📘 নবীজির সাঃ পদাঙ্ক অনুসরণ > 📄 আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া

📄 আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া


রাসূল বলেন, “যখন সাহায্য চাইবে, আল্লাহর দিকেই ফিরবে।” আল্লাহর হেফাজত করা আর স্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহকে জানার আদেশ দেওয়ার পর তিনি আমাদের ইবাদাতের সারনির্যাসের কথা বলছেন। তা হলো শুধু আল্লাহর কাছেই দু'আ করা। নু'মান বিন বাশির থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ বলেন, “দু'আ হলো ইবাদাত।” তারপর তিনি এই আয়াত পাঠ করেন,
"তোমাদের প্রতিপালক বলেন, 'আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেবো।'”১৩৭ এ ছাড়া চারটি সুনান গ্রন্থেও হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। ১৩৮
এই সকল আদেশের পর তিনি আমাদের এক আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে নির্দেশ দিচ্ছেন। এই নির্দেশ উৎসারিত হয়েছে আল্লাহর এই আয়াত থেকে :
"আমরা শুধু আপনারই ইবাদাত করি এবং আপনার কাছেই সাহায্য চাই।”১৩৯
এর মাধ্যমে এক ব্যাপক-বিস্তৃত মূলনীতি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বলা হয়ে থাকে, সকল আসমানি কিতাবের মূল বার্তা এই মূলনীতিকে ঘিরেই আবর্তিত হয়।
শুধুই আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার দুটি তাৎপর্য রয়েছে:
১. আল্লাহর সাহায্য ছাড়া আল্লাহর আনুগত্য করা বান্দার পক্ষে সম্ভব না।
২. আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা ছাড়া আর কেউই বান্দাকে তার দুনিয়াবি ও আখিরাতি জীবনের উন্নতির জন্য সাহায্য করতে পারে না। যাকে আল্লাহ সাহায্য করেন, সে প্রকৃত অর্থেই সাহায্যপ্রাপ্ত; আর যাকে আল্লাহ পরিত্যাগ করেন, সে সত্যিকার অর্থেই পরিত্যক্ত।
এক সহীহ হাদীসে এসেছে, নবীজি বলেছেন, “তোমার উপকারে আসবে এমন সকল জিনিস কামনা করো এবং আল্লাহর সাহায্য চাও। আর নিরাশ হোয়ো না।”১৪০
তিনি এ কথাটি খুতবায় বলতেন ও সাহাবাগণকে বলতে শিক্ষা দিতেন, “সকল প্রশংসা আল্লাহর। আমরা তাঁর সাহায্য চাই এবং তাঁর কাছে হিদায়াত কামনা করি...”১৪১
তিনি মুয়ায -কে শিখিয়েছেন তিনি যেন প্রত্যেক সালাতের পর এ দু'আ করেন, “হে আল্লাহ, আপনাকে স্মরণ করতে, আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ হতে ও আপনার জন্য আমার ইবাদাতকে সুন্দর করতে আমাকে সাহায্য করুন।”১৪২
নবীজি-এর একটি দু'আ এমন ছিল, “হে আমার প্রতিপালক, আমাকে সাহায্য করুন। আমার বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্য করবেন না।”১৪৩
উমার -এর নির্ধারিত দু'আ কুনুতের একটি অংশ হলো, “হে আল্লাহ, আমরা আপনার সাহায্য চাই।”১৪৪
এক বিখ্যাত বর্ণনায় আছে, সাগর দ্বিখণ্ডিত করার জন্য আঘাত করে মূসা বলেন, “হে আল্লাহ, সব প্রশংসা আপনার। আপনার কাছেই অভিযোগ করা হয়। আপনিই সেই সত্তা, যার সাহায্য কামনা করা হয়। আর আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তন করা হয় মুক্তির জন্য, আপনার প্রতিই আস্থা রাখা হয় এবং আপনি ছাড়া আর কারও শক্তি বা গতি নেই।”১৪৫
আল্লাহর আদেশ পালন, আল্লাহর নিষেধকৃত বস্তু পরিত্যাগ এবং তাকদিরের ভালোমন্দ মেনে নেওয়া বান্দার পক্ষে কখনোই সম্ভব না আল্লাহর সাহায্য ছাড়া। ইয়াকুব বলেন,
"...আমি উত্তম ধৈর্যধারণ করব। তোমরা যা বানিয়েছ, তার ব্যাপারে আল্লাহই আমার আশ্রয়স্থল।”১৪৬
এ কারণেই নিজের উপর মিথ্যে অপবাদ আরোপের খবর (ইফকের ঘটনা) শুনে আয়িশা এই কথাটি বলেছেন। পরে আল্লাহ তাঁকে পবিত্র ঘোষণা করে আয়াত নাযিল করেন।
মূসা তাঁর জাতিকে বলেছিলেন :
"অতএব আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও এবং ধৈর্যধারণ করো।”১৪৭
আল্লাহ বলেন:
"(রাসূল) বলল, 'হে আমার প্রতিপালক, তুমি ন্যায্য মীমাংসা করে দাও, আর আমাদের প্রতিপালক তো দয়ার আধার। তোমরা যেসব কথা বলছ, সে বিষয়ে তিনিই একমাত্র আশ্রয়স্থল। "১৪৮
নবীজি যখন উসমান-কে সুসংবাদ দিলেন যে তিনি ফিতনার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর জান্নাতে প্রবেশ করবেন, তখন উসমান বলেছিলেন, “আল্লাহর সাহায্য চাই।”১৪৯ ফিতনাবাজরা যখন ভেতরে ঢুকে উসমান-কে মারতে লাগল আর তাঁর শরীর থেকে রক্ত প্রবাহিত হতে লাগল, তখন তিনি পড়ছিলেন, “(হে আল্লাহ) আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আপনি মহাপবিত্র। নিশ্চয়ই আমি সীমালঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত (ইউনুস -এর সেই দু'আ)। হে আল্লাহ, তাদের বিরুদ্ধে আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই। আপনি আমাকে যা দিয়ে পরীক্ষা করছেন, তা সহ্য করার জন্য আমি আপনার কাছে সাহায্য চাই।”
আবু তালহা থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এক যুদ্ধে শত্রুর মুখোমুখি হয়ে বললেন, “হে বিচারদিবসের মালিক, আমরা আপনারই ইবাদাত করি এবং আপনারই কাছে সাহায্য চাই।” আবু তালহা বলেন, “আমি দেখলাম শত্রুরা জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাচ্ছে।” আবুশ শাইখ আল-আসবাহানি এটি বর্ণনা করেছেন। ১৫০
দ্বীনি ও দুনিয়াবি জীবনে ভালো করার জন্য বান্দার আল্লাহর সাহায্য প্রয়োজন। যুবাইর তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহ-এর প্রতি শেষ উপদেশে বলেন, তাঁর ঋণগুলো যেন শোধ করে দেওয়া হয়। তারপর বলেন, “যদি তা করতে অসমর্থ হও, আমার মনিবের কাছে সাহায্য চেয়ো।” তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “বাবা, আপনার মনিব কে?” তিনি জবাব দিলেন, “আল্লাহ।” আব্দুল্লাহ বলেন, “যখনই ঋণ পরিশোধ করতে কষ্ট হতো, আমি বলতাম, 'হে যুবাইরের মনিব, তাঁর ঋণ শোধ করে দিন।' আর তা শোধ করার ব্যবস্থা হয়ে যেত।”
মিম্বর থেকে দেওয়া নিজের প্রথম খুতবায় উমার ইবনুল খাত্তাব বলেন, “আরবরা এক দীর্ঘ ভ্রমণক্লান্ত উট১৫১, যার রশি আমি ধরেছি। আমি একে নিয়ে বিস্তীর্ণ ভূমি পার হব আর এ কাজে আমি আল্লাহর সাহায্য চাই।”
মৃত্যু থেকে শুরু করে কিয়ামাতের সকল ভয়াবহতা সহ্য করার জন্যও বান্দা আল্লাহর সাহায্যের মুখাপেক্ষী।
খালিদ বিন ওয়ালিদ যখন মৃত্যুশয্যায়, তাঁর পাশে থাকা এক লোক বলল, "এটি (মৃত্যু) ভয়াবহ রকমের কঠিন।” খালিদ বললেন, “নিশ্চয়। কিন্তু আমি আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার সাহায্য চাই।”
আমির বিন আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর মৃত্যুশয্যায় কান্না করে বলেন, “আমি কান্না করছি কেবল দিনের উত্তাপ (সিয়াম) আর দাঁড়ানোর শৈত্য (তাহাজ্জুদ) হারিয়ে ফেলার কারণে। আমি এই মারাত্মক ক্ষতি থেকে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাই।”
অতীতের এক ব্যক্তি বলেছিলেন, “হে আমার প্রতিপালক, আমার অবাক লাগে, যে আপনাকে জানে সে কী করে অন্য কারও প্রতি আশা রাখতে পারে? আমার অবাক লাগে, যে আপনাকে জানে সে কী করে অন্য কারও কাছে সাহায্য চাইতে পারে?”
উমার বিন আব্দুল আযিয -কে আল-হাসান চিঠি লেখেন, “আল্লাহ ছাড়া আর কারও সাহায্য চাইবেন না। না হলে যার কাছে সাহায্য চাচ্ছেন আল্লাহ আপনাকে তার দায়িত্বে ছেড়ে দেবেন।”
একজন সালাফ বলেছিলেন, “আল্লাহর সাহায্য চাও। তাঁর সাহায্য চাও, কারণ যাদের কাছে সাহায্য চাওয়া হয় তাদের মাঝে তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ।”

টিকাঃ
১৩৭ সূরাহ গাফির, ৪০: ৬০
১৩৮ আবু দাউদ: ১৪৭৯; তিরমিযি: ২৯৬৯-৩২৪৭-৩৩৭২; নাসাঈ, আল-কুবরা: ১১৪৬৪; ইবনু মাজাহ : ৩৮২৮ তিরমিযি একে হাসান সহীহ বলেছেন। নববী, আল-আযকার: ৪৭৮ পৃষ্ঠায় বলেছেন এর ইসনাদ হাসান; ইবনু হাজার, ফাতহ: খণ্ড ১, ৬৪ পৃষ্ঠায় বলেছেন, এর ইসনাদ জাইয়্যিদ; ইবনু হিব্বান : ২৩৯৬ একে সহীহ বলেছেন; একই কথা বলেছেন হাকিম: ১৯০২; যাহাবি একমত। আলবানি, সহীহুত তারগীব: ১৬২৭, একে সহীহ বলেছেন।
১০১ সূরাহ আল-ফাতিহাহ, ১:৫
১৪০ মুসলিম: ২৬৬৪; আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।
১৪১ শাফিঈ, মুসনাদ : খণ্ড ১, ১৪৭ পৃষ্ঠায় ইবনু আব্বাস থেকে যঈফ জিদ্দান সূত্রে বর্ণনা করেছেন, খুতবাটি “তাঁর হিদায়াত কামনা করো" অংশটি ছাড়া সহীহ মুসলিমে এসেছে।
১৪২ আহমাদ: ২২১১৯-২২১২৬; আবু দাউদ: ১৫২২; নাসাঈ: ১৩০৪ এবং আমালুল ইয়াওম ওয়াল লাইলাহ: ১০৯
নববী, আল-আযকার: পৃষ্ঠা ১০৩ এবং আল-খুলাসাহ: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৬৮ এবং রিয়াদ : ৩৮৯-১৪৩০ এ বলেন এর ইসনাদ সহীহ। একই কথা বলেছেন ইবনু কাসির, আল-বিদায়া: খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ৯৭; ইবনু আল্লান, আল-ফুতুহাতুর রব্বানিয়্যাহ: খণ্ড ৩, ৫৫ পৃষ্ঠাতে ইবনু হাজারের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, এটি সহীহ। আলবানি, সহীহুত তারগীব: ১৫৯৬-এ একে সহীহ বলেছেন, আরনাউত একই কথা বলেছেন।
১৪০ আহমাদ : ১৯৯৭; আবু দাউদ : ১৫১০-১৫১১; তিরমিযি: ৩৫৫১, তিরমিযি একে হাসান বলেছেন, যাহাবি একমত। আলবানি সহীহুত তিরমিযিতে একে সহীহ বলেছেন। আরনাউত বলেছেন এর ইসনাদ সহীহ।
১৪৪ তাহাবি, মা'আনিউল আসার: খণ্ড ১, ২৫০ পৃষ্ঠায় জাইয়্যিদ ইসনাদ সহকার বর্ণনা করেছেন।
১৪৫ তাবারানি, আল-আসওয়াত, আস-সগীর, ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত; হায়সামি : খণ্ড ১০, ১৮৩ পৃষ্ঠাতে বলেছেন, "এর ইসনাদে থাকা বর্ণনাকারীদের আমি চিনি না”।
১৪৬ সূরাহ ইউসুফ, ১২: ১৮
১৪৭ সূরাহ আল-আ'রাফ, ৭: ১২৮
১৪৮ সূরাহ আল-আম্বিয়া, ২১: ১১২
১৪৯ মুসলিম: ২৪০৩
১৫০ তাবারানি, আল-আসওয়াত: ৮১৬৩; ইবনুস সুন্নি, আমালুল ইয়াওমা ওয়াল লাইলাহ : ৩৩৪; হায়সামি: খণ্ড ৫, ৩২৮ পৃষ্ঠায় বলেন, এর ইসনাদে আব্দুস সালাম ইবনু হাশিম আছেন, যিনি যঈফ। আলবানি, আয-যঈফাহ: ৫১০৫-এ একে যঈফ বলেছেন।
১৫১ অর্থাৎ, যেকোনো কষ্ট সহ্য করে নেয় এবং যা করা উচিত তা করে।

📘 নবীজির সাঃ পদাঙ্ক অনুসরণ > 📄 কলম শুকিয়ে গেছে

📄 কলম শুকিয়ে গেছে


নবীজি বলেন, “যা যা ঘটবে, (তা লেখার পর) কলম শুকিয়ে গেছে।” আরেক বর্ণনায় আছে, “কলম তুলে নেওয়া হয়েছে এবং কালি শুকিয়ে গেছে।” আরেক বর্ণনায় আছে, “কলম তুলে নেওয়া হয়েছে আর পৃষ্ঠাগুলো শুকিয়ে গেছে।”
এই সবগুলো 'কিনায়াহ' বা রূপক দিয়ে তাকদীরের কর্মপদ্ধতি বর্ণনা করা হচ্ছে। সবকিছুই আগে থেকে এক বিস্তীর্ণ কিতাবে লিখিত রয়েছে। এমন এক বইয়ের কথা বলা হচ্ছে, যা সুদীর্ঘকাল আগে লিপিবদ্ধ হয়েছে। এতে লেখার কাজে ব্যবহৃত কলমটি তুলে নেওয়া হয়েছে, কলম বা পৃষ্ঠার কালি শুকিয়ে গেছে, আর মোছা যাবে না। তাকদীরের গভীরতার দিকে ইঙ্গিত করার জন্য এ এক চমৎকার পদ্ধতি।
কুরআন ও সুন্নাহও এই অর্থের দিকে নির্দেশ করে। আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা বলেন:
“পৃথিবীতে অথবা তোমাদের নিজেদের উপর এমন কোনো বিপদ আসে না, যা আমি সংঘটিত করার পূর্বে কিতাবে লিপিবদ্ধ রাখি না। এটি (করা) আল্লাহর জন্য খুবই সহজ।” ১৫২
দাহহাক থেকে বর্ণিত আছে, ইবনে আব্বাস বলেন, "আল্লাহ কলম সৃষ্টি করে তাঁর নির্দেশে একে চলতে বললেন। কলমটির আকৃতি আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী দূরত্বের সমান। কলম বলল, 'হে প্রতিপালক, কী লিখব?' তিনি বললেন, 'আমি যা কিছু সৃষ্টি করব এবং আমার সৃষ্টির সাথে যা যা হবে-বৃষ্টি, উদ্ভিদ, আত্মা, কর্ম, রিযক ও আয়ু।' কিয়ামাত পর্যন্ত যা যা ঘটবে, কলম তা লিখল। আল্লাহর কাছে তাঁর আরশের নিচে তিনি তা এক কিতাবে সংরক্ষিত রেখেছেন।”
আবু যাবইয়ান থেকে বর্ণিত ইবনে আব্বাস বলেন, “আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করলেন ও তাকে আদেশ দিলেন, 'লেখো।' এটি জিজ্ঞেস করল, 'কী লিখব?' তিনি জবাব দিলেন, 'তাকদীর।' কিয়ামাত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত যা যা
ঘটবে, সেটি সেসব লিপিবদ্ধ করল।” তারপর তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করেন: “নূন। কলমের ও তারা যা লেখে, তার শপথ।”১৫৩
আবুদ্দুহা ইবনে আব্বাস আবুদ্দুহা -এর বর্ণনায় রাসূল থেকে একই রকম একটি বর্ণনা করেন।১৫৪ -এর একটি হাদীসও আছে, তবে তা সহীহ নয়। ১৫৫
ইবনে বাত্তাহ থেকে দুর্বল ইসনাদে আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূল বলেছেন, "আল্লাহ প্রথমে কলম সৃষ্টি করেছেন। তারপর সৃষ্টি করেছেন আন-নূন, যা হলো একটি কালির দোয়াত। তিনি আদেশ করলেন, 'লেখো।' এটি জিজ্ঞেস করল, 'কী লিখব?' তিনি বললেন, 'কিয়ামাত পর্যন্ত যা যা ঘটবে, লেখো।' এটি হলো আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার এই আয়াতের অর্থ : "নূন। কলমের ও তারা যা লেখে, তার শপথ।”১৫৬
এরপর কলমকে এমনভাবে সিলগালা করা হলো যে, তা আর কথা বলতে পারে না। কিয়ামাত পর্যন্ত এটি আর কথা বলবে না।”১৫৭
ইমাম আহমাদ, আবু দাউদ ও তিরমিযির সূত্রে উবাদা ইবনুস সামিত থেকে বর্ণিত আছে নবীজি বলেন, “আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন, যাকে তিনি আদেশ দিয়েছেন, 'লেখো।' সে সময় সেটি সেই সবকিছু লিখল, যা কিয়ামাত পর্যন্ত ঘটবে।”১৫৮
সহীহ মুসলিমে আব্দুল্লাহ ইবনু আমর থেকে বর্ণিত আছে নবীজি বলেন, “আল্লাহ প্রতিটি প্রাণীর তাকদীর আসমান-জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে লিপিবদ্ধ করেছেন।”১৫৯
ইমাম আহমাদ, তিরমিযি ও নাসাঈর সূত্রে বর্ণিত আব্দুল্লাহ ইবনু আমর বলেন, "নবীজি দুটি বই নিয়ে আমাদের কাছে বেরিয়ে আসলেন। তিনি বললেন, 'তোমরা কি জানো এই বইগুলো কী?' আমরা বললাম, 'না, ইয়া রাসূলাল্লাহ। যদি না আপনি আমাদের জানান।' তিনি ডান হাতের বইটি দেখিয়ে বললেন, 'এটি রব্বুল আ'লামিনের পক্ষ থেকে আসা একটি কিতাব, যাতে সকল জান্নাতির নাম, তাদের পিতামাতার নাম, গোত্রের নাম (বিস্তারিত) লিখিত রয়েছে। একদম শেষ ব্যক্তি পর্যন্ত লিখিত রয়েছে। এটি সংখ্যায় না কমবে, না বাড়বে।' বাম হাতের বইটির ব্যাপারে বললেন, 'এটি রব্বুল আ'লামিনের পক্ষ থেকে আসা একটি কিতাব, যাতে সকল জাহান্নামির নাম, তাদের পিতামাতার নাম, গোত্রের নাম (বিস্তারিত) লিখিত রয়েছে। একদম শেষ ব্যক্তি পর্যন্ত লিখিত রয়েছে। এটি সংখ্যায় না কমবে, না বাড়বে।' সাহাবাগণ বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, যদি সব নির্ধারিত হয়েই থাকে, তাহলে আমল করার কী দরকার?' তিনি বললেন, 'দৃঢ়, অবিচল ও ভারসাম্যপূর্ণ থাকো। জান্নাতি ব্যক্তির সর্বশেষ কাজ হবে জান্নাতিদের কাজের মতো, এর আগে সে যা-ই করে থাকুক না কেন। জাহান্নামি ব্যক্তির সর্বশেষ কাজ হবে জাহান্নামিদের কাজের মতো, এর আগে সে যা-ই করে থাকুক না কেন। বই দুটি ফেলে আল্লাহর রাসূল হাত দিয়ে ইশারা করে বললেন, 'তোমাদের প্রতিপালক বান্দাদের ব্যাপারে সবকিছু নির্ধারণ করে রেখেছেন, এক দল যাবে জান্নাতে, আরেক দল যাবে জাহান্নামে। '১৬০১৬১
ইমাম আহমাদ-এর সূত্রে আবুদ্দারদা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, "প্রত্যেক বান্দার জন্য আল্লাহ পাঁচটি বিষয় নির্ধারণ করে রেখেছেন- তার আয়ু, তার রিযক, তার আমল এবং সে কি ধ্বংসপ্রাপ্ত না নাজাতপ্রাপ্ত।”১৬২
ইমাম আহমাদ ও তিরমিযির সূত্রে ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেন, “আল্লাহ প্রত্যেক প্রাণ সৃষ্টি করেছেন এবং নির্ধারণ করে দিয়েছেন তার আয়ু, তার রিযক এবং যেসব ফিতনার সে মুখোমুখি হবে।”১৬৩
সহীহ মুসলিমে জাবির থেকে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করল,
"হে আল্লাহর রাসূল, আজকের আমল কী উদ্দেশ্যে করা হবে? কলম শুকিয়ে গেছে ও তাকদীর নির্ধারিত হয়ে গেছে, সেই উদ্দেশ্যে; নাকি ভবিষ্যতের কোনো কিছুর জন্যে?” রাসূল বললেন, “বরং কলম শুকিয়ে গেছে ও তাকদীর নির্ধারিত হয়ে গেছে, সেই উদ্দেশ্যে।” সেই ব্যক্তি বলল, "তাহলে আমল করব কী জন্যে?” তিনি বললেন, "আমল করতে থাকো। কারণ, প্রত্যেকের জন্য (সে যেই আমলের জন্য সৃষ্ট হয়েছে, তা) সহজ করে দেওয়া হয়।”১৬৪
এ সংক্রান্ত হাদীস ও সাহাবাগণের বর্ণনা প্রচুর রয়েছে। একজন বলেছেন:
আমল করতে থাকো পুরোটা, ঘটিতব্য সকল লিখে কলম গেছে শুকিয়ে, মানুষের রয়েছে এমনই স্রষ্টা, যার নির্ধারণ থেকে কেউ যাবে না পালিয়ে।

টিকাঃ
১৫২ সূরাহ আল-হাদীদ, ৫৭ : ২২
১০০ সূরাহ আল-কলাম, ৬৮: ১-২ বর্ণনাটি তাবারিতে (৬৮: ১-এর তাফসিরে) এবং আজুররি, আশ-শরিয়াহ: ১৮৩-৩৫০-তে সহীহ ইসনাদ সহকারে আছে। হাকিম: ৩৮৪০ একে সহীহ বলেছেন, যাহাবি একমত।
১৫৪ প্রাগুক্ত, আজুররি: ১৮২ এবং এটি সহীহ।
১০০ তাবারানি, আল-কাবির: ১২২২৭; বর্ণনাসূত্র যঈফ, যেহেতু এতে মুয়াম্মাল ইবনু ইসমাঈল আছেন, যিনি সত্যবাদী, কিন্তু দুর্বল স্মরণশক্তিধারী। হায়সামি: খণ্ড ৭, ১২৮ পৃষ্ঠায় বলেন, “মুয়াম্মাল বিশ্বস্ত, কিন্তু ভুল করেন। ইবনু মাইন ও অন্যান্যরা তাঁকে সিকাহ বলেছেন। বুখারি ও অন্যান্যরা বলেছেন যঈফ।"
১০৬ সূরাহ আল-কলাম, ৬৮: ১-২; বর্ণনাটি তাবারি : খণ্ড ২৯, ৯-১০ পৃষ্ঠায় আছে।
** ইবনু বাত্তাহ, আল-ইবানাহ (কাদর): ১৩৬৪; আজুররি: ১৭৯-৩৪৫; সুয়ুতি, আল-লাই আল-মাসনুয়াহ: খণ্ড ১, ১৩১ পৃষ্ঠায় একে হাকিম আত-তিরমিযির সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। এটি আরও বর্ণনা করেছেন ইবনু আসাকির, তারিখুদ্দিমাশক: খণ্ড ১৭, পৃষ্ঠা ২৪৭ ইবনু আদি, আল-কামিল: খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ৫২২, হাদীস নং ১৭৫৩-তে বলেছেন হাদীসটি বাতিল ও মুনকার। যাহাবি, আল-মিযান খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৬১, হাদীস নং ৮২৯৮-এ একমত পোষণ করেছেন। একই কথা বলেছেন আলবানি, আয-যঈফাহ: ১২৫৩
১৫৮ আহমাদ: ২২৭০৫-২২৭০৭; আবু দাউদ: ৪৭০০; তিরমিযি: ২১৫৫-৩৩১৯; তিরমিযি একে হাসান সহীহ গারীব বলেছেন। ইবনুল আরাবি, আহকামুল কুরআন: খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৩৫ এবং আলবানি, সহীহাহ: ১৩৩ এবং আরনাউত একে সহীহ বলেছেন।
১৫৯ মুসলিম: ২৬৫৩
১৬০ সূরাহ আশ-শুরা, ৪২: ৭
১৬১ আহমাদ: ৬৫৬৩; তিরমিযি ২১৪১; নাসাঈ, আল-কুবরা: ১১৪০৯; তিরমিযি একে হাসান সহীহ গারীব এবং নাসাঈ সহীহ বলেছেন, যা বর্ণিত আছে তুহফাতুল আশরাফ খণ্ড ৬, ২৪৩ পৃষ্ঠায়। ইবনু হাজার, ফাতহ: খণ্ড ৬, ৩৩৬ পৃষ্ঠায় এর ইসনাদ হাসান বলেছেন। অনুরূপ বলেছেন আলবানি, আস-সহীহাহ: ৮৪৮
১৬২ আহমাদ: ২১৭২২ এই শব্দ সহকারে, "আল্লাহ প্রত্যেক বান্দার জন্য পাঁচটি বিষয় নির্ধারিত করে দিয়েছেন-তার আয়ু, তার আমল, তার বিশ্রাম, তার নড়াচড়া এবং তার রিযক।” ইবনু হিব্বান : ৬১৫০-এ একে সহীহ বলেছেন। আহমাদ: ২১৭২৩-এ শব্দগুলো, “আল্লাহ প্রত্যেক বান্দার জন্য পাঁচটি বিষয় নির্ধারিত করে দিয়েছেন-তার আয়ু, তার রিযক, তার আমল, সে ধ্বংসপ্রাপ্ত না নাজাতপ্রাপ্ত।” সুয়ুতি, আল-জামিউস সগীর: ৫৮৪৮-এ একে সহীহ বলেছেন। অনুরূপ বলেছেন ওয়াদি, আস-সহীহুল মুসনাদ: ১০৪৫, আলবানি, যিলালুল জান্নাহ: ৩০৭- ৩০৮ এবং আরনাউত, উভয়ে একে সহীহ বলেছেন।
১৬০ আহমাদ: ৪১৯৭; তিরমিযি : ২১৪৩; আলবানি, আস-সহীহাহ: ১১৫২ এবং আরনাউত একে সহীহ বলেছেন। আহমাদ: ৮৩৪৩-এ আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেন, "আল্লাহ প্রতিটি আত্মা সৃষ্টি করে এর জীবন, মরণ, এটি যেসব পরীক্ষার মুখোমুখি হবে এবং রিযক নির্ধারিত করে দিয়েছেন।” ইবনু হিব্বান: ৬১১৮-৬১১৯ এবং আরনাউত একে সহীহ বলেছেন।
১৬৪ মুসলিম: ২৬৪৮

📘 নবীজির সাঃ পদাঙ্ক অনুসরণ > 📄 আল্লাহর নির্ধারণই কার্যকর হয়

📄 আল্লাহর নির্ধারণই কার্যকর হয়


নবীজি বলেছেন, “সমগ্র সৃষ্টিজগৎ একত্র হয়ে যদি তোমার এমন কোনো উপকার করতে চায়, যা আল্লাহ নির্ধারিত করে রাখেননি, তাহলেও তারা তা করতে সমর্থ হবে না। আর তারা যদি তোমার এমন কোনো ক্ষতি করতে চায়, যা আল্লাহ নির্ধারিত করে রাখেননি, তাহলেও তারা তা করতে সমর্থ হবে না।”
এর অর্থ হলো, বান্দা যত উপকার ও ক্ষতির সম্মুখীন হয়, সবই তার জন্য আগে থেকে নির্ধারিত হয়ে আছে। সমগ্র সৃষ্টিজগৎ মিলে সর্বাত্মক চেষ্টা করেও অনির্ধারিত কোনো বিষয়ের মুখোমুখি তাকে করতে পারবে না। কুরআনের আয়াতেও এটি প্রমাণিত হয়। যেমন:
"বলে দাও, আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারিত করে দিয়েছেন, তা ছাড়া অন্য কিছুই আমাদের ঘটবে না..."১৬৫
“পৃথিবীতে অথবা তোমাদের নিজেদের উপর এমন কোনো বিপদ আসে না, যা আমি সংঘটিত করার পূর্বে কিতাবে লিপিবদ্ধ রাখিনি।...”১৬৬
"...বলে দাও, যদি তোমরা তোমাদের ঘরেও থাকতে, তথাপি যাদের জন্য মৃত্যু নির্ধারিত ছিল, তারা তাদের মৃত্যুর স্থানের পানে বেরিয়েই পড়ত..."১৬৭
ইমাম আহমাদের সূত্রে আবুদ্দারদা থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ বলেন,
“সবকিছুরই একটি হাকিকত রয়েছে। বান্দা ততক্ষণ ঈমানের হাকিকত অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না সে জেনে নিচ্ছে যে, তার সাথে যা ঘটেছে তা ঘটারই ছিল; যা ঘটেনি, তা কিছুতেই ঘটত না।”১৬৮
আবু দাঊদ ও ইবনে মাজাহর সূত্রেও যায়েদ বিন সাবিত থেকে অনুরূপ অর্থের হাদীস বর্ণিত হয়েছে। ১৬৯
জেনে রাখুন, ইবনে আব্বাস -কে দেওয়া পুরো উপদেশটি এই কেন্দ্রীয় মূলনীতিকে ঘিরেই আবর্তিত হয় এবং এরই শাখা হিসেবে বের হয়। বান্দা যখন উপলব্ধি করবে যে, আল্লাহর নির্ধারণ করে রাখা ভালো-মন্দ ও উপকার-অপকার ছাড়া আর কিছুই তার সাথে ঘটবে না, পুরো সৃষ্টিজগৎ মিলে এর অন্যথা করতে চাইলেও ব্যর্থ হবে, সে তখন বুঝতে পারবে যে এক আল্লাহই উপকার করার ও ক্ষতি করার মালিক, তিনিই দেন, তিনিই দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার প্রতি বান্দার তাওহীদ পূর্ণাঙ্গতা পাবে। সে তখন একমাত্র তাঁর কাছেই সাহায্য চাইবে, তাঁর কাছেই প্রার্থনা করবে, তাঁর সামনেই নিজেকে বিনীত ও অবনত করবে। সে শুধু তাঁরই ইবাদাত করবে এবং তাঁর কাছেই সাহায্য চাইবে। কারণ, কারও উপাসনা করা হয়ই এই আশায় যে, উপাস্য কোনো উপকার করবেন এবং কোনো অপকার থেকে বাঁচাবেন। এ জন্যই আল্লাহ অন্য কোনো কিছুর উপাসনা নিষিদ্ধ করেছেন যে, তারা কোনো উপকার বা অপকার করতে পারে না, তাদের উপাসনা নিষ্ফল। ১৭০
যাদের অন্তরে ঈমান ঠিকমতো প্রবেশ করেনি, তারা স্রষ্টার আনুগত্যের আগে সৃষ্টির আনুগত্যকে স্থান দেয় এই ভেবে যে, এগুলো তার কিছু উপকার করবে বা কিছু ক্ষতি থেকে তাকে বাঁচাবে। বান্দা যখন উপলব্ধি করবে যে, একমাত্র আল্লাহই লাভ-ক্ষতি করানোর মালিক, তিনিই দাতা, তিনিই দান থেকে বিরতকারী, তখন বান্দা ইবাদাতের জন্য আল্লাহকেই নির্দিষ্ট করে নেবে এবং সৃষ্টির উপর স্রষ্টাকে প্রাধান্য দেবে। সাহায্য চাওয়ার জন্যও তখন এক আল্লাহরই কাছে শরণাপন্ন হবে।
এই ব্যাপক অর্থপূর্ণ ও অসাধারণ উপদেশে এই সকল বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে, যার প্রতিটিই পর্বতপ্রমাণ গুরুত্বের দাবিদার।
বান্দা কর্তৃক আল্লাহকে হেফাজত করার অর্থ হলো আল্লাহর দেওয়া সীমা মেনে চলা এবং তাঁর অধিকারসমূহ আদায় করা। এটিই তাঁর ইবাদাতের হাকিকত। এর মাধ্যমে উপদেশটি শুরু হয়। তারপর তা এগিয়ে যায় আল্লাহ কর্তৃক বান্দার হেফাজতের দিকে, যার বাস্তবায়ন প্রতিটি বান্দার চূড়ান্ত মনোবাসনা।
এরপর বলা হয়েছে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় বান্দা আল্লাহকে জানলে আল্লাহ তাকে তার দুঃখ-দুর্দশার সময় জানবেন। এটি হলো আল্লাহ কর্তৃক বান্দাকে হেফাজত করার অংশ এবং এর পূর্ণতা দানকারী। দুঃখ-কষ্টের সময়কে বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হলো এটাই সেই সময় যখন বান্দা এমন সত্তার কাছে মরিয়া হয়ে ফিরে যায়, যে তার সম্পর্কে জানে এবং তাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারবে। এমনকি মুশরিকরাও এ রকম সময় এক আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা, কান্নাকাটি, অনুনয়-বিনয় করতে থাকে। জানে যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলাই কেবল তাদের দু'আর উত্তর প্রদানে সক্ষম। কিন্তু যখন বিপদ কেটে যায়, তারা শির্কে ফিরে যায়-যার কথা আল্লাহ কুরআনে বহু জায়গায় বলেছেন এবং যার কারণে মুশরিকদের নিন্দা করেছেন। ১৭১ এই উপদেশের মাধ্যমে নবীজি আমাদের মুশরিকদের বিরোধিতা করতে শিখিয়েছেন। আদেশ করেছেন যেন আমরা সুখের সময়েও আল্লাহকে স্মরণ করি, দ্বীনকে একমাত্র তাঁর জন্যই বিশুদ্ধ করে নিই, তাঁরই নৈকট্য কামনা করি। এর ফলে বান্দার দুঃখের সময়ে বান্দাকে জানা আল্লাহর জন্য জরুরি হয়ে পড়বে।
এরপর বলা হয়েছে শুধু আল্লাহর কাছেই সবকিছু চাইতে এবং তাঁরই সাহায্য কামনা করতে। সুখ-দুঃখ উভয় সময়েই তা করতে হবে।
তারপর সেই মূলনীতি উল্লেখ করা হয়েছে, যার উপর আগের সকল বিষয় নির্মিত হয়েছে-এক আল্লাহই উপকার করেন, ক্ষতিসাধন বা দূরীভূত করেন, দান করেন ও দান করা থেকে বিরত থাকেন, পুরো সৃষ্টিজগৎ মিলেও আল্লাহর নির্ধারিত বিষয়ের অন্যথা করতে অক্ষম।
এই উপলব্ধি বান্দাকে সৃষ্টির উপর নির্ভরতা থেকে মুক্ত করে। বান্দা কোনো সৃষ্টির কাছে হাত পাতা, সাহায্য চাওয়া এবং উপকার ও অপকারের আশা করা থেকে বিরত হয়।১৭২ সৃষ্টির প্রতি বান্দার ভয়ও দূরীভূত হয়। এর আবশ্যক ফলাফলস্বরূপ, সে একমাত্র আল্লাহরই উপাসনা করে এবং আল্লাহরই কাছে সাহায্য চায়। আল্লাহর আনুগত্যকে সে সৃষ্টির আনুগত্যের আগে স্থান দেয়। সমগ্র সৃষ্টিজগৎকে অসন্তুষ্ট করে হলেও বান্দা আল্লাহকে সন্তুষ্ট রাখতে সচেষ্ট হয়ে ওঠে। আবু সাঈদ থেকে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূল ﷺ বলেন, "ইয়াকীনের দুর্বলতার একটি লক্ষণ এই যে, কোনো ব্যক্তি আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে মানুষকে সন্তুষ্ট করতে চায়। আল্লাহ যে রিযক দিয়েছেন, তার জন্য তাদের প্রশংসা করে; আল্লাহ যা তাকে দেননি, তার জন্য তাদের তিরস্কার করে। মানুষ কেবল কামনা করলেই আল্লাহর রিযক লাভ করতে পারে না, আবার কেবল ঘৃণা করলেই তা দূর করতে পারে না।”১৭৩
কবি সত্যিই বলেছিলেন: যদি স্বাদ নিতে জানতে, যখন জীবন তিক্ত, রাগের মুখেও যদি মানুষ শান্ত থাকা শিখত, জীবন সহজ হয় সত্যিকারের ভালোবাসায়ই খালি, পৃথিবীর উপর যা-ই আছে, সেসব তো ধুলাবালি।
জেনে রাখুন, জমিনের উপর চলমান প্রতিটি প্রাণীই কেবল ধুলা আর মাটি। রাজাধিরাজ আল্লাহর আনুগত্যের আগে ধুলাবালি আর মাটির আনুগত্যকে কী করে স্থান দেওয়া সম্ভব? মালিক ও দাতাকে অসন্তুষ্ট করে মাটিকে সন্তুষ্ট করে কী লাভ? সত্যিই অবাক করা ব্যাপার!
কুরআনের বহু জায়গায় এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলাই দান করেন ও দান করা থেকে বিরত থাকেন:
“আল্লাহ মানুষের জন্য যে রহমত খুলে দেন, তা নিবারণ করার কেউ নেই। আর তিনি যা বারিত করেন, কেউ তা প্রেরণ করতে পারে না... "১৭৪
“আল্লাহ যদি তোমাকে কষ্ট দিতে চান, তাহলে তিনি ছাড়া তা দূর করার আর কেউ নেই। আর আল্লাহ যদি তোমার কল্যাণ করতে চান, তাহলে তাঁর অনুগ্রহ রদ করার কেউ নেই... "১৭৫
“বলো, তোমরা কি ভেবে দেখেছ যে, আল্লাহ আমার ক্ষতি করতে চাইলে আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ডাকো, তারা কি সে ক্ষতি দূর করতে পারবে? অথবা তিনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করতে চাইলে তারা কি তাঁর অনুগ্রহ ঠেকাতে পারবে?... "১৭৬
আল্লাহ তা'আলা নূহ-এর উক্তি উল্লেখ করেন :
“হে আমার সম্প্রদায়, আমার অবস্থিতি আর আল্লাহর আয়াতসমূহের দ্বারা তোমাদের প্রতি আমার উপদেশ দান যদি তোমাদের নিকট অসহ্য মনে হয়, (তাতে আমার কোনো পরোয়া নেই, কারণ) আমি তো কেবল আল্লাহর উপর ভরসা করি। তোমরা তোমাদের শরিকদের নিয়ে সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করো। পরে তোমাদের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তোমাদের মাঝে যেন কোনো অস্পষ্টতা না থাকে... "১৭৭
আল্লাহ তা'আলা হুদ-এর উক্তি উল্লেখ করেন :
"আমি আল্লাহকে সাক্ষী রাখছি আর তোমরাও সাক্ষী হও যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাকে তাঁর শরিক করো, তার সাথে আমি পুরোপুরি সম্পর্কহীন। তাঁকে (আল্লাহ) ব্যতীত তোমরা সকলে মিলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করো আর আমাকে একটুও অবকাশ দিয়ো না। আমি নির্ভর করি আল্লাহর উপর, যিনি আমার আর তোমাদের প্রতিপালক... "১৭৮
একজন সালাফ বলেছেন:
আল্লাহ আমার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তা তো হবেই, হুঁশিয়ারি দিয়ে তা এড়ানো গেলে তো এড়ানো যেত কবেই। আমরা যতটা না নিজেদের, তারচেয়ে বেশি আমরা আল্লাহর, আমাদের পরিচয় তো কেবল এক তাকদীরে বাঁধা বান্দাহর।
ফুদাইল আল-ফাকাহ -এর কাছে এক ব্যক্তি একবার নালিশ করল। তিনি জবাব দিলেন, “তুমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে নালিশ করলে?”
একজন সালাফ বলেছেন:
যে রায় ইচ্ছা দাও, তোমার রায় হবে না বাস্তবায়ন, আল্লাহর দেওয়া তাকদীরই হবে আসল কার্যকারণ, রবের অধীনে সবকিছু, তাঁরই ইচ্ছা সর্বদা হয় সাধন।

টিকাঃ
১৬৫ সূরাহ আত-তাওবাহ, ৯:৫১
১৬৬ সূরাহ আল-হাদীদ, ৫৭: ২২
১৬৭ সূরাহ আলে ইমরান, ৩ : ১৫৪
১৬৮ আহমাদ: ২৭৪৯০; ইবন আবি আসিম: ২৪৬; একে হাসান বলেছেন, সুয়তি, আল-জামি : ২৪১৭ এবং ওয়াদিই, সহীহুল মুসনাদ: ১০৫০। আলবানি, যিলালুল জান্নাহ: ২৪৬ এবং আস-সহীহাহ: ২৪৭১-এ একে সমর্থনকারী হাদীসের কারণে সহীহ বলেছেন।
১৬৯ আহমাদ: ২১৫৮৯-২১৬১১-২১৬৫৩; আবু দাউদ: ৪৬৯৯; ইবনু মাজাহ: ৭৭ এই শব্দ সহকারে, “তুমি যদি আল্লাহর রাস্তায় উহুদ পরিমাণ খরচ করো, তাহলেও আল্লাহ তা কবুল করবেন না, যদি না তুমি তাকদিরে বিশ্বাস করো এবং জেনে নাও যে, যা তোমার উপর আপতিত হয়েছে তা হওয়ারই ছিল এবং যা আপতিত হয়নি তা কিছুতেই হওয়ার ছিল না। এ (বিশ্বাস) ছাড়া অন্য কোনো কিছুর উপর মৃত্যুবরণ করলে তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” একে সহীহ বলেছেন ইবনু হিব্বান : ৭২৭ এবং আলবানি, তাখরিজ আবু দাউদ: ৪৬৯৯; আরনাউত বলেছেন এর ইসনাদ শক্তিশালী। তিরমিযি : ২১৪৪ এবং তাবারানি, আল-কাবির: ১১২৪৩ ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ বলেন, "বান্দা ততক্ষণ মুমিন হবে না যতক্ষণ না সে তাকদীরের ভালো-মন্দে বিশ্বাস করে এবং জেনে নেয় যে, যা তার উপর আপতিত হয়েছে তা হওয়ারই ছিল এবং যা আপতিত হয়নি তা কিছুতেই হওয়ার ছিল না।” আলবানি, আস-সহীহাহ: ২৪৩৯ একে সহীহ বলেছেন।
১৭০ যেমন আল্লাহর কালাম, "তারা আল্লাহকে ছেড়ে ইবাদাত করে এমন কিছুর, যা না তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারে আর না উপকার করতে পারে।” [সূরাহ ইউনুস, ১০: ১৮] "তারপরও তারা আল্লাহকে ছেড়ে ইবাদাত করে এমন কিছুর, যা না তাদের সাহায্য করতে পারে, না ক্ষতি।” [সূরাহ আল-ফুরকান, ২৫: ৫৫] "বাবা, কেন আপনি এমন জিনিসের ইবাদাত করেন যা শোনে না, দেখে না, আপনার কোনো কাজেই আসে না?” [সূরাহ মারইয়াম, ১৯: ৪২] "আর তারা তাঁকে বাদ দিয়ে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করেছে অন্য কিছুকে, যারা কিছুই সৃষ্ট করে না; বরং তারা নিজেরাই সৃষ্ট। তারা ক্ষমতা রাখে না নিজেদের ক্ষতি বা উপকার করার, আর ক্ষমতা রাখে না মৃত্যু, জীবন ও পুনরুত্থানের উপর।” [সূরাহ আল-ফুরকান, ২৫: ৩]
১৭১ যেমন আল্লাহর বাণী, “যখন মানুষকে দুঃখ-ক্লেশ স্পর্শ করে, সে শুয়ে, বসে ও দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকে। আর যখন আমি সে দুঃখ-ক্লেশ অপসারণ করে দিই, সে এমনভাবে চলে যায় যেন তাকে দুঃখ-ক্লেশ স্পর্শ করার পর সে আমাকে কখনো ডাকেইনি।” [সূরাহ ইউনুস, ১০: ১২] “তোমরা যে অনুগ্রহই লাভ করে থাকো, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর যখন দুঃখ-কষ্ট তোমাদের স্পর্শ করে, তখন তাঁর কাছেই তোমরা আকুল আবেদন জানাতে থাকো। অতঃপর যখন তিনি তোমাদের থেকে দুঃখ-কষ্ট দূর করে দেন, তখন তোমাদের একদল তাদের প্রতিপালকের সঙ্গে অন্যকে শরিক করে বসে আমি তাদের যা দিয়েছি, তার না-শোকরি করার জন্য। অতএব, তোমরা ভোগ করে নাও। শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে।” [সূরাহ আন-নাহল, ১৬ : ৫০-৫৫] "সমুদ্রে যখন বিপদ তোমাদের পেয়ে বসে, তখন তাঁকে ছাড়া অন্য যাদের তোমরা (উপাস্য ভেবে) আহ্বান করো, তারা (তখন তোমাদের মন থেকে) হারিয়ে যায়। অতঃপর তিনি যখন তোমাদের স্থলে এনে বাঁচিয়ে দেন, তখন তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও। মানুষ হলো বড়ই অকৃতজ্ঞ।” [সূরাহ বানী ইসরাঈল, ১৭: ৬৭] "দুঃখ-মুসিবত যখন মানুষকে স্পর্শ করে, তখন সে তার প্রতিপালককে ডাকতে থাকে তাঁর প্রতি বড়ই একনিষ্ঠ হয়ে। অতঃপর তিনি যখন নিজ পক্ষ থেকে অনুগ্রহ দিয়ে তাকে ধন্য করেন, তখন সে পূর্বে যে জন্য তাঁকে ডেকেছিল তা ভুলে যায় এবং অন্যদের আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করায় তাঁর পথ থেকে পথভ্রষ্ট করার জন্য।” [সূরাহ আয-যুমার, ৩৯: ৮]
১৭২ হালিমি, আল-মিনহাজ ফী শুয়াবুল ঈমানে বলেন, "আশার কয়েক রকম রূপ আছে: ১. আকাঙ্ক্ষিত বস্তু লাভের আশা, ২. তা পাওয়ার পর ধরে রাখার আশা, ৩. অনাকাঙ্ক্ষিত বস্তু থেকে দূরে থাকার আশা, ৪. ঘটে যাওয়া কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত জিনিসের সমাপ্তি দেখার আশা। কারও প্রতি ভয়ের মতো করে আশাও যদি কারও হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে যায়, তাহলে বিনয় ও নম্রতার দিকে ধাবিত করে। কারণ, আশা আর ভয় হাত ধরাধরি করে চলে। ভীত ব্যক্তি ভয়ের বিপরীতটিরও আশা করে। সে আল্লাহর কাছে দু'আ করে, তাঁর কাছে কামনা করে। তেমনি তাঁকে ভয় করা ব্যক্তি আকাঙ্ক্ষিত বস্তু হারানোর ভয় করে এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়। কাজেই যে ব্যক্তিই ভয় করে, সে আশাও করে। আর যে আশা করে, সে ভয়ও করে।”
১৭৩ আবু নুয়াইম, আল-হিলইয়াহ: খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ১০৬; বায়হাকি, শুয়াব: ২০৭-এ বলেন, এর বর্ণনাসূত্রে মুহাম্মাদ ইবনু মারওয়ান আছেন, যিনি যঈফ। যাহাবি, আল-মিযান: খণ্ড ৪, ৩২ পৃষ্ঠায় বলেন, "তাঁরা তাঁকে পরিত্যাগ করেছেন এবং কেউ তাঁর মিথ্যুক হওয়ার অভিযোগ করেন।” এ ছাড়াও এর ইসনাদে আতিয়্যাহ আল-আওফি নামক একজন যঈফ বর্ণনাকারী আছেন। সুয়ুতি, আল-জামি: ২৪৯৩ একে যঈফ বলেছেন এবং আলবানি, আয-যঈফা: ১৪৮২তে একে মাওযু বলেছেন। তাবারানি, আল-কাবির: ১০৫১৪ এবং বায়হাকি : ২০৮ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেন, “আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে কাউকে সন্তুষ্ট কোরো না। আল্লাহর দয়ার কারণে অন্য কারও প্রশংসা কোরো না। আল্লাহ যা (হতে দিতে) চাননি, তার জন্য অন্য কাউকে তিরস্কার কোরো না। কোনো ব্যক্তির চাইলেই আল্লাহর রিযক চলে আসে না এবং কোনো ব্যক্তির অপছন্দ করলেই তা দূর হয়ে যায় না।" আলবানি, যঈফ আত-তারগীব: ১০৬৪ একে মাওযু বলেছেন। বায়হাকি: ২০৯ এবং ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ইয়াকিন : ৩২ এ একই কথা ইবনু মাসউদ এ-এর বক্তব্য হিসেবে এনেছেন। দেখুন অধ্যায় নয়, ফুটনোট: ৩১
১৭৪ সূরাহ ফাতির, ৩৫: ২
১৭৫ সূরাহ ইউনুস, ১০: ১০৭
১৭৬ সূরাহ আয-যুমার, ৩৯: ৩৮
১৭৭ সূরাহ ইউনুস, ১০:৭১
১৭৮ সূরাহ হুদ, ১১:৫৪-৫৬

নবীজি বলেছেন, “সমগ্র সৃষ্টিজগৎ একত্র হয়ে যদি তোমার এমন কোনো উপকার করতে চায়, যা আল্লাহ নির্ধারিত করে রাখেননি, তাহলেও তারা তা করতে সমর্থ হবে না। আর তারা যদি তোমার এমন কোনো ক্ষতি করতে চায়, যা আল্লাহ নির্ধারিত করে রাখেননি, তাহলেও তারা তা করতে সমর্থ হবে না।”
এর অর্থ হলো, বান্দা যত উপকার ও ক্ষতির সম্মুখীন হয়, সবই তার জন্য আগে থেকে নির্ধারিত হয়ে আছে। সমগ্র সৃষ্টিজগৎ মিলে সর্বাত্মক চেষ্টা করেও অনির্ধারিত কোনো বিষয়ের মুখোমুখি তাকে করতে পারবে না। কুরআনের আয়াতেও এটি প্রমাণিত হয়। যেমন:
"বলে দাও, আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারিত করে দিয়েছেন, তা ছাড়া অন্য কিছুই আমাদের ঘটবে না..."১৬৫
“পৃথিবীতে অথবা তোমাদের নিজেদের উপর এমন কোনো বিপদ আসে না, যা আমি সংঘটিত করার পূর্বে কিতাবে লিপিবদ্ধ রাখিনি।...”১৬৬
"...বলে দাও, যদি তোমরা তোমাদের ঘরেও থাকতে, তথাপি যাদের জন্য মৃত্যু নির্ধারিত ছিল, তারা তাদের মৃত্যুর স্থানের পানে বেরিয়েই পড়ত..."১৬৭
ইমাম আহমাদের সূত্রে আবুদ্দারদা থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ বলেন,
“সবকিছুরই একটি হাকিকত রয়েছে। বান্দা ততক্ষণ ঈমানের হাকিকত অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না সে জেনে নিচ্ছে যে, তার সাথে যা ঘটেছে তা ঘটারই ছিল; যা ঘটেনি, তা কিছুতেই ঘটত না।”১৬৮
আবু দাঊদ ও ইবনে মাজাহর সূত্রেও যায়েদ বিন সাবিত থেকে অনুরূপ অর্থের হাদীস বর্ণিত হয়েছে। ১৬৯
জেনে রাখুন, ইবনে আব্বাস -কে দেওয়া পুরো উপদেশটি এই কেন্দ্রীয় মূলনীতিকে ঘিরেই আবর্তিত হয় এবং এরই শাখা হিসেবে বের হয়। বান্দা যখন উপলব্ধি করবে যে, আল্লাহর নির্ধারণ করে রাখা ভালো-মন্দ ও উপকার-অপকার ছাড়া আর কিছুই তার সাথে ঘটবে না, পুরো সৃষ্টিজগৎ মিলে এর অন্যথা করতে চাইলেও ব্যর্থ হবে, সে তখন বুঝতে পারবে যে এক আল্লাহই উপকার করার ও ক্ষতি করার মালিক, তিনিই দেন, তিনিই দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার প্রতি বান্দার তাওহীদ পূর্ণাঙ্গতা পাবে। সে তখন একমাত্র তাঁর কাছেই সাহায্য চাইবে, তাঁর কাছেই প্রার্থনা করবে, তাঁর সামনেই নিজেকে বিনীত ও অবনত করবে। সে শুধু তাঁরই ইবাদাত করবে এবং তাঁর কাছেই সাহায্য চাইবে। কারণ, কারও উপাসনা করা হয়ই এই আশায় যে, উপাস্য কোনো উপকার করবেন এবং কোনো অপকার থেকে বাঁচাবেন। এ জন্যই আল্লাহ অন্য কোনো কিছুর উপাসনা নিষিদ্ধ করেছেন যে, তারা কোনো উপকার বা অপকার করতে পারে না, তাদের উপাসনা নিষ্ফল। ১৭০
যাদের অন্তরে ঈমান ঠিকমতো প্রবেশ করেনি, তারা স্রষ্টার আনুগত্যের আগে সৃষ্টির আনুগত্যকে স্থান দেয় এই ভেবে যে, এগুলো তার কিছু উপকার করবে বা কিছু ক্ষতি থেকে তাকে বাঁচাবে। বান্দা যখন উপলব্ধি করবে যে, একমাত্র আল্লাহই লাভ-ক্ষতি করানোর মালিক, তিনিই দাতা, তিনিই দান থেকে বিরতকারী, তখন বান্দা ইবাদাতের জন্য আল্লাহকেই নির্দিষ্ট করে নেবে এবং সৃষ্টির উপর স্রষ্টাকে প্রাধান্য দেবে। সাহায্য চাওয়ার জন্যও তখন এক আল্লাহরই কাছে শরণাপন্ন হবে।
এই ব্যাপক অর্থপূর্ণ ও অসাধারণ উপদেশে এই সকল বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে, যার প্রতিটিই পর্বতপ্রমাণ গুরুত্বের দাবিদার।
বান্দা কর্তৃক আল্লাহকে হেফাজত করার অর্থ হলো আল্লাহর দেওয়া সীমা মেনে চলা এবং তাঁর অধিকারসমূহ আদায় করা। এটিই তাঁর ইবাদাতের হাকিকত। এর মাধ্যমে উপদেশটি শুরু হয়। তারপর তা এগিয়ে যায় আল্লাহ কর্তৃক বান্দার হেফাজতের দিকে, যার বাস্তবায়ন প্রতিটি বান্দার চূড়ান্ত মনোবাসনা।
এরপর বলা হয়েছে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় বান্দা আল্লাহকে জানলে আল্লাহ তাকে তার দুঃখ-দুর্দশার সময় জানবেন। এটি হলো আল্লাহ কর্তৃক বান্দাকে হেফাজত করার অংশ এবং এর পূর্ণতা দানকারী। দুঃখ-কষ্টের সময়কে বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হলো এটাই সেই সময় যখন বান্দা এমন সত্তার কাছে মরিয়া হয়ে ফিরে যায়, যে তার সম্পর্কে জানে এবং তাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারবে। এমনকি মুশরিকরাও এ রকম সময় এক আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা, কান্নাকাটি, অনুনয়-বিনয় করতে থাকে। জানে যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলাই কেবল তাদের দু'আর উত্তর প্রদানে সক্ষম। কিন্তু যখন বিপদ কেটে যায়, তারা শির্কে ফিরে যায়-যার কথা আল্লাহ কুরআনে বহু জায়গায় বলেছেন এবং যার কারণে মুশরিকদের নিন্দা করেছেন। ১৭১ এই উপদেশের মাধ্যমে নবীজি আমাদের মুশরিকদের বিরোধিতা করতে শিখিয়েছেন। আদেশ করেছেন যেন আমরা সুখের সময়েও আল্লাহকে স্মরণ করি, দ্বীনকে একমাত্র তাঁর জন্যই বিশুদ্ধ করে নিই, তাঁরই নৈকট্য কামনা করি। এর ফলে বান্দার দুঃখের সময়ে বান্দাকে জানা আল্লাহর জন্য জরুরি হয়ে পড়বে।
এরপর বলা হয়েছে শুধু আল্লাহর কাছেই সবকিছু চাইতে এবং তাঁরই সাহায্য কামনা করতে। সুখ-দুঃখ উভয় সময়েই তা করতে হবে।
তারপর সেই মূলনীতি উল্লেখ করা হয়েছে, যার উপর আগের সকল বিষয় নির্মিত হয়েছে-এক আল্লাহই উপকার করেন, ক্ষতিসাধন বা দূরীভূত করেন, দান করেন ও দান করা থেকে বিরত থাকেন, পুরো সৃষ্টিজগৎ মিলেও আল্লাহর নির্ধারিত বিষয়ের অন্যথা করতে অক্ষম।
এই উপলব্ধি বান্দাকে সৃষ্টির উপর নির্ভরতা থেকে মুক্ত করে। বান্দা কোনো সৃষ্টির কাছে হাত পাতা, সাহায্য চাওয়া এবং উপকার ও অপকারের আশা করা থেকে বিরত হয়।১৭২ সৃষ্টির প্রতি বান্দার ভয়ও দূরীভূত হয়। এর আবশ্যক ফলাফলস্বরূপ, সে একমাত্র আল্লাহরই উপাসনা করে এবং আল্লাহরই কাছে সাহায্য চায়। আল্লাহর আনুগত্যকে সে সৃষ্টির আনুগত্যের আগে স্থান দেয়। সমগ্র সৃষ্টিজগৎকে অসন্তুষ্ট করে হলেও বান্দা আল্লাহকে সন্তুষ্ট রাখতে সচেষ্ট হয়ে ওঠে। আবু সাঈদ থেকে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূল ﷺ বলেন, "ইয়াকীনের দুর্বলতার একটি লক্ষণ এই যে, কোনো ব্যক্তি আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে মানুষকে সন্তুষ্ট করতে চায়। আল্লাহ যে রিযক দিয়েছেন, তার জন্য তাদের প্রশংসা করে; আল্লাহ যা তাকে দেননি, তার জন্য তাদের তিরস্কার করে। মানুষ কেবল কামনা করলেই আল্লাহর রিযক লাভ করতে পারে না, আবার কেবল ঘৃণা করলেই তা দূর করতে পারে না।”১৭৩
কবি সত্যিই বলেছিলেন: যদি স্বাদ নিতে জানতে, যখন জীবন তিক্ত, রাগের মুখেও যদি মানুষ শান্ত থাকা শিখত, জীবন সহজ হয় সত্যিকারের ভালোবাসায়ই খালি, পৃথিবীর উপর যা-ই আছে, সেসব তো ধুলাবালি।
জেনে রাখুন, জমিনের উপর চলমান প্রতিটি প্রাণীই কেবল ধুলা আর মাটি। রাজাধিরাজ আল্লাহর আনুগত্যের আগে ধুলাবালি আর মাটির আনুগত্যকে কী করে স্থান দেওয়া সম্ভব? মালিক ও দাতাকে অসন্তুষ্ট করে মাটিকে সন্তুষ্ট করে কী লাভ? সত্যিই অবাক করা ব্যাপার!
কুরআনের বহু জায়গায় এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলাই দান করেন ও দান করা থেকে বিরত থাকেন:
“আল্লাহ মানুষের জন্য যে রহমত খুলে দেন, তা নিবারণ করার কেউ নেই। আর তিনি যা বারিত করেন, কেউ তা প্রেরণ করতে পারে না... "১৭৪
“আল্লাহ যদি তোমাকে কষ্ট দিতে চান, তাহলে তিনি ছাড়া তা দূর করার আর কেউ নেই। আর আল্লাহ যদি তোমার কল্যাণ করতে চান, তাহলে তাঁর অনুগ্রহ রদ করার কেউ নেই... "১৭৫
“বলো, তোমরা কি ভেবে দেখেছ যে, আল্লাহ আমার ক্ষতি করতে চাইলে আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ডাকো, তারা কি সে ক্ষতি দূর করতে পারবে? অথবা তিনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করতে চাইলে তারা কি তাঁর অনুগ্রহ ঠেকাতে পারবে?... "১৭৬
আল্লাহ তা'আলা নূহ-এর উক্তি উল্লেখ করেন :
“হে আমার সম্প্রদায়, আমার অবস্থিতি আর আল্লাহর আয়াতসমূহের দ্বারা তোমাদের প্রতি আমার উপদেশ দান যদি তোমাদের নিকট অসহ্য মনে হয়, (তাতে আমার কোনো পরোয়া নেই, কারণ) আমি তো কেবল আল্লাহর উপর ভরসা করি। তোমরা তোমাদের শরিকদের নিয়ে সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করো। পরে তোমাদের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তোমাদের মাঝে যেন কোনো অস্পষ্টতা না থাকে... "১৭৭
আল্লাহ তা'আলা হুদ-এর উক্তি উল্লেখ করেন :
"আমি আল্লাহকে সাক্ষী রাখছি আর তোমরাও সাক্ষী হও যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাকে তাঁর শরিক করো, তার সাথে আমি পুরোপুরি সম্পর্কহীন। তাঁকে (আল্লাহ) ব্যতীত তোমরা সকলে মিলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করো আর আমাকে একটুও অবকাশ দিয়ো না। আমি নির্ভর করি আল্লাহর উপর, যিনি আমার আর তোমাদের প্রতিপালক... "১৭৮
একজন সালাফ বলেছেন:
আল্লাহ আমার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তা তো হবেই, হুঁশিয়ারি দিয়ে তা এড়ানো গেলে তো এড়ানো যেত কবেই। আমরা যতটা না নিজেদের, তারচেয়ে বেশি আমরা আল্লাহর, আমাদের পরিচয় তো কেবল এক তাকদীরে বাঁধা বান্দাহর।
ফুদাইল আল-ফাকাহ -এর কাছে এক ব্যক্তি একবার নালিশ করল। তিনি জবাব দিলেন, “তুমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে নালিশ করলে?”
একজন সালাফ বলেছেন:
যে রায় ইচ্ছা দাও, তোমার রায় হবে না বাস্তবায়ন, আল্লাহর দেওয়া তাকদীরই হবে আসল কার্যকারণ, রবের অধীনে সবকিছু, তাঁরই ইচ্ছা সর্বদা হয় সাধন।

টিকাঃ
১৬৫ সূরাহ আত-তাওবাহ, ৯:৫১
১৬৬ সূরাহ আল-হাদীদ, ৫৭: ২২
১৬৭ সূরাহ আলে ইমরান, ৩ : ১৫৪
১৬৮ আহমাদ: ২৭৪৯০; ইবন আবি আসিম: ২৪৬; একে হাসান বলেছেন, সুয়তি, আল-জামি : ২৪১৭ এবং ওয়াদিই, সহীহুল মুসনাদ: ১০৫০। আলবানি, যিলালুল জান্নাহ: ২৪৬ এবং আস-সহীহাহ: ২৪৭১-এ একে সমর্থনকারী হাদীসের কারণে সহীহ বলেছেন।
১৬৯ আহমাদ: ২১৫৮৯-২১৬১১-২১৬৫৩; আবু দাউদ: ৪৬৯৯; ইবনু মাজাহ: ৭৭ এই শব্দ সহকারে, “তুমি যদি আল্লাহর রাস্তায় উহুদ পরিমাণ খরচ করো, তাহলেও আল্লাহ তা কবুল করবেন না, যদি না তুমি তাকদিরে বিশ্বাস করো এবং জেনে নাও যে, যা তোমার উপর আপতিত হয়েছে তা হওয়ারই ছিল এবং যা আপতিত হয়নি তা কিছুতেই হওয়ার ছিল না। এ (বিশ্বাস) ছাড়া অন্য কোনো কিছুর উপর মৃত্যুবরণ করলে তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” একে সহীহ বলেছেন ইবনু হিব্বান : ৭২৭ এবং আলবানি, তাখরিজ আবু দাউদ: ৪৬৯৯; আরনাউত বলেছেন এর ইসনাদ শক্তিশালী। তিরমিযি : ২১৪৪ এবং তাবারানি, আল-কাবির: ১১২৪৩ ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ বলেন, "বান্দা ততক্ষণ মুমিন হবে না যতক্ষণ না সে তাকদীরের ভালো-মন্দে বিশ্বাস করে এবং জেনে নেয় যে, যা তার উপর আপতিত হয়েছে তা হওয়ারই ছিল এবং যা আপতিত হয়নি তা কিছুতেই হওয়ার ছিল না।” আলবানি, আস-সহীহাহ: ২৪৩৯ একে সহীহ বলেছেন।
১৭০ যেমন আল্লাহর কালাম, "তারা আল্লাহকে ছেড়ে ইবাদাত করে এমন কিছুর, যা না তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারে আর না উপকার করতে পারে।” [সূরাহ ইউনুস, ১০: ১৮] "তারপরও তারা আল্লাহকে ছেড়ে ইবাদাত করে এমন কিছুর, যা না তাদের সাহায্য করতে পারে, না ক্ষতি।” [সূরাহ আল-ফুরকান, ২৫: ৫৫] "বাবা, কেন আপনি এমন জিনিসের ইবাদাত করেন যা শোনে না, দেখে না, আপনার কোনো কাজেই আসে না?” [সূরাহ মারইয়াম, ১৯: ৪২] "আর তারা তাঁকে বাদ দিয়ে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করেছে অন্য কিছুকে, যারা কিছুই সৃষ্ট করে না; বরং তারা নিজেরাই সৃষ্ট। তারা ক্ষমতা রাখে না নিজেদের ক্ষতি বা উপকার করার, আর ক্ষমতা রাখে না মৃত্যু, জীবন ও পুনরুত্থানের উপর।” [সূরাহ আল-ফুরকান, ২৫: ৩]
১৭১ যেমন আল্লাহর বাণী, “যখন মানুষকে দুঃখ-ক্লেশ স্পর্শ করে, সে শুয়ে, বসে ও দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকে। আর যখন আমি সে দুঃখ-ক্লেশ অপসারণ করে দিই, সে এমনভাবে চলে যায় যেন তাকে দুঃখ-ক্লেশ স্পর্শ করার পর সে আমাকে কখনো ডাকেইনি।” [সূরাহ ইউনুস, ১০: ১২] “তোমরা যে অনুগ্রহই লাভ করে থাকো, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর যখন দুঃখ-কষ্ট তোমাদের স্পর্শ করে, তখন তাঁর কাছেই তোমরা আকুল আবেদন জানাতে থাকো। অতঃপর যখন তিনি তোমাদের থেকে দুঃখ-কষ্ট দূর করে দেন, তখন তোমাদের একদল তাদের প্রতিপালকের সঙ্গে অন্যকে শরিক করে বসে আমি তাদের যা দিয়েছি, তার না-শোকরি করার জন্য। অতএব, তোমরা ভোগ করে নাও। শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে।” [সূরাহ আন-নাহল, ১৬ : ৫০-৫৫] "সমুদ্রে যখন বিপদ তোমাদের পেয়ে বসে, তখন তাঁকে ছাড়া অন্য যাদের তোমরা (উপাস্য ভেবে) আহ্বান করো, তারা (তখন তোমাদের মন থেকে) হারিয়ে যায়। অতঃপর তিনি যখন তোমাদের স্থলে এনে বাঁচিয়ে দেন, তখন তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও। মানুষ হলো বড়ই অকৃতজ্ঞ।” [সূরাহ বানী ইসরাঈল, ১৭: ৬৭] "দুঃখ-মুসিবত যখন মানুষকে স্পর্শ করে, তখন সে তার প্রতিপালককে ডাকতে থাকে তাঁর প্রতি বড়ই একনিষ্ঠ হয়ে। অতঃপর তিনি যখন নিজ পক্ষ থেকে অনুগ্রহ দিয়ে তাকে ধন্য করেন, তখন সে পূর্বে যে জন্য তাঁকে ডেকেছিল তা ভুলে যায় এবং অন্যদের আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করায় তাঁর পথ থেকে পথভ্রষ্ট করার জন্য।” [সূরাহ আয-যুমার, ৩৯: ৮]
১৭২ হালিমি, আল-মিনহাজ ফী শুয়াবুল ঈমানে বলেন, "আশার কয়েক রকম রূপ আছে: ১. আকাঙ্ক্ষিত বস্তু লাভের আশা, ২. তা পাওয়ার পর ধরে রাখার আশা, ৩. অনাকাঙ্ক্ষিত বস্তু থেকে দূরে থাকার আশা, ৪. ঘটে যাওয়া কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত জিনিসের সমাপ্তি দেখার আশা। কারও প্রতি ভয়ের মতো করে আশাও যদি কারও হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে যায়, তাহলে বিনয় ও নম্রতার দিকে ধাবিত করে। কারণ, আশা আর ভয় হাত ধরাধরি করে চলে। ভীত ব্যক্তি ভয়ের বিপরীতটিরও আশা করে। সে আল্লাহর কাছে দু'আ করে, তাঁর কাছে কামনা করে। তেমনি তাঁকে ভয় করা ব্যক্তি আকাঙ্ক্ষিত বস্তু হারানোর ভয় করে এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়। কাজেই যে ব্যক্তিই ভয় করে, সে আশাও করে। আর যে আশা করে, সে ভয়ও করে।”
১৭৩ আবু নুয়াইম, আল-হিলইয়াহ: খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ১০৬; বায়হাকি, শুয়াব: ২০৭-এ বলেন, এর বর্ণনাসূত্রে মুহাম্মাদ ইবনু মারওয়ান আছেন, যিনি যঈফ। যাহাবি, আল-মিযান: খণ্ড ৪, ৩২ পৃষ্ঠায় বলেন, "তাঁরা তাঁকে পরিত্যাগ করেছেন এবং কেউ তাঁর মিথ্যুক হওয়ার অভিযোগ করেন।” এ ছাড়াও এর ইসনাদে আতিয়্যাহ আল-আওফি নামক একজন যঈফ বর্ণনাকারী আছেন। সুয়ুতি, আল-জামি: ২৪৯৩ একে যঈফ বলেছেন এবং আলবানি, আয-যঈফা: ১৪৮২তে একে মাওযু বলেছেন। তাবারানি, আল-কাবির: ১০৫১৪ এবং বায়হাকি : ২০৮ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেন, “আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে কাউকে সন্তুষ্ট কোরো না। আল্লাহর দয়ার কারণে অন্য কারও প্রশংসা কোরো না। আল্লাহ যা (হতে দিতে) চাননি, তার জন্য অন্য কাউকে তিরস্কার কোরো না। কোনো ব্যক্তির চাইলেই আল্লাহর রিযক চলে আসে না এবং কোনো ব্যক্তির অপছন্দ করলেই তা দূর হয়ে যায় না।" আলবানি, যঈফ আত-তারগীব: ১০৬৪ একে মাওযু বলেছেন। বায়হাকি: ২০৯ এবং ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ইয়াকিন : ৩২ এ একই কথা ইবনু মাসউদ এ-এর বক্তব্য হিসেবে এনেছেন। দেখুন অধ্যায় নয়, ফুটনোট: ৩১
১৭৪ সূরাহ ফাতির, ৩৫: ২
১৭৫ সূরাহ ইউনুস, ১০: ১০৭
১৭৬ সূরাহ আয-যুমার, ৩৯: ৩৮
১৭৭ সূরাহ ইউনুস, ১০:৭১
১৭৮ সূরাহ হুদ, ১১:৫৪-৫৬

নবীজি বলেছেন, “সমগ্র সৃষ্টিজগৎ একত্র হয়ে যদি তোমার এমন কোনো উপকার করতে চায়, যা আল্লাহ নির্ধারিত করে রাখেননি, তাহলেও তারা তা করতে সমর্থ হবে না। আর তারা যদি তোমার এমন কোনো ক্ষতি করতে চায়, যা আল্লাহ নির্ধারিত করে রাখেননি, তাহলেও তারা তা করতে সমর্থ হবে না।”
এর অর্থ হলো, বান্দা যত উপকার ও ক্ষতির সম্মুখীন হয়, সবই তার জন্য আগে থেকে নির্ধারিত হয়ে আছে। সমগ্র সৃষ্টিজগৎ মিলে সর্বাত্মক চেষ্টা করেও অনির্ধারিত কোনো বিষয়ের মুখোমুখি তাকে করতে পারবে না। কুরআনের আয়াতেও এটি প্রমাণিত হয়। যেমন:
"বলে দাও, আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারিত করে দিয়েছেন, তা ছাড়া অন্য কিছুই আমাদের ঘটবে না..."১৬৫
“পৃথিবীতে অথবা তোমাদের নিজেদের উপর এমন কোনো বিপদ আসে না, যা আমি সংঘটিত করার পূর্বে কিতাবে লিপিবদ্ধ রাখিনি।...”১৬৬
"...বলে দাও, যদি তোমরা তোমাদের ঘরেও থাকতে, তথাপি যাদের জন্য মৃত্যু নির্ধারিত ছিল, তারা তাদের মৃত্যুর স্থানের পানে বেরিয়েই পড়ত..."১৬৭
ইমাম আহমাদের সূত্রে আবুদ্দারদা থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ বলেন,
“সবকিছুরই একটি হাকিকত রয়েছে। বান্দা ততক্ষণ ঈমানের হাকিকত অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না সে জেনে নিচ্ছে যে, তার সাথে যা ঘটেছে তা ঘটারই ছিল; যা ঘটেনি, তা কিছুতেই ঘটত না।”১৬৮
আবু দাঊদ ও ইবনে মাজাহর সূত্রেও যায়েদ বিন সাবিত থেকে অনুরূপ অর্থের হাদীস বর্ণিত হয়েছে। ১৬৯
জেনে রাখুন, ইবনে আব্বাস -কে দেওয়া পুরো উপদেশটি এই কেন্দ্রীয় মূলনীতিকে ঘিরেই আবর্তিত হয় এবং এরই শাখা হিসেবে বের হয়। বান্দা যখন উপলব্ধি করবে যে, আল্লাহর নির্ধারণ করে রাখা ভালো-মন্দ ও উপকার-অপকার ছাড়া আর কিছুই তার সাথে ঘটবে না, পুরো সৃষ্টিজগৎ মিলে এর অন্যথা করতে চাইলেও ব্যর্থ হবে, সে তখন বুঝতে পারবে যে এক আল্লাহই উপকার করার ও ক্ষতি করার মালিক, তিনিই দেন, তিনিই দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার প্রতি বান্দার তাওহীদ পূর্ণাঙ্গতা পাবে। সে তখন একমাত্র তাঁর কাছেই সাহায্য চাইবে, তাঁর কাছেই প্রার্থনা করবে, তাঁর সামনেই নিজেকে বিনীত ও অবনত করবে। সে শুধু তাঁরই ইবাদাত করবে এবং তাঁর কাছেই সাহায্য চাইবে। কারণ, কারও উপাসনা করা হয়ই এই আশায় যে, উপাস্য কোনো উপকার করবেন এবং কোনো অপকার থেকে বাঁচাবেন। এ জন্যই আল্লাহ অন্য কোনো কিছুর উপাসনা নিষিদ্ধ করেছেন যে, তারা কোনো উপকার বা অপকার করতে পারে না, তাদের উপাসনা নিষ্ফল। ১৭০
যাদের অন্তরে ঈমান ঠিকমতো প্রবেশ করেনি, তারা স্রষ্টার আনুগত্যের আগে সৃষ্টির আনুগত্যকে স্থান দেয় এই ভেবে যে, এগুলো তার কিছু উপকার করবে বা কিছু ক্ষতি থেকে তাকে বাঁচাবে। বান্দা যখন উপলব্ধি করবে যে, একমাত্র আল্লাহই লাভ-ক্ষতি করানোর মালিক, তিনিই দাতা, তিনিই দান থেকে বিরতকারী, তখন বান্দা ইবাদাতের জন্য আল্লাহকেই নির্দিষ্ট করে নেবে এবং সৃষ্টির উপর স্রষ্টাকে প্রাধান্য দেবে। সাহায্য চাওয়ার জন্যও তখন এক আল্লাহরই কাছে শরণাপন্ন হবে।
এই ব্যাপক অর্থপূর্ণ ও অসাধারণ উপদেশে এই সকল বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে, যার প্রতিটিই পর্বতপ্রমাণ গুরুত্বের দাবিদার।
বান্দা কর্তৃক আল্লাহকে হেফাজত করার অর্থ হলো আল্লাহর দেওয়া সীমা মেনে চলা এবং তাঁর অধিকারসমূহ আদায় করা। এটিই তাঁর ইবাদাতের হাকিকত। এর মাধ্যমে উপদেশটি শুরু হয়। তারপর তা এগিয়ে যায় আল্লাহ কর্তৃক বান্দার হেফাজতের দিকে, যার বাস্তবায়ন প্রতিটি বান্দার চূড়ান্ত মনোবাসনা।
এরপর বলা হয়েছে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় বান্দা আল্লাহকে জানলে আল্লাহ তাকে তার দুঃখ-দুর্দশার সময় জানবেন। এটি হলো আল্লাহ কর্তৃক বান্দাকে হেফাজত করার অংশ এবং এর পূর্ণতা দানকারী। দুঃখ-কষ্টের সময়কে বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হলো এটাই সেই সময় যখন বান্দা এমন সত্তার কাছে মরিয়া হয়ে ফিরে যায়, যে তার সম্পর্কে জানে এবং তাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারবে। এমনকি মুশরিকরাও এ রকম সময় এক আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা, কান্নাকাটি, অনুনয়-বিনয় করতে থাকে। জানে যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলাই কেবল তাদের দু'আর উত্তর প্রদানে সক্ষম। কিন্তু যখন বিপদ কেটে যায়, তারা শির্কে ফিরে যায়-যার কথা আল্লাহ কুরআনে বহু জায়গায় বলেছেন এবং যার কারণে মুশরিকদের নিন্দা করেছেন। ১৭১ এই উপদেশের মাধ্যমে নবীজি আমাদের মুশরিকদের বিরোধিতা করতে শিখিয়েছেন। আদেশ করেছেন যেন আমরা সুখের সময়েও আল্লাহকে স্মরণ করি, দ্বীনকে একমাত্র তাঁর জন্যই বিশুদ্ধ করে নিই, তাঁরই নৈকট্য কামনা করি। এর ফলে বান্দার দুঃখের সময়ে বান্দাকে জানা আল্লাহর জন্য জরুরি হয়ে পড়বে।
এরপর বলা হয়েছে শুধু আল্লাহর কাছেই সবকিছু চাইতে এবং তাঁরই সাহায্য কামনা করতে। সুখ-দুঃখ উভয় সময়েই তা করতে হবে।
তারপর সেই মূলনীতি উল্লেখ করা হয়েছে, যার উপর আগের সকল বিষয় নির্মিত হয়েছে-এক আল্লাহই উপকার করেন, ক্ষতিসাধন বা দূরীভূত করেন, দান করেন ও দান করা থেকে বিরত থাকেন, পুরো সৃষ্টিজগৎ মিলেও আল্লাহর নির্ধারিত বিষয়ের অন্যথা করতে অক্ষম।
এই উপলব্ধি বান্দাকে সৃষ্টির উপর নির্ভরতা থেকে মুক্ত করে। বান্দা কোনো সৃষ্টির কাছে হাত পাতা, সাহায্য চাওয়া এবং উপকার ও অপকারের আশা করা থেকে বিরত হয়।১৭২ সৃষ্টির প্রতি বান্দার ভয়ও দূরীভূত হয়। এর আবশ্যক ফলাফলস্বরূপ, সে একমাত্র আল্লাহরই উপাসনা করে এবং আল্লাহরই কাছে সাহায্য চায়। আল্লাহর আনুগত্যকে সে সৃষ্টির আনুগত্যের আগে স্থান দেয়। সমগ্র সৃষ্টিজগৎকে অসন্তুষ্ট করে হলেও বান্দা আল্লাহকে সন্তুষ্ট রাখতে সচেষ্ট হয়ে ওঠে। আবু সাঈদ থেকে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূল ﷺ বলেন, "ইয়াকীনের দুর্বলতার একটি লক্ষণ এই যে, কোনো ব্যক্তি আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে মানুষকে সন্তুষ্ট করতে চায়। আল্লাহ যে রিযক দিয়েছেন, তার জন্য তাদের প্রশংসা করে; আল্লাহ যা তাকে দেননি, তার জন্য তাদের তিরস্কার করে। মানুষ কেবল কামনা করলেই আল্লাহর রিযক লাভ করতে পারে না, আবার কেবল ঘৃণা করলেই তা দূর করতে পারে না।”১৭৩
কবি সত্যিই বলেছিলেন: যদি স্বাদ নিতে জানতে, যখন জীবন তিক্ত, রাগের মুখেও যদি মানুষ শান্ত থাকা শিখত, জীবন সহজ হয় সত্যিকারের ভালোবাসায়ই খালি, পৃথিবীর উপর যা-ই আছে, সেসব তো ধুলাবালি।
জেনে রাখুন, জমিনের উপর চলমান প্রতিটি প্রাণীই কেবল ধুলা আর মাটি। রাজাধিরাজ আল্লাহর আনুগত্যের আগে ধুলাবালি আর মাটির আনুগত্যকে কী করে স্থান দেওয়া সম্ভব? মালিক ও দাতাকে অসন্তুষ্ট করে মাটিকে সন্তুষ্ট করে কী লাভ? সত্যিই অবাক করা ব্যাপার!
কুরআনের বহু জায়গায় এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলাই দান করেন ও দান করা থেকে বিরত থাকেন:
“আল্লাহ মানুষের জন্য যে রহমত খুলে দেন, তা নিবারণ করার কেউ নেই। আর তিনি যা বারিত করেন, কেউ তা প্রেরণ করতে পারে না... "১৭৪
“আল্লাহ যদি তোমাকে কষ্ট দিতে চান, তাহলে তিনি ছাড়া তা দূর করার আর কেউ নেই। আর আল্লাহ যদি তোমার কল্যাণ করতে চান, তাহলে তাঁর অনুগ্রহ রদ করার কেউ নেই... "১৭৫
“বলো, তোমরা কি ভেবে দেখেছ যে, আল্লাহ আমার ক্ষতি করতে চাইলে আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ডাকো, তারা কি সে ক্ষতি দূর করতে পারবে? অথবা তিনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করতে চাইলে তারা কি তাঁর অনুগ্রহ ঠেকাতে পারবে?... "১৭৬
আল্লাহ তা'আলা নূহ-এর উক্তি উল্লেখ করেন :
“হে আমার সম্প্রদায়, আমার অবস্থিতি আর আল্লাহর আয়াতসমূহের দ্বারা তোমাদের প্রতি আমার উপদেশ দান যদি তোমাদের নিকট অসহ্য মনে হয়, (তাতে আমার কোনো পরোয়া নেই, কারণ) আমি তো কেবল আল্লাহর উপর ভরসা করি। তোমরা তোমাদের শরিকদের নিয়ে সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করো। পরে তোমাদের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তোমাদের মাঝে যেন কোনো অস্পষ্টতা না থাকে... "১৭৭
আল্লাহ তা'আলা হুদ-এর উক্তি উল্লেখ করেন :
"আমি আল্লাহকে সাক্ষী রাখছি আর তোমরাও সাক্ষী হও যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাকে তাঁর শরিক করো, তার সাথে আমি পুরোপুরি সম্পর্কহীন। তাঁকে (আল্লাহ) ব্যতীত তোমরা সকলে মিলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করো আর আমাকে একটুও অবকাশ দিয়ো না। আমি নির্ভর করি আল্লাহর উপর, যিনি আমার আর তোমাদের প্রতিপালক... "১৭৮
একজন সালাফ বলেছেন:
আল্লাহ আমার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তা তো হবেই, হুঁশিয়ারি দিয়ে তা এড়ানো গেলে তো এড়ানো যেত কবেই। আমরা যতটা না নিজেদের, তারচেয়ে বেশি আমরা আল্লাহর, আমাদের পরিচয় তো কেবল এক তাকদীরে বাঁধা বান্দাহর।
ফুদাইল আল-ফাকাহ -এর কাছে এক ব্যক্তি একবার নালিশ করল। তিনি জবাব দিলেন, “তুমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে নালিশ করলে?”
একজন সালাফ বলেছেন:
যে রায় ইচ্ছা দাও, তোমার রায় হবে না বাস্তবায়ন, আল্লাহর দেওয়া তাকদীরই হবে আসল কার্যকারণ, রবের অধীনে সবকিছু, তাঁরই ইচ্ছা সর্বদা হয় সাধন।

টিকাঃ
১৬৫ সূরাহ আত-তাওবাহ, ৯:৫১
১৬৬ সূরাহ আল-হাদীদ, ৫৭: ২২
১৬৭ সূরাহ আলে ইমরান, ৩ : ১৫৪
১৬৮ আহমাদ: ২৭৪৯০; ইবন আবি আসিম: ২৪৬; একে হাসান বলেছেন, সুয়তি, আল-জামি : ২৪১৭ এবং ওয়াদিই, সহীহুল মুসনাদ: ১০৫০। আলবানি, যিলালুল জান্নাহ: ২৪৬ এবং আস-সহীহাহ: ২৪৭১-এ একে সমর্থনকারী হাদীসের কারণে সহীহ বলেছেন।
১৬৯ আহমাদ: ২১৫৮৯-২১৬১১-২১৬৫৩; আবু দাউদ: ৪৬৯৯; ইবনু মাজাহ: ৭৭ এই শব্দ সহকারে, “তুমি যদি আল্লাহর রাস্তায় উহুদ পরিমাণ খরচ করো, তাহলেও আল্লাহ তা কবুল করবেন না, যদি না তুমি তাকদিরে বিশ্বাস করো এবং জেনে নাও যে, যা তোমার উপর আপতিত হয়েছে তা হওয়ারই ছিল এবং যা আপতিত হয়নি তা কিছুতেই হওয়ার ছিল না। এ (বিশ্বাস) ছাড়া অন্য কোনো কিছুর উপর মৃত্যুবরণ করলে তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” একে সহীহ বলেছেন ইবনু হিব্বান : ৭২৭ এবং আলবানি, তাখরিজ আবু দাউদ: ৪৬৯৯; আরনাউত বলেছেন এর ইসনাদ শক্তিশালী। তিরমিযি : ২১৪৪ এবং তাবারানি, আল-কাবির: ১১২৪৩ ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ বলেন, "বান্দা ততক্ষণ মুমিন হবে না যতক্ষণ না সে তাকদীরের ভালো-মন্দে বিশ্বাস করে এবং জেনে নেয় যে, যা তার উপর আপতিত হয়েছে তা হওয়ারই ছিল এবং যা আপতিত হয়নি তা কিছুতেই হওয়ার ছিল না।” আলবানি, আস-সহীহাহ: ২৪৩৯ একে সহীহ বলেছেন।
১৭০ যেমন আল্লাহর কালাম, "তারা আল্লাহকে ছেড়ে ইবাদাত করে এমন কিছুর, যা না তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারে আর না উপকার করতে পারে।” [সূরাহ ইউনুস, ১০: ১৮] "তারপরও তারা আল্লাহকে ছেড়ে ইবাদাত করে এমন কিছুর, যা না তাদের সাহায্য করতে পারে, না ক্ষতি।” [সূরাহ আল-ফুরকান, ২৫: ৫৫] "বাবা, কেন আপনি এমন জিনিসের ইবাদাত করেন যা শোনে না, দেখে না, আপনার কোনো কাজেই আসে না?” [সূরাহ মারইয়াম, ১৯: ৪২] "আর তারা তাঁকে বাদ দিয়ে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করেছে অন্য কিছুকে, যারা কিছুই সৃষ্ট করে না; বরং তারা নিজেরাই সৃষ্ট। তারা ক্ষমতা রাখে না নিজেদের ক্ষতি বা উপকার করার, আর ক্ষমতা রাখে না মৃত্যু, জীবন ও পুনরুত্থানের উপর।” [সূরাহ আল-ফুরকান, ২৫: ৩]
১৭১ যেমন আল্লাহর বাণী, “যখন মানুষকে দুঃখ-ক্লেশ স্পর্শ করে, সে শুয়ে, বসে ও দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকে। আর যখন আমি সে দুঃখ-ক্লেশ অপসারণ করে দিই, সে এমনভাবে চলে যায় যেন তাকে দুঃখ-ক্লেশ স্পর্শ করার পর সে আমাকে কখনো ডাকেইনি।” [সূরাহ ইউনুস, ১০: ১২] “তোমরা যে অনুগ্রহই লাভ করে থাকো, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর যখন দুঃখ-কষ্ট তোমাদের স্পর্শ করে, তখন তাঁর কাছেই তোমরা আকুল আবেদন জানাতে থাকো। অতঃপর যখন তিনি তোমাদের থেকে দুঃখ-কষ্ট দূর করে দেন, তখন তোমাদের একদল তাদের প্রতিপালকের সঙ্গে অন্যকে শরিক করে বসে আমি তাদের যা দিয়েছি, তার না-শোকরি করার জন্য। অতএব, তোমরা ভোগ করে নাও। শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে।” [সূরাহ আন-নাহল, ১৬ : ৫০-৫৫] "সমুদ্রে যখন বিপদ তোমাদের পেয়ে বসে, তখন তাঁকে ছাড়া অন্য যাদের তোমরা (উপাস্য ভেবে) আহ্বান করো, তারা (তখন তোমাদের মন থেকে) হারিয়ে যায়। অতঃপর তিনি যখন তোমাদের স্থলে এনে বাঁচিয়ে দেন, তখন তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও। মানুষ হলো বড়ই অকৃতজ্ঞ।” [সূরাহ বানী ইসরাঈল, ১৭: ৬৭] "দুঃখ-মুসিবত যখন মানুষকে স্পর্শ করে, তখন সে তার প্রতিপালককে ডাকতে থাকে তাঁর প্রতি বড়ই একনিষ্ঠ হয়ে। অতঃপর তিনি যখন নিজ পক্ষ থেকে অনুগ্রহ দিয়ে তাকে ধন্য করেন, তখন সে পূর্বে যে জন্য তাঁকে ডেকেছিল তা ভুলে যায় এবং অন্যদের আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করায় তাঁর পথ থেকে পথভ্রষ্ট করার জন্য।” [সূরাহ আয-যুমার, ৩৯: ৮]
১৭২ হালিমি, আল-মিনহাজ ফী শুয়াবুল ঈমানে বলেন, "আশার কয়েক রকম রূপ আছে: ১. আকাঙ্ক্ষিত বস্তু লাভের আশা, ২. তা পাওয়ার পর ধরে রাখার আশা, ৩. অনাকাঙ্ক্ষিত বস্তু থেকে দূরে থাকার আশা, ৪. ঘটে যাওয়া কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত জিনিসের সমাপ্তি দেখার আশা। কারও প্রতি ভয়ের মতো করে আশাও যদি কারও হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে যায়, তাহলে বিনয় ও নম্রতার দিকে ধাবিত করে। কারণ, আশা আর ভয় হাত ধরাধরি করে চলে। ভীত ব্যক্তি ভয়ের বিপরীতটিরও আশা করে। সে আল্লাহর কাছে দু'আ করে, তাঁর কাছে কামনা করে। তেমনি তাঁকে ভয় করা ব্যক্তি আকাঙ্ক্ষিত বস্তু হারানোর ভয় করে এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়। কাজেই যে ব্যক্তিই ভয় করে, সে আশাও করে। আর যে আশা করে, সে ভয়ও করে।”
১৭৩ আবু নুয়াইম, আল-হিলইয়াহ: খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ১০৬; বায়হাকি, শুয়াব: ২০৭-এ বলেন, এর বর্ণনাসূত্রে মুহাম্মাদ ইবনু মারওয়ান আছেন, যিনি যঈফ। যাহাবি, আল-মিযান: খণ্ড ৪, ৩২ পৃষ্ঠায় বলেন, "তাঁরা তাঁকে পরিত্যাগ করেছেন এবং কেউ তাঁর মিথ্যুক হওয়ার অভিযোগ করেন।” এ ছাড়াও এর ইসনাদে আতিয়্যাহ আল-আওফি নামক একজন যঈফ বর্ণনাকারী আছেন। সুয়ুতি, আল-জামি: ২৪৯৩ একে যঈফ বলেছেন এবং আলবানি, আয-যঈফা: ১৪৮২তে একে মাওযু বলেছেন। তাবারানি, আল-কাবির: ১০৫১৪ এবং বায়হাকি : ২০৮ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেন, “আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে কাউকে সন্তুষ্ট কোরো না। আল্লাহর দয়ার কারণে অন্য কারও প্রশংসা কোরো না। আল্লাহ যা (হতে দিতে) চাননি, তার জন্য অন্য কাউকে তিরস্কার কোরো না। কোনো ব্যক্তির চাইলেই আল্লাহর রিযক চলে আসে না এবং কোনো ব্যক্তির অপছন্দ করলেই তা দূর হয়ে যায় না।" আলবানি, যঈফ আত-তারগীব: ১০৬৪ একে মাওযু বলেছেন। বায়হাকি: ২০৯ এবং ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ইয়াকিন : ৩২ এ একই কথা ইবনু মাসউদ এ-এর বক্তব্য হিসেবে এনেছেন। দেখুন অধ্যায় নয়, ফুটনোট: ৩১
১৭৪ সূরাহ ফাতির, ৩৫: ২
১৭৫ সূরাহ ইউনুস, ১০: ১০৭
১৭৬ সূরাহ আয-যুমার, ৩৯: ৩৮
১৭৭ সূরাহ ইউনুস, ১০:৭১
১৭৮ সূরাহ হুদ, ১১:৫৪-৫৬

📘 নবীজির সাঃ পদাঙ্ক অনুসরণ > 📄 ধৈর্যের ফযিলত

📄 ধৈর্যের ফযিলত


রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “জেনে রেখো, তুমি যা অপছন্দ করো তা ধৈর্যের মাধ্যমে সহ্য করার মধ্যে রয়েছে মহাকল্যাণ।” গুফরাহর আযাদকৃত দাস উমারের বর্ণনায় ইবনে আব্বাস থেকে অতিরিক্ত বাক্য রয়েছে,
“তুমি যদি ইয়াকীনপূর্ণ অবস্থায় সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহর জন্য আমল করতে পারো, তবে তা করো। আর যদি তা না পারো, তাহলে জেনে রেখো, তুমি যা অপছন্দ করো তা ধৈর্যের মাধ্যমে সহ্য করার মধ্যে রয়েছে মহাকল্যাণ।”১৭৯
এখানে ইয়াকীন অর্থ হলো তাকদীরের উপর ঈমান রাখা। তাঁর ছেলে আলি বিন আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস তাঁর পিতার সূত্রে যে বর্ণনা করেছেন, তাতে স্পষ্ট করে এ অর্থের উল্লেখ আছে। এতে অতিরিক্ত শব্দ রয়েছে, “আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমি কীভাবে ইয়াকীনের সাথে কাজ করতে পারি?' তিনি বললেন, 'তুমি জানবে যে, যা তোমার উপর আপতিত হয়েছে তা হওয়ারই ছিল, আর যা আপতিত হয়নি তা কিছুতেই হওয়ার ছিল না।” তবে এ বর্ণনার সনদ দুর্বল।
তাকদীরের প্রতি ইয়াকীন যখন অন্তরে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়ে যাবে, তখন এর আবশ্যক ফলাফলস্বরূপ অন্তর থাকবে ধীরস্থির ও শান্ত। এই অর্থই প্রকাশ পেয়েছে এই আয়াতে :
“পৃথিবীতে অথবা তোমাদের নিজেদের উপর এমন কোনো বিপদ আসে না, যা আমি সংঘটিত করার পূর্বে কিতাবে লিপিবদ্ধ রাখিনি। এটি (করা) আল্লাহর জন্য খুবই সহজ। এটা এ জন্য যে, তোমাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য তোমরা যেন হতাশাগ্রস্ত না হও। আর তোমাদের যা দান করা হয়েছে, তার জন্য তোমরা যেন উৎফুল্ল না হও। কেননা, আল্লাহ অহংকারী ও অধিক গর্বকারীকে পছন্দ করেন না।”১৮০
এই আয়াতের তাফসীরে দাহহাক বলেন, “তিনি তাদের মনোবল দৃঢ় করলেন, যাতে 'তোমাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য তোমরা যেন হতাশাগ্রস্ত না হও। অতএব দুনিয়াবি জিনিসের জন্য দুঃখ কোরো না। কারণ, আমি তা তোমার জন্য নির্ধারণই করিনি।' আর 'তোমাদের যা দান করা হয়েছে, তার জন্য তোমরা যেন উৎফুল্ল না হও। সেসব দুনিয়াবি জিনিসের জন্য অহংকারী হবে না যা তোমাদের দেওয়া হয়েছে, কারণ তা কখনোই আটকে রাখার ছিল না।” বর্ণনাটি ইবনু আবিদ্দুনিয়া-এর সূত্রে এসেছে।
সাইদ ইবনু যুবাইর এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ""তোমাদের যা দান করা হয়েছে' অর্থাৎ দুনিয়াবি প্রাচুর্য। কারণ, তুমি তো জানোই তোমার সৃষ্টির আগে থেকেই এটি নির্ধারিত ছিল।” ইবনু আবি হাতিম এটি বর্ণনা করেছেন।
এর আলোকেই একজন সালাফ বলেছিলেন, “তাকদীরের প্রতি ঈমান দুশ্চিন্তা ও হতাশা দূর করে দেয়।” নবীজি এ দিকে ইঙ্গিত দিয়েছেন এই হাদীসের মাধ্যমে :
"যা কিছু তোমার উপকার করবে, তা কামনা করো এবং আল্লাহর সাহায্য চাও। আর নিরাশ হোয়ো না। কোনো বিপদ ঘটলে বলবে না, 'ইশ! আমি যদি অমুক কাজটা না করতাম!' বরং বলো, 'আল্লাহ তা নির্ধারণ করেছেন। তিনি যা চেয়েছেন, তা-ই করেছেন।' 'যদি' শয়তানের কুমন্ত্রণার দুয়ার খুলে দেয়।”১৮১
অর্থাৎ, বিপদের সময় মানুষ যদি তাকদীরের প্রতি ঈমানের কথা স্মরণ করে, তাহলে শয়তানের ওয়াসওয়াসার মাধ্যমে আর দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।
আনাস বলেন, "আমি দশ বছর নবীজি -এর খেদমত করেছি। কখনো তিনি আমাকে বলেননি, 'এটা কেন করলে?' 'ওটা করলে না কেন?”১৮২ তিনি বলেন, “তাঁর পরিবারের কেউ যদি আমাকে বকা দিত, তিনি বলতেন, 'বাদ দাও। কোনো কিছু তাকদীরে থাকলে তা হবেই।” অতিরিক্ত শব্দসহ হাদীসটি ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন। ১৮৩
ত্রুটিপূর্ণ এক সনদে ইবনু আবিদ্দুনিয়া থেকে বর্ণিত হয়েছে, আয়িশা বলেন, “নবীজি ঘরে ফিরলে সবচেয়ে বেশি যে কথাটি বলতেন তা হলো, 'আল্লাহ যা কিছু বিষয় নির্ধারিত রেখেছেন তা ঘটবেই।” এ ছাড়া আরেকটি মুরসাল বর্ণনায় আছে, নবীজি ইবনু মাসউদ-কে বলেন,
"বেশি দুশ্চিন্তা করবে না। আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন, তা ঘটবেই। যে রিযক তোমার জন্য আছে, তা আসবেই।”১৮৪ আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেন, “লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ১৮৫ (বলা) হলো নিরানব্বইটি রোগের আরোগ্য, যার সবচেয়ে কমটি হলো দুশ্চিন্তা।”১৮৬
এই কথার বাস্তবায়নের আবশ্যক ফলাফল হলো আল্লাহর কাছে সকল বিষয় ন্যস্ত করে এই বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ না চাইলে কোনো কিছুই ঘটবে না। এর উপর ঈমান দুশ্চিন্তা ও হতাশা দূর করে দেয়। নবীজি এক ব্যক্তিকে উপদেশ দিয়ে বলেন,
“আল্লাহ তোমার জন্য নির্ধারণ করে রেখেছেন এমন কোনো কিছুর জন্য আল্লাহকে গালিগালাজ করবে না।”১৮৭
বান্দা যখন আল্লাহর তাকদীরের মাধ্যমে তাঁর হিকমাহ ও রহমতের বিষয়টি বুঝতে পারে, সে বুঝতে পারে যে, তাকদীরের জন্য আল্লাহকে তিরস্কার করা সমীচীন নয়। সে আল্লাহর নির্ধারিত বিষয়ে সন্তুষ্টি বোধ করবে। আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা বলেন:
"আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদ আসে না। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, আল্লাহ তার অন্তরকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন..."১৮৮
এর তাফসীরে আলকামাহ বলেন, "মানুষের উপর আসা বিপদের কথা এখানে বলা হচ্ছে। কিন্তু সে জানে যে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে। তাই সে তা মেনে নেয় এবং সন্তুষ্ট থাকে।”
এক সহীহ হাদীসে আছে,
"আল্লাহ মুমিনের জন্য যা-ই নির্ধারণ করেন, তা তার জন্য কল্যাণকর। সে যদি ভালো অবস্থায় থাকে, তাহলে সে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে এবং তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি খারাপ অবস্থায় পড়ে, তাহলে সে ধৈর্যধারণ করে এবং তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। কেবল মুমিনের জন্যই এ বিষয়টি সত্য。”১৮৯
"বলে দাও, 'আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারণ করেছেন তা ছাড়া অন্য কিছুই আমাদের ঘটবে না, তিনিই আমাদের রক্ষক, আর আল্লাহর উপরই মুমিনদের ভরসা করা উচিত।' বলো, 'তোমরা আমাদের জন্য যে জিনিসের অপেক্ষা করছ, তা দুটো ভালোর একটি ছাড়া আর কিছুই না...'”১৯০
এখানে আল্লাহ আমাদের জানাচ্ছেন যে, তাঁর নির্ধারিত বিষয় ছাড়া মুমিনদের আর কিছুই হবে না। এ থেকে বোঝা যায় সেই বিষয়টি সহজ বা কঠিন যা-ই হোক, একই কথা। তারপর তিনি জানাচ্ছেন যে, তিনি তাদের রক্ষক। তাঁকে যারা রক্ষক হিসেবে গ্রহণ করেছে, তাদের তিনি ছেড়ে যাবেন না। নিশ্চয়ই তিনি তাদের কল্যাণ করার দায়িত্ব নেবেন:
“জেনে রেখো, আল্লাহই তোমাদের অভিভাবক, কতই-না উত্তম অভিভাবক! কতই-না উত্তম সাহায্যকারী! ১৯১
“তোমরা আমাদের জন্য যে জিনিসের অপেক্ষা করছ, তা দুটো ভালোর একটি ছাড়া আর কিছুই না... "১৯২
তিরমিযিতে আনাস থেকে বর্ণিত আছে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
“আল্লাহ যখন কোনো জাতিকে ভালোবাসেন, তখন তাদের পরীক্ষায় ফেলেন। যে কেউ সন্তুষ্ট থাকে, সে সন্তুষ্টি লাভ করবে। আর যে কেউ অসন্তুষ্ট হয়, সে অসন্তুষ্টি লাভ করবে।”১৯৩
আবুদ্দারদা (রাঃ) বলেন, “আল্লাহ কোনো কিছু নির্ধারণ করলে বান্দা এর প্রতি সন্তুষ্ট থাকলে আল্লাহ খুশি হন।” উন্মুদ্দারদা (রাঃ) বলেন, “যারা আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরের ব্যাপারে সন্তুষ্ট, তারাই সত্যিকারের প্রশান্তচিত্ত। কিয়ামাতের দিন তারা জান্নাতে এমন স্থান লাভ করবে, যা দেখে শহীদরাও হিংসা করবেন।”
ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন, “আল্লাহ তাঁর ন্যায়বিচার ও জ্ঞানের মাধ্যমে ইয়াকীন ও সন্তুষ্টির মাঝেই আনন্দ রেখেছেন। আর সংশয় ও অসন্তুষ্টির মাঝে রেখেছেন দুশ্চিন্তা আর অস্থিরতা।” নবীজি (ﷺ)-এর একটি হাদীস হিসেবেও কথাটি বর্ণিত আছে, তবে তার সনদ দুর্বল।
উমার বিন আব্দুল আযিয (রাঃ) বলতেন, “এই দু’আগুলো আমার জন্য আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার নির্ধারিত তাকদীরের প্রতি আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কোনো প্রয়োজনই বাকি রাখেনি।” তিনি এই দু’আগুলো খুব বেশি বেশি করতেন, “হে আল্লাহ, আমাকে আপনার তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট রাখুন। আমাকে আপনার তাকদীরে এত বারাকাহ দিন, যাতে আমি এমন বিষয়ে বিলম্ব কামনা না করি, যা আপনি দ্রুত দেবেন এবং যা বিলম্বে দেবেন তাতে তাড়াহুড়া না করি।”১৯৪
ইবনু আওন (রাঃ) বলেন,
"স্বাচ্ছন্দ্য ও কাঠিন্য উভয় অবস্থায় আল্লাহর তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকো। এতে তোমার অস্থিরতা কমবে এবং আখিরাতের জন্য লাভজনক হবে। জেনে রেখো, বান্দা ততক্ষণ সত্যিকারের সন্তুষ্টি লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তার দরিদ্র অবস্থার সন্তুষ্টি সচ্ছলতার অবস্থার সন্তুষ্টির সমান হচ্ছে। আল্লাহর ইচ্ছেকে নিজের কামনা-বাসনার বিপরীত দেখতে পেয়ে কী করে তুমি অসন্তুষ্ট হতে পারো? অথচ তুমি আল্লাহকে তোমার অবস্থার দেখভাল করার অনুরোধ করেছ। এমনটা হতেই পারে যে, তোমার ইচ্ছামতো সবকিছু হলে তুমি ধ্বংস হয়ে যেতে। অথচ আল্লাহর নির্ধারিত বিষয় তোমার ইচ্ছের সাথে মিললে তুমি খুশি হয়ে ওঠো। উভয় অবস্থার কারণ হলো গায়েবের ব্যাপারে তোমার নিতান্ত অজ্ঞতা। এই অবস্থা নিয়ে
বিচারদিবসে যাওয়ার সাহস হয় কী করে! তুমি নিজের প্রতি সদ্ব্যবহার করোনি, সন্তুষ্টির সঠিক মাত্রায়ও পৌঁছতে পারোনি।”
চমৎকার কিছু কথা। এর অর্থ হলো যে, বান্দা যখন আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার কাছে কোনো বিষয়ে ফায়সালা করে দেওয়ার দু'আ (ইস্তিখারা) করে, তখন আল্লাহ যে সিদ্ধান্তই দিন তাতে তার সন্তুষ্ট থাকতে হবে-পছন্দ হোক বা না হোক। কারণ, সে তো জানেই না কোন অবস্থায় তার কল্যাণ রয়েছে। আর আল্লাহ যা নির্ধারণ করেন, তার জন্য তিনি তিরস্কারযোগ্য নন। আল্লাহ যা নির্ধারণ করবেন, এতে সন্তুষ্ট হওয়ার মতো মনোবল নেই, এমন মানুষদের এ কারণেই ইস্তিখারার দু'আয় 'সকল কল্যাণকর অবস্থায়' কথাটি যোগ করার পরামর্শ দিতেন ইবনে মাসউদ১৯৫ সহ কিছু সালাফ। অন্যথায় সে এমন ফিতনায় পতিত হতে পারে, যাতে সে উত্তীর্ণ হতে পারবে না। এ কথাটি নবীজি -এর হাদীস হিসেবেও বর্ণিত হয়েছে। তবে তার সনদ দুর্বল। ১৯৬
সাদ থেকে বর্ণিত, রাসূল বলেন, "বান্দার সৌভাগ্য হলো আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার কাছে সিদ্ধান্ত চাওয়ার পর তাঁর প্রদান করা সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকতে পারা। আর বান্দার দুর্ভাগ্য হলো আল্লাহর সিদ্ধান্ত চাওয়া পরিত্যাগ করা আর তিনি যা নির্ধারণ করেন, তাতে অসন্তুষ্ট হওয়া।” হাদীসটি তিরমিযি ও অন্যান্য কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। ১৯৭
তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্টি অর্জনের অনেক উপায় আছে:
১. আল্লাহর প্রতি বান্দার দৃঢ় ইয়াকীন থাকা যে, তিনি মুমিনের জন্য যা নির্ধারণ করেন তা-ই কল্যাণকর। সে যেন দক্ষ ডাক্তারের কাছে নিজেকে সমর্পণ করা রোগী। ডাক্তারের পথ্য তার ব্যথার উদ্রেক করুক বা না করুক, সে সন্তুষ্টই থাকবে। কারণ, সে জানে যে, ডাক্তার তাকে সর্বাধিক কল্যাণকর পথ্যই দিচ্ছেন। ইবনে আওল তাঁর উক্তিতে এর কথাই বলেছেন।
২. সন্তুষ্টির বিনিময়ে আল্লাহ যে প্রতিদান দেওয়ার ওয়াদা করেছেন, তা স্মরণ করা। বান্দা এটি নিয়ে চিন্তায় এমনই মগ্ন হয়ে যেতে পারে যে, বাকি সব ব্যথা সে
ভুলেই যাবে। সালাফদের মধ্যে একজন নারী পড়ে যান, এতে তাঁর পায়ের নখ ভেঙে যায়। তিনি হেসে উঠে বলেন, “তাঁর কাছে এর যে প্রতিদান তা ভেবে আমি ব্যথার তিক্ততা ভুলে গেছি।”
৩. যেই সত্তা বিপদ পাঠান, তাঁর ভালোবাসায় নিজেকে মগ্ন করে ফেলা। তাঁর অসীম প্রাচুর্য, মহত্ত্ব, সৌন্দর্য, ত্রুটিহীনতা নিয়ে চিন্তা করা। এমন সচেতনতার ফলে এমন অবস্থা সৃষ্টি হবে যে, ইউসুফ (আঃ)-কে দেখে মিসরের নারীদের হাত কাটার ব্যাথা ভুলে যাওয়ার**১৮৮** মতো করেই বান্দা ব্যাথা ভুলে যাবে। পূর্বে বর্ণিত অবস্থার চেয়ে এটি আরও উচ্চতর পর্যায়।
জুনাইদ (রহঃ) বলেন তিনি সিররি (রহঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, প্রেমিক বিপদের ব্যাথা অনুভব করেন কি না। তিনি জবাব দিয়েছিলেন, “না।” এ কথার মাধ্যমে তিনি এই উচ্চতর পর্যায়ের কথা বলছেন। এ কথার আলোকেই বিপদে পতিত একদল মানুষ বলেছিলেন, “তিনি (আল্লাহ) আমাদের সঙ্গে যা করতে চান, তা-ই করুন। এমনকি তিনি যদি আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একটি একটি করে কেটে ফেলতেন, এতে তাঁর প্রতি আমাদের ভালোবাসাই কেবল বাড়ত।”
তাঁদের মধ্যে একজন বলেছেন: প্রেমের আতিশয্য যদি টুকরো টুকরো করে কাটে আমায়, আমার ভালোবাসা বৃদ্ধি ছাড়া তাতে কিছুই হতো না হায়। আমি হয়ে থাকব ভালোবাসার কাছে বন্দী, তব সন্তুষ্টির খোঁজেই পৌঁছে যাব জীবনসন্ধি।
ইবরাহীম ইবনু আদহাম (রহঃ) তাঁর সম্পত্তি, সম্পদ, সন্তান ও দাসদের ছেড়ে গিয়েছিলেন। তাওয়াফ করার সময় তিনি তাঁর পুত্রকে দেখতে পান, কিন্তু তাঁর সাথে কথা বলেননি। তিনি বলেন: সবকিছু থেকে হিজরত করেছি তোমাকে পাবার আশায় অধীনস্থদের ছাড়িয়া এসেছি তোমাকে দেখার নেশায়। তুমি আমায় টুকরো করলেও বেড়েই চলব ভালোবাসায়।
আল্লাহর এমনই একদল প্রেমিক ছিলেন ফুদাইল ও ফাতহুল মাওসিলির মতো ব্যক্তিরা। তাঁরা যদি এমন অবস্থায় ঘুমোতে যেতেন যে, রাতের খাবার খাওয়া হয়নি বা জ্বালানোর মতো কুপি পাওয়া যায়নি, তাহলে তাঁরা আনন্দে কান্না করতেন।
শীতকালে ফাতহ তাঁর পরিবারকে জড়ো করে নিজের চাদর দিয়ে তাদের ঢেকে নিয়ে বলতেন,
“(হে আল্লাহ) আপনি আমাকে ক্ষুধার্ত রেখেছেন, তাই আমি আমার পরিবারকে ক্ষুধার্ত রেখেছি। আপনি আমাকে খ্যাতিহীন করেছেন, তাই আমি আমার পরিবারকে খ্যাতিহীন করেছি। এমনটা আপনি আপনার প্রিয় বান্দাদের সাথেই করে থাকেন, আমি কি তাদের একজন? আমার কি আনন্দিত হওয়া উচিত নয়?”১৯৯
একজন সালাফ অসুস্থ ছিলেন। তাঁরা তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার কি কিছু লাগবে?” তিনি বলেন, "তাঁর (আল্লাহর) কাছে যা সবচেয়ে প্রিয়, আমার কাছেও তা-ই প্রিয়।”২০০
এর আলোকে একজন বলেছিলেন:
আপনার শান্তি মধুর, যার থেকে দূরত্বও নিকট সমধিক, আপনি আমার প্রাণেরই মতো, বরং তার চেয়ে অধিক। এটাই আমার জন্য যথেষ্ট, যাতে তুমি তুষ্ট, তাতে আমিও তুষ্ট।
আবুত্তুরাব এই চরণগুলো রচনা করেছেন :
বিভ্রান্ত হোয়ো না কেউ, প্রেমিকেরও তো চিহ্ন আছে, নির্দিষ্ট পথে উপহার পাঠায় সে প্রেমাস্পদের কাছে। রবের দেওয়া বিপদে তুষ্ট, তিনি যা করেন তায় খুশি, তাঁর দেওয়া দারিদ্র্যই প্রাচুর্য, বরং তার চেয়েও বেশি।
তাঁরা এক ব্যক্তির কাছে গেলেন, যার ছেলে জিহাদে শহীদ হয়েছে। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, "আমি পুত্রশোকে কাঁদছি না। তরবারির আঘাত পাওয়ার সময় আল্লাহর প্রতি সে কতই-না সন্তুষ্ট ছিল, তা ভেবেই কাঁদছি।”
তারা যদি মোর মৃত্যুই চায়, সেটাই হোক না তবে! আল্লাহ যা চান, সেটা না হওয়া আমি চেয়েছি কবে?
মূলকথা হলো, রাসূল ﷺ চেয়েছেন ইবনে আব্বাস যেন সামর্থ্য থাকলে সন্তুষ্ট অবস্থায় আমল করেন। যদি সামর্থ্য না থাকে, তিনি বলেন, “যদি তা না পারো, তাহলে জেনে রেখো, তুমি যা অপছন্দ করো তা ধৈর্যের মাধ্যমে সহ্য করার মধ্যে রয়েছে মহাকল্যাণ।” এ থেকে বোঝা যায়, যেসব নির্ধারিত বিষয় সহ্য করা কঠিন, তাতে পুরোপুরি সন্তুষ্ট থাকা আবশ্যক নয়, তবে অত্যন্ত উত্তম। যে সন্তুষ্ট হতে পারে না, তাকে অবশ্যই ধৈর্যশীল হতে হবে। ধৈর্য আবশ্যক। এর ফলে মহাকল্যাণ আসে। আল্লাহ তা'আলা ধৈর্যের আদেশ দিয়েছেন এবং এর জন্য বিশাল পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন,
"... আমি ধৈর্যশীলদের তাদের পুরস্কার অপরিমিতভাবে দিয়ে থাকি।”২০১
"...ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দান করো। নিশ্চয়ই যারা বিপদকালে বলে থাকে, 'আমরা আল্লাহরই, আর আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী।' এদের প্রতিই রয়েছে তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অনুগ্রহ ও করুণা। আর এরাই হিদায়াতপ্রাপ্ত।”২০২
"...সুসংবাদ দাও সেই বিনীতদের, 'আল্লাহ' নামের উল্লেখ হলেই যাদের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে, যারা তাদের বিপদে-আপদে ধৈর্যধারণ করে..."২০৩
আল-হাসান বলেন, “সন্তুষ্টির অবস্থা বিরল। তবে ধৈর্য হলো মুমিনের আশ্রয়।”২০৪ সুলাইমান আল-খাওয়াস বলেন, “ধৈর্যের মর্যাদা সন্তুষ্টির নিচে। সন্তুষ্ট ব্যক্তির অবস্থা এই যে, বিপদ আসুক বা না আসুক, সে সন্তুষ্ট। আর ধৈর্য হলো বিপদ আসার পর অবিচলভাবে তা সহ্য করা।”
সন্তুষ্টি আর ধৈর্যের মাঝে পার্থক্য আছে। ধৈর্য হলো বিপদ দেখতে পাওয়ার পর অসন্তুষ্ট হওয়া থেকে আত্মাকে লাগাম পরানো।২০৫ আর সন্তুষ্টি হলো যেকোনো অবস্থায়ই যা হচ্ছে, তা মেনে নেওয়া। সন্তুষ্টির কারণে ব্যথা কমে যায়, এমনকি একদমই শূন্য হয়ে যেতে পারে। কারণ, অন্তর তখন ইয়াকীন ও জ্ঞানের কোমল পরশ পেয়ে গেছে। ২০৬
উমার বিন আব্দুল আযীয, ফুদাইল, আবু সুলাইমান, ইবনুল মুবারাকসহ অনেক সালাফ তাই বলতেন, “সন্তুষ্ট ব্যক্তি বর্তমানে যেই অবস্থায় আছে, সেটা ছাড়া আর অন্য কিছু কামনাই করে না। কিন্তু ধৈর্যশীল ব্যক্তি (অবস্থার পরিবর্তন) কামনা করে।” অনেক সাহাবাগণের থেকেও এ রকম সন্তুষ্টির অবস্থার বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন: উমার , ইবনে মাসউদ প্রমুখ।
আব্দুল আযীয ইবনে আবু রুওওয়াদ বলেন, “বানী ইসরাঈলের এক আবেদ ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখানো হলো, অমুক মহিলা জান্নাতে তাঁর স্ত্রী হবে। তিনি সেই নারীর বাসায় তিন দিনের জন্য গেলেন, যাতে তিনি কী আমল করেন তা জানা যায়। কিন্তু রাতে পুরুষটি যখন সালাত পড়তেন, নারীটি ঘুমাতেন। পুরুষটি যেদিন সিয়াম রাখতেন, নারীটি খাওয়া-দাওয়া করতেন। চলে যাওয়ার সময় তিনি নারীটিকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনার কোন আমলটি আপনার কাছে সেরা মনে হয়?' নারীটি বললেন, 'আপনি আমাকে যা করতে দেখেছেন, তার চেয়ে বেশি আমি কিছুই করি না। কিন্তু আমি যখন কষ্টে থাকি, তখন স্বাচ্ছন্দ্য কামনা করি না। যখন অসুস্থ থাকি, তখন সুস্বাস্থ্য কামনা করি না। যখন ক্ষুধার্ত থাকি, তখন ভরপেট হওয়া কামনা করি না। যখন রোদে থাকি, তখন ছায়া কামনা করি না।' লোকটি বললেন, 'আল্লাহর কসম! এই গুণ তো বান্দাদের আয়ত্তের বাইরে।”২০৭
বিপদের প্রথম আঘাতেই ধৈর্যধারণ করতে হয় বলে নবীজির সহীহ হাদীসে এসেছে।২০৮ আর বিপদ ভোগ করতে থাকা অবস্থায় সন্তুষ্টি প্রদর্শন করতে হয়। যেমনটি নবীজি ﷺ দু'আ করতেন, “তাকদীরের লিখন সংঘটিত হয়ে যাবার পর আমি আপনার নিকট সন্তুষ্ট থাকার সামর্থ্য চাই।”২০৯ কারণ, বিপদ আসার আগে বান্দা সহজেই সন্তুষ্ট থাকতে পারে। কিন্তু বিপদ আসার পর তার অবস্থা একদম বিপরীত হয়ে যেতে পারে। নির্ধারিত বিপদ চলে আসার পর যে সন্তুষ্টি প্রদর্শন করে, সে-ই সত্যিকারের সন্তুষ্ট। ২১০
সারকথা হলো, ধৈর্যধারণ আবশ্যক। ধৈর্যের সীমানার বাইরেই থাকে অসন্তুষ্টি। যে কেউ আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরের ব্যাপারে অসন্তুষ্ট, তার পরিণাম হবে আল্লাহর অসন্তুষ্টি। তার উপর তার নিজের অসন্তুষ্টির চেয়ে বেশি হবে বিপদের স্বাদ আর শত্রুদের পক্ষ থেকে আসা ক্ষতি। একজন সালাফ বলেছেন:
কোনো দুর্ঘটনায় হোয়ো না হতাশ শত্রুকে ধরতে দিয়ো না তোমার রাশ ধৈর্যের মাধ্যমেই দেখতে পাবে আশ, দৃঢ়পদ থাকো যখন শত্রু-সঙ্গে হয় নিবাস।
নবীজি বলেন, “যে নিজের মাঝে ধৈর্য স্থাপন করে, আল্লাহ তাকে ধৈর্য দান করেন। ধৈর্যের চেয়ে বড় ও ব্যাপক উপহার আর কাউকে কখনো দেওয়া হয়নি।” ২১১
উমার বলেন, "আমাদের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সময় ছিল ধৈর্যধারণের দিনগুলো।” ২১২ আলি বলেন, "ঈমানের সাথে ধৈর্যের সম্পর্ক দেহের সাথে মাথার সম্পর্কের মতো। যার ধৈর্য নেই, তার ঈমানই নেই।” ১১৩
আল-হাসান বলেন, “ধৈর্য হলো জান্নাতি এক নিয়ামাত। আল্লাহ কেবল সম্মানিতদেরই তা দান করেন।” মায়মুন ইবনু মিহরান বলেন, “নবী বা অন্য কেউই কখনো ধৈর্যধারণ না করে কোনো কল্যাণ লাভ করতে পারেননি।” ইবরাহীম আত-তাইমী বলেন, “আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার উপর ঈমানের পর বান্দাকে সবচেয়ে বড় যে নিয়ামাত আল্লাহ দিয়েছেন, তা হলো ক্ষতির সময় ধৈর্য, পরীক্ষার সময় ধৈর্য, বিপদের সময় ধৈর্য।” তিনি এ কথা বলেছেন এই আয়াতের ভিত্তিতে :
"বরং কল্যাণ আছে এতে যে, কোনো ব্যক্তি ঈমান আনবে আল্লাহ, শেষ দিবস, ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ ও নবীগণের উপর এবং আল্লাহর ভালোবাসার্থে ধন-সম্পদ আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম-মিসকীন, মুসাফির ও যাজ্ঞাকারীদের এবং দাসত্বজীবন হতে নিষ্কৃতি দিতে দান করবে এবং সালাত কায়েম করবে ও যাকাত প্রদান করবে, প্রতিশ্রুতি দানের পর স্বীয় প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবে এবং অভাবে, দুঃখ-ক্লেশে ও সংকটে ধৈর্যধারণ করবে। এ লোকেরাই সত্যপরায়ণ আর এ লোকেরাই তাকওয়াবান।” ২১৪
উমার বিন আব্দুল আযীয বলেন,
“আল্লাহ যদি কাউকে কোনো নিয়ামাত দিয়ে তা ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে তার বদলে শুধু ধৈর্য দান করেন, তাহলে যা দেওয়া হলো তা ছিনিয়ে নেওয়া বস্তুর চেয়ে উত্তম।” তারপর তিনি তিলাওয়াত করেন:
"... আমি ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান অপরিমিতভাবে দিয়ে থাকি।”২১৫
একজন সালাফের পকেটে সব সময় একটি কাগজের টুকরা থাকত। সময়ে সময়ে তিনি তা বের করে পড়তেন। তাতে লেখা ছিল,
“তুমি ধৈর্যধারণ করে তোমার প্রতিপালকের হুকুমের অপেক্ষায় থাকো, কারণ তুমি তাঁর দৃষ্টির সামনেই আছো..."২১৬
সুন্দর ধৈর্য হলো বিপদের কথা বান্দার নিজের কাছে রাখা আর কাউকে এ বিষয়ে না বলা।
"ধৈর্যই উত্তম।”২১৭
একদল সালাফ এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, এর অর্থ হলো কোনো অভিযোগ ছাড়াই ধৈর্যধারণ করা। ২১৮
আহনাফ ইবনু কায়স ؒ চল্লিশ বছর ধরে অন্ধ ছিলেন, কিন্তু তিনি এর কথা কাউকে বলেননি। আব্দুল আযীয ইবনু আবু রুওওয়াদ-এর এক চোখ বিশ বছর যাবৎ অন্ধ ছিল। তাঁর ছেলে একদিন ভালো করে দেখে বললেন, “বাবা, আপনার এক চোখ অন্ধ।” তিনি বললেন, “গত বিশ বছর ধরে আমি এ নিয়ে আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট আছি।” ইমাম আহমাদ ؒ অসুস্থ হলে তা নিয়ে কখনো কোনো অভিযোগ করতেন না। তাঁকে যখন জানানো হলো যে অসুস্থ অবস্থায় মুজাহিদ ؒ গোঙানো অপছন্দ করতেন, তখন তিনি মৃত্যু পর্যন্ত এ কাজ ত্যাগ করেন। তিনি নিজেকে বলতেন, "ধৈর্য ধরো, না হলে পস্তাতে হবে।"
এক জ্ঞানী ব্যক্তি এক রোগীর কাছে গিয়ে দেখলেন সে উহ আহ করছে। তিনি মনে করিয়ে দিলেন, “এটি (রোগ) কার দেওয়া?” তাঁদের একজন বলতেন:
শরীর তো আমার অসুস্থতায় জর্জরিত, তবু দর্শনার্থীদের কাছে রাখে লুক্কায়িত। প্রিয়তমের তাকদীরে যদি অসন্তুষ্ট হয়, তাহলে তো নফস সুবিচারকারী নয়।
ইয়াহইয়া ইবনু মুয়ায বলেন,
"তুমি যদি তোমার রবকে ভালোবাসো আর তিনি তোমার জন্য ক্ষুধা ও বস্ত্রের অভাব নির্ধারণ করেন, তোমার উপর ফরয হলো এটি সহ্য করা এবং মাখলুকদের কাছ থেকে তা লুকানো। প্রেমিক তো বিনা অভিযোগে প্রেমাস্পদের থেকে পাওয়া কষ্ট সহ্য করে। তাহলে মাখলুকের কাছে তুমি এমন জিনিস নিয়ে কেন অভিযোগ করবে, যা সে তোমাকে দেয়ইনি?"
কবি বলেন, আপনি ছাড়া সকলের কাজ আমার ঘৃণায় খণ্ডিত, আপনার হতে যা কিছু আসে তা-ই সৌন্দর্যমণ্ডিত।
নবীজি ও সাহাবাগণ ক্ষুধার তাড়নায় পেটে পাথর বাঁধতেন। ১৯
উয়াইস ময়লার স্তূপ থেকে ভাঙা হাড্ডি জড়ো করতেন আর তাঁর আশপাশে কুকুররাও তা-ই করত। একবার এক কুকুর তাঁকে দেখে ঘেউ ঘেউ করে উঠল। তিনি বললেন, “কুকুর, যে তোমার ক্ষতি করে না, তুমিও তার ক্ষতি করো না। তোমার কাছে যা আছে, তা তুমি খাও। আমার কাছে যা আছে, তা আমি খাই। আমি যদি জান্নাতে যাই, আমি তোমার চেয়ে উত্তম হব। আর আমি যদি জাহান্নামে যাই, তুমি আমার চেয়ে উত্তম হবে।”
ইবরাহীম ইবনু আদহাম গরিবদের সাথে শস্যের অঙ্কুর কুড়াতেন। যখন তিনি টের পেলেন গরিবরা তাদের সাথে তাঁর এ প্রতিযোগিতা পছন্দ করছে না, তখন তিনি ভাবলেন, “আমি কি বালখ অঞ্চলে সম্পদ ফেলে এলাম গরিবদের সাথে শস্যদানা কুড়ানোর প্রতিযোগিতা করতে?” তারপর থেকে তিনি কেবল পশুরা যেসব মাঠে চড়ত, সেখান থেকেই শস্য কুড়াতেন।”
ইমাম আহমাদ গরিবদের সাথে শস্য কুড়াতেন। সুফিয়ান আস-সাওরি মক্কায় যাওয়ার পথে একবার দুটি উটের দেখাশোনার চাকরি নিয়েছিলেন। তিনি কিছু লোকের জন্য রান্নার দায়িত্ব ছিলেন। তিনি এত বাজে রান্না করতেন যে, লোকেরা তা খেয়ে তাঁকে প্রহার করত। ফাতহুল মাওসিলি টাকার বিনিময়ে কিছু মানুষের জন্য আগুন জ্বালানোর কাজ করতেন।
ভূমি দিয়ে এলাম আমি আপনার ওয়াস্তে আমার শত্রু হিংসুকদের হস্তে।
হে রব, কতদিন পাব নেক নজর তোমার? জীবন শেষ হতে চলল, প্রয়োজন ফুরোয়নি আমার।
আরেকজন সালাফ বলেছেন: তোমার রহমতের খোঁজে সয়েছি অনেক দুঃখ-যাতনা অনেক ধৈর্য ধরেছি আমি অনেক কষ্ট-যাজ্ঞা। ছেড়ে যেয়ো না আমায় পারব না আমি তোমায় ছাড়া পারিশ্রমিক চাও যদি আমার প্রাণটি নাও সারা। তোমার সন্তুষ্টিকে আমি বেসেছি অনেক ভালো, হৃদয় আকুল, কণ্ঠ রুদ্ধ অশ্রুতে টলোমলো। আপনার প্রেমে সকল বিপদ হয়ে যায় সহ্য আমার, বিপদে যে কখনো পড়েনি তার সুখ কী আবার?
তাঁদের দৃষ্টিতে দুনিয়াবি কষ্ট হলো নিয়ামাত। তাঁদের একজন বলতেন, “সত্যিকার বিচারক তো সে-ই, যে বিপদকে দেখে নিয়ামাত হিসেবে আর স্বাচ্ছন্দ্যকে ভাবে দুর্ভাগ্য।” এক ইসরাঈলী বর্ণনায় আছে, "যদি কোনো প্রাচুর্যশালীকে আসতে দেখো, তাহলে বলো, 'কোনো এক পাপের অগ্রীম শাস্তি!' যদি কোনো দরিদ্রকে আসতে দেখো, তাহলে বলো, 'নেককারের নিদর্শন, স্বাগতম!”২২০
একজন সালাফ বলেছেন,
"আমি কোনো দুনিয়াবি বিপদে পড়লে চারবার আল্লাহর প্রশংসা করি। বিপদ এর চেয়েও খারাপ না হওয়ার কারণে, আমাকে বিপদ সহ্য করার শক্তি দেওয়ার কারণে, আমাকে 'ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' বলার শক্তি প্রদানের কারণে, আমাকে দ্বীনের ক্ষেত্রে কোনো বিপদে না ফেলার কারণে।"
ধৈর্যের মাধ্যমে মুক্তি কামনা করা ইবাদাতের একটি প্রকার। কারণ, বিপদ কখনোই চিরস্থায়ী হয় না।
ধৈর্য ধরে বিপদ সহ্য করো, হে হৃদয়। জেনো বিপদ কভু চিরস্থায়ী না হয়। ধৈর্য ধরো মহান ব্যক্তিদের মতো করেই, বিপদ তো আজকে আছে, কালকে নেই।
পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্দশাগ্রস্ত লোকটিকে জান্নাতে একটু ঢুকিয়ে আবার বের করে এনে জিজ্ঞেস করা হবে, "তুমি কি কখনো বিপদ দেখেছ? বিপদ ভোগ করেছ?” সে বলবে, “না, ইয়া রব্ব!”২২১
হে আত্মা, আর মাত্র কয়েকটা দিন, এরা তো স্বপ্নের মতো স্থায়িত্বহীন। হে আত্মা, পৃথিবী তাড়াতাড়ি পার করে দাও, আসল জীবন তো সামনে, তার দিকেই যাও।
আরেকজন বলেছেন: একটি মাত্র ঘণ্টার ব্যাপার, তারপরই তা নেই, এ সবই ক্ষণস্থায়ী, সব হারিয়ে শেষে যাবেই।

টিকাঃ
১৭৯ আবু নুয়াইম: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩১৪
১৮০ সূরাহ আল-হাদীদ, ৫৭: ২২-২৩
১৮১ মুসলিম: ২৬৬৪; আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।
১৮২ বুখারি: ২৭৬৮-৬০৩৮-৬৯১১; মুসলিম: ২৩০৯
১৮৩ আহমাদ: ১৩৪১৮; বায়হাকি, শুয়াব: ৮০৭০; বুখারি ও মুসলিমের শর্তানুযায়ী এর ইসনাদ গ্রহণযোগ্য। অনুরূপ, আরনাউত, তাখরিজ মুসনাদ।
১৮৪ বায়হাকি, শুয়াব: ১১৮৮; ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ, আল-ইসাবাহ: খণ্ড ১, ১০৪ পৃষ্ঠায় ইবনু হাজার বলেন, এর ইসনাদে আইয়‍্যাশ ইবনু আব্বাস নামক একজন যঈফ বর্ণনাকারী আছেন। আলবানি, আয-যঈফাহ: ৪৭৯৩ এ একে যঈফ বলেছেন। অনুরূপ আস-সহীহাহ: খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৪ এ তিনি উমার ও আবু যার থেকে এই হাদীসের আরও দুটি দুর্বল বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন
১৮৫ অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কারও কোনো শক্তি বা ক্ষমতা নেই।
১৮৬ তাবারানি, আল-আসওয়াত: ৫০২৮; ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ, হাকিম : ১৯৯০ একে সহীহ বলেছেন, কিন্তু যাহাবি দেখান যে এতে বিশর নামক একজন দুর্বল বর্ণনাকারী আছেন। হায়সামি: খণ্ড ১০, ৯৮ পৃষ্ঠায় বলেন, এর ইসনাদে বিশর ইবনু রাফি আছেন, যিনি দুর্বল। ইবনুল জাওযি, আল-ইলাল: খণ্ড ২, ৩৪৮ পৃষ্ঠায় বলেন এটি সহীহ নয়। আলবানি একে যঈফ বলেছেন, যঈফ আর-তারগীব: ৯৭০-১১৪৭
১৮৭ আহমাদ: ১৭৮১৪-২২১৭; বুখারি, খালাক আফআলুল ইবাদ: ১৬৩ মুনযিরি, আত-তারগীব : খণ্ড ২, ২৫৭ পৃষ্ঠাতে দুটি বর্ণনাসূত্র উল্লেখের পর তাদের একটিকে হাসান বলেন। আলবানি, আস-সহীহাহ: ৩৩৩৪ এবং সহীহুত তারগীব : ১৩০৭ এ একে হাসান লি গাইরিহি বলেন। আরনাউত বলেন, হাদীসটি হাসান বলে পরিগণিত হওয়ার যোগ্য।
১৮৮ সূরাহ আত-তাগাবুন, ৬৪: ১১
১৮৯ মুসলিম: ২৯৯৯; সুহাইব ইবনু সিনান এ থেকে বর্ণিত।
১৯০ সূরাহ আত-তাওবাহ, ৯ : ৫১-৫২
১৯১ সূরাহ আল-আনফাল, ৮ : ৪০
১৯২ সূরাহ আর-তাওবাহ, ৯ : ৫২
১৯৩ তিরমিযি, ২৩৯৬, ইবনু মাজাহ, ৪০৩১
১৯৪ বায়হাকি, শুয়াব: ২২৭
১৯০ বায়হাকি, শুয়াব: ২০৫
১৯৬ তাবারানি, আল-কাবির: ১০০১২-১০০৫২; ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত। এটি যঈফ।
১৯৭ আহমাদ: ১৪৪৫ এবং তিরমিযি: ২১৫১; তিরমিযি একে গারীব বলেছেন, কারণ এর ইসনাদে হাম্মাদ ইবনু হুমাইদ আছেন, যিনি শক্তিশালী নন। আরনাউত এর ইসনাদকে যঈফ বলেছেন। আলবানি, আয-যঈফাহ: ১৯০৬ এ একে যঈফ বলেছেন।
১৮৮ "যখন তারা তাকে দেখল, বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল আর নিজেদের হাত কেটে ফেলল আর বলল, 'আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন। এ তো মানুষ নয়, এক সম্মানিত ফেরেশতা!” [সূরাহ ইউসুফ, ১২:৩১]
১৯৯ আবু নুয়াইম: খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ১৯২
২০০ যাহাবি, সিয়ার: খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ১৮২; ইয়াহইয়া ইবনু সাইদ আল-কাত্তানের উদ্ধৃতি দিয়ে।
২০১ সূরাহ আয-যুমার, ৩৯: ১০
২০২ সূরাহ আল-বাকারাহ, ২: ১৫৫-১৫৭
২০০ সূরাহ আল-হাজ্জ, ২২: ৩৪-৩৫
২০৪ আবু নুয়াইম: খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৪২; উমার ইবনু আব্দুল আযীয থেকে।
২০৫ সবর: বিরত থাকা ও সংযত হওয়া। রাগিব বলেন, "এটি হলো শরিয়ত ও আকল অনুযায়ী আত্মাকে বিরত রাখা।” জাহিয বলেন যে, এটি স্থিরবুদ্ধিতা ও সাহসের সমন্বয়ে গঠিত এক গুণ। মুনাউয়ি বলেন যে, এটি হলো শারিরীক ও মানসিক অসুবিধা ও ব্যথার মুখোমুখি হতে পারার ক্ষমতা। এটি হলো আত্মাকে কৃপণতা ও হতাশা থেকে বিরত রাখা, জিহ্বাকে অভিযোগ করা থেকে বিরত রাখা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে বিশৃঙ্খল হওয়া থেকে বিরত রাখা। এটি হলো সকল পরিস্থিতিতে আল্লাহর হুকুমের উপর দৃঢ় থাকা এবং সর্বোত্তম উপায়ে বিপদের মোকাবেলা করা। ইবনু হিব্বান, রওদাতুল উকালা: পৃষ্ঠা ১২৬-১২৮ এ বলেন, বুদ্ধিমানের উপর আবশ্যক হলো বিপদের আগমনের শুরুতে সবর অবলম্বন করা। আর যখন সে এতে দৃঢ় হয়ে যাবে, তখন সন্তুষ্টির (রিদ্বা) পর্যায়ে উন্নীত হওয়া। কেউ যদি সবর দ্বারা পরিপুষ্ট না হয়ে থাকে, তাহলে তার উচিত নিজের মধ্যে সবরের পরিচর্যা করা (তাসাব্বর), কারণ এটিই রিদ্বার প্রথম ধাপ। মানুষের যদি সত্যিই সবর থাকে, তাহলে সে মহান হয়ে যাবে। কারণ, এটিই সকল কল্যাণের ঝরনা আর সকল আনুগত্যের ভিত্তি... এর দিকে যাওয়ার ধাপগুলো হলো সচেতনতা (ইহতিমাম), উপলব্ধি (তায়াক্কু), পরীক্ষা-নিরীক্ষা (তাহাব্বত) এবং তাসাব্বুর। এর পরেই আসে রিদ্বা। আর এটিই আত্মিক উন্নতির শিখর... তিনটি বিষয়ে সবর প্রদর্শন করতে হয়: ১) গুনাহ থেকে সবর, ২) আল্লাহর আনুগত্যে লেগে থাকার ব্যাপারে সবর, ৩) বিপদ-আপদের মুখে সবর। অনুরূপ, ইবনুল কাইয়্যিম, মাদারিজুস সালিকীন: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৬২-১৬৫
২০৬ রিদ্বা : হতাশা ও বিরক্তির বিপরীত। জুরানি একে বলেছেন তাকদীর কার্যকর হতে দেখে হৃদয়ে আনন্দ লাভ করা। ইবনুল কাইয়্যিম, মাদারিজ: খণ্ড ২, ১৮৫ পৃষ্ঠাতে উল্লেখ করেছেন যে, এটি হলো তাকদীরের ওঠা-নামায় অন্তর প্রশান্ত রাখা এবং এই বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ এতে কল্যাণকর কিছুই রেখেছেন।
বায়হাকি, শুয়াব: ২০৯-এ উল্লেখ আছে, ইবনু মাসউদ বলেন, "রিদ্বা হলো আল্লাহর অসন্তুষ্টির বিনিময়ে মানুষকে সন্তুষ্ট না করা, আল্লাহর দেওয়া রিযকের কারণে অন্য কাউকে প্রশংসা না করা, আল্লাহ যা দেননি তার জন্য অন্য কাউকে দোষারোপ না করা। কারও ইচ্ছায় আল্লাহর রিযক আসে না, আবার কেউ ইচ্ছা না করলেই তা বন্ধ হয়ে যায় না। আল্লাহ তাঁর ন্যায়বিচার ও জ্ঞানের মাধ্যমে তিনি মুক্তি ও আনন্দ রেখেছেন ইয়াকীন ও সন্তুষ্টিতে, আর দুশ্চিন্তা ও হতাশা রেখেছেন সন্দেহ ও অসন্তুষ্টিতে।”
২০৭ এই ঘটনার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। বর্ণনাকারী একজন আবিদ, পরহেজগার, তবে সকল আলিমের মতে তিনি মুরজিয়া সম্প্রদায়ের। ইমাম আবু হাতিম বলেন, "তার বর্ণনা অগ্রহণযোগ্য।" আল্লামা ইবনুল জুনাইদ বলেন, "তিনি ভুয়া হাদীস বর্ণনা করতেন।" ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল বলেন, "তিনি মুরজিয়া ছিলেন। খুব ইবাদাত করতেন। তবে হাদীস বর্ণনায় তিনি অন্যদের মত নির্ভরযোগ্য ছিলেন না।" - শর'ঈ সম্পাদক
২০৮ বুখারি: ১২৮৩-১৩০২-৭১৫৪; মুসলিম: ৬২৬; আনাস থেকে বর্ণিত।
২০৯ আহমাদ: ১৮৩২৫; নাসাঈ : ১৩০৬-১৩০৭; আম্মার ইবনু ইয়াসির এ থেকে বর্ণিত। একে সহীহ বলেছেন, ইবনু হিব্বান: ১৯৭১; হাকিম: ১৯২৩ (যাহাবি একমত); আলবানি, তাখরিজুন নাসাঈ; এবং আরনাউত।
২১০ অনুরূপ খাত্তাবি, শানুদ দু'আ: পৃষ্ঠা ১৩২
২১১ বুখারি: ১৪৬৯-৬৪৭০; মুসলিম: ১০৫৩; আবু সাইদ আল-খুদরি থেকে বর্ণিত।
২১২ তালিক বর্ণনা হিসেবে বুখারিতে উল্লেখিত। ইবনু হাজার, ফাতহ: খণ্ড ১১, ৩০৯ পৃষ্ঠায় বলেন, “আহমাদ: কিতাবুয যুহদ (১১৭)-তে এর পূর্ণাঙ্গ সূত্র উল্লেখ করেন মুজাহিদ পর্যন্ত, যিনি বলেন, "উমার বলেছেন..." এবং এটি সহীহ। এটি আরও উল্লেখ করেছেন ইবনুল মুবারাক, আয-যুহদ: ৬৩০ এবং ওয়াকি, আয-যুহদ: ১৯৮ এ।
১০ ইবনু আবু শাইবাহ, আল-ঈমান: ১৩০; ওয়াকি: ১৯৯; বায়হাকি, শুয়াব : ৪০; আবু নুয়াইম: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৭৫-৭৬; সুয়ুতি, আল-জামি: ৫১৩৬ পৃষ্ঠায় একে যঈফ বলেছেন।
২৬৪ সূরাহ আল-বাকারাহ, ২: ১৭৭
২১৫ সূরাহ আয-যুমার, ৩৯: ১০
২১৬ সূরাহ আত-তূর, ৫২: ৪৮
২১৭ সূরাহ ইউসুফ, ১২:৮৩
১১৮ অনুরূপ, তাবারি; ধৈর্য বিষয়ে ইবনুল কাইয়্যিমের বিস্তারিত আলোচনা দেখুন পরিশিষ্ট দুইয়ে।
১৯ বুখারি: ৬৪৫২; আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।
২২০ যাহাবির মতে এটি বলেছেন সুরাইহ আল-কাদি, সিয়ার: খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১০৫
২২১ মুসলিম: ২৮০৭; আনাস থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “জেনে রেখো, তুমি যা অপছন্দ করো তা ধৈর্যের মাধ্যমে সহ্য করার মধ্যে রয়েছে মহাকল্যাণ।” গুফরাহর আযাদকৃত দাস উমারের বর্ণনায় ইবনে আব্বাস থেকে অতিরিক্ত বাক্য রয়েছে,
“তুমি যদি ইয়াকীনপূর্ণ অবস্থায় সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহর জন্য আমল করতে পারো, তবে তা করো। আর যদি তা না পারো, তাহলে জেনে রেখো, তুমি যা অপছন্দ করো তা ধৈর্যের মাধ্যমে সহ্য করার মধ্যে রয়েছে মহাকল্যাণ।”১৭৯
এখানে ইয়াকীন অর্থ হলো তাকদীরের উপর ঈমান রাখা। তাঁর ছেলে আলি বিন আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস তাঁর পিতার সূত্রে যে বর্ণনা করেছেন, তাতে স্পষ্ট করে এ অর্থের উল্লেখ আছে। এতে অতিরিক্ত শব্দ রয়েছে, “আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমি কীভাবে ইয়াকীনের সাথে কাজ করতে পারি?' তিনি বললেন, 'তুমি জানবে যে, যা তোমার উপর আপতিত হয়েছে তা হওয়ারই ছিল, আর যা আপতিত হয়নি তা কিছুতেই হওয়ার ছিল না।” তবে এ বর্ণনার সনদ দুর্বল।
তাকদীরের প্রতি ইয়াকীন যখন অন্তরে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়ে যাবে, তখন এর আবশ্যক ফলাফলস্বরূপ অন্তর থাকবে ধীরস্থির ও শান্ত। এই অর্থই প্রকাশ পেয়েছে এই আয়াতে :
“পৃথিবীতে অথবা তোমাদের নিজেদের উপর এমন কোনো বিপদ আসে না, যা আমি সংঘটিত করার পূর্বে কিতাবে লিপিবদ্ধ রাখিনি। এটি (করা) আল্লাহর জন্য খুবই সহজ। এটা এ জন্য যে, তোমাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য তোমরা যেন হতাশাগ্রস্ত না হও। আর তোমাদের যা দান করা হয়েছে, তার জন্য তোমরা যেন উৎফুল্ল না হও। কেননা, আল্লাহ অহংকারী ও অধিক গর্বকারীকে পছন্দ করেন না।”১৮০
এই আয়াতের তাফসীরে দাহহাক বলেন, “তিনি তাদের মনোবল দৃঢ় করলেন, যাতে 'তোমাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য তোমরা যেন হতাশাগ্রস্ত না হও। অতএব দুনিয়াবি জিনিসের জন্য দুঃখ কোরো না। কারণ, আমি তা তোমার জন্য নির্ধারণই করিনি।' আর 'তোমাদের যা দান করা হয়েছে, তার জন্য তোমরা যেন উৎফুল্ল না হও। সেসব দুনিয়াবি জিনিসের জন্য অহংকারী হবে না যা তোমাদের দেওয়া হয়েছে, কারণ তা কখনোই আটকে রাখার ছিল না।” বর্ণনাটি ইবনু আবিদ্দুনিয়া-এর সূত্রে এসেছে।
সাইদ ইবনু যুবাইর এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ""তোমাদের যা দান করা হয়েছে' অর্থাৎ দুনিয়াবি প্রাচুর্য। কারণ, তুমি তো জানোই তোমার সৃষ্টির আগে থেকেই এটি নির্ধারিত ছিল।” ইবনু আবি হাতিম এটি বর্ণনা করেছেন।
এর আলোকেই একজন সালাফ বলেছিলেন, “তাকদীরের প্রতি ঈমান দুশ্চিন্তা ও হতাশা দূর করে দেয়।” নবীজি এ দিকে ইঙ্গিত দিয়েছেন এই হাদীসের মাধ্যমে :
"যা কিছু তোমার উপকার করবে, তা কামনা করো এবং আল্লাহর সাহায্য চাও। আর নিরাশ হোয়ো না। কোনো বিপদ ঘটলে বলবে না, 'ইশ! আমি যদি অমুক কাজটা না করতাম!' বরং বলো, 'আল্লাহ তা নির্ধারণ করেছেন। তিনি যা চেয়েছেন, তা-ই করেছেন।' 'যদি' শয়তানের কুমন্ত্রণার দুয়ার খুলে দেয়।”১৮১
অর্থাৎ, বিপদের সময় মানুষ যদি তাকদীরের প্রতি ঈমানের কথা স্মরণ করে, তাহলে শয়তানের ওয়াসওয়াসার মাধ্যমে আর দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।
আনাস বলেন, "আমি দশ বছর নবীজি -এর খেদমত করেছি। কখনো তিনি আমাকে বলেননি, 'এটা কেন করলে?' 'ওটা করলে না কেন?”১৮২ তিনি বলেন, “তাঁর পরিবারের কেউ যদি আমাকে বকা দিত, তিনি বলতেন, 'বাদ দাও। কোনো কিছু তাকদীরে থাকলে তা হবেই।” অতিরিক্ত শব্দসহ হাদীসটি ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন। ১৮৩
ত্রুটিপূর্ণ এক সনদে ইবনু আবিদ্দুনিয়া থেকে বর্ণিত হয়েছে, আয়িশা বলেন, “নবীজি ঘরে ফিরলে সবচেয়ে বেশি যে কথাটি বলতেন তা হলো, 'আল্লাহ যা কিছু বিষয় নির্ধারিত রেখেছেন তা ঘটবেই।” এ ছাড়া আরেকটি মুরসাল বর্ণনায় আছে, নবীজি ইবনু মাসউদ-কে বলেন,
"বেশি দুশ্চিন্তা করবে না। আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন, তা ঘটবেই। যে রিযক তোমার জন্য আছে, তা আসবেই।”১৮৪ আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেন, “লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ১৮৫ (বলা) হলো নিরানব্বইটি রোগের আরোগ্য, যার সবচেয়ে কমটি হলো দুশ্চিন্তা।”১৮৬
এই কথার বাস্তবায়নের আবশ্যক ফলাফল হলো আল্লাহর কাছে সকল বিষয় ন্যস্ত করে এই বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ না চাইলে কোনো কিছুই ঘটবে না। এর উপর ঈমান দুশ্চিন্তা ও হতাশা দূর করে দেয়। নবীজি এক ব্যক্তিকে উপদেশ দিয়ে বলেন,
“আল্লাহ তোমার জন্য নির্ধারণ করে রেখেছেন এমন কোনো কিছুর জন্য আল্লাহকে গালিগালাজ করবে না।”১৮৭
বান্দা যখন আল্লাহর তাকদীরের মাধ্যমে তাঁর হিকমাহ ও রহমতের বিষয়টি বুঝতে পারে, সে বুঝতে পারে যে, তাকদীরের জন্য আল্লাহকে তিরস্কার করা সমীচীন নয়। সে আল্লাহর নির্ধারিত বিষয়ে সন্তুষ্টি বোধ করবে। আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা বলেন:
"আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদ আসে না। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, আল্লাহ তার অন্তরকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন..."১৮৮
এর তাফসীরে আলকামাহ বলেন, "মানুষের উপর আসা বিপদের কথা এখানে বলা হচ্ছে। কিন্তু সে জানে যে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে। তাই সে তা মেনে নেয় এবং সন্তুষ্ট থাকে।”
এক সহীহ হাদীসে আছে,
"আল্লাহ মুমিনের জন্য যা-ই নির্ধারণ করেন, তা তার জন্য কল্যাণকর। সে যদি ভালো অবস্থায় থাকে, তাহলে সে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে এবং তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি খারাপ অবস্থায় পড়ে, তাহলে সে ধৈর্যধারণ করে এবং তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। কেবল মুমিনের জন্যই এ বিষয়টি সত্য。”১৮৯
"বলে দাও, 'আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারণ করেছেন তা ছাড়া অন্য কিছুই আমাদের ঘটবে না, তিনিই আমাদের রক্ষক, আর আল্লাহর উপরই মুমিনদের ভরসা করা উচিত।' বলো, 'তোমরা আমাদের জন্য যে জিনিসের অপেক্ষা করছ, তা দুটো ভালোর একটি ছাড়া আর কিছুই না...'”১৯০
এখানে আল্লাহ আমাদের জানাচ্ছেন যে, তাঁর নির্ধারিত বিষয় ছাড়া মুমিনদের আর কিছুই হবে না। এ থেকে বোঝা যায় সেই বিষয়টি সহজ বা কঠিন যা-ই হোক, একই কথা। তারপর তিনি জানাচ্ছেন যে, তিনি তাদের রক্ষক। তাঁকে যারা রক্ষক হিসেবে গ্রহণ করেছে, তাদের তিনি ছেড়ে যাবেন না। নিশ্চয়ই তিনি তাদের কল্যাণ করার দায়িত্ব নেবেন:
“জেনে রেখো, আল্লাহই তোমাদের অভিভাবক, কতই-না উত্তম অভিভাবক! কতই-না উত্তম সাহায্যকারী! ১৯১
“তোমরা আমাদের জন্য যে জিনিসের অপেক্ষা করছ, তা দুটো ভালোর একটি ছাড়া আর কিছুই না... "১৯২
তিরমিযিতে আনাস থেকে বর্ণিত আছে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
“আল্লাহ যখন কোনো জাতিকে ভালোবাসেন, তখন তাদের পরীক্ষায় ফেলেন। যে কেউ সন্তুষ্ট থাকে, সে সন্তুষ্টি লাভ করবে। আর যে কেউ অসন্তুষ্ট হয়, সে অসন্তুষ্টি লাভ করবে।”১৯৩
আবুদ্দারদা (রাঃ) বলেন, “আল্লাহ কোনো কিছু নির্ধারণ করলে বান্দা এর প্রতি সন্তুষ্ট থাকলে আল্লাহ খুশি হন।” উন্মুদ্দারদা (রাঃ) বলেন, “যারা আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরের ব্যাপারে সন্তুষ্ট, তারাই সত্যিকারের প্রশান্তচিত্ত। কিয়ামাতের দিন তারা জান্নাতে এমন স্থান লাভ করবে, যা দেখে শহীদরাও হিংসা করবেন।”
ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন, “আল্লাহ তাঁর ন্যায়বিচার ও জ্ঞানের মাধ্যমে ইয়াকীন ও সন্তুষ্টির মাঝেই আনন্দ রেখেছেন। আর সংশয় ও অসন্তুষ্টির মাঝে রেখেছেন দুশ্চিন্তা আর অস্থিরতা।” নবীজি (ﷺ)-এর একটি হাদীস হিসেবেও কথাটি বর্ণিত আছে, তবে তার সনদ দুর্বল।
উমার বিন আব্দুল আযিয (রাঃ) বলতেন, “এই দু’আগুলো আমার জন্য আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার নির্ধারিত তাকদীরের প্রতি আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কোনো প্রয়োজনই বাকি রাখেনি।” তিনি এই দু’আগুলো খুব বেশি বেশি করতেন, “হে আল্লাহ, আমাকে আপনার তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট রাখুন। আমাকে আপনার তাকদীরে এত বারাকাহ দিন, যাতে আমি এমন বিষয়ে বিলম্ব কামনা না করি, যা আপনি দ্রুত দেবেন এবং যা বিলম্বে দেবেন তাতে তাড়াহুড়া না করি।”১৯৪
ইবনু আওন (রাঃ) বলেন,
"স্বাচ্ছন্দ্য ও কাঠিন্য উভয় অবস্থায় আল্লাহর তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকো। এতে তোমার অস্থিরতা কমবে এবং আখিরাতের জন্য লাভজনক হবে। জেনে রেখো, বান্দা ততক্ষণ সত্যিকারের সন্তুষ্টি লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তার দরিদ্র অবস্থার সন্তুষ্টি সচ্ছলতার অবস্থার সন্তুষ্টির সমান হচ্ছে। আল্লাহর ইচ্ছেকে নিজের কামনা-বাসনার বিপরীত দেখতে পেয়ে কী করে তুমি অসন্তুষ্ট হতে পারো? অথচ তুমি আল্লাহকে তোমার অবস্থার দেখভাল করার অনুরোধ করেছ। এমনটা হতেই পারে যে, তোমার ইচ্ছামতো সবকিছু হলে তুমি ধ্বংস হয়ে যেতে। অথচ আল্লাহর নির্ধারিত বিষয় তোমার ইচ্ছের সাথে মিললে তুমি খুশি হয়ে ওঠো। উভয় অবস্থার কারণ হলো গায়েবের ব্যাপারে তোমার নিতান্ত অজ্ঞতা। এই অবস্থা নিয়ে
বিচারদিবসে যাওয়ার সাহস হয় কী করে! তুমি নিজের প্রতি সদ্ব্যবহার করোনি, সন্তুষ্টির সঠিক মাত্রায়ও পৌঁছতে পারোনি।”
চমৎকার কিছু কথা। এর অর্থ হলো যে, বান্দা যখন আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার কাছে কোনো বিষয়ে ফায়সালা করে দেওয়ার দু'আ (ইস্তিখারা) করে, তখন আল্লাহ যে সিদ্ধান্তই দিন তাতে তার সন্তুষ্ট থাকতে হবে-পছন্দ হোক বা না হোক। কারণ, সে তো জানেই না কোন অবস্থায় তার কল্যাণ রয়েছে। আর আল্লাহ যা নির্ধারণ করেন, তার জন্য তিনি তিরস্কারযোগ্য নন। আল্লাহ যা নির্ধারণ করবেন, এতে সন্তুষ্ট হওয়ার মতো মনোবল নেই, এমন মানুষদের এ কারণেই ইস্তিখারার দু'আয় 'সকল কল্যাণকর অবস্থায়' কথাটি যোগ করার পরামর্শ দিতেন ইবনে মাসউদ১৯৫ সহ কিছু সালাফ। অন্যথায় সে এমন ফিতনায় পতিত হতে পারে, যাতে সে উত্তীর্ণ হতে পারবে না। এ কথাটি নবীজি -এর হাদীস হিসেবেও বর্ণিত হয়েছে। তবে তার সনদ দুর্বল। ১৯৬
সাদ থেকে বর্ণিত, রাসূল বলেন, "বান্দার সৌভাগ্য হলো আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার কাছে সিদ্ধান্ত চাওয়ার পর তাঁর প্রদান করা সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকতে পারা। আর বান্দার দুর্ভাগ্য হলো আল্লাহর সিদ্ধান্ত চাওয়া পরিত্যাগ করা আর তিনি যা নির্ধারণ করেন, তাতে অসন্তুষ্ট হওয়া।” হাদীসটি তিরমিযি ও অন্যান্য কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। ১৯৭
তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্টি অর্জনের অনেক উপায় আছে:
১. আল্লাহর প্রতি বান্দার দৃঢ় ইয়াকীন থাকা যে, তিনি মুমিনের জন্য যা নির্ধারণ করেন তা-ই কল্যাণকর। সে যেন দক্ষ ডাক্তারের কাছে নিজেকে সমর্পণ করা রোগী। ডাক্তারের পথ্য তার ব্যথার উদ্রেক করুক বা না করুক, সে সন্তুষ্টই থাকবে। কারণ, সে জানে যে, ডাক্তার তাকে সর্বাধিক কল্যাণকর পথ্যই দিচ্ছেন। ইবনে আওল তাঁর উক্তিতে এর কথাই বলেছেন।
২. সন্তুষ্টির বিনিময়ে আল্লাহ যে প্রতিদান দেওয়ার ওয়াদা করেছেন, তা স্মরণ করা। বান্দা এটি নিয়ে চিন্তায় এমনই মগ্ন হয়ে যেতে পারে যে, বাকি সব ব্যথা সে
ভুলেই যাবে। সালাফদের মধ্যে একজন নারী পড়ে যান, এতে তাঁর পায়ের নখ ভেঙে যায়। তিনি হেসে উঠে বলেন, “তাঁর কাছে এর যে প্রতিদান তা ভেবে আমি ব্যথার তিক্ততা ভুলে গেছি।”
৩. যেই সত্তা বিপদ পাঠান, তাঁর ভালোবাসায় নিজেকে মগ্ন করে ফেলা। তাঁর অসীম প্রাচুর্য, মহত্ত্ব, সৌন্দর্য, ত্রুটিহীনতা নিয়ে চিন্তা করা। এমন সচেতনতার ফলে এমন অবস্থা সৃষ্টি হবে যে, ইউসুফ (আঃ)-কে দেখে মিসরের নারীদের হাত কাটার ব্যাথা ভুলে যাওয়ার**১৮৮** মতো করেই বান্দা ব্যাথা ভুলে যাবে। পূর্বে বর্ণিত অবস্থার চেয়ে এটি আরও উচ্চতর পর্যায়।
জুনাইদ (রহঃ) বলেন তিনি সিররি (রহঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, প্রেমিক বিপদের ব্যাথা অনুভব করেন কি না। তিনি জবাব দিয়েছিলেন, “না।” এ কথার মাধ্যমে তিনি এই উচ্চতর পর্যায়ের কথা বলছেন। এ কথার আলোকেই বিপদে পতিত একদল মানুষ বলেছিলেন, “তিনি (আল্লাহ) আমাদের সঙ্গে যা করতে চান, তা-ই করুন। এমনকি তিনি যদি আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একটি একটি করে কেটে ফেলতেন, এতে তাঁর প্রতি আমাদের ভালোবাসাই কেবল বাড়ত।”
তাঁদের মধ্যে একজন বলেছেন: প্রেমের আতিশয্য যদি টুকরো টুকরো করে কাটে আমায়, আমার ভালোবাসা বৃদ্ধি ছাড়া তাতে কিছুই হতো না হায়। আমি হয়ে থাকব ভালোবাসার কাছে বন্দী, তব সন্তুষ্টির খোঁজেই পৌঁছে যাব জীবনসন্ধি।
ইবরাহীম ইবনু আদহাম (রহঃ) তাঁর সম্পত্তি, সম্পদ, সন্তান ও দাসদের ছেড়ে গিয়েছিলেন। তাওয়াফ করার সময় তিনি তাঁর পুত্রকে দেখতে পান, কিন্তু তাঁর সাথে কথা বলেননি। তিনি বলেন: সবকিছু থেকে হিজরত করেছি তোমাকে পাবার আশায় অধীনস্থদের ছাড়িয়া এসেছি তোমাকে দেখার নেশায়। তুমি আমায় টুকরো করলেও বেড়েই চলব ভালোবাসায়।
আল্লাহর এমনই একদল প্রেমিক ছিলেন ফুদাইল ও ফাতহুল মাওসিলির মতো ব্যক্তিরা। তাঁরা যদি এমন অবস্থায় ঘুমোতে যেতেন যে, রাতের খাবার খাওয়া হয়নি বা জ্বালানোর মতো কুপি পাওয়া যায়নি, তাহলে তাঁরা আনন্দে কান্না করতেন।
শীতকালে ফাতহ তাঁর পরিবারকে জড়ো করে নিজের চাদর দিয়ে তাদের ঢেকে নিয়ে বলতেন,
“(হে আল্লাহ) আপনি আমাকে ক্ষুধার্ত রেখেছেন, তাই আমি আমার পরিবারকে ক্ষুধার্ত রেখেছি। আপনি আমাকে খ্যাতিহীন করেছেন, তাই আমি আমার পরিবারকে খ্যাতিহীন করেছি। এমনটা আপনি আপনার প্রিয় বান্দাদের সাথেই করে থাকেন, আমি কি তাদের একজন? আমার কি আনন্দিত হওয়া উচিত নয়?”১৯৯
একজন সালাফ অসুস্থ ছিলেন। তাঁরা তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার কি কিছু লাগবে?” তিনি বলেন, "তাঁর (আল্লাহর) কাছে যা সবচেয়ে প্রিয়, আমার কাছেও তা-ই প্রিয়।”২০০
এর আলোকে একজন বলেছিলেন:
আপনার শান্তি মধুর, যার থেকে দূরত্বও নিকট সমধিক, আপনি আমার প্রাণেরই মতো, বরং তার চেয়ে অধিক। এটাই আমার জন্য যথেষ্ট, যাতে তুমি তুষ্ট, তাতে আমিও তুষ্ট।
আবুত্তুরাব এই চরণগুলো রচনা করেছেন :
বিভ্রান্ত হোয়ো না কেউ, প্রেমিকেরও তো চিহ্ন আছে, নির্দিষ্ট পথে উপহার পাঠায় সে প্রেমাস্পদের কাছে। রবের দেওয়া বিপদে তুষ্ট, তিনি যা করেন তায় খুশি, তাঁর দেওয়া দারিদ্র্যই প্রাচুর্য, বরং তার চেয়েও বেশি।
তাঁরা এক ব্যক্তির কাছে গেলেন, যার ছেলে জিহাদে শহীদ হয়েছে। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, "আমি পুত্রশোকে কাঁদছি না। তরবারির আঘাত পাওয়ার সময় আল্লাহর প্রতি সে কতই-না সন্তুষ্ট ছিল, তা ভেবেই কাঁদছি।”
তারা যদি মোর মৃত্যুই চায়, সেটাই হোক না তবে! আল্লাহ যা চান, সেটা না হওয়া আমি চেয়েছি কবে?
মূলকথা হলো, রাসূল ﷺ চেয়েছেন ইবনে আব্বাস যেন সামর্থ্য থাকলে সন্তুষ্ট অবস্থায় আমল করেন। যদি সামর্থ্য না থাকে, তিনি বলেন, “যদি তা না পারো, তাহলে জেনে রেখো, তুমি যা অপছন্দ করো তা ধৈর্যের মাধ্যমে সহ্য করার মধ্যে রয়েছে মহাকল্যাণ।” এ থেকে বোঝা যায়, যেসব নির্ধারিত বিষয় সহ্য করা কঠিন, তাতে পুরোপুরি সন্তুষ্ট থাকা আবশ্যক নয়, তবে অত্যন্ত উত্তম। যে সন্তুষ্ট হতে পারে না, তাকে অবশ্যই ধৈর্যশীল হতে হবে। ধৈর্য আবশ্যক। এর ফলে মহাকল্যাণ আসে। আল্লাহ তা'আলা ধৈর্যের আদেশ দিয়েছেন এবং এর জন্য বিশাল পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন,
"... আমি ধৈর্যশীলদের তাদের পুরস্কার অপরিমিতভাবে দিয়ে থাকি।”২০১
"...ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দান করো। নিশ্চয়ই যারা বিপদকালে বলে থাকে, 'আমরা আল্লাহরই, আর আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী।' এদের প্রতিই রয়েছে তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অনুগ্রহ ও করুণা। আর এরাই হিদায়াতপ্রাপ্ত।”২০২
"...সুসংবাদ দাও সেই বিনীতদের, 'আল্লাহ' নামের উল্লেখ হলেই যাদের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে, যারা তাদের বিপদে-আপদে ধৈর্যধারণ করে..."২০৩
আল-হাসান বলেন, “সন্তুষ্টির অবস্থা বিরল। তবে ধৈর্য হলো মুমিনের আশ্রয়।”২০৪ সুলাইমান আল-খাওয়াস বলেন, “ধৈর্যের মর্যাদা সন্তুষ্টির নিচে। সন্তুষ্ট ব্যক্তির অবস্থা এই যে, বিপদ আসুক বা না আসুক, সে সন্তুষ্ট। আর ধৈর্য হলো বিপদ আসার পর অবিচলভাবে তা সহ্য করা।”
সন্তুষ্টি আর ধৈর্যের মাঝে পার্থক্য আছে। ধৈর্য হলো বিপদ দেখতে পাওয়ার পর অসন্তুষ্ট হওয়া থেকে আত্মাকে লাগাম পরানো।২০৫ আর সন্তুষ্টি হলো যেকোনো অবস্থায়ই যা হচ্ছে, তা মেনে নেওয়া। সন্তুষ্টির কারণে ব্যথা কমে যায়, এমনকি একদমই শূন্য হয়ে যেতে পারে। কারণ, অন্তর তখন ইয়াকীন ও জ্ঞানের কোমল পরশ পেয়ে গেছে। ২০৬
উমার বিন আব্দুল আযীয, ফুদাইল, আবু সুলাইমান, ইবনুল মুবারাকসহ অনেক সালাফ তাই বলতেন, “সন্তুষ্ট ব্যক্তি বর্তমানে যেই অবস্থায় আছে, সেটা ছাড়া আর অন্য কিছু কামনাই করে না। কিন্তু ধৈর্যশীল ব্যক্তি (অবস্থার পরিবর্তন) কামনা করে।” অনেক সাহাবাগণের থেকেও এ রকম সন্তুষ্টির অবস্থার বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন: উমার , ইবনে মাসউদ প্রমুখ।
আব্দুল আযীয ইবনে আবু রুওওয়াদ বলেন, “বানী ইসরাঈলের এক আবেদ ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখানো হলো, অমুক মহিলা জান্নাতে তাঁর স্ত্রী হবে। তিনি সেই নারীর বাসায় তিন দিনের জন্য গেলেন, যাতে তিনি কী আমল করেন তা জানা যায়। কিন্তু রাতে পুরুষটি যখন সালাত পড়তেন, নারীটি ঘুমাতেন। পুরুষটি যেদিন সিয়াম রাখতেন, নারীটি খাওয়া-দাওয়া করতেন। চলে যাওয়ার সময় তিনি নারীটিকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনার কোন আমলটি আপনার কাছে সেরা মনে হয়?' নারীটি বললেন, 'আপনি আমাকে যা করতে দেখেছেন, তার চেয়ে বেশি আমি কিছুই করি না। কিন্তু আমি যখন কষ্টে থাকি, তখন স্বাচ্ছন্দ্য কামনা করি না। যখন অসুস্থ থাকি, তখন সুস্বাস্থ্য কামনা করি না। যখন ক্ষুধার্ত থাকি, তখন ভরপেট হওয়া কামনা করি না। যখন রোদে থাকি, তখন ছায়া কামনা করি না।' লোকটি বললেন, 'আল্লাহর কসম! এই গুণ তো বান্দাদের আয়ত্তের বাইরে।”২০৭
বিপদের প্রথম আঘাতেই ধৈর্যধারণ করতে হয় বলে নবীজির সহীহ হাদীসে এসেছে।২০৮ আর বিপদ ভোগ করতে থাকা অবস্থায় সন্তুষ্টি প্রদর্শন করতে হয়। যেমনটি নবীজি ﷺ দু'আ করতেন, “তাকদীরের লিখন সংঘটিত হয়ে যাবার পর আমি আপনার নিকট সন্তুষ্ট থাকার সামর্থ্য চাই।”২০৯ কারণ, বিপদ আসার আগে বান্দা সহজেই সন্তুষ্ট থাকতে পারে। কিন্তু বিপদ আসার পর তার অবস্থা একদম বিপরীত হয়ে যেতে পারে। নির্ধারিত বিপদ চলে আসার পর যে সন্তুষ্টি প্রদর্শন করে, সে-ই সত্যিকারের সন্তুষ্ট। ২১০
সারকথা হলো, ধৈর্যধারণ আবশ্যক। ধৈর্যের সীমানার বাইরেই থাকে অসন্তুষ্টি। যে কেউ আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরের ব্যাপারে অসন্তুষ্ট, তার পরিণাম হবে আল্লাহর অসন্তুষ্টি। তার উপর তার নিজের অসন্তুষ্টির চেয়ে বেশি হবে বিপদের স্বাদ আর শত্রুদের পক্ষ থেকে আসা ক্ষতি। একজন সালাফ বলেছেন:
কোনো দুর্ঘটনায় হোয়ো না হতাশ শত্রুকে ধরতে দিয়ো না তোমার রাশ ধৈর্যের মাধ্যমেই দেখতে পাবে আশ, দৃঢ়পদ থাকো যখন শত্রু-সঙ্গে হয় নিবাস।
নবীজি বলেন, “যে নিজের মাঝে ধৈর্য স্থাপন করে, আল্লাহ তাকে ধৈর্য দান করেন। ধৈর্যের চেয়ে বড় ও ব্যাপক উপহার আর কাউকে কখনো দেওয়া হয়নি।” ২১১
উমার বলেন, "আমাদের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সময় ছিল ধৈর্যধারণের দিনগুলো।” ২১২ আলি বলেন, "ঈমানের সাথে ধৈর্যের সম্পর্ক দেহের সাথে মাথার সম্পর্কের মতো। যার ধৈর্য নেই, তার ঈমানই নেই।” ১১৩
আল-হাসান বলেন, “ধৈর্য হলো জান্নাতি এক নিয়ামাত। আল্লাহ কেবল সম্মানিতদেরই তা দান করেন।” মায়মুন ইবনু মিহরান বলেন, “নবী বা অন্য কেউই কখনো ধৈর্যধারণ না করে কোনো কল্যাণ লাভ করতে পারেননি।” ইবরাহীম আত-তাইমী বলেন, “আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার উপর ঈমানের পর বান্দাকে সবচেয়ে বড় যে নিয়ামাত আল্লাহ দিয়েছেন, তা হলো ক্ষতির সময় ধৈর্য, পরীক্ষার সময় ধৈর্য, বিপদের সময় ধৈর্য।” তিনি এ কথা বলেছেন এই আয়াতের ভিত্তিতে :
"বরং কল্যাণ আছে এতে যে, কোনো ব্যক্তি ঈমান আনবে আল্লাহ, শেষ দিবস, ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ ও নবীগণের উপর এবং আল্লাহর ভালোবাসার্থে ধন-সম্পদ আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম-মিসকীন, মুসাফির ও যাজ্ঞাকারীদের এবং দাসত্বজীবন হতে নিষ্কৃতি দিতে দান করবে এবং সালাত কায়েম করবে ও যাকাত প্রদান করবে, প্রতিশ্রুতি দানের পর স্বীয় প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবে এবং অভাবে, দুঃখ-ক্লেশে ও সংকটে ধৈর্যধারণ করবে। এ লোকেরাই সত্যপরায়ণ আর এ লোকেরাই তাকওয়াবান।” ২১৪
উমার বিন আব্দুল আযীয বলেন,
“আল্লাহ যদি কাউকে কোনো নিয়ামাত দিয়ে তা ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে তার বদলে শুধু ধৈর্য দান করেন, তাহলে যা দেওয়া হলো তা ছিনিয়ে নেওয়া বস্তুর চেয়ে উত্তম।” তারপর তিনি তিলাওয়াত করেন:
"... আমি ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান অপরিমিতভাবে দিয়ে থাকি।”২১৫
একজন সালাফের পকেটে সব সময় একটি কাগজের টুকরা থাকত। সময়ে সময়ে তিনি তা বের করে পড়তেন। তাতে লেখা ছিল,
“তুমি ধৈর্যধারণ করে তোমার প্রতিপালকের হুকুমের অপেক্ষায় থাকো, কারণ তুমি তাঁর দৃষ্টির সামনেই আছো..."২১৬
সুন্দর ধৈর্য হলো বিপদের কথা বান্দার নিজের কাছে রাখা আর কাউকে এ বিষয়ে না বলা।
"ধৈর্যই উত্তম।”২১৭
একদল সালাফ এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, এর অর্থ হলো কোনো অভিযোগ ছাড়াই ধৈর্যধারণ করা। ২১৮
আহনাফ ইবনু কায়স ؒ চল্লিশ বছর ধরে অন্ধ ছিলেন, কিন্তু তিনি এর কথা কাউকে বলেননি। আব্দুল আযীয ইবনু আবু রুওওয়াদ-এর এক চোখ বিশ বছর যাবৎ অন্ধ ছিল। তাঁর ছেলে একদিন ভালো করে দেখে বললেন, “বাবা, আপনার এক চোখ অন্ধ।” তিনি বললেন, “গত বিশ বছর ধরে আমি এ নিয়ে আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট আছি।” ইমাম আহমাদ ؒ অসুস্থ হলে তা নিয়ে কখনো কোনো অভিযোগ করতেন না। তাঁকে যখন জানানো হলো যে অসুস্থ অবস্থায় মুজাহিদ ؒ গোঙানো অপছন্দ করতেন, তখন তিনি মৃত্যু পর্যন্ত এ কাজ ত্যাগ করেন। তিনি নিজেকে বলতেন, "ধৈর্য ধরো, না হলে পস্তাতে হবে।"
এক জ্ঞানী ব্যক্তি এক রোগীর কাছে গিয়ে দেখলেন সে উহ আহ করছে। তিনি মনে করিয়ে দিলেন, “এটি (রোগ) কার দেওয়া?” তাঁদের একজন বলতেন:
শরীর তো আমার অসুস্থতায় জর্জরিত, তবু দর্শনার্থীদের কাছে রাখে লুক্কায়িত। প্রিয়তমের তাকদীরে যদি অসন্তুষ্ট হয়, তাহলে তো নফস সুবিচারকারী নয়।
ইয়াহইয়া ইবনু মুয়ায বলেন,
"তুমি যদি তোমার রবকে ভালোবাসো আর তিনি তোমার জন্য ক্ষুধা ও বস্ত্রের অভাব নির্ধারণ করেন, তোমার উপর ফরয হলো এটি সহ্য করা এবং মাখলুকদের কাছ থেকে তা লুকানো। প্রেমিক তো বিনা অভিযোগে প্রেমাস্পদের থেকে পাওয়া কষ্ট সহ্য করে। তাহলে মাখলুকের কাছে তুমি এমন জিনিস নিয়ে কেন অভিযোগ করবে, যা সে তোমাকে দেয়ইনি?"
কবি বলেন, আপনি ছাড়া সকলের কাজ আমার ঘৃণায় খণ্ডিত, আপনার হতে যা কিছু আসে তা-ই সৌন্দর্যমণ্ডিত।
নবীজি ও সাহাবাগণ ক্ষুধার তাড়নায় পেটে পাথর বাঁধতেন। ১৯
উয়াইস ময়লার স্তূপ থেকে ভাঙা হাড্ডি জড়ো করতেন আর তাঁর আশপাশে কুকুররাও তা-ই করত। একবার এক কুকুর তাঁকে দেখে ঘেউ ঘেউ করে উঠল। তিনি বললেন, “কুকুর, যে তোমার ক্ষতি করে না, তুমিও তার ক্ষতি করো না। তোমার কাছে যা আছে, তা তুমি খাও। আমার কাছে যা আছে, তা আমি খাই। আমি যদি জান্নাতে যাই, আমি তোমার চেয়ে উত্তম হব। আর আমি যদি জাহান্নামে যাই, তুমি আমার চেয়ে উত্তম হবে।”
ইবরাহীম ইবনু আদহাম গরিবদের সাথে শস্যের অঙ্কুর কুড়াতেন। যখন তিনি টের পেলেন গরিবরা তাদের সাথে তাঁর এ প্রতিযোগিতা পছন্দ করছে না, তখন তিনি ভাবলেন, “আমি কি বালখ অঞ্চলে সম্পদ ফেলে এলাম গরিবদের সাথে শস্যদানা কুড়ানোর প্রতিযোগিতা করতে?” তারপর থেকে তিনি কেবল পশুরা যেসব মাঠে চড়ত, সেখান থেকেই শস্য কুড়াতেন।”
ইমাম আহমাদ গরিবদের সাথে শস্য কুড়াতেন। সুফিয়ান আস-সাওরি মক্কায় যাওয়ার পথে একবার দুটি উটের দেখাশোনার চাকরি নিয়েছিলেন। তিনি কিছু লোকের জন্য রান্নার দায়িত্ব ছিলেন। তিনি এত বাজে রান্না করতেন যে, লোকেরা তা খেয়ে তাঁকে প্রহার করত। ফাতহুল মাওসিলি টাকার বিনিময়ে কিছু মানুষের জন্য আগুন জ্বালানোর কাজ করতেন।
ভূমি দিয়ে এলাম আমি আপনার ওয়াস্তে আমার শত্রু হিংসুকদের হস্তে।
হে রব, কতদিন পাব নেক নজর তোমার? জীবন শেষ হতে চলল, প্রয়োজন ফুরোয়নি আমার।
আরেকজন সালাফ বলেছেন: তোমার রহমতের খোঁজে সয়েছি অনেক দুঃখ-যাতনা অনেক ধৈর্য ধরেছি আমি অনেক কষ্ট-যাজ্ঞা। ছেড়ে যেয়ো না আমায় পারব না আমি তোমায় ছাড়া পারিশ্রমিক চাও যদি আমার প্রাণটি নাও সারা। তোমার সন্তুষ্টিকে আমি বেসেছি অনেক ভালো, হৃদয় আকুল, কণ্ঠ রুদ্ধ অশ্রুতে টলোমলো। আপনার প্রেমে সকল বিপদ হয়ে যায় সহ্য আমার, বিপদে যে কখনো পড়েনি তার সুখ কী আবার?
তাঁদের দৃষ্টিতে দুনিয়াবি কষ্ট হলো নিয়ামাত। তাঁদের একজন বলতেন, “সত্যিকার বিচারক তো সে-ই, যে বিপদকে দেখে নিয়ামাত হিসেবে আর স্বাচ্ছন্দ্যকে ভাবে দুর্ভাগ্য।” এক ইসরাঈলী বর্ণনায় আছে, "যদি কোনো প্রাচুর্যশালীকে আসতে দেখো, তাহলে বলো, 'কোনো এক পাপের অগ্রীম শাস্তি!' যদি কোনো দরিদ্রকে আসতে দেখো, তাহলে বলো, 'নেককারের নিদর্শন, স্বাগতম!”২২০
একজন সালাফ বলেছেন,
"আমি কোনো দুনিয়াবি বিপদে পড়লে চারবার আল্লাহর প্রশংসা করি। বিপদ এর চেয়েও খারাপ না হওয়ার কারণে, আমাকে বিপদ সহ্য করার শক্তি দেওয়ার কারণে, আমাকে 'ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' বলার শক্তি প্রদানের কারণে, আমাকে দ্বীনের ক্ষেত্রে কোনো বিপদে না ফেলার কারণে।"
ধৈর্যের মাধ্যমে মুক্তি কামনা করা ইবাদাতের একটি প্রকার। কারণ, বিপদ কখনোই চিরস্থায়ী হয় না।
ধৈর্য ধরে বিপদ সহ্য করো, হে হৃদয়। জেনো বিপদ কভু চিরস্থায়ী না হয়। ধৈর্য ধরো মহান ব্যক্তিদের মতো করেই, বিপদ তো আজকে আছে, কালকে নেই।
পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্দশাগ্রস্ত লোকটিকে জান্নাতে একটু ঢুকিয়ে আবার বের করে এনে জিজ্ঞেস করা হবে, "তুমি কি কখনো বিপদ দেখেছ? বিপদ ভোগ করেছ?” সে বলবে, “না, ইয়া রব্ব!”২২১
হে আত্মা, আর মাত্র কয়েকটা দিন, এরা তো স্বপ্নের মতো স্থায়িত্বহীন। হে আত্মা, পৃথিবী তাড়াতাড়ি পার করে দাও, আসল জীবন তো সামনে, তার দিকেই যাও।
আরেকজন বলেছেন: একটি মাত্র ঘণ্টার ব্যাপার, তারপরই তা নেই, এ সবই ক্ষণস্থায়ী, সব হারিয়ে শেষে যাবেই।

টিকাঃ
১৭৯ আবু নুয়াইম: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩১৪
১৮০ সূরাহ আল-হাদীদ, ৫৭: ২২-২৩
১৮১ মুসলিম: ২৬৬৪; আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।
১৮২ বুখারি: ২৭৬৮-৬০৩৮-৬৯১১; মুসলিম: ২৩০৯
১৮৩ আহমাদ: ১৩৪১৮; বায়হাকি, শুয়াব: ৮০৭০; বুখারি ও মুসলিমের শর্তানুযায়ী এর ইসনাদ গ্রহণযোগ্য। অনুরূপ, আরনাউত, তাখরিজ মুসনাদ।
১৮৪ বায়হাকি, শুয়াব: ১১৮৮; ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ, আল-ইসাবাহ: খণ্ড ১, ১০৪ পৃষ্ঠায় ইবনু হাজার বলেন, এর ইসনাদে আইয়‍্যাশ ইবনু আব্বাস নামক একজন যঈফ বর্ণনাকারী আছেন। আলবানি, আয-যঈফাহ: ৪৭৯৩ এ একে যঈফ বলেছেন। অনুরূপ আস-সহীহাহ: খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৪ এ তিনি উমার ও আবু যার থেকে এই হাদীসের আরও দুটি দুর্বল বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন
১৮৫ অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কারও কোনো শক্তি বা ক্ষমতা নেই।
১৮৬ তাবারানি, আল-আসওয়াত: ৫০২৮; ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ, হাকিম : ১৯৯০ একে সহীহ বলেছেন, কিন্তু যাহাবি দেখান যে এতে বিশর নামক একজন দুর্বল বর্ণনাকারী আছেন। হায়সামি: খণ্ড ১০, ৯৮ পৃষ্ঠায় বলেন, এর ইসনাদে বিশর ইবনু রাফি আছেন, যিনি দুর্বল। ইবনুল জাওযি, আল-ইলাল: খণ্ড ২, ৩৪৮ পৃষ্ঠায় বলেন এটি সহীহ নয়। আলবানি একে যঈফ বলেছেন, যঈফ আর-তারগীব: ৯৭০-১১৪৭
১৮৭ আহমাদ: ১৭৮১৪-২২১৭; বুখারি, খালাক আফআলুল ইবাদ: ১৬৩ মুনযিরি, আত-তারগীব : খণ্ড ২, ২৫৭ পৃষ্ঠাতে দুটি বর্ণনাসূত্র উল্লেখের পর তাদের একটিকে হাসান বলেন। আলবানি, আস-সহীহাহ: ৩৩৩৪ এবং সহীহুত তারগীব : ১৩০৭ এ একে হাসান লি গাইরিহি বলেন। আরনাউত বলেন, হাদীসটি হাসান বলে পরিগণিত হওয়ার যোগ্য।
১৮৮ সূরাহ আত-তাগাবুন, ৬৪: ১১
১৮৯ মুসলিম: ২৯৯৯; সুহাইব ইবনু সিনান এ থেকে বর্ণিত।
১৯০ সূরাহ আত-তাওবাহ, ৯ : ৫১-৫২
১৯১ সূরাহ আল-আনফাল, ৮ : ৪০
১৯২ সূরাহ আর-তাওবাহ, ৯ : ৫২
১৯৩ তিরমিযি, ২৩৯৬, ইবনু মাজাহ, ৪০৩১
১৯৪ বায়হাকি, শুয়াব: ২২৭
১৯০ বায়হাকি, শুয়াব: ২০৫
১৯৬ তাবারানি, আল-কাবির: ১০০১২-১০০৫২; ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত। এটি যঈফ।
১৯৭ আহমাদ: ১৪৪৫ এবং তিরমিযি: ২১৫১; তিরমিযি একে গারীব বলেছেন, কারণ এর ইসনাদে হাম্মাদ ইবনু হুমাইদ আছেন, যিনি শক্তিশালী নন। আরনাউত এর ইসনাদকে যঈফ বলেছেন। আলবানি, আয-যঈফাহ: ১৯০৬ এ একে যঈফ বলেছেন।
১৮৮ "যখন তারা তাকে দেখল, বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল আর নিজেদের হাত কেটে ফেলল আর বলল, 'আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন। এ তো মানুষ নয়, এক সম্মানিত ফেরেশতা!” [সূরাহ ইউসুফ, ১২:৩১]
১৯৯ আবু নুয়াইম: খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ১৯২
২০০ যাহাবি, সিয়ার: খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ১৮২; ইয়াহইয়া ইবনু সাইদ আল-কাত্তানের উদ্ধৃতি দিয়ে।
২০১ সূরাহ আয-যুমার, ৩৯: ১০
২০২ সূরাহ আল-বাকারাহ, ২: ১৫৫-১৫৭
২০০ সূরাহ আল-হাজ্জ, ২২: ৩৪-৩৫
২০৪ আবু নুয়াইম: খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৪২; উমার ইবনু আব্দুল আযীয থেকে।
২০৫ সবর: বিরত থাকা ও সংযত হওয়া। রাগিব বলেন, "এটি হলো শরিয়ত ও আকল অনুযায়ী আত্মাকে বিরত রাখা।” জাহিয বলেন যে, এটি স্থিরবুদ্ধিতা ও সাহসের সমন্বয়ে গঠিত এক গুণ। মুনাউয়ি বলেন যে, এটি হলো শারিরীক ও মানসিক অসুবিধা ও ব্যথার মুখোমুখি হতে পারার ক্ষমতা। এটি হলো আত্মাকে কৃপণতা ও হতাশা থেকে বিরত রাখা, জিহ্বাকে অভিযোগ করা থেকে বিরত রাখা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে বিশৃঙ্খল হওয়া থেকে বিরত রাখা। এটি হলো সকল পরিস্থিতিতে আল্লাহর হুকুমের উপর দৃঢ় থাকা এবং সর্বোত্তম উপায়ে বিপদের মোকাবেলা করা। ইবনু হিব্বান, রওদাতুল উকালা: পৃষ্ঠা ১২৬-১২৮ এ বলেন, বুদ্ধিমানের উপর আবশ্যক হলো বিপদের আগমনের শুরুতে সবর অবলম্বন করা। আর যখন সে এতে দৃঢ় হয়ে যাবে, তখন সন্তুষ্টির (রিদ্বা) পর্যায়ে উন্নীত হওয়া। কেউ যদি সবর দ্বারা পরিপুষ্ট না হয়ে থাকে, তাহলে তার উচিত নিজের মধ্যে সবরের পরিচর্যা করা (তাসাব্বর), কারণ এটিই রিদ্বার প্রথম ধাপ। মানুষের যদি সত্যিই সবর থাকে, তাহলে সে মহান হয়ে যাবে। কারণ, এটিই সকল কল্যাণের ঝরনা আর সকল আনুগত্যের ভিত্তি... এর দিকে যাওয়ার ধাপগুলো হলো সচেতনতা (ইহতিমাম), উপলব্ধি (তায়াক্কু), পরীক্ষা-নিরীক্ষা (তাহাব্বত) এবং তাসাব্বুর। এর পরেই আসে রিদ্বা। আর এটিই আত্মিক উন্নতির শিখর... তিনটি বিষয়ে সবর প্রদর্শন করতে হয়: ১) গুনাহ থেকে সবর, ২) আল্লাহর আনুগত্যে লেগে থাকার ব্যাপারে সবর, ৩) বিপদ-আপদের মুখে সবর। অনুরূপ, ইবনুল কাইয়্যিম, মাদারিজুস সালিকীন: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৬২-১৬৫
২০৬ রিদ্বা : হতাশা ও বিরক্তির বিপরীত। জুরানি একে বলেছেন তাকদীর কার্যকর হতে দেখে হৃদয়ে আনন্দ লাভ করা। ইবনুল কাইয়্যিম, মাদারিজ: খণ্ড ২, ১৮৫ পৃষ্ঠাতে উল্লেখ করেছেন যে, এটি হলো তাকদীরের ওঠা-নামায় অন্তর প্রশান্ত রাখা এবং এই বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ এতে কল্যাণকর কিছুই রেখেছেন।
বায়হাকি, শুয়াব: ২০৯-এ উল্লেখ আছে, ইবনু মাসউদ বলেন, "রিদ্বা হলো আল্লাহর অসন্তুষ্টির বিনিময়ে মানুষকে সন্তুষ্ট না করা, আল্লাহর দেওয়া রিযকের কারণে অন্য কাউকে প্রশংসা না করা, আল্লাহ যা দেননি তার জন্য অন্য কাউকে দোষারোপ না করা। কারও ইচ্ছায় আল্লাহর রিযক আসে না, আবার কেউ ইচ্ছা না করলেই তা বন্ধ হয়ে যায় না। আল্লাহ তাঁর ন্যায়বিচার ও জ্ঞানের মাধ্যমে তিনি মুক্তি ও আনন্দ রেখেছেন ইয়াকীন ও সন্তুষ্টিতে, আর দুশ্চিন্তা ও হতাশা রেখেছেন সন্দেহ ও অসন্তুষ্টিতে।”
২০৭ এই ঘটনার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। বর্ণনাকারী একজন আবিদ, পরহেজগার, তবে সকল আলিমের মতে তিনি মুরজিয়া সম্প্রদায়ের। ইমাম আবু হাতিম বলেন, "তার বর্ণনা অগ্রহণযোগ্য।" আল্লামা ইবনুল জুনাইদ বলেন, "তিনি ভুয়া হাদীস বর্ণনা করতেন।" ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল বলেন, "তিনি মুরজিয়া ছিলেন। খুব ইবাদাত করতেন। তবে হাদীস বর্ণনায় তিনি অন্যদের মত নির্ভরযোগ্য ছিলেন না।" - শর'ঈ সম্পাদক
২০৮ বুখারি: ১২৮৩-১৩০২-৭১৫৪; মুসলিম: ৬২৬; আনাস থেকে বর্ণিত।
২০৯ আহমাদ: ১৮৩২৫; নাসাঈ : ১৩০৬-১৩০৭; আম্মার ইবনু ইয়াসির এ থেকে বর্ণিত। একে সহীহ বলেছেন, ইবনু হিব্বান: ১৯৭১; হাকিম: ১৯২৩ (যাহাবি একমত); আলবানি, তাখরিজুন নাসাঈ; এবং আরনাউত।
২১০ অনুরূপ খাত্তাবি, শানুদ দু'আ: পৃষ্ঠা ১৩২
২১১ বুখারি: ১৪৬৯-৬৪৭০; মুসলিম: ১০৫৩; আবু সাইদ আল-খুদরি থেকে বর্ণিত।
২১২ তালিক বর্ণনা হিসেবে বুখারিতে উল্লেখিত। ইবনু হাজার, ফাতহ: খণ্ড ১১, ৩০৯ পৃষ্ঠায় বলেন, “আহমাদ: কিতাবুয যুহদ (১১৭)-তে এর পূর্ণাঙ্গ সূত্র উল্লেখ করেন মুজাহিদ পর্যন্ত, যিনি বলেন, "উমার বলেছেন..." এবং এটি সহীহ। এটি আরও উল্লেখ করেছেন ইবনুল মুবারাক, আয-যুহদ: ৬৩০ এবং ওয়াকি, আয-যুহদ: ১৯৮ এ।
১০ ইবনু আবু শাইবাহ, আল-ঈমান: ১৩০; ওয়াকি: ১৯৯; বায়হাকি, শুয়াব : ৪০; আবু নুয়াইম: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৭৫-৭৬; সুয়ুতি, আল-জামি: ৫১৩৬ পৃষ্ঠায় একে যঈফ বলেছেন।
২৬৪ সূরাহ আল-বাকারাহ, ২: ১৭৭
২১৫ সূরাহ আয-যুমার, ৩৯: ১০
২১৬ সূরাহ আত-তূর, ৫২: ৪৮
২১৭ সূরাহ ইউসুফ, ১২:৮৩
১১৮ অনুরূপ, তাবারি; ধৈর্য বিষয়ে ইবনুল কাইয়্যিমের বিস্তারিত আলোচনা দেখুন পরিশিষ্ট দুইয়ে।
১৯ বুখারি: ৬৪৫২; আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।
২২০ যাহাবির মতে এটি বলেছেন সুরাইহ আল-কাদি, সিয়ার: খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১০৫
২২১ মুসলিম: ২৮০৭; আনাস থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “জেনে রেখো, তুমি যা অপছন্দ করো তা ধৈর্যের মাধ্যমে সহ্য করার মধ্যে রয়েছে মহাকল্যাণ।” গুফরাহর আযাদকৃত দাস উমারের বর্ণনায় ইবনে আব্বাস থেকে অতিরিক্ত বাক্য রয়েছে,
“তুমি যদি ইয়াকীনপূর্ণ অবস্থায় সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহর জন্য আমল করতে পারো, তবে তা করো। আর যদি তা না পারো, তাহলে জেনে রেখো, তুমি যা অপছন্দ করো তা ধৈর্যের মাধ্যমে সহ্য করার মধ্যে রয়েছে মহাকল্যাণ।”১৭৯
এখানে ইয়াকীন অর্থ হলো তাকদীরের উপর ঈমান রাখা। তাঁর ছেলে আলি বিন আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস তাঁর পিতার সূত্রে যে বর্ণনা করেছেন, তাতে স্পষ্ট করে এ অর্থের উল্লেখ আছে। এতে অতিরিক্ত শব্দ রয়েছে, “আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমি কীভাবে ইয়াকীনের সাথে কাজ করতে পারি?' তিনি বললেন, 'তুমি জানবে যে, যা তোমার উপর আপতিত হয়েছে তা হওয়ারই ছিল, আর যা আপতিত হয়নি তা কিছুতেই হওয়ার ছিল না।” তবে এ বর্ণনার সনদ দুর্বল।
তাকদীরের প্রতি ইয়াকীন যখন অন্তরে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়ে যাবে, তখন এর আবশ্যক ফলাফলস্বরূপ অন্তর থাকবে ধীরস্থির ও শান্ত। এই অর্থই প্রকাশ পেয়েছে এই আয়াতে :
“পৃথিবীতে অথবা তোমাদের নিজেদের উপর এমন কোনো বিপদ আসে না, যা আমি সংঘটিত করার পূর্বে কিতাবে লিপিবদ্ধ রাখিনি। এটি (করা) আল্লাহর জন্য খুবই সহজ। এটা এ জন্য যে, তোমাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য তোমরা যেন হতাশাগ্রস্ত না হও। আর তোমাদের যা দান করা হয়েছে, তার জন্য তোমরা যেন উৎফুল্ল না হও। কেননা, আল্লাহ অহংকারী ও অধিক গর্বকারীকে পছন্দ করেন না।”১৮০
এই আয়াতের তাফসীরে দাহহাক বলেন, “তিনি তাদের মনোবল দৃঢ় করলেন, যাতে 'তোমাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য তোমরা যেন হতাশাগ্রস্ত না হও। অতএব দুনিয়াবি জিনিসের জন্য দুঃখ কোরো না। কারণ, আমি তা তোমার জন্য নির্ধারণই করিনি।' আর 'তোমাদের যা দান করা হয়েছে, তার জন্য তোমরা যেন উৎফুল্ল না হও। সেসব দুনিয়াবি জিনিসের জন্য অহংকারী হবে না যা তোমাদের দেওয়া হয়েছে, কারণ তা কখনোই আটকে রাখার ছিল না।” বর্ণনাটি ইবনু আবিদ্দুনিয়া-এর সূত্রে এসেছে।
সাইদ ইবনু যুবাইর এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ""তোমাদের যা দান করা হয়েছে' অর্থাৎ দুনিয়াবি প্রাচুর্য। কারণ, তুমি তো জানোই তোমার সৃষ্টির আগে থেকেই এটি নির্ধারিত ছিল।” ইবনু আবি হাতিম এটি বর্ণনা করেছেন।
এর আলোকেই একজন সালাফ বলেছিলেন, “তাকদীরের প্রতি ঈমান দুশ্চিন্তা ও হতাশা দূর করে দেয়।” নবীজি এ দিকে ইঙ্গিত দিয়েছেন এই হাদীসের মাধ্যমে :
"যা কিছু তোমার উপকার করবে, তা কামনা করো এবং আল্লাহর সাহায্য চাও। আর নিরাশ হোয়ো না। কোনো বিপদ ঘটলে বলবে না, 'ইশ! আমি যদি অমুক কাজটা না করতাম!' বরং বলো, 'আল্লাহ তা নির্ধারণ করেছেন। তিনি যা চেয়েছেন, তা-ই করেছেন।' 'যদি' শয়তানের কুমন্ত্রণার দুয়ার খুলে দেয়।”১৮১
অর্থাৎ, বিপদের সময় মানুষ যদি তাকদীরের প্রতি ঈমানের কথা স্মরণ করে, তাহলে শয়তানের ওয়াসওয়াসার মাধ্যমে আর দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।
আনাস বলেন, "আমি দশ বছর নবীজি -এর খেদমত করেছি। কখনো তিনি আমাকে বলেননি, 'এটা কেন করলে?' 'ওটা করলে না কেন?”১৮২ তিনি বলেন, “তাঁর পরিবারের কেউ যদি আমাকে বকা দিত, তিনি বলতেন, 'বাদ দাও। কোনো কিছু তাকদীরে থাকলে তা হবেই।” অতিরিক্ত শব্দসহ হাদীসটি ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন। ১৮৩
ত্রুটিপূর্ণ এক সনদে ইবনু আবিদ্দুনিয়া থেকে বর্ণিত হয়েছে, আয়িশা বলেন, “নবীজি ঘরে ফিরলে সবচেয়ে বেশি যে কথাটি বলতেন তা হলো, 'আল্লাহ যা কিছু বিষয় নির্ধারিত রেখেছেন তা ঘটবেই।” এ ছাড়া আরেকটি মুরসাল বর্ণনায় আছে, নবীজি ইবনু মাসউদ-কে বলেন,
"বেশি দুশ্চিন্তা করবে না। আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন, তা ঘটবেই। যে রিযক তোমার জন্য আছে, তা আসবেই।”১৮৪ আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেন, “লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ১৮৫ (বলা) হলো নিরানব্বইটি রোগের আরোগ্য, যার সবচেয়ে কমটি হলো দুশ্চিন্তা।”১৮৬
এই কথার বাস্তবায়নের আবশ্যক ফলাফল হলো আল্লাহর কাছে সকল বিষয় ন্যস্ত করে এই বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ না চাইলে কোনো কিছুই ঘটবে না। এর উপর ঈমান দুশ্চিন্তা ও হতাশা দূর করে দেয়। নবীজি এক ব্যক্তিকে উপদেশ দিয়ে বলেন,
“আল্লাহ তোমার জন্য নির্ধারণ করে রেখেছেন এমন কোনো কিছুর জন্য আল্লাহকে গালিগালাজ করবে না।”১৮৭
বান্দা যখন আল্লাহর তাকদীরের মাধ্যমে তাঁর হিকমাহ ও রহমতের বিষয়টি বুঝতে পারে, সে বুঝতে পারে যে, তাকদীরের জন্য আল্লাহকে তিরস্কার করা সমীচীন নয়। সে আল্লাহর নির্ধারিত বিষয়ে সন্তুষ্টি বোধ করবে। আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা বলেন:
"আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদ আসে না। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, আল্লাহ তার অন্তরকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন..."১৮৮
এর তাফসীরে আলকামাহ বলেন, "মানুষের উপর আসা বিপদের কথা এখানে বলা হচ্ছে। কিন্তু সে জানে যে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে। তাই সে তা মেনে নেয় এবং সন্তুষ্ট থাকে।”
এক সহীহ হাদীসে আছে,
"আল্লাহ মুমিনের জন্য যা-ই নির্ধারণ করেন, তা তার জন্য কল্যাণকর। সে যদি ভালো অবস্থায় থাকে, তাহলে সে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে এবং তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি খারাপ অবস্থায় পড়ে, তাহলে সে ধৈর্যধারণ করে এবং তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। কেবল মুমিনের জন্যই এ বিষয়টি সত্য。”১৮৯
"বলে দাও, 'আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারণ করেছেন তা ছাড়া অন্য কিছুই আমাদের ঘটবে না, তিনিই আমাদের রক্ষক, আর আল্লাহর উপরই মুমিনদের ভরসা করা উচিত।' বলো, 'তোমরা আমাদের জন্য যে জিনিসের অপেক্ষা করছ, তা দুটো ভালোর একটি ছাড়া আর কিছুই না...'”১৯০
এখানে আল্লাহ আমাদের জানাচ্ছেন যে, তাঁর নির্ধারিত বিষয় ছাড়া মুমিনদের আর কিছুই হবে না। এ থেকে বোঝা যায় সেই বিষয়টি সহজ বা কঠিন যা-ই হোক, একই কথা। তারপর তিনি জানাচ্ছেন যে, তিনি তাদের রক্ষক। তাঁকে যারা রক্ষক হিসেবে গ্রহণ করেছে, তাদের তিনি ছেড়ে যাবেন না। নিশ্চয়ই তিনি তাদের কল্যাণ করার দায়িত্ব নেবেন:
“জেনে রেখো, আল্লাহই তোমাদের অভিভাবক, কতই-না উত্তম অভিভাবক! কতই-না উত্তম সাহায্যকারী! ১৯১
“তোমরা আমাদের জন্য যে জিনিসের অপেক্ষা করছ, তা দুটো ভালোর একটি ছাড়া আর কিছুই না... "১৯২
তিরমিযিতে আনাস থেকে বর্ণিত আছে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
“আল্লাহ যখন কোনো জাতিকে ভালোবাসেন, তখন তাদের পরীক্ষায় ফেলেন। যে কেউ সন্তুষ্ট থাকে, সে সন্তুষ্টি লাভ করবে। আর যে কেউ অসন্তুষ্ট হয়, সে অসন্তুষ্টি লাভ করবে।”১৯৩
আবুদ্দারদা (রাঃ) বলেন, “আল্লাহ কোনো কিছু নির্ধারণ করলে বান্দা এর প্রতি সন্তুষ্ট থাকলে আল্লাহ খুশি হন।” উন্মুদ্দারদা (রাঃ) বলেন, “যারা আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরের ব্যাপারে সন্তুষ্ট, তারাই সত্যিকারের প্রশান্তচিত্ত। কিয়ামাতের দিন তারা জান্নাতে এমন স্থান লাভ করবে, যা দেখে শহীদরাও হিংসা করবেন।”
ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন, “আল্লাহ তাঁর ন্যায়বিচার ও জ্ঞানের মাধ্যমে ইয়াকীন ও সন্তুষ্টির মাঝেই আনন্দ রেখেছেন। আর সংশয় ও অসন্তুষ্টির মাঝে রেখেছেন দুশ্চিন্তা আর অস্থিরতা।” নবীজি (ﷺ)-এর একটি হাদীস হিসেবেও কথাটি বর্ণিত আছে, তবে তার সনদ দুর্বল।
উমার বিন আব্দুল আযিয (রাঃ) বলতেন, “এই দু’আগুলো আমার জন্য আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার নির্ধারিত তাকদীরের প্রতি আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কোনো প্রয়োজনই বাকি রাখেনি।” তিনি এই দু’আগুলো খুব বেশি বেশি করতেন, “হে আল্লাহ, আমাকে আপনার তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট রাখুন। আমাকে আপনার তাকদীরে এত বারাকাহ দিন, যাতে আমি এমন বিষয়ে বিলম্ব কামনা না করি, যা আপনি দ্রুত দেবেন এবং যা বিলম্বে দেবেন তাতে তাড়াহুড়া না করি।”১৯৪
ইবনু আওন (রাঃ) বলেন,
"স্বাচ্ছন্দ্য ও কাঠিন্য উভয় অবস্থায় আল্লাহর তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকো। এতে তোমার অস্থিরতা কমবে এবং আখিরাতের জন্য লাভজনক হবে। জেনে রেখো, বান্দা ততক্ষণ সত্যিকারের সন্তুষ্টি লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তার দরিদ্র অবস্থার সন্তুষ্টি সচ্ছলতার অবস্থার সন্তুষ্টির সমান হচ্ছে। আল্লাহর ইচ্ছেকে নিজের কামনা-বাসনার বিপরীত দেখতে পেয়ে কী করে তুমি অসন্তুষ্ট হতে পারো? অথচ তুমি আল্লাহকে তোমার অবস্থার দেখভাল করার অনুরোধ করেছ। এমনটা হতেই পারে যে, তোমার ইচ্ছামতো সবকিছু হলে তুমি ধ্বংস হয়ে যেতে। অথচ আল্লাহর নির্ধারিত বিষয় তোমার ইচ্ছের সাথে মিললে তুমি খুশি হয়ে ওঠো। উভয় অবস্থার কারণ হলো গায়েবের ব্যাপারে তোমার নিতান্ত অজ্ঞতা। এই অবস্থা নিয়ে
বিচারদিবসে যাওয়ার সাহস হয় কী করে! তুমি নিজের প্রতি সদ্ব্যবহার করোনি, সন্তুষ্টির সঠিক মাত্রায়ও পৌঁছতে পারোনি।”
চমৎকার কিছু কথা। এর অর্থ হলো যে, বান্দা যখন আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার কাছে কোনো বিষয়ে ফায়সালা করে দেওয়ার দু'আ (ইস্তিখারা) করে, তখন আল্লাহ যে সিদ্ধান্তই দিন তাতে তার সন্তুষ্ট থাকতে হবে-পছন্দ হোক বা না হোক। কারণ, সে তো জানেই না কোন অবস্থায় তার কল্যাণ রয়েছে। আর আল্লাহ যা নির্ধারণ করেন, তার জন্য তিনি তিরস্কারযোগ্য নন। আল্লাহ যা নির্ধারণ করবেন, এতে সন্তুষ্ট হওয়ার মতো মনোবল নেই, এমন মানুষদের এ কারণেই ইস্তিখারার দু'আয় 'সকল কল্যাণকর অবস্থায়' কথাটি যোগ করার পরামর্শ দিতেন ইবনে মাসউদ১৯৫ সহ কিছু সালাফ। অন্যথায় সে এমন ফিতনায় পতিত হতে পারে, যাতে সে উত্তীর্ণ হতে পারবে না। এ কথাটি নবীজি -এর হাদীস হিসেবেও বর্ণিত হয়েছে। তবে তার সনদ দুর্বল। ১৯৬
সাদ থেকে বর্ণিত, রাসূল বলেন, "বান্দার সৌভাগ্য হলো আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার কাছে সিদ্ধান্ত চাওয়ার পর তাঁর প্রদান করা সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকতে পারা। আর বান্দার দুর্ভাগ্য হলো আল্লাহর সিদ্ধান্ত চাওয়া পরিত্যাগ করা আর তিনি যা নির্ধারণ করেন, তাতে অসন্তুষ্ট হওয়া।” হাদীসটি তিরমিযি ও অন্যান্য কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। ১৯৭
তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্টি অর্জনের অনেক উপায় আছে:
১. আল্লাহর প্রতি বান্দার দৃঢ় ইয়াকীন থাকা যে, তিনি মুমিনের জন্য যা নির্ধারণ করেন তা-ই কল্যাণকর। সে যেন দক্ষ ডাক্তারের কাছে নিজেকে সমর্পণ করা রোগী। ডাক্তারের পথ্য তার ব্যথার উদ্রেক করুক বা না করুক, সে সন্তুষ্টই থাকবে। কারণ, সে জানে যে, ডাক্তার তাকে সর্বাধিক কল্যাণকর পথ্যই দিচ্ছেন। ইবনে আওল তাঁর উক্তিতে এর কথাই বলেছেন।
২. সন্তুষ্টির বিনিময়ে আল্লাহ যে প্রতিদান দেওয়ার ওয়াদা করেছেন, তা স্মরণ করা। বান্দা এটি নিয়ে চিন্তায় এমনই মগ্ন হয়ে যেতে পারে যে, বাকি সব ব্যথা সে
ভুলেই যাবে। সালাফদের মধ্যে একজন নারী পড়ে যান, এতে তাঁর পায়ের নখ ভেঙে যায়। তিনি হেসে উঠে বলেন, “তাঁর কাছে এর যে প্রতিদান তা ভেবে আমি ব্যথার তিক্ততা ভুলে গেছি।”
৩. যেই সত্তা বিপদ পাঠান, তাঁর ভালোবাসায় নিজেকে মগ্ন করে ফেলা। তাঁর অসীম প্রাচুর্য, মহত্ত্ব, সৌন্দর্য, ত্রুটিহীনতা নিয়ে চিন্তা করা। এমন সচেতনতার ফলে এমন অবস্থা সৃষ্টি হবে যে, ইউসুফ (আঃ)-কে দেখে মিসরের নারীদের হাত কাটার ব্যাথা ভুলে যাওয়ার**১৮৮** মতো করেই বান্দা ব্যাথা ভুলে যাবে। পূর্বে বর্ণিত অবস্থার চেয়ে এটি আরও উচ্চতর পর্যায়।
জুনাইদ (রহঃ) বলেন তিনি সিররি (রহঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, প্রেমিক বিপদের ব্যাথা অনুভব করেন কি না। তিনি জবাব দিয়েছিলেন, “না।” এ কথার মাধ্যমে তিনি এই উচ্চতর পর্যায়ের কথা বলছেন। এ কথার আলোকেই বিপদে পতিত একদল মানুষ বলেছিলেন, “তিনি (আল্লাহ) আমাদের সঙ্গে যা করতে চান, তা-ই করুন। এমনকি তিনি যদি আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একটি একটি করে কেটে ফেলতেন, এতে তাঁর প্রতি আমাদের ভালোবাসাই কেবল বাড়ত।”
তাঁদের মধ্যে একজন বলেছেন: প্রেমের আতিশয্য যদি টুকরো টুকরো করে কাটে আমায়, আমার ভালোবাসা বৃদ্ধি ছাড়া তাতে কিছুই হতো না হায়। আমি হয়ে থাকব ভালোবাসার কাছে বন্দী, তব সন্তুষ্টির খোঁজেই পৌঁছে যাব জীবনসন্ধি।
ইবরাহীম ইবনু আদহাম (রহঃ) তাঁর সম্পত্তি, সম্পদ, সন্তান ও দাসদের ছেড়ে গিয়েছিলেন। তাওয়াফ করার সময় তিনি তাঁর পুত্রকে দেখতে পান, কিন্তু তাঁর সাথে কথা বলেননি। তিনি বলেন: সবকিছু থেকে হিজরত করেছি তোমাকে পাবার আশায় অধীনস্থদের ছাড়িয়া এসেছি তোমাকে দেখার নেশায়। তুমি আমায় টুকরো করলেও বেড়েই চলব ভালোবাসায়।
আল্লাহর এমনই একদল প্রেমিক ছিলেন ফুদাইল ও ফাতহুল মাওসিলির মতো ব্যক্তিরা। তাঁরা যদি এমন অবস্থায় ঘুমোতে যেতেন যে, রাতের খাবার খাওয়া হয়নি বা জ্বালানোর মতো কুপি পাওয়া যায়নি, তাহলে তাঁরা আনন্দে কান্না করতেন।
শীতকালে ফাতহ তাঁর পরিবারকে জড়ো করে নিজের চাদর দিয়ে তাদের ঢেকে নিয়ে বলতেন,
“(হে আল্লাহ) আপনি আমাকে ক্ষুধার্ত রেখেছেন, তাই আমি আমার পরিবারকে ক্ষুধার্ত রেখেছি। আপনি আমাকে খ্যাতিহীন করেছেন, তাই আমি আমার পরিবারকে খ্যাতিহীন করেছি। এমনটা আপনি আপনার প্রিয় বান্দাদের সাথেই করে থাকেন, আমি কি তাদের একজন? আমার কি আনন্দিত হওয়া উচিত নয়?”১৯৯
একজন সালাফ অসুস্থ ছিলেন। তাঁরা তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার কি কিছু লাগবে?” তিনি বলেন, "তাঁর (আল্লাহর) কাছে যা সবচেয়ে প্রিয়, আমার কাছেও তা-ই প্রিয়।”২০০
এর আলোকে একজন বলেছিলেন:
আপনার শান্তি মধুর, যার থেকে দূরত্বও নিকট সমধিক, আপনি আমার প্রাণেরই মতো, বরং তার চেয়ে অধিক। এটাই আমার জন্য যথেষ্ট, যাতে তুমি তুষ্ট, তাতে আমিও তুষ্ট।
আবুত্তুরাব এই চরণগুলো রচনা করেছেন :
বিভ্রান্ত হোয়ো না কেউ, প্রেমিকেরও তো চিহ্ন আছে, নির্দিষ্ট পথে উপহার পাঠায় সে প্রেমাস্পদের কাছে। রবের দেওয়া বিপদে তুষ্ট, তিনি যা করেন তায় খুশি, তাঁর দেওয়া দারিদ্র্যই প্রাচুর্য, বরং তার চেয়েও বেশি।
তাঁরা এক ব্যক্তির কাছে গেলেন, যার ছেলে জিহাদে শহীদ হয়েছে। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, "আমি পুত্রশোকে কাঁদছি না। তরবারির আঘাত পাওয়ার সময় আল্লাহর প্রতি সে কতই-না সন্তুষ্ট ছিল, তা ভেবেই কাঁদছি।”
তারা যদি মোর মৃত্যুই চায়, সেটাই হোক না তবে! আল্লাহ যা চান, সেটা না হওয়া আমি চেয়েছি কবে?
মূলকথা হলো, রাসূল ﷺ চেয়েছেন ইবনে আব্বাস যেন সামর্থ্য থাকলে সন্তুষ্ট অবস্থায় আমল করেন। যদি সামর্থ্য না থাকে, তিনি বলেন, “যদি তা না পারো, তাহলে জেনে রেখো, তুমি যা অপছন্দ করো তা ধৈর্যের মাধ্যমে সহ্য করার মধ্যে রয়েছে মহাকল্যাণ।” এ থেকে বোঝা যায়, যেসব নির্ধারিত বিষয় সহ্য করা কঠিন, তাতে পুরোপুরি সন্তুষ্ট থাকা আবশ্যক নয়, তবে অত্যন্ত উত্তম। যে সন্তুষ্ট হতে পারে না, তাকে অবশ্যই ধৈর্যশীল হতে হবে। ধৈর্য আবশ্যক। এর ফলে মহাকল্যাণ আসে। আল্লাহ তা'আলা ধৈর্যের আদেশ দিয়েছেন এবং এর জন্য বিশাল পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন,
"... আমি ধৈর্যশীলদের তাদের পুরস্কার অপরিমিতভাবে দিয়ে থাকি।”২০১
"...ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দান করো। নিশ্চয়ই যারা বিপদকালে বলে থাকে, 'আমরা আল্লাহরই, আর আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী।' এদের প্রতিই রয়েছে তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অনুগ্রহ ও করুণা। আর এরাই হিদায়াতপ্রাপ্ত।”২০২
"...সুসংবাদ দাও সেই বিনীতদের, 'আল্লাহ' নামের উল্লেখ হলেই যাদের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে, যারা তাদের বিপদে-আপদে ধৈর্যধারণ করে..."২০৩
আল-হাসান বলেন, “সন্তুষ্টির অবস্থা বিরল। তবে ধৈর্য হলো মুমিনের আশ্রয়।”২০৪ সুলাইমান আল-খাওয়াস বলেন, “ধৈর্যের মর্যাদা সন্তুষ্টির নিচে। সন্তুষ্ট ব্যক্তির অবস্থা এই যে, বিপদ আসুক বা না আসুক, সে সন্তুষ্ট। আর ধৈর্য হলো বিপদ আসার পর অবিচলভাবে তা সহ্য করা।”
সন্তুষ্টি আর ধৈর্যের মাঝে পার্থক্য আছে। ধৈর্য হলো বিপদ দেখতে পাওয়ার পর অসন্তুষ্ট হওয়া থেকে আত্মাকে লাগাম পরানো।২০৫ আর সন্তুষ্টি হলো যেকোনো অবস্থায়ই যা হচ্ছে, তা মেনে নেওয়া। সন্তুষ্টির কারণে ব্যথা কমে যায়, এমনকি একদমই শূন্য হয়ে যেতে পারে। কারণ, অন্তর তখন ইয়াকীন ও জ্ঞানের কোমল পরশ পেয়ে গেছে। ২০৬
উমার বিন আব্দুল আযীয, ফুদাইল, আবু সুলাইমান, ইবনুল মুবারাকসহ অনেক সালাফ তাই বলতেন, “সন্তুষ্ট ব্যক্তি বর্তমানে যেই অবস্থায় আছে, সেটা ছাড়া আর অন্য কিছু কামনাই করে না। কিন্তু ধৈর্যশীল ব্যক্তি (অবস্থার পরিবর্তন) কামনা করে।” অনেক সাহাবাগণের থেকেও এ রকম সন্তুষ্টির অবস্থার বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন: উমার , ইবনে মাসউদ প্রমুখ।
আব্দুল আযীয ইবনে আবু রুওওয়াদ বলেন, “বানী ইসরাঈলের এক আবেদ ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখানো হলো, অমুক মহিলা জান্নাতে তাঁর স্ত্রী হবে। তিনি সেই নারীর বাসায় তিন দিনের জন্য গেলেন, যাতে তিনি কী আমল করেন তা জানা যায়। কিন্তু রাতে পুরুষটি যখন সালাত পড়তেন, নারীটি ঘুমাতেন। পুরুষটি যেদিন সিয়াম রাখতেন, নারীটি খাওয়া-দাওয়া করতেন। চলে যাওয়ার সময় তিনি নারীটিকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনার কোন আমলটি আপনার কাছে সেরা মনে হয়?' নারীটি বললেন, 'আপনি আমাকে যা করতে দেখেছেন, তার চেয়ে বেশি আমি কিছুই করি না। কিন্তু আমি যখন কষ্টে থাকি, তখন স্বাচ্ছন্দ্য কামনা করি না। যখন অসুস্থ থাকি, তখন সুস্বাস্থ্য কামনা করি না। যখন ক্ষুধার্ত থাকি, তখন ভরপেট হওয়া কামনা করি না। যখন রোদে থাকি, তখন ছায়া কামনা করি না।' লোকটি বললেন, 'আল্লাহর কসম! এই গুণ তো বান্দাদের আয়ত্তের বাইরে।”২০৭
বিপদের প্রথম আঘাতেই ধৈর্যধারণ করতে হয় বলে নবীজির সহীহ হাদীসে এসেছে।২০৮ আর বিপদ ভোগ করতে থাকা অবস্থায় সন্তুষ্টি প্রদর্শন করতে হয়। যেমনটি নবীজি ﷺ দু'আ করতেন, “তাকদীরের লিখন সংঘটিত হয়ে যাবার পর আমি আপনার নিকট সন্তুষ্ট থাকার সামর্থ্য চাই।”২০৯ কারণ, বিপদ আসার আগে বান্দা সহজেই সন্তুষ্ট থাকতে পারে। কিন্তু বিপদ আসার পর তার অবস্থা একদম বিপরীত হয়ে যেতে পারে। নির্ধারিত বিপদ চলে আসার পর যে সন্তুষ্টি প্রদর্শন করে, সে-ই সত্যিকারের সন্তুষ্ট। ২১০
সারকথা হলো, ধৈর্যধারণ আবশ্যক। ধৈর্যের সীমানার বাইরেই থাকে অসন্তুষ্টি। যে কেউ আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরের ব্যাপারে অসন্তুষ্ট, তার পরিণাম হবে আল্লাহর অসন্তুষ্টি। তার উপর তার নিজের অসন্তুষ্টির চেয়ে বেশি হবে বিপদের স্বাদ আর শত্রুদের পক্ষ থেকে আসা ক্ষতি। একজন সালাফ বলেছেন:
কোনো দুর্ঘটনায় হোয়ো না হতাশ শত্রুকে ধরতে দিয়ো না তোমার রাশ ধৈর্যের মাধ্যমেই দেখতে পাবে আশ, দৃঢ়পদ থাকো যখন শত্রু-সঙ্গে হয় নিবাস।
নবীজি বলেন, “যে নিজের মাঝে ধৈর্য স্থাপন করে, আল্লাহ তাকে ধৈর্য দান করেন। ধৈর্যের চেয়ে বড় ও ব্যাপক উপহার আর কাউকে কখনো দেওয়া হয়নি।” ২১১
উমার বলেন, "আমাদের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সময় ছিল ধৈর্যধারণের দিনগুলো।” ২১২ আলি বলেন, "ঈমানের সাথে ধৈর্যের সম্পর্ক দেহের সাথে মাথার সম্পর্কের মতো। যার ধৈর্য নেই, তার ঈমানই নেই।” ১১৩
আল-হাসান বলেন, “ধৈর্য হলো জান্নাতি এক নিয়ামাত। আল্লাহ কেবল সম্মানিতদেরই তা দান করেন।” মায়মুন ইবনু মিহরান বলেন, “নবী বা অন্য কেউই কখনো ধৈর্যধারণ না করে কোনো কল্যাণ লাভ করতে পারেননি।” ইবরাহীম আত-তাইমী বলেন, “আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার উপর ঈমানের পর বান্দাকে সবচেয়ে বড় যে নিয়ামাত আল্লাহ দিয়েছেন, তা হলো ক্ষতির সময় ধৈর্য, পরীক্ষার সময় ধৈর্য, বিপদের সময় ধৈর্য।” তিনি এ কথা বলেছেন এই আয়াতের ভিত্তিতে :
"বরং কল্যাণ আছে এতে যে, কোনো ব্যক্তি ঈমান আনবে আল্লাহ, শেষ দিবস, ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ ও নবীগণের উপর এবং আল্লাহর ভালোবাসার্থে ধন-সম্পদ আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম-মিসকীন, মুসাফির ও যাজ্ঞাকারীদের এবং দাসত্বজীবন হতে নিষ্কৃতি দিতে দান করবে এবং সালাত কায়েম করবে ও যাকাত প্রদান করবে, প্রতিশ্রুতি দানের পর স্বীয় প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবে এবং অভাবে, দুঃখ-ক্লেশে ও সংকটে ধৈর্যধারণ করবে। এ লোকেরাই সত্যপরায়ণ আর এ লোকেরাই তাকওয়াবান।” ২১৪
উমার বিন আব্দুল আযীয বলেন,
“আল্লাহ যদি কাউকে কোনো নিয়ামাত দিয়ে তা ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে তার বদলে শুধু ধৈর্য দান করেন, তাহলে যা দেওয়া হলো তা ছিনিয়ে নেওয়া বস্তুর চেয়ে উত্তম।” তারপর তিনি তিলাওয়াত করেন:
"... আমি ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান অপরিমিতভাবে দিয়ে থাকি।”২১৫
একজন সালাফের পকেটে সব সময় একটি কাগজের টুকরা থাকত। সময়ে সময়ে তিনি তা বের করে পড়তেন। তাতে লেখা ছিল,
“তুমি ধৈর্যধারণ করে তোমার প্রতিপালকের হুকুমের অপেক্ষায় থাকো, কারণ তুমি তাঁর দৃষ্টির সামনেই আছো..."২১৬
সুন্দর ধৈর্য হলো বিপদের কথা বান্দার নিজের কাছে রাখা আর কাউকে এ বিষয়ে না বলা।
"ধৈর্যই উত্তম।”২১৭
একদল সালাফ এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, এর অর্থ হলো কোনো অভিযোগ ছাড়াই ধৈর্যধারণ করা। ২১৮
আহনাফ ইবনু কায়স ؒ চল্লিশ বছর ধরে অন্ধ ছিলেন, কিন্তু তিনি এর কথা কাউকে বলেননি। আব্দুল আযীয ইবনু আবু রুওওয়াদ-এর এক চোখ বিশ বছর যাবৎ অন্ধ ছিল। তাঁর ছেলে একদিন ভালো করে দেখে বললেন, “বাবা, আপনার এক চোখ অন্ধ।” তিনি বললেন, “গত বিশ বছর ধরে আমি এ নিয়ে আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট আছি।” ইমাম আহমাদ ؒ অসুস্থ হলে তা নিয়ে কখনো কোনো অভিযোগ করতেন না। তাঁকে যখন জানানো হলো যে অসুস্থ অবস্থায় মুজাহিদ ؒ গোঙানো অপছন্দ করতেন, তখন তিনি মৃত্যু পর্যন্ত এ কাজ ত্যাগ করেন। তিনি নিজেকে বলতেন, "ধৈর্য ধরো, না হলে পস্তাতে হবে।"
এক জ্ঞানী ব্যক্তি এক রোগীর কাছে গিয়ে দেখলেন সে উহ আহ করছে। তিনি মনে করিয়ে দিলেন, “এটি (রোগ) কার দেওয়া?” তাঁদের একজন বলতেন:
শরীর তো আমার অসুস্থতায় জর্জরিত, তবু দর্শনার্থীদের কাছে রাখে লুক্কায়িত। প্রিয়তমের তাকদীরে যদি অসন্তুষ্ট হয়, তাহলে তো নফস সুবিচারকারী নয়।
ইয়াহইয়া ইবনু মুয়ায বলেন,
"তুমি যদি তোমার রবকে ভালোবাসো আর তিনি তোমার জন্য ক্ষুধা ও বস্ত্রের অভাব নির্ধারণ করেন, তোমার উপর ফরয হলো এটি সহ্য করা এবং মাখলুকদের কাছ থেকে তা লুকানো। প্রেমিক তো বিনা অভিযোগে প্রেমাস্পদের থেকে পাওয়া কষ্ট সহ্য করে। তাহলে মাখলুকের কাছে তুমি এমন জিনিস নিয়ে কেন অভিযোগ করবে, যা সে তোমাকে দেয়ইনি?"
কবি বলেন, আপনি ছাড়া সকলের কাজ আমার ঘৃণায় খণ্ডিত, আপনার হতে যা কিছু আসে তা-ই সৌন্দর্যমণ্ডিত।
নবীজি ও সাহাবাগণ ক্ষুধার তাড়নায় পেটে পাথর বাঁধতেন। ১৯
উয়াইস ময়লার স্তূপ থেকে ভাঙা হাড্ডি জড়ো করতেন আর তাঁর আশপাশে কুকুররাও তা-ই করত। একবার এক কুকুর তাঁকে দেখে ঘেউ ঘেউ করে উঠল। তিনি বললেন, “কুকুর, যে তোমার ক্ষতি করে না, তুমিও তার ক্ষতি করো না। তোমার কাছে যা আছে, তা তুমি খাও। আমার কাছে যা আছে, তা আমি খাই। আমি যদি জান্নাতে যাই, আমি তোমার চেয়ে উত্তম হব। আর আমি যদি জাহান্নামে যাই, তুমি আমার চেয়ে উত্তম হবে।”
ইবরাহীম ইবনু আদহাম গরিবদের সাথে শস্যের অঙ্কুর কুড়াতেন। যখন তিনি টের পেলেন গরিবরা তাদের সাথে তাঁর এ প্রতিযোগিতা পছন্দ করছে না, তখন তিনি ভাবলেন, “আমি কি বালখ অঞ্চলে সম্পদ ফেলে এলাম গরিবদের সাথে শস্যদানা কুড়ানোর প্রতিযোগিতা করতে?” তারপর থেকে তিনি কেবল পশুরা যেসব মাঠে চড়ত, সেখান থেকেই শস্য কুড়াতেন।”
ইমাম আহমাদ গরিবদের সাথে শস্য কুড়াতেন। সুফিয়ান আস-সাওরি মক্কায় যাওয়ার পথে একবার দুটি উটের দেখাশোনার চাকরি নিয়েছিলেন। তিনি কিছু লোকের জন্য রান্নার দায়িত্ব ছিলেন। তিনি এত বাজে রান্না করতেন যে, লোকেরা তা খেয়ে তাঁকে প্রহার করত। ফাতহুল মাওসিলি টাকার বিনিময়ে কিছু মানুষের জন্য আগুন জ্বালানোর কাজ করতেন।
ভূমি দিয়ে এলাম আমি আপনার ওয়াস্তে আমার শত্রু হিংসুকদের হস্তে।
হে রব, কতদিন পাব নেক নজর তোমার? জীবন শেষ হতে চলল, প্রয়োজন ফুরোয়নি আমার।
আরেকজন সালাফ বলেছেন: তোমার রহমতের খোঁজে সয়েছি অনেক দুঃখ-যাতনা অনেক ধৈর্য ধরেছি আমি অনেক কষ্ট-যাজ্ঞা। ছেড়ে যেয়ো না আমায় পারব না আমি তোমায় ছাড়া পারিশ্রমিক চাও যদি আমার প্রাণটি নাও সারা। তোমার সন্তুষ্টিকে আমি বেসেছি অনেক ভালো, হৃদয় আকুল, কণ্ঠ রুদ্ধ অশ্রুতে টলোমলো। আপনার প্রেমে সকল বিপদ হয়ে যায় সহ্য আমার, বিপদে যে কখনো পড়েনি তার সুখ কী আবার?
তাঁদের দৃষ্টিতে দুনিয়াবি কষ্ট হলো নিয়ামাত। তাঁদের একজন বলতেন, “সত্যিকার বিচারক তো সে-ই, যে বিপদকে দেখে নিয়ামাত হিসেবে আর স্বাচ্ছন্দ্যকে ভাবে দুর্ভাগ্য।” এক ইসরাঈলী বর্ণনায় আছে, "যদি কোনো প্রাচুর্যশালীকে আসতে দেখো, তাহলে বলো, 'কোনো এক পাপের অগ্রীম শাস্তি!' যদি কোনো দরিদ্রকে আসতে দেখো, তাহলে বলো, 'নেককারের নিদর্শন, স্বাগতম!”২২০
একজন সালাফ বলেছেন,
"আমি কোনো দুনিয়াবি বিপদে পড়লে চারবার আল্লাহর প্রশংসা করি। বিপদ এর চেয়েও খারাপ না হওয়ার কারণে, আমাকে বিপদ সহ্য করার শক্তি দেওয়ার কারণে, আমাকে 'ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' বলার শক্তি প্রদানের কারণে, আমাকে দ্বীনের ক্ষেত্রে কোনো বিপদে না ফেলার কারণে।"
ধৈর্যের মাধ্যমে মুক্তি কামনা করা ইবাদাতের একটি প্রকার। কারণ, বিপদ কখনোই চিরস্থায়ী হয় না।
ধৈর্য ধরে বিপদ সহ্য করো, হে হৃদয়। জেনো বিপদ কভু চিরস্থায়ী না হয়। ধৈর্য ধরো মহান ব্যক্তিদের মতো করেই, বিপদ তো আজকে আছে, কালকে নেই।
পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্দশাগ্রস্ত লোকটিকে জান্নাতে একটু ঢুকিয়ে আবার বের করে এনে জিজ্ঞেস করা হবে, "তুমি কি কখনো বিপদ দেখেছ? বিপদ ভোগ করেছ?” সে বলবে, “না, ইয়া রব্ব!”২২১
হে আত্মা, আর মাত্র কয়েকটা দিন, এরা তো স্বপ্নের মতো স্থায়িত্বহীন। হে আত্মা, পৃথিবী তাড়াতাড়ি পার করে দাও, আসল জীবন তো সামনে, তার দিকেই যাও।
আরেকজন বলেছেন: একটি মাত্র ঘণ্টার ব্যাপার, তারপরই তা নেই, এ সবই ক্ষণস্থায়ী, সব হারিয়ে শেষে যাবেই।

টিকাঃ
১৭৯ আবু নুয়াইম: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩১৪
১৮০ সূরাহ আল-হাদীদ, ৫৭: ২২-২৩
১৮১ মুসলিম: ২৬৬৪; আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।
১৮২ বুখারি: ২৭৬৮-৬০৩৮-৬৯১১; মুসলিম: ২৩০৯
১৮৩ আহমাদ: ১৩৪১৮; বায়হাকি, শুয়াব: ৮০৭০; বুখারি ও মুসলিমের শর্তানুযায়ী এর ইসনাদ গ্রহণযোগ্য। অনুরূপ, আরনাউত, তাখরিজ মুসনাদ।
১৮৪ বায়হাকি, শুয়াব: ১১৮৮; ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ, আল-ইসাবাহ: খণ্ড ১, ১০৪ পৃষ্ঠায় ইবনু হাজার বলেন, এর ইসনাদে আইয়‍্যাশ ইবনু আব্বাস নামক একজন যঈফ বর্ণনাকারী আছেন। আলবানি, আয-যঈফাহ: ৪৭৯৩ এ একে যঈফ বলেছেন। অনুরূপ আস-সহীহাহ: খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৪ এ তিনি উমার ও আবু যার থেকে এই হাদীসের আরও দুটি দুর্বল বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন
১৮৫ অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কারও কোনো শক্তি বা ক্ষমতা নেই।
১৮৬ তাবারানি, আল-আসওয়াত: ৫০২৮; ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহ, হাকিম : ১৯৯০ একে সহীহ বলেছেন, কিন্তু যাহাবি দেখান যে এতে বিশর নামক একজন দুর্বল বর্ণনাকারী আছেন। হায়সামি: খণ্ড ১০, ৯৮ পৃষ্ঠায় বলেন, এর ইসনাদে বিশর ইবনু রাফি আছেন, যিনি দুর্বল। ইবনুল জাওযি, আল-ইলাল: খণ্ড ২, ৩৪৮ পৃষ্ঠায় বলেন এটি সহীহ নয়। আলবানি একে যঈফ বলেছেন, যঈফ আর-তারগীব: ৯৭০-১১৪৭
১৮৭ আহমাদ: ১৭৮১৪-২২১৭; বুখারি, খালাক আফআলুল ইবাদ: ১৬৩ মুনযিরি, আত-তারগীব : খণ্ড ২, ২৫৭ পৃষ্ঠাতে দুটি বর্ণনাসূত্র উল্লেখের পর তাদের একটিকে হাসান বলেন। আলবানি, আস-সহীহাহ: ৩৩৩৪ এবং সহীহুত তারগীব : ১৩০৭ এ একে হাসান লি গাইরিহি বলেন। আরনাউত বলেন, হাদীসটি হাসান বলে পরিগণিত হওয়ার যোগ্য।
১৮৮ সূরাহ আত-তাগাবুন, ৬৪: ১১
১৮৯ মুসলিম: ২৯৯৯; সুহাইব ইবনু সিনান এ থেকে বর্ণিত।
১৯০ সূরাহ আত-তাওবাহ, ৯ : ৫১-৫২
১৯১ সূরাহ আল-আনফাল, ৮ : ৪০
১৯২ সূরাহ আর-তাওবাহ, ৯ : ৫২
১৯৩ তিরমিযি, ২৩৯৬, ইবনু মাজাহ, ৪০৩১
১৯৪ বায়হাকি, শুয়াব: ২২৭
১৯০ বায়হাকি, শুয়াব: ২০৫
১৯৬ তাবারানি, আল-কাবির: ১০০১২-১০০৫২; ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত। এটি যঈফ।
১৯৭ আহমাদ: ১৪৪৫ এবং তিরমিযি: ২১৫১; তিরমিযি একে গারীব বলেছেন, কারণ এর ইসনাদে হাম্মাদ ইবনু হুমাইদ আছেন, যিনি শক্তিশালী নন। আরনাউত এর ইসনাদকে যঈফ বলেছেন। আলবানি, আয-যঈফাহ: ১৯০৬ এ একে যঈফ বলেছেন।
১৮৮ "যখন তারা তাকে দেখল, বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল আর নিজেদের হাত কেটে ফেলল আর বলল, 'আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন। এ তো মানুষ নয়, এক সম্মানিত ফেরেশতা!” [সূরাহ ইউসুফ, ১২:৩১]
১৯৯ আবু নুয়াইম: খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ১৯২
২০০ যাহাবি, সিয়ার: খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ১৮২; ইয়াহইয়া ইবনু সাইদ আল-কাত্তানের উদ্ধৃতি দিয়ে।
২০১ সূরাহ আয-যুমার, ৩৯: ১০
২০২ সূরাহ আল-বাকারাহ, ২: ১৫৫-১৫৭
২০০ সূরাহ আল-হাজ্জ, ২২: ৩৪-৩৫
২০৪ আবু নুয়াইম: খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৪২; উমার ইবনু আব্দুল আযীয থেকে।
২০৫ সবর: বিরত থাকা ও সংযত হওয়া। রাগিব বলেন, "এটি হলো শরিয়ত ও আকল অনুযায়ী আত্মাকে বিরত রাখা।” জাহিয বলেন যে, এটি স্থিরবুদ্ধিতা ও সাহসের সমন্বয়ে গঠিত এক গুণ। মুনাউয়ি বলেন যে, এটি হলো শারিরীক ও মানসিক অসুবিধা ও ব্যথার মুখোমুখি হতে পারার ক্ষমতা। এটি হলো আত্মাকে কৃপণতা ও হতাশা থেকে বিরত রাখা, জিহ্বাকে অভিযোগ করা থেকে বিরত রাখা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে বিশৃঙ্খল হওয়া থেকে বিরত রাখা। এটি হলো সকল পরিস্থিতিতে আল্লাহর হুকুমের উপর দৃঢ় থাকা এবং সর্বোত্তম উপায়ে বিপদের মোকাবেলা করা। ইবনু হিব্বান, রওদাতুল উকালা: পৃষ্ঠা ১২৬-১২৮ এ বলেন, বুদ্ধিমানের উপর আবশ্যক হলো বিপদের আগমনের শুরুতে সবর অবলম্বন করা। আর যখন সে এতে দৃঢ় হয়ে যাবে, তখন সন্তুষ্টির (রিদ্বা) পর্যায়ে উন্নীত হওয়া। কেউ যদি সবর দ্বারা পরিপুষ্ট না হয়ে থাকে, তাহলে তার উচিত নিজের মধ্যে সবরের পরিচর্যা করা (তাসাব্বর), কারণ এটিই রিদ্বার প্রথম ধাপ। মানুষের যদি সত্যিই সবর থাকে, তাহলে সে মহান হয়ে যাবে। কারণ, এটিই সকল কল্যাণের ঝরনা আর সকল আনুগত্যের ভিত্তি... এর দিকে যাওয়ার ধাপগুলো হলো সচেতনতা (ইহতিমাম), উপলব্ধি (তায়াক্কু), পরীক্ষা-নিরীক্ষা (তাহাব্বত) এবং তাসাব্বুর। এর পরেই আসে রিদ্বা। আর এটিই আত্মিক উন্নতির শিখর... তিনটি বিষয়ে সবর প্রদর্শন করতে হয়: ১) গুনাহ থেকে সবর, ২) আল্লাহর আনুগত্যে লেগে থাকার ব্যাপারে সবর, ৩) বিপদ-আপদের মুখে সবর। অনুরূপ, ইবনুল কাইয়্যিম, মাদারিজুস সালিকীন: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৬২-১৬৫
২০৬ রিদ্বা : হতাশা ও বিরক্তির বিপরীত। জুরানি একে বলেছেন তাকদীর কার্যকর হতে দেখে হৃদয়ে আনন্দ লাভ করা। ইবনুল কাইয়্যিম, মাদারিজ: খণ্ড ২, ১৮৫ পৃষ্ঠাতে উল্লেখ করেছেন যে, এটি হলো তাকদীরের ওঠা-নামায় অন্তর প্রশান্ত রাখা এবং এই বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ এতে কল্যাণকর কিছুই রেখেছেন।
বায়হাকি, শুয়াব: ২০৯-এ উল্লেখ আছে, ইবনু মাসউদ বলেন, "রিদ্বা হলো আল্লাহর অসন্তুষ্টির বিনিময়ে মানুষকে সন্তুষ্ট না করা, আল্লাহর দেওয়া রিযকের কারণে অন্য কাউকে প্রশংসা না করা, আল্লাহ যা দেননি তার জন্য অন্য কাউকে দোষারোপ না করা। কারও ইচ্ছায় আল্লাহর রিযক আসে না, আবার কেউ ইচ্ছা না করলেই তা বন্ধ হয়ে যায় না। আল্লাহ তাঁর ন্যায়বিচার ও জ্ঞানের মাধ্যমে তিনি মুক্তি ও আনন্দ রেখেছেন ইয়াকীন ও সন্তুষ্টিতে, আর দুশ্চিন্তা ও হতাশা রেখেছেন সন্দেহ ও অসন্তুষ্টিতে।”
২০৭ এই ঘটনার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। বর্ণনাকারী একজন আবিদ, পরহেজগার, তবে সকল আলিমের মতে তিনি মুরজিয়া সম্প্রদায়ের। ইমাম আবু হাতিম বলেন, "তার বর্ণনা অগ্রহণযোগ্য।" আল্লামা ইবনুল জুনাইদ বলেন, "তিনি ভুয়া হাদীস বর্ণনা করতেন।" ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল বলেন, "তিনি মুরজিয়া ছিলেন। খুব ইবাদাত করতেন। তবে হাদীস বর্ণনায় তিনি অন্যদের মত নির্ভরযোগ্য ছিলেন না।" - শর'ঈ সম্পাদক
২০৮ বুখারি: ১২৮৩-১৩০২-৭১৫৪; মুসলিম: ৬২৬; আনাস থেকে বর্ণিত।
২০৯ আহমাদ: ১৮৩২৫; নাসাঈ : ১৩০৬-১৩০৭; আম্মার ইবনু ইয়াসির এ থেকে বর্ণিত। একে সহীহ বলেছেন, ইবনু হিব্বান: ১৯৭১; হাকিম: ১৯২৩ (যাহাবি একমত); আলবানি, তাখরিজুন নাসাঈ; এবং আরনাউত।
২১০ অনুরূপ খাত্তাবি, শানুদ দু'আ: পৃষ্ঠা ১৩২
২১১ বুখারি: ১৪৬৯-৬৪৭০; মুসলিম: ১০৫৩; আবু সাইদ আল-খুদরি থেকে বর্ণিত।
২১২ তালিক বর্ণনা হিসেবে বুখারিতে উল্লেখিত। ইবনু হাজার, ফাতহ: খণ্ড ১১, ৩০৯ পৃষ্ঠায় বলেন, “আহমাদ: কিতাবুয যুহদ (১১৭)-তে এর পূর্ণাঙ্গ সূত্র উল্লেখ করেন মুজাহিদ পর্যন্ত, যিনি বলেন, "উমার বলেছেন..." এবং এটি সহীহ। এটি আরও উল্লেখ করেছেন ইবনুল মুবারাক, আয-যুহদ: ৬৩০ এবং ওয়াকি, আয-যুহদ: ১৯৮ এ।
১০ ইবনু আবু শাইবাহ, আল-ঈমান: ১৩০; ওয়াকি: ১৯৯; বায়হাকি, শুয়াব : ৪০; আবু নুয়াইম: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৭৫-৭৬; সুয়ুতি, আল-জামি: ৫১৩৬ পৃষ্ঠায় একে যঈফ বলেছেন।
২৬৪ সূরাহ আল-বাকারাহ, ২: ১৭৭
২১৫ সূরাহ আয-যুমার, ৩৯: ১০
২১৬ সূরাহ আত-তূর, ৫২: ৪৮
২১৭ সূরাহ ইউসুফ, ১২:৮৩
১১৮ অনুরূপ, তাবারি; ধৈর্য বিষয়ে ইবনুল কাইয়্যিমের বিস্তারিত আলোচনা দেখুন পরিশিষ্ট দুইয়ে।
১৯ বুখারি: ৬৪৫২; আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।
২২০ যাহাবির মতে এটি বলেছেন সুরাইহ আল-কাদি, সিয়ার: খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১০৫
২২১ মুসলিম: ২৮০৭; আনাস থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00