📄 জাহেলি যুগের প্রথম শপথগ্রহণের ঘটনা
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন—
‘জাহেলি যুগে সর্বপ্রথম কাসামাহ আমাদের হাশেমি গোত্রে অনুষ্ঠিত হয়। কুরাইশের কোনো একটি শাখা-গোত্রের একজন লোক বনু হাশিমের এক ব্যক্তিকে মজুর হিসাবে নিয়োগ করেছিল। মজুরটি তাদের নিকটবর্তী হওয়ার পর খাদ্যপূর্ণ বস্তার বাঁধন ছিঁড়ে যায়। তখন সে মজুর ব্যক্তিটিকে বলল, “আমাকে একটি রশি দিয়ে সাহায্য করো।” মজুর তাকে একটি রশি দিল। এরপর তারা যখন অবতরণ করল তখন একটি ছাড়া সকল উট বেঁধে রাখা হলো। মজুর নিয়োগকারী ব্যক্তি মজুরকে জিজ্ঞেস করল, "সকল উট বাঁধা হলো কিন্তু এ উটটি বাঁধা হলো না কেন?” মজুর উত্তরে বলল, “এ উটটি বাঁধার কোনো রশি নেই।” এ কথা শুনে মালিক মজুরকে লাঠি দিয়ে এমনভাবে আঘাত করল যে শেষ পর্যন্ত এ আঘাতেই তার মৃত্যু হয়ে গেল।
আহত মজুরটি যখন মুমূর্ষু অবস্থায় ছিল, তখন ইয়ামানি এক লোক তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। আহত মজুর তাকে বলল, "আপনি হজ উপলক্ষে মক্কায় উপস্থিত হলে বনু হাশিম গোত্রকে ডাকবেন এবং আবু তালিবকে জানিয়ে দেবেন যে, অমুক ব্যক্তি একটি রশির কারণে আমাকে হত্যা করেছে।” এর কিছুক্ষণ পর আহত মজুরটির মৃত্যু হয়ে যায়।
ইয়ামানি লোকটি হজ পালনের জন্য মক্কায় এসে সংবাদটি আবু তালিবকে পৌঁছে দিল। এ কথা শুনে আবু তালিব মজুর নিয়োগকারী ব্যক্তির কাছে তিনটি প্রস্তাব দিলেন— হয়তো হত্যার বিনিময়ে একশত উট দেবে, অথবা তোমার গোত্রের বিশ্বাসযোগ্য ৫০ জন লোক শপথ করে বলবে যে তুমি তাকে হত্যা করোনি, নতুবা আমরা হত্যার বদলায় তোমাকে হত্যা করব।
হত্যাকারী ব্যক্তিটি তখন নিজ গোত্রীয় লোকদের কাছে গেলে তারা বলল, “আমরা হলফ করব।” তখন বনু হাশিম গোত্রের এক নারী এসে আবু তালিবকে অনুরোধ করলেন যেন তার সন্তানকে এই শপথ থেকে রেহাই দেওয়া হয়। আবু তালিব তা মঞ্জুর করলেন। তারপর হত্যাকারীর গোত্রের এক পুরুষ দুটি উট প্রদান করে শপথ করা থেকে অব্যাহতি চাইল। বাকি ৪৮ জন এসে যথাস্থানে শপথ করল। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আল্লাহর কসম, শপথ করার পর একটি বছর অতিবাহিত হওয়ার পূর্বেই ঐ ৪৮ জনের একজনও বেঁচে ছিল না। [১]
প্রথম পাঠ
কাসামাহ (শপথগ্রহণ) জাহেলি যুগের এক বিচারব্যবস্থা। ইসলাম একে বহাল রেখেছে। হত্যাকারী জানা না গেলে মহল্লার পঞ্চাশজন ব্যক্তিকে শপথ করতে হয় যে তারা হত্যাকারীকে জানে না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খায়বারের ইহুদিদের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতিতে বিচার করেছিলেন।
দ্বিতীয় পাঠ
জাহেলি যুগেও অনেকে মিথ্যা শপথ করাটাকে মহাপাপ মনে করত। কিন্তু অনেকে অঙ্গীকারের কোনো বালাই রাখত না। আলোচ্য ঘটনায় ৪৮ জন লোক মিথ্যা কসম খেয়েছিল। এই ঘটনার এক বছর অতিক্রান্ত হতে না হতেই মিথ্যা শপথকারী প্রত্যেকেই মৃত্যুবরণ করে।
তৃতীয় পাঠ
আপনার সম্প্রদায় ও পরিবার-পরিজনদের অন্যায় পক্ষপাতিত্ব করবেন না। বাতিল তো বাতিলই। মেয়ের বা ছেলের প্রতি ভালবাসার অর্থ এটা নয় যে অন্যায় ক্ষেত্রে তাদের পক্ষপাতিত্ব করবেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো বলেছেন, 'তুমি তোমার ভাইকে সাহায্য করো চাই সে জালেম হোক বা মাজলুম।' জালেমকে সাহায্য করার অর্থ হলো তাকে জুলুম থেকে বাধা প্রদান করা। [১]
চতুর্থ পাঠ
আল্লাহর নামে মিথ্যা কসম করবেন না। আল্লাহ তাআলা কোনো মুশরিক অপর কোনো মুশরিকের উপর জুলুম করাকেও পছন্দ করেননি। যারা আল্লাহর নামে মিথ্যা কসম করেছিল এক বছর অতিবাহিত না হতেই তাদের মৃত্যু হয়ে যায়। দুনিয়ার মুক্তি ক্ষণিকের, আখেরাতে প্রতিটি কর্মের হিসাব দিতে হবে।
পঞ্চম পাঠ
ইসলাম তার পূর্ববর্তী আরব-জীবনের ওপর 'জাহেলি' শব্দটি প্রয়োগ করেছে যা মূলত ধর্মীয় দিক থেকে অজ্ঞতা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-'আমি তো মহৎ চরিত্রকে পূর্ণতা দানের জন্য প্রেরিত হয়েছি।' [১] ইসলাম প্রতিপক্ষের সঠিক বিষয়গুলোর স্বীকৃতি দান করে থাকে। কোনো ব্যক্তিকে ভালোবাসলে তার ভুল-ত্রুটির কথা ভুলে যাবেন না।
ষষ্ঠ পাঠ
জাহেলি যুগের আরবদের আচার-আচরণের কিছু বিস্ময়কর ঘটনা রয়েছে।
প্রথম ঘটনা: কায়েস ইবনে সাদ ও এক বেদুইন পরিবারের ঘটনা। সেখানে বেদুইন স্বামী মেহমানদের কাছ থেকে খাবারের মূল্য হিসেবে রেখে যাওয়া একশত দিনার বর্শা হাতে ফেরত দিয়ে মেহমানদারির মর্যাদা রক্ষা করেছিলেন।
দ্বিতীয় ঘটনা: এক বেদুইন একটি ফড়িংকে আশ্রয় দিয়েছিল এবং তার জন্য নিজ গোত্রের মানুষের বিরুদ্ধে তরবারি হাতে দাঁড়িয়েছিল যতক্ষণ না ফড়িংটি উড়ে চলে যায়।
তৃতীয় ঘটনা: সা'সাআ তিনশত মেয়েকে জীবন্ত প্রোথিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন তাদের পিতাদের কাছ থেকে উটের বিনিময়ে কিনে নিয়ে।
চতুর্থ ঘটনা: নুমান ইবনে মুনজির এবং শুরাইক ইবনে আদির জামিন হওয়ার ঘটনা। ওয়াদা পূরণকারী তাঈ ব্যক্তিটি সঠিক সময়ে ফিরে এলে নুমান তার নিষ্ঠুর অভ্যাস ত্যাগ করেন।
পঞ্চম ঘটনা: হাতেম তাঈ এবং এক এতিম বালকের গল্প। বালকটি তার কাছে থাকা একশটি ছাগলই মেহমানের জন্য জবাই করে দিয়েছিল। হাতেম তাঈ তাকেই নিজের চেয়ে বড় দানবীর হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।
টিকাঃ
[১] কাউকে কোনো মহল্লায় জখমের চিহ্নসহ নিহত অবস্থায় পাওয়া গেলে আর তার হত্যাকারী জানা না গেলে নিহত ব্যক্তির লোকজনদের দাবির প্রেক্ষিতে সে মহল্লার পঞ্চাশজন ব্যক্তির এ মর্মে শপথ করা যে, আমরা তাকে হত্যা করিনি আর তার হত্যাকারীকেও জানি না। পরিভাষায় একে কসামাহ বলা হয়। (বাহরুর রায়েক, ৮/৪৪৫)
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৮৪৫
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ২৪৪৪
[১] মাজমাউয যাওয়ায়েদ, ৯/১৮