📘 নবীজির সাঃ পদাঙ্ক অনুসরণ > 📄 ধৈর্যের ব্যাপারে ইবনুল কাইয়্যিম রহ.-এর বক্তব্য

📄 ধৈর্যের ব্যাপারে ইবনুল কাইয়্যিম রহ.-এর বক্তব্য


আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ধৈর্যকে বানিয়েছেন প্রতিযোগিতার এমন এক ঘোড়া, যা কখনো হোঁচট খায় না বা টলমল করে না; এমন এক তরবারি, যার ধার কখনো কমে না; এমন এক বিজয়ী সেনাদল, যাদের কখনো পরাজিত করা যায় না; এমন এক শক্তিশালী দুর্গ, যা কখনো ভাঙে না-বিজিত হয় না। ধৈর্য আর আসমানি সাহায্য হলো রক্তের দুই ভাই।

আসমানি সাহায্য আসে ধৈর্যের মাধ্যমে, বিপদের পেছন পেছন আসে মুক্তি, আর কাঠিন্যের সাথে আসে সহজতা। একদল সৈন্যের চেয়েও বেশি সাহায্য-সহযোগিতা করে ধৈর্য। বিজয় অর্জনের ক্ষেত্রে এটি হলো দেহের মাথার মতো। সত্যবাদী নিশ্চয়তাদাতা আল্লাহ তাঁর কিতাবে ওয়াদা করেছেন যে তিনি ধৈর্যশীলকে অপরিমিত পুরস্কার দেবেন। তিনি জানিয়েছেন যে পথপ্রদর্শন করা, সাহায্য করা ও সুস্পষ্ট বিজয় প্রদান করার মাধ্যমে তিনি ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।

“এবং ধৈর্যধারণ করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।”

আল্লাহকে সাথে পাওয়ার মাধ্যমে ধৈর্যশীলরা দুনিয়া ও আখিরাতে সফল হয় এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নিয়ামাত লাভ করে।

দ্বীনের ক্ষেত্রে নেতৃত্বকে আল্লাহ ধৈর্য ও ইয়াকীনের উপর নির্ভরশীল করেছেন :
"আর আমি তাদের মধ্য থেকে নেতা মনোনীত করেছিলাম যারা আমার নির্দেশ মোতাবেক সৎপথ প্রদর্শন করত, যতদিন তারা ধৈর্য অবলম্বন করে ছিল আর আমার আয়াতসমূহের উপর দৃঢ় বিশ্বাসী ছিল।”

"আর যদি তোমরা ধৈর্যধারণ করো, তবে ধৈর্যধারণকারীদের জন্য তা অবশ্যই উত্তম।”

তিনি আমাদের জানিয়েছেন যে ধৈর্যধারণকারী ও মুত্তাকীর বিরুদ্ধে শত্রুর কোনো চক্রান্ত সফল হয় না :
“কিন্তু যদি তোমরা ধৈর্যশীল হও ও তাকওয়া অবলম্বন করো, তবে তাদের চক্রান্ত তোমাদের কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না।”

তিনি আমাদের জানিয়েছেন যে সত্যবাদী নবী ইউসুফ -এর ধৈর্য ও তাকওয়াই তাঁকে সম্মান ও কর্তৃত্বের আসনের দিকে ধাবিত করেছে :

“যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন করে ও ধৈর্যধারণ করে, এমন সৎকর্মশীলদের কর্মফল আল্লাহ কখনো বিনষ্ট করেন না।”

সাফল্য নির্ভর করে ধৈর্য ও তাকওয়ার উপর :

“হে ঈমানদারগণ, ধৈর্যধারণ করো, ধৈর্যধারণে (শত্রুদের চেয়ে) অগ্রগামী হও, যুদ্ধক্ষেত্রে দৃঢ় থাকো। আর তাকওয়া অবলম্বন করো যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।”

আল্লাহ তা'আলাকে যারা চায়, তাদের শ্রেষ্ঠতম উপায়ে উৎসাহ দিয়ে আল্লাহ বলেছেন:

“আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।”

তিনি ধৈর্যশীলদের তিনটি বিষয়ের সুসংবাদ দিয়েছেন, যে সুসংবাদপ্রাপ্তদের সবচেয়ে বেশি ঈর্ষা করা উচিত:

“ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ প্রদান করো, নিশ্চয়ই যারা বিপদকালে বলে 'আমরা আল্লাহর, তাঁরই দিকে আমরা প্রত্যাবর্তনকারী। এদের জন্য রয়েছে তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অনুগ্রহ ও করুণা আর এরাই হিদায়াতপ্রাপ্ত।”

“তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। আর তা আল্লাহভীরু ব্যক্তিবর্গ ছাড়া অন্য সকলের কাছে নিশ্চিতভাবে কঠিন।”

তিনি ঘোষণা করেছেন যে জান্নাত লাভ ও জাহান্নাম থেকে মুক্তিলাভের মহাবিজয় লাভ করে কেবল ধৈর্যশীলরা:
"আজ আমি তাদের পুরস্কৃত করলাম তাদের ধৈর্যধারণের কারণে, আর তারাই তো সফলকাম।”

তিনি জানিয়েছেন যে, তাঁর পুরস্কারের আশা করতে এবং দুনিয়া ও এর ছলনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে সক্ষম একমাত্র ধৈর্যশীল মুমিনরা :
"কিন্তু যাদের জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল তারা বলল, 'ধিক তোমাদের! যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের জন্য আল্লাহর পুরস্কারই উত্তম। কিন্তু কেবল ধৈর্যশীলরাই তা লাভ করবে।”

মন্দকে উত্তম দিয়ে প্রতিহত করলে শত্রুরাও বন্ধুতে পরিণত হয় :

“...আর মন্দকে প্রতিহত করো উত্তম দিয়ে, তাহলে যার সাথে তোমার শত্রুতা আছে সে পরিণত হবে তোমার প্রাণের বন্ধুতে।”

ধৈর্যশীল ছাড়া আর কেউই এই গুণ লাভ করতে পারে না। সৌভাগ্যবান ছাড়া আর কেউই এই গুণ লাভ করতে পারে না।

আল্লাহ তা'আলা কসম করে বলছেন:

“নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে। তবে তারা নয় যারা ঈমান আনে, সৎকর্ম করে, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় ও পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দেয়।

তিনি তাঁর সৃষ্টিকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন-ডান দিকের দল ও বাম দিকের দল। তিনি ডান দিকের দলের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন পরস্পরকে ধৈর্য ও দয়ার উপদেশ দেওয়ার কথা। ধৈর্যশীল ও কৃতজ্ঞদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন আল্লাহর আয়াত থেকে উপকৃত হওয়ার কথা। তিনি তাঁর কিতাবের চারটি আয়াতে বলেছেন:

“নিশ্চয়ই এতে নিদর্শন রয়েছে প্রত্যেক ধৈর্যশীল ও কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য।

তিনি ক্ষমা ও পুরস্কারের শর্ত বানিয়েছেন সৎকর্ম ও ধৈর্যধারণ করাকে। তিনি যাকে পথ দেখান, তার জন্য তা নিঃসন্দেহে সহজ:

"শুধু তারা ব্যতীত যারা ধৈর্যধারণ করে ও সৎকর্ম করে। তারা লাভ করবে ক্ষমা ও অপরিমিত পুরস্কার।”

ধৈর্য ও ক্ষমা হলো এমনই সুনিশ্চিত বিষয় যে, যারা এর সওদা করবে তারা কখনোই ক্ষতির সম্মুখীন হবে না।

"কিন্তু কেউ যদি ধৈর্যধারণ করে ও ক্ষমা করে, তাহলে তা অবশ্যই দৃঢ়চিত্ততার কাজ।”

তিনি তাঁর রাসূল ﷺ-কে আদেশ করেছেন আল্লাহর ফায়সালার জন্য ধৈর্যধারণ করতে। আমাদের জানিয়েছেন যে, ধৈর্য হতে হবে কেবল আল্লাহর জন্য। এর মাধ্যমে বিপদ-আপদ সহ্য করা সহজ হয়ে যায়:

“তুমি ধৈর্য ধরে তোমার প্রতিপালকের হুকুমের অপেক্ষায় থাকো। তুমি আমার দৃষ্টির সামনেই আছো।

“তুমি ধৈর্যধারণ করো। তোমার ধৈর্য তো কেবল আল্লাহ ব্যতীত নয়। ওদের কার্যকলাপে তুমি দুঃখিত হোয়ো না। আর ওদের ষড়যন্ত্রের কারণে অন্তরে কুণ্ঠাবোধ কোরো না। যারা তাকওয়াবান ও সৎকর্মশীল, আল্লাহ তো তাদেরই সঙ্গে আছেন।”

ধৈর্য হলো মুমিনের রশি, যা তাকে বেঁধে রাখে। সে হয়তো কিছুক্ষণ এদিক-সেদিক ঘোরাফেরা করতে পারে, কিন্তু একটা সময় পর তাকে ফেরত আসাই লাগবে। এটি হলো ঈমানের খুঁটি, যার উপর সে নির্ভর করে। যার ধৈর্য নেই, তার ঈমান নেই। যদি থাকেও, তা অত্যন্ত দুর্বল। যার ধৈর্য নেই, সে যেন একদম নড়বড়ে কিনারে দাঁড়িয়ে আল্লাহর ইবাদাত করছে। যদি তার কল্যাণ হয়, সে শান্ত থাকে। কিন্তু যদি বিপদে পড়ে, তাহলে তার দুনিয়া উল্টে যায়। সে দুনিয়া-আখিরাত দুটিই হারায়।
সালাফগণ যে সর্বোত্তম জীবিকা লাভ করেছিলেন, তা সম্ভব হয়েছিল তাঁদের ধৈর্যের কারণে। কৃতজ্ঞতার কারণে তাঁরা উন্নীত হয়েছিলেন সর্বোচ্চ স্তরে। কৃতজ্ঞতা আর ধৈর্যের ডানায় ভর দিয়ে তাঁরা উড়েছিলেন মহাসাফল্যের জান্নাতে। এই নিয়ামাত আল্লাহ যাকে ইচ্ছে করেন তাকেই কেবল দান করেন। তিনি মহাদানশীল।

ঈমান দুই ভাগে বিভক্ত-ধৈর্য আর কৃতজ্ঞতা। যে কেউ নিজের প্রতি সৎ, যে সফল হতে ইচ্ছুক, সে যেন এই দুটি মূলনীতিকে কখনোই অবহেলা না করে। কখনোই এ দুটি রাস্তা থেকে সরে না যায়। তাহলেই কেবল আল্লাহ বিচার দিবসে তাকে শ্রেষ্ঠতর দলে (জান্নাতিদের দল) স্থান দেবেন।

এরপর ধৈর্যের সংজ্ঞায় ইবনুল কাইয়্যিম লেখেন :

এটি এক মহান গুণ, যা আত্মাকে মন্দ ও অসন্তোষজনক কাজ করা থেকে বিরত রাখে। এই চমৎকার গুণের কারণেই আত্মার সংশোধন সম্ভব হয়।

জুনাইদ ইবনু মুহাম্মাদ-কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জবাবে বলেন, "এর অর্থ হলো ভ্রু না কুঁচকেই তিক্ততা হজম করে ফেলা।” যুন্নুন বলেন, “ধৈর্য হলো (আল্লাহর হুকুম) অমান্য করা থেকে নিজেকে বিরত রাখা, বিপদের কঠিন অংশগুলো সহ্য করার সময় নীরব ও স্থির থাকা, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দারিদ্র্য আসার পরও অমুখাপেক্ষী থাকা।” আরও বলা হয়, “ধৈর্য হলো উত্তম আচরণের সহিত বিপদের মোকাবেলা করা।” আরও বলা হয়, “ধৈর্য হলো বিনা অভিযোগে বিপদের মাঝে হারিয়ে যাওয়া।” আবু উসমান বলেন, “সত্যিকার ধৈর্যশীল হলো সেই ব্যক্তি, যে তার আত্মাকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে অভ্যস্ত করে নিয়েছে।"

আরও বলা হয়, “ধৈর্য হলো কঠিন সময়কে সে রকম হাসিমুখে মোকাবেলা করা, যেমনটা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময়ে করা হয়।” এর অর্থ হলো, স্বাচ্ছন্দ্য ও বিপদ উভয় অবস্থায়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। তাই সুখের সময়ে কৃতজ্ঞ থাকতে হবে আর বিপদের সময় ধৈর্য ধরতে হবে।

আমর ইবনু উসমান আল-মাক্কি বলেন, “ধৈর্য হলো আল্লাহর সিদ্ধান্তের সামনে দৃঢ়পদ থাকা। আর তাঁর প্রেরিত বিপদকে ধীরস্থিরতার মধ্য দিয়ে স্বাগত জানানো।” এর অর্থ হলো কোনো সংকোচ, রাগ বা অভিযোগ না রেখে বিপদকে সানন্দে বরণ করে নেওয়া।

খাওয়াস বলেন, “ধৈর্য হলো দৃঢ়ভাবে কুরআন ও সুন্নাহর নিয়মনীতি মেনে চলা।” রুওয়াইম বলেন, “ধৈর্য হলো অভিযোগ ত্যাগ করা।” এভাবে তিনি ফলাফলের মাধ্যমে একে সংজ্ঞায়িত করেছেন।

অন্যেরা বলেন, “ধৈর্য হলো আল্লাহর সাহায্য কামনা।” আবু আলি বলেন, "ধৈর্য হলো এর নামেরই মতো।”

আলি ইবনু আবি তালিব বলেন, “ধৈর্য হলো এমন এক ঘোড়া, যা হোঁচট খায় না বা টলমল করে না।"

আবু মুহাম্মাদ আল-জারিরি বলেন, “ধৈর্য হলো মনকে শান্ত রেখে বিপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যের অবস্থার মাঝে কোনো পার্থক্য না করা।” আমি বলি, এর না দরকার আছে আর না এটি সম্ভব। আল্লাহ আমাদের সৃষ্টিই করেছেন এমনভাবে যে, আমরা এ দুই অবস্থার মাঝে পার্থক্য করেই থাকি। যেটা দরকার তা হলো, আত্মাকে হতাশা ও অভিযোগপ্রবণতা থেকে বিরত রাখা। ধৈর্যের চেয়ে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বেশি সহজ যেমনটা নবীজি তাঁর বিখ্যাত দু'আয় বলেছেন, "আপনি যতক্ষণ আমার প্রতি রাগান্বিত নন, ততক্ষণ আমি কোনো কিছুর পরোয়া করি না। কিন্তু আমি আপনার দেওয়া স্বাচ্ছন্দ্যের অবস্থা অধিক কামনা করি।”

তাঁর আরেক হাদীস, "ধৈর্যের চেয়ে উত্তম ও মহত্তর উপহার কাউকে দেওয়া হয়নি।” এর সাথে আগের হাদীসটির কোনো বিরোধ নেই। কারণ, বিপদ আসার পর বান্দার পক্ষে করণীয় শ্রেষ্ঠতম কাজ হলো ধৈর্যধারণ করা। কিন্তু বিপদ আসার আগে স্বাচ্ছন্দ্যই তার জন্য উত্তম।

আবু আলি আদ্দাক্কাক বলেন, “ধৈর্যের সংজ্ঞা এই যে, আপনি তাকদীরের ব্যাপারে অভিযোগ করবেন না। তবে অভিযোগ না করেই বিপদের ফলাফলগুলো প্রকাশ করা ধৈর্যের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। আইয়ুব -এর ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'আমি তাকে পেয়েছি ধৈর্যশীল' যদিও আইয়ুব বলেছিলেন, 'আমি দুঃখ-কষ্টে নিপতিত হয়েছি।'”

আমার মতে, তিনি শব্দটিকে এর ফলাফলের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন। "অভিযোগ না করেই” কথাটার ব্যাপারে বলা যায়, অভিযোগ দুই প্রকারের :

একটি হলো, আল্লাহর কাছে অভিযোগ করা। এর সাথে ধৈর্যের কোনো সাংঘর্ষিকতা নেই। ইয়াকুব বলেছেন, "আমি আমার দুঃখ-কষ্টের ব্যাপারে একমাত্র আল্লাহর কাছেই অভিযোগ পেশ করছি।” অথচ তিনি আগেই বলেছেন, "উত্তম ধৈর্য (ধারণ করব আমি)।” আর আল্লাহ তাঁকে বর্ণনা করেছেন ধৈর্যশীল ব্যক্তি বলে।

ধৈর্যশীলদের নেতা নবীজি বলেছেন, “হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছেই আমার অসহায়ত্ব ও সম্বলহীনতার ব্যাপারে অভিযোগ করছি..."
মূসা বলেছেন, “হে আল্লাহ, সকল প্রশংসা আপনার। আপনার নিকটই অভিযোগ পেশ করা হয়। আপনিই সাহায্যকারী, আপনার কাছেই সাহায্য চাওয়া হয়। আপনার উপরই নির্ভর করা হয়। আপনি ছাড়া আর কারও শক্তি ও ক্ষমতা নেই।"

দ্বিতীয় প্রকার হলো, বিপদের ব্যাপারে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির অভিযোগপ্রবণ হয়ে ওঠা। সে মুখে বলার মাধ্যমে অথবা অন্য কোনো উপায়ও এসব অভিযোগ করতে পারে। এটি ধৈর্যের সাথে সাংঘর্ষিক। আল্লাহর কাছে অভিযোগ করা আর বিপদের ব্যাপারে অভিযোগ করার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। আমরা পরে তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

বলা হয়, “ধৈর্য হলো আত্মার সাহস।” এখান থেকেই "সাহস হলো একটি ঘণ্টার জন্য ধৈর্য প্রদর্শন করা” কথাটির উদ্ভব। বলা হয়, “ধৈর্য হলো টালমাটাল সময়ে অন্তরের স্থিরতা।”

ধৈর্য আর হতাশা পরস্পর বিপরীত। দুটি পরস্পরবিরোধী প্রসঙ্গে এ দুটির কথা বলা হয়েছে:

“(জাহান্নামিরা বলবে)... 'আমরা হতাশ হই বা ধৈর্যধারণ করি, আমাদের আর কোনো নিষ্কৃতি নেই।”

হতাশা হলো অক্ষমতা ও পথহারানোর সঙ্গী। ধৈর্য হলো বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার সঙ্গী। হতাশাকে যদি জিজ্ঞেস করা হতো, "তোমার পিতা কে?” তাহলে সে বলত, "অক্ষমতা।” আর ধৈর্যকে একই প্রশ্ন করা হলে সে বলত, “বিচক্ষণতা।”

আত্মা হলো বান্দার বাহন, যার উপর ভর করে সে হয় জান্নাতে যায়, নয়তো জাহান্নামে। ধৈর্য হলো সেই বাহনের লাগাম। এই লাগাম না থাকলে বাহনটি লক্ষ্যহীনভাবে এদিক-সেদিক দৌড়ে বেড়াত।

একটি খুতবায় হাজ্জাজ বলেন, “এই আত্মাগুলোর লাগাম টেনে ধরো। কারণ, তারা মন্দ কাজে ঢুকে পড়ে। আল্লাহ তার উপর রহম করুন যে তার আত্মার উপর লাগাম পরিয়ে একে আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে সরিয়ে এনে আল্লাহর আনুগত্যে প্রবেশ করায়। জেনে রেখো, আল্লাহর শাস্তি ভোগ করার চেয়ে তাঁর নিষেধকৃত বস্তুগুলো থেকে ধৈর্য ধরে বিরত থাকা বেশি সহজ।"

আমি বলি, আত্মার ক্ষমতা রয়েছে দৌড়ে বেড়ানোর ও বিরত থাকার। ধৈর্যের আসল রূপ হলো, উপকারী জিনিসের দিকে আত্মাকে দৌড়ে নেওয়া আর ক্ষতিকর জিনিস থেকে একে বিরত রাখা।

কিছু মানুষ উপলব্ধি করে যে ধৈর্য ধরে উপকারী কাজ করতে থাকার চেয়ে ধৈর্য ধরে ক্ষতিকর কাজ থেকে বিরত থাকা বেশি কঠিন। ফলে তারা আল্লাহর হুকুম পালন করে ঠিকই, কিন্তু আল্লাহর নিষেধকৃত কাজেও জড়িয়ে পড়ে। আরেক দল মানুষের কাছে আবার হারাম জিনিস থেকে দূরে থাকা সহজ, কিন্তু আল্লাহর আদেশগুলো পালন করা কঠিন। আরেক দলের কাছে দুটিই কঠিন।

শ্রেষ্ঠতম মানুষ হলো এই দুটি বিষয়েই ধৈর্যধারণকারী। অনেকেই শীতগ্রীষ্ম- নির্বিশেষে রাতে তাহাজ্জুদ আর দিনের বেলা সওম পালন করে, অথচ দৃষ্টি অবনত রাখতে হিমশিম খায়। অনেকে দৃষ্টি সহজেই অবনত রাখতে পারে, কিন্তু সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ এবং জিহাদ করতে অপারগ হয়। অধিকাংশ মানুষ উভয় ব্যাপারেই অধৈর্য। খুব কম মানুষ উভয় ব্যাপারেই যথাযথ ধৈর্যশীল।

বলা হয়, “কামনা-বাসনার সম্মুখে বুদ্ধি-বিবেচনা ও দ্বীনদারি অবিচল রাখার নামই ধৈর্য।” এর অর্থ হলো, লোভনীয় জিনিসের দিকে ছুটে বেড়ানোই মানুষের বাতিক। কিন্তু বুদ্ধি-বিবেচনা আর ধার্মিকতা এতে বাধা দেয়। ফলে দুই পক্ষ এক চিরন্তন যুদ্ধে লিপ্ত থাকে। একবার এই পক্ষ, আরেকবার ওই পক্ষ জেতে। অন্তর, ধৈর্য, সাহস ও দৃঢ়তা হলো যুদ্ধক্ষেত্র।

টিকাঃ
২৭৩. সূরাহ আল-আনফাল, ৮:৪৬
২৭৪. সূরাহ আস-সাজদাহ, ৩২: ২৪
২৭৫. সূরাহ আন-নাহল, ১৬: ১২৬
২৭৬. সূরাহ আলে ইমরান, ৩: ১২০
২৭৭. সূরাহ ইউসুফ, ১২: ৯০
২৭৮. সূরাহ আলে ইমরান, ৩: ২০০
২৭৯. সূরাহ আলে ইমরান, ৩: ১৪৬
২৮০. সূরাহ আল-বাকারাহ, ২: ১৫৫-১৫৭
২৮১. সূরাহ আল-বাকারাহ, ২: ৪৫
২৮২. সূরাহ আল-মুমিনূন, ২৩: ১১১
২৮৩. সূরাহ আল-কাসাস, ২৮:৮০
২৮৪. সূরাহ ফুসসিলাত, ৪১ : ৩৪
২৮৫. সূরাহ ফুসসিলাত, ৪১: ৩৫ দ্রষ্টব্য
২৮৬. সূরাহ আল-আসর, ১০৩: ২-৩
২৮৭. সূরাহ আল-বালাদ, ৯০: ১৭
২৮৮. সূরাহ লুকমান, ৩১: ৩১; সূরাহ ইবরাহীম, ১৪: ৫; সূরাহ সাবা, ৩৪: ১৯; সূরাহ আশ- শূরা, ৪২: ৩৩
২৮৯. সূরাহ হুদ, ১১: ১১
২৯০. সূরাহ আশ-শূরা, ৪২: ৩৩
২৯১. সূরাহ আত-তুর, ৫২: ৪৮
২৯২. সূরাহ আন-নাহল, ১৬: ১২৮-১২৮
২৯৩. শোকর: কোনো উপকারের কারণে কারও প্রশংসা করা। ইবনুল কাইয়্যিম, মাদারিজ: খণ্ড ২, ২৪৪ পৃষ্ঠায় বলেন, “শোকর হলো আল্লাহর অনুগ্রহের প্রভাব প্রশংসা ও স্বীকৃতির মাধ্যমে মুখে প্রকাশ করা, সাক্ষ্য দেওয়া ও ভালোবাসার মাধ্যমে অন্তরে প্রকাশ করা, আত্মসমর্পণ ও আনুগত্যের মাধ্যমে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে প্রকাশ করা।” ফাইরোজাবাদি, বাসাইর, বলেন, "শোকর নির্মিত হয়েছে পাঁচটি খুঁটির উপর। অনুগ্রহ যিনি প্রদান করেছেন, তাঁর প্রতি আনুগত্য; তাঁকে ভালোবাসা; তাঁর অনুগ্রহের স্বীকৃতি প্রদান; এর জন্য তাঁর প্রশংসা করা এবং তাঁর অসন্তোষ উদ্রেককারী কোনো পথে তা ব্যবহার না করা।"
ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি: খণ্ড ১১, ৩১১ পৃষ্ঠাতে বলেন, "শোকরের অন্তর্ভুক্ত হলো আনুগত্য করে যাওয়ার ব্যাপারে ধৈর্যধারণ এবং অবাধ্যতা থেকে দূরত্ব অবলম্বনে ধৈর্যধারণ। ইমামদের কেউ কেউ বলেছেন যে, সবর থাকলে শোকর থাকতেই হবে। একটিকে ছাড়া আরেকটি পরিপূর্ণ হয় না। একটি চলে গেলে অপরটিও চলে যায়। কাজেই যে অনুগ্রহ লাভের অবস্থায় আছে, শোকর ও সবর প্রদর্শন করা তার উপর বাধ্যতামূলক। অবাধ্যতা থেকে সবর। যে বিপদগ্রস্ত, শোকর ও সবর প্রদর্শন করা তার উপর বাধ্যতামূলক। আল্লাহর অধিকার প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে শোকর। নিশ্চয় স্বাচ্ছন্দ্য ও দুর্দশা উভয় অবস্থায় দাসত্ব করতে হবে কেবল আল্লাহর।"
২৯৪. লেখক (রাহিমাহুল্লাহ) এর আগের অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন যে, সবর হলো খুব তিতা একটি ওষুধের নাম
২৯৫. তাবারানি : খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা ৭৩, হাদীস নং ১৮১। তাইফ থেকে তিনি ফিরে আসার পর এই বিখ্যাত দু'আ করেন।
২৯৬. বুখারি: ১৪৬৯-৬৪৭০; মুসলিম: ১০৫৩; আবু সাইদ থেকে বর্ণিত।
২৯৭. সূরাহ সোয়াদ, ৩৮: ৪৪
২৯৮. সূরাহ আল-আম্বিয়া, ২১: ৮৩
২৯৯. সূরাহ ইউসুফ, ১২ : ৮৬
৩০০. সূরাহ ইউসুফ, ১২: ১৩, ৮৩
৩০১. তাইফ থেকে ফিরে আসার পর করা দু'আর অংশ; অনুরূপ, ফুটোনোট: ২৩। পূর্ণ দু'আটির অর্থ "হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছেই আমার অসহায়ত্ব ও সম্বলহীনতার ব্যাপারে অভিযোগ করছি। হে আরহামুর রাহিমীন, হে মাযলুমদের প্রতিপালক, আপনি আমার প্রতিপালক। আপনি আমাকে কাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন? আমাকে অসন্তোষ সহকারে অভিবাদন জানানোদের থেকে অনেক দূরবর্তী কারও হাতে, না শত্রুদের হাতে? আপনি যতক্ষণ আমার প্রতি রাগান্বিত নন, ততক্ষণ আমি কোনো কিছুর পরোয়া করি না। কিন্তু আমি আপনার দেওয়া স্বাচ্ছন্দ্যের অবস্থা অধিক কামনা করি। আমি আপনার নূরে আশ্রয় গ্রহণ করছি, যা ছায়াকে আলোকিত করে দেয়, দুনিয়া ও আখিরাতের বিপদ সমাধা করে দেয়, এই নিশ্চয়তায় যে আপনার ক্রোধ বা অসন্তুষ্টি আমার উপর অবতরণ করবে না। সকল শক্তি-ক্ষমতা আপনার পক্ষ থেকেই।”
৩০২. সূরাহ ইবরাহীম, ১৪: ২১
৩০৩. ইবনুল কাইয়্যিম, ইদাতুস সবিরীন ওয়া যাকিরাতুশ শাকিরীন

📘 নবীজির সাঃ পদাঙ্ক অনুসরণ > 📄 বিপদ-আপদের ফযিলত

📄 বিপদ-আপদের ফযিলত


আল-ইযয ইবনু আব্দুস সালাম

বিপদ, পরীক্ষা, দুর্ভাগ্য আর দুর্যোগের মাঝে রয়েছে অনেক উপকারিতা। বিভিন্ন মর্যাদার মানুষের উপর এ সকল উপকারিতা বিভিন্ন মাত্রায় প্রযোজ্য।

১। আল্লাহর প্রভুত্ব ও সর্বব্যাপী ক্ষমতার ব্যাপারে উপলব্ধি জন্মানো।

২। বান্দার নগণ্যতা উপলব্ধি করা।

৩। আল্লাহ তা'আলার প্রতি ইখলাস বাস্তবায়ন। কারণ, এই অবস্থায় আল্লাহ ছাড়া আর কারও কাছে যাওয়ার থাকে না, তিনি ছাড়া আর কেউ বিপদ সরাতে পারে না।

৪। অনুতপ্ত হয়ে অন্তরকে আল্লাহর দিকে ফেরানো।

৫। বিনয় অবলম্বন ও দু'আ করতে পারা।

৬। সহনশীলতা। সহনশীলতার মর্যাদা বিপদের ভয়াবহতা অনুসারে বাড়ে-কমে। ভয়াবহতম দুর্যোগে সহনশীলতা প্রদর্শন হলো এর উত্তম রূপ।

৭। বিপদের মুখে ধৈর্যধারণ ও দৃঢ়তা প্রদর্শন। এতে আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়া যায় ও নেকি লাভ হয়।

৮। নানা রকম উপকারিতার কারণে বিপদের আগমনে আনন্দ অনুভব করা।

৯। নানা রকম উপকারিতার কারণে বিপদের আগমনে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া। এটি হলো রোগাক্রান্ত অঙ্গ কেটে ফেলার কারণে ডাক্তারের প্রতি রোগীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের মতো, যদিও এর ফলে তাকে বিকলাঙ্গ হয়ে যেতে হয়েছে।

১০। গুনাহ মাফ পাওয়া।
১১। বিপদগ্রস্তদের প্রতি দয়া প্রদর্শন ও তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারা।

১২। সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের নিয়ামাত যথাযথভাবে উপলব্ধি করা। কারণ, হারিয়ে ফেলার আগে কেউ ঠিকমতো নিয়ামাতের মূল্য বোঝে না।

১৩। এই বিপদের বিনিময়ে আখিরাতে আল্লাহ কত পুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন, তা চিন্তা করা।

১৪। এর নানা লুক্কায়িত উপকারিতা আবিষ্কার করা। যেমন: সারাহকে (আলাইহাস সালাম) ধরে নিয়ে যাওয়ার পর অত্যাচারী বাদশা তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার সময় উপহার হিসেবে দেন দাসী হাজারকে (আলাইহাস সালাম)। তাঁর গর্ভেই জন্ম হয় ইবরাহীম-এর ছেলে ইসমাঈল, যার বংশ থেকে এসেছেন রাহমাতাল্লিল আলামীন মুহাম্মাদ। বিপদের ফলাফল কতই-না উত্তম!

১৫। বিপদের ফলে মানুষ মন্দকাজ, বিলাসিতা, অহংকার, লোকদেখানো, অপচয় ও অত্যাচার থেকে বিরত থাকে। এ কারণেই সবচেয়ে বেশি বিপদ দেওয়া হয়েছে নবীগণকে, তাঁদের পর সৎকর্মশীলগণকে, এভাবে একে একে তাঁদের সবচেয়ে নিকটবর্তী মর্যাদার মানুষগণকে। তাঁদের পাগল, জাদুকর, গণক বলা হয়েছিল। ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা হয়েছিল। সাহাবাগণকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। তাঁদের বিপদ আর শত্রুসংখ্যা বাড়তেই থাকে। কিছু ক্ষেত্রে তাঁরা পরাজিত হন। উহুদ ও অন্যান্য যুদ্ধে অনেকে শহীন হন। রাসূল মুখে আঘাত পান, দাঁত ভেঙে যায়, হেলমেট ভেঙে মাথায় গেঁথে যায়। তাঁর শত্রুরা আনন্দিত হয় আর সঙ্গীরা শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তাঁরা এক অনিঃশেষ দারিদ্র্য, দুর্দশা ও ভয়ের অবস্থায় থাকতেন। ক্ষুধার জ্বালায় তাঁরা পেটে পাথর বেঁধেছেন আর দো-জাহানের সর্দার কখনো এক দিনে দুবার পেট পুরে রুটি খাননি। তাঁকে মানসিকভাবে এমনই আঘাত করা হয়েছে যে, তাঁর পবিত্রা স্ত্রীকে চরিত্রহীনতার অপবাদ দেওয়া হয়েছে। নবী- রাসূল ও সৎকর্মশীল সকলকেই বিপদ দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। প্রত্যেকের বিপদ ছিল তাঁর মর্যাদার অনুপাতে। তাঁদের কাউকে দ্বিখণ্ডিত করা হয়েছে, কিন্তু এতে তাঁদের ঈমান টলে যায়নি। বিপদ-আপদের কারণে বান্দা আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার দিকে ফিরে যায়। সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের মাঝে থাকলে বান্দা আল্লাহ থেকে দূরে সরে যায়। এ কারনেই নবীগণ অল্প খেতেন, অনাড়ম্বর পোশাক পরতেন, যাতে তাঁরা আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার একনিষ্ঠ বান্দা হয়ে থাকতে পারেন।

১৬। বিপদে এমন সন্তুষ্ট থাকা যে, এর ফলে আল্লাহ তা'আলা সন্তুষ্ট হন। কারণ, সৎকর্মশীল ও পাপাচারী উভয়কেই বিপদ দেওয়া হয়। বিপদের আগমনে যে রুষ্ট হয়, দুনিয়া ও আখিরাতে তার পরিণতি খারাপ। আর যে এতে সন্তুষ্ট থাকে, তার জন্য রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি, যা জান্নাত ও এর সকল নিয়ামাতের চেয়ে উত্তম。

টিকাঃ
৩০৪. হিল্ম: তাড়াহুড়া ত্যাগ করা। রাগিব, আল-মুফরাদাতে বলেন, "এটি হলো রাগের সময় নাফস ও মেজাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারার ক্ষমতা।" জাহিয, তাহাযিবুল আখলাকে বলেন, "এটি হলো সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও চরম রাগের সময় প্রতিশোধ গ্রহণ থেকে বিরত থাকা।” জুরজানি, আত-তারিফাতে বলেন, "এটি হলো রাগের সময় শান্ত থাকা।"
৩০৫. আহমাদ: ১৪৮১-১৪৯৪-১৫৫৫-১৬০৭; তিরমিযি: ২৪০০; ইবনু মাজাহ : ৪০২৩; সাইদ ইবনু আবু ওয়াক্কাস থেকে বর্ণিত। তিরমিযি একে হাসান সহীহ বলেছেন; হাকিম: ১২০ একে সহীহ বলেছেন এবং যাহাবি একমত।
৩০৬. বুখারি: ৬৪৫২; আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।
৩০৭. মুসলিম: ২৯৭০; আয়িশা থেকে বর্ণিত।
৩০৮. মুনাওয়ি, ফাইদুল কাদির: খণ্ড ১, ২৪৫ পৃষ্ঠায় বলেন, "গাযালি বলেছেন, 'তুমি যদি দেখো আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা পৃথিবীকে তোমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন, তোমাকে বারবার পরীক্ষায় ফেলছেন, তাহলে জেনে রেখো, তাঁর কাছে তোমার মর্যাদা বিশাল। জেনে রেখো, তিনি তোমার সাথে সে রকম আচরণ করছেন, যেমন আচরণ করেছেন তাঁর আউলিয়াগণের সাথে এবং নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ বানাদাদের সাথে। আর তিনি তোমাকে দেখেশুনে রাখছেন। তুমি কি তাঁর বাণী শোনোনি? “তুমি ধৈর্যধারণ করে তোমার প্রতিপালকের হুকুমের অপেক্ষায় থাকো, কারণ তুমি তাঁর দৃষ্টির সামনেই আছো।” [সূরাহ আত-তুর, ৫২ : ৪৮] অতএব, নিজের উপর এই মহান অনুগ্রহ স্বীকার করো।”
৩০৯. ফাওয়াইদুল বালওয়া ওয়াল মিহান থেকে সংক্ষেপিত। পূর্ণ ইংরেজি অনুবাদটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৪ সালে দারুস সুন্নাহ পাবলিশার্স, বার্মিংহাম, ইউনাইটেড কিংডম থেকে Trials & Tribulations: Wisdom & Benefits শিরোনামে।

📘 নবীজির সাঃ পদাঙ্ক অনুসরণ > 📄 আল-ইযয ইবনু আব্দুস সালাম রহ.

📄 আল-ইযয ইবনু আব্দুস সালাম রহ.


বিপদ, পরীক্ষা, দুর্ভাগ্য আর দুর্যোগের মাঝে রয়েছে অনেক উপকারিতা। বিভিন্ন মর্যাদার মানুষের উপর এ সকল উপকারিতা বিভিন্ন মাত্রায় প্রযোজ্য।

১। আল্লাহর প্রভুত্ব ও সর্বব্যাপী ক্ষমতার ব্যাপারে উপলব্ধি জন্মানো।

২। বান্দার নগণ্যতা উপলব্ধি করা।

৩। আল্লাহ তা'আলার প্রতি ইখলাস বাস্তবায়ন। কারণ, এই অবস্থায় আল্লাহ ছাড়া আর কারও কাছে যাওয়ার থাকে না, তিনি ছাড়া আর কেউ বিপদ সরাতে পারে না।

৪। অনুতপ্ত হয়ে অন্তরকে আল্লাহর দিকে ফেরানো।

৫। বিনয় অবলম্বন ও দু'আ করতে পারা।

৬। সহনশীলতা। সহনশীলতার মর্যাদা বিপদের ভয়াবহতা অনুসারে বাড়ে-কমে। ভয়াবহতম দুর্যোগে সহনশীলতা প্রদর্শন হলো এর উত্তম রূপ।

৭। বিপদের মুখে ধৈর্যধারণ ও দৃঢ়তা প্রদর্শন। এতে আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়া যায় ও নেকি লাভ হয়।

৮। নানা রকম উপকারিতার কারণে বিপদের আগমনে আনন্দ অনুভব করা।

৯। নানা রকম উপকারিতার কারণে বিপদের আগমনে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া। এটি হলো রোগাক্রান্ত অঙ্গ কেটে ফেলার কারণে ডাক্তারের প্রতি রোগীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের মতো, যদিও এর ফলে তাকে বিকলাঙ্গ হয়ে যেতে হয়েছে।

১০। গুনাহ মাফ পাওয়া।
১১। বিপদগ্রস্তদের প্রতি দয়া প্রদর্শন ও তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারা।

১২। সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের নিয়ামাত যথাযথভাবে উপলব্ধি করা। কারণ, হারিয়ে ফেলার আগে কেউ ঠিকমতো নিয়ামাতের মূল্য বোঝে না।

১৩। এই বিপদের বিনিময়ে আখিরাতে আল্লাহ কত পুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন, তা চিন্তা করা।

১৪। এর নানা লুক্কায়িত উপকারিতা আবিষ্কার করা। যেমন: সারাহকে (আলাইহাস সালাম) ধরে নিয়ে যাওয়ার পর অত্যাচারী বাদশা তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার সময় উপহার হিসেবে দেন দাসী হাজারকে (আলাইহাস সালাম)। তাঁর গর্ভেই জন্ম হয় ইবরাহীম-এর ছেলে ইসমাঈল, যার বংশ থেকে এসেছেন রাহমাতাল্লিল আলামীন মুহাম্মাদ। বিপদের ফলাফল কতই-না উত্তম!

১৫। বিপদের ফলে মানুষ মন্দকাজ, বিলাসিতা, অহংকার, লোকদেখানো, অপচয় ও অত্যাচার থেকে বিরত থাকে। এ কারণেই সবচেয়ে বেশি বিপদ দেওয়া হয়েছে নবীগণকে, তাঁদের পর সৎকর্মশীলগণকে, এভাবে একে একে তাঁদের সবচেয়ে নিকটবর্তী মর্যাদার মানুষগণকে। তাঁদের পাগল, জাদুকর, গণক বলা হয়েছিল। ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা হয়েছিল। সাহাবাগণকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। তাঁদের বিপদ আর শত্রুসংখ্যা বাড়তেই থাকে। কিছু ক্ষেত্রে তাঁরা পরাজিত হন। উহুদ ও অন্যান্য যুদ্ধে অনেকে শহীন হন। রাসূল মুখে আঘাত পান, দাঁত ভেঙে যায়, হেলমেট ভেঙে মাথায় গেঁথে যায়। তাঁর শত্রুরা আনন্দিত হয় আর সঙ্গীরা শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তাঁরা এক অনিঃশেষ দারিদ্র্য, দুর্দশা ও ভয়ের অবস্থায় থাকতেন। ক্ষুধার জ্বালায় তাঁরা পেটে পাথর বেঁধেছেন আর দো-জাহানের সর্দার কখনো এক দিনে দুবার পেট পুরে রুটি খাননি। তাঁকে মানসিকভাবে এমনই আঘাত করা হয়েছে যে, তাঁর পবিত্রা স্ত্রীকে চরিত্রহীনতার অপবাদ দেওয়া হয়েছে। নবী- রাসূল ও সৎকর্মশীল সকলকেই বিপদ দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। প্রত্যেকের বিপদ ছিল তাঁর মর্যাদার অনুপাতে। তাঁদের কাউকে দ্বিখণ্ডিত করা হয়েছে, কিন্তু এতে তাঁদের ঈমান টলে যায়নি। বিপদ-আপদের কারণে বান্দা আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার দিকে ফিরে যায়। সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের মাঝে থাকলে বান্দা আল্লাহ থেকে দূরে সরে যায়। এ কারনেই নবীগণ অল্প খেতেন, অনাড়ম্বর পোশাক পরতেন, যাতে তাঁরা আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার একনিষ্ঠ বান্দা হয়ে থাকতে পারেন।

১৬। বিপদে এমন সন্তুষ্ট থাকা যে, এর ফলে আল্লাহ তা'আলা সন্তুষ্ট হন। কারণ, সৎকর্মশীল ও পাপাচারী উভয়কেই বিপদ দেওয়া হয়। বিপদের আগমনে যে রুষ্ট হয়, দুনিয়া ও আখিরাতে তার পরিণতি খারাপ। আর যে এতে সন্তুষ্ট থাকে, তার জন্য রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি, যা জান্নাত ও এর সকল নিয়ামাতের চেয়ে উত্তম。

টিকাঃ
৩০৪. হিল্ম: তাড়াহুড়া ত্যাগ করা। রাগিব, আল-মুফরাদাতে বলেন, "এটি হলো রাগের সময় নাফস ও মেজাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারার ক্ষমতা।" জাহিয, তাহাযিবুল আখলাকে বলেন, "এটি হলো সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও চরম রাগের সময় প্রতিশোধ গ্রহণ থেকে বিরত থাকা।” জুরজানি, আত-তারিফাতে বলেন, "এটি হলো রাগের সময় শান্ত থাকা।"
৩০৫. আহমাদ: ১৪৮১-১৪৯৪-১৫৫৫-১৬০৭; তিরমিযি: ২৪০০; ইবনু মাজাহ : ৪০২৩; সাইদ ইবনু আবু ওয়াক্কাস থেকে বর্ণিত। তিরমিযি একে হাসান সহীহ বলেছেন; হাকিম: ১২০ একে সহীহ বলেছেন এবং যাহাবি একমত।
৩০৬. বুখারি: ৬৪৫২; আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।
৩০৭. মুসলিম: ২৯৭০; আয়িশা থেকে বর্ণিত।
৩০৮. মুনাওয়ি, ফাইদুল কাদির: খণ্ড ১, ২৪৫ পৃষ্ঠায় বলেন, "গাযালি বলেছেন, 'তুমি যদি দেখো আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা পৃথিবীকে তোমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন, তোমাকে বারবার পরীক্ষায় ফেলছেন, তাহলে জেনে রেখো, তাঁর কাছে তোমার মর্যাদা বিশাল। জেনে রেখো, তিনি তোমার সাথে সে রকম আচরণ করছেন, যেমন আচরণ করেছেন তাঁর আউলিয়াগণের সাথে এবং নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ বানাদাদের সাথে। আর তিনি তোমাকে দেখেশুনে রাখছেন। তুমি কি তাঁর বাণী শোনোনি? “তুমি ধৈর্যধারণ করে তোমার প্রতিপালকের হুকুমের অপেক্ষায় থাকো, কারণ তুমি তাঁর দৃষ্টির সামনেই আছো।” [সূরাহ আত-তুর, ৫২ : ৪৮] অতএব, নিজের উপর এই মহান অনুগ্রহ স্বীকার করো।”
৩০৯. ফাওয়াইদুল বালওয়া ওয়াল মিহান থেকে সংক্ষেপিত। পূর্ণ ইংরেজি অনুবাদটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৪ সালে দারুস সুন্নাহ পাবলিশার্স, বার্মিংহাম, ইউনাইটেড কিংডম থেকে Trials & Tribulations: Wisdom & Benefits শিরোনামে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00