📘 নবীজির সাঃ পদাঙ্ক অনুসরণ > 📄 ধৈর্যের ফযিলত

📄 ধৈর্যের ফযিলত


রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “জেনে রেখো, তুমি যা অপছন্দ করো তা ধৈর্যের মাধ্যমে সহ্য করার মধ্যে রয়েছে মহাকল্যাণ।” গুফরাহর আযাদকৃত দাস উমারের বর্ণনায় ইবনে আব্বাস থেকে অতিরিক্ত বাক্য রয়েছে,
“তুমি যদি ইয়াকীনপূর্ণ অবস্থায় সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহর জন্য আমল করতে পারো, তবে তা করো। আর যদি তা না পারো, তাহলে জেনে রেখো, তুমি যা অপছন্দ করো তা ধৈর্যের মাধ্যমে সহ্য করার মধ্যে রয়েছে মহাকল্যাণ।”১৭৯
এখানে ইয়াকীন অর্থ হলো তাকদীরের উপর ঈমান রাখা। তাঁর ছেলে আলি বিন আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস তাঁর পিতার সূত্রে যে বর্ণনা করেছেন, তাতে স্পষ্ট করে এ অর্থের উল্লেখ আছে। এতে অতিরিক্ত শব্দ রয়েছে, “আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমি কীভাবে ইয়াকীনের সাথে কাজ করতে পারি?' তিনি বললেন, 'তুমি জানবে যে, যা তোমার উপর আপতিত হয়েছে তা হওয়ারই ছিল, আর যা আপতিত হয়নি তা কিছুতেই হওয়ার ছিল না।” তবে এ বর্ণনার সনদ দুর্বল।
তাকদীরের প্রতি ইয়াকীন যখন অন্তরে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়ে যাবে, তখন এর আবশ্যক ফলাফলস্বরূপ অন্তর থাকবে ধীরস্থির ও শান্ত। এই অর্থই প্রকাশ পেয়েছে এই আয়াতে :
“পৃথিবীতে অথবা তোমাদের নিজেদের উপর এমন কোনো বিপদ আসে না, যা আমি সংঘটিত করার পূর্বে কিতাবে লিপিবদ্ধ রাখিনি। এটি (করা) আল্লাহর জন্য খুবই সহজ। এটা এ জন্য যে, তোমাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য তোমরা যেন হতাশাগ্রস্ত না হও। আর তোমাদের যা দান করা হয়েছে, তার জন্য তোমরা যেন উৎফুল্ল না হও। কেননা, আল্লাহ অহংকারী ও অধিক গর্বকারীকে পছন্দ করেন না।”১৮০
এই আয়াতের তাফসীরে দাহহাক বলেন, “তিনি তাদের মনোবল দৃঢ় করলেন, যাতে 'তোমাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য তোমরা যেন হতাশাগ্রস্ত না হও। অতএব দুনিয়াবি জিনিসের জন্য দুঃখ কোরো না। কারণ, আমি তা তোমার জন্য নির্ধারণই করিনি।' আর 'তোমাদের যা দান করা হয়েছে, তার জন্য তোমরা যেন উৎফুল্ল না হও। সেসব দুনিয়াবি জিনিসের জন্য অহংকারী হবে না যা তোমাদের দেওয়া হয়েছে, কারণ তা কখনোই আটকে রাখার ছিল না।” বর্ণনাটি ইবনু আবিদ্দুনিয়া-এর সূত্রে এসেছে।
সাইদ ইবনু যুবাইর এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ""তোমাদের যা দান করা হয়েছে' অর্থাৎ দুনিয়াবি প্রাচুর্য। কারণ, তুমি তো জানোই তোমার সৃষ্টির আগে থেকেই এটি নির্ধারিত ছিল।” ইবনু আবি হাতিম এটি বর্ণনা করেছেন।
এর আলোকেই একজন সালাফ বলেছিলেন, “তাকদীরের প্রতি ঈমান দুশ্চিন্তা ও হতাশা দূর করে দেয়।” নবীজি এ দিকে ইঙ্গিত দিয়েছেন এই হাদীসের মাধ্যমে :
"যা কিছু তোমার উপকার করবে, তা কামনা করো এবং আল্লাহর সাহায্য চাও। আর নিরাশ হোয়ো না। কোনো বিপদ ঘটলে বলবে না, 'ইশ! আমি যদি অমুক কাজটা না করতাম!' বরং বলো, 'আল্লাহ তা নির্ধারণ করেছেন। তিনি যা চেয়েছেন, তা-ই করেছেন।' 'যদি' শয়তানের কুমন্ত্রণার দুয়ার খুলে দেয়।”১৮১
অর্থাৎ, বিপদের সময় মানুষ যদি তাকদীরের প্রতি ঈমানের কথা স্মরণ করে, তাহলে শয়তানের ওয়াসওয়াসার মাধ্যমে আর দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।
আনাস বলেন, "আমি দশ বছর নবীজি -এর খেদমত করেছি। কখনো তিনি আমাকে বলেননি, 'এটা কেন করলে?' 'ওটা করলে না কেন?”১৮২ তিনি বলেন, “তাঁর পরিবারের কেউ যদি আমাকে বকা দিত, তিনি বলতেন, 'বাদ দাও। কোনো কিছু তাকদীরে থাকলে তা হবেই।” অতিরিক্ত শব্দসহ হাদীসটি ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন। ১৮৩
ত্রুটিপূর্ণ এক সনদে ইবনু আবিদ্দুনিয়া থেকে বর্ণিত হয়েছে, আয়িশা বলেন, “নবীজি ঘরে ফিরলে সবচেয়ে বেশি যে কথাটি বলতেন তা হলো, 'আল্লাহ যা কিছু বিষয় নির্ধারিত রেখেছেন তা ঘটবেই।” এ ছাড়া আরেকটি মুরসাল বর্ণনায় আছে, নবীজি ইবনু মাসউদ-কে বলেন,
"বেশি দুশ্চিন্তা করবে না। আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন, তা ঘটবেই। যে রিযক তোমার জন্য আছে, তা আসবেই।”১৮৪ আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেন, “লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ১৮৫ (বলা) হলো নিরানব্বইটি রোগের আরোগ্য, যার সবচেয়ে কমটি হলো দুশ্চিন্তা।”১৮৬
এই কথার বাস্তবায়নের আবশ্যক ফলাফল হলো আল্লাহর কাছে সকল বিষয় ন্যস্ত করে এই বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ না চাইলে কোনো কিছুই ঘটবে না। এর উপর ঈমান দুশ্চিন্তা ও হতাশা দূর করে দেয়। নবীজি এক ব্যক্তিকে উপদেশ দিয়ে বলেন,
“আল্লাহ তোমার জন্য নির্ধারণ করে রেখেছেন এমন কোনো কিছুর জন্য আল্লাহকে গালিগালাজ করবে না।”১৮৭
বান্দা যখন আল্লাহর তাকদীরের মাধ্যমে তাঁর হিকমাহ ও রহমতের বিষয়টি বুঝতে পারে, সে বুঝতে পারে যে, তাকদীরের জন্য আল্লাহকে তিরস্কার করা সমীচীন নয়। সে আল্লাহর নির্ধারিত বিষয়ে সন্তুষ্টি বোধ করবে। আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা বলেন:
"আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদ আসে না। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, আল্লাহ তার অন্তরকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন..."১৮৮
এর তাফসীরে আলকামাহ বলেন, "মানুষের উপর আসা বিপদের কথা এখানে বলা হচ্ছে। কিন্তু সে জানে যে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে। তাই সে তা মেনে নেয় এবং সন্তুষ্ট থাকে।”
এক সহীহ হাদীসে আছে,
"আল্লাহ মুমিনের জন্য যা-ই নির্ধারণ করেন, তা তার জন্য কল্যাণকর। সে যদি ভালো অবস্থায় থাকে, তাহলে সে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে এবং তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি খারাপ অবস্থায় পড়ে, তাহলে সে ধৈর্যধারণ করে এবং তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। কেবল মুমিনের জন্যই এ বিষয়টি সত্য。”১৮৯
"বলে দাও, 'আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারণ করেছেন তা ছাড়া অন্য কিছুই আমাদের ঘটবে না, তিনিই আমাদের রক্ষক, আর আল্লাহর উপরই মুমিনদের ভরসা করা উচিত।' বলো, 'তোমরা আমাদের জন্য যে জিনিসের অপেক্ষা করছ, তা দুটো ভালোর একটি ছাড়া আর কিছুই না...'”১৯০
এখানে আল্লাহ আমাদের জানাচ্ছেন যে, তাঁর নির্ধারিত বিষয় ছাড়া মুমিনদের আর কিছুই হবে না। এ থেকে বোঝা যায় সেই বিষয়টি সহজ বা কঠিন যা-ই হোক, একই কথা। তারপর তিনি জানাচ্ছেন যে, তিনি তাদের রক্ষক। তাঁকে যারা রক্ষক হিসেবে গ্রহণ করেছে, তাদের তিনি ছেড়ে যাবেন না। নিশ্চয়ই তিনি তাদের কল্যাণ করার দায়িত্ব নেবেন:
“জেনে রেখো, আল্লাহই তোমাদের অভিভাবক, কতই-না উত্তম অভিভাবক! কতই-না উত্তম সাহায্যকারী! ১৯১
“তোমরা আমাদের জন্য যে জিনিসের অপেক্ষা করছ, তা দুটো ভালোর একটি ছাড়া আর কিছুই না... "১৯২
তিরমিযিতে আনাস থেকে বর্ণিত আছে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
“আল্লাহ যখন কোনো জাতিকে ভালোবাসেন, তখন তাদের পরীক্ষায় ফেলেন। যে কেউ সন্তুষ্ট থাকে, সে সন্তুষ্টি লাভ করবে। আর যে কেউ অসন্তুষ্ট হয়, সে অসন্তুষ্টি লাভ করবে।”১৯৩
আবুদ্দারদা (রাঃ) বলেন, “আল্লাহ কোনো কিছু নির্ধারণ করলে বান্দা এর প্রতি সন্তুষ্ট থাকলে আল্লাহ খুশি হন।” উন্মুদ্দারদা (রাঃ) বলেন, “যারা আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরের ব্যাপারে সন্তুষ্ট, তারাই সত্যিকারের প্রশান্তচিত্ত। কিয়ামাতের দিন তারা জান্নাতে এমন স্থান লাভ করবে, যা দেখে শহীদরাও হিংসা করবেন।”
ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন, “আল্লাহ তাঁর ন্যায়বিচার ও জ্ঞানের মাধ্যমে ইয়াকীন ও সন্তুষ্টির মাঝেই আনন্দ রেখেছেন। আর সংশয় ও অসন্তুষ্টির মাঝে রেখেছেন দুশ্চিন্তা আর অস্থিরতা।” নবীজি (ﷺ)-এর একটি হাদীস হিসেবেও কথাটি বর্ণিত আছে, তবে তার সনদ দুর্বল।
উমার বিন আব্দুল আযিয (রাঃ) বলতেন, “এই দু’আগুলো আমার জন্য আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার নির্ধারিত তাকদীরের প্রতি আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কোনো প্রয়োজনই বাকি রাখেনি।” তিনি এই দু’আগুলো খুব বেশি বেশি করতেন, “হে আল্লাহ, আমাকে আপনার তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট রাখুন। আমাকে আপনার তাকদীরে এত বারাকাহ দিন, যাতে আমি এমন বিষয়ে বিলম্ব কামনা না করি, যা আপনি দ্রুত দেবেন এবং যা বিলম্বে দেবেন তাতে তাড়াহুড়া না করি।”১৯৪
ইবনু আওন (রাঃ) বলেন,
"স্বাচ্ছন্দ্য ও কাঠিন্য উভয় অবস্থায় আল্লাহর তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকো। এতে তোমার অস্থিরতা কমবে এবং আখিরাতের জন্য লাভজনক হবে। জেনে রেখো, বান্দা ততক্ষণ সত্যিকারের সন্তুষ্টি লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তার দরিদ্র অবস্থার সন্তুষ্টি সচ্ছলতার অবস্থার সন্তুষ্টির সমান হচ্ছে। আল্লাহর ইচ্ছেকে নিজের কামনা-বাসনার বিপরীত দেখতে পেয়ে কী করে তুমি অসন্তুষ্ট হতে পারো? অথচ তুমি আল্লাহকে তোমার অবস্থার দেখভাল করার অনুরোধ করেছ। এমনটা হতেই পারে যে, তোমার ইচ্ছামতো সবকিছু হলে তুমি ধ্বংস হয়ে যেতে। অথচ আল্লাহর নির্ধারিত বিষয় তোমার ইচ্ছের সাথে মিললে তুমি খুশি হয়ে ওঠো। উভয় অবস্থার কারণ হলো গায়েবের ব্যাপারে তোমার নিতান্ত অজ্ঞতা। এই অবস্থা নিয়ে
বিচারদিবসে যাওয়ার সাহস হয় কী করে! তুমি নিজের প্রতি সদ্ব্যবহার করোনি, সন্তুষ্টির সঠিক মাত্রায়ও পৌঁছতে পারোনি।”
চমৎকার কিছু কথা। এর অর্থ হলো যে, বান্দা যখন আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার কাছে কোনো বিষয়ে ফায়সালা করে দেওয়ার দু'আ (ইস্তিখারা) করে, তখন আল্লাহ যে সিদ্ধান্তই দিন তাতে তার সন্তুষ্ট থাকতে হবে-পছন্দ হোক বা না হোক। কারণ, সে তো জানেই না কোন অবস্থায় তার কল্যাণ রয়েছে। আর আল্লাহ যা নির্ধারণ করেন, তার জন্য তিনি তিরস্কারযোগ্য নন। আল্লাহ যা নির্ধারণ করবেন, এতে সন্তুষ্ট হওয়ার মতো মনোবল নেই, এমন মানুষদের এ কারণেই ইস্তিখারার দু'আয় 'সকল কল্যাণকর অবস্থায়' কথাটি যোগ করার পরামর্শ দিতেন ইবনে মাসউদ১৯৫ সহ কিছু সালাফ। অন্যথায় সে এমন ফিতনায় পতিত হতে পারে, যাতে সে উত্তীর্ণ হতে পারবে না। এ কথাটি নবীজি -এর হাদীস হিসেবেও বর্ণিত হয়েছে। তবে তার সনদ দুর্বল। ১৯৬
সাদ থেকে বর্ণিত, রাসূল বলেন, "বান্দার সৌভাগ্য হলো আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার কাছে সিদ্ধান্ত চাওয়ার পর তাঁর প্রদান করা সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকতে পারা। আর বান্দার দুর্ভাগ্য হলো আল্লাহর সিদ্ধান্ত চাওয়া পরিত্যাগ করা আর তিনি যা নির্ধারণ করেন, তাতে অসন্তুষ্ট হওয়া।” হাদীসটি তিরমিযি ও অন্যান্য কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। ১৯৭
তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্টি অর্জনের অনেক উপায় আছে:
১. আল্লাহর প্রতি বান্দার দৃঢ় ইয়াকীন থাকা যে, তিনি মুমিনের জন্য যা নির্ধারণ করেন তা-ই কল্যাণকর। সে যেন দক্ষ ডাক্তারের কাছে নিজেকে সমর্পণ করা রোগী। ডাক্তারের পথ্য তার ব্যথার উদ্রেক করুক বা না করুক, সে সন্তুষ্টই থাকবে। কারণ, সে জানে যে, ডাক্তার তাকে সর্বাধিক কল্যাণকর পথ্যই দিচ্ছেন। ইবনে আওল তাঁর উক্তিতে এর কথাই বলেছেন।
২. সন্তুষ্টির বিনিময়ে আল্লাহ যে প্রতিদান দেওয়ার ওয়াদা করেছেন, তা স্মরণ করা। বান্দা এটি নিয়ে চিন্তায় এমনই মগ্ন হয়ে যেতে পারে যে, বাকি সব ব্যথা সে
ভুলেই যাবে। সালাফদের মধ্যে একজন নারী পড়ে যান, এতে তাঁর পায়ের নখ ভেঙে যায়। তিনি হেসে উঠে বলেন, “তাঁর কাছে এর যে প্রতিদান তা ভেবে আমি ব্যথার তিক্ততা ভুলে গেছি।”
৩. যেই সত্তা বিপদ পাঠান, তাঁর ভালোবাসায় নিজেকে মগ্ন করে ফেলা। তাঁর অসীম প্রাচুর্য, মহত্ত্ব, সৌন্দর্য, ত্রুটিহীনতা নিয়ে চিন্তা করা। এমন সচেতনতার ফলে এমন অবস্থা সৃষ্টি হবে যে, ইউসুফ (আঃ)-কে দেখে মিসরের নারীদের হাত কাটার ব্যাথা ভুলে যাওয়ার**১৮৮** মতো করেই বান্দা ব্যাথা ভুলে যাবে। পূর্বে বর্ণিত অবস্থার চেয়ে এটি আরও উচ্চতর পর্যায়।
জুনাইদ (রহঃ) বলেন তিনি সিররি (রহঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, প্রেমিক বিপদের ব্যাথা অনুভব করেন কি না। তিনি জবাব দিয়েছিলেন, “না।” এ কথার মাধ্যমে তিনি এই উচ্চতর পর্যায়ের কথা বলছেন। এ কথার আলোকেই বিপদে পতিত একদল মানুষ বলেছিলেন, “তিনি (আল্লাহ) আমাদের সঙ্গে যা করতে চান, তা-ই করুন। এমনকি তিনি যদি আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একটি একটি করে কেটে ফেলতেন, এতে তাঁর প্রতি আমাদের ভালোবাসাই কেবল বাড়ত।”
তাঁদের মধ্যে একজন বলেছেন: প্রেমের আতিশয্য যদি টুকরো টুকরো করে কাটে আমায়, আমার ভালোবাসা বৃদ্ধি ছাড়া তাতে কিছুই হতো না হায়। আমি হয়ে থাকব ভালোবাসার কাছে বন্দী, তব সন্তুষ্টির খোঁজেই পৌঁছে যাব জীবনসন্ধি।
ইবরাহীম ইবনু আদহাম (রহঃ) তাঁর সম্পত্তি, সম্পদ, সন্তান ও দাসদের ছেড়ে গিয়েছিলেন। তাওয়াফ করার সময় তিনি তাঁর পুত্রকে দেখতে পান, কিন্তু তাঁর সাথে কথা বলেননি। তিনি বলেন: সবকিছু থেকে হিজরত করেছি তোমাকে পাবার আশায় অধীনস্থদের ছাড়িয়া এসেছি তোমাকে দেখার নেশায়। তুমি আমায় টুকরো করলেও বেড়েই চলব ভালোবাসায়।
আল্লাহর এমনই একদল প্রেমিক ছিলেন ফুদাইল ও ফাতহুল মাওসিলির মতো ব্যক্তিরা। তাঁরা যদি এমন অবস্থায় ঘুমোতে যেতেন যে, রাতের খাবার খাওয়া হয়নি বা জ্বালানোর মতো কুপি পাওয়া যায়নি, তাহলে তাঁরা আনন্দে কান্না করতেন।
শীতকালে ফাতহ তাঁর পরিবারকে জড়ো করে নিজের চাদর দিয়ে তাদের ঢেকে নিয়ে বলতেন,
“(হে আল্লাহ) আপনি আমাকে ক্ষুধার্ত রেখেছেন, তাই আমি আমার পরিবারকে ক্ষুধার্ত রেখেছি। আপনি আমাকে খ্যাতিহীন করেছেন, তাই আমি আমার পরিবারকে খ্যাতিহীন করেছি। এমনটা আপনি আপনার প্রিয় বান্দাদের সাথেই করে থাকেন, আমি কি তাদের একজন? আমার কি আনন্দিত হওয়া উচিত নয়?”১৯৯
একজন সালাফ অসুস্থ ছিলেন। তাঁরা তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার কি কিছু লাগবে?” তিনি বলেন, "তাঁর (আল্লাহর) কাছে যা সবচেয়ে প্রিয়, আমার কাছেও তা-ই প্রিয়।”২০০
এর আলোকে একজন বলেছিলেন:
আপনার শান্তি মধুর, যার থেকে দূরত্বও নিকট সমধিক, আপনি আমার প্রাণেরই মতো, বরং তার চেয়ে অধিক। এটাই আমার জন্য যথেষ্ট, যাতে তুমি তুষ্ট, তাতে আমিও তুষ্ট।
আবুত্তুরাব এই চরণগুলো রচনা করেছেন :
বিভ্রান্ত হোয়ো না কেউ, প্রেমিকেরও তো চিহ্ন আছে, নির্দিষ্ট পথে উপহার পাঠায় সে প্রেমাস্পদের কাছে। রবের দেওয়া বিপদে তুষ্ট, তিনি যা করেন তায় খুশি, তাঁর দেওয়া দারিদ্র্যই প্রাচুর্য, বরং তার চেয়েও বেশি।
তাঁরা এক ব্যক্তির কাছে গেলেন, যার ছেলে জিহাদে শহীদ হয়েছে। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, "আমি পুত্রশোকে কাঁদছি না। তরবারির আঘাত পাওয়ার সময় আল্লাহর প্রতি সে কতই-না সন্তুষ্ট ছিল, তা ভেবেই কাঁদছি।”
তারা যদি মোর মৃত্যুই চায়, সেটাই হোক না তবে! আল্লাহ যা চান, সেটা না হওয়া আমি চেয়েছি কবে?
মূলকথা হলো, রাসূল ﷺ চেয়েছেন ইবনে আব্বাস যেন সামর্থ্য থাকলে সন্তুষ্ট অবস্থায় আমল করেন। যদি সামর্থ্য না থাকে, তিনি বলেন, “যদি তা না পারো, তাহলে জেনে রেখো, তুমি যা অপছন্দ করো তা ধৈর্যের মাধ্যমে সহ্য করার মধ্যে রয়েছে মহাকল্যাণ।” এ থেকে বোঝা যায়, যেসব নির্ধারিত বিষয় সহ্য করা কঠিন, তাতে পুরোপুরি সন্তুষ্ট থাকা আবশ্যক নয়, তবে অত্যন্ত উত্তম। যে সন্তুষ্ট হতে পারে না, তাকে অবশ্যই ধৈর্যশীল হতে হবে। ধৈর্য আবশ্যক। এর ফলে মহাকল্যাণ আসে। আল্লাহ তা'আলা ধৈর্যের আদেশ দিয়েছেন এবং এর জন্য বিশাল পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন,
"... আমি ধৈর্যশীলদের তাদের পুরস্কার অপরিমিতভাবে দিয়ে থাকি।”২০১
"...ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দান করো। নিশ্চয়ই যারা বিপদকালে বলে থাকে, 'আমরা আল্লাহরই, আর আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী।' এদের প্রতিই রয়েছে তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অনুগ্রহ ও করুণা। আর এরাই হিদায়াতপ্রাপ্ত।”২০২
"...সুসংবাদ দাও সেই বিনীতদের, 'আল্লাহ' নামের উল্লেখ হলেই যাদের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে, যারা তাদের বিপদে-আপদে ধৈর্যধারণ করে..."২০৩
আল-হাসান বলেন, “সন্তুষ্টির অবস্থা বিরল। তবে ধৈর্য হলো মুমিনের আশ্রয়।”২০৪ সুলাইমান আল-খাওয়াস বলেন, “ধৈর্যের মর্যাদা সন্তুষ্টির নিচে। সন্তুষ্ট ব্যক্তির অবস্থা এই যে, বিপদ আসুক বা না আসুক, সে সন্তুষ্ট। আর ধৈর্য হলো বিপদ আসার পর অবিচলভাবে তা সহ্য করা।”
সন্তুষ্টি আর ধৈর্যের মাঝে পার্থক্য আছে। ধৈর্য হলো বিপদ দেখতে পাওয়ার পর অসন্তুষ্ট হওয়া থেকে আত্মাকে লাগাম পরানো।২০৫ আর সন্তুষ্টি হলো যেকোনো অবস্থায়ই যা হচ্ছে, তা মেনে নেওয়া। সন্তুষ্টির কারণে ব্যথা কমে যায়, এমনকি একদমই শূন্য হয়ে যেতে পারে। কারণ, অন্তর তখন ইয়াকীন ও জ্ঞানের কোমল পরশ পেয়ে গেছে। ২০৬
উমার বিন আব্দুল আযীয, ফুদাইল, আবু সুলাইমান, ইবনুল মুবারাকসহ অনেক সালাফ তাই বলতেন, “সন্তুষ্ট ব্যক্তি বর্তমানে যেই অবস্থায় আছে, সেটা ছাড়া আর অন্য কিছু কামনাই করে না। কিন্তু ধৈর্যশীল ব্যক্তি (অবস্থার পরিবর্তন) কামনা করে।” অনেক সাহাবাগণের থেকেও এ রকম সন্তুষ্টির অবস্থার বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন: উমার , ইবনে মাসউদ প্রমুখ।
আব্দুল আযীয ইবনে আবু রুওওয়াদ বলেন, “বানী ইসরাঈলের এক আবেদ ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখানো হলো, অমুক মহিলা জান্নাতে তাঁর স্ত্রী হবে। তিনি সেই নারীর বাসায় তিন দিনের জন্য গেলেন, যাতে তিনি কী আমল করেন তা জানা যায়। কিন্তু রাতে পুরুষটি যখন সালাত পড়তেন, নারীটি ঘুমাতেন। পুরুষটি যেদিন সিয়াম রাখতেন, নারীটি খাওয়া-দাওয়া করতেন। চলে যাওয়ার সময় তিনি নারীটিকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনার কোন আমলটি আপনার কাছে সেরা মনে হয়?' নারীটি বললেন, 'আপনি আমাকে যা করতে দেখেছেন, তার চেয়ে বেশি আমি কিছুই করি না। কিন্তু আমি যখন কষ্টে থাকি, তখন স্বাচ্ছন্দ্য কামনা করি না। যখন অসুস্থ থাকি, তখন সুস্বাস্থ্য কামনা করি না। যখন ক্ষুধার্ত থাকি, তখন ভরপেট হওয়া কামনা করি না। যখন রোদে থাকি, তখন ছায়া কামনা করি না।' লোকটি বললেন, 'আল্লাহর কসম! এই গুণ তো বান্দাদের আয়ত্তের বাইরে।”২০৭
বিপদের প্রথম আঘাতেই ধৈর্যধারণ করতে হয় বলে নবীজির সহীহ হাদীসে এসেছে।২০৮ আর বিপদ ভোগ করতে থাকা অবস্থায় সন্তুষ্টি প্রদর্শন করতে হয়। যেমনটি নবীজি ﷺ দু'আ করতেন, “তাকদীরের লিখন সংঘটিত হয়ে যাবার পর আমি আপনার নিকট সন্তুষ্ট থাকার সামর্থ্য চাই।”২০৯ কারণ, বিপদ আসার আগে বান্দা সহজেই সন্তুষ্ট থাকতে পারে। কিন্তু বিপদ আসার পর তার অবস্থা একদম বিপরীত হয়ে যেতে পারে। নির্ধারিত বিপদ চলে আসার পর যে সন্তুষ্টি প্রদর্শন করে, সে-ই সত্যিকারের সন্তুষ্ট। ২১০
সারকথা হলো, ধৈর্যধারণ আবশ্যক। ধৈর্যের সীমানার বাইরেই থাকে অসন্তুষ্টি। যে কেউ আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরের ব্যাপারে অসন্তুষ্ট, তার পরিণাম হবে আল্লাহর অসন্তুষ্টি। তার উপর তার নিজের অসন্তুষ্টির চেয়ে বেশি হবে বিপদের স্বাদ আর শত্রুদের পক্ষ থেকে আসা ক্ষতি। একজন সালাফ বলেছেন:
কোনো দুর্ঘটনায় হোয়ো না হতাশ শত্রুকে ধরতে দিয়ো না তোমার রাশ ধৈর্যের মাধ্যমেই দেখতে পাবে আশ, দৃঢ়পদ থাকো যখন শত্রু-সঙ্গে হয় নিবাস।
নবীজি বলেন, “যে নিজের মাঝে ধৈর্য স্থাপন করে, আল্লাহ তাকে ধৈর্য দান করেন। ধৈর্যের চেয়ে বড় ও ব্যাপক উপহার আর কাউকে কখনো দেওয়া হয়নি।” ২১১
উমার বলেন, "আমাদের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সময় ছিল ধৈর্যধারণের দিনগুলো।” ২১২ আলি বলেন, "ঈমানের সাথে ধৈর্যের সম্পর্ক দেহের সাথে মাথার সম্পর্কের মতো। যার ধৈর্য নেই, তার ঈমানই নেই।” ১১৩
আল-হাসান বলেন, “ধৈর্য হলো জান্নাতি এক নিয়ামাত। আল্লাহ কেবল সম্মানিতদেরই তা দান করেন।” মায়মুন ইবনু মিহরান বলেন, “নবী বা অন্য কেউই কখনো ধৈর্যধারণ না করে কোনো কল্যাণ লাভ করতে পারেননি।” ইবরাহীম আত-তাইমী বলেন, “আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার উপর ঈমানের পর বান্দাকে সবচেয়ে বড় যে নিয়ামাত আল্লাহ দিয়েছেন, তা হলো ক্ষতির সময় ধৈর্য, পরীক্ষার সময় ধৈর্য, বিপদের সময় ধৈর্য।” তিনি এ কথা বলেছেন এই আয়াতের ভিত্তিতে :
"বরং কল্যাণ আছে এতে যে, কোনো ব্যক্তি ঈমান আনবে আল্লাহ, শেষ দিবস, ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ ও নবীগণের উপর এবং আল্লাহর ভালোবাসার্থে ধন-সম্পদ আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম-মিসকীন, মুসাফির ও যাজ্ঞাকারীদের এবং দাসত্বজীবন হতে নিষ্কৃতি দিতে দান করবে এবং সালাত কায়েম করবে ও যাকাত প্রদান করবে, প্রতিশ্রুতি দানের পর স্বীয় প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবে এবং অভাবে, দুঃখ-ক্লেশে ও সংকটে ধৈর্যধারণ করবে। এ লোকেরাই সত্যপরায়ণ আর এ লোকেরাই তাকওয়াবান।” ২১৪
উমার বিন আব্দুল আযীয বলেন,
“আল্লাহ যদি কাউকে কোনো নিয়ামাত দিয়ে তা ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে তার বদলে শুধু ধৈর্য দান করেন, তাহলে যা দেওয়া হলো তা ছিনিয়ে নেওয়া বস্তুর চেয়ে উত্তম।” তারপর তিনি তিলাওয়াত করেন:
"... আমি ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান অপরিমিতভাবে দিয়ে থাকি।”২১৫
একজন সালাফের পকেটে সব সময় একটি কাগজের টুকরা থাকত। সময়ে সময়ে তিনি তা বের করে পড়তেন। তাতে লেখা ছিল,
“তুমি ধৈর্যধারণ করে তোমার প্রতিপালকের হুকুমের অপেক্ষায় থাকো, কারণ তুমি তাঁর দৃষ্টির সামনেই আছো..."২১৬
সুন্দর ধৈর্য হলো বিপদের কথা বান্দার নিজের কাছে রাখা আর কাউকে এ বিষয়ে না বলা।
"ধৈর্যই উত্তম।”২১৭
একদল সালাফ এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, এর অর্থ হলো কোনো অভিযোগ ছাড়াই ধৈর্যধারণ করা। ২১৮
আহনাফ ইবনু কায়স ؒ চল্লিশ বছর ধরে অন্ধ ছিলেন, কিন্তু তিনি এর কথা কাউকে বলেননি। আব্দুল আযীয ইবনু আবু রুওওয়াদ-এর এক চোখ বিশ বছর যাবৎ অন্ধ ছিল। তাঁর ছেলে একদিন ভালো করে দেখে বললেন, “বাবা, আপনার এক চোখ অন্ধ।” তিনি বললেন, “গত বিশ বছর ধরে আমি এ নিয়ে আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট আছি।” ইমাম আহমাদ ؒ অসুস্থ হলে তা নিয়ে কখনো কোনো অভিযোগ করতেন না। তাঁকে যখন জানানো হলো যে অসুস্থ অবস্থায় মুজাহিদ ؒ গোঙানো অপছন্দ করতেন, তখন তিনি মৃত্যু পর্যন্ত এ কাজ ত্যাগ করেন। তিনি নিজেকে বলতেন, "ধৈর্য ধরো, না হলে পস্তাতে হবে।"
এক জ্ঞানী ব্যক্তি এক রোগীর কাছে গিয়ে দেখলেন সে উহ আহ করছে। তিনি মনে করিয়ে দিলেন, “এটি (রোগ) কার দেওয়া?” তাঁদের একজন বলতেন:
শরীর তো আমার অসুস্থতায় জর্জরিত, তবু দর্শনার্থীদের কাছে রাখে লুক্কায়িত। প্রিয়তমের তাকদীরে যদি অসন্তুষ্ট হয়, তাহলে তো নফস সুবিচারকারী নয়।
ইয়াহইয়া ইবনু মুয়ায বলেন,
"তুমি যদি তোমার রবকে ভালোবাসো আর তিনি তোমার জন্য ক্ষুধা ও বস্ত্রের অভাব নির্ধারণ করেন, তোমার উপর ফরয হলো এটি সহ্য করা এবং মাখলুকদের কাছ থেকে তা লুকানো। প্রেমিক তো বিনা অভিযোগে প্রেমাস্পদের থেকে পাওয়া কষ্ট সহ্য করে। তাহলে মাখলুকের কাছে তুমি এমন জিনিস নিয়ে কেন অভিযোগ করবে, যা সে তোমাকে দেয়ইনি?"
কবি বলেন, আপনি ছাড়া সকলের কাজ আমার ঘৃণায় খণ্ডিত, আপনার হতে যা কিছু আসে তা-ই সৌন্দর্যমণ্ডিত।
নবীজি ও সাহাবাগণ ক্ষুধার তাড়নায় পেটে পাথর বাঁধতেন। ১৯
উয়াইস ময়লার স্তূপ থেকে ভাঙা হাড্ডি জড়ো করতেন আর তাঁর আশপাশে কুকুররাও তা-ই করত। একবার এক কুকুর তাঁকে দেখে ঘেউ ঘেউ করে উঠল। তিনি বললেন, “কুকুর, যে তোমার ক্ষতি করে না, তুমিও তার ক্ষতি করো না। তোমার কাছে যা আছে, তা তুমি খাও। আমার কাছে যা আছে, তা আমি খাই। আমি যদি জান্নাতে যাই, আমি তোমার চেয়ে উত্তম হব। আর আমি যদি জাহান্নামে যাই, তুমি আমার চেয়ে উত্তম হবে।”
ইবরাহীম ইবনু আদহাম গরিবদের সাথে শস্যের অঙ্কুর কুড়াতেন। যখন তিনি টের পেলেন গরিবরা তাদের সাথে তাঁর এ প্রতিযোগিতা পছন্দ করছে না, তখন তিনি ভাবলেন, “আমি কি বালখ অঞ্চলে সম্পদ ফেলে এলাম গরিবদের সাথে শস্যদানা কুড়ানোর প্রতিযোগিতা করতে?” তারপর থেকে তিনি কেবল পশুরা যেসব মাঠে চড়ত, সেখান থেকেই শস্য কুড়াতেন।”
ইমাম আহমাদ গরিবদের সাথে শস্য কুড়াতেন। সুফিয়ান আস-সাওরি মক্কায় যাওয়ার পথে একবার দুটি উটের দেখাশোনার চাকরি নিয়েছিলেন। তিনি কিছু লোকের জন্য রান্নার দায়িত্ব ছিলেন। তিনি এত বাজে রান্না করতেন যে, লোকেরা তা খেয়ে তাঁকে প্রহার করত। ফাতহুল মাওসিলি টাকার বিনিময়ে কিছু মানুষের জন্য আগুন জ্বালানোর কাজ করতেন।
ভূমি দিয়ে এলাম আমি আপনার ওয়াস্তে আমার শত্রু হিংসুকদের হস্তে।
হে রব, কতদিন পাব নেক নজর তোমার? জীবন শেষ হতে চলল, প্রয়োজন ফুরোয়নি আমার।
আরেকজন সালাফ বলেছেন: তোমার রহমতের খোঁজে সয়েছি অনেক দুঃখ-যাতনা অনেক ধৈর্য ধরেছি আমি অনেক কষ্ট-যাজ্ঞা। ছেড়ে যেয়ো না আমায় পারব না আমি তোমায় ছাড়া পারিশ্রমিক চাও যদি আমার প্রাণটি নাও সারা। তোমার সন্তুষ্টিকে আমি বেসেছি অনেক ভালো, হৃদয় আকুল, কণ্ঠ রুদ্ধ অশ্রুতে টলোমলো। আপনার প্রেমে সকল বিপদ হয়ে যায় সহ্য আমার, বিপদে যে কখনো পড়েনি তার সুখ কী আবার?
তাঁদের দৃষ্টিতে দুনিয়াবি কষ্ট হলো নিয়ামাত। তাঁদের একজন বলতেন, “সত্যিকার বিচারক তো সে-ই, যে বিপদকে দেখে নিয়ামাত হিসেবে আর স্বাচ্ছন্দ্যকে ভাবে দুর্ভাগ্য।” এক ইসরাঈলী বর্ণনায় আছে, "যদি কোনো প্রাচুর্যশালীকে আসতে দেখো, তাহলে বলো, 'কোনো এক পাপের অগ্রীম শাস্তি!' যদি কোনো দরিদ্রকে আসতে দেখো, তাহলে বলো, 'নেককারের নিদর্শন, স্বাগতম!”২২০
একজন সালাফ বলেছেন,
"আমি কোনো দুনিয়াবি বিপদে পড়লে চারবার আল্লাহর প্রশংসা করি। বিপদ এর চেয়েও খারাপ না হওয়ার কারণে, আমাকে বিপদ সহ্য করার শক্তি দেওয়ার কারণে, আমাকে 'ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' বলার শক্তি প্রদানের কারণে, আমাকে দ্বীনের ক্ষেত্রে কোনো বিপদে না ফেলার কারণে।"
ধৈর্যের মাধ্যমে মুক্তি কামনা করা ইবাদাতের একটি প্রকার। কারণ, বিপদ কখনোই চিরস্থায়ী হয় না।
ধৈর্য ধরে বিপদ সহ্য করো, হে হৃদয়। জেনো বিপদ কভু চিরস্থায়ী না হয়। ধৈর্য ধরো মহান ব্যক্তিদের মতো করেই, বিপদ তো আজকে আছে, কালকে নেই।
পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্দশাগ্রস্ত লোকটিকে জান্নাতে একটু ঢুকিয়ে আবার বের করে এনে জিজ্ঞেস করা হবে, "তুমি কি কখনো বিপদ দেখেছ? বিপদ ভোগ করেছ?” সে বলবে, “না, ইয়া রব্ব!”২২১
হে আত্মা, আর মাত্র কয়েকটা দিন, এরা তো স্বপ্নের মতো স্থায়িত্বহীন। হে আত্মা, পৃথিবী তাড়াতাড়ি পার করে দাও, আসল জীবন তো সামনে, তার দিকেই যাও।
আরেকজন বলেছেন: একটি মাত্র ঘণ্টার ব্যাপার, তারপরই তা নেই, এ সবই ক্ষণস্থায়ী, সব হারিয়ে শেষে যাবেই।

টিকাঃ
১৭৯ আবু নুয়াইম: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩১৪
১৮০ সূরাহ আল-হাদীদ, ৫৭: ২২-২৩
১৮১ মুসলিম: ২৬৬৪; আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।
১৮২ বুখারি: ২৭৬৮-৬০৩৮-৬৯১১; মুসলিম: ২৩০৯
১৮৩ আহমাদ: ১৩৪১৮; বায়হাকি, শুয়াব: ৮০৭০; বুখারি ও মুসলিমের শর্তানুযায়ী এর ইসনাদ গ্রহণযোগ্য। অনুরূপ, আরনাউত, তাখরিজ মুসনাদ।
১৮৪ বায়হাকি, শুয়াব: ১১৮৮; ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ, আল-ইসাবাহ: খণ্ড ১, ১০৪ পৃষ্ঠায় ইবনু হাজার বলেন, এর ইসনাদে আইয়‍্যাশ ইবনু আব্বাস নামক একজন যঈফ বর্ণনাকারী আছেন। আলবানি, আয-যঈফাহ: ৪৭৯৩ এ একে যঈফ বলেছেন। অনুরূপ আস-সহীহাহ: খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৪ এ তিনি উমার ও আবু যার থেকে এই হাদীসের আরও দুটি দুর্বল বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন
১৮৫ অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কারও কোনো শক্তি বা ক্ষমতা নেই।
১৮৬ তাবারানি, আল-আসওয়াত: ৫০২৮; ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ, হাকিম : ১৯৯০ একে সহীহ বলেছেন, কিন্তু যাহাবি দেখান যে এতে বিশর নামক একজন দুর্বল বর্ণনাকারী আছেন। হায়সামি: খণ্ড ১০, ৯৮ পৃষ্ঠায় বলেন, এর ইসনাদে বিশর ইবনু রাফি আছেন, যিনি দুর্বল। ইবনুল জাওযি, আল-ইলাল: খণ্ড ২, ৩৪৮ পৃষ্ঠায় বলেন এটি সহীহ নয়। আলবানি একে যঈফ বলেছেন, যঈফ আর-তারগীব: ৯৭০-১১৪৭
১৮৭ আহমাদ: ১৭৮১৪-২২১৭; বুখারি, খালাক আফআলুল ইবাদ: ১৬৩ মুনযিরি, আত-তারগীব : খণ্ড ২, ২৫৭ পৃষ্ঠাতে দুটি বর্ণনাসূত্র উল্লেখের পর তাদের একটিকে হাসান বলেন। আলবানি, আস-সহীহাহ: ৩৩৩৪ এবং সহীহুত তারগীব : ১৩০৭ এ একে হাসান লি গাইরিহি বলেন। আরনাউত বলেন, হাদীসটি হাসান বলে পরিগণিত হওয়ার যোগ্য।
১৮৮ সূরাহ আত-তাগাবুন, ৬৪: ১১
১৮৯ মুসলিম: ২৯৯৯; সুহাইব ইবনু সিনান এ থেকে বর্ণিত।
১৯০ সূরাহ আত-তাওবাহ, ৯ : ৫১-৫২
১৯১ সূরাহ আল-আনফাল, ৮ : ৪০
১৯২ সূরাহ আর-তাওবাহ, ৯ : ৫২
১৯৩ তিরমিযি, ২৩৯৬, ইবনু মাজাহ, ৪০৩১
১৯৪ বায়হাকি, শুয়াব: ২২৭
১৯০ বায়হাকি, শুয়াব: ২০৫
১৯৬ তাবারানি, আল-কাবির: ১০০১২-১০০৫২; ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত। এটি যঈফ।
১৯৭ আহমাদ: ১৪৪৫ এবং তিরমিযি: ২১৫১; তিরমিযি একে গারীব বলেছেন, কারণ এর ইসনাদে হাম্মাদ ইবনু হুমাইদ আছেন, যিনি শক্তিশালী নন। আরনাউত এর ইসনাদকে যঈফ বলেছেন। আলবানি, আয-যঈফাহ: ১৯০৬ এ একে যঈফ বলেছেন।
১৮৮ "যখন তারা তাকে দেখল, বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল আর নিজেদের হাত কেটে ফেলল আর বলল, 'আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন। এ তো মানুষ নয়, এক সম্মানিত ফেরেশতা!” [সূরাহ ইউসুফ, ১২:৩১]
১৯৯ আবু নুয়াইম: খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ১৯২
২০০ যাহাবি, সিয়ার: খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ১৮২; ইয়াহইয়া ইবনু সাইদ আল-কাত্তানের উদ্ধৃতি দিয়ে।
২০১ সূরাহ আয-যুমার, ৩৯: ১০
২০২ সূরাহ আল-বাকারাহ, ২: ১৫৫-১৫৭
২০০ সূরাহ আল-হাজ্জ, ২২: ৩৪-৩৫
২০৪ আবু নুয়াইম: খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৪২; উমার ইবনু আব্দুল আযীয থেকে।
২০৫ সবর: বিরত থাকা ও সংযত হওয়া। রাগিব বলেন, "এটি হলো শরিয়ত ও আকল অনুযায়ী আত্মাকে বিরত রাখা।” জাহিয বলেন যে, এটি স্থিরবুদ্ধিতা ও সাহসের সমন্বয়ে গঠিত এক গুণ। মুনাউয়ি বলেন যে, এটি হলো শারিরীক ও মানসিক অসুবিধা ও ব্যথার মুখোমুখি হতে পারার ক্ষমতা। এটি হলো আত্মাকে কৃপণতা ও হতাশা থেকে বিরত রাখা, জিহ্বাকে অভিযোগ করা থেকে বিরত রাখা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে বিশৃঙ্খল হওয়া থেকে বিরত রাখা। এটি হলো সকল পরিস্থিতিতে আল্লাহর হুকুমের উপর দৃঢ় থাকা এবং সর্বোত্তম উপায়ে বিপদের মোকাবেলা করা। ইবনু হিব্বান, রওদাতুল উকালা: পৃষ্ঠা ১২৬-১২৮ এ বলেন, বুদ্ধিমানের উপর আবশ্যক হলো বিপদের আগমনের শুরুতে সবর অবলম্বন করা। আর যখন সে এতে দৃঢ় হয়ে যাবে, তখন সন্তুষ্টির (রিদ্বা) পর্যায়ে উন্নীত হওয়া। কেউ যদি সবর দ্বারা পরিপুষ্ট না হয়ে থাকে, তাহলে তার উচিত নিজের মধ্যে সবরের পরিচর্যা করা (তাসাব্বর), কারণ এটিই রিদ্বার প্রথম ধাপ। মানুষের যদি সত্যিই সবর থাকে, তাহলে সে মহান হয়ে যাবে। কারণ, এটিই সকল কল্যাণের ঝরনা আর সকল আনুগত্যের ভিত্তি... এর দিকে যাওয়ার ধাপগুলো হলো সচেতনতা (ইহতিমাম), উপলব্ধি (তায়াক্কু), পরীক্ষা-নিরীক্ষা (তাহাব্বত) এবং তাসাব্বুর। এর পরেই আসে রিদ্বা। আর এটিই আত্মিক উন্নতির শিখর... তিনটি বিষয়ে সবর প্রদর্শন করতে হয়: ১) গুনাহ থেকে সবর, ২) আল্লাহর আনুগত্যে লেগে থাকার ব্যাপারে সবর, ৩) বিপদ-আপদের মুখে সবর। অনুরূপ, ইবনুল কাইয়্যিম, মাদারিজুস সালিকীন: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৬২-১৬৫
২০৬ রিদ্বা : হতাশা ও বিরক্তির বিপরীত। জুরানি একে বলেছেন তাকদীর কার্যকর হতে দেখে হৃদয়ে আনন্দ লাভ করা। ইবনুল কাইয়্যিম, মাদারিজ: খণ্ড ২, ১৮৫ পৃষ্ঠাতে উল্লেখ করেছেন যে, এটি হলো তাকদীরের ওঠা-নামায় অন্তর প্রশান্ত রাখা এবং এই বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ এতে কল্যাণকর কিছুই রেখেছেন।
বায়হাকি, শুয়াব: ২০৯-এ উল্লেখ আছে, ইবনু মাসউদ বলেন, "রিদ্বা হলো আল্লাহর অসন্তুষ্টির বিনিময়ে মানুষকে সন্তুষ্ট না করা, আল্লাহর দেওয়া রিযকের কারণে অন্য কাউকে প্রশংসা না করা, আল্লাহ যা দেননি তার জন্য অন্য কাউকে দোষারোপ না করা। কারও ইচ্ছায় আল্লাহর রিযক আসে না, আবার কেউ ইচ্ছা না করলেই তা বন্ধ হয়ে যায় না। আল্লাহ তাঁর ন্যায়বিচার ও জ্ঞানের মাধ্যমে তিনি মুক্তি ও আনন্দ রেখেছেন ইয়াকীন ও সন্তুষ্টিতে, আর দুশ্চিন্তা ও হতাশা রেখেছেন সন্দেহ ও অসন্তুষ্টিতে।”
২০৭ এই ঘটনার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। বর্ণনাকারী একজন আবিদ, পরহেজগার, তবে সকল আলিমের মতে তিনি মুরজিয়া সম্প্রদায়ের। ইমাম আবু হাতিম বলেন, "তার বর্ণনা অগ্রহণযোগ্য।" আল্লামা ইবনুল জুনাইদ বলেন, "তিনি ভুয়া হাদীস বর্ণনা করতেন।" ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল বলেন, "তিনি মুরজিয়া ছিলেন। খুব ইবাদাত করতেন। তবে হাদীস বর্ণনায় তিনি অন্যদের মত নির্ভরযোগ্য ছিলেন না।" - শর'ঈ সম্পাদক
২০৮ বুখারি: ১২৮৩-১৩০২-৭১৫৪; মুসলিম: ৬২৬; আনাস থেকে বর্ণিত।
২০৯ আহমাদ: ১৮৩২৫; নাসাঈ : ১৩০৬-১৩০৭; আম্মার ইবনু ইয়াসির এ থেকে বর্ণিত। একে সহীহ বলেছেন, ইবনু হিব্বান: ১৯৭১; হাকিম: ১৯২৩ (যাহাবি একমত); আলবানি, তাখরিজুন নাসাঈ; এবং আরনাউত।
২১০ অনুরূপ খাত্তাবি, শানুদ দু'আ: পৃষ্ঠা ১৩২
২১১ বুখারি: ১৪৬৯-৬৪৭০; মুসলিম: ১০৫৩; আবু সাইদ আল-খুদরি থেকে বর্ণিত।
২১২ তালিক বর্ণনা হিসেবে বুখারিতে উল্লেখিত। ইবনু হাজার, ফাতহ: খণ্ড ১১, ৩০৯ পৃষ্ঠায় বলেন, “আহমাদ: কিতাবুয যুহদ (১১৭)-তে এর পূর্ণাঙ্গ সূত্র উল্লেখ করেন মুজাহিদ পর্যন্ত, যিনি বলেন, "উমার বলেছেন..." এবং এটি সহীহ। এটি আরও উল্লেখ করেছেন ইবনুল মুবারাক, আয-যুহদ: ৬৩০ এবং ওয়াকি, আয-যুহদ: ১৯৮ এ।
১০ ইবনু আবু শাইবাহ, আল-ঈমান: ১৩০; ওয়াকি: ১৯৯; বায়হাকি, শুয়াব : ৪০; আবু নুয়াইম: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৭৫-৭৬; সুয়ুতি, আল-জামি: ৫১৩৬ পৃষ্ঠায় একে যঈফ বলেছেন।
২৬৪ সূরাহ আল-বাকারাহ, ২: ১৭৭
২১৫ সূরাহ আয-যুমার, ৩৯: ১০
২১৬ সূরাহ আত-তূর, ৫২: ৪৮
২১৭ সূরাহ ইউসুফ, ১২:৮৩
১১৮ অনুরূপ, তাবারি; ধৈর্য বিষয়ে ইবনুল কাইয়্যিমের বিস্তারিত আলোচনা দেখুন পরিশিষ্ট দুইয়ে।
১৯ বুখারি: ৬৪৫২; আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।
২২০ যাহাবির মতে এটি বলেছেন সুরাইহ আল-কাদি, সিয়ার: খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১০৫
২২১ মুসলিম: ২৮০৭; আনাস থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “জেনে রেখো, তুমি যা অপছন্দ করো তা ধৈর্যের মাধ্যমে সহ্য করার মধ্যে রয়েছে মহাকল্যাণ।” গুফরাহর আযাদকৃত দাস উমারের বর্ণনায় ইবনে আব্বাস থেকে অতিরিক্ত বাক্য রয়েছে,
“তুমি যদি ইয়াকীনপূর্ণ অবস্থায় সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহর জন্য আমল করতে পারো, তবে তা করো। আর যদি তা না পারো, তাহলে জেনে রেখো, তুমি যা অপছন্দ করো তা ধৈর্যের মাধ্যমে সহ্য করার মধ্যে রয়েছে মহাকল্যাণ।”১৭৯
এখানে ইয়াকীন অর্থ হলো তাকদীরের উপর ঈমান রাখা। তাঁর ছেলে আলি বিন আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস তাঁর পিতার সূত্রে যে বর্ণনা করেছেন, তাতে স্পষ্ট করে এ অর্থের উল্লেখ আছে। এতে অতিরিক্ত শব্দ রয়েছে, “আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমি কীভাবে ইয়াকীনের সাথে কাজ করতে পারি?' তিনি বললেন, 'তুমি জানবে যে, যা তোমার উপর আপতিত হয়েছে তা হওয়ারই ছিল, আর যা আপতিত হয়নি তা কিছুতেই হওয়ার ছিল না।” তবে এ বর্ণনার সনদ দুর্বল।
তাকদীরের প্রতি ইয়াকীন যখন অন্তরে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়ে যাবে, তখন এর আবশ্যক ফলাফলস্বরূপ অন্তর থাকবে ধীরস্থির ও শান্ত। এই অর্থই প্রকাশ পেয়েছে এই আয়াতে :
“পৃথিবীতে অথবা তোমাদের নিজেদের উপর এমন কোনো বিপদ আসে না, যা আমি সংঘটিত করার পূর্বে কিতাবে লিপিবদ্ধ রাখিনি। এটি (করা) আল্লাহর জন্য খুবই সহজ। এটা এ জন্য যে, তোমাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য তোমরা যেন হতাশাগ্রস্ত না হও। আর তোমাদের যা দান করা হয়েছে, তার জন্য তোমরা যেন উৎফুল্ল না হও। কেননা, আল্লাহ অহংকারী ও অধিক গর্বকারীকে পছন্দ করেন না।”১৮০
এই আয়াতের তাফসীরে দাহহাক বলেন, “তিনি তাদের মনোবল দৃঢ় করলেন, যাতে 'তোমাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য তোমরা যেন হতাশাগ্রস্ত না হও। অতএব দুনিয়াবি জিনিসের জন্য দুঃখ কোরো না। কারণ, আমি তা তোমার জন্য নির্ধারণই করিনি।' আর 'তোমাদের যা দান করা হয়েছে, তার জন্য তোমরা যেন উৎফুল্ল না হও। সেসব দুনিয়াবি জিনিসের জন্য অহংকারী হবে না যা তোমাদের দেওয়া হয়েছে, কারণ তা কখনোই আটকে রাখার ছিল না।” বর্ণনাটি ইবনু আবিদ্দুনিয়া-এর সূত্রে এসেছে।
সাইদ ইবনু যুবাইর এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ""তোমাদের যা দান করা হয়েছে' অর্থাৎ দুনিয়াবি প্রাচুর্য। কারণ, তুমি তো জানোই তোমার সৃষ্টির আগে থেকেই এটি নির্ধারিত ছিল।” ইবনু আবি হাতিম এটি বর্ণনা করেছেন।
এর আলোকেই একজন সালাফ বলেছিলেন, “তাকদীরের প্রতি ঈমান দুশ্চিন্তা ও হতাশা দূর করে দেয়।” নবীজি এ দিকে ইঙ্গিত দিয়েছেন এই হাদীসের মাধ্যমে :
"যা কিছু তোমার উপকার করবে, তা কামনা করো এবং আল্লাহর সাহায্য চাও। আর নিরাশ হোয়ো না। কোনো বিপদ ঘটলে বলবে না, 'ইশ! আমি যদি অমুক কাজটা না করতাম!' বরং বলো, 'আল্লাহ তা নির্ধারণ করেছেন। তিনি যা চেয়েছেন, তা-ই করেছেন।' 'যদি' শয়তানের কুমন্ত্রণার দুয়ার খুলে দেয়।”১৮১
অর্থাৎ, বিপদের সময় মানুষ যদি তাকদীরের প্রতি ঈমানের কথা স্মরণ করে, তাহলে শয়তানের ওয়াসওয়াসার মাধ্যমে আর দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।
আনাস বলেন, "আমি দশ বছর নবীজি -এর খেদমত করেছি। কখনো তিনি আমাকে বলেননি, 'এটা কেন করলে?' 'ওটা করলে না কেন?”১৮২ তিনি বলেন, “তাঁর পরিবারের কেউ যদি আমাকে বকা দিত, তিনি বলতেন, 'বাদ দাও। কোনো কিছু তাকদীরে থাকলে তা হবেই।” অতিরিক্ত শব্দসহ হাদীসটি ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন। ১৮৩
ত্রুটিপূর্ণ এক সনদে ইবনু আবিদ্দুনিয়া থেকে বর্ণিত হয়েছে, আয়িশা বলেন, “নবীজি ঘরে ফিরলে সবচেয়ে বেশি যে কথাটি বলতেন তা হলো, 'আল্লাহ যা কিছু বিষয় নির্ধারিত রেখেছেন তা ঘটবেই।” এ ছাড়া আরেকটি মুরসাল বর্ণনায় আছে, নবীজি ইবনু মাসউদ-কে বলেন,
"বেশি দুশ্চিন্তা করবে না। আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন, তা ঘটবেই। যে রিযক তোমার জন্য আছে, তা আসবেই।”১৮৪ আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেন, “লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ১৮৫ (বলা) হলো নিরানব্বইটি রোগের আরোগ্য, যার সবচেয়ে কমটি হলো দুশ্চিন্তা।”১৮৬
এই কথার বাস্তবায়নের আবশ্যক ফলাফল হলো আল্লাহর কাছে সকল বিষয় ন্যস্ত করে এই বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ না চাইলে কোনো কিছুই ঘটবে না। এর উপর ঈমান দুশ্চিন্তা ও হতাশা দূর করে দেয়। নবীজি এক ব্যক্তিকে উপদেশ দিয়ে বলেন,
“আল্লাহ তোমার জন্য নির্ধারণ করে রেখেছেন এমন কোনো কিছুর জন্য আল্লাহকে গালিগালাজ করবে না।”১৮৭
বান্দা যখন আল্লাহর তাকদীরের মাধ্যমে তাঁর হিকমাহ ও রহমতের বিষয়টি বুঝতে পারে, সে বুঝতে পারে যে, তাকদীরের জন্য আল্লাহকে তিরস্কার করা সমীচীন নয়। সে আল্লাহর নির্ধারিত বিষয়ে সন্তুষ্টি বোধ করবে। আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা বলেন:
"আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদ আসে না। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, আল্লাহ তার অন্তরকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন..."১৮৮
এর তাফসীরে আলকামাহ বলেন, "মানুষের উপর আসা বিপদের কথা এখানে বলা হচ্ছে। কিন্তু সে জানে যে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে। তাই সে তা মেনে নেয় এবং সন্তুষ্ট থাকে।”
এক সহীহ হাদীসে আছে,
"আল্লাহ মুমিনের জন্য যা-ই নির্ধারণ করেন, তা তার জন্য কল্যাণকর। সে যদি ভালো অবস্থায় থাকে, তাহলে সে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে এবং তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি খারাপ অবস্থায় পড়ে, তাহলে সে ধৈর্যধারণ করে এবং তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। কেবল মুমিনের জন্যই এ বিষয়টি সত্য。”১৮৯
"বলে দাও, 'আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারণ করেছেন তা ছাড়া অন্য কিছুই আমাদের ঘটবে না, তিনিই আমাদের রক্ষক, আর আল্লাহর উপরই মুমিনদের ভরসা করা উচিত।' বলো, 'তোমরা আমাদের জন্য যে জিনিসের অপেক্ষা করছ, তা দুটো ভালোর একটি ছাড়া আর কিছুই না...'”১৯০
এখানে আল্লাহ আমাদের জানাচ্ছেন যে, তাঁর নির্ধারিত বিষয় ছাড়া মুমিনদের আর কিছুই হবে না। এ থেকে বোঝা যায় সেই বিষয়টি সহজ বা কঠিন যা-ই হোক, একই কথা। তারপর তিনি জানাচ্ছেন যে, তিনি তাদের রক্ষক। তাঁকে যারা রক্ষক হিসেবে গ্রহণ করেছে, তাদের তিনি ছেড়ে যাবেন না। নিশ্চয়ই তিনি তাদের কল্যাণ করার দায়িত্ব নেবেন:
“জেনে রেখো, আল্লাহই তোমাদের অভিভাবক, কতই-না উত্তম অভিভাবক! কতই-না উত্তম সাহায্যকারী! ১৯১
“তোমরা আমাদের জন্য যে জিনিসের অপেক্ষা করছ, তা দুটো ভালোর একটি ছাড়া আর কিছুই না... "১৯২
তিরমিযিতে আনাস থেকে বর্ণিত আছে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
“আল্লাহ যখন কোনো জাতিকে ভালোবাসেন, তখন তাদের পরীক্ষায় ফেলেন। যে কেউ সন্তুষ্ট থাকে, সে সন্তুষ্টি লাভ করবে। আর যে কেউ অসন্তুষ্ট হয়, সে অসন্তুষ্টি লাভ করবে।”১৯৩
আবুদ্দারদা (রাঃ) বলেন, “আল্লাহ কোনো কিছু নির্ধারণ করলে বান্দা এর প্রতি সন্তুষ্ট থাকলে আল্লাহ খুশি হন।” উন্মুদ্দারদা (রাঃ) বলেন, “যারা আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরের ব্যাপারে সন্তুষ্ট, তারাই সত্যিকারের প্রশান্তচিত্ত। কিয়ামাতের দিন তারা জান্নাতে এমন স্থান লাভ করবে, যা দেখে শহীদরাও হিংসা করবেন।”
ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন, “আল্লাহ তাঁর ন্যায়বিচার ও জ্ঞানের মাধ্যমে ইয়াকীন ও সন্তুষ্টির মাঝেই আনন্দ রেখেছেন। আর সংশয় ও অসন্তুষ্টির মাঝে রেখেছেন দুশ্চিন্তা আর অস্থিরতা।” নবীজি (ﷺ)-এর একটি হাদীস হিসেবেও কথাটি বর্ণিত আছে, তবে তার সনদ দুর্বল।
উমার বিন আব্দুল আযিয (রাঃ) বলতেন, “এই দু’আগুলো আমার জন্য আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার নির্ধারিত তাকদীরের প্রতি আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কোনো প্রয়োজনই বাকি রাখেনি।” তিনি এই দু’আগুলো খুব বেশি বেশি করতেন, “হে আল্লাহ, আমাকে আপনার তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট রাখুন। আমাকে আপনার তাকদীরে এত বারাকাহ দিন, যাতে আমি এমন বিষয়ে বিলম্ব কামনা না করি, যা আপনি দ্রুত দেবেন এবং যা বিলম্বে দেবেন তাতে তাড়াহুড়া না করি।”১৯৪
ইবনু আওন (রাঃ) বলেন,
"স্বাচ্ছন্দ্য ও কাঠিন্য উভয় অবস্থায় আল্লাহর তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকো। এতে তোমার অস্থিরতা কমবে এবং আখিরাতের জন্য লাভজনক হবে। জেনে রেখো, বান্দা ততক্ষণ সত্যিকারের সন্তুষ্টি লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তার দরিদ্র অবস্থার সন্তুষ্টি সচ্ছলতার অবস্থার সন্তুষ্টির সমান হচ্ছে। আল্লাহর ইচ্ছেকে নিজের কামনা-বাসনার বিপরীত দেখতে পেয়ে কী করে তুমি অসন্তুষ্ট হতে পারো? অথচ তুমি আল্লাহকে তোমার অবস্থার দেখভাল করার অনুরোধ করেছ। এমনটা হতেই পারে যে, তোমার ইচ্ছামতো সবকিছু হলে তুমি ধ্বংস হয়ে যেতে। অথচ আল্লাহর নির্ধারিত বিষয় তোমার ইচ্ছের সাথে মিললে তুমি খুশি হয়ে ওঠো। উভয় অবস্থার কারণ হলো গায়েবের ব্যাপারে তোমার নিতান্ত অজ্ঞতা। এই অবস্থা নিয়ে
বিচারদিবসে যাওয়ার সাহস হয় কী করে! তুমি নিজের প্রতি সদ্ব্যবহার করোনি, সন্তুষ্টির সঠিক মাত্রায়ও পৌঁছতে পারোনি।”
চমৎকার কিছু কথা। এর অর্থ হলো যে, বান্দা যখন আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার কাছে কোনো বিষয়ে ফায়সালা করে দেওয়ার দু'আ (ইস্তিখারা) করে, তখন আল্লাহ যে সিদ্ধান্তই দিন তাতে তার সন্তুষ্ট থাকতে হবে-পছন্দ হোক বা না হোক। কারণ, সে তো জানেই না কোন অবস্থায় তার কল্যাণ রয়েছে। আর আল্লাহ যা নির্ধারণ করেন, তার জন্য তিনি তিরস্কারযোগ্য নন। আল্লাহ যা নির্ধারণ করবেন, এতে সন্তুষ্ট হওয়ার মতো মনোবল নেই, এমন মানুষদের এ কারণেই ইস্তিখারার দু'আয় 'সকল কল্যাণকর অবস্থায়' কথাটি যোগ করার পরামর্শ দিতেন ইবনে মাসউদ১৯৫ সহ কিছু সালাফ। অন্যথায় সে এমন ফিতনায় পতিত হতে পারে, যাতে সে উত্তীর্ণ হতে পারবে না। এ কথাটি নবীজি -এর হাদীস হিসেবেও বর্ণিত হয়েছে। তবে তার সনদ দুর্বল। ১৯৬
সাদ থেকে বর্ণিত, রাসূল বলেন, "বান্দার সৌভাগ্য হলো আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার কাছে সিদ্ধান্ত চাওয়ার পর তাঁর প্রদান করা সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকতে পারা। আর বান্দার দুর্ভাগ্য হলো আল্লাহর সিদ্ধান্ত চাওয়া পরিত্যাগ করা আর তিনি যা নির্ধারণ করেন, তাতে অসন্তুষ্ট হওয়া।” হাদীসটি তিরমিযি ও অন্যান্য কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। ১৯৭
তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্টি অর্জনের অনেক উপায় আছে:
১. আল্লাহর প্রতি বান্দার দৃঢ় ইয়াকীন থাকা যে, তিনি মুমিনের জন্য যা নির্ধারণ করেন তা-ই কল্যাণকর। সে যেন দক্ষ ডাক্তারের কাছে নিজেকে সমর্পণ করা রোগী। ডাক্তারের পথ্য তার ব্যথার উদ্রেক করুক বা না করুক, সে সন্তুষ্টই থাকবে। কারণ, সে জানে যে, ডাক্তার তাকে সর্বাধিক কল্যাণকর পথ্যই দিচ্ছেন। ইবনে আওল তাঁর উক্তিতে এর কথাই বলেছেন।
২. সন্তুষ্টির বিনিময়ে আল্লাহ যে প্রতিদান দেওয়ার ওয়াদা করেছেন, তা স্মরণ করা। বান্দা এটি নিয়ে চিন্তায় এমনই মগ্ন হয়ে যেতে পারে যে, বাকি সব ব্যথা সে
ভুলেই যাবে। সালাফদের মধ্যে একজন নারী পড়ে যান, এতে তাঁর পায়ের নখ ভেঙে যায়। তিনি হেসে উঠে বলেন, “তাঁর কাছে এর যে প্রতিদান তা ভেবে আমি ব্যথার তিক্ততা ভুলে গেছি।”
৩. যেই সত্তা বিপদ পাঠান, তাঁর ভালোবাসায় নিজেকে মগ্ন করে ফেলা। তাঁর অসীম প্রাচুর্য, মহত্ত্ব, সৌন্দর্য, ত্রুটিহীনতা নিয়ে চিন্তা করা। এমন সচেতনতার ফলে এমন অবস্থা সৃষ্টি হবে যে, ইউসুফ (আঃ)-কে দেখে মিসরের নারীদের হাত কাটার ব্যাথা ভুলে যাওয়ার**১৮৮** মতো করেই বান্দা ব্যাথা ভুলে যাবে। পূর্বে বর্ণিত অবস্থার চেয়ে এটি আরও উচ্চতর পর্যায়।
জুনাইদ (রহঃ) বলেন তিনি সিররি (রহঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, প্রেমিক বিপদের ব্যাথা অনুভব করেন কি না। তিনি জবাব দিয়েছিলেন, “না।” এ কথার মাধ্যমে তিনি এই উচ্চতর পর্যায়ের কথা বলছেন। এ কথার আলোকেই বিপদে পতিত একদল মানুষ বলেছিলেন, “তিনি (আল্লাহ) আমাদের সঙ্গে যা করতে চান, তা-ই করুন। এমনকি তিনি যদি আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একটি একটি করে কেটে ফেলতেন, এতে তাঁর প্রতি আমাদের ভালোবাসাই কেবল বাড়ত।”
তাঁদের মধ্যে একজন বলেছেন: প্রেমের আতিশয্য যদি টুকরো টুকরো করে কাটে আমায়, আমার ভালোবাসা বৃদ্ধি ছাড়া তাতে কিছুই হতো না হায়। আমি হয়ে থাকব ভালোবাসার কাছে বন্দী, তব সন্তুষ্টির খোঁজেই পৌঁছে যাব জীবনসন্ধি।
ইবরাহীম ইবনু আদহাম (রহঃ) তাঁর সম্পত্তি, সম্পদ, সন্তান ও দাসদের ছেড়ে গিয়েছিলেন। তাওয়াফ করার সময় তিনি তাঁর পুত্রকে দেখতে পান, কিন্তু তাঁর সাথে কথা বলেননি। তিনি বলেন: সবকিছু থেকে হিজরত করেছি তোমাকে পাবার আশায় অধীনস্থদের ছাড়িয়া এসেছি তোমাকে দেখার নেশায়। তুমি আমায় টুকরো করলেও বেড়েই চলব ভালোবাসায়।
আল্লাহর এমনই একদল প্রেমিক ছিলেন ফুদাইল ও ফাতহুল মাওসিলির মতো ব্যক্তিরা। তাঁরা যদি এমন অবস্থায় ঘুমোতে যেতেন যে, রাতের খাবার খাওয়া হয়নি বা জ্বালানোর মতো কুপি পাওয়া যায়নি, তাহলে তাঁরা আনন্দে কান্না করতেন।
শীতকালে ফাতহ তাঁর পরিবারকে জড়ো করে নিজের চাদর দিয়ে তাদের ঢেকে নিয়ে বলতেন,
“(হে আল্লাহ) আপনি আমাকে ক্ষুধার্ত রেখেছেন, তাই আমি আমার পরিবারকে ক্ষুধার্ত রেখেছি। আপনি আমাকে খ্যাতিহীন করেছেন, তাই আমি আমার পরিবারকে খ্যাতিহীন করেছি। এমনটা আপনি আপনার প্রিয় বান্দাদের সাথেই করে থাকেন, আমি কি তাদের একজন? আমার কি আনন্দিত হওয়া উচিত নয়?”১৯৯
একজন সালাফ অসুস্থ ছিলেন। তাঁরা তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার কি কিছু লাগবে?” তিনি বলেন, "তাঁর (আল্লাহর) কাছে যা সবচেয়ে প্রিয়, আমার কাছেও তা-ই প্রিয়।”২০০
এর আলোকে একজন বলেছিলেন:
আপনার শান্তি মধুর, যার থেকে দূরত্বও নিকট সমধিক, আপনি আমার প্রাণেরই মতো, বরং তার চেয়ে অধিক। এটাই আমার জন্য যথেষ্ট, যাতে তুমি তুষ্ট, তাতে আমিও তুষ্ট।
আবুত্তুরাব এই চরণগুলো রচনা করেছেন :
বিভ্রান্ত হোয়ো না কেউ, প্রেমিকেরও তো চিহ্ন আছে, নির্দিষ্ট পথে উপহার পাঠায় সে প্রেমাস্পদের কাছে। রবের দেওয়া বিপদে তুষ্ট, তিনি যা করেন তায় খুশি, তাঁর দেওয়া দারিদ্র্যই প্রাচুর্য, বরং তার চেয়েও বেশি।
তাঁরা এক ব্যক্তির কাছে গেলেন, যার ছেলে জিহাদে শহীদ হয়েছে। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, "আমি পুত্রশোকে কাঁদছি না। তরবারির আঘাত পাওয়ার সময় আল্লাহর প্রতি সে কতই-না সন্তুষ্ট ছিল, তা ভেবেই কাঁদছি।”
তারা যদি মোর মৃত্যুই চায়, সেটাই হোক না তবে! আল্লাহ যা চান, সেটা না হওয়া আমি চেয়েছি কবে?
মূলকথা হলো, রাসূল ﷺ চেয়েছেন ইবনে আব্বাস যেন সামর্থ্য থাকলে সন্তুষ্ট অবস্থায় আমল করেন। যদি সামর্থ্য না থাকে, তিনি বলেন, “যদি তা না পারো, তাহলে জেনে রেখো, তুমি যা অপছন্দ করো তা ধৈর্যের মাধ্যমে সহ্য করার মধ্যে রয়েছে মহাকল্যাণ।” এ থেকে বোঝা যায়, যেসব নির্ধারিত বিষয় সহ্য করা কঠিন, তাতে পুরোপুরি সন্তুষ্ট থাকা আবশ্যক নয়, তবে অত্যন্ত উত্তম। যে সন্তুষ্ট হতে পারে না, তাকে অবশ্যই ধৈর্যশীল হতে হবে। ধৈর্য আবশ্যক। এর ফলে মহাকল্যাণ আসে। আল্লাহ তা'আলা ধৈর্যের আদেশ দিয়েছেন এবং এর জন্য বিশাল পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন,
"... আমি ধৈর্যশীলদের তাদের পুরস্কার অপরিমিতভাবে দিয়ে থাকি।”২০১
"...ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দান করো। নিশ্চয়ই যারা বিপদকালে বলে থাকে, 'আমরা আল্লাহরই, আর আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী।' এদের প্রতিই রয়েছে তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অনুগ্রহ ও করুণা। আর এরাই হিদায়াতপ্রাপ্ত।”২০২
"...সুসংবাদ দাও সেই বিনীতদের, 'আল্লাহ' নামের উল্লেখ হলেই যাদের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে, যারা তাদের বিপদে-আপদে ধৈর্যধারণ করে..."২০৩
আল-হাসান বলেন, “সন্তুষ্টির অবস্থা বিরল। তবে ধৈর্য হলো মুমিনের আশ্রয়।”২০৪ সুলাইমান আল-খাওয়াস বলেন, “ধৈর্যের মর্যাদা সন্তুষ্টির নিচে। সন্তুষ্ট ব্যক্তির অবস্থা এই যে, বিপদ আসুক বা না আসুক, সে সন্তুষ্ট। আর ধৈর্য হলো বিপদ আসার পর অবিচলভাবে তা সহ্য করা।”
সন্তুষ্টি আর ধৈর্যের মাঝে পার্থক্য আছে। ধৈর্য হলো বিপদ দেখতে পাওয়ার পর অসন্তুষ্ট হওয়া থেকে আত্মাকে লাগাম পরানো।২০৫ আর সন্তুষ্টি হলো যেকোনো অবস্থায়ই যা হচ্ছে, তা মেনে নেওয়া। সন্তুষ্টির কারণে ব্যথা কমে যায়, এমনকি একদমই শূন্য হয়ে যেতে পারে। কারণ, অন্তর তখন ইয়াকীন ও জ্ঞানের কোমল পরশ পেয়ে গেছে। ২০৬
উমার বিন আব্দুল আযীয, ফুদাইল, আবু সুলাইমান, ইবনুল মুবারাকসহ অনেক সালাফ তাই বলতেন, “সন্তুষ্ট ব্যক্তি বর্তমানে যেই অবস্থায় আছে, সেটা ছাড়া আর অন্য কিছু কামনাই করে না। কিন্তু ধৈর্যশীল ব্যক্তি (অবস্থার পরিবর্তন) কামনা করে।” অনেক সাহাবাগণের থেকেও এ রকম সন্তুষ্টির অবস্থার বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন: উমার , ইবনে মাসউদ প্রমুখ।
আব্দুল আযীয ইবনে আবু রুওওয়াদ বলেন, “বানী ইসরাঈলের এক আবেদ ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখানো হলো, অমুক মহিলা জান্নাতে তাঁর স্ত্রী হবে। তিনি সেই নারীর বাসায় তিন দিনের জন্য গেলেন, যাতে তিনি কী আমল করেন তা জানা যায়। কিন্তু রাতে পুরুষটি যখন সালাত পড়তেন, নারীটি ঘুমাতেন। পুরুষটি যেদিন সিয়াম রাখতেন, নারীটি খাওয়া-দাওয়া করতেন। চলে যাওয়ার সময় তিনি নারীটিকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনার কোন আমলটি আপনার কাছে সেরা মনে হয়?' নারীটি বললেন, 'আপনি আমাকে যা করতে দেখেছেন, তার চেয়ে বেশি আমি কিছুই করি না। কিন্তু আমি যখন কষ্টে থাকি, তখন স্বাচ্ছন্দ্য কামনা করি না। যখন অসুস্থ থাকি, তখন সুস্বাস্থ্য কামনা করি না। যখন ক্ষুধার্ত থাকি, তখন ভরপেট হওয়া কামনা করি না। যখন রোদে থাকি, তখন ছায়া কামনা করি না।' লোকটি বললেন, 'আল্লাহর কসম! এই গুণ তো বান্দাদের আয়ত্তের বাইরে।”২০৭
বিপদের প্রথম আঘাতেই ধৈর্যধারণ করতে হয় বলে নবীজির সহীহ হাদীসে এসেছে।২০৮ আর বিপদ ভোগ করতে থাকা অবস্থায় সন্তুষ্টি প্রদর্শন করতে হয়। যেমনটি নবীজি ﷺ দু'আ করতেন, “তাকদীরের লিখন সংঘটিত হয়ে যাবার পর আমি আপনার নিকট সন্তুষ্ট থাকার সামর্থ্য চাই।”২০৯ কারণ, বিপদ আসার আগে বান্দা সহজেই সন্তুষ্ট থাকতে পারে। কিন্তু বিপদ আসার পর তার অবস্থা একদম বিপরীত হয়ে যেতে পারে। নির্ধারিত বিপদ চলে আসার পর যে সন্তুষ্টি প্রদর্শন করে, সে-ই সত্যিকারের সন্তুষ্ট। ২১০
সারকথা হলো, ধৈর্যধারণ আবশ্যক। ধৈর্যের সীমানার বাইরেই থাকে অসন্তুষ্টি। যে কেউ আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরের ব্যাপারে অসন্তুষ্ট, তার পরিণাম হবে আল্লাহর অসন্তুষ্টি। তার উপর তার নিজের অসন্তুষ্টির চেয়ে বেশি হবে বিপদের স্বাদ আর শত্রুদের পক্ষ থেকে আসা ক্ষতি। একজন সালাফ বলেছেন:
কোনো দুর্ঘটনায় হোয়ো না হতাশ শত্রুকে ধরতে দিয়ো না তোমার রাশ ধৈর্যের মাধ্যমেই দেখতে পাবে আশ, দৃঢ়পদ থাকো যখন শত্রু-সঙ্গে হয় নিবাস।
নবীজি বলেন, “যে নিজের মাঝে ধৈর্য স্থাপন করে, আল্লাহ তাকে ধৈর্য দান করেন। ধৈর্যের চেয়ে বড় ও ব্যাপক উপহার আর কাউকে কখনো দেওয়া হয়নি।” ২১১
উমার বলেন, "আমাদের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সময় ছিল ধৈর্যধারণের দিনগুলো।” ২১২ আলি বলেন, "ঈমানের সাথে ধৈর্যের সম্পর্ক দেহের সাথে মাথার সম্পর্কের মতো। যার ধৈর্য নেই, তার ঈমানই নেই।” ১১৩
আল-হাসান বলেন, “ধৈর্য হলো জান্নাতি এক নিয়ামাত। আল্লাহ কেবল সম্মানিতদেরই তা দান করেন।” মায়মুন ইবনু মিহরান বলেন, “নবী বা অন্য কেউই কখনো ধৈর্যধারণ না করে কোনো কল্যাণ লাভ করতে পারেননি।” ইবরাহীম আত-তাইমী বলেন, “আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার উপর ঈমানের পর বান্দাকে সবচেয়ে বড় যে নিয়ামাত আল্লাহ দিয়েছেন, তা হলো ক্ষতির সময় ধৈর্য, পরীক্ষার সময় ধৈর্য, বিপদের সময় ধৈর্য।” তিনি এ কথা বলেছেন এই আয়াতের ভিত্তিতে :
"বরং কল্যাণ আছে এতে যে, কোনো ব্যক্তি ঈমান আনবে আল্লাহ, শেষ দিবস, ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ ও নবীগণের উপর এবং আল্লাহর ভালোবাসার্থে ধন-সম্পদ আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম-মিসকীন, মুসাফির ও যাজ্ঞাকারীদের এবং দাসত্বজীবন হতে নিষ্কৃতি দিতে দান করবে এবং সালাত কায়েম করবে ও যাকাত প্রদান করবে, প্রতিশ্রুতি দানের পর স্বীয় প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবে এবং অভাবে, দুঃখ-ক্লেশে ও সংকটে ধৈর্যধারণ করবে। এ লোকেরাই সত্যপরায়ণ আর এ লোকেরাই তাকওয়াবান।” ২১৪
উমার বিন আব্দুল আযীয বলেন,
“আল্লাহ যদি কাউকে কোনো নিয়ামাত দিয়ে তা ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে তার বদলে শুধু ধৈর্য দান করেন, তাহলে যা দেওয়া হলো তা ছিনিয়ে নেওয়া বস্তুর চেয়ে উত্তম।” তারপর তিনি তিলাওয়াত করেন:
"... আমি ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান অপরিমিতভাবে দিয়ে থাকি।”২১৫
একজন সালাফের পকেটে সব সময় একটি কাগজের টুকরা থাকত। সময়ে সময়ে তিনি তা বের করে পড়তেন। তাতে লেখা ছিল,
“তুমি ধৈর্যধারণ করে তোমার প্রতিপালকের হুকুমের অপেক্ষায় থাকো, কারণ তুমি তাঁর দৃষ্টির সামনেই আছো..."২১৬
সুন্দর ধৈর্য হলো বিপদের কথা বান্দার নিজের কাছে রাখা আর কাউকে এ বিষয়ে না বলা।
"ধৈর্যই উত্তম।”২১৭
একদল সালাফ এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, এর অর্থ হলো কোনো অভিযোগ ছাড়াই ধৈর্যধারণ করা। ২১৮
আহনাফ ইবনু কায়স ؒ চল্লিশ বছর ধরে অন্ধ ছিলেন, কিন্তু তিনি এর কথা কাউকে বলেননি। আব্দুল আযীয ইবনু আবু রুওওয়াদ-এর এক চোখ বিশ বছর যাবৎ অন্ধ ছিল। তাঁর ছেলে একদিন ভালো করে দেখে বললেন, “বাবা, আপনার এক চোখ অন্ধ।” তিনি বললেন, “গত বিশ বছর ধরে আমি এ নিয়ে আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট আছি।” ইমাম আহমাদ ؒ অসুস্থ হলে তা নিয়ে কখনো কোনো অভিযোগ করতেন না। তাঁকে যখন জানানো হলো যে অসুস্থ অবস্থায় মুজাহিদ ؒ গোঙানো অপছন্দ করতেন, তখন তিনি মৃত্যু পর্যন্ত এ কাজ ত্যাগ করেন। তিনি নিজেকে বলতেন, "ধৈর্য ধরো, না হলে পস্তাতে হবে।"
এক জ্ঞানী ব্যক্তি এক রোগীর কাছে গিয়ে দেখলেন সে উহ আহ করছে। তিনি মনে করিয়ে দিলেন, “এটি (রোগ) কার দেওয়া?” তাঁদের একজন বলতেন:
শরীর তো আমার অসুস্থতায় জর্জরিত, তবু দর্শনার্থীদের কাছে রাখে লুক্কায়িত। প্রিয়তমের তাকদীরে যদি অসন্তুষ্ট হয়, তাহলে তো নফস সুবিচারকারী নয়।
ইয়াহইয়া ইবনু মুয়ায বলেন,
"তুমি যদি তোমার রবকে ভালোবাসো আর তিনি তোমার জন্য ক্ষুধা ও বস্ত্রের অভাব নির্ধারণ করেন, তোমার উপর ফরয হলো এটি সহ্য করা এবং মাখলুকদের কাছ থেকে তা লুকানো। প্রেমিক তো বিনা অভিযোগে প্রেমাস্পদের থেকে পাওয়া কষ্ট সহ্য করে। তাহলে মাখলুকের কাছে তুমি এমন জিনিস নিয়ে কেন অভিযোগ করবে, যা সে তোমাকে দেয়ইনি?"
কবি বলেন, আপনি ছাড়া সকলের কাজ আমার ঘৃণায় খণ্ডিত, আপনার হতে যা কিছু আসে তা-ই সৌন্দর্যমণ্ডিত।
নবীজি ও সাহাবাগণ ক্ষুধার তাড়নায় পেটে পাথর বাঁধতেন। ১৯
উয়াইস ময়লার স্তূপ থেকে ভাঙা হাড্ডি জড়ো করতেন আর তাঁর আশপাশে কুকুররাও তা-ই করত। একবার এক কুকুর তাঁকে দেখে ঘেউ ঘেউ করে উঠল। তিনি বললেন, “কুকুর, যে তোমার ক্ষতি করে না, তুমিও তার ক্ষতি করো না। তোমার কাছে যা আছে, তা তুমি খাও। আমার কাছে যা আছে, তা আমি খাই। আমি যদি জান্নাতে যাই, আমি তোমার চেয়ে উত্তম হব। আর আমি যদি জাহান্নামে যাই, তুমি আমার চেয়ে উত্তম হবে।”
ইবরাহীম ইবনু আদহাম গরিবদের সাথে শস্যের অঙ্কুর কুড়াতেন। যখন তিনি টের পেলেন গরিবরা তাদের সাথে তাঁর এ প্রতিযোগিতা পছন্দ করছে না, তখন তিনি ভাবলেন, “আমি কি বালখ অঞ্চলে সম্পদ ফেলে এলাম গরিবদের সাথে শস্যদানা কুড়ানোর প্রতিযোগিতা করতে?” তারপর থেকে তিনি কেবল পশুরা যেসব মাঠে চড়ত, সেখান থেকেই শস্য কুড়াতেন।”
ইমাম আহমাদ গরিবদের সাথে শস্য কুড়াতেন। সুফিয়ান আস-সাওরি মক্কায় যাওয়ার পথে একবার দুটি উটের দেখাশোনার চাকরি নিয়েছিলেন। তিনি কিছু লোকের জন্য রান্নার দায়িত্ব ছিলেন। তিনি এত বাজে রান্না করতেন যে, লোকেরা তা খেয়ে তাঁকে প্রহার করত। ফাতহুল মাওসিলি টাকার বিনিময়ে কিছু মানুষের জন্য আগুন জ্বালানোর কাজ করতেন।
ভূমি দিয়ে এলাম আমি আপনার ওয়াস্তে আমার শত্রু হিংসুকদের হস্তে।
হে রব, কতদিন পাব নেক নজর তোমার? জীবন শেষ হতে চলল, প্রয়োজন ফুরোয়নি আমার।
আরেকজন সালাফ বলেছেন: তোমার রহমতের খোঁজে সয়েছি অনেক দুঃখ-যাতনা অনেক ধৈর্য ধরেছি আমি অনেক কষ্ট-যাজ্ঞা। ছেড়ে যেয়ো না আমায় পারব না আমি তোমায় ছাড়া পারিশ্রমিক চাও যদি আমার প্রাণটি নাও সারা। তোমার সন্তুষ্টিকে আমি বেসেছি অনেক ভালো, হৃদয় আকুল, কণ্ঠ রুদ্ধ অশ্রুতে টলোমলো। আপনার প্রেমে সকল বিপদ হয়ে যায় সহ্য আমার, বিপদে যে কখনো পড়েনি তার সুখ কী আবার?
তাঁদের দৃষ্টিতে দুনিয়াবি কষ্ট হলো নিয়ামাত। তাঁদের একজন বলতেন, “সত্যিকার বিচারক তো সে-ই, যে বিপদকে দেখে নিয়ামাত হিসেবে আর স্বাচ্ছন্দ্যকে ভাবে দুর্ভাগ্য।” এক ইসরাঈলী বর্ণনায় আছে, "যদি কোনো প্রাচুর্যশালীকে আসতে দেখো, তাহলে বলো, 'কোনো এক পাপের অগ্রীম শাস্তি!' যদি কোনো দরিদ্রকে আসতে দেখো, তাহলে বলো, 'নেককারের নিদর্শন, স্বাগতম!”২২০
একজন সালাফ বলেছেন,
"আমি কোনো দুনিয়াবি বিপদে পড়লে চারবার আল্লাহর প্রশংসা করি। বিপদ এর চেয়েও খারাপ না হওয়ার কারণে, আমাকে বিপদ সহ্য করার শক্তি দেওয়ার কারণে, আমাকে 'ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' বলার শক্তি প্রদানের কারণে, আমাকে দ্বীনের ক্ষেত্রে কোনো বিপদে না ফেলার কারণে।"
ধৈর্যের মাধ্যমে মুক্তি কামনা করা ইবাদাতের একটি প্রকার। কারণ, বিপদ কখনোই চিরস্থায়ী হয় না।
ধৈর্য ধরে বিপদ সহ্য করো, হে হৃদয়। জেনো বিপদ কভু চিরস্থায়ী না হয়। ধৈর্য ধরো মহান ব্যক্তিদের মতো করেই, বিপদ তো আজকে আছে, কালকে নেই।
পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্দশাগ্রস্ত লোকটিকে জান্নাতে একটু ঢুকিয়ে আবার বের করে এনে জিজ্ঞেস করা হবে, "তুমি কি কখনো বিপদ দেখেছ? বিপদ ভোগ করেছ?” সে বলবে, “না, ইয়া রব্ব!”২২১
হে আত্মা, আর মাত্র কয়েকটা দিন, এরা তো স্বপ্নের মতো স্থায়িত্বহীন। হে আত্মা, পৃথিবী তাড়াতাড়ি পার করে দাও, আসল জীবন তো সামনে, তার দিকেই যাও।
আরেকজন বলেছেন: একটি মাত্র ঘণ্টার ব্যাপার, তারপরই তা নেই, এ সবই ক্ষণস্থায়ী, সব হারিয়ে শেষে যাবেই।

টিকাঃ
১৭৯ আবু নুয়াইম: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩১৪
১৮০ সূরাহ আল-হাদীদ, ৫৭: ২২-২৩
১৮১ মুসলিম: ২৬৬৪; আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।
১৮২ বুখারি: ২৭৬৮-৬০৩৮-৬৯১১; মুসলিম: ২৩০৯
১৮৩ আহমাদ: ১৩৪১৮; বায়হাকি, শুয়াব: ৮০৭০; বুখারি ও মুসলিমের শর্তানুযায়ী এর ইসনাদ গ্রহণযোগ্য। অনুরূপ, আরনাউত, তাখরিজ মুসনাদ।
১৮৪ বায়হাকি, শুয়াব: ১১৮৮; ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ, আল-ইসাবাহ: খণ্ড ১, ১০৪ পৃষ্ঠায় ইবনু হাজার বলেন, এর ইসনাদে আইয়‍্যাশ ইবনু আব্বাস নামক একজন যঈফ বর্ণনাকারী আছেন। আলবানি, আয-যঈফাহ: ৪৭৯৩ এ একে যঈফ বলেছেন। অনুরূপ আস-সহীহাহ: খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৪ এ তিনি উমার ও আবু যার থেকে এই হাদীসের আরও দুটি দুর্বল বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন
১৮৫ অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কারও কোনো শক্তি বা ক্ষমতা নেই।
১৮৬ তাবারানি, আল-আসওয়াত: ৫০২৮; ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ, হাকিম : ১৯৯০ একে সহীহ বলেছেন, কিন্তু যাহাবি দেখান যে এতে বিশর নামক একজন দুর্বল বর্ণনাকারী আছেন। হায়সামি: খণ্ড ১০, ৯৮ পৃষ্ঠায় বলেন, এর ইসনাদে বিশর ইবনু রাফি আছেন, যিনি দুর্বল। ইবনুল জাওযি, আল-ইলাল: খণ্ড ২, ৩৪৮ পৃষ্ঠায় বলেন এটি সহীহ নয়। আলবানি একে যঈফ বলেছেন, যঈফ আর-তারগীব: ৯৭০-১১৪৭
১৮৭ আহমাদ: ১৭৮১৪-২২১৭; বুখারি, খালাক আফআলুল ইবাদ: ১৬৩ মুনযিরি, আত-তারগীব : খণ্ড ২, ২৫৭ পৃষ্ঠাতে দুটি বর্ণনাসূত্র উল্লেখের পর তাদের একটিকে হাসান বলেন। আলবানি, আস-সহীহাহ: ৩৩৩৪ এবং সহীহুত তারগীব : ১৩০৭ এ একে হাসান লি গাইরিহি বলেন। আরনাউত বলেন, হাদীসটি হাসান বলে পরিগণিত হওয়ার যোগ্য।
১৮৮ সূরাহ আত-তাগাবুন, ৬৪: ১১
১৮৯ মুসলিম: ২৯৯৯; সুহাইব ইবনু সিনান এ থেকে বর্ণিত।
১৯০ সূরাহ আত-তাওবাহ, ৯ : ৫১-৫২
১৯১ সূরাহ আল-আনফাল, ৮ : ৪০
১৯২ সূরাহ আর-তাওবাহ, ৯ : ৫২
১৯৩ তিরমিযি, ২৩৯৬, ইবনু মাজাহ, ৪০৩১
১৯৪ বায়হাকি, শুয়াব: ২২৭
১৯০ বায়হাকি, শুয়াব: ২০৫
১৯৬ তাবারানি, আল-কাবির: ১০০১২-১০০৫২; ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত। এটি যঈফ।
১৯৭ আহমাদ: ১৪৪৫ এবং তিরমিযি: ২১৫১; তিরমিযি একে গারীব বলেছেন, কারণ এর ইসনাদে হাম্মাদ ইবনু হুমাইদ আছেন, যিনি শক্তিশালী নন। আরনাউত এর ইসনাদকে যঈফ বলেছেন। আলবানি, আয-যঈফাহ: ১৯০৬ এ একে যঈফ বলেছেন।
১৮৮ "যখন তারা তাকে দেখল, বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল আর নিজেদের হাত কেটে ফেলল আর বলল, 'আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন। এ তো মানুষ নয়, এক সম্মানিত ফেরেশতা!” [সূরাহ ইউসুফ, ১২:৩১]
১৯৯ আবু নুয়াইম: খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ১৯২
২০০ যাহাবি, সিয়ার: খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ১৮২; ইয়াহইয়া ইবনু সাইদ আল-কাত্তানের উদ্ধৃতি দিয়ে।
২০১ সূরাহ আয-যুমার, ৩৯: ১০
২০২ সূরাহ আল-বাকারাহ, ২: ১৫৫-১৫৭
২০০ সূরাহ আল-হাজ্জ, ২২: ৩৪-৩৫
২০৪ আবু নুয়াইম: খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৪২; উমার ইবনু আব্দুল আযীয থেকে।
২০৫ সবর: বিরত থাকা ও সংযত হওয়া। রাগিব বলেন, "এটি হলো শরিয়ত ও আকল অনুযায়ী আত্মাকে বিরত রাখা।” জাহিয বলেন যে, এটি স্থিরবুদ্ধিতা ও সাহসের সমন্বয়ে গঠিত এক গুণ। মুনাউয়ি বলেন যে, এটি হলো শারিরীক ও মানসিক অসুবিধা ও ব্যথার মুখোমুখি হতে পারার ক্ষমতা। এটি হলো আত্মাকে কৃপণতা ও হতাশা থেকে বিরত রাখা, জিহ্বাকে অভিযোগ করা থেকে বিরত রাখা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে বিশৃঙ্খল হওয়া থেকে বিরত রাখা। এটি হলো সকল পরিস্থিতিতে আল্লাহর হুকুমের উপর দৃঢ় থাকা এবং সর্বোত্তম উপায়ে বিপদের মোকাবেলা করা। ইবনু হিব্বান, রওদাতুল উকালা: পৃষ্ঠা ১২৬-১২৮ এ বলেন, বুদ্ধিমানের উপর আবশ্যক হলো বিপদের আগমনের শুরুতে সবর অবলম্বন করা। আর যখন সে এতে দৃঢ় হয়ে যাবে, তখন সন্তুষ্টির (রিদ্বা) পর্যায়ে উন্নীত হওয়া। কেউ যদি সবর দ্বারা পরিপুষ্ট না হয়ে থাকে, তাহলে তার উচিত নিজের মধ্যে সবরের পরিচর্যা করা (তাসাব্বর), কারণ এটিই রিদ্বার প্রথম ধাপ। মানুষের যদি সত্যিই সবর থাকে, তাহলে সে মহান হয়ে যাবে। কারণ, এটিই সকল কল্যাণের ঝরনা আর সকল আনুগত্যের ভিত্তি... এর দিকে যাওয়ার ধাপগুলো হলো সচেতনতা (ইহতিমাম), উপলব্ধি (তায়াক্কু), পরীক্ষা-নিরীক্ষা (তাহাব্বত) এবং তাসাব্বুর। এর পরেই আসে রিদ্বা। আর এটিই আত্মিক উন্নতির শিখর... তিনটি বিষয়ে সবর প্রদর্শন করতে হয়: ১) গুনাহ থেকে সবর, ২) আল্লাহর আনুগত্যে লেগে থাকার ব্যাপারে সবর, ৩) বিপদ-আপদের মুখে সবর। অনুরূপ, ইবনুল কাইয়্যিম, মাদারিজুস সালিকীন: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৬২-১৬৫
২০৬ রিদ্বা : হতাশা ও বিরক্তির বিপরীত। জুরানি একে বলেছেন তাকদীর কার্যকর হতে দেখে হৃদয়ে আনন্দ লাভ করা। ইবনুল কাইয়্যিম, মাদারিজ: খণ্ড ২, ১৮৫ পৃষ্ঠাতে উল্লেখ করেছেন যে, এটি হলো তাকদীরের ওঠা-নামায় অন্তর প্রশান্ত রাখা এবং এই বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ এতে কল্যাণকর কিছুই রেখেছেন।
বায়হাকি, শুয়াব: ২০৯-এ উল্লেখ আছে, ইবনু মাসউদ বলেন, "রিদ্বা হলো আল্লাহর অসন্তুষ্টির বিনিময়ে মানুষকে সন্তুষ্ট না করা, আল্লাহর দেওয়া রিযকের কারণে অন্য কাউকে প্রশংসা না করা, আল্লাহ যা দেননি তার জন্য অন্য কাউকে দোষারোপ না করা। কারও ইচ্ছায় আল্লাহর রিযক আসে না, আবার কেউ ইচ্ছা না করলেই তা বন্ধ হয়ে যায় না। আল্লাহ তাঁর ন্যায়বিচার ও জ্ঞানের মাধ্যমে তিনি মুক্তি ও আনন্দ রেখেছেন ইয়াকীন ও সন্তুষ্টিতে, আর দুশ্চিন্তা ও হতাশা রেখেছেন সন্দেহ ও অসন্তুষ্টিতে।”
২০৭ এই ঘটনার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। বর্ণনাকারী একজন আবিদ, পরহেজগার, তবে সকল আলিমের মতে তিনি মুরজিয়া সম্প্রদায়ের। ইমাম আবু হাতিম বলেন, "তার বর্ণনা অগ্রহণযোগ্য।" আল্লামা ইবনুল জুনাইদ বলেন, "তিনি ভুয়া হাদীস বর্ণনা করতেন।" ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল বলেন, "তিনি মুরজিয়া ছিলেন। খুব ইবাদাত করতেন। তবে হাদীস বর্ণনায় তিনি অন্যদের মত নির্ভরযোগ্য ছিলেন না।" - শর'ঈ সম্পাদক
২০৮ বুখারি: ১২৮৩-১৩০২-৭১৫৪; মুসলিম: ৬২৬; আনাস থেকে বর্ণিত।
২০৯ আহমাদ: ১৮৩২৫; নাসাঈ : ১৩০৬-১৩০৭; আম্মার ইবনু ইয়াসির এ থেকে বর্ণিত। একে সহীহ বলেছেন, ইবনু হিব্বান: ১৯৭১; হাকিম: ১৯২৩ (যাহাবি একমত); আলবানি, তাখরিজুন নাসাঈ; এবং আরনাউত।
২১০ অনুরূপ খাত্তাবি, শানুদ দু'আ: পৃষ্ঠা ১৩২
২১১ বুখারি: ১৪৬৯-৬৪৭০; মুসলিম: ১০৫৩; আবু সাইদ আল-খুদরি থেকে বর্ণিত।
২১২ তালিক বর্ণনা হিসেবে বুখারিতে উল্লেখিত। ইবনু হাজার, ফাতহ: খণ্ড ১১, ৩০৯ পৃষ্ঠায় বলেন, “আহমাদ: কিতাবুয যুহদ (১১৭)-তে এর পূর্ণাঙ্গ সূত্র উল্লেখ করেন মুজাহিদ পর্যন্ত, যিনি বলেন, "উমার বলেছেন..." এবং এটি সহীহ। এটি আরও উল্লেখ করেছেন ইবনুল মুবারাক, আয-যুহদ: ৬৩০ এবং ওয়াকি, আয-যুহদ: ১৯৮ এ।
১০ ইবনু আবু শাইবাহ, আল-ঈমান: ১৩০; ওয়াকি: ১৯৯; বায়হাকি, শুয়াব : ৪০; আবু নুয়াইম: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৭৫-৭৬; সুয়ুতি, আল-জামি: ৫১৩৬ পৃষ্ঠায় একে যঈফ বলেছেন।
২৬৪ সূরাহ আল-বাকারাহ, ২: ১৭৭
২১৫ সূরাহ আয-যুমার, ৩৯: ১০
২১৬ সূরাহ আত-তূর, ৫২: ৪৮
২১৭ সূরাহ ইউসুফ, ১২:৮৩
১১৮ অনুরূপ, তাবারি; ধৈর্য বিষয়ে ইবনুল কাইয়্যিমের বিস্তারিত আলোচনা দেখুন পরিশিষ্ট দুইয়ে।
১৯ বুখারি: ৬৪৫২; আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।
২২০ যাহাবির মতে এটি বলেছেন সুরাইহ আল-কাদি, সিয়ার: খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১০৫
২২১ মুসলিম: ২৮০৭; আনাস থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “জেনে রেখো, তুমি যা অপছন্দ করো তা ধৈর্যের মাধ্যমে সহ্য করার মধ্যে রয়েছে মহাকল্যাণ।” গুফরাহর আযাদকৃত দাস উমারের বর্ণনায় ইবনে আব্বাস থেকে অতিরিক্ত বাক্য রয়েছে,
“তুমি যদি ইয়াকীনপূর্ণ অবস্থায় সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহর জন্য আমল করতে পারো, তবে তা করো। আর যদি তা না পারো, তাহলে জেনে রেখো, তুমি যা অপছন্দ করো তা ধৈর্যের মাধ্যমে সহ্য করার মধ্যে রয়েছে মহাকল্যাণ।”১৭৯
এখানে ইয়াকীন অর্থ হলো তাকদীরের উপর ঈমান রাখা। তাঁর ছেলে আলি বিন আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস তাঁর পিতার সূত্রে যে বর্ণনা করেছেন, তাতে স্পষ্ট করে এ অর্থের উল্লেখ আছে। এতে অতিরিক্ত শব্দ রয়েছে, “আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমি কীভাবে ইয়াকীনের সাথে কাজ করতে পারি?' তিনি বললেন, 'তুমি জানবে যে, যা তোমার উপর আপতিত হয়েছে তা হওয়ারই ছিল, আর যা আপতিত হয়নি তা কিছুতেই হওয়ার ছিল না।” তবে এ বর্ণনার সনদ দুর্বল।
তাকদীরের প্রতি ইয়াকীন যখন অন্তরে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়ে যাবে, তখন এর আবশ্যক ফলাফলস্বরূপ অন্তর থাকবে ধীরস্থির ও শান্ত। এই অর্থই প্রকাশ পেয়েছে এই আয়াতে :
“পৃথিবীতে অথবা তোমাদের নিজেদের উপর এমন কোনো বিপদ আসে না, যা আমি সংঘটিত করার পূর্বে কিতাবে লিপিবদ্ধ রাখিনি। এটি (করা) আল্লাহর জন্য খুবই সহজ। এটা এ জন্য যে, তোমাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য তোমরা যেন হতাশাগ্রস্ত না হও। আর তোমাদের যা দান করা হয়েছে, তার জন্য তোমরা যেন উৎফুল্ল না হও। কেননা, আল্লাহ অহংকারী ও অধিক গর্বকারীকে পছন্দ করেন না।”১৮০
এই আয়াতের তাফসীরে দাহহাক বলেন, “তিনি তাদের মনোবল দৃঢ় করলেন, যাতে 'তোমাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য তোমরা যেন হতাশাগ্রস্ত না হও। অতএব দুনিয়াবি জিনিসের জন্য দুঃখ কোরো না। কারণ, আমি তা তোমার জন্য নির্ধারণই করিনি।' আর 'তোমাদের যা দান করা হয়েছে, তার জন্য তোমরা যেন উৎফুল্ল না হও। সেসব দুনিয়াবি জিনিসের জন্য অহংকারী হবে না যা তোমাদের দেওয়া হয়েছে, কারণ তা কখনোই আটকে রাখার ছিল না।” বর্ণনাটি ইবনু আবিদ্দুনিয়া-এর সূত্রে এসেছে।
সাইদ ইবনু যুবাইর এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ""তোমাদের যা দান করা হয়েছে' অর্থাৎ দুনিয়াবি প্রাচুর্য। কারণ, তুমি তো জানোই তোমার সৃষ্টির আগে থেকেই এটি নির্ধারিত ছিল।” ইবনু আবি হাতিম এটি বর্ণনা করেছেন।
এর আলোকেই একজন সালাফ বলেছিলেন, “তাকদীরের প্রতি ঈমান দুশ্চিন্তা ও হতাশা দূর করে দেয়।” নবীজি এ দিকে ইঙ্গিত দিয়েছেন এই হাদীসের মাধ্যমে :
"যা কিছু তোমার উপকার করবে, তা কামনা করো এবং আল্লাহর সাহায্য চাও। আর নিরাশ হোয়ো না। কোনো বিপদ ঘটলে বলবে না, 'ইশ! আমি যদি অমুক কাজটা না করতাম!' বরং বলো, 'আল্লাহ তা নির্ধারণ করেছেন। তিনি যা চেয়েছেন, তা-ই করেছেন।' 'যদি' শয়তানের কুমন্ত্রণার দুয়ার খুলে দেয়।”১৮১
অর্থাৎ, বিপদের সময় মানুষ যদি তাকদীরের প্রতি ঈমানের কথা স্মরণ করে, তাহলে শয়তানের ওয়াসওয়াসার মাধ্যমে আর দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।
আনাস বলেন, "আমি দশ বছর নবীজি -এর খেদমত করেছি। কখনো তিনি আমাকে বলেননি, 'এটা কেন করলে?' 'ওটা করলে না কেন?”১৮২ তিনি বলেন, “তাঁর পরিবারের কেউ যদি আমাকে বকা দিত, তিনি বলতেন, 'বাদ দাও। কোনো কিছু তাকদীরে থাকলে তা হবেই।” অতিরিক্ত শব্দসহ হাদীসটি ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন। ১৮৩
ত্রুটিপূর্ণ এক সনদে ইবনু আবিদ্দুনিয়া থেকে বর্ণিত হয়েছে, আয়িশা বলেন, “নবীজি ঘরে ফিরলে সবচেয়ে বেশি যে কথাটি বলতেন তা হলো, 'আল্লাহ যা কিছু বিষয় নির্ধারিত রেখেছেন তা ঘটবেই।” এ ছাড়া আরেকটি মুরসাল বর্ণনায় আছে, নবীজি ইবনু মাসউদ-কে বলেন,
"বেশি দুশ্চিন্তা করবে না। আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন, তা ঘটবেই। যে রিযক তোমার জন্য আছে, তা আসবেই।”১৮৪ আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেন, “লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ১৮৫ (বলা) হলো নিরানব্বইটি রোগের আরোগ্য, যার সবচেয়ে কমটি হলো দুশ্চিন্তা।”১৮৬
এই কথার বাস্তবায়নের আবশ্যক ফলাফল হলো আল্লাহর কাছে সকল বিষয় ন্যস্ত করে এই বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ না চাইলে কোনো কিছুই ঘটবে না। এর উপর ঈমান দুশ্চিন্তা ও হতাশা দূর করে দেয়। নবীজি এক ব্যক্তিকে উপদেশ দিয়ে বলেন,
“আল্লাহ তোমার জন্য নির্ধারণ করে রেখেছেন এমন কোনো কিছুর জন্য আল্লাহকে গালিগালাজ করবে না।”১৮৭
বান্দা যখন আল্লাহর তাকদীরের মাধ্যমে তাঁর হিকমাহ ও রহমতের বিষয়টি বুঝতে পারে, সে বুঝতে পারে যে, তাকদীরের জন্য আল্লাহকে তিরস্কার করা সমীচীন নয়। সে আল্লাহর নির্ধারিত বিষয়ে সন্তুষ্টি বোধ করবে। আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা বলেন:
"আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদ আসে না। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, আল্লাহ তার অন্তরকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন..."১৮৮
এর তাফসীরে আলকামাহ বলেন, "মানুষের উপর আসা বিপদের কথা এখানে বলা হচ্ছে। কিন্তু সে জানে যে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে। তাই সে তা মেনে নেয় এবং সন্তুষ্ট থাকে।”
এক সহীহ হাদীসে আছে,
"আল্লাহ মুমিনের জন্য যা-ই নির্ধারণ করেন, তা তার জন্য কল্যাণকর। সে যদি ভালো অবস্থায় থাকে, তাহলে সে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে এবং তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি খারাপ অবস্থায় পড়ে, তাহলে সে ধৈর্যধারণ করে এবং তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। কেবল মুমিনের জন্যই এ বিষয়টি সত্য。”১৮৯
"বলে দাও, 'আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারণ করেছেন তা ছাড়া অন্য কিছুই আমাদের ঘটবে না, তিনিই আমাদের রক্ষক, আর আল্লাহর উপরই মুমিনদের ভরসা করা উচিত।' বলো, 'তোমরা আমাদের জন্য যে জিনিসের অপেক্ষা করছ, তা দুটো ভালোর একটি ছাড়া আর কিছুই না...'”১৯০
এখানে আল্লাহ আমাদের জানাচ্ছেন যে, তাঁর নির্ধারিত বিষয় ছাড়া মুমিনদের আর কিছুই হবে না। এ থেকে বোঝা যায় সেই বিষয়টি সহজ বা কঠিন যা-ই হোক, একই কথা। তারপর তিনি জানাচ্ছেন যে, তিনি তাদের রক্ষক। তাঁকে যারা রক্ষক হিসেবে গ্রহণ করেছে, তাদের তিনি ছেড়ে যাবেন না। নিশ্চয়ই তিনি তাদের কল্যাণ করার দায়িত্ব নেবেন:
“জেনে রেখো, আল্লাহই তোমাদের অভিভাবক, কতই-না উত্তম অভিভাবক! কতই-না উত্তম সাহায্যকারী! ১৯১
“তোমরা আমাদের জন্য যে জিনিসের অপেক্ষা করছ, তা দুটো ভালোর একটি ছাড়া আর কিছুই না... "১৯২
তিরমিযিতে আনাস থেকে বর্ণিত আছে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
“আল্লাহ যখন কোনো জাতিকে ভালোবাসেন, তখন তাদের পরীক্ষায় ফেলেন। যে কেউ সন্তুষ্ট থাকে, সে সন্তুষ্টি লাভ করবে। আর যে কেউ অসন্তুষ্ট হয়, সে অসন্তুষ্টি লাভ করবে।”১৯৩
আবুদ্দারদা (রাঃ) বলেন, “আল্লাহ কোনো কিছু নির্ধারণ করলে বান্দা এর প্রতি সন্তুষ্ট থাকলে আল্লাহ খুশি হন।” উন্মুদ্দারদা (রাঃ) বলেন, “যারা আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরের ব্যাপারে সন্তুষ্ট, তারাই সত্যিকারের প্রশান্তচিত্ত। কিয়ামাতের দিন তারা জান্নাতে এমন স্থান লাভ করবে, যা দেখে শহীদরাও হিংসা করবেন।”
ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন, “আল্লাহ তাঁর ন্যায়বিচার ও জ্ঞানের মাধ্যমে ইয়াকীন ও সন্তুষ্টির মাঝেই আনন্দ রেখেছেন। আর সংশয় ও অসন্তুষ্টির মাঝে রেখেছেন দুশ্চিন্তা আর অস্থিরতা।” নবীজি (ﷺ)-এর একটি হাদীস হিসেবেও কথাটি বর্ণিত আছে, তবে তার সনদ দুর্বল।
উমার বিন আব্দুল আযিয (রাঃ) বলতেন, “এই দু’আগুলো আমার জন্য আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার নির্ধারিত তাকদীরের প্রতি আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কোনো প্রয়োজনই বাকি রাখেনি।” তিনি এই দু’আগুলো খুব বেশি বেশি করতেন, “হে আল্লাহ, আমাকে আপনার তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট রাখুন। আমাকে আপনার তাকদীরে এত বারাকাহ দিন, যাতে আমি এমন বিষয়ে বিলম্ব কামনা না করি, যা আপনি দ্রুত দেবেন এবং যা বিলম্বে দেবেন তাতে তাড়াহুড়া না করি।”১৯৪
ইবনু আওন (রাঃ) বলেন,
"স্বাচ্ছন্দ্য ও কাঠিন্য উভয় অবস্থায় আল্লাহর তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকো। এতে তোমার অস্থিরতা কমবে এবং আখিরাতের জন্য লাভজনক হবে। জেনে রেখো, বান্দা ততক্ষণ সত্যিকারের সন্তুষ্টি লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তার দরিদ্র অবস্থার সন্তুষ্টি সচ্ছলতার অবস্থার সন্তুষ্টির সমান হচ্ছে। আল্লাহর ইচ্ছেকে নিজের কামনা-বাসনার বিপরীত দেখতে পেয়ে কী করে তুমি অসন্তুষ্ট হতে পারো? অথচ তুমি আল্লাহকে তোমার অবস্থার দেখভাল করার অনুরোধ করেছ। এমনটা হতেই পারে যে, তোমার ইচ্ছামতো সবকিছু হলে তুমি ধ্বংস হয়ে যেতে। অথচ আল্লাহর নির্ধারিত বিষয় তোমার ইচ্ছের সাথে মিললে তুমি খুশি হয়ে ওঠো। উভয় অবস্থার কারণ হলো গায়েবের ব্যাপারে তোমার নিতান্ত অজ্ঞতা। এই অবস্থা নিয়ে
বিচারদিবসে যাওয়ার সাহস হয় কী করে! তুমি নিজের প্রতি সদ্ব্যবহার করোনি, সন্তুষ্টির সঠিক মাত্রায়ও পৌঁছতে পারোনি।”
চমৎকার কিছু কথা। এর অর্থ হলো যে, বান্দা যখন আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার কাছে কোনো বিষয়ে ফায়সালা করে দেওয়ার দু'আ (ইস্তিখারা) করে, তখন আল্লাহ যে সিদ্ধান্তই দিন তাতে তার সন্তুষ্ট থাকতে হবে-পছন্দ হোক বা না হোক। কারণ, সে তো জানেই না কোন অবস্থায় তার কল্যাণ রয়েছে। আর আল্লাহ যা নির্ধারণ করেন, তার জন্য তিনি তিরস্কারযোগ্য নন। আল্লাহ যা নির্ধারণ করবেন, এতে সন্তুষ্ট হওয়ার মতো মনোবল নেই, এমন মানুষদের এ কারণেই ইস্তিখারার দু'আয় 'সকল কল্যাণকর অবস্থায়' কথাটি যোগ করার পরামর্শ দিতেন ইবনে মাসউদ১৯৫ সহ কিছু সালাফ। অন্যথায় সে এমন ফিতনায় পতিত হতে পারে, যাতে সে উত্তীর্ণ হতে পারবে না। এ কথাটি নবীজি -এর হাদীস হিসেবেও বর্ণিত হয়েছে। তবে তার সনদ দুর্বল। ১৯৬
সাদ থেকে বর্ণিত, রাসূল বলেন, "বান্দার সৌভাগ্য হলো আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার কাছে সিদ্ধান্ত চাওয়ার পর তাঁর প্রদান করা সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকতে পারা। আর বান্দার দুর্ভাগ্য হলো আল্লাহর সিদ্ধান্ত চাওয়া পরিত্যাগ করা আর তিনি যা নির্ধারণ করেন, তাতে অসন্তুষ্ট হওয়া।” হাদীসটি তিরমিযি ও অন্যান্য কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। ১৯৭
তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্টি অর্জনের অনেক উপায় আছে:
১. আল্লাহর প্রতি বান্দার দৃঢ় ইয়াকীন থাকা যে, তিনি মুমিনের জন্য যা নির্ধারণ করেন তা-ই কল্যাণকর। সে যেন দক্ষ ডাক্তারের কাছে নিজেকে সমর্পণ করা রোগী। ডাক্তারের পথ্য তার ব্যথার উদ্রেক করুক বা না করুক, সে সন্তুষ্টই থাকবে। কারণ, সে জানে যে, ডাক্তার তাকে সর্বাধিক কল্যাণকর পথ্যই দিচ্ছেন। ইবনে আওল তাঁর উক্তিতে এর কথাই বলেছেন।
২. সন্তুষ্টির বিনিময়ে আল্লাহ যে প্রতিদান দেওয়ার ওয়াদা করেছেন, তা স্মরণ করা। বান্দা এটি নিয়ে চিন্তায় এমনই মগ্ন হয়ে যেতে পারে যে, বাকি সব ব্যথা সে
ভুলেই যাবে। সালাফদের মধ্যে একজন নারী পড়ে যান, এতে তাঁর পায়ের নখ ভেঙে যায়। তিনি হেসে উঠে বলেন, “তাঁর কাছে এর যে প্রতিদান তা ভেবে আমি ব্যথার তিক্ততা ভুলে গেছি।”
৩. যেই সত্তা বিপদ পাঠান, তাঁর ভালোবাসায় নিজেকে মগ্ন করে ফেলা। তাঁর অসীম প্রাচুর্য, মহত্ত্ব, সৌন্দর্য, ত্রুটিহীনতা নিয়ে চিন্তা করা। এমন সচেতনতার ফলে এমন অবস্থা সৃষ্টি হবে যে, ইউসুফ (আঃ)-কে দেখে মিসরের নারীদের হাত কাটার ব্যাথা ভুলে যাওয়ার**১৮৮** মতো করেই বান্দা ব্যাথা ভুলে যাবে। পূর্বে বর্ণিত অবস্থার চেয়ে এটি আরও উচ্চতর পর্যায়।
জুনাইদ (রহঃ) বলেন তিনি সিররি (রহঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, প্রেমিক বিপদের ব্যাথা অনুভব করেন কি না। তিনি জবাব দিয়েছিলেন, “না।” এ কথার মাধ্যমে তিনি এই উচ্চতর পর্যায়ের কথা বলছেন। এ কথার আলোকেই বিপদে পতিত একদল মানুষ বলেছিলেন, “তিনি (আল্লাহ) আমাদের সঙ্গে যা করতে চান, তা-ই করুন। এমনকি তিনি যদি আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একটি একটি করে কেটে ফেলতেন, এতে তাঁর প্রতি আমাদের ভালোবাসাই কেবল বাড়ত।”
তাঁদের মধ্যে একজন বলেছেন: প্রেমের আতিশয্য যদি টুকরো টুকরো করে কাটে আমায়, আমার ভালোবাসা বৃদ্ধি ছাড়া তাতে কিছুই হতো না হায়। আমি হয়ে থাকব ভালোবাসার কাছে বন্দী, তব সন্তুষ্টির খোঁজেই পৌঁছে যাব জীবনসন্ধি।
ইবরাহীম ইবনু আদহাম (রহঃ) তাঁর সম্পত্তি, সম্পদ, সন্তান ও দাসদের ছেড়ে গিয়েছিলেন। তাওয়াফ করার সময় তিনি তাঁর পুত্রকে দেখতে পান, কিন্তু তাঁর সাথে কথা বলেননি। তিনি বলেন: সবকিছু থেকে হিজরত করেছি তোমাকে পাবার আশায় অধীনস্থদের ছাড়িয়া এসেছি তোমাকে দেখার নেশায়। তুমি আমায় টুকরো করলেও বেড়েই চলব ভালোবাসায়।
আল্লাহর এমনই একদল প্রেমিক ছিলেন ফুদাইল ও ফাতহুল মাওসিলির মতো ব্যক্তিরা। তাঁরা যদি এমন অবস্থায় ঘুমোতে যেতেন যে, রাতের খাবার খাওয়া হয়নি বা জ্বালানোর মতো কুপি পাওয়া যায়নি, তাহলে তাঁরা আনন্দে কান্না করতেন।
শীতকালে ফাতহ তাঁর পরিবারকে জড়ো করে নিজের চাদর দিয়ে তাদের ঢেকে নিয়ে বলতেন,
“(হে আল্লাহ) আপনি আমাকে ক্ষুধার্ত রেখেছেন, তাই আমি আমার পরিবারকে ক্ষুধার্ত রেখেছি। আপনি আমাকে খ্যাতিহীন করেছেন, তাই আমি আমার পরিবারকে খ্যাতিহীন করেছি। এমনটা আপনি আপনার প্রিয় বান্দাদের সাথেই করে থাকেন, আমি কি তাদের একজন? আমার কি আনন্দিত হওয়া উচিত নয়?”১৯৯
একজন সালাফ অসুস্থ ছিলেন। তাঁরা তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার কি কিছু লাগবে?” তিনি বলেন, "তাঁর (আল্লাহর) কাছে যা সবচেয়ে প্রিয়, আমার কাছেও তা-ই প্রিয়।”২০০
এর আলোকে একজন বলেছিলেন:
আপনার শান্তি মধুর, যার থেকে দূরত্বও নিকট সমধিক, আপনি আমার প্রাণেরই মতো, বরং তার চেয়ে অধিক। এটাই আমার জন্য যথেষ্ট, যাতে তুমি তুষ্ট, তাতে আমিও তুষ্ট।
আবুত্তুরাব এই চরণগুলো রচনা করেছেন :
বিভ্রান্ত হোয়ো না কেউ, প্রেমিকেরও তো চিহ্ন আছে, নির্দিষ্ট পথে উপহার পাঠায় সে প্রেমাস্পদের কাছে। রবের দেওয়া বিপদে তুষ্ট, তিনি যা করেন তায় খুশি, তাঁর দেওয়া দারিদ্র্যই প্রাচুর্য, বরং তার চেয়েও বেশি।
তাঁরা এক ব্যক্তির কাছে গেলেন, যার ছেলে জিহাদে শহীদ হয়েছে। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, "আমি পুত্রশোকে কাঁদছি না। তরবারির আঘাত পাওয়ার সময় আল্লাহর প্রতি সে কতই-না সন্তুষ্ট ছিল, তা ভেবেই কাঁদছি।”
তারা যদি মোর মৃত্যুই চায়, সেটাই হোক না তবে! আল্লাহ যা চান, সেটা না হওয়া আমি চেয়েছি কবে?
মূলকথা হলো, রাসূল ﷺ চেয়েছেন ইবনে আব্বাস যেন সামর্থ্য থাকলে সন্তুষ্ট অবস্থায় আমল করেন। যদি সামর্থ্য না থাকে, তিনি বলেন, “যদি তা না পারো, তাহলে জেনে রেখো, তুমি যা অপছন্দ করো তা ধৈর্যের মাধ্যমে সহ্য করার মধ্যে রয়েছে মহাকল্যাণ।” এ থেকে বোঝা যায়, যেসব নির্ধারিত বিষয় সহ্য করা কঠিন, তাতে পুরোপুরি সন্তুষ্ট থাকা আবশ্যক নয়, তবে অত্যন্ত উত্তম। যে সন্তুষ্ট হতে পারে না, তাকে অবশ্যই ধৈর্যশীল হতে হবে। ধৈর্য আবশ্যক। এর ফলে মহাকল্যাণ আসে। আল্লাহ তা'আলা ধৈর্যের আদেশ দিয়েছেন এবং এর জন্য বিশাল পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন,
"... আমি ধৈর্যশীলদের তাদের পুরস্কার অপরিমিতভাবে দিয়ে থাকি।”২০১
"...ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দান করো। নিশ্চয়ই যারা বিপদকালে বলে থাকে, 'আমরা আল্লাহরই, আর আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী।' এদের প্রতিই রয়েছে তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অনুগ্রহ ও করুণা। আর এরাই হিদায়াতপ্রাপ্ত।”২০২
"...সুসংবাদ দাও সেই বিনীতদের, 'আল্লাহ' নামের উল্লেখ হলেই যাদের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে, যারা তাদের বিপদে-আপদে ধৈর্যধারণ করে..."২০৩
আল-হাসান বলেন, “সন্তুষ্টির অবস্থা বিরল। তবে ধৈর্য হলো মুমিনের আশ্রয়।”২০৪ সুলাইমান আল-খাওয়াস বলেন, “ধৈর্যের মর্যাদা সন্তুষ্টির নিচে। সন্তুষ্ট ব্যক্তির অবস্থা এই যে, বিপদ আসুক বা না আসুক, সে সন্তুষ্ট। আর ধৈর্য হলো বিপদ আসার পর অবিচলভাবে তা সহ্য করা।”
সন্তুষ্টি আর ধৈর্যের মাঝে পার্থক্য আছে। ধৈর্য হলো বিপদ দেখতে পাওয়ার পর অসন্তুষ্ট হওয়া থেকে আত্মাকে লাগাম পরানো।২০৫ আর সন্তুষ্টি হলো যেকোনো অবস্থায়ই যা হচ্ছে, তা মেনে নেওয়া। সন্তুষ্টির কারণে ব্যথা কমে যায়, এমনকি একদমই শূন্য হয়ে যেতে পারে। কারণ, অন্তর তখন ইয়াকীন ও জ্ঞানের কোমল পরশ পেয়ে গেছে। ২০৬
উমার বিন আব্দুল আযীয, ফুদাইল, আবু সুলাইমান, ইবনুল মুবারাকসহ অনেক সালাফ তাই বলতেন, “সন্তুষ্ট ব্যক্তি বর্তমানে যেই অবস্থায় আছে, সেটা ছাড়া আর অন্য কিছু কামনাই করে না। কিন্তু ধৈর্যশীল ব্যক্তি (অবস্থার পরিবর্তন) কামনা করে।” অনেক সাহাবাগণের থেকেও এ রকম সন্তুষ্টির অবস্থার বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন: উমার , ইবনে মাসউদ প্রমুখ।
আব্দুল আযীয ইবনে আবু রুওওয়াদ বলেন, “বানী ইসরাঈলের এক আবেদ ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখানো হলো, অমুক মহিলা জান্নাতে তাঁর স্ত্রী হবে। তিনি সেই নারীর বাসায় তিন দিনের জন্য গেলেন, যাতে তিনি কী আমল করেন তা জানা যায়। কিন্তু রাতে পুরুষটি যখন সালাত পড়তেন, নারীটি ঘুমাতেন। পুরুষটি যেদিন সিয়াম রাখতেন, নারীটি খাওয়া-দাওয়া করতেন। চলে যাওয়ার সময় তিনি নারীটিকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনার কোন আমলটি আপনার কাছে সেরা মনে হয়?' নারীটি বললেন, 'আপনি আমাকে যা করতে দেখেছেন, তার চেয়ে বেশি আমি কিছুই করি না। কিন্তু আমি যখন কষ্টে থাকি, তখন স্বাচ্ছন্দ্য কামনা করি না। যখন অসুস্থ থাকি, তখন সুস্বাস্থ্য কামনা করি না। যখন ক্ষুধার্ত থাকি, তখন ভরপেট হওয়া কামনা করি না। যখন রোদে থাকি, তখন ছায়া কামনা করি না।' লোকটি বললেন, 'আল্লাহর কসম! এই গুণ তো বান্দাদের আয়ত্তের বাইরে।”২০৭
বিপদের প্রথম আঘাতেই ধৈর্যধারণ করতে হয় বলে নবীজির সহীহ হাদীসে এসেছে।২০৮ আর বিপদ ভোগ করতে থাকা অবস্থায় সন্তুষ্টি প্রদর্শন করতে হয়। যেমনটি নবীজি ﷺ দু'আ করতেন, “তাকদীরের লিখন সংঘটিত হয়ে যাবার পর আমি আপনার নিকট সন্তুষ্ট থাকার সামর্থ্য চাই।”২০৯ কারণ, বিপদ আসার আগে বান্দা সহজেই সন্তুষ্ট থাকতে পারে। কিন্তু বিপদ আসার পর তার অবস্থা একদম বিপরীত হয়ে যেতে পারে। নির্ধারিত বিপদ চলে আসার পর যে সন্তুষ্টি প্রদর্শন করে, সে-ই সত্যিকারের সন্তুষ্ট। ২১০
সারকথা হলো, ধৈর্যধারণ আবশ্যক। ধৈর্যের সীমানার বাইরেই থাকে অসন্তুষ্টি। যে কেউ আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরের ব্যাপারে অসন্তুষ্ট, তার পরিণাম হবে আল্লাহর অসন্তুষ্টি। তার উপর তার নিজের অসন্তুষ্টির চেয়ে বেশি হবে বিপদের স্বাদ আর শত্রুদের পক্ষ থেকে আসা ক্ষতি। একজন সালাফ বলেছেন:
কোনো দুর্ঘটনায় হোয়ো না হতাশ শত্রুকে ধরতে দিয়ো না তোমার রাশ ধৈর্যের মাধ্যমেই দেখতে পাবে আশ, দৃঢ়পদ থাকো যখন শত্রু-সঙ্গে হয় নিবাস।
নবীজি বলেন, “যে নিজের মাঝে ধৈর্য স্থাপন করে, আল্লাহ তাকে ধৈর্য দান করেন। ধৈর্যের চেয়ে বড় ও ব্যাপক উপহার আর কাউকে কখনো দেওয়া হয়নি।” ২১১
উমার বলেন, "আমাদের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সময় ছিল ধৈর্যধারণের দিনগুলো।” ২১২ আলি বলেন, "ঈমানের সাথে ধৈর্যের সম্পর্ক দেহের সাথে মাথার সম্পর্কের মতো। যার ধৈর্য নেই, তার ঈমানই নেই।” ১১৩
আল-হাসান বলেন, “ধৈর্য হলো জান্নাতি এক নিয়ামাত। আল্লাহ কেবল সম্মানিতদেরই তা দান করেন।” মায়মুন ইবনু মিহরান বলেন, “নবী বা অন্য কেউই কখনো ধৈর্যধারণ না করে কোনো কল্যাণ লাভ করতে পারেননি।” ইবরাহীম আত-তাইমী বলেন, “আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার উপর ঈমানের পর বান্দাকে সবচেয়ে বড় যে নিয়ামাত আল্লাহ দিয়েছেন, তা হলো ক্ষতির সময় ধৈর্য, পরীক্ষার সময় ধৈর্য, বিপদের সময় ধৈর্য।” তিনি এ কথা বলেছেন এই আয়াতের ভিত্তিতে :
"বরং কল্যাণ আছে এতে যে, কোনো ব্যক্তি ঈমান আনবে আল্লাহ, শেষ দিবস, ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ ও নবীগণের উপর এবং আল্লাহর ভালোবাসার্থে ধন-সম্পদ আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম-মিসকীন, মুসাফির ও যাজ্ঞাকারীদের এবং দাসত্বজীবন হতে নিষ্কৃতি দিতে দান করবে এবং সালাত কায়েম করবে ও যাকাত প্রদান করবে, প্রতিশ্রুতি দানের পর স্বীয় প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবে এবং অভাবে, দুঃখ-ক্লেশে ও সংকটে ধৈর্যধারণ করবে। এ লোকেরাই সত্যপরায়ণ আর এ লোকেরাই তাকওয়াবান।” ২১৪
উমার বিন আব্দুল আযীয বলেন,
“আল্লাহ যদি কাউকে কোনো নিয়ামাত দিয়ে তা ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে তার বদলে শুধু ধৈর্য দান করেন, তাহলে যা দেওয়া হলো তা ছিনিয়ে নেওয়া বস্তুর চেয়ে উত্তম।” তারপর তিনি তিলাওয়াত করেন:
"... আমি ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান অপরিমিতভাবে দিয়ে থাকি।”২১৫
একজন সালাফের পকেটে সব সময় একটি কাগজের টুকরা থাকত। সময়ে সময়ে তিনি তা বের করে পড়তেন। তাতে লেখা ছিল,
“তুমি ধৈর্যধারণ করে তোমার প্রতিপালকের হুকুমের অপেক্ষায় থাকো, কারণ তুমি তাঁর দৃষ্টির সামনেই আছো..."২১৬
সুন্দর ধৈর্য হলো বিপদের কথা বান্দার নিজের কাছে রাখা আর কাউকে এ বিষয়ে না বলা।
"ধৈর্যই উত্তম।”২১৭
একদল সালাফ এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, এর অর্থ হলো কোনো অভিযোগ ছাড়াই ধৈর্যধারণ করা। ২১৮
আহনাফ ইবনু কায়স ؒ চল্লিশ বছর ধরে অন্ধ ছিলেন, কিন্তু তিনি এর কথা কাউকে বলেননি। আব্দুল আযীয ইবনু আবু রুওওয়াদ-এর এক চোখ বিশ বছর যাবৎ অন্ধ ছিল। তাঁর ছেলে একদিন ভালো করে দেখে বললেন, “বাবা, আপনার এক চোখ অন্ধ।” তিনি বললেন, “গত বিশ বছর ধরে আমি এ নিয়ে আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট আছি।” ইমাম আহমাদ ؒ অসুস্থ হলে তা নিয়ে কখনো কোনো অভিযোগ করতেন না। তাঁকে যখন জানানো হলো যে অসুস্থ অবস্থায় মুজাহিদ ؒ গোঙানো অপছন্দ করতেন, তখন তিনি মৃত্যু পর্যন্ত এ কাজ ত্যাগ করেন। তিনি নিজেকে বলতেন, "ধৈর্য ধরো, না হলে পস্তাতে হবে।"
এক জ্ঞানী ব্যক্তি এক রোগীর কাছে গিয়ে দেখলেন সে উহ আহ করছে। তিনি মনে করিয়ে দিলেন, “এটি (রোগ) কার দেওয়া?” তাঁদের একজন বলতেন:
শরীর তো আমার অসুস্থতায় জর্জরিত, তবু দর্শনার্থীদের কাছে রাখে লুক্কায়িত। প্রিয়তমের তাকদীরে যদি অসন্তুষ্ট হয়, তাহলে তো নফস সুবিচারকারী নয়।
ইয়াহইয়া ইবনু মুয়ায বলেন,
"তুমি যদি তোমার রবকে ভালোবাসো আর তিনি তোমার জন্য ক্ষুধা ও বস্ত্রের অভাব নির্ধারণ করেন, তোমার উপর ফরয হলো এটি সহ্য করা এবং মাখলুকদের কাছ থেকে তা লুকানো। প্রেমিক তো বিনা অভিযোগে প্রেমাস্পদের থেকে পাওয়া কষ্ট সহ্য করে। তাহলে মাখলুকের কাছে তুমি এমন জিনিস নিয়ে কেন অভিযোগ করবে, যা সে তোমাকে দেয়ইনি?"
কবি বলেন, আপনি ছাড়া সকলের কাজ আমার ঘৃণায় খণ্ডিত, আপনার হতে যা কিছু আসে তা-ই সৌন্দর্যমণ্ডিত।
নবীজি ও সাহাবাগণ ক্ষুধার তাড়নায় পেটে পাথর বাঁধতেন। ১৯
উয়াইস ময়লার স্তূপ থেকে ভাঙা হাড্ডি জড়ো করতেন আর তাঁর আশপাশে কুকুররাও তা-ই করত। একবার এক কুকুর তাঁকে দেখে ঘেউ ঘেউ করে উঠল। তিনি বললেন, “কুকুর, যে তোমার ক্ষতি করে না, তুমিও তার ক্ষতি করো না। তোমার কাছে যা আছে, তা তুমি খাও। আমার কাছে যা আছে, তা আমি খাই। আমি যদি জান্নাতে যাই, আমি তোমার চেয়ে উত্তম হব। আর আমি যদি জাহান্নামে যাই, তুমি আমার চেয়ে উত্তম হবে।”
ইবরাহীম ইবনু আদহাম গরিবদের সাথে শস্যের অঙ্কুর কুড়াতেন। যখন তিনি টের পেলেন গরিবরা তাদের সাথে তাঁর এ প্রতিযোগিতা পছন্দ করছে না, তখন তিনি ভাবলেন, “আমি কি বালখ অঞ্চলে সম্পদ ফেলে এলাম গরিবদের সাথে শস্যদানা কুড়ানোর প্রতিযোগিতা করতে?” তারপর থেকে তিনি কেবল পশুরা যেসব মাঠে চড়ত, সেখান থেকেই শস্য কুড়াতেন।”
ইমাম আহমাদ গরিবদের সাথে শস্য কুড়াতেন। সুফিয়ান আস-সাওরি মক্কায় যাওয়ার পথে একবার দুটি উটের দেখাশোনার চাকরি নিয়েছিলেন। তিনি কিছু লোকের জন্য রান্নার দায়িত্ব ছিলেন। তিনি এত বাজে রান্না করতেন যে, লোকেরা তা খেয়ে তাঁকে প্রহার করত। ফাতহুল মাওসিলি টাকার বিনিময়ে কিছু মানুষের জন্য আগুন জ্বালানোর কাজ করতেন।
ভূমি দিয়ে এলাম আমি আপনার ওয়াস্তে আমার শত্রু হিংসুকদের হস্তে।
হে রব, কতদিন পাব নেক নজর তোমার? জীবন শেষ হতে চলল, প্রয়োজন ফুরোয়নি আমার।
আরেকজন সালাফ বলেছেন: তোমার রহমতের খোঁজে সয়েছি অনেক দুঃখ-যাতনা অনেক ধৈর্য ধরেছি আমি অনেক কষ্ট-যাজ্ঞা। ছেড়ে যেয়ো না আমায় পারব না আমি তোমায় ছাড়া পারিশ্রমিক চাও যদি আমার প্রাণটি নাও সারা। তোমার সন্তুষ্টিকে আমি বেসেছি অনেক ভালো, হৃদয় আকুল, কণ্ঠ রুদ্ধ অশ্রুতে টলোমলো। আপনার প্রেমে সকল বিপদ হয়ে যায় সহ্য আমার, বিপদে যে কখনো পড়েনি তার সুখ কী আবার?
তাঁদের দৃষ্টিতে দুনিয়াবি কষ্ট হলো নিয়ামাত। তাঁদের একজন বলতেন, “সত্যিকার বিচারক তো সে-ই, যে বিপদকে দেখে নিয়ামাত হিসেবে আর স্বাচ্ছন্দ্যকে ভাবে দুর্ভাগ্য।” এক ইসরাঈলী বর্ণনায় আছে, "যদি কোনো প্রাচুর্যশালীকে আসতে দেখো, তাহলে বলো, 'কোনো এক পাপের অগ্রীম শাস্তি!' যদি কোনো দরিদ্রকে আসতে দেখো, তাহলে বলো, 'নেককারের নিদর্শন, স্বাগতম!”২২০
একজন সালাফ বলেছেন,
"আমি কোনো দুনিয়াবি বিপদে পড়লে চারবার আল্লাহর প্রশংসা করি। বিপদ এর চেয়েও খারাপ না হওয়ার কারণে, আমাকে বিপদ সহ্য করার শক্তি দেওয়ার কারণে, আমাকে 'ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' বলার শক্তি প্রদানের কারণে, আমাকে দ্বীনের ক্ষেত্রে কোনো বিপদে না ফেলার কারণে।"
ধৈর্যের মাধ্যমে মুক্তি কামনা করা ইবাদাতের একটি প্রকার। কারণ, বিপদ কখনোই চিরস্থায়ী হয় না।
ধৈর্য ধরে বিপদ সহ্য করো, হে হৃদয়। জেনো বিপদ কভু চিরস্থায়ী না হয়। ধৈর্য ধরো মহান ব্যক্তিদের মতো করেই, বিপদ তো আজকে আছে, কালকে নেই।
পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্দশাগ্রস্ত লোকটিকে জান্নাতে একটু ঢুকিয়ে আবার বের করে এনে জিজ্ঞেস করা হবে, "তুমি কি কখনো বিপদ দেখেছ? বিপদ ভোগ করেছ?” সে বলবে, “না, ইয়া রব্ব!”২২১
হে আত্মা, আর মাত্র কয়েকটা দিন, এরা তো স্বপ্নের মতো স্থায়িত্বহীন। হে আত্মা, পৃথিবী তাড়াতাড়ি পার করে দাও, আসল জীবন তো সামনে, তার দিকেই যাও।
আরেকজন বলেছেন: একটি মাত্র ঘণ্টার ব্যাপার, তারপরই তা নেই, এ সবই ক্ষণস্থায়ী, সব হারিয়ে শেষে যাবেই।

টিকাঃ
১৭৯ আবু নুয়াইম: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩১৪
১৮০ সূরাহ আল-হাদীদ, ৫৭: ২২-২৩
১৮১ মুসলিম: ২৬৬৪; আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।
১৮২ বুখারি: ২৭৬৮-৬০৩৮-৬৯১১; মুসলিম: ২৩০৯
১৮৩ আহমাদ: ১৩৪১৮; বায়হাকি, শুয়াব: ৮০৭০; বুখারি ও মুসলিমের শর্তানুযায়ী এর ইসনাদ গ্রহণযোগ্য। অনুরূপ, আরনাউত, তাখরিজ মুসনাদ।
১৮৪ বায়হাকি, শুয়াব: ১১৮৮; ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ, আল-ইসাবাহ: খণ্ড ১, ১০৪ পৃষ্ঠায় ইবনু হাজার বলেন, এর ইসনাদে আইয়‍্যাশ ইবনু আব্বাস নামক একজন যঈফ বর্ণনাকারী আছেন। আলবানি, আয-যঈফাহ: ৪৭৯৩ এ একে যঈফ বলেছেন। অনুরূপ আস-সহীহাহ: খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৪ এ তিনি উমার ও আবু যার থেকে এই হাদীসের আরও দুটি দুর্বল বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন
১৮৫ অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কারও কোনো শক্তি বা ক্ষমতা নেই।
১৮৬ তাবারানি, আল-আসওয়াত: ৫০২৮; ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ, হাকিম : ১৯৯০ একে সহীহ বলেছেন, কিন্তু যাহাবি দেখান যে এতে বিশর নামক একজন দুর্বল বর্ণনাকারী আছেন। হায়সামি: খণ্ড ১০, ৯৮ পৃষ্ঠায় বলেন, এর ইসনাদে বিশর ইবনু রাফি আছেন, যিনি দুর্বল। ইবনুল জাওযি, আল-ইলাল: খণ্ড ২, ৩৪৮ পৃষ্ঠায় বলেন এটি সহীহ নয়। আলবানি একে যঈফ বলেছেন, যঈফ আর-তারগীব: ৯৭০-১১৪৭
১৮৭ আহমাদ: ১৭৮১৪-২২১৭; বুখারি, খালাক আফআলুল ইবাদ: ১৬৩ মুনযিরি, আত-তারগীব : খণ্ড ২, ২৫৭ পৃষ্ঠাতে দুটি বর্ণনাসূত্র উল্লেখের পর তাদের একটিকে হাসান বলেন। আলবানি, আস-সহীহাহ: ৩৩৩৪ এবং সহীহুত তারগীব : ১৩০৭ এ একে হাসান লি গাইরিহি বলেন। আরনাউত বলেন, হাদীসটি হাসান বলে পরিগণিত হওয়ার যোগ্য।
১৮৮ সূরাহ আত-তাগাবুন, ৬৪: ১১
১৮৯ মুসলিম: ২৯৯৯; সুহাইব ইবনু সিনান এ থেকে বর্ণিত।
১৯০ সূরাহ আত-তাওবাহ, ৯ : ৫১-৫২
১৯১ সূরাহ আল-আনফাল, ৮ : ৪০
১৯২ সূরাহ আর-তাওবাহ, ৯ : ৫২
১৯৩ তিরমিযি, ২৩৯৬, ইবনু মাজাহ, ৪০৩১
১৯৪ বায়হাকি, শুয়াব: ২২৭
১৯০ বায়হাকি, শুয়াব: ২০৫
১৯৬ তাবারানি, আল-কাবির: ১০০১২-১০০৫২; ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত। এটি যঈফ।
১৯৭ আহমাদ: ১৪৪৫ এবং তিরমিযি: ২১৫১; তিরমিযি একে গারীব বলেছেন, কারণ এর ইসনাদে হাম্মাদ ইবনু হুমাইদ আছেন, যিনি শক্তিশালী নন। আরনাউত এর ইসনাদকে যঈফ বলেছেন। আলবানি, আয-যঈফাহ: ১৯০৬ এ একে যঈফ বলেছেন।
১৮৮ "যখন তারা তাকে দেখল, বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল আর নিজেদের হাত কেটে ফেলল আর বলল, 'আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন। এ তো মানুষ নয়, এক সম্মানিত ফেরেশতা!” [সূরাহ ইউসুফ, ১২:৩১]
১৯৯ আবু নুয়াইম: খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ১৯২
২০০ যাহাবি, সিয়ার: খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ১৮২; ইয়াহইয়া ইবনু সাইদ আল-কাত্তানের উদ্ধৃতি দিয়ে।
২০১ সূরাহ আয-যুমার, ৩৯: ১০
২০২ সূরাহ আল-বাকারাহ, ২: ১৫৫-১৫৭
২০০ সূরাহ আল-হাজ্জ, ২২: ৩৪-৩৫
২০৪ আবু নুয়াইম: খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৪২; উমার ইবনু আব্দুল আযীয থেকে।
২০৫ সবর: বিরত থাকা ও সংযত হওয়া। রাগিব বলেন, "এটি হলো শরিয়ত ও আকল অনুযায়ী আত্মাকে বিরত রাখা।” জাহিয বলেন যে, এটি স্থিরবুদ্ধিতা ও সাহসের সমন্বয়ে গঠিত এক গুণ। মুনাউয়ি বলেন যে, এটি হলো শারিরীক ও মানসিক অসুবিধা ও ব্যথার মুখোমুখি হতে পারার ক্ষমতা। এটি হলো আত্মাকে কৃপণতা ও হতাশা থেকে বিরত রাখা, জিহ্বাকে অভিযোগ করা থেকে বিরত রাখা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে বিশৃঙ্খল হওয়া থেকে বিরত রাখা। এটি হলো সকল পরিস্থিতিতে আল্লাহর হুকুমের উপর দৃঢ় থাকা এবং সর্বোত্তম উপায়ে বিপদের মোকাবেলা করা। ইবনু হিব্বান, রওদাতুল উকালা: পৃষ্ঠা ১২৬-১২৮ এ বলেন, বুদ্ধিমানের উপর আবশ্যক হলো বিপদের আগমনের শুরুতে সবর অবলম্বন করা। আর যখন সে এতে দৃঢ় হয়ে যাবে, তখন সন্তুষ্টির (রিদ্বা) পর্যায়ে উন্নীত হওয়া। কেউ যদি সবর দ্বারা পরিপুষ্ট না হয়ে থাকে, তাহলে তার উচিত নিজের মধ্যে সবরের পরিচর্যা করা (তাসাব্বর), কারণ এটিই রিদ্বার প্রথম ধাপ। মানুষের যদি সত্যিই সবর থাকে, তাহলে সে মহান হয়ে যাবে। কারণ, এটিই সকল কল্যাণের ঝরনা আর সকল আনুগত্যের ভিত্তি... এর দিকে যাওয়ার ধাপগুলো হলো সচেতনতা (ইহতিমাম), উপলব্ধি (তায়াক্কু), পরীক্ষা-নিরীক্ষা (তাহাব্বত) এবং তাসাব্বুর। এর পরেই আসে রিদ্বা। আর এটিই আত্মিক উন্নতির শিখর... তিনটি বিষয়ে সবর প্রদর্শন করতে হয়: ১) গুনাহ থেকে সবর, ২) আল্লাহর আনুগত্যে লেগে থাকার ব্যাপারে সবর, ৩) বিপদ-আপদের মুখে সবর। অনুরূপ, ইবনুল কাইয়্যিম, মাদারিজুস সালিকীন: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৬২-১৬৫
২০৬ রিদ্বা : হতাশা ও বিরক্তির বিপরীত। জুরানি একে বলেছেন তাকদীর কার্যকর হতে দেখে হৃদয়ে আনন্দ লাভ করা। ইবনুল কাইয়্যিম, মাদারিজ: খণ্ড ২, ১৮৫ পৃষ্ঠাতে উল্লেখ করেছেন যে, এটি হলো তাকদীরের ওঠা-নামায় অন্তর প্রশান্ত রাখা এবং এই বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ এতে কল্যাণকর কিছুই রেখেছেন।
বায়হাকি, শুয়াব: ২০৯-এ উল্লেখ আছে, ইবনু মাসউদ বলেন, "রিদ্বা হলো আল্লাহর অসন্তুষ্টির বিনিময়ে মানুষকে সন্তুষ্ট না করা, আল্লাহর দেওয়া রিযকের কারণে অন্য কাউকে প্রশংসা না করা, আল্লাহ যা দেননি তার জন্য অন্য কাউকে দোষারোপ না করা। কারও ইচ্ছায় আল্লাহর রিযক আসে না, আবার কেউ ইচ্ছা না করলেই তা বন্ধ হয়ে যায় না। আল্লাহ তাঁর ন্যায়বিচার ও জ্ঞানের মাধ্যমে তিনি মুক্তি ও আনন্দ রেখেছেন ইয়াকীন ও সন্তুষ্টিতে, আর দুশ্চিন্তা ও হতাশা রেখেছেন সন্দেহ ও অসন্তুষ্টিতে।”
২০৭ এই ঘটনার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। বর্ণনাকারী একজন আবিদ, পরহেজগার, তবে সকল আলিমের মতে তিনি মুরজিয়া সম্প্রদায়ের। ইমাম আবু হাতিম বলেন, "তার বর্ণনা অগ্রহণযোগ্য।" আল্লামা ইবনুল জুনাইদ বলেন, "তিনি ভুয়া হাদীস বর্ণনা করতেন।" ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল বলেন, "তিনি মুরজিয়া ছিলেন। খুব ইবাদাত করতেন। তবে হাদীস বর্ণনায় তিনি অন্যদের মত নির্ভরযোগ্য ছিলেন না।" - শর'ঈ সম্পাদক
২০৮ বুখারি: ১২৮৩-১৩০২-৭১৫৪; মুসলিম: ৬২৬; আনাস থেকে বর্ণিত।
২০৯ আহমাদ: ১৮৩২৫; নাসাঈ : ১৩০৬-১৩০৭; আম্মার ইবনু ইয়াসির এ থেকে বর্ণিত। একে সহীহ বলেছেন, ইবনু হিব্বান: ১৯৭১; হাকিম: ১৯২৩ (যাহাবি একমত); আলবানি, তাখরিজুন নাসাঈ; এবং আরনাউত।
২১০ অনুরূপ খাত্তাবি, শানুদ দু'আ: পৃষ্ঠা ১৩২
২১১ বুখারি: ১৪৬৯-৬৪৭০; মুসলিম: ১০৫৩; আবু সাইদ আল-খুদরি থেকে বর্ণিত।
২১২ তালিক বর্ণনা হিসেবে বুখারিতে উল্লেখিত। ইবনু হাজার, ফাতহ: খণ্ড ১১, ৩০৯ পৃষ্ঠায় বলেন, “আহমাদ: কিতাবুয যুহদ (১১৭)-তে এর পূর্ণাঙ্গ সূত্র উল্লেখ করেন মুজাহিদ পর্যন্ত, যিনি বলেন, "উমার বলেছেন..." এবং এটি সহীহ। এটি আরও উল্লেখ করেছেন ইবনুল মুবারাক, আয-যুহদ: ৬৩০ এবং ওয়াকি, আয-যুহদ: ১৯৮ এ।
১০ ইবনু আবু শাইবাহ, আল-ঈমান: ১৩০; ওয়াকি: ১৯৯; বায়হাকি, শুয়াব : ৪০; আবু নুয়াইম: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৭৫-৭৬; সুয়ুতি, আল-জামি: ৫১৩৬ পৃষ্ঠায় একে যঈফ বলেছেন।
২৬৪ সূরাহ আল-বাকারাহ, ২: ১৭৭
২১৫ সূরাহ আয-যুমার, ৩৯: ১০
২১৬ সূরাহ আত-তূর, ৫২: ৪৮
২১৭ সূরাহ ইউসুফ, ১২:৮৩
১১৮ অনুরূপ, তাবারি; ধৈর্য বিষয়ে ইবনুল কাইয়্যিমের বিস্তারিত আলোচনা দেখুন পরিশিষ্ট দুইয়ে।
১৯ বুখারি: ৬৪৫২; আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।
২২০ যাহাবির মতে এটি বলেছেন সুরাইহ আল-কাদি, সিয়ার: খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১০৫
২২১ মুসলিম: ২৮০৭; আনাস থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে।

📘 নবীজির সাঃ পদাঙ্ক অনুসরণ > 📄 ধৈর্য ও বিজয়

📄 ধৈর্য ও বিজয়


রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “বিজয় রয়েছে ধৈর্যের মধ্যে।” কথাটি কুরআনের এ আয়াতের অনুরূপ :
“হে ঈমানদারগণ, যখন তোমরা কোনো বাহিনীর মুখোমুখি হবে, তখন অবিচল থাকবে আর আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করবে, যাতে তোমরা সাফল্য লাভ করতে পারো।”২২২
“...তোমাদের মধ্যে বিশজন ধৈর্যশীল থাকলে তারা দুই শ জনের উপর জয়ী হবে এবং তোমাদের মধ্যে সেরূপ এক শ জন থাকলে তারা এক হাজার জনের উপর বিজয়ী হবে...”২২৩
তালূতের ঘটনার ব্যাপারে আল্লাহ বলেন :
“তারপর তালুত ও তার সাথি মুমিনগণ নদী পার হয়ে বলল, 'আজ জালুত ও তার সৈন্যদের সাথে যুদ্ধ করার শক্তি আমাদের নেই।' কিন্তু যাদের এ ধারণা ছিল যে, তাদের আল্লাহর সামনে হাজির হতে হবে, তারা বলল, 'আল্লাহর হুকুমে বহু ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র দল বৃহৎ দলের উপর জয়যুক্ত হয়েছে।' আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।”২২৪
“হ্যাঁ, যদি তোমরা ধৈর্যধারণ করো ও তাকওয়া অবলম্বন করো এবং তারা (অর্থাৎ শত্রুরা) মুহূর্তের মধ্যে এখানে তোমাদের উপর এসে পড়ে, তাহলে তোমাদের প্রতিপালক বিশেষভাবে চিহ্নিত পাঁচ সহস্র ফেরেশতা দ্বারা তোমাদের সাহায্য করবেন।”২২৫
এমন আরও অনেক আয়াত ও হাদীসে শত্রুর মোকাবেলার সময় ধৈর্যধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বানু আবাসার বয়োজ্যেষ্ঠদের উমার এ জিজ্ঞেস করলেন, “আপনারা শত্রুদের সাথে কী অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করেন?” তারা বলল, “ধৈর্য দিয়ে। আমরা যতবারই কোনো শত্রুর মুখোমুখি হয়েছি, আমরা ধৈর্যশীল ও অবিচল ছিলাম যেমন ধৈর্যশীল ও অবচিল তারা ছিল।"
একজন সালাফ বলেছেন, "আমরা সবাই মৃত্যু ও আঘাতের ব্যথা ঘৃণা করি। কিন্তু ধৈর্যের মাধ্যমে আমাদের মর্যাদা (আল্লাহর কাছে) বিভিন্ন স্তরে বৃদ্ধি পায়।”
বাত্তাল-কে সাহসের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “এটা হলো এক ঘণ্টার ধৈর্য।”
এই সবকিছু বহিঃশত্রু বা কাফিরদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও অন্তরের শত্রু তথা কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রেও সত্য। এর বিরুদ্ধে লড়াই করা জিহাদের মহত্তম প্রকারগুলোর একটি। নবীজি বলেন, “মুজাহিদ হলো সে, যে আল্লাহর জন্য নিজের নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে।”২২৬
জিহাদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা এক ব্যক্তিকে আব্দুল্লাহ ইবনু আমর জবাব দিয়েছিলেন, "নিজের নফস দিয়ে শুরু করো আর এর বিরুদ্ধে লড়াই করো। নিজের নফস দিয়ে শুরু করো আর এর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করো।”
জাবির থেকে দুর্বল সনদে বর্ণিত আছে, জিহাদ থেকে ফেরত আসা একটি দলকে রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “তোমরা ছোট যুদ্ধ থেকে বড় যুদ্ধের দিকে ফিরে এলে।” জিজ্ঞেস করা হলো, "বড় জিহাদ কী?” তিনি বলেন, "বান্দার নিজের কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াই করা।” ২২৭
উমার (রাঃ)-কে খলিফা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সময় আবু বকর (রাঃ) বললেন, “প্রথম যে বিষয়ে আপনি সাবধান থাকবেন, তা হলো আপনার নফস।” সাইদ ইবনু সিনানের সূত্রে আনাস (রাঃ) থেকে সহীহ সনদে এবং মালিক ইবনু আশজাই থেকে মুরসাল হাদীসে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, “তোমার শত্রু সে নয়, যে তোমাকে হত্যা করলে তুমি জান্নাতে প্রবেশ করো, অথবা তাকে তুমি হত্যা করলে সে তোমার জন্য নূর হয়। তোমার নিকৃষ্টতম শত্রু হলো তোমার অন্তরের কুপ্রবৃত্তি।” ২২৮
কবি আব্বাস ইবনুল আহনাফ (রহঃ) এক কবিতায় এই অর্থ তুলে এনেছেন :
আমার অন্তর আমাকে ক্ষতির দিকে ডাকে বাড়িয়ে দেয় আমার যাতনা-দুঃখবোধ, যে শত্রু আমার ভেতরেই বাস করে, তাকে কীভাবে করি প্রতিরোধ?
এই জিহাদেও ধৈর্য প্রয়োজন। যে কেউ ধৈর্যধারণ করে নিজের বিরুদ্ধে, কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে ও নিজের শয়তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, সে বিজয়ী হবে। উল্টোদিকে যে হাল ছেড়ে দেয়, সে পরাজিত ও বন্দী হবে। সে হয়ে পড়বে তার শয়তান ও কুপ্রবৃত্তির অধীনস্থ। বলা হয় : মানুষ যদি কুপ্রবৃত্তিকে না হারায় মহৎ ব্যক্তিও নিকৃষ্ট হয়ে যায়।
আরেকজন বলেন : কামনার হাতে হয়তো বন্দী থাকে কেউ তবুও ধৈর্যের মুখে হারিয়ে যায় তা, বাসনার কাছে হয়তো হয়েছে কেউ দাস কিন্তু তা দমন করে সেও হতে পারে রাজা।
ইবনুল মুবারাক বলেন, “ধৈর্যশীলদের শেষ পর্যন্ত খুব অল্পই ধৈর্য ধরা লাগে। আর যারা হতাশ হয়ে যায়, তারা সামান্যই আনন্দের খোরাক পায়।"
বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত আছে নবীজি বলেন, “শক্তিশালী সে নয়, যে ভালো কুস্তি করে। আসল শক্তিশালী হলো সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে।”২২৯
আহনাফ ইবনু কায়স-এর বর্ণনা দিতে গিয়ে এক ব্যক্তি বলেন, "রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপারে তাঁর ছিল অভাবনীয় দক্ষতা।” এক ব্যক্তি এক সালাফকে বললেন, "অমুক পানির উপর হাঁটতে পারে।” তিনি তা শুনে বললেন, “আল্লাহ যদি কাউকে তার প্রবৃত্তি দমনের ক্ষমতা দেন, সে পানির উপর হাঁটতে জানা ব্যক্তির চেয়েও শক্তিশালী।”
জেনে রাখুন, আপনার প্রবৃত্তি হলো একটি পশুর মতো। সে যদি দেখে আপনি দৃঢ় ও প্রতিজ্ঞ, তাহলে সে নড়াচড়া করে না। কিন্তু যদি সে দেখে আপনি অলস, তাহলে সে এর সুযোগ নিয়ে নিজের কামনা-বাসনার পেছনে ছুটতে শুরু করে।
আবু সুলাইমান আদ-দারানি বলতেন, "যখন আমি ইরাকে ছিলাম, তখন আমি রাজপুত্রদের প্রাসাদ, পাত্র, জামাকাপড় ও খাবারের দেখভালের দায়িত্বে ছিলাম। আমার নফস এর কোনোটিই কামনা করেনি। তারপর আমাকে খেজুরের স্তূপ দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হলে আমি প্রায় এর ফাঁদে পড়েই যাচ্ছিলাম।” এক জ্ঞানী ব্যক্তিকে তা জানানো হলে তিনি বলেন, “প্রথমটি অর্জন করার কোনো ইচ্ছা বা আশা তার ছিল না, তাই তার প্রবৃত্তি তার পেছনে ছোটেনি। কিন্তু সে দ্বিতীয়টি চাইছিল, তাই তার প্রবৃত্তি ছুটতে শুরু করে।”
শক্ত হাতে বিলাসিতা দূরে ঠেললাম যতক্ষণ না তারা দূর হয়ে গেল, নফসকে জোর করলাম সেসব ছাড়তে সে তা মেনে নিতে বাধ্য হলো। মানুষ যেদিকে নির্দেশ করে নফস তো সেদিকেই যায়, শুধু সুযোগ পেলেই কেবল সে কামনার দিকে ধায়।
অনেক দিন যাবৎ আমার নফস হয়েছে আমার উপর বিজয়ী কিন্তু যখনই দৃঢ় হয়েছি আমি নফস হয়েছে বিনয়ী।
অতএব, “বিজয় রয়েছে ধৈর্যের মধ্যে” বলার দ্বারা বাইরের ও ভেতরের উভয় ধরনের শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা বলা হচ্ছে। সালাফগণ নফসের কামনা- বাসনার বিরুদ্ধে ধৈর্যধারণ করাকে বিপদের সময় ধৈর্যধারণ করার চেয়ে উত্তম বলে জানতেন।
মায়মুন ইবনে মিহরান বলেন, “ধৈর্য দুই ধরনের। বিপদের মুখে ধৈর্যধারণ করা, যা ভালো। আর গুনাহ পরিত্যাগ করতে ধৈর্যধারণ করা, যা উত্তম।”
সাইদ ইবনু যুবাইর বলেন, “ধৈর্য দুই ধরনের। শ্রেষ্ঠ ধৈর্য হলো আল্লাহর নিষেধকৃত জিনিস পরিহার করতে ও তাঁর আদেশকৃত কাজ করতে ধৈর্যধারণ করা। অপরটি হলো বিপদের সময় ধৈর্যধারণ করা।”
একই অর্থবিশিষ্ট রাসূল ﷺ-এর একটি হাদীস আলি -এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তবে তা সহীহ নয়। ২৩০

টিকাঃ
২২২ সূরাহ আল-আনফাল, ৮: ৪৫
২২৩ সূরাহ আল-আনফাল, ৮: ৬৫
২২৪ সূরাহ আল-বাকারাহ, ২: ২৪৯
২২৫ সূরাহ আলে ইমরান, ৩: ১২৫
২২৬ আহমাদ: ২৩৯৫১; তিরমিযি: ১২৬১; ফাদালাহ থেকে বর্ণিত; আহমাদ: ২৩৯৫৭ এ এসেছে এই শব্দমালায়, "...আল্লাহর আনুগত্যের উপর।” সহীহ ইসনাদ সহকারে। আহমাদ: ২৩২৯৬৫ তে এসেছে এই শব্দমালায়, "...আল্লাহর রাস্তায়।” সহীহ ইসনাদ সহকারে। তিরমিযি : ১৬২১ এ এসেছে এই শব্দ সহকারে, "মুজাহিদ হলো সে, যে নফসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।” তিনি একে হাসান সহীহ বলেছেন। তিরমিযি একে হাসান সহীহ বলেছেন এবং একে সহীহ বলেছেন ইবনু হিব্বান : ৬৪২৪; হাকিম: ২৪; আলবানি, আস-সহীহাহ: ৫৪৯; এবং আরনাউত।
২২৭ বায়হাকি, আয-যুহদুল কাবির: ৩৭৩ এ বলেন এর ইসনাদে দুর্বলতা আছে। ইবনু রজব একে যঈফ বলেছেন যেমনটি উপরে এসেছে, এ ছাড়া এসেছে জামিউল উলুম খণ্ড ১, ৪৮৯ পৃষ্ঠায়। ইবনু তাইমিয়্যাহ, মাজমু আল-ফাতাওয়া: খণ্ড ১১, ১৯৭ পৃষ্ঠায় বলেন এর কোনো ভিত্তি নেই। আল-মুস্তাদরাক আলা মাজমু: খণ্ড ১, ২২১ পৃষ্ঠায় বলেছেন এটি সহীহ নয়। যায়লাই তাখরিজুল কাশশাফ: খণ্ড ২, ৩৯৫ পৃষ্ঠায় বলেন, এটি গারীব জিদ্দান। ইবনু হাজার, আল-কাফি: ১৯৪ পৃষ্ঠায় বলেন, “এতে লাইস ইবনু আবু সুলাইম থেকে ইয়াহইয়া ইবনু ইয়ালা, তাঁর থেকে ঈসা ইবনু ইবরাহীম রয়েছেন, যাদের সকলে যঈফ। আলবানি, আয-যঈফাহ: ২৪৬০ এ একে মুনকার বলেছেন।
মোল্লা আলি কারি, আল-আসরারুল মারফুআহ: ২২১ এ ইবনু হাজারের উদ্ধৃতি দেন যে, এটি ইবরাহীম ইবনু আবু আবলাহর একটি উক্তি। এ ছাড়া লেখক, জামিউল উলুম: খণ্ড ১, ৪৮৯ পৃষ্ঠাতেও একে তাঁর উক্তি বলেছেন।
২২৮ তাবারানি, আল-কাবির: ৩৪৪৫; আবু মালিক আল-আশআরি থেকে বর্ণিত; আলবানি একে যঈফ বলেছেন, যঈফুত তারগীব: ১৮৯০
বুখারি: ৬১১৪; মুসলিম: ২৬০৮; আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।
২৩০ ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আস-সবর: ২৪ এই শব্দমালায়, “ধৈর্য তিন ধরনের। বিপদ মোকাবেলায় ধৈর্য, আল্লাহর আনুগত্যে ধৈর্য, গুনাহ পরিহারে ধৈর্য...”

রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “বিজয় রয়েছে ধৈর্যের মধ্যে।” কথাটি কুরআনের এ আয়াতের অনুরূপ :
“হে ঈমানদারগণ, যখন তোমরা কোনো বাহিনীর মুখোমুখি হবে, তখন অবিচল থাকবে আর আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করবে, যাতে তোমরা সাফল্য লাভ করতে পারো।”২২২
“...তোমাদের মধ্যে বিশজন ধৈর্যশীল থাকলে তারা দুই শ জনের উপর জয়ী হবে এবং তোমাদের মধ্যে সেরূপ এক শ জন থাকলে তারা এক হাজার জনের উপর বিজয়ী হবে...”২২৩
তালূতের ঘটনার ব্যাপারে আল্লাহ বলেন :
“তারপর তালুত ও তার সাথি মুমিনগণ নদী পার হয়ে বলল, 'আজ জালুত ও তার সৈন্যদের সাথে যুদ্ধ করার শক্তি আমাদের নেই।' কিন্তু যাদের এ ধারণা ছিল যে, তাদের আল্লাহর সামনে হাজির হতে হবে, তারা বলল, 'আল্লাহর হুকুমে বহু ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র দল বৃহৎ দলের উপর জয়যুক্ত হয়েছে।' আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।”২২৪
“হ্যাঁ, যদি তোমরা ধৈর্যধারণ করো ও তাকওয়া অবলম্বন করো এবং তারা (অর্থাৎ শত্রুরা) মুহূর্তের মধ্যে এখানে তোমাদের উপর এসে পড়ে, তাহলে তোমাদের প্রতিপালক বিশেষভাবে চিহ্নিত পাঁচ সহস্র ফেরেশতা দ্বারা তোমাদের সাহায্য করবেন।”২২৫
এমন আরও অনেক আয়াত ও হাদীসে শত্রুর মোকাবেলার সময় ধৈর্যধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বানু আবাসার বয়োজ্যেষ্ঠদের উমার এ জিজ্ঞেস করলেন, “আপনারা শত্রুদের সাথে কী অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করেন?” তারা বলল, “ধৈর্য দিয়ে। আমরা যতবারই কোনো শত্রুর মুখোমুখি হয়েছি, আমরা ধৈর্যশীল ও অবিচল ছিলাম যেমন ধৈর্যশীল ও অবচিল তারা ছিল।"
একজন সালাফ বলেছেন, "আমরা সবাই মৃত্যু ও আঘাতের ব্যথা ঘৃণা করি। কিন্তু ধৈর্যের মাধ্যমে আমাদের মর্যাদা (আল্লাহর কাছে) বিভিন্ন স্তরে বৃদ্ধি পায়।”
বাত্তাল-কে সাহসের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “এটা হলো এক ঘণ্টার ধৈর্য।”
এই সবকিছু বহিঃশত্রু বা কাফিরদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও অন্তরের শত্রু তথা কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রেও সত্য। এর বিরুদ্ধে লড়াই করা জিহাদের মহত্তম প্রকারগুলোর একটি। নবীজি বলেন, “মুজাহিদ হলো সে, যে আল্লাহর জন্য নিজের নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে।”২২৬
জিহাদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা এক ব্যক্তিকে আব্দুল্লাহ ইবনু আমর জবাব দিয়েছিলেন, "নিজের নফস দিয়ে শুরু করো আর এর বিরুদ্ধে লড়াই করো। নিজের নফস দিয়ে শুরু করো আর এর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করো।”
জাবির থেকে দুর্বল সনদে বর্ণিত আছে, জিহাদ থেকে ফেরত আসা একটি দলকে রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “তোমরা ছোট যুদ্ধ থেকে বড় যুদ্ধের দিকে ফিরে এলে।” জিজ্ঞেস করা হলো, "বড় জিহাদ কী?” তিনি বলেন, "বান্দার নিজের কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াই করা।” ২২৭
উমার (রাঃ)-কে খলিফা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সময় আবু বকর (রাঃ) বললেন, “প্রথম যে বিষয়ে আপনি সাবধান থাকবেন, তা হলো আপনার নফস।” সাইদ ইবনু সিনানের সূত্রে আনাস (রাঃ) থেকে সহীহ সনদে এবং মালিক ইবনু আশজাই থেকে মুরসাল হাদীসে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, “তোমার শত্রু সে নয়, যে তোমাকে হত্যা করলে তুমি জান্নাতে প্রবেশ করো, অথবা তাকে তুমি হত্যা করলে সে তোমার জন্য নূর হয়। তোমার নিকৃষ্টতম শত্রু হলো তোমার অন্তরের কুপ্রবৃত্তি।” ২২৮
কবি আব্বাস ইবনুল আহনাফ (রহঃ) এক কবিতায় এই অর্থ তুলে এনেছেন :
আমার অন্তর আমাকে ক্ষতির দিকে ডাকে বাড়িয়ে দেয় আমার যাতনা-দুঃখবোধ, যে শত্রু আমার ভেতরেই বাস করে, তাকে কীভাবে করি প্রতিরোধ?
এই জিহাদেও ধৈর্য প্রয়োজন। যে কেউ ধৈর্যধারণ করে নিজের বিরুদ্ধে, কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে ও নিজের শয়তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, সে বিজয়ী হবে। উল্টোদিকে যে হাল ছেড়ে দেয়, সে পরাজিত ও বন্দী হবে। সে হয়ে পড়বে তার শয়তান ও কুপ্রবৃত্তির অধীনস্থ। বলা হয় : মানুষ যদি কুপ্রবৃত্তিকে না হারায় মহৎ ব্যক্তিও নিকৃষ্ট হয়ে যায়।
আরেকজন বলেন : কামনার হাতে হয়তো বন্দী থাকে কেউ তবুও ধৈর্যের মুখে হারিয়ে যায় তা, বাসনার কাছে হয়তো হয়েছে কেউ দাস কিন্তু তা দমন করে সেও হতে পারে রাজা।
ইবনুল মুবারাক বলেন, “ধৈর্যশীলদের শেষ পর্যন্ত খুব অল্পই ধৈর্য ধরা লাগে। আর যারা হতাশ হয়ে যায়, তারা সামান্যই আনন্দের খোরাক পায়।"
বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত আছে নবীজি বলেন, “শক্তিশালী সে নয়, যে ভালো কুস্তি করে। আসল শক্তিশালী হলো সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে।”২২৯
আহনাফ ইবনু কায়স-এর বর্ণনা দিতে গিয়ে এক ব্যক্তি বলেন, "রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপারে তাঁর ছিল অভাবনীয় দক্ষতা।” এক ব্যক্তি এক সালাফকে বললেন, "অমুক পানির উপর হাঁটতে পারে।” তিনি তা শুনে বললেন, “আল্লাহ যদি কাউকে তার প্রবৃত্তি দমনের ক্ষমতা দেন, সে পানির উপর হাঁটতে জানা ব্যক্তির চেয়েও শক্তিশালী।”
জেনে রাখুন, আপনার প্রবৃত্তি হলো একটি পশুর মতো। সে যদি দেখে আপনি দৃঢ় ও প্রতিজ্ঞ, তাহলে সে নড়াচড়া করে না। কিন্তু যদি সে দেখে আপনি অলস, তাহলে সে এর সুযোগ নিয়ে নিজের কামনা-বাসনার পেছনে ছুটতে শুরু করে।
আবু সুলাইমান আদ-দারানি বলতেন, "যখন আমি ইরাকে ছিলাম, তখন আমি রাজপুত্রদের প্রাসাদ, পাত্র, জামাকাপড় ও খাবারের দেখভালের দায়িত্বে ছিলাম। আমার নফস এর কোনোটিই কামনা করেনি। তারপর আমাকে খেজুরের স্তূপ দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হলে আমি প্রায় এর ফাঁদে পড়েই যাচ্ছিলাম।” এক জ্ঞানী ব্যক্তিকে তা জানানো হলে তিনি বলেন, “প্রথমটি অর্জন করার কোনো ইচ্ছা বা আশা তার ছিল না, তাই তার প্রবৃত্তি তার পেছনে ছোটেনি। কিন্তু সে দ্বিতীয়টি চাইছিল, তাই তার প্রবৃত্তি ছুটতে শুরু করে।”
শক্ত হাতে বিলাসিতা দূরে ঠেললাম যতক্ষণ না তারা দূর হয়ে গেল, নফসকে জোর করলাম সেসব ছাড়তে সে তা মেনে নিতে বাধ্য হলো। মানুষ যেদিকে নির্দেশ করে নফস তো সেদিকেই যায়, শুধু সুযোগ পেলেই কেবল সে কামনার দিকে ধায়।
অনেক দিন যাবৎ আমার নফস হয়েছে আমার উপর বিজয়ী কিন্তু যখনই দৃঢ় হয়েছি আমি নফস হয়েছে বিনয়ী।
অতএব, “বিজয় রয়েছে ধৈর্যের মধ্যে” বলার দ্বারা বাইরের ও ভেতরের উভয় ধরনের শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা বলা হচ্ছে। সালাফগণ নফসের কামনা- বাসনার বিরুদ্ধে ধৈর্যধারণ করাকে বিপদের সময় ধৈর্যধারণ করার চেয়ে উত্তম বলে জানতেন।
মায়মুন ইবনে মিহরান বলেন, “ধৈর্য দুই ধরনের। বিপদের মুখে ধৈর্যধারণ করা, যা ভালো। আর গুনাহ পরিত্যাগ করতে ধৈর্যধারণ করা, যা উত্তম।”
সাইদ ইবনু যুবাইর বলেন, “ধৈর্য দুই ধরনের। শ্রেষ্ঠ ধৈর্য হলো আল্লাহর নিষেধকৃত জিনিস পরিহার করতে ও তাঁর আদেশকৃত কাজ করতে ধৈর্যধারণ করা। অপরটি হলো বিপদের সময় ধৈর্যধারণ করা।”
একই অর্থবিশিষ্ট রাসূল ﷺ-এর একটি হাদীস আলি -এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তবে তা সহীহ নয়। ২৩০

টিকাঃ
২২২ সূরাহ আল-আনফাল, ৮: ৪৫
২২৩ সূরাহ আল-আনফাল, ৮: ৬৫
২২৪ সূরাহ আল-বাকারাহ, ২: ২৪৯
২২৫ সূরাহ আলে ইমরান, ৩: ১২৫
২২৬ আহমাদ: ২৩৯৫১; তিরমিযি: ১২৬১; ফাদালাহ থেকে বর্ণিত; আহমাদ: ২৩৯৫৭ এ এসেছে এই শব্দমালায়, "...আল্লাহর আনুগত্যের উপর।” সহীহ ইসনাদ সহকারে। আহমাদ: ২৩২৯৬৫ তে এসেছে এই শব্দমালায়, "...আল্লাহর রাস্তায়।” সহীহ ইসনাদ সহকারে। তিরমিযি : ১৬২১ এ এসেছে এই শব্দ সহকারে, "মুজাহিদ হলো সে, যে নফসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।” তিনি একে হাসান সহীহ বলেছেন। তিরমিযি একে হাসান সহীহ বলেছেন এবং একে সহীহ বলেছেন ইবনু হিব্বান : ৬৪২৪; হাকিম: ২৪; আলবানি, আস-সহীহাহ: ৫৪৯; এবং আরনাউত।
২২৭ বায়হাকি, আয-যুহদুল কাবির: ৩৭৩ এ বলেন এর ইসনাদে দুর্বলতা আছে। ইবনু রজব একে যঈফ বলেছেন যেমনটি উপরে এসেছে, এ ছাড়া এসেছে জামিউল উলুম খণ্ড ১, ৪৮৯ পৃষ্ঠায়। ইবনু তাইমিয়্যাহ, মাজমু আল-ফাতাওয়া: খণ্ড ১১, ১৯৭ পৃষ্ঠায় বলেন এর কোনো ভিত্তি নেই। আল-মুস্তাদরাক আলা মাজমু: খণ্ড ১, ২২১ পৃষ্ঠায় বলেছেন এটি সহীহ নয়। যায়লাই তাখরিজুল কাশশাফ: খণ্ড ২, ৩৯৫ পৃষ্ঠায় বলেন, এটি গারীব জিদ্দান। ইবনু হাজার, আল-কাফি: ১৯৪ পৃষ্ঠায় বলেন, “এতে লাইস ইবনু আবু সুলাইম থেকে ইয়াহইয়া ইবনু ইয়ালা, তাঁর থেকে ঈসা ইবনু ইবরাহীম রয়েছেন, যাদের সকলে যঈফ। আলবানি, আয-যঈফাহ: ২৪৬০ এ একে মুনকার বলেছেন।
মোল্লা আলি কারি, আল-আসরারুল মারফুআহ: ২২১ এ ইবনু হাজারের উদ্ধৃতি দেন যে, এটি ইবরাহীম ইবনু আবু আবলাহর একটি উক্তি। এ ছাড়া লেখক, জামিউল উলুম: খণ্ড ১, ৪৮৯ পৃষ্ঠাতেও একে তাঁর উক্তি বলেছেন।
২২৮ তাবারানি, আল-কাবির: ৩৪৪৫; আবু মালিক আল-আশআরি থেকে বর্ণিত; আলবানি একে যঈফ বলেছেন, যঈফুত তারগীব: ১৮৯০
বুখারি: ৬১১৪; মুসলিম: ২৬০৮; আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।
২৩০ ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আস-সবর: ২৪ এই শব্দমালায়, “ধৈর্য তিন ধরনের। বিপদ মোকাবেলায় ধৈর্য, আল্লাহর আনুগত্যে ধৈর্য, গুনাহ পরিহারে ধৈর্য...”

রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “বিজয় রয়েছে ধৈর্যের মধ্যে।” কথাটি কুরআনের এ আয়াতের অনুরূপ :
“হে ঈমানদারগণ, যখন তোমরা কোনো বাহিনীর মুখোমুখি হবে, তখন অবিচল থাকবে আর আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করবে, যাতে তোমরা সাফল্য লাভ করতে পারো।”২২২
“...তোমাদের মধ্যে বিশজন ধৈর্যশীল থাকলে তারা দুই শ জনের উপর জয়ী হবে এবং তোমাদের মধ্যে সেরূপ এক শ জন থাকলে তারা এক হাজার জনের উপর বিজয়ী হবে...”২২৩
তালূতের ঘটনার ব্যাপারে আল্লাহ বলেন :
“তারপর তালুত ও তার সাথি মুমিনগণ নদী পার হয়ে বলল, 'আজ জালুত ও তার সৈন্যদের সাথে যুদ্ধ করার শক্তি আমাদের নেই।' কিন্তু যাদের এ ধারণা ছিল যে, তাদের আল্লাহর সামনে হাজির হতে হবে, তারা বলল, 'আল্লাহর হুকুমে বহু ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র দল বৃহৎ দলের উপর জয়যুক্ত হয়েছে।' আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।”২২৪
“হ্যাঁ, যদি তোমরা ধৈর্যধারণ করো ও তাকওয়া অবলম্বন করো এবং তারা (অর্থাৎ শত্রুরা) মুহূর্তের মধ্যে এখানে তোমাদের উপর এসে পড়ে, তাহলে তোমাদের প্রতিপালক বিশেষভাবে চিহ্নিত পাঁচ সহস্র ফেরেশতা দ্বারা তোমাদের সাহায্য করবেন।”২২৫
এমন আরও অনেক আয়াত ও হাদীসে শত্রুর মোকাবেলার সময় ধৈর্যধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বানু আবাসার বয়োজ্যেষ্ঠদের উমার এ জিজ্ঞেস করলেন, “আপনারা শত্রুদের সাথে কী অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করেন?” তারা বলল, “ধৈর্য দিয়ে। আমরা যতবারই কোনো শত্রুর মুখোমুখি হয়েছি, আমরা ধৈর্যশীল ও অবিচল ছিলাম যেমন ধৈর্যশীল ও অবচিল তারা ছিল।"
একজন সালাফ বলেছেন, "আমরা সবাই মৃত্যু ও আঘাতের ব্যথা ঘৃণা করি। কিন্তু ধৈর্যের মাধ্যমে আমাদের মর্যাদা (আল্লাহর কাছে) বিভিন্ন স্তরে বৃদ্ধি পায়।”
বাত্তাল-কে সাহসের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “এটা হলো এক ঘণ্টার ধৈর্য।”
এই সবকিছু বহিঃশত্রু বা কাফিরদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও অন্তরের শত্রু তথা কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রেও সত্য। এর বিরুদ্ধে লড়াই করা জিহাদের মহত্তম প্রকারগুলোর একটি। নবীজি বলেন, “মুজাহিদ হলো সে, যে আল্লাহর জন্য নিজের নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে।”২২৬
জিহাদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা এক ব্যক্তিকে আব্দুল্লাহ ইবনু আমর জবাব দিয়েছিলেন, "নিজের নফস দিয়ে শুরু করো আর এর বিরুদ্ধে লড়াই করো। নিজের নফস দিয়ে শুরু করো আর এর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করো।”
জাবির থেকে দুর্বল সনদে বর্ণিত আছে, জিহাদ থেকে ফেরত আসা একটি দলকে রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “তোমরা ছোট যুদ্ধ থেকে বড় যুদ্ধের দিকে ফিরে এলে।” জিজ্ঞেস করা হলো, "বড় জিহাদ কী?” তিনি বলেন, "বান্দার নিজের কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াই করা।” ২২৭
উমার (রাঃ)-কে খলিফা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সময় আবু বকর (রাঃ) বললেন, “প্রথম যে বিষয়ে আপনি সাবধান থাকবেন, তা হলো আপনার নফস।” সাইদ ইবনু সিনানের সূত্রে আনাস (রাঃ) থেকে সহীহ সনদে এবং মালিক ইবনু আশজাই থেকে মুরসাল হাদীসে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, “তোমার শত্রু সে নয়, যে তোমাকে হত্যা করলে তুমি জান্নাতে প্রবেশ করো, অথবা তাকে তুমি হত্যা করলে সে তোমার জন্য নূর হয়। তোমার নিকৃষ্টতম শত্রু হলো তোমার অন্তরের কুপ্রবৃত্তি।” ২২৮
কবি আব্বাস ইবনুল আহনাফ (রহঃ) এক কবিতায় এই অর্থ তুলে এনেছেন :
আমার অন্তর আমাকে ক্ষতির দিকে ডাকে বাড়িয়ে দেয় আমার যাতনা-দুঃখবোধ, যে শত্রু আমার ভেতরেই বাস করে, তাকে কীভাবে করি প্রতিরোধ?
এই জিহাদেও ধৈর্য প্রয়োজন। যে কেউ ধৈর্যধারণ করে নিজের বিরুদ্ধে, কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে ও নিজের শয়তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, সে বিজয়ী হবে। উল্টোদিকে যে হাল ছেড়ে দেয়, সে পরাজিত ও বন্দী হবে। সে হয়ে পড়বে তার শয়তান ও কুপ্রবৃত্তির অধীনস্থ। বলা হয় : মানুষ যদি কুপ্রবৃত্তিকে না হারায় মহৎ ব্যক্তিও নিকৃষ্ট হয়ে যায়।
আরেকজন বলেন : কামনার হাতে হয়তো বন্দী থাকে কেউ তবুও ধৈর্যের মুখে হারিয়ে যায় তা, বাসনার কাছে হয়তো হয়েছে কেউ দাস কিন্তু তা দমন করে সেও হতে পারে রাজা।
ইবনুল মুবারাক বলেন, “ধৈর্যশীলদের শেষ পর্যন্ত খুব অল্পই ধৈর্য ধরা লাগে। আর যারা হতাশ হয়ে যায়, তারা সামান্যই আনন্দের খোরাক পায়।"
বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত আছে নবীজি বলেন, “শক্তিশালী সে নয়, যে ভালো কুস্তি করে। আসল শক্তিশালী হলো সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে।”২২৯
আহনাফ ইবনু কায়স-এর বর্ণনা দিতে গিয়ে এক ব্যক্তি বলেন, "রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপারে তাঁর ছিল অভাবনীয় দক্ষতা।” এক ব্যক্তি এক সালাফকে বললেন, "অমুক পানির উপর হাঁটতে পারে।” তিনি তা শুনে বললেন, “আল্লাহ যদি কাউকে তার প্রবৃত্তি দমনের ক্ষমতা দেন, সে পানির উপর হাঁটতে জানা ব্যক্তির চেয়েও শক্তিশালী।”
জেনে রাখুন, আপনার প্রবৃত্তি হলো একটি পশুর মতো। সে যদি দেখে আপনি দৃঢ় ও প্রতিজ্ঞ, তাহলে সে নড়াচড়া করে না। কিন্তু যদি সে দেখে আপনি অলস, তাহলে সে এর সুযোগ নিয়ে নিজের কামনা-বাসনার পেছনে ছুটতে শুরু করে।
আবু সুলাইমান আদ-দারানি বলতেন, "যখন আমি ইরাকে ছিলাম, তখন আমি রাজপুত্রদের প্রাসাদ, পাত্র, জামাকাপড় ও খাবারের দেখভালের দায়িত্বে ছিলাম। আমার নফস এর কোনোটিই কামনা করেনি। তারপর আমাকে খেজুরের স্তূপ দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হলে আমি প্রায় এর ফাঁদে পড়েই যাচ্ছিলাম।” এক জ্ঞানী ব্যক্তিকে তা জানানো হলে তিনি বলেন, “প্রথমটি অর্জন করার কোনো ইচ্ছা বা আশা তার ছিল না, তাই তার প্রবৃত্তি তার পেছনে ছোটেনি। কিন্তু সে দ্বিতীয়টি চাইছিল, তাই তার প্রবৃত্তি ছুটতে শুরু করে।”
শক্ত হাতে বিলাসিতা দূরে ঠেললাম যতক্ষণ না তারা দূর হয়ে গেল, নফসকে জোর করলাম সেসব ছাড়তে সে তা মেনে নিতে বাধ্য হলো। মানুষ যেদিকে নির্দেশ করে নফস তো সেদিকেই যায়, শুধু সুযোগ পেলেই কেবল সে কামনার দিকে ধায়।
অনেক দিন যাবৎ আমার নফস হয়েছে আমার উপর বিজয়ী কিন্তু যখনই দৃঢ় হয়েছি আমি নফস হয়েছে বিনয়ী।
অতএব, “বিজয় রয়েছে ধৈর্যের মধ্যে” বলার দ্বারা বাইরের ও ভেতরের উভয় ধরনের শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা বলা হচ্ছে। সালাফগণ নফসের কামনা- বাসনার বিরুদ্ধে ধৈর্যধারণ করাকে বিপদের সময় ধৈর্যধারণ করার চেয়ে উত্তম বলে জানতেন।
মায়মুন ইবনে মিহরান বলেন, “ধৈর্য দুই ধরনের। বিপদের মুখে ধৈর্যধারণ করা, যা ভালো। আর গুনাহ পরিত্যাগ করতে ধৈর্যধারণ করা, যা উত্তম।”
সাইদ ইবনু যুবাইর বলেন, “ধৈর্য দুই ধরনের। শ্রেষ্ঠ ধৈর্য হলো আল্লাহর নিষেধকৃত জিনিস পরিহার করতে ও তাঁর আদেশকৃত কাজ করতে ধৈর্যধারণ করা। অপরটি হলো বিপদের সময় ধৈর্যধারণ করা।”
একই অর্থবিশিষ্ট রাসূল ﷺ-এর একটি হাদীস আলি -এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তবে তা সহীহ নয়। ২৩০

টিকাঃ
২২২ সূরাহ আল-আনফাল, ৮: ৪৫
২২৩ সূরাহ আল-আনফাল, ৮: ৬৫
২২৪ সূরাহ আল-বাকারাহ, ২: ২৪৯
২২৫ সূরাহ আলে ইমরান, ৩: ১২৫
২২৬ আহমাদ: ২৩৯৫১; তিরমিযি: ১২৬১; ফাদালাহ থেকে বর্ণিত; আহমাদ: ২৩৯৫৭ এ এসেছে এই শব্দমালায়, "...আল্লাহর আনুগত্যের উপর।” সহীহ ইসনাদ সহকারে। আহমাদ: ২৩২৯৬৫ তে এসেছে এই শব্দমালায়, "...আল্লাহর রাস্তায়।” সহীহ ইসনাদ সহকারে। তিরমিযি : ১৬২১ এ এসেছে এই শব্দ সহকারে, "মুজাহিদ হলো সে, যে নফসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।” তিনি একে হাসান সহীহ বলেছেন। তিরমিযি একে হাসান সহীহ বলেছেন এবং একে সহীহ বলেছেন ইবনু হিব্বান : ৬৪২৪; হাকিম: ২৪; আলবানি, আস-সহীহাহ: ৫৪৯; এবং আরনাউত।
২২৭ বায়হাকি, আয-যুহদুল কাবির: ৩৭৩ এ বলেন এর ইসনাদে দুর্বলতা আছে। ইবনু রজব একে যঈফ বলেছেন যেমনটি উপরে এসেছে, এ ছাড়া এসেছে জামিউল উলুম খণ্ড ১, ৪৮৯ পৃষ্ঠায়। ইবনু তাইমিয়্যাহ, মাজমু আল-ফাতাওয়া: খণ্ড ১১, ১৯৭ পৃষ্ঠায় বলেন এর কোনো ভিত্তি নেই। আল-মুস্তাদরাক আলা মাজমু: খণ্ড ১, ২২১ পৃষ্ঠায় বলেছেন এটি সহীহ নয়। যায়লাই তাখরিজুল কাশশাফ: খণ্ড ২, ৩৯৫ পৃষ্ঠায় বলেন, এটি গারীব জিদ্দান। ইবনু হাজার, আল-কাফি: ১৯৪ পৃষ্ঠায় বলেন, “এতে লাইস ইবনু আবু সুলাইম থেকে ইয়াহইয়া ইবনু ইয়ালা, তাঁর থেকে ঈসা ইবনু ইবরাহীম রয়েছেন, যাদের সকলে যঈফ। আলবানি, আয-যঈফাহ: ২৪৬০ এ একে মুনকার বলেছেন।
মোল্লা আলি কারি, আল-আসরারুল মারফুআহ: ২২১ এ ইবনু হাজারের উদ্ধৃতি দেন যে, এটি ইবরাহীম ইবনু আবু আবলাহর একটি উক্তি। এ ছাড়া লেখক, জামিউল উলুম: খণ্ড ১, ৪৮৯ পৃষ্ঠাতেও একে তাঁর উক্তি বলেছেন।
২২৮ তাবারানি, আল-কাবির: ৩৪৪৫; আবু মালিক আল-আশআরি থেকে বর্ণিত; আলবানি একে যঈফ বলেছেন, যঈফুত তারগীব: ১৮৯০
বুখারি: ৬১১৪; মুসলিম: ২৬০৮; আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।
২৩০ ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আস-সবর: ২৪ এই শব্দমালায়, “ধৈর্য তিন ধরনের। বিপদ মোকাবেলায় ধৈর্য, আল্লাহর আনুগত্যে ধৈর্য, গুনাহ পরিহারে ধৈর্য...”

📘 নবীজির সাঃ পদাঙ্ক অনুসরণ > 📄 কষ্টের সাথে স্বস্তি

📄 কষ্টের সাথে স্বস্তি


নবীজি বলেন, “কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।” এর সমর্থন রয়েছে আল্লাহ তা'আলার এই আয়াতে :
“মানুষ নিরাশ হয়ে যাওয়ার পর তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন আর স্বীয় রহমত ছড়িয়ে দেন। তিনিই সকল গুণে প্রশংসিত প্রকৃত অভিভাবক।”২৩১
"আল্লাহ, যিনি বায়ু প্রেরণ করেন, অতঃপর তা মেঘমালার সঞ্চার করেন, অতঃপর তিনি তা আকাশে ছড়িয়ে দেন যেভাবে ইচ্ছে করেন, অতঃপর তাকে খণ্ড-বিখণ্ড করে দেন, তারপর তুমি দেখতে পাও তার মাঝ থেকে বৃষ্টিফোঁটা নির্গত হচ্ছে, অতঃপর তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাদের নিকট তিনি ইচ্ছে করেন তাদের কাছে যখন তা পৌঁছে দেন, তখন তারা হয় আনন্দিত। যদিও ইতঃপূর্বে তাদের প্রতি বৃষ্টি বর্ষণের পূর্বে তারা ছিল চরমভাবে হতাশ।”২৩২
আবু রাযিন আল-উকাইলি থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে আছে, নবীজি বলেন, “আমাদের রব সেই বান্দার হতাশা দেখে হাসেন, যার অবস্থা তিনি শীঘ্রই পরিবর্তন করতে চলেছেন।”২৩৩ ইমাম আহমাদ এটি বর্ণনা করেন। তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহ-ও আবু রাজিন-এর সূত্রে একটি দীর্ঘ হাদীস বর্ণনা করেন যেখানে নবীজি বলেন, “যেই দিনে বৃষ্টি পাঠানো হবে, আল্লাহ তোমাদের হতাশ অবস্থায় দেখবেন এবং তিনি হাসবেন এটি জেনে যে, তিনি শীঘ্রই অবস্থার পরিবর্তন আনতে চলেছেন।” ২৩৪
এর অর্থ হলো আল্লাহ তাঁর বান্দার হতাশা, নিরাশা, ভয়, ভুল বোঝা ও তাঁর রহমতের আশা ছেড়ে দেওয়া দেখে বিস্মিত হন, অথচ তিনি নির্ধারিত করে দিয়েছেন যে, তাদের অজান্তেই অবস্থা শীঘ্রই পরিবর্তিত হবে, বৃষ্টি নেমে আসবে।
এক জুমু'আর দিন নবীজি ﷺ যখন খুতবা দিচ্ছিলেন, এক ব্যক্তি এসে খরা ও জনগণের দুর্দশার ব্যাপারে অভিযোগ করল। নবীজি ﷺ হাত তুলে বৃষ্টির জন্য দু'আ করলেন। আকাশে মেঘ জমে পরবর্তী জুমু'আ পর্যন্ত বৃষ্টি হতে লাগল। তখন লোকেরা এসে বৃষ্টি বন্ধের জন্য দু'আ করতে অনুরোধ করল। এরপর আকাশ পরিষ্কার হলো।২৩৫
আল্লাহ তাঁর কিতাবে এমন অনেক কাহিনি বলেছেন যেখানে দুঃখ-দুর্দশার পর প্রশান্তি আসে। তিনি নূহ -এর কথা বলেছেন, যাকে তাঁর সাথের মুমিনদের সহ আল্লাহ 'মহাবিপদ' থেকে উদ্ধার করেছেন, যখন বাকি সবাই ডুবে গিয়েছিল।২৩৬ আল্লাহ জানিয়েছেন কীভাবে তিনি মুশরিকদের প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ড থেকে ইবরাহীম -কে উদ্ধার করেছেন এবং তাকে তাঁর জন্য 'প্রশান্তিদায়ক ঠান্ডা' করে দিয়েছেন। ২৩৭ আরও বলেছেন ইবরাহীম  তাঁর সন্তানকে কুরবানি করার শেষ মুহূর্তে এক 'উত্তম কুরবানি'র২৩৮ বিনিময়ে ইসমাঈল -এর প্রাণ বাঁচান। তিনি জানিয়েছেন কীভাবে মূসা -কে তাঁর মা নদীতে ভাসিয়ে দেন এবং তিনি ফিরআউনের পরিবারের কাছে এসে ভিড়েন। আরও জানিয়েছেন মূসা  ও ফিরআউনের মধ্যকার দ্বন্দ্বের কাহিনি, কীভাবে আল্লাহ মূসা -কে বাঁচিয়ে তাঁর শত্রুদের ডুবিয়ে দেন। তিনি আইয়ুব , ইউনুস , ইয়াকুব , ইউসুফ -এর কাহিনি বর্ণনা করেছেন। ইউনুস -এর জনপদ ঈমান আনার পর কী হলো, তা বর্ণনা করেছেন। মুহাম্মাদ ﷺ-এর জীবনের অনেক ঘটনা বর্ণনা করেছেন। গারে সাওর এবং বদর, উহুদ ও হুনাইনের যুদ্ধে কীভাবে সাহায্য করেছেন, তা জানিয়েছেন।
আয়িশা -কে লোকেরা মিথ্যা অপবাদ প্রদানের পর আল্লাহ তাঁর নিষ্পাপতা ঘোষণা করেছেন। ২**৩৯** আল্লাহ আরও জানিয়েছেন তিন ব্যক্তির কাহিনি :
"...যারা (তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা থেকে) পেছনে থেকে গিয়েছিল। তারা অনুশোচনার আগুনে এমনই দগ্ধ যে, পৃথিবী তার পূর্ণ বিস্তৃতি নিয়েও তাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল আর তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠল আর তারা বুঝতে পারল যে, আল্লাহ ছাড়া তাদের কোনো আশ্রয়স্থল নেই তাঁর কাছে ফিরে যাওয়া ব্যতীত। অতঃপর তিনি তাদের অনুগ্রহ করলেন, যাতে তারা অনুশোচনায় তার দিকে ফিরে আসে... "২**৪০**
সুন্নাহয়ও এমন অনেক কাহিনি আছে। যেমন গুহায় আটকা পড়া তিন ব্যক্তি, যারা নিজেদের আমলের দোহাই দিয়ে দু'আ করে মুক্তি পান। ২**৪১** আরও আছে ইবরাহীম ও সারাহ-এর কাহিনি, যেখানে যালিম বাদশাহ তাঁদের নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করতে বন্দী করে কিন্তু আল্লাহ তার পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেন। ২**৪২**
উম্মাতে মুহাম্মাদী এবং এর আগের উম্মাতদের এমন অনেক কাহিনি বিবৃত হয়েছে অনেক কিতাবে। যেমন: ইবনু আবিদ্দুনিয়া আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ, মুজাবিউদ্দু'আ এবং আরেকটি কিতাব আল-মুস্তাগিসিনা বিল্লাহ ওয়াল মুস্তাস্রিখিনা বিহি, এ ছাড়া আওলিয়াগণের কারামাত-সংক্রান্ত কিতাব, সৎকর্মশীলদের জীবনী ও ইতিহাসের কিতাব।
একজন আলিম-সম্ভবত তিনি মরোক্কোর, তাঁর এক বইয়ে হাফিয আবু যার আল- হারাওয়ি থেকে একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। তিনি যখন বাগদাদে এক সুগন্ধী বিক্রেতার দোকানে আবু হাফস ইবনু শাহিন -কে পড়ে শোনাচ্ছিলেন, তিনি এক লোককে এসে দশ দিরহাম দিয়ে সুগন্ধী বিক্রেতার কাছ থেকে কিছু কিনতে দেখলেন। সে ক্রয়কৃত জিনিসগুলো একটি টুকরিতে রেখে মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় সে পড়ে গিয়ে সব জিনিস ভেঙে গেল। লোকটি কান্না করতে করতে জানাল যে, সে একবার এক কাফেলায় উট ও তার পিঠে থাকা চার শ দিরহাম এবং তার চেয়েও দামি কিছু রত্নপাথর হারায়। তাতেও সে কিছু মনে করেনি। কিন্তু এখন তার ছেলে হয়েছে। প্রসবের পর নারীর যা যা লাগে, তা সে কিনে ফিরছিল। এই দশ দিরহামই তার ছিল। এখন তাও শেষ। পরের দিন তার কোনো কাজও নেই যে অর্থ কামাই করবে। এখন সে কেবল পালিয়ে গিয়ে স্ত্রী-সন্তানকে শান্তিতে মরতে দিতে পারে। আল-জুন্দের এক বয়স্ক লোক ঘরের দাওয়ায় বসে তা শুনতে পেলেন। তিনি কয়েকজন সহকর্মীসহ অনুমতি নিয়ে আবু হাফস-এর ঘরে এলেন। বিপদে পড়া লোকটিও তাঁদের সাথে ছিল। তিনি লোকটিকে তার কাহিনি আবার শোনাতে বলেন। এরপর জিজ্ঞেস করেন তার হারানো উটটি দেখলে সে চিনবে কি না। সে জানাল চিনবে। তিনি একটি উট এনে দিলে লোকটি তা চিনতে পারে এবং তার সাথে থাকা রত্নপাথরগুলোও সাথে পায়। ফলে সে আবার ধনী হয়ে ফিরে গেল। সে চলে যাবার পর জুন্দী লোকটি কাঁদতে লাগলেন। জিজ্ঞেস করার পর তিনি বলেন, “আমি দু'আ করেছিলাম উটের মালিককে খুঁজে পাবার আগ পর্যন্ত যেন আমি বেঁচে থাকি। আজ যেহেতু আমার সে দু'আ কবুল হয়ে গেছে, আমি বুঝতে পারছি আমার মৃত্যু নিকটবর্তী।” আবু যার জানান, “তিনি অল্প ক'দিন পরই মারা যান। আমরা তাঁর জানাযা আদায় করি। আল্লাহ তাঁকে রহম করুন।”
একই লেখক আরেকটি কাহিনি বর্ণনা করেন। মওসুলে এক ব্যবসায়ী ছিল, যে নানা জায়গায় ঘুরেফিরে ব্যবসা করত। একবার সকল সহায়সম্পত্তি ও ব্যবসায়িক মালামাল নিয়ে সে কুফায় ব্যবসা করতে গেল। পথে এক ব্যক্তির সাথে দেখা হলো যে তার অনেক উপকার করল। তারা দ্রুত বন্ধু হয় গেল এবং সে তাকে বিশ্বাস করে বসল। এক জায়গায় বিশ্রাম নিতে থামলে ওই ব্যক্তি সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীর সবকিছু নিয়ে যায়। ব্যবসায়ী একদম কপর্দকশূন্য হয়ে যায়। সে অনেক খুঁজেও চোরকে খুঁজে পেল না। পায়ে হেঁটে ধুঁকে ধুঁকে সে নিজ দেশে ফিরল। তার পরিবার তাকে দেখে খুশি হয়ে উঠল। তার স্ত্রী এক সন্তানের জন্ম দিয়েছে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, জ্বালানি ও খাবার কিছুই ঘরে নেই। তারা ভেবেছিল সে ফিরে আসায় এখন সেসবের ব্যবস্থা হবে। এই ঘটনা শুনে ব্যবসায়ীর কষ্ট আরও বেড়ে গেল। কিছু না জানিয়ে সে বাজারের দিকে গেল। দোকানদারকে সালাম দিয়ে সে তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জড়ো করে কিছু বলতে যাবে, এমন সময় দোকানদারের কাছে অরক্ষিত অবস্থায় সে তার ঘোড়ায় ঝোলানোর থলিটি পড়ে থাকতে দেখতে পেল। সে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল এই জিনিস সে কোথায় পেয়েছে। দোকানদার জানাল এক ব্যক্তি সফর করে এসে তার কাছে এগুলো আমানত রেখেছে। সে মাসজিদে ঘুমোচ্ছে। ব্যবসায়ী থলিটি নিয়ে মাসজিদে গিয়ে সেই লোককে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখল। সে তাকে লাথি মেরে জাগিয়ে দিয়ে বলল, “চোর! বিশ্বাসঘাতক! আমার জিনিসপত্র কোথায়?” চোরটি জানাল তার সেই থলিতেই সব আছে। ব্যবসায়ী তখন থলি খুলে তাতে নিজের সকল জিনিস খুঁজে পেল। সে তারপর তার পরিবারের জন্য দুই হাত খুলে খরচ করল।
একই রকম একটি দীর্ঘ কাহিনি তিন্নাওখি বর্ণনা করেছেন আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ গ্রন্থে। এর সারসংক্ষেপ হলো: খলিফা হারুন আর-রশিদের আমলে এক টাকা লেনদেনকারী ছিল। সে পাঁচ শ দিনার দিয়ে এক দাসী ক্রয় করল। সে দাসীকে এতই ভালোবেসে ফেলল যে, সব সময় তার সাথে থাকতে থাকতে তার ব্যবসায় ক্ষতি হওয়া শুরু হলো। তার পুরো মূলধন খরচ হয়ে গিয়ে কিছুই বাকি থাকল না। তার দাসী গর্ভবতী হয়ে গেল। লোকটি তার ঘরের জিনিসপত্র বেচতে বেচতে শেষ পর্যন্ত আর কিছুই বাকি রইল না। প্রসববেদনা উঠলে নারীটি তাকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে তাড়া দিলো। বলল যে, সেগুলো যথাসময়ে না পেলে সে মারা যাবে। লোকটি ঘর থেকে বের হয়ে ফুরাত নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিল। শেষ মুহূর্তে তাকে আল্লাহর ভয় পেয়ে বসল। সে আত্মহত্যার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে পায়ে হেঁটে এক শহর থেকে আরেক শহরে যেতে লাগল। শেষমেশ সে খুরাসানে পৌঁছে কাজ পেল। সে সেখান থেকে বাগদাদে তার দাসীর কাছে পর পর ছেষট্টিটি চিঠি লিখেও কোনো জবাব পেল না। সে ধরে নিল তার দাসী সত্যিই মারা গেছে। ত্রিশ বছর খুরাসানে থেকে সে আবারও ধনী হয়ে গেল। তখন সে বাগদাদে নিজ ভূমে ফেরার সিদ্ধান্ত নিল। পথিমধ্যে ডাকাতি হয়ে সে আবার আগের মতো কপর্দকহীন হয়ে গেল। বাগদাদে ফিরে সে নিজের ঘরের ঠিকানায় গিয়ে দেখল সেখানে আলিশান এক বাড়ি। তাতে পাহারাদার দাঁড় করানো। সে প্রহরীকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, এই ঘরের মালিক কে? প্রহরী জানাল একজন টাকা লেনদেনকারী এ ঘরের মালিক। যে নাম তাকে বলা হলো, তা তার নিজেরই নাম। আরও বিস্তারিত জানতে চাইলে প্রহরী বলল যে, এই ঘরের মালিকের মা হলেন আমীরুল মুমিনীনের ছেলেরও ধাত্রী মাতা। আমীরুল মুমিনীনের মামুন নামে এক ছেলে হয়। সে এই মহিলা ছাড়া আর কারও দুধ খেতে চাইত না। মামুন যখন খলিফা হলেন, তিনি সেই মহিলাকে আর তার ছেলেকে যত্ন-আত্তি করেন। ছেলেটি বড় হলে খলিফা তাকে বাইতুল মালের রক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। সেই মহিলা এখন কিছুদিন খলিফার কাছে থাকে, আর কিছুদিন এই বাড়িতে নিজের ছেলের কাছে থাকে। প্রহরীর কাছে সে এই মহিলার স্বামীর
ব্যাপারে জানতে চাইলো। প্রহরী জানাল, ত্রিশ বছর আগে এই বাড়ির মালিকের যখন জন্ম হচ্ছিল তখন তার বাবা অর্থের সন্ধানে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় আর পথ হারিয়ে ফেলে। সে আর ফিরে আসেনি, হয়তো মারা গেছে। তাদের কথোপকথনের পর নিজের লোকজনসহ তার ছেলে ফিরে আসে। লোকটি তাকে পরিচয় দিয়ে বলে সে তার বাবা। ছেলেটি বিস্মিত হয়ে যায়। তাকে ঘরের ভেতরে নিয়ে বসায়। সেখানে একটি পর্দাঘেরা জায়গা ছিল। লোকটি বলল, “তুমি যদি আমার কথা বিশ্বাস না করো, তাহলে তাকে জিজ্ঞেস করতে পারো।” কথা শুনে সেই দাসীটি বেরিয়ে এসে নিজের স্বামীকে চিনতে পেরে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে খেতে কাঁদতে লাগল। তারা তাকে আমীরুল মুমিনীনের কাছে নিয়ে গেল। খলিফা আল-মামুন তার ছেলেকে পদোন্নতি দিলেন আর তাকে তার ছেলের আগের পদে নিয়োগ দিলেন।
ইবনু আবিদ্দুনিয়া তাঁর আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ওয়াদ্দাহ ইবনু খাইসামা বলেন, “উমার বিন আব্দুল আযীয আমাকে এক কারাগার থেকে সকল বন্দীকে মুক্তি দেওয়ার আদেশ দিলেন। আমি ইয়াযিদ ইবনু আবি মুসলিম ছাড়া বাকি সবাইকে ছেড়ে দিলাম। সে প্রতিশোধ হিসেবে আমার প্রাণ নেওয়ার হুমকি দিলো। আমি আফ্রিকায় থাকা অবস্থায় শুনলাম আফ্রিকান প্রদেশগুলোর সম্প্রতি নিযুক্ত আমির ইয়াযিদ ইবনু আবি মুসলিম আসছে। আমি পালিয়ে গেলাম। সে আমাকে ধরতে একের পর এক লোক পাঠাতে লাগল। একসময় আমি ধরা পড়লাম আর আমাকে তার কাছে নেওয়া হলো। সে বলল, 'আল্লাহর কসম! আমি বারবার দু'আ করেছি তোমাকে আমার কাছে পাওয়ার জন্য।' আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম! আমি বারবার দু'আ করেছি তিনি যেন তোমার অনিষ্ট থেকে আমাকে রক্ষা করেন।' সে বলল, 'আল্লাহর কসম! তিনি তোমাকে নিরাপত্তা দেননি আর আমি তোমাকে হত্যা করব। এমনকি মৃত্যুর ফেরেশতাও যদি তোমার প্রাণ নিতে আমার সাথে পাল্লা দেন, তিনি পরাজিত হবেন। তরবারি আর জল্লাদের চাদর নিয়ে এসো!' আমাকে তাতে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে আমার মাথায় জল্লাদ তলোয়ার ঠেকাল। এমন সময় সালাতের আযান হলো। সে সালাত পড়তে চলে গেল। সে সেজদায় থাকা অবস্থায় একদল সেনা আক্রমণ করে তাকে হত্যা করে ফেলল। এক লোক এসে আমার হাতের বাঁধন কেটে দিয়ে আমাকে নিজের রাস্তায় চলে যেতে বলল।”
উমার আস-সারায়ার সূত্রে তিনি আরেকটি ঘটনা বর্ণনা করেন। উমার একবার রোমান প্রদেশগুলোতে একাকী অবস্থান করছিলেন। তিনি ঘুমানো অবস্থায় তাদের একজন এসে তাঁকে পাড়া দিয়ে ঘুম থেকে তুলে বলল, “অ্যাই আরব, তোমাকে
বেছে নেওয়ার সুযোগ দিলাম। তোমাকে আমি বর্শা দিয়ে হত্যা করতে পারি, তলোয়ার দিয়ে হত্যা করতে পারি অথবা আমরা কুস্তি করতে পারি।” তিনি বললেন, "তাহলে আমরা কুস্তি লড়ব।” সে তাঁকে হারিয়ে দিয়ে তাঁর বুকের উপর বসে বলল, “বল, তোকে কীভাবে হত্যা করব।” তিনি চিৎকার করলেন, “হে আল্লাহ, আপনার মহত্ত্ব ছাড়া আপনার আরশের নিচের আর যা কিছুর ইবাদাত করা হয়, সব মিথ্যে! আপনি আমার অবস্থা দেখছেন। অতএব আমাকে উদ্ধার করুন।” তিনি তারপর অজ্ঞান হয়ে গেলেন। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন তিনি ওই রোমানকে তাঁর পাশে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলেন।
আবুল হাসান ইবনু জাদহাম বর্ণনা করেন, হাতিম আল-আসাম বলেন, "আমরা তুর্কিদের মুখোমুখি হলাম এবং দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হলাম। এক তুর্কি আমাকে ঘোড়া থেকে ফেলে দিলো। তারপর ঘোড়া থেকে নেমে এসে আমার বুকে চড়ে বসল। আমার দাড়ি ধরে সে নিজের মোজা থেকে একটি চাকু বের করে আমাকে জবাই করতে উদ্যত হলো। কিন্তু আমার হৃদয় তার বা তার চাকুতে মগ্ন ছিল না। তা মগ্ন ছিল আমার মালিকের মাঝে। আমি ভাবলাম, 'হে মালিক, আপনি যদি এখানে আমার জবাই তাকদীরে রেখে থাকেন, আমি এর প্রতি নিজেকে সমর্পণ করলাম। আমি আপনারই।' এমতাবস্থায় এক মুসলিম তার দিকে একটি তির ছুড়ে মারল আর সে আমার উপর থেকে পড়ে গেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে তার চাকু নিয়ে তাকে জবাই করে দিলাম।”
অতএব, আপনার হৃদয়কে আপনার মনিবের হাতে সঁপে দিন। দেখবেন সাহায্যের এমন সব দুয়ার খুলে যাচ্ছে, যা আপনার পূর্বপুরুষদের কেউ দেখেনি।

টিকাঃ
২০১ সূরাহ আশ-শুরা, ৪২: ২৮
২০২ সূরাহ আর-রূম, ৩০ : ৪৮-৪৯
২০৩ আহমাদ: ১৬১৮৭-১৬২০১; ইবনু মাজাহ: ১৮১; আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ, আস-সুন্নাহ: ৪৫২-৪৫৩; ইবনু তাইমিয়্যাহ, আল-ওয়াসিতিয়্যাহতে বলেন, হাদীসটি হাসান। সুয়ুতি, আল-জামি: ৫২০৭ এ একে সহীহ বলেছেন। আরনাউত এর ইসনাদ যঈফ বলেছেন। একই কথা বলেছেন আলবানি, আস-সহীহাহ: ২৮১০, কিন্তু তিনি একে শাহীদের কারণে হাসান বলেছেন।
২০৪ আহমাদ: ১৬২০৬; আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ, আস-সুন্নাহ: ৪৫২-৪৫৩; তাবারানি, আল-কাবির: খণ্ড ১৯, পৃষ্ঠা ২১১, হাদীস নং ৪৭৭, এর ইসনাদ যঈফ; অনুরূপ আলবানি, আস-সহীহাহ : ২৮১০; এবং আরনাউত
২৩৫ বুখারি: ৯৩২-৯৩৩-১০১৩-১০১৯-১০২১-১০২৯-১০৩৩-৩৫৮২-৬০৯৩-৬৩৪২; মুসলিম: ৮৯৭; আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত।
২৩৬ সূরাহ আল-আম্বিয়া, ২১: ৭৬
২৩৭ সূরাহ আল-আম্বিয়া, ২১: ৬৯
২৩৮ সূরাহ আস-সফফাত, ৩৭: ১০৭
২**৩৯** পুরো কাহিনিটি বর্ণিত আছে বুখারি: ২৬৬১-৪১৪১-৪৬৯০-৪৭৫০-৪৭৫৭-৬৬৭৯- ৭৩৬৯-৭৩৭০-৭৫০০-৭৫৪৫ এবং মুসলিম: ২৭৭০; আয়িশাহ থেকে।
২**৪০** সূরাহ আত-তাওবাহ, ৯ : ১১৮ পুরো কাহিনিটি বর্ণিত আছে বুখারি: ২৭৫৭-২৯৪৭-২৯৫০-৩০৮৮-৩৫৫৬-৩৮৮৯- ৩৯৫১-৪৪১৭-৪৬৭৩-৪৬৭৬-৪৬৭৭-৪৬৭৮-৬২৫৫-৬৬৯০-৭২২৫ এবং মুসলিম : ২৭৬৯; কাব বিন মালিক থেকে বর্ণিত।
২**৪১** বুখারি: ২২১৫-২২৭২-২৩৩৩-৩৪৬৫-৫৯৭৪ এবং মুসলিম : ২৭৪৩; ইবনু উমার থেকে বর্ণিত।
২**৪২** বুখারি: ২২১৭-২৬৩৫-৩৩৫৭-৩৩৫৮-৫০৮৪-৬৯৫০; মুসলিম: ২৩৭১; আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।

নবীজি বলেন, “কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।” এর সমর্থন রয়েছে আল্লাহ তা'আলার এই আয়াতে :
“মানুষ নিরাশ হয়ে যাওয়ার পর তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন আর স্বীয় রহমত ছড়িয়ে দেন। তিনিই সকল গুণে প্রশংসিত প্রকৃত অভিভাবক।”২৩১
"আল্লাহ, যিনি বায়ু প্রেরণ করেন, অতঃপর তা মেঘমালার সঞ্চার করেন, অতঃপর তিনি তা আকাশে ছড়িয়ে দেন যেভাবে ইচ্ছে করেন, অতঃপর তাকে খণ্ড-বিখণ্ড করে দেন, তারপর তুমি দেখতে পাও তার মাঝ থেকে বৃষ্টিফোঁটা নির্গত হচ্ছে, অতঃপর তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাদের নিকট তিনি ইচ্ছে করেন তাদের কাছে যখন তা পৌঁছে দেন, তখন তারা হয় আনন্দিত। যদিও ইতঃপূর্বে তাদের প্রতি বৃষ্টি বর্ষণের পূর্বে তারা ছিল চরমভাবে হতাশ।”২৩২
আবু রাযিন আল-উকাইলি থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে আছে, নবীজি বলেন, “আমাদের রব সেই বান্দার হতাশা দেখে হাসেন, যার অবস্থা তিনি শীঘ্রই পরিবর্তন করতে চলেছেন।”২৩৩ ইমাম আহমাদ এটি বর্ণনা করেন। তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহ-ও আবু রাজিন-এর সূত্রে একটি দীর্ঘ হাদীস বর্ণনা করেন যেখানে নবীজি বলেন, “যেই দিনে বৃষ্টি পাঠানো হবে, আল্লাহ তোমাদের হতাশ অবস্থায় দেখবেন এবং তিনি হাসবেন এটি জেনে যে, তিনি শীঘ্রই অবস্থার পরিবর্তন আনতে চলেছেন।” ২৩৪
এর অর্থ হলো আল্লাহ তাঁর বান্দার হতাশা, নিরাশা, ভয়, ভুল বোঝা ও তাঁর রহমতের আশা ছেড়ে দেওয়া দেখে বিস্মিত হন, অথচ তিনি নির্ধারিত করে দিয়েছেন যে, তাদের অজান্তেই অবস্থা শীঘ্রই পরিবর্তিত হবে, বৃষ্টি নেমে আসবে।
এক জুমু'আর দিন নবীজি ﷺ যখন খুতবা দিচ্ছিলেন, এক ব্যক্তি এসে খরা ও জনগণের দুর্দশার ব্যাপারে অভিযোগ করল। নবীজি ﷺ হাত তুলে বৃষ্টির জন্য দু'আ করলেন। আকাশে মেঘ জমে পরবর্তী জুমু'আ পর্যন্ত বৃষ্টি হতে লাগল। তখন লোকেরা এসে বৃষ্টি বন্ধের জন্য দু'আ করতে অনুরোধ করল। এরপর আকাশ পরিষ্কার হলো।২৩৫
আল্লাহ তাঁর কিতাবে এমন অনেক কাহিনি বলেছেন যেখানে দুঃখ-দুর্দশার পর প্রশান্তি আসে। তিনি নূহ -এর কথা বলেছেন, যাকে তাঁর সাথের মুমিনদের সহ আল্লাহ 'মহাবিপদ' থেকে উদ্ধার করেছেন, যখন বাকি সবাই ডুবে গিয়েছিল।২৩৬ আল্লাহ জানিয়েছেন কীভাবে তিনি মুশরিকদের প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ড থেকে ইবরাহীম -কে উদ্ধার করেছেন এবং তাকে তাঁর জন্য 'প্রশান্তিদায়ক ঠান্ডা' করে দিয়েছেন। ২৩৭ আরও বলেছেন ইবরাহীম  তাঁর সন্তানকে কুরবানি করার শেষ মুহূর্তে এক 'উত্তম কুরবানি'র২৩৮ বিনিময়ে ইসমাঈল -এর প্রাণ বাঁচান। তিনি জানিয়েছেন কীভাবে মূসা -কে তাঁর মা নদীতে ভাসিয়ে দেন এবং তিনি ফিরআউনের পরিবারের কাছে এসে ভিড়েন। আরও জানিয়েছেন মূসা  ও ফিরআউনের মধ্যকার দ্বন্দ্বের কাহিনি, কীভাবে আল্লাহ মূসা -কে বাঁচিয়ে তাঁর শত্রুদের ডুবিয়ে দেন। তিনি আইয়ুব , ইউনুস , ইয়াকুব , ইউসুফ -এর কাহিনি বর্ণনা করেছেন। ইউনুস -এর জনপদ ঈমান আনার পর কী হলো, তা বর্ণনা করেছেন। মুহাম্মাদ ﷺ-এর জীবনের অনেক ঘটনা বর্ণনা করেছেন। গারে সাওর এবং বদর, উহুদ ও হুনাইনের যুদ্ধে কীভাবে সাহায্য করেছেন, তা জানিয়েছেন।
আয়িশা -কে লোকেরা মিথ্যা অপবাদ প্রদানের পর আল্লাহ তাঁর নিষ্পাপতা ঘোষণা করেছেন। ২**৩৯** আল্লাহ আরও জানিয়েছেন তিন ব্যক্তির কাহিনি :
"...যারা (তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা থেকে) পেছনে থেকে গিয়েছিল। তারা অনুশোচনার আগুনে এমনই দগ্ধ যে, পৃথিবী তার পূর্ণ বিস্তৃতি নিয়েও তাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল আর তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠল আর তারা বুঝতে পারল যে, আল্লাহ ছাড়া তাদের কোনো আশ্রয়স্থল নেই তাঁর কাছে ফিরে যাওয়া ব্যতীত। অতঃপর তিনি তাদের অনুগ্রহ করলেন, যাতে তারা অনুশোচনায় তার দিকে ফিরে আসে... "২**৪০**
সুন্নাহয়ও এমন অনেক কাহিনি আছে। যেমন গুহায় আটকা পড়া তিন ব্যক্তি, যারা নিজেদের আমলের দোহাই দিয়ে দু'আ করে মুক্তি পান। ২**৪১** আরও আছে ইবরাহীম ও সারাহ-এর কাহিনি, যেখানে যালিম বাদশাহ তাঁদের নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করতে বন্দী করে কিন্তু আল্লাহ তার পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেন। ২**৪২**
উম্মাতে মুহাম্মাদী এবং এর আগের উম্মাতদের এমন অনেক কাহিনি বিবৃত হয়েছে অনেক কিতাবে। যেমন: ইবনু আবিদ্দুনিয়া আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ, মুজাবিউদ্দু'আ এবং আরেকটি কিতাব আল-মুস্তাগিসিনা বিল্লাহ ওয়াল মুস্তাস্রিখিনা বিহি, এ ছাড়া আওলিয়াগণের কারামাত-সংক্রান্ত কিতাব, সৎকর্মশীলদের জীবনী ও ইতিহাসের কিতাব।
একজন আলিম-সম্ভবত তিনি মরোক্কোর, তাঁর এক বইয়ে হাফিয আবু যার আল- হারাওয়ি থেকে একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। তিনি যখন বাগদাদে এক সুগন্ধী বিক্রেতার দোকানে আবু হাফস ইবনু শাহিন -কে পড়ে শোনাচ্ছিলেন, তিনি এক লোককে এসে দশ দিরহাম দিয়ে সুগন্ধী বিক্রেতার কাছ থেকে কিছু কিনতে দেখলেন। সে ক্রয়কৃত জিনিসগুলো একটি টুকরিতে রেখে মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় সে পড়ে গিয়ে সব জিনিস ভেঙে গেল। লোকটি কান্না করতে করতে জানাল যে, সে একবার এক কাফেলায় উট ও তার পিঠে থাকা চার শ দিরহাম এবং তার চেয়েও দামি কিছু রত্নপাথর হারায়। তাতেও সে কিছু মনে করেনি। কিন্তু এখন তার ছেলে হয়েছে। প্রসবের পর নারীর যা যা লাগে, তা সে কিনে ফিরছিল। এই দশ দিরহামই তার ছিল। এখন তাও শেষ। পরের দিন তার কোনো কাজও নেই যে অর্থ কামাই করবে। এখন সে কেবল পালিয়ে গিয়ে স্ত্রী-সন্তানকে শান্তিতে মরতে দিতে পারে। আল-জুন্দের এক বয়স্ক লোক ঘরের দাওয়ায় বসে তা শুনতে পেলেন। তিনি কয়েকজন সহকর্মীসহ অনুমতি নিয়ে আবু হাফস-এর ঘরে এলেন। বিপদে পড়া লোকটিও তাঁদের সাথে ছিল। তিনি লোকটিকে তার কাহিনি আবার শোনাতে বলেন। এরপর জিজ্ঞেস করেন তার হারানো উটটি দেখলে সে চিনবে কি না। সে জানাল চিনবে। তিনি একটি উট এনে দিলে লোকটি তা চিনতে পারে এবং তার সাথে থাকা রত্নপাথরগুলোও সাথে পায়। ফলে সে আবার ধনী হয়ে ফিরে গেল। সে চলে যাবার পর জুন্দী লোকটি কাঁদতে লাগলেন। জিজ্ঞেস করার পর তিনি বলেন, “আমি দু'আ করেছিলাম উটের মালিককে খুঁজে পাবার আগ পর্যন্ত যেন আমি বেঁচে থাকি। আজ যেহেতু আমার সে দু'আ কবুল হয়ে গেছে, আমি বুঝতে পারছি আমার মৃত্যু নিকটবর্তী।” আবু যার জানান, “তিনি অল্প ক'দিন পরই মারা যান। আমরা তাঁর জানাযা আদায় করি। আল্লাহ তাঁকে রহম করুন।”
একই লেখক আরেকটি কাহিনি বর্ণনা করেন। মওসুলে এক ব্যবসায়ী ছিল, যে নানা জায়গায় ঘুরেফিরে ব্যবসা করত। একবার সকল সহায়সম্পত্তি ও ব্যবসায়িক মালামাল নিয়ে সে কুফায় ব্যবসা করতে গেল। পথে এক ব্যক্তির সাথে দেখা হলো যে তার অনেক উপকার করল। তারা দ্রুত বন্ধু হয় গেল এবং সে তাকে বিশ্বাস করে বসল। এক জায়গায় বিশ্রাম নিতে থামলে ওই ব্যক্তি সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীর সবকিছু নিয়ে যায়। ব্যবসায়ী একদম কপর্দকশূন্য হয়ে যায়। সে অনেক খুঁজেও চোরকে খুঁজে পেল না। পায়ে হেঁটে ধুঁকে ধুঁকে সে নিজ দেশে ফিরল। তার পরিবার তাকে দেখে খুশি হয়ে উঠল। তার স্ত্রী এক সন্তানের জন্ম দিয়েছে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, জ্বালানি ও খাবার কিছুই ঘরে নেই। তারা ভেবেছিল সে ফিরে আসায় এখন সেসবের ব্যবস্থা হবে। এই ঘটনা শুনে ব্যবসায়ীর কষ্ট আরও বেড়ে গেল। কিছু না জানিয়ে সে বাজারের দিকে গেল। দোকানদারকে সালাম দিয়ে সে তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জড়ো করে কিছু বলতে যাবে, এমন সময় দোকানদারের কাছে অরক্ষিত অবস্থায় সে তার ঘোড়ায় ঝোলানোর থলিটি পড়ে থাকতে দেখতে পেল। সে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল এই জিনিস সে কোথায় পেয়েছে। দোকানদার জানাল এক ব্যক্তি সফর করে এসে তার কাছে এগুলো আমানত রেখেছে। সে মাসজিদে ঘুমোচ্ছে। ব্যবসায়ী থলিটি নিয়ে মাসজিদে গিয়ে সেই লোককে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখল। সে তাকে লাথি মেরে জাগিয়ে দিয়ে বলল, “চোর! বিশ্বাসঘাতক! আমার জিনিসপত্র কোথায়?” চোরটি জানাল তার সেই থলিতেই সব আছে। ব্যবসায়ী তখন থলি খুলে তাতে নিজের সকল জিনিস খুঁজে পেল। সে তারপর তার পরিবারের জন্য দুই হাত খুলে খরচ করল।
একই রকম একটি দীর্ঘ কাহিনি তিন্নাওখি বর্ণনা করেছেন আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ গ্রন্থে। এর সারসংক্ষেপ হলো: খলিফা হারুন আর-রশিদের আমলে এক টাকা লেনদেনকারী ছিল। সে পাঁচ শ দিনার দিয়ে এক দাসী ক্রয় করল। সে দাসীকে এতই ভালোবেসে ফেলল যে, সব সময় তার সাথে থাকতে থাকতে তার ব্যবসায় ক্ষতি হওয়া শুরু হলো। তার পুরো মূলধন খরচ হয়ে গিয়ে কিছুই বাকি থাকল না। তার দাসী গর্ভবতী হয়ে গেল। লোকটি তার ঘরের জিনিসপত্র বেচতে বেচতে শেষ পর্যন্ত আর কিছুই বাকি রইল না। প্রসববেদনা উঠলে নারীটি তাকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে তাড়া দিলো। বলল যে, সেগুলো যথাসময়ে না পেলে সে মারা যাবে। লোকটি ঘর থেকে বের হয়ে ফুরাত নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিল। শেষ মুহূর্তে তাকে আল্লাহর ভয় পেয়ে বসল। সে আত্মহত্যার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে পায়ে হেঁটে এক শহর থেকে আরেক শহরে যেতে লাগল। শেষমেশ সে খুরাসানে পৌঁছে কাজ পেল। সে সেখান থেকে বাগদাদে তার দাসীর কাছে পর পর ছেষট্টিটি চিঠি লিখেও কোনো জবাব পেল না। সে ধরে নিল তার দাসী সত্যিই মারা গেছে। ত্রিশ বছর খুরাসানে থেকে সে আবারও ধনী হয়ে গেল। তখন সে বাগদাদে নিজ ভূমে ফেরার সিদ্ধান্ত নিল। পথিমধ্যে ডাকাতি হয়ে সে আবার আগের মতো কপর্দকহীন হয়ে গেল। বাগদাদে ফিরে সে নিজের ঘরের ঠিকানায় গিয়ে দেখল সেখানে আলিশান এক বাড়ি। তাতে পাহারাদার দাঁড় করানো। সে প্রহরীকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, এই ঘরের মালিক কে? প্রহরী জানাল একজন টাকা লেনদেনকারী এ ঘরের মালিক। যে নাম তাকে বলা হলো, তা তার নিজেরই নাম। আরও বিস্তারিত জানতে চাইলে প্রহরী বলল যে, এই ঘরের মালিকের মা হলেন আমীরুল মুমিনীনের ছেলেরও ধাত্রী মাতা। আমীরুল মুমিনীনের মামুন নামে এক ছেলে হয়। সে এই মহিলা ছাড়া আর কারও দুধ খেতে চাইত না। মামুন যখন খলিফা হলেন, তিনি সেই মহিলাকে আর তার ছেলেকে যত্ন-আত্তি করেন। ছেলেটি বড় হলে খলিফা তাকে বাইতুল মালের রক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। সেই মহিলা এখন কিছুদিন খলিফার কাছে থাকে, আর কিছুদিন এই বাড়িতে নিজের ছেলের কাছে থাকে। প্রহরীর কাছে সে এই মহিলার স্বামীর
ব্যাপারে জানতে চাইলো। প্রহরী জানাল, ত্রিশ বছর আগে এই বাড়ির মালিকের যখন জন্ম হচ্ছিল তখন তার বাবা অর্থের সন্ধানে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় আর পথ হারিয়ে ফেলে। সে আর ফিরে আসেনি, হয়তো মারা গেছে। তাদের কথোপকথনের পর নিজের লোকজনসহ তার ছেলে ফিরে আসে। লোকটি তাকে পরিচয় দিয়ে বলে সে তার বাবা। ছেলেটি বিস্মিত হয়ে যায়। তাকে ঘরের ভেতরে নিয়ে বসায়। সেখানে একটি পর্দাঘেরা জায়গা ছিল। লোকটি বলল, “তুমি যদি আমার কথা বিশ্বাস না করো, তাহলে তাকে জিজ্ঞেস করতে পারো।” কথা শুনে সেই দাসীটি বেরিয়ে এসে নিজের স্বামীকে চিনতে পেরে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে খেতে কাঁদতে লাগল। তারা তাকে আমীরুল মুমিনীনের কাছে নিয়ে গেল। খলিফা আল-মামুন তার ছেলেকে পদোন্নতি দিলেন আর তাকে তার ছেলের আগের পদে নিয়োগ দিলেন।
ইবনু আবিদ্দুনিয়া তাঁর আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ওয়াদ্দাহ ইবনু খাইসামা বলেন, “উমার বিন আব্দুল আযীয আমাকে এক কারাগার থেকে সকল বন্দীকে মুক্তি দেওয়ার আদেশ দিলেন। আমি ইয়াযিদ ইবনু আবি মুসলিম ছাড়া বাকি সবাইকে ছেড়ে দিলাম। সে প্রতিশোধ হিসেবে আমার প্রাণ নেওয়ার হুমকি দিলো। আমি আফ্রিকায় থাকা অবস্থায় শুনলাম আফ্রিকান প্রদেশগুলোর সম্প্রতি নিযুক্ত আমির ইয়াযিদ ইবনু আবি মুসলিম আসছে। আমি পালিয়ে গেলাম। সে আমাকে ধরতে একের পর এক লোক পাঠাতে লাগল। একসময় আমি ধরা পড়লাম আর আমাকে তার কাছে নেওয়া হলো। সে বলল, 'আল্লাহর কসম! আমি বারবার দু'আ করেছি তোমাকে আমার কাছে পাওয়ার জন্য।' আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম! আমি বারবার দু'আ করেছি তিনি যেন তোমার অনিষ্ট থেকে আমাকে রক্ষা করেন।' সে বলল, 'আল্লাহর কসম! তিনি তোমাকে নিরাপত্তা দেননি আর আমি তোমাকে হত্যা করব। এমনকি মৃত্যুর ফেরেশতাও যদি তোমার প্রাণ নিতে আমার সাথে পাল্লা দেন, তিনি পরাজিত হবেন। তরবারি আর জল্লাদের চাদর নিয়ে এসো!' আমাকে তাতে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে আমার মাথায় জল্লাদ তলোয়ার ঠেকাল। এমন সময় সালাতের আযান হলো। সে সালাত পড়তে চলে গেল। সে সেজদায় থাকা অবস্থায় একদল সেনা আক্রমণ করে তাকে হত্যা করে ফেলল। এক লোক এসে আমার হাতের বাঁধন কেটে দিয়ে আমাকে নিজের রাস্তায় চলে যেতে বলল।”
উমার আস-সারায়ার সূত্রে তিনি আরেকটি ঘটনা বর্ণনা করেন। উমার একবার রোমান প্রদেশগুলোতে একাকী অবস্থান করছিলেন। তিনি ঘুমানো অবস্থায় তাদের একজন এসে তাঁকে পাড়া দিয়ে ঘুম থেকে তুলে বলল, “অ্যাই আরব, তোমাকে
বেছে নেওয়ার সুযোগ দিলাম। তোমাকে আমি বর্শা দিয়ে হত্যা করতে পারি, তলোয়ার দিয়ে হত্যা করতে পারি অথবা আমরা কুস্তি করতে পারি।” তিনি বললেন, "তাহলে আমরা কুস্তি লড়ব।” সে তাঁকে হারিয়ে দিয়ে তাঁর বুকের উপর বসে বলল, “বল, তোকে কীভাবে হত্যা করব।” তিনি চিৎকার করলেন, “হে আল্লাহ, আপনার মহত্ত্ব ছাড়া আপনার আরশের নিচের আর যা কিছুর ইবাদাত করা হয়, সব মিথ্যে! আপনি আমার অবস্থা দেখছেন। অতএব আমাকে উদ্ধার করুন।” তিনি তারপর অজ্ঞান হয়ে গেলেন। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন তিনি ওই রোমানকে তাঁর পাশে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলেন।
আবুল হাসান ইবনু জাদহাম বর্ণনা করেন, হাতিম আল-আসাম বলেন, "আমরা তুর্কিদের মুখোমুখি হলাম এবং দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হলাম। এক তুর্কি আমাকে ঘোড়া থেকে ফেলে দিলো। তারপর ঘোড়া থেকে নেমে এসে আমার বুকে চড়ে বসল। আমার দাড়ি ধরে সে নিজের মোজা থেকে একটি চাকু বের করে আমাকে জবাই করতে উদ্যত হলো। কিন্তু আমার হৃদয় তার বা তার চাকুতে মগ্ন ছিল না। তা মগ্ন ছিল আমার মালিকের মাঝে। আমি ভাবলাম, 'হে মালিক, আপনি যদি এখানে আমার জবাই তাকদীরে রেখে থাকেন, আমি এর প্রতি নিজেকে সমর্পণ করলাম। আমি আপনারই।' এমতাবস্থায় এক মুসলিম তার দিকে একটি তির ছুড়ে মারল আর সে আমার উপর থেকে পড়ে গেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে তার চাকু নিয়ে তাকে জবাই করে দিলাম।”
অতএব, আপনার হৃদয়কে আপনার মনিবের হাতে সঁপে দিন। দেখবেন সাহায্যের এমন সব দুয়ার খুলে যাচ্ছে, যা আপনার পূর্বপুরুষদের কেউ দেখেনি।

টিকাঃ
২০১ সূরাহ আশ-শুরা, ৪২: ২৮
২০২ সূরাহ আর-রূম, ৩০ : ৪৮-৪৯
২০৩ আহমাদ: ১৬১৮৭-১৬২০১; ইবনু মাজাহ: ১৮১; আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ, আস-সুন্নাহ: ৪৫২-৪৫৩; ইবনু তাইমিয়্যাহ, আল-ওয়াসিতিয়্যাহতে বলেন, হাদীসটি হাসান। সুয়ুতি, আল-জামি: ৫২০৭ এ একে সহীহ বলেছেন। আরনাউত এর ইসনাদ যঈফ বলেছেন। একই কথা বলেছেন আলবানি, আস-সহীহাহ: ২৮১০, কিন্তু তিনি একে শাহীদের কারণে হাসান বলেছেন।
২০৪ আহমাদ: ১৬২০৬; আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ, আস-সুন্নাহ: ৪৫২-৪৫৩; তাবারানি, আল-কাবির: খণ্ড ১৯, পৃষ্ঠা ২১১, হাদীস নং ৪৭৭, এর ইসনাদ যঈফ; অনুরূপ আলবানি, আস-সহীহাহ : ২৮১০; এবং আরনাউত
২৩৫ বুখারি: ৯৩২-৯৩৩-১০১৩-১০১৯-১০২১-১০২৯-১০৩৩-৩৫৮২-৬০৯৩-৬৩৪২; মুসলিম: ৮৯৭; আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত।
২৩৬ সূরাহ আল-আম্বিয়া, ২১: ৭৬
২৩৭ সূরাহ আল-আম্বিয়া, ২১: ৬৯
২৩৮ সূরাহ আস-সফফাত, ৩৭: ১০৭
২**৩৯** পুরো কাহিনিটি বর্ণিত আছে বুখারি: ২৬৬১-৪১৪১-৪৬৯০-৪৭৫০-৪৭৫৭-৬৬৭৯- ৭৩৬৯-৭৩৭০-৭৫০০-৭৫৪৫ এবং মুসলিম: ২৭৭০; আয়িশাহ থেকে।
২**৪০** সূরাহ আত-তাওবাহ, ৯ : ১১৮ পুরো কাহিনিটি বর্ণিত আছে বুখারি: ২৭৫৭-২৯৪৭-২৯৫০-৩০৮৮-৩৫৫৬-৩৮৮৯- ৩৯৫১-৪৪১৭-৪৬৭৩-৪৬৭৬-৪৬৭৭-৪৬৭৮-৬২৫৫-৬৬৯০-৭২২৫ এবং মুসলিম : ২৭৬৯; কাব বিন মালিক থেকে বর্ণিত।
২**৪১** বুখারি: ২২১৫-২২৭২-২৩৩৩-৩৪৬৫-৫৯৭৪ এবং মুসলিম : ২৭৪৩; ইবনু উমার থেকে বর্ণিত।
২**৪২** বুখারি: ২২১৭-২৬৩৫-৩৩৫৭-৩৩৫৮-৫০৮৪-৬৯৫০; মুসলিম: ২৩৭১; আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।

নবীজি বলেন, “কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।” এর সমর্থন রয়েছে আল্লাহ তা'আলার এই আয়াতে :
“মানুষ নিরাশ হয়ে যাওয়ার পর তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন আর স্বীয় রহমত ছড়িয়ে দেন। তিনিই সকল গুণে প্রশংসিত প্রকৃত অভিভাবক।”২৩১
"আল্লাহ, যিনি বায়ু প্রেরণ করেন, অতঃপর তা মেঘমালার সঞ্চার করেন, অতঃপর তিনি তা আকাশে ছড়িয়ে দেন যেভাবে ইচ্ছে করেন, অতঃপর তাকে খণ্ড-বিখণ্ড করে দেন, তারপর তুমি দেখতে পাও তার মাঝ থেকে বৃষ্টিফোঁটা নির্গত হচ্ছে, অতঃপর তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাদের নিকট তিনি ইচ্ছে করেন তাদের কাছে যখন তা পৌঁছে দেন, তখন তারা হয় আনন্দিত। যদিও ইতঃপূর্বে তাদের প্রতি বৃষ্টি বর্ষণের পূর্বে তারা ছিল চরমভাবে হতাশ।”২৩২
আবু রাযিন আল-উকাইলি থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে আছে, নবীজি বলেন, “আমাদের রব সেই বান্দার হতাশা দেখে হাসেন, যার অবস্থা তিনি শীঘ্রই পরিবর্তন করতে চলেছেন।”২৩৩ ইমাম আহমাদ এটি বর্ণনা করেন। তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহ-ও আবু রাজিন-এর সূত্রে একটি দীর্ঘ হাদীস বর্ণনা করেন যেখানে নবীজি বলেন, “যেই দিনে বৃষ্টি পাঠানো হবে, আল্লাহ তোমাদের হতাশ অবস্থায় দেখবেন এবং তিনি হাসবেন এটি জেনে যে, তিনি শীঘ্রই অবস্থার পরিবর্তন আনতে চলেছেন।” ২৩৪
এর অর্থ হলো আল্লাহ তাঁর বান্দার হতাশা, নিরাশা, ভয়, ভুল বোঝা ও তাঁর রহমতের আশা ছেড়ে দেওয়া দেখে বিস্মিত হন, অথচ তিনি নির্ধারিত করে দিয়েছেন যে, তাদের অজান্তেই অবস্থা শীঘ্রই পরিবর্তিত হবে, বৃষ্টি নেমে আসবে।
এক জুমু'আর দিন নবীজি ﷺ যখন খুতবা দিচ্ছিলেন, এক ব্যক্তি এসে খরা ও জনগণের দুর্দশার ব্যাপারে অভিযোগ করল। নবীজি ﷺ হাত তুলে বৃষ্টির জন্য দু'আ করলেন। আকাশে মেঘ জমে পরবর্তী জুমু'আ পর্যন্ত বৃষ্টি হতে লাগল। তখন লোকেরা এসে বৃষ্টি বন্ধের জন্য দু'আ করতে অনুরোধ করল। এরপর আকাশ পরিষ্কার হলো।২৩৫
আল্লাহ তাঁর কিতাবে এমন অনেক কাহিনি বলেছেন যেখানে দুঃখ-দুর্দশার পর প্রশান্তি আসে। তিনি নূহ -এর কথা বলেছেন, যাকে তাঁর সাথের মুমিনদের সহ আল্লাহ 'মহাবিপদ' থেকে উদ্ধার করেছেন, যখন বাকি সবাই ডুবে গিয়েছিল।২৩৬ আল্লাহ জানিয়েছেন কীভাবে তিনি মুশরিকদের প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ড থেকে ইবরাহীম -কে উদ্ধার করেছেন এবং তাকে তাঁর জন্য 'প্রশান্তিদায়ক ঠান্ডা' করে দিয়েছেন। ২৩৭ আরও বলেছেন ইবরাহীম  তাঁর সন্তানকে কুরবানি করার শেষ মুহূর্তে এক 'উত্তম কুরবানি'র২৩৮ বিনিময়ে ইসমাঈল -এর প্রাণ বাঁচান। তিনি জানিয়েছেন কীভাবে মূসা -কে তাঁর মা নদীতে ভাসিয়ে দেন এবং তিনি ফিরআউনের পরিবারের কাছে এসে ভিড়েন। আরও জানিয়েছেন মূসা  ও ফিরআউনের মধ্যকার দ্বন্দ্বের কাহিনি, কীভাবে আল্লাহ মূসা -কে বাঁচিয়ে তাঁর শত্রুদের ডুবিয়ে দেন। তিনি আইয়ুব , ইউনুস , ইয়াকুব , ইউসুফ -এর কাহিনি বর্ণনা করেছেন। ইউনুস -এর জনপদ ঈমান আনার পর কী হলো, তা বর্ণনা করেছেন। মুহাম্মাদ ﷺ-এর জীবনের অনেক ঘটনা বর্ণনা করেছেন। গারে সাওর এবং বদর, উহুদ ও হুনাইনের যুদ্ধে কীভাবে সাহায্য করেছেন, তা জানিয়েছেন।
আয়িশা -কে লোকেরা মিথ্যা অপবাদ প্রদানের পর আল্লাহ তাঁর নিষ্পাপতা ঘোষণা করেছেন। ২**৩৯** আল্লাহ আরও জানিয়েছেন তিন ব্যক্তির কাহিনি :
"...যারা (তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা থেকে) পেছনে থেকে গিয়েছিল। তারা অনুশোচনার আগুনে এমনই দগ্ধ যে, পৃথিবী তার পূর্ণ বিস্তৃতি নিয়েও তাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল আর তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠল আর তারা বুঝতে পারল যে, আল্লাহ ছাড়া তাদের কোনো আশ্রয়স্থল নেই তাঁর কাছে ফিরে যাওয়া ব্যতীত। অতঃপর তিনি তাদের অনুগ্রহ করলেন, যাতে তারা অনুশোচনায় তার দিকে ফিরে আসে... "২**৪০**
সুন্নাহয়ও এমন অনেক কাহিনি আছে। যেমন গুহায় আটকা পড়া তিন ব্যক্তি, যারা নিজেদের আমলের দোহাই দিয়ে দু'আ করে মুক্তি পান। ২**৪১** আরও আছে ইবরাহীম ও সারাহ-এর কাহিনি, যেখানে যালিম বাদশাহ তাঁদের নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করতে বন্দী করে কিন্তু আল্লাহ তার পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেন। ২**৪২**
উম্মাতে মুহাম্মাদী এবং এর আগের উম্মাতদের এমন অনেক কাহিনি বিবৃত হয়েছে অনেক কিতাবে। যেমন: ইবনু আবিদ্দুনিয়া আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ, মুজাবিউদ্দু'আ এবং আরেকটি কিতাব আল-মুস্তাগিসিনা বিল্লাহ ওয়াল মুস্তাস্রিখিনা বিহি, এ ছাড়া আওলিয়াগণের কারামাত-সংক্রান্ত কিতাব, সৎকর্মশীলদের জীবনী ও ইতিহাসের কিতাব।
একজন আলিম-সম্ভবত তিনি মরোক্কোর, তাঁর এক বইয়ে হাফিয আবু যার আল- হারাওয়ি থেকে একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। তিনি যখন বাগদাদে এক সুগন্ধী বিক্রেতার দোকানে আবু হাফস ইবনু শাহিন -কে পড়ে শোনাচ্ছিলেন, তিনি এক লোককে এসে দশ দিরহাম দিয়ে সুগন্ধী বিক্রেতার কাছ থেকে কিছু কিনতে দেখলেন। সে ক্রয়কৃত জিনিসগুলো একটি টুকরিতে রেখে মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় সে পড়ে গিয়ে সব জিনিস ভেঙে গেল। লোকটি কান্না করতে করতে জানাল যে, সে একবার এক কাফেলায় উট ও তার পিঠে থাকা চার শ দিরহাম এবং তার চেয়েও দামি কিছু রত্নপাথর হারায়। তাতেও সে কিছু মনে করেনি। কিন্তু এখন তার ছেলে হয়েছে। প্রসবের পর নারীর যা যা লাগে, তা সে কিনে ফিরছিল। এই দশ দিরহামই তার ছিল। এখন তাও শেষ। পরের দিন তার কোনো কাজও নেই যে অর্থ কামাই করবে। এখন সে কেবল পালিয়ে গিয়ে স্ত্রী-সন্তানকে শান্তিতে মরতে দিতে পারে। আল-জুন্দের এক বয়স্ক লোক ঘরের দাওয়ায় বসে তা শুনতে পেলেন। তিনি কয়েকজন সহকর্মীসহ অনুমতি নিয়ে আবু হাফস-এর ঘরে এলেন। বিপদে পড়া লোকটিও তাঁদের সাথে ছিল। তিনি লোকটিকে তার কাহিনি আবার শোনাতে বলেন। এরপর জিজ্ঞেস করেন তার হারানো উটটি দেখলে সে চিনবে কি না। সে জানাল চিনবে। তিনি একটি উট এনে দিলে লোকটি তা চিনতে পারে এবং তার সাথে থাকা রত্নপাথরগুলোও সাথে পায়। ফলে সে আবার ধনী হয়ে ফিরে গেল। সে চলে যাবার পর জুন্দী লোকটি কাঁদতে লাগলেন। জিজ্ঞেস করার পর তিনি বলেন, “আমি দু'আ করেছিলাম উটের মালিককে খুঁজে পাবার আগ পর্যন্ত যেন আমি বেঁচে থাকি। আজ যেহেতু আমার সে দু'আ কবুল হয়ে গেছে, আমি বুঝতে পারছি আমার মৃত্যু নিকটবর্তী।” আবু যার জানান, “তিনি অল্প ক'দিন পরই মারা যান। আমরা তাঁর জানাযা আদায় করি। আল্লাহ তাঁকে রহম করুন।”
একই লেখক আরেকটি কাহিনি বর্ণনা করেন। মওসুলে এক ব্যবসায়ী ছিল, যে নানা জায়গায় ঘুরেফিরে ব্যবসা করত। একবার সকল সহায়সম্পত্তি ও ব্যবসায়িক মালামাল নিয়ে সে কুফায় ব্যবসা করতে গেল। পথে এক ব্যক্তির সাথে দেখা হলো যে তার অনেক উপকার করল। তারা দ্রুত বন্ধু হয় গেল এবং সে তাকে বিশ্বাস করে বসল। এক জায়গায় বিশ্রাম নিতে থামলে ওই ব্যক্তি সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীর সবকিছু নিয়ে যায়। ব্যবসায়ী একদম কপর্দকশূন্য হয়ে যায়। সে অনেক খুঁজেও চোরকে খুঁজে পেল না। পায়ে হেঁটে ধুঁকে ধুঁকে সে নিজ দেশে ফিরল। তার পরিবার তাকে দেখে খুশি হয়ে উঠল। তার স্ত্রী এক সন্তানের জন্ম দিয়েছে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, জ্বালানি ও খাবার কিছুই ঘরে নেই। তারা ভেবেছিল সে ফিরে আসায় এখন সেসবের ব্যবস্থা হবে। এই ঘটনা শুনে ব্যবসায়ীর কষ্ট আরও বেড়ে গেল। কিছু না জানিয়ে সে বাজারের দিকে গেল। দোকানদারকে সালাম দিয়ে সে তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জড়ো করে কিছু বলতে যাবে, এমন সময় দোকানদারের কাছে অরক্ষিত অবস্থায় সে তার ঘোড়ায় ঝোলানোর থলিটি পড়ে থাকতে দেখতে পেল। সে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল এই জিনিস সে কোথায় পেয়েছে। দোকানদার জানাল এক ব্যক্তি সফর করে এসে তার কাছে এগুলো আমানত রেখেছে। সে মাসজিদে ঘুমোচ্ছে। ব্যবসায়ী থলিটি নিয়ে মাসজিদে গিয়ে সেই লোককে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখল। সে তাকে লাথি মেরে জাগিয়ে দিয়ে বলল, “চোর! বিশ্বাসঘাতক! আমার জিনিসপত্র কোথায়?” চোরটি জানাল তার সেই থলিতেই সব আছে। ব্যবসায়ী তখন থলি খুলে তাতে নিজের সকল জিনিস খুঁজে পেল। সে তারপর তার পরিবারের জন্য দুই হাত খুলে খরচ করল।
একই রকম একটি দীর্ঘ কাহিনি তিন্নাওখি বর্ণনা করেছেন আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ গ্রন্থে। এর সারসংক্ষেপ হলো: খলিফা হারুন আর-রশিদের আমলে এক টাকা লেনদেনকারী ছিল। সে পাঁচ শ দিনার দিয়ে এক দাসী ক্রয় করল। সে দাসীকে এতই ভালোবেসে ফেলল যে, সব সময় তার সাথে থাকতে থাকতে তার ব্যবসায় ক্ষতি হওয়া শুরু হলো। তার পুরো মূলধন খরচ হয়ে গিয়ে কিছুই বাকি থাকল না। তার দাসী গর্ভবতী হয়ে গেল। লোকটি তার ঘরের জিনিসপত্র বেচতে বেচতে শেষ পর্যন্ত আর কিছুই বাকি রইল না। প্রসববেদনা উঠলে নারীটি তাকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে তাড়া দিলো। বলল যে, সেগুলো যথাসময়ে না পেলে সে মারা যাবে। লোকটি ঘর থেকে বের হয়ে ফুরাত নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিল। শেষ মুহূর্তে তাকে আল্লাহর ভয় পেয়ে বসল। সে আত্মহত্যার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে পায়ে হেঁটে এক শহর থেকে আরেক শহরে যেতে লাগল। শেষমেশ সে খুরাসানে পৌঁছে কাজ পেল। সে সেখান থেকে বাগদাদে তার দাসীর কাছে পর পর ছেষট্টিটি চিঠি লিখেও কোনো জবাব পেল না। সে ধরে নিল তার দাসী সত্যিই মারা গেছে। ত্রিশ বছর খুরাসানে থেকে সে আবারও ধনী হয়ে গেল। তখন সে বাগদাদে নিজ ভূমে ফেরার সিদ্ধান্ত নিল। পথিমধ্যে ডাকাতি হয়ে সে আবার আগের মতো কপর্দকহীন হয়ে গেল। বাগদাদে ফিরে সে নিজের ঘরের ঠিকানায় গিয়ে দেখল সেখানে আলিশান এক বাড়ি। তাতে পাহারাদার দাঁড় করানো। সে প্রহরীকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, এই ঘরের মালিক কে? প্রহরী জানাল একজন টাকা লেনদেনকারী এ ঘরের মালিক। যে নাম তাকে বলা হলো, তা তার নিজেরই নাম। আরও বিস্তারিত জানতে চাইলে প্রহরী বলল যে, এই ঘরের মালিকের মা হলেন আমীরুল মুমিনীনের ছেলেরও ধাত্রী মাতা। আমীরুল মুমিনীনের মামুন নামে এক ছেলে হয়। সে এই মহিলা ছাড়া আর কারও দুধ খেতে চাইত না। মামুন যখন খলিফা হলেন, তিনি সেই মহিলাকে আর তার ছেলেকে যত্ন-আত্তি করেন। ছেলেটি বড় হলে খলিফা তাকে বাইতুল মালের রক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। সেই মহিলা এখন কিছুদিন খলিফার কাছে থাকে, আর কিছুদিন এই বাড়িতে নিজের ছেলের কাছে থাকে। প্রহরীর কাছে সে এই মহিলার স্বামীর
ব্যাপারে জানতে চাইলো। প্রহরী জানাল, ত্রিশ বছর আগে এই বাড়ির মালিকের যখন জন্ম হচ্ছিল তখন তার বাবা অর্থের সন্ধানে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় আর পথ হারিয়ে ফেলে। সে আর ফিরে আসেনি, হয়তো মারা গেছে। তাদের কথোপকথনের পর নিজের লোকজনসহ তার ছেলে ফিরে আসে। লোকটি তাকে পরিচয় দিয়ে বলে সে তার বাবা। ছেলেটি বিস্মিত হয়ে যায়। তাকে ঘরের ভেতরে নিয়ে বসায়। সেখানে একটি পর্দাঘেরা জায়গা ছিল। লোকটি বলল, “তুমি যদি আমার কথা বিশ্বাস না করো, তাহলে তাকে জিজ্ঞেস করতে পারো।” কথা শুনে সেই দাসীটি বেরিয়ে এসে নিজের স্বামীকে চিনতে পেরে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে খেতে কাঁদতে লাগল। তারা তাকে আমীরুল মুমিনীনের কাছে নিয়ে গেল। খলিফা আল-মামুন তার ছেলেকে পদোন্নতি দিলেন আর তাকে তার ছেলের আগের পদে নিয়োগ দিলেন।
ইবনু আবিদ্দুনিয়া তাঁর আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ওয়াদ্দাহ ইবনু খাইসামা বলেন, “উমার বিন আব্দুল আযীয আমাকে এক কারাগার থেকে সকল বন্দীকে মুক্তি দেওয়ার আদেশ দিলেন। আমি ইয়াযিদ ইবনু আবি মুসলিম ছাড়া বাকি সবাইকে ছেড়ে দিলাম। সে প্রতিশোধ হিসেবে আমার প্রাণ নেওয়ার হুমকি দিলো। আমি আফ্রিকায় থাকা অবস্থায় শুনলাম আফ্রিকান প্রদেশগুলোর সম্প্রতি নিযুক্ত আমির ইয়াযিদ ইবনু আবি মুসলিম আসছে। আমি পালিয়ে গেলাম। সে আমাকে ধরতে একের পর এক লোক পাঠাতে লাগল। একসময় আমি ধরা পড়লাম আর আমাকে তার কাছে নেওয়া হলো। সে বলল, 'আল্লাহর কসম! আমি বারবার দু'আ করেছি তোমাকে আমার কাছে পাওয়ার জন্য।' আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম! আমি বারবার দু'আ করেছি তিনি যেন তোমার অনিষ্ট থেকে আমাকে রক্ষা করেন।' সে বলল, 'আল্লাহর কসম! তিনি তোমাকে নিরাপত্তা দেননি আর আমি তোমাকে হত্যা করব। এমনকি মৃত্যুর ফেরেশতাও যদি তোমার প্রাণ নিতে আমার সাথে পাল্লা দেন, তিনি পরাজিত হবেন। তরবারি আর জল্লাদের চাদর নিয়ে এসো!' আমাকে তাতে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে আমার মাথায় জল্লাদ তলোয়ার ঠেকাল। এমন সময় সালাতের আযান হলো। সে সালাত পড়তে চলে গেল। সে সেজদায় থাকা অবস্থায় একদল সেনা আক্রমণ করে তাকে হত্যা করে ফেলল। এক লোক এসে আমার হাতের বাঁধন কেটে দিয়ে আমাকে নিজের রাস্তায় চলে যেতে বলল।”
উমার আস-সারায়ার সূত্রে তিনি আরেকটি ঘটনা বর্ণনা করেন। উমার একবার রোমান প্রদেশগুলোতে একাকী অবস্থান করছিলেন। তিনি ঘুমানো অবস্থায় তাদের একজন এসে তাঁকে পাড়া দিয়ে ঘুম থেকে তুলে বলল, “অ্যাই আরব, তোমাকে
বেছে নেওয়ার সুযোগ দিলাম। তোমাকে আমি বর্শা দিয়ে হত্যা করতে পারি, তলোয়ার দিয়ে হত্যা করতে পারি অথবা আমরা কুস্তি করতে পারি।” তিনি বললেন, "তাহলে আমরা কুস্তি লড়ব।” সে তাঁকে হারিয়ে দিয়ে তাঁর বুকের উপর বসে বলল, “বল, তোকে কীভাবে হত্যা করব।” তিনি চিৎকার করলেন, “হে আল্লাহ, আপনার মহত্ত্ব ছাড়া আপনার আরশের নিচের আর যা কিছুর ইবাদাত করা হয়, সব মিথ্যে! আপনি আমার অবস্থা দেখছেন। অতএব আমাকে উদ্ধার করুন।” তিনি তারপর অজ্ঞান হয়ে গেলেন। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন তিনি ওই রোমানকে তাঁর পাশে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলেন।
আবুল হাসান ইবনু জাদহাম বর্ণনা করেন, হাতিম আল-আসাম বলেন, "আমরা তুর্কিদের মুখোমুখি হলাম এবং দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হলাম। এক তুর্কি আমাকে ঘোড়া থেকে ফেলে দিলো। তারপর ঘোড়া থেকে নেমে এসে আমার বুকে চড়ে বসল। আমার দাড়ি ধরে সে নিজের মোজা থেকে একটি চাকু বের করে আমাকে জবাই করতে উদ্যত হলো। কিন্তু আমার হৃদয় তার বা তার চাকুতে মগ্ন ছিল না। তা মগ্ন ছিল আমার মালিকের মাঝে। আমি ভাবলাম, 'হে মালিক, আপনি যদি এখানে আমার জবাই তাকদীরে রেখে থাকেন, আমি এর প্রতি নিজেকে সমর্পণ করলাম। আমি আপনারই।' এমতাবস্থায় এক মুসলিম তার দিকে একটি তির ছুড়ে মারল আর সে আমার উপর থেকে পড়ে গেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে তার চাকু নিয়ে তাকে জবাই করে দিলাম।”
অতএব, আপনার হৃদয়কে আপনার মনিবের হাতে সঁপে দিন। দেখবেন সাহায্যের এমন সব দুয়ার খুলে যাচ্ছে, যা আপনার পূর্বপুরুষদের কেউ দেখেনি।

টিকাঃ
২০১ সূরাহ আশ-শুরা, ৪২: ২৮
২০২ সূরাহ আর-রূম, ৩০ : ৪৮-৪৯
২০৩ আহমাদ: ১৬১৮৭-১৬২০১; ইবনু মাজাহ: ১৮১; আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ, আস-সুন্নাহ: ৪৫২-৪৫৩; ইবনু তাইমিয়্যাহ, আল-ওয়াসিতিয়্যাহতে বলেন, হাদীসটি হাসান। সুয়ুতি, আল-জামি: ৫২০৭ এ একে সহীহ বলেছেন। আরনাউত এর ইসনাদ যঈফ বলেছেন। একই কথা বলেছেন আলবানি, আস-সহীহাহ: ২৮১০, কিন্তু তিনি একে শাহীদের কারণে হাসান বলেছেন।
২০৪ আহমাদ: ১৬২০৬; আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ, আস-সুন্নাহ: ৪৫২-৪৫৩; তাবারানি, আল-কাবির: খণ্ড ১৯, পৃষ্ঠা ২১১, হাদীস নং ৪৭৭, এর ইসনাদ যঈফ; অনুরূপ আলবানি, আস-সহীহাহ : ২৮১০; এবং আরনাউত
২৩৫ বুখারি: ৯৩২-৯৩৩-১০১৩-১০১৯-১০২১-১০২৯-১০৩৩-৩৫৮২-৬০৯৩-৬৩৪২; মুসলিম: ৮৯৭; আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত।
২৩৬ সূরাহ আল-আম্বিয়া, ২১: ৭৬
২৩৭ সূরাহ আল-আম্বিয়া, ২১: ৬৯
২৩৮ সূরাহ আস-সফফাত, ৩৭: ১০৭
২**৩৯** পুরো কাহিনিটি বর্ণিত আছে বুখারি: ২৬৬১-৪১৪১-৪৬৯০-৪৭৫০-৪৭৫৭-৬৬৭৯- ৭৩৬৯-৭৩৭০-৭৫০০-৭৫৪৫ এবং মুসলিম: ২৭৭০; আয়িশাহ থেকে।
২**৪০** সূরাহ আত-তাওবাহ, ৯ : ১১৮ পুরো কাহিনিটি বর্ণিত আছে বুখারি: ২৭৫৭-২৯৪৭-২৯৫০-৩০৮৮-৩৫৫৬-৩৮৮৯- ৩৯৫১-৪৪১৭-৪৬৭৩-৪৬৭৬-৪৬৭৭-৪৬৭৮-৬২৫৫-৬৬৯০-৭২২৫ এবং মুসলিম : ২৭৬৯; কাব বিন মালিক থেকে বর্ণিত।
২**৪১** বুখারি: ২২১৫-২২৭২-২৩৩৩-৩৪৬৫-৫৯৭৪ এবং মুসলিম : ২৭৪৩; ইবনু উমার থেকে বর্ণিত।
২**৪২** বুখারি: ২২১৭-২৬৩৫-৩৩৫৭-৩৩৫৮-৫০৮৪-৬৯৫০; মুসলিম: ২৩৭১; আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।

📘 নবীজির সাঃ পদাঙ্ক অনুসরণ > 📄 কাঠিন্যের সাথে সহজতা

📄 কাঠিন্যের সাথে সহজতা


রাসূল বলেন, "আর কাঠিন্যের সাথে আছে সহজতা।” এ কথাটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার এই আয়াত থেকে উৎসারিত : "আল্লাহ কষ্টের পর আরাম দেবেন।”২৪৩
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৪৪
হুমাইদ ইবনু হাম্মাদ ইবনু আবুল খুওয়ার বর্ণনা করেন, আইয ইবনু শুরাইহ তাঁকে জানিয়েছেন যে, তিনি আনাস বিন মালিক-কে বলতে শুনেছেন, "নবীজি মাটিতে এক গর্তের সামনে বসে ছিলেন। তিনি বললেন, 'কষ্ট যদি এই গর্তে গিয়েও ঢুকত, স্বস্তি এর পেছন পেছন গিয়ে ঢুকে তাকে বের করে দিত।' তারপর আল্লাহ আয়াত নাযিল করেন :
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৪৫
এটি বর্ণিত হয়েছে ইবনু আবি হাতিম-এর আত-তাফসিরে। বাযযার-এর বর্ণনায় রয়েছে, “কষ্ট যদি এসে এই গর্তেও ঢুকত, স্বস্তি এর পেছন পেছন গিয়ে ঢুকত এবং একে সরিয়ে দিত। তারপর তিনি তিলাওয়াত করলেন, 'কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।”২৪৬
হুমাইদ বিন হাম্মাদকে দুর্বল বর্ণনাকারী বলা হয়। মা'মার থেকে ইবনু জারির বর্ণনা করেন, আল-হাসান বলেন, “নবীজি একদিন আনন্দিত ও খুশি অবস্থায় বের হয়ে এসে বললেন, 'একটি কষ্ট কখনো দুইটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারবে না।”২৪৭
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৪৮ আওফ এবং ইউনুস এ-এর সূত্রেও তিনি আল-হাসান থেকে এটি মুরসাল হাদীস হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি একে কাতাদাহ থেকে বর্ণিত হাদীস হিসেবেও উল্লেখ করেছেন, যিনি বলেন, "আমাদের কাছে বলা হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাহাবাগণকে এই আয়াতের সুসংবাদ এই বলে দিয়েছেন যে, 'একটি কষ্ট কখনো দুইটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারবে না।”২৪৯
মুয়াউয়িয়াহ ইবনু কুররাহ থেকে ইবনু আবিদ্দুনিয়া বর্ণনা করেন যে, এক বর্ণনাকারী তাঁকে জানিয়েছেন, ইবনু মাসউদ বলেছেন, "কষ্ট যদি একটি গর্তেও প্রবেশ করে, স্বস্তি একে অনুসরণ করে এতে প্রবেশ করবে।”২৫০ তারপর তিনি তিলাওয়াত করেন: "কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৫১
এ ছাড়া তিনি এটি আব্দুর রহমান ইবনু যাইদ ইবনু আসলাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি তাঁর বাবার থেকে এবং তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেন, যখন আবু উবাইদা অবরোধে পড়লেন, তখন উমার তাঁকে চিঠি লিখলেন, “যে কষ্টই আসুক না কেন, আল্লাহ তার পর মুক্তি পাঠাবেন। কারণ, একটি কষ্ট দুটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারে না আর আল্লাহ বলেন:
'হে ঈমানদারগণ, ধৈর্য ধরো এবং ধৈর্যে (শত্রুর চেয়ে বেশি) অগ্রসর থাকো। যুদ্ধক্ষেত্রে দৃঢ়তা প্রদর্শন করো। আর তাকওয়া অবলম্বন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।' ২৫২, ২৫৩
ইবনে আব্বাস ২৫৪ সহ অন্যান্য মুফাসসিরগণও এই আয়াতের তাফসীরে বলেছেন, “একটি কষ্ট দুইটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারবে না।”
অতীতের এক ব্যক্তি মরুভূমিতে খুব কষ্টে থাকা অবস্থায় কবিতার এ চরণ দুটি তাঁর মাথায় আসে: দুশ্চিন্তিত হয়ে নিদ্রা থেকে জাগরণ, তার চেয়ে উত্তম হলো সাক্ষাৎ মরণ। রাতের বেলা কোনো একটি কণ্ঠ ডেকে উঠল, নিশ্চিন্ত হও, হে দুশ্চিন্তিত জন! কবিতা আওড়েছ, কিন্তু সাক্ষ্য দেয় মন, ধেয়ে আসে যখন কষ্টের বাহিনী ভাবো, 'আমি কি প্রশস্ত করিনি...?'২৫৫ দুই স্বস্তির মাঝে এক কষ্ট থাকবেই স্মরণ করলে আনন্দ লাগবেই।
তিনি বলেন, "আমি এই চরণগুলো মুখস্থ করে নিলাম। আর আল্লাহ আমাকে আমার দুর্দশা থেকে মুক্তি দিলেন।”
এ ব্যাপারে অনেক কাব্য রচিত হয়েছে। আমরা এর কয়েকটি উদ্ধৃত করছি :
ধৈর্য ধরো, ধৈর্যে বিস্ময়কর ফল আসে, হতাশ হোয়ো না কোনোই সর্বনাশে।
কষ্টের কাঁধ উষ্ণ করে নিজের শ্বাসে, এর পেছন পেছনেই স্বস্তি চলে আসে।
একজন বলেছেন: হতাশ হয়ে যায় অনেকে এমন সংকটে যার সমাধান আসছে খুবই নিকটে।
আরেকজন বলেছেন: হয়তো শীঘ্রই আসছে বিপদমুক্তি, 'হয়তো'ই আমাদের আত্মার যুক্তি। হতাশার কাছে যখন করে আত্মসমর্পণ, বিপদমুক্তি খুব নিকটেই থাকে তখন।
আরেকজন আবৃত্তি করেছেন : সবকিছু যখন কঠিন লাগে, মুক্তি আশা করো তখনই, মুক্তি খুব কাছেই থাকে, বিপদ ঘনীভূত হয় যখনই।
আরেকজন নিচের চরণগুলো রচনা করেছেন :
একদিনের জন্য কষ্টে পতিত হলে হতাশ হোয়ো না, কতশত দিন যে স্বস্তিতে বাঁচবে, তা তুমি জানো না। রবের ব্যাপারে কুধারণা রেখো না, সৌন্দর্য তাঁরই ভূষণ, কখনো নিরাশ হোয়ো না, এ যে কুফরি এক ভীষণ! অল্পতেই তোমার সেরে যাবে প্রয়োজন, জেনে রেখো কষ্টকে স্বস্তি করে অনুসরণ। যত বক্তা রাখে তাদের বক্তব্য, আল্লাহর কথাই তার মাঝে সর্বাধিক সত্য।
তাঁদের একজন বলেছেন, ধৈর্য হলো কষ্টমুক্তিদ্বার, কষ্টকে স্বস্তি অনুসরণ করে প্রতিবার। থেমে থাকে না কখনো সময় এক ঘটনার পর আরেক ঘটনা হয়।
বিপদ-আপদ প্রদানের কিছু সূক্ষ্ম উপকারিতা ও প্রজ্ঞার কথা বর্ণনা করে আমরা এই আলোচনা শেষ করব।
১. গুনাহ মাফ হয় ও ধৈর্য ধরে বিপদ সহ্য করার সাওয়াব লাভ হয়। বিপদটির কারণে সাওয়াব পাওয়া যায় কি না-এ নিয়ে আলিমগণের মতভেদ আছে।
২. বান্দার তার গুনাহের কথা স্মরণ হয় এবং সে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার কাছে তাওবাহর সুযোগ পায়।
৩. শক্ত ও কঠিন থাকার পর অন্তর নরম হয়। একজন সালাফ বলেছিলেন, “কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ার ফলে গুনাহের কথা স্মরণ করতে পারে। এবং আল্লাহর ভয়ে মাছির মাথা পরিমাণ অশ্রুও যদি নির্গত হয়, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।”
৪. ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার সামনে বিনয়ী করে। প্রচুর নেক আমলের চেয়ে এ রকম একটি অবস্থাই আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়।
৫. এসব বিপদের কারণে ব্যক্তির হৃদয় আল্লাহর দিকে ঘুরে যায়, সে তাঁর দুয়ারে গিয়ে দাঁড়ায়, তাঁকে ডাকে ও তাঁর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে। এটি হলো বিপদের সবচেয়ে বড় লাভ। যারা বিপদের সময় আল্লাহর সামনে বিনীত হয় না, আল্লাহ তাদের তিরস্কার করেছেন:
"আমি তাদের শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করেছিলাম। কিন্তু তারা তাদের প্রতিপালকের নিকট নত হলো না, আর তারা কাকুতি-মিনতিও করল না।”২৫৬
“তোমার পূর্বে আমি অনেক জাতির কাছে রাসূল পাঠিয়েছি। আর অভাব-অনটন ও দুঃখ-ক্লেশ দিয়ে পাকড়াও করেছিলাম, যাতে তারা বিনয়ী হয়।”২৫৭
পূর্বের এক আসমানি কিতাবে আছে, "আল্লাহ বান্দাকে পরীক্ষায় ফেলেন, কারণ তিনি তার কাছে কাকুতি-মিনতি শুনতে ভালোবাসেন।”
সাইদ বিন আব্দুল আযীয বলেন, “দাউদ বলেন, 'সুমহান সেই সত্তা, যিনি বিপদে ফেলে বান্দাকে দু'আ করতে বাধ্য করেন। সুমহান সেই সত্তা, যিনি স্বাচ্ছন্দ্য প্রদানের মাধ্যমে কৃতজ্ঞ হতে দেন।”
মুহাম্মাদ আল-মুনকাদির এ প্রচণ্ড কষ্টে ছিলেন। আবু জাফার মুহাম্মাদ ইবনু আলি তাঁর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর ব্যাপারে মানুষকে জিজ্ঞেস করলেন। লোকেরা জানাল তিনি ঋণগ্রস্ত। আবু জাফার বললেন, "তাঁর জন্য কি দু'আর দরজা খুলেছে?” তারা জানাল, "হ্যাঁ।" আবু জাফার বললেন, "বান্দা সত্যিই সৌভাগ্যবান, যদি সে প্রয়োজনের সময় তার রবকে বেশি বেশি ডাকে, তা যে প্রয়োজনই হোক না কেন।”
তাঁদের কেউ কেউ বিপদে পড়ে দু'আ করার সময় দ্রুত জবাব আশা করতেন না। তাঁদের যে রবকে প্রয়োজন হয়েছে, এই অবস্থাটি দ্রুত শেষ হয়ে যাক-তা তাঁরা চাইতেন না। সাবিত বলেন, “মুমিন যখন আল্লাহকে ডাকে, আল্লাহ জিবরীলকে তার প্রয়োজন পূরণ করার দায়িত্ব দিয়ে বলেন, 'তার প্রয়োজন পূরণ করতে তাড়াহুড়া করবে না। আমি আমার মুমিন বান্দার কণ্ঠ শুনতে ভালোবাসি।” এটি নবীজি -এর হাদীস হিসেবেও বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এর সকল সনদ দুর্বল।৫৮
একজন সালাফ স্বপ্নে আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করে বললেন, "হে আল্লাহ, আমি আপনাকে অনেক ডেকেছি, কিন্তু জবাব পাইনি।” তিনি জবাব দিলেন, "আমি তোমার কণ্ঠ শুনতে ভালোবাসি।”
৬. বিপদ-আপদের ফলে অন্তর ধৈর্যের ও সন্তুষ্টির মিষ্টতা অনুভব করে। এটি হলো বিরাট পুরস্কারের পদ, যার মর্যাদা সম্পর্কে ইতঃপূর্বে আলোচনা হয়েছে।
৭. বিপদের ফলে বান্দা সৃষ্টির থেকে মুখ ফিরিয়ে স্রষ্টামুখী হয়। আল্লাহ বলেছেন মুশরিকরাই বিপদের সময় এক আল্লাহকে ডাকে, তাহলে মুমিনের অবস্থা কী?
৮. বিপদের ফলে বান্দা তাওহীদকে সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করে ও একে অন্তরে অনুভব করে।২৫৯
এক ইসরাঈলী বর্ণনায় আছে, (আল্লাহ বলেন),
"বিপদ তোমাকে আর আমাকে কাছে আনে। স্বাচ্ছন্দ্য তোমাকে তোমার কাছে আনে।"

টিকাঃ
২৪৩ সূরাহ আত-তলাক, ৬৫: ৭
২৪৪ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪: ৫-৬
২৪৫ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪: ৫-৬
২৪৬ ইবনু আবি হাতিম : ১৯৩৯৫; বাযযার: ২২৮৮; তাবারানি, আল-আসওয়াত: ৩৪১৬; হাকিম: ৩০১০। যাহাবি বলেন, "এটি শুধু হুমাইদ ইবনু হাম্মাদ থেকে আইয সূত্রে বর্ণিত আছে। উভয়ই হাদীস বর্ণনায় মুনকার। বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১২, বলেন এটি যঈফ; আলবানি, আয- যঈফাহ: ১৪০৩ এ একে যঈফ জিদ্দান বলেছেন।
২৪৭ তাবারি; বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১৩; হাকিম: ৩৯৫০; যাহাবি একে মুরসাল বলেন। একই কথা বলেছেন যায়লাই, তাখরিজুল কাশশাফ: খণ্ড ৪, ২৩৫ পৃষ্ঠায়। ইবনু হাজার, আল-কাফি: ৩১৯ পৃষ্ঠায় একে মুরসাল বলেন এবং বলেন যে, এর মাওসুল সংস্করণটি যঈফ। তাগলিক আত- তালিক: খণ্ড ৪, ৩৭২ পৃষ্ঠায় তিনি আরও বলেন আল-হাসান পর্যন্ত এর ইসনাদ সহীহ। আলবানি, আয-যঈফাহ: ৪৩৪২ এ একে যঈফ বলেন। ইবনু আবি হাতিম: ১৩৩৯৬ এ একে আল-হাসানের উক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। ইবনু কাসির বলেন, “এই কথাগুলোর অর্থ হলো উভয় ক্ষেত্রে 'কষ্ট' কথাটি সুনির্দিষ্টতাবাচক উপসর্গ 'আল' এর সাথে যুক্ত। অতএব এটি একবচন। কিন্তু 'স্বস্তি' শব্দটি অনির্দিষ্ট রেখে দেওয়া হয়েছে। অতএব, এটি একাধিকবার ঘটবে। অতএব, দ্বিতীয়বারে উল্লেখিত কষ্ট প্রথমটিকেই বোঝাচ্ছে। তবে স্বস্তির ঘটনা একাধিক।"
২৪৮ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪ : ৫-৬
২৪৯ তাবারি; এটি মুরসাল। ইবনু হাজার, তাগলিক আত-তালিক: খণ্ড ৪, ৩৭২ পৃষ্ঠায় বলেন কাতাদাহ পর্যন্ত এর ইসনাদ সহীহ।
২৫০ বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১১; সুয়ুতি, আদুররুল মানসুরে একে ইবনু আবিদ্দুনিয়ার আস- সবরের সাথে সম্পৃক্ত করেন।
২৫১ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪ : ৫-৬
২৫২ সূরাহ আলে ইমরান, ৩: ২০০
২৫০ ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ: পৃষ্ঠা ২৪; বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১০; ইবনু আবি শাইবাহ: খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৩৫ এবং খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা ৩৭; হাকিম: ৩১৭৬ এ একে মুসলিমের শর্তানুযায়ী সহীহ বলেছেন। যাহাবি একমত। কিন্তু ইবনু হাজার, তাগলিক আত-তালিক: খণ্ড ৪, ৩৭২ পৃষ্ঠায় বলেন এর ইসনাদ হাসান।
২৫৪ সাখাওয়ি, আল-মাকাসিদ: ৮৭৭ বলেন, "এটি বর্ণিত হয়েছে আবু সালিহ থেকে আল-কালবি, তাঁর থেকে আল-ফাররা কর্তৃক।
২৫৫ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪: ১
২৫৬ সূরাহ আল-মুমিনূন, ২৩: ৭৬
২৫৭ সূরাহ আল-আন'আম, ৬: ৪২
২৫৮ তাবারানি, আল-আসওয়াত: ৮৪৪২; জাবির থেকে বর্ণিত।
২৫৯ বিপদের ফযিলতের আরও পূর্ণাঙ্গ তালিকার জন্য পরিশিষ্ট তিন দ্রষ্টব্য।

রাসূল বলেন, "আর কাঠিন্যের সাথে আছে সহজতা।” এ কথাটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার এই আয়াত থেকে উৎসারিত : "আল্লাহ কষ্টের পর আরাম দেবেন।”২৪৩
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৪৪
হুমাইদ ইবনু হাম্মাদ ইবনু আবুল খুওয়ার বর্ণনা করেন, আইয ইবনু শুরাইহ তাঁকে জানিয়েছেন যে, তিনি আনাস বিন মালিক-কে বলতে শুনেছেন, "নবীজি মাটিতে এক গর্তের সামনে বসে ছিলেন। তিনি বললেন, 'কষ্ট যদি এই গর্তে গিয়েও ঢুকত, স্বস্তি এর পেছন পেছন গিয়ে ঢুকে তাকে বের করে দিত।' তারপর আল্লাহ আয়াত নাযিল করেন :
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৪৫
এটি বর্ণিত হয়েছে ইবনু আবি হাতিম-এর আত-তাফসিরে। বাযযার-এর বর্ণনায় রয়েছে, “কষ্ট যদি এসে এই গর্তেও ঢুকত, স্বস্তি এর পেছন পেছন গিয়ে ঢুকত এবং একে সরিয়ে দিত। তারপর তিনি তিলাওয়াত করলেন, 'কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।”২৪৬
হুমাইদ বিন হাম্মাদকে দুর্বল বর্ণনাকারী বলা হয়। মা'মার থেকে ইবনু জারির বর্ণনা করেন, আল-হাসান বলেন, “নবীজি একদিন আনন্দিত ও খুশি অবস্থায় বের হয়ে এসে বললেন, 'একটি কষ্ট কখনো দুইটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারবে না।”২৪৭
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৪৮ আওফ এবং ইউনুস এ-এর সূত্রেও তিনি আল-হাসান থেকে এটি মুরসাল হাদীস হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি একে কাতাদাহ থেকে বর্ণিত হাদীস হিসেবেও উল্লেখ করেছেন, যিনি বলেন, "আমাদের কাছে বলা হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাহাবাগণকে এই আয়াতের সুসংবাদ এই বলে দিয়েছেন যে, 'একটি কষ্ট কখনো দুইটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারবে না।”২৪৯
মুয়াউয়িয়াহ ইবনু কুররাহ থেকে ইবনু আবিদ্দুনিয়া বর্ণনা করেন যে, এক বর্ণনাকারী তাঁকে জানিয়েছেন, ইবনু মাসউদ বলেছেন, "কষ্ট যদি একটি গর্তেও প্রবেশ করে, স্বস্তি একে অনুসরণ করে এতে প্রবেশ করবে।”২৫০ তারপর তিনি তিলাওয়াত করেন: "কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৫১
এ ছাড়া তিনি এটি আব্দুর রহমান ইবনু যাইদ ইবনু আসলাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি তাঁর বাবার থেকে এবং তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেন, যখন আবু উবাইদা অবরোধে পড়লেন, তখন উমার তাঁকে চিঠি লিখলেন, “যে কষ্টই আসুক না কেন, আল্লাহ তার পর মুক্তি পাঠাবেন। কারণ, একটি কষ্ট দুটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারে না আর আল্লাহ বলেন:
'হে ঈমানদারগণ, ধৈর্য ধরো এবং ধৈর্যে (শত্রুর চেয়ে বেশি) অগ্রসর থাকো। যুদ্ধক্ষেত্রে দৃঢ়তা প্রদর্শন করো। আর তাকওয়া অবলম্বন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।' ২৫২, ২৫৩
ইবনে আব্বাস ২৫৪ সহ অন্যান্য মুফাসসিরগণও এই আয়াতের তাফসীরে বলেছেন, “একটি কষ্ট দুইটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারবে না।”
অতীতের এক ব্যক্তি মরুভূমিতে খুব কষ্টে থাকা অবস্থায় কবিতার এ চরণ দুটি তাঁর মাথায় আসে: দুশ্চিন্তিত হয়ে নিদ্রা থেকে জাগরণ, তার চেয়ে উত্তম হলো সাক্ষাৎ মরণ। রাতের বেলা কোনো একটি কণ্ঠ ডেকে উঠল, নিশ্চিন্ত হও, হে দুশ্চিন্তিত জন! কবিতা আওড়েছ, কিন্তু সাক্ষ্য দেয় মন, ধেয়ে আসে যখন কষ্টের বাহিনী ভাবো, 'আমি কি প্রশস্ত করিনি...?'২৫৫ দুই স্বস্তির মাঝে এক কষ্ট থাকবেই স্মরণ করলে আনন্দ লাগবেই।
তিনি বলেন, "আমি এই চরণগুলো মুখস্থ করে নিলাম। আর আল্লাহ আমাকে আমার দুর্দশা থেকে মুক্তি দিলেন।”
এ ব্যাপারে অনেক কাব্য রচিত হয়েছে। আমরা এর কয়েকটি উদ্ধৃত করছি :
ধৈর্য ধরো, ধৈর্যে বিস্ময়কর ফল আসে, হতাশ হোয়ো না কোনোই সর্বনাশে।
কষ্টের কাঁধ উষ্ণ করে নিজের শ্বাসে, এর পেছন পেছনেই স্বস্তি চলে আসে।
একজন বলেছেন: হতাশ হয়ে যায় অনেকে এমন সংকটে যার সমাধান আসছে খুবই নিকটে।
আরেকজন বলেছেন: হয়তো শীঘ্রই আসছে বিপদমুক্তি, 'হয়তো'ই আমাদের আত্মার যুক্তি। হতাশার কাছে যখন করে আত্মসমর্পণ, বিপদমুক্তি খুব নিকটেই থাকে তখন।
আরেকজন আবৃত্তি করেছেন : সবকিছু যখন কঠিন লাগে, মুক্তি আশা করো তখনই, মুক্তি খুব কাছেই থাকে, বিপদ ঘনীভূত হয় যখনই।
আরেকজন নিচের চরণগুলো রচনা করেছেন :
একদিনের জন্য কষ্টে পতিত হলে হতাশ হোয়ো না, কতশত দিন যে স্বস্তিতে বাঁচবে, তা তুমি জানো না। রবের ব্যাপারে কুধারণা রেখো না, সৌন্দর্য তাঁরই ভূষণ, কখনো নিরাশ হোয়ো না, এ যে কুফরি এক ভীষণ! অল্পতেই তোমার সেরে যাবে প্রয়োজন, জেনে রেখো কষ্টকে স্বস্তি করে অনুসরণ। যত বক্তা রাখে তাদের বক্তব্য, আল্লাহর কথাই তার মাঝে সর্বাধিক সত্য।
তাঁদের একজন বলেছেন, ধৈর্য হলো কষ্টমুক্তিদ্বার, কষ্টকে স্বস্তি অনুসরণ করে প্রতিবার। থেমে থাকে না কখনো সময় এক ঘটনার পর আরেক ঘটনা হয়।
বিপদ-আপদ প্রদানের কিছু সূক্ষ্ম উপকারিতা ও প্রজ্ঞার কথা বর্ণনা করে আমরা এই আলোচনা শেষ করব।
১. গুনাহ মাফ হয় ও ধৈর্য ধরে বিপদ সহ্য করার সাওয়াব লাভ হয়। বিপদটির কারণে সাওয়াব পাওয়া যায় কি না-এ নিয়ে আলিমগণের মতভেদ আছে।
২. বান্দার তার গুনাহের কথা স্মরণ হয় এবং সে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার কাছে তাওবাহর সুযোগ পায়।
৩. শক্ত ও কঠিন থাকার পর অন্তর নরম হয়। একজন সালাফ বলেছিলেন, “কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ার ফলে গুনাহের কথা স্মরণ করতে পারে। এবং আল্লাহর ভয়ে মাছির মাথা পরিমাণ অশ্রুও যদি নির্গত হয়, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।”
৪. ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার সামনে বিনয়ী করে। প্রচুর নেক আমলের চেয়ে এ রকম একটি অবস্থাই আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়।
৫. এসব বিপদের কারণে ব্যক্তির হৃদয় আল্লাহর দিকে ঘুরে যায়, সে তাঁর দুয়ারে গিয়ে দাঁড়ায়, তাঁকে ডাকে ও তাঁর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে। এটি হলো বিপদের সবচেয়ে বড় লাভ। যারা বিপদের সময় আল্লাহর সামনে বিনীত হয় না, আল্লাহ তাদের তিরস্কার করেছেন:
"আমি তাদের শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করেছিলাম। কিন্তু তারা তাদের প্রতিপালকের নিকট নত হলো না, আর তারা কাকুতি-মিনতিও করল না।”২৫৬
“তোমার পূর্বে আমি অনেক জাতির কাছে রাসূল পাঠিয়েছি। আর অভাব-অনটন ও দুঃখ-ক্লেশ দিয়ে পাকড়াও করেছিলাম, যাতে তারা বিনয়ী হয়।”২৫৭
পূর্বের এক আসমানি কিতাবে আছে, "আল্লাহ বান্দাকে পরীক্ষায় ফেলেন, কারণ তিনি তার কাছে কাকুতি-মিনতি শুনতে ভালোবাসেন।”
সাইদ বিন আব্দুল আযীয বলেন, “দাউদ বলেন, 'সুমহান সেই সত্তা, যিনি বিপদে ফেলে বান্দাকে দু'আ করতে বাধ্য করেন। সুমহান সেই সত্তা, যিনি স্বাচ্ছন্দ্য প্রদানের মাধ্যমে কৃতজ্ঞ হতে দেন।”
মুহাম্মাদ আল-মুনকাদির এ প্রচণ্ড কষ্টে ছিলেন। আবু জাফার মুহাম্মাদ ইবনু আলি তাঁর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর ব্যাপারে মানুষকে জিজ্ঞেস করলেন। লোকেরা জানাল তিনি ঋণগ্রস্ত। আবু জাফার বললেন, "তাঁর জন্য কি দু'আর দরজা খুলেছে?” তারা জানাল, "হ্যাঁ।" আবু জাফার বললেন, "বান্দা সত্যিই সৌভাগ্যবান, যদি সে প্রয়োজনের সময় তার রবকে বেশি বেশি ডাকে, তা যে প্রয়োজনই হোক না কেন।”
তাঁদের কেউ কেউ বিপদে পড়ে দু'আ করার সময় দ্রুত জবাব আশা করতেন না। তাঁদের যে রবকে প্রয়োজন হয়েছে, এই অবস্থাটি দ্রুত শেষ হয়ে যাক-তা তাঁরা চাইতেন না। সাবিত বলেন, “মুমিন যখন আল্লাহকে ডাকে, আল্লাহ জিবরীলকে তার প্রয়োজন পূরণ করার দায়িত্ব দিয়ে বলেন, 'তার প্রয়োজন পূরণ করতে তাড়াহুড়া করবে না। আমি আমার মুমিন বান্দার কণ্ঠ শুনতে ভালোবাসি।” এটি নবীজি -এর হাদীস হিসেবেও বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এর সকল সনদ দুর্বল।৫৮
একজন সালাফ স্বপ্নে আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করে বললেন, "হে আল্লাহ, আমি আপনাকে অনেক ডেকেছি, কিন্তু জবাব পাইনি।” তিনি জবাব দিলেন, "আমি তোমার কণ্ঠ শুনতে ভালোবাসি।”
৬. বিপদ-আপদের ফলে অন্তর ধৈর্যের ও সন্তুষ্টির মিষ্টতা অনুভব করে। এটি হলো বিরাট পুরস্কারের পদ, যার মর্যাদা সম্পর্কে ইতঃপূর্বে আলোচনা হয়েছে।
৭. বিপদের ফলে বান্দা সৃষ্টির থেকে মুখ ফিরিয়ে স্রষ্টামুখী হয়। আল্লাহ বলেছেন মুশরিকরাই বিপদের সময় এক আল্লাহকে ডাকে, তাহলে মুমিনের অবস্থা কী?
৮. বিপদের ফলে বান্দা তাওহীদকে সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করে ও একে অন্তরে অনুভব করে।২৫৯
এক ইসরাঈলী বর্ণনায় আছে, (আল্লাহ বলেন),
"বিপদ তোমাকে আর আমাকে কাছে আনে। স্বাচ্ছন্দ্য তোমাকে তোমার কাছে আনে।"

টিকাঃ
২৪৩ সূরাহ আত-তলাক, ৬৫: ৭
২৪৪ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪: ৫-৬
২৪৫ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪: ৫-৬
২৪৬ ইবনু আবি হাতিম : ১৯৩৯৫; বাযযার: ২২৮৮; তাবারানি, আল-আসওয়াত: ৩৪১৬; হাকিম: ৩০১০। যাহাবি বলেন, "এটি শুধু হুমাইদ ইবনু হাম্মাদ থেকে আইয সূত্রে বর্ণিত আছে। উভয়ই হাদীস বর্ণনায় মুনকার। বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১২, বলেন এটি যঈফ; আলবানি, আয- যঈফাহ: ১৪০৩ এ একে যঈফ জিদ্দান বলেছেন।
২৪৭ তাবারি; বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১৩; হাকিম: ৩৯৫০; যাহাবি একে মুরসাল বলেন। একই কথা বলেছেন যায়লাই, তাখরিজুল কাশশাফ: খণ্ড ৪, ২৩৫ পৃষ্ঠায়। ইবনু হাজার, আল-কাফি: ৩১৯ পৃষ্ঠায় একে মুরসাল বলেন এবং বলেন যে, এর মাওসুল সংস্করণটি যঈফ। তাগলিক আত- তালিক: খণ্ড ৪, ৩৭২ পৃষ্ঠায় তিনি আরও বলেন আল-হাসান পর্যন্ত এর ইসনাদ সহীহ। আলবানি, আয-যঈফাহ: ৪৩৪২ এ একে যঈফ বলেন। ইবনু আবি হাতিম: ১৩৩৯৬ এ একে আল-হাসানের উক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। ইবনু কাসির বলেন, “এই কথাগুলোর অর্থ হলো উভয় ক্ষেত্রে 'কষ্ট' কথাটি সুনির্দিষ্টতাবাচক উপসর্গ 'আল' এর সাথে যুক্ত। অতএব এটি একবচন। কিন্তু 'স্বস্তি' শব্দটি অনির্দিষ্ট রেখে দেওয়া হয়েছে। অতএব, এটি একাধিকবার ঘটবে। অতএব, দ্বিতীয়বারে উল্লেখিত কষ্ট প্রথমটিকেই বোঝাচ্ছে। তবে স্বস্তির ঘটনা একাধিক।"
২৪৮ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪ : ৫-৬
২৪৯ তাবারি; এটি মুরসাল। ইবনু হাজার, তাগলিক আত-তালিক: খণ্ড ৪, ৩৭২ পৃষ্ঠায় বলেন কাতাদাহ পর্যন্ত এর ইসনাদ সহীহ।
২৫০ বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১১; সুয়ুতি, আদুররুল মানসুরে একে ইবনু আবিদ্দুনিয়ার আস- সবরের সাথে সম্পৃক্ত করেন।
২৫১ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪ : ৫-৬
২৫২ সূরাহ আলে ইমরান, ৩: ২০০
২৫০ ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ: পৃষ্ঠা ২৪; বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১০; ইবনু আবি শাইবাহ: খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৩৫ এবং খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা ৩৭; হাকিম: ৩১৭৬ এ একে মুসলিমের শর্তানুযায়ী সহীহ বলেছেন। যাহাবি একমত। কিন্তু ইবনু হাজার, তাগলিক আত-তালিক: খণ্ড ৪, ৩৭২ পৃষ্ঠায় বলেন এর ইসনাদ হাসান।
২৫৪ সাখাওয়ি, আল-মাকাসিদ: ৮৭৭ বলেন, "এটি বর্ণিত হয়েছে আবু সালিহ থেকে আল-কালবি, তাঁর থেকে আল-ফাররা কর্তৃক।
২৫৫ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪: ১
২৫৬ সূরাহ আল-মুমিনূন, ২৩: ৭৬
২৫৭ সূরাহ আল-আন'আম, ৬: ৪২
২৫৮ তাবারানি, আল-আসওয়াত: ৮৪৪২; জাবির থেকে বর্ণিত।
২৫৯ বিপদের ফযিলতের আরও পূর্ণাঙ্গ তালিকার জন্য পরিশিষ্ট তিন দ্রষ্টব্য।

রাসূল বলেন, "আর কাঠিন্যের সাথে আছে সহজতা।” এ কথাটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার এই আয়াত থেকে উৎসারিত : "আল্লাহ কষ্টের পর আরাম দেবেন।”২৪৩
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৪৪
হুমাইদ ইবনু হাম্মাদ ইবনু আবুল খুওয়ার বর্ণনা করেন, আইয ইবনু শুরাইহ তাঁকে জানিয়েছেন যে, তিনি আনাস বিন মালিক-কে বলতে শুনেছেন, "নবীজি মাটিতে এক গর্তের সামনে বসে ছিলেন। তিনি বললেন, 'কষ্ট যদি এই গর্তে গিয়েও ঢুকত, স্বস্তি এর পেছন পেছন গিয়ে ঢুকে তাকে বের করে দিত।' তারপর আল্লাহ আয়াত নাযিল করেন :
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৪৫
এটি বর্ণিত হয়েছে ইবনু আবি হাতিম-এর আত-তাফসিরে। বাযযার-এর বর্ণনায় রয়েছে, “কষ্ট যদি এসে এই গর্তেও ঢুকত, স্বস্তি এর পেছন পেছন গিয়ে ঢুকত এবং একে সরিয়ে দিত। তারপর তিনি তিলাওয়াত করলেন, 'কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।”২৪৬
হুমাইদ বিন হাম্মাদকে দুর্বল বর্ণনাকারী বলা হয়। মা'মার থেকে ইবনু জারির বর্ণনা করেন, আল-হাসান বলেন, “নবীজি একদিন আনন্দিত ও খুশি অবস্থায় বের হয়ে এসে বললেন, 'একটি কষ্ট কখনো দুইটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারবে না।”২৪৭
"কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৪৮ আওফ এবং ইউনুস এ-এর সূত্রেও তিনি আল-হাসান থেকে এটি মুরসাল হাদীস হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি একে কাতাদাহ থেকে বর্ণিত হাদীস হিসেবেও উল্লেখ করেছেন, যিনি বলেন, "আমাদের কাছে বলা হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাহাবাগণকে এই আয়াতের সুসংবাদ এই বলে দিয়েছেন যে, 'একটি কষ্ট কখনো দুইটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারবে না।”২৪৯
মুয়াউয়িয়াহ ইবনু কুররাহ থেকে ইবনু আবিদ্দুনিয়া বর্ণনা করেন যে, এক বর্ণনাকারী তাঁকে জানিয়েছেন, ইবনু মাসউদ বলেছেন, "কষ্ট যদি একটি গর্তেও প্রবেশ করে, স্বস্তি একে অনুসরণ করে এতে প্রবেশ করবে।”২৫০ তারপর তিনি তিলাওয়াত করেন: "কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।”২৫১
এ ছাড়া তিনি এটি আব্দুর রহমান ইবনু যাইদ ইবনু আসলাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি তাঁর বাবার থেকে এবং তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেন, যখন আবু উবাইদা অবরোধে পড়লেন, তখন উমার তাঁকে চিঠি লিখলেন, “যে কষ্টই আসুক না কেন, আল্লাহ তার পর মুক্তি পাঠাবেন। কারণ, একটি কষ্ট দুটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারে না আর আল্লাহ বলেন:
'হে ঈমানদারগণ, ধৈর্য ধরো এবং ধৈর্যে (শত্রুর চেয়ে বেশি) অগ্রসর থাকো। যুদ্ধক্ষেত্রে দৃঢ়তা প্রদর্শন করো। আর তাকওয়া অবলম্বন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।' ২৫২, ২৫৩
ইবনে আব্বাস ২৫৪ সহ অন্যান্য মুফাসসিরগণও এই আয়াতের তাফসীরে বলেছেন, “একটি কষ্ট দুইটি স্বস্তিকে গ্রাস করতে পারবে না।”
অতীতের এক ব্যক্তি মরুভূমিতে খুব কষ্টে থাকা অবস্থায় কবিতার এ চরণ দুটি তাঁর মাথায় আসে: দুশ্চিন্তিত হয়ে নিদ্রা থেকে জাগরণ, তার চেয়ে উত্তম হলো সাক্ষাৎ মরণ। রাতের বেলা কোনো একটি কণ্ঠ ডেকে উঠল, নিশ্চিন্ত হও, হে দুশ্চিন্তিত জন! কবিতা আওড়েছ, কিন্তু সাক্ষ্য দেয় মন, ধেয়ে আসে যখন কষ্টের বাহিনী ভাবো, 'আমি কি প্রশস্ত করিনি...?'২৫৫ দুই স্বস্তির মাঝে এক কষ্ট থাকবেই স্মরণ করলে আনন্দ লাগবেই।
তিনি বলেন, "আমি এই চরণগুলো মুখস্থ করে নিলাম। আর আল্লাহ আমাকে আমার দুর্দশা থেকে মুক্তি দিলেন।”
এ ব্যাপারে অনেক কাব্য রচিত হয়েছে। আমরা এর কয়েকটি উদ্ধৃত করছি :
ধৈর্য ধরো, ধৈর্যে বিস্ময়কর ফল আসে, হতাশ হোয়ো না কোনোই সর্বনাশে।
কষ্টের কাঁধ উষ্ণ করে নিজের শ্বাসে, এর পেছন পেছনেই স্বস্তি চলে আসে।
একজন বলেছেন: হতাশ হয়ে যায় অনেকে এমন সংকটে যার সমাধান আসছে খুবই নিকটে।
আরেকজন বলেছেন: হয়তো শীঘ্রই আসছে বিপদমুক্তি, 'হয়তো'ই আমাদের আত্মার যুক্তি। হতাশার কাছে যখন করে আত্মসমর্পণ, বিপদমুক্তি খুব নিকটেই থাকে তখন।
আরেকজন আবৃত্তি করেছেন : সবকিছু যখন কঠিন লাগে, মুক্তি আশা করো তখনই, মুক্তি খুব কাছেই থাকে, বিপদ ঘনীভূত হয় যখনই।
আরেকজন নিচের চরণগুলো রচনা করেছেন :
একদিনের জন্য কষ্টে পতিত হলে হতাশ হোয়ো না, কতশত দিন যে স্বস্তিতে বাঁচবে, তা তুমি জানো না। রবের ব্যাপারে কুধারণা রেখো না, সৌন্দর্য তাঁরই ভূষণ, কখনো নিরাশ হোয়ো না, এ যে কুফরি এক ভীষণ! অল্পতেই তোমার সেরে যাবে প্রয়োজন, জেনে রেখো কষ্টকে স্বস্তি করে অনুসরণ। যত বক্তা রাখে তাদের বক্তব্য, আল্লাহর কথাই তার মাঝে সর্বাধিক সত্য।
তাঁদের একজন বলেছেন, ধৈর্য হলো কষ্টমুক্তিদ্বার, কষ্টকে স্বস্তি অনুসরণ করে প্রতিবার। থেমে থাকে না কখনো সময় এক ঘটনার পর আরেক ঘটনা হয়।
বিপদ-আপদ প্রদানের কিছু সূক্ষ্ম উপকারিতা ও প্রজ্ঞার কথা বর্ণনা করে আমরা এই আলোচনা শেষ করব।
১. গুনাহ মাফ হয় ও ধৈর্য ধরে বিপদ সহ্য করার সাওয়াব লাভ হয়। বিপদটির কারণে সাওয়াব পাওয়া যায় কি না-এ নিয়ে আলিমগণের মতভেদ আছে।
২. বান্দার তার গুনাহের কথা স্মরণ হয় এবং সে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার কাছে তাওবাহর সুযোগ পায়।
৩. শক্ত ও কঠিন থাকার পর অন্তর নরম হয়। একজন সালাফ বলেছিলেন, “কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ার ফলে গুনাহের কথা স্মরণ করতে পারে। এবং আল্লাহর ভয়ে মাছির মাথা পরিমাণ অশ্রুও যদি নির্গত হয়, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।”
৪. ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার সামনে বিনয়ী করে। প্রচুর নেক আমলের চেয়ে এ রকম একটি অবস্থাই আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়।
৫. এসব বিপদের কারণে ব্যক্তির হৃদয় আল্লাহর দিকে ঘুরে যায়, সে তাঁর দুয়ারে গিয়ে দাঁড়ায়, তাঁকে ডাকে ও তাঁর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে। এটি হলো বিপদের সবচেয়ে বড় লাভ। যারা বিপদের সময় আল্লাহর সামনে বিনীত হয় না, আল্লাহ তাদের তিরস্কার করেছেন:
"আমি তাদের শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করেছিলাম। কিন্তু তারা তাদের প্রতিপালকের নিকট নত হলো না, আর তারা কাকুতি-মিনতিও করল না।”২৫৬
“তোমার পূর্বে আমি অনেক জাতির কাছে রাসূল পাঠিয়েছি। আর অভাব-অনটন ও দুঃখ-ক্লেশ দিয়ে পাকড়াও করেছিলাম, যাতে তারা বিনয়ী হয়।”২৫৭
পূর্বের এক আসমানি কিতাবে আছে, "আল্লাহ বান্দাকে পরীক্ষায় ফেলেন, কারণ তিনি তার কাছে কাকুতি-মিনতি শুনতে ভালোবাসেন।”
সাইদ বিন আব্দুল আযীয বলেন, “দাউদ বলেন, 'সুমহান সেই সত্তা, যিনি বিপদে ফেলে বান্দাকে দু'আ করতে বাধ্য করেন। সুমহান সেই সত্তা, যিনি স্বাচ্ছন্দ্য প্রদানের মাধ্যমে কৃতজ্ঞ হতে দেন।”
মুহাম্মাদ আল-মুনকাদির এ প্রচণ্ড কষ্টে ছিলেন। আবু জাফার মুহাম্মাদ ইবনু আলি তাঁর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর ব্যাপারে মানুষকে জিজ্ঞেস করলেন। লোকেরা জানাল তিনি ঋণগ্রস্ত। আবু জাফার বললেন, "তাঁর জন্য কি দু'আর দরজা খুলেছে?” তারা জানাল, "হ্যাঁ।" আবু জাফার বললেন, "বান্দা সত্যিই সৌভাগ্যবান, যদি সে প্রয়োজনের সময় তার রবকে বেশি বেশি ডাকে, তা যে প্রয়োজনই হোক না কেন।”
তাঁদের কেউ কেউ বিপদে পড়ে দু'আ করার সময় দ্রুত জবাব আশা করতেন না। তাঁদের যে রবকে প্রয়োজন হয়েছে, এই অবস্থাটি দ্রুত শেষ হয়ে যাক-তা তাঁরা চাইতেন না। সাবিত বলেন, “মুমিন যখন আল্লাহকে ডাকে, আল্লাহ জিবরীলকে তার প্রয়োজন পূরণ করার দায়িত্ব দিয়ে বলেন, 'তার প্রয়োজন পূরণ করতে তাড়াহুড়া করবে না। আমি আমার মুমিন বান্দার কণ্ঠ শুনতে ভালোবাসি।” এটি নবীজি -এর হাদীস হিসেবেও বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এর সকল সনদ দুর্বল।৫৮
একজন সালাফ স্বপ্নে আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করে বললেন, "হে আল্লাহ, আমি আপনাকে অনেক ডেকেছি, কিন্তু জবাব পাইনি।” তিনি জবাব দিলেন, "আমি তোমার কণ্ঠ শুনতে ভালোবাসি।”
৬. বিপদ-আপদের ফলে অন্তর ধৈর্যের ও সন্তুষ্টির মিষ্টতা অনুভব করে। এটি হলো বিরাট পুরস্কারের পদ, যার মর্যাদা সম্পর্কে ইতঃপূর্বে আলোচনা হয়েছে।
৭. বিপদের ফলে বান্দা সৃষ্টির থেকে মুখ ফিরিয়ে স্রষ্টামুখী হয়। আল্লাহ বলেছেন মুশরিকরাই বিপদের সময় এক আল্লাহকে ডাকে, তাহলে মুমিনের অবস্থা কী?
৮. বিপদের ফলে বান্দা তাওহীদকে সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করে ও একে অন্তরে অনুভব করে।২৫৯
এক ইসরাঈলী বর্ণনায় আছে, (আল্লাহ বলেন),
"বিপদ তোমাকে আর আমাকে কাছে আনে। স্বাচ্ছন্দ্য তোমাকে তোমার কাছে আনে।"

টিকাঃ
২৪৩ সূরাহ আত-তলাক, ৬৫: ৭
২৪৪ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪: ৫-৬
২৪৫ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪: ৫-৬
২৪৬ ইবনু আবি হাতিম : ১৯৩৯৫; বাযযার: ২২৮৮; তাবারানি, আল-আসওয়াত: ৩৪১৬; হাকিম: ৩০১০। যাহাবি বলেন, "এটি শুধু হুমাইদ ইবনু হাম্মাদ থেকে আইয সূত্রে বর্ণিত আছে। উভয়ই হাদীস বর্ণনায় মুনকার। বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১২, বলেন এটি যঈফ; আলবানি, আয- যঈফাহ: ১৪০৩ এ একে যঈফ জিদ্দান বলেছেন।
২৪৭ তাবারি; বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১৩; হাকিম: ৩৯৫০; যাহাবি একে মুরসাল বলেন। একই কথা বলেছেন যায়লাই, তাখরিজুল কাশশাফ: খণ্ড ৪, ২৩৫ পৃষ্ঠায়। ইবনু হাজার, আল-কাফি: ৩১৯ পৃষ্ঠায় একে মুরসাল বলেন এবং বলেন যে, এর মাওসুল সংস্করণটি যঈফ। তাগলিক আত- তালিক: খণ্ড ৪, ৩৭২ পৃষ্ঠায় তিনি আরও বলেন আল-হাসান পর্যন্ত এর ইসনাদ সহীহ। আলবানি, আয-যঈফাহ: ৪৩৪২ এ একে যঈফ বলেন। ইবনু আবি হাতিম: ১৩৩৯৬ এ একে আল-হাসানের উক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। ইবনু কাসির বলেন, “এই কথাগুলোর অর্থ হলো উভয় ক্ষেত্রে 'কষ্ট' কথাটি সুনির্দিষ্টতাবাচক উপসর্গ 'আল' এর সাথে যুক্ত। অতএব এটি একবচন। কিন্তু 'স্বস্তি' শব্দটি অনির্দিষ্ট রেখে দেওয়া হয়েছে। অতএব, এটি একাধিকবার ঘটবে। অতএব, দ্বিতীয়বারে উল্লেখিত কষ্ট প্রথমটিকেই বোঝাচ্ছে। তবে স্বস্তির ঘটনা একাধিক।"
২৪৮ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪ : ৫-৬
২৪৯ তাবারি; এটি মুরসাল। ইবনু হাজার, তাগলিক আত-তালিক: খণ্ড ৪, ৩৭২ পৃষ্ঠায় বলেন কাতাদাহ পর্যন্ত এর ইসনাদ সহীহ।
২৫০ বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১১; সুয়ুতি, আদুররুল মানসুরে একে ইবনু আবিদ্দুনিয়ার আস- সবরের সাথে সম্পৃক্ত করেন।
২৫১ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪ : ৫-৬
২৫২ সূরাহ আলে ইমরান, ৩: ২০০
২৫০ ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ: পৃষ্ঠা ২৪; বায়হাকি, শুয়াব: ১০০১০; ইবনু আবি শাইবাহ: খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৩৫ এবং খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা ৩৭; হাকিম: ৩১৭৬ এ একে মুসলিমের শর্তানুযায়ী সহীহ বলেছেন। যাহাবি একমত। কিন্তু ইবনু হাজার, তাগলিক আত-তালিক: খণ্ড ৪, ৩৭২ পৃষ্ঠায় বলেন এর ইসনাদ হাসান।
২৫৪ সাখাওয়ি, আল-মাকাসিদ: ৮৭৭ বলেন, "এটি বর্ণিত হয়েছে আবু সালিহ থেকে আল-কালবি, তাঁর থেকে আল-ফাররা কর্তৃক।
২৫৫ সূরাহ আলাম নাশরহ, ৯৪: ১
২৫৬ সূরাহ আল-মুমিনূন, ২৩: ৭৬
২৫৭ সূরাহ আল-আন'আম, ৬: ৪২
২৫৮ তাবারানি, আল-আসওয়াত: ৮৪৪২; জাবির থেকে বর্ণিত।
২৫৯ বিপদের ফযিলতের আরও পূর্ণাঙ্গ তালিকার জন্য পরিশিষ্ট তিন দ্রষ্টব্য।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00