📄 আল্লাহকে হেফাজত করা
নবীজি -এর কথা “আল্লাহকে হেফাজত করো, তাহলে তিনি তোমাকে হেফাজত করবেন” এর অর্থ হলো আল্লাহর নির্ধারণ করা সীমা মেনে চলা, তাঁর অধিকার সংরক্ষণ করা, তাঁর আদেশ-নিষেধ পালন করা। এটি করার উপায় হলো আল্লাহ যা আদেশ করেছেন, তা পালন করা; যা থেকে নিষেধ করেছেন, তা পরিহার করা; আল্লাহ যে সীমা প্রদান করেছেন তা লঙ্ঘন করে হারামে পতিত না হওয়া।
অতএব, এই বাক্য থেকে সেই সকল দায়িত্ব পালন করা ও সেই সকল নিষিদ্ধ কাজ পরিহার করাকে বোঝায়, যার কথা বলা হয়েছে আবু সালাবা থেকে বর্ণিত হাদীসে। রাসূল ﷺ বলেন,
"আল্লাহ বিভিন্ন দায়িত্ব ফরয করেছেন, অতএব এগুলোতে শিথিলতা কোরো না। তিনি অনেক বিষয় হারাম করেছেন, অতএব এগুলোতে লিপ্ত হোয়ো না। আর তিনি সীমা স্থাপন করেছেন, তা লঙ্ঘন কোরো না।”১৫
উপরের এই সবকিছুই 'আল্লাহর সীমা সংরক্ষণ করার অন্তর্ভুক্ত, যা কুরআনের এই আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয়:
"...যারা আল্লাহর নির্ধারিত সীমা সংরক্ষণকারী... "১৬
“এ হলো তা-ই, যার ওয়াদা তোমাদের দেওয়া হয়েছিল-প্রত্যেক আল্লাহ-অভিমুখী ও (গুনাহ থেকে) খুব বেশি হেফাজতকারীর জন্য। যে না দেখে দয়াময় (আল্লাহ)-কে ভয় করত, আল্লাহর নির্দেশ পালনের জন্য বিনয়ে অবনত অন্তর নিয়ে উপস্থিত হতো। "১৮
এই আয়াতে "হেফাজতকারী"র ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর আদেশসমূহ সংরক্ষণ করে। ১৯ আরেক অর্থ হলো সেই ব্যক্তি, গুনাহের কারণে যার উৎকণ্ঠা তাকে তাওবাহ ও গুনাহ পরিত্যাগের দিকে নিয়ে যায়।২০ এই আয়াতে উভয় অর্থই প্রকাশ পায়। এ ছাড়া যারা হাক্কুল ইবাদ বা আল্লাহর বান্দাদের অধিকার সংরক্ষণ করে, তারাও এ আয়াতের আওতায় পড়ে। এই সকল দিকই একটি মৌলিক অর্থকে ঘিরে আবর্তিত হয়।
জান্নাতের নিয়ামাতের ব্যাপারে একটি হাদীসে বলা হয়েছে,
“যখন আল্লাহ তা'আলা জান্নাতবাসীদের তাঁকে দেখার জন্য আহ্বান করবেন, তখন পর্দা সরিয়ে দেওয়ার পর তিনি বলবেন, 'স্বাগতম, হে আমার বান্দারা, যারা আমার অধিকার সংরক্ষণ করেছিলে, আমার সাথে কৃত ওয়াদা পূরণ করেছিলে, আর আমাকে গোপনে ভয় করেছিলে; যারা প্রত্যেক অবস্থায় আমার প্রতি ভীত ছিলে।”২২
অতএব, উপরে বর্ণিত সকল বিষয় আল্লাহকে হেফাজত করার বিষয়ে ইবনু আব্বাস -এর প্রতি রাসূলুল্লাহ -এর আদেশের অন্তর্ভুক্ত।
১.১ সালাত সংরক্ষণ করা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেসব বিষয় হেফাজত করতে হবে, তার একটি হলো দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত ফরয সালাত। আল্লাহ তা'আলা বলেন :
“তোমরা সালাতের হেফাজত করো, বিশেষত মধ্যবর্তী সালাত... ”২৩
"...যারা তাদের সালাত সংরক্ষণকারী।”২৪
নবীজি বলেন, "যারা এগুলোর হেফাজত করে, আল্লাহ তাদের জান্নাতে প্রবেশ করানোর ওয়াদা করেছেন।”২৫
আরেক হাদীসে আছে, "যারা এগুলোর হেফাজত করে, তা তাদের জন্য কিয়ামাতের দিন নূর, প্রমাণ ও মুক্তির কারণ হবে।”২৬
১.২ পাক-পবিত্রতা হেফাজত করা
একই বিষয় পাক-পবিত্রতার ক্ষেত্রেও সত্য, কারণ এটি সালাতের চাবি। নবীজি বলেন, “মুমিন ছাড়া আর কেউই ওযুর হেফাজত করে না।”২৮
কারণ, বান্দা নিজের অজান্তেই ওযু ভেঙে ফেলতে পারে। ওযু রাখার ব্যাপারে সচেতন থাকার অর্থ হলো অন্তরে ঈমান সঠিকভাবে প্রোথিত হয়েছে।
১.৩ শপথের হেফাজত করা
আল্লাহ যেসব বিষয় হেফাজত করতে আদেশ করেছেন, তার একটি হলো শপথ। কসম ভঙ্গ করার কাফফারার বিধান দেওয়ার পর আল্লাহ বলেন:
"এগুলো হলো তোমাদের শপথের কাফফারা, যখন তোমরা শপথ করো।
“তোমরা তোমাদের শপথ হেফাজত করবে।”২৯
মানুষ অহরহ শপথ করে থাকে। এগুলোর একেকটি ভঙ্গ করা একেক পর্যায়ের গুরুতর পাপ। কখনো কসম ভাঙার কাফফারা দিতে হয়। কোনো ক্ষেত্রে খুব গুরুতর কাফফারা প্রয়োজন (কাফফারা মুগাল্লাযা)। আবার কিছু ক্ষেত্রে তালাক পতিত হয়ে যায়। যে ব্যক্তি শপথ রক্ষা করার ব্যাপারে সচেতন থাকে, নিশ্চয়ই তার অন্তরে ঈমান প্রবেশ করেছে।
সালাফগণ সতর্কতার সাথে নিজেদের শপথ রক্ষা করতেন। তাঁদের কেউ কেউ তো কখনোই আল্লাহর নামে কসম করতেন না। আবার কেউ কেউ শপথ ভেঙে গেছে ধরে নিয়ে কাফফারা আদায় করে দিতেন। ইমাম আহমাদ মৃত্যুশয্যায় থাকা অবস্থায় ওসিয়ত করেন যেন তাঁর পক্ষ থেকে কসম ভাঙার কাফফারা আদায় করা হয়। তিনি বলেন, “আমার মনে হয় আমি কোনো কৃত শপথ ভঙ্গ করেছি।”
বর্ণিত আছে যে, আইয়ুব যদি কাউকে আল্লাহর নামে শপথ করতে শুনতেন, তাহলে অসাবধানতাবশত গুনাহে লিপ্ত হওয়া থেকে তাকে বাঁচানোর জন্য তার পক্ষ থেকে কাফফারা আদায় করে দিতেন। এ কারণে তিনি যখন স্ত্রীকে এক শ আঘাত করার কসম করে বসেন, তখন আল্লাহ তাঁর জন্য সহজ পথ বের করে দেন।৩০ কারণ, তিনি অন্যদের কসম হেফাজত করার ব্যাপারে সাবধানী ছিলেন। তাঁর এই বিশেষ বিধান অন্য মানুষদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য কি না, এ ব্যাপারে আলিমগণের মতভেদ আছে।
ইয়াযিদ ইবনু আবি হাবিব (রহঃ) বলেন, “আমার কাছে এই বর্ণনা পৌঁছেছে যে, আরশ বহনকারীদের মাঝে একজনের চোখ থেকে নদীর মতো অশ্রু প্রবাহিত হয়। তিনি মাথা তোলার পর বলেন, 'আপনি সুমহান! আপনাকে সেভাবে ভয় করা হয় না, যেমন ভয় করার আপনি যোগ্য।' আল্লাহ বলেন, 'তারপরও যারা আমার নামে মিথ্যা শপথ করে, তারা তা অনুধাবন করে না।”
মিথ্যা শপথ করার ব্যাপারে খুবই কড়া ধমক এসেছে। অতিরিক্ত কসম করা, আল্লাহর নামে মিথ্যা শপথ করা- এগুলোর কারণ হলো আল্লাহর ব্যাপারে অজ্ঞতা ও অন্তরে সম্মানের অভাব।
১.৪ মাথা ও পেট হেফাজত করা
যেসব জিনিস হেফাজত করা মুমিনদের অবশ্য কর্তব্য, তার মধ্যে রয়েছে মাথা ও পেট। ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ বলেন, "আল্লাহকে সঠিকভাবে লজ্জা করতে হলে অবশ্যই মাথা ও মাথা যা ধারণ করে এবং পেট ও পেট যা ধারণ করে, সেসবের হেফাজত করতে হবে।” এটি বর্ণিত হয়েছে আহমাদ ও তিরমিযিতে। ৩১
মাথা ও মাথা যা ধারণ করে, এর অন্তর্ভুক্ত হলো কান, চোখ ও জিহ্বা। কোনো হারাম জিনিস শোনা, দেখা বা স্বাদ গ্রহণ করা থেকে এদের হেফাজত করতে হবে। পেট ও পেট যা ধারণ করে, তার মধ্যে রয়েছে অন্তর। হারাম জিনিসে লিপ্ত থাকতে চাওয়া থেকে অন্তরকে হেফাজত করতে হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন: "শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও অন্তর-এ প্রত্যেকটি জিজ্ঞাসিত হবে।”৩২ এ ছাড়া হারাম জিনিস খাওয়া থেকে পেটকে হেফাজত করাও এর অন্তর্ভুক্ত।
১.৫ জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের হেফাজত করা
হারামে লিপ্ত হওয়া থেকে জিহ্বা ও লজ্জাস্থানকে হেফাজত করাও ফরয। আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ বলেন, “দুই চোয়াল ও দুই উরুর মাঝে যা আছে, সেগুলোর হেফাজত যে করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” এটি বর্ণিত হয়েছে মুস্তাদরাক আল-হাকিম।৩৩ বুখারিতেও সাদ ইবনু সাহল -এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে,
“দুই চোয়াল ও দুই উরুর মাঝে যা আছে, সেগুলোর হেফাজত করার ব্যাপারে যে আমাকে নিশ্চয়তা দিতে পারবে, আমি তাকে জান্নাতের নিশ্চয়তা জানাচ্ছি।”৩৪
মুসনাদু আহমাদে আবু মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, “দুই চোয়াল ও দুই উরুর মাঝে যা আছে, সেগুলো যে হেফাজত করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”৩৫
আল্লাহ তা'আলা বিশেষ করে লজ্জাস্থানের হেফাজতের কথা উল্লেখ করেছেন এবং এর হেফাজতকারীদের প্রশংসা করেছেন,
“মুমিন পুরুষদের বলুন যেন তারা তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।"৩৬
“...লজ্জাস্থানের হেফাজতকারী পুরুষ ও নারী...”৩৭
“...যারা তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে-শুধু তাদের স্ত্রী ও দক্ষিণ হস্ত মালিকানা (ক্রীতদাসী) ব্যতীত, কারণ সে ক্ষেত্রে তারা নিন্দা থেকে মুক্ত।”৩৮
বর্ণিত আছে যে, আবু ইদরীস আল-খাওলানি বলেন, “আদাম যখন জমিনে অবতরণ করেন, তখন আল্লাহ সর্বপ্রথম তাঁকে আদেশ দিয়েছিলেন লজ্জাস্থানের হেফাজত করার এবং হালাল স্থান ছাড়া অন্য কোথাও তা ব্যবহার না করার।”
টিকাঃ
১৫ দারুকুতনি: খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৮৩, হাদীস নং ৪৩৮৬; তাবারানি, আল-কাবির: খণ্ড ২২, পৃষ্ঠা ২২১
১৬ সূরাহ আত-তাওবাহ, ৯ : ১১২
১৭ অথবা "...যারা গোপনে আর-রহমানকে ভয় করে..."
১৮ সূরাহ কাফ, ৫০: ৩২-৩৩
১৯ তাবারি থেকে বর্ণিত কাতাদাহ'র ব্যাখ্যা।
২০ বায়হাকি থেকে বর্ণিত সাইদ ইবনু সিনানের ব্যাখ্যা। তাবারি থেকে বর্ণিত ইবনু আব্বাস, সাইদ ইবনুল মুসাইয়্যিব, মুজাহিদ ও উবাইদ ইবনু উমাইরের ব্যাখ্যা। সুয়ুতির আদ-দুররুল মানসুর।
২১ তাবারানি ও অন্যান্য কর্তৃক উল্লেখিত।
২২ ইবনু আবিদ্দুনিয়া, সিফাতুল জান্নাহ: পৃষ্ঠা ৫৩ এবং আবু নুয়াইম, সিফাতুল জান্নাহ: পৃষ্ঠা ৪১১, মুনযিরি, আত-তারগীব: খণ্ড ৪, ৩০৭ পৃষ্ঠায় বলেন, নবীজি -এর হাদীস হিসেবে এটি মুনকার। আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: খণ্ড ২, ৫২০ পৃষ্ঠায় ইবনু কাসির বলেন, "এটি মুরসাল যঈফ গারীব। এর ব্যাপারে সর্বোচ্চ যা বলা যায় তা হলো, এটি কোনো সালাফের উক্তি যা ভুল করে নবীজি -এর নামে প্রচারিত হয়েছে। আল্লাহই ভালো জানেন।" হাদিউল আরওয়াহর ২৩৩ পৃষ্ঠায় ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, এটি নবীজির হাদীস হিসেবে সহীহ নয়।
২৩ সূরাহ আল-বাকারাহ, ২: ২৩৮
২৪ সূরাহ আল-মা'আরিজ, ৭০: ৩৪
২৫ মালিক: ২৬৮; আবু দাউদ: ৪২৫; নাসাঈ: ৪৬২; ইবনু মাজাহ: ১৪০১; ইবনু হিব্বান: ১৭৩২-২৪১৭ তে একে সহীহ বলেছেন; ইবনু আব্দুল বার, আত-তামহিদ: খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ১৮৭; নববী, খুলাসাতুল আহকাম: ১৮৫৯; আলবানি, সহীহ আত-তারগীব: ৩৭০
২৬ আহমাদ: ৬৫৭৬; তাবারানি, আল-আসওয়াত: ১৭৮৮; ইবনু হিব্বান: ১৪৬৭ ও ইরাকি, তারহুত তাসরিব: খণ্ড ২, ১৪৭ পৃষ্ঠায় একে সহীহ বলেছেন। মুনযিরি, আত-তারগীব: খণ্ড ১, ২৬৪ পৃষ্ঠাতে এর ইসনাদকে জাইয়্যিদ বলেছেন। তানকিহুত তাহকীক: খণ্ড ১, ৩০০ পৃষ্ঠাতে যাহাবিও এ কথা বলেছেন। হাইসামি: খণ্ড ১, ২৯২ পৃষ্ঠায় বলেন, "আহমাদের বর্ণনাকারীগণ সিকাহ”। আরনাউত একে মুসনাদের টীকায় হাসান এবং ইবনু হিব্বানের টীকায় সহীহ বলেছেন।
২৭ আলি থেকে বর্ণিত, নবীজি বলেন, “পবিত্রতা হলো সালাতের চাবি। তাকবির তার (সালাতের বাইরের সকল কাজ) হারামকারী এবং সালাম ফেরানো তার হালালকারী।” তিরমিযি: ৩; এ ছাড়া জাবির থেকে (৪) এবং আবু সাইদ আল-খুদরি থেকে (২৩৮) এটি বর্ণিত হয়েছে।
২৮ আহমাদ: ২২৩৭৮-২২৪৩৩-২২৪৩৬; ইবনু মাজাহ: ২৭৭; দারিমি: ৬৫৫, সাওবান থেকে বর্ণিত। জামিউস সগির: ৯৯৪ নং-এ সুয়ুতি একে সহীহ বলেছেন; আমালিতে মুনযিরি ইরাকির উদ্ধৃতি দিয়ে একে হাসান বলেছেন; আরনাউতের মতে সহীহ লি গাইরিহি; আলবানি, সহীহুত তারগীব: ১৯৭-৩৭৯
২৯ সূরাহ আল-মায়িদাহ, ৫: ৮৯
৩০ "কিছু ঘাস নাও আর তা দিয়ে আঘাত করো। এবং শপথ ভঙ্গ কোরো না।" (সূরাহ সোয়াদ, ৩৮:৪৪) যিহার এর কাফফারাঃ নিজ স্ত্রীকে কিংবা তার কোন অঙ্গকে মায়ের সাথে, কিংবা স্থায়ীভাবে বিয়ে হারাম এমন কোন মহিলার পৃষ্ঠদেশের সমতুল্য বলে আখ্যায়িত করাকে আরবিতে যিহার বলে। এ কথার উদ্দেশ্য হলো মা ও মাহরামের সাথে মেলামেশা যেমন হারাম, ঠিক তেমনি স্ত্রীর সাথেও হারাম করা- শর'ঈ সম্পাদক
৩১ আহমাদ : ৩৬৫১; তিরমিযি: ২৪৫৮; তিরমিযি বলেছেন হাদীসটি গারীব। আরনাউত বলেছেন এর ইসনাদ যঈফ। সহীহ আত-তারগীব: ১৭২৪-২৬৩৮-৩৩৩৭ একে হাসান লি গাইরিহি বলেছেন।
৩২ সূরাহ বানী ইসরাঈল, ১৭ : ৩৬
৩৩ হাকিম : ৮০৫৮; তিনি একে সহীহ বলেছেন। যাহাবি তাঁর সাথে একমত। একই অর্থের একটি হাদীস রয়েছে তিরমিযি : ২৪০৯-এ। তিনি একে হাসান সহীহ বলেছেন। এ ছাড়া আবু হুরায়রা থেকে ইবনে হিব্বানে (৫৭০৩) বর্ণিত হয়েছে, “আল্লাহ যাকে তার দুই ঠোঁট ও দুই পায়ের মধ্যবর্তী বস্তুর অকল্যাণ থেকে রক্ষা করেন, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
৩৪ বুখারি: ৬৪৭৪-৬৮০৭
৩৫ আহমাদ: ১৯৫৫৯; হাকিম: ৮০৬৩; আরনাউত একে হাসান লি গাইরিহি বলেছেন।
৩৬ সূরাহ আন-নূর, ২৪: ৩০
৩৭ সূরাহ আল-আহযাব, ৩৩: ৩৫
৩৮ সূরাহ আল-মুমিনুন, ২৩: ৫-৬
📄 আল্লাহ্ তোমাকে হেফাজত করবেন
নবীজি -এর কথা “তিনি তোমাকে হেফাজত করবেন” এর অর্থ হলো- যে কেউ আল্লাহর দেওয়া সীমা সংরক্ষণ করে ও তাঁর অধিকারসমূহ আদায় করে, তাকে আল্লাহ হেফাজত করবেন। কারণ, যেমন কর্ম তেমন ফল। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
“...আমার সঙ্গে তোমাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করো, আমিও তোমাদের সঙ্গে আমার অঙ্গীকার পূর্ণ করব...”৩১
“আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।”৪০
“...তোমরা যদি আল্লাহকে সাহায্য করো, তিনি তোমাদের সাহায্য করবেন... ৪১
আল্লাহ কর্তৃক বান্দাকে হেফাজত করা হয় দুই রকমে :
এক. এমন জিনিসের ব্যাপারে তাকে হেফাজত করা, যা দুনিয়ায় তার উপকার করবে। যেমন: তার শরীর, সন্তান, পরিবার ও সম্পদ।
ইবনে উমার থেকে বর্ণিত আছে রাসূল ঘুম থেকে জাগার পর ও ঘুমাতে যাওয়ার আগে এই দু'আ করা কখনোই ত্যাগ করেননি,
“হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে এই দুনিয়া ও আখিরাতের ক্ষমা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ, আমি আপনার নিকট ক্ষমা ও নিরাপত্তা চাচ্ছি আমার দ্বীন, দুনিয়া, পরিবার ও অর্থ-সম্পদের। হে আল্লাহ, আপনি আমার গোপন ত্রুটিসমূহ ঢেকে রাখুন, আমার উদ্বিগ্নতাকে রূপান্তর করুন নিরাপত্তায়। হে আল্লাহ, আপনি আমাকে হেফাজত করুন আমার সামনের দিক থেকে, আমার পেছনের দিক থেকে, আমার ডান দিক থেকে, আমার বাম দিক থেকে এবং আমার উপরের দিক থেকে। আর আপনার মহত্ত্বের উসিলায় আশ্রয় চাই আমার নিচ থেকে
হঠাৎ আক্রান্ত হওয়া থেকে।” আহমাদ, আবু দাউদ, নাসাঈ ও ইবনু মাজাহতে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। ৪২
দু'আটি আল্লাহর এই আয়াতের মর্মকথা:
“মানুষের সামনে ও পেছনে পাহারাদার (ফেরেশতা) নিযুক্ত আছে, যারা আল্লাহর হুকুম মোতাবেক তাকে রক্ষণাবেক্ষণ করে।”৪৩
ইবনু আব্বাস বলেন, “তাঁরা হলেন ফেরেশতা, যারা আল্লাহর হুকুমে তাকে রক্ষণাবেক্ষণ করেন। আর যখন নির্ধারিত বিষয় চলে আসে, তাঁরা তাকে পরিত্যাগ করেন। "৪৪
আলি বলেন, “দুইজন ফেরেশতা নিযুক্ত থেকে ব্যক্তিকে সেইসব বিষয় থেকে রক্ষা করেন, যা তাকদিরে নির্ধারিত নয়। তারপর যখন নির্ধারিত বিষয় চলে আসে, তাঁরা তাকে ছেড়ে যান। মনে রেখো, নির্ধারিত সময় হলো সুরক্ষিত ঢালের মতো।”৪৫
মুজাহিদ বলেন, "প্রতিটি মানুষের সাথেই ফেরেশতা আছেন, যারা তাকে তার জাগ্রত ও ঘুমন্ত অবস্থায় জিন, মানুষ ও ক্ষতিকর প্রাণী থেকে হেফাজত করেন। বান্দার কাছে এ রকম যা-ই আসে, তাকেই তাঁরা বলেন, 'দূর হও তুমি!' শুধু সেসব ব্যতীত, যেগুলো দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ অনুমতি দিয়েছেন।” ৪৬
২.১ আল্লাহ কর্তৃক স্বাস্থ্য ও সম্পদের হেফাজত
আল্লাহ কর্তৃক বান্দাকে হেফাজত করার একটি ধরন হলো বান্দার স্বাস্থ্য, শক্তি, বুদ্ধি ও সম্পদ সংরক্ষণ। একজন সালাফ বলেছেন, “আলিম কখনো বার্ধক্যজনিত ভীমরতিতে পতিত হন না।” আরেকজন বলেছেন, "যে কেউ কুরআন মুখস্থ করে, সে দেখবে যে তার জ্ঞানবুদ্ধি বরকতময় হয়ে গেছে।”
আল্লাহর তা'আলা কুরআনে বলেন: "অতঃপর তাদের করেছি নীচ থেকে নীচতর। কিন্তু তাদের নয়, যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে।”৪৭
এর ব্যাখ্যায় কেউ কেউ বলেছেন "নীচ থেকে নীচতর” অর্থ বার্ধক্যের জরাজীর্ণতা। ৪৮
আবুত্তাইয়্যিব আত-তাবারি এক শতাধিক বছর বেঁচে ছিলেন। কিন্তু তাঁর জ্ঞানবুদ্ধি ও শারীরিক শক্তি খুব একটা লোপ পায়নি। একবার তিনি বড় একটি জাহাজ থেকে লাফিয়ে মাটিতে নামেন। এ জন্য তাঁকে তিরস্কার করা হলে তিনি বলেন, “আমরা এই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে যৌবনে গুনাহ থেকে হেফাজত করেছি। তাই বার্ধক্যে আমাদের জন্য আল্লাহ এগুলোকে হেফাজত করছেন।”৪৯
জুনাইদ একবার এক বৃদ্ধ লোককে ভিক্ষা করতে দেখে বললেন, “এই লোকটি যৌবনে আল্লাহর প্রতি দায়িত্বে অবহেলা করেছে। তাই তার বার্ধক্যে আল্লাহ তাকে অবহেলা করছেন।"
এ ছাড়া মানুষের নেক কাজের বিনিময়ে আল্লাহ তার সন্তান-সন্ততি ও নাতি- নাতনিদেরও হেফাজত করেন। আল্লাহ কুরআনে বলেন : “তাদের পিতা ছিল সৎকর্মপরায়ণ।”৫০
এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, তারা তাদের পিতার নেক আমলের মাধ্যমে হেফাজত হয়েছে। ৫১
মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদির বলেন, “আল্লাহ তাঁর কোনো বান্দার নেক আমলের কারণে তার সন্তান-সন্ততি ও নাতি-নাতনিদের হেফাজত করেন। সে যে শহরে রয়েছে এবং এর আশপাশের স্থাপনাকেও আল্লাহ হেফাজত করেন। তারা সব সময়ই আল্লাহর নিরাপত্তাবেষ্টনীতে থাকবে।”৫২
ইবনুল মুসাইয়্যিব তাঁর সন্তানকে বলেন, “পুত্র, আমি তোমার জন্য বেশি বেশি সালাত আদায় করি এই আশায় যে, তোমার মাধ্যমে আমাকে হেফাজত করা হবে।” তারপর তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করেন:
"তাদের পিতা ছিল সৎকর্মপরায়ণ।”৫৩
উমার বিন আব্দুল আযিয বলেছেন, “যে মুমিনই মৃত্যুবরণ করুক, আল্লাহ তাকে তার সন্তান ও নাতিদের মাধ্যমে হেফাজত করেন।”
ইয়াহইয়া ইবনে ইসমাইল ইবনে সালামাহ ইবনে খুয়াইল বলেন, “আমার এক বড় বোন ছিল, যে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে ও অচল হয়ে পড়ে। সে আমাদের চিলেকোঠার দূরতম কোনায় বসে থাকত। সেখানেই সে দশ বছরের কিছু বেশি সময় কাটায়। মাঝরাতে আমরা ঘুমে থাকা অবস্থায় কেউ একজন দরজায় কড়া নাড়ল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'কে?' সে উত্তর দিলো, 'কাজ্জাহ। আমি বললাম, 'আমার বোন?' সে বলল, 'হ্যাঁ, তোমার বোন।' আমি দরজা খোলার পর সে দশ বছরের মধ্যে এই প্রথম আমাদের ঘরে প্রবেশ করল। তারপর বলল, 'কেউ একজন আমার স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলল, 'আল্লাহ তোমার বাবা ইসমাইলকে তোমার দাদা সালামাহর উসিলায় হেফাজত করেছেন। তিনি তোমাকে তোমার পিতার উসিলায় হেফাজত করেছেন। অতএব, যদি তুমি চাও, তাহলে আল্লাহর কাছে দু'আ করো। যা তোমাকে আক্রান্ত করেছে, তা তোমাকে ছেড়ে যাবে। অথবা তুমি ধৈর্য ধরতে পারো, তাহলে তুমি জান্নাত লাভ করবে। আবু বকর ও উমার-এর প্রতি তোমার বাবা ও দাদা যে ভালোবাসা পোষণ করতেন, তার কারণে আবু বকর ও উমার আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার কাছে তোমার জন্য শাফাআত করেছেন।' আমি বললাম, 'যদি দুটির একটিই নিতে হয়, তাহলে আমি ধৈর্যধারণ করে জান্নাত লাভ করাকে বেছে নিলাম। কিন্তু আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিকুলের প্রতি দয়ালু। কোনো কিছুই তাঁর জন্য কঠিন নয়। তিনি যদি আমাকে দুটিই দিতে চান, তাহলে তিনি তা করতে সক্ষম।' তারপর আমাকে বলা হলো, 'আল্লাহ তোমাকে উভয়টিই দিলেন। তিনি তোমার পিতা ও পিতামহের প্রতি সেই ভালোবাসার কারণে সন্তুষ্ট,
যেই ভালোবাসা তারা আবু বকর ও উমারের প্রতি রাখত।” আর আল্লাহ তাকে তার অসুস্থতা থেকে মুক্তি দিলেন।"
বান্দা যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার আনুগত্যে নিজেকে সঁপে দেয়, আল্লাহ তাকে নিম্নোক্ত হাদীস অনুযায়ী হেফাজত করেন। মুসনাদু আহমাদে হুমাইদ বিন হিলাল সূত্রে এক বর্ণনাকারী থেকে বর্ণিত হয়েছে, “আমি নবীজি -এর কাছে এলাম আর তিনি আমাকে একটি ঘর দেখিয়ে বললেন, 'এই বাড়িতে এক নারী বাস করত, যে এক মুসলিম মুজাহিদ বাহিনীর সাথে অভিযানে যায়। সে তার মালিকানাধীন বারোটি ছাগল ও কাপড় বোনার কাঁটা ঘরে রেখে যায়। এর মধ্যে একটি ছাগল ও কাঁটা হারিয়ে যায়। সে দু'আ করে, 'হে আল্লাহ, যে আপনার রাস্তায় বের হয়, আপনি তার হেফাজতের ওয়াদা করেছেন। আমি একটি ছাগল ও কাপড় বোনার কাঁটা হারিয়ে ফেলেছি। আমি আপনার কাছে মিনতি করছি তা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য।” রাসূল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার উদ্দেশ্যে ওই নারীর করা দু'আর গভীরতা নিয়ে মন্তব্য করলেন। তিনি বললেন, 'সকালে জেগে উঠে সে হারানো ছাগল ও কাঁটা ফিরে পেল এবং সেই সাথে অনুরূপ আরও পেল। যদি চাও, তাহলে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করতে পারো।' আমি বললাম, 'আমি আপনার কথা বিশ্বাস করি।'”৫৪
শাইবান আর-রা'ই এক খোলা মাঠে তাঁর পশুপাল চরাতেন। জুমু'আর দিন সালাতে যাওয়ার সময় তিনি পশুগুলোর চারপাশে একটি দাগ টেনে দিয়ে যান। সালাত শেষে ফিরে তিনি সেগুলোকে ঠিক ওই জায়গাতেই সহি সালামতে দেখতে পান। ৫৫
একজন সালাফের একটি নিক্তি ছিল, যা দিয়ে তিনি দিরহাম পরিমাপ করতেন। তিনি আযান শুনতে পেয়ে সেগুলোকে মাটিতে ছড়ানো-ছিটানো অবস্থায় রেখেই সালাতে চলে গেলেন। ফিরে এসে তিনি পড়ে থাকা টাকাপয়সা গুছিয়ে নিলেন এবং এর মধ্যে একটি পয়সাও হারিয়ে যায়নি।
২.২ ক্ষতি থেকে আল্লাহ কর্তৃক হেফাজত
আল্লাহ তাঁর বান্দাকে হেফাজত করার আরেকটি প্রকার হলো দুনিয়ার জীবনে তার ক্ষতি করতে চাওয়া প্রতিটি জিন ও মানুষ থেকে তাকে হেফাজত করা। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
“যে কেউ আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য কোনো না-কোনো পথ বের করে দেবেন আর তাকে (এমন উৎস) থেকে রিযক দেবেন, যা সে ধারণাও করতে পারে না।”৫৬
এর ব্যাখ্যায় আয়িশা বলেন, “তিনি তার দুর্দশা ও দুশ্চিন্তা দূর করতে যথেষ্ট হবেন।”৫৭ রাবি ইবনু খুসাইম বলেন, “মানুষের উপর যত রকম বোঝা চাপতে পারে, তিনি তাকে সেসব থেকে বের হওয়ার পথ করে দেবেন।”৫৮
মুয়াওয়িয়াহ এর উদ্দেশ্যে আয়িশা লেখেন,
“আপনি যদি আল্লাহকে ভয় করেন, তাহলে লোকদের বিরুদ্ধে তিনিই আপনার জন্য যথেষ্ট হবেন। আর যদি আপনি মানুষকে ভয় করেন, তারা আল্লাহর বিরুদ্ধে আপনাকে জয়ী করতে পারবে না।”৫৯
হাকাম ইবনু আমর আল-গিফারি-কে একজন খলিফা একটি চিঠি লিখেন, যেখানে আল্লাহর কিতাববিরোধী কিছু কাজ করার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। তিনি জবাবে লেখেন,
“আমি আল্লাহর কিতাবে দেখলাম যে, এটি আমীরুল মুমিনীনের চিঠির উপর প্রাধান্য পাবে। আসমান ও জমিন যদি একটি দলা করে মিশিয়ে ফেলা হয় আর বান্দা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার প্রতি ভয় রাখে, তাহলে আল্লাহ তাকে সেখান থেকেও বের হওয়ার পথ করে দেবেন। সালাম।"
একজন সালাফ কাব্যে লিখেছেন: তাকওয়ার দ্বারাই আসে বিপদমুক্তি, আসে বিজয়, বাড়ে আশার শক্তি। তাকওয়া থাকলে বের করেই দেবেন পথ, বান্দার প্রতি এটিই আল্লাহর শপথ।
একজন সালাফ তাঁর ভাইয়ের উদ্দেশ্যে চিঠিতে লিখেছেন, "...পর সমাচার এই যে, যার তাকওয়া রয়েছে, সে নিজেকে হেফাজত করল। যে তাকওয়াকে অবহেলা করল, সে নিজেকেই অবহেলা করল আর তাকে আল্লাহর কোনো প্রয়োজনই নেই।"
২.৩ জন্তু-জানোয়ারের বিরুদ্ধে আল্লাহ কর্তৃক হেফাজত
যারা আল্লাহকে হেফাজত করে, আল্লাহ তাদের আরেকটি বিস্ময়কর উপায়ে হেফাজত করেন। যেসব জন্তু-জানোয়ার সাধারণত ক্ষতিকর, আল্লাহ সেসবকে তাদের সুরক্ষা ও সাহায্যের কাজে নিয়োগ করে দেন। এমনটিই ঘটেছিল নবীজি -এর আযাদকৃত দাস সাফিনা-এর সাথে। তাঁর নৌকা ডুবে যায় আর তিনি এক দ্বীপে ভেসে আসেন। সেখানে তিনি এক সিংহ দেখে বলেন, “এই আবুল হারিস, আমি সাফিনাহ। রাসূলুল্লাহ -এর আযাদকৃত দাস।” সিংহটি তাঁর সাথে সাথে হাঁটল এবং পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল। তারপর বিদায় জানানোর মতো করে গরগর শব্দ করে চলে গেল। ৬০
আবু ইবরাহীম আস-সাইহ এক মঠের কাছাকাছি জায়গায় অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তিনি বললেন, “আমি যদি মঠটির দরজাটা পর্যন্তও যেতে পারতাম, তাহলে সন্ন্যাসীরা বেরিয়ে এসে আমার সেবা করতে পারত।” এক সিংহ বেরিয়ে এসে তাঁকে পিঠে করে বয়ে নিয়ে মঠের দরজায় রেখে আসে। প্রায় চার শ জন সন্ন্যাসী তাঁকে দেখে বেরিয়ে আসেন ও তাঁর হাতে ইসলাম কবুল করেন। ১
একবার ইবরাহীম বিন আদহাম একটি বাগানে ঘুমিয়ে পড়েন। তাঁর পাশেই একটি সরীসৃপ ছিল, যার মুখে ড্যাফোডিলের একটি চক্র ছিল। তিনি জেগে ওঠা পর্যন্ত এটি তাঁকে পাহারা দিলো।
অতএব বোঝা গেল, যে কেউ আল্লাহকে হেফাজত করে, আল্লাহ তাকে হিংস্র প্রাণী থেকে হেফাজত করেন। উল্টো সেগুলোকে সেই বান্দার উপকারে লাগিয়ে দেন। আর যারা আল্লাহকে অবহেলা করে, আল্লাহও তাকে অবহেলা করেন। এমনকি যেসব জিনিস থেকে মানুষ উপকার আশা করে, সেগুলোও তার ক্ষতি করে বসে। যেমন পরিবারের সবচেয়ে কাছের লোক বা অন্য কোনো প্রিয় মানুষ।
একজন সালাফ বলেছেন, "আমি যখন আল্লাহর অবাধ্যতা করি, তাহলে আমার চাকর ও পোষা গাধার আচার-আচরণেও এর প্রভাব দেখতে পাই।” ৬২ অর্থাৎ, তাঁর চাকর অগোছালো কাজ করে ও তাঁর অবাধ্য হয় এবং তাঁর গাধা তাঁকে বহন করতে অনিচ্ছুক হয়ে পড়ে।
সকল কল্যাণ রয়েছে আল্লাহকে মানা ও তাঁর দিকে মুখ ফেরানোর মধ্যে। আর সব অকল্যাণ রয়েছে আল্লাহর অবাধ্যতা করা ও তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার মধ্যে।
একজন জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছিলেন, “যে কেউ তার মনিবের দুয়ার পরিত্যাগ করে, সে কখনোই জমিনে দৃঢ়ভাবে পা রাখতে পারে না।”
তাঁদের একজন এই কবিতা লিখেছেন : আল্লাহর কসম! যতবার তোমার দুয়ারে এসেছি, দূরের পথ নিজেকে দিয়েছে সংক্ষেপ করে। যখন তোমার দুয়ার ত্যাগের বাসনা করেছি, কাপড়েতে পা বেঁধে জমিনে গিয়েছি পড়ে। আল্লাহর দোহাই! ক্ষমা করো, ভুলে যাও, পেতে দাও, আমার অবস্থা তোমার নিজের চোখ দিয়ে দেখে নাও।
আল্লাহর হেফাজতের মহত্তম রূপ হলো বান্দাকে তার দ্বীনের ব্যাপারে হেফাজত করা।
২.৪ আল্লাহ কর্তৃক সংশয় ও লোভ-লালসা থেকে হেফাজত
বান্দার জীবদ্দশায় আল্লাহ তাকে সব রকমের সংশয়, পথভ্রষ্টকারী বিদআত ও অবৈধ লোভলালসা থেকে হেফাজত করেন। মৃত্যুর সময়ও আল্লাহ তার দ্বীনকে এমনভাবে হেফাজত করেন যে, সে ইসলামের পথে থাকা অবস্থায় মারা যায়।
হাকাম ইবনু আবান থেকে বর্ণিত আবু মাক্কি বলেন, "মানুষের মৃত্যু এলে ফেরেশতাকে বলা হয় 'তার মাথা শুঁকো।' ফেরেশতা বলেন, 'আমি কুরআনের সুগন্ধ পাচ্ছি।' বলা হয়, 'তার অন্তর শুঁকো।' ফেরেশতা বলেন, 'আমি সিয়ামের সুগন্ধ পাচ্ছি।' বলা হয়, 'তার পা শুকো।' তিনি বলেন, 'আমি তাহাজ্জুদের সুগন্ধ পাচ্ছি।' সে নিজের নফসকে হেফাজত করেছে, তাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাকে হেফাজত করেছেন।” ইবনু আবিদ্দুনিয়া এটি বর্ণনা করেছেন। ৬৩
বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত আছে যে নবীজি আল-বারা ইবনু আযি-কে ঘুমানোর সময় এই দু'আ পড়তে শিখিয়েছেন,
“হে আমার রব, যদি আপনি আমার প্রাণ আটকে রাখেন, তবে আপনি তাকে দয়া করুন। আর যদি আপনি তা ফেরত পাঠিয়ে দেন, তাহলে আপনি তার হেফাজত করুন, যেভাবে আপনি আপনার সৎকর্মশীল বান্দাদের হেফাজত করে থাকেন।”৬৪
সহীহ ইবনে হিব্বানে উমার থেকে বর্ণিত আছে যে, নবীজি দু'আ করতে শিখিয়েছেন,
“হে আল্লাহ, দাঁড়ানো অবস্থায় আমাকে ইসলামের মাধ্যমে হেফাজত করুন, বসা অবস্থায় আমাকে ইসলামের মাধ্যমে হেফাজত করুন এবং শোয়া অবস্থায় আমাকে ইসলামের মাধ্যমে হেফাজত করুন। আমার ব্যাপারে হিংসুক শত্রুর দু'আর জবাব দেবেন না।”৬৫
রাসূল যখন কোনো মুসাফিরকে বিদায় জানাতেন, তখন বলতেন, “আমি তোমার দ্বীন, বিশ্বাস ও চূড়ান্ত আমল আল্লাহর দায়িত্বে সমর্পিত করছি।”৬৬ আরেক বর্ণনায় আছে, তিনি বলতেন, “আল্লাহ যখন কোনো কিছু নিজের দায়িত্বে নিয়ে নেন, তখন তিনি তা হেফাজত করেন।” নাসাঈ ও অন্যান্য কিতাবে তা বর্ণিত হয়েছে।৬৭
তাবারানির বর্ণিত একটি হাদীসে নবীজি বলেন,
“যেভাবে সালাত আদায় করা উচিত, বান্দা যখন সেভাবে সালাত আদায় করে, তখন সেই সালাত সূর্যের মতো আলোকিত হয়ে আল্লাহর কাছে উঠে যায় আর মুসল্লীকে বলে, 'আল্লাহ তোমাকে সেভাবে হেফাজত করুন, যেভাবে তুমি আমার হেফাজত করলে।' সে যদি অলসতা ও অবহেলার সাথে তা আদায় করে, তাহলে পুরনো কাপড় প্যাঁচানোর মতো করে প্যাঁচিয়ে তা মুসল্লীর মুখে ছুড়ে মেরে বলা হবে, 'তুমি যেভাবে আমাকে নষ্ট করলে, আল্লাহ তোমাকে সেভাবে নষ্ট করুন।”৬৮
উমার বিন খাত্তাব তাঁর খুতবায় বলতেন, “হে আল্লাহ, আপনার নিরাপত্তার মাধ্যমে আমাদের হেফাজত করুন। আর আমাদের আপনার হুকুমের উপর অটল রাখুন।"
একজন সালাফকে একবার এক ব্যক্তি বলল, “আল্লাহ আপনাকে হেফাজত করুন।" তিনি জবাবে বললেন, "আমার ভাই, এই দু'আ কোরো না যে, সেই ব্যক্তি হেফাজতে থাকুক। বরং এই দু'আ করো যাতে সেই ব্যক্তির ঈমান হেফাজতে থাকে।” তাঁর এ কথার অর্থ হলো দ্বীনের হেফাজতের জন্য দু'আ করাকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। কারণ, পার্থিব হেফাজতে তো পাপাচারী ও নেককার উভয়ই থাকতে পারে। কিন্তু শুধু মুমিন বান্দাকেই আল্লাহ দ্বীনের ব্যাপারে হেফাজত করেন। তার দ্বীন ও এর দূষয়িতা যেকোনো বস্তুর মাঝে আল্লাহ বাধা হয়ে যান। এই বাধা তিনি নানা রকম উপায়ে দিয়ে থাকেন। কিছু উপায় বান্দা বুঝে উঠতেও পারে না, আর কিছু উপায়কে তো বাহ্যিকভাবে দেখে সে ঘৃণাই করতে শুরু করে।
ইউসুফ-কে আল্লাহ এভাবেই বাঁচিয়েছেন,
"এমনটি ঘটেছে যেন আমি তাকে অসৎ কাজ ও নির্লজ্জতা থেকে সরিয়ে রাখি। সে ছিল আমার বিশুদ্ধ-হৃদয় বান্দাদের একজন। ২৬৯
২.৫ সরাসরি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে আল্লাহ কর্তৃক হেফাজত
যে কেউ আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ, আল্লাহ তাকে অকল্যাণ ও অশ্লীলতা থেকে হেফাজত করেন। তিনি তাকে এমন সব মাধ্যমে রক্ষা করবেন, যার ব্যাপারে সে জানতেও পারে না। তিনি বান্দা ও গুনাহের পথের মাঝে বাধা হয়ে ওঠেন। মারুফ আল-কারখি একবার একদল যুবককে ফিতনার সময় যুদ্ধে বের হবার প্রস্তুতি নিতে দেখলেন। তিনি বললেন, “হে আল্লাহ, তাদের হেফাজত করুন।” তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, "আপনি ওদের জন্য কেন দু'আ করছেন?” তিনি জবাব দিলেন, “তিনি (আল্লাহ) যদি তাদের রক্ষা করতেন, তাহলে তারা যে উদ্দেশ্যে বের হচ্ছে সে উদ্দেশ্যে বের হতো না।"
উমার একবার এক ব্যক্তিকে দু'আ করতে শুনলেন, “হে আল্লাহ, আপনি বান্দা ও বান্দার অন্তরের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়ান। অতএব, আপনি আপনার অবাধ্যতা ও আমার মাঝে বাধা হয়ে যান।” উমার (রাঃ) তা শুনে খুশি হলেন এবং সেই ব্যক্তির জন্য দু'আ করলেন।
আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বলেন:
“জেনে রেখো, মানুষ ও তার অন্তরের মাঝে আল্লাহ প্রতিবন্ধক হয়ে যান...”৭০
এর ব্যাখ্যায় ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, “তিনি মুমিন ও গুনাহের মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে যান, যা তাকে জাহান্নামে নিয়ে যেতে পারত।” ৭১
অতীতের এক ব্যক্তি হাজ্জ করতে যান। মক্কায় একদল লোকের সাথে ঘুমানোর সময় হঠাৎ তাঁর একটি গুনাহ করতে ইচ্ছে হয়। তিনি একটি কণ্ঠ শুনতে পেলেন, “দুর্ভাগ্য তোমার! তুমি কি হাজ্জ করছ না?” ফলে আল্লাহ তাঁকে গুনাহ বাস্তবায়ন করা থেকে হেফাজত করলেন।
এক ব্যক্তি একদল লোকের সাথে বেরিয়েছিলেন একটি নির্দিষ্ট গুনাহ করার উদ্দেশ্যে। তিনি যখন কাজটি করতে যাবেন তখন একটি কণ্ঠ চিৎকার করে উঠল, “প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের দায়ে আবদ্ধ।”৭২
ফলে তিনি সে গুনাহ করা থেকে বিরত হলেন।
এক ব্যক্তি ঘন গাছপালার ভেতর ঢুকে ভাবলেন, “আমি এখানে গোপনে গুনাহ করতে পারি। কে দেখবে আমাকে?” তিনি তখন গাছপালার মাঝে একটি কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হতে শুনলেন, যা এই আয়াত তিলাওয়াত করছিল :
“যিনি সৃষ্টি করলেন, তিনিই কি জানেন না? তিনি অতি সূক্ষ্মদর্শী, ওয়াকিফহাল। ”৭৩
আরেক ব্যক্তি গুনাহ করার ইচ্ছা করে তা সম্পাদন করতে গেলেন। যেতে যেতে তিনি এক বক্তার পাশ দিয়ে গেলেন, যে গল্প বর্ণনা করছিল। তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে শুনতে পেলেন সে বলছে, “ওহে যারা পাপ করতে চাও! তুমি কি জানো না যে কামনার স্রষ্টা তোমার ইচ্ছের ব্যাপারে অবগত?” এটি শুনে তিনি অজ্ঞান হয়ে গেলেন এবং জ্ঞান ফেরার সাথে সাথে তাওবাহ করে নিলেন।
এক নেককার বাদশাহ তাঁর এক সুন্দরী প্রজার প্রেমে পড়ে গেলেন। তিনি নিজের ব্যাপারে ভীত হয়ে পড়লেন এবং রাতে তাহাজ্জুদে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে পানাহ চাইলেন। সে রাতেই সেই প্রজা অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তিন দিন পর মারা যান।
২.৬ উপদেশ প্রদানের মাধ্যমে আল্লাহ কর্তৃক হেফাজত
গুনাহ করার সঙ্গী হিসেবে পেতে চাওয়া ব্যক্তিদের কাছে উপদেশ শুনে অনেকেই হেফাজত হয়েছে। এক হাদীসে এসেছে তিন ব্যক্তি একটি গুহায় ঢোকার পর তার মুখ পাথর পড়ে বন্ধ হয়ে যায়। প্রত্যেকে তখন নিজ নিজ একটি নেক আমলের উসিলায় আল্লাহর কাছে দু'আ করেন। এর মধ্যে এক ব্যক্তি বলেছিলেন যে তিনি এক নারীর সাথে যিনা করতে উদ্যত হলে সেই নারী বলেন, “আল্লাহকে ভয় করুন। যথাযথ অধিকার ছাড়া পর্দা ছেদ করবেন না।” তা শুনে তিনি গুনাহ থেকে বিরত হন। ৭৪
এর আরেকটি উদাহরণ হলো কিফল নামে বানী ইসরাঈলের এক ব্যক্তি, যে খুব ঘন ঘন গুনাহে লিপ্ত হতেন। তিনি এক নারীর সাথে আকৃষ্ট হয়ে তাঁকে ষাট দিনার দিয়ে তার সাথে যিনা করতে উদ্যত হন। নারীটি প্রবলভাবে কাঁপতে শুরু করায় তিনি জিজ্ঞেস করেন, "আমি কি তোমাকে জোর করছি নাকি?” তিনি জবাব দেন, “না। কিন্তু আমি আগে কখনো এই কাজ করিনি আর কেবল অভাবের তাড়নায়ই এখন এমনটা করছি।” কিফল বললেন, “তুমি আল্লাহকে ভয় করো। আমারও কি উচিত নয় আল্লাহকে ভয় করা?” তিনি উঠে চলে যান। উপহার হিসেবে তাঁর অর্থ নারীটির জন্য রেখে যান। তিনি তারপর বলেন, “আল্লাহর কসম! কিফল আর কখনোই আল্লাহকে অমান্য করবে না।” তিনি সে রাতেই মারা যান। পরদিন সকালে তাঁর দরজায় লেখা দেখতে পাওয়া যায়, “আল্লাহ কিফলকে ক্ষমা করে
দিয়েছেন।" রাসূলুল্লাহ থেকে ইবন উমার-এর সূত্রে আহমাদ ও তিরমিযিতে এটি বর্ণিত হয়েছে। ৭৫
এক ব্যক্তি এক নারীকে প্রলুব্ধ করে দরজা আটকাতে আদেশ দেন। নারীটি দরজা আটকে বললেন, “একটি দরজা খোলা রয়ে গেছে।” লোকটি বললেন, “কোন সে দরজা?” নারীটি জবাব দিলেন, “আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ও আমাদের মধ্যকার দরজা।" তা শুনে লোকটি গুনাহ থেকে বিরত হলেন।
আরেক ব্যক্তি এক বেদুঈনকে প্ররোচিত করে বলেছিল, “নক্ষত্র ছাড়া আর কী আছে, যা আমাদের দেখতে পাবে?” বেদুঈন নারীটি বললেন, “কেন! যিনি নক্ষত্র সৃষ্টি করেছেন, তিনি।”৭৬
এ সবগুলোই হলো আল্লাহর সাহায্য এবং বান্দা ও গুনাহের মাঝে তাঁর প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠার উদাহরণ। পাপাচারীদের কথা বলে আল-হাসান বলেন, “তাঁর (আল্লাহর) কাছে তাদের মূল্য নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, ফলে তারা তাঁর অবাধ্য হলো। তারা যদি তাঁর কাছে মান-সম্মানের অবস্থান ধরে রাখতে পারত, তাহলে তিনি তাদের হেফাজত করতেন।” বিশর বলেন, "সম্মানিত ও মর্যাদাবান ব্যক্তি কখনোই আল্লাহর অবাধ্যতায় লেগে থাকতে পারে না। আর না কোনো সুবিবেচক ব্যক্তি আখিরাতের উপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দিতে পারে।”
২.৭ বান্দার জন্য আল্লাহ কর্তৃক সবচেয়ে উত্তম বিষয় নির্ধারণ
বান্দার দ্বীনকে হেফাজত করার জন্য আল্লাহর আরেকটি পদ্ধতি হলো বান্দার দুনিয়াবি কামনা ব্যর্থ করে দেওয়া। বান্দা হয়তো নেতৃত্ব বা ব্যবসা-বাণিজ্যের মতো কোনো দুনিয়াবি জিনিসের পেছনে ছুটছে। কিন্তু এটা তার দ্বীনের জন্য কল্যাণকর নয় বলে আল্লাহ তাকে লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ করে দেন। বান্দা এর পেছনে আল্লাহর হিকমাহ বুঝতে না পেরে দুঃখিত হয়ে যায়।
ইবনে মাসউদ বলেন,
"বান্দা হয়তো ব্যবসায় বা নেতৃত্বের জন্য তোড়জোড় করে এই আশায় যে, তা তার জন্য সহজ করে দেওয়া হবে। আল্লাহ তাকে দেখে ফেরেশতাদের আদেশ দেন, 'তাকে এ থেকে বিরত রাখো। কারণ, আমি যদি তার জন্য এটির ইচ্ছা করতাম, তাহলে তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাতাম।' ফলে আল্লাহ তাকে এ কাজ থেকে বিরত রাখবেন। বান্দা রাগে-দুঃখে বলতে থাকবে, 'অমুক আমাকে হারিয়ে দিলো! তমুক আমাকে ছাড়িয়ে গেল!' অথচ এ সবই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার দয়া।"
আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, বান্দা হয়তো কোনো নেক আমল করতে তৎপরতা চালাচ্ছে, কিন্তু তা তার জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ পথ নয়। ফলে আল্লাহ তার ও তার আমলের মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে যান আর বান্দা সেটা টেরও পায় না। তাবারানিতে আনাস থেকে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূল বলেন,
"আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা বলেন, 'আমার বান্দাদের মধ্যে এমন অনেকে আছে যাদের ঈমান কেবল দারিদ্র্যের মাধ্যমে উন্নত করা সম্ভব। আমি যদি তাকে প্রাচুর্য দিতাম, তার ঈমান হ্রাস পেত। আমার বান্দাদের মধ্যে এমন অনেকে আছে যাদের ঈমান কেবল প্রাচুর্যের মাধ্যমে উন্নত করা সম্ভব। আমি যদি তাকে দারিদ্র্য দিতাম, তার ঈমান হ্রাস পেত। আমার বান্দাদের মধ্যে এমন অনেকে আছে যাদের ঈমান কেবল সুস্বাস্থ্যের মাধ্যমে উন্নত করা সম্ভব। আমি যদি তাকে অসুস্থতা দিতাম, তার ঈমান হ্রাস পেত। আমার বান্দাদের মধ্যে এমন অনেকে আছে যাদের ঈমান কেবল অসুস্থতার মাধ্যমে উন্নত করা সম্ভব। আমি যদি তাকে সুস্বাস্থ্য দিতাম, তার ঈমান হ্রাস পেত। আমার বান্দাদের মাঝে অনেকে কোনো একটি ইবাদাত করতে চায়, কিন্তু আমি তাদের তা থেকে বিরত রাখি যাতে তারা অহংকারে পতিত না হয়। বান্দাদের অন্তরে কী আছে, তার ব্যাপারে আমার জ্ঞানের ভিত্তিতে আমি তাদের অবস্থা নিয়ন্ত্রণ করি। আমি সর্বজ্ঞানী, সর্বজ্ঞ।”৭৭
অতীতের এক ব্যক্তি খুব বেশি বেশি শাহাদাতের জন্য দু'আ করত। একটি কণ্ঠ ডেকে বলল, “তুমি যদি কোনো সামরিক অভিযানে বের হও, তুমি বন্দী হবে এবং বন্দী অবস্থায় তুমি খ্রিষ্টান হয়ে যাবে। অতএব, এর দু'আ করা বন্ধ করো।”৭৮
অতএব সারসংক্ষেপ হলো যে আল্লাহর সীমাসমূহ সংরক্ষণ করে এবং তাঁর অধিকারসমূহের প্রতি যত্নবান থাকে, দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহ তার দ্বীনি ও দুনিয়াবি বিষয়াদি ঠিক রাখার দায়িত্ব নেবেন।
২.৮ আল্লাহ হলেন মুমিনদের হেফাজতকারী
আল্লাহ তা'আলা তাঁর কিতাবে বলেছেন যে, তিনি হলেন মুমিনদের হেফাজতকারী। তিনি সৎকর্মশীলদের সুরক্ষা দেন। এর অন্তর্ভুক্ত বিষয় হলো, দুনিয়া ও আখিরাতে মুমিনের জন্য যা উপকারী, তিনি তা হেফাজত করেন। আর তিনি মুমিনদের অন্য কারও হাতে ছেড়ে যাবেন না। আল্লাহ তা'আলা বলেন : “আল্লাহ হলেন মুমিনদের অভিভাবক। তিনি তাদের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসেন।”৭৯
“এর কারণ এই যে, আল্লাহ ঈমানদারদের অভিভাবক; আর কাফিরদের কোনো অভিভাবক নেই।”৮০
“যে কেউ আল্লাহর উপর ভরসা করে, আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট।”৮১
“আল্লাহ কি তাঁর বান্দার জন্য যথেষ্ট নন?”৮২
যে কেউ আল্লাহর হকসমূহ প্রতিষ্ঠিত করে, দুনিয়া ও আখিরাতে তার জন্য কল্যাণকর সকল বিষয় সংঘটনের দায়িত্ব আল্লাহ গ্রহণ করেন। যে কেউ চায় আল্লাহ তার হেফাজত করুন এবং তার সকল বিষয়ের দেখাশোনা করুন, সে যেন প্রথমে তার নিজের উপর আল্লাহর অধিকারসমূহের হেফাজত করে। যে কেউ চায় কোনো অপছন্দনীয় বিষয় তাকে স্পর্শ না করুক, সে যেন আল্লাহর অপছন্দনীয় বিষয়গুলো এড়িয়ে চলে।
একজন সালাফ এক মজলিস থেকে আরেক মজলিসে যেতেন আর বলতে থাকতেন, “যে কেউ চায় আল্লাহ তার ভালো অবস্থার হেফাজত করুন, সে যেন তাকওয়া অবলম্বন করে।"
দুনিয়াবিমুখ সাধক আল-উমারি -এর কাছে কেউ উপদেশ চাইলে তিনি বলতেন, “আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলাকে নিজের প্রতি যেমন পেতে চাও, আল্লাহর সাথেও ঠিক তেমনটাই হও।”
সালিহ ইবনু আব্দুল কারিম বলেছেন, “আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন, 'আমার ক্ষমতা ও জালালের কসম! আমার আনুগত্যে লেগে থাকার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে অন্তরের দিকেই আমি তাকাই, সেটিকেই সকল অবস্থায় রক্ষা করা ও দৃঢ় রাখার দায়িত্ব আমি গ্রহণ করি।”
পূর্বেকার এক আসমানি কিতাবে বলা হয়েছে, “আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন, 'হে আদমসন্তান, তুমি কি আমাকে বলবে না কিসে তোমার হাসির উদ্রেক করে? হে আদমসন্তান, আমার প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করো, তারপর যেখানে খুশি সেখানে ঘুমিয়ে পড়ো।”
এর অর্থ হলো সঠিকভাবে তাকওয়া অবলম্বন করতে পারলে আর কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তার কারণ নেই। আপনার জন্য কোন বিষয়টি উত্তম, সর্বজ্ঞ আল্লাহ আপনাকে সেদিকে পরিচালিত করবেনই।
জাবির থেকে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূল বলেছেন, “যে কেউ আল্লাহর কাছে নিজের মর্যাদা সম্পর্কে জানতে চায়, সে যেন নিজের দিকে তাকায় এবং তার কাছে আল্লাহর মর্যাদা কেমন, তা দেখে। যে আল্লাহকে যেমন মর্যাদা দেয়, আল্লাহ তাকে তেমনই মর্যাদা দেন।”৮৩
এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাকে কতটা হেফাজত করবেন, তা নির্ভর করে বান্দা আল্লাহর হক ও তাঁর দেওয়া সীমা-পরিসীমার কতটা হেফাজত করে সেটার উপর। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ করা, তাঁকে জানা, তাঁকে ভালোবাসা, তাঁর ইবাদাত করা যার লক্ষ্য, সে খেয়াল করবে যে, আল্লাহও তার সাথে অনুরূপ যথোচিত আচরণ করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন :
"আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।”৮৪
"আমার সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করো, আমি তোমাদের প্রতি অঙ্গীকার পূর্ণ করব।”৮৫
তার উপর আল্লাহ হলেন দয়ালুদের মধ্যে সবচেয়ে দয়ালু। তিনি একটি নেক আমলের দশ বা তার চেয়ে বেশি গুণ প্রতিদান দেন। যে কেউ আল্লাহর দিকে এক বিঘত অগ্রসর হয়, আল্লাহ তার দিকে এক হাত অগ্রসর হন। যে আল্লাহর দিকে হেঁটে আসে, আল্লাহ তার দিকে দৌড়ে আসেন। ৮৬
মানুষকে যা কিছুই দেওয়া হয়, তা তার নিজের পক্ষ থেকেই। আর যে বিপদই তার উপর আপতিত হয়, এর কারণ হলো আল্লাহর অধিকার সংরক্ষণের ব্যাপারে তার কোনো না-কোনো গাফলতির ফল। আলি বলেন, "বান্দার কর্তব্য হলো তার আশা কেবল তার রবের প্রতিই রাখা, তাহলে নিজের গুনাহ ছাড়া আর কোনো কিছু নিয়েই তার ভীত হওয়ার কারণ নেই।”
একজন সালাফ বলেছেন, “যে কেউ পরিশুদ্ধ করে, তাকে পরিশুদ্ধ করা হয়। আর যে দূষিত করে, তার সাথেও অনুরূপ আচরণ করা হবে।"
মাসরুক বলেন, "যার অন্তরের গতিবিধি অত্যন্ত সচেতনভাবে আল্লাহর প্রতি সম্মান রাখে, আল্লাহ তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গতিবিধি হেফাজত করবেন।”
এ ব্যাপারে আরও অনেক অনেক কথা বলা যায়। তবে এ পর্যন্ত আমরা যতটুকু বললাম ততটুকুই যথেষ্ট। আর সকল প্রশংসা আল্লাহর।
টিকাঃ
৩১ সূরাহ আল-বাকারাহ, ২:৪০
৪০ সূরাহ আল-বাকারাহ, ২: ১৫২
৪১ সূরাহ মুহাম্মাদ, ৪৭:৭
৪২ আহমাদ : ৪৭৫৮; আবু দাউদ: ৫০৭৪; নাসাঈ : ৫৫৩১-৫৫৩২; ইবনু মাজাহ : ৩৮৭১; ইবনু হিব্বান : ৯৬১-তে একে সহীহ বলেছেন। এ ছাড়া হাকিম: ১৯০২ একে সহীহ বলেছেন: যাহাবি একমত। আলবানি, সহীহ আত-তারগীব: ৬৫৯; আরনাউত ও অন্যান্য। ইবনু আল্লানের মতে ইবনু হাজার একে হাসান গারীব বলেছেন, আল-ফুতুহাতুর রব্বানিয়্যাহ: খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১০৯
৪৩ সূরাহ আর-রা'দ, ১৩: ১১
৪৪ তাবারি, ২০২১৬-২০২১৭; সুয়তি, আদ্দুররুল মানসুর: খণ্ড ৪, ৬১৪ পৃষ্ঠাতে একে আব্দুর রাযযাক, ফারয়াবি, ইবনুল মুনযির এবং ইবনু আবি হাতিমের সাথেও সম্পৃক্ত করেছেন।
৪৫ তাবারি : ২০২৭৪; যখন তাঁকে বলা হয়েছিল যে কিছু লোক তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করেছে, তখন তিনি এ কথা বলেন।
৪৬ তাবারি: ২০২৪৫
৪৭ সূরাহ আত-তিন, ৯৫ : ৫-৬
৪৮ "আল্লাহই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন। তোমাদের কাউকে অকর্মণ্য বয়সে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, যাতে জ্ঞান লাভ করার পরেও আর কোনো কিছুর জ্ঞান থাকে না। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী, সর্বাপেক্ষা শক্তিমান।” (সূরাহ আন-নাহল, ১৬: ৭০) অনুরূপ সূরাহ আল-হাজ্জ, ২২:৫
৪৯ ইবনু কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ৮০
৫০ সূরাহ আল-কাহফ, ১৮: ৮২
৫১ ইবনু আব্বাস কর্তৃক ব্যক্ত ও ইবনুল মুবারক (আয-যুহদ: ৩৩২) ও তাবারি কর্তৃক উদ্ধৃত
৫২ আবু নুয়াইম, আল-হিলইয়াহ: খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৪৮; ইবনুল মুবারাক, আয-যুহদ: ৩৩০
৫৩ সূরাহ আল-কাহফ, ১৮: ৮২
৫৪ আহমাদ: ২০৬৬৪; হাইসামি: খণ্ড ৫, ২৭৭ পৃষ্ঠায় বলেছেন, বর্ণনাকারীগণ সহীহাইনের।
৫৫ আবু নুয়াইম: খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৩১৭
৫৬ সূরাহ আত-তলাক, ৬৫: ২
৫৭ আদ্দুররুল মানসুরে সুয়ুতি একে ইবনু আবি হাতিমের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন।
৫৮ তাবারি
৫৯ ইবনু আবি শাইবাহ: খণ্ড ১৪, পৃষ্ঠা ৬১
৬০ আবু নুয়াইম : খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৬৯; তাবারানি, আল-কাবির: ৬৪৩২; হাকিম : ৬৫৫০; তিনি একে সহীহ বলেছেন, যাহাবি একমত।
৬১ যাহাবি, সিয়ার: খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ২২৮-২২৯; তিনি একে মুনকার বলেছেন।
৬২ আবু নুয়াইম: খণ্ড ৮, ১০৯ পৃষ্ঠায় ফুদাইল ইবনু ইয়্যাদ থেকে উদ্ধৃত।
৬৩ আবু নুয়াইম: খণ্ড ৮, ১০৯ পৃষ্ঠায় ফুদাইল ইবনু ইয়্যাদের উক্তি হিসেবেও এটি উল্লেখিত হয়েছে
৬৪ শব্দগুলো বুখারি: ৬৩২০-৭৩৯৩ এবং মুসলিম: ২৭১৪ এর যা আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত। আল-বারার হাদীসটি রয়েছে বুখারি: ৬৩১১-৬৩৩৩-৭৪৮৮ এবং মুসলিম: ২৭১০। কথাগুলো হলো, "ঘুমাতে যাবার সময় সালাতের ওযুর মতো ওযু করে নেবে, ডান কাত হয়ে শুবে এবং বলবে, 'হে আল্লাহ, আমি আমার মুখ আপনার দিকে ফেরালাম..."
৬৫ ইবনু হিব্বান: ৯৩৪, যঈফ ইসনাদে; হাকিম: ১৯২৪-এ এর সমর্থনে ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত একটি হাদীস রয়েছে। “হে আল্লাহ, আমাকে দাঁড়ানো অবস্থায়, বসা অবস্থায় ও শোয়া অবস্থায় ইসলামের দ্বারা হেফাজত করুন। আমার কোনো শত্রু বা হিংসুককে (আমার উপর আপতিত বিপদের কারণে) আনন্দিত হতে দেবেন না। হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে সেই সকল কল্যাণ চাই, যার ভান্ডার আপনার হাতে। আর আমি আপনার কাছে সেই সকল অকল্যাণ থেকে আশ্রয় চাই, যার ভান্ডার আপনার হাতে।" আল-জামিউস সগীর: ১৪৮৬-তে সুয়ুতি একে সহীহ বলেছেন। আস-সহীহাহ: ১৫৪০-এ আলবানি একে হাসান বলেছেন, কারণ উভয় হাদীস একে অপরের সমর্থনকারী
৬৬ তিরমিযি: ৩৪৪২-৩৪৪৩; আবু দাউদ: ২৬০০; নাসাঈ, আমালুল ইয়াওমা ওয়াল লাইলাহ : ৫২৪; ইবনু মাজাহ : ২৮২৬, ইবনু উমার থেকে বর্ণিত। তিরমিযি একে হাসান সহীহ গারীব বলেছেন। একে সহীহ ঘোষণা করেছেন ইবনু হিব্বান: ২৬৯৩ এবং হাকিম: ২৪৭৫, যাহাবি একমত। ইবনু আসাকির, মুজামুশ শুয়ুখ: খণ্ড ২, ৭৮০ পৃষ্ঠাতে একে হাসান বলেছেন। ইবনু আল্লানের মতে ইবনু হাজারও একে হাসান বলেছেন। একই শব্দে বর্ণনা করেছেন আবু দাউদ : ২৬০১, আব্দুল্লাহ ইবনু ইয়াযিদ থেকে; নববী, রিয়াদুস সলিহীন: ২৯৪ এবং আল-আযকার: ২৭৯ পৃষ্ঠাতে এর ইসনাদকে সহীহ বলেছেন। আলবানি, আস-সহীহাহ: ১৫-১৬০৫ এ একই কথা বলেছেন।
৬৭ নাসাঈ, আমালুল ইয়াওম ওয়াল লাইলাহ: ৫০৬, ৫০৯, ৫১৭; ইবনু হিব্বান: ২৩৭৬ (মাওয়ারিদ); বায়হাকি, আস-সুনানুল কুবরা: খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ১৭৩, ইবনু উমার থেকে হাসান ইসনাদে বর্ণিত।
৬৮ তাবারানি, আল-আসওয়াত: ৩০৯৫, আনাস থেকে বর্ণিত। ইরাকি, আল-মুগনি: ৩৮২-তে বলেছেন এর ইসনাদ যঈফ। তিনি আরও বলেন, উবাদা ইবনুস সামিত থেকে যঈফ ইসনাদে তায়ালিসিও এটি বর্ণনা করেছেন। হায়সামি: খণ্ড ১, ৩০২ পৃষ্ঠায় আনাসের এই হাদীসের ব্যাপারে বলেন, "এর ইসনাদে উব্বাদ ইবনু কাসির আছেন, যার দুর্বলতার ব্যাপারে ঐকমত্য রয়েছে। আলবানি, যঈফ আত-তিরমিযি: ২২১-২৮০ তে একে যঈফ জিদ্দান বলেছেন। উবাদার হাদীসের ব্যাপারে হায়সামি: খণ্ড ২, ১২২ পৃষ্ঠায় বলেন যে, এতে আল-আহওয়াস ইবনু হাকিম নামক একজন বর্ণনাকারী আছেন, যাকে ইবনুল মাদানি এবং আল-ইজলি সিকাহ বলেছেন এবং অন্য আরেক দল যঈফ বলেছেন।
৬৯ সূরাহ ইউসুফ, ১২: ২৪
৭০ সূরাহ আল-আনফাল, ৮ : ২৪
৭১ তাবারি : ১৫৮৮০-১৫৮৮১; হাকিম : ৩২৬৫-এ একে সহীহ বলেছেন, যাহাবি একমত।
৭২ সূরাহ আল-মুদ্দাসসির, ৭৪ : ৩৮
৭৩ সূরাহ আল-মুলক, ৬৭: ১৪
৭৪ বুখারি: ২২১৫-২২৭২-২৩৩৩-৩৪৬৫-৫৯৭৪ এবং মুসলিম: ২৭৪৩; ইবনু উমার থেকে বর্ণিত।
৭৫ আহমাদ: ৪৭৪৭ এবং তিরমিযি: ২৪৯৬; তিরমিযি একে হাসান বলেছেন। কিন্তু আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: খণ্ড ১, ২২৬ পৃষ্ঠায় ইবন কাসির বলেছেন, "এটি শায হাদীস এবং এর ইসনাদ খুবই ত্রুটিপূর্ণ"। আলবানি, আয-যঈফাহ: ৪০৮৩ এবং আরনাউত ও অন্যান্যরা একে যঈফ বলেছেন।
৭৬ ইবনুল জাওযি, যাম্মুল হাওয়া: ২৭২ পৃষ্ঠা
৭৭ ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-আওলিয়া: পৃষ্ঠা ১০০; আবু নুয়াইম : খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৩১৮; বায়হাকি, আল-আসমা ওয়াসসিফাত: ১৫০ পৃষ্ঠা। আবু নুয়াইম হাদীসটিকে গারীব বলেছেন এবং জামিউল উলুম: খণ্ড ২, ৩৩৩ পৃষ্ঠায় ইবনু রজব বলেছেন, "এতে আল-খুশানি ও সাদাকাহ রয়েছেন। উভয় বর্ণনাকারীই যঈফ, এবং আরেক বর্ণনাকারী হিশাম অপরিচিত।” আলবানি, আয-যঈফাহ : ১৭৭৫-এ একে যঈফ জিদ্দান বলেছেন।
৭৮ সাহল ইবনে হুনাইফ থেকে বর্ণিত রাসূলাল্লাহ ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি সত্য নিয়তে আল্লাহর কাছে শাহাদত প্রার্থনা করবে, আল্লাহ তাকে শহীদদের মর্যাদায় পৌঁছিয়ে দিবেন; যদিও সে নিজ বিছানায় মৃত্যুবরণ করে।” (মুসলিম-১৯০৯, তিরমিযি-১৬৫৩, নাসায়ী- ৩১৬২, আবু দাউদ-১৫২০) এই হাদীসের ব্যাখ্যায় আল্লামা নববী রহিমাহুল্লাহ বলেন, "সত্যচিত্তে শাহাদাত কামনা করা মুস্তাহাব"! (সূত্র- শরহে সহিহিল মুসলিমঃ ৪/৭৪) এক হাদীসে এসেছে, উমর ইবনুল খাত্তাব এ এই বলে দু'আ করতেন, قَالَ اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي شَهَادَةً فِي سَبِيلِكَ، وَاجْعَلْ مَوْتِي فِي بَلْدِ رَسُولِكَ صلى الله عليه وسلم "হে আল্লাহ! আমাকে তোমার রাস্তায় শাহাদাত লাভের তাওফীক দান কর এবং আমার মৃত্যু তোমার রাসূলের শহরে প্রদান কর।" (সহিহ বুখারী- ১৮৯০) ইবনু রজবের উল্লেখিত কথাটির সাথে এই বর্ণনাগুলোর বাহ্যিক বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে তার সমাধান এ হতে পারে যে, লোকটির জিহাদ ভীতি ছিলো। কোনো পূর্ব প্রস্তুতি ছিল না। কিংবা মানসিকভাবে সে খুবই দুর্বল! এতে সে ফিতনায় পড়ে কিংবা পরীক্ষায় পতিত হয়ে দ্বীন ত্যাগ করার ঝুঁকি ছিলো। আল্লাহ সর্বাধিক ভালো জানেন।- শর'ঈ সম্পাদক
৭৯ সূরাহ আল-বাকারাহ, ২: ২৫৭
৮০ সূরাহ মুহাম্মাদ, ৪৭: ১১
৮১ সূরাহ আত-তলাক, ৬৫: ৩
৮২ সূরাহ আয-যুমার, ৩৯ : ৩৬
৮৩ আবু ইয়ালা : ১৮৬৫-২১৩৮; তাবারানি, আল-আসওয়াত: ২৫০১; হাকিম: ১৮২০ এ একে সহীহ বলেছেন। কিন্তু যাহাবি বলেন, "এতে উমার নামে এক যঈফ বর্ণনাকারী রয়েছেন”। হায়সামি: খণ্ড ১০, ৭৭ পৃষ্ঠায় বলেন, “এর বর্ণনাসূত্রে উমার ইবনু আব্দুল্লাহ রয়েছেন, যিনি গুফরাহর আযাদকৃত দাস। তাঁকে একাধিক আলেম সিকাহ বলেছেন। একদল বলেছেন যঈফ। বাকি বর্ণনাকারীরা সহীহাইনের বর্ণনাকারী। আলবানি, আয-যঈফাহ: ৫৪২৭-৬২০৫ এ একে যঈফ বলেছেন।
৮৪ সূরাহ আল-বাকারাহ, ২: ১৫২
৮৫ সূরাহ আল-বাকারাহ, ২: ৪০
৮৬ বুখারি: ৭৪০৫ এবং মুসলিম: ২৬৮৭-২৭৪৩ এ আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে, "যে কেউ আমার দিকে এক বিঘত অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হই। যে আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে দুই হাত অগ্রসর হই। যে আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দৌড়ে যাই।" আহমাদ: ২১৩৭৪-এ আবু যার এর বর্ণনায় আরও আছে, "এবং আল্লাহ আরও মহান, এবং আল্লাহ আরও মহান"। হায়সামি: খণ্ড ১০, ১৯৭ পৃষ্ঠায় একে হাসান বলেছেন
📄 আল্লাহ তোমার সাথে আছেন
রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “আল্লাহকে হেফাজত করো, তাহলে তাঁকে তুমি তোমার সামনে পাবে।" আরেক বর্ণনায় আছে, “আল্লাহকে হেফাজত করো, তাহলে তাঁকে তুমি তোমার আগে পাবে।” এর অর্থ হলো, যে কেউ আল্লাহর নির্ধারিত সীমা হেফাজত করে এবং তাঁর অধিকারসমূহ যত্নসহকারে পালন করে, সে সকল ব্যাপারে আল্লাহকে তার সাথে পাবে। আল্লাহ তাকে বেষ্টন করে রাখবেন, সাহায্য করবেন, সংরক্ষণ করবেন, অবলম্বন দান করবেন, তার পা দৃঢ় রাখবেন, এবং আসমানি সাহায্য প্রদান করবেন। তিনি “প্রত্যেক প্রাণীর উপার্জনের প্রতি দৃষ্টি রাখেন”৮৭ এবং তিনি “যারা তাকওয়া অবলম্বন করে আর সৎকর্মশীল, তাদের সাথে আছেন।”৮৮
কাতাদাহ বলেন, “যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, আল্লাহ তাদের সাথে আছেন। কারও সাথে যদি আল্লাহ থাকেন, তাহলে তো সে এমন পক্ষকে নিজের সাথে পেল যে কখনো পরাজিত হবে না; এমন পাহারাদার পেল, যে কখনো ঘুমাবে না; এমন পথপ্রদর্শক পেল, যে কখনো পথ হারাবে না।”৮৯
একজন সালাফ তাঁর এক ভাইয়ের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন, “পর সমাচার এই যে... আল্লাহ যদি তোমার সাথে থাকেন, তাহলে তোমার আর ভয় কিসের? তিনি যদি তোমার বিরুদ্ধে থাকেন, তাহলে তুমি আর কার উপর আশা-ভরসা করবে? সালাম।"
এই “সঙ্গে থাকার বিষয়”টি বিশেষ এবং আলাদা, যা কেবল মুত্তাকীদের জন্যই নির্ধারিত। এখানে সাধারণভাবে "সঙ্গে থাকা”র কথা বোঝাচ্ছে না, যার কথা নিম্নোক্ত আয়াতগুলোতে বলা হয়েছে:
"...তোমরা যেখানেই থাকো, তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন..."১০
"কিন্তু তারা আল্লাহ হতে গোপন করতে পারে না, কেননা যে সময়ে তারা রাতে এমন বিষয়ে পরামর্শ করে যা আল্লাহ পছন্দ করেন না, তখনো তিনি তাদের সঙ্গেই আছেন..."১১
বিশেষ "সঙ্গে থাকা” বলতে সাহায্য, সহযোগিতা ও হেফাজত করা বোঝায়। যেমনটি আল্লাহ বলেছিলেন মূসা ও হারুন -কে
"... আমি তোমাদের সাথেই আছি। আমি (সবকিছু) শুনি ও দেখি।”১২
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"...সে তার সঙ্গীকে বলেছিল, 'চিন্তা কোরো না, আল্লাহ আমাদের সাথেই আছেন।'..."১৩
নবীজি আবু বকর-কে বলেছিলেন, "এমন দুইজনের ব্যাপারে তুমি কী মনে করো, যাদের তৃতীয়জন হলেন আল্লাহ?”১৪
এখানে "সঙ্গে থাকা” বলতে যা বোঝানো হয়েছে, তা নিম্নোক্ত আয়াতে বর্ণিত বিষয়টির মতো নয়:
"...তিনজনের মধ্যে এমন কোনো গোপন পরামর্শ হয় না, যাতে চতুর্থজন আল্লাহ হন না। আর পাঁচজনেও হয় না ষষ্ঠজন তিনি ছাড়া। এর কমসংখ্যকেও হয় না, আর বেশিসংখ্যকেও না, তিনি তাদের সঙ্গে থাকা ব্যতীত, তারা যেখানেই থাকুক না কেন... "১৫
এটি সাধারণ অর্থে এবং যে কারও ক্ষেত্রেই সত্য।১৬ আর বিশেষায়িত “সঙ্গে থাকা”র কথা বলা হয়েছে এই হাদীসে,
“...বান্দা নফল ইবাদাত করার মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হতে থাকে। এমনকি আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি। যখন আমি তাকে ভালোবাসি তখন আমি তার শ্রবণশক্তি হয়ে যাই যা দিয়ে সে শোনে, তার দৃষ্টিশক্তি হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে, তার হাত হয়ে যাই যা দিয়ে সে আঘাত করে, তার পা হয়ে যাই যা দিয়ে সে হাঁটে।”৯৭
কিতাব ও সুন্নাহর এমন প্রচুর উদাহরণ থেকে প্রমাণিত হয় যে মহান প্রতিপালক তাদের নিকটবর্তী-যারা তাঁকে মান্য করে, তাকওয়া অবলম্বন করে, তাঁর নির্ধারিত সীমা হেফাজত করে এবং তাঁর অধিকারসমূহ আদায় করে।
তাবুকে যাওয়ার সময় বুনান আল-হাম্মাল এক খোলা ভূমিতে প্রবেশ করেন। সেখানে হঠাৎ তিনি একাকিত্ব বোধ করেন। তখন এক কণ্ঠ শোনা যায়, "কেন তুমি একা বোধ করছ? তোমার ভালোবাসার পাত্র (আল্লাহ) কি তোমার সাথে নন?”৯৮
অতএব যে'কেউ আল্লাহকে হেফাজত করে ও তাঁর অধিকারসমূহের ব্যাপারে যত্নবান হয়, সে সর্বাবস্থায় আল্লাহকে নিজের সামনে ও আগে পাবে। সে তাঁরই মাঝে স্বস্তি খুঁজে পাবে এবং মাখলুকের বদলে তিনিই তার জন্য যথেষ্ট হবেন। হাদীসে আছে, “সর্বশ্রেষ্ঠ ঈমান হলো-বান্দা জানবে যে-সে যেখানেই থাকুক না কেন, আল্লাহ তার সাথে আছেন।” হাদীসটি তাবারানি ও অন্যান্য কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। ১৯
এই বিষয়টি পরিপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করতে গেলে আলোচনা অত্যন্ত দীর্ঘ হয়ে যাবে। ১০০
এক প্রাজ্ঞ আলিম একা একা সফর করছিলেন। কিছু মানুষ তাঁকে বিদায় জানানোর জন্য এলে তিনি এই কবিতা দিয়ে উত্তর দেন: যখন যাত্রা করি মোরা এমনকি রাতেও, তোমার সঙ্গ আর যিকির শ্রেষ্ঠ পাথেয়।
শিবলি এই কবিতা প্রায়ই পাঠ করতেন এবং কখনো কখনো এটি আবৃত্তি করে মজলিস শেষ করে উঠতেন।
টিকাঃ
৮৭ সূরাহ আর-রা'দ, ১৩: ৩৩
৮৮ সূরাহ আন-নাহল, ১৬: ১২৮
৮৯ আবু নুয়াইম: খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৪০
৯০ সূরাহ আল-হাদীদ, ৫৭:৪
৯১ সূরাহ আন-নিসা, ৪: ১০৮
৯২ সূরাহ ত্বা-হা, ২০ : ৪৬
৯৩ সূরাহ আত-তাওবাহ, ৯:৪০
৯৪ বুখারি: ৩৬৫৩-৩৯২২-৪৬৬৩; মুসলিম : ২৩৮১; আবু বাকর ১২ থেকে বর্ণিত।
৯৫ সূরাহ আল-মুজাদালাহ, ৫৮ : ৭
৯৬ লেখক জামিউল উলুম খণ্ড ১, ৪৭১ পৃষ্ঠায় যোগ করেন, "এই 'সাথে থাকা' অর্থ হলো তিনি জানেন তারা কী করে, তিনি তাদের ব্যাপারে পূর্ণ ওয়াকিফহাল, সতর্ক নজরদারি কারী। এর ফলে তাঁর প্রতি ভয় তৈরি হয়।"
৯৭ বুখারি: ৬৫০২; আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত। একই রকম হাদীস মুসনাদু আহমাদে আইশা থেকে, তাবারানিতে আবু উমামা থেকে, ইসমাঈলির মুসনাদ আলিতে আলি থেকে, তাবারানিতে ইবনু আব্বাস থেকে, তাবারানিতে আনাস থেকে, আবু ইয়ালাতে মায়মুনাহ থেকে। তাহকিক কালিমাতুল ইখলাস গ্রন্থে ইবনু রজব বলেন, “এর অর্থ হলো, ভালোবাসা যখন হৃদয়কে ভরে ফেলে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তখন কেবল রবের পছন্দনীয় কাজই করবে। এই অবস্থায় আত্মা প্রশান্তি বোধ করবে। কারণ, তা এমনই বিলীন হয়ে গেছে যে, নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে সে কেবল রবের ইচ্ছানুযায়ীই কাজ করে। হে আল্লাহর বান্দা, সেভাবে আল্লাহর ইবাদাত করো, যেমনটা তিনি চান। তুমি যেভাবে চাও, সেভাবে না। শেষোক্ত পদ্ধতিতে ইবাদাতকারী বান্দা যেন নড়বড়ে কিনারায় দাঁড়িয়ে ইবাদাত করছে। তার সাথে ভালো কিছু ঘটলে সে খুশি থাকে। কিন্তু পরীক্ষা এলে সে পেছন ফিরে চলে যায়। ফলে দুনিয়া ও আখিরাত দুইই হারায়। প্রজ্ঞা ও ভালোবাসা যখন শক্তিশালী হয়ে যায়, বান্দা তখন তার রবের ইচ্ছানুযায়ীই চলে।"
৯৮ আবু নুয়াইম: খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ৩২৪
৯৯ তাবারানি, আল-কাবির এবং আল-আসওয়াত: ৮৭৯৬; আবু নুয়াইম খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ১২৪; আবু উবাদাহ ইবনুস সামিত থেকে বর্ণিত। সুয়ুতি, আল-জামিউস সগীর ১৪২৩ এবং আলবানি, আয-যঈফাহ, ২৫৮৯-এ একে যঈফ বলেছেন
১০০ কাশফুল কুরবাহ গ্রন্থে ইবনু রজব লেখেন, "তাঁদের অনেকের মাখলুকের সাথে ভাব আদানপ্রদানের শক্তিই থাকত না। তাই তাঁরা প্রিয়তম রবের সাথে একা থাকার জন্য নির্জনে পালিয়ে যেতেন। এ জন্যই তাঁদের অনেকে লম্বা সময় নির্জনবাস করতেন। তাঁদের একজনকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, 'আপনি কি একাকিত্বের তিক্ততা অনুভব করেন না?' তিনি জবাব দেন, “কী করে তা অনুভব করতে পারি, যখন তিনি বলেছেন তিনি তাঁর স্মরণকারীর সঙ্গী?' আরেকজন বলেছিলেন, 'কী করে কেউ নিঃসঙ্গতা অনুভব করতে পারে, যখন আল্লাহ তার সাথে আছেন?' আরেকজন বলেছিলেন, 'একা থাকলে নিঃসঙ্গতার তিক্ততা অনুভব করার কারণ হলো রবের সাথে প্রশান্তি লাভ করতে না পারার লক্ষণ।' ইয়াহইয়া ইবনু মুয়ায ঘন ঘন নির্জনবাসে যেতেন। তাঁর ভাই তাঁকে এ জন্য তিরস্কার করে বলেছিলেন, 'আপনি যদি মানুষদের মাঝে একজন মানুষ হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার মানুষের সঙ্গও প্রয়োজন।' তিনি জবাব দেন, 'আপনি মানুষের মাঝে একজন মানুষ হয়ে থাকলে আপনার আল্লাহকে প্রয়োজন।' তাঁকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়, 'আপনি মানুষের কাছ থেকে হিজরত করে চলে গেছেন। তাহলে আপনি কার সাথে থাকেন?' তিনি জবাব দেন, 'তাঁর সাথেই, যার ওয়াস্তে আমি হিজরত করেছি।' গাযওয়ানকে একবার নির্জনবাসের কারণে তিরস্কার করা হলে তিনি জবাব দেন, 'যিনি আমার প্রয়োজন পূরণ করেন, তাঁর সাথে বসে আমি প্রশান্তি লাভ করি।' তাঁরা গুরাবা ছিলেন বলে তাঁদের কাউকে পাগল ভাবা হতো, যেমনটা ভাবা হয়েছিল ওয়াইসকে। আবু মুসলিম আল-খাওলানি এত যিকর করতেন যে, তাঁর জিহ্বা সব সময় নড়তে থাকত। এক ব্যক্তি তাঁর সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করল, 'আপনার সঙ্গী কি পাগল নাকি?' আবু মুসলিম জবাব দেন, 'না রে, ভাই! এটা বরং পাগলামির চিকিৎসা।' তাঁদের বর্ণনা দিতে গিয়ে আল-হাসান বলেন, 'অজ্ঞ ব্যক্তি তাঁদের দেখে অসুস্থ মনে করে, অথচ তাঁরা অসুস্থতা থেকে বহু দূরে! সে বলবে যে তাঁরা সংবিৎ হারিয়ে বসেছেন। অবশ্যই তাঁরা সংবিৎ হারিয়েছেন এক মহান বিষয়ের কারণে, তাদের অপবাদ থেকে যা অনেক মহান। আল্লাহর কসম! তোমার দুনিয়াবি জিনিস থেকে (মুখ ফিরিয়ে) তাঁরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।' এ বিষয়েই কবি বলেছেন: "ভালোবাসার পবিত্রতার শপথ, আপনি ছাড়া আমার কেউ নেই, হে প্রতিপালক, আমার লক্ষ্য কেবল আপনাকে ঘিরেই। আপনার প্রতি টান দেখে তারা বলে, 'এ লোক পাগল নির্ঘাত'। আমি বলি, 'এ পাগলামি কখনো ছেড়ে না যাক।”
📄 আল্লাহকে জানা
আল্লাহর রাসূল বলেছেন, “স্বাচ্ছন্দ্যের সময়ে আল্লাহকে জেনো, তাহলে তোমার বিপদের সময় তিনি তোমাকে জানবেন।” বান্দা যদি সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় তাকওয়া অবলম্বন করে, আল্লাহর নির্ধারিত সীমা হেফাজত করে এবং তাঁর অধিকারের ব্যাপারে সচেতন থাকে, এর অর্থ হলো সে আল্লাহকে জানতে শিখেছে। এর ফলে আল্লাহ ও তার মাঝে এক আধ্যাত্মিক জ্ঞানের সম্পর্ক তৈরি হয়, যার ফলে বিপদ-দুর্দশার সময় আল্লাহ তাকে জানবেন। সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় বান্দা যে আমল করেছে, তা আল্লাহ জানবেন এবং এই জানার বদৌলতে তাকে দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি দেবেন।
এই জানা থাকার বিষয়টিও বিশেষ ও আলাদা, যা বান্দার প্রতি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার নৈকট্য, ভালোবাসা ও দু'আ কবুল করার সাথে সম্পর্কিত। এ ছাড়া মাখলুকের কোনো কিছুই যে আল্লাহর কাছ থেকে গোপন নেই, সেটি হচ্ছে সাধারণভাবে জানা থাকা। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"...তিনি তোমাদের ভালোমতোই জানেন যখন তিনি তোমাদের মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন আর যখন তোমরা তোমাদের মায়ের গর্ভে ভ্রূণ-অবস্থায় ছিলে... ১০১
“আমিই মানুষকে সৃষ্টি করেছি; আর তার প্রবৃত্তি তাকে (নিত্যনতুন) কী কুমন্ত্রণা দেয়, তাও আমি জানি... "১০২
আর এই বিশেষ “জানা থাকা”র ব্যাপারটি এই হাদীসে কুদসিতে বর্ণিত বিষয়ের অনুরূপ : "... বান্দা নফল ইবাদাত করার মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হতে থাকে। এমনকি আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি। যখন আমি তাকে ভালোবাসি তখন আমি তার শ্রবণশক্তি হয়ে যাই যা দিয়ে সে শোনে, তার দৃষ্টিশক্তি হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে, তার হাত হয়ে যাই যা দিয়ে সে আঘাত করে, তার পা হয়ে যাই যা দিয়ে সে হাঁটে। "১০৩
শাওয়ানাহ নামের এক ইবাদাতগুজার নারীর সাথে সাক্ষাৎ করে ফুদাইল বললেন তাঁর জন্য দু'আ করতে। তিনি বলেন, "কিসে আপনাকে তাঁর থেকে পৃথক করছে? আপনি (নিজেই) যদি দু'আ করেন, (তাহলেও) তিনি জবাব দেবেন।" এ কথা শুনে ফুদাইল আবেগের আতিশয্যে মুর্ছা গেলেন। ১০৪
আবু জাফর আস-সাইহ বর্ণনা করেন, হাজ্জাজের কাছ থেকে পালিয়ে আল-হাসান এলেন হাবিব আবু মুহাম্মাদ এ-এর কাছে। বললেন, “আবু মুহাম্মাদ, আমাকে হাজ্জাজের বাহিনীর কাছ থেকে লুকান। তারা আমাকে ধাওয়া করেছে।” তিনি জবাব দিলেন, "আবু সাইদ, আমি লজ্জিত! আপনার সাথে আপনার প্রতিপালকের কি এমন কোনো আস্থার সম্পর্ক নেই যে, আপনি তার কাছে দু'আ করবেন আর তিনি আপনাকে এই সবকিছু থেকে লুকিয়ে ফেলবেন? আসুন, ঘরে ঢুকুন।” এর কিছুক্ষণ পর হাজ্জাজের বাহিনীও সেই ঘরে ঢুকল কিন্তু তাঁকে খুঁজে পেল না। এই খবর হাজ্জাজের কানে পৌঁছানো হলে তিনি বলেন, "বরং সে সেই ঘরের ভেতরেই ছিল। কিন্তু আল্লাহ তাদের দৃষ্টি ঢেকে দিয়েছেন বলে তারা তাকে দেখতে পায়নি।"
আল্লাহর ব্যাপারে এই বিশেষ জ্ঞান যখন লাভ হয়, তখন বান্দা ও রবের মাঝে প্রশান্তি-ঘনিষ্ঠতা ও লজ্জাশীলতার অনুভূতিসম্পন্ন এক সম্পর্ক তৈরি হয়। প্রত্যেক মুমিনের মাঝেই সাধারণভাবে যে জ্ঞান থাকে, এই জ্ঞান সে রকম নয়। এই বিশেষ ধরনের জ্ঞান লাভের জন্যই সাধকগণ কঠোর সাধনা করে থাকেন।
আবু সুলাইমান এক ব্যক্তিকে বলতে শুনলেন, "আমি গত রাতটি নারীদের ব্যাপারে কথা বলে কাটিয়েছি।” তিনি বললেন, "ধিক তোমাকে! তোমার কি তাঁর (আল্লাহর) প্রতি কোনো লজ্জা নেই? সারা রাত তিনি তোমাকে দেখেছেন যে, তুমি তাঁকে ছাড়া অন্য কারও স্মরণ করে রাত কাটিয়েছ। কিন্তু তুমি যাকে জানোই না, তাঁর সামনে লজ্জিত কী করে হবে?"
আহমাদ ইবনু আসিম আল-আনতাকি বলেন, "আমার ইচ্ছা হলো আমার মনিবকে জানার পর মৃত্যুবরণ করা। জানার অর্থ (তাঁর অস্তিত্ব) স্বীকার করা নয়; বরং এটি এমন এক ধরনের জ্ঞান যা লাভ করলে তাঁর সামনে লজ্জিত হওয়া যায়।”
এই বিশেষ জ্ঞান ও বিশেষ ধরনের “জানা”র মাধ্যমে বান্দা তার রবের প্রতি সন্তুষ্ট হতে শেখে, তাঁর উপর নির্ভর করতে শেখে, সকল বিপদ হতে উদ্ধার হওয়ার ব্যাপারে তাঁর উপর আস্থা রাখতে শেখে। ঠিক একইভাবে এই জ্ঞানের ফলে রবও বান্দার দু'আ কবুল করতে থাকেন।
হাসান আল-বাসরি যখন হাজ্জাজের কাছ থেকে পালাচ্ছিলেন, তাঁকে বসরায় চলে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। তিনি ফুঁপিয়ে কেঁদে বললেন, “আমি নিজের এলাকা, পরিবার, ভাইদের ছেড়ে যাব? আমার প্রতিপালকের ব্যাপারে আমার জ্ঞান এবং যেই নিয়ামত দিয়ে তিনি আমাকে ধন্য করেছেন, এতে আমার বিশ্বাস হয়ে গেছে তিনি আমাকে বাঁচাবেন ও তার হাত থেকে নিষ্কৃতি দেবেন, ইনশাআল্লাহ তা'আলা।” হাজ্জাজ তাঁর কোনো ক্ষতিই করতে পারেননি; বরং এ ঘটনার পর তিনি হাসানকে অত্যন্ত সম্মান করতে শুরু করেন এবং তাঁর ব্যাপারে ভালো ভালো কথা বলেন।
মারুফকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “কিসে আপনাকে নির্জনে গিয়ে ইবাদাত করতে উদ্বুদ্ধ করল?” সম্ভাব্য কারণ হিসেবে প্রশ্নকারী মৃত্যু, আল-বারযাখ, জান্নাত ও জাহান্নামের কথা উল্লেখ করলেন। তিনি জবাব দিলেন, “এসব আবার কী! এগুলো তো তাঁরই হাতে। তোমার ও তাঁর মাঝে যখন জ্ঞানের সম্পর্ক স্থাপিত হবে, তখন তিনিই এই সকল ঘাঁটিতে তোমার জন্য যথেষ্ট হবেন।”
তিরমিযিতে আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত এই হাদীস এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে তোলে। রাসূল বলেন, “যে চায় তার দুঃখ-দুর্দশার সময় আল্লাহ তার দু'আ কবুল করুন, সে যেন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় বেশি বেশি দু'আ করে।”১০৫
ইবনু আবিদ্দুনিয়া, ইবনু আবি হাতিম, ইবনু জারির ও অন্যরা ইয়াযিদ আর-রাকাশির সূত্রে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। আনাস থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “মাছের পেটে থাকা অবস্থায় ইউনুস যখন দু'আ করছিলেন, তখন ফেরেশতারা বললেন, 'এ তো একটি পরিচিত কণ্ঠ, অথচ আসছে এক অপরিচিত জায়গা থেকে।' তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, 'ইনি কে?' আল্লাহ বললেন, 'আমার বান্দা ইউনুস।' তাঁরা বললেন, 'আপনার বান্দা ইউনুস, যার সকল আমল ও সকল দু'আ কবুল করা হয়েছে?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' তাঁরা বললেন, 'হে প্রতিপালক, তিনি সুখের সময়ে যা করতেন, তার উসিলায় আপনি কি তাঁর এই দুঃখের সময় তাঁর প্রতি রহম করবেন না?' তিনি জবাব দিলেন, 'অবশ্যই।' তিনি মাছকে আদেশ দিলেন ইউনুস -কে মরুভূমির উপকূলে বের করে দিতে।"১০৬
দাহহাক ইবনু কায়স বলেন, "স্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহকে স্মরণ করো, তিনি তোমাকে তোমার দুর্দশার সময়ে স্মরণ করবেন। ইউনুস আল্লাহকে স্মরণ করতেন। পরে যখন মাছ তাঁকে গিলে ফেলল, আল্লাহ তা'আলা বললেন:
“সে যদি আল্লাহর তাসবীহকারী না হতো, তাহলে নিশ্চিতই তাকে পুনরুত্থানের দিন পর্যন্ত মাছের পেটে থাকতে হতো।”১০৭
ফিরআউন ছিল এক যালিম, যে আল্লাহর স্মরণের প্রতি গাফেল ছিল। সে ডুবে যাওয়ার সময় বলেছিল, "আমি ঈমান আনলাম।” আল্লাহ তা'আলা বললেন:
"কী! এখন? আগে তো অমান্য করেছ আর ফাসাদকারীদের অন্তর্ভুক্ত থেকেছ। "১০৮
রিশদিন ইবনু সাদ বলেছেন, "আবুদ্দারদা -এর কাছে এক ব্যক্তি উপদেশ চাইলো। তিনি জবাব দিলেন, 'স্বাচ্ছন্দ্যের সময়ে আল্লাহকে স্মরণ করো, তিনি তোমার দুর্দশান সময়ে তোমাকে স্মরণ করবেন।”১০৯
সালমান আল-ফারিসি বলেন,
"কেউ যদি স্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার কাছে দু'আ করতে অভ্যস্ত থাকে, তাহলে সে কোনো বিপদে পড়ে দু'আ করলে ফেরেশতারা বলেন, 'এ তো একটি পরিচিত কণ্ঠ!' তারপর তাঁরা তার জন্য সুপারিশ করেন। আর সে যদি স্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার কাছে দু'আ করতে অভ্যস্ত না থাকে, তাহলে সে কোনো বিপদে পড়ে দু'আ করলে ফেরেশতারা বলেন, 'এ তো একটি অপরিচিত কণ্ঠ!' তাঁরা তার জন্য সুপারিশ করেন না।”
পাথর দিয়ে গুহার মুখ বন্ধ হয়ে আটকে পড়া তিন ব্যক্তির হাদীসও এখানে উল্লেখ্য। বিপদে পড়ে তাঁরা এমন নেক আমলের উসিলা দিয়ে দু'আ করেছিলেন, যেগুলো তাঁরা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময়ে করেছিলেন। পিতামাতার প্রতি সদাচরণ, অশ্লীল কাজ পরিত্যাগ আর আমানত রক্ষা করা। ১১০
এটি জানা কথা যে, স্বাচ্ছন্দ্যের সময় বান্দা আল্লাহকে স্মরণ করলে তার দুর্দশার সময় আল্লাহ তাকে স্মরণ করবেন। জীবনে যত বিপদ আসে তার মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপদ হলো মৃত্যু। তার মৃত্যু-পরবর্তী গন্তব্য যদি ভালো না হয়, তাহলে মৃত্যুর পরের ঘাঁটিগুলো এরচেয়ে ভয়াবহ হবে। আর গন্তব্য ভালো হলে মৃত্যুই হবে সবচেয়ে হালকা বিপদ। তাই এই বিপদের সময় আসার আগেই মানুষকে এর জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে ও আমল তৈরি করতে হবে। কেউ জানে না কোন দিন বা কোন রাতে তার মৃত্যু চলে আসবে।
মৃত্যুর সময় নেক আমলের কথা স্মরণ করতে পারলে রবের প্রতি বান্দার সুধারণা তীব্র হয়, মৃত্যুযন্ত্রণা লাঘব হয় ও আশার সঞ্চার হয়।
একজন সালাফ মোটামুটি এমন একটি কথা বলেছিলেন, “তাঁরা নেক আমলের একটি ভান্ডার প্রস্তুত রাখা ওয়াজিব মনে করতেন, যাতে মৃত্যুযন্ত্রণা লাঘব হয়।”
কোনো নেক আমল-যেমন হাজ্জ, জিহাদ, সিয়াম ইত্যাদি-করার পরপরই মারা যাওয়াকে তাঁরা অত্যন্ত ফযিলতপূর্ণ বলে বিশ্বাস করতেন।
নাখঈ (রহ.) বলেছেন, “মৃত্যুশয্যায় শায়িত ব্যক্তিকে তার নেক আমলের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়াকে তাঁরা প্রশংসনীয় বলে জানতেন। এতে করে রবের প্রতি বান্দার সুধারণা তৈরি হয়।”
আবু আব্দুর রহমান আস-সুলামি (রহ.) তাঁর মৃত্যুশয্যায় বলেছিলেন, “আমি কী করে আমার প্রতিপালকের প্রতি সুধারণা না রাখতে পারি, অথচ আমি আশিটি রমাদান যাবৎ সিয়াম পালন করেছি?”১১১
আবু বাকর ইবনু আইয়্যাশ-এর মৃত্যু উপস্থিত হলে তাঁর আশপাশের মানুষেরা কান্না করতে লাগলেন। তিনি বললেন, “কান্না কোরো না। আমি এই মুসাল্লায় তেরো হাজার বার কুরআন সম্পূর্ণ তিলাওয়াত করেছি।”
বর্ণিত আছে যে, তিনি তাঁর সন্তানকে বলেছিলেন, “তোমার কি মনে হয় আল্লাহ তোমার পিতার জীবনের চল্লিশটি বছর নষ্ট করে দেবেন, যার প্রতিটি রাতে সে কুরআন সম্পূর্ণ তিলাওয়াত করেছে?”১১২
একজন সালাফ তাঁর মৃত্যুশয্যায় তাঁর পুত্রকে পাশে বসে কাঁদতে দেখলেন। তিনি বললেন, “কেঁদো না। তোমার পিতা কখনো কোনো অশ্লীল কাজ করেননি।”
আদাম ইবনু আবু ইয়্যাস মৃত্যুশয্যায় কাপড় জড়ানো অবস্থায়ই সম্পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াত করেন। তিনি বললেন, “আপনার প্রতি আমার ভালোবাসার উসিলায় এই ভয়াবহ সময়ে আমার প্রতি সদয় হোন। এই মহাদিবসের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় সারাক্ষণ আমার সকল আশা-ভরসা আপনার প্রতি ছিল। লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ!” এতটুকু বলে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। আল্লাহ তাঁকে রহম করুন।১১৩
দুনিয়াবিরাগী সাধক আব্দুস সামাদ তাঁর মৃত্যুশয্যায় বলেছিলেন, “হে আমার প্রভু, এই সময়টির জন্যই আমি আপনাকে আমার গুপ্ত ধনভান্ডার হিসেবে রেখেছি। এই সময়টির জন্যই আমি আপনার হেফাজত করেছি। আপনার ব্যাপারে আমার সুধারণাকে বাস্তবায়ন করুন।”১১৪
ইবনু আকিল-এর মৃত্যুর সময় তাঁর পাশে বসে কান্নারত নারীদের তিনি বলেন, "পঞ্চাশ বছর যাবৎ আমি তাঁর জন্য রায় গোপন রেখে এসেছি। আজ আমাকে তাঁর সাথে সাক্ষাতের প্রস্তুতি নিতে একা থাকতে দাও।"
কারামিতা* সম্প্রদায় (ইসমাঈলি শিয়াদের একটি শাখা) হাজীগণের উপর আক্রমণ করে। তখন তাঁরা তাওয়াফ করছিলেন। সুফি আলি ইবনু বাকওয়াইহ সেখানে ছিলেন। তিনিও তাওয়াফ করছিলেন। কিন্তু তরবারির উপর্যুপরি আঘাত পেয়েও তিনি তাওয়াফ থামাননি। এ অবস্থায়ই তাঁর মৃত্যু চলে আসে। তখন তিনি এ কবিতা পাঠ করছিলেন :
প্রেমিকেরা সেজদা দিয়ে শুয়ে আছে যে ঘরে, আসহাবে কাহফ ঘুমোয় যেমন শতাব্দী ধরে। যদি বলে তারা যুদ্ধের দিন আগে থেকেই ছিল মৃত, ওয়াল্লাহি! এ কথা মিথ্যে হিসেবে হবে না কভু ধৃত।
যে কেউ জীবদ্দশায় আল্লাহর সীমা হেফাজত করে ও তাঁর কথা মান্য করে, তার মৃত্যুশয্যায় আল্লাহ তাকে হেফাজত করবেন ও ঈমানের সাথে মৃত্যু দান করবেন। কবরে ফেরেশতাদের সওয়ালের মুখে আল্লাহ তাকে শক্তিশালী কালিমাহ দিয়ে শক্তিশালী করবেন, কবরের আযাবকে তার থেকে হটিয়ে দেবেন, একাকিত্ব আর অন্ধকারের জীবনে তার জন্য সান্ত্বনা হবেন।
একজন সালাফ বলেছিলেন, “কবরে প্রবেশ করার সময় যদি আল্লাহ তোমার সাথে থাকেন, তাহলে তুমি ক্ষতিগ্রস্তও হবে না, একাকীও হবে না।”
একজন নেককার আলিমের মৃত্যুর পর তিনি স্বপ্নে দেখা দেন। তাঁকে তাঁর অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “আমার মহাপবিত্র ও সুমহান প্রতিপালক আমাকে সঙ্গ দেন।”
দুনিয়ার একাকিত্বে আল্লাহ যার সঙ্গী হন, সে আশা করতেই পারে যে কবরের একাকিত্বেও আল্লাহ তার সঙ্গী হবেন। এ অর্থেই একজন সালাফ বলেছিলেন :
একাকিত্বে আমার সঙ্গী হও, হে রব। আমি বিশ্বাস করি তোমার ওয়াহী সব। আল্লাহর দিকে যাত্রায় আমি করি না কোনো ভয়, আমার প্রতি তাঁর দয়া যে পরিবারের চেয়ে বেশি হয়!”
কিয়ামাতের ভয়াবহতা ও কাঠিন্যের ব্যাপারেও এ কথা সত্য। আল্লাহ যখন তাঁর অনুগত বান্দার দেখভাল করেন, তিনি তাকে এই সবকিছু থেকে উদ্ধার করে নেবেন।
আল্লাহ তা'আলার বাণী :
"যে কেউ তাকওয়া অবলম্বন করে, আল্লাহ তাকে কোনো না-কোনো পথে উদ্ধার করে দেবেন।” ১১৫
এর ব্যাখ্যায় কাতাদাহ বলেন, "অর্থাৎ মৃত্যুযন্ত্রণা ও কিয়ামাতের ভয়াবহতা থেকে (বের হওয়ার পথ করে দেবেন)।"১১৬
আলি ইবনু আবু তালহা থেকে বর্ণিত আব্বাস এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, "আমি (আল্লাহ) তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের সব কষ্ট থেকে মুক্তি দেবো।”১১৭
আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন: "যারা বলে, 'আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ' অতঃপর (সে কথার উপর) সুদৃঢ় থাকে, ফেরেশতারা তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় আর বলে, 'তোমরা ভয় কোরো না, চিন্তা কোরো না। আর জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো, যার ওয়াদা তোমাদের দেওয়া হয়েছে।”১১৮
এর ব্যাখ্যায় যাইদ ইবনু আসলাম বলেছেন, "মৃত্যুর ক্ষণে, কবরে ও কিয়ামাতের দিন তাকে সুসংবাদ দেওয়া হবে। সুসংবাদের আনন্দ হৃদয় থেকে বের হওয়ার আগেই সে নিজেকে জান্নাতের সামনে আবিষ্কার করবে।”১১৯
সাবিত আল-বুনানি এই আয়াতের তাফসীরে বলেন, "আমাদের কাছে এ কথা পৌঁছেছে যে, যে দুজন ফেরেশতা তাকে এ দুনিয়ায় সঙ্গ দিতেন, তাঁরা কবর থেকে পুনরুত্থানের দিন মুমিনের সাথে দেখা করে বলবেন, 'ভয় কোরো না, চিন্তা কোরো না।' আর আল্লাহ তার ভয় লাঘব করে চোখকে প্রশান্তি দেবেন। কিয়ামাতের দিন মানুষকে যত বিপদই গ্রাস করবে, মুমিনের জন্য তা প্রশান্তিদায়ক হবে। কারণ, আল্লাহ তাকে হিদায়াত দিয়েছেন এবং দুনিয়ায় সে নেক আমল করেছে।”১২০ ইবনু আবি হাতিম ও অন্যান্যদের কাছ থেকে বর্ণনাগুলো এসেছে।
আর যারা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময়ে আল্লাহকে জানে না, তার দুঃখ-দুর্দশার সময়ে আল্লাহও তাকে জানবেন না-হোক তা দুনিয়া বা আখিরাতে। দুনিয়ায় এসব মানুষের অবস্থা দেখে বোঝা যায় যে, আখিরাতে তাদের অবস্থা আরও খারাপ হবে।
কারণ, তাদের কোনো রক্ষাকারী বা সাহায্যকারী থাকবে না।
টিকাঃ
১০১ সূরাহ আন-নাজম, ৫৩: ৩২
১০২ সূরাহ কাফ, ৫০: ১৬
১০০ বুখারি: ৬৫০২; আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত।
১০৪ আবু নুয়াইম: খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ১১৬, হাদীস নং ১১৫৬৭-তে আরও বলা হয়, ফুদাইল বলেন, "আমাদের আনুগত্যের মহত্ত্ব দিয়ে মহান করুন, আর অবাধ্যতার অপমান দিয়ে অপমানিত করবেন না।"
১০৫ তিরমিযি: ৩৩৮২; তিনি একে গারীব বলেছেন। হাকিম: ১৯৯৭ একে গারীব বলেছেন। যাহাবি একমত। মুনযিরি, আত-তারগীব: খণ্ড, ২, ৩৮৮ পৃষ্ঠাতে বলেন এর ইসনাদ সহীহ। সুয়তি, জামিউস সগির: ৮৭৪৩ এবং আলবানি, আস-সহীহাহ: ৫৯৩ ও সহীহুত তারগীব: ১৬২৮-এ একে হাসান বলেছেন।
১০০ ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-ফারাজ বাদাশশিদ্দাহর ২৫ পৃষ্ঠায় এর ইসনাদ যঈফ বলেছেন।
১০৭ সূরাহ আস-সফফাত, ৩৭: ১৪৩-১৪৪
১০৮ সূরাহ ইউনুস, ১০: ৯১
১০৯ আবু নুয়াইম: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২০৯
১১০ বুখারি: ২২১৫-২২৭২-২৩৩৩-৩৪৬৫-৫৯৭৪ এবং মুসলিম: ২৭৪৩; ইবনু উমার (রা.) থেকে বর্ণিত।
১১১ আবু নুয়াইম: খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৯২
১১২ খাতিব, তারিখ: খণ্ড ১৪, পৃষ্ঠা ৩৮৩
১১০ খাতিব, তারিখ: খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ২৯
১১৪ ইবনুল জাওযি, সিফাতুস সাফওয়াহ: খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৭২
*কারামিতা সম্প্রদায়: বাতিনিয়্যাহ গোষ্ঠীর মতো আকীদা পোষণকারী একটি দল এবং মায়মুন ইবনু দায়সানের অনুসারী। বাতিনিয়্যাহ হলো শিয়াদের একটি দল, যারা ইসমাঈল ইবনু জাফারের অনুসারী। এরা বিশ্বাস করে যে, কুরআন-হাদীস কেবল ভাসা ভাসা কিছু বক্তব্যের সমষ্টি, যার অন্তর্নিহিত আসল বক্তব্য বাহ্যিক বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। জান্নাত, জাহান্নাম ও আখিরাতের ব্যাপারে তাদের ভ্রান্ত এ ব্যাখ্যাগুলো তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাসের উদাহরণ।
১১৫ সূরাহ আত-তালাক, ৬৫: ২
১১৬ সুয়ুতি, আদ্দুররুল মানসুর: খণ্ড ১৪, পৃষ্ঠা ৫৩৭ একে আব্দ ইবনু হুমাইদের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন; আবু নুয়াইম, আল-হিলইয়াহ: খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৪০
১১৭ তাবারি : খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৩; সুয়ুতি, আদ্দুররুল মানসুর: খণ্ড ১৪, ৫৩৮ পৃষ্ঠায় একে ইবনুল মুনযির ও ইবনু আবি হাতিমের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন।
১১৮ সূরাহ ফুসসিলাত, ৪১ : ৩০; অনুরূপ সূরাহ আল-আহকাফ, ৪৬ : ১৩
১১৯ সুয়ুতি, আদ্দুররুল মানসুর: খণ্ড ১৩, ১০৭ পৃষ্ঠায় একে ইবনু আবি শাইবাহ ইবনু আবি হাতিমের সাথে সম্পৃক্ত করেন।
১২০ সুয়ুতি, আদ্দুররুল মানসুর: খণ্ড ১৩, ১০৮ পৃষ্ঠায় একে ইবনুল মুনযির ও ইবনু আবি হাতিমের সাথে সম্পৃক্ত করেন।