📘 নবীজির ﷺ পাঠশালা 📄 হাজেরা ও ইসমাইল আলাইহিমাস সালাম

📄 হাজেরা ও ইসমাইল আলাইহিমাস সালাম


নারী জাতি সর্বপ্রথম কোমরবন্ধ বানানো শিখেছে ইসমাইলের মায়ের কাছে থেকে। হাজেরা কোমরবন্ধ লাগাতেন সারাহ'র কাছ থেকে নিজের মর্যাদা গোপন রাখার জন্য। [১]

প্রথম পাঠ
কোমরবন্ধ হচ্ছে ঘরের কাজের সময় নারীরা যা শরীরের মাঝখানে বেঁধে রাখে। হাদিসের উদ্দেশ্য হলো হাজেরাই সর্বপ্রথম এটি বানিয়েছিলেন। প্রকৃত বিষয় হলো একদিন তিনি স্বামীর সঙ্গে ছেলে ইসমাইলকে নিয়ে বের হন। সারাকে তখন নেওয়া হয়নি। পদচিহ্ন গোপন রাখার জন্য তিনি কোমরবন্ধ হালকা করে দিয়েছিলেন। ফলে তিনি কোথায় যাচ্ছেন সারা তা জানতে পারবেন না। তিনি নিজের ওপর আশংকা করে এ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। ঘটনার শুরু-অংশের মাধ্যমে আমরা সতীনদের মধ্যকার ঈর্ষা সম্পর্কে বুঝতে পারি। সতীনদের মধ্যকার ঈর্ষা বিশেষত সারার বিষয়টি আলোচনার পূর্বে আমাদেরকে তার চেষ্টা-মুজাহাদার বিষয়টি ভুলে গেলে চলবে না। তিনি সেই নারী, যখন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর প্রতি কেউ ঈমান আনেনি তিনি তার প্রতি ঈমান এনেছেন। তিনি সেই নারী মিশরের বাদশাহ যাকে নিজের জন্য গ্রহণ করতে চেয়েছিল, কিন্তু তিনি নিজের পবিত্রতার হেফাজত করেছেন।
সতীনের প্রতি ঈর্ষা নারীদের স্বভাবজাত বিষয়। ইবনু হাজার রহিমাহুল্লাহ ফাতহুল বারিতে বলেছেন, নারীদের ঈর্ষাবোধ কারও ক্ষমতাধীন বিষয় নয়। এটি তাদের স্বভাবজাত বিষয়। তারা কখনো এটা থেকে মুক্ত হতে পারবে না। এটা যতক্ষণ পর্যন্ত অনুভূতির পর্যায়ে থাকবে আল্লাহ তাআলা ততক্ষণ এগুলোর হিসাব নেবেন না। কিন্তু যখন এই অনুভূতি থেকে মন্দ কিছু প্রকাশ পাবে তখন এ জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। সারা ছিলেন স্বামী-ভক্ত, দীর্ঘকাল তিনি তার স্বামীকে নিয়েই কাটিয়েছেন। এখন সেই স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী হওয়ায় এবং সেই স্ত্রী থেকে সন্তান জন্মগ্রহণ করায় তিনি তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হওয়াটাই স্বাভাবিক।

দ্বিতীয় পাঠ
কাজ অনুযায়ী প্রতিদান হয়ে থাকে। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর কাছে সারা নিজেই হাজেরাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন। এই ঘরে ইসমাইল আলাইহিস সালাম-এর জন্ম হয়। আল্লাহ তাআলা সন্তানহীনা সারাকেও সুস্থ করে দেন। তার গর্ভে নবী ইসহাক আলাইহিস সালাম-এর জন্ম হয়। ইসহাক আলাইহিস সালাম-এর বংশ থেকেই পরবর্তীতে বনি ইসরাইলের সকল নবী প্রেরিত হয়েছেন। তবে ইসমাইল আলাইহিস সালাম-এর বংশে শুধু আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাই এমন এক নবী, যদি অন্যসকল মানুষ ও নবীকে এক জায়গায় রাখা হয় তাহলে তিনি তাদের সকলকে ছাড়িয়ে যাবেন।
'অতঃপর ইবরাহিম হাজেরা ও তার শিশু-ছেলে ইসমাইলকে সঙ্গে নিয়ে বের হলেন এ অবস্থায় যে, হাজেরা শিশুকে দুধ পান করাতেন। অবশেষে যেখানে কাবাঘর অবস্থিত, ইবরাহিম তাদের উভয়কে সেখানে নিয়ে এসে মসজিদের উঁচু অংশে জমজম কূপের উপরে অবস্থিত একটি বড় গাছের নিচে তাদেরকে রাখলেন। তখন মক্কায় না ছিল কোনো মানুষ, না ছিল কোনোরূপ পানির ব্যবস্থা। পরে তিনি তাদেরকে সেখানেই রেখে গেলেন। এ ছাড়া তিনি তাদের কাছে রেখে গেলেন একটি থলের মধ্যে কিছু খেজুর আর একটি মশকে অল্প পরিমাণ পানি। অতঃপর ফিরে চললেন। তখন ইসমাইলের মা পিছু পিছু এলেন এবং বলতে লাগলেন, “হে ইবরাহিম! আপনি কোথায় চলে যাচ্ছেন? আমাদেকে এমন এক ময়দানে রেখে যাচ্ছেন, যেখানে না আছে কোনো সাহায্যকারী আর না আছে কোনো ব্যবস্থা।” তিনি এ কথা তাকে বারবার বললেন। কিন্তু ইবরাহিম তার দিকে তাকালেন না। হাজেরা বললেন, “এর আদেশ কি আপনাকে আল্লাহ দিয়েছেন?” তিনি বললেন, "হ্যাঁ।” হাজেরা বললেন, "তাহলে আল্লাহ আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না।"
অতঃপর তিনি ফিরে আসলেন। আর ইবরাহিমও সামনে চললেন। চলতে চলতে যখন তিনি গিরিপথের বাঁকে পৌঁছলেন, যেখানে স্ত্রী ও সন্তান তাকে আর দেখতে পাচ্ছেন না, তখন তিনি কাবাঘরের দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন। অতঃপর দুহাত তুলে এ দুআ করলেন, আর বললেন-
“হে আমাদের রব! আমি নিজের এক সন্তানকে আপনার পবিত্র গৃহের সন্নিকটে চাষাবাদহীন উপত্যকায় পুনর্বাসন করেছি; হে আমাদের রব! যাতে তারা নামাজ কায়েম রাখে। অতঃপর আপনি কিছু লোকের অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করুন এবং তাদেরকে ফল-ফলাদি দ্বারা রিজিক দান করুন, যাতে তারা শুকরিয়া আদায় করে।” [১]

তৃতীয় পাঠ
ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও তার পরিবারের ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনটি বেশি বিস্ময়কর তা নির্ধারণ করতে আপনি হিমশিম খেয়ে যাবেন। তিনি ছিলেন সন্তানহীন। বার্ধক্য পর্যন্ত তিনি এর ওপর ধৈর্যধারণ করেছেন। তারপর সর্বশেষে যখন তাকে এক সন্তান দান করা হয় তখন সেই স্ত্রী এবং কলিজার টুকরো সন্তানকে চাষাবাদহীন উপত্যকায় রেখে আসতে বলা হয়। যেখানে কোনো মানুষ বা কাফেলার আগমন ঘটে না। কিন্তু ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এসবের কোনো চিন্তাই করেননি। আল্লাহ তাআলা আদেশ করেছেন, অবশ্যই তার আদেশ এবং ইচ্ছা বাস্তবায়িত হবে। নাকি আপনি সন্তানকে স্তন্যদানকারিণী মমতাময়ী মায়ের কথা ভেবে আশ্চর্য হবেন? যিনি জানতে পারলেন এটি আল্লাহর নির্দেশ, তখন তিনি পূর্ণ বিশ্বাসের সঙ্গে বললেন, তাহলে আল্লাহ আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না।

চতুর্থ পাঠ
ছেলেকে দূরে রেখে এসে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম পিতৃত্বের অনুভূতিতে কোনো সমস্যা অনুভব করেননি। আর হাজেরা স্বামী থেকে দূরে অবস্থান করেও কোনো সমস্যা অনুভব করেননি। এর দ্বারা বুঝে আসে, আল্লাহর কাছে পৌঁছার রাস্তা কখনো মনের বিপরীত হয়ে থাকে। যারা নিজেদের মনের উপর বিজয়ী হতে পারে তারাই কেবল আল্লাহর কাছে পৌঁছতে পারে।

পঞ্চম পাঠ
ইবরাহিম আলাইহিস সালাম কেন তার প্রতি এবং সন্তানের প্রতি তাকালেন না? তিনি দুর্বল হয়ে যেতে চাননি। আপন স্ত্রী এবং সন্তানদেরকে রেখে চলে যাচ্ছেন, এ সময় যেন তার মন বিগলিত না হয়ে যায়, তাদের ভালোবাসায় যেন তিনি আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়নে অক্ষম হয়ে না পড়েন, এজন্য তিনি এমন করেছিলেন। বড়রা এমনই হয়ে থাকেন। তারা রবের ভালোবাসায় নিজেদের ভালোবাসাকে বিসর্জন দেন। দুআ মুমিনের অস্ত্র। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এ অস্ত্র প্রয়োগ করেন। তিনি বলেন-
'অতঃপর আপনি কিছু লোকের অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করুন।' [১]
তার দুআর ফলে সেই প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ কাবার প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকে। উঁচু-নিচু সকল স্থান থেকেই সেখানে মানুষের ঢল নামে। একজন মাত্র নারী, তার দেখাশোনার জন্য পুরো একটি গোত্র (জুরহুম গোত্র) চলে আসে। যে ছেলেকে পিতা একাকী রেখে গেছে এখন তাকে দশ দশ জন মানুষ দেখাশোনা করে। আপনার সমস্যার ফাইলটি (দুআর মাধ্যমে) আসমানে পাঠিয়ে দিন।

ষষ্ঠ পাঠ
আল্লাহ কি আপনাকে আদেশ করেছেন? কত চমৎকার সেই ঈমান... যখন আমরা কেবল আল্লাহ তাআলার নির্দেশের কারণে কোনো কাজ করি। এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকুন, যে আল্লাহর আদেশ পালন করে আল্লাহ তাআলা তার দেখাশোনা করেন। যে হারাম থেকে নিজের হাত গুটিয়ে নেয় আল্লাহ হালাল থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন।
'আর ইসমাইলের মা ইসমাইলকে স্বীয় স্তন্যের দুধ পান করাতেন এবং নিজে ঐ মশক থেকে পানি পান করতেন। অবশেষে মশকে যা পানি ছিল তা ফুরিয়ে গেল। তিনি নিজে তৃষ্ণার্ত হলেন এবং তার শিশু-পুত্রটিও তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়ল। তৃষ্ণায় তার বুক ধড়ফড় করছে অথবা সে মাটিতে পড়ে ছটফট করছে। শিশু-পুত্রের এ করুণ অবস্থার দিকে তাকানো অসহনীয় হয়ে পড়ায় তিনি সরে গেলেন আর সাফা পর্বত থেকে নেমে পড়লেন। নিজের কামিজের এক প্রান্ত তুলে ধরে একজন ক্লান্ত-শ্রান্ত মানুষের মতো ছুটে চললেন। ময়দান অতিক্রম করে 'মারওয়া' পাহাড়ের কাছে এসে তার উপর উঠে দাড়ালেন। এমনিভাবে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করলেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'এ জন্যই মানুষ এ পর্বতদ্বয়ের মধ্যে সাঈ করে থাকে।' অতঃপর তিনি যখন মারওয়া পাহাড়ে উঠলেন, তখন একটি শব্দ শুনতে পেলেন। হঠাৎ সেখানে তিনি একজন ফেরেশতাকে দেখতে পেলেন। সেই ফেরেশতা আপন পায়ের গোড়ালি দ্বারা আঘাত করলেন। ফলে পানি বের হতে লাগল। হাজেরা'র চারপাশে নিজ হাতে বাঁধ দিয়ে এক হাউজের মতো করে দিলেন এবং হাতের কোষভরে তার মশকটিতে পানি ভরতে লাগলেন।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ইসমাইলের মাকে আল্লাহ রহম করুন। যদি তিনি বাঁধ না দিয়ে জমজমকে এভাবে ছেড়ে দিতেন, তাহলে জমজম একটি প্রবহমান ঝরনায় পরিণত হতো। হাজেরা পানি পান করলেন, শিশু-পুত্রকেও দুধ পান করালেন, তখন ফেরেশতা তাকে বললেন, “আপনি ধ্বংসের কোনো আশংকা করবেন না। কেননা এখানেই আল্লাহর ঘর রয়েছে। এ শিশুটি এবং তার পিতা দুজনে মিলে এখানে ঘর নির্মাণ করবে এবং আল্লাহ তার আপনজনকে কখনো ধ্বংস করেন না।”

সপ্তম পাঠ
হাজেরা ভাঙতে জানেন না। সঙ্গে সঙ্গে তিনি সাফা পাহাড়ে উঠে যান দেখতে থাকেন কেউ আসে কি না। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সবক। আপনার পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক, কখনো তা হাজেরার চেয়ে কঠিন হবে না। নবীর স্ত্রী ও নবীর মা হওয়া সত্ত্বেও তিনি সবকিছু মেনে নিয়ে বিকল হয়ে বসে থাকেননি। দুনিয়াটা চেষ্টা-প্রচেষ্টার ঘর।

অষ্টম পাঠ
প্রতিটি কাজেই কষ্ট অনুযায়ী প্রতিদান অর্জিত হয়ে থাকে। যে নারী বলেছিলেন— 'আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না'— আল্লাহ তাআলা সেই নারীর কাছে এক ফেরেশতা পাঠিয়ে বলেন— 'নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তার নিকটতম বান্দাদের ধ্বংস করেন না।' মানুষ বিপদের সময় সান্ত্বনাদানকারী লোকের মুখাপেক্ষী থাকে। আপনি অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গেলে তাকে সুস্থ হওয়ার আশার বাণী শোনান। ঘের অমানিশাপূর্ণ অন্ধকার রজনীর পরই দিগন্ত ভেদ করে আলোর আভা ফুটে ওঠে।

নবম পাঠ
গোটা বিশ্বজগত আল্লাহর হাতে। পানির দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা চাইলে হাজেরার জন্য পানি বের করে আনতে পারতেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তার জন্য জিবরাইল আলাইহিস সালাম-কে পাঠালেন। কারণ তিনি বিপদ অনুযায়ী সান্ত্বনা দিতে চেয়েছেন। জিবরাইল আলাইহিস সালাম মানুষের আকৃতিতে হাজেরার কাছে এসেছিলেন। ফেরেশতাগণ অন্য আকৃতি ধারণ করলেও নিজেদের শক্তি বিদ্যমান থাকে।

দশম পাঠ
যদি হাজেরা আলাইহাস সালাম মশকে পানি না ভরতেন এবং তাকে চারদিক থেকে বেষ্টন না করতেন তাহলে জমজম একটি প্রবহমান ঝরনা হয়ে যেত। মুত্তাকিদেরকে ফেরেশতা মনে করে আচরণ করা যাবে না। ভুলে যাবেন না যে তারাও আপনার মতো মানুষ। হাজেরা আলাইহাস সালাম খুবই পিপাসার্ত ছিলেন। তাই তিনি স্বভাবগতভাবেই সে পানিকে চারদিক থেকে বেষ্টন করে দিয়েছেন।

একাদশ পাঠ
যিনি ধূ-ধূ মরুভূমি থেকে পানি বের করতে পারেন তিনি অবশ্যই মানুষকে বহু সমস্যা-সংকট থেকেও উদ্ধার করতে পারেন। যিনি পাথর থেকে উটনী বের করতে পারেন তিনি আপনার জন্য মানুষের অন্তর থেকে দয়া-মমতা বের করতে পারেন। আপনার সকল জটিল সমস্যার বিষয়গুলো আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে দিন।
'জুরহুম গোত্রের একদল লোক তাদের কাছ দিয়ে অতিক্রম করছিল। তারা মক্কায় নিচু ভূমিতে অবতরণ করল এবং দেখতে পেল একঝাঁক পাখি চক্রাকারে উড়ছে। তারা সেখানে গিয়েই পানি দেখতে পেল। ইসমাইল আলাইহিস সালাম-এর মা পানির কাছে ছিলেন। তারা তাকে বলল, “আমরা আপনার নিকটবর্তী স্থানে বসবাস করতে চাই। আপনি আমাদের কি অনুমতি দেবেন?” তিনি জবাব দিলেন, "হ্যাঁ। তবে, এ পানির উপর তোমাদের কোনো অধিকার থাকবে না।” তারা “হ্যাঁ” বলে তাদের মত প্রকাশ করল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এ ঘটনা ইসমাইলের মাকে একটি সুযোগ এনে দিল। অতঃপর তারা সেখানে বসতি স্থাপন করল। ইসমাইল যৌবনে উপনীত হলেন এবং তাদের থেকে আরবি ভাষা শিখলেন। তারা তার সঙ্গে তাদেরই একটি মেয়েকে বিয়ে দিল।'

দ্বাদশ পাঠ
জুরহুম গোত্রের লোকজন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর ধর্মের উপর ছিল না, কিন্তু তাদের মধ্যে কার্যত ইসলামের চরিত্র বিদ্যমান ছিল। তারা কোনো কিছুই গ্রহণ না করার শর্তে রাজি হয়ে যাওয়াটা আমাদের হৃদয়কে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে! অথচ আমরা অবৈধভাবে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করে থাকি! তারা মনে করত শক্তির চেয়ে অধিকার বড়।

ত্রয়োদশ পাঠ
মানুষকে এ জন্যই ইনসান বলা হয় যে, সে অন্যের মাধ্যমে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। ক্ষুধার্তরা আমাদের কাছে রুটি পাবে। দুঃখ-ভারাক্রান্ত ব্যক্তি আমাদের কাছে সান্ত্বনা পাবে। আপনার মানবতাবোধ পরখ করে দেখুন।

চতুর্দশ পাঠ
বেড়ে ওঠা এবং প্রতিপালনের দিক থেকে ইসমাইল আলাইহিস সালাম আরব; কিন্তু বংশগতভাবে তিনি আরব নন। আমরা সকলেই আদম-সন্তান, আর আদম মাটির তৈরি। আরবের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি বানিয়ে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সম্মানিত করেছেন। কিন্তু এটা অন্যদের ওপর নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে গর্ব করার বিষয় নয়। আকিদা হলো গোত্র, মাটি এমনকি রক্ত থেকেও দামি।
'এরই মধ্যে ইসমাইলের মা হাজেরা ইন্তেকাল করেন। ইবরাহিম তার পরিত্যক্ত পরিজনের অবস্থা দেখার জন্য এখানে আসলেন। কিন্তু তিনি ইসমাইলকে পেলেন না। তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, সে বলল, "আমরা নিদারুণ কষ্টে আছি।” তিনি বললেন, "তোমার স্বামী বাড়ি এলে তাকে বোলো, সে যেন তার ঘরের দরজার চৌকাঠ বদলিয়ে নেয়।” ইসমাইল বাড়ি এসে জানতে পেরে বললেন, “ইনি আমার পিতা। এ কথা দ্বারা তিনি নির্দেশ দিয়েছেন আমি যেন তোমাকে পৃথক করে দিই।” অতঃপর ইসমাইল অন্য একটি মেয়েকে বিয়ে করেন। ইবরাহিম পরে আবার দেখতে এলেন। এবার ইসমাইলের স্ত্রী বলল, "আমরা ভালো এবং স্বচ্ছল অবস্থায় আছি।” সাথে সে আল্লাহর প্রশংসাও করল। ইবরাহিম দুআ করলেন, “হে আল্লাহ! তাদের গোশত ও পানিতে বরকত দিন।” ইবরাহিম বললেন, “তোমার স্বামী যখন ফিরে আসবে, তাকে সালাম বোলো আর হুকুম কোরো, সে যেন তার ঘরের দরজার চৌকাঠ ঠিক রাখে।” ইসমাইল ফিরে এসে বললেন, “ইনিই আমার পিতা। আর তুমি হলে আমার ঘরের দরজার চৌকাঠ।”'

পঞ্চদশ পাঠ
কত চমৎকার ইঙ্গিত—তাকে আদেশ দাও, যেন সে তার দরজার চৌকাঠ পাল্টে ফেলে! ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বহু উঁচুমানের মানুষ। বার্তা পৌঁছে দিতে তিনি ইঙ্গিতপূর্ণ পন্থা অবলম্বন করেছেন। ইঙ্গিতবহ কথাবার্তার ক্ষেত্রে আপনাকে অত্যন্ত সুক্ষদর্শী হতে হবে।

ষোড়শ পাঠ
তাকদিরের ওপর সন্তুষ্টির মধ্যেই আসল প্রাচুর্য রয়েছে। ইসমাইল আলাইহিস সালাম-এর প্রথম স্ত্রীর দৃষ্টি ছিল না-পাওয়া জিনিসের প্রতি, আর দ্বিতীয় স্ত্রী যা পেয়েছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট ও কৃতজ্ঞ থেকেছে। অকৃতজ্ঞদের সঙ্গে ওঠাবসা করার চেয়ে কঠিন আর কিছু নেই। কৃতজ্ঞতার সঙ্গে ওঠাবসা করার চেয়ে সুমিষ্ট আর কিছু নেই।

সপ্তদশ পাঠ
আমাদেরকে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নিছক পিতার নির্দেশে স্ত্রীকে তালাক প্রদান করা কি কল্যাণকর কাজ? সকল পিতাই ইবরাহিম আলাইহিস সালাম নয়। ছেলে নিজেই নিজের জীবনপদ্ধতি নির্ধারণ করবে।
'ইবরাহিম পরে আবার এলেন। দেখতে পেলেন ইসমাইল তার একটি তির মেরামত করছেন। ইবরাহিম বললেন, “আল্লাহ আমাকে এখানে একটি ঘর বানাতে নির্দেশ দিয়েছেন।” এরপর তারা উভয়ে কাবাঘরের দেয়াল তুলতে লেগে গেলেন। ইসমাইল পাথর আনতেন আর ইবরাহিম নির্মাণ করতেন। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম মাকামে ইবরাহিম পাথরের উপর দাঁড়িয়ে নির্মাণ কাজ করতে লাগলেন। সেসময় তারা উভয়ে এ দুআ করলেন— “হে আমাদের রব! আমাদের তরফ থেকে কবুল করুন।”'

অষ্টাদশ পাঠ
ইসমাইল আলাইহিস সালাম অত্যন্ত দক্ষ তিরন্দাজ ছিলেন। এই ধর্ম যেহেতু জিহাদ ও বিজয়ের ধর্ম তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তির-চালনা শিখতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। 'জেনে রাখ শক্তি হলো নিক্ষেপে।' [১]

ঊনবিংশ পাঠ
নিঃসন্দেহে সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্যে নির্ধারিত হয়েছে, সেটাই হচ্ছে এ ঘর, যা মক্কায় অবস্থিত। [১]

বিংশ পাঠ
ইবরাহিম আলাইহিস সালাম যে আকৃতিতে কাবা নির্মাণ করেছিলেন বর্তমানে কি তা সে অবস্থায় আছে? উত্তর হলো-না। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর সময় কাবার দুটি দরজা ছিল এবং হাতিম তার অন্তর্ভুক্ত ছিল। কুরাইশদের সময় অর্থের সংকুলান না থাকায় তারা হাতিমকে বাইরে রেখে দেয়। আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু এটিকে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর সময় যেমন ছিল সেভাবে নির্মাণ করেছিলেন, পরে তা আবার কুরাইশদের নির্মাণের ওপর বহাল করা হয়।

একবিংশ পাঠ
কাবা শরিফের বিভিন্ন অংশ:
এক. হাজরে আসওয়াদ: ফেরেশতারা জান্নাত থেকে পাথরটি এনেছিলেন। এটি বরফের চেয়েও সাদা ছিল। মুশরিকদের গুনাহ একে কালো বানিয়ে ফেলেছে। মানুষের গুনাহ যখন জান্নাতের একটি সাদা পাথরকে কালো বানিয়ে দিতে পারে তখন গুনাহ অন্তরের কী অবস্থা করতে পারে!
দুই. হাতিমে কাবা: এটি কাবার পাশে অর্ধবৃত্তাকার অংশ। বিধানগত দিক থেকে এটা কাবার অংশ।
তিন. মাকামে ইবরাহিম: ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এই পাথরটিতে দাঁড়িয়ে কাবা নির্মাণ করতেন। আল্লাহ তাআলা পাথরটিকে তার জন্য নরম বানিয়ে দিয়েছিলেন।

টিকাঃ
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৩৬৪
[১] সুরা ইবরাহিম, আয়াত-ক্রম: ৩৭; সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৩৬৪
[১] সুরা ইবরাহিম, আয়াত-ক্রম: ৩৭
[১] মুসনাদে আহমদ, হাদিস-ক্রম: ১৩৭৭; সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৫২২৫
[১] রাসূল সা. বলেন, আমি তো কেবল উৎকৃষ্ট চরিত্রের পূর্ণতা দানের জন্য প্রেরিত হয়েছি। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস-ক্রম: ৮৯৫২)
[১] সুনানে আবু দাউদ, হাদিস-ক্রম: ৩৯৮৪
[১] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম : ১৯১৭
[১] সুরা আলে ইমরান, আয়াত-ক্রম: ৯৬
[১] সুরা আলে ইমরান, আয়াত-ক্রম : ১৭
[২] সুনানে তিরমিযি, হাদিস-ক্রম : ৮৭৭

📘 নবীজির ﷺ পাঠশালা 📄 মুসা আলাইহিস সালাম ও খিজির আলাইহিস সালাম

📄 মুসা আলাইহিস সালাম ও খিজির আলাইহিস সালাম


রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—'একবার মুসা বনি ইসরাইলের মধ্যে বয়ান করার জন্য দাড়ালেন। তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, “কোন ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী?” তিনি বললেন, "আমি।” মুসা আলাইহিস সালাম-এর এ উত্তরে আল্লাহ তার প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন। আল্লাহ তাকে বললেন, "বরং দুই সমুদ্রের সংযোগ স্থলে আমার একজন বান্দা আছে, সে তোমার চেয়ে অধিক জ্ঞানী।” মুসা আলাইহিস সালাম আরজ করলেন, “হে আমার রব! আমি তার সঙ্গে কীভাবে সাক্ষাৎ করব?” আল্লাহ বললেন, “তুমি একটি মাছ ধরো এবং তা একটি থলের মধ্যে ভরে রাখো। যেখানে গিয়ে তুমি মাছটি হারিয়ে ফেলবে সেখানেই তিনি অবস্থান করছেন।”
মুসা একটি মাছ ধরলেন এবং থলের মধ্যে ভরে রাখলেন। তিনি এবং তার সাথি ইউশা ইবনে নুন চলতে লাগলেন। একসময় তারা দুজন একটি পাথরের কাছে এসে পৌঁছে বিশ্রাম করলেন। মুসা ঘুমিয়ে পড়লেন। আর মাছটি থলে থেকে বের হয়ে নদীতে চলে গেল। শেষে যখন পরের দিন ভোর হলো মুসা তার সাথিকে বললেন, "আমাদের সকালের খাবার আনো।” সঙ্গী বললেন, “আমরা যখন সেই পাথরটির কাছে বিশ্রাম নিয়েছিলাম, মাছটি তখন চলে গিয়েছিল, তা আপনাকে জানাতে আমি ভুলে গেছি।” মুসা বললেন, “ওটাই তো সেই স্থান যা আমরা খুঁজে বেড়াচ্ছি।” অতঃপর উভয়ে সেই পাথরটির কাছে ফিরে এলেন। তারা দেখলেন, সেখানে জনৈক ব্যক্তি বস্ত্রাবৃত হয়ে আছেন। মুসা তাকে সালাম করলেন। তিনি বললেন, "এখানে সালাম কী করে এলো?” তিনি বললেন, “আমি মুসা।” তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি বনি ইসরাইলের মুসা?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ, আপনাকে যে মহাজ্ঞান দান করা হয়েছে তা শেখার জন্য এসেছি।”
খিজির বললেন, “আপনি আমার সঙ্গে থেকে ধৈর্যধারণ করতে পারবেন না। আর আপনি এমন বিষয়ে ধৈর্য রাখবেন কী করে, যার রহস্য আপনার জানা নেই!” মুসা বললেন, “ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে একজন ধৈর্যশীল হিসেবে দেখতে পাবেন।” অতঃপর তারা দুজন রওনা হয়ে নদীর তীর ঘেঁষে চলতে লাগলেন। এমন সময় একটি নৌকা তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তারা পারিশ্রমিক ছাড়াই তাদেরকে নৌকায় তুলে নিল। অতঃপর খিযির হঠাৎ কুঠার নিয়ে নৌকার একটি তক্তা খুলে ফেললেন। মুসা বললেন, “যাত্রীদেরকে ডুবিয়ে দেয়ার জন্য আপনি নৌকাটি ফুটো করে দিলেন! এ তো আপনি একটি গুরুতর কাজ করলেন!” খিজির বললেন, “আমি কি বলিনি যে, আপনি আমার সঙ্গে কিছুতেই ধৈর্যধারণ করতে পারবেন না?” মুসা বললেন, "আমি যে বিষয়টি ভুলে গেছি, তার জন্য আমাকে দোষারোেপ করবেন না।” এমন সময় একটি চড়ইপাখি এসে নদীর পানিতে ঠোঁট ডুবাল। খিজির বললেন, “হে মুসা! আমার এবং তোমার জ্ঞানের দ্বারা আল্লাহর জ্ঞান থেকে ততটুকুও কমেনি যতটুকু এ পাখিটি নদীর পানি হ্রাস করেছে।”
অতঃপর তারা একটি বালকের পাশ দিয়ে গেলেন। খিজির তার মাথা ধরলেন এবং নিজ হাতে তার ঘাড় আলাদা করে ফেললেন। এতে মুসা তাকে বললেন, “আপনি একটি নিষ্পাপ বালককে বিনা অপরাধে হত্যা করলেন! নিশ্চয়ই আপনি একটি অন্যায় কাজ করলেন।” খিজির বললেন, “আমি কি আপনাকে বলিনি যে, আপনি আমার সঙ্গে ধৈর্য ধরতে পারবেন না?” মুসা বললেন, “এরপর যদি আমি আপনাকে আর কোনো বিষয়ে জিজ্ঞেস করি তাহলে আপনি আমাকে আর আপনার সঙ্গে রাখবেন না।”
তারা এক জনপদে এসে উপনীত হলেন। গ্রামবাসীদের কাছে তারা খাবার চাইলেন। কিন্তু গ্রামের লোকেরা তাদের আতিথেয়তা করতে অস্বীকার করল। অতঃপর তারা সেখানেই একটি দেয়াল দেখতে পেলেন, যা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। খিজির নিজ হাতে দেয়ালটি সোজা করে দিলেন। মুসা বললেন, “তারা আমাদের আতিথেয়তা করল না আর আপনি এদের দেয়াল সোজা করতে গেলেন! আপনি ইচ্ছা করলে এর বদলে মজুরি গ্রহণ করতে পারতেন।” খিজির বললেন, “এখানেই আপনার ও আমার মধ্যে বিচ্ছেদ হলো। তবে এখনই আমি আপনাকে জ্ঞাত করছি সেসব কথার রহস্য, যেসব বিষয়ে আপনি ধৈর্য ধরতে পারেননি।”
'আপনি যে বিষয়ে ধৈর্য্যধারণ করতে অক্ষম হয়েছিলেন, এই হলো তার ব্যাখ্যা।' [১]
আল্লাহ মুসা আলাইহিস সালাম-এর ওপর রহমত বর্ষণ করুন। তিনি যদি ধৈর্য ধরতেন, তাহলে তাদের উভয়ের ব্যাপারে আমাদেরকে আরও অনেক ঘটনা জানানো হতো। [২]

প্রথম পাঠ
ঘটনা থেকে প্রাসঙ্গিকভাবেই খিজির আলাইহিস সালাম-এর পরিচয়ের বিষয়টি চলে আসে। খিজির নামে একজন ব্যক্তি রয়েছেন। তার জীবিত থাকার ব্যাপারে যত হাদিস বর্ণিত হয়েছে তার একটিও বিশুদ্ধ নয়। ইবনুল কাইয়িম জাওযি রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন- 'যেসব হাদিসে খিজির আলাইহিস সালাম জীবিত থাকার কথা উল্লেখ হয়েছে সবগুলোই মিথ্যা। তার জীবিত থাকার ব্যাপারে একটি হাদিসও সহিহ নয়।' [৩]
ইমাম বুখারি রহমতুল্লাহি আলাইহিকে জিজ্ঞেস করা হয়, 'খিজির আলাইহিস সালাম কি জীবিত?' তিনি বলেন, 'এমনটা হতে পারে না। কারণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, বর্তমানে যারা ভূ-পৃষ্ঠে রয়েছে একশত বছর পর তাদের কেউই অবশিষ্ট থাকবে না।' [১]
কুরআন, হাদিস, আলিমগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত এবং বিবেক-সবগুলো এ কথার প্রমাণ করে যে, খিজির আলাইহিস সালাম জীবিত নন। তিনি আমাদের মতো এক আদম-সন্তান। মুসা আলাইহিস সালাম-এর যুগের কাছাকাছি সময়ের লোক ছিলেন।

দ্বিতীয় পাঠ
বিনয়ী হোন। আমরা নিজেদেরকে সর্বক্ষেত্রে যোগ্য মনে করি। মুসা আলাইহিস সালাম সম্মানিত নবী হওয়া সত্ত্বেও তাকে যখন সবচেয়ে বড় জ্ঞানী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো তিনি নিজেকে বড় জ্ঞানী বলেন। এ কারণে আল্লাহ তাআলা তাকে শিক্ষামূলক তিরস্কার করেন। বহু মানুষ এমন আছে যারা আপনার চেয়ে বেশি জানে। কোনো ব্যক্তি সর্ব বিষয়ে জ্ঞান রাখাটা অসম্ভব। আল্লাহ তাআলা আপন হেকমতের মাধ্যমে মানুষকে পরস্পরের মুখাপেক্ষী করে দিয়েছেন।

তৃতীয় পাঠ
কে উত্তম-মুসা নাকি খিজির? নিঃসন্দেহে মুসা আলাইহিস সালাম উত্তম। কারণ, নবুওয়াতের সমতুল্য আর কোনো মর্যাদা হতে পারে না। খিজির আলাইহিস সালাম-কে আল্লাহ তাআলা বিশেষ জ্ঞান প্রদান করেছিলেন। তাই তিনি মুসা আলাইহিস সালাম-এর চেয়ে অধিক জ্ঞানী। কিন্তু নবুওয়াতের কারণে মুসা আলাইহিস সালাম খিজির আলাইহিস সালাম-এর চেয়ে উত্তম। মুসা আলাইহিস সালাম মহান ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও তার চেয়ে নিম্নস্তরের ব্যক্তির কাছ থেকে জ্ঞানলাভ করতে সংকোচবোধ করেননি।
'আমি তোমার প্রতি মহব্বত সঞ্চারিত করেছিলাম আমার নিজের পক্ষ থেকে, যাতে তুমি আমার দৃষ্টির সামনে প্রতিপালিত হও।' [১]
'এবং আমি তোমাকে আমার নিজের জন্য তৈরি করে নিয়েছি।' [২]
'এবং আমি তোমাকে মনোনীত করেছি।' [১]
অভিজাত লোকেরা বিনয়ী হয়ে থাকেন, তাই আপনিও বিনয়ী হোন।

চতুর্থ পাঠ
কষ্টের সঙ্গেই ইলম জড়িত। এক টুকরো রুটিই যখন সহজে অর্জিত হয় না, ইলমের ব্যাপারে তো প্রশ্নই ওঠে না! কষ্ট স্বীকার মুসা আলাইহিস সালাম-কে ইলম অর্জন থেকে বাধা দিতে পারেনি। তাই তিনি ইলম অর্জনের সফরে বের হয়ে যান।

পঞ্চম পাঠ
খিজির আলাইহিস সালাম মুসা আলাইহিস সালাম-কে বলেছিলেন, 'আল্লাহ তাআলা আমাকে বিশেষ কিছু জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন যা আপনি জানেন না, আর আপনাকে বিশেষ কিছু জ্ঞান দান করেছেন যা আমি জানি না।' জ্ঞান দুই প্রকার। এক. ইলমে লাদুনি, আল্লাহ যাকে চান তাকে তা দান করেন। দুই. এমন জ্ঞান যা কষ্ট, সাধনা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে অর্জিত হয়ে থাকে। বুদ্ধিমানগণ লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য উপকরণ গ্রহণ করেন। কিন্তু তারা জানেন, ফলাফল আল্লাহর হাতে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরতের সময় উপকরণকে বাদ দিয়ে দেননি। উপকরণ যেন আপনাকে উপকরণ-স্রষ্টার কথা ভুলিয়ে না দেয়।

ষষ্ঠ পাঠ
বড় বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহ তাআলা ছোট ছোট বিপদে নিপতিত করে থাকেন। বিপদাপদ রহমত নিয়ে আসে। খিজির আলাইহিস সালাম যদি নৌকাটিকে ভালো রাখতেন তাহলে অত্যাচারী বাদশাহ তা ছিনিয়ে নিতো। সবসময় কম ক্ষতিকর বিষয়টি গ্রহণ করুন। উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'জ্ঞানী হলো সে, যে দুই অকল্যাণের মধ্য থেকে তুলণামূলক কল্যাণকরটি চিনে নিতে পারে।' পরকাল ঠিক করার জন্যও মানুষকে বিপদে ফেলা হয়ে থাকে। এই মুমিন মাতাপিতা কীভাবে জানতে পারত যে, তাদের ছেলে বড় হয়ে কাফের হয়ে যেত? আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য দুই অকল্যাণের মধ্যে তুলনামূলক কল্যাণকরটি নির্বাচন করেছেন।

সপ্তম পাঠ
সন্তানকে আল্লাহর নিরাপত্তায় সোপর্দ করুন এবং আপনি সৎ হয়ে যান। সন্তানের জন্য শুধু মিরাস রেখে যাওয়ার অর্থ হলো তার জন্য কিছু উপায়-উপকরণের ব্যবস্থা করা। পক্ষান্তরে তার জন্য তাকওয়া রেখে যাওয়ার অর্থ হলো উপায়-উপকরণের স্রষ্টা আল্লাহকে তার জন্য রেখে যাওয়া। আল্লাহ তাআলা দুইজন নবীকে পাঠালেন দুই বালকের সম্পত্তির দেওয়াল উঠানোর জন্য, কারণ তাদের পিতা ছিলেন সৎ।

অষ্টম পাঠ
এই ঘটনাটি আমাদেরকে আল্লাহর সঙ্গে শিষ্টাচারের বিষয়টি শিক্ষা দেয়। খিজির আলাইহিস সালাম যা করেছিলেন সবই আল্লাহর নির্দেশে করেছেন। কিন্তু সংবাদ দিতে গিয়ে তিনি শিষ্টাচার রক্ষা করেছেন।
'নৌকাটি কয়েকজন দরিদ্র লোকের ছিল। আমি সেটিকে ত্রুটিযুক্ত করার ইচ্ছা করলাম।' [১]
বালকটিকে হত্যা করার ক্ষেত্রে তিনি বললেন— 'অতঃপর আমি চাইলাম, তাদের রব যেন তাদেরকে পবিত্রতায় উত্তম সন্তান দান করেন।' [২]
দেয়ালের ক্ষেত্রে বললেন— 'সুতরাং আপনার রব দয়াবশতঃ ইচ্ছা করলেন যে, তারা যৌবনে পদার্পণ করুক এবং নিজেদের গুপ্তধন উদ্ধার করুক।' [১]
আল্লাহর সঙ্গে নবীদের শিষ্টাচার লক্ষ করুন। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বলেছিলেন, 'যখন আমি রোগাক্রান্ত হই তখন তিনিই আরোগ্য দান করেন।' [২] অসুস্থতার সম্বন্ধ তিনি নিজের দিকে করেছেন আর সুস্থতার সম্বন্ধ আল্লাহর দিকে। আইয়ুব আলাইহিস সালাম বলেছিলেন, 'আমি দুঃখ-কষ্টে নিপতিত হয়েছি।' [১] তিনি স্পষ্টভাবে সুস্থ করে দেওয়ার আবেদনও করেননি, বরং প্রশংসা করেছেন। আদব রক্ষা করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

টিকাঃ
[১] সুরা কাহাফ, আয়াত-ক্রম : ৮২
[২] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৪০; সহিহ মুসলিম হাদিস-ক্রম: ২৩৮০
[৩] আল মানারুল মুনিফ, ৬৭। তবে ইবনে হাজার আসকালানি বলেন, বিষয়টি নিয়ে আলেমগণের মতানৈক্য রয়েছে। অর্থাৎ সহিহ হাদিস দ্বারা বিষয়টি প্রমাণিত না হলেও আলেমগণের এক জামআতের মতে তিনি জীবিত রয়েছেন। -আল-মাতালিবুল আলিয়া, ১৭/৫৩০
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৬০১
[১] সূরা ত্ব-হা, আয়াত-ক্রম: ৩৯
[২] সুরা ত্ব-হা, আয়াত-ক্রম: ৪১
[১] সুরা ত্ব-হা, আয়াত-ক্রম : ১৩
[১] সুরা কাহাফ, আয়াত-ক্রম: ৭৯
[২] সূরা কাহাফ, আয়াত-ক্রম: ৮০-৮১
[১] সুরা কাহাফ, আয়াত-ক্রম : ৮২
[২] সুরা মায়িদাহ, আয়াত-ক্রম: ১১৬
[১] সূরা মায়িদাহ, আয়াত-ক্রম: ১১৬
[২] সূরা শুআরা, আয়াত-ক্রম: ৭৮-৮০
[১] সুরা আম্বিয়া, আয়াত-ক্রম : ৮৩
[২] সুরা আরাফ, আয়াত-ক্রম : ২৩
[১] সুরা জিন, আয়াত-ক্রম : ১০

📘 নবীজির ﷺ পাঠশালা 📄 নিজের ওপর জুলুমকারী ব্যক্তিটি

📄 নিজের ওপর জুলুমকারী ব্যক্তিটি


আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'আগের যুগে এক লোক তার নিজের ওপর অনেক জুলুম করেছিল। তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে সে তার পুত্রদেরকে বলল, “মৃত্যুর পর আমার দেহ হাড়-গোশতসহ পুড়িয়ে ছাই করে তা প্রবল বাতাসে উড়িয়ে দিয়ো। আল্লাহর কসম! যদি আমার রব আমাকে ধরে ফেলেন, তবে তিনি আমাকে এমন কঠিনতম শাস্তি দেবেন যা অন্য কাউকে দেননি।” তারপর যখন তার মৃত্যু হলো-তার কথামতো সেভাবেই করা হলো। অতঃপর আল্লাহ ভূপৃষ্ঠকে আদেশ করলেন, “তোমার মধ্যে ঐ ব্যক্তির যা আছে জমা করে দাও।” ভূপৃষ্ঠ তা জমা করে দিল। এ ব্যক্তি তখনই দাঁড়িয়ে গেল। আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "কীসে তোমাকে এ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করল?” সে বলল, “হে আমার রব! আপনার ভয়।” অতঃপর তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হলো।' [১]

প্রথম পাঠ
এই হাদিসের মাধ্যমে জানা যায় যে, লোকটি গুনাহের ক্ষেত্রে অনেক বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিল। অন্য এক বর্ণনা দ্বারা জানা যায়, সে কখনো কোনো ভালো কাজ করেনি।
আমরা দেখছি, দুনিয়া থেকে তার বিদায় নেওয়ার সময় হয়ে গেছে। কিন্তু আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার মতো কোনো নেক কাজ তার নেই। এমতাবস্থায় সে তার সন্তানদেরকে একত্রিত করে শুধু একটি ওসিয়ত করে গেল—যেন তার গোশত-চামড়া ও হাড়গুলো পুড়িয়ে ছাই বানিয়ে দেওয়া হয়। তার আশঙ্কা ছিল ছাই বিদ্যমান থাকলে আল্লাহ এর মাধ্যমেই তাকে পাকড়াও করবেন। তাই সে ছাইগুলো বাতাসে উড়িয়ে দেওয়ার ওসিয়ত করে যায়।
সে কেন এ ওসিয়ত করেছিল? কারণ সে জানত আল্লাহ তাআলার আজাব অত্যন্ত কঠিন। আল্লাহর সামনে দাঁড় করানো হলে কোনো কিছুই তাকে শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবে না। অর্থাৎ সে শাস্তির উপযুক্ত হয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করত। আজাব ও শাস্তিদাতা সত্তা মহান আল্লাহ তাআলার অস্তিত্বের ওপর ঈমান রাখত। সে বুঝতে পারছিল যে, তার সময় সংকীর্ণ হয়ে আসছে, তাই সে অপেক্ষমান শাস্তি থেকে মুক্তির জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল। সে বুঝতে পারছিল, মিছে এই দুনিয়ায় তার আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে এসেছে। তাই সে হিসাব থেকে পলায়ন করতে চাচ্ছিল। সে ছাই হয়ে বাতাসে উড়ে যেতে চেয়েছিল।
তার পূর্ণ বিশ্বাস ছিল, অবশ্যই তাকে শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে, এমতাবস্থায় সে আল্লাহর কাছে কোনো ওজর পেশ করতে পারবে না। কারণ কোনো নেক আমল তার নেই। অবশ্য সে ভুলে গিয়েছে যে, সে এমন এক সত্তার কাছে যাচ্ছে যিনি গলিত হাড্ডিসমূহও জীবিত করতে পারেন।

দ্বিতীয় পাঠ
অন্তরই সকল ইবাদতের মূল। অন্তরের ধ্যান, খেয়াল ও নিবেদন ব্যতীত শুধু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কোনো আমল গ্রহণযোগ্য নয়। খুশু তথা বিনয় ব্যতীত নামাজ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নড়াচড়া বৈ কিছু নয়। এতে নামাজে আল্লাহর সঙ্গে একান্ত আলাপের বিষয়টি ফুটে ওঠে না। তাকওয়া ব্যতীত রোজা রাখাটা নিছক পণ্ডশ্রম। এতে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলার জন্য পানাহার এবং প্রবৃত্তির চাহিদা পরিত্যাগের বিষয়টি ফুটে ওঠে না। হজ তো কোনো ভ্রমণের নাম নয়; বরং আধ্যাত্মিক ইবাদতের এক মাধ্যম। যদি অন্তরের মাধ্যমে সেটি অনুভূত না হয় তাহলে তার প্রকৃত উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়ে যাবে।
অন্তরের অন্যতম ইবাদত আল্লাহ তাআলাকে ভয় করা। যদি কেউ আল্লাহর অস্তিত্বের ওপর ঈমান না রাখে তাহলে তাকে ভয় করে কোনো কাজ হবে না। আলোচ্য ঘটনায় এ ব্যক্তিটি আল্লাহর ওপর ঈমান রাখত কিন্তু তার অবাধ্যতা করত। সে সাধারণ কোনো গুনাহ করেনি; বরং গুনাহের ক্ষেত্রে নিজের ওপর অনেক বাড়াবাড়ি করেছে। সে এমন কোনো আমল করেনি যার মাধ্যমে আল্লাহর রহমতের আশা করতে পারে। কিন্তু সে বুঝতে পারছিল, তার ধ্বংস অনিবার্য। তার জানা ছিল আল্লাহ দয়ালু ও পরম ক্ষমাশীল সত্তা হলেও এর পাশাপাশি তিনি শাস্তিও দিয়ে থাকেন।
তার রহমত সকল কিছুকে পরিবেষ্টন করে আছে। তবে তিনি শিরিক করাকে কখনো ক্ষমা করেন না, শিরিক ব্যতীত অন্য সকল গুনাহ তিনি চাইলে ক্ষমা করে দিতে পারেন। আপনার অন্তর ও মনের গোপন অবস্থা সম্পর্কে তিনি জানেন। তিনিই তার নেয়ামতসমূহ আপনার কাছে প্রিয় করে তোলেন। তিনি ক্ষমা নিয়ে তাওবার দরজায় আপনার জন্য অপেক্ষা করেন। যে ব্যক্তি তার কাছে দুনিয়া-সমান পাপ নিয়ে আসে তিনি তার কাছে সমপরিমাণ মাগফিরাত নিয়ে আসেন। আপনার গুনাহ যত বেশিই হোক না কেন যদি আপনি ক্ষমার আশা রাখেন তাহলে তিনি চাইলে সব গুনাহ ক্ষমা করে দিতে পারেন। তিনি জানেন, এই ব্যক্তিটি জীবনে একদিনও তার আনুগত্য করেনি। তেমনিভাবে তিনি তার অন্তরে-থাকা আল্লাহর ভয়ের ব্যাপারেও জানেন। তাই তিনি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।

তৃতীয় পাঠ
আল্লাহর ভয়ের বিভিন্ন স্তর রয়েছে। কেউ আল্লাহ তাআলার ভয়ে গুনাহ থেকে বিরত থাকে। আবার কেউ গুনাহ করে আল্লাহর ভয়ে লজ্জিত হয়। সফল তো সেই ব্যক্তি আল্লাহর ভয় যাকে তাওবার পথে টেনে আনে। সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার পূর্বে লজ্জিত হতে হবে। আল্লাহকে ভয় করার জন্য কারও গুনাহ করার সুযোগ নেই। যদিও গুনাহগারদের উচিত আল্লাহকে অধিক ভয় করা। কিন্তু আল্লাহ তাআলাকে ভয় করাটা তার সম্মানের অংশ। এই তো উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু! অত্যন্ত মুত্তাকি ও পরহেজগার এক ব্যক্তি। তিনি আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়ার এবং তার শাস্তিতে গ্রেফতার হওয়ার আশঙ্কা করছেন। তাই তিনি বলছেন, 'যদি আকাশ থেকে কোনো ঘোষক ঘোষণা করে যে, হে লোক সকল! তোমরা সকলে জান্নাতে প্রবেশ করবে তবে একজন ব্যতীত! তাহলে আমার আশঙ্কা হয়, সেই ব্যক্তি আমিই হব! আর যদি কোনো ঘোষক ঘোষণা করে যে, হে লোক সকল! তোমরা সকলে জাহান্নামি তবে একজন ছাড়া! তাহলে আমি আশাবাদী আমিই সেই ব্যক্তি হব।'
আল্লাহ তাআলাকে ভয় করাটা তার প্রতি ঈমান রাখার অংশ। অন্তরে আল্লাহর ভয় ঢুকে গেলে বান্দা অন্য কোনো দিকে ভ্রুক্ষেপ করবে না। মুমিন তো একমাত্র আল্লাহ তাআলাকে ভয় করে। সে জানে, তার রিজিক আল্লাহর হাতে। তাই সে রিজিক বন্ধ হওয়ার ভয় করে না। সে জানে, জীবন-মৃত্যু আল্লাহর হাতে, তাই সে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ তার রুহ নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করে না। সে জানে, মানুষ সামান্য উপকরণ মাত্র। তাদের সকলের ফলাফল সেই সত্তার মাধ্যমে নির্ধারিত হয় যিনি কোনো বিষয়ে ফায়সালা করতে চাইলে শুধু বলেন, 'হও', সঙ্গে সঙ্গে তা হয়ে যায়।

চতুর্থ পাঠ
সত্য স্বীকার করে নেওয়াটা মর্যাদার বিষয়। সাহাসিকতারও। যদিও ভয় তার পিছু তাড়া করে বেড়ায়। সবচেয়ে উত্তম অজুহাত হলো নিজের ভুল স্বীকার করে নেওয়া। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট ভুল হলো—ভুলের পক্ষে সাফাই গাওয়া। ভুল হয়ে গেলে তা স্বীকার করে নিন। কারণ সৃষ্টিগতভাবে সকলেই মানুষ। মানুষ মাত্রই ভুল করে থাকে। আপনি সেইসব অভিজাত লোকের অন্তর্ভুক্ত হোন যাদের কাছে কেউ ভীত হয়ে বা লজ্জিত হয়ে আসলে তারা অহংকার করে না। বদান্যশীলদের শক্তি তাদেরকে প্রতিশোধের আহ্বান জানালেও তারা মানুষকে ক্ষমা করে দেয়। ভুল মানুষের স্বভাবের অংশ। এমনকি এটা মানুষের উত্তম বৈশিষ্ট্য। কারণ ভুলের কারণে মানুষ শিখে থাকে, পরিমার্জিত হয়। ভুলের মাধ্যমে আমরা নিজেদের মনুষ্য-প্রবৃত্তিকে স্মরণ করে থাকি। নিজেদের দুর্বলতার কথা বুঝতে পারি। তখন আমরা এর হিসাব-নিকাশ করতে পারি। ভুলের মাধ্যমে আমরা নিজেদেরকে পূর্ণ ভাবার অহমিকা থেকে এবং অহংকারের অন্ধকার থেকে বের করে নিয়ে আসতে পারি। গুনাহের কারণে বিনয় অবলম্বন কখনো আল্লাহর কাছে নেক-কাজের-ফলে-সৃষ্ট অহমিকা থেকে উত্তম হয়ে থাকে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- 'পবিত্র সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! যদি তোমরা গুনাহ না করতে তাহলে আল্লাহ তোমাদের বিলুপ্ত করে দিতেন এবং এমন সম্প্রদায় নিয়ে আসতেন যারা গুনাহ করত এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করত। আল্লাহ তখন তাদের ক্ষমা করে দিতেন।' [১]

পঞ্চম পাঠ
সময় ফুরিয়ে যাওয়ার পর আনীত ঈমান মানুষকে মুক্তি দিতে পারে না। আল্লাহ তাআলা বলেন- 'যেদিন আপনার রবের পক্ষ থেকে কোনো নিদর্শন আসবে, সেদিন যারা পূর্ব থেকে বিশ্বাস স্থাপন করেনি কিংবা স্বীয় বিশ্বাস অনুযায়ী কোনোরূপ সৎকর্ম করেনি তার ঈমান কোনো কাজে আসবে না।' [২]
ফিরআউনের ক্ষেত্রে এমনই ঘটেছিল। তারা সমুদ্রের ঢেউয়ে হাবুডুবু খাচ্ছিল। মৃত্যুযন্ত্রণা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। তখন সে বলে উঠেছিল— 'আমি ঈমান আনলাম যে, বনি ইসরাইল যার ওপর ঈমান এনেছে, তাকে ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। বস্তুত আমিও তারই অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত।' [১] এ ঈমান তার কোনো উপকারে আসেনি। এ কারণে আল্লাহ তাআলা ফিরআউনের এ কথার উত্তরে বলেন— 'এখন এ কথা বলছ! অথচ তুমি ইতিপূর্বে নাফরমানি করছিলে, এবং পথভ্রষ্টদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলে।' [২]
ফিরআউন জীবিত থাকাবস্থায় প্রকাশ্যভাবে আল্লাহকে অস্বীকার করেছে। হাদিসে উল্লিখিত আলোচ্য ব্যক্তিটি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী ছিল। তবে তার পাপাচার বেশি ছিল। আল্লাহ তাআলা চাইলে তার হকের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন। কিন্তু বান্দার হকের গুনাহ তিনি ক্ষমা করেন না; বরং বান্দা তা মাফ করে দিলে কিংবা তার হক আদায় করা হলেই কেবল তা মাফ হতে পারে। এটি আল্লাহ তাআলার ইনসাফ। তিনি অবশ্যই এই জুলুমের প্রতিশোধ নেবেন। এমনকি তিনি চতুষ্পদ জন্তুদের পরস্পর থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার ব্যবস্থা করবেন।

ষষ্ঠ পাঠ
ওসিয়ত পূরণ করা জীবিতদের ওপর মৃতের অধিকার। মাতা-পিতার ওসিয়ত পূরণ করাটা তাদের প্রতি এক ধরনের সদাচার। কিন্তু আমরা উল্লিখিত হাদিসে দেখতে পেলাম, সন্তানরা পিতাকে পুড়িয়ে তার হাড্ডি ছাই করে বাতাসে উড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তার ওসিয়ত পূরণ করেছে। এটি খুবই অবাক-করা আনুগত্য।
মৃত্যুর পর সন্তানেরা যেন তাদের প্রতি সদাচরণ করে এজন্য ওসিয়ত করে যাওয়ার প্রয়োজন হয়না। দুনিয়া থেকে চলে গেলেও সন্তানদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বাকি থাকে। শেষ রাত্রে পিতা-মাতার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করাটাও এক ধরনের সদাচারণ। দুআ কবুলের সময় তার জন্য দুআ করাটা সদাচারণ। কোনো অভাবগ্রস্তকে তাদের পক্ষ থেকে সাদাকাহ করাটা সদাচারণ। মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করাটাও মাতাপিতার প্রতি এক ধরনের সদাচরণ। কারণ মানুষ তখন আপনার প্রতিপালনকারীর জন্য দুআ করবে। মাতা-পিতার প্রতি প্রকৃত সদাচরণ শুরু হয় তাদের মৃত্যুর পরে। কারণ মৃত্যুর পর তাদের সকল আমল বন্ধ হয়ে যায়, তখন নেককার সন্তান দুআ করলেই তারা তা ভোগ করে।

টিকাঃ
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৪৮; সহিহ মুসলিম, ২৭৫৬
[১] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৭৪৯
[২] সুরা আনআম, আয়াত-ক্রম: ১৫৮
[১] সুরা ইউনুস, আয়াত-ক্রম: ৯০
[২] সুরা ইউনুস, আয়াত-ক্রম: ৯১
[৩] মুসনাদে আহমদ, হাদিস-ক্রম: ২৮২০। সনদ যঈফ।
[৪] সুরা নাযিয়াত, আয়াত-ক্রম: ২৪

📘 নবীজির ﷺ পাঠশালা 📄 ইউনুস আলাইহিস সালাম

📄 ইউনুস আলাইহিস সালাম


রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন— ইউনুস আলাইহিস সালাম তার সম্প্রদায়কে শাস্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি তাদেরকে জানিয়েছিলেন যে, তিনদিন পরই তাদের ওপর শাস্তি নেমে আসবে। এরপর তিনি তাদের ছেড়ে চলে যান। তখন তার জাতি সমস্ত সন্তান থেকে তাদের মায়েদের আলাদা করে দেয়। সকলে বের হয়ে আল্লাহর আশ্রয় নেয়। তার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করে। আল্লাহ তাআলা আজাব উঠিয়ে নেন।
অপরদিকে ইউনুস আলাইহিস সালাম আজাবের অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু তিনি কোনো আজাব দেখতে পেলেন না। তাদের রীতি ছিল, যদি কেউ মিথ্যা বলে আর আপন বক্তব্যের স্বপক্ষে কোনো দলিল-প্রমাণ পেশ না করতে পারে তাহলে সে হত্যার উপযুক্ত হবে। তাই তিনি রাগান্বিত হয়ে বের হয়ে যান। এক জাহাজের কাছে আসেন। তারা তাকে উঠিয়ে নেয়। জাহাজের লোকেরা তাকে চিনতে পারে। তিনি আরোহণ করার পর জাহাজটি থেমে যায়। জাহাজটি ডানে-বামে কোনো দিকেই চলছিল না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমাদের এই জাহাজের কী হলো?' তারা বলল, 'আমরা জানি না।' তিনি বললেন, 'কিন্তু আমি জানি। এ জাহাজে মনিব থেকে পলাতক এক গোলাম রয়েছে। আল্লাহর কসম, যতক্ষণ না তোমরা তাকে ফেলে দেবে ততক্ষণ এটা চলবে না।' তারা বলল, 'হে আল্লাহর নবী! আমরা আপনাকে ফেলে দিতে পারব না।' ইউনুস আলাইহিস সালাম বললেন, 'তোমরা লটারি করো, যার নাম আসবে তাকে নিক্ষেপ করা হবে।'
তারা লটারি করলে তিন-তিনবারই ইউনুস আলাইহিস সালাম-এর নাম আসে। তাকে ফেলে দেওয়া হলে আল্লাহ তাআলা তাকে মাছের মুখে ছেড়ে দেন। মাছ তাকে গিলে ফেলে। তাকে নিয়ে সমুদ্রের গভীরে চলে যায়। ইউনুস আলাইহিস সালাম সেখানে নুড়ি পাথরের ঘর্ষণের মতো তাসবিহ পাঠ শুনতে পান। এ সময় তিনি দুআ করেন। যার বর্ণনা কুরআনে উঠে এসেছে এভাবে—
'তখন তিনি অন্ধকারের মধ্যে (আল্লাহকে) ডেকে বলেন, আপনি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই; আপনি পবিত্রতম সত্তা, আমি গুনাহগার।' [১]
মাছ তাকে পশমবিহীন পাখি-ছানার মতো পেট থেকে উগরে ফেলে। আল্লাহ তাআলা সেখানে একটি লাউগাছ উৎপন্ন করেন। তিনি এর মাধ্যমে ছায়া গ্রহণ করতেন। এরপর লাউ গাছটি শুকিয়ে যায়। গাছটি শুকিয়ে যাওয়ার কারণে তিনি ক্রন্দন করতে থাকেন। আল্লাহ তাআলা ওহি প্রেরণ করে বলেন, 'একটি গাছ শুকিয়ে যাওয়ার কারণে তুমি ক্রন্দন করছ! কিন্তু এক লক্ষ বা তারও বেশি লোকদের ব্যাপারে তুমি ক্রন্দন করছ না! তাদেরকে তুমি ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিলে?' তিনি সেখান থেকে বের হন। এক বালকের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। বালকটি মেষ চড়াচ্ছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কোন সম্প্রদায়ের?' সে বলল, 'ইউনুস সম্প্রদায়ের।' তিনি বললেন, 'তুমি তাদেরকে গিয়ে সালাম জানাবে। বলবে যে, তুমি ইউনুসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছ।'
বালকটি বলল, 'যদি তুমি ইউনুস হয়ে থাকো তাহলে তো তুমি জানো, যে কেউ প্রমাণবিহীন মিথ্যা বললে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকে। তোমার উক্ত দাবির পক্ষে কে আমার সাক্ষী হবে?' তিনি বললেন, 'এই গাছ এবং এই স্থানটি তোমার সাক্ষী দেবে।' বালকটি ইউনুস আলাইহিস সালাম-কে বলল, 'তাদেরকে আদেশ করুন।' ইউনুস আলাইহিস সালাম গাছ ও সেই স্থানকে বললেন, 'তোমাদের কাছে বালকটি আসলে তোমরা তার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে।' গাছ ও স্থান বলল, 'হ্যাঁ।'
বালকটি তার সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গেল। সে বাদশাহর কাছে গিয়ে বলল, 'আমি নবী ইউনুসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। তিনি আপনাদেরকে সালাম জানিয়েছেন।' বাদশাহ বালকটিকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। বালকটি বলল, 'আমার সাক্ষী রয়েছে।' বাদশাহ তার সঙ্গে কয়েকজন লোক পাঠান। তারা সেই গাছ ও স্থানের কাছে পৌঁছে। বালকটি এগুলোকে সম্বোধন করে বলে, 'আমি তোমাদেরকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি, ইউনুস কি তোমাদেরকে সাক্ষী রাখেননি?' তারা বলল, 'হ্যাঁ।' লোকেরা ভীত হয়ে গেল। তারা বাদশাহর কাছে গিয়ে এর বিবরণ পেশ করল। বাদশাহ বালকটির হাত ধরে তাকে নিজের আসনে বসালেন। বালকটি ৪০ বছর তাদের দায়িত্ব পালন করে। [১]

প্রথম পাঠ
আল্লাহ তাআলা একজনকে অপরজনের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। নবীগণও মানুষ। তাদের একজন অন্যজনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ তাআলা নবীদেরকে নিষ্পাপ থাকার গুণ দান করেছেন। সেটা ধর্মীয় ক্ষেত্রে এবং ধর্মীয় বিধি-নিষেধ পৌঁছানোর ক্ষেত্রে। তেমনিভাবে চারিত্রিক ক্ষেত্রেও তারা নিষ্পাপ। কিন্তু পার্থিব বিষয়ে তারা মানুষ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় এসে পরাগায়ন করার প্রশ্নে বলেছিলেন, 'তোমরা পার্থিব বিষয়ে আমার চেয়ে অধিক অবগত।' বনি ইসরাইল গো-বৎসকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করায় মুসা আলাইহিস সালাম খুব রাগান্বিত হন, এমনকি নিজ ভাই হারুন আলাইহিস সালাম তাকে বলেন— 'হে আমার জননী-তনয় (ভাই), আমার শ্মশ্রু ও মাথার চুল ধরে টেনো না।' [১]
মনুষ্য-স্বভাবের কারণে ইউনুস আলাইহিস সালাম থেকে এ কাজ সংঘটিত হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে তাকে আজাবের সংবাদ দিয়েছিলেন। ইউনুস আলাইহিস সালাম তা জানতেন না। কারণ তিনি তো একজন মানুষ। কোনো অদেখা বিষয় সম্পর্কে তিনি জানেন না। তখন তিনি রাগান্বিত হয়ে বের হয়ে যান। সমুদ্রতীরে এসে জাহাজবাসীকে অনুরোধ করেন। জাহাজটি না চলায় লটারি করা হলে তিনবারই ইউনুস আলাইহিস সালাম-এর নাম আসে। তখন তিনি নিজেই সমুদ্রে ঝাঁপ দেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'তোমাদের কেউ যেন এটা না বলে যে, আমি ইউনুস ইবনে মাত্তার চেয়ে উত্তম।'

দ্বিতীয় পাঠ
তাওবা আজাব উঠিয়ে নেয়। দুআ তাকদির পরিবর্তন করে দেয়। আল্লাহ তাআলা নির্ধারণ করে রেখেছেন যে, দুআ ও তাওবা শাস্তিকে ফিরিয়ে দেয়। ইউনুস আলাইহিস সালাম-কে আল্লাহ তাআলার লিখিত প্রথম তাকদির সম্পর্কে সংবাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় তাকদির তিনি জানতেন না। দেখা যাবে বহু আজাব নেমে আসার মতো ছিল; কিন্তু তাওবার ফলে তা উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে।

তৃতীয় পাঠ
মানুষের স্বভাব বিভিন্ন ধরনের। নবীদের স্বভাব অন্য মানুষের তুলনায় ভিন্ন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বদরের বন্দীদের ব্যাপারে সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। তিনি তখন অত্যন্ত চমৎকার কথা বলেন। তিনি বলেন, 'হে আবু বকর, তুমি ঈসা ইবনে মারিয়ামের মতো। আর হেমর, তুমি নুহের মতো।' [৩] বদান্যশীল ব্যক্তি সবসময় বদান্যতা প্রদর্শন করে। কৃপণ ব্যক্তি চিরদিন কৃপণ রয়ে যায়। ঈমান মানুষের স্বভাবকে পরিমার্জিত করতে পারে কিন্তু একে সম্পূর্ণ নিঃশেষ করে দেয় না।

চতুর্থ পাঠ
জায়েজ ক্ষেত্রে লটারি করাটা ভিত্তিহীন বিষয় নয়। এটি নবীদের রীতি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধে বের হওয়ার সময় স্ত্রীদের মধ্যে লটারি করেছেন। [১] এর মাধ্যমে কোন স্ত্রীকে যুদ্ধে নিয়ে যাবেন—এ মধুর সমস্যার সমাধান হতো। লটারি এক চমৎকার সমাধান।

পঞ্চম পাঠ
আল্লাহ তাআলা অসীম ক্ষমতার অধিকারী। মানুষ-খেকো হিংস্র মাছকে নির্দেশ দেওয়া হয়। সে ইউনূস আলাইহিস সালাম-কে গিলে নেয়। আল্লাহ তাআলা চাইলে তাকে রক্ষা করতে পারেন। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও ইউনুস আলাইহিস সালাম-এর আমলের পার্থক্যের কারণে আল্লাহ কর্তৃক তাদের হেফাজতে পার্থক্য ঘটেছে। ইউনুস আলাইহিস সালাম আজাব না আসায় রাগান্বিত হয়ে বের হয়ে যান। আল্লাহ তাআলা তার জীবনকে রক্ষা করেছেন, তবে ঘটে যাওয়া কাজ থেকে পবিত্র করার জন্য তিনি তাকে সমস্যায় নিপতিত করেন।

ষষ্ঠ পাঠ
মানুষের সঙ্গে তাদের মর্যাদা অনুযায়ী আচরণ করুন। লক্ষ করুন, প্রথমবার লটারিতে নাম আসার সঙ্গে সঙ্গেই লোকেরা ইউনুস আলাইহিস সালাম-কে সমুদ্রে ফেলে দেয়নি। কারণ তিনি তাদের এক সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাতেম তাই-এর মেয়েকে সম্মান করেছিলেন। কারণ তার পিতা আরবের একজন মর্যাদাবান ও সম্মানিত লোেক ছিলেন। অভিজাত ও অনুগ্রহশীল ব্যক্তির পদস্খলন ঘটে গেলে তা হালকাভাবে গ্রহণ করুন।

সপ্তম পাঠ
মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকুন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, 'মুসলমান ভীরু হতে পারে, কৃপণ হতে পারে, কিন্তু মিথ্যুক হতে পারে না।' [২] ইউনুস আলাইহিস সালাম-এর সম্প্রদায় মিথ্যাকে এত অপছন্দ করত যে, এর শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছিল। যদি কাফের সম্প্রদায় মিথ্যাকে এমন অপছন্দ করতে পারে, তাহলে মুসলমান কীভাবে মিথ্যুক হতে পারে!

টিকাঃ
[১] সুরা আম্বিয়া, আয়াত-ক্রম: ৮৭
[১] মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস-ক্রম: ৩১৮৬৬। সনদ হাসান।
[১] সূরা ত্বহা, ২০:৯৪
[১] সুরা মায়িদাহ, আয়াত-ক্রম: ১১৮
[২] সুরা নূহ, ৭১: ২৬
[৩] মুসনাদে আহমদ, ৩৬৩২। যঈফ।
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৪১৪১
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ২৫১৮
[২] বায়হাকী, শুআবুল ঈমান, হাদিস-ক্রম: ৪৪৭২

ফন্ট সাইজ
15px
17px