারাত আন নাস।
* ইবনু আবিদ দুনইয়া; ক্বিসার আল আমাল।
* ইবন আবি হাতিম, আব্দুর রহমান ইবন মুহাম্মাদ; আল 'ইলাল।
* ইবন আবি শাইবাহ, আবু বকর; আল মুসনাদ।
* ইবন আবি শাইবাহ, আবু বকর; আল মুসান্নাফ।
* ইবন আবি শাইবাহ, মুহাম্মাদ ইবন উসমান; আল আরশ।
* ইবন আল জা'দ, আলি; আল মুসনাদ।
* ইবনুল জাওযি, আবুল ফারাজ আব্দুর রাহমান ইবন আলি; কাশফ আল মুশকিল।
ইবন আল মাগাযিল, আলি ইবন আল হাসান; মানাক্কিব 'আলি।
ইবনুল মুবারাক, আব্দুলাহ; আল যুহুদ।
ইবন আন নাজ্জার, মুহাম্মাদ ইবন আহমাদ; আদ দুররাহ আছ ছামিনাহ ফি আখবার আল মাদিনাহ।
ইবনুস সুন্নি, আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ; 'আমাল আল ইয়াওম ওয়াল লাইলাহ।
ইবনুল ওয়ারদি, 'উমার ইবনু মুযাফফার; তারিখ।
ইবন বাত্তাল, আলি ইবন খালাফ; শারহ সাহিহ আল বুখারি।
ইবন হাজার আল আসকালানি, আহমাদ ইবন আলি; আল ইসাবাহ ফি তামিয়ায আস সাহাবাহ।
ইবন হাজার আল আসকালানি, আহমাদ ইবন আলি; ফাতহুল বারি।
ইবন হাজার আল আসকালানি, আহমাদ ইবন আলি; নাতা'ইয আল আফকার।
ইবন হাজার, আত তালখিস আল হাবির।
ইবন হাম্বাল, আহমাদ; আল আশরিবাহ।
ইবন হাম্বাল, আহমাদ; আল মুসনাদ।
ইবন হাম্বাল, আহমাদ; ফাদ্বাইল আস সাহাবাহ।
ইবন হিব্বান, মুহাম্মাদ; আছ ছিকাত।
ইবন কাছির, ইছমাইল ইবন 'উমার; আল বিদায়াহ ওয়া আন নিহায়াহ।
ইবন খুজাইমাহ, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক আন নিশাপুরি; আত তাওহিদ।
ইবন মাজাহ, মুহাম্মাদ ইবন ইয়াজিদ; সুনান ইবন মাজাহ।
ইবন মানদাহ; মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক; কিতাবুল ঈমান।
ইবনুল কাইয়িম আল জাওযিয়্যাহ, মুহাম্মাদ ইবন আবু বকর; যা'দ উল মা'আদ।
ইবন কুতায়বাহ, আব্দুল্লাহ ইবন মুসলিম; আল মা'আরিফ।
ইবন রাওয়াউয়িহ, ইসহাক্ব; আল মুসনাদ।
ইবন রজব, আহমাদ ইবন আলি; ফাতহুল বারি।
ইবন সা'দ, মুহাম্মাদ; আত তাক্বাবাত ওয়াল কুবরাহ।
ইবন সাল্লাম, আল কাসিম; ফাদ্বাইল আল কুরআন।
ইবন সাল্লাম, আল ক্বাসিম, কিতাবুল আমওয়াল।
• ইবন শাব্বাহ, ‘উমার; তারিখ আল মাদিনাহ।
• ইবন জানযাওয়িহ, আহমাদ; আল আমওয়াল।
• মালিক; আল মুওয়াত্তা।
• মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক ইবন ইবরাহিম; হাদিস আস সিরাজ।
• মুসলিম ইবন আল হাজ্জাজ; সহিহ মুসলিম।
• হান্নাদ ইবন আস সিররি; আল যুহুদ।
• হিশাম ইবন ‘আম্মার; হাদিস হিশাম ইবন ‘আম্মার।