📄 কষ্টের সাথে স্বস্তি
নবীজি বলেন, “কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।” এর সমর্থন রয়েছে আল্লাহ তা'আলার এই আয়াতে :
“মানুষ নিরাশ হয়ে যাওয়ার পর তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন আর স্বীয় রহমত ছড়িয়ে দেন। তিনিই সকল গুণে প্রশংসিত প্রকৃত অভিভাবক।”২৩১
"আল্লাহ, যিনি বায়ু প্রেরণ করেন, অতঃপর তা মেঘমালার সঞ্চার করেন, অতঃপর তিনি তা আকাশে ছড়িয়ে দেন যেভাবে ইচ্ছে করেন, অতঃপর তাকে খণ্ড-বিখণ্ড করে দেন, তারপর তুমি দেখতে পাও তার মাঝ থেকে বৃষ্টিফোঁটা নির্গত হচ্ছে, অতঃপর তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাদের নিকট তিনি ইচ্ছে করেন তাদের কাছে যখন তা পৌঁছে দেন, তখন তারা হয় আনন্দিত। যদিও ইতঃপূর্বে তাদের প্রতি বৃষ্টি বর্ষণের পূর্বে তারা ছিল চরমভাবে হতাশ।”২৩২
আবু রাযিন আল-উকাইলি থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে আছে, নবীজি বলেন, “আমাদের রব সেই বান্দার হতাশা দেখে হাসেন, যার অবস্থা তিনি শীঘ্রই পরিবর্তন করতে চলেছেন।”২৩৩ ইমাম আহমাদ এটি বর্ণনা করেন। তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহ-ও আবু রাজিন-এর সূত্রে একটি দীর্ঘ হাদীস বর্ণনা করেন যেখানে নবীজি বলেন, “যেই দিনে বৃষ্টি পাঠানো হবে, আল্লাহ তোমাদের হতাশ অবস্থায় দেখবেন এবং তিনি হাসবেন এটি জেনে যে, তিনি শীঘ্রই অবস্থার পরিবর্তন আনতে চলেছেন।” ২৩৪
এর অর্থ হলো আল্লাহ তাঁর বান্দার হতাশা, নিরাশা, ভয়, ভুল বোঝা ও তাঁর রহমতের আশা ছেড়ে দেওয়া দেখে বিস্মিত হন, অথচ তিনি নির্ধারিত করে দিয়েছেন যে, তাদের অজান্তেই অবস্থা শীঘ্রই পরিবর্তিত হবে, বৃষ্টি নেমে আসবে।
এক জুমু'আর দিন নবীজি ﷺ যখন খুতবা দিচ্ছিলেন, এক ব্যক্তি এসে খরা ও জনগণের দুর্দশার ব্যাপারে অভিযোগ করল। নবীজি ﷺ হাত তুলে বৃষ্টির জন্য দু'আ করলেন। আকাশে মেঘ জমে পরবর্তী জুমু'আ পর্যন্ত বৃষ্টি হতে লাগল। তখন লোকেরা এসে বৃষ্টি বন্ধের জন্য দু'আ করতে অনুরোধ করল। এরপর আকাশ পরিষ্কার হলো।২৩৫
আল্লাহ তাঁর কিতাবে এমন অনেক কাহিনি বলেছেন যেখানে দুঃখ-দুর্দশার পর প্রশান্তি আসে। তিনি নূহ -এর কথা বলেছেন, যাকে তাঁর সাথের মুমিনদের সহ আল্লাহ 'মহাবিপদ' থেকে উদ্ধার করেছেন, যখন বাকি সবাই ডুবে গিয়েছিল।২৩৬ আল্লাহ জানিয়েছেন কীভাবে তিনি মুশরিকদের প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ড থেকে ইবরাহীম -কে উদ্ধার করেছেন এবং তাকে তাঁর জন্য 'প্রশান্তিদায়ক ঠান্ডা' করে দিয়েছেন। ২৩৭ আরও বলেছেন ইবরাহীম তাঁর সন্তানকে কুরবানি করার শেষ মুহূর্তে এক 'উত্তম কুরবানি'র২৩৮ বিনিময়ে ইসমাঈল -এর প্রাণ বাঁচান। তিনি জানিয়েছেন কীভাবে মূসা -কে তাঁর মা নদীতে ভাসিয়ে দেন এবং তিনি ফিরআউনের পরিবারের কাছে এসে ভিড়েন। আরও জানিয়েছেন মূসা ও ফিরআউনের মধ্যকার দ্বন্দ্বের কাহিনি, কীভাবে আল্লাহ মূসা -কে বাঁচিয়ে তাঁর শত্রুদের ডুবিয়ে দেন। তিনি আইয়ুব , ইউনুস , ইয়াকুব , ইউসুফ -এর কাহিনি বর্ণনা করেছেন। ইউনুস -এর জনপদ ঈমান আনার পর কী হলো, তা বর্ণনা করেছেন। মুহাম্মাদ ﷺ-এর জীবনের অনেক ঘটনা বর্ণনা করেছেন। গারে সাওর এবং বদর, উহুদ ও হুনাইনের যুদ্ধে কীভাবে সাহায্য করেছেন, তা জানিয়েছেন।
আয়িশা -কে লোকেরা মিথ্যা অপবাদ প্রদানের পর আল্লাহ তাঁর নিষ্পাপতা ঘোষণা করেছেন। ২**৩৯** আল্লাহ আরও জানিয়েছেন তিন ব্যক্তির কাহিনি :
"...যারা (তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা থেকে) পেছনে থেকে গিয়েছিল। তারা অনুশোচনার আগুনে এমনই দগ্ধ যে, পৃথিবী তার পূর্ণ বিস্তৃতি নিয়েও তাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল আর তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠল আর তারা বুঝতে পারল যে, আল্লাহ ছাড়া তাদের কোনো আশ্রয়স্থল নেই তাঁর কাছে ফিরে যাওয়া ব্যতীত। অতঃপর তিনি তাদের অনুগ্রহ করলেন, যাতে তারা অনুশোচনায় তার দিকে ফিরে আসে... "২**৪০**
সুন্নাহয়ও এমন অনেক কাহিনি আছে। যেমন গুহায় আটকা পড়া তিন ব্যক্তি, যারা নিজেদের আমলের দোহাই দিয়ে দু'আ করে মুক্তি পান। ২**৪১** আরও আছে ইবরাহীম ও সারাহ-এর কাহিনি, যেখানে যালিম বাদশাহ তাঁদের নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করতে বন্দী করে কিন্তু আল্লাহ তার পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেন। ২**৪২**
উম্মাতে মুহাম্মাদী এবং এর আগের উম্মাতদের এমন অনেক কাহিনি বিবৃত হয়েছে অনেক কিতাবে। যেমন: ইবনু আবিদ্দুনিয়া আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ, মুজাবিউদ্দু'আ এবং আরেকটি কিতাব আল-মুস্তাগিসিনা বিল্লাহ ওয়াল মুস্তাস্রিখিনা বিহি, এ ছাড়া আওলিয়াগণের কারামাত-সংক্রান্ত কিতাব, সৎকর্মশীলদের জীবনী ও ইতিহাসের কিতাব।
একজন আলিম-সম্ভবত তিনি মরোক্কোর, তাঁর এক বইয়ে হাফিয আবু যার আল- হারাওয়ি থেকে একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। তিনি যখন বাগদাদে এক সুগন্ধী বিক্রেতার দোকানে আবু হাফস ইবনু শাহিন -কে পড়ে শোনাচ্ছিলেন, তিনি এক লোককে এসে দশ দিরহাম দিয়ে সুগন্ধী বিক্রেতার কাছ থেকে কিছু কিনতে দেখলেন। সে ক্রয়কৃত জিনিসগুলো একটি টুকরিতে রেখে মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় সে পড়ে গিয়ে সব জিনিস ভেঙে গেল। লোকটি কান্না করতে করতে জানাল যে, সে একবার এক কাফেলায় উট ও তার পিঠে থাকা চার শ দিরহাম এবং তার চেয়েও দামি কিছু রত্নপাথর হারায়। তাতেও সে কিছু মনে করেনি। কিন্তু এখন তার ছেলে হয়েছে। প্রসবের পর নারীর যা যা লাগে, তা সে কিনে ফিরছিল। এই দশ দিরহামই তার ছিল। এখন তাও শেষ। পরের দিন তার কোনো কাজও নেই যে অর্থ কামাই করবে। এখন সে কেবল পালিয়ে গিয়ে স্ত্রী-সন্তানকে শান্তিতে মরতে দিতে পারে। আল-জুন্দের এক বয়স্ক লোক ঘরের দাওয়ায় বসে তা শুনতে পেলেন। তিনি কয়েকজন সহকর্মীসহ অনুমতি নিয়ে আবু হাফস-এর ঘরে এলেন। বিপদে পড়া লোকটিও তাঁদের সাথে ছিল। তিনি লোকটিকে তার কাহিনি আবার শোনাতে বলেন। এরপর জিজ্ঞেস করেন তার হারানো উটটি দেখলে সে চিনবে কি না। সে জানাল চিনবে। তিনি একটি উট এনে দিলে লোকটি তা চিনতে পারে এবং তার সাথে থাকা রত্নপাথরগুলোও সাথে পায়। ফলে সে আবার ধনী হয়ে ফিরে গেল। সে চলে যাবার পর জুন্দী লোকটি কাঁদতে লাগলেন। জিজ্ঞেস করার পর তিনি বলেন, “আমি দু'আ করেছিলাম উটের মালিককে খুঁজে পাবার আগ পর্যন্ত যেন আমি বেঁচে থাকি। আজ যেহেতু আমার সে দু'আ কবুল হয়ে গেছে, আমি বুঝতে পারছি আমার মৃত্যু নিকটবর্তী।” আবু যার জানান, “তিনি অল্প ক'দিন পরই মারা যান। আমরা তাঁর জানাযা আদায় করি। আল্লাহ তাঁকে রহম করুন।”
একই লেখক আরেকটি কাহিনি বর্ণনা করেন। মওসুলে এক ব্যবসায়ী ছিল, যে নানা জায়গায় ঘুরেফিরে ব্যবসা করত। একবার সকল সহায়সম্পত্তি ও ব্যবসায়িক মালামাল নিয়ে সে কুফায় ব্যবসা করতে গেল। পথে এক ব্যক্তির সাথে দেখা হলো যে তার অনেক উপকার করল। তারা দ্রুত বন্ধু হয় গেল এবং সে তাকে বিশ্বাস করে বসল। এক জায়গায় বিশ্রাম নিতে থামলে ওই ব্যক্তি সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীর সবকিছু নিয়ে যায়। ব্যবসায়ী একদম কপর্দকশূন্য হয়ে যায়। সে অনেক খুঁজেও চোরকে খুঁজে পেল না। পায়ে হেঁটে ধুঁকে ধুঁকে সে নিজ দেশে ফিরল। তার পরিবার তাকে দেখে খুশি হয়ে উঠল। তার স্ত্রী এক সন্তানের জন্ম দিয়েছে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, জ্বালানি ও খাবার কিছুই ঘরে নেই। তারা ভেবেছিল সে ফিরে আসায় এখন সেসবের ব্যবস্থা হবে। এই ঘটনা শুনে ব্যবসায়ীর কষ্ট আরও বেড়ে গেল। কিছু না জানিয়ে সে বাজারের দিকে গেল। দোকানদারকে সালাম দিয়ে সে তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জড়ো করে কিছু বলতে যাবে, এমন সময় দোকানদারের কাছে অরক্ষিত অবস্থায় সে তার ঘোড়ায় ঝোলানোর থলিটি পড়ে থাকতে দেখতে পেল। সে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল এই জিনিস সে কোথায় পেয়েছে। দোকানদার জানাল এক ব্যক্তি সফর করে এসে তার কাছে এগুলো আমানত রেখেছে। সে মাসজিদে ঘুমোচ্ছে। ব্যবসায়ী থলিটি নিয়ে মাসজিদে গিয়ে সেই লোককে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখল। সে তাকে লাথি মেরে জাগিয়ে দিয়ে বলল, “চোর! বিশ্বাসঘাতক! আমার জিনিসপত্র কোথায়?” চোরটি জানাল তার সেই থলিতেই সব আছে। ব্যবসায়ী তখন থলি খুলে তাতে নিজের সকল জিনিস খুঁজে পেল। সে তারপর তার পরিবারের জন্য দুই হাত খুলে খরচ করল।
একই রকম একটি দীর্ঘ কাহিনি তিন্নাওখি বর্ণনা করেছেন আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ গ্রন্থে। এর সারসংক্ষেপ হলো: খলিফা হারুন আর-রশিদের আমলে এক টাকা লেনদেনকারী ছিল। সে পাঁচ শ দিনার দিয়ে এক দাসী ক্রয় করল। সে দাসীকে এতই ভালোবেসে ফেলল যে, সব সময় তার সাথে থাকতে থাকতে তার ব্যবসায় ক্ষতি হওয়া শুরু হলো। তার পুরো মূলধন খরচ হয়ে গিয়ে কিছুই বাকি থাকল না। তার দাসী গর্ভবতী হয়ে গেল। লোকটি তার ঘরের জিনিসপত্র বেচতে বেচতে শেষ পর্যন্ত আর কিছুই বাকি রইল না। প্রসববেদনা উঠলে নারীটি তাকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে তাড়া দিলো। বলল যে, সেগুলো যথাসময়ে না পেলে সে মারা যাবে। লোকটি ঘর থেকে বের হয়ে ফুরাত নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিল। শেষ মুহূর্তে তাকে আল্লাহর ভয় পেয়ে বসল। সে আত্মহত্যার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে পায়ে হেঁটে এক শহর থেকে আরেক শহরে যেতে লাগল। শেষমেশ সে খুরাসানে পৌঁছে কাজ পেল। সে সেখান থেকে বাগদাদে তার দাসীর কাছে পর পর ছেষট্টিটি চিঠি লিখেও কোনো জবাব পেল না। সে ধরে নিল তার দাসী সত্যিই মারা গেছে। ত্রিশ বছর খুরাসানে থেকে সে আবারও ধনী হয়ে গেল। তখন সে বাগদাদে নিজ ভূমে ফেরার সিদ্ধান্ত নিল। পথিমধ্যে ডাকাতি হয়ে সে আবার আগের মতো কপর্দকহীন হয়ে গেল। বাগদাদে ফিরে সে নিজের ঘরের ঠিকানায় গিয়ে দেখল সেখানে আলিশান এক বাড়ি। তাতে পাহারাদার দাঁড় করানো। সে প্রহরীকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, এই ঘরের মালিক কে? প্রহরী জানাল একজন টাকা লেনদেনকারী এ ঘরের মালিক। যে নাম তাকে বলা হলো, তা তার নিজেরই নাম। আরও বিস্তারিত জানতে চাইলে প্রহরী বলল যে, এই ঘরের মালিকের মা হলেন আমীরুল মুমিনীনের ছেলেরও ধাত্রী মাতা। আমীরুল মুমিনীনের মামুন নামে এক ছেলে হয়। সে এই মহিলা ছাড়া আর কারও দুধ খেতে চাইত না। মামুন যখন খলিফা হলেন, তিনি সেই মহিলাকে আর তার ছেলেকে যত্ন-আত্তি করেন। ছেলেটি বড় হলে খলিফা তাকে বাইতুল মালের রক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। সেই মহিলা এখন কিছুদিন খলিফার কাছে থাকে, আর কিছুদিন এই বাড়িতে নিজের ছেলের কাছে থাকে। প্রহরীর কাছে সে এই মহিলার স্বামীর
ব্যাপারে জানতে চাইলো। প্রহরী জানাল, ত্রিশ বছর আগে এই বাড়ির মালিকের যখন জন্ম হচ্ছিল তখন তার বাবা অর্থের সন্ধানে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় আর পথ হারিয়ে ফেলে। সে আর ফিরে আসেনি, হয়তো মারা গেছে। তাদের কথোপকথনের পর নিজের লোকজনসহ তার ছেলে ফিরে আসে। লোকটি তাকে পরিচয় দিয়ে বলে সে তার বাবা। ছেলেটি বিস্মিত হয়ে যায়। তাকে ঘরের ভেতরে নিয়ে বসায়। সেখানে একটি পর্দাঘেরা জায়গা ছিল। লোকটি বলল, “তুমি যদি আমার কথা বিশ্বাস না করো, তাহলে তাকে জিজ্ঞেস করতে পারো।” কথা শুনে সেই দাসীটি বেরিয়ে এসে নিজের স্বামীকে চিনতে পেরে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে খেতে কাঁদতে লাগল। তারা তাকে আমীরুল মুমিনীনের কাছে নিয়ে গেল। খলিফা আল-মামুন তার ছেলেকে পদোন্নতি দিলেন আর তাকে তার ছেলের আগের পদে নিয়োগ দিলেন।
ইবনু আবিদ্দুনিয়া তাঁর আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ওয়াদ্দাহ ইবনু খাইসামা বলেন, “উমার বিন আব্দুল আযীয আমাকে এক কারাগার থেকে সকল বন্দীকে মুক্তি দেওয়ার আদেশ দিলেন। আমি ইয়াযিদ ইবনু আবি মুসলিম ছাড়া বাকি সবাইকে ছেড়ে দিলাম। সে প্রতিশোধ হিসেবে আমার প্রাণ নেওয়ার হুমকি দিলো। আমি আফ্রিকায় থাকা অবস্থায় শুনলাম আফ্রিকান প্রদেশগুলোর সম্প্রতি নিযুক্ত আমির ইয়াযিদ ইবনু আবি মুসলিম আসছে। আমি পালিয়ে গেলাম। সে আমাকে ধরতে একের পর এক লোক পাঠাতে লাগল। একসময় আমি ধরা পড়লাম আর আমাকে তার কাছে নেওয়া হলো। সে বলল, 'আল্লাহর কসম! আমি বারবার দু'আ করেছি তোমাকে আমার কাছে পাওয়ার জন্য।' আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম! আমি বারবার দু'আ করেছি তিনি যেন তোমার অনিষ্ট থেকে আমাকে রক্ষা করেন।' সে বলল, 'আল্লাহর কসম! তিনি তোমাকে নিরাপত্তা দেননি আর আমি তোমাকে হত্যা করব। এমনকি মৃত্যুর ফেরেশতাও যদি তোমার প্রাণ নিতে আমার সাথে পাল্লা দেন, তিনি পরাজিত হবেন। তরবারি আর জল্লাদের চাদর নিয়ে এসো!' আমাকে তাতে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে আমার মাথায় জল্লাদ তলোয়ার ঠেকাল। এমন সময় সালাতের আযান হলো। সে সালাত পড়তে চলে গেল। সে সেজদায় থাকা অবস্থায় একদল সেনা আক্রমণ করে তাকে হত্যা করে ফেলল। এক লোক এসে আমার হাতের বাঁধন কেটে দিয়ে আমাকে নিজের রাস্তায় চলে যেতে বলল।”
উমার আস-সারায়ার সূত্রে তিনি আরেকটি ঘটনা বর্ণনা করেন। উমার একবার রোমান প্রদেশগুলোতে একাকী অবস্থান করছিলেন। তিনি ঘুমানো অবস্থায় তাদের একজন এসে তাঁকে পাড়া দিয়ে ঘুম থেকে তুলে বলল, “অ্যাই আরব, তোমাকে
বেছে নেওয়ার সুযোগ দিলাম। তোমাকে আমি বর্শা দিয়ে হত্যা করতে পারি, তলোয়ার দিয়ে হত্যা করতে পারি অথবা আমরা কুস্তি করতে পারি।” তিনি বললেন, "তাহলে আমরা কুস্তি লড়ব।” সে তাঁকে হারিয়ে দিয়ে তাঁর বুকের উপর বসে বলল, “বল, তোকে কীভাবে হত্যা করব।” তিনি চিৎকার করলেন, “হে আল্লাহ, আপনার মহত্ত্ব ছাড়া আপনার আরশের নিচের আর যা কিছুর ইবাদাত করা হয়, সব মিথ্যে! আপনি আমার অবস্থা দেখছেন। অতএব আমাকে উদ্ধার করুন।” তিনি তারপর অজ্ঞান হয়ে গেলেন। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন তিনি ওই রোমানকে তাঁর পাশে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলেন।
আবুল হাসান ইবনু জাদহাম বর্ণনা করেন, হাতিম আল-আসাম বলেন, "আমরা তুর্কিদের মুখোমুখি হলাম এবং দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হলাম। এক তুর্কি আমাকে ঘোড়া থেকে ফেলে দিলো। তারপর ঘোড়া থেকে নেমে এসে আমার বুকে চড়ে বসল। আমার দাড়ি ধরে সে নিজের মোজা থেকে একটি চাকু বের করে আমাকে জবাই করতে উদ্যত হলো। কিন্তু আমার হৃদয় তার বা তার চাকুতে মগ্ন ছিল না। তা মগ্ন ছিল আমার মালিকের মাঝে। আমি ভাবলাম, 'হে মালিক, আপনি যদি এখানে আমার জবাই তাকদীরে রেখে থাকেন, আমি এর প্রতি নিজেকে সমর্পণ করলাম। আমি আপনারই।' এমতাবস্থায় এক মুসলিম তার দিকে একটি তির ছুড়ে মারল আর সে আমার উপর থেকে পড়ে গেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে তার চাকু নিয়ে তাকে জবাই করে দিলাম।”
অতএব, আপনার হৃদয়কে আপনার মনিবের হাতে সঁপে দিন। দেখবেন সাহায্যের এমন সব দুয়ার খুলে যাচ্ছে, যা আপনার পূর্বপুরুষদের কেউ দেখেনি।
টিকাঃ
২০১ সূরাহ আশ-শুরা, ৪২: ২৮
২০২ সূরাহ আর-রূম, ৩০ : ৪৮-৪৯
২০৩ আহমাদ: ১৬১৮৭-১৬২০১; ইবনু মাজাহ: ১৮১; আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ, আস-সুন্নাহ: ৪৫২-৪৫৩; ইবনু তাইমিয়্যাহ, আল-ওয়াসিতিয়্যাহতে বলেন, হাদীসটি হাসান। সুয়ুতি, আল-জামি: ৫২০৭ এ একে সহীহ বলেছেন। আরনাউত এর ইসনাদ যঈফ বলেছেন। একই কথা বলেছেন আলবানি, আস-সহীহাহ: ২৮১০, কিন্তু তিনি একে শাহীদের কারণে হাসান বলেছেন।
২০৪ আহমাদ: ১৬২০৬; আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ, আস-সুন্নাহ: ৪৫২-৪৫৩; তাবারানি, আল-কাবির: খণ্ড ১৯, পৃষ্ঠা ২১১, হাদীস নং ৪৭৭, এর ইসনাদ যঈফ; অনুরূপ আলবানি, আস-সহীহাহ : ২৮১০; এবং আরনাউত
২৩৫ বুখারি: ৯৩২-৯৩৩-১০১৩-১০১৯-১০২১-১০২৯-১০৩৩-৩৫৮২-৬০৯৩-৬৩৪২; মুসলিম: ৮৯৭; আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত।
২৩৬ সূরাহ আল-আম্বিয়া, ২১: ৭৬
২৩৭ সূরাহ আল-আম্বিয়া, ২১: ৬৯
২৩৮ সূরাহ আস-সফফাত, ৩৭: ১০৭
২**৩৯** পুরো কাহিনিটি বর্ণিত আছে বুখারি: ২৬৬১-৪১৪১-৪৬৯০-৪৭৫০-৪৭৫৭-৬৬৭৯- ৭৩৬৯-৭৩৭০-৭৫০০-৭৫৪৫ এবং মুসলিম: ২৭৭০; আয়িশাহ থেকে।
২**৪০** সূরাহ আত-তাওবাহ, ৯ : ১১৮ পুরো কাহিনিটি বর্ণিত আছে বুখারি: ২৭৫৭-২৯৪৭-২৯৫০-৩০৮৮-৩৫৫৬-৩৮৮৯- ৩৯৫১-৪৪১৭-৪৬৭৩-৪৬৭৬-৪৬৭৭-৪৬৭৮-৬২৫৫-৬৬৯০-৭২২৫ এবং মুসলিম : ২৭৬৯; কাব বিন মালিক থেকে বর্ণিত।
২**৪১** বুখারি: ২২১৫-২২৭২-২৩৩৩-৩৪৬৫-৫৯৭৪ এবং মুসলিম : ২৭৪৩; ইবনু উমার থেকে বর্ণিত।
২**৪২** বুখারি: ২২১৭-২৬৩৫-৩৩৫৭-৩৩৫৮-৫০৮৪-৬৯৫০; মুসলিম: ২৩৭১; আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।
নবীজি বলেন, “কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।” এর সমর্থন রয়েছে আল্লাহ তা'আলার এই আয়াতে :
“মানুষ নিরাশ হয়ে যাওয়ার পর তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন আর স্বীয় রহমত ছড়িয়ে দেন। তিনিই সকল গুণে প্রশংসিত প্রকৃত অভিভাবক।”২৩১
"আল্লাহ, যিনি বায়ু প্রেরণ করেন, অতঃপর তা মেঘমালার সঞ্চার করেন, অতঃপর তিনি তা আকাশে ছড়িয়ে দেন যেভাবে ইচ্ছে করেন, অতঃপর তাকে খণ্ড-বিখণ্ড করে দেন, তারপর তুমি দেখতে পাও তার মাঝ থেকে বৃষ্টিফোঁটা নির্গত হচ্ছে, অতঃপর তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাদের নিকট তিনি ইচ্ছে করেন তাদের কাছে যখন তা পৌঁছে দেন, তখন তারা হয় আনন্দিত। যদিও ইতঃপূর্বে তাদের প্রতি বৃষ্টি বর্ষণের পূর্বে তারা ছিল চরমভাবে হতাশ।”২৩২
আবু রাযিন আল-উকাইলি থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে আছে, নবীজি বলেন, “আমাদের রব সেই বান্দার হতাশা দেখে হাসেন, যার অবস্থা তিনি শীঘ্রই পরিবর্তন করতে চলেছেন।”২৩৩ ইমাম আহমাদ এটি বর্ণনা করেন। তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহ-ও আবু রাজিন-এর সূত্রে একটি দীর্ঘ হাদীস বর্ণনা করেন যেখানে নবীজি বলেন, “যেই দিনে বৃষ্টি পাঠানো হবে, আল্লাহ তোমাদের হতাশ অবস্থায় দেখবেন এবং তিনি হাসবেন এটি জেনে যে, তিনি শীঘ্রই অবস্থার পরিবর্তন আনতে চলেছেন।” ২৩৪
এর অর্থ হলো আল্লাহ তাঁর বান্দার হতাশা, নিরাশা, ভয়, ভুল বোঝা ও তাঁর রহমতের আশা ছেড়ে দেওয়া দেখে বিস্মিত হন, অথচ তিনি নির্ধারিত করে দিয়েছেন যে, তাদের অজান্তেই অবস্থা শীঘ্রই পরিবর্তিত হবে, বৃষ্টি নেমে আসবে।
এক জুমু'আর দিন নবীজি ﷺ যখন খুতবা দিচ্ছিলেন, এক ব্যক্তি এসে খরা ও জনগণের দুর্দশার ব্যাপারে অভিযোগ করল। নবীজি ﷺ হাত তুলে বৃষ্টির জন্য দু'আ করলেন। আকাশে মেঘ জমে পরবর্তী জুমু'আ পর্যন্ত বৃষ্টি হতে লাগল। তখন লোকেরা এসে বৃষ্টি বন্ধের জন্য দু'আ করতে অনুরোধ করল। এরপর আকাশ পরিষ্কার হলো।২৩৫
আল্লাহ তাঁর কিতাবে এমন অনেক কাহিনি বলেছেন যেখানে দুঃখ-দুর্দশার পর প্রশান্তি আসে। তিনি নূহ -এর কথা বলেছেন, যাকে তাঁর সাথের মুমিনদের সহ আল্লাহ 'মহাবিপদ' থেকে উদ্ধার করেছেন, যখন বাকি সবাই ডুবে গিয়েছিল।২৩৬ আল্লাহ জানিয়েছেন কীভাবে তিনি মুশরিকদের প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ড থেকে ইবরাহীম -কে উদ্ধার করেছেন এবং তাকে তাঁর জন্য 'প্রশান্তিদায়ক ঠান্ডা' করে দিয়েছেন। ২৩৭ আরও বলেছেন ইবরাহীম তাঁর সন্তানকে কুরবানি করার শেষ মুহূর্তে এক 'উত্তম কুরবানি'র২৩৮ বিনিময়ে ইসমাঈল -এর প্রাণ বাঁচান। তিনি জানিয়েছেন কীভাবে মূসা -কে তাঁর মা নদীতে ভাসিয়ে দেন এবং তিনি ফিরআউনের পরিবারের কাছে এসে ভিড়েন। আরও জানিয়েছেন মূসা ও ফিরআউনের মধ্যকার দ্বন্দ্বের কাহিনি, কীভাবে আল্লাহ মূসা -কে বাঁচিয়ে তাঁর শত্রুদের ডুবিয়ে দেন। তিনি আইয়ুব , ইউনুস , ইয়াকুব , ইউসুফ -এর কাহিনি বর্ণনা করেছেন। ইউনুস -এর জনপদ ঈমান আনার পর কী হলো, তা বর্ণনা করেছেন। মুহাম্মাদ ﷺ-এর জীবনের অনেক ঘটনা বর্ণনা করেছেন। গারে সাওর এবং বদর, উহুদ ও হুনাইনের যুদ্ধে কীভাবে সাহায্য করেছেন, তা জানিয়েছেন।
আয়িশা -কে লোকেরা মিথ্যা অপবাদ প্রদানের পর আল্লাহ তাঁর নিষ্পাপতা ঘোষণা করেছেন। ২**৩৯** আল্লাহ আরও জানিয়েছেন তিন ব্যক্তির কাহিনি :
"...যারা (তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা থেকে) পেছনে থেকে গিয়েছিল। তারা অনুশোচনার আগুনে এমনই দগ্ধ যে, পৃথিবী তার পূর্ণ বিস্তৃতি নিয়েও তাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল আর তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠল আর তারা বুঝতে পারল যে, আল্লাহ ছাড়া তাদের কোনো আশ্রয়স্থল নেই তাঁর কাছে ফিরে যাওয়া ব্যতীত। অতঃপর তিনি তাদের অনুগ্রহ করলেন, যাতে তারা অনুশোচনায় তার দিকে ফিরে আসে... "২**৪০**
সুন্নাহয়ও এমন অনেক কাহিনি আছে। যেমন গুহায় আটকা পড়া তিন ব্যক্তি, যারা নিজেদের আমলের দোহাই দিয়ে দু'আ করে মুক্তি পান। ২**৪১** আরও আছে ইবরাহীম ও সারাহ-এর কাহিনি, যেখানে যালিম বাদশাহ তাঁদের নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করতে বন্দী করে কিন্তু আল্লাহ তার পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেন। ২**৪২**
উম্মাতে মুহাম্মাদী এবং এর আগের উম্মাতদের এমন অনেক কাহিনি বিবৃত হয়েছে অনেক কিতাবে। যেমন: ইবনু আবিদ্দুনিয়া আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ, মুজাবিউদ্দু'আ এবং আরেকটি কিতাব আল-মুস্তাগিসিনা বিল্লাহ ওয়াল মুস্তাস্রিখিনা বিহি, এ ছাড়া আওলিয়াগণের কারামাত-সংক্রান্ত কিতাব, সৎকর্মশীলদের জীবনী ও ইতিহাসের কিতাব।
একজন আলিম-সম্ভবত তিনি মরোক্কোর, তাঁর এক বইয়ে হাফিয আবু যার আল- হারাওয়ি থেকে একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। তিনি যখন বাগদাদে এক সুগন্ধী বিক্রেতার দোকানে আবু হাফস ইবনু শাহিন -কে পড়ে শোনাচ্ছিলেন, তিনি এক লোককে এসে দশ দিরহাম দিয়ে সুগন্ধী বিক্রেতার কাছ থেকে কিছু কিনতে দেখলেন। সে ক্রয়কৃত জিনিসগুলো একটি টুকরিতে রেখে মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় সে পড়ে গিয়ে সব জিনিস ভেঙে গেল। লোকটি কান্না করতে করতে জানাল যে, সে একবার এক কাফেলায় উট ও তার পিঠে থাকা চার শ দিরহাম এবং তার চেয়েও দামি কিছু রত্নপাথর হারায়। তাতেও সে কিছু মনে করেনি। কিন্তু এখন তার ছেলে হয়েছে। প্রসবের পর নারীর যা যা লাগে, তা সে কিনে ফিরছিল। এই দশ দিরহামই তার ছিল। এখন তাও শেষ। পরের দিন তার কোনো কাজও নেই যে অর্থ কামাই করবে। এখন সে কেবল পালিয়ে গিয়ে স্ত্রী-সন্তানকে শান্তিতে মরতে দিতে পারে। আল-জুন্দের এক বয়স্ক লোক ঘরের দাওয়ায় বসে তা শুনতে পেলেন। তিনি কয়েকজন সহকর্মীসহ অনুমতি নিয়ে আবু হাফস-এর ঘরে এলেন। বিপদে পড়া লোকটিও তাঁদের সাথে ছিল। তিনি লোকটিকে তার কাহিনি আবার শোনাতে বলেন। এরপর জিজ্ঞেস করেন তার হারানো উটটি দেখলে সে চিনবে কি না। সে জানাল চিনবে। তিনি একটি উট এনে দিলে লোকটি তা চিনতে পারে এবং তার সাথে থাকা রত্নপাথরগুলোও সাথে পায়। ফলে সে আবার ধনী হয়ে ফিরে গেল। সে চলে যাবার পর জুন্দী লোকটি কাঁদতে লাগলেন। জিজ্ঞেস করার পর তিনি বলেন, “আমি দু'আ করেছিলাম উটের মালিককে খুঁজে পাবার আগ পর্যন্ত যেন আমি বেঁচে থাকি। আজ যেহেতু আমার সে দু'আ কবুল হয়ে গেছে, আমি বুঝতে পারছি আমার মৃত্যু নিকটবর্তী।” আবু যার জানান, “তিনি অল্প ক'দিন পরই মারা যান। আমরা তাঁর জানাযা আদায় করি। আল্লাহ তাঁকে রহম করুন।”
একই লেখক আরেকটি কাহিনি বর্ণনা করেন। মওসুলে এক ব্যবসায়ী ছিল, যে নানা জায়গায় ঘুরেফিরে ব্যবসা করত। একবার সকল সহায়সম্পত্তি ও ব্যবসায়িক মালামাল নিয়ে সে কুফায় ব্যবসা করতে গেল। পথে এক ব্যক্তির সাথে দেখা হলো যে তার অনেক উপকার করল। তারা দ্রুত বন্ধু হয় গেল এবং সে তাকে বিশ্বাস করে বসল। এক জায়গায় বিশ্রাম নিতে থামলে ওই ব্যক্তি সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীর সবকিছু নিয়ে যায়। ব্যবসায়ী একদম কপর্দকশূন্য হয়ে যায়। সে অনেক খুঁজেও চোরকে খুঁজে পেল না। পায়ে হেঁটে ধুঁকে ধুঁকে সে নিজ দেশে ফিরল। তার পরিবার তাকে দেখে খুশি হয়ে উঠল। তার স্ত্রী এক সন্তানের জন্ম দিয়েছে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, জ্বালানি ও খাবার কিছুই ঘরে নেই। তারা ভেবেছিল সে ফিরে আসায় এখন সেসবের ব্যবস্থা হবে। এই ঘটনা শুনে ব্যবসায়ীর কষ্ট আরও বেড়ে গেল। কিছু না জানিয়ে সে বাজারের দিকে গেল। দোকানদারকে সালাম দিয়ে সে তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জড়ো করে কিছু বলতে যাবে, এমন সময় দোকানদারের কাছে অরক্ষিত অবস্থায় সে তার ঘোড়ায় ঝোলানোর থলিটি পড়ে থাকতে দেখতে পেল। সে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল এই জিনিস সে কোথায় পেয়েছে। দোকানদার জানাল এক ব্যক্তি সফর করে এসে তার কাছে এগুলো আমানত রেখেছে। সে মাসজিদে ঘুমোচ্ছে। ব্যবসায়ী থলিটি নিয়ে মাসজিদে গিয়ে সেই লোককে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখল। সে তাকে লাথি মেরে জাগিয়ে দিয়ে বলল, “চোর! বিশ্বাসঘাতক! আমার জিনিসপত্র কোথায়?” চোরটি জানাল তার সেই থলিতেই সব আছে। ব্যবসায়ী তখন থলি খুলে তাতে নিজের সকল জিনিস খুঁজে পেল। সে তারপর তার পরিবারের জন্য দুই হাত খুলে খরচ করল।
একই রকম একটি দীর্ঘ কাহিনি তিন্নাওখি বর্ণনা করেছেন আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ গ্রন্থে। এর সারসংক্ষেপ হলো: খলিফা হারুন আর-রশিদের আমলে এক টাকা লেনদেনকারী ছিল। সে পাঁচ শ দিনার দিয়ে এক দাসী ক্রয় করল। সে দাসীকে এতই ভালোবেসে ফেলল যে, সব সময় তার সাথে থাকতে থাকতে তার ব্যবসায় ক্ষতি হওয়া শুরু হলো। তার পুরো মূলধন খরচ হয়ে গিয়ে কিছুই বাকি থাকল না। তার দাসী গর্ভবতী হয়ে গেল। লোকটি তার ঘরের জিনিসপত্র বেচতে বেচতে শেষ পর্যন্ত আর কিছুই বাকি রইল না। প্রসববেদনা উঠলে নারীটি তাকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে তাড়া দিলো। বলল যে, সেগুলো যথাসময়ে না পেলে সে মারা যাবে। লোকটি ঘর থেকে বের হয়ে ফুরাত নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিল। শেষ মুহূর্তে তাকে আল্লাহর ভয় পেয়ে বসল। সে আত্মহত্যার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে পায়ে হেঁটে এক শহর থেকে আরেক শহরে যেতে লাগল। শেষমেশ সে খুরাসানে পৌঁছে কাজ পেল। সে সেখান থেকে বাগদাদে তার দাসীর কাছে পর পর ছেষট্টিটি চিঠি লিখেও কোনো জবাব পেল না। সে ধরে নিল তার দাসী সত্যিই মারা গেছে। ত্রিশ বছর খুরাসানে থেকে সে আবারও ধনী হয়ে গেল। তখন সে বাগদাদে নিজ ভূমে ফেরার সিদ্ধান্ত নিল। পথিমধ্যে ডাকাতি হয়ে সে আবার আগের মতো কপর্দকহীন হয়ে গেল। বাগদাদে ফিরে সে নিজের ঘরের ঠিকানায় গিয়ে দেখল সেখানে আলিশান এক বাড়ি। তাতে পাহারাদার দাঁড় করানো। সে প্রহরীকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, এই ঘরের মালিক কে? প্রহরী জানাল একজন টাকা লেনদেনকারী এ ঘরের মালিক। যে নাম তাকে বলা হলো, তা তার নিজেরই নাম। আরও বিস্তারিত জানতে চাইলে প্রহরী বলল যে, এই ঘরের মালিকের মা হলেন আমীরুল মুমিনীনের ছেলেরও ধাত্রী মাতা। আমীরুল মুমিনীনের মামুন নামে এক ছেলে হয়। সে এই মহিলা ছাড়া আর কারও দুধ খেতে চাইত না। মামুন যখন খলিফা হলেন, তিনি সেই মহিলাকে আর তার ছেলেকে যত্ন-আত্তি করেন। ছেলেটি বড় হলে খলিফা তাকে বাইতুল মালের রক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। সেই মহিলা এখন কিছুদিন খলিফার কাছে থাকে, আর কিছুদিন এই বাড়িতে নিজের ছেলের কাছে থাকে। প্রহরীর কাছে সে এই মহিলার স্বামীর
ব্যাপারে জানতে চাইলো। প্রহরী জানাল, ত্রিশ বছর আগে এই বাড়ির মালিকের যখন জন্ম হচ্ছিল তখন তার বাবা অর্থের সন্ধানে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় আর পথ হারিয়ে ফেলে। সে আর ফিরে আসেনি, হয়তো মারা গেছে। তাদের কথোপকথনের পর নিজের লোকজনসহ তার ছেলে ফিরে আসে। লোকটি তাকে পরিচয় দিয়ে বলে সে তার বাবা। ছেলেটি বিস্মিত হয়ে যায়। তাকে ঘরের ভেতরে নিয়ে বসায়। সেখানে একটি পর্দাঘেরা জায়গা ছিল। লোকটি বলল, “তুমি যদি আমার কথা বিশ্বাস না করো, তাহলে তাকে জিজ্ঞেস করতে পারো।” কথা শুনে সেই দাসীটি বেরিয়ে এসে নিজের স্বামীকে চিনতে পেরে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে খেতে কাঁদতে লাগল। তারা তাকে আমীরুল মুমিনীনের কাছে নিয়ে গেল। খলিফা আল-মামুন তার ছেলেকে পদোন্নতি দিলেন আর তাকে তার ছেলের আগের পদে নিয়োগ দিলেন।
ইবনু আবিদ্দুনিয়া তাঁর আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ওয়াদ্দাহ ইবনু খাইসামা বলেন, “উমার বিন আব্দুল আযীয আমাকে এক কারাগার থেকে সকল বন্দীকে মুক্তি দেওয়ার আদেশ দিলেন। আমি ইয়াযিদ ইবনু আবি মুসলিম ছাড়া বাকি সবাইকে ছেড়ে দিলাম। সে প্রতিশোধ হিসেবে আমার প্রাণ নেওয়ার হুমকি দিলো। আমি আফ্রিকায় থাকা অবস্থায় শুনলাম আফ্রিকান প্রদেশগুলোর সম্প্রতি নিযুক্ত আমির ইয়াযিদ ইবনু আবি মুসলিম আসছে। আমি পালিয়ে গেলাম। সে আমাকে ধরতে একের পর এক লোক পাঠাতে লাগল। একসময় আমি ধরা পড়লাম আর আমাকে তার কাছে নেওয়া হলো। সে বলল, 'আল্লাহর কসম! আমি বারবার দু'আ করেছি তোমাকে আমার কাছে পাওয়ার জন্য।' আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম! আমি বারবার দু'আ করেছি তিনি যেন তোমার অনিষ্ট থেকে আমাকে রক্ষা করেন।' সে বলল, 'আল্লাহর কসম! তিনি তোমাকে নিরাপত্তা দেননি আর আমি তোমাকে হত্যা করব। এমনকি মৃত্যুর ফেরেশতাও যদি তোমার প্রাণ নিতে আমার সাথে পাল্লা দেন, তিনি পরাজিত হবেন। তরবারি আর জল্লাদের চাদর নিয়ে এসো!' আমাকে তাতে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে আমার মাথায় জল্লাদ তলোয়ার ঠেকাল। এমন সময় সালাতের আযান হলো। সে সালাত পড়তে চলে গেল। সে সেজদায় থাকা অবস্থায় একদল সেনা আক্রমণ করে তাকে হত্যা করে ফেলল। এক লোক এসে আমার হাতের বাঁধন কেটে দিয়ে আমাকে নিজের রাস্তায় চলে যেতে বলল।”
উমার আস-সারায়ার সূত্রে তিনি আরেকটি ঘটনা বর্ণনা করেন। উমার একবার রোমান প্রদেশগুলোতে একাকী অবস্থান করছিলেন। তিনি ঘুমানো অবস্থায় তাদের একজন এসে তাঁকে পাড়া দিয়ে ঘুম থেকে তুলে বলল, “অ্যাই আরব, তোমাকে
বেছে নেওয়ার সুযোগ দিলাম। তোমাকে আমি বর্শা দিয়ে হত্যা করতে পারি, তলোয়ার দিয়ে হত্যা করতে পারি অথবা আমরা কুস্তি করতে পারি।” তিনি বললেন, "তাহলে আমরা কুস্তি লড়ব।” সে তাঁকে হারিয়ে দিয়ে তাঁর বুকের উপর বসে বলল, “বল, তোকে কীভাবে হত্যা করব।” তিনি চিৎকার করলেন, “হে আল্লাহ, আপনার মহত্ত্ব ছাড়া আপনার আরশের নিচের আর যা কিছুর ইবাদাত করা হয়, সব মিথ্যে! আপনি আমার অবস্থা দেখছেন। অতএব আমাকে উদ্ধার করুন।” তিনি তারপর অজ্ঞান হয়ে গেলেন। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন তিনি ওই রোমানকে তাঁর পাশে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলেন।
আবুল হাসান ইবনু জাদহাম বর্ণনা করেন, হাতিম আল-আসাম বলেন, "আমরা তুর্কিদের মুখোমুখি হলাম এবং দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হলাম। এক তুর্কি আমাকে ঘোড়া থেকে ফেলে দিলো। তারপর ঘোড়া থেকে নেমে এসে আমার বুকে চড়ে বসল। আমার দাড়ি ধরে সে নিজের মোজা থেকে একটি চাকু বের করে আমাকে জবাই করতে উদ্যত হলো। কিন্তু আমার হৃদয় তার বা তার চাকুতে মগ্ন ছিল না। তা মগ্ন ছিল আমার মালিকের মাঝে। আমি ভাবলাম, 'হে মালিক, আপনি যদি এখানে আমার জবাই তাকদীরে রেখে থাকেন, আমি এর প্রতি নিজেকে সমর্পণ করলাম। আমি আপনারই।' এমতাবস্থায় এক মুসলিম তার দিকে একটি তির ছুড়ে মারল আর সে আমার উপর থেকে পড়ে গেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে তার চাকু নিয়ে তাকে জবাই করে দিলাম।”
অতএব, আপনার হৃদয়কে আপনার মনিবের হাতে সঁপে দিন। দেখবেন সাহায্যের এমন সব দুয়ার খুলে যাচ্ছে, যা আপনার পূর্বপুরুষদের কেউ দেখেনি।
টিকাঃ
২০১ সূরাহ আশ-শুরা, ৪২: ২৮
২০২ সূরাহ আর-রূম, ৩০ : ৪৮-৪৯
২০৩ আহমাদ: ১৬১৮৭-১৬২০১; ইবনু মাজাহ: ১৮১; আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ, আস-সুন্নাহ: ৪৫২-৪৫৩; ইবনু তাইমিয়্যাহ, আল-ওয়াসিতিয়্যাহতে বলেন, হাদীসটি হাসান। সুয়ুতি, আল-জামি: ৫২০৭ এ একে সহীহ বলেছেন। আরনাউত এর ইসনাদ যঈফ বলেছেন। একই কথা বলেছেন আলবানি, আস-সহীহাহ: ২৮১০, কিন্তু তিনি একে শাহীদের কারণে হাসান বলেছেন।
২০৪ আহমাদ: ১৬২০৬; আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ, আস-সুন্নাহ: ৪৫২-৪৫৩; তাবারানি, আল-কাবির: খণ্ড ১৯, পৃষ্ঠা ২১১, হাদীস নং ৪৭৭, এর ইসনাদ যঈফ; অনুরূপ আলবানি, আস-সহীহাহ : ২৮১০; এবং আরনাউত
২৩৫ বুখারি: ৯৩২-৯৩৩-১০১৩-১০১৯-১০২১-১০২৯-১০৩৩-৩৫৮২-৬০৯৩-৬৩৪২; মুসলিম: ৮৯৭; আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত।
২৩৬ সূরাহ আল-আম্বিয়া, ২১: ৭৬
২৩৭ সূরাহ আল-আম্বিয়া, ২১: ৬৯
২৩৮ সূরাহ আস-সফফাত, ৩৭: ১০৭
২**৩৯** পুরো কাহিনিটি বর্ণিত আছে বুখারি: ২৬৬১-৪১৪১-৪৬৯০-৪৭৫০-৪৭৫৭-৬৬৭৯- ৭৩৬৯-৭৩৭০-৭৫০০-৭৫৪৫ এবং মুসলিম: ২৭৭০; আয়িশাহ থেকে।
২**৪০** সূরাহ আত-তাওবাহ, ৯ : ১১৮ পুরো কাহিনিটি বর্ণিত আছে বুখারি: ২৭৫৭-২৯৪৭-২৯৫০-৩০৮৮-৩৫৫৬-৩৮৮৯- ৩৯৫১-৪৪১৭-৪৬৭৩-৪৬৭৬-৪৬৭৭-৪৬৭৮-৬২৫৫-৬৬৯০-৭২২৫ এবং মুসলিম : ২৭৬৯; কাব বিন মালিক থেকে বর্ণিত।
২**৪১** বুখারি: ২২১৫-২২৭২-২৩৩৩-৩৪৬৫-৫৯৭৪ এবং মুসলিম : ২৭৪৩; ইবনু উমার থেকে বর্ণিত।
২**৪২** বুখারি: ২২১৭-২৬৩৫-৩৩৫৭-৩৩৫৮-৫০৮৪-৬৯৫০; মুসলিম: ২৩৭১; আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।
নবীজি বলেন, “কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।” এর সমর্থন রয়েছে আল্লাহ তা'আলার এই আয়াতে :
“মানুষ নিরাশ হয়ে যাওয়ার পর তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন আর স্বীয় রহমত ছড়িয়ে দেন। তিনিই সকল গুণে প্রশংসিত প্রকৃত অভিভাবক।”২৩১
"আল্লাহ, যিনি বায়ু প্রেরণ করেন, অতঃপর তা মেঘমালার সঞ্চার করেন, অতঃপর তিনি তা আকাশে ছড়িয়ে দেন যেভাবে ইচ্ছে করেন, অতঃপর তাকে খণ্ড-বিখণ্ড করে দেন, তারপর তুমি দেখতে পাও তার মাঝ থেকে বৃষ্টিফোঁটা নির্গত হচ্ছে, অতঃপর তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাদের নিকট তিনি ইচ্ছে করেন তাদের কাছে যখন তা পৌঁছে দেন, তখন তারা হয় আনন্দিত। যদিও ইতঃপূর্বে তাদের প্রতি বৃষ্টি বর্ষণের পূর্বে তারা ছিল চরমভাবে হতাশ।”২৩২
আবু রাযিন আল-উকাইলি থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে আছে, নবীজি বলেন, “আমাদের রব সেই বান্দার হতাশা দেখে হাসেন, যার অবস্থা তিনি শীঘ্রই পরিবর্তন করতে চলেছেন।”২৩৩ ইমাম আহমাদ এটি বর্ণনা করেন। তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহ-ও আবু রাজিন-এর সূত্রে একটি দীর্ঘ হাদীস বর্ণনা করেন যেখানে নবীজি বলেন, “যেই দিনে বৃষ্টি পাঠানো হবে, আল্লাহ তোমাদের হতাশ অবস্থায় দেখবেন এবং তিনি হাসবেন এটি জেনে যে, তিনি শীঘ্রই অবস্থার পরিবর্তন আনতে চলেছেন।” ২৩৪
এর অর্থ হলো আল্লাহ তাঁর বান্দার হতাশা, নিরাশা, ভয়, ভুল বোঝা ও তাঁর রহমতের আশা ছেড়ে দেওয়া দেখে বিস্মিত হন, অথচ তিনি নির্ধারিত করে দিয়েছেন যে, তাদের অজান্তেই অবস্থা শীঘ্রই পরিবর্তিত হবে, বৃষ্টি নেমে আসবে।
এক জুমু'আর দিন নবীজি ﷺ যখন খুতবা দিচ্ছিলেন, এক ব্যক্তি এসে খরা ও জনগণের দুর্দশার ব্যাপারে অভিযোগ করল। নবীজি ﷺ হাত তুলে বৃষ্টির জন্য দু'আ করলেন। আকাশে মেঘ জমে পরবর্তী জুমু'আ পর্যন্ত বৃষ্টি হতে লাগল। তখন লোকেরা এসে বৃষ্টি বন্ধের জন্য দু'আ করতে অনুরোধ করল। এরপর আকাশ পরিষ্কার হলো।২৩৫
আল্লাহ তাঁর কিতাবে এমন অনেক কাহিনি বলেছেন যেখানে দুঃখ-দুর্দশার পর প্রশান্তি আসে। তিনি নূহ -এর কথা বলেছেন, যাকে তাঁর সাথের মুমিনদের সহ আল্লাহ 'মহাবিপদ' থেকে উদ্ধার করেছেন, যখন বাকি সবাই ডুবে গিয়েছিল।২৩৬ আল্লাহ জানিয়েছেন কীভাবে তিনি মুশরিকদের প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ড থেকে ইবরাহীম -কে উদ্ধার করেছেন এবং তাকে তাঁর জন্য 'প্রশান্তিদায়ক ঠান্ডা' করে দিয়েছেন। ২৩৭ আরও বলেছেন ইবরাহীম তাঁর সন্তানকে কুরবানি করার শেষ মুহূর্তে এক 'উত্তম কুরবানি'র২৩৮ বিনিময়ে ইসমাঈল -এর প্রাণ বাঁচান। তিনি জানিয়েছেন কীভাবে মূসা -কে তাঁর মা নদীতে ভাসিয়ে দেন এবং তিনি ফিরআউনের পরিবারের কাছে এসে ভিড়েন। আরও জানিয়েছেন মূসা ও ফিরআউনের মধ্যকার দ্বন্দ্বের কাহিনি, কীভাবে আল্লাহ মূসা -কে বাঁচিয়ে তাঁর শত্রুদের ডুবিয়ে দেন। তিনি আইয়ুব , ইউনুস , ইয়াকুব , ইউসুফ -এর কাহিনি বর্ণনা করেছেন। ইউনুস -এর জনপদ ঈমান আনার পর কী হলো, তা বর্ণনা করেছেন। মুহাম্মাদ ﷺ-এর জীবনের অনেক ঘটনা বর্ণনা করেছেন। গারে সাওর এবং বদর, উহুদ ও হুনাইনের যুদ্ধে কীভাবে সাহায্য করেছেন, তা জানিয়েছেন।
আয়িশা -কে লোকেরা মিথ্যা অপবাদ প্রদানের পর আল্লাহ তাঁর নিষ্পাপতা ঘোষণা করেছেন। ২**৩৯** আল্লাহ আরও জানিয়েছেন তিন ব্যক্তির কাহিনি :
"...যারা (তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা থেকে) পেছনে থেকে গিয়েছিল। তারা অনুশোচনার আগুনে এমনই দগ্ধ যে, পৃথিবী তার পূর্ণ বিস্তৃতি নিয়েও তাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল আর তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠল আর তারা বুঝতে পারল যে, আল্লাহ ছাড়া তাদের কোনো আশ্রয়স্থল নেই তাঁর কাছে ফিরে যাওয়া ব্যতীত। অতঃপর তিনি তাদের অনুগ্রহ করলেন, যাতে তারা অনুশোচনায় তার দিকে ফিরে আসে... "২**৪০**
সুন্নাহয়ও এমন অনেক কাহিনি আছে। যেমন গুহায় আটকা পড়া তিন ব্যক্তি, যারা নিজেদের আমলের দোহাই দিয়ে দু'আ করে মুক্তি পান। ২**৪১** আরও আছে ইবরাহীম ও সারাহ-এর কাহিনি, যেখানে যালিম বাদশাহ তাঁদের নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করতে বন্দী করে কিন্তু আল্লাহ তার পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেন। ২**৪২**
উম্মাতে মুহাম্মাদী এবং এর আগের উম্মাতদের এমন অনেক কাহিনি বিবৃত হয়েছে অনেক কিতাবে। যেমন: ইবনু আবিদ্দুনিয়া আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ, মুজাবিউদ্দু'আ এবং আরেকটি কিতাব আল-মুস্তাগিসিনা বিল্লাহ ওয়াল মুস্তাস্রিখিনা বিহি, এ ছাড়া আওলিয়াগণের কারামাত-সংক্রান্ত কিতাব, সৎকর্মশীলদের জীবনী ও ইতিহাসের কিতাব।
একজন আলিম-সম্ভবত তিনি মরোক্কোর, তাঁর এক বইয়ে হাফিয আবু যার আল- হারাওয়ি থেকে একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। তিনি যখন বাগদাদে এক সুগন্ধী বিক্রেতার দোকানে আবু হাফস ইবনু শাহিন -কে পড়ে শোনাচ্ছিলেন, তিনি এক লোককে এসে দশ দিরহাম দিয়ে সুগন্ধী বিক্রেতার কাছ থেকে কিছু কিনতে দেখলেন। সে ক্রয়কৃত জিনিসগুলো একটি টুকরিতে রেখে মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় সে পড়ে গিয়ে সব জিনিস ভেঙে গেল। লোকটি কান্না করতে করতে জানাল যে, সে একবার এক কাফেলায় উট ও তার পিঠে থাকা চার শ দিরহাম এবং তার চেয়েও দামি কিছু রত্নপাথর হারায়। তাতেও সে কিছু মনে করেনি। কিন্তু এখন তার ছেলে হয়েছে। প্রসবের পর নারীর যা যা লাগে, তা সে কিনে ফিরছিল। এই দশ দিরহামই তার ছিল। এখন তাও শেষ। পরের দিন তার কোনো কাজও নেই যে অর্থ কামাই করবে। এখন সে কেবল পালিয়ে গিয়ে স্ত্রী-সন্তানকে শান্তিতে মরতে দিতে পারে। আল-জুন্দের এক বয়স্ক লোক ঘরের দাওয়ায় বসে তা শুনতে পেলেন। তিনি কয়েকজন সহকর্মীসহ অনুমতি নিয়ে আবু হাফস-এর ঘরে এলেন। বিপদে পড়া লোকটিও তাঁদের সাথে ছিল। তিনি লোকটিকে তার কাহিনি আবার শোনাতে বলেন। এরপর জিজ্ঞেস করেন তার হারানো উটটি দেখলে সে চিনবে কি না। সে জানাল চিনবে। তিনি একটি উট এনে দিলে লোকটি তা চিনতে পারে এবং তার সাথে থাকা রত্নপাথরগুলোও সাথে পায়। ফলে সে আবার ধনী হয়ে ফিরে গেল। সে চলে যাবার পর জুন্দী লোকটি কাঁদতে লাগলেন। জিজ্ঞেস করার পর তিনি বলেন, “আমি দু'আ করেছিলাম উটের মালিককে খুঁজে পাবার আগ পর্যন্ত যেন আমি বেঁচে থাকি। আজ যেহেতু আমার সে দু'আ কবুল হয়ে গেছে, আমি বুঝতে পারছি আমার মৃত্যু নিকটবর্তী।” আবু যার জানান, “তিনি অল্প ক'দিন পরই মারা যান। আমরা তাঁর জানাযা আদায় করি। আল্লাহ তাঁকে রহম করুন।”
একই লেখক আরেকটি কাহিনি বর্ণনা করেন। মওসুলে এক ব্যবসায়ী ছিল, যে নানা জায়গায় ঘুরেফিরে ব্যবসা করত। একবার সকল সহায়সম্পত্তি ও ব্যবসায়িক মালামাল নিয়ে সে কুফায় ব্যবসা করতে গেল। পথে এক ব্যক্তির সাথে দেখা হলো যে তার অনেক উপকার করল। তারা দ্রুত বন্ধু হয় গেল এবং সে তাকে বিশ্বাস করে বসল। এক জায়গায় বিশ্রাম নিতে থামলে ওই ব্যক্তি সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীর সবকিছু নিয়ে যায়। ব্যবসায়ী একদম কপর্দকশূন্য হয়ে যায়। সে অনেক খুঁজেও চোরকে খুঁজে পেল না। পায়ে হেঁটে ধুঁকে ধুঁকে সে নিজ দেশে ফিরল। তার পরিবার তাকে দেখে খুশি হয়ে উঠল। তার স্ত্রী এক সন্তানের জন্ম দিয়েছে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, জ্বালানি ও খাবার কিছুই ঘরে নেই। তারা ভেবেছিল সে ফিরে আসায় এখন সেসবের ব্যবস্থা হবে। এই ঘটনা শুনে ব্যবসায়ীর কষ্ট আরও বেড়ে গেল। কিছু না জানিয়ে সে বাজারের দিকে গেল। দোকানদারকে সালাম দিয়ে সে তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জড়ো করে কিছু বলতে যাবে, এমন সময় দোকানদারের কাছে অরক্ষিত অবস্থায় সে তার ঘোড়ায় ঝোলানোর থলিটি পড়ে থাকতে দেখতে পেল। সে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল এই জিনিস সে কোথায় পেয়েছে। দোকানদার জানাল এক ব্যক্তি সফর করে এসে তার কাছে এগুলো আমানত রেখেছে। সে মাসজিদে ঘুমোচ্ছে। ব্যবসায়ী থলিটি নিয়ে মাসজিদে গিয়ে সেই লোককে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখল। সে তাকে লাথি মেরে জাগিয়ে দিয়ে বলল, “চোর! বিশ্বাসঘাতক! আমার জিনিসপত্র কোথায়?” চোরটি জানাল তার সেই থলিতেই সব আছে। ব্যবসায়ী তখন থলি খুলে তাতে নিজের সকল জিনিস খুঁজে পেল। সে তারপর তার পরিবারের জন্য দুই হাত খুলে খরচ করল।
একই রকম একটি দীর্ঘ কাহিনি তিন্নাওখি বর্ণনা করেছেন আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ গ্রন্থে। এর সারসংক্ষেপ হলো: খলিফা হারুন আর-রশিদের আমলে এক টাকা লেনদেনকারী ছিল। সে পাঁচ শ দিনার দিয়ে এক দাসী ক্রয় করল। সে দাসীকে এতই ভালোবেসে ফেলল যে, সব সময় তার সাথে থাকতে থাকতে তার ব্যবসায় ক্ষতি হওয়া শুরু হলো। তার পুরো মূলধন খরচ হয়ে গিয়ে কিছুই বাকি থাকল না। তার দাসী গর্ভবতী হয়ে গেল। লোকটি তার ঘরের জিনিসপত্র বেচতে বেচতে শেষ পর্যন্ত আর কিছুই বাকি রইল না। প্রসববেদনা উঠলে নারীটি তাকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে তাড়া দিলো। বলল যে, সেগুলো যথাসময়ে না পেলে সে মারা যাবে। লোকটি ঘর থেকে বের হয়ে ফুরাত নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিল। শেষ মুহূর্তে তাকে আল্লাহর ভয় পেয়ে বসল। সে আত্মহত্যার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে পায়ে হেঁটে এক শহর থেকে আরেক শহরে যেতে লাগল। শেষমেশ সে খুরাসানে পৌঁছে কাজ পেল। সে সেখান থেকে বাগদাদে তার দাসীর কাছে পর পর ছেষট্টিটি চিঠি লিখেও কোনো জবাব পেল না। সে ধরে নিল তার দাসী সত্যিই মারা গেছে। ত্রিশ বছর খুরাসানে থেকে সে আবারও ধনী হয়ে গেল। তখন সে বাগদাদে নিজ ভূমে ফেরার সিদ্ধান্ত নিল। পথিমধ্যে ডাকাতি হয়ে সে আবার আগের মতো কপর্দকহীন হয়ে গেল। বাগদাদে ফিরে সে নিজের ঘরের ঠিকানায় গিয়ে দেখল সেখানে আলিশান এক বাড়ি। তাতে পাহারাদার দাঁড় করানো। সে প্রহরীকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, এই ঘরের মালিক কে? প্রহরী জানাল একজন টাকা লেনদেনকারী এ ঘরের মালিক। যে নাম তাকে বলা হলো, তা তার নিজেরই নাম। আরও বিস্তারিত জানতে চাইলে প্রহরী বলল যে, এই ঘরের মালিকের মা হলেন আমীরুল মুমিনীনের ছেলেরও ধাত্রী মাতা। আমীরুল মুমিনীনের মামুন নামে এক ছেলে হয়। সে এই মহিলা ছাড়া আর কারও দুধ খেতে চাইত না। মামুন যখন খলিফা হলেন, তিনি সেই মহিলাকে আর তার ছেলেকে যত্ন-আত্তি করেন। ছেলেটি বড় হলে খলিফা তাকে বাইতুল মালের রক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। সেই মহিলা এখন কিছুদিন খলিফার কাছে থাকে, আর কিছুদিন এই বাড়িতে নিজের ছেলের কাছে থাকে। প্রহরীর কাছে সে এই মহিলার স্বামীর
ব্যাপারে জানতে চাইলো। প্রহরী জানাল, ত্রিশ বছর আগে এই বাড়ির মালিকের যখন জন্ম হচ্ছিল তখন তার বাবা অর্থের সন্ধানে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় আর পথ হারিয়ে ফেলে। সে আর ফিরে আসেনি, হয়তো মারা গেছে। তাদের কথোপকথনের পর নিজের লোকজনসহ তার ছেলে ফিরে আসে। লোকটি তাকে পরিচয় দিয়ে বলে সে তার বাবা। ছেলেটি বিস্মিত হয়ে যায়। তাকে ঘরের ভেতরে নিয়ে বসায়। সেখানে একটি পর্দাঘেরা জায়গা ছিল। লোকটি বলল, “তুমি যদি আমার কথা বিশ্বাস না করো, তাহলে তাকে জিজ্ঞেস করতে পারো।” কথা শুনে সেই দাসীটি বেরিয়ে এসে নিজের স্বামীকে চিনতে পেরে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে খেতে কাঁদতে লাগল। তারা তাকে আমীরুল মুমিনীনের কাছে নিয়ে গেল। খলিফা আল-মামুন তার ছেলেকে পদোন্নতি দিলেন আর তাকে তার ছেলের আগের পদে নিয়োগ দিলেন।
ইবনু আবিদ্দুনিয়া তাঁর আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ওয়াদ্দাহ ইবনু খাইসামা বলেন, “উমার বিন আব্দুল আযীয আমাকে এক কারাগার থেকে সকল বন্দীকে মুক্তি দেওয়ার আদেশ দিলেন। আমি ইয়াযিদ ইবনু আবি মুসলিম ছাড়া বাকি সবাইকে ছেড়ে দিলাম। সে প্রতিশোধ হিসেবে আমার প্রাণ নেওয়ার হুমকি দিলো। আমি আফ্রিকায় থাকা অবস্থায় শুনলাম আফ্রিকান প্রদেশগুলোর সম্প্রতি নিযুক্ত আমির ইয়াযিদ ইবনু আবি মুসলিম আসছে। আমি পালিয়ে গেলাম। সে আমাকে ধরতে একের পর এক লোক পাঠাতে লাগল। একসময় আমি ধরা পড়লাম আর আমাকে তার কাছে নেওয়া হলো। সে বলল, 'আল্লাহর কসম! আমি বারবার দু'আ করেছি তোমাকে আমার কাছে পাওয়ার জন্য।' আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম! আমি বারবার দু'আ করেছি তিনি যেন তোমার অনিষ্ট থেকে আমাকে রক্ষা করেন।' সে বলল, 'আল্লাহর কসম! তিনি তোমাকে নিরাপত্তা দেননি আর আমি তোমাকে হত্যা করব। এমনকি মৃত্যুর ফেরেশতাও যদি তোমার প্রাণ নিতে আমার সাথে পাল্লা দেন, তিনি পরাজিত হবেন। তরবারি আর জল্লাদের চাদর নিয়ে এসো!' আমাকে তাতে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে আমার মাথায় জল্লাদ তলোয়ার ঠেকাল। এমন সময় সালাতের আযান হলো। সে সালাত পড়তে চলে গেল। সে সেজদায় থাকা অবস্থায় একদল সেনা আক্রমণ করে তাকে হত্যা করে ফেলল। এক লোক এসে আমার হাতের বাঁধন কেটে দিয়ে আমাকে নিজের রাস্তায় চলে যেতে বলল।”
উমার আস-সারায়ার সূত্রে তিনি আরেকটি ঘটনা বর্ণনা করেন। উমার একবার রোমান প্রদেশগুলোতে একাকী অবস্থান করছিলেন। তিনি ঘুমানো অবস্থায় তাদের একজন এসে তাঁকে পাড়া দিয়ে ঘুম থেকে তুলে বলল, “অ্যাই আরব, তোমাকে
বেছে নেওয়ার সুযোগ দিলাম। তোমাকে আমি বর্শা দিয়ে হত্যা করতে পারি, তলোয়ার দিয়ে হত্যা করতে পারি অথবা আমরা কুস্তি করতে পারি।” তিনি বললেন, "তাহলে আমরা কুস্তি লড়ব।” সে তাঁকে হারিয়ে দিয়ে তাঁর বুকের উপর বসে বলল, “বল, তোকে কীভাবে হত্যা করব।” তিনি চিৎকার করলেন, “হে আল্লাহ, আপনার মহত্ত্ব ছাড়া আপনার আরশের নিচের আর যা কিছুর ইবাদাত করা হয়, সব মিথ্যে! আপনি আমার অবস্থা দেখছেন। অতএব আমাকে উদ্ধার করুন।” তিনি তারপর অজ্ঞান হয়ে গেলেন। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন তিনি ওই রোমানকে তাঁর পাশে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলেন।
আবুল হাসান ইবনু জাদহাম বর্ণনা করেন, হাতিম আল-আসাম বলেন, "আমরা তুর্কিদের মুখোমুখি হলাম এবং দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হলাম। এক তুর্কি আমাকে ঘোড়া থেকে ফেলে দিলো। তারপর ঘোড়া থেকে নেমে এসে আমার বুকে চড়ে বসল। আমার দাড়ি ধরে সে নিজের মোজা থেকে একটি চাকু বের করে আমাকে জবাই করতে উদ্যত হলো। কিন্তু আমার হৃদয় তার বা তার চাকুতে মগ্ন ছিল না। তা মগ্ন ছিল আমার মালিকের মাঝে। আমি ভাবলাম, 'হে মালিক, আপনি যদি এখানে আমার জবাই তাকদীরে রেখে থাকেন, আমি এর প্রতি নিজেকে সমর্পণ করলাম। আমি আপনারই।' এমতাবস্থায় এক মুসলিম তার দিকে একটি তির ছুড়ে মারল আর সে আমার উপর থেকে পড়ে গেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে তার চাকু নিয়ে তাকে জবাই করে দিলাম।”
অতএব, আপনার হৃদয়কে আপনার মনিবের হাতে সঁপে দিন। দেখবেন সাহায্যের এমন সব দুয়ার খুলে যাচ্ছে, যা আপনার পূর্বপুরুষদের কেউ দেখেনি।
টিকাঃ
২০১ সূরাহ আশ-শুরা, ৪২: ২৮
২০২ সূরাহ আর-রূম, ৩০ : ৪৮-৪৯
২০৩ আহমাদ: ১৬১৮৭-১৬২০১; ইবনু মাজাহ: ১৮১; আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ, আস-সুন্নাহ: ৪৫২-৪৫৩; ইবনু তাইমিয়্যাহ, আল-ওয়াসিতিয়্যাহতে বলেন, হাদীসটি হাসান। সুয়ুতি, আল-জামি: ৫২০৭ এ একে সহীহ বলেছেন। আরনাউত এর ইসনাদ যঈফ বলেছেন। একই কথা বলেছেন আলবানি, আস-সহীহাহ: ২৮১০, কিন্তু তিনি একে শাহীদের কারণে হাসান বলেছেন।
২০৪ আহমাদ: ১৬২০৬; আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ, আস-সুন্নাহ: ৪৫২-৪৫৩; তাবারানি, আল-কাবির: খণ্ড ১৯, পৃষ্ঠা ২১১, হাদীস নং ৪৭৭, এর ইসনাদ যঈফ; অনুরূপ আলবানি, আস-সহীহাহ : ২৮১০; এবং আরনাউত
২৩৫ বুখারি: ৯৩২-৯৩৩-১০১৩-১০১৯-১০২১-১০২৯-১০৩৩-৩৫৮২-৬০৯৩-৬৩৪২; মুসলিম: ৮৯৭; আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত।
২৩৬ সূরাহ আল-আম্বিয়া, ২১: ৭৬
২৩৭ সূরাহ আল-আম্বিয়া, ২১: ৬৯
২৩৮ সূরাহ আস-সফফাত, ৩৭: ১০৭
২**৩৯** পুরো কাহিনিটি বর্ণিত আছে বুখারি: ২৬৬১-৪১৪১-৪৬৯০-৪৭৫০-৪৭৫৭-৬৬৭৯- ৭৩৬৯-৭৩৭০-৭৫০০-৭৫৪৫ এবং মুসলিম: ২৭৭০; আয়িশাহ থেকে।
২**৪০** সূরাহ আত-তাওবাহ, ৯ : ১১৮ পুরো কাহিনিটি বর্ণিত আছে বুখারি: ২৭৫৭-২৯৪৭-২৯৫০-৩০৮৮-৩৫৫৬-৩৮৮৯- ৩৯৫১-৪৪১৭-৪৬৭৩-৪৬৭৬-৪৬৭৭-৪৬৭৮-৬২৫৫-৬৬৯০-৭২২৫ এবং মুসলিম : ২৭৬৯; কাব বিন মালিক থেকে বর্ণিত।
২**৪১** বুখারি: ২২১৫-২২৭২-২৩৩৩-৩৪৬৫-৫৯৭৪ এবং মুসলিম : ২৭৪৩; ইবনু উমার থেকে বর্ণিত।
২**৪২** বুখারি: ২২১৭-২৬৩৫-৩৩৫৭-৩৩৫৮-৫০৮৪-৬৯৫০; মুসলিম: ২৩৭১; আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।
📄 কাঠিন্যের সাথে সহজতা
রাসূল বলেন, "আর কাঠিন্যের সাথে আছে সহজতা।” এ কথাটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার এই আয়াত থেকে উৎসারিত : "আল্লাহ কষ্টের পর আরাম দেবেন।”২৪৩
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৪৪
হুমাইদ ইবনু হাম্মাদ ইবনু আবুল খুওয়ার বর্ণনা করেন, আইয ইবনু শুরাইহ তাঁকে জানিয়েছেন যে, তিনি আনাস বিন মালিক-কে বলতে শুনেছেন, "নবীজি মাটিতে এক গর্তের সামনে বসে ছিলেন। তিনি বললেন, 'কষ্ট যদি এই গর্তে গিয়েও ঢুকত, স্বস্তি এর পেছন পেছন গিয়ে ঢুকে তাকে বের করে দিত।' তারপর আল্লাহ আয়াত নাযিল করেন :
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৪৫
এটি বর্ণিত হয়েছে ইবনু আবি হাতিম-এর আত-তাফসিরে। বাযযার-এর বর্ণনায় রয়েছে, “কষ্ট যদি এসে এই গর্তেও ঢুকত, স্বস্তি এর পেছন পেছন গিয়ে ঢুকত এবং একে সরিয়ে দিত। তারপর তিনি তিলাওয়াত করলেন, 'কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।”২৪৬
হুমাইদ বিন হাম্মাদকে দুর্বল বর্ণনাকারী বলা হয়। মা'মার থেকে ইবনু জারির বর্ণনা করেন, আল-হাসান বলেন, “নবীজি একদিন আনন্দিত ও খুশি অবস্থায় বের হয়ে এসে বললেন, 'একটি কষ্ট কখনো দুইটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারবে না।”২৪৭
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৪৮ আওফ এবং ইউনুস এ-এর সূত্রেও তিনি আল-হাসান থেকে এটি মুরসাল হাদীস হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি একে কাতাদাহ থেকে বর্ণিত হাদীস হিসেবেও উল্লেখ করেছেন, যিনি বলেন, "আমাদের কাছে বলা হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাহাবাগণকে এই আয়াতের সুসংবাদ এই বলে দিয়েছেন যে, 'একটি কষ্ট কখনো দুইটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারবে না।”২৪৯
মুয়াউয়িয়াহ ইবনু কুররাহ থেকে ইবনু আবিদ্দুনিয়া বর্ণনা করেন যে, এক বর্ণনাকারী তাঁকে জানিয়েছেন, ইবনু মাসউদ বলেছেন, "কষ্ট যদি একটি গর্তেও প্রবেশ করে, স্বস্তি একে অনুসরণ করে এতে প্রবেশ করবে।”২৫০ তারপর তিনি তিলাওয়াত করেন: "কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৫১
এ ছাড়া তিনি এটি আব্দুর রহমান ইবনু যাইদ ইবনু আসলাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি তাঁর বাবার থেকে এবং তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেন, যখন আবু উবাইদা অবরোধে পড়লেন, তখন উমার তাঁকে চিঠি লিখলেন, “যে কষ্টই আসুক না কেন, আল্লাহ তার পর মুক্তি পাঠাবেন। কারণ, একটি কষ্ট দুটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারে না আর আল্লাহ বলেন:
'হে ঈমানদারগণ, ধৈর্য ধরো এবং ধৈর্যে (শত্রুর চেয়ে বেশি) অগ্রসর থাকো। যুদ্ধক্ষেত্রে দৃঢ়তা প্রদর্শন করো। আর তাকওয়া অবলম্বন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।' ২৫২, ২৫৩
ইবনে আব্বাস ২৫৪ সহ অন্যান্য মুফাসসিরগণও এই আয়াতের তাফসীরে বলেছেন, “একটি কষ্ট দুইটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারবে না।”
অতীতের এক ব্যক্তি মরুভূমিতে খুব কষ্টে থাকা অবস্থায় কবিতার এ চরণ দুটি তাঁর মাথায় আসে: দুশ্চিন্তিত হয়ে নিদ্রা থেকে জাগরণ, তার চেয়ে উত্তম হলো সাক্ষাৎ মরণ। রাতের বেলা কোনো একটি কণ্ঠ ডেকে উঠল, নিশ্চিন্ত হও, হে দুশ্চিন্তিত জন! কবিতা আওড়েছ, কিন্তু সাক্ষ্য দেয় মন, ধেয়ে আসে যখন কষ্টের বাহিনী ভাবো, 'আমি কি প্রশস্ত করিনি...?'২৫৫ দুই স্বস্তির মাঝে এক কষ্ট থাকবেই স্মরণ করলে আনন্দ লাগবেই।
তিনি বলেন, "আমি এই চরণগুলো মুখস্থ করে নিলাম। আর আল্লাহ আমাকে আমার দুর্দশা থেকে মুক্তি দিলেন।”
এ ব্যাপারে অনেক কাব্য রচিত হয়েছে। আমরা এর কয়েকটি উদ্ধৃত করছি :
ধৈর্য ধরো, ধৈর্যে বিস্ময়কর ফল আসে, হতাশ হোয়ো না কোনোই সর্বনাশে।
কষ্টের কাঁধ উষ্ণ করে নিজের শ্বাসে, এর পেছন পেছনেই স্বস্তি চলে আসে।
একজন বলেছেন: হতাশ হয়ে যায় অনেকে এমন সংকটে যার সমাধান আসছে খুবই নিকটে।
আরেকজন বলেছেন: হয়তো শীঘ্রই আসছে বিপদমুক্তি, 'হয়তো'ই আমাদের আত্মার যুক্তি। হতাশার কাছে যখন করে আত্মসমর্পণ, বিপদমুক্তি খুব নিকটেই থাকে তখন।
আরেকজন আবৃত্তি করেছেন : সবকিছু যখন কঠিন লাগে, মুক্তি আশা করো তখনই, মুক্তি খুব কাছেই থাকে, বিপদ ঘনীভূত হয় যখনই।
আরেকজন নিচের চরণগুলো রচনা করেছেন :
একদিনের জন্য কষ্টে পতিত হলে হতাশ হোয়ো না, কতশত দিন যে স্বস্তিতে বাঁচবে, তা তুমি জানো না। রবের ব্যাপারে কুধারণা রেখো না, সৌন্দর্য তাঁরই ভূষণ, কখনো নিরাশ হোয়ো না, এ যে কুফরি এক ভীষণ! অল্পতেই তোমার সেরে যাবে প্রয়োজন, জেনে রেখো কষ্টকে স্বস্তি করে অনুসরণ। যত বক্তা রাখে তাদের বক্তব্য, আল্লাহর কথাই তার মাঝে সর্বাধিক সত্য।
তাঁদের একজন বলেছেন, ধৈর্য হলো কষ্টমুক্তিদ্বার, কষ্টকে স্বস্তি অনুসরণ করে প্রতিবার। থেমে থাকে না কখনো সময় এক ঘটনার পর আরেক ঘটনা হয়।
বিপদ-আপদ প্রদানের কিছু সূক্ষ্ম উপকারিতা ও প্রজ্ঞার কথা বর্ণনা করে আমরা এই আলোচনা শেষ করব।
১. গুনাহ মাফ হয় ও ধৈর্য ধরে বিপদ সহ্য করার সাওয়াব লাভ হয়। বিপদটির কারণে সাওয়াব পাওয়া যায় কি না-এ নিয়ে আলিমগণের মতভেদ আছে।
২. বান্দার তার গুনাহের কথা স্মরণ হয় এবং সে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার কাছে তাওবাহর সুযোগ পায়।
৩. শক্ত ও কঠিন থাকার পর অন্তর নরম হয়। একজন সালাফ বলেছিলেন, “কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ার ফলে গুনাহের কথা স্মরণ করতে পারে। এবং আল্লাহর ভয়ে মাছির মাথা পরিমাণ অশ্রুও যদি নির্গত হয়, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।”
৪. ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার সামনে বিনয়ী করে। প্রচুর নেক আমলের চেয়ে এ রকম একটি অবস্থাই আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়।
৫. এসব বিপদের কারণে ব্যক্তির হৃদয় আল্লাহর দিকে ঘুরে যায়, সে তাঁর দুয়ারে গিয়ে দাঁড়ায়, তাঁকে ডাকে ও তাঁর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে। এটি হলো বিপদের সবচেয়ে বড় লাভ। যারা বিপদের সময় আল্লাহর সামনে বিনীত হয় না, আল্লাহ তাদের তিরস্কার করেছেন:
"আমি তাদের শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করেছিলাম। কিন্তু তারা তাদের প্রতিপালকের নিকট নত হলো না, আর তারা কাকুতি-মিনতিও করল না।”২৫৬
“তোমার পূর্বে আমি অনেক জাতির কাছে রাসূল পাঠিয়েছি। আর অভাব-অনটন ও দুঃখ-ক্লেশ দিয়ে পাকড়াও করেছিলাম, যাতে তারা বিনয়ী হয়।”২৫৭
পূর্বের এক আসমানি কিতাবে আছে, "আল্লাহ বান্দাকে পরীক্ষায় ফেলেন, কারণ তিনি তার কাছে কাকুতি-মিনতি শুনতে ভালোবাসেন।”
সাইদ বিন আব্দুল আযীয বলেন, “দাউদ বলেন, 'সুমহান সেই সত্তা, যিনি বিপদে ফেলে বান্দাকে দু'আ করতে বাধ্য করেন। সুমহান সেই সত্তা, যিনি স্বাচ্ছন্দ্য প্রদানের মাধ্যমে কৃতজ্ঞ হতে দেন।”
মুহাম্মাদ আল-মুনকাদির এ প্রচণ্ড কষ্টে ছিলেন। আবু জাফার মুহাম্মাদ ইবনু আলি তাঁর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর ব্যাপারে মানুষকে জিজ্ঞেস করলেন। লোকেরা জানাল তিনি ঋণগ্রস্ত। আবু জাফার বললেন, "তাঁর জন্য কি দু'আর দরজা খুলেছে?” তারা জানাল, "হ্যাঁ।" আবু জাফার বললেন, "বান্দা সত্যিই সৌভাগ্যবান, যদি সে প্রয়োজনের সময় তার রবকে বেশি বেশি ডাকে, তা যে প্রয়োজনই হোক না কেন।”
তাঁদের কেউ কেউ বিপদে পড়ে দু'আ করার সময় দ্রুত জবাব আশা করতেন না। তাঁদের যে রবকে প্রয়োজন হয়েছে, এই অবস্থাটি দ্রুত শেষ হয়ে যাক-তা তাঁরা চাইতেন না। সাবিত বলেন, “মুমিন যখন আল্লাহকে ডাকে, আল্লাহ জিবরীলকে তার প্রয়োজন পূরণ করার দায়িত্ব দিয়ে বলেন, 'তার প্রয়োজন পূরণ করতে তাড়াহুড়া করবে না। আমি আমার মুমিন বান্দার কণ্ঠ শুনতে ভালোবাসি।” এটি নবীজি -এর হাদীস হিসেবেও বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এর সকল সনদ দুর্বল।৫৮
একজন সালাফ স্বপ্নে আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করে বললেন, "হে আল্লাহ, আমি আপনাকে অনেক ডেকেছি, কিন্তু জবাব পাইনি।” তিনি জবাব দিলেন, "আমি তোমার কণ্ঠ শুনতে ভালোবাসি।”
৬. বিপদ-আপদের ফলে অন্তর ধৈর্যের ও সন্তুষ্টির মিষ্টতা অনুভব করে। এটি হলো বিরাট পুরস্কারের পদ, যার মর্যাদা সম্পর্কে ইতঃপূর্বে আলোচনা হয়েছে।
৭. বিপদের ফলে বান্দা সৃষ্টির থেকে মুখ ফিরিয়ে স্রষ্টামুখী হয়। আল্লাহ বলেছেন মুশরিকরাই বিপদের সময় এক আল্লাহকে ডাকে, তাহলে মুমিনের অবস্থা কী?
৮. বিপদের ফলে বান্দা তাওহীদকে সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করে ও একে অন্তরে অনুভব করে।২৫৯
এক ইসরাঈলী বর্ণনায় আছে, (আল্লাহ বলেন),
"বিপদ তোমাকে আর আমাকে কাছে আনে। স্বাচ্ছন্দ্য তোমাকে তোমার কাছে আনে।"
টিকাঃ
২৪৩ সূরাহ আত-তলাক, ৬৫: ৭
২৪৪ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪: ৫-৬
২৪৫ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪: ৫-৬
২৪৬ ইবনু আবি হাতিম : ১৯৩৯৫; বাযযার: ২২৮৮; তাবারানি, আল-আসওয়াত: ৩৪১৬; হাকিম: ৩০১০। যাহাবি বলেন, "এটি শুধু হুমাইদ ইবনু হাম্মাদ থেকে আইয সূত্রে বর্ণিত আছে। উভয়ই হাদীস বর্ণনায় মুনকার। বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১২, বলেন এটি যঈফ; আলবানি, আয- যঈফাহ: ১৪০৩ এ একে যঈফ জিদ্দান বলেছেন।
২৪৭ তাবারি; বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১৩; হাকিম: ৩৯৫০; যাহাবি একে মুরসাল বলেন। একই কথা বলেছেন যায়লাই, তাখরিজুল কাশশাফ: খণ্ড ৪, ২৩৫ পৃষ্ঠায়। ইবনু হাজার, আল-কাফি: ৩১৯ পৃষ্ঠায় একে মুরসাল বলেন এবং বলেন যে, এর মাওসুল সংস্করণটি যঈফ। তাগলিক আত- তালিক: খণ্ড ৪, ৩৭২ পৃষ্ঠায় তিনি আরও বলেন আল-হাসান পর্যন্ত এর ইসনাদ সহীহ। আলবানি, আয-যঈফাহ: ৪৩৪২ এ একে যঈফ বলেন। ইবনু আবি হাতিম: ১৩৩৯৬ এ একে আল-হাসানের উক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। ইবনু কাসির বলেন, “এই কথাগুলোর অর্থ হলো উভয় ক্ষেত্রে 'কষ্ট' কথাটি সুনির্দিষ্টতাবাচক উপসর্গ 'আল' এর সাথে যুক্ত। অতএব এটি একবচন। কিন্তু 'স্বস্তি' শব্দটি অনির্দিষ্ট রেখে দেওয়া হয়েছে। অতএব, এটি একাধিকবার ঘটবে। অতএব, দ্বিতীয়বারে উল্লেখিত কষ্ট প্রথমটিকেই বোঝাচ্ছে। তবে স্বস্তির ঘটনা একাধিক।"
২৪৮ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪ : ৫-৬
২৪৯ তাবারি; এটি মুরসাল। ইবনু হাজার, তাগলিক আত-তালিক: খণ্ড ৪, ৩৭২ পৃষ্ঠায় বলেন কাতাদাহ পর্যন্ত এর ইসনাদ সহীহ।
২৫০ বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১১; সুয়ুতি, আদুররুল মানসুরে একে ইবনু আবিদ্দুনিয়ার আস- সবরের সাথে সম্পৃক্ত করেন।
২৫১ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪ : ৫-৬
২৫২ সূরাহ আলে ইমরান, ৩: ২০০
২৫০ ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ: পৃষ্ঠা ২৪; বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১০; ইবনু আবি শাইবাহ: খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৩৫ এবং খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা ৩৭; হাকিম: ৩১৭৬ এ একে মুসলিমের শর্তানুযায়ী সহীহ বলেছেন। যাহাবি একমত। কিন্তু ইবনু হাজার, তাগলিক আত-তালিক: খণ্ড ৪, ৩৭২ পৃষ্ঠায় বলেন এর ইসনাদ হাসান।
২৫৪ সাখাওয়ি, আল-মাকাসিদ: ৮৭৭ বলেন, "এটি বর্ণিত হয়েছে আবু সালিহ থেকে আল-কালবি, তাঁর থেকে আল-ফাররা কর্তৃক।
২৫৫ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪: ১
২৫৬ সূরাহ আল-মুমিনূন, ২৩: ৭৬
২৫৭ সূরাহ আল-আন'আম, ৬: ৪২
২৫৮ তাবারানি, আল-আসওয়াত: ৮৪৪২; জাবির থেকে বর্ণিত।
২৫৯ বিপদের ফযিলতের আরও পূর্ণাঙ্গ তালিকার জন্য পরিশিষ্ট তিন দ্রষ্টব্য।
রাসূল বলেন, "আর কাঠিন্যের সাথে আছে সহজতা।” এ কথাটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার এই আয়াত থেকে উৎসারিত : "আল্লাহ কষ্টের পর আরাম দেবেন।”২৪৩
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৪৪
হুমাইদ ইবনু হাম্মাদ ইবনু আবুল খুওয়ার বর্ণনা করেন, আইয ইবনু শুরাইহ তাঁকে জানিয়েছেন যে, তিনি আনাস বিন মালিক-কে বলতে শুনেছেন, "নবীজি মাটিতে এক গর্তের সামনে বসে ছিলেন। তিনি বললেন, 'কষ্ট যদি এই গর্তে গিয়েও ঢুকত, স্বস্তি এর পেছন পেছন গিয়ে ঢুকে তাকে বের করে দিত।' তারপর আল্লাহ আয়াত নাযিল করেন :
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৪৫
এটি বর্ণিত হয়েছে ইবনু আবি হাতিম-এর আত-তাফসিরে। বাযযার-এর বর্ণনায় রয়েছে, “কষ্ট যদি এসে এই গর্তেও ঢুকত, স্বস্তি এর পেছন পেছন গিয়ে ঢুকত এবং একে সরিয়ে দিত। তারপর তিনি তিলাওয়াত করলেন, 'কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।”২৪৬
হুমাইদ বিন হাম্মাদকে দুর্বল বর্ণনাকারী বলা হয়। মা'মার থেকে ইবনু জারির বর্ণনা করেন, আল-হাসান বলেন, “নবীজি একদিন আনন্দিত ও খুশি অবস্থায় বের হয়ে এসে বললেন, 'একটি কষ্ট কখনো দুইটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারবে না।”২৪৭
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৪৮ আওফ এবং ইউনুস এ-এর সূত্রেও তিনি আল-হাসান থেকে এটি মুরসাল হাদীস হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি একে কাতাদাহ থেকে বর্ণিত হাদীস হিসেবেও উল্লেখ করেছেন, যিনি বলেন, "আমাদের কাছে বলা হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাহাবাগণকে এই আয়াতের সুসংবাদ এই বলে দিয়েছেন যে, 'একটি কষ্ট কখনো দুইটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারবে না।”২৪৯
মুয়াউয়িয়াহ ইবনু কুররাহ থেকে ইবনু আবিদ্দুনিয়া বর্ণনা করেন যে, এক বর্ণনাকারী তাঁকে জানিয়েছেন, ইবনু মাসউদ বলেছেন, "কষ্ট যদি একটি গর্তেও প্রবেশ করে, স্বস্তি একে অনুসরণ করে এতে প্রবেশ করবে।”২৫০ তারপর তিনি তিলাওয়াত করেন: "কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৫১
এ ছাড়া তিনি এটি আব্দুর রহমান ইবনু যাইদ ইবনু আসলাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি তাঁর বাবার থেকে এবং তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেন, যখন আবু উবাইদা অবরোধে পড়লেন, তখন উমার তাঁকে চিঠি লিখলেন, “যে কষ্টই আসুক না কেন, আল্লাহ তার পর মুক্তি পাঠাবেন। কারণ, একটি কষ্ট দুটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারে না আর আল্লাহ বলেন:
'হে ঈমানদারগণ, ধৈর্য ধরো এবং ধৈর্যে (শত্রুর চেয়ে বেশি) অগ্রসর থাকো। যুদ্ধক্ষেত্রে দৃঢ়তা প্রদর্শন করো। আর তাকওয়া অবলম্বন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।' ২৫২, ২৫৩
ইবনে আব্বাস ২৫৪ সহ অন্যান্য মুফাসসিরগণও এই আয়াতের তাফসীরে বলেছেন, “একটি কষ্ট দুইটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারবে না।”
অতীতের এক ব্যক্তি মরুভূমিতে খুব কষ্টে থাকা অবস্থায় কবিতার এ চরণ দুটি তাঁর মাথায় আসে: দুশ্চিন্তিত হয়ে নিদ্রা থেকে জাগরণ, তার চেয়ে উত্তম হলো সাক্ষাৎ মরণ। রাতের বেলা কোনো একটি কণ্ঠ ডেকে উঠল, নিশ্চিন্ত হও, হে দুশ্চিন্তিত জন! কবিতা আওড়েছ, কিন্তু সাক্ষ্য দেয় মন, ধেয়ে আসে যখন কষ্টের বাহিনী ভাবো, 'আমি কি প্রশস্ত করিনি...?'২৫৫ দুই স্বস্তির মাঝে এক কষ্ট থাকবেই স্মরণ করলে আনন্দ লাগবেই।
তিনি বলেন, "আমি এই চরণগুলো মুখস্থ করে নিলাম। আর আল্লাহ আমাকে আমার দুর্দশা থেকে মুক্তি দিলেন।”
এ ব্যাপারে অনেক কাব্য রচিত হয়েছে। আমরা এর কয়েকটি উদ্ধৃত করছি :
ধৈর্য ধরো, ধৈর্যে বিস্ময়কর ফল আসে, হতাশ হোয়ো না কোনোই সর্বনাশে।
কষ্টের কাঁধ উষ্ণ করে নিজের শ্বাসে, এর পেছন পেছনেই স্বস্তি চলে আসে।
একজন বলেছেন: হতাশ হয়ে যায় অনেকে এমন সংকটে যার সমাধান আসছে খুবই নিকটে।
আরেকজন বলেছেন: হয়তো শীঘ্রই আসছে বিপদমুক্তি, 'হয়তো'ই আমাদের আত্মার যুক্তি। হতাশার কাছে যখন করে আত্মসমর্পণ, বিপদমুক্তি খুব নিকটেই থাকে তখন।
আরেকজন আবৃত্তি করেছেন : সবকিছু যখন কঠিন লাগে, মুক্তি আশা করো তখনই, মুক্তি খুব কাছেই থাকে, বিপদ ঘনীভূত হয় যখনই।
আরেকজন নিচের চরণগুলো রচনা করেছেন :
একদিনের জন্য কষ্টে পতিত হলে হতাশ হোয়ো না, কতশত দিন যে স্বস্তিতে বাঁচবে, তা তুমি জানো না। রবের ব্যাপারে কুধারণা রেখো না, সৌন্দর্য তাঁরই ভূষণ, কখনো নিরাশ হোয়ো না, এ যে কুফরি এক ভীষণ! অল্পতেই তোমার সেরে যাবে প্রয়োজন, জেনে রেখো কষ্টকে স্বস্তি করে অনুসরণ। যত বক্তা রাখে তাদের বক্তব্য, আল্লাহর কথাই তার মাঝে সর্বাধিক সত্য।
তাঁদের একজন বলেছেন, ধৈর্য হলো কষ্টমুক্তিদ্বার, কষ্টকে স্বস্তি অনুসরণ করে প্রতিবার। থেমে থাকে না কখনো সময় এক ঘটনার পর আরেক ঘটনা হয়।
বিপদ-আপদ প্রদানের কিছু সূক্ষ্ম উপকারিতা ও প্রজ্ঞার কথা বর্ণনা করে আমরা এই আলোচনা শেষ করব।
১. গুনাহ মাফ হয় ও ধৈর্য ধরে বিপদ সহ্য করার সাওয়াব লাভ হয়। বিপদটির কারণে সাওয়াব পাওয়া যায় কি না-এ নিয়ে আলিমগণের মতভেদ আছে।
২. বান্দার তার গুনাহের কথা স্মরণ হয় এবং সে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার কাছে তাওবাহর সুযোগ পায়।
৩. শক্ত ও কঠিন থাকার পর অন্তর নরম হয়। একজন সালাফ বলেছিলেন, “কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ার ফলে গুনাহের কথা স্মরণ করতে পারে। এবং আল্লাহর ভয়ে মাছির মাথা পরিমাণ অশ্রুও যদি নির্গত হয়, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।”
৪. ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার সামনে বিনয়ী করে। প্রচুর নেক আমলের চেয়ে এ রকম একটি অবস্থাই আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়।
৫. এসব বিপদের কারণে ব্যক্তির হৃদয় আল্লাহর দিকে ঘুরে যায়, সে তাঁর দুয়ারে গিয়ে দাঁড়ায়, তাঁকে ডাকে ও তাঁর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে। এটি হলো বিপদের সবচেয়ে বড় লাভ। যারা বিপদের সময় আল্লাহর সামনে বিনীত হয় না, আল্লাহ তাদের তিরস্কার করেছেন:
"আমি তাদের শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করেছিলাম। কিন্তু তারা তাদের প্রতিপালকের নিকট নত হলো না, আর তারা কাকুতি-মিনতিও করল না।”২৫৬
“তোমার পূর্বে আমি অনেক জাতির কাছে রাসূল পাঠিয়েছি। আর অভাব-অনটন ও দুঃখ-ক্লেশ দিয়ে পাকড়াও করেছিলাম, যাতে তারা বিনয়ী হয়।”২৫৭
পূর্বের এক আসমানি কিতাবে আছে, "আল্লাহ বান্দাকে পরীক্ষায় ফেলেন, কারণ তিনি তার কাছে কাকুতি-মিনতি শুনতে ভালোবাসেন।”
সাইদ বিন আব্দুল আযীয বলেন, “দাউদ বলেন, 'সুমহান সেই সত্তা, যিনি বিপদে ফেলে বান্দাকে দু'আ করতে বাধ্য করেন। সুমহান সেই সত্তা, যিনি স্বাচ্ছন্দ্য প্রদানের মাধ্যমে কৃতজ্ঞ হতে দেন।”
মুহাম্মাদ আল-মুনকাদির এ প্রচণ্ড কষ্টে ছিলেন। আবু জাফার মুহাম্মাদ ইবনু আলি তাঁর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর ব্যাপারে মানুষকে জিজ্ঞেস করলেন। লোকেরা জানাল তিনি ঋণগ্রস্ত। আবু জাফার বললেন, "তাঁর জন্য কি দু'আর দরজা খুলেছে?” তারা জানাল, "হ্যাঁ।" আবু জাফার বললেন, "বান্দা সত্যিই সৌভাগ্যবান, যদি সে প্রয়োজনের সময় তার রবকে বেশি বেশি ডাকে, তা যে প্রয়োজনই হোক না কেন।”
তাঁদের কেউ কেউ বিপদে পড়ে দু'আ করার সময় দ্রুত জবাব আশা করতেন না। তাঁদের যে রবকে প্রয়োজন হয়েছে, এই অবস্থাটি দ্রুত শেষ হয়ে যাক-তা তাঁরা চাইতেন না। সাবিত বলেন, “মুমিন যখন আল্লাহকে ডাকে, আল্লাহ জিবরীলকে তার প্রয়োজন পূরণ করার দায়িত্ব দিয়ে বলেন, 'তার প্রয়োজন পূরণ করতে তাড়াহুড়া করবে না। আমি আমার মুমিন বান্দার কণ্ঠ শুনতে ভালোবাসি।” এটি নবীজি -এর হাদীস হিসেবেও বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এর সকল সনদ দুর্বল।৫৮
একজন সালাফ স্বপ্নে আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করে বললেন, "হে আল্লাহ, আমি আপনাকে অনেক ডেকেছি, কিন্তু জবাব পাইনি।” তিনি জবাব দিলেন, "আমি তোমার কণ্ঠ শুনতে ভালোবাসি।”
৬. বিপদ-আপদের ফলে অন্তর ধৈর্যের ও সন্তুষ্টির মিষ্টতা অনুভব করে। এটি হলো বিরাট পুরস্কারের পদ, যার মর্যাদা সম্পর্কে ইতঃপূর্বে আলোচনা হয়েছে।
৭. বিপদের ফলে বান্দা সৃষ্টির থেকে মুখ ফিরিয়ে স্রষ্টামুখী হয়। আল্লাহ বলেছেন মুশরিকরাই বিপদের সময় এক আল্লাহকে ডাকে, তাহলে মুমিনের অবস্থা কী?
৮. বিপদের ফলে বান্দা তাওহীদকে সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করে ও একে অন্তরে অনুভব করে।২৫৯
এক ইসরাঈলী বর্ণনায় আছে, (আল্লাহ বলেন),
"বিপদ তোমাকে আর আমাকে কাছে আনে। স্বাচ্ছন্দ্য তোমাকে তোমার কাছে আনে।"
টিকাঃ
২৪৩ সূরাহ আত-তলাক, ৬৫: ৭
২৪৪ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪: ৫-৬
২৪৫ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪: ৫-৬
২৪৬ ইবনু আবি হাতিম : ১৯৩৯৫; বাযযার: ২২৮৮; তাবারানি, আল-আসওয়াত: ৩৪১৬; হাকিম: ৩০১০। যাহাবি বলেন, "এটি শুধু হুমাইদ ইবনু হাম্মাদ থেকে আইয সূত্রে বর্ণিত আছে। উভয়ই হাদীস বর্ণনায় মুনকার। বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১২, বলেন এটি যঈফ; আলবানি, আয- যঈফাহ: ১৪০৩ এ একে যঈফ জিদ্দান বলেছেন।
২৪৭ তাবারি; বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১৩; হাকিম: ৩৯৫০; যাহাবি একে মুরসাল বলেন। একই কথা বলেছেন যায়লাই, তাখরিজুল কাশশাফ: খণ্ড ৪, ২৩৫ পৃষ্ঠায়। ইবনু হাজার, আল-কাফি: ৩১৯ পৃষ্ঠায় একে মুরসাল বলেন এবং বলেন যে, এর মাওসুল সংস্করণটি যঈফ। তাগলিক আত- তালিক: খণ্ড ৪, ৩৭২ পৃষ্ঠায় তিনি আরও বলেন আল-হাসান পর্যন্ত এর ইসনাদ সহীহ। আলবানি, আয-যঈফাহ: ৪৩৪২ এ একে যঈফ বলেন। ইবনু আবি হাতিম: ১৩৩৯৬ এ একে আল-হাসানের উক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। ইবনু কাসির বলেন, “এই কথাগুলোর অর্থ হলো উভয় ক্ষেত্রে 'কষ্ট' কথাটি সুনির্দিষ্টতাবাচক উপসর্গ 'আল' এর সাথে যুক্ত। অতএব এটি একবচন। কিন্তু 'স্বস্তি' শব্দটি অনির্দিষ্ট রেখে দেওয়া হয়েছে। অতএব, এটি একাধিকবার ঘটবে। অতএব, দ্বিতীয়বারে উল্লেখিত কষ্ট প্রথমটিকেই বোঝাচ্ছে। তবে স্বস্তির ঘটনা একাধিক।"
২৪৮ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪ : ৫-৬
২৪৯ তাবারি; এটি মুরসাল। ইবনু হাজার, তাগলিক আত-তালিক: খণ্ড ৪, ৩৭২ পৃষ্ঠায় বলেন কাতাদাহ পর্যন্ত এর ইসনাদ সহীহ।
২৫০ বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১১; সুয়ুতি, আদুররুল মানসুরে একে ইবনু আবিদ্দুনিয়ার আস- সবরের সাথে সম্পৃক্ত করেন।
২৫১ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪ : ৫-৬
২৫২ সূরাহ আলে ইমরান, ৩: ২০০
২৫০ ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ: পৃষ্ঠা ২৪; বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১০; ইবনু আবি শাইবাহ: খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৩৫ এবং খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা ৩৭; হাকিম: ৩১৭৬ এ একে মুসলিমের শর্তানুযায়ী সহীহ বলেছেন। যাহাবি একমত। কিন্তু ইবনু হাজার, তাগলিক আত-তালিক: খণ্ড ৪, ৩৭২ পৃষ্ঠায় বলেন এর ইসনাদ হাসান।
২৫৪ সাখাওয়ি, আল-মাকাসিদ: ৮৭৭ বলেন, "এটি বর্ণিত হয়েছে আবু সালিহ থেকে আল-কালবি, তাঁর থেকে আল-ফাররা কর্তৃক।
২৫৫ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪: ১
২৫৬ সূরাহ আল-মুমিনূন, ২৩: ৭৬
২৫৭ সূরাহ আল-আন'আম, ৬: ৪২
২৫৮ তাবারানি, আল-আসওয়াত: ৮৪৪২; জাবির থেকে বর্ণিত।
২৫৯ বিপদের ফযিলতের আরও পূর্ণাঙ্গ তালিকার জন্য পরিশিষ্ট তিন দ্রষ্টব্য।
রাসূল বলেন, "আর কাঠিন্যের সাথে আছে সহজতা।” এ কথাটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার এই আয়াত থেকে উৎসারিত : "আল্লাহ কষ্টের পর আরাম দেবেন।”২৪৩
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৪৪
হুমাইদ ইবনু হাম্মাদ ইবনু আবুল খুওয়ার বর্ণনা করেন, আইয ইবনু শুরাইহ তাঁকে জানিয়েছেন যে, তিনি আনাস বিন মালিক-কে বলতে শুনেছেন, "নবীজি মাটিতে এক গর্তের সামনে বসে ছিলেন। তিনি বললেন, 'কষ্ট যদি এই গর্তে গিয়েও ঢুকত, স্বস্তি এর পেছন পেছন গিয়ে ঢুকে তাকে বের করে দিত।' তারপর আল্লাহ আয়াত নাযিল করেন :
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৪৫
এটি বর্ণিত হয়েছে ইবনু আবি হাতিম-এর আত-তাফসিরে। বাযযার-এর বর্ণনায় রয়েছে, “কষ্ট যদি এসে এই গর্তেও ঢুকত, স্বস্তি এর পেছন পেছন গিয়ে ঢুকত এবং একে সরিয়ে দিত। তারপর তিনি তিলাওয়াত করলেন, 'কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।”২৪৬
হুমাইদ বিন হাম্মাদকে দুর্বল বর্ণনাকারী বলা হয়। মা'মার থেকে ইবনু জারির বর্ণনা করেন, আল-হাসান বলেন, “নবীজি একদিন আনন্দিত ও খুশি অবস্থায় বের হয়ে এসে বললেন, 'একটি কষ্ট কখনো দুইটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারবে না।”২৪৭
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৪৮ আওফ এবং ইউনুস এ-এর সূত্রেও তিনি আল-হাসান থেকে এটি মুরসাল হাদীস হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি একে কাতাদাহ থেকে বর্ণিত হাদীস হিসেবেও উল্লেখ করেছেন, যিনি বলেন, "আমাদের কাছে বলা হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাহাবাগণকে এই আয়াতের সুসংবাদ এই বলে দিয়েছেন যে, 'একটি কষ্ট কখনো দুইটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারবে না।”২৪৯
মুয়াউয়িয়াহ ইবনু কুররাহ থেকে ইবনু আবিদ্দুনিয়া বর্ণনা করেন যে, এক বর্ণনাকারী তাঁকে জানিয়েছেন, ইবনু মাসউদ বলেছেন, "কষ্ট যদি একটি গর্তেও প্রবেশ করে, স্বস্তি একে অনুসরণ করে এতে প্রবেশ করবে।”২৫০ তারপর তিনি তিলাওয়াত করেন: "কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৫১
এ ছাড়া তিনি এটি আব্দুর রহমান ইবনু যাইদ ইবনু আসলাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি তাঁর বাবার থেকে এবং তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেন, যখন আবু উবাইদা অবরোধে পড়লেন, তখন উমার তাঁকে চিঠি লিখলেন, “যে কষ্টই আসুক না কেন, আল্লাহ তার পর মুক্তি পাঠাবেন। কারণ, একটি কষ্ট দুটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারে না আর আল্লাহ বলেন:
'হে ঈমানদারগণ, ধৈর্য ধরো এবং ধৈর্যে (শত্রুর চেয়ে বেশি) অগ্রসর থাকো। যুদ্ধক্ষেত্রে দৃঢ়তা প্রদর্শন করো। আর তাকওয়া অবলম্বন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।' ২৫২, ২৫৩
ইবনে আব্বাস ২৫৪ সহ অন্যান্য মুফাসসিরগণও এই আয়াতের তাফসীরে বলেছেন, “একটি কষ্ট দুইটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারবে না।”
অতীতের এক ব্যক্তি মরুভূমিতে খুব কষ্টে থাকা অবস্থায় কবিতার এ চরণ দুটি তাঁর মাথায় আসে: দুশ্চিন্তিত হয়ে নিদ্রা থেকে জাগরণ, তার চেয়ে উত্তম হলো সাক্ষাৎ মরণ। রাতের বেলা কোনো একটি কণ্ঠ ডেকে উঠল, নিশ্চিন্ত হও, হে দুশ্চিন্তিত জন! কবিতা আওড়েছ, কিন্তু সাক্ষ্য দেয় মন, ধেয়ে আসে যখন কষ্টের বাহিনী ভাবো, 'আমি কি প্রশস্ত করিনি...?'২৫৫ দুই স্বস্তির মাঝে এক কষ্ট থাকবেই স্মরণ করলে আনন্দ লাগবেই।
তিনি বলেন, "আমি এই চরণগুলো মুখস্থ করে নিলাম। আর আল্লাহ আমাকে আমার দুর্দশা থেকে মুক্তি দিলেন।”
এ ব্যাপারে অনেক কাব্য রচিত হয়েছে। আমরা এর কয়েকটি উদ্ধৃত করছি :
ধৈর্য ধরো, ধৈর্যে বিস্ময়কর ফল আসে, হতাশ হোয়ো না কোনোই সর্বনাশে।
কষ্টের কাঁধ উষ্ণ করে নিজের শ্বাসে, এর পেছন পেছনেই স্বস্তি চলে আসে।
একজন বলেছেন: হতাশ হয়ে যায় অনেকে এমন সংকটে যার সমাধান আসছে খুবই নিকটে।
আরেকজন বলেছেন: হয়তো শীঘ্রই আসছে বিপদমুক্তি, 'হয়তো'ই আমাদের আত্মার যুক্তি। হতাশার কাছে যখন করে আত্মসমর্পণ, বিপদমুক্তি খুব নিকটেই থাকে তখন।
আরেকজন আবৃত্তি করেছেন : সবকিছু যখন কঠিন লাগে, মুক্তি আশা করো তখনই, মুক্তি খুব কাছেই থাকে, বিপদ ঘনীভূত হয় যখনই।
আরেকজন নিচের চরণগুলো রচনা করেছেন :
একদিনের জন্য কষ্টে পতিত হলে হতাশ হোয়ো না, কতশত দিন যে স্বস্তিতে বাঁচবে, তা তুমি জানো না। রবের ব্যাপারে কুধারণা রেখো না, সৌন্দর্য তাঁরই ভূষণ, কখনো নিরাশ হোয়ো না, এ যে কুফরি এক ভীষণ! অল্পতেই তোমার সেরে যাবে প্রয়োজন, জেনে রেখো কষ্টকে স্বস্তি করে অনুসরণ। যত বক্তা রাখে তাদের বক্তব্য, আল্লাহর কথাই তার মাঝে সর্বাধিক সত্য।
তাঁদের একজন বলেছেন, ধৈর্য হলো কষ্টমুক্তিদ্বার, কষ্টকে স্বস্তি অনুসরণ করে প্রতিবার। থেমে থাকে না কখনো সময় এক ঘটনার পর আরেক ঘটনা হয়।
বিপদ-আপদ প্রদানের কিছু সূক্ষ্ম উপকারিতা ও প্রজ্ঞার কথা বর্ণনা করে আমরা এই আলোচনা শেষ করব।
১. গুনাহ মাফ হয় ও ধৈর্য ধরে বিপদ সহ্য করার সাওয়াব লাভ হয়। বিপদটির কারণে সাওয়াব পাওয়া যায় কি না-এ নিয়ে আলিমগণের মতভেদ আছে।
২. বান্দার তার গুনাহের কথা স্মরণ হয় এবং সে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার কাছে তাওবাহর সুযোগ পায়।
৩. শক্ত ও কঠিন থাকার পর অন্তর নরম হয়। একজন সালাফ বলেছিলেন, “কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ার ফলে গুনাহের কথা স্মরণ করতে পারে। এবং আল্লাহর ভয়ে মাছির মাথা পরিমাণ অশ্রুও যদি নির্গত হয়, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।”
৪. ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার সামনে বিনয়ী করে। প্রচুর নেক আমলের চেয়ে এ রকম একটি অবস্থাই আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়।
৫. এসব বিপদের কারণে ব্যক্তির হৃদয় আল্লাহর দিকে ঘুরে যায়, সে তাঁর দুয়ারে গিয়ে দাঁড়ায়, তাঁকে ডাকে ও তাঁর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে। এটি হলো বিপদের সবচেয়ে বড় লাভ। যারা বিপদের সময় আল্লাহর সামনে বিনীত হয় না, আল্লাহ তাদের তিরস্কার করেছেন:
"আমি তাদের শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করেছিলাম। কিন্তু তারা তাদের প্রতিপালকের নিকট নত হলো না, আর তারা কাকুতি-মিনতিও করল না।”২৫৬
“তোমার পূর্বে আমি অনেক জাতির কাছে রাসূল পাঠিয়েছি। আর অভাব-অনটন ও দুঃখ-ক্লেশ দিয়ে পাকড়াও করেছিলাম, যাতে তারা বিনয়ী হয়।”২৫৭
পূর্বের এক আসমানি কিতাবে আছে, "আল্লাহ বান্দাকে পরীক্ষায় ফেলেন, কারণ তিনি তার কাছে কাকুতি-মিনতি শুনতে ভালোবাসেন।”
সাইদ বিন আব্দুল আযীয বলেন, “দাউদ বলেন, 'সুমহান সেই সত্তা, যিনি বিপদে ফেলে বান্দাকে দু'আ করতে বাধ্য করেন। সুমহান সেই সত্তা, যিনি স্বাচ্ছন্দ্য প্রদানের মাধ্যমে কৃতজ্ঞ হতে দেন।”
মুহাম্মাদ আল-মুনকাদির এ প্রচণ্ড কষ্টে ছিলেন। আবু জাফার মুহাম্মাদ ইবনু আলি তাঁর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর ব্যাপারে মানুষকে জিজ্ঞেস করলেন। লোকেরা জানাল তিনি ঋণগ্রস্ত। আবু জাফার বললেন, "তাঁর জন্য কি দু'আর দরজা খুলেছে?” তারা জানাল, "হ্যাঁ।" আবু জাফার বললেন, "বান্দা সত্যিই সৌভাগ্যবান, যদি সে প্রয়োজনের সময় তার রবকে বেশি বেশি ডাকে, তা যে প্রয়োজনই হোক না কেন।”
তাঁদের কেউ কেউ বিপদে পড়ে দু'আ করার সময় দ্রুত জবাব আশা করতেন না। তাঁদের যে রবকে প্রয়োজন হয়েছে, এই অবস্থাটি দ্রুত শেষ হয়ে যাক-তা তাঁরা চাইতেন না। সাবিত বলেন, “মুমিন যখন আল্লাহকে ডাকে, আল্লাহ জিবরীলকে তার প্রয়োজন পূরণ করার দায়িত্ব দিয়ে বলেন, 'তার প্রয়োজন পূরণ করতে তাড়াহুড়া করবে না। আমি আমার মুমিন বান্দার কণ্ঠ শুনতে ভালোবাসি।” এটি নবীজি -এর হাদীস হিসেবেও বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এর সকল সনদ দুর্বল।৫৮
একজন সালাফ স্বপ্নে আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করে বললেন, "হে আল্লাহ, আমি আপনাকে অনেক ডেকেছি, কিন্তু জবাব পাইনি।” তিনি জবাব দিলেন, "আমি তোমার কণ্ঠ শুনতে ভালোবাসি।”
৬. বিপদ-আপদের ফলে অন্তর ধৈর্যের ও সন্তুষ্টির মিষ্টতা অনুভব করে। এটি হলো বিরাট পুরস্কারের পদ, যার মর্যাদা সম্পর্কে ইতঃপূর্বে আলোচনা হয়েছে।
৭. বিপদের ফলে বান্দা সৃষ্টির থেকে মুখ ফিরিয়ে স্রষ্টামুখী হয়। আল্লাহ বলেছেন মুশরিকরাই বিপদের সময় এক আল্লাহকে ডাকে, তাহলে মুমিনের অবস্থা কী?
৮. বিপদের ফলে বান্দা তাওহীদকে সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করে ও একে অন্তরে অনুভব করে।২৫৯
এক ইসরাঈলী বর্ণনায় আছে, (আল্লাহ বলেন),
"বিপদ তোমাকে আর আমাকে কাছে আনে। স্বাচ্ছন্দ্য তোমাকে তোমার কাছে আনে।"
টিকাঃ
২৪৩ সূরাহ আত-তলাক, ৬৫: ৭
২৪৪ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪: ৫-৬
২৪৫ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪: ৫-৬
২৪৬ ইবনু আবি হাতিম : ১৯৩৯৫; বাযযার: ২২৮৮; তাবারানি, আল-আসওয়াত: ৩৪১৬; হাকিম: ৩০১০। যাহাবি বলেন, "এটি শুধু হুমাইদ ইবনু হাম্মাদ থেকে আইয সূত্রে বর্ণিত আছে। উভয়ই হাদীস বর্ণনায় মুনকার। বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১২, বলেন এটি যঈফ; আলবানি, আয- যঈফাহ: ১৪০৩ এ একে যঈফ জিদ্দান বলেছেন।
২৪৭ তাবারি; বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১৩; হাকিম: ৩৯৫০; যাহাবি একে মুরসাল বলেন। একই কথা বলেছেন যায়লাই, তাখরিজুল কাশশাফ: খণ্ড ৪, ২৩৫ পৃষ্ঠায়। ইবনু হাজার, আল-কাফি: ৩১৯ পৃষ্ঠায় একে মুরসাল বলেন এবং বলেন যে, এর মাওসুল সংস্করণটি যঈফ। তাগলিক আত- তালিক: খণ্ড ৪, ৩৭২ পৃষ্ঠায় তিনি আরও বলেন আল-হাসান পর্যন্ত এর ইসনাদ সহীহ। আলবানি, আয-যঈফাহ: ৪৩৪২ এ একে যঈফ বলেন। ইবনু আবি হাতিম: ১৩৩৯৬ এ একে আল-হাসানের উক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। ইবনু কাসির বলেন, “এই কথাগুলোর অর্থ হলো উভয় ক্ষেত্রে 'কষ্ট' কথাটি সুনির্দিষ্টতাবাচক উপসর্গ 'আল' এর সাথে যুক্ত। অতএব এটি একবচন। কিন্তু 'স্বস্তি' শব্দটি অনির্দিষ্ট রেখে দেওয়া হয়েছে। অতএব, এটি একাধিকবার ঘটবে। অতএব, দ্বিতীয়বারে উল্লেখিত কষ্ট প্রথমটিকেই বোঝাচ্ছে। তবে স্বস্তির ঘটনা একাধিক।"
২৪৮ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪ : ৫-৬
২৪৯ তাবারি; এটি মুরসাল। ইবনু হাজার, তাগলিক আত-তালিক: খণ্ড ৪, ৩৭২ পৃষ্ঠায় বলেন কাতাদাহ পর্যন্ত এর ইসনাদ সহীহ।
২৫০ বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১১; সুয়ুতি, আদুররুল মানসুরে একে ইবনু আবিদ্দুনিয়ার আস- সবরের সাথে সম্পৃক্ত করেন।
২৫১ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪ : ৫-৬
২৫২ সূরাহ আলে ইমরান, ৩: ২০০
২৫০ ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ: পৃষ্ঠা ২৪; বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১০; ইবনু আবি শাইবাহ: খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৩৫ এবং খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা ৩৭; হাকিম: ৩১৭৬ এ একে মুসলিমের শর্তানুযায়ী সহীহ বলেছেন। যাহাবি একমত। কিন্তু ইবনু হাজার, তাগলিক আত-তালিক: খণ্ড ৪, ৩৭২ পৃষ্ঠায় বলেন এর ইসনাদ হাসান।
২৫৪ সাখাওয়ি, আল-মাকাসিদ: ৮৭৭ বলেন, "এটি বর্ণিত হয়েছে আবু সালিহ থেকে আল-কালবি, তাঁর থেকে আল-ফাররা কর্তৃক।
২৫৫ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪: ১
২৫৬ সূরাহ আল-মুমিনূন, ২৩: ৭৬
২৫৭ সূরাহ আল-আন'আম, ৬: ৪২
২৫৮ তাবারানি, আল-আসওয়াত: ৮৪৪২; জাবির থেকে বর্ণিত।
২৫৯ বিপদের ফযিলতের আরও পূর্ণাঙ্গ তালিকার জন্য পরিশিষ্ট তিন দ্রষ্টব্য।