📄 আল্লাহর কাছে চাওয়া
রাসূল বলেছেন, “যখন চাইবে, আল্লাহরই কাছে চাইবে।” আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা শুধু তারই কাছে দু'আ করার আদেশ করেছেন। অন্য কারও কাছে দু'আ করা নিষিদ্ধ করেছেন।
"তোমরা আল্লাহর নিকট তাঁর অনুগ্রহ কামনা করো।”১২২
তিরমিযিতে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূল বলেন,
"আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ চাও। কারণ, তাঁর কাছে চাওয়াকে আল্লাহ ভালোবাসেন।”১২২
এ ছাড়া আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূল বলেন, “আল্লাহর কাছে না চাওয়া হলে তিনি রাগান্বিত হন।”১২৩
আরেক হাদীসে আছে,
“আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন, যারা বিশুদ্ধচিত্তে ও ক্রমাগত দু'আ করতে থাকে।”১২৪
আরেক হাদীসে আছে, “তোমাদের সকলের উচিত সকল প্রয়োজনে রবের কাছেই চাওয়া, এমনকি জুতোর ফিতা ছিঁড়ে গেলেও।”১২৫
একই অর্থসম্পন্ন আরও অনেক হাদীস রয়েছে। এ ছাড়া মাখলুকের কাছে চাইতে নিষেধ করেও অনেক হাদীস রয়েছে।
ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, রাসূল ﷺ বলেন, “ধনী হওয়া সত্ত্বেও এক ব্যক্তি কেবল চাইতেই থাকবে, চাইতেই থাকবে। শেষমেশ তার চেহারা নিঃশেষ হয়ে যাবে আর আল্লাহর সামনে তার কোনো চেহারাই থাকবে না।”১২৬
রাসূল ﷺ তাঁর একদল সাহাবার কাছ থেকে শপথ গ্রহণ করেছিলেন যে, তাঁরা মানুষের কাছে কিছু চাইবেন না।১২৭ তাঁদের মাঝে আবু বকর, আবু যার ও সাওবান ছিলেন। তাঁদের চাবুক বা উটের রশি পড়ে গেলেও তাঁরা তা অন্য কাউকে তুলে দিতে ডাকতেন না।
জেনে রাখুন, যৌক্তিক ও শরয়ী উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে শুধু আল্লাহর কাছে চাওয়াটাই সমীচীন। তাঁর সৃষ্টির কাছে নয়।
কোনো কিছু চাওয়ার অর্থ হলো-যার কাছে চাওয়া হচ্ছে তার সামনে নিজের মর্যাদা উৎসর্গ করা ও নিজেকে নীচ করা। এটি শুধু আল্লাহর সাথেই প্রযোজ্য। ইবাদাত ও দু'আর মাধ্যমে শুধু আল্লাহর সামনেই অবনত হতে হয়। এটি সত্যিকার ভালোবাসারও একটি লক্ষণ।
ইউসুফ ইবনুল হুসাইন-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “প্রেমিকদের কী হলো যে, তারা নিজেদের ভালোবাসায় অবনত করে এত আনন্দ পায়?” তিনি উত্তর দেন:
ভালোবাসায় নীচতাই হলো মহান, প্রেমাস্পদের কাছে সমর্পণই সম্মান।
এই ধরনের বিনয় ও ভালোবাসা কেবল আল্লাহরই প্রাপ্য। এগুলো ইবাদাতেরই বিভিন্ন উপাদান, যা একমাত্র সত্যিকার উপাস্যের প্রাপ্য।
ইমাম আহমাদ দু'আ করার সময় বলতেন,
“হে আল্লাহ, যেভাবে আপনি আমার চেহারাকে আপনি ছাড়া অন্য কাউকে সেজদা করা থেকে হেফাজত করেছেন, তেমনিভাবে আমাকে আপনি ছাড়া অন্য কারও কাছে চাওয়া থেকে হেফাজত করুন।”
আবুল খাইর আল-আত্তা বলেন, "আমি এক বছর মক্কায় ছিলাম। আমি দারিদ্র্যক্লিষ্ট ও ক্ষুধাপীড়িত হয়ে পড়ি। যতবারই আমি ভিক্ষা করতে বের হতে নিতাম, একটা কণ্ঠ বলে উঠত, 'আমাকে সেজদাকারী চেহারাটিকে কি তুমি অন্য কারও কাছে নিবেদন করতে চললে?”
এই অর্থে একজন সালাফ বলেছিলেন: আল্লাহর কাছে একবার চেহারা সঁপেছে যে, ভিক্ষায় প্রাচুর্য এলেও ভিখারি হবে না সে। দাঁড়িপাল্লায় দু'আর সাথে ওজন করলে সবই, দু'আই হবে ভারী সবচেয়ে, বাকিরা হালকা খুবই। ভিক্ষা করেই চাও যদি-বা চেহারা করতে মলিন, তাঁরই কাছে চাও, যিনি দানশীল, দয়ালু সীমাহীন।
সহীহ বুখারি ও মুসলিমের হাদীস থেকে প্রমাণিত যে, যে ব্যক্তি প্রয়োজন ছাড়া ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করবে, কিয়ামাতের দিন তার চেহারায় এক টুকরো মাংসও থাকবে না।১৮ কারণ, দুনিয়াতে সে এই চেহারার পবিত্রতা ও মহত্ত্ব নষ্ট করেছে।
তাই কিয়ামাতের দিন আল্লাহ এই চেহারার বাহ্যিক সৌন্দর্য নষ্ট করে দিয়ে কেবল একটি কঙ্কাল বসিয়ে রাখবেন। এ ছাড়া এর অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যও আল্লাহ কেড়ে নেবেন। ফলে আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তির আর কোনো সম্মানই থাকবে না।
আল্লাহর কাছে চাওয়ার মাধ্যমে ইবাদাতের এক গূঢ় তাৎপর্যপূর্ণ রূপ প্রকাশ পায়। কারণ, এর মাধ্যমে বান্দা তার রবের কাছে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে আর তার অসহায়ত্ব দূর করতে রবের সক্ষমতার সাক্ষ্য দেয়। কোনো সৃষ্টির কাছে কিছু চাওয়া হলো যুলুম। কারণ, মাখলুক নিজের কোনো উপকার করতে পারে না, নিজেকে কোনো ক্ষতি থেকে বাঁচাতে পারে না-অন্যের লাভক্ষতি করতে পারা তো দূরের ব্যাপার। মাখলুকের কাছে চাওয়ার অর্থ হলো সক্ষম সত্তাকে সরিয়ে অক্ষম সত্তাকে সেই জায়গায় বসানো।
এর পক্ষে সমর্থন পাওয়া যায় সহীহ মুসলিমে আবু যার থেকে বর্ণিত এক হাদীসে, যেখানে রাসূল ﷺ বলেন, “হে আমার বান্দারা, যদি তোমাদের শুরু থেকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত সকল জিন ও মানুষ একত্র হয়ে আমার কাছে চায় আর আমি প্রত্যেককে তার প্রয়োজন পূরণ করে দিই, তাহলে আমার ভান্ডার থেকে ততটুকুও কমবে না যতটুকু সুচ ডুবিয়ে তুলে আনলে সাগর থেকে পানি কমে।”১২৯
তিরমিযির বর্ণনায় অতিরিক্ত অংশ আছে, “...এর কারণ, আমি দানশীল, প্রাচুর্যশালী, প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে, সুমহান। আমি যা ইচ্ছা, তা-ই করি। আমার পুরস্কার কেবল একটি শব্দ আর শাস্তিও কেবল একটি শব্দ। যখন আমি কোনো কিছু সংঘটনের ইচ্ছে করি, তখন কেবল বলি ‘হও!’ আর তা হয়ে যায়।”১৩০
তাহলে কী করে প্রাচুর্যশালীকে ত্যাগ করে একজন অভাবগ্রস্তের কাছে চাওয়া যেতে পারে? আজিব ব্যাপার!
একজন সালাফ বলেছিলেন, "আমি আল্লাহর কাছেই এই দুনিয়ার কোনো কিছু চাইতে লজ্জিত হই, যদিও তিনি এর মালিক। তাহলে আমি কী করে এমন কারও কাছে চাইতে পারি, যে এর মালিকই নয়?” অর্থাৎ, মাখলুক।
একজন সালাফ বিপদে পড়ে তাঁর এক ভাইয়ের কাছে সাহায্য চাওয়ার মনস্থির করলেন। স্বপ্নে এক ব্যক্তি দেখা দিয়ে তাঁকে বললেন,
মুক্ত ব্যক্তি সবই যখন পায় এক আল্লাহর কাছে, বান্দার দিকে মন ফেরানো তখন কি তার সাজে?
তিনি ঘুম থেকে জেগে উঠে আবিষ্কার করলেন যে, তিনি মানুষের মাঝে সবচেয়ে সন্তুষ্টচিত্তের অধিকারী।
একজন সালাফ বলেছেন, "আমি এক আসমানি কিতাবে এই কথাগুলো পড়েছি, 'আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন, বিপদের সময় আমি ছাড়া আর কারও কাছে কি আশা করা হয়? বিপদ (দেওয়া ও তুলে নেওয়ার ক্ষমতা) আমার হাতে। আমি চিরঞ্জীব, অমুখাপেক্ষী। আমি ছাড়া আর কারও কাছে আশা করা হয় কি অথবা দিনের শুরুতে কারও দরজায় কড়া নাড়া হয় কি? আমার কাছেই সকল ভান্ডারের চাবি আর আমার কাছে দু'আকারীর জন্য আমার দরজা খোলা। কে বলতে পারবে যে, কষ্টের সময় সে আমার কাছে চেয়েছে অথচ আমি তাকে নিরাশ করেছি? কে বলতে পারবে যে, বিপদের সময় সে আমার কাছে চেয়েছে অথচ আমি তাকে আশাহত করেছি? কে বলতে পারবে যে, সে আমার দরজায় কড়া নেড়েছে অথচ আমি তার জন্য দরজা খুলিনি? আমি আশার উৎস, তাহলে কী করে আশাকে আমার থেকে দূরে সরানো যায়? আমি কি গরিব যে বান্দা আমাকে কৃপণ হিসেবে পাবে? দুনিয়া, আখিরাত, দয়া, মায়া-সবই কি আমার কাছে নয়? আশান্বিতদের কিসে বাধা দেয় আমার প্রতি আশা করা থেকে? আমি যদি আসমান-জমিনের সকলকে একত্র করে প্রত্যেককে তা দিই-যা আমি সবাইকে একসাথে দিই-যদি আমি প্রত্যেকের আশা পূরণ করি, তাহলে আমার রাজত্ব থেকে অণু পরিমাণও কমবে না। এমন রাজত্ব কী করে কমতে পারে, যার ধারক আমি? ধ্বংস তাদের, যারা আমার দয়া থেকে নিরাশ হয়। ধ্বংস তাদের, যারা আমাকে অমান্য করে ও আমার নিষেধ করা সীমানায় পা বাড়ায়।”
আল্লাহর কাছে চাওয়াকে তিনি ভালোবাসেন আর তাঁর কাছে না চাইলে তিনি রাগান্বিত হন। তিনি চান তাঁর বান্দারা তাঁর কাছে কামনা করুক, চেয়ে নিক, তাঁকে ডাকুক, তাঁর প্রতি নিজেদের প্রয়োজন প্রকাশ করুক। তিনি তাদের ভালোবাসেন, যারা বিশুদ্ধচিত্তে ও ক্রমাগত দু'আ করে। মাখলুকের কাছে চাওয়া হলে সে রেগে যায়, কারণ সে অভাবগ্রস্ত ও অসমর্থ।
ইবনুস সাম্মাক বলেন, "এমন কারও কাছে চেয়ো না, যে তোমার অনুরোধ না শুনে তোমার কাছ থেকে দৌড়ে পালাবে। বরং তাঁর কাছে যাও, যিনি তাঁর কাছে চাইতে আদেশ করেছেন।”
আবুল আতাহিয়্যাহ বলেন,
আল্লাহ রাগান্বিত হন তাঁর কাছে না চাইলে, বনী আদম রেগে যায় তার কাছে চাইলে। আল্লাহর দিকেই ফেরাও তোমার যত দু'আ, কারণ, তাঁর দিকেই আমাদের চূড়ান্ত যাওয়া।
ইয়াহইয়া ইবনু মুয়ায বলতেন, “হে সেই সত্তা, যার কাছে না চাইলে রাগান্বিত হন! কেউ আপনার কাছে চাইলে তাকে যেন ফিরিয়ে দেবেন না।”
আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের বলছেন তাঁর কাছে চাইতে। প্রতি রাতে তিনি ডাকেন, "কেউ কি আছে যে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব? কেউ কি আছে যে আমাকে ডাকবে, আমি তাতে সাড়া দেবো?”১৩১
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"আমার বান্দারা যখন তোমাকে আমার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে, আমি তো নিকটেই। আমি আহ্বানকারীর আহ্বানে সাড়া দিই, যখন সে আমাকে আহ্বান করে।”১৩২
বান্দা যে সময়েই তাঁকে ডাকুক না কেন, আল্লাহ শোনেন, নিকটে থাকেন, জবাব দেন। দুজনের মাঝে কোনো পর্দা থাকে না, দরজায় কোনো দারোগা থাকে না। কোনো মাখলুকের কাছে চাওয়া হলে বেশির ভাগ সময় সাথে সাথেই প্রাচীর উঁচু হয়ে ওঠে, দরজা বন্ধ হতে শুরু করে, আর সব রকমের বাধা দেখা দিতে শুরু করে।
আতা -কে তাউস বলেন, "এমন কারও কাছে কিছু চাওয়া থেকে সাবধান থাকো, যে তোমার মুখের উপর দরজা আটকে দেবে আর বাধা খাড়া করে দেবে। বরং এমন কারও কাছে যাও, যার দরজা কিয়ামাত পর্যন্ত খোলা, যিনি তোমাকে আদেশ করেছেন তাঁর কাছে চাইতে এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জবাব দেওয়ার।”১৩৩
একজন আলেমের উদ্দেশ্যে ওয়াহব বিন মুনাব্বিহ বলেছেন,
“আমার কাছে কি এই খবর পৌঁছেনি যে, আপনি রাজা ও রাজপুত্রদের কাছে ঘুরে বেড়ান আপনার জ্ঞান (বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে) নিয়ে? ধিক আপনাকে! আপনি এমন কারও কাছে যাচ্ছেন, যে আপনার মুখের উপর দরজা আটকে দেবে, নিজের বিত্তশালিতা গোপন করে গরিব সাজবে। অথচ আপনি তাকে ছেড়ে দিচ্ছেন, যার দরজা দিনে-রাতে খোলা থাকে আর তিনি তাঁর বিত্তশালিতা দেখিয়ে বলেন, 'আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেবো।"
একন শাসকের দুয়ারে কয়েকজন লোককে জড়ো হতে দেখে মায়মুন ইবনু মিহরান বলেছিলেন,
"সুলতানের মাধ্যমে যার প্রয়োজন পূরণ হয় না, সে জেনে রাখুক আর- রহমানের দরবারগুলো সব সময় খোলা। মাসজিদে গিয়ে দুই রাকআত সালাত পড়ে নিজের প্রয়োজনগুলো তাঁর কাছেই ব্যক্ত করো।”
বাকর আল-মুযানি বলতেন, “হে আদমসন্তান, তোমার মতো আর কে আছে? তুমি যখনই চাও, তখনই পবিত্রতা অর্জন করে গোপনে তোমার প্রতিপালকের সাথে আলোচনা করতে পারো মাঝখানে কোনো পর্দা বা দোভাষী ছাড়াই।”
এক সৎকর্মশীল ব্যক্তিকে আরেক ব্যক্তি এসে অনুরোধ করল কোনো একজনের কাছে তার ব্যাপারে সুপারিশ করার জন্য। তিনি জবাব দিলেন, “খোলা দরজা ফেলে আমি বন্ধ দরজার দিকে কখনোই যাব না।”
এ প্রসঙ্গে একজন সালাফ বলেছেন: রাজার দুয়ার বন্ধ সকল, আল্লাহর দুয়ার অনর্গল।
আরেকজন বলেছেন: যাচকের থেকে পালিয়ে বেড়ানো প্রহরী ঘেরা ব্যক্তিরা, শোনো! আল্লাহর দুয়ারে প্রহরী নেই কোনো।
এক আলিমের উদ্দেশ্যে আরেকজন বলেছেন: ঢুকতে দেবে না যে, বসতে হয় না তার দুয়ারে, অথচ তুমি প্রয়োজন মেটাতে ডাকছ উহারে।
বাদ দাও তারে, চাও তার প্রতিপালকের কাছে, পূরণ হয়ে যাবে তোমার যত প্রয়োজন আছে।
ইবনু আবিদদুনিয়া৩০৮ আৰু উবাইদাহ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ থেকে হাদীস বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি নবিজি ﷺ-এর কাছে এসে বলল, “হে আল্লাহর রাসূল, অমুক গোত্র আমাকে আক্রমণ করে আমার সন্তান ও উট নিয়ে গেছে।” নবিজি ﷺ জবাব দিলেন, “মুহাম্মদের পরিবার এ রকম এ রকম জায়গায় থাকে, তাদের কাছে এক মুদ্দ বা সা (পরিমাপে দুটি একক) পরিমাণ খাবারও থাকে না। অতএব, আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার কাছে চাও।” লোকটি ফিরে গেলে তার স্ত্রী জিজ্ঞাসা করল, “তিনি কী বলেছেন।” সে তা শোনালে স্ত্রী বলল, “কতই-না উত্তম জবাব!” অল্প কিছুদিন পরেই আল্লাহ তার সন্তান ও উট তার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি আরও এত পরিমাণ উট দিলেন, যা তার আগে ছিলই না। সে নবিজি ﷺ-এর কাছে ফিরে এসে সব ঘটনা খুলে বলল। নবিজি ﷺ মিম্বরে উঠে আল্লাহর প্রশংসা করলেন। তারপর লোকদের আদেশ দিলেন আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার কাছে চাইতে ও তাঁরই উপর আশা রাখতে। তিনি তিলাওয়াত করলেন :
“যে তাকওয়া অবলম্বন করে, তিনি তার জন্য পথ করে দেবেন এবং তাকে তাঁর কল্পনাতীত উৎস থেকে রিযক দেবেন।”৩০৯
সাবিত আল-বুনানিকে এক ব্যক্তি অনুরোধ করলেন তার হয়ে কাফির কাছে সুপারিশ করতে যাতে তার কিছু প্রয়োজন পূরণ করে দেওয়া হয়। সাবিত তাঁর সাথে চললেন। পথে যত মাসজিদ পড়ল প্রতিটিতে ঢুকে তিনি সালাত পড়লেন ও দু’আ করলেন। তাঁরা আদালতে যখন পৌঁছলেন ততক্ষণে লোকটি সাবিতকে এ জন্য দোয়া-খারাপ করতে লাগল। তিনি জবাবে বললেন, “এই পুরোটা সময় আমি তোমার অনুরোধের জবাব দিচ্ছিলাম।” পরে কাফির সাথে দেখা করা ছাড়াই আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করে দিলেন।
ইসহাক ইবনু উকবাদ আল-বাসরি ইউমাচ্ছিলেন। স্বপ্নে এক লোককে তিনি বলতে দেখলেন, “অতি দৃষ্টিতাপ্রবণকে উদ্ধার করো!” তিনি জেগে উঠে বললেন, “প্রতিবেশীদের মাঝে কি কোনো অভাবগ্রস্ত আছে?” লোকেরা জবাব দিলো, “আমরা জানি না।” তিনি ঘুমিয়ে পড়লে দ্বিতীয়বারও একই স্বপ্ন দেখলেন। তৃতীয়বারে স্বপ্নের সেই ব্যক্তিটি বলল, “তুমি তার প্রয়োজন পূরণ না করে।
ঘুমাচ্ছ?” তিনি জেগে উঠে তিন শ দিরহাম সাথে নিয়ে খচ্চরে চড়ে বসরায় রওনা হলেন। তিনি সেখানে মাসজিদে থামলেন। সেখানে জানাযার সালাত হচ্ছিল। সেখানে তিনি এক ব্যক্তিকে সালাতরত দেখলেন। তাঁর উপস্থিতি টের পেয়ে সে সালাত শেষ করে তাঁর কাছে এল। ইসহাক বললেন, “হে আল্লাহর বান্দা, এই সময়ে তুমি মাসজিদে কী করছ?” সে বলল, "আমার মাত্র এক শ দিরহাম ছিল, যা আমি হারিয়ে ফেলেছি। এ ছাড়া আমার দুই শ দিরহাম দেনা আছে।” ইসহাক তাঁর টাকা বের করে বললেন, “এখানে তিন শ দিরহাম আছে। এটা নাও।” সে সেটা নিলে ইসহাক জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কি আমাকে চেনো?” সে বলল, "না।” তিনি বললেন, “আমার নাম ইসহাক ইবনে উব্বাদ। আমি অমুক জায়গায় থাকি। তোমার কিছু লাগলে আমার কাছে এসো।” সে জবাব দিলো, “আল্লাহ আপনাকে রহম করুন। আমার কিছু লাগলে আমি তাঁকেই আগে ডাকব, যিনি আপনাকে এখানে নিয়ে এলেন।”
আব্দুর রহমান ইবনু যাইদ ইবনু আসলাম বলেন, "এক সকালে আমার মা আমার বাবাকে বললেন, 'আল্লাহর কসম! আপনার ঘরে খাওয়ার মতো এক টুকরা মাংসও নেই।' তিনি উঠে দাঁড়িয়ে ওযু করে পোশাক গায়ে দিলেন এবং ঘরে সালাত আদায় করলেন। আমার মা আমাকে বললেন, 'তোমার বাবা এরচেয়ে বেশি কিছু করবে না। বরং তুমিই যাও।' আমি বের হলাম। আমার এক বন্ধুর কথা মনে পড়ল, যে খেজুর বিক্রি করত। আমি তার দোকানে গেলাম। সে আমাকে দেখে তাঁর ঘরে নিয়ে গিয়ে খাওয়াল। আমি কিছু বলার আগেই সে নিজে থেকে ত্রিশ দিনার ভরা একটি থলি বের করে বলল, 'তোমার বাবাকে সালাম দিয়ো। জানিয়ো যে আমরা তাঁকে আমাদের ব্যবসার অংশীদার করেছি। এই হলো তাঁর শেয়ার।”
ইবরাহীম ইবনু আদহাম এক যুদ্ধাভিযানে গেলেন কয়েকজন সহকর্মীসহ। তারা খরচ ভাগাভাগি করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। ইবরাহীম ভাবতে লাগলেন কোন সহকর্মীর থেকে ধার নেওয়া যায়। হঠাৎ তিনি সংবিত ফিরে পেয়ে ভাবলেন, “ধিক আমাকে! আমি তাদের মনিবকে ভুলে মনিবের বান্দাদের কাছে চাইছি! অথচ মনিব আমাকে বলেন, 'আমার চেয়ে বেশি কে তোমার আবেদনের দাবিদার?” তিনি ওযু করে দুই রাকআত সালাত আদায় করলেন এবং সেজদায় বললেন, “হে আমার প্রতিপালক, আপনি জানেন আমি কী করেছি। তা ভুলক্রমে অজ্ঞতাবশত হয়ে গেছে। আপনি যদি আমাকে শাস্তি দিতে চান, আমি তার যোগ্য। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা করতে চান, আপনি তা করতে সক্ষম। আপনি আমার প্রয়োজন জানেন। আপনার রহমত দিয়ে তা পূরণ করে দিন।” তিনি মাথা তুলে নিজের
সামনে চার শ দিনার পড়ে থাকতে দেখলেন। সেখান থেকে তিনি এক দিনার নিয়ে চলে গেলেন।
আসবাগ ইবনু যাইদ বলেন, “আমি এবং আমার সাথে থাকা লোকেরা তিন দিন কোনো কিছু না খেয়ে কাটালাম। আমার ছোট মেয়েরা আমার কাছে এসে কান্না করল, 'বাবা, ক্ষিদে পেয়েছে!' আমি ওযু করে সালাত আদায় করলাম এবং বিশেষ একটি দু'আ করার ইশারা পেলাম যার শেষ কথাগুলো ছিল, 'হে আল্লাহ, রিযকের দরজাগুলো আমার জন্য খুলে দিন। আমাকে কারও কাছে ঋণী রাখবেন না এবং আখিরাতে আপনার দয়ায় আমাকে এ জন্য দায়ী রাখবেন না, হে আরহামুর রাহিমীন!' আমি ঘরে ফিরতেই আমার বড় মেয়ে বলল, 'বাবা, আমাদের চাচা এসেছিলেন। তিনি এই দিরহামভর্তি থলে, এই ময়দাভর্তি বস্তা আর বাজারভর্তি এই বস্তা দিয়ে গেলেন। তিনি বললেন, 'ভাইজানকে আমার সালাম দিয়ো। আর বোলো কোনো কিছু লাগলে সেই দু'আটি করতে।” আসবাগ বলেন, "আল্লাহর কসম! আমার কোনো ভাই নেই। আমি জানিও না সেই লোকটি কে। কিন্তু আল্লাহ সর্বশক্তিমান।”
হাকাম ইবনু মূসা বলেন, "আমি এক সকালে ঘুম থেকে উঠতেই স্ত্রী অনুযোগ করল যে ঘরে কোনো ময়দা বা রুটি নেই। আমি কিছু পাব না জেনেই ঘর থেকে বের হলাম আর হাঁটতে হাঁটতে বললাম, 'হে আল্লাহ, আপনি জানেন আমার ঘরে কোনো ময়দা, রুটি বা টাকা নেই। অতএব আমাদের সেসব দিন।' এক ব্যক্তি আমার সাথে দেখা করে বলল, 'আপনার কী রুটি লাগবে, না ময়দা?' আমি বললাম, 'যেকোনোটি।' তারপর আমি সারা দিন আমার দরকারি জিনিস খুঁজতে ঘোরাঘুরি করলাম, কিন্তু কোত্থাও তা পেলাম না। আমি ফিরে এসে দেখলাম আমার পরিবারে রুটি আর মাংসের বিরাট আয়োজন চলছে। আমি বললাম, 'এসব কোথায় পেলে?' জবাব দিলো, 'আপনি যেই লোকটাকে পাঠালেন, তার কাছে।' আমি চুপ করে রইলাম।”
আওযায়ি বলেন, "আমি তাওয়াফ করার সময় দেখলাম এক ব্যক্তি কাবার গিলাফ চড়িয়ে ধরে আছে আর বলছে, 'হে আল্লাহ, আপনি দেখতে পাচ্ছেন আমি গরিব। আমার সন্তানরা উলঙ্গ। আমার উট কৃশকায়। অতএব আপনি যা দেখতে পাচ্ছেন, হে অদৃশ্য সর্বদ্রষ্টা!' একটি কণ্ঠ তার পেছন থেকে ডেকে বলল, 'আসিম, আসিম। তায়েফে তোমার চাচার ঘরে যাও। তিনি মারা গেছেন। তিনি এক হাজার ভেড়ি, তিন শ উট, চার শ দিরহাম, চারজন দাস ও তিনটি ইয়ামানি তরবারি রেখে গেছেন। গিয়ে সেগুলো গ্রহণ করো। কারণ, তুমি তার একমাত্র উত্তরাধিকারী।'
আমি বললাম, 'আসিম, তুমি যার কাছে দু'আ করছিলে, তিনি নিকটেই ছিলেন।' সে বলল, আপনি কি আল্লাহর এই আয়াত পড়েননি:
"আমার বান্দারা যখন তোমাকে আমার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে, আমি তো নিকটেই। আমি আহ্বানকারীর আহ্বানে সাড়া দিই, যখন সে আমাকে আহ্বান করে। ১৩৬
টিকাঃ
১২২ সূরাহ আন-নিসা, ৪ : ৩২
১২২ তিরমিযি : ৩৫৭১; তাবারানি, আল-কাবির: খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ১২৪ ইজলুনি, কাশফুল খফা: ১৫০৭-এ বলেন ইরাকি একে যঈফ এবং ইবনু হাজার একে হাসান বলেছেন। এক যঈফ ঘোষণা করেন আলবানি, আয-যঈফা: ৪৯২; ইরাকি, আল-মুগনি: ৯৮৭-তে বলেন, এর বর্ণনাসূত্রে হাম্মাদ বিন ওয়াকিদ আছেন, যাকে ইবনু মাইন ও অন্যান্যরা যঈফ বলেছেন। সাখাওয়ি, মাকসাদুল হাসানাহ: ১৯৫-এ বায়হাকির উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, হাম্মাদ একাই এটি বর্ণনা করেছেন এবং তিনি শক্তিশালী নন।
১২৩ আহমাদ: ৯৭০১; তিরমিযি: ৩৩৭৩; ইবনু মাজাহ : ৩৮২৭ এর ইসনাদ যঈফ বলেছেন যাহাবি, আল-মিযান: খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫৩৮; আরনাউত ও অন্যান্য, তবে অন্যান্য সমর্থনকারী হাদীসের কারণে আলবানি এক হাসান বলেছেন, আস-সহীহাহ : ২৬৫৪
১২৪ তাবারানি, আদ-দু'আ: ২০; বায়হাকি, শুয়াবুল ঈমান: ১১০৮, কুদাই ১০৬৯; আইশাহ থেকে বর্ণিত। তিরমিযি হাদীসটি বর্ণনা করেননি। ইবনু আদি একে বাতিল বলেছেন; একই কথা বলেছেন আলবানি, আয-যঈফাহ: ৬৩৭; আল-ইরওয়া: ৬৭৭-এ তিনি একে মাওযু বলেন; অনুরূপ ইবনু হাজার, তালখিসুল হাবির: ৭১৬; উকাইলি: খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৫৫৪, হাদিস নং ২০৮৫; ইবনু আদি, আল-কামিল: খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৫০০-৫০১
১২৫ তিরমিযি : ৩৬৮২; আনাস থেকে বর্ণিত; তিরমিযি একে গারীব বলেছেন। একে যঈফ বলেছেন আলবানি, আয-যঈফাহ: ১৩৬২
১২৬ বাযযার : ৯১৯; তাবারানি, আল-কাবির: খণ্ড ২০, পৃষ্ঠা ৩৩৩, হাদিস নং ৭৯০; মুয়ায ইবনু আম্মার থেকে বর্ণিত, ইবনু মাসউদ থেকে নয়। ইবনু আবি হাতিম, আল-জারহ ওয়া তা'দিল : খণ্ড ৮, ২৮২ পৃষ্ঠাতে একে মুনকার বলেছেন। বুখারি: ১৪৭৪ এবং মুসলিম: ১০৪০ ইবনু উমার থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ বলেন, "কোনো ব্যক্তি মানুষের কাছে ভিক্ষা করতে থাকে। এভাবে করে সে কিয়ামাতের দিন মুখমণ্ডলে এক টুকরাও মাংস ছাড়া দণ্ডায়মান হবে।" আহমাদ: ২২২২০ এবং বাযযার: ৯২৩-এ সাওয়াব থেকে করেন, রাসূলুল্লাহ বলেন, "যে কেউ তার অপ্রয়োজনীয় জিনিস যেচে বেড়ায়, এটি কিয়ামাতের দিন তার চেহারা নষ্ট করে দেবে।" বাযযার এর ইসনাদ হাসান বলেছেন। আরনাউত ও অন্যান্যদের মতে সহীহ।
১২৭ মুসলিম: ১০৪৩; আওফ ইবনু মালিক থেকে বর্ণিত।
১২৮ বুখারি: ১৪৭৪; মুসলিম: ১০৪০
১২৯ মুসলিম: ২৫৭৭
১৩০ আহমাদ: ২১৩৬৭-২১৩৬৯; তিরমিযি ২৪৯৫; ইবনু মাজাহ: ৪২৫৭, তিরমিযি একে হাসান বলেছেন; আরনাউত ও অন্যান্যরা একে শাহীদের কারণে সহীহ বলেছেন।
১৩১ বুখারি: ১১৪৫-৬৩২১-৭৪৯৪ এবং মুসলিম: ৭৫৬ আবু হুরায়রা এ থেকে বর্ণনা করেন, নবীজি বলেন “প্রতিরাতের শেষ তৃতীয়াংশে আমাদের মহান প্রতিপালক শেষ আসমানে অবতরণ করে বলতে থাকেন, 'কেউ কি আছে যে আমাকে ডাকবে, আমি জবাব দেবো? কেউ কি আছে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দেবো? কেউ কি আছে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব?'"
১০২ সূরাহ আল-বাকারাহ, ২: ১৮৬
১০০ আবু নুয়াইম: খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১১; খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ১৪১
৩০৮ ইবনু আবিদদুনিয়া, আল-ফারাজ বাদাশশিদদাহ : পৃষ্ঠা ১০ এবং আল-কানাইয গায়িত ‘আ’আফফুফ : পৃষ্ঠা ৫৪; বায়হাকি, আদ-দালাইল : খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ১০৭
৩০৯ সুরা আত-তালাক, ৬৫ : ২
১৩৬ আল-বাকারাহ, ২: ১৮৬
📄 আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া
রাসূল বলেন, “যখন সাহায্য চাইবে, আল্লাহর দিকেই ফিরবে।” আল্লাহর হেফাজত করা আর স্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহকে জানার আদেশ দেওয়ার পর তিনি আমাদের ইবাদাতের সারনির্যাসের কথা বলছেন। তা হলো শুধু আল্লাহর কাছেই দু'আ করা। নু'মান বিন বাশির থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ বলেন, “দু'আ হলো ইবাদাত।” তারপর তিনি এই আয়াত পাঠ করেন,
"তোমাদের প্রতিপালক বলেন, 'আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেবো।'”১৩৭ এ ছাড়া চারটি সুনান গ্রন্থেও হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। ১৩৮
এই সকল আদেশের পর তিনি আমাদের এক আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে নির্দেশ দিচ্ছেন। এই নির্দেশ উৎসারিত হয়েছে আল্লাহর এই আয়াত থেকে :
"আমরা শুধু আপনারই ইবাদাত করি এবং আপনার কাছেই সাহায্য চাই।”১৩৯
এর মাধ্যমে এক ব্যাপক-বিস্তৃত মূলনীতি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বলা হয়ে থাকে, সকল আসমানি কিতাবের মূল বার্তা এই মূলনীতিকে ঘিরেই আবর্তিত হয়।
শুধুই আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার দুটি তাৎপর্য রয়েছে:
১. আল্লাহর সাহায্য ছাড়া আল্লাহর আনুগত্য করা বান্দার পক্ষে সম্ভব না।
২. আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা ছাড়া আর কেউই বান্দাকে তার দুনিয়াবি ও আখিরাতি জীবনের উন্নতির জন্য সাহায্য করতে পারে না। যাকে আল্লাহ সাহায্য করেন, সে প্রকৃত অর্থেই সাহায্যপ্রাপ্ত; আর যাকে আল্লাহ পরিত্যাগ করেন, সে সত্যিকার অর্থেই পরিত্যক্ত।
এক সহীহ হাদীসে এসেছে, নবীজি বলেছেন, “তোমার উপকারে আসবে এমন সকল জিনিস কামনা করো এবং আল্লাহর সাহায্য চাও। আর নিরাশ হোয়ো না।”১৪০
তিনি এ কথাটি খুতবায় বলতেন ও সাহাবাগণকে বলতে শিক্ষা দিতেন, “সকল প্রশংসা আল্লাহর। আমরা তাঁর সাহায্য চাই এবং তাঁর কাছে হিদায়াত কামনা করি...”১৪১
তিনি মুয়ায -কে শিখিয়েছেন তিনি যেন প্রত্যেক সালাতের পর এ দু'আ করেন, “হে আল্লাহ, আপনাকে স্মরণ করতে, আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ হতে ও আপনার জন্য আমার ইবাদাতকে সুন্দর করতে আমাকে সাহায্য করুন।”১৪২
নবীজি-এর একটি দু'আ এমন ছিল, “হে আমার প্রতিপালক, আমাকে সাহায্য করুন। আমার বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্য করবেন না।”১৪৩
উমার -এর নির্ধারিত দু'আ কুনুতের একটি অংশ হলো, “হে আল্লাহ, আমরা আপনার সাহায্য চাই।”১৪৪
এক বিখ্যাত বর্ণনায় আছে, সাগর দ্বিখণ্ডিত করার জন্য আঘাত করে মূসা বলেন, “হে আল্লাহ, সব প্রশংসা আপনার। আপনার কাছেই অভিযোগ করা হয়। আপনিই সেই সত্তা, যার সাহায্য কামনা করা হয়। আর আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তন করা হয় মুক্তির জন্য, আপনার প্রতিই আস্থা রাখা হয় এবং আপনি ছাড়া আর কারও শক্তি বা গতি নেই।”১৪৫
আল্লাহর আদেশ পালন, আল্লাহর নিষেধকৃত বস্তু পরিত্যাগ এবং তাকদিরের ভালোমন্দ মেনে নেওয়া বান্দার পক্ষে কখনোই সম্ভব না আল্লাহর সাহায্য ছাড়া। ইয়াকুব বলেন,
"...আমি উত্তম ধৈর্যধারণ করব। তোমরা যা বানিয়েছ, তার ব্যাপারে আল্লাহই আমার আশ্রয়স্থল।”১৪৬
এ কারণেই নিজের উপর মিথ্যে অপবাদ আরোপের খবর (ইফকের ঘটনা) শুনে আয়িশা এই কথাটি বলেছেন। পরে আল্লাহ তাঁকে পবিত্র ঘোষণা করে আয়াত নাযিল করেন।
মূসা তাঁর জাতিকে বলেছিলেন :
"অতএব আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও এবং ধৈর্যধারণ করো।”১৪৭
আল্লাহ বলেন:
"(রাসূল) বলল, 'হে আমার প্রতিপালক, তুমি ন্যায্য মীমাংসা করে দাও, আর আমাদের প্রতিপালক তো দয়ার আধার। তোমরা যেসব কথা বলছ, সে বিষয়ে তিনিই একমাত্র আশ্রয়স্থল। "১৪৮
নবীজি যখন উসমান-কে সুসংবাদ দিলেন যে তিনি ফিতনার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর জান্নাতে প্রবেশ করবেন, তখন উসমান বলেছিলেন, “আল্লাহর সাহায্য চাই।”১৪৯ ফিতনাবাজরা যখন ভেতরে ঢুকে উসমান-কে মারতে লাগল আর তাঁর শরীর থেকে রক্ত প্রবাহিত হতে লাগল, তখন তিনি পড়ছিলেন, “(হে আল্লাহ) আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আপনি মহাপবিত্র। নিশ্চয়ই আমি সীমালঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত (ইউনুস -এর সেই দু'আ)। হে আল্লাহ, তাদের বিরুদ্ধে আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই। আপনি আমাকে যা দিয়ে পরীক্ষা করছেন, তা সহ্য করার জন্য আমি আপনার কাছে সাহায্য চাই।”
আবু তালহা থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এক যুদ্ধে শত্রুর মুখোমুখি হয়ে বললেন, “হে বিচারদিবসের মালিক, আমরা আপনারই ইবাদাত করি এবং আপনারই কাছে সাহায্য চাই।” আবু তালহা বলেন, “আমি দেখলাম শত্রুরা জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাচ্ছে।” আবুশ শাইখ আল-আসবাহানি এটি বর্ণনা করেছেন। ১৫০
দ্বীনি ও দুনিয়াবি জীবনে ভালো করার জন্য বান্দার আল্লাহর সাহায্য প্রয়োজন। যুবাইর তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহ-এর প্রতি শেষ উপদেশে বলেন, তাঁর ঋণগুলো যেন শোধ করে দেওয়া হয়। তারপর বলেন, “যদি তা করতে অসমর্থ হও, আমার মনিবের কাছে সাহায্য চেয়ো।” তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “বাবা, আপনার মনিব কে?” তিনি জবাব দিলেন, “আল্লাহ।” আব্দুল্লাহ বলেন, “যখনই ঋণ পরিশোধ করতে কষ্ট হতো, আমি বলতাম, 'হে যুবাইরের মনিব, তাঁর ঋণ শোধ করে দিন।' আর তা শোধ করার ব্যবস্থা হয়ে যেত।”
মিম্বর থেকে দেওয়া নিজের প্রথম খুতবায় উমার ইবনুল খাত্তাব বলেন, “আরবরা এক দীর্ঘ ভ্রমণক্লান্ত উট১৫১, যার রশি আমি ধরেছি। আমি একে নিয়ে বিস্তীর্ণ ভূমি পার হব আর এ কাজে আমি আল্লাহর সাহায্য চাই।”
মৃত্যু থেকে শুরু করে কিয়ামাতের সকল ভয়াবহতা সহ্য করার জন্যও বান্দা আল্লাহর সাহায্যের মুখাপেক্ষী।
খালিদ বিন ওয়ালিদ যখন মৃত্যুশয্যায়, তাঁর পাশে থাকা এক লোক বলল, "এটি (মৃত্যু) ভয়াবহ রকমের কঠিন।” খালিদ বললেন, “নিশ্চয়। কিন্তু আমি আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার সাহায্য চাই।”
আমির বিন আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর মৃত্যুশয্যায় কান্না করে বলেন, “আমি কান্না করছি কেবল দিনের উত্তাপ (সিয়াম) আর দাঁড়ানোর শৈত্য (তাহাজ্জুদ) হারিয়ে ফেলার কারণে। আমি এই মারাত্মক ক্ষতি থেকে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাই।”
অতীতের এক ব্যক্তি বলেছিলেন, “হে আমার প্রতিপালক, আমার অবাক লাগে, যে আপনাকে জানে সে কী করে অন্য কারও প্রতি আশা রাখতে পারে? আমার অবাক লাগে, যে আপনাকে জানে সে কী করে অন্য কারও কাছে সাহায্য চাইতে পারে?”
উমার বিন আব্দুল আযিয -কে আল-হাসান চিঠি লেখেন, “আল্লাহ ছাড়া আর কারও সাহায্য চাইবেন না। না হলে যার কাছে সাহায্য চাচ্ছেন আল্লাহ আপনাকে তার দায়িত্বে ছেড়ে দেবেন।”
একজন সালাফ বলেছিলেন, “আল্লাহর সাহায্য চাও। তাঁর সাহায্য চাও, কারণ যাদের কাছে সাহায্য চাওয়া হয় তাদের মাঝে তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ।”
টিকাঃ
১৩৭ সূরাহ গাফির, ৪০: ৬০
১৩৮ আবু দাউদ: ১৪৭৯; তিরমিযি: ২৯৬৯-৩২৪৭-৩৩৭২; নাসাঈ, আল-কুবরা: ১১৪৬৪; ইবনু মাজাহ : ৩৮২৮ তিরমিযি একে হাসান সহীহ বলেছেন। নববী, আল-আযকার: ৪৭৮ পৃষ্ঠায় বলেছেন এর ইসনাদ হাসান; ইবনু হাজার, ফাতহ: খণ্ড ১, ৬৪ পৃষ্ঠায় বলেছেন, এর ইসনাদ জাইয়্যিদ; ইবনু হিব্বান : ২৩৯৬ একে সহীহ বলেছেন; একই কথা বলেছেন হাকিম: ১৯০২; যাহাবি একমত। আলবানি, সহীহুত তারগীব: ১৬২৭, একে সহীহ বলেছেন।
১০১ সূরাহ আল-ফাতিহাহ, ১:৫
১৪০ মুসলিম: ২৬৬৪; আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।
১৪১ শাফিঈ, মুসনাদ : খণ্ড ১, ১৪৭ পৃষ্ঠায় ইবনু আব্বাস থেকে যঈফ জিদ্দান সূত্রে বর্ণনা করেছেন, খুতবাটি “তাঁর হিদায়াত কামনা করো" অংশটি ছাড়া সহীহ মুসলিমে এসেছে।
১৪২ আহমাদ: ২২১১৯-২২১২৬; আবু দাউদ: ১৫২২; নাসাঈ: ১৩০৪ এবং আমালুল ইয়াওম ওয়াল লাইলাহ: ১০৯
নববী, আল-আযকার: পৃষ্ঠা ১০৩ এবং আল-খুলাসাহ: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৬৮ এবং রিয়াদ : ৩৮৯-১৪৩০ এ বলেন এর ইসনাদ সহীহ। একই কথা বলেছেন ইবনু কাসির, আল-বিদায়া: খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ৯৭; ইবনু আল্লান, আল-ফুতুহাতুর রব্বানিয়্যাহ: খণ্ড ৩, ৫৫ পৃষ্ঠাতে ইবনু হাজারের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, এটি সহীহ। আলবানি, সহীহুত তারগীব: ১৫৯৬-এ একে সহীহ বলেছেন, আরনাউত একই কথা বলেছেন।
১৪০ আহমাদ : ১৯৯৭; আবু দাউদ : ১৫১০-১৫১১; তিরমিযি: ৩৫৫১, তিরমিযি একে হাসান বলেছেন, যাহাবি একমত। আলবানি সহীহুত তিরমিযিতে একে সহীহ বলেছেন। আরনাউত বলেছেন এর ইসনাদ সহীহ।
১৪৪ তাহাবি, মা'আনিউল আসার: খণ্ড ১, ২৫০ পৃষ্ঠায় জাইয়্যিদ ইসনাদ সহকার বর্ণনা করেছেন।
১৪৫ তাবারানি, আল-আসওয়াত, আস-সগীর, ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত; হায়সামি : খণ্ড ১০, ১৮৩ পৃষ্ঠাতে বলেছেন, "এর ইসনাদে থাকা বর্ণনাকারীদের আমি চিনি না”।
১৪৬ সূরাহ ইউসুফ, ১২: ১৮
১৪৭ সূরাহ আল-আ'রাফ, ৭: ১২৮
১৪৮ সূরাহ আল-আম্বিয়া, ২১: ১১২
১৪৯ মুসলিম: ২৪০৩
১৫০ তাবারানি, আল-আসওয়াত: ৮১৬৩; ইবনুস সুন্নি, আমালুল ইয়াওমা ওয়াল লাইলাহ : ৩৩৪; হায়সামি: খণ্ড ৫, ৩২৮ পৃষ্ঠায় বলেন, এর ইসনাদে আব্দুস সালাম ইবনু হাশিম আছেন, যিনি যঈফ। আলবানি, আয-যঈফাহ: ৫১০৫-এ একে যঈফ বলেছেন।
১৫১ অর্থাৎ, যেকোনো কষ্ট সহ্য করে নেয় এবং যা করা উচিত তা করে।
📄 কলম শুকিয়ে গেছে
নবীজি বলেন, “যা যা ঘটবে, (তা লেখার পর) কলম শুকিয়ে গেছে।” আরেক বর্ণনায় আছে, “কলম তুলে নেওয়া হয়েছে এবং কালি শুকিয়ে গেছে।” আরেক বর্ণনায় আছে, “কলম তুলে নেওয়া হয়েছে আর পৃষ্ঠাগুলো শুকিয়ে গেছে।”
এই সবগুলো 'কিনায়াহ' বা রূপক দিয়ে তাকদীরের কর্মপদ্ধতি বর্ণনা করা হচ্ছে। সবকিছুই আগে থেকে এক বিস্তীর্ণ কিতাবে লিখিত রয়েছে। এমন এক বইয়ের কথা বলা হচ্ছে, যা সুদীর্ঘকাল আগে লিপিবদ্ধ হয়েছে। এতে লেখার কাজে ব্যবহৃত কলমটি তুলে নেওয়া হয়েছে, কলম বা পৃষ্ঠার কালি শুকিয়ে গেছে, আর মোছা যাবে না। তাকদীরের গভীরতার দিকে ইঙ্গিত করার জন্য এ এক চমৎকার পদ্ধতি।
কুরআন ও সুন্নাহও এই অর্থের দিকে নির্দেশ করে। আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা বলেন:
“পৃথিবীতে অথবা তোমাদের নিজেদের উপর এমন কোনো বিপদ আসে না, যা আমি সংঘটিত করার পূর্বে কিতাবে লিপিবদ্ধ রাখি না। এটি (করা) আল্লাহর জন্য খুবই সহজ।” ১৫২
দাহহাক থেকে বর্ণিত আছে, ইবনে আব্বাস বলেন, "আল্লাহ কলম সৃষ্টি করে তাঁর নির্দেশে একে চলতে বললেন। কলমটির আকৃতি আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী দূরত্বের সমান। কলম বলল, 'হে প্রতিপালক, কী লিখব?' তিনি বললেন, 'আমি যা কিছু সৃষ্টি করব এবং আমার সৃষ্টির সাথে যা যা হবে-বৃষ্টি, উদ্ভিদ, আত্মা, কর্ম, রিযক ও আয়ু।' কিয়ামাত পর্যন্ত যা যা ঘটবে, কলম তা লিখল। আল্লাহর কাছে তাঁর আরশের নিচে তিনি তা এক কিতাবে সংরক্ষিত রেখেছেন।”
আবু যাবইয়ান থেকে বর্ণিত ইবনে আব্বাস বলেন, “আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করলেন ও তাকে আদেশ দিলেন, 'লেখো।' এটি জিজ্ঞেস করল, 'কী লিখব?' তিনি জবাব দিলেন, 'তাকদীর।' কিয়ামাত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত যা যা
ঘটবে, সেটি সেসব লিপিবদ্ধ করল।” তারপর তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করেন: “নূন। কলমের ও তারা যা লেখে, তার শপথ।”১৫৩
আবুদ্দুহা ইবনে আব্বাস আবুদ্দুহা -এর বর্ণনায় রাসূল থেকে একই রকম একটি বর্ণনা করেন।১৫৪ -এর একটি হাদীসও আছে, তবে তা সহীহ নয়। ১৫৫
ইবনে বাত্তাহ থেকে দুর্বল ইসনাদে আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূল বলেছেন, "আল্লাহ প্রথমে কলম সৃষ্টি করেছেন। তারপর সৃষ্টি করেছেন আন-নূন, যা হলো একটি কালির দোয়াত। তিনি আদেশ করলেন, 'লেখো।' এটি জিজ্ঞেস করল, 'কী লিখব?' তিনি বললেন, 'কিয়ামাত পর্যন্ত যা যা ঘটবে, লেখো।' এটি হলো আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার এই আয়াতের অর্থ : "নূন। কলমের ও তারা যা লেখে, তার শপথ।”১৫৬
এরপর কলমকে এমনভাবে সিলগালা করা হলো যে, তা আর কথা বলতে পারে না। কিয়ামাত পর্যন্ত এটি আর কথা বলবে না।”১৫৭
ইমাম আহমাদ, আবু দাউদ ও তিরমিযির সূত্রে উবাদা ইবনুস সামিত থেকে বর্ণিত আছে নবীজি বলেন, “আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন, যাকে তিনি আদেশ দিয়েছেন, 'লেখো।' সে সময় সেটি সেই সবকিছু লিখল, যা কিয়ামাত পর্যন্ত ঘটবে।”১৫৮
সহীহ মুসলিমে আব্দুল্লাহ ইবনু আমর থেকে বর্ণিত আছে নবীজি বলেন, “আল্লাহ প্রতিটি প্রাণীর তাকদীর আসমান-জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে লিপিবদ্ধ করেছেন।”১৫৯
ইমাম আহমাদ, তিরমিযি ও নাসাঈর সূত্রে বর্ণিত আব্দুল্লাহ ইবনু আমর বলেন, "নবীজি দুটি বই নিয়ে আমাদের কাছে বেরিয়ে আসলেন। তিনি বললেন, 'তোমরা কি জানো এই বইগুলো কী?' আমরা বললাম, 'না, ইয়া রাসূলাল্লাহ। যদি না আপনি আমাদের জানান।' তিনি ডান হাতের বইটি দেখিয়ে বললেন, 'এটি রব্বুল আ'লামিনের পক্ষ থেকে আসা একটি কিতাব, যাতে সকল জান্নাতির নাম, তাদের পিতামাতার নাম, গোত্রের নাম (বিস্তারিত) লিখিত রয়েছে। একদম শেষ ব্যক্তি পর্যন্ত লিখিত রয়েছে। এটি সংখ্যায় না কমবে, না বাড়বে।' বাম হাতের বইটির ব্যাপারে বললেন, 'এটি রব্বুল আ'লামিনের পক্ষ থেকে আসা একটি কিতাব, যাতে সকল জাহান্নামির নাম, তাদের পিতামাতার নাম, গোত্রের নাম (বিস্তারিত) লিখিত রয়েছে। একদম শেষ ব্যক্তি পর্যন্ত লিখিত রয়েছে। এটি সংখ্যায় না কমবে, না বাড়বে।' সাহাবাগণ বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, যদি সব নির্ধারিত হয়েই থাকে, তাহলে আমল করার কী দরকার?' তিনি বললেন, 'দৃঢ়, অবিচল ও ভারসাম্যপূর্ণ থাকো। জান্নাতি ব্যক্তির সর্বশেষ কাজ হবে জান্নাতিদের কাজের মতো, এর আগে সে যা-ই করে থাকুক না কেন। জাহান্নামি ব্যক্তির সর্বশেষ কাজ হবে জাহান্নামিদের কাজের মতো, এর আগে সে যা-ই করে থাকুক না কেন। বই দুটি ফেলে আল্লাহর রাসূল হাত দিয়ে ইশারা করে বললেন, 'তোমাদের প্রতিপালক বান্দাদের ব্যাপারে সবকিছু নির্ধারণ করে রেখেছেন, এক দল যাবে জান্নাতে, আরেক দল যাবে জাহান্নামে। '১৬০১৬১
ইমাম আহমাদ-এর সূত্রে আবুদ্দারদা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, "প্রত্যেক বান্দার জন্য আল্লাহ পাঁচটি বিষয় নির্ধারণ করে রেখেছেন- তার আয়ু, তার রিযক, তার আমল এবং সে কি ধ্বংসপ্রাপ্ত না নাজাতপ্রাপ্ত।”১৬২
ইমাম আহমাদ ও তিরমিযির সূত্রে ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেন, “আল্লাহ প্রত্যেক প্রাণ সৃষ্টি করেছেন এবং নির্ধারণ করে দিয়েছেন তার আয়ু, তার রিযক এবং যেসব ফিতনার সে মুখোমুখি হবে।”১৬৩
সহীহ মুসলিমে জাবির থেকে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করল,
"হে আল্লাহর রাসূল, আজকের আমল কী উদ্দেশ্যে করা হবে? কলম শুকিয়ে গেছে ও তাকদীর নির্ধারিত হয়ে গেছে, সেই উদ্দেশ্যে; নাকি ভবিষ্যতের কোনো কিছুর জন্যে?” রাসূল বললেন, “বরং কলম শুকিয়ে গেছে ও তাকদীর নির্ধারিত হয়ে গেছে, সেই উদ্দেশ্যে।” সেই ব্যক্তি বলল, "তাহলে আমল করব কী জন্যে?” তিনি বললেন, "আমল করতে থাকো। কারণ, প্রত্যেকের জন্য (সে যেই আমলের জন্য সৃষ্ট হয়েছে, তা) সহজ করে দেওয়া হয়।”১৬৪
এ সংক্রান্ত হাদীস ও সাহাবাগণের বর্ণনা প্রচুর রয়েছে। একজন বলেছেন:
আমল করতে থাকো পুরোটা, ঘটিতব্য সকল লিখে কলম গেছে শুকিয়ে, মানুষের রয়েছে এমনই স্রষ্টা, যার নির্ধারণ থেকে কেউ যাবে না পালিয়ে।
টিকাঃ
১৫২ সূরাহ আল-হাদীদ, ৫৭ : ২২
১০০ সূরাহ আল-কলাম, ৬৮: ১-২ বর্ণনাটি তাবারিতে (৬৮: ১-এর তাফসিরে) এবং আজুররি, আশ-শরিয়াহ: ১৮৩-৩৫০-তে সহীহ ইসনাদ সহকারে আছে। হাকিম: ৩৮৪০ একে সহীহ বলেছেন, যাহাবি একমত।
১৫৪ প্রাগুক্ত, আজুররি: ১৮২ এবং এটি সহীহ।
১০০ তাবারানি, আল-কাবির: ১২২২৭; বর্ণনাসূত্র যঈফ, যেহেতু এতে মুয়াম্মাল ইবনু ইসমাঈল আছেন, যিনি সত্যবাদী, কিন্তু দুর্বল স্মরণশক্তিধারী। হায়সামি: খণ্ড ৭, ১২৮ পৃষ্ঠায় বলেন, “মুয়াম্মাল বিশ্বস্ত, কিন্তু ভুল করেন। ইবনু মাইন ও অন্যান্যরা তাঁকে সিকাহ বলেছেন। বুখারি ও অন্যান্যরা বলেছেন যঈফ।"
১০৬ সূরাহ আল-কলাম, ৬৮: ১-২; বর্ণনাটি তাবারি : খণ্ড ২৯, ৯-১০ পৃষ্ঠায় আছে।
** ইবনু বাত্তাহ, আল-ইবানাহ (কাদর): ১৩৬৪; আজুররি: ১৭৯-৩৪৫; সুয়ুতি, আল-লাই আল-মাসনুয়াহ: খণ্ড ১, ১৩১ পৃষ্ঠায় একে হাকিম আত-তিরমিযির সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। এটি আরও বর্ণনা করেছেন ইবনু আসাকির, তারিখুদ্দিমাশক: খণ্ড ১৭, পৃষ্ঠা ২৪৭ ইবনু আদি, আল-কামিল: খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ৫২২, হাদীস নং ১৭৫৩-তে বলেছেন হাদীসটি বাতিল ও মুনকার। যাহাবি, আল-মিযান খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৬১, হাদীস নং ৮২৯৮-এ একমত পোষণ করেছেন। একই কথা বলেছেন আলবানি, আয-যঈফাহ: ১২৫৩
১৫৮ আহমাদ: ২২৭০৫-২২৭০৭; আবু দাউদ: ৪৭০০; তিরমিযি: ২১৫৫-৩৩১৯; তিরমিযি একে হাসান সহীহ গারীব বলেছেন। ইবনুল আরাবি, আহকামুল কুরআন: খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৩৫ এবং আলবানি, সহীহাহ: ১৩৩ এবং আরনাউত একে সহীহ বলেছেন।
১৫৯ মুসলিম: ২৬৫৩
১৬০ সূরাহ আশ-শুরা, ৪২: ৭
১৬১ আহমাদ: ৬৫৬৩; তিরমিযি ২১৪১; নাসাঈ, আল-কুবরা: ১১৪০৯; তিরমিযি একে হাসান সহীহ গারীব এবং নাসাঈ সহীহ বলেছেন, যা বর্ণিত আছে তুহফাতুল আশরাফ খণ্ড ৬, ২৪৩ পৃষ্ঠায়। ইবনু হাজার, ফাতহ: খণ্ড ৬, ৩৩৬ পৃষ্ঠায় এর ইসনাদ হাসান বলেছেন। অনুরূপ বলেছেন আলবানি, আস-সহীহাহ: ৮৪৮
১৬২ আহমাদ: ২১৭২২ এই শব্দ সহকারে, "আল্লাহ প্রত্যেক বান্দার জন্য পাঁচটি বিষয় নির্ধারিত করে দিয়েছেন-তার আয়ু, তার আমল, তার বিশ্রাম, তার নড়াচড়া এবং তার রিযক।” ইবনু হিব্বান : ৬১৫০-এ একে সহীহ বলেছেন। আহমাদ: ২১৭২৩-এ শব্দগুলো, “আল্লাহ প্রত্যেক বান্দার জন্য পাঁচটি বিষয় নির্ধারিত করে দিয়েছেন-তার আয়ু, তার রিযক, তার আমল, সে ধ্বংসপ্রাপ্ত না নাজাতপ্রাপ্ত।” সুয়ুতি, আল-জামিউস সগীর: ৫৮৪৮-এ একে সহীহ বলেছেন। অনুরূপ বলেছেন ওয়াদি, আস-সহীহুল মুসনাদ: ১০৪৫, আলবানি, যিলালুল জান্নাহ: ৩০৭- ৩০৮ এবং আরনাউত, উভয়ে একে সহীহ বলেছেন।
১৬০ আহমাদ: ৪১৯৭; তিরমিযি : ২১৪৩; আলবানি, আস-সহীহাহ: ১১৫২ এবং আরনাউত একে সহীহ বলেছেন। আহমাদ: ৮৩৪৩-এ আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেন, "আল্লাহ প্রতিটি আত্মা সৃষ্টি করে এর জীবন, মরণ, এটি যেসব পরীক্ষার মুখোমুখি হবে এবং রিযক নির্ধারিত করে দিয়েছেন।” ইবনু হিব্বান: ৬১১৮-৬১১৯ এবং আরনাউত একে সহীহ বলেছেন।
১৬৪ মুসলিম: ২৬৪৮
📄 আল্লাহর নির্ধারণই কার্যকর হয়
নবীজি বলেছেন, “সমগ্র সৃষ্টিজগৎ একত্র হয়ে যদি তোমার এমন কোনো উপকার করতে চায়, যা আল্লাহ নির্ধারিত করে রাখেননি, তাহলেও তারা তা করতে সমর্থ হবে না। আর তারা যদি তোমার এমন কোনো ক্ষতি করতে চায়, যা আল্লাহ নির্ধারিত করে রাখেননি, তাহলেও তারা তা করতে সমর্থ হবে না।”
এর অর্থ হলো, বান্দা যত উপকার ও ক্ষতির সম্মুখীন হয়, সবই তার জন্য আগে থেকে নির্ধারিত হয়ে আছে। সমগ্র সৃষ্টিজগৎ মিলে সর্বাত্মক চেষ্টা করেও অনির্ধারিত কোনো বিষয়ের মুখোমুখি তাকে করতে পারবে না। কুরআনের আয়াতেও এটি প্রমাণিত হয়। যেমন:
"বলে দাও, আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারিত করে দিয়েছেন, তা ছাড়া অন্য কিছুই আমাদের ঘটবে না..."১৬৫
“পৃথিবীতে অথবা তোমাদের নিজেদের উপর এমন কোনো বিপদ আসে না, যা আমি সংঘটিত করার পূর্বে কিতাবে লিপিবদ্ধ রাখিনি।...”১৬৬
"...বলে দাও, যদি তোমরা তোমাদের ঘরেও থাকতে, তথাপি যাদের জন্য মৃত্যু নির্ধারিত ছিল, তারা তাদের মৃত্যুর স্থানের পানে বেরিয়েই পড়ত..."১৬৭
ইমাম আহমাদের সূত্রে আবুদ্দারদা থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ বলেন,
“সবকিছুরই একটি হাকিকত রয়েছে। বান্দা ততক্ষণ ঈমানের হাকিকত অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না সে জেনে নিচ্ছে যে, তার সাথে যা ঘটেছে তা ঘটারই ছিল; যা ঘটেনি, তা কিছুতেই ঘটত না।”১৬৮
আবু দাঊদ ও ইবনে মাজাহর সূত্রেও যায়েদ বিন সাবিত থেকে অনুরূপ অর্থের হাদীস বর্ণিত হয়েছে। ১৬৯
জেনে রাখুন, ইবনে আব্বাস -কে দেওয়া পুরো উপদেশটি এই কেন্দ্রীয় মূলনীতিকে ঘিরেই আবর্তিত হয় এবং এরই শাখা হিসেবে বের হয়। বান্দা যখন উপলব্ধি করবে যে, আল্লাহর নির্ধারণ করে রাখা ভালো-মন্দ ও উপকার-অপকার ছাড়া আর কিছুই তার সাথে ঘটবে না, পুরো সৃষ্টিজগৎ মিলে এর অন্যথা করতে চাইলেও ব্যর্থ হবে, সে তখন বুঝতে পারবে যে এক আল্লাহই উপকার করার ও ক্ষতি করার মালিক, তিনিই দেন, তিনিই দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার প্রতি বান্দার তাওহীদ পূর্ণাঙ্গতা পাবে। সে তখন একমাত্র তাঁর কাছেই সাহায্য চাইবে, তাঁর কাছেই প্রার্থনা করবে, তাঁর সামনেই নিজেকে বিনীত ও অবনত করবে। সে শুধু তাঁরই ইবাদাত করবে এবং তাঁর কাছেই সাহায্য চাইবে। কারণ, কারও উপাসনা করা হয়ই এই আশায় যে, উপাস্য কোনো উপকার করবেন এবং কোনো অপকার থেকে বাঁচাবেন। এ জন্যই আল্লাহ অন্য কোনো কিছুর উপাসনা নিষিদ্ধ করেছেন যে, তারা কোনো উপকার বা অপকার করতে পারে না, তাদের উপাসনা নিষ্ফল। ১৭০
যাদের অন্তরে ঈমান ঠিকমতো প্রবেশ করেনি, তারা স্রষ্টার আনুগত্যের আগে সৃষ্টির আনুগত্যকে স্থান দেয় এই ভেবে যে, এগুলো তার কিছু উপকার করবে বা কিছু ক্ষতি থেকে তাকে বাঁচাবে। বান্দা যখন উপলব্ধি করবে যে, একমাত্র আল্লাহই লাভ-ক্ষতি করানোর মালিক, তিনিই দাতা, তিনিই দান থেকে বিরতকারী, তখন বান্দা ইবাদাতের জন্য আল্লাহকেই নির্দিষ্ট করে নেবে এবং সৃষ্টির উপর স্রষ্টাকে প্রাধান্য দেবে। সাহায্য চাওয়ার জন্যও তখন এক আল্লাহরই কাছে শরণাপন্ন হবে।
এই ব্যাপক অর্থপূর্ণ ও অসাধারণ উপদেশে এই সকল বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে, যার প্রতিটিই পর্বতপ্রমাণ গুরুত্বের দাবিদার।
বান্দা কর্তৃক আল্লাহকে হেফাজত করার অর্থ হলো আল্লাহর দেওয়া সীমা মেনে চলা এবং তাঁর অধিকারসমূহ আদায় করা। এটিই তাঁর ইবাদাতের হাকিকত। এর মাধ্যমে উপদেশটি শুরু হয়। তারপর তা এগিয়ে যায় আল্লাহ কর্তৃক বান্দার হেফাজতের দিকে, যার বাস্তবায়ন প্রতিটি বান্দার চূড়ান্ত মনোবাসনা।
এরপর বলা হয়েছে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় বান্দা আল্লাহকে জানলে আল্লাহ তাকে তার দুঃখ-দুর্দশার সময় জানবেন। এটি হলো আল্লাহ কর্তৃক বান্দাকে হেফাজত করার অংশ এবং এর পূর্ণতা দানকারী। দুঃখ-কষ্টের সময়কে বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হলো এটাই সেই সময় যখন বান্দা এমন সত্তার কাছে মরিয়া হয়ে ফিরে যায়, যে তার সম্পর্কে জানে এবং তাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারবে। এমনকি মুশরিকরাও এ রকম সময় এক আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা, কান্নাকাটি, অনুনয়-বিনয় করতে থাকে। জানে যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলাই কেবল তাদের দু'আর উত্তর প্রদানে সক্ষম। কিন্তু যখন বিপদ কেটে যায়, তারা শির্কে ফিরে যায়-যার কথা আল্লাহ কুরআনে বহু জায়গায় বলেছেন এবং যার কারণে মুশরিকদের নিন্দা করেছেন। ১৭১ এই উপদেশের মাধ্যমে নবীজি আমাদের মুশরিকদের বিরোধিতা করতে শিখিয়েছেন। আদেশ করেছেন যেন আমরা সুখের সময়েও আল্লাহকে স্মরণ করি, দ্বীনকে একমাত্র তাঁর জন্যই বিশুদ্ধ করে নিই, তাঁরই নৈকট্য কামনা করি। এর ফলে বান্দার দুঃখের সময়ে বান্দাকে জানা আল্লাহর জন্য জরুরি হয়ে পড়বে।
এরপর বলা হয়েছে শুধু আল্লাহর কাছেই সবকিছু চাইতে এবং তাঁরই সাহায্য কামনা করতে। সুখ-দুঃখ উভয় সময়েই তা করতে হবে।
তারপর সেই মূলনীতি উল্লেখ করা হয়েছে, যার উপর আগের সকল বিষয় নির্মিত হয়েছে-এক আল্লাহই উপকার করেন, ক্ষতিসাধন বা দূরীভূত করেন, দান করেন ও দান করা থেকে বিরত থাকেন, পুরো সৃষ্টিজগৎ মিলেও আল্লাহর নির্ধারিত বিষয়ের অন্যথা করতে অক্ষম।
এই উপলব্ধি বান্দাকে সৃষ্টির উপর নির্ভরতা থেকে মুক্ত করে। বান্দা কোনো সৃষ্টির কাছে হাত পাতা, সাহায্য চাওয়া এবং উপকার ও অপকারের আশা করা থেকে বিরত হয়।১৭২ সৃষ্টির প্রতি বান্দার ভয়ও দূরীভূত হয়। এর আবশ্যক ফলাফলস্বরূপ, সে একমাত্র আল্লাহরই উপাসনা করে এবং আল্লাহরই কাছে সাহায্য চায়। আল্লাহর আনুগত্যকে সে সৃষ্টির আনুগত্যের আগে স্থান দেয়। সমগ্র সৃষ্টিজগৎকে অসন্তুষ্ট করে হলেও বান্দা আল্লাহকে সন্তুষ্ট রাখতে সচেষ্ট হয়ে ওঠে। আবু সাঈদ থেকে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূল ﷺ বলেন, "ইয়াকীনের দুর্বলতার একটি লক্ষণ এই যে, কোনো ব্যক্তি আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে মানুষকে সন্তুষ্ট করতে চায়। আল্লাহ যে রিযক দিয়েছেন, তার জন্য তাদের প্রশংসা করে; আল্লাহ যা তাকে দেননি, তার জন্য তাদের তিরস্কার করে। মানুষ কেবল কামনা করলেই আল্লাহর রিযক লাভ করতে পারে না, আবার কেবল ঘৃণা করলেই তা দূর করতে পারে না।”১৭৩
কবি সত্যিই বলেছিলেন: যদি স্বাদ নিতে জানতে, যখন জীবন তিক্ত, রাগের মুখেও যদি মানুষ শান্ত থাকা শিখত, জীবন সহজ হয় সত্যিকারের ভালোবাসায়ই খালি, পৃথিবীর উপর যা-ই আছে, সেসব তো ধুলাবালি।
জেনে রাখুন, জমিনের উপর চলমান প্রতিটি প্রাণীই কেবল ধুলা আর মাটি। রাজাধিরাজ আল্লাহর আনুগত্যের আগে ধুলাবালি আর মাটির আনুগত্যকে কী করে স্থান দেওয়া সম্ভব? মালিক ও দাতাকে অসন্তুষ্ট করে মাটিকে সন্তুষ্ট করে কী লাভ? সত্যিই অবাক করা ব্যাপার!
কুরআনের বহু জায়গায় এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলাই দান করেন ও দান করা থেকে বিরত থাকেন:
“আল্লাহ মানুষের জন্য যে রহমত খুলে দেন, তা নিবারণ করার কেউ নেই। আর তিনি যা বারিত করেন, কেউ তা প্রেরণ করতে পারে না... "১৭৪
“আল্লাহ যদি তোমাকে কষ্ট দিতে চান, তাহলে তিনি ছাড়া তা দূর করার আর কেউ নেই। আর আল্লাহ যদি তোমার কল্যাণ করতে চান, তাহলে তাঁর অনুগ্রহ রদ করার কেউ নেই... "১৭৫
“বলো, তোমরা কি ভেবে দেখেছ যে, আল্লাহ আমার ক্ষতি করতে চাইলে আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ডাকো, তারা কি সে ক্ষতি দূর করতে পারবে? অথবা তিনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করতে চাইলে তারা কি তাঁর অনুগ্রহ ঠেকাতে পারবে?... "১৭৬
আল্লাহ তা'আলা নূহ-এর উক্তি উল্লেখ করেন :
“হে আমার সম্প্রদায়, আমার অবস্থিতি আর আল্লাহর আয়াতসমূহের দ্বারা তোমাদের প্রতি আমার উপদেশ দান যদি তোমাদের নিকট অসহ্য মনে হয়, (তাতে আমার কোনো পরোয়া নেই, কারণ) আমি তো কেবল আল্লাহর উপর ভরসা করি। তোমরা তোমাদের শরিকদের নিয়ে সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করো। পরে তোমাদের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তোমাদের মাঝে যেন কোনো অস্পষ্টতা না থাকে... "১৭৭
আল্লাহ তা'আলা হুদ-এর উক্তি উল্লেখ করেন :
"আমি আল্লাহকে সাক্ষী রাখছি আর তোমরাও সাক্ষী হও যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাকে তাঁর শরিক করো, তার সাথে আমি পুরোপুরি সম্পর্কহীন। তাঁকে (আল্লাহ) ব্যতীত তোমরা সকলে মিলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করো আর আমাকে একটুও অবকাশ দিয়ো না। আমি নির্ভর করি আল্লাহর উপর, যিনি আমার আর তোমাদের প্রতিপালক... "১৭৮
একজন সালাফ বলেছেন:
আল্লাহ আমার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তা তো হবেই, হুঁশিয়ারি দিয়ে তা এড়ানো গেলে তো এড়ানো যেত কবেই। আমরা যতটা না নিজেদের, তারচেয়ে বেশি আমরা আল্লাহর, আমাদের পরিচয় তো কেবল এক তাকদীরে বাঁধা বান্দাহর।
ফুদাইল আল-ফাকাহ -এর কাছে এক ব্যক্তি একবার নালিশ করল। তিনি জবাব দিলেন, “তুমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে নালিশ করলে?”
একজন সালাফ বলেছেন:
যে রায় ইচ্ছা দাও, তোমার রায় হবে না বাস্তবায়ন, আল্লাহর দেওয়া তাকদীরই হবে আসল কার্যকারণ, রবের অধীনে সবকিছু, তাঁরই ইচ্ছা সর্বদা হয় সাধন।
টিকাঃ
১৬৫ সূরাহ আত-তাওবাহ, ৯:৫১
১৬৬ সূরাহ আল-হাদীদ, ৫৭: ২২
১৬৭ সূরাহ আলে ইমরান, ৩ : ১৫৪
১৬৮ আহমাদ: ২৭৪৯০; ইবন আবি আসিম: ২৪৬; একে হাসান বলেছেন, সুয়তি, আল-জামি : ২৪১৭ এবং ওয়াদিই, সহীহুল মুসনাদ: ১০৫০। আলবানি, যিলালুল জান্নাহ: ২৪৬ এবং আস-সহীহাহ: ২৪৭১-এ একে সমর্থনকারী হাদীসের কারণে সহীহ বলেছেন।
১৬৯ আহমাদ: ২১৫৮৯-২১৬১১-২১৬৫৩; আবু দাউদ: ৪৬৯৯; ইবনু মাজাহ: ৭৭ এই শব্দ সহকারে, “তুমি যদি আল্লাহর রাস্তায় উহুদ পরিমাণ খরচ করো, তাহলেও আল্লাহ তা কবুল করবেন না, যদি না তুমি তাকদিরে বিশ্বাস করো এবং জেনে নাও যে, যা তোমার উপর আপতিত হয়েছে তা হওয়ারই ছিল এবং যা আপতিত হয়নি তা কিছুতেই হওয়ার ছিল না। এ (বিশ্বাস) ছাড়া অন্য কোনো কিছুর উপর মৃত্যুবরণ করলে তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” একে সহীহ বলেছেন ইবনু হিব্বান : ৭২৭ এবং আলবানি, তাখরিজ আবু দাউদ: ৪৬৯৯; আরনাউত বলেছেন এর ইসনাদ শক্তিশালী। তিরমিযি : ২১৪৪ এবং তাবারানি, আল-কাবির: ১১২৪৩ ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ বলেন, "বান্দা ততক্ষণ মুমিন হবে না যতক্ষণ না সে তাকদীরের ভালো-মন্দে বিশ্বাস করে এবং জেনে নেয় যে, যা তার উপর আপতিত হয়েছে তা হওয়ারই ছিল এবং যা আপতিত হয়নি তা কিছুতেই হওয়ার ছিল না।” আলবানি, আস-সহীহাহ: ২৪৩৯ একে সহীহ বলেছেন।
১৭০ যেমন আল্লাহর কালাম, "তারা আল্লাহকে ছেড়ে ইবাদাত করে এমন কিছুর, যা না তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারে আর না উপকার করতে পারে।” [সূরাহ ইউনুস, ১০: ১৮] "তারপরও তারা আল্লাহকে ছেড়ে ইবাদাত করে এমন কিছুর, যা না তাদের সাহায্য করতে পারে, না ক্ষতি।” [সূরাহ আল-ফুরকান, ২৫: ৫৫] "বাবা, কেন আপনি এমন জিনিসের ইবাদাত করেন যা শোনে না, দেখে না, আপনার কোনো কাজেই আসে না?” [সূরাহ মারইয়াম, ১৯: ৪২] "আর তারা তাঁকে বাদ দিয়ে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করেছে অন্য কিছুকে, যারা কিছুই সৃষ্ট করে না; বরং তারা নিজেরাই সৃষ্ট। তারা ক্ষমতা রাখে না নিজেদের ক্ষতি বা উপকার করার, আর ক্ষমতা রাখে না মৃত্যু, জীবন ও পুনরুত্থানের উপর।” [সূরাহ আল-ফুরকান, ২৫: ৩]
১৭১ যেমন আল্লাহর বাণী, “যখন মানুষকে দুঃখ-ক্লেশ স্পর্শ করে, সে শুয়ে, বসে ও দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকে। আর যখন আমি সে দুঃখ-ক্লেশ অপসারণ করে দিই, সে এমনভাবে চলে যায় যেন তাকে দুঃখ-ক্লেশ স্পর্শ করার পর সে আমাকে কখনো ডাকেইনি।” [সূরাহ ইউনুস, ১০: ১২] “তোমরা যে অনুগ্রহই লাভ করে থাকো, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর যখন দুঃখ-কষ্ট তোমাদের স্পর্শ করে, তখন তাঁর কাছেই তোমরা আকুল আবেদন জানাতে থাকো। অতঃপর যখন তিনি তোমাদের থেকে দুঃখ-কষ্ট দূর করে দেন, তখন তোমাদের একদল তাদের প্রতিপালকের সঙ্গে অন্যকে শরিক করে বসে আমি তাদের যা দিয়েছি, তার না-শোকরি করার জন্য। অতএব, তোমরা ভোগ করে নাও। শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে।” [সূরাহ আন-নাহল, ১৬ : ৫০-৫৫] "সমুদ্রে যখন বিপদ তোমাদের পেয়ে বসে, তখন তাঁকে ছাড়া অন্য যাদের তোমরা (উপাস্য ভেবে) আহ্বান করো, তারা (তখন তোমাদের মন থেকে) হারিয়ে যায়। অতঃপর তিনি যখন তোমাদের স্থলে এনে বাঁচিয়ে দেন, তখন তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও। মানুষ হলো বড়ই অকৃতজ্ঞ।” [সূরাহ বানী ইসরাঈল, ১৭: ৬৭] "দুঃখ-মুসিবত যখন মানুষকে স্পর্শ করে, তখন সে তার প্রতিপালককে ডাকতে থাকে তাঁর প্রতি বড়ই একনিষ্ঠ হয়ে। অতঃপর তিনি যখন নিজ পক্ষ থেকে অনুগ্রহ দিয়ে তাকে ধন্য করেন, তখন সে পূর্বে যে জন্য তাঁকে ডেকেছিল তা ভুলে যায় এবং অন্যদের আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করায় তাঁর পথ থেকে পথভ্রষ্ট করার জন্য।” [সূরাহ আয-যুমার, ৩৯: ৮]
১৭২ হালিমি, আল-মিনহাজ ফী শুয়াবুল ঈমানে বলেন, "আশার কয়েক রকম রূপ আছে: ১. আকাঙ্ক্ষিত বস্তু লাভের আশা, ২. তা পাওয়ার পর ধরে রাখার আশা, ৩. অনাকাঙ্ক্ষিত বস্তু থেকে দূরে থাকার আশা, ৪. ঘটে যাওয়া কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত জিনিসের সমাপ্তি দেখার আশা। কারও প্রতি ভয়ের মতো করে আশাও যদি কারও হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে যায়, তাহলে বিনয় ও নম্রতার দিকে ধাবিত করে। কারণ, আশা আর ভয় হাত ধরাধরি করে চলে। ভীত ব্যক্তি ভয়ের বিপরীতটিরও আশা করে। সে আল্লাহর কাছে দু'আ করে, তাঁর কাছে কামনা করে। তেমনি তাঁকে ভয় করা ব্যক্তি আকাঙ্ক্ষিত বস্তু হারানোর ভয় করে এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়। কাজেই যে ব্যক্তিই ভয় করে, সে আশাও করে। আর যে আশা করে, সে ভয়ও করে।”
১৭৩ আবু নুয়াইম, আল-হিলইয়াহ: খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ১০৬; বায়হাকি, শুয়াব: ২০৭-এ বলেন, এর বর্ণনাসূত্রে মুহাম্মাদ ইবনু মারওয়ান আছেন, যিনি যঈফ। যাহাবি, আল-মিযান: খণ্ড ৪, ৩২ পৃষ্ঠায় বলেন, "তাঁরা তাঁকে পরিত্যাগ করেছেন এবং কেউ তাঁর মিথ্যুক হওয়ার অভিযোগ করেন।” এ ছাড়াও এর ইসনাদে আতিয়্যাহ আল-আওফি নামক একজন যঈফ বর্ণনাকারী আছেন। সুয়ুতি, আল-জামি: ২৪৯৩ একে যঈফ বলেছেন এবং আলবানি, আয-যঈফা: ১৪৮২তে একে মাওযু বলেছেন। তাবারানি, আল-কাবির: ১০৫১৪ এবং বায়হাকি : ২০৮ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেন, “আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে কাউকে সন্তুষ্ট কোরো না। আল্লাহর দয়ার কারণে অন্য কারও প্রশংসা কোরো না। আল্লাহ যা (হতে দিতে) চাননি, তার জন্য অন্য কাউকে তিরস্কার কোরো না। কোনো ব্যক্তির চাইলেই আল্লাহর রিযক চলে আসে না এবং কোনো ব্যক্তির অপছন্দ করলেই তা দূর হয়ে যায় না।" আলবানি, যঈফ আত-তারগীব: ১০৬৪ একে মাওযু বলেছেন। বায়হাকি: ২০৯ এবং ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ইয়াকিন : ৩২ এ একই কথা ইবনু মাসউদ এ-এর বক্তব্য হিসেবে এনেছেন। দেখুন অধ্যায় নয়, ফুটনোট: ৩১
১৭৪ সূরাহ ফাতির, ৩৫: ২
১৭৫ সূরাহ ইউনুস, ১০: ১০৭
১৭৬ সূরাহ আয-যুমার, ৩৯: ৩৮
১৭৭ সূরাহ ইউনুস, ১০:৭১
১৭৮ সূরাহ হুদ, ১১:৫৪-৫৬
নবীজি বলেছেন, “সমগ্র সৃষ্টিজগৎ একত্র হয়ে যদি তোমার এমন কোনো উপকার করতে চায়, যা আল্লাহ নির্ধারিত করে রাখেননি, তাহলেও তারা তা করতে সমর্থ হবে না। আর তারা যদি তোমার এমন কোনো ক্ষতি করতে চায়, যা আল্লাহ নির্ধারিত করে রাখেননি, তাহলেও তারা তা করতে সমর্থ হবে না।”
এর অর্থ হলো, বান্দা যত উপকার ও ক্ষতির সম্মুখীন হয়, সবই তার জন্য আগে থেকে নির্ধারিত হয়ে আছে। সমগ্র সৃষ্টিজগৎ মিলে সর্বাত্মক চেষ্টা করেও অনির্ধারিত কোনো বিষয়ের মুখোমুখি তাকে করতে পারবে না। কুরআনের আয়াতেও এটি প্রমাণিত হয়। যেমন:
"বলে দাও, আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারিত করে দিয়েছেন, তা ছাড়া অন্য কিছুই আমাদের ঘটবে না..."১৬৫
“পৃথিবীতে অথবা তোমাদের নিজেদের উপর এমন কোনো বিপদ আসে না, যা আমি সংঘটিত করার পূর্বে কিতাবে লিপিবদ্ধ রাখিনি।...”১৬৬
"...বলে দাও, যদি তোমরা তোমাদের ঘরেও থাকতে, তথাপি যাদের জন্য মৃত্যু নির্ধারিত ছিল, তারা তাদের মৃত্যুর স্থানের পানে বেরিয়েই পড়ত..."১৬৭
ইমাম আহমাদের সূত্রে আবুদ্দারদা থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ বলেন,
“সবকিছুরই একটি হাকিকত রয়েছে। বান্দা ততক্ষণ ঈমানের হাকিকত অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না সে জেনে নিচ্ছে যে, তার সাথে যা ঘটেছে তা ঘটারই ছিল; যা ঘটেনি, তা কিছুতেই ঘটত না।”১৬৮
আবু দাঊদ ও ইবনে মাজাহর সূত্রেও যায়েদ বিন সাবিত থেকে অনুরূপ অর্থের হাদীস বর্ণিত হয়েছে। ১৬৯
জেনে রাখুন, ইবনে আব্বাস -কে দেওয়া পুরো উপদেশটি এই কেন্দ্রীয় মূলনীতিকে ঘিরেই আবর্তিত হয় এবং এরই শাখা হিসেবে বের হয়। বান্দা যখন উপলব্ধি করবে যে, আল্লাহর নির্ধারণ করে রাখা ভালো-মন্দ ও উপকার-অপকার ছাড়া আর কিছুই তার সাথে ঘটবে না, পুরো সৃষ্টিজগৎ মিলে এর অন্যথা করতে চাইলেও ব্যর্থ হবে, সে তখন বুঝতে পারবে যে এক আল্লাহই উপকার করার ও ক্ষতি করার মালিক, তিনিই দেন, তিনিই দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার প্রতি বান্দার তাওহীদ পূর্ণাঙ্গতা পাবে। সে তখন একমাত্র তাঁর কাছেই সাহায্য চাইবে, তাঁর কাছেই প্রার্থনা করবে, তাঁর সামনেই নিজেকে বিনীত ও অবনত করবে। সে শুধু তাঁরই ইবাদাত করবে এবং তাঁর কাছেই সাহায্য চাইবে। কারণ, কারও উপাসনা করা হয়ই এই আশায় যে, উপাস্য কোনো উপকার করবেন এবং কোনো অপকার থেকে বাঁচাবেন। এ জন্যই আল্লাহ অন্য কোনো কিছুর উপাসনা নিষিদ্ধ করেছেন যে, তারা কোনো উপকার বা অপকার করতে পারে না, তাদের উপাসনা নিষ্ফল। ১৭০
যাদের অন্তরে ঈমান ঠিকমতো প্রবেশ করেনি, তারা স্রষ্টার আনুগত্যের আগে সৃষ্টির আনুগত্যকে স্থান দেয় এই ভেবে যে, এগুলো তার কিছু উপকার করবে বা কিছু ক্ষতি থেকে তাকে বাঁচাবে। বান্দা যখন উপলব্ধি করবে যে, একমাত্র আল্লাহই লাভ-ক্ষতি করানোর মালিক, তিনিই দাতা, তিনিই দান থেকে বিরতকারী, তখন বান্দা ইবাদাতের জন্য আল্লাহকেই নির্দিষ্ট করে নেবে এবং সৃষ্টির উপর স্রষ্টাকে প্রাধান্য দেবে। সাহায্য চাওয়ার জন্যও তখন এক আল্লাহরই কাছে শরণাপন্ন হবে।
এই ব্যাপক অর্থপূর্ণ ও অসাধারণ উপদেশে এই সকল বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে, যার প্রতিটিই পর্বতপ্রমাণ গুরুত্বের দাবিদার।
বান্দা কর্তৃক আল্লাহকে হেফাজত করার অর্থ হলো আল্লাহর দেওয়া সীমা মেনে চলা এবং তাঁর অধিকারসমূহ আদায় করা। এটিই তাঁর ইবাদাতের হাকিকত। এর মাধ্যমে উপদেশটি শুরু হয়। তারপর তা এগিয়ে যায় আল্লাহ কর্তৃক বান্দার হেফাজতের দিকে, যার বাস্তবায়ন প্রতিটি বান্দার চূড়ান্ত মনোবাসনা।
এরপর বলা হয়েছে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় বান্দা আল্লাহকে জানলে আল্লাহ তাকে তার দুঃখ-দুর্দশার সময় জানবেন। এটি হলো আল্লাহ কর্তৃক বান্দাকে হেফাজত করার অংশ এবং এর পূর্ণতা দানকারী। দুঃখ-কষ্টের সময়কে বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হলো এটাই সেই সময় যখন বান্দা এমন সত্তার কাছে মরিয়া হয়ে ফিরে যায়, যে তার সম্পর্কে জানে এবং তাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারবে। এমনকি মুশরিকরাও এ রকম সময় এক আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা, কান্নাকাটি, অনুনয়-বিনয় করতে থাকে। জানে যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলাই কেবল তাদের দু'আর উত্তর প্রদানে সক্ষম। কিন্তু যখন বিপদ কেটে যায়, তারা শির্কে ফিরে যায়-যার কথা আল্লাহ কুরআনে বহু জায়গায় বলেছেন এবং যার কারণে মুশরিকদের নিন্দা করেছেন। ১৭১ এই উপদেশের মাধ্যমে নবীজি আমাদের মুশরিকদের বিরোধিতা করতে শিখিয়েছেন। আদেশ করেছেন যেন আমরা সুখের সময়েও আল্লাহকে স্মরণ করি, দ্বীনকে একমাত্র তাঁর জন্যই বিশুদ্ধ করে নিই, তাঁরই নৈকট্য কামনা করি। এর ফলে বান্দার দুঃখের সময়ে বান্দাকে জানা আল্লাহর জন্য জরুরি হয়ে পড়বে।
এরপর বলা হয়েছে শুধু আল্লাহর কাছেই সবকিছু চাইতে এবং তাঁরই সাহায্য কামনা করতে। সুখ-দুঃখ উভয় সময়েই তা করতে হবে।
তারপর সেই মূলনীতি উল্লেখ করা হয়েছে, যার উপর আগের সকল বিষয় নির্মিত হয়েছে-এক আল্লাহই উপকার করেন, ক্ষতিসাধন বা দূরীভূত করেন, দান করেন ও দান করা থেকে বিরত থাকেন, পুরো সৃষ্টিজগৎ মিলেও আল্লাহর নির্ধারিত বিষয়ের অন্যথা করতে অক্ষম।
এই উপলব্ধি বান্দাকে সৃষ্টির উপর নির্ভরতা থেকে মুক্ত করে। বান্দা কোনো সৃষ্টির কাছে হাত পাতা, সাহায্য চাওয়া এবং উপকার ও অপকারের আশা করা থেকে বিরত হয়।১৭২ সৃষ্টির প্রতি বান্দার ভয়ও দূরীভূত হয়। এর আবশ্যক ফলাফলস্বরূপ, সে একমাত্র আল্লাহরই উপাসনা করে এবং আল্লাহরই কাছে সাহায্য চায়। আল্লাহর আনুগত্যকে সে সৃষ্টির আনুগত্যের আগে স্থান দেয়। সমগ্র সৃষ্টিজগৎকে অসন্তুষ্ট করে হলেও বান্দা আল্লাহকে সন্তুষ্ট রাখতে সচেষ্ট হয়ে ওঠে। আবু সাঈদ থেকে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূল ﷺ বলেন, "ইয়াকীনের দুর্বলতার একটি লক্ষণ এই যে, কোনো ব্যক্তি আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে মানুষকে সন্তুষ্ট করতে চায়। আল্লাহ যে রিযক দিয়েছেন, তার জন্য তাদের প্রশংসা করে; আল্লাহ যা তাকে দেননি, তার জন্য তাদের তিরস্কার করে। মানুষ কেবল কামনা করলেই আল্লাহর রিযক লাভ করতে পারে না, আবার কেবল ঘৃণা করলেই তা দূর করতে পারে না।”১৭৩
কবি সত্যিই বলেছিলেন: যদি স্বাদ নিতে জানতে, যখন জীবন তিক্ত, রাগের মুখেও যদি মানুষ শান্ত থাকা শিখত, জীবন সহজ হয় সত্যিকারের ভালোবাসায়ই খালি, পৃথিবীর উপর যা-ই আছে, সেসব তো ধুলাবালি।
জেনে রাখুন, জমিনের উপর চলমান প্রতিটি প্রাণীই কেবল ধুলা আর মাটি। রাজাধিরাজ আল্লাহর আনুগত্যের আগে ধুলাবালি আর মাটির আনুগত্যকে কী করে স্থান দেওয়া সম্ভব? মালিক ও দাতাকে অসন্তুষ্ট করে মাটিকে সন্তুষ্ট করে কী লাভ? সত্যিই অবাক করা ব্যাপার!
কুরআনের বহু জায়গায় এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলাই দান করেন ও দান করা থেকে বিরত থাকেন:
“আল্লাহ মানুষের জন্য যে রহমত খুলে দেন, তা নিবারণ করার কেউ নেই। আর তিনি যা বারিত করেন, কেউ তা প্রেরণ করতে পারে না... "১৭৪
“আল্লাহ যদি তোমাকে কষ্ট দিতে চান, তাহলে তিনি ছাড়া তা দূর করার আর কেউ নেই। আর আল্লাহ যদি তোমার কল্যাণ করতে চান, তাহলে তাঁর অনুগ্রহ রদ করার কেউ নেই... "১৭৫
“বলো, তোমরা কি ভেবে দেখেছ যে, আল্লাহ আমার ক্ষতি করতে চাইলে আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ডাকো, তারা কি সে ক্ষতি দূর করতে পারবে? অথবা তিনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করতে চাইলে তারা কি তাঁর অনুগ্রহ ঠেকাতে পারবে?... "১৭৬
আল্লাহ তা'আলা নূহ-এর উক্তি উল্লেখ করেন :
“হে আমার সম্প্রদায়, আমার অবস্থিতি আর আল্লাহর আয়াতসমূহের দ্বারা তোমাদের প্রতি আমার উপদেশ দান যদি তোমাদের নিকট অসহ্য মনে হয়, (তাতে আমার কোনো পরোয়া নেই, কারণ) আমি তো কেবল আল্লাহর উপর ভরসা করি। তোমরা তোমাদের শরিকদের নিয়ে সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করো। পরে তোমাদের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তোমাদের মাঝে যেন কোনো অস্পষ্টতা না থাকে... "১৭৭
আল্লাহ তা'আলা হুদ-এর উক্তি উল্লেখ করেন :
"আমি আল্লাহকে সাক্ষী রাখছি আর তোমরাও সাক্ষী হও যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাকে তাঁর শরিক করো, তার সাথে আমি পুরোপুরি সম্পর্কহীন। তাঁকে (আল্লাহ) ব্যতীত তোমরা সকলে মিলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করো আর আমাকে একটুও অবকাশ দিয়ো না। আমি নির্ভর করি আল্লাহর উপর, যিনি আমার আর তোমাদের প্রতিপালক... "১৭৮
একজন সালাফ বলেছেন:
আল্লাহ আমার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তা তো হবেই, হুঁশিয়ারি দিয়ে তা এড়ানো গেলে তো এড়ানো যেত কবেই। আমরা যতটা না নিজেদের, তারচেয়ে বেশি আমরা আল্লাহর, আমাদের পরিচয় তো কেবল এক তাকদীরে বাঁধা বান্দাহর।
ফুদাইল আল-ফাকাহ -এর কাছে এক ব্যক্তি একবার নালিশ করল। তিনি জবাব দিলেন, “তুমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে নালিশ করলে?”
একজন সালাফ বলেছেন:
যে রায় ইচ্ছা দাও, তোমার রায় হবে না বাস্তবায়ন, আল্লাহর দেওয়া তাকদীরই হবে আসল কার্যকারণ, রবের অধীনে সবকিছু, তাঁরই ইচ্ছা সর্বদা হয় সাধন।
টিকাঃ
১৬৫ সূরাহ আত-তাওবাহ, ৯:৫১
১৬৬ সূরাহ আল-হাদীদ, ৫৭: ২২
১৬৭ সূরাহ আলে ইমরান, ৩ : ১৫৪
১৬৮ আহমাদ: ২৭৪৯০; ইবন আবি আসিম: ২৪৬; একে হাসান বলেছেন, সুয়তি, আল-জামি : ২৪১৭ এবং ওয়াদিই, সহীহুল মুসনাদ: ১০৫০। আলবানি, যিলালুল জান্নাহ: ২৪৬ এবং আস-সহীহাহ: ২৪৭১-এ একে সমর্থনকারী হাদীসের কারণে সহীহ বলেছেন।
১৬৯ আহমাদ: ২১৫৮৯-২১৬১১-২১৬৫৩; আবু দাউদ: ৪৬৯৯; ইবনু মাজাহ: ৭৭ এই শব্দ সহকারে, “তুমি যদি আল্লাহর রাস্তায় উহুদ পরিমাণ খরচ করো, তাহলেও আল্লাহ তা কবুল করবেন না, যদি না তুমি তাকদিরে বিশ্বাস করো এবং জেনে নাও যে, যা তোমার উপর আপতিত হয়েছে তা হওয়ারই ছিল এবং যা আপতিত হয়নি তা কিছুতেই হওয়ার ছিল না। এ (বিশ্বাস) ছাড়া অন্য কোনো কিছুর উপর মৃত্যুবরণ করলে তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” একে সহীহ বলেছেন ইবনু হিব্বান : ৭২৭ এবং আলবানি, তাখরিজ আবু দাউদ: ৪৬৯৯; আরনাউত বলেছেন এর ইসনাদ শক্তিশালী। তিরমিযি : ২১৪৪ এবং তাবারানি, আল-কাবির: ১১২৪৩ ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ বলেন, "বান্দা ততক্ষণ মুমিন হবে না যতক্ষণ না সে তাকদীরের ভালো-মন্দে বিশ্বাস করে এবং জেনে নেয় যে, যা তার উপর আপতিত হয়েছে তা হওয়ারই ছিল এবং যা আপতিত হয়নি তা কিছুতেই হওয়ার ছিল না।” আলবানি, আস-সহীহাহ: ২৪৩৯ একে সহীহ বলেছেন।
১৭০ যেমন আল্লাহর কালাম, "তারা আল্লাহকে ছেড়ে ইবাদাত করে এমন কিছুর, যা না তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারে আর না উপকার করতে পারে।” [সূরাহ ইউনুস, ১০: ১৮] "তারপরও তারা আল্লাহকে ছেড়ে ইবাদাত করে এমন কিছুর, যা না তাদের সাহায্য করতে পারে, না ক্ষতি।” [সূরাহ আল-ফুরকান, ২৫: ৫৫] "বাবা, কেন আপনি এমন জিনিসের ইবাদাত করেন যা শোনে না, দেখে না, আপনার কোনো কাজেই আসে না?” [সূরাহ মারইয়াম, ১৯: ৪২] "আর তারা তাঁকে বাদ দিয়ে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করেছে অন্য কিছুকে, যারা কিছুই সৃষ্ট করে না; বরং তারা নিজেরাই সৃষ্ট। তারা ক্ষমতা রাখে না নিজেদের ক্ষতি বা উপকার করার, আর ক্ষমতা রাখে না মৃত্যু, জীবন ও পুনরুত্থানের উপর।” [সূরাহ আল-ফুরকান, ২৫: ৩]
১৭১ যেমন আল্লাহর বাণী, “যখন মানুষকে দুঃখ-ক্লেশ স্পর্শ করে, সে শুয়ে, বসে ও দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকে। আর যখন আমি সে দুঃখ-ক্লেশ অপসারণ করে দিই, সে এমনভাবে চলে যায় যেন তাকে দুঃখ-ক্লেশ স্পর্শ করার পর সে আমাকে কখনো ডাকেইনি।” [সূরাহ ইউনুস, ১০: ১২] “তোমরা যে অনুগ্রহই লাভ করে থাকো, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর যখন দুঃখ-কষ্ট তোমাদের স্পর্শ করে, তখন তাঁর কাছেই তোমরা আকুল আবেদন জানাতে থাকো। অতঃপর যখন তিনি তোমাদের থেকে দুঃখ-কষ্ট দূর করে দেন, তখন তোমাদের একদল তাদের প্রতিপালকের সঙ্গে অন্যকে শরিক করে বসে আমি তাদের যা দিয়েছি, তার না-শোকরি করার জন্য। অতএব, তোমরা ভোগ করে নাও। শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে।” [সূরাহ আন-নাহল, ১৬ : ৫০-৫৫] "সমুদ্রে যখন বিপদ তোমাদের পেয়ে বসে, তখন তাঁকে ছাড়া অন্য যাদের তোমরা (উপাস্য ভেবে) আহ্বান করো, তারা (তখন তোমাদের মন থেকে) হারিয়ে যায়। অতঃপর তিনি যখন তোমাদের স্থলে এনে বাঁচিয়ে দেন, তখন তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও। মানুষ হলো বড়ই অকৃতজ্ঞ।” [সূরাহ বানী ইসরাঈল, ১৭: ৬৭] "দুঃখ-মুসিবত যখন মানুষকে স্পর্শ করে, তখন সে তার প্রতিপালককে ডাকতে থাকে তাঁর প্রতি বড়ই একনিষ্ঠ হয়ে। অতঃপর তিনি যখন নিজ পক্ষ থেকে অনুগ্রহ দিয়ে তাকে ধন্য করেন, তখন সে পূর্বে যে জন্য তাঁকে ডেকেছিল তা ভুলে যায় এবং অন্যদের আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করায় তাঁর পথ থেকে পথভ্রষ্ট করার জন্য।” [সূরাহ আয-যুমার, ৩৯: ৮]
১৭২ হালিমি, আল-মিনহাজ ফী শুয়াবুল ঈমানে বলেন, "আশার কয়েক রকম রূপ আছে: ১. আকাঙ্ক্ষিত বস্তু লাভের আশা, ২. তা পাওয়ার পর ধরে রাখার আশা, ৩. অনাকাঙ্ক্ষিত বস্তু থেকে দূরে থাকার আশা, ৪. ঘটে যাওয়া কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত জিনিসের সমাপ্তি দেখার আশা। কারও প্রতি ভয়ের মতো করে আশাও যদি কারও হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে যায়, তাহলে বিনয় ও নম্রতার দিকে ধাবিত করে। কারণ, আশা আর ভয় হাত ধরাধরি করে চলে। ভীত ব্যক্তি ভয়ের বিপরীতটিরও আশা করে। সে আল্লাহর কাছে দু'আ করে, তাঁর কাছে কামনা করে। তেমনি তাঁকে ভয় করা ব্যক্তি আকাঙ্ক্ষিত বস্তু হারানোর ভয় করে এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়। কাজেই যে ব্যক্তিই ভয় করে, সে আশাও করে। আর যে আশা করে, সে ভয়ও করে।”
১৭৩ আবু নুয়াইম, আল-হিলইয়াহ: খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ১০৬; বায়হাকি, শুয়াব: ২০৭-এ বলেন, এর বর্ণনাসূত্রে মুহাম্মাদ ইবনু মারওয়ান আছেন, যিনি যঈফ। যাহাবি, আল-মিযান: খণ্ড ৪, ৩২ পৃষ্ঠায় বলেন, "তাঁরা তাঁকে পরিত্যাগ করেছেন এবং কেউ তাঁর মিথ্যুক হওয়ার অভিযোগ করেন।” এ ছাড়াও এর ইসনাদে আতিয়্যাহ আল-আওফি নামক একজন যঈফ বর্ণনাকারী আছেন। সুয়ুতি, আল-জামি: ২৪৯৩ একে যঈফ বলেছেন এবং আলবানি, আয-যঈফা: ১৪৮২তে একে মাওযু বলেছেন। তাবারানি, আল-কাবির: ১০৫১৪ এবং বায়হাকি : ২০৮ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেন, “আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে কাউকে সন্তুষ্ট কোরো না। আল্লাহর দয়ার কারণে অন্য কারও প্রশংসা কোরো না। আল্লাহ যা (হতে দিতে) চাননি, তার জন্য অন্য কাউকে তিরস্কার কোরো না। কোনো ব্যক্তির চাইলেই আল্লাহর রিযক চলে আসে না এবং কোনো ব্যক্তির অপছন্দ করলেই তা দূর হয়ে যায় না।" আলবানি, যঈফ আত-তারগীব: ১০৬৪ একে মাওযু বলেছেন। বায়হাকি: ২০৯ এবং ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ইয়াকিন : ৩২ এ একই কথা ইবনু মাসউদ এ-এর বক্তব্য হিসেবে এনেছেন। দেখুন অধ্যায় নয়, ফুটনোট: ৩১
১৭৪ সূরাহ ফাতির, ৩৫: ২
১৭৫ সূরাহ ইউনুস, ১০: ১০৭
১৭৬ সূরাহ আয-যুমার, ৩৯: ৩৮
১৭৭ সূরাহ ইউনুস, ১০:৭১
১৭৮ সূরাহ হুদ, ১১:৫৪-৫৬
নবীজি বলেছেন, “সমগ্র সৃষ্টিজগৎ একত্র হয়ে যদি তোমার এমন কোনো উপকার করতে চায়, যা আল্লাহ নির্ধারিত করে রাখেননি, তাহলেও তারা তা করতে সমর্থ হবে না। আর তারা যদি তোমার এমন কোনো ক্ষতি করতে চায়, যা আল্লাহ নির্ধারিত করে রাখেননি, তাহলেও তারা তা করতে সমর্থ হবে না।”
এর অর্থ হলো, বান্দা যত উপকার ও ক্ষতির সম্মুখীন হয়, সবই তার জন্য আগে থেকে নির্ধারিত হয়ে আছে। সমগ্র সৃষ্টিজগৎ মিলে সর্বাত্মক চেষ্টা করেও অনির্ধারিত কোনো বিষয়ের মুখোমুখি তাকে করতে পারবে না। কুরআনের আয়াতেও এটি প্রমাণিত হয়। যেমন:
"বলে দাও, আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারিত করে দিয়েছেন, তা ছাড়া অন্য কিছুই আমাদের ঘটবে না..."১৬৫
“পৃথিবীতে অথবা তোমাদের নিজেদের উপর এমন কোনো বিপদ আসে না, যা আমি সংঘটিত করার পূর্বে কিতাবে লিপিবদ্ধ রাখিনি।...”১৬৬
"...বলে দাও, যদি তোমরা তোমাদের ঘরেও থাকতে, তথাপি যাদের জন্য মৃত্যু নির্ধারিত ছিল, তারা তাদের মৃত্যুর স্থানের পানে বেরিয়েই পড়ত..."১৬৭
ইমাম আহমাদের সূত্রে আবুদ্দারদা থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ বলেন,
“সবকিছুরই একটি হাকিকত রয়েছে। বান্দা ততক্ষণ ঈমানের হাকিকত অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না সে জেনে নিচ্ছে যে, তার সাথে যা ঘটেছে তা ঘটারই ছিল; যা ঘটেনি, তা কিছুতেই ঘটত না।”১৬৮
আবু দাঊদ ও ইবনে মাজাহর সূত্রেও যায়েদ বিন সাবিত থেকে অনুরূপ অর্থের হাদীস বর্ণিত হয়েছে। ১৬৯
জেনে রাখুন, ইবনে আব্বাস -কে দেওয়া পুরো উপদেশটি এই কেন্দ্রীয় মূলনীতিকে ঘিরেই আবর্তিত হয় এবং এরই শাখা হিসেবে বের হয়। বান্দা যখন উপলব্ধি করবে যে, আল্লাহর নির্ধারণ করে রাখা ভালো-মন্দ ও উপকার-অপকার ছাড়া আর কিছুই তার সাথে ঘটবে না, পুরো সৃষ্টিজগৎ মিলে এর অন্যথা করতে চাইলেও ব্যর্থ হবে, সে তখন বুঝতে পারবে যে এক আল্লাহই উপকার করার ও ক্ষতি করার মালিক, তিনিই দেন, তিনিই দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার প্রতি বান্দার তাওহীদ পূর্ণাঙ্গতা পাবে। সে তখন একমাত্র তাঁর কাছেই সাহায্য চাইবে, তাঁর কাছেই প্রার্থনা করবে, তাঁর সামনেই নিজেকে বিনীত ও অবনত করবে। সে শুধু তাঁরই ইবাদাত করবে এবং তাঁর কাছেই সাহায্য চাইবে। কারণ, কারও উপাসনা করা হয়ই এই আশায় যে, উপাস্য কোনো উপকার করবেন এবং কোনো অপকার থেকে বাঁচাবেন। এ জন্যই আল্লাহ অন্য কোনো কিছুর উপাসনা নিষিদ্ধ করেছেন যে, তারা কোনো উপকার বা অপকার করতে পারে না, তাদের উপাসনা নিষ্ফল। ১৭০
যাদের অন্তরে ঈমান ঠিকমতো প্রবেশ করেনি, তারা স্রষ্টার আনুগত্যের আগে সৃষ্টির আনুগত্যকে স্থান দেয় এই ভেবে যে, এগুলো তার কিছু উপকার করবে বা কিছু ক্ষতি থেকে তাকে বাঁচাবে। বান্দা যখন উপলব্ধি করবে যে, একমাত্র আল্লাহই লাভ-ক্ষতি করানোর মালিক, তিনিই দাতা, তিনিই দান থেকে বিরতকারী, তখন বান্দা ইবাদাতের জন্য আল্লাহকেই নির্দিষ্ট করে নেবে এবং সৃষ্টির উপর স্রষ্টাকে প্রাধান্য দেবে। সাহায্য চাওয়ার জন্যও তখন এক আল্লাহরই কাছে শরণাপন্ন হবে।
এই ব্যাপক অর্থপূর্ণ ও অসাধারণ উপদেশে এই সকল বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে, যার প্রতিটিই পর্বতপ্রমাণ গুরুত্বের দাবিদার।
বান্দা কর্তৃক আল্লাহকে হেফাজত করার অর্থ হলো আল্লাহর দেওয়া সীমা মেনে চলা এবং তাঁর অধিকারসমূহ আদায় করা। এটিই তাঁর ইবাদাতের হাকিকত। এর মাধ্যমে উপদেশটি শুরু হয়। তারপর তা এগিয়ে যায় আল্লাহ কর্তৃক বান্দার হেফাজতের দিকে, যার বাস্তবায়ন প্রতিটি বান্দার চূড়ান্ত মনোবাসনা।
এরপর বলা হয়েছে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় বান্দা আল্লাহকে জানলে আল্লাহ তাকে তার দুঃখ-দুর্দশার সময় জানবেন। এটি হলো আল্লাহ কর্তৃক বান্দাকে হেফাজত করার অংশ এবং এর পূর্ণতা দানকারী। দুঃখ-কষ্টের সময়কে বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হলো এটাই সেই সময় যখন বান্দা এমন সত্তার কাছে মরিয়া হয়ে ফিরে যায়, যে তার সম্পর্কে জানে এবং তাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারবে। এমনকি মুশরিকরাও এ রকম সময় এক আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা, কান্নাকাটি, অনুনয়-বিনয় করতে থাকে। জানে যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলাই কেবল তাদের দু'আর উত্তর প্রদানে সক্ষম। কিন্তু যখন বিপদ কেটে যায়, তারা শির্কে ফিরে যায়-যার কথা আল্লাহ কুরআনে বহু জায়গায় বলেছেন এবং যার কারণে মুশরিকদের নিন্দা করেছেন। ১৭১ এই উপদেশের মাধ্যমে নবীজি আমাদের মুশরিকদের বিরোধিতা করতে শিখিয়েছেন। আদেশ করেছেন যেন আমরা সুখের সময়েও আল্লাহকে স্মরণ করি, দ্বীনকে একমাত্র তাঁর জন্যই বিশুদ্ধ করে নিই, তাঁরই নৈকট্য কামনা করি। এর ফলে বান্দার দুঃখের সময়ে বান্দাকে জানা আল্লাহর জন্য জরুরি হয়ে পড়বে।
এরপর বলা হয়েছে শুধু আল্লাহর কাছেই সবকিছু চাইতে এবং তাঁরই সাহায্য কামনা করতে। সুখ-দুঃখ উভয় সময়েই তা করতে হবে।
তারপর সেই মূলনীতি উল্লেখ করা হয়েছে, যার উপর আগের সকল বিষয় নির্মিত হয়েছে-এক আল্লাহই উপকার করেন, ক্ষতিসাধন বা দূরীভূত করেন, দান করেন ও দান করা থেকে বিরত থাকেন, পুরো সৃষ্টিজগৎ মিলেও আল্লাহর নির্ধারিত বিষয়ের অন্যথা করতে অক্ষম।
এই উপলব্ধি বান্দাকে সৃষ্টির উপর নির্ভরতা থেকে মুক্ত করে। বান্দা কোনো সৃষ্টির কাছে হাত পাতা, সাহায্য চাওয়া এবং উপকার ও অপকারের আশা করা থেকে বিরত হয়।১৭২ সৃষ্টির প্রতি বান্দার ভয়ও দূরীভূত হয়। এর আবশ্যক ফলাফলস্বরূপ, সে একমাত্র আল্লাহরই উপাসনা করে এবং আল্লাহরই কাছে সাহায্য চায়। আল্লাহর আনুগত্যকে সে সৃষ্টির আনুগত্যের আগে স্থান দেয়। সমগ্র সৃষ্টিজগৎকে অসন্তুষ্ট করে হলেও বান্দা আল্লাহকে সন্তুষ্ট রাখতে সচেষ্ট হয়ে ওঠে। আবু সাঈদ থেকে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূল ﷺ বলেন, "ইয়াকীনের দুর্বলতার একটি লক্ষণ এই যে, কোনো ব্যক্তি আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে মানুষকে সন্তুষ্ট করতে চায়। আল্লাহ যে রিযক দিয়েছেন, তার জন্য তাদের প্রশংসা করে; আল্লাহ যা তাকে দেননি, তার জন্য তাদের তিরস্কার করে। মানুষ কেবল কামনা করলেই আল্লাহর রিযক লাভ করতে পারে না, আবার কেবল ঘৃণা করলেই তা দূর করতে পারে না।”১৭৩
কবি সত্যিই বলেছিলেন: যদি স্বাদ নিতে জানতে, যখন জীবন তিক্ত, রাগের মুখেও যদি মানুষ শান্ত থাকা শিখত, জীবন সহজ হয় সত্যিকারের ভালোবাসায়ই খালি, পৃথিবীর উপর যা-ই আছে, সেসব তো ধুলাবালি।
জেনে রাখুন, জমিনের উপর চলমান প্রতিটি প্রাণীই কেবল ধুলা আর মাটি। রাজাধিরাজ আল্লাহর আনুগত্যের আগে ধুলাবালি আর মাটির আনুগত্যকে কী করে স্থান দেওয়া সম্ভব? মালিক ও দাতাকে অসন্তুষ্ট করে মাটিকে সন্তুষ্ট করে কী লাভ? সত্যিই অবাক করা ব্যাপার!
কুরআনের বহু জায়গায় এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলাই দান করেন ও দান করা থেকে বিরত থাকেন:
“আল্লাহ মানুষের জন্য যে রহমত খুলে দেন, তা নিবারণ করার কেউ নেই। আর তিনি যা বারিত করেন, কেউ তা প্রেরণ করতে পারে না... "১৭৪
“আল্লাহ যদি তোমাকে কষ্ট দিতে চান, তাহলে তিনি ছাড়া তা দূর করার আর কেউ নেই। আর আল্লাহ যদি তোমার কল্যাণ করতে চান, তাহলে তাঁর অনুগ্রহ রদ করার কেউ নেই... "১৭৫
“বলো, তোমরা কি ভেবে দেখেছ যে, আল্লাহ আমার ক্ষতি করতে চাইলে আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ডাকো, তারা কি সে ক্ষতি দূর করতে পারবে? অথবা তিনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করতে চাইলে তারা কি তাঁর অনুগ্রহ ঠেকাতে পারবে?... "১৭৬
আল্লাহ তা'আলা নূহ-এর উক্তি উল্লেখ করেন :
“হে আমার সম্প্রদায়, আমার অবস্থিতি আর আল্লাহর আয়াতসমূহের দ্বারা তোমাদের প্রতি আমার উপদেশ দান যদি তোমাদের নিকট অসহ্য মনে হয়, (তাতে আমার কোনো পরোয়া নেই, কারণ) আমি তো কেবল আল্লাহর উপর ভরসা করি। তোমরা তোমাদের শরিকদের নিয়ে সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করো। পরে তোমাদের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তোমাদের মাঝে যেন কোনো অস্পষ্টতা না থাকে... "১৭৭
আল্লাহ তা'আলা হুদ-এর উক্তি উল্লেখ করেন :
"আমি আল্লাহকে সাক্ষী রাখছি আর তোমরাও সাক্ষী হও যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাকে তাঁর শরিক করো, তার সাথে আমি পুরোপুরি সম্পর্কহীন। তাঁকে (আল্লাহ) ব্যতীত তোমরা সকলে মিলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করো আর আমাকে একটুও অবকাশ দিয়ো না। আমি নির্ভর করি আল্লাহর উপর, যিনি আমার আর তোমাদের প্রতিপালক... "১৭৮
একজন সালাফ বলেছেন:
আল্লাহ আমার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তা তো হবেই, হুঁশিয়ারি দিয়ে তা এড়ানো গেলে তো এড়ানো যেত কবেই। আমরা যতটা না নিজেদের, তারচেয়ে বেশি আমরা আল্লাহর, আমাদের পরিচয় তো কেবল এক তাকদীরে বাঁধা বান্দাহর।
ফুদাইল আল-ফাকাহ -এর কাছে এক ব্যক্তি একবার নালিশ করল। তিনি জবাব দিলেন, “তুমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে নালিশ করলে?”
একজন সালাফ বলেছেন:
যে রায় ইচ্ছা দাও, তোমার রায় হবে না বাস্তবায়ন, আল্লাহর দেওয়া তাকদীরই হবে আসল কার্যকারণ, রবের অধীনে সবকিছু, তাঁরই ইচ্ছা সর্বদা হয় সাধন।
টিকাঃ
১৬৫ সূরাহ আত-তাওবাহ, ৯:৫১
১৬৬ সূরাহ আল-হাদীদ, ৫৭: ২২
১৬৭ সূরাহ আলে ইমরান, ৩ : ১৫৪
১৬৮ আহমাদ: ২৭৪৯০; ইবন আবি আসিম: ২৪৬; একে হাসান বলেছেন, সুয়তি, আল-জামি : ২৪১৭ এবং ওয়াদিই, সহীহুল মুসনাদ: ১০৫০। আলবানি, যিলালুল জান্নাহ: ২৪৬ এবং আস-সহীহাহ: ২৪৭১-এ একে সমর্থনকারী হাদীসের কারণে সহীহ বলেছেন।
১৬৯ আহমাদ: ২১৫৮৯-২১৬১১-২১৬৫৩; আবু দাউদ: ৪৬৯৯; ইবনু মাজাহ: ৭৭ এই শব্দ সহকারে, “তুমি যদি আল্লাহর রাস্তায় উহুদ পরিমাণ খরচ করো, তাহলেও আল্লাহ তা কবুল করবেন না, যদি না তুমি তাকদিরে বিশ্বাস করো এবং জেনে নাও যে, যা তোমার উপর আপতিত হয়েছে তা হওয়ারই ছিল এবং যা আপতিত হয়নি তা কিছুতেই হওয়ার ছিল না। এ (বিশ্বাস) ছাড়া অন্য কোনো কিছুর উপর মৃত্যুবরণ করলে তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” একে সহীহ বলেছেন ইবনু হিব্বান : ৭২৭ এবং আলবানি, তাখরিজ আবু দাউদ: ৪৬৯৯; আরনাউত বলেছেন এর ইসনাদ শক্তিশালী। তিরমিযি : ২১৪৪ এবং তাবারানি, আল-কাবির: ১১২৪৩ ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ বলেন, "বান্দা ততক্ষণ মুমিন হবে না যতক্ষণ না সে তাকদীরের ভালো-মন্দে বিশ্বাস করে এবং জেনে নেয় যে, যা তার উপর আপতিত হয়েছে তা হওয়ারই ছিল এবং যা আপতিত হয়নি তা কিছুতেই হওয়ার ছিল না।” আলবানি, আস-সহীহাহ: ২৪৩৯ একে সহীহ বলেছেন।
১৭০ যেমন আল্লাহর কালাম, "তারা আল্লাহকে ছেড়ে ইবাদাত করে এমন কিছুর, যা না তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারে আর না উপকার করতে পারে।” [সূরাহ ইউনুস, ১০: ১৮] "তারপরও তারা আল্লাহকে ছেড়ে ইবাদাত করে এমন কিছুর, যা না তাদের সাহায্য করতে পারে, না ক্ষতি।” [সূরাহ আল-ফুরকান, ২৫: ৫৫] "বাবা, কেন আপনি এমন জিনিসের ইবাদাত করেন যা শোনে না, দেখে না, আপনার কোনো কাজেই আসে না?” [সূরাহ মারইয়াম, ১৯: ৪২] "আর তারা তাঁকে বাদ দিয়ে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করেছে অন্য কিছুকে, যারা কিছুই সৃষ্ট করে না; বরং তারা নিজেরাই সৃষ্ট। তারা ক্ষমতা রাখে না নিজেদের ক্ষতি বা উপকার করার, আর ক্ষমতা রাখে না মৃত্যু, জীবন ও পুনরুত্থানের উপর।” [সূরাহ আল-ফুরকান, ২৫: ৩]
১৭১ যেমন আল্লাহর বাণী, “যখন মানুষকে দুঃখ-ক্লেশ স্পর্শ করে, সে শুয়ে, বসে ও দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকে। আর যখন আমি সে দুঃখ-ক্লেশ অপসারণ করে দিই, সে এমনভাবে চলে যায় যেন তাকে দুঃখ-ক্লেশ স্পর্শ করার পর সে আমাকে কখনো ডাকেইনি।” [সূরাহ ইউনুস, ১০: ১২] “তোমরা যে অনুগ্রহই লাভ করে থাকো, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর যখন দুঃখ-কষ্ট তোমাদের স্পর্শ করে, তখন তাঁর কাছেই তোমরা আকুল আবেদন জানাতে থাকো। অতঃপর যখন তিনি তোমাদের থেকে দুঃখ-কষ্ট দূর করে দেন, তখন তোমাদের একদল তাদের প্রতিপালকের সঙ্গে অন্যকে শরিক করে বসে আমি তাদের যা দিয়েছি, তার না-শোকরি করার জন্য। অতএব, তোমরা ভোগ করে নাও। শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে।” [সূরাহ আন-নাহল, ১৬ : ৫০-৫৫] "সমুদ্রে যখন বিপদ তোমাদের পেয়ে বসে, তখন তাঁকে ছাড়া অন্য যাদের তোমরা (উপাস্য ভেবে) আহ্বান করো, তারা (তখন তোমাদের মন থেকে) হারিয়ে যায়। অতঃপর তিনি যখন তোমাদের স্থলে এনে বাঁচিয়ে দেন, তখন তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও। মানুষ হলো বড়ই অকৃতজ্ঞ।” [সূরাহ বানী ইসরাঈল, ১৭: ৬৭] "দুঃখ-মুসিবত যখন মানুষকে স্পর্শ করে, তখন সে তার প্রতিপালককে ডাকতে থাকে তাঁর প্রতি বড়ই একনিষ্ঠ হয়ে। অতঃপর তিনি যখন নিজ পক্ষ থেকে অনুগ্রহ দিয়ে তাকে ধন্য করেন, তখন সে পূর্বে যে জন্য তাঁকে ডেকেছিল তা ভুলে যায় এবং অন্যদের আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করায় তাঁর পথ থেকে পথভ্রষ্ট করার জন্য।” [সূরাহ আয-যুমার, ৩৯: ৮]
১৭২ হালিমি, আল-মিনহাজ ফী শুয়াবুল ঈমানে বলেন, "আশার কয়েক রকম রূপ আছে: ১. আকাঙ্ক্ষিত বস্তু লাভের আশা, ২. তা পাওয়ার পর ধরে রাখার আশা, ৩. অনাকাঙ্ক্ষিত বস্তু থেকে দূরে থাকার আশা, ৪. ঘটে যাওয়া কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত জিনিসের সমাপ্তি দেখার আশা। কারও প্রতি ভয়ের মতো করে আশাও যদি কারও হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে যায়, তাহলে বিনয় ও নম্রতার দিকে ধাবিত করে। কারণ, আশা আর ভয় হাত ধরাধরি করে চলে। ভীত ব্যক্তি ভয়ের বিপরীতটিরও আশা করে। সে আল্লাহর কাছে দু'আ করে, তাঁর কাছে কামনা করে। তেমনি তাঁকে ভয় করা ব্যক্তি আকাঙ্ক্ষিত বস্তু হারানোর ভয় করে এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়। কাজেই যে ব্যক্তিই ভয় করে, সে আশাও করে। আর যে আশা করে, সে ভয়ও করে।”
১৭৩ আবু নুয়াইম, আল-হিলইয়াহ: খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ১০৬; বায়হাকি, শুয়াব: ২০৭-এ বলেন, এর বর্ণনাসূত্রে মুহাম্মাদ ইবনু মারওয়ান আছেন, যিনি যঈফ। যাহাবি, আল-মিযান: খণ্ড ৪, ৩২ পৃষ্ঠায় বলেন, "তাঁরা তাঁকে পরিত্যাগ করেছেন এবং কেউ তাঁর মিথ্যুক হওয়ার অভিযোগ করেন।” এ ছাড়াও এর ইসনাদে আতিয়্যাহ আল-আওফি নামক একজন যঈফ বর্ণনাকারী আছেন। সুয়ুতি, আল-জামি: ২৪৯৩ একে যঈফ বলেছেন এবং আলবানি, আয-যঈফা: ১৪৮২তে একে মাওযু বলেছেন। তাবারানি, আল-কাবির: ১০৫১৪ এবং বায়হাকি : ২০৮ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেন, “আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে কাউকে সন্তুষ্ট কোরো না। আল্লাহর দয়ার কারণে অন্য কারও প্রশংসা কোরো না। আল্লাহ যা (হতে দিতে) চাননি, তার জন্য অন্য কাউকে তিরস্কার কোরো না। কোনো ব্যক্তির চাইলেই আল্লাহর রিযক চলে আসে না এবং কোনো ব্যক্তির অপছন্দ করলেই তা দূর হয়ে যায় না।" আলবানি, যঈফ আত-তারগীব: ১০৬৪ একে মাওযু বলেছেন। বায়হাকি: ২০৯ এবং ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ইয়াকিন : ৩২ এ একই কথা ইবনু মাসউদ এ-এর বক্তব্য হিসেবে এনেছেন। দেখুন অধ্যায় নয়, ফুটনোট: ৩১
১৭৪ সূরাহ ফাতির, ৩৫: ২
১৭৫ সূরাহ ইউনুস, ১০: ১০৭
১৭৬ সূরাহ আয-যুমার, ৩৯: ৩৮
১৭৭ সূরাহ ইউনুস, ১০:৭১
১৭৮ সূরাহ হুদ, ১১:৫৪-৫৬