📘 নবীজির সাঃ পদাঙ্ক অনুসরণ > 📄 কাঠিন্যের সাথে সহজতা

📄 কাঠিন্যের সাথে সহজতা


রাসূল বলেন, "আর কাঠিন্যের সাথে আছে সহজতা।” এ কথাটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার এই আয়াত থেকে উৎসারিত : "আল্লাহ কষ্টের পর আরাম দেবেন।”২৪৩
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৪৪
হুমাইদ ইবনু হাম্মাদ ইবনু আবুল খুওয়ার বর্ণনা করেন, আইয ইবনু শুরাইহ তাঁকে জানিয়েছেন যে, তিনি আনাস বিন মালিক-কে বলতে শুনেছেন, "নবীজি মাটিতে এক গর্তের সামনে বসে ছিলেন। তিনি বললেন, 'কষ্ট যদি এই গর্তে গিয়েও ঢুকত, স্বস্তি এর পেছন পেছন গিয়ে ঢুকে তাকে বের করে দিত।' তারপর আল্লাহ আয়াত নাযিল করেন :
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৪৫
এটি বর্ণিত হয়েছে ইবনু আবি হাতিম-এর আত-তাফসিরে। বাযযার-এর বর্ণনায় রয়েছে, “কষ্ট যদি এসে এই গর্তেও ঢুকত, স্বস্তি এর পেছন পেছন গিয়ে ঢুকত এবং একে সরিয়ে দিত। তারপর তিনি তিলাওয়াত করলেন, 'কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।”২৪৬
হুমাইদ বিন হাম্মাদকে দুর্বল বর্ণনাকারী বলা হয়। মা'মার থেকে ইবনু জারির বর্ণনা করেন, আল-হাসান বলেন, “নবীজি একদিন আনন্দিত ও খুশি অবস্থায় বের হয়ে এসে বললেন, 'একটি কষ্ট কখনো দুইটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারবে না।”২৪৭
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৪৮ আওফ এবং ইউনুস এ-এর সূত্রেও তিনি আল-হাসান থেকে এটি মুরসাল হাদীস হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি একে কাতাদাহ থেকে বর্ণিত হাদীস হিসেবেও উল্লেখ করেছেন, যিনি বলেন, "আমাদের কাছে বলা হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাহাবাগণকে এই আয়াতের সুসংবাদ এই বলে দিয়েছেন যে, 'একটি কষ্ট কখনো দুইটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারবে না।”২৪৯
মুয়াউয়িয়াহ ইবনু কুররাহ থেকে ইবনু আবিদ্দুনিয়া বর্ণনা করেন যে, এক বর্ণনাকারী তাঁকে জানিয়েছেন, ইবনু মাসউদ বলেছেন, "কষ্ট যদি একটি গর্তেও প্রবেশ করে, স্বস্তি একে অনুসরণ করে এতে প্রবেশ করবে।”২৫০ তারপর তিনি তিলাওয়াত করেন: "কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৫১
এ ছাড়া তিনি এটি আব্দুর রহমান ইবনু যাইদ ইবনু আসলাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি তাঁর বাবার থেকে এবং তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেন, যখন আবু উবাইদা অবরোধে পড়লেন, তখন উমার তাঁকে চিঠি লিখলেন, “যে কষ্টই আসুক না কেন, আল্লাহ তার পর মুক্তি পাঠাবেন। কারণ, একটি কষ্ট দুটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারে না আর আল্লাহ বলেন:
'হে ঈমানদারগণ, ধৈর্য ধরো এবং ধৈর্যে (শত্রুর চেয়ে বেশি) অগ্রসর থাকো। যুদ্ধক্ষেত্রে দৃঢ়তা প্রদর্শন করো। আর তাকওয়া অবলম্বন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।' ২৫২, ২৫৩
ইবনে আব্বাস ২৫৪ সহ অন্যান্য মুফাসসিরগণও এই আয়াতের তাফসীরে বলেছেন, “একটি কষ্ট দুইটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারবে না।”
অতীতের এক ব্যক্তি মরুভূমিতে খুব কষ্টে থাকা অবস্থায় কবিতার এ চরণ দুটি তাঁর মাথায় আসে: দুশ্চিন্তিত হয়ে নিদ্রা থেকে জাগরণ, তার চেয়ে উত্তম হলো সাক্ষাৎ মরণ। রাতের বেলা কোনো একটি কণ্ঠ ডেকে উঠল, নিশ্চিন্ত হও, হে দুশ্চিন্তিত জন! কবিতা আওড়েছ, কিন্তু সাক্ষ্য দেয় মন, ধেয়ে আসে যখন কষ্টের বাহিনী ভাবো, 'আমি কি প্রশস্ত করিনি...?'২৫৫ দুই স্বস্তির মাঝে এক কষ্ট থাকবেই স্মরণ করলে আনন্দ লাগবেই।
তিনি বলেন, "আমি এই চরণগুলো মুখস্থ করে নিলাম। আর আল্লাহ আমাকে আমার দুর্দশা থেকে মুক্তি দিলেন।”
এ ব্যাপারে অনেক কাব্য রচিত হয়েছে। আমরা এর কয়েকটি উদ্ধৃত করছি :
ধৈর্য ধরো, ধৈর্যে বিস্ময়কর ফল আসে, হতাশ হোয়ো না কোনোই সর্বনাশে।
কষ্টের কাঁধ উষ্ণ করে নিজের শ্বাসে, এর পেছন পেছনেই স্বস্তি চলে আসে।
একজন বলেছেন: হতাশ হয়ে যায় অনেকে এমন সংকটে যার সমাধান আসছে খুবই নিকটে।
আরেকজন বলেছেন: হয়তো শীঘ্রই আসছে বিপদমুক্তি, 'হয়তো'ই আমাদের আত্মার যুক্তি। হতাশার কাছে যখন করে আত্মসমর্পণ, বিপদমুক্তি খুব নিকটেই থাকে তখন।
আরেকজন আবৃত্তি করেছেন : সবকিছু যখন কঠিন লাগে, মুক্তি আশা করো তখনই, মুক্তি খুব কাছেই থাকে, বিপদ ঘনীভূত হয় যখনই।
আরেকজন নিচের চরণগুলো রচনা করেছেন :
একদিনের জন্য কষ্টে পতিত হলে হতাশ হোয়ো না, কতশত দিন যে স্বস্তিতে বাঁচবে, তা তুমি জানো না। রবের ব্যাপারে কুধারণা রেখো না, সৌন্দর্য তাঁরই ভূষণ, কখনো নিরাশ হোয়ো না, এ যে কুফরি এক ভীষণ! অল্পতেই তোমার সেরে যাবে প্রয়োজন, জেনে রেখো কষ্টকে স্বস্তি করে অনুসরণ। যত বক্তা রাখে তাদের বক্তব্য, আল্লাহর কথাই তার মাঝে সর্বাধিক সত্য।
তাঁদের একজন বলেছেন, ধৈর্য হলো কষ্টমুক্তিদ্বার, কষ্টকে স্বস্তি অনুসরণ করে প্রতিবার। থেমে থাকে না কখনো সময় এক ঘটনার পর আরেক ঘটনা হয়।
বিপদ-আপদ প্রদানের কিছু সূক্ষ্ম উপকারিতা ও প্রজ্ঞার কথা বর্ণনা করে আমরা এই আলোচনা শেষ করব।
১. গুনাহ মাফ হয় ও ধৈর্য ধরে বিপদ সহ্য করার সাওয়াব লাভ হয়। বিপদটির কারণে সাওয়াব পাওয়া যায় কি না-এ নিয়ে আলিমগণের মতভেদ আছে।
২. বান্দার তার গুনাহের কথা স্মরণ হয় এবং সে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার কাছে তাওবাহর সুযোগ পায়।
৩. শক্ত ও কঠিন থাকার পর অন্তর নরম হয়। একজন সালাফ বলেছিলেন, “কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ার ফলে গুনাহের কথা স্মরণ করতে পারে। এবং আল্লাহর ভয়ে মাছির মাথা পরিমাণ অশ্রুও যদি নির্গত হয়, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।”
৪. ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার সামনে বিনয়ী করে। প্রচুর নেক আমলের চেয়ে এ রকম একটি অবস্থাই আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়।
৫. এসব বিপদের কারণে ব্যক্তির হৃদয় আল্লাহর দিকে ঘুরে যায়, সে তাঁর দুয়ারে গিয়ে দাঁড়ায়, তাঁকে ডাকে ও তাঁর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে। এটি হলো বিপদের সবচেয়ে বড় লাভ। যারা বিপদের সময় আল্লাহর সামনে বিনীত হয় না, আল্লাহ তাদের তিরস্কার করেছেন:
"আমি তাদের শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করেছিলাম। কিন্তু তারা তাদের প্রতিপালকের নিকট নত হলো না, আর তারা কাকুতি-মিনতিও করল না।”২৫৬
“তোমার পূর্বে আমি অনেক জাতির কাছে রাসূল পাঠিয়েছি। আর অভাব-অনটন ও দুঃখ-ক্লেশ দিয়ে পাকড়াও করেছিলাম, যাতে তারা বিনয়ী হয়।”২৫৭
পূর্বের এক আসমানি কিতাবে আছে, "আল্লাহ বান্দাকে পরীক্ষায় ফেলেন, কারণ তিনি তার কাছে কাকুতি-মিনতি শুনতে ভালোবাসেন।”
সাইদ বিন আব্দুল আযীয বলেন, “দাউদ বলেন, 'সুমহান সেই সত্তা, যিনি বিপদে ফেলে বান্দাকে দু'আ করতে বাধ্য করেন। সুমহান সেই সত্তা, যিনি স্বাচ্ছন্দ্য প্রদানের মাধ্যমে কৃতজ্ঞ হতে দেন।”
মুহাম্মাদ আল-মুনকাদির এ প্রচণ্ড কষ্টে ছিলেন। আবু জাফার মুহাম্মাদ ইবনু আলি তাঁর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর ব্যাপারে মানুষকে জিজ্ঞেস করলেন। লোকেরা জানাল তিনি ঋণগ্রস্ত। আবু জাফার বললেন, "তাঁর জন্য কি দু'আর দরজা খুলেছে?” তারা জানাল, "হ্যাঁ।" আবু জাফার বললেন, "বান্দা সত্যিই সৌভাগ্যবান, যদি সে প্রয়োজনের সময় তার রবকে বেশি বেশি ডাকে, তা যে প্রয়োজনই হোক না কেন।”
তাঁদের কেউ কেউ বিপদে পড়ে দু'আ করার সময় দ্রুত জবাব আশা করতেন না। তাঁদের যে রবকে প্রয়োজন হয়েছে, এই অবস্থাটি দ্রুত শেষ হয়ে যাক-তা তাঁরা চাইতেন না। সাবিত বলেন, “মুমিন যখন আল্লাহকে ডাকে, আল্লাহ জিবরীলকে তার প্রয়োজন পূরণ করার দায়িত্ব দিয়ে বলেন, 'তার প্রয়োজন পূরণ করতে তাড়াহুড়া করবে না। আমি আমার মুমিন বান্দার কণ্ঠ শুনতে ভালোবাসি।” এটি নবীজি -এর হাদীস হিসেবেও বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এর সকল সনদ দুর্বল।৫৮
একজন সালাফ স্বপ্নে আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করে বললেন, "হে আল্লাহ, আমি আপনাকে অনেক ডেকেছি, কিন্তু জবাব পাইনি।” তিনি জবাব দিলেন, "আমি তোমার কণ্ঠ শুনতে ভালোবাসি।”
৬. বিপদ-আপদের ফলে অন্তর ধৈর্যের ও সন্তুষ্টির মিষ্টতা অনুভব করে। এটি হলো বিরাট পুরস্কারের পদ, যার মর্যাদা সম্পর্কে ইতঃপূর্বে আলোচনা হয়েছে।
৭. বিপদের ফলে বান্দা সৃষ্টির থেকে মুখ ফিরিয়ে স্রষ্টামুখী হয়। আল্লাহ বলেছেন মুশরিকরাই বিপদের সময় এক আল্লাহকে ডাকে, তাহলে মুমিনের অবস্থা কী?
৮. বিপদের ফলে বান্দা তাওহীদকে সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করে ও একে অন্তরে অনুভব করে।২৫৯
এক ইসরাঈলী বর্ণনায় আছে, (আল্লাহ বলেন),
"বিপদ তোমাকে আর আমাকে কাছে আনে। স্বাচ্ছন্দ্য তোমাকে তোমার কাছে আনে।"

টিকাঃ
২৪৩ সূরাহ আত-তলাক, ৬৫: ৭
২৪৪ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪: ৫-৬
২৪৫ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪: ৫-৬
২৪৬ ইবনু আবি হাতিম : ১৯৩৯৫; বাযযার: ২২৮৮; তাবারানি, আল-আসওয়াত: ৩৪১৬; হাকিম: ৩০১০। যাহাবি বলেন, "এটি শুধু হুমাইদ ইবনু হাম্মাদ থেকে আইয সূত্রে বর্ণিত আছে। উভয়ই হাদীস বর্ণনায় মুনকার। বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১২, বলেন এটি যঈফ; আলবানি, আয- যঈফাহ: ১৪০৩ এ একে যঈফ জিদ্দান বলেছেন।
২৪৭ তাবারি; বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১৩; হাকিম: ৩৯৫০; যাহাবি একে মুরসাল বলেন। একই কথা বলেছেন যায়লাই, তাখরিজুল কাশশাফ: খণ্ড ৪, ২৩৫ পৃষ্ঠায়। ইবনু হাজার, আল-কাফি: ৩১৯ পৃষ্ঠায় একে মুরসাল বলেন এবং বলেন যে, এর মাওসুল সংস্করণটি যঈফ। তাগলিক আত- তালিক: খণ্ড ৪, ৩৭২ পৃষ্ঠায় তিনি আরও বলেন আল-হাসান পর্যন্ত এর ইসনাদ সহীহ। আলবানি, আয-যঈফাহ: ৪৩৪২ এ একে যঈফ বলেন। ইবনু আবি হাতিম: ১৩৩৯৬ এ একে আল-হাসানের উক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। ইবনু কাসির বলেন, “এই কথাগুলোর অর্থ হলো উভয় ক্ষেত্রে 'কষ্ট' কথাটি সুনির্দিষ্টতাবাচক উপসর্গ 'আল' এর সাথে যুক্ত। অতএব এটি একবচন। কিন্তু 'স্বস্তি' শব্দটি অনির্দিষ্ট রেখে দেওয়া হয়েছে। অতএব, এটি একাধিকবার ঘটবে। অতএব, দ্বিতীয়বারে উল্লেখিত কষ্ট প্রথমটিকেই বোঝাচ্ছে। তবে স্বস্তির ঘটনা একাধিক।"
২৪৮ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪ : ৫-৬
২৪৯ তাবারি; এটি মুরসাল। ইবনু হাজার, তাগলিক আত-তালিক: খণ্ড ৪, ৩৭২ পৃষ্ঠায় বলেন কাতাদাহ পর্যন্ত এর ইসনাদ সহীহ।
২৫০ বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১১; সুয়ুতি, আদুররুল মানসুরে একে ইবনু আবিদ্দুনিয়ার আস- সবরের সাথে সম্পৃক্ত করেন।
২৫১ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪ : ৫-৬
২৫২ সূরাহ আলে ইমরান, ৩: ২০০
২৫০ ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ: পৃষ্ঠা ২৪; বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১০; ইবনু আবি শাইবাহ: খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৩৫ এবং খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা ৩৭; হাকিম: ৩১৭৬ এ একে মুসলিমের শর্তানুযায়ী সহীহ বলেছেন। যাহাবি একমত। কিন্তু ইবনু হাজার, তাগলিক আত-তালিক: খণ্ড ৪, ৩৭২ পৃষ্ঠায় বলেন এর ইসনাদ হাসান।
২৫৪ সাখাওয়ি, আল-মাকাসিদ: ৮৭৭ বলেন, "এটি বর্ণিত হয়েছে আবু সালিহ থেকে আল-কালবি, তাঁর থেকে আল-ফাররা কর্তৃক।
২৫৫ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪: ১
২৫৬ সূরাহ আল-মুমিনূন, ২৩: ৭৬
২৫৭ সূরাহ আল-আন'আম, ৬: ৪২
২৫৮ তাবারানি, আল-আসওয়াত: ৮৪৪২; জাবির থেকে বর্ণিত।
২৫৯ বিপদের ফযিলতের আরও পূর্ণাঙ্গ তালিকার জন্য পরিশিষ্ট তিন দ্রষ্টব্য।

রাসূল বলেন, "আর কাঠিন্যের সাথে আছে সহজতা।” এ কথাটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার এই আয়াত থেকে উৎসারিত : "আল্লাহ কষ্টের পর আরাম দেবেন।”২৪৩
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৪৪
হুমাইদ ইবনু হাম্মাদ ইবনু আবুল খুওয়ার বর্ণনা করেন, আইয ইবনু শুরাইহ তাঁকে জানিয়েছেন যে, তিনি আনাস বিন মালিক-কে বলতে শুনেছেন, "নবীজি মাটিতে এক গর্তের সামনে বসে ছিলেন। তিনি বললেন, 'কষ্ট যদি এই গর্তে গিয়েও ঢুকত, স্বস্তি এর পেছন পেছন গিয়ে ঢুকে তাকে বের করে দিত।' তারপর আল্লাহ আয়াত নাযিল করেন :
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৪৫
এটি বর্ণিত হয়েছে ইবনু আবি হাতিম-এর আত-তাফসিরে। বাযযার-এর বর্ণনায় রয়েছে, “কষ্ট যদি এসে এই গর্তেও ঢুকত, স্বস্তি এর পেছন পেছন গিয়ে ঢুকত এবং একে সরিয়ে দিত। তারপর তিনি তিলাওয়াত করলেন, 'কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।”২৪৬
হুমাইদ বিন হাম্মাদকে দুর্বল বর্ণনাকারী বলা হয়। মা'মার থেকে ইবনু জারির বর্ণনা করেন, আল-হাসান বলেন, “নবীজি একদিন আনন্দিত ও খুশি অবস্থায় বের হয়ে এসে বললেন, 'একটি কষ্ট কখনো দুইটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারবে না।”২৪৭
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৪৮ আওফ এবং ইউনুস এ-এর সূত্রেও তিনি আল-হাসান থেকে এটি মুরসাল হাদীস হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি একে কাতাদাহ থেকে বর্ণিত হাদীস হিসেবেও উল্লেখ করেছেন, যিনি বলেন, "আমাদের কাছে বলা হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাহাবাগণকে এই আয়াতের সুসংবাদ এই বলে দিয়েছেন যে, 'একটি কষ্ট কখনো দুইটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারবে না।”২৪৯
মুয়াউয়িয়াহ ইবনু কুররাহ থেকে ইবনু আবিদ্দুনিয়া বর্ণনা করেন যে, এক বর্ণনাকারী তাঁকে জানিয়েছেন, ইবনু মাসউদ বলেছেন, "কষ্ট যদি একটি গর্তেও প্রবেশ করে, স্বস্তি একে অনুসরণ করে এতে প্রবেশ করবে।”২৫০ তারপর তিনি তিলাওয়াত করেন: "কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৫১
এ ছাড়া তিনি এটি আব্দুর রহমান ইবনু যাইদ ইবনু আসলাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি তাঁর বাবার থেকে এবং তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেন, যখন আবু উবাইদা অবরোধে পড়লেন, তখন উমার তাঁকে চিঠি লিখলেন, “যে কষ্টই আসুক না কেন, আল্লাহ তার পর মুক্তি পাঠাবেন। কারণ, একটি কষ্ট দুটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারে না আর আল্লাহ বলেন:
'হে ঈমানদারগণ, ধৈর্য ধরো এবং ধৈর্যে (শত্রুর চেয়ে বেশি) অগ্রসর থাকো। যুদ্ধক্ষেত্রে দৃঢ়তা প্রদর্শন করো। আর তাকওয়া অবলম্বন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।' ২৫২, ২৫৩
ইবনে আব্বাস ২৫৪ সহ অন্যান্য মুফাসসিরগণও এই আয়াতের তাফসীরে বলেছেন, “একটি কষ্ট দুইটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারবে না।”
অতীতের এক ব্যক্তি মরুভূমিতে খুব কষ্টে থাকা অবস্থায় কবিতার এ চরণ দুটি তাঁর মাথায় আসে: দুশ্চিন্তিত হয়ে নিদ্রা থেকে জাগরণ, তার চেয়ে উত্তম হলো সাক্ষাৎ মরণ। রাতের বেলা কোনো একটি কণ্ঠ ডেকে উঠল, নিশ্চিন্ত হও, হে দুশ্চিন্তিত জন! কবিতা আওড়েছ, কিন্তু সাক্ষ্য দেয় মন, ধেয়ে আসে যখন কষ্টের বাহিনী ভাবো, 'আমি কি প্রশস্ত করিনি...?'২৫৫ দুই স্বস্তির মাঝে এক কষ্ট থাকবেই স্মরণ করলে আনন্দ লাগবেই।
তিনি বলেন, "আমি এই চরণগুলো মুখস্থ করে নিলাম। আর আল্লাহ আমাকে আমার দুর্দশা থেকে মুক্তি দিলেন।”
এ ব্যাপারে অনেক কাব্য রচিত হয়েছে। আমরা এর কয়েকটি উদ্ধৃত করছি :
ধৈর্য ধরো, ধৈর্যে বিস্ময়কর ফল আসে, হতাশ হোয়ো না কোনোই সর্বনাশে।
কষ্টের কাঁধ উষ্ণ করে নিজের শ্বাসে, এর পেছন পেছনেই স্বস্তি চলে আসে।
একজন বলেছেন: হতাশ হয়ে যায় অনেকে এমন সংকটে যার সমাধান আসছে খুবই নিকটে।
আরেকজন বলেছেন: হয়তো শীঘ্রই আসছে বিপদমুক্তি, 'হয়তো'ই আমাদের আত্মার যুক্তি। হতাশার কাছে যখন করে আত্মসমর্পণ, বিপদমুক্তি খুব নিকটেই থাকে তখন।
আরেকজন আবৃত্তি করেছেন : সবকিছু যখন কঠিন লাগে, মুক্তি আশা করো তখনই, মুক্তি খুব কাছেই থাকে, বিপদ ঘনীভূত হয় যখনই।
আরেকজন নিচের চরণগুলো রচনা করেছেন :
একদিনের জন্য কষ্টে পতিত হলে হতাশ হোয়ো না, কতশত দিন যে স্বস্তিতে বাঁচবে, তা তুমি জানো না। রবের ব্যাপারে কুধারণা রেখো না, সৌন্দর্য তাঁরই ভূষণ, কখনো নিরাশ হোয়ো না, এ যে কুফরি এক ভীষণ! অল্পতেই তোমার সেরে যাবে প্রয়োজন, জেনে রেখো কষ্টকে স্বস্তি করে অনুসরণ। যত বক্তা রাখে তাদের বক্তব্য, আল্লাহর কথাই তার মাঝে সর্বাধিক সত্য।
তাঁদের একজন বলেছেন, ধৈর্য হলো কষ্টমুক্তিদ্বার, কষ্টকে স্বস্তি অনুসরণ করে প্রতিবার। থেমে থাকে না কখনো সময় এক ঘটনার পর আরেক ঘটনা হয়।
বিপদ-আপদ প্রদানের কিছু সূক্ষ্ম উপকারিতা ও প্রজ্ঞার কথা বর্ণনা করে আমরা এই আলোচনা শেষ করব।
১. গুনাহ মাফ হয় ও ধৈর্য ধরে বিপদ সহ্য করার সাওয়াব লাভ হয়। বিপদটির কারণে সাওয়াব পাওয়া যায় কি না-এ নিয়ে আলিমগণের মতভেদ আছে।
২. বান্দার তার গুনাহের কথা স্মরণ হয় এবং সে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার কাছে তাওবাহর সুযোগ পায়।
৩. শক্ত ও কঠিন থাকার পর অন্তর নরম হয়। একজন সালাফ বলেছিলেন, “কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ার ফলে গুনাহের কথা স্মরণ করতে পারে। এবং আল্লাহর ভয়ে মাছির মাথা পরিমাণ অশ্রুও যদি নির্গত হয়, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।”
৪. ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার সামনে বিনয়ী করে। প্রচুর নেক আমলের চেয়ে এ রকম একটি অবস্থাই আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়।
৫. এসব বিপদের কারণে ব্যক্তির হৃদয় আল্লাহর দিকে ঘুরে যায়, সে তাঁর দুয়ারে গিয়ে দাঁড়ায়, তাঁকে ডাকে ও তাঁর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে। এটি হলো বিপদের সবচেয়ে বড় লাভ। যারা বিপদের সময় আল্লাহর সামনে বিনীত হয় না, আল্লাহ তাদের তিরস্কার করেছেন:
"আমি তাদের শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করেছিলাম। কিন্তু তারা তাদের প্রতিপালকের নিকট নত হলো না, আর তারা কাকুতি-মিনতিও করল না।”২৫৬
“তোমার পূর্বে আমি অনেক জাতির কাছে রাসূল পাঠিয়েছি। আর অভাব-অনটন ও দুঃখ-ক্লেশ দিয়ে পাকড়াও করেছিলাম, যাতে তারা বিনয়ী হয়।”২৫৭
পূর্বের এক আসমানি কিতাবে আছে, "আল্লাহ বান্দাকে পরীক্ষায় ফেলেন, কারণ তিনি তার কাছে কাকুতি-মিনতি শুনতে ভালোবাসেন।”
সাইদ বিন আব্দুল আযীয বলেন, “দাউদ বলেন, 'সুমহান সেই সত্তা, যিনি বিপদে ফেলে বান্দাকে দু'আ করতে বাধ্য করেন। সুমহান সেই সত্তা, যিনি স্বাচ্ছন্দ্য প্রদানের মাধ্যমে কৃতজ্ঞ হতে দেন।”
মুহাম্মাদ আল-মুনকাদির এ প্রচণ্ড কষ্টে ছিলেন। আবু জাফার মুহাম্মাদ ইবনু আলি তাঁর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর ব্যাপারে মানুষকে জিজ্ঞেস করলেন। লোকেরা জানাল তিনি ঋণগ্রস্ত। আবু জাফার বললেন, "তাঁর জন্য কি দু'আর দরজা খুলেছে?” তারা জানাল, "হ্যাঁ।" আবু জাফার বললেন, "বান্দা সত্যিই সৌভাগ্যবান, যদি সে প্রয়োজনের সময় তার রবকে বেশি বেশি ডাকে, তা যে প্রয়োজনই হোক না কেন।”
তাঁদের কেউ কেউ বিপদে পড়ে দু'আ করার সময় দ্রুত জবাব আশা করতেন না। তাঁদের যে রবকে প্রয়োজন হয়েছে, এই অবস্থাটি দ্রুত শেষ হয়ে যাক-তা তাঁরা চাইতেন না। সাবিত বলেন, “মুমিন যখন আল্লাহকে ডাকে, আল্লাহ জিবরীলকে তার প্রয়োজন পূরণ করার দায়িত্ব দিয়ে বলেন, 'তার প্রয়োজন পূরণ করতে তাড়াহুড়া করবে না। আমি আমার মুমিন বান্দার কণ্ঠ শুনতে ভালোবাসি।” এটি নবীজি -এর হাদীস হিসেবেও বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এর সকল সনদ দুর্বল।৫৮
একজন সালাফ স্বপ্নে আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করে বললেন, "হে আল্লাহ, আমি আপনাকে অনেক ডেকেছি, কিন্তু জবাব পাইনি।” তিনি জবাব দিলেন, "আমি তোমার কণ্ঠ শুনতে ভালোবাসি।”
৬. বিপদ-আপদের ফলে অন্তর ধৈর্যের ও সন্তুষ্টির মিষ্টতা অনুভব করে। এটি হলো বিরাট পুরস্কারের পদ, যার মর্যাদা সম্পর্কে ইতঃপূর্বে আলোচনা হয়েছে।
৭. বিপদের ফলে বান্দা সৃষ্টির থেকে মুখ ফিরিয়ে স্রষ্টামুখী হয়। আল্লাহ বলেছেন মুশরিকরাই বিপদের সময় এক আল্লাহকে ডাকে, তাহলে মুমিনের অবস্থা কী?
৮. বিপদের ফলে বান্দা তাওহীদকে সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করে ও একে অন্তরে অনুভব করে।২৫৯
এক ইসরাঈলী বর্ণনায় আছে, (আল্লাহ বলেন),
"বিপদ তোমাকে আর আমাকে কাছে আনে। স্বাচ্ছন্দ্য তোমাকে তোমার কাছে আনে।"

টিকাঃ
২৪৩ সূরাহ আত-তলাক, ৬৫: ৭
২৪৪ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪: ৫-৬
২৪৫ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪: ৫-৬
২৪৬ ইবনু আবি হাতিম : ১৯৩৯৫; বাযযার: ২২৮৮; তাবারানি, আল-আসওয়াত: ৩৪১৬; হাকিম: ৩০১০। যাহাবি বলেন, "এটি শুধু হুমাইদ ইবনু হাম্মাদ থেকে আইয সূত্রে বর্ণিত আছে। উভয়ই হাদীস বর্ণনায় মুনকার। বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১২, বলেন এটি যঈফ; আলবানি, আয- যঈফাহ: ১৪০৩ এ একে যঈফ জিদ্দান বলেছেন।
২৪৭ তাবারি; বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১৩; হাকিম: ৩৯৫০; যাহাবি একে মুরসাল বলেন। একই কথা বলেছেন যায়লাই, তাখরিজুল কাশশাফ: খণ্ড ৪, ২৩৫ পৃষ্ঠায়। ইবনু হাজার, আল-কাফি: ৩১৯ পৃষ্ঠায় একে মুরসাল বলেন এবং বলেন যে, এর মাওসুল সংস্করণটি যঈফ। তাগলিক আত- তালিক: খণ্ড ৪, ৩৭২ পৃষ্ঠায় তিনি আরও বলেন আল-হাসান পর্যন্ত এর ইসনাদ সহীহ। আলবানি, আয-যঈফাহ: ৪৩৪২ এ একে যঈফ বলেন। ইবনু আবি হাতিম: ১৩৩৯৬ এ একে আল-হাসানের উক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। ইবনু কাসির বলেন, “এই কথাগুলোর অর্থ হলো উভয় ক্ষেত্রে 'কষ্ট' কথাটি সুনির্দিষ্টতাবাচক উপসর্গ 'আল' এর সাথে যুক্ত। অতএব এটি একবচন। কিন্তু 'স্বস্তি' শব্দটি অনির্দিষ্ট রেখে দেওয়া হয়েছে। অতএব, এটি একাধিকবার ঘটবে। অতএব, দ্বিতীয়বারে উল্লেখিত কষ্ট প্রথমটিকেই বোঝাচ্ছে। তবে স্বস্তির ঘটনা একাধিক।"
২৪৮ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪ : ৫-৬
২৪৯ তাবারি; এটি মুরসাল। ইবনু হাজার, তাগলিক আত-তালিক: খণ্ড ৪, ৩৭২ পৃষ্ঠায় বলেন কাতাদাহ পর্যন্ত এর ইসনাদ সহীহ।
২৫০ বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১১; সুয়ুতি, আদুররুল মানসুরে একে ইবনু আবিদ্দুনিয়ার আস- সবরের সাথে সম্পৃক্ত করেন।
২৫১ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪ : ৫-৬
২৫২ সূরাহ আলে ইমরান, ৩: ২০০
২৫০ ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ: পৃষ্ঠা ২৪; বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১০; ইবনু আবি শাইবাহ: খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৩৫ এবং খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা ৩৭; হাকিম: ৩১৭৬ এ একে মুসলিমের শর্তানুযায়ী সহীহ বলেছেন। যাহাবি একমত। কিন্তু ইবনু হাজার, তাগলিক আত-তালিক: খণ্ড ৪, ৩৭২ পৃষ্ঠায় বলেন এর ইসনাদ হাসান।
২৫৪ সাখাওয়ি, আল-মাকাসিদ: ৮৭৭ বলেন, "এটি বর্ণিত হয়েছে আবু সালিহ থেকে আল-কালবি, তাঁর থেকে আল-ফাররা কর্তৃক।
২৫৫ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪: ১
২৫৬ সূরাহ আল-মুমিনূন, ২৩: ৭৬
২৫৭ সূরাহ আল-আন'আম, ৬: ৪২
২৫৮ তাবারানি, আল-আসওয়াত: ৮৪৪২; জাবির থেকে বর্ণিত।
২৫৯ বিপদের ফযিলতের আরও পূর্ণাঙ্গ তালিকার জন্য পরিশিষ্ট তিন দ্রষ্টব্য।

রাসূল বলেন, "আর কাঠিন্যের সাথে আছে সহজতা।” এ কথাটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার এই আয়াত থেকে উৎসারিত : "আল্লাহ কষ্টের পর আরাম দেবেন।”২৪৩
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৪৪
হুমাইদ ইবনু হাম্মাদ ইবনু আবুল খুওয়ার বর্ণনা করেন, আইয ইবনু শুরাইহ তাঁকে জানিয়েছেন যে, তিনি আনাস বিন মালিক-কে বলতে শুনেছেন, "নবীজি মাটিতে এক গর্তের সামনে বসে ছিলেন। তিনি বললেন, 'কষ্ট যদি এই গর্তে গিয়েও ঢুকত, স্বস্তি এর পেছন পেছন গিয়ে ঢুকে তাকে বের করে দিত।' তারপর আল্লাহ আয়াত নাযিল করেন :
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৪৫
এটি বর্ণিত হয়েছে ইবনু আবি হাতিম-এর আত-তাফসিরে। বাযযার-এর বর্ণনায় রয়েছে, “কষ্ট যদি এসে এই গর্তেও ঢুকত, স্বস্তি এর পেছন পেছন গিয়ে ঢুকত এবং একে সরিয়ে দিত। তারপর তিনি তিলাওয়াত করলেন, 'কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।”২৪৬
হুমাইদ বিন হাম্মাদকে দুর্বল বর্ণনাকারী বলা হয়। মা'মার থেকে ইবনু জারির বর্ণনা করেন, আল-হাসান বলেন, “নবীজি একদিন আনন্দিত ও খুশি অবস্থায় বের হয়ে এসে বললেন, 'একটি কষ্ট কখনো দুইটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারবে না।”২৪৭
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৪৮ আওফ এবং ইউনুস এ-এর সূত্রেও তিনি আল-হাসান থেকে এটি মুরসাল হাদীস হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি একে কাতাদাহ থেকে বর্ণিত হাদীস হিসেবেও উল্লেখ করেছেন, যিনি বলেন, "আমাদের কাছে বলা হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাহাবাগণকে এই আয়াতের সুসংবাদ এই বলে দিয়েছেন যে, 'একটি কষ্ট কখনো দুইটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারবে না।”২৪৯
মুয়াউয়িয়াহ ইবনু কুররাহ থেকে ইবনু আবিদ্দুনিয়া বর্ণনা করেন যে, এক বর্ণনাকারী তাঁকে জানিয়েছেন, ইবনু মাসউদ বলেছেন, "কষ্ট যদি একটি গর্তেও প্রবেশ করে, স্বস্তি একে অনুসরণ করে এতে প্রবেশ করবে।”২৫০ তারপর তিনি তিলাওয়াত করেন: "কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৫১
এ ছাড়া তিনি এটি আব্দুর রহমান ইবনু যাইদ ইবনু আসলাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি তাঁর বাবার থেকে এবং তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেন, যখন আবু উবাইদা অবরোধে পড়লেন, তখন উমার তাঁকে চিঠি লিখলেন, “যে কষ্টই আসুক না কেন, আল্লাহ তার পর মুক্তি পাঠাবেন। কারণ, একটি কষ্ট দুটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারে না আর আল্লাহ বলেন:
'হে ঈমানদারগণ, ধৈর্য ধরো এবং ধৈর্যে (শত্রুর চেয়ে বেশি) অগ্রসর থাকো। যুদ্ধক্ষেত্রে দৃঢ়তা প্রদর্শন করো। আর তাকওয়া অবলম্বন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।' ২৫২, ২৫৩
ইবনে আব্বাস ২৫৪ সহ অন্যান্য মুফাসসিরগণও এই আয়াতের তাফসীরে বলেছেন, “একটি কষ্ট দুইটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারবে না।”
অতীতের এক ব্যক্তি মরুভূমিতে খুব কষ্টে থাকা অবস্থায় কবিতার এ চরণ দুটি তাঁর মাথায় আসে: দুশ্চিন্তিত হয়ে নিদ্রা থেকে জাগরণ, তার চেয়ে উত্তম হলো সাক্ষাৎ মরণ। রাতের বেলা কোনো একটি কণ্ঠ ডেকে উঠল, নিশ্চিন্ত হও, হে দুশ্চিন্তিত জন! কবিতা আওড়েছ, কিন্তু সাক্ষ্য দেয় মন, ধেয়ে আসে যখন কষ্টের বাহিনী ভাবো, 'আমি কি প্রশস্ত করিনি...?'২৫৫ দুই স্বস্তির মাঝে এক কষ্ট থাকবেই স্মরণ করলে আনন্দ লাগবেই।
তিনি বলেন, "আমি এই চরণগুলো মুখস্থ করে নিলাম। আর আল্লাহ আমাকে আমার দুর্দশা থেকে মুক্তি দিলেন।”
এ ব্যাপারে অনেক কাব্য রচিত হয়েছে। আমরা এর কয়েকটি উদ্ধৃত করছি :
ধৈর্য ধরো, ধৈর্যে বিস্ময়কর ফল আসে, হতাশ হোয়ো না কোনোই সর্বনাশে।
কষ্টের কাঁধ উষ্ণ করে নিজের শ্বাসে, এর পেছন পেছনেই স্বস্তি চলে আসে।
একজন বলেছেন: হতাশ হয়ে যায় অনেকে এমন সংকটে যার সমাধান আসছে খুবই নিকটে।
আরেকজন বলেছেন: হয়তো শীঘ্রই আসছে বিপদমুক্তি, 'হয়তো'ই আমাদের আত্মার যুক্তি। হতাশার কাছে যখন করে আত্মসমর্পণ, বিপদমুক্তি খুব নিকটেই থাকে তখন।
আরেকজন আবৃত্তি করেছেন : সবকিছু যখন কঠিন লাগে, মুক্তি আশা করো তখনই, মুক্তি খুব কাছেই থাকে, বিপদ ঘনীভূত হয় যখনই।
আরেকজন নিচের চরণগুলো রচনা করেছেন :
একদিনের জন্য কষ্টে পতিত হলে হতাশ হোয়ো না, কতশত দিন যে স্বস্তিতে বাঁচবে, তা তুমি জানো না। রবের ব্যাপারে কুধারণা রেখো না, সৌন্দর্য তাঁরই ভূষণ, কখনো নিরাশ হোয়ো না, এ যে কুফরি এক ভীষণ! অল্পতেই তোমার সেরে যাবে প্রয়োজন, জেনে রেখো কষ্টকে স্বস্তি করে অনুসরণ। যত বক্তা রাখে তাদের বক্তব্য, আল্লাহর কথাই তার মাঝে সর্বাধিক সত্য।
তাঁদের একজন বলেছেন, ধৈর্য হলো কষ্টমুক্তিদ্বার, কষ্টকে স্বস্তি অনুসরণ করে প্রতিবার। থেমে থাকে না কখনো সময় এক ঘটনার পর আরেক ঘটনা হয়।
বিপদ-আপদ প্রদানের কিছু সূক্ষ্ম উপকারিতা ও প্রজ্ঞার কথা বর্ণনা করে আমরা এই আলোচনা শেষ করব।
১. গুনাহ মাফ হয় ও ধৈর্য ধরে বিপদ সহ্য করার সাওয়াব লাভ হয়। বিপদটির কারণে সাওয়াব পাওয়া যায় কি না-এ নিয়ে আলিমগণের মতভেদ আছে।
২. বান্দার তার গুনাহের কথা স্মরণ হয় এবং সে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার কাছে তাওবাহর সুযোগ পায়।
৩. শক্ত ও কঠিন থাকার পর অন্তর নরম হয়। একজন সালাফ বলেছিলেন, “কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ার ফলে গুনাহের কথা স্মরণ করতে পারে। এবং আল্লাহর ভয়ে মাছির মাথা পরিমাণ অশ্রুও যদি নির্গত হয়, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।”
৪. ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার সামনে বিনয়ী করে। প্রচুর নেক আমলের চেয়ে এ রকম একটি অবস্থাই আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়।
৫. এসব বিপদের কারণে ব্যক্তির হৃদয় আল্লাহর দিকে ঘুরে যায়, সে তাঁর দুয়ারে গিয়ে দাঁড়ায়, তাঁকে ডাকে ও তাঁর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে। এটি হলো বিপদের সবচেয়ে বড় লাভ। যারা বিপদের সময় আল্লাহর সামনে বিনীত হয় না, আল্লাহ তাদের তিরস্কার করেছেন:
"আমি তাদের শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করেছিলাম। কিন্তু তারা তাদের প্রতিপালকের নিকট নত হলো না, আর তারা কাকুতি-মিনতিও করল না।”২৫৬
“তোমার পূর্বে আমি অনেক জাতির কাছে রাসূল পাঠিয়েছি। আর অভাব-অনটন ও দুঃখ-ক্লেশ দিয়ে পাকড়াও করেছিলাম, যাতে তারা বিনয়ী হয়।”২৫৭
পূর্বের এক আসমানি কিতাবে আছে, "আল্লাহ বান্দাকে পরীক্ষায় ফেলেন, কারণ তিনি তার কাছে কাকুতি-মিনতি শুনতে ভালোবাসেন।”
সাইদ বিন আব্দুল আযীয বলেন, “দাউদ বলেন, 'সুমহান সেই সত্তা, যিনি বিপদে ফেলে বান্দাকে দু'আ করতে বাধ্য করেন। সুমহান সেই সত্তা, যিনি স্বাচ্ছন্দ্য প্রদানের মাধ্যমে কৃতজ্ঞ হতে দেন।”
মুহাম্মাদ আল-মুনকাদির এ প্রচণ্ড কষ্টে ছিলেন। আবু জাফার মুহাম্মাদ ইবনু আলি তাঁর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর ব্যাপারে মানুষকে জিজ্ঞেস করলেন। লোকেরা জানাল তিনি ঋণগ্রস্ত। আবু জাফার বললেন, "তাঁর জন্য কি দু'আর দরজা খুলেছে?” তারা জানাল, "হ্যাঁ।" আবু জাফার বললেন, "বান্দা সত্যিই সৌভাগ্যবান, যদি সে প্রয়োজনের সময় তার রবকে বেশি বেশি ডাকে, তা যে প্রয়োজনই হোক না কেন।”
তাঁদের কেউ কেউ বিপদে পড়ে দু'আ করার সময় দ্রুত জবাব আশা করতেন না। তাঁদের যে রবকে প্রয়োজন হয়েছে, এই অবস্থাটি দ্রুত শেষ হয়ে যাক-তা তাঁরা চাইতেন না। সাবিত বলেন, “মুমিন যখন আল্লাহকে ডাকে, আল্লাহ জিবরীলকে তার প্রয়োজন পূরণ করার দায়িত্ব দিয়ে বলেন, 'তার প্রয়োজন পূরণ করতে তাড়াহুড়া করবে না। আমি আমার মুমিন বান্দার কণ্ঠ শুনতে ভালোবাসি।” এটি নবীজি -এর হাদীস হিসেবেও বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এর সকল সনদ দুর্বল।৫৮
একজন সালাফ স্বপ্নে আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করে বললেন, "হে আল্লাহ, আমি আপনাকে অনেক ডেকেছি, কিন্তু জবাব পাইনি।” তিনি জবাব দিলেন, "আমি তোমার কণ্ঠ শুনতে ভালোবাসি।”
৬. বিপদ-আপদের ফলে অন্তর ধৈর্যের ও সন্তুষ্টির মিষ্টতা অনুভব করে। এটি হলো বিরাট পুরস্কারের পদ, যার মর্যাদা সম্পর্কে ইতঃপূর্বে আলোচনা হয়েছে।
৭. বিপদের ফলে বান্দা সৃষ্টির থেকে মুখ ফিরিয়ে স্রষ্টামুখী হয়। আল্লাহ বলেছেন মুশরিকরাই বিপদের সময় এক আল্লাহকে ডাকে, তাহলে মুমিনের অবস্থা কী?
৮. বিপদের ফলে বান্দা তাওহীদকে সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করে ও একে অন্তরে অনুভব করে।২৫৯
এক ইসরাঈলী বর্ণনায় আছে, (আল্লাহ বলেন),
"বিপদ তোমাকে আর আমাকে কাছে আনে। স্বাচ্ছন্দ্য তোমাকে তোমার কাছে আনে।"

টিকাঃ
২৪৩ সূরাহ আত-তলাক, ৬৫: ৭
২৪৪ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪: ৫-৬
২৪৫ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪: ৫-৬
২৪৬ ইবনু আবি হাতিম : ১৯৩৯৫; বাযযার: ২২৮৮; তাবারানি, আল-আসওয়াত: ৩৪১৬; হাকিম: ৩০১০। যাহাবি বলেন, "এটি শুধু হুমাইদ ইবনু হাম্মাদ থেকে আইয সূত্রে বর্ণিত আছে। উভয়ই হাদীস বর্ণনায় মুনকার। বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১২, বলেন এটি যঈফ; আলবানি, আয- যঈফাহ: ১৪০৩ এ একে যঈফ জিদ্দান বলেছেন।
২৪৭ তাবারি; বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১৩; হাকিম: ৩৯৫০; যাহাবি একে মুরসাল বলেন। একই কথা বলেছেন যায়লাই, তাখরিজুল কাশশাফ: খণ্ড ৪, ২৩৫ পৃষ্ঠায়। ইবনু হাজার, আল-কাফি: ৩১৯ পৃষ্ঠায় একে মুরসাল বলেন এবং বলেন যে, এর মাওসুল সংস্করণটি যঈফ। তাগলিক আত- তালিক: খণ্ড ৪, ৩৭২ পৃষ্ঠায় তিনি আরও বলেন আল-হাসান পর্যন্ত এর ইসনাদ সহীহ। আলবানি, আয-যঈফাহ: ৪৩৪২ এ একে যঈফ বলেন। ইবনু আবি হাতিম: ১৩৩৯৬ এ একে আল-হাসানের উক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। ইবনু কাসির বলেন, “এই কথাগুলোর অর্থ হলো উভয় ক্ষেত্রে 'কষ্ট' কথাটি সুনির্দিষ্টতাবাচক উপসর্গ 'আল' এর সাথে যুক্ত। অতএব এটি একবচন। কিন্তু 'স্বস্তি' শব্দটি অনির্দিষ্ট রেখে দেওয়া হয়েছে। অতএব, এটি একাধিকবার ঘটবে। অতএব, দ্বিতীয়বারে উল্লেখিত কষ্ট প্রথমটিকেই বোঝাচ্ছে। তবে স্বস্তির ঘটনা একাধিক।"
২৪৮ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪ : ৫-৬
২৪৯ তাবারি; এটি মুরসাল। ইবনু হাজার, তাগলিক আত-তালিক: খণ্ড ৪, ৩৭২ পৃষ্ঠায় বলেন কাতাদাহ পর্যন্ত এর ইসনাদ সহীহ।
২৫০ বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১১; সুয়ুতি, আদুররুল মানসুরে একে ইবনু আবিদ্দুনিয়ার আস- সবরের সাথে সম্পৃক্ত করেন।
২৫১ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪ : ৫-৬
২৫২ সূরাহ আলে ইমরান, ৩: ২০০
২৫০ ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ: পৃষ্ঠা ২৪; বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১০; ইবনু আবি শাইবাহ: খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৩৫ এবং খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা ৩৭; হাকিম: ৩১৭৬ এ একে মুসলিমের শর্তানুযায়ী সহীহ বলেছেন। যাহাবি একমত। কিন্তু ইবনু হাজার, তাগলিক আত-তালিক: খণ্ড ৪, ৩৭২ পৃষ্ঠায় বলেন এর ইসনাদ হাসান।
২৫৪ সাখাওয়ি, আল-মাকাসিদ: ৮৭৭ বলেন, "এটি বর্ণিত হয়েছে আবু সালিহ থেকে আল-কালবি, তাঁর থেকে আল-ফাররা কর্তৃক।
২৫৫ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪: ১
২৫৬ সূরাহ আল-মুমিনূন, ২৩: ৭৬
২৫৭ সূরাহ আল-আন'আম, ৬: ৪২
২৫৮ তাবারানি, আল-আসওয়াত: ৮৪৪২; জাবির থেকে বর্ণিত।
২৫৯ বিপদের ফযিলতের আরও পূর্ণাঙ্গ তালিকার জন্য পরিশিষ্ট তিন দ্রষ্টব্য।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00