📄 শর’ঈ সম্পাদকের কথা
রাসূল ছিলেন "জাওয়ামিউল কালিম" তথা অল্প কথায় অধিক মর্ম প্রকাশক। উম্মাহর জন্য 'রহমাহ' হয়ে আসা এই মহা মানবের প্রতিটা কথায় লুকিয়ে আছে সফলতার মূলমন্ত্র, আত্মার খোরাক, ইহকাল ও পরকালে সাফল্যলাভের উপদেশ! তাঁর মুখনিঃসৃত বাণীগুলো ছিলো পরশ পাথরতুল্য। যারাই তা মেনে নিয়েছেন, সে অনুপাতে জীবনকে ঢেলে সাজিয়েছেন, মুহূর্ত পূর্ব জাহিলী, বর্বর ও নরকপ্রান্তে উপনীত সেই মানুষগুলো পৌঁছে গেছেন ইতিহাসের স্বর্ণশিখরে। তাঁর প্রতিটা কথা, কর্ম ও সমর্থন সর্বকালেই সকল শ্রেণী-পেশা মানুষের জন্য পথনির্দেশক। চির মুক্তির দিকে আহবায়ক। পাঠকের হাতে সমর্পিত বইটি এমন একটি কথা বা হহাদীসেরই ব্যাখ্যাগ্রন্থ মাত্র।
বালক সাহাবি ইবনে আব্বাস। রাসূলের সাথে উটের উপর বসা। প্রিয়নবী স্নেহভরে ডাকলেন, "বৎস! আমি কি তোমাকে এমন কিছু কথা বলে দিব, যা মেনে চললে তুমি উপকৃত হবে? প্রভূত কল্যাণ লাভ করবে...?" এরপর তিনি এক এক করে ১২ টা নসীহত করেন। অবিজ্ঞতায় পোড় খাওয়া ব্যক্তি যেভাবে অনুজদের উপদেশ দেয়, ঠিক সেভাবে রাসূল বলছেন, আর বালক সাহাবি তা মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। এ যেন সফলতার ১২ টি ধাপ, ১২ টি সিঁড়ি। মেধাবী ও বিচক্ষণ সাহাবি ইবনে আব্বাস তা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছেন। ফলে তিনি জীবনের সুখটা পূর্ণমাত্রায় উপভোগ করেছেন।
রাসূলের সেই নসীহতনামাকে বর্ণনা করেছেন অনেক মুহাদ্দিস। অনেক ওয়ায়েজ। কিন্তু ইবনে রজব রহিমাহুল্লাহ একটু ভিন্নপথে হাটলেন। একটু ভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করলেন। তিনি ১২ টি নসীহতকে পৃথক পৃথক শিরোনামে ব্যাখ্যা করেছেন। প্রতিটা শিরোনামের অধীনে উল্লেখ করেছেন অন্তত দশটি করে চমৎকার সব বাণী ও কাহিনী। কুর'আন-সুন্নাহ এবং বুজুর্গ ব্যক্তিদের বাস্তব ঘটনা ও উপমা দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন নসীহতগুলো মর্মকথা, উপকারীতা ও গ্রহণযোগ্যতা। লেখক তার বইটির নাম রেখেছেন "নূরুল ইকতিবাস", যার বাংলা অনুবাদ "নবীজির পদাঙ্ক অনুসরণ।"
বইটি মূলত ইংরেজি থেকে অনূদিত। তবে আমি আরবিটা পড়েছি। এবং খুব যত্নসহকারেই অনুবাদকপি মূল বইটির সাথে মিলেয়ে নিয়েছি। তবে ইংরেজি ভার্সনটাতে অতিরিক্ত কিছু পরিশিষ্ট ছিলো, যা উপকারি মনে হওয়ায় অনুবাদেও সংযুক্ত করা হয়েছে। কিছুকিছু জায়গায় আমাদের মত পাঠকদের ঘটনা কিংবা বর্ণনায় অসস্পষ্টতা বা প্রশ্ন থাকতে পারে ভেবে টীকা সংযোজন করা হয়েছে। আর রেফারেন্স এর ক্ষেত্রে আমরা আরবী ও ইংরেজি ভার্সনেরই ইত্তিবা করেছি।
বইটি পড়তে গিয়ে মনে হলো দুইটি বিষয় একটু খোলাসা করে দেওয়া উচিৎ। কেননা বিষয় দুইটি নিয়ে আমাদের ধর্মচর্চাঙ্গণে বেশ বিতর্ক আছে। কিংবা অজ্ঞতার কারণে কেউ কেউ অযথা বিতর্কে জড়িয়ে যাচ্ছে।
প্রথম বিষয়ঃ কিছু মানুষের ধারণা, "অলি-আউলিয়াগণের কারামত সত্য নয়। ইসলামে এর কোনো ভিত্তি নেই।” তাদের দাবি, “কারামত আর মু'জিযা একই। এবং তা কেবল নবী-রাসূলগণ থেকেই প্রকাশ পেয়ে থাকে।”
আসলে উনাদের বিশ্বাস কিংবা বক্তব্য সত্য নয়। বরং তা কুর'আন ও সুন্নাহ বিরোধী। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মতে মু'মিন ও সৎকর্মপরায়ণ লোকদের থেকে প্রকাশিত কারামত সত্য।
কারামত বলা হয় নেক ও মুমিন লোকদের থেকে শরীয়ত মু'আফিক অলৌকিক কিছু প্রকাশ পাওয়া। সেটা দীনের বিজয়, বাতিলের পরাজয়, কোনো বিপদ দূর কিংবা নেক লোকদের ইচ্ছে পূরণের কারণেও হতে পারে। হতে পারে আল্লাহর নিদর্শন প্রকাশের উদ্দেস্যেও।
কিছু প্রমাণঃ
এক,
মারইয়াম এর যখন প্রসব ব্যথা শুরু হয়, তখন তিনি দূরে নির্জন একটি জায়গায় চলে যান। সেখানে একটি মরা খাল আর শুকনো খেজুর গাছ ছিলো। তিনি খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। এমন সময় জিব্রাইল তাকে ডেকে বললেন, পেরেশান হয়ো না। আল্লাহ আপনার জন্য খালে পানি প্রবাহিত করেছেন। শুকনো গাছে পরিপক্ক খেজুর দান করেছেন। আপনি তার ঝুকে পড়া পাতা ধরে ঝাকা দিলেই তা ঝরঝর করে পড়বে। এটা ছিলো মারইয়াম এর কারামতি। আর তিনি যে নবী ছিলেন না, এ ব্যাপারে সবাই একমত।
দুই,
আল্লাহ তা'আলা মারইয়াম-কে উত্তমভাবে লালন-পালন করার জন্য তাঁর খালু যাকারিয়া-এর তত্ত্বাবধানে দিলেন। মারইয়াম মিহরাবের নিজ কক্ষে থাকতেন। যাকারিয়া যখনই মারইয়াম এর কক্ষে প্রবেশ করতেন তখন তার কাছে বিভিন্ন অমৌসুমী ফল-ফলাদি দেখতে পেতেন। গ্রীষ্মের ফল শীতকালে আর শীতকালের ফল গ্রীষ্মে। এ ফলমূল দেখে জাকারিয়া (আঃ) আশ্চর্য হয়ে যেতেন; কারণ তিনি নিজে এ ফল এনে দিতেন না এবং অন্য কেউও এনে দিত না। এটা ছিলো মারইয়াম (আঃ)-এর কারামাত।
তিন,
আসহাফে কাহাফের ঘটনাটিও বড় আশ্চর্যের। অলৌকিক। কোনো মানুষের পক্ষেই একটানা ৩০৯ বছর ঘুমানো এবং জাগ্রত হওয়া সম্ভব নয়। এমনকি তারা যে গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন, তার মুখ ছিলো প্রশস্ত। কিন্তু সূর্যের আলো তাতে ঢুকত না। এটা তাদের কারামাত।
চার,
সুলাইমান (আঃ) চাইলেন রানী বিলকিসকে চমকে দিবেন। তো তিনি তার অনুসারীদের বললেন, কে আছে যে তার সিংহাসন তার আগমনের পূর্বে এখানে উপস্থিত করতে পারবে? তখন এক ব্যক্তি বললেন আমি আপনার চোখের পলক পরার আগেই তা হাজির করে দিবো। এবং তাই হলো। অধিকাংশ তাফসীরবিদের মতে, এ লোক সুলাইমান (আঃ)-এর সহচর ছিলেন, যার নাম ছিল আসেফ ইবনে বরখিয়া। সে হিসেবে এটা একটি কারামত ছিল।
পাঁচ,
ইবরাহীম (আঃ) স্ত্রী সারাকে সঙ্গে নিয়ে হিজরত করলেন এবং এমন এক জনপদে প্রবেশ করলেন, যেখানে এক অত্যাচারী শাসক ছিল। সে জানতে পারলো যে ইবরাহীম নামক এক ব্যক্তি এক পরমা সুন্দরী নারীকে নিয়ে তার শহরে প্রবেশ করেছে। তখন তাদের ডাকা হলো। একপর্যায় সারাকে ডেকে পাঠালেন। বাদশাহ তাঁর দিকে অসৎ নিয়তে অগ্রসর হলে সারা উযু করে সালাত আদায়ে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং এ দু'আ করলেন, হে আল্লাহ! আমিও তোমার উপর এবং তোমার রসূলের উপর ঈমান এনেছি এবং আমার স্বামী ব্যতীত সকল হতে আমার লজ্জাস্থানকে সংরক্ষণ করেছি। তুমি এই কাফিরকে আমার উপর ক্ষমতা দিও না। তখন বাদশাহ বেহুঁশ হয়ে পড়ে মাটিতে পায়ের আঘাত করতে লাগলো। তখন সারা বললেন, আয় আল্লাহ! এ যদি মারা যায় তবে লোকে বলবে, স্ত্রীলোকটি একে হত্যা করেছে। তখন সে সংজ্ঞা ফিরে পেল। এভাবে দু'বার বা তিনবারের পর বাদশাহ বলল, আল্লাহর শপথ! তোমরা তো আমার নিকট এক শয়তানকে পাঠিয়েছ। একে ইবরাহীমের নিকট ফিরিয়ে দাও এবং তার জন্য হাজেরাকে হাদিয়া। স্বরূপ দান কর। সারাহ ইবরাহীম-এর নিকট ফিরে এসে বললেন, আপনি জানেন কি, আল্লাহ্ তা'আলা কাফিরকে লজ্জিত ও নিরাশ করেছেন এবং সে এক বাঁদী হাদিয়া হিসেবে দিয়েছেন।
ছয়,
পাহাড়ের গুহায় আটকে যাওয়া তিন যুবকের ঘটনাও এখানে উল্লেখযোগ্য। তাদের তিন জনের প্রত্যেকেই স্বীয় সৎকর্মের অসিলা দিয়ে দু'আ করেন। ফলে পাথরটি আপনা আপনি সরে যায়। তারাও মুক্তি পায় এক ভয়াবহ বিপদ থেকে।
সাত,
জুরাইজ নামের এক আবেদ নফল ইবাদাতে ছিলেন। এমন সময় তার মা এসে তাকে ডাকেন। কিন্তু ইবাদাতে থাকায় তিনি তার ডাকে সাড়া দেননি। এদিকে মা রাগ হয়ে বলেন, আল্লাহ যেন তাকে পতিতাদের মুখ না দেখিয়ে মৃত্যু না দেন। এর অনেকদিন পর এক রাখালিনী বাচ্চা প্রসব করে। সে বলল এই বাচ্চার বাপ জুরাইজ। লোকেরা জুরাইজের উপর ক্ষেপে গেলো। ভণ্ড বলে অভিযোগ করলো। তো জুরাইজ তা জানতে পেরে বললেন, ঐ নবজাতক শিশুটিকে নিয়ে আসুন। এরপর তিনি বাচ্চাকে বললেন, তোমার পিতা কে? বাচ্চা বলল, অমুক রাখাল আমার বাপ।
আট,
অতীতকালে এক বাদশার এক জাদুকর ও গণক ছিল। যখন সে গণক বৃদ্ধ অবস্থায় উপনীত হলো তখন সে বাদশাকে বলল, আমাকে একটি বুদ্ধিমান বালক দিন যাকে আমি এ বিদ্যা শিক্ষা দেব। সুতরাং বাদশা সে রকম একজন বুদ্ধিমান বালক খোঁজ করে তার কাছে সমর্পণ করলেন। ঐ বালকের পথে এক পাদরিরও ঘর ছিল। বালকটি পথে আসা যাওয়ার সময় সে পাদরির নিকট গিয়ে বসত এবং তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতো। এভাবে তার আসা-যাওয়া অব্যাহত থাকে।
একদা এ বালকটির যাওয়ার পথে এক বৃহদাকার জন্তু (বাঘ অথবা সাপ) বসে ছিল যে মানুষের আসা যাওয়ার রাস্তা বন্ধ করে রেখেছিল। বালকটি চিন্তা করল, আজকে আমি পরীক্ষা করব যে জাদুকর সত্য, না পাদ্রী। সে একটি পাথরের টুকরো কুড়িয়ে বলল, হে আল্লাহ তা'আলা! যদি পাদ্রীর আমল তোমার কাছে জাদুকরের আমল থেকে উত্তম এবং পছন্দনীয় হয়, তাহলে এ জন্তুকে মেরে ফেল, যাতে মানুষ চলাচল করতে পারে। এ বলে বালকটি পাথর ছুড়লে জন্তুটি মারা গেল। এবার বালকটি পাদ্রীর নিকট গিয়ে সব খুলে বলল। পাদ্রী বললেন, হে বৎস! এবার দেখছি তুমি পূর্ণ দক্ষতায় পৌঁছে গেছো। এবার তোমার পরীক্ষা শুরু হতে চলেছে। কিন্তু এ পরীক্ষা অবস্থায় আমার নাম তুমি প্রকাশ করবে না। এ বালকটি জন্মান্ধ ও ধবল প্রভৃতি রোগের চিকিৎসাও করত; তবে তা আল্লাহ তা'আলার ওপর বিশ্বাসের শর্ত রেখেই করত। বালকটি এ শর্তানুযায়ী বাদশার এক সহচরের অন্ধ চক্ষুকে আল্লাহ তা'আলার কাছে দু'আ করে ভাল করে দেন। বালকটি বলত যে, আপনি যদি ঈমান আনেন তাহলে আমি আল্লাহ তা'আলার কাছে দু'আ করব; তিনি আরোগ্য দান করবেন। সুতরাং সে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানালে তিনি রোগীকে আরোগ্য দান করতেন। এ খবর বাদশার নিকট গেল, সে বড় উদ্বিগ্ন হলো। কিছু সংখ্যক ঈমানদারকে সে হত্যাও করে ফেললো। আর এ বালকটির ব্যাপারে তিনি কয়েকটি লোককে ডেকে বললো যে, এ বালকটিকে উঁচু পাহাড়ের ওপর নিয়ে গিয়ে নীচে ফেলে দাও। বালকটি আল্লাহ তা'আলার কাছে দু'আ করলে পাহাড় কাপতে লাগল। সে ছাড়া সকলেই পাহাড় থেকে পড়ে গেল। বাদশা তখন বালকটিকে অপর কিছু লোকের কাছে সমর্পণ করে বললো, একে একটি নৌকায় চড়িয়ে সমুদ্রের মাঝে নিক্ষেপ কর। সেখানেও বালকটি বেঁচে গেল। এবার বালকটি বাদশাকে বলল: যদি আপনি আমাকে মারতে চান তাহলে এর সঠিক পদ্ধতি হলো একটি খোলা মাঠে লোকদেরকে সমবেত করে “বিসমিল্লাহি রাব্বিল গোলাম” বলে আমার প্রতি তীর নিক্ষপ করুন। দেখবেন আমি মারা গেছি। বাদশা তাই করলো। ফলে বালকটি মৃত্যুবরণ করল।
এটা দেখে সে ঘটনাস্থলেই লোকেরা উচ্চকণ্ঠে বলে উঠল যে, আমরা এ বালকটির রবের প্রতি ঈমান আনলাম। বাদশা আরো অধিক উদ্বিগ্ন হলো। অতএব সে তাদের জন্য গর্ত খনন করে তাতে আগুন জ্বালাতে আদেশ করলো। অতঃপর হুকুম দিলো যে, যে ব্যক্তি ঈমান হতে ফিরে না আসবে তাদেরকে আগুনে নিক্ষেপ কর। এভাবে ঈমানদার ব্যক্তিরা আসতে থাকল এবং আগুনে নিক্ষিপ্ত হতে থাকল। পরিশেষে একটি মহিলার পালা এল, যার সঙ্গে তার বাচ্চাও ছিল। সে একটু পশ্চাদপদ হলো। কিন্তু বাচ্চাটি বলে উঠল, আম্মাজান! ধৈর্য ধরুন। আপনি সত্যের ওপরে আছেন। সুতরাং সেও আগুনে পুড়ে শহীদ হয়ে গেল।
নয়,
নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দু'জন সহাবী অন্ধকার রাতে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট হতে বের হলেন, তখন তাদের সঙ্গে দু'টি বাতির মত কিছু তাদের সম্মুখ ভাগ আলোকিত করে চলল। যখন তাঁরা আলাদা হয়ে গেলেন তখন প্রত্যেকের সঙ্গে এক একটি বাতি চলতে লাগল। তাঁরা নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছা পর্যন্ত। (বলা হয়ে থাকে, এরা হলেন উব্বাদ বিন বিশর এবং উসাইদ বিন হুজাইর)
আলোচ্য ঘটনাগুলোর কেউ কিন্তু নবী-রাসূল ছিলেনা না। তথাপি তাদের থেকে অলৌকিক যা প্রকাশ পেয়েছে, তা কারামত ছাড়া আর কি বা হতে পারে? ইমাম আবু জা'ফর আত্মহাভী বলেন, "বিশ্বস্ত সূত্রে আউলিয়াগণ থেকে প্রকাশিত কারামাতকে আমরা বিশ্বাস করি।"
ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন, "আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের অন্যতম একটি আকিদা হলো আউলিয়াগণ থেকে অলৌকিক কিছু প্রকাশ হওয়াকে সত্যায়িত করা। এটা যেমন সাহাবা, তাবেয়ী ও তাবেঈনগণের যুগে প্রকাশ পেয়েছে, অনুরূপ কিয়ামত পর্যন্ত তা যে কোনো পরহেজগার মুমিনের থেকে প্রকাশ পেতে পারে।”
এখানে মু'জিযা ও কারামাতের মধ্যে কিছু সুনির্দিষ্ট পার্থক্য তুলে ধরা হলোঃ
১। মু'জিযা নবুওয়তের দাবীর সাথে সম্পৃক্ত। আর কারামতের ব্যাপারে এ দাবী থাকতে পারে না।
২। মু'জিযা নবীর ইচ্ছাধীন। তিনি সেটা দেখাতে ও প্রকাশে সমর্থ হন। পক্ষান্তরে কারামত দেখাবার ব্যাপার নয়।
৩। মু'জিযা হলো চ্যালেঞ্জ মূলক। কিন্তু কারামাত এমন নয়।
৪। মু'জিযা প্রকাশের জন্যই। কিন্তু কারামত প্রকাশ বা বলে বেড়ানোর বিষয় না।
কারামত মূলতঃ নবীর মু'জিযারই অংশ। নবীর অনুসরণ না করলে কারামত কখনো হাসিল হতে পারে না। যারা নবীর অনুসরণ করবে না তারা যদি এ ধরণের কিছু দেখায় তবে স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে যে, সেটা কোন যাদু বা সম্মোহনী অথবা ধোঁকার অংশ।
দ্বিতীয় কথাঃ
যয়ীফ হাদীসের দ্বারা ফাযায়েলে আ'মাল তথা 'আমলের ফজীলতে গ্রহণযোগ্য কি না এ ব্যাপারে আলেমগণের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। তবে অধিকাংশ আলিমের মতে ফাযায়েলে আ'মালের ক্ষেত্রে যয়ীফ হাদীস দ্বারা মুস্তাহাব হিসেবে আমল করা জায়েয। কিন্তু তিনটি শর্তের ভিত্তিতে! সহিহ বুখারির প্রসিদ্ধ ও অদিতীয় ব্যাখ্যা গ্রন্থ 'ফাতহুল বারী'র লিপিকার আল্লামা ইবনুল হাজার আসকালানী 'আল ইসাবাতু ফী তাময়ীজিস সাহাবা'তে বলেন, “তিনটি শর্তের ভিত্তিতে যয়ীফ হাদীসের উপর আমল করা যাবে।
ক, অত্যাধিক পরিমাণের যয়ীফ না হতে হবে।
খ, হাদীসটি একদম অপরিচিত না হতে হবে।
গ, হাদীসের আমল যেন ছুটে না যায়, সে সতর্কতা হিসেবে আমল করা হবে। এ হিসেবে নয় যে এটার দ্বারা আমলটি অকাট্যভাবে প্রমাণিত।"
“হুকমুল আমালি বিল হাদীসিস যায়ীফ' কিতাবের লেখক বলেন, “সকল আলিমের মতেই হালাল, হারামের বিধান সাব্যস্ত করা ছাড়া ফজীলতের ক্ষেত্রে যয়ীফ হাদীসের আমল গ্রহণযোগ্য।”
আল্লামা ইমাম নববী ও মোল্লা আলী কারী বলেন, ফাজায়েলের ক্ষেত্রে যয়ীফ হাদীস গ্রহণযোগ্য এ ব্যাপারে আলেমগণের ঐক্যমত রয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, সুফয়ান ছাওরি , আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারাক, আব্দুর রহমান বিন মাহদী , সুফয়ান বিন উয়াইনাহ, ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন, আহমাদ ইবনে হাম্বল, হাফিয ইবনে কাছির, জালালুদ্দিন মহল্লী, জালালুদ্দিন সুয়ূতি প্রমুখ।
বিবেকসম্পন্ন এবং সত্যাগ্রহী মানুষের জন্য একদুটি দলীলই যথেষ্ট ছিল। এরপরেও যদি কারো দলীলতেষ্টা না মিটে, তাহলে সূত্রে বর্ণিত গ্রন্থগুলো বিস্তর মুতালা'আর অনুরোধ জানাচ্ছি।
বইটির অনুবাদে, প্রকাশে যারা যেভাবে, প্রত্যক্ষ ও পরক্ষভাবে সাহায্য, সহযোগিতা করেছেন, আল্লাহ তাদের উত্তম প্রতিদান দিন। বিশেষত সীরাত পাবলিকেশন এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে। বাংলাভাষী পাঠকদের হাতে মনমুগ্ধকর এমন একটি বই তুলে দিতে পারায় আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি। ইসলাম ও উম্মাহর খেদমতে আল্লাহ তাদের সঠিক মানহাজের উপদ দায়েম ও কায়েম রাখেন।
একটু বই নির্ভুল ও প্রশ্নমুক্ত করার জন্য প্রকাশক, অনুবাদক এবং শরীয়ী সম্পাদক কারোরই সততা ও আন্তরিকতার ঘাটতি থাকে না। তবু অজ্ঞতা, অসতর্কতা ও অযোগ্যতার কারণে ভুল থেকে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। যদি এমন কোনো ভুল কোনো বিজ্ঞ পাঠকের নজরে পড়ে, তাহলে সর্বাগ্রে প্রকাশন সংশ্লিষ্ট কাউকে অবগত করার অনুরোধ করছি। ইনশাআল্লাহ, শুদ্ধ ও সত্য গ্রহণে আমাদের আন্তরিক পাবেন।
আবু মুহাম্মাদ জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া শিক্ষক, জামিয়া হোসাইনিয়া দারুল উলুম, রুপনগর, মিরপুর, ঢাকা