📘 নবীজির ﷺ পাঠশালা 📄 মুসা আলাইহিস সালাম ও খিজির আলাইহিস সালাম

📄 মুসা আলাইহিস সালাম ও খিজির আলাইহিস সালাম


রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—'একবার মুসা বনি ইসরাইলের মধ্যে বয়ান করার জন্য দাড়ালেন। তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, “কোন ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী?” তিনি বললেন, "আমি।” মুসা আলাইহিস সালাম-এর এ উত্তরে আল্লাহ তার প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন। আল্লাহ তাকে বললেন, "বরং দুই সমুদ্রের সংযোগ স্থলে আমার একজন বান্দা আছে, সে তোমার চেয়ে অধিক জ্ঞানী।” মুসা আলাইহিস সালাম আরজ করলেন, “হে আমার রব! আমি তার সঙ্গে কীভাবে সাক্ষাৎ করব?” আল্লাহ বললেন, “তুমি একটি মাছ ধরো এবং তা একটি থলের মধ্যে ভরে রাখো। যেখানে গিয়ে তুমি মাছটি হারিয়ে ফেলবে সেখানেই তিনি অবস্থান করছেন।”
মুসা একটি মাছ ধরলেন এবং থলের মধ্যে ভরে রাখলেন। তিনি এবং তার সাথি ইউশা ইবনে নুন চলতে লাগলেন। একসময় তারা দুজন একটি পাথরের কাছে এসে পৌঁছে বিশ্রাম করলেন। মুসা ঘুমিয়ে পড়লেন। আর মাছটি থলে থেকে বের হয়ে নদীতে চলে গেল। শেষে যখন পরের দিন ভোর হলো মুসা তার সাথিকে বললেন, "আমাদের সকালের খাবার আনো।” সঙ্গী বললেন, “আমরা যখন সেই পাথরটির কাছে বিশ্রাম নিয়েছিলাম, মাছটি তখন চলে গিয়েছিল, তা আপনাকে জানাতে আমি ভুলে গেছি।” মুসা বললেন, “ওটাই তো সেই স্থান যা আমরা খুঁজে বেড়াচ্ছি।” অতঃপর উভয়ে সেই পাথরটির কাছে ফিরে এলেন। তারা দেখলেন, সেখানে জনৈক ব্যক্তি বস্ত্রাবৃত হয়ে আছেন। মুসা তাকে সালাম করলেন। তিনি বললেন, "এখানে সালাম কী করে এলো?” তিনি বললেন, “আমি মুসা।” তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি বনি ইসরাইলের মুসা?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ, আপনাকে যে মহাজ্ঞান দান করা হয়েছে তা শেখার জন্য এসেছি।”
খিজির বললেন, “আপনি আমার সঙ্গে থেকে ধৈর্যধারণ করতে পারবেন না। আর আপনি এমন বিষয়ে ধৈর্য রাখবেন কী করে, যার রহস্য আপনার জানা নেই!” মুসা বললেন, “ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে একজন ধৈর্যশীল হিসেবে দেখতে পাবেন।” অতঃপর তারা দুজন রওনা হয়ে নদীর তীর ঘেঁষে চলতে লাগলেন। এমন সময় একটি নৌকা তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তারা পারিশ্রমিক ছাড়াই তাদেরকে নৌকায় তুলে নিল। অতঃপর খিযির হঠাৎ কুঠার নিয়ে নৌকার একটি তক্তা খুলে ফেললেন। মুসা বললেন, “যাত্রীদেরকে ডুবিয়ে দেয়ার জন্য আপনি নৌকাটি ফুটো করে দিলেন! এ তো আপনি একটি গুরুতর কাজ করলেন!” খিজির বললেন, “আমি কি বলিনি যে, আপনি আমার সঙ্গে কিছুতেই ধৈর্যধারণ করতে পারবেন না?” মুসা বললেন, "আমি যে বিষয়টি ভুলে গেছি, তার জন্য আমাকে দোষারোেপ করবেন না।” এমন সময় একটি চড়ইপাখি এসে নদীর পানিতে ঠোঁট ডুবাল। খিজির বললেন, “হে মুসা! আমার এবং তোমার জ্ঞানের দ্বারা আল্লাহর জ্ঞান থেকে ততটুকুও কমেনি যতটুকু এ পাখিটি নদীর পানি হ্রাস করেছে।”
অতঃপর তারা একটি বালকের পাশ দিয়ে গেলেন। খিজির তার মাথা ধরলেন এবং নিজ হাতে তার ঘাড় আলাদা করে ফেললেন। এতে মুসা তাকে বললেন, “আপনি একটি নিষ্পাপ বালককে বিনা অপরাধে হত্যা করলেন! নিশ্চয়ই আপনি একটি অন্যায় কাজ করলেন।” খিজির বললেন, “আমি কি আপনাকে বলিনি যে, আপনি আমার সঙ্গে ধৈর্য ধরতে পারবেন না?” মুসা বললেন, “এরপর যদি আমি আপনাকে আর কোনো বিষয়ে জিজ্ঞেস করি তাহলে আপনি আমাকে আর আপনার সঙ্গে রাখবেন না।”
তারা এক জনপদে এসে উপনীত হলেন। গ্রামবাসীদের কাছে তারা খাবার চাইলেন। কিন্তু গ্রামের লোকেরা তাদের আতিথেয়তা করতে অস্বীকার করল। অতঃপর তারা সেখানেই একটি দেয়াল দেখতে পেলেন, যা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। খিজির নিজ হাতে দেয়ালটি সোজা করে দিলেন। মুসা বললেন, “তারা আমাদের আতিথেয়তা করল না আর আপনি এদের দেয়াল সোজা করতে গেলেন! আপনি ইচ্ছা করলে এর বদলে মজুরি গ্রহণ করতে পারতেন।” খিজির বললেন, “এখানেই আপনার ও আমার মধ্যে বিচ্ছেদ হলো। তবে এখনই আমি আপনাকে জ্ঞাত করছি সেসব কথার রহস্য, যেসব বিষয়ে আপনি ধৈর্য ধরতে পারেননি।”
'আপনি যে বিষয়ে ধৈর্য্যধারণ করতে অক্ষম হয়েছিলেন, এই হলো তার ব্যাখ্যা।' [১]
আল্লাহ মুসা আলাইহিস সালাম-এর ওপর রহমত বর্ষণ করুন। তিনি যদি ধৈর্য ধরতেন, তাহলে তাদের উভয়ের ব্যাপারে আমাদেরকে আরও অনেক ঘটনা জানানো হতো। [২]

প্রথম পাঠ
ঘটনা থেকে প্রাসঙ্গিকভাবেই খিজির আলাইহিস সালাম-এর পরিচয়ের বিষয়টি চলে আসে। খিজির নামে একজন ব্যক্তি রয়েছেন। তার জীবিত থাকার ব্যাপারে যত হাদিস বর্ণিত হয়েছে তার একটিও বিশুদ্ধ নয়। ইবনুল কাইয়িম জাওযি রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন- 'যেসব হাদিসে খিজির আলাইহিস সালাম জীবিত থাকার কথা উল্লেখ হয়েছে সবগুলোই মিথ্যা। তার জীবিত থাকার ব্যাপারে একটি হাদিসও সহিহ নয়।' [৩]
ইমাম বুখারি রহমতুল্লাহি আলাইহিকে জিজ্ঞেস করা হয়, 'খিজির আলাইহিস সালাম কি জীবিত?' তিনি বলেন, 'এমনটা হতে পারে না। কারণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, বর্তমানে যারা ভূ-পৃষ্ঠে রয়েছে একশত বছর পর তাদের কেউই অবশিষ্ট থাকবে না।' [১]
কুরআন, হাদিস, আলিমগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত এবং বিবেক-সবগুলো এ কথার প্রমাণ করে যে, খিজির আলাইহিস সালাম জীবিত নন। তিনি আমাদের মতো এক আদম-সন্তান। মুসা আলাইহিস সালাম-এর যুগের কাছাকাছি সময়ের লোক ছিলেন।

দ্বিতীয় পাঠ
বিনয়ী হোন। আমরা নিজেদেরকে সর্বক্ষেত্রে যোগ্য মনে করি। মুসা আলাইহিস সালাম সম্মানিত নবী হওয়া সত্ত্বেও তাকে যখন সবচেয়ে বড় জ্ঞানী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো তিনি নিজেকে বড় জ্ঞানী বলেন। এ কারণে আল্লাহ তাআলা তাকে শিক্ষামূলক তিরস্কার করেন। বহু মানুষ এমন আছে যারা আপনার চেয়ে বেশি জানে। কোনো ব্যক্তি সর্ব বিষয়ে জ্ঞান রাখাটা অসম্ভব। আল্লাহ তাআলা আপন হেকমতের মাধ্যমে মানুষকে পরস্পরের মুখাপেক্ষী করে দিয়েছেন।

তৃতীয় পাঠ
কে উত্তম-মুসা নাকি খিজির? নিঃসন্দেহে মুসা আলাইহিস সালাম উত্তম। কারণ, নবুওয়াতের সমতুল্য আর কোনো মর্যাদা হতে পারে না। খিজির আলাইহিস সালাম-কে আল্লাহ তাআলা বিশেষ জ্ঞান প্রদান করেছিলেন। তাই তিনি মুসা আলাইহিস সালাম-এর চেয়ে অধিক জ্ঞানী। কিন্তু নবুওয়াতের কারণে মুসা আলাইহিস সালাম খিজির আলাইহিস সালাম-এর চেয়ে উত্তম। মুসা আলাইহিস সালাম মহান ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও তার চেয়ে নিম্নস্তরের ব্যক্তির কাছ থেকে জ্ঞানলাভ করতে সংকোচবোধ করেননি।
'আমি তোমার প্রতি মহব্বত সঞ্চারিত করেছিলাম আমার নিজের পক্ষ থেকে, যাতে তুমি আমার দৃষ্টির সামনে প্রতিপালিত হও।' [১]
'এবং আমি তোমাকে আমার নিজের জন্য তৈরি করে নিয়েছি।' [২]
'এবং আমি তোমাকে মনোনীত করেছি।' [১]
অভিজাত লোকেরা বিনয়ী হয়ে থাকেন, তাই আপনিও বিনয়ী হোন।

চতুর্থ পাঠ
কষ্টের সঙ্গেই ইলম জড়িত। এক টুকরো রুটিই যখন সহজে অর্জিত হয় না, ইলমের ব্যাপারে তো প্রশ্নই ওঠে না! কষ্ট স্বীকার মুসা আলাইহিস সালাম-কে ইলম অর্জন থেকে বাধা দিতে পারেনি। তাই তিনি ইলম অর্জনের সফরে বের হয়ে যান।

পঞ্চম পাঠ
খিজির আলাইহিস সালাম মুসা আলাইহিস সালাম-কে বলেছিলেন, 'আল্লাহ তাআলা আমাকে বিশেষ কিছু জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন যা আপনি জানেন না, আর আপনাকে বিশেষ কিছু জ্ঞান দান করেছেন যা আমি জানি না।' জ্ঞান দুই প্রকার। এক. ইলমে লাদুনি, আল্লাহ যাকে চান তাকে তা দান করেন। দুই. এমন জ্ঞান যা কষ্ট, সাধনা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে অর্জিত হয়ে থাকে। বুদ্ধিমানগণ লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য উপকরণ গ্রহণ করেন। কিন্তু তারা জানেন, ফলাফল আল্লাহর হাতে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরতের সময় উপকরণকে বাদ দিয়ে দেননি। উপকরণ যেন আপনাকে উপকরণ-স্রষ্টার কথা ভুলিয়ে না দেয়।

ষষ্ঠ পাঠ
বড় বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহ তাআলা ছোট ছোট বিপদে নিপতিত করে থাকেন। বিপদাপদ রহমত নিয়ে আসে। খিজির আলাইহিস সালাম যদি নৌকাটিকে ভালো রাখতেন তাহলে অত্যাচারী বাদশাহ তা ছিনিয়ে নিতো। সবসময় কম ক্ষতিকর বিষয়টি গ্রহণ করুন। উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'জ্ঞানী হলো সে, যে দুই অকল্যাণের মধ্য থেকে তুলণামূলক কল্যাণকরটি চিনে নিতে পারে।' পরকাল ঠিক করার জন্যও মানুষকে বিপদে ফেলা হয়ে থাকে। এই মুমিন মাতাপিতা কীভাবে জানতে পারত যে, তাদের ছেলে বড় হয়ে কাফের হয়ে যেত? আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য দুই অকল্যাণের মধ্যে তুলনামূলক কল্যাণকরটি নির্বাচন করেছেন।

সপ্তম পাঠ
সন্তানকে আল্লাহর নিরাপত্তায় সোপর্দ করুন এবং আপনি সৎ হয়ে যান। সন্তানের জন্য শুধু মিরাস রেখে যাওয়ার অর্থ হলো তার জন্য কিছু উপায়-উপকরণের ব্যবস্থা করা। পক্ষান্তরে তার জন্য তাকওয়া রেখে যাওয়ার অর্থ হলো উপায়-উপকরণের স্রষ্টা আল্লাহকে তার জন্য রেখে যাওয়া। আল্লাহ তাআলা দুইজন নবীকে পাঠালেন দুই বালকের সম্পত্তির দেওয়াল উঠানোর জন্য, কারণ তাদের পিতা ছিলেন সৎ।

অষ্টম পাঠ
এই ঘটনাটি আমাদেরকে আল্লাহর সঙ্গে শিষ্টাচারের বিষয়টি শিক্ষা দেয়। খিজির আলাইহিস সালাম যা করেছিলেন সবই আল্লাহর নির্দেশে করেছেন। কিন্তু সংবাদ দিতে গিয়ে তিনি শিষ্টাচার রক্ষা করেছেন।
'নৌকাটি কয়েকজন দরিদ্র লোকের ছিল। আমি সেটিকে ত্রুটিযুক্ত করার ইচ্ছা করলাম।' [১]
বালকটিকে হত্যা করার ক্ষেত্রে তিনি বললেন— 'অতঃপর আমি চাইলাম, তাদের রব যেন তাদেরকে পবিত্রতায় উত্তম সন্তান দান করেন।' [২]
দেয়ালের ক্ষেত্রে বললেন— 'সুতরাং আপনার রব দয়াবশতঃ ইচ্ছা করলেন যে, তারা যৌবনে পদার্পণ করুক এবং নিজেদের গুপ্তধন উদ্ধার করুক।' [১]
আল্লাহর সঙ্গে নবীদের শিষ্টাচার লক্ষ করুন। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বলেছিলেন, 'যখন আমি রোগাক্রান্ত হই তখন তিনিই আরোগ্য দান করেন।' [২] অসুস্থতার সম্বন্ধ তিনি নিজের দিকে করেছেন আর সুস্থতার সম্বন্ধ আল্লাহর দিকে। আইয়ুব আলাইহিস সালাম বলেছিলেন, 'আমি দুঃখ-কষ্টে নিপতিত হয়েছি।' [১] তিনি স্পষ্টভাবে সুস্থ করে দেওয়ার আবেদনও করেননি, বরং প্রশংসা করেছেন। আদব রক্ষা করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

টিকাঃ
[১] সুরা কাহাফ, আয়াত-ক্রম : ৮২
[২] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৪০; সহিহ মুসলিম হাদিস-ক্রম: ২৩৮০
[৩] আল মানারুল মুনিফ, ৬৭। তবে ইবনে হাজার আসকালানি বলেন, বিষয়টি নিয়ে আলেমগণের মতানৈক্য রয়েছে। অর্থাৎ সহিহ হাদিস দ্বারা বিষয়টি প্রমাণিত না হলেও আলেমগণের এক জামআতের মতে তিনি জীবিত রয়েছেন। -আল-মাতালিবুল আলিয়া, ১৭/৫৩০
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৬০১
[১] সূরা ত্ব-হা, আয়াত-ক্রম: ৩৯
[২] সুরা ত্ব-হা, আয়াত-ক্রম: ৪১
[১] সুরা ত্ব-হা, আয়াত-ক্রম : ১৩
[১] সুরা কাহাফ, আয়াত-ক্রম: ৭৯
[২] সূরা কাহাফ, আয়াত-ক্রম: ৮০-৮১
[১] সুরা কাহাফ, আয়াত-ক্রম : ৮২
[২] সুরা মায়িদাহ, আয়াত-ক্রম: ১১৬
[১] সূরা মায়িদাহ, আয়াত-ক্রম: ১১৬
[২] সূরা শুআরা, আয়াত-ক্রম: ৭৮-৮০
[১] সুরা আম্বিয়া, আয়াত-ক্রম : ৮৩
[২] সুরা আরাফ, আয়াত-ক্রম : ২৩
[১] সুরা জিন, আয়াত-ক্রম : ১০

📘 নবীজির ﷺ পাঠশালা 📄 নিজের ওপর জুলুমকারী ব্যক্তিটি

📄 নিজের ওপর জুলুমকারী ব্যক্তিটি


আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'আগের যুগে এক লোক তার নিজের ওপর অনেক জুলুম করেছিল। তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে সে তার পুত্রদেরকে বলল, “মৃত্যুর পর আমার দেহ হাড়-গোশতসহ পুড়িয়ে ছাই করে তা প্রবল বাতাসে উড়িয়ে দিয়ো। আল্লাহর কসম! যদি আমার রব আমাকে ধরে ফেলেন, তবে তিনি আমাকে এমন কঠিনতম শাস্তি দেবেন যা অন্য কাউকে দেননি।” তারপর যখন তার মৃত্যু হলো-তার কথামতো সেভাবেই করা হলো। অতঃপর আল্লাহ ভূপৃষ্ঠকে আদেশ করলেন, “তোমার মধ্যে ঐ ব্যক্তির যা আছে জমা করে দাও।” ভূপৃষ্ঠ তা জমা করে দিল। এ ব্যক্তি তখনই দাঁড়িয়ে গেল। আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "কীসে তোমাকে এ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করল?” সে বলল, “হে আমার রব! আপনার ভয়।” অতঃপর তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হলো।' [১]

প্রথম পাঠ
এই হাদিসের মাধ্যমে জানা যায় যে, লোকটি গুনাহের ক্ষেত্রে অনেক বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিল। অন্য এক বর্ণনা দ্বারা জানা যায়, সে কখনো কোনো ভালো কাজ করেনি।
আমরা দেখছি, দুনিয়া থেকে তার বিদায় নেওয়ার সময় হয়ে গেছে। কিন্তু আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার মতো কোনো নেক কাজ তার নেই। এমতাবস্থায় সে তার সন্তানদেরকে একত্রিত করে শুধু একটি ওসিয়ত করে গেল—যেন তার গোশত-চামড়া ও হাড়গুলো পুড়িয়ে ছাই বানিয়ে দেওয়া হয়। তার আশঙ্কা ছিল ছাই বিদ্যমান থাকলে আল্লাহ এর মাধ্যমেই তাকে পাকড়াও করবেন। তাই সে ছাইগুলো বাতাসে উড়িয়ে দেওয়ার ওসিয়ত করে যায়।
সে কেন এ ওসিয়ত করেছিল? কারণ সে জানত আল্লাহ তাআলার আজাব অত্যন্ত কঠিন। আল্লাহর সামনে দাঁড় করানো হলে কোনো কিছুই তাকে শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবে না। অর্থাৎ সে শাস্তির উপযুক্ত হয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করত। আজাব ও শাস্তিদাতা সত্তা মহান আল্লাহ তাআলার অস্তিত্বের ওপর ঈমান রাখত। সে বুঝতে পারছিল যে, তার সময় সংকীর্ণ হয়ে আসছে, তাই সে অপেক্ষমান শাস্তি থেকে মুক্তির জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল। সে বুঝতে পারছিল, মিছে এই দুনিয়ায় তার আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে এসেছে। তাই সে হিসাব থেকে পলায়ন করতে চাচ্ছিল। সে ছাই হয়ে বাতাসে উড়ে যেতে চেয়েছিল।
তার পূর্ণ বিশ্বাস ছিল, অবশ্যই তাকে শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে, এমতাবস্থায় সে আল্লাহর কাছে কোনো ওজর পেশ করতে পারবে না। কারণ কোনো নেক আমল তার নেই। অবশ্য সে ভুলে গিয়েছে যে, সে এমন এক সত্তার কাছে যাচ্ছে যিনি গলিত হাড্ডিসমূহও জীবিত করতে পারেন।

দ্বিতীয় পাঠ
অন্তরই সকল ইবাদতের মূল। অন্তরের ধ্যান, খেয়াল ও নিবেদন ব্যতীত শুধু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কোনো আমল গ্রহণযোগ্য নয়। খুশু তথা বিনয় ব্যতীত নামাজ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নড়াচড়া বৈ কিছু নয়। এতে নামাজে আল্লাহর সঙ্গে একান্ত আলাপের বিষয়টি ফুটে ওঠে না। তাকওয়া ব্যতীত রোজা রাখাটা নিছক পণ্ডশ্রম। এতে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলার জন্য পানাহার এবং প্রবৃত্তির চাহিদা পরিত্যাগের বিষয়টি ফুটে ওঠে না। হজ তো কোনো ভ্রমণের নাম নয়; বরং আধ্যাত্মিক ইবাদতের এক মাধ্যম। যদি অন্তরের মাধ্যমে সেটি অনুভূত না হয় তাহলে তার প্রকৃত উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়ে যাবে।
অন্তরের অন্যতম ইবাদত আল্লাহ তাআলাকে ভয় করা। যদি কেউ আল্লাহর অস্তিত্বের ওপর ঈমান না রাখে তাহলে তাকে ভয় করে কোনো কাজ হবে না। আলোচ্য ঘটনায় এ ব্যক্তিটি আল্লাহর ওপর ঈমান রাখত কিন্তু তার অবাধ্যতা করত। সে সাধারণ কোনো গুনাহ করেনি; বরং গুনাহের ক্ষেত্রে নিজের ওপর অনেক বাড়াবাড়ি করেছে। সে এমন কোনো আমল করেনি যার মাধ্যমে আল্লাহর রহমতের আশা করতে পারে। কিন্তু সে বুঝতে পারছিল, তার ধ্বংস অনিবার্য। তার জানা ছিল আল্লাহ দয়ালু ও পরম ক্ষমাশীল সত্তা হলেও এর পাশাপাশি তিনি শাস্তিও দিয়ে থাকেন।
তার রহমত সকল কিছুকে পরিবেষ্টন করে আছে। তবে তিনি শিরিক করাকে কখনো ক্ষমা করেন না, শিরিক ব্যতীত অন্য সকল গুনাহ তিনি চাইলে ক্ষমা করে দিতে পারেন। আপনার অন্তর ও মনের গোপন অবস্থা সম্পর্কে তিনি জানেন। তিনিই তার নেয়ামতসমূহ আপনার কাছে প্রিয় করে তোলেন। তিনি ক্ষমা নিয়ে তাওবার দরজায় আপনার জন্য অপেক্ষা করেন। যে ব্যক্তি তার কাছে দুনিয়া-সমান পাপ নিয়ে আসে তিনি তার কাছে সমপরিমাণ মাগফিরাত নিয়ে আসেন। আপনার গুনাহ যত বেশিই হোক না কেন যদি আপনি ক্ষমার আশা রাখেন তাহলে তিনি চাইলে সব গুনাহ ক্ষমা করে দিতে পারেন। তিনি জানেন, এই ব্যক্তিটি জীবনে একদিনও তার আনুগত্য করেনি। তেমনিভাবে তিনি তার অন্তরে-থাকা আল্লাহর ভয়ের ব্যাপারেও জানেন। তাই তিনি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।

তৃতীয় পাঠ
আল্লাহর ভয়ের বিভিন্ন স্তর রয়েছে। কেউ আল্লাহ তাআলার ভয়ে গুনাহ থেকে বিরত থাকে। আবার কেউ গুনাহ করে আল্লাহর ভয়ে লজ্জিত হয়। সফল তো সেই ব্যক্তি আল্লাহর ভয় যাকে তাওবার পথে টেনে আনে। সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার পূর্বে লজ্জিত হতে হবে। আল্লাহকে ভয় করার জন্য কারও গুনাহ করার সুযোগ নেই। যদিও গুনাহগারদের উচিত আল্লাহকে অধিক ভয় করা। কিন্তু আল্লাহ তাআলাকে ভয় করাটা তার সম্মানের অংশ। এই তো উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু! অত্যন্ত মুত্তাকি ও পরহেজগার এক ব্যক্তি। তিনি আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়ার এবং তার শাস্তিতে গ্রেফতার হওয়ার আশঙ্কা করছেন। তাই তিনি বলছেন, 'যদি আকাশ থেকে কোনো ঘোষক ঘোষণা করে যে, হে লোক সকল! তোমরা সকলে জান্নাতে প্রবেশ করবে তবে একজন ব্যতীত! তাহলে আমার আশঙ্কা হয়, সেই ব্যক্তি আমিই হব! আর যদি কোনো ঘোষক ঘোষণা করে যে, হে লোক সকল! তোমরা সকলে জাহান্নামি তবে একজন ছাড়া! তাহলে আমি আশাবাদী আমিই সেই ব্যক্তি হব।'
আল্লাহ তাআলাকে ভয় করাটা তার প্রতি ঈমান রাখার অংশ। অন্তরে আল্লাহর ভয় ঢুকে গেলে বান্দা অন্য কোনো দিকে ভ্রুক্ষেপ করবে না। মুমিন তো একমাত্র আল্লাহ তাআলাকে ভয় করে। সে জানে, তার রিজিক আল্লাহর হাতে। তাই সে রিজিক বন্ধ হওয়ার ভয় করে না। সে জানে, জীবন-মৃত্যু আল্লাহর হাতে, তাই সে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ তার রুহ নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করে না। সে জানে, মানুষ সামান্য উপকরণ মাত্র। তাদের সকলের ফলাফল সেই সত্তার মাধ্যমে নির্ধারিত হয় যিনি কোনো বিষয়ে ফায়সালা করতে চাইলে শুধু বলেন, 'হও', সঙ্গে সঙ্গে তা হয়ে যায়।

চতুর্থ পাঠ
সত্য স্বীকার করে নেওয়াটা মর্যাদার বিষয়। সাহাসিকতারও। যদিও ভয় তার পিছু তাড়া করে বেড়ায়। সবচেয়ে উত্তম অজুহাত হলো নিজের ভুল স্বীকার করে নেওয়া। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট ভুল হলো—ভুলের পক্ষে সাফাই গাওয়া। ভুল হয়ে গেলে তা স্বীকার করে নিন। কারণ সৃষ্টিগতভাবে সকলেই মানুষ। মানুষ মাত্রই ভুল করে থাকে। আপনি সেইসব অভিজাত লোকের অন্তর্ভুক্ত হোন যাদের কাছে কেউ ভীত হয়ে বা লজ্জিত হয়ে আসলে তারা অহংকার করে না। বদান্যশীলদের শক্তি তাদেরকে প্রতিশোধের আহ্বান জানালেও তারা মানুষকে ক্ষমা করে দেয়। ভুল মানুষের স্বভাবের অংশ। এমনকি এটা মানুষের উত্তম বৈশিষ্ট্য। কারণ ভুলের কারণে মানুষ শিখে থাকে, পরিমার্জিত হয়। ভুলের মাধ্যমে আমরা নিজেদের মনুষ্য-প্রবৃত্তিকে স্মরণ করে থাকি। নিজেদের দুর্বলতার কথা বুঝতে পারি। তখন আমরা এর হিসাব-নিকাশ করতে পারি। ভুলের মাধ্যমে আমরা নিজেদেরকে পূর্ণ ভাবার অহমিকা থেকে এবং অহংকারের অন্ধকার থেকে বের করে নিয়ে আসতে পারি। গুনাহের কারণে বিনয় অবলম্বন কখনো আল্লাহর কাছে নেক-কাজের-ফলে-সৃষ্ট অহমিকা থেকে উত্তম হয়ে থাকে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- 'পবিত্র সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! যদি তোমরা গুনাহ না করতে তাহলে আল্লাহ তোমাদের বিলুপ্ত করে দিতেন এবং এমন সম্প্রদায় নিয়ে আসতেন যারা গুনাহ করত এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করত। আল্লাহ তখন তাদের ক্ষমা করে দিতেন।' [১]

পঞ্চম পাঠ
সময় ফুরিয়ে যাওয়ার পর আনীত ঈমান মানুষকে মুক্তি দিতে পারে না। আল্লাহ তাআলা বলেন- 'যেদিন আপনার রবের পক্ষ থেকে কোনো নিদর্শন আসবে, সেদিন যারা পূর্ব থেকে বিশ্বাস স্থাপন করেনি কিংবা স্বীয় বিশ্বাস অনুযায়ী কোনোরূপ সৎকর্ম করেনি তার ঈমান কোনো কাজে আসবে না।' [২]
ফিরআউনের ক্ষেত্রে এমনই ঘটেছিল। তারা সমুদ্রের ঢেউয়ে হাবুডুবু খাচ্ছিল। মৃত্যুযন্ত্রণা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। তখন সে বলে উঠেছিল— 'আমি ঈমান আনলাম যে, বনি ইসরাইল যার ওপর ঈমান এনেছে, তাকে ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। বস্তুত আমিও তারই অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত।' [১] এ ঈমান তার কোনো উপকারে আসেনি। এ কারণে আল্লাহ তাআলা ফিরআউনের এ কথার উত্তরে বলেন— 'এখন এ কথা বলছ! অথচ তুমি ইতিপূর্বে নাফরমানি করছিলে, এবং পথভ্রষ্টদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলে।' [২]
ফিরআউন জীবিত থাকাবস্থায় প্রকাশ্যভাবে আল্লাহকে অস্বীকার করেছে। হাদিসে উল্লিখিত আলোচ্য ব্যক্তিটি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী ছিল। তবে তার পাপাচার বেশি ছিল। আল্লাহ তাআলা চাইলে তার হকের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন। কিন্তু বান্দার হকের গুনাহ তিনি ক্ষমা করেন না; বরং বান্দা তা মাফ করে দিলে কিংবা তার হক আদায় করা হলেই কেবল তা মাফ হতে পারে। এটি আল্লাহ তাআলার ইনসাফ। তিনি অবশ্যই এই জুলুমের প্রতিশোধ নেবেন। এমনকি তিনি চতুষ্পদ জন্তুদের পরস্পর থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার ব্যবস্থা করবেন।

ষষ্ঠ পাঠ
ওসিয়ত পূরণ করা জীবিতদের ওপর মৃতের অধিকার। মাতা-পিতার ওসিয়ত পূরণ করাটা তাদের প্রতি এক ধরনের সদাচার। কিন্তু আমরা উল্লিখিত হাদিসে দেখতে পেলাম, সন্তানরা পিতাকে পুড়িয়ে তার হাড্ডি ছাই করে বাতাসে উড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তার ওসিয়ত পূরণ করেছে। এটি খুবই অবাক-করা আনুগত্য।
মৃত্যুর পর সন্তানেরা যেন তাদের প্রতি সদাচরণ করে এজন্য ওসিয়ত করে যাওয়ার প্রয়োজন হয়না। দুনিয়া থেকে চলে গেলেও সন্তানদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বাকি থাকে। শেষ রাত্রে পিতা-মাতার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করাটাও এক ধরনের সদাচারণ। দুআ কবুলের সময় তার জন্য দুআ করাটা সদাচারণ। কোনো অভাবগ্রস্তকে তাদের পক্ষ থেকে সাদাকাহ করাটা সদাচারণ। মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করাটাও মাতাপিতার প্রতি এক ধরনের সদাচরণ। কারণ মানুষ তখন আপনার প্রতিপালনকারীর জন্য দুআ করবে। মাতা-পিতার প্রতি প্রকৃত সদাচরণ শুরু হয় তাদের মৃত্যুর পরে। কারণ মৃত্যুর পর তাদের সকল আমল বন্ধ হয়ে যায়, তখন নেককার সন্তান দুআ করলেই তারা তা ভোগ করে।

টিকাঃ
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৪৮; সহিহ মুসলিম, ২৭৫৬
[১] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৭৪৯
[২] সুরা আনআম, আয়াত-ক্রম: ১৫৮
[১] সুরা ইউনুস, আয়াত-ক্রম: ৯০
[২] সুরা ইউনুস, আয়াত-ক্রম: ৯১
[৩] মুসনাদে আহমদ, হাদিস-ক্রম: ২৮২০। সনদ যঈফ।
[৪] সুরা নাযিয়াত, আয়াত-ক্রম: ২৪

📘 নবীজির ﷺ পাঠশালা 📄 ইউনুস আলাইহিস সালাম

📄 ইউনুস আলাইহিস সালাম


রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন— ইউনুস আলাইহিস সালাম তার সম্প্রদায়কে শাস্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি তাদেরকে জানিয়েছিলেন যে, তিনদিন পরই তাদের ওপর শাস্তি নেমে আসবে। এরপর তিনি তাদের ছেড়ে চলে যান। তখন তার জাতি সমস্ত সন্তান থেকে তাদের মায়েদের আলাদা করে দেয়। সকলে বের হয়ে আল্লাহর আশ্রয় নেয়। তার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করে। আল্লাহ তাআলা আজাব উঠিয়ে নেন।
অপরদিকে ইউনুস আলাইহিস সালাম আজাবের অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু তিনি কোনো আজাব দেখতে পেলেন না। তাদের রীতি ছিল, যদি কেউ মিথ্যা বলে আর আপন বক্তব্যের স্বপক্ষে কোনো দলিল-প্রমাণ পেশ না করতে পারে তাহলে সে হত্যার উপযুক্ত হবে। তাই তিনি রাগান্বিত হয়ে বের হয়ে যান। এক জাহাজের কাছে আসেন। তারা তাকে উঠিয়ে নেয়। জাহাজের লোকেরা তাকে চিনতে পারে। তিনি আরোহণ করার পর জাহাজটি থেমে যায়। জাহাজটি ডানে-বামে কোনো দিকেই চলছিল না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমাদের এই জাহাজের কী হলো?' তারা বলল, 'আমরা জানি না।' তিনি বললেন, 'কিন্তু আমি জানি। এ জাহাজে মনিব থেকে পলাতক এক গোলাম রয়েছে। আল্লাহর কসম, যতক্ষণ না তোমরা তাকে ফেলে দেবে ততক্ষণ এটা চলবে না।' তারা বলল, 'হে আল্লাহর নবী! আমরা আপনাকে ফেলে দিতে পারব না।' ইউনুস আলাইহিস সালাম বললেন, 'তোমরা লটারি করো, যার নাম আসবে তাকে নিক্ষেপ করা হবে।'
তারা লটারি করলে তিন-তিনবারই ইউনুস আলাইহিস সালাম-এর নাম আসে। তাকে ফেলে দেওয়া হলে আল্লাহ তাআলা তাকে মাছের মুখে ছেড়ে দেন। মাছ তাকে গিলে ফেলে। তাকে নিয়ে সমুদ্রের গভীরে চলে যায়। ইউনুস আলাইহিস সালাম সেখানে নুড়ি পাথরের ঘর্ষণের মতো তাসবিহ পাঠ শুনতে পান। এ সময় তিনি দুআ করেন। যার বর্ণনা কুরআনে উঠে এসেছে এভাবে—
'তখন তিনি অন্ধকারের মধ্যে (আল্লাহকে) ডেকে বলেন, আপনি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই; আপনি পবিত্রতম সত্তা, আমি গুনাহগার।' [১]
মাছ তাকে পশমবিহীন পাখি-ছানার মতো পেট থেকে উগরে ফেলে। আল্লাহ তাআলা সেখানে একটি লাউগাছ উৎপন্ন করেন। তিনি এর মাধ্যমে ছায়া গ্রহণ করতেন। এরপর লাউ গাছটি শুকিয়ে যায়। গাছটি শুকিয়ে যাওয়ার কারণে তিনি ক্রন্দন করতে থাকেন। আল্লাহ তাআলা ওহি প্রেরণ করে বলেন, 'একটি গাছ শুকিয়ে যাওয়ার কারণে তুমি ক্রন্দন করছ! কিন্তু এক লক্ষ বা তারও বেশি লোকদের ব্যাপারে তুমি ক্রন্দন করছ না! তাদেরকে তুমি ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিলে?' তিনি সেখান থেকে বের হন। এক বালকের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। বালকটি মেষ চড়াচ্ছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কোন সম্প্রদায়ের?' সে বলল, 'ইউনুস সম্প্রদায়ের।' তিনি বললেন, 'তুমি তাদেরকে গিয়ে সালাম জানাবে। বলবে যে, তুমি ইউনুসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছ।'
বালকটি বলল, 'যদি তুমি ইউনুস হয়ে থাকো তাহলে তো তুমি জানো, যে কেউ প্রমাণবিহীন মিথ্যা বললে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকে। তোমার উক্ত দাবির পক্ষে কে আমার সাক্ষী হবে?' তিনি বললেন, 'এই গাছ এবং এই স্থানটি তোমার সাক্ষী দেবে।' বালকটি ইউনুস আলাইহিস সালাম-কে বলল, 'তাদেরকে আদেশ করুন।' ইউনুস আলাইহিস সালাম গাছ ও সেই স্থানকে বললেন, 'তোমাদের কাছে বালকটি আসলে তোমরা তার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে।' গাছ ও স্থান বলল, 'হ্যাঁ।'
বালকটি তার সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গেল। সে বাদশাহর কাছে গিয়ে বলল, 'আমি নবী ইউনুসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। তিনি আপনাদেরকে সালাম জানিয়েছেন।' বাদশাহ বালকটিকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। বালকটি বলল, 'আমার সাক্ষী রয়েছে।' বাদশাহ তার সঙ্গে কয়েকজন লোক পাঠান। তারা সেই গাছ ও স্থানের কাছে পৌঁছে। বালকটি এগুলোকে সম্বোধন করে বলে, 'আমি তোমাদেরকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি, ইউনুস কি তোমাদেরকে সাক্ষী রাখেননি?' তারা বলল, 'হ্যাঁ।' লোকেরা ভীত হয়ে গেল। তারা বাদশাহর কাছে গিয়ে এর বিবরণ পেশ করল। বাদশাহ বালকটির হাত ধরে তাকে নিজের আসনে বসালেন। বালকটি ৪০ বছর তাদের দায়িত্ব পালন করে। [১]

প্রথম পাঠ
আল্লাহ তাআলা একজনকে অপরজনের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। নবীগণও মানুষ। তাদের একজন অন্যজনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ তাআলা নবীদেরকে নিষ্পাপ থাকার গুণ দান করেছেন। সেটা ধর্মীয় ক্ষেত্রে এবং ধর্মীয় বিধি-নিষেধ পৌঁছানোর ক্ষেত্রে। তেমনিভাবে চারিত্রিক ক্ষেত্রেও তারা নিষ্পাপ। কিন্তু পার্থিব বিষয়ে তারা মানুষ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় এসে পরাগায়ন করার প্রশ্নে বলেছিলেন, 'তোমরা পার্থিব বিষয়ে আমার চেয়ে অধিক অবগত।' বনি ইসরাইল গো-বৎসকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করায় মুসা আলাইহিস সালাম খুব রাগান্বিত হন, এমনকি নিজ ভাই হারুন আলাইহিস সালাম তাকে বলেন— 'হে আমার জননী-তনয় (ভাই), আমার শ্মশ্রু ও মাথার চুল ধরে টেনো না।' [১]
মনুষ্য-স্বভাবের কারণে ইউনুস আলাইহিস সালাম থেকে এ কাজ সংঘটিত হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে তাকে আজাবের সংবাদ দিয়েছিলেন। ইউনুস আলাইহিস সালাম তা জানতেন না। কারণ তিনি তো একজন মানুষ। কোনো অদেখা বিষয় সম্পর্কে তিনি জানেন না। তখন তিনি রাগান্বিত হয়ে বের হয়ে যান। সমুদ্রতীরে এসে জাহাজবাসীকে অনুরোধ করেন। জাহাজটি না চলায় লটারি করা হলে তিনবারই ইউনুস আলাইহিস সালাম-এর নাম আসে। তখন তিনি নিজেই সমুদ্রে ঝাঁপ দেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'তোমাদের কেউ যেন এটা না বলে যে, আমি ইউনুস ইবনে মাত্তার চেয়ে উত্তম।'

দ্বিতীয় পাঠ
তাওবা আজাব উঠিয়ে নেয়। দুআ তাকদির পরিবর্তন করে দেয়। আল্লাহ তাআলা নির্ধারণ করে রেখেছেন যে, দুআ ও তাওবা শাস্তিকে ফিরিয়ে দেয়। ইউনুস আলাইহিস সালাম-কে আল্লাহ তাআলার লিখিত প্রথম তাকদির সম্পর্কে সংবাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় তাকদির তিনি জানতেন না। দেখা যাবে বহু আজাব নেমে আসার মতো ছিল; কিন্তু তাওবার ফলে তা উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে।

তৃতীয় পাঠ
মানুষের স্বভাব বিভিন্ন ধরনের। নবীদের স্বভাব অন্য মানুষের তুলনায় ভিন্ন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বদরের বন্দীদের ব্যাপারে সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। তিনি তখন অত্যন্ত চমৎকার কথা বলেন। তিনি বলেন, 'হে আবু বকর, তুমি ঈসা ইবনে মারিয়ামের মতো। আর হেমর, তুমি নুহের মতো।' [৩] বদান্যশীল ব্যক্তি সবসময় বদান্যতা প্রদর্শন করে। কৃপণ ব্যক্তি চিরদিন কৃপণ রয়ে যায়। ঈমান মানুষের স্বভাবকে পরিমার্জিত করতে পারে কিন্তু একে সম্পূর্ণ নিঃশেষ করে দেয় না।

চতুর্থ পাঠ
জায়েজ ক্ষেত্রে লটারি করাটা ভিত্তিহীন বিষয় নয়। এটি নবীদের রীতি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধে বের হওয়ার সময় স্ত্রীদের মধ্যে লটারি করেছেন। [১] এর মাধ্যমে কোন স্ত্রীকে যুদ্ধে নিয়ে যাবেন—এ মধুর সমস্যার সমাধান হতো। লটারি এক চমৎকার সমাধান।

পঞ্চম পাঠ
আল্লাহ তাআলা অসীম ক্ষমতার অধিকারী। মানুষ-খেকো হিংস্র মাছকে নির্দেশ দেওয়া হয়। সে ইউনূস আলাইহিস সালাম-কে গিলে নেয়। আল্লাহ তাআলা চাইলে তাকে রক্ষা করতে পারেন। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও ইউনুস আলাইহিস সালাম-এর আমলের পার্থক্যের কারণে আল্লাহ কর্তৃক তাদের হেফাজতে পার্থক্য ঘটেছে। ইউনুস আলাইহিস সালাম আজাব না আসায় রাগান্বিত হয়ে বের হয়ে যান। আল্লাহ তাআলা তার জীবনকে রক্ষা করেছেন, তবে ঘটে যাওয়া কাজ থেকে পবিত্র করার জন্য তিনি তাকে সমস্যায় নিপতিত করেন।

ষষ্ঠ পাঠ
মানুষের সঙ্গে তাদের মর্যাদা অনুযায়ী আচরণ করুন। লক্ষ করুন, প্রথমবার লটারিতে নাম আসার সঙ্গে সঙ্গেই লোকেরা ইউনুস আলাইহিস সালাম-কে সমুদ্রে ফেলে দেয়নি। কারণ তিনি তাদের এক সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাতেম তাই-এর মেয়েকে সম্মান করেছিলেন। কারণ তার পিতা আরবের একজন মর্যাদাবান ও সম্মানিত লোেক ছিলেন। অভিজাত ও অনুগ্রহশীল ব্যক্তির পদস্খলন ঘটে গেলে তা হালকাভাবে গ্রহণ করুন।

সপ্তম পাঠ
মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকুন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, 'মুসলমান ভীরু হতে পারে, কৃপণ হতে পারে, কিন্তু মিথ্যুক হতে পারে না।' [২] ইউনুস আলাইহিস সালাম-এর সম্প্রদায় মিথ্যাকে এত অপছন্দ করত যে, এর শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছিল। যদি কাফের সম্প্রদায় মিথ্যাকে এমন অপছন্দ করতে পারে, তাহলে মুসলমান কীভাবে মিথ্যুক হতে পারে!

টিকাঃ
[১] সুরা আম্বিয়া, আয়াত-ক্রম: ৮৭
[১] মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস-ক্রম: ৩১৮৬৬। সনদ হাসান।
[১] সূরা ত্বহা, ২০:৯৪
[১] সুরা মায়িদাহ, আয়াত-ক্রম: ১১৮
[২] সুরা নূহ, ৭১: ২৬
[৩] মুসনাদে আহমদ, ৩৬৩২। যঈফ।
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৪১৪১
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ২৫১৮
[২] বায়হাকী, শুআবুল ঈমান, হাদিস-ক্রম: ৪৪৭২

📘 নবীজির ﷺ পাঠশালা 📄 ইউশা ইবনে নুন আলাইহিস সালাম

📄 ইউশা ইবনে নুন আলাইহিস সালাম


আবু হুরায়রাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
'এক নবী জিহাদে বের হবার প্রাক্কালে নিজ সম্প্রদায়কে বললেন, “এমন কোনো ব্যক্তি আমার অনুসরণ করবে না, যে কোনো নারীকে বিয়ে করেছে এবং তার সঙ্গে মিলিত হবার ইচ্ছা রাখে, কিন্তু এখনো মিলিত হয়নি। এমন ব্যক্তিও না, যে ঘর তৈরি করেছে কিন্তু তার ছাদ তোলেনি। আর এমন ব্যক্তিও না, যে গর্ভবতী ছাগল বা উটনী কিনেছে এবং তার প্রসবের অপেক্ষায় আছে।”
অতঃপর তিনি জিহাদের জন্য বের হলেন। আসরের নামাজের সময় কিংবা এর কাছাকাছি সময় তিনি একটি জনপদের কাছাকাছি পৌঁছুলে সূর্যকে লক্ষ্য করে বললেন, “তুমিও আদেশ পালনকারী আর আমিও আদেশ পালনকারী। হে আল্লাহ! সূর্যকে থামিয়ে দিন!” সূর্যকে থামিয়ে দেওয়া হলো। আল্লাহ তাকে বিজয় দান করলেন। তিনি গনিমতের সম্পদগুলো একত্র করলে এগুলো জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য আগুন এল, কিন্তু আগুন তা জ্বালাল না।
ওই নবী তখন বললেন, “তোমাদের মধ্যে (গনিমত) আত্মসাৎকারী রয়েছে। প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন যেন আমার কাছে বায়আত হয়।” একজনের হাত তখন নবীর হাতের সঙ্গে আটকে গেল। নবী বললেন, "তোমাদের গোত্রেই আত্মসাৎকারী রয়েছে। তোমাদের মধ্যেই আত্মসাৎকারী রয়েছে।” অবশেষে তারা গাভীর মস্তক-পরিমাণ স্বর্ণ উপস্থিত করল এবং তা রেখে দিল। এরপর আগুন এসে তা জ্বালিয়ে ফেলল। তবে আমাদের দুর্বলতা ও অক্ষমতার প্রতি লক্ষ করে আল্লাহ আমাদের জন্য তা হালাল করে দিয়েছেন।' [২]

প্রথম পাঠ
ঘটনায় যে নবীর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে তিনি ইউশা ইবনে নুন আলাইহিস সালাম। কুরআনুল কারিমে তার ব্যাপারে নিম্নোক্ত আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে— 'যখন মুসা তার যুবক (সঙ্গী)-কে বললেন।' [৩] মুসা আলাইহিস সালাম-কে বনি ইসরাইল বলেছিল— 'যতক্ষণ তারা সেখানে থাকবে আমরা কখনো সেখানে যাব না। বরং আপনি ও আপনার রব যান এবং উভয়ে যুদ্ধ করুন। আমরা এখানেই বসলাম।' [১] আল্লাহ তাআলা তখন তাদেরকে তিহ ময়দানে প্রবেশ করান। হারুন ও মুসা আলাইহিমাস সালাম-এর ইন্তেকালের পর আল্লাহ তাআলা ইউশা ইবনে নুন আলাইহিস সালাম-কে নবুওয়াত প্রদান করেন। তিনি আমালেকাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে বিজয় লাভ করেন।

দ্বিতীয় পাঠ
কখনো পরিমাণ নিয়ে আলোচনা করবেন না; বরং গুণগতমান নিয়ে আলোচনা করুন। ইউশা আলাইহিস সালাম যাদের মন অন্য কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত ছিল তাদেরকে শরিক করেননি। যেমন— যে কোনো নারীকে বিয়ে করেছে কিন্তু ঘরসংসার করেনি, ঘর বানিয়েছে কিন্তু ছাদ তোলেনি, পশুর প্রসবের অপেক্ষায় আছে। এর মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি যে, দুনিয়া মানুষকে ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে। ঈমান মানুষের স্বভাবকে পরিমার্জিত করতে পারে কিন্তু একে সম্পূর্ণ নিঃশেষ করে দেয় না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাসান ইবনে আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে কোলে নিয়ে বলেন— 'আর জেনে রাখো, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি অকল্যাণের সম্মুখীনকারী।' [১] দ্বীন গ্রহণ করার অর্থ হারাম থেকে বেঁচে থাকা, জীবন থেকে হাত গুটিয়ে নেয়া নয়।

তৃতীয় পাঠ
সকল বিষয় আল্লাহ তাআলার হাতে। জুমার দিন আসরের শেষ সময় যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। এ কারণেই ইউশা আলাইহিস সালাম সূর্যকে সম্বোধন করে বলেছিলেন, 'আমিও আদিষ্ট তুমিও আদিষ্ট।' এটাই হলো প্রকৃত ঈমান। এই বিশ্বজগতের সবকিছুই আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন। জিবরাইল আলাইহিস সালাম থেকে নিয়ে ছোট্ট পিপীলিকা— সবকিছুই আল্লাহর নির্দেশের সামনে সমান। আমাদের দায়িত্ব হলো উপকরণ গ্রহণ করা, কিন্তু ফলাফল আল্লাহর হাতে।

চতুর্থ পাঠ
একজন সেনাপতি বা পরিচালককে মানবিক হতে হয়। জ্ঞানী দায়িত্ববান ব্যক্তি মানুষকে নিয়ম-কানুনের মাধ্যমে নয়, বরং অন্তরের মাধ্যমে অনুগত করে রাখেন। ব্যর্থ দায়িত্বশীল হলো সে, যে নিজেকে নিয়ম-কানুনের গোলাম বানিয়ে রাখে।

পঞ্চম পাঠ
নির্বাচিত ব্যক্তিদের মধ্যেও স্তর-ভেদ রয়েছে। ইউশা ইবনে নুন আলাইহিস সালাম-এর বাহিনীর প্রতি লক্ষ করুন। দুনিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রত্যেককে তিনি দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। দেখা গেল, খুব কম মানুষই উত্তীর্ণ হতে পেরেছে। এমনকি তাদের মধ্যেও কেউ কেউ গনিমতের সম্পদ চুরি করেছে। এ দুনিয়া পুরোটাই এক জাদু ও ফেতনা।

ষষ্ঠ পাঠ
আকিদার ক্ষেত্রে সকল নবী-রাসুল একমত। কিন্তু শরিয়তের ক্ষেত্রে তাদের ভিন্নতা রয়েছে। পূর্ববর্তী সকল উম্মতের ওপর গনিমতের সম্পদ হারাম ছিল। তাদের ক্ষেত্রে নিয়ম ছিল-গনিমতের সম্পদ একত্রিত করার পর আকাশ থেকে আগুন এসে তা জ্বালিয়ে দিত। এই যুদ্ধে আগুন প্রথমদিকে জ্বালিয়ে দেয়নি কারণ এক ব্যক্তি সম্পদ আত্মসাৎ করেছিল। পরে তা ফেরত আনলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এটিই ছিল কবুল হওয়ার আলামত।

টিকাঃ
[১] (গনিমত সংক্রান্ত নিয়মাবলী)
[২] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩১২৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ১৭৪৭
[৩] সুরা কাহাফ, আয়াত-ক্রম: ৬০
[১] সুরা মায়িদাহ, আয়াত-ক্রম: ২৪
[১] সুরা আনফাল, ৮: ২৮

ফন্ট সাইজ
15px
17px