📄 ইউশা ইবনে নুন আলাইহিস সালাম
আবু হুরায়রাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
'এক নবী জিহাদে বের হবার প্রাক্কালে নিজ সম্প্রদায়কে বললেন, “এমন কোনো ব্যক্তি আমার অনুসরণ করবে না, যে কোনো নারীকে বিয়ে করেছে এবং তার সঙ্গে মিলিত হবার ইচ্ছা রাখে, কিন্তু এখনো মিলিত হয়নি। এমন ব্যক্তিও না, যে ঘর তৈরি করেছে কিন্তু তার ছাদ তোলেনি। আর এমন ব্যক্তিও না, যে গর্ভবতী ছাগল বা উটনী কিনেছে এবং তার প্রসবের অপেক্ষায় আছে।”
অতঃপর তিনি জিহাদের জন্য বের হলেন। আসরের নামাজের সময় কিংবা এর কাছাকাছি সময় তিনি একটি জনপদের কাছাকাছি পৌঁছুলে সূর্যকে লক্ষ্য করে বললেন, “তুমিও আদেশ পালনকারী আর আমিও আদেশ পালনকারী। হে আল্লাহ! সূর্যকে থামিয়ে দিন!” সূর্যকে থামিয়ে দেওয়া হলো। আল্লাহ তাকে বিজয় দান করলেন। তিনি গনিমতের সম্পদগুলো একত্র করলে এগুলো জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য আগুন এল, কিন্তু আগুন তা জ্বালাল না।
ওই নবী তখন বললেন, “তোমাদের মধ্যে (গনিমত) আত্মসাৎকারী রয়েছে। প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন যেন আমার কাছে বায়আত হয়।” একজনের হাত তখন নবীর হাতের সঙ্গে আটকে গেল। নবী বললেন, "তোমাদের গোত্রেই আত্মসাৎকারী রয়েছে। তোমাদের মধ্যেই আত্মসাৎকারী রয়েছে।” অবশেষে তারা গাভীর মস্তক-পরিমাণ স্বর্ণ উপস্থিত করল এবং তা রেখে দিল। এরপর আগুন এসে তা জ্বালিয়ে ফেলল। তবে আমাদের দুর্বলতা ও অক্ষমতার প্রতি লক্ষ করে আল্লাহ আমাদের জন্য তা হালাল করে দিয়েছেন।' [২]
প্রথম পাঠ
ঘটনায় যে নবীর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে তিনি ইউশা ইবনে নুন আলাইহিস সালাম। কুরআনুল কারিমে তার ব্যাপারে নিম্নোক্ত আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে— 'যখন মুসা তার যুবক (সঙ্গী)-কে বললেন।' [৩] মুসা আলাইহিস সালাম-কে বনি ইসরাইল বলেছিল— 'যতক্ষণ তারা সেখানে থাকবে আমরা কখনো সেখানে যাব না। বরং আপনি ও আপনার রব যান এবং উভয়ে যুদ্ধ করুন। আমরা এখানেই বসলাম।' [১] আল্লাহ তাআলা তখন তাদেরকে তিহ ময়দানে প্রবেশ করান। হারুন ও মুসা আলাইহিমাস সালাম-এর ইন্তেকালের পর আল্লাহ তাআলা ইউশা ইবনে নুন আলাইহিস সালাম-কে নবুওয়াত প্রদান করেন। তিনি আমালেকাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে বিজয় লাভ করেন।
দ্বিতীয় পাঠ
কখনো পরিমাণ নিয়ে আলোচনা করবেন না; বরং গুণগতমান নিয়ে আলোচনা করুন। ইউশা আলাইহিস সালাম যাদের মন অন্য কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত ছিল তাদেরকে শরিক করেননি। যেমন— যে কোনো নারীকে বিয়ে করেছে কিন্তু ঘরসংসার করেনি, ঘর বানিয়েছে কিন্তু ছাদ তোলেনি, পশুর প্রসবের অপেক্ষায় আছে। এর মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি যে, দুনিয়া মানুষকে ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে। ঈমান মানুষের স্বভাবকে পরিমার্জিত করতে পারে কিন্তু একে সম্পূর্ণ নিঃশেষ করে দেয় না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাসান ইবনে আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে কোলে নিয়ে বলেন— 'আর জেনে রাখো, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি অকল্যাণের সম্মুখীনকারী।' [১] দ্বীন গ্রহণ করার অর্থ হারাম থেকে বেঁচে থাকা, জীবন থেকে হাত গুটিয়ে নেয়া নয়।
তৃতীয় পাঠ
সকল বিষয় আল্লাহ তাআলার হাতে। জুমার দিন আসরের শেষ সময় যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। এ কারণেই ইউশা আলাইহিস সালাম সূর্যকে সম্বোধন করে বলেছিলেন, 'আমিও আদিষ্ট তুমিও আদিষ্ট।' এটাই হলো প্রকৃত ঈমান। এই বিশ্বজগতের সবকিছুই আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন। জিবরাইল আলাইহিস সালাম থেকে নিয়ে ছোট্ট পিপীলিকা— সবকিছুই আল্লাহর নির্দেশের সামনে সমান। আমাদের দায়িত্ব হলো উপকরণ গ্রহণ করা, কিন্তু ফলাফল আল্লাহর হাতে।
চতুর্থ পাঠ
একজন সেনাপতি বা পরিচালককে মানবিক হতে হয়। জ্ঞানী দায়িত্ববান ব্যক্তি মানুষকে নিয়ম-কানুনের মাধ্যমে নয়, বরং অন্তরের মাধ্যমে অনুগত করে রাখেন। ব্যর্থ দায়িত্বশীল হলো সে, যে নিজেকে নিয়ম-কানুনের গোলাম বানিয়ে রাখে।
পঞ্চম পাঠ
নির্বাচিত ব্যক্তিদের মধ্যেও স্তর-ভেদ রয়েছে। ইউশা ইবনে নুন আলাইহিস সালাম-এর বাহিনীর প্রতি লক্ষ করুন। দুনিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রত্যেককে তিনি দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। দেখা গেল, খুব কম মানুষই উত্তীর্ণ হতে পেরেছে। এমনকি তাদের মধ্যেও কেউ কেউ গনিমতের সম্পদ চুরি করেছে। এ দুনিয়া পুরোটাই এক জাদু ও ফেতনা।
ষষ্ঠ পাঠ
আকিদার ক্ষেত্রে সকল নবী-রাসুল একমত। কিন্তু শরিয়তের ক্ষেত্রে তাদের ভিন্নতা রয়েছে। পূর্ববর্তী সকল উম্মতের ওপর গনিমতের সম্পদ হারাম ছিল। তাদের ক্ষেত্রে নিয়ম ছিল-গনিমতের সম্পদ একত্রিত করার পর আকাশ থেকে আগুন এসে তা জ্বালিয়ে দিত। এই যুদ্ধে আগুন প্রথমদিকে জ্বালিয়ে দেয়নি কারণ এক ব্যক্তি সম্পদ আত্মসাৎ করেছিল। পরে তা ফেরত আনলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এটিই ছিল কবুল হওয়ার আলামত।
টিকাঃ
[১] (গনিমত সংক্রান্ত নিয়মাবলী)
[২] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩১২৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ১৭৪৭
[৩] সুরা কাহাফ, আয়াত-ক্রম: ৬০
[১] সুরা মায়িদাহ, আয়াত-ক্রম: ২৪
[১] সুরা আনফাল, ৮: ২৮
📄 রাসুল-কন্যা যাইনাব ও আবুল আস ইবনে রবি রাদিয়াল্লাহু আনহুমা
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন- মক্কাবাসী যখন বদরযুদ্ধে বন্দী হওয়া স্বজনদের মুক্তির জন্য মুক্তিপণ স্বরূপ বিভিন্ন পণ্য প্রেরণ করছিল তখন আবুল আস ইবনে রবির মুক্তিপণ স্বরূপ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মেয়ে যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহা কিছু অর্থ-সম্পদ পাঠান। তাতে তিনি একটি গলার হারও পাঠান। হারটি ছিল খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা'র। হারটি দেখে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অন্তর অত্যন্ত বিগলিত হয়ে যায়। তিনি বলেন, 'যদি তোমরা ভালো মনে করো তাহলে এই হারটি তাকে (যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহা) ফেরত দিয়ে বন্দীকে মুক্ত করে দিতে পারো।' সাহাবায়ে কেরাম বললেন, 'অবশ্যই, ইয়া রাসুলাল্লাহ।' তখন তারা তাকে মুক্ত করে দেন। যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহা'র হার তাকে ফেরত দিয়ে দেন।' [১]
প্রথম পাঠ
আবুল আস ইবনে রবি হলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মেয়ে যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহা'র খালাতো ভাই। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার প্রশংসা করে বলেন, 'আবুল আস ইবনে রবি'র কাছে আমি মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। সে আমার সঙ্গে ওয়াদা করেছে এবং তা রক্ষা করেছে।' [২] আবুল আস যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বিয়ে করেছিলেন নবুওয়াত লাভের আগে। আবুল আস যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহা'র ঈমান আনার বিষয়ে অবগত হলেও তাকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করেননি। কুরাইশরা যাইনাবকে পৃথক করে দেওয়ার জন্য আবুল আসকে চাপ দিলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। বদরের যুদ্ধে আবুল আস বন্দী হন। যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহা স্বামীর মুক্তির জন্য গলার হার পাঠান যা খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা তাকে দিয়েছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবুল আসকে মুক্ত করে দেন এবং যাইনাবকে মদিনায় পাঠিয়ে দিতে বলেন। যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহা মদিনায় হিজরতের পর স্বামী আবুল আসের কাছ থেকে প্রায় ছয় বছর বিচ্ছিন্ন থাকেন। পরে আবুল আস মদিনায় গিয়ে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন এবং যাইনাবকে তার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় পাঠ
যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহা ও আবুল আসের মধ্যকার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর। বিচ্ছেদের সকল পরিস্থিতি সত্ত্বেও তিনি স্বামীর সঙ্গে জীবনযাপন করতে থাকেন। তিনি আশা করতে থাকেন যে একদিন স্বামী ইসলাম গ্রহণ করবেন। মনের সঙ্গে মনের মিল হয়ে গেলে ব্যক্তিগত স্বার্থ সেখানে তিরোহিত হয়ে যায়। সেখানে শুধুই 'আমরা' থাকে।
তৃতীয় পাঠ
ইসলাম উত্তম আচরণের ধর্ম। ভালোবাসা মানুষের স্বভাবজাত বিষয়। এই ধর্মের রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহা'র জন্য আবুল আসকে ভালোবাসতে বাধা প্রদান করেননি। ভালোবাসা কোনো দোষ নয়। তবে ভালোবাসার আদব রয়েছে। যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহা আল্লাহর নির্দেশ পালনে পিছুপা হননি, আবার আবুল আসের জন্য দীর্ঘ ছয়টি বছর অপেক্ষা করেছেন।
চতুর্থ পাঠ
এক দিকে ভালোবাসায়-কুরবান-হয়ে-যাওয়া এক কন্যা, বিপরীতে পিতৃত্বের ক্ষেত্রে সজাগ এক পিতা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জামাতার মুক্তিপণের হার দেখে বিগলিত হলেও সাহাবিদের সম্মতি নিয়েছিলেন। তিনি মেয়েকে ইচ্ছাধিকার প্রদান করেছিলেন। পিতৃত্বের অর্থ এটা নয় যে সন্তানকে বাদ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সন্তান যাতে পড়ে না যায় এজন্য তাকে ধরে রাখাটা পিতার দায়িত্ব নয়; বরং পড়ে গিয়ে সে যেন নতুন করে দাঁড়াতে পারে এজন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়াই তার দায়িত্ব। যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহা যখন আবুল আসকে নিরাপত্তা দেওয়ার ঘোষণা দিলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'মুসলমানদের অতি সাধারণ ব্যক্তিও সকল মুসলমানের বিপরীতে কাউকে আশ্রয় দিতে পারে।' [১]
পঞ্চম পাঠ
ভালোবাসা অন্তরের বিষয়। টাকা-কড়ি থাকলে অনেকেই ভালোবাসতে চাইবে, কিন্তু দুঃসময়ে তাদের খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রকৃত প্রেমিক-যে ভালোবাসা ও মহব্বতের কথা মুখে প্রকাশ করতে পারে না-সে আপনার পাশেই পড়ে থাকবে। আবুল আস কুরাইশদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং যাইনাবকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করতে রাজি হননি।
ষষ্ঠ পাঠ
নিষ্ঠুর অন্তরও মাঝে-মধ্যে নরম হয়ে যায়। দূরে অবস্থানকারী ব্যক্তিটি কখনো নিকটে চলে আসতে পারে। যেটাকে আজ অসম্ভব মনে করছেন, আগামীকালই তা আপনার সামনে হাজির দেখতে পারেন। আপনাকে বুঝতে হবে যে, এক অন্তরের ওপর অপর অন্তরের অধিকার রয়েছে। এই পথে চলতে গিয়ে বহু কষ্টের সম্মুখীন হতে পারেন, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছলে সব ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে।
সপ্তম পাঠ
ইসলাম আগমনের পূর্ব থেকেই আরবদের অনেক সুন্দর চরিত্র ছিল। আরবরা কখনো কোনো ওয়াদা ভঙ্গ করত না। হান ইবনে মাসউদ বা সামওয়ালের মতো বহু ব্যক্তিত্বের অঙ্গীকার পালনের কাহিনী ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। ইসলাম এসে আরবদের অনেক ভালো গুণাবলী বহাল রেখেছে। আর আমরা আজ সভ্য হওয়ার নামে নিজেদের ঐতিহ্য ও ভালো বৈশিষ্ট্যগুলো বিসর্জন দিচ্ছি।
টিকাঃ
[১] মুসনাদে আহমদ, হাদিস-ক্রম: ২৬৩৬২
[২] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৭২৯
[১] সুনানে আবু দাউদ, হাদিস-ক্রম: ২৭৫১
📄 আল্লাহর ওপর স্পর্ধা প্রদর্শনকারী
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
'বনি ইসরাইলের দুই ব্যক্তির মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল। তাদের একজন গুনাহ ও পাপাচারে লিপ্ত থাকত আর অপরজন ইবাদত-বন্দেগিতে থাকত মগ্ন। ইবাদতগুজার ব্যক্তিটি তার বন্ধুকে গুনাহে লিপ্ত থাকতে দেখে বলত, "তুমি বিরত হও।” একদিন তাকে গুনাহ করতে দেখে বলল, “তুমি বিরত হয়ে যাও।” তখন ঐ ব্যক্তিটি বলল, "আমাকে আমার রবের হাতে ছেড়ে দাও। তোমাকে কি আমার ওপর রক্ষণাবেক্ষণকারী করে পাঠানো হয়েছে?"
ইবাদতগুজার ব্যক্তিটি বলল, “আল্লাহর কসম, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করবেন না!” কিংবা সে বলেছে, “আল্লাহ তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না।”
এরপর তাদের উভয়ের রুহ কবজা করা হয়। তারা উভয়ে বিশ্বজগতের প্রতিপালকের কাছে একত্রিত হয়। আল্লাহ তাআলা তখন ইবাদতগুজার লোকটিকে বললেন, "তুমি কি আমার ব্যাপারে জানতে কিংবা তুমি কি আমার ক্ষমতার ওপর কর্তৃত্ববান?” আর পাপাচারীকে বললেন, “যাও, তুমি আমার রহমতের কারণে জান্নাতে প্রবেশ করো।” এবং অপরজন (অর্থাৎ ইবাদতগুজার ব্যক্তির) ব্যাপারে (ফেরেশতাদের) বললেন, “তোমরা তাকে জাহান্নামে নিয়ে যাও।” [১]
প্রথম পাঠ
নেক আমল এবং ইবাদত-বন্দেগিতে অধ্যবসায় মানুষকে বান্দা থেকে ইলাহের স্তরে পৌঁছে দিতে পারে না। কিছু মানুষ আমলের অহংকারে ভুলে যায় যে সে নিজেও আল্লাহর রহমতের অধীন। জান্নাত-জাহান্নামের ফয়সালা করার দায়িত্ব কারো হাতেই অর্পণ করা হয়নি। আমরা পাপাচারী বা ইবাদতগুজার যেই হই না কেন, আল্লাহর রহমত ছাড়া কেউ মুক্তি পাব না।
দ্বিতীয় পাঠ
সৎ কাজের আদেশের অর্থ অন্যের দোষ-ত্রুটির পাহারাদার বনে যাওয়া নয়। কাউকে গুনাহে লিপ্ত দেখলে ঘৃণা না করে তাকে আল্লাহর রহমতের কথা শোনান। সাবধান, তাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করার পরিবর্তে দূরে ঠেলে দেবেন না! যে ব্যক্তি ৯৯ জনকে হত্যা করেছিল সে নিরাশকারী দাঈর পাল্লায় পড়ে খুনের সেঞ্চুরি করেছিল, কিন্তু পরে আশার বাণী পেয়ে তাওবা করেছিল।
তৃতীয় পাঠ
শব্দ প্রয়োগে সতর্ক হোন! রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, মানুষ আল্লাহর অসন্তুষ্টিমূলক কোনো কথা বলে ফেলে যাকে সে তেমন গুরুত্ব দেয় না, কিন্তু সেই কথার কারণেই সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। [১] আমাদের কথাগুলো কর্তনকারী তরবারির ন্যায়। বান্দাকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করা মারাত্মক অপরাধ। আল্লাহ তাআলা বলছেন- 'তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ মাফ করেন।' [১] আকাশের বিষয়ে ফায়সালা দেওয়ার ক্ষমতা কোনো মানুষের নেই।
চতুর্থ পাঠ
এক বন্ধু অপর বন্ধুর আয়না। বন্ধু তো সে যে ভুল হলে শুধরে দেয়। হাদিসে উল্লিখিত ইবাদতগুজার বন্ধুটি দাওয়াতের পদ্ধতিতে ভুল করেছে। বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা আপনাকে আল্লাহর সীমা লংঘন করার সুযোগ এনে দেয় না। পদ্ধতি এবং শৈলী হলো চিন্তা-চেতনা পরিচালিত হওয়ার মূল ভিত।
পঞ্চম পাঠ
শেষ ভালো যার সব ভালো তার। উত্তম পরিণামের জন্য সবসময় আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে। কোনো আমল আপনাকে আল্লাহর রহমত থেকে অমুখাপেক্ষী করে দিতে পারে না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দিনে সত্তরেরও অধিকবার ইস্তেগফার করতেন। [১] শরীরের অন্তরটি ভালো হলে সব ভালো। হাদিসে এসেছে যে কেউ সারা জীবন জান্নাতের আমল করে কিন্তু শেষ মুহূর্তে তকদির অগ্রগামী হয়ে সে জাহান্নামে যায়। [৪]
ষষ্ঠ পাঠ
আল্লাহর আদালতে ইনসাফ পাওয়া যাবে। ইবাদতগুজার ব্যক্তিটি আল্লাহর ক্ষমতার ব্যাপারে স্পর্ধা দেখিয়েছিল, অপরদিকে পাপাচারী ব্যক্তিটি আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে সুধারণা পোষণ করেছিল। ইবাদত যদি অন্তরের ইবাদতের সঙ্গে না মেলে তবে তার ওজন নেই। পাপাচারী হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহর প্রতি সুধারণা তাকে মুক্তি দিয়েছে, আর আমলদার হওয়া সত্ত্বেও অহংকার অন্যজনকে জাহান্নামে নিয়ে গেছে।
টিকাঃ
[১] সুনানে আবু দাউদ, হাদিস-ক্রম: ৪৯০১
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৬৪৭৮
[১] সুরা যুমার, আয়াত-ক্রম : ৫৩
[২] সুরা আলে ইমরান, আয়াত-ক্রম : ১২৮
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৬৩০৭
[২] সুরা ফাতাহ, আয়াত-ক্রম : ২
[৩] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম : ৫২
[৪] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম : ৩২৩২
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৭৪০৫
📄 জাহেলি যুগের প্রথম শপথগ্রহণের ঘটনা
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন—
‘জাহেলি যুগে সর্বপ্রথম কাসামাহ আমাদের হাশেমি গোত্রে অনুষ্ঠিত হয়। কুরাইশের কোনো একটি শাখা-গোত্রের একজন লোক বনু হাশিমের এক ব্যক্তিকে মজুর হিসাবে নিয়োগ করেছিল। মজুরটি তাদের নিকটবর্তী হওয়ার পর খাদ্যপূর্ণ বস্তার বাঁধন ছিঁড়ে যায়। তখন সে মজুর ব্যক্তিটিকে বলল, “আমাকে একটি রশি দিয়ে সাহায্য করো।” মজুর তাকে একটি রশি দিল। এরপর তারা যখন অবতরণ করল তখন একটি ছাড়া সকল উট বেঁধে রাখা হলো। মজুর নিয়োগকারী ব্যক্তি মজুরকে জিজ্ঞেস করল, "সকল উট বাঁধা হলো কিন্তু এ উটটি বাঁধা হলো না কেন?” মজুর উত্তরে বলল, “এ উটটি বাঁধার কোনো রশি নেই।” এ কথা শুনে মালিক মজুরকে লাঠি দিয়ে এমনভাবে আঘাত করল যে শেষ পর্যন্ত এ আঘাতেই তার মৃত্যু হয়ে গেল।
আহত মজুরটি যখন মুমূর্ষু অবস্থায় ছিল, তখন ইয়ামানি এক লোক তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। আহত মজুর তাকে বলল, "আপনি হজ উপলক্ষে মক্কায় উপস্থিত হলে বনু হাশিম গোত্রকে ডাকবেন এবং আবু তালিবকে জানিয়ে দেবেন যে, অমুক ব্যক্তি একটি রশির কারণে আমাকে হত্যা করেছে।” এর কিছুক্ষণ পর আহত মজুরটির মৃত্যু হয়ে যায়।
ইয়ামানি লোকটি হজ পালনের জন্য মক্কায় এসে সংবাদটি আবু তালিবকে পৌঁছে দিল। এ কথা শুনে আবু তালিব মজুর নিয়োগকারী ব্যক্তির কাছে তিনটি প্রস্তাব দিলেন— হয়তো হত্যার বিনিময়ে একশত উট দেবে, অথবা তোমার গোত্রের বিশ্বাসযোগ্য ৫০ জন লোক শপথ করে বলবে যে তুমি তাকে হত্যা করোনি, নতুবা আমরা হত্যার বদলায় তোমাকে হত্যা করব।
হত্যাকারী ব্যক্তিটি তখন নিজ গোত্রীয় লোকদের কাছে গেলে তারা বলল, “আমরা হলফ করব।” তখন বনু হাশিম গোত্রের এক নারী এসে আবু তালিবকে অনুরোধ করলেন যেন তার সন্তানকে এই শপথ থেকে রেহাই দেওয়া হয়। আবু তালিব তা মঞ্জুর করলেন। তারপর হত্যাকারীর গোত্রের এক পুরুষ দুটি উট প্রদান করে শপথ করা থেকে অব্যাহতি চাইল। বাকি ৪৮ জন এসে যথাস্থানে শপথ করল। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আল্লাহর কসম, শপথ করার পর একটি বছর অতিবাহিত হওয়ার পূর্বেই ঐ ৪৮ জনের একজনও বেঁচে ছিল না। [১]
প্রথম পাঠ
কাসামাহ (শপথগ্রহণ) জাহেলি যুগের এক বিচারব্যবস্থা। ইসলাম একে বহাল রেখেছে। হত্যাকারী জানা না গেলে মহল্লার পঞ্চাশজন ব্যক্তিকে শপথ করতে হয় যে তারা হত্যাকারীকে জানে না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খায়বারের ইহুদিদের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতিতে বিচার করেছিলেন।
দ্বিতীয় পাঠ
জাহেলি যুগেও অনেকে মিথ্যা শপথ করাটাকে মহাপাপ মনে করত। কিন্তু অনেকে অঙ্গীকারের কোনো বালাই রাখত না। আলোচ্য ঘটনায় ৪৮ জন লোক মিথ্যা কসম খেয়েছিল। এই ঘটনার এক বছর অতিক্রান্ত হতে না হতেই মিথ্যা শপথকারী প্রত্যেকেই মৃত্যুবরণ করে।
তৃতীয় পাঠ
আপনার সম্প্রদায় ও পরিবার-পরিজনদের অন্যায় পক্ষপাতিত্ব করবেন না। বাতিল তো বাতিলই। মেয়ের বা ছেলের প্রতি ভালবাসার অর্থ এটা নয় যে অন্যায় ক্ষেত্রে তাদের পক্ষপাতিত্ব করবেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো বলেছেন, 'তুমি তোমার ভাইকে সাহায্য করো চাই সে জালেম হোক বা মাজলুম।' জালেমকে সাহায্য করার অর্থ হলো তাকে জুলুম থেকে বাধা প্রদান করা। [১]
চতুর্থ পাঠ
আল্লাহর নামে মিথ্যা কসম করবেন না। আল্লাহ তাআলা কোনো মুশরিক অপর কোনো মুশরিকের উপর জুলুম করাকেও পছন্দ করেননি। যারা আল্লাহর নামে মিথ্যা কসম করেছিল এক বছর অতিবাহিত না হতেই তাদের মৃত্যু হয়ে যায়। দুনিয়ার মুক্তি ক্ষণিকের, আখেরাতে প্রতিটি কর্মের হিসাব দিতে হবে।
পঞ্চম পাঠ
ইসলাম তার পূর্ববর্তী আরব-জীবনের ওপর 'জাহেলি' শব্দটি প্রয়োগ করেছে যা মূলত ধর্মীয় দিক থেকে অজ্ঞতা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-'আমি তো মহৎ চরিত্রকে পূর্ণতা দানের জন্য প্রেরিত হয়েছি।' [১] ইসলাম প্রতিপক্ষের সঠিক বিষয়গুলোর স্বীকৃতি দান করে থাকে। কোনো ব্যক্তিকে ভালোবাসলে তার ভুল-ত্রুটির কথা ভুলে যাবেন না।
ষষ্ঠ পাঠ
জাহেলি যুগের আরবদের আচার-আচরণের কিছু বিস্ময়কর ঘটনা রয়েছে।
প্রথম ঘটনা: কায়েস ইবনে সাদ ও এক বেদুইন পরিবারের ঘটনা। সেখানে বেদুইন স্বামী মেহমানদের কাছ থেকে খাবারের মূল্য হিসেবে রেখে যাওয়া একশত দিনার বর্শা হাতে ফেরত দিয়ে মেহমানদারির মর্যাদা রক্ষা করেছিলেন।
দ্বিতীয় ঘটনা: এক বেদুইন একটি ফড়িংকে আশ্রয় দিয়েছিল এবং তার জন্য নিজ গোত্রের মানুষের বিরুদ্ধে তরবারি হাতে দাঁড়িয়েছিল যতক্ষণ না ফড়িংটি উড়ে চলে যায়।
তৃতীয় ঘটনা: সা'সাআ তিনশত মেয়েকে জীবন্ত প্রোথিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন তাদের পিতাদের কাছ থেকে উটের বিনিময়ে কিনে নিয়ে।
চতুর্থ ঘটনা: নুমান ইবনে মুনজির এবং শুরাইক ইবনে আদির জামিন হওয়ার ঘটনা। ওয়াদা পূরণকারী তাঈ ব্যক্তিটি সঠিক সময়ে ফিরে এলে নুমান তার নিষ্ঠুর অভ্যাস ত্যাগ করেন।
পঞ্চম ঘটনা: হাতেম তাঈ এবং এক এতিম বালকের গল্প। বালকটি তার কাছে থাকা একশটি ছাগলই মেহমানের জন্য জবাই করে দিয়েছিল। হাতেম তাঈ তাকেই নিজের চেয়ে বড় দানবীর হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।
টিকাঃ
[১] কাউকে কোনো মহল্লায় জখমের চিহ্নসহ নিহত অবস্থায় পাওয়া গেলে আর তার হত্যাকারী জানা না গেলে নিহত ব্যক্তির লোকজনদের দাবির প্রেক্ষিতে সে মহল্লার পঞ্চাশজন ব্যক্তির এ মর্মে শপথ করা যে, আমরা তাকে হত্যা করিনি আর তার হত্যাকারীকেও জানি না। পরিভাষায় একে কসামাহ বলা হয়। (বাহরুর রায়েক, ৮/৪৪৫)
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৮৪৫
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ২৪৪৪
[১] মাজমাউয যাওয়ায়েদ, ৯/১৮