📄 আসহাবুল উখদুদ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
'তোমাদের পূর্ববর্তী যামানায় এক বাদশাহ ছিল। তার ছিল এক জাদুকর। বার্ধ্যক্যে পৌঁছে সে বাদশাহকে বলল, “আমি তো বৃদ্ধ হয়ে পড়েছি, সুতরাং একজন বালককে আপনি আমার কাছে প্রেরণ করুন, যাকে আমি জাদুবিদ্যা শিক্ষা দেব।” অতঃপর জাদুবিদ্যা শিক্ষা দেয়ার জন্য বাদশাহ তার কাছে এক বালককে প্রেরণ করল। বালকের যাত্রাপথে ছিলেন এক ধর্মযাজক। বালক তার কাছে বসল এবং তার কথা শুনল। তার কথা যুবকের পছন্দ হলো। তারপর বালক জাদুকরের কাছে যাত্রাকালে সর্বদাই ধর্মযাজকের কাছে যেত এবং তার কাছে বসত। তারপর সে যখন জাদুকরের কাছে যেত তখন সে তাকে মারধর করত। ফলে জাদুকরের ব্যাপারে সে ধর্মযাজকের কাছে অভিযোগ করল। তখন ধর্মযাজক বললেন, “তোমার যদি জাদুকরের ব্যাপারে ভয় হয় তবে বলবে, আমার পরিবারের লোকেরা আমাকে আসতে দেয়নি। আর যদি তুমি তোমার গৃহকর্তার ব্যাপারে আশংকাবোধ করো তবে বলবে, জাদুকর আমাকে বিলম্বে ছুটি দিয়েছে।” এমনিভাবে চলতে থাকাবস্থায় একদিন হঠাৎ সে একটি ভয়ানক হিংস্র প্রাণীর সম্মুখীন হলো, যা লোকেদের পথ আটকিয়ে রেখেছিল। এ অবস্থা দেখে সে বলল, "আজই জানতে পারব, জাদুকর উত্তম না ধর্মযাজক।” অতঃপর একটি পাথর হাতে নিয়ে বলল, “হে আল্লাহ! যদি জাদুকরের চাইতে ধর্মযাজক আপনার কাছে পছন্দনীয় হয়, তবে এ পাথরে আঘাতে হিংস্র প্রাণীটি নিঃশেষ করে দিন, যেন লোকজন চলাচল করতে পারে।” অতঃপর সে হিংস্র প্রাণীকে লক্ষ্য করে পাথর ছুঁড়ল এবং সেটাকে মেরে ফেলল। ফলে লোকজন আবার যাতায়াত শুরু করল। এরপর সে ধর্মযাজকের কাছে এসে তাকে সম্পূর্ণ ঘটনা বলল। ধর্মযাজক বলল, “বেটা! আজ তুমি আমার থেকেও শ্রেষ্ঠ। তোমার মর্যাদা এ পর্যন্ত পৌঁছেছে যা আমি দেখতে পাচ্ছি। তবে শীঘ্রই তুমি পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। যদি পরীক্ষার মুখোমুখি হও তবে আমার কথা গোপন রাখবে।"
এদিকে বালক আল্লাহর হুকুমে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে আরোেগ্য দান করতে লাগল এবং লোকদের সমুদয় রোগ-ব্যাধির নিরাময় করতে লাগল। বাদশাহর পরিষদবর্গের এক লোক অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। লোকটি যুবকের ব্যাপারে শুনতে পেয়ে বহু হাদিয়া ও উপঢৌকন নিয়ে তার কাছে এল এবং বলল, “তুমি যদি আমাকে আরোগ্য দান করতে পারো তবে এসব মাল আমি তোমাকে দিয়ে দেব।” এ কথা শুনে বালক বলল, “আমি তো কাউকে আরোগ্য দান করতে পারি না। আরোগ্য তো দেন আল্লাহ তাআলা। তুমি যদি আল্লাহর ওপর ঈমান আনো তবে আমি আল্লাহর কাছে দুআ করব, আল্লাহ তোমাকে আরোগ্য দান করবেন।” তারপর সে আল্লাহর ওপর ঈমান আনল। আল্লাহ তাআলা তাকে রোগমুক্ত করে দিলেন। এরপর সে বাদশাহর কাছে এসে অন্যান্য দিনের মতোই বসল। বাদশাহ তাকে জিজ্ঞেস করল, "তোমার দৃষ্টিশক্তি কে ফিরিয়ে দিল?” সে বলল, "আমার রব।” এ কথা শুনে বাদশাহ্ তাকে আবার প্রশ্ন করল, "আমি ছাড়া তোমার অন্য কোনো রব আছে?” সে বলল, "আমার ও আপনার সকলের রবই আল্লাহ।” অতঃপর বাদশাহ তাকে পাকড়াও করে অবিরতভাবে শাস্তি দিতে লাগল, অবশেষে সে ঐ বালকের সন্ধান দিয়ে দিল।
বালকটিকে নিয়ে আসা হলো। বাদশাহ তাকে বলল, “প্রিয় বেটা! তোমার জাদু এ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, তুমি অন্ধ ও কুষ্ঠ রোগীকেও নিরাময় করতে পার!” বালক বলল, "আমি কাউকে নিরাময় করতে পারি না। নিরাময় করেন আল্লাহ।” এ কথা শুনে বাদশাহ এবার বালকটিকে শাস্তি দিতে লাগল। বালক শাস্তি বরদাশত করতে না পেরে অবশেষে ধর্মযাজকের (দরবেশের) কথা বলে দিল। এরপর ধর্মযাজককে ধরে আনা হলো এবং তাকে বলা হলো তুমি তোমার দ্বীন থেকে ফিরে এসো। তিনি অস্বীকার করলেন। ফলে তার মাথার তালুতে করাত রেখে সেটাকে টুকরো টুকরো করে ফেলা হলো। এতে তার মাথা দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। অবশেষে ঐ বালকটিকে আনা হলো এবং তাকেও বলা হলো-তুমি তোমার দ্বীন থেকে ফিরে এসো। সেও অস্বীকার করল। অতঃপর বাদশাহ তাকে তার কিছু সহচরের হাতে অর্পণ করে বলল, “তোমরা তাকে অমুক পাহাড়ে নিয়ে যাও এবং তাকেসহ পাহাড়ে আরোহণ করো। পর্বত শৃঙ্গে পৌঁছার পর সে যদি তার ধর্ম থেকে ফিরে আসে তাহলে তো ভালো। নতুবা তাকে সেখান থেকে ছুঁড়ে মারবে।” তারপর তারা তাকে নিয়ে গেল এবং তাকেসহ পর্বতে আরোহণ করল। বালক তখন দুআ করে বলল, “হে আল্লাহ! তোমার যেভাবে ইচ্ছা আমাকে তাদের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষ করো।” তৎক্ষণাৎ তাদেরকেসহ পাহাড় কেঁপে উঠল। ফলে তারা পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়ল। আর সে হেঁটে হেঁটে বাদশাহর কাছে চলে এল।
তাকে দেখে বাদশাহ তাকে প্রশ্ন করল, "তোমার সাথিরা কোথায়?” সে বলল, "আল্লাহ আমাকে তাদের চক্রান্ত থেকে হেফাজত করেছেন।” বাদশাহ আবারও তাকে তার কতিপয় সহচরের হাতে সমর্পণ করে বলল, “তোমরা তাকে নিয়ে নৌকায় তুলবে। তারপর মাঝ সমুদ্রে যাবার পর সে যদি তার দ্বীন (ধর্ম) থেকে ফিরে আসে তাহলে তো ভালো, নতুবা তাকে সমুদ্রে ফেলে দিয়ো।" তারা তাকে সমুদ্রে নিয়ে গেল। এবারও সে দুআ করে বলল, “হে আল্লাহ! তোমার যেভাবে ইচ্ছা তুমি আমাকে তাদের চক্রান্ত থেকে রক্ষা করো।” তৎক্ষণাৎ নৌকাটি তাদেরসহ উল্টে গেল। ফলে তারা সকলেই পানিতে ডুবে গেল। আর বালক হেঁটে হেঁটে বাদশাহর কাছে চলে এল। তাকে দেখে বাদশাহ প্রশ্ন করল, “তোমার সঙ্গীগণ কোথায়?” সে বলল, "আল্লাহ আমাকে তাদের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করেছেন।”
অতঃপর সে বাদশাহকে বলল, "তুমি আমাকে হত্যা করতে পারবে না যে পর্যন্ত না আমার নির্দেশিত পদ্ধতি অবলম্বন করবে।” বাদশাহ বলল, “সে আবার কী?” বালক বলল, “একটি ময়দানে তুমি লোকদেরকে জমায়েত করো। অতঃপর একটি কাষ্ঠের শূলীতে আমাকে উঠিয়ে আমার তিরদানি থেকে একটি তির নিয়ে সেটাকে ধনুকের মধ্যে রাখবে। এরপর 'বালকের প্রভুর নামে' বলে আমার দিকে তির নিক্ষেপ কোরো। এভাবে যদি করো তবেই তুমি আমাকে মারতে পারবে।” তার কথা অনুসারে বাদশাহ লোকদেরকে এক মাঠে জমায়েত করল এবং তাকে একটি কাষ্ঠের শূলীতে চড়াল। অতঃপর তার তিরদানি থেকে একটি তির নিয়ে সেটাকে ধনুকের মধ্যে রেখে 'বালকের প্রভুর নামে' বলে তার দিকে তা নিক্ষেপ করল। তির তার কানের নিম্নাংশে গিয়ে বিধল। অতঃপর সে তিরবিদ্ধ স্থানে নিজের হাত রাখল এবং সঙ্গে সঙ্গে প্রাণ ত্যাগ করল। এ দৃশ্য দেখে রাজ্যের লোকজন বলে উঠল, “আমরা এ বালকের রবের ওপর ঈমান আনলাম।” এ সংবাদ বাদশাহকে জানানো হলো এবং তাকে বলা হলো, “লক্ষ করেছেন কি? আপনি যে পরিস্থিতি উদ্ভবের আশঙ্কা করছিলেন, আল্লাহর শপথ! সে আশঙ্কাজনক পরিস্থিতিই আপনার মাথার উপর চেপে বসেছে। সকল মানুষই বালকের রবের উপর ঈমান এনেছে। এ দেখে বাদশাহ্ সকল রাস্তার মাথায় গর্ত খননের নির্দেশ দিল। গর্ত খনন করা হলো এবং ওগুলোতে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করা হলো। অতঃপর বাদশাহ আদেশ করল, “যে লোক তার ধর্মমত বর্জন না করবে তাকে ওগুলোতে নিক্ষেপ করা হবে।” কিংবা সে বলল, "তাকে বলবে, যেন সে অগ্নিতে প্রবেশ করে।” লোকেরা তাই করল। পরিশেষে এক নারী একটি শিশু নিয়ে অগ্নিগহ্বরে পতিত হবার ব্যাপারে ইতস্তত করছিল। এ দেখে দুধের শিশু তাকে (মাকে) বলল, “ওহে আম্মাজান! সবর করুন, আপনি তো সত্য দ্বীনের (ধর্মের) উপর প্রতিষ্ঠিত আছেন।” [১]
প্রথম পাঠ
দুনিয়া বড় আজব। কল্পনাতীত জায়গায়ও গোমরাহি তির হয়। কুফরির কারণে মহাপ্লাবন নবীপুত্রকে ডুবিয়ে দিয়েছে। কুফরির কারণে নবীর স্ত্রীর ওপর সম্প্রদায়ের অনুরূপ আজাব নেমে এসেছে। নবীর পিতা মূর্তি পুজায় লিপ্ত! তিনি স্বচক্ষে দেখছেন তার ছেলেকে আগুনে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। আবার যেখান থেকে হেদায়েতের আশা করা যায়নি সেখান থেকেও হেদায়েতের আলো ফুটে উঠেছে। আযরের ঔরস থেকেই ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বের হয়েছেন! ফিরআউনের প্রাসাদ থেকে মুসা আলাইহিস সালাম বের হয়েছেন! যে ফিরআউন বলেছিল— 'আমি তোমাদের সবচেয়ে বড় রব।' তার ঘর থেকে ইতিহাসের এক বিদূষী নারী আসিয়া বের হয়েছেন! মহান পবিত্র সত্তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের কারণে তাকে শূলীতে চড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
যে বালককে বাদশাহ জাদুকর বানাতে চেয়েছিল সে দায়ী হয়ে যায়। যে শিশুর মাধ্যমে বাদশাহ মানুষকে গোমরাহ করতে চেয়েছিল সে-ই মানুষের হেদায়েতের মাধ্যম হয়ে ওঠে। যে শিশুর মাধ্যমে বাদশাহ রাজত্ব মজবুত করতে চেয়েছিল সে-ই তার রাজত্ব নড়বড়ে করে দেয়। যে শিশুর মাধ্যমে বাদশাহ নিজের শক্তি জাহির করতে চেয়েছিল সে-ই তার দুর্বলতা প্রকাশ করে দেয়। কোনো ঘরই একেবারে নিখুঁত হিসাবে চলে না। ঘরে কেবল মানুষ বসবাস করে কিন্তু তাদের অন্তরগুলো তো আল্লাহর হাতে। যেখানে আমরা ধারণা করি যে, হেদায়াত ছাড়া কিছুই নেই সেখানে তিনি গোমরাহ করতে পারেন আর যেখানে আমরা ধারণা করি যে, গোমরাহি ব্যতীত কিছু নেই সেখান থেকে তিনি হেদায়েত দিতে পারেন।
দ্বিতীয় পাঠ
আপনিও চান আমিও চাই, কিন্তু আল্লাহ যা চান তা-ই বাস্তবায়িত হয়।
কে ভেবেছিল-এই বালক বাদশাহর রাজত্বকে নড়বড়ে করে দেবে! কে ভেবেছিল-মদপ্রেমী হামযাহ একসময় আল্লাহর সিংহ হয়ে যাবেন! কে ভেবেছিল-যিনি উহুদে মুসলমানদের সাময়িক পরাজযয়ের কারণ ছিলেন অচিরেই সেই তিনিই সাইফুল্লাহ (আল্লাহর সিংহ) হয়ে যাবেন! কে ভেবেছিল-মক্কা বিজয়ের দিন যাঁর রক্ত হালাল ঘোষণা করা হয়েছিল সেই ইকরামা অচিরেই ইয়ারমুকের নেতা এবং শহিদ হয়ে যাবেন! কে ভেবেছিল-শত মানুষের হন্তারককে জান্নাতে প্রবেশ করানোর জন্য আল্লাহ তাআলা ভূখণ্ডকে সংকুচিত করে দেবেন! কে ভেবেছিল-যেই উমর খেজুরের মাধ্যমে উপাস্য বানিয়ে তার ইবাদত করতেন এবং তা আবার খেয়ে ফেলতেন তিনিই একসময় ইতিহাসের অন্যতম ন্যায়-পরায়ণ শাসক হয়ে যাবেন! আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তো ইতিহাসের চেয়েও বড় ব্যক্তি ছিলেন, তার সঙ্গে কাউকে তুলনা দেওয়া যায় না। কে ভেবেছিল—যে ব্যক্তি হামযাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে হত্যা করেছে অচিরেই সে মুসাইলামাতুল কাজ্জাবকে হত্যা করবে!
তৃতীয় পাঠ
আল্লাহ তাআলা কোনো যুদ্ধ সংঘটিত করতে চাইলে তার জন্য এমন অস্ত্র নির্বাচন করেন, আমরা হতভম্ব হয়ে যাই। একটি ছোট্ট বালক তখন একটি রাজত্ব ধ্বংস করে ফেলে! সাধারণ পানি পুরো জাতিকে ডুবিয়ে দেয়! সমুদ্র ধ্বংস করে ফেলে আস্ত এক বাহিনীকে! সামান্য এক মশা নমরুদকে অপদস্থ করে ফেলে! ভূপৃষ্ঠ কারুনকে গিলে ফেলে! বৃষ্টি পরাক্রমশালী সম্প্রদায়কে পরাভূত করে দেয়! বাতাস জালেমদেরকে টেনে নিয়ে যায়! ছোট্ট এক পাখি আবরাহাকে পিষে মারে! আর এতসব কিছু করতে আল্লাহ তাআলার একটি শব্দের বেশি কিছু খরচ হয় না। তিনি শুধু বলেন, 'হও!', হয়ে যায়।
বিশ্বাস রাখুন, যিনি রাজত্বকে ধ্বংস করে দিলেন, তিনি আপনার দুঃখ দূর করে দিতে সক্ষম। যিনি আস্ত এক বাহিনীকে তছনছ করে দিতে পারেন তিনি আপনার নিরাশা দূর করে দিতে সক্ষম। যিনি অহংকারী সম্প্রদায় এবং হস্তিবাহিনীকে পরাজিত করে দিলেন তিনি আপনার কষ্ট দূর করতে সক্ষম। শুধু তাকে দেখাতে হবে যে, আপনি তার জন্য, তাহলে তিনিও আপনাকে দেখাবেন যে, তিনি আপনার জন্য।
চতুর্থ পাঠ
ঈমানের বিষয়টি অত্যন্ত আশ্চর্যজনক। কেউ গোটা জীবন কুফরি এবং গোমরাহির মধ্যে কাটিয়ে দেয়, আর পরমুহূর্তেই ঈমান তার সবকিছু মুছে ফেলে। তার অবস্থা এমন হয়ে যায় যে, সে যেন কুফর কী জিনিস জানেই না! মানুষেরা যুগের পর যুগ ধরে বাদশাহর পূজা করত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তারা বাদশাহ ছাড়া রব বলে আর কাউকে জানত না। কিন্তু শুধুমাত্র একটি বালকের মৃত্যুতে তারা কুফর থেকে ঈমানের পথে চলে আসে। তাদের জন্য গর্ত খোঁড়া হয়, আগুন প্রজ্জ্বলিত করা হয়, জ্বলন্ত আগুনে তাদেরকে নিক্ষেপ করা হয়, কিন্তু কোনো জিনিসই তাদেরকে ঈমান থেকে টলাতে পারেনি। যেন তাদের জন্মই হয়েছে ঈমানের ওপর এবং ঈমান নিয়ে তারা জীবনযাপন করেছে।
বাদশাহর এই অন্ধ সভাসদ ছিল তারই এক অনুচর। মানুষকে বাদশাহর ইবাদত করার জন্য এবং তাদের কাছে কুফরকে মহিমান্বিত করে তোলার জন্য সে গোটা জীবন ব্যয় করেছে। তারপর ঈমান আনায় তার মাথায় করাত ধরা হয়েছে, সত্য ধর্ম পরিত্যাগ না করায় তাকে দুটুকরো করে ফেলা হয়েছে। ফিরআউনের জাদুকরদেরকে মিশরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পূর্বপরিচিতির সূত্র ধরে আনা হয়। তাদের অনেকেই ফিরআউনের সেবক ও সভাসদ ছিল। ফিরআউনের আঙুলের ইশারায় তারা যে-কোনো কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ত। কিন্তু যখন তাদের মধ্যে ঈমানের নুর এল, তারা সকলেই মুসা আলাইহিস সালাম এবং হারুন আলাইহিস সালাম-এর রবের উপর ঈমান আনল। তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ল। ফিরআউন আড়াআড়িভাবে তাদের হাত-পাঁ কেটে দেওয়ার এবং শূলীতে চড়ানোর হুমকি দেয়। তারা কি তখন মাথা নত করে দিয়েছিল? এক মুহূর্তের ঈমান তাদেরকে আমূল বদলে দিয়েছিল।
তারা ফিরআউনকে বলেছিল- 'তুমি যা ইচ্ছা করতে পার। যা করবার পার্থিব এই জীবনেই তো তুমি করবে।' [১]
সকালে তারা জাদুকর ছিল আর সন্ধ্যায় তারা খেজুরগাছের উপর ঝুলন্ত অবস্থায় শহিদ হয়ে যায়। উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কথাই ধরুন না! মানুষকে আল্লাহর পথে বাধা দেওয়ার ব্যাপারে তিনি ছিলেন ইতিহাস-প্রসিদ্ধ। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দুআ তার ব্যাপারে কবুল হয়ে যায়। নবীজি দুআ করেছিলেন, 'হে আল্লাহ! আবু জেহেল ও উমর ইবনুল খাত্তাবের মধ্যে যে আপনার কাছে প্রিয় তার মাধ্যমে ইসলামকে শক্তিশালী করুন।' [১]
ঈমান আনার পর তিনি (হুদায়বিয়ার সন্ধির পর) গর্জে উঠেছিলেন। বলেছিলেন, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা কি হকের ওপর নই আর তারা কি বাতিলের উপর নয়?' [২] রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাবে বলেছিলেন, 'অবশ্যই।' তখন তিনি বলেছিলেন, 'তাহলে কেন আমরা আমাদের ধর্মের এই অপমান মেনে নেব?' এভাবেই এক মুহূর্তে তিনি কুফরের শীর্ষ চূড়া থেকে ঈমানের শীর্ষ চূড়ায় উঠে আসেন। এই ঈমান অত্যন্ত আশ্চর্যজনক। এটা মানুষের মনে কী না করতে পারে!
পঞ্চম পাঠ
ফুকাহায়ে কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আউলিয়াদের কারামত সত্য। কেবল গোঁড়ামি বশতই তা অস্বীকার করা যেতে পারে। দ্বীন যদিও আমাদেরকে এই কথা বলে যে, গোটা বিশ্বজগত আল্লাহ তাআলার নিয়ন্ত্রণাধীন। কিন্তু এর বিপরীতে এটি একটি বাস্তবভিত্তিক ধর্ম। যা আমাদেরকে সামর্থ্য অনুযায়ী উপকরণ গ্রহণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে থাকে। তাই কোনো বিষয় হাদিসের মাধ্যমে প্রমাণিত হলে আমরা সেই কারামতকে সত্য বলে বিশ্বাস করব। আর তা শুধু জনশ্রুতি হলে মানুষের কাছে বর্ণনা করব না। অন্যথায় মানুষকে বোকামির পথে চালিত করা হবে।
সহিহ হাদিসের মাধ্যমে বহু আউলিয়া কেরামের কারামত সংঘটিত হওয়ার কথা জানা যায়। পারিভাষিক দৃষ্টিকোণ থেকে কারামাত স্বভাববিরুদ্ধ এক বিষয়; আল্লাহ তাআলা যা নেককার বান্দাদের মাধ্যমে সংঘটিত করে থাকেন। কারামত শুধু আউলিয়া কেরামের সঙ্গে ঘটে থাকে আর মুজিযা শুধুমাত্র নবীদের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। ছোট বালকের হাতে সংঘটিত এ ঘটনাটি কারামাত; ঈসা আলাইহিস সালাম-এর মুজিযার সঙ্গে যার সাদৃশ্য রয়েছে। বালকটি কুষ্ঠ এবং অন্ধ ব্যক্তিকে সুস্থ করে দিত। আল্লাহ তাআলার হুকুমে বহু রোগের চিকিৎসা করত।
মিশরের নীল নদের ব্যাপারে উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কারামত রয়েছে। ইতিহাসবিদগণ তা বর্ণনা করেছেন। মিশর বিজয়ের হওয়ার পর সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কাছে এসে বলল, 'আমির! আমাদের এই নীল নদের এক রীতি রয়েছে, সেই রীতি পালন ব্যতীত তা প্রবাহিত হয় না।' তিনি বললেন, 'সেটা আবার কী?' তারা বলল, 'এই মাসের তেরো তারিখ হলে আমরা এক কুমারী মেয়ের পিতাকে ধন-সম্পদ দিয়ে সন্তুষ্ট করে মেয়েকে সবচেয়ে সুন্দর পোশাক এবং অলংকার পরিধান করিয়ে নীল নদে ফেলে দেবো।' আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'ইসলামে এর কোনো ভিত্তি নাই। ইসলাম জাহেলি যুগের এসব বিষয়কে ধ্বংস করে দেয়।' কিন্তু তারা তিন মাস অপেক্ষা করল। নীলনদ আর প্রবাহিত হলো না। তখন আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু নীল নদ এবং মিশরবাসীদের অবস্থা জানিয়ে উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কাছে চিঠি লিখেন।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু উত্তরে লিখে পাঠান, 'নিশ্চয়ই তুমি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছ। ইসলাম পূর্ববর্তী সকল কুসংস্কার বাতিল ঘোষণা করেছে। আমি এই চিঠির মধ্যে তোমার কাছে একটি চিরকুট পাঠালাম, তুমি সেটি নীল নদে রাখবে।'
আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন নীল নদের প্রতি উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু'র চিঠি খুললেন, তিনি দেখতে পেলেন তাতে লেখা রয়েছে-
আল্লাহর বান্দা উমর ইবনুল খাত্তাবের পক্ষ থেকে মিসরের নীল নদের প্রতি পর সমাচার এই যে, যদি তুমি তোমার নির্দেশে প্রবাহিত হয়ে থাক তাহলে তোমার কাছে আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই। আর যদি তুমি আল্লাহর হুকুমে প্রবাহিত হয়ে থাক তাহলে আমরা তোমাকে প্রবাহিতকারী সত্তার কাছে নিবেদন করছি, তিনি যেন তোমাকে প্রবাহিত করে দেন।
আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু চিঠিটি নীল নদে নিক্ষেপ করেন। আল্লাহ তাআলা সঙ্গে সঙ্গে দরিয়ায়ে নীলকে প্রবাহিত করে দেন। এমনকি সে রাতেই পুরো নদী পানিতে ভরে ওঠে। তখন থেকে নিয়ে আজ অবধি মিশরের নীল নদ আর কখনোই শুকায়নি। উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র আরেকটি কারামত হলো-মদিনায় একবার ভূমিকম্প দেখা দেয়, উমর তখন ভূপৃষ্ঠকে লাঠি দ্বারা আঘাত করে বলেন-'হে জমিন! থেমে যাও! আমি কি তোমার উপর ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করিনি?' সঙ্গে সঙ্গে ভূকম্পন থেমে যায়।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু'র আরও একটি কারামত হলো- এক ব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কাছে এসে বলল, 'আমার হাতে এক জখম হয়েছে, উমর জীবিত থাকাবস্থায় আমি তার কাছে একই জখম নিয়ে গিয়েছিলাম। তিনি আমার হাতে তার হাত রেখে সুরা ফাতেহা তেলাওয়াত করেন, এতে আমি সুস্থ হয়ে যাই।' ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন তার হাতে আপন হাত রাখেন এবং সুরা ফাতিহা তেলাওয়াত করেন। কিন্তু সে সুস্থতা লাভ করল না। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু এবার বললেন, 'ফাতিহা তো সেই ফাতেহাই রয়েছে কিন্তু উমরের হাত কোথায়!'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু'রও কারামত রয়েছে। উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সময় একবার অনাবৃষ্টির ফলে শষ্যভূমি অনুর্বর হয়ে যায়। উমর তখন জনগণকে নিয়ে সালাতুল ইসতিসকার জন্য বের হন। সঙ্গে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু-ও ছিলেন। তিনি তার বাহু আঁকড়ে ধরেন এবং বলেন, 'হে আল্লাহ আমরা আপনার নবীর চাচার মাধ্যমে আপনার নৈকট্য কামনা করছি। কেননা আপনি বলেছেন আর আপনার কথাই সত্য-
প্রাচীরের ব্যাপার—সেটি ছিল নগরের দুজন পিতহীন বালকের। এর নিচে ছিল তাদের গুপ্তধন এবং তাদের পিতা ছিল সৎকর্মপরায়ণ। [১]
'তাদের পিতা সৎ হওয়ার কারণে তাদেরকে রক্ষা করা হয়েছিল। অতএব, হে আল্লাহ, আপনি নবীর মাধ্যমে তার চাচাকে রক্ষা করুন। তিনি আমাদেরকে আপনার কাছে সুপারিশকারী এবং ক্ষমা প্রার্থনাকারী হিসেবে নিয়ে এসেছেন।'
এরপর তিনি লোকজনকে উদ্দেশ্য করে বলেন- 'আর হে আমার কওম! তোমাদের রবের কাছে তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা করো। অতঃপর তারই দিকে মনোনিবেশ করো; তিনি আসমান থেকে তোমাদের উপর বৃষ্টিধারা প্রেরণ করবেন।' [১]
এরপর আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু দুআ করতে থাকেন আর তার চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হতে থাকে। একসময় মেঘ তৈরি হয়। তা থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হয়। এমনকি বৃষ্টির পানি হাঁটু পর্যন্ত উঠে যায়। মানুষ তখন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কাছে এসে তার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়ে বলতে লাগল, 'হে হারামাইনের পানি সিঞ্চনকারী! আপনার জন্য মুবারকবাদি।' তখন বৃষ্টি থামে। এ ধরনের আরও বহু ঘটনা রয়েছে।
ষষ্ঠ পাঠ
জাহান্নামকে কামনা বাসনা দ্বারা বেষ্টন করা হয়েছে আর জান্নাতকে কষ্টদায়ক জিনিস দ্বারা বেষ্টন করা হয়েছে। [২]
জান্নাতের রাস্তা অত্যন্ত কঠিন তবে আল্লাহ তাআলা যাকে চান তার জন্য তা সহজ করে দেন। বিশ্বজগতের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার রীতি হলো, এই ধর্মের অনুসারীরা কিছুটা কষ্ট এবং শাস্তি ভোগ করবে। এর কারণ তাদেরকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার অক্ষমতা নয়; বরং আল্লাহ তাআলা জালেমকে একটু ছাড় দিতে চান এবং মুমিনকে উঁচু করতে চান।
নবুওয়াত লাভের পর খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম-কে ওয়ারাকা ইবনে নাওফালের কাছে নিয়ে যান তখন ওয়ারাকা নবীজি বলেন, 'হায়! যখন তোমার সম্প্রদায় তোমাকে বের করে দেবে, তখন যদি আমি জীবিত থাকতাম, অবশ্যই আমি তোমাকে সবরকমের সহযোগিতা করতাম।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করেন, 'তারা কি আমাকে বের করে দেবে!' তিনি বলেন, 'তুমি যে জিনিস নিয়ে এসেছ তা নিয়ে যারাই এসেছে তাদের সঙ্গে শত্রুতা করা হয়েছে।'
ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-কে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছে। ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম-কে করাত দ্বারা বিদীর্ণ করে ফেলা হয়েছে। এক নবীকে তার সম্প্রদায় পাথর দ্বারা আঘাত করতে করতে রক্ত ঝরিয়ে ফেলেছে। তিনি রক্ত মুছতে মুছতে বলছেন, 'হে আমার রব, আপনি আমার সম্প্রদায়কে ক্ষমা করে দিন। তারা তো জানে না।' উপরোল্লিখিত ঘটনায় মুমিনরা যে শাস্তির সম্মুখীন হয়েছে এ যেন লম্বা এক শেকলের ছোট্ট আংটা। অর্থাৎ শুরু থেকে চলে আসা ধারাবাহিকতা।
এই দ্বীন তো কেবল রক্ত এবং কুরবানির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিলাল ইবনে রাবাহের সঙ্গে উমাইয়া ইবনে খালাফ যে আচরণ করেছে উদাহরণ হিসেবে সেটিই যথেষ্ট। বিলাল বলেন, 'আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে হাজির হলাম। তখন তিনি নিজ চাদরকে বালিশ বানিয়ে কাবাঘরের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। আমরা মুশরিকদের পক্ষ থেকে কঠিন নির্যাতন ভোগ করছিলাম। তাই আমি বললাম, “আপনি কি আল্লাহর কাছে দুআ করবেন না?” তখন তিনি উঠে বসলেন এবং তার চেহারা লাল হয়ে গেল। বললেন, “তোমাদের পূর্বের ঈমানদারদের মধ্যে কারও কারও শরীরের হাড় পর্যন্ত তামাম গোশত ও শিরা উপশিরাগুলো লোহার চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে বের করে ফেলা হতো। কিন্তু এসব নির্যাতনও তাদেরকে দ্বীন থেকে বিমুখ করতে পারত না। তাদের মধ্যে কারও মাথার মাঝখানে করাত রেখে তাকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলা হতো। কিন্তু এ নির্যাতনও তাদেরকে দ্বীন থেকে ফেরাতে পারত না। আল্লাহর কসম, আল্লাহ তাআলা অবশ্যই দ্বীনকে পরিপূর্ণ করবেন। তখন একজন উস্ট্রারোহী সানআ থেকে হাযারামাউত পর্যন্ত একাই সফর করবে। আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সে ভয় করবে না এবং তার মেষপালের উপর নেকড়ের আক্রমণ ছাড়া সে অন্য কিছুর ভয় করবে না। কিন্তু তোমরা তড়িগড়ি করছ।”
সপ্তম পাঠ
কখনো উস্তাদের তুলনায় ছাত্রের যোগ্যতা বেশি হয়। আমরা যেসব আলেমের কথা জানি তারা অধিকাংশিই এমন উস্তাদের ছাত্র যাঁদেরকে আমরা চিনি না। আপনার ছাত্র আপনার চেয়ে অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন হলে একে সমস্যা মনে করবেন না। সে যদি আপনার চেয়েও অধিক খ্যাতি লাভ করে তবে এটা আপনার জন্য একটি সাদাকায়ে জারিয়া। উপরোল্লিখিত ঘটনায় ছাত্র তার উস্তাদকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। পাহাড়ে ওই ধর্মযাজকের মৃত্যু হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু বালকটি প্রতিবারই নিজ পায়ে হেঁটে বাদশাহর কাছে ফিরে এসেছে। ধর্মযাজক মৃত্যুভয়ে বালককে তার সন্ধান দিতে নিষেধ করেছিলেন, আর বালকটি নিজেকে হত্যা করার পদ্ধতি নিজেই বাদশাহকে বলে দিয়েছিল! ধর্মযাজক যেহেতু বালককে এই পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছিলেন তাই তিনি অবশ্যই এর সওয়াব পাবেন। মনে রাখতে হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা নিজেদের চেয়ে বড় না হতে পারব, যতক্ষণ আমরা অন্যের মাধ্যমে হলেও হকের বিজয়ের আশা না করতে পারব কিংবা অন্যের মাধ্যমে হলেও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা না চাইব ততক্ষণ পূর্ণতায় পৌঁছুতে পারব না। নিজের সাওয়াবের অংশের ব্যাপারে ভীত হবেন না। এটা এমন এক দ্বীন যে দ্বীনের অনুসারী কাউকে ভালো কাজের সন্ধান দিলে সে ওই কাজ সম্পাদনকারীর অনুরূপ সওয়াব লাভ করে থাকে।
অষ্টম পাঠ
অভাবগ্রস্তকে সাহায্য করুন, যদিও তা সামান্য হয়। অন্যের ক্ষুধা নিবারণ করুন, যদিও তা একটুকরো রুটির মাধ্যমে হয়। অন্যের ব্যথা হালকা করুন, যদিও তা সামান্য ঔষধের মূল্যের মাধ্যমে হয়। বিবাদ মিটিয়ে দিন, যদিও তা একটি মিষ্টি-কথার মাধ্যমে হয়। সরল, সহজ, সাধারণ এবং প্রয়োজনগ্রস্ত ব্যক্তিদের প্রতি একটু দৃষ্টিপাত আপনাকে দাওয়াত থেকে বিমুখ করে দেবে না; বরং এটাই হলো দাওয়াত। ঘটনায় উল্লিখিত বালকের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বড় কাজ নিতে চেয়েছেন। মানুষকে বাদশাহর ইবাদত-উপাসনা থেকে বের করে আল্লাহ তাআলার উপাসনার দিকে নিয়ে আসতে চেয়েছেন। এই বিষয়টি তাকে মানুষ থেকে বিমুখ করে রাখেনি; বরং সম্পূর্ণ উল্টো হয়েছে। সে সবসময় অসুস্থ, প্রয়োজনগ্রস্ত ও দুর্বলদের সঙ্গেই ছিল। মানুষ যখন আমাদেরকে ভালোবাসবে তখন তারা আমাদের দাওয়াতকেও ভালোবাসবে। আমরা যদি নিকৃষ্ট নমুনা হই, তাহলে কোন জিনিস তাদেরকে তাদের বর্তমান অবস্থা পরিত্যাগ করে আমাদের সাদৃশ্যতা অবলম্বন করতে উদ্বুদ্ধ করে তুলবে? আচার-আচরণে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হোন। লেনদেনে নরম হোন। কথাবার্তায় সুমিষ্ট হোন। জনৈক ব্যক্তি অত্যন্ত সত্য কথা বলেছেন, আপনার পকেটে কুরআনুল কারিম থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আপনার চরিত্রে যেন একটি হলেও আয়াত ফুটে ওঠে।
টিকাঃ
[১] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ৩০০৫
[১] সুরা ত্বহা, আয়াত-ক্রম : ৭২
[১] সুনানে তিরমিযি, হাদিস-ক্রম: ৩৬৮১
[২] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ১৭৮৫
[১] সুরা কাহাফ, আয়াত-ক্রম: ৮২
[১] সুরা হুদ, আয়াত-ক্রম : ৫২
[২] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম : ৬৪৮৭
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৯৪৩
📄 আলেমকে উপদেশদানকারী নারী
মুয়াত্তা মালেকে এসেছে কাসেম ইবনে মুহাম্মদের সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন- আমার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর মুহাম্মদ ইবনে কাব আল কুরাযি আমাকে সান্ত্বনা জানানোর জন্য আসেন। তিনি বলেন, বনি ইসরাইলে একজন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি আলেম, ফকিহ, আবেদ ও মুজতাহিদ ছিলেন। তার এক স্ত্রী ছিল, যার সৌন্দর্যে তিনি আকৃষ্ট ছিলেন। তাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। একদিন ওই স্ত্রী মারা যায়। এতে তিনি ভীষণ কষ্ট পান। তিনি তার জন্য আফসোস করতে থাকেন। ঘর বন্ধ করে নির্জনে অবস্থান করতে থাকেন। মানুষজন থেকে আড়ালে চলে যান। কেউ তার কাছে যেতে পারত না। এক নারী তার এ অবস্থার কথা শুনে তার কাছে এল। সে বলল, তার কাছে আমার বিশেষ প্রয়োজন আছে। আমি সে ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞেস করতে চাই। আর বিষয়টি সরাসরি সাক্ষাৎ ব্যতীত সম্ভব হবে না। লোকের সমাগম কমে গেলে সে ওই আলেমের দরজায় পড়ে রইল। সে বলল, আমার অবশ্যই তাকে প্রয়োজন। এক ব্যক্তি ওই আলেমকে গিয়ে বলল, 'এখানে একজন নারী এসেছে, সে আপনাকে একটি বিষয় জিজ্ঞেস করতে চায়, সরাসরি সাক্ষাৎ ছাড়া নাকি তা সম্ভব না। সবাই চলে গেছে, কিন্তু সে দরজা ছাড়ছে না।' তিনি বললেন, 'তাকে প্রবেশের অনুমতি দাও।' নারীটি তার কাছে প্রবেশ করে বলল, 'আমি আপনাকে একটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে এসেছি।' তিনি বললেন, 'কী?' সে বলল, 'আমি আমার প্রতিবেশীর কাছ থেকে একটি অলংকার ধার নিয়েছিলাম। আমি তা পরিধান করতাম। এরপর তারা আমার কাছে তা ফেরত দেওয়ার সংবাদ পাঠায়। আমি কি তাদেরকে তা ফেরত দিয়ে দেব?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, অবশ্যই।' নারীটি বলল, 'এই অলংকার তো আমার কাছে কিছু কাল ছিল!' তিনি বললেন, 'তারা যেহেতু কিছু সময়ের জন্য তোমাকে ধার দিয়েছিল তাই তাদের কাছে তা ফিরিয়ে দেওয়া আবশ্যক।' নারী বলল, 'আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া করুন, আল্লাহ তাআলা আপনাকে যে জিনিস কিছুদিন ব্যবহারের জন্য ধার দিয়েছেন এরপর তা নিয়ে নিয়েছেন, আপনি সে কারণে আফসোস করছেন! অথচ তিনি সে ব্যাপারে আপনার চেয়ে অধিক হকদার!' আল্লাহ তাআলা নারীটির কথার মাধ্যমে ওই আলেমের দৃষ্টি খুলে দেন এবং তাকে উপকৃত করেন। [১]
প্রথম পাঠ
প্রাচীনকালের আরবগণ বলতেন-বিচক্ষণ ব্যক্তিরও ভুল হয়ে থাকে। দানশীল ব্যক্তিরও আবদার থাকে। ভালো মানের ঘোড়াও হোঁচট খায়! এটি আরবদের এক বুদ্ধিদীপ্ত উক্তি। আমরা তো মানুষ। আর স্বাভাবিকভাবেই আমাদের কর্মকাণ্ডের রেলগাড়ি লাইনচ্যুত হতে পারে। যে হাকিম মানুষের সমস্যা সমাধান করেন তিনি নিজেও সমস্যায় নিপতিত হয়ে থাকেন। মুত্তাকি ব্যক্তিরও কখনো গুনাহ হয়ে যায়। দানশীলও কখনো কৃপণতার নিকটবর্তী হয়ে। নম্র ব্যক্তিও কখনো রাগান্বিত হয়। তাই সাময়িক ও সামান্য কোনো ঘটনার মাধ্যমে ব্যক্তিত্ব ও মানবতায় পরিপূর্ণ ইতিহাসকে মুছে ফেলবেন না। ফিকহের একটি মূলনীতি রয়েছে, পানি অনেক বেশি হলে তখন নাপাকি পড়লেও তা বিবেচ্য হয় না। বহু মানুষ এমন রয়েছে যারা দান-দক্ষিণার দিক থেকে সমুদ্রের মতো। কখনো তাদের দ্বারা কলংকজনক কোনো কাজ প্রকাশ পেলে তাদের সুউজ্জ্বল অতীতকে স্মরণ করুন।
বদরি সাহাবি হাতেব ইবনে আবি বালতাআ রাদিয়াল্লাহু আনহু কুরাইশদের চিঠি লিখেন। এতে তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মক্কা বিজয়ের অভিযানের সংবাদ প্রদান কেরন। অথচ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিষয়টিকে গোপন রাখতে বলেছিলেন। এরপর জিবরাইল আলাইহিস সালাম রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে এ বিষয়ে সংবাদ প্রদান করেন। হাতেব রাদিয়াল্লাহু আনহু যে নারী দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে খুঁজে নিয়ে আসার জন্য লোক পাঠিয়ে দেন। হাতেব রাদিয়াল্লাহু আনহু চিঠি লেখার কারণ সম্পর্কে বলেন যে, মক্কায় তার পরিবার-পরিজন রয়েছে। তার প্রবল ধারণা হয়েছিল, যদি চিঠি লেখার মাধ্যমে তিনি মক্কার কুরাইশদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করেন তাহলে তারা তার পরিবার-পরিজনের সঙ্গে উত্তম আচরণ করবে। যুদ্ধের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি মারাত্মক বিশ্বাঘাতকতা! এ কারণেই উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু হাতেব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র গর্দান উড়িয়ে দেওয়ার আবেদন করেন। কিন্তু দয়ালু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি ভুল কাজের কারণে তার অতীতের উজ্জ্বল ইতিহাস ভুলে যেতে পারেন না। তাই তিনি উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলেন, 'আল্লাহ তাআলা সম্ভবত বদরবাসীদের প্রতি উঁকি দিয়েছেন এবং বলেছেন, তোমরা যা খুশি করতে পারো। আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিলাম।' [১]
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজে কিতাবুল্লাহর হাফেজ ছিলেন। কুরআনের উপর তিনি আমল করতেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওফাতের দিন তিনি মসজিদে রাগান্বিত হয়ে যান। যারা ধারণা করে যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মারা গেছেন তিনি তাদেরকে পাকড়াও করার সংকল্প করেন। তিনি মনে করেছিলেন, মুসা আলাইহিস সালাম-এর মতোই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সাক্ষাত করতে সাময়িকের জন্য গেছেন। কিন্তু যখন আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বাণী তিলাওয়াত করলেন, তখন তিনি বুঝতে পারলেন যে, মৃত্যুই আল্লাহ তাআলার ফায়সালা। কোনো জিনিস একে প্রতিহত করতে পারবে না।
'আর মুহাম্মদ তো একজন রাসুলই! তার পূর্বেও বহু রাসুল অতিবাহিত হয়েছেন। তাহলে কি তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে?' [১]
পরবর্তী সময়ে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'আমার মনে হচ্ছিল যেন ইতিপূর্বে আমি এ আয়াত শোনিইনি।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ভালোবাসা বশতঃ সামান্য সময়ের এ ঘটনার মাধ্যমে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু'র খেলাফত-পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী উজ্জ্বল ইতিহাস মুছে ফেলাটা কি ইনসাফ হবে?
দ্বিতীয় পাঠ
নারীদেরকে তুচ্ছ ভাবা থেকে বিরত থাকুন। এমনও ক্ষেত্র রয়েছে যে ক্ষেত্রে একজন নারী এক-হাজার পুরুষের সমান। বহু সমস্যা ও সংকটে একজন নারীর মত হাজার পুরুষের মতের চেয়েও অগ্রগণ্য হয়ে থাকে। নারী তো মানুষ। তার আছে অতি সংবেদনশীল মানসিকতা এবং সুবিশাল হৃদয়। এটা কখনো এই কথার প্রমাণ বহন করে না যে, সে কম বুদ্ধিসম্পন্ন। সংবেদনশীলতা মূলত নারীর প্রশংসা। এটি তার কোনো দোষ নয়। কে বলেছে যে, সংবেদনশীলতা জ্ঞান-বুদ্ধির পরিপন্থী? যদি আমরা এমনটি বলি তাহলে অবশ্যই আমাদেরকে তার বিপরীত বিষয় বলতে হবে যে, মানুষের কোনো হৃদয় নেই। এই বিষয়টি যেমন পুরুষের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ জুলুম তেমনিভাবে নারী ক্ষেত্রেও। আল্লাহ তাআলা অন্যান্য বিষয়ের তুলনায় নারীকে অধিক সংবেদনশীলতা দান করেছেন। তিনি তাকে শাসনকার্য ও বিচার-আচারের চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান করেছেন। সেটা হলো বিচারক এবং শাসকদের প্রতিপালন। তিনি পুরুষদেরকে অধিক জ্ঞান-বুদ্ধি দেওয়ার কারণ হলো-তাদের জীবনযাপন অত্যন্ত নিষ্ঠুর প্রকৃতির। বহু স্থানে তাদেরকে কঠোর ও দয়ামায়াহীন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। সুখময় পরিবার তো সেটি, যে পরিবারের নারীরা পুরুষের বিবেক-বুদ্ধিকে সংবেদনশীলতার মাধ্যমে নরম করে তোলে। আর পুরুষেরা আপন বিবেক-বুদ্ধির মাধ্যমে নারীর সংবেদনশীল হৃদয়কে শক্ত করে তোলে।
তৃতীয় পাঠ
নবী-রাসুলগণ ব্যতীত কোনো মানুষ নিষ্পাপ নয়। নিজ নিজ জ্ঞান-বুদ্ধি ও অন্তর অনুপাতে মানুষের গুনাহে লিপ্ত হওয়ার পার্থক্য ঘটে থাকে। আমরা তো সাধারণ মানুষ, আমরা ফেরেশতা বা নবী নই। মানুষের সঙ্গে ওঠা-বসার ক্ষেত্রে আমাদেরকে এ বিষয়টি স্মরণ রাখতে হবে। আমাদেরকে বুঝতে হবে যে, বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন মতপথ ও চিন্তা-চেতনা রয়েছে। আমি এমন বিষয় দেখে থাকি যা অন্য কেউ দেখে না। আবার সে যা দেখে আমি তা দেখি না। তাই আমার দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে অন্যকে অপারগ ভাবা উচিত। তেমনিভাবে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রেও আমাকে অপারগ ভাবা উচিত। কারও ত্রুটি-বিচ্যুতিকে এমনভাবে নেওয়া যাবে না যে, যেন আমরা মানুষের ব্যাপারে দায়িত্বশীল।
সুফিয়ান ইবনে হুসাইন রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি ইয়াস মুয়াবিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি'র কাছে এক ব্যক্তির দোষের কথা উল্লেখ করলাম। তখন তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তুমি কি রোমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছ?' আমি বললাম, 'না।' তিনি বললেন, 'তাহলে কি সিন্ধু হিন্দুস্তান এবং তুর্কে যুদ্ধ করেছ?' আমি বললাম, 'না।' তিনি বললেন, 'হিন্দ, সিন্ধু, তুর্ক রোমানরা তোমার থেকে নিরাপদ থাকতে পারে কিন্তু তোমার মুসলিম ভাই তোমার থেকে নিরাপদ থাকতে পারছে না!'
মানুষ কবে আবার প্রত্যেক বিষয়ে একমত হবে? যদি মানুষের বিবেক-বুদ্ধি এক ধরনের হতো তাহলে আর ফিকহের ক্ষেত্রে ইজতিহাদ এবং বহুমত তৈরি হতো না! এইসব ইজতিহাদ এবং মতবিরোধে অবশ্যই রহমত রয়েছে। ইমাম আহমদ রহমতুল্লাহি আলাইহি যদি তার উস্তাদ শাফেয়ি রহমতুল্লাহি আলাইহি'র সঙ্গে সকল বিষয়ে সহমত পোষণ করতেন তাহলে তিনি কোনো মাজহাবের ইমাম হয়ে যেতেন না। কিন্তু তিনি নিজে উস্তাদকে সম্মান করার পাশাপাশি তার সঙ্গে মতবিরোধ করতেন। আর সর্বক্ষেত্রেই উস্তাদ-ছাত্রের বিষয়টি বিদ্যমান থাকে না। সমসাময়িকদেরকে বিশেষ ক্ষেত্রে অপারগ মনে করাটা আলিমগণের বৈশিষ্ট্য।
চতুর্থ পাঠ
একটি ঘটনা হাজার ক্লাস থেকে উত্তম। জেনে রাখুন, কুরআনুল কারিমের এক-তৃতীয়াংশই ঘটনা। এগুলো আনন্দ, ফূর্তি ও উপভোগের জন্য নয়; বরং তা আগ্রহোদ্দীপক পাঠ। আল্লাহ তাআলা যখন আমাদেরকে চারিত্রিক পবিত্রতা শিক্ষা দিতে চেয়েছেন, ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। যখন দ্বীনের ওপর অবিচল থাকার আদর্শ শিক্ষা দিতে চেয়েছেন, ফিরআউনের জাদুকরদের ঘটনা উল্লেখ করেছেন। যখন দুআ কবুল হওয়ার বিষয়টি শিক্ষা দিতে চেয়েছেন, নুহ ও জাকারিয়া আলাইহিমাস সালাম-এর ঘটনা উল্লেখ করেছেন। যখন অপরাধীদের ছলচাতুরির বিবরণ পেশ করতে চেয়েছেন, বনি ইসরাইলের গাভীর ঘটনা উল্লেখ করেছেন। যখন তাঁর নেয়ামত অস্বীকার করার পরিণাম সম্পর্কে জানাতে চেয়েছেন, বাগানবাসী দুই ব্যক্তির আলোচনা করেছেন। যখন সৎকাজ শিক্ষা দিতে চেয়েছেন, ইসমাইল আলাইহিস সালাম-এর কথা আলোচনা করেছেন। যখন আল্লাহ কর্তৃক বান্দাদেরকে সাহায্য করার বিষয়টি আলোচনা করতে চেয়েছেন, ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-কে আগুনে নিক্ষেপ করার বিষয়টি এবং মুসা আলাইহিস সালাম-এর সমুদ্রের মুখোমুখি হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। যখন কৃপণতার পরিণাম শিক্ষা দিতে চেয়েছেন, বাগানবাসীদের কথা আলোচনা করেছেন। যখন তাঁর প্রতিশোধ গ্রহণের বিষয়টি অবগত করাতে চেয়েছেন, সামুদ, আদ ও লুত সম্প্রদায়ের কথা আলোচনা করেছেন। যখন হেকমত শিক্ষা দিতে চেয়েছেন, লুকমান আলাইহিস সালামের কথা আলোচনা করেছেন। যখন কৃপণতা এবং অহংকারের পরিণাম জানাতে চেয়েছেন, কারুনের কথা আলোচনা করেছেন। যখন ভাই ভাইকে ভালোবাসার শিক্ষা দিতে চেয়েছেন, মুসা ও হারুন আলাইহিমাস সালাম-এর কথা আলোচনা করেছেন। যখন এই শিক্ষা দিতে চেয়েছেন যে, নিকটাত্মীয়রাও বিদ্বেষী হয়ে যেতে পারে, তখন ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর ভাইদের কথা আলোচনা করেছেন। যখন হারাম মনোবাসনার কুফল জানাতে চেয়েছেন, জুলাইখার কথা আলোচনা করেছেন। যখন মৃতকে জীবিত করার ব্যাপারে তার কুদরত সম্পর্কে জানাতে চেয়েছেন, উযাইরের গাধা এবং ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর পাখি সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। যখন দুশমনের মোকাবেলায় তার সেনাবাহিনী নির্বাচনের বিষয়টি জানাতে চেয়েছেন, নুহ আলাইহিস সালাম-এর প্লাবন এবং আবরাহার হস্তিবাহিনী সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। যখন দ্বীনের ব্যাপারে সন্তানের অবাধ্যতা সম্পর্কে জানাতে চেয়েছেন, নুহ আলাইহিস সালাম-এর পুত্রের আলোচনা করেছেন। যখন হিংসা সম্পর্কে অবগত করতে চেয়েছেন, হাবিল-কাবিলের কথা আলোচনা করেছেন। আর যখন তিনি আমাদেরকে অবাধ্য ও বোকাদের সম্পর্কে অবগত করতে চেয়েছেন, ফিরআউন ও নমরুদের কথা আলোচনা করেছেন। মানব-মনে ঘটনা অত্যন্ত প্রভাব বিস্তার করে থাকে। এটি ছোটদের পূর্বে বড়দের জন্য শিক্ষা, উপদেশ ও সংস্কৃতির মাধ্যমে। তাই ঘটনার ব্যাপারে বিমুখ হবেন না। একটি ঘটনা হাজারটা উপদেশের সমান হতে পারে।
পঞ্চম পাঠ
পূর্ববর্তীদের ঘটনায় অবশ্যই সান্ত্বনার উপাদান রয়েছে। যার সন্তান তার অবাধ্যতা করে থাকে সে যেন নুহ আলাইহিস সালাম-এর ঘটনার মাধ্যমে সান্ত্বনা লাভ করে। হে বালক! পিতার পাপাচারের কারণে তুমি পরীক্ষায় নিপতিত? তুমি ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর মাধ্যমে সান্ত্বনা লাভ করতে পারো। হে স্বামী আপনি কি পাপাচারী স্ত্রীর মাধ্যমে পরীক্ষার নিপতিত? আপনি লুত আলাইহিস সালাম-এর মাধ্যমে সান্ত্বনা লাভ করতে পারেন। হে স্ত্রী! আপনি কি পাপাচারী স্বামীর মাধ্যমে পরীক্ষায় নিপতিত? আপনি ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়ার মাধ্যমে সান্ত্বনা লাভ করতে পারেন। আপনি কি রোগব্যাধির মাধ্যমে পরীক্ষায় নিপতিত? তাহলে আপনি আইয়ুব আলাইহিস সালাম-এর মাধ্যমে সান্ত্বনা লাভ করতে পারেন। আপনার কি সন্তান হারিয়ে গেছে? তাহলে আপনি ইয়াকুব আলাইহিস সালাম-এর মাধ্যমে সান্ত্বনা লাভ করতে পারেন। আপনি কি ভাইদের মাধ্যমে জুলুমের শিকার হচ্ছেন? তাহলে ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর মাধ্যমে সান্ত্বনা লাভ করতে পারেন। আপনার চাচা কি আপনাকে কষ্ট দেয়? তাহলে আপনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাধ্যমে সান্ত্বনা লাভ করতে পারেন।
আপনার দৃষ্টিতে যদি এই সকল ব্যক্তি সান্ত্বনা লাভের মাধ্যম না হয়, তাহলে জেনে রাখুন, আপনাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো পৃথিবীতে আর কোনো জিনিস নেই। আল্লাহ তাআলার তাকদিরের ওপর রাগ-অভিমান কখনো আপনাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারবে না। বরং তা গুনাহ এবং আজাব নিয়ে আসবে। আবার তাকদিরের প্রতি সন্তুষ্টি কখনো আপনাকে বিপদ থেকে উদ্ধার নাও করতে পারে। কিন্তু এতে আপনার দ্বিগুণ সওয়াব অর্জনের পাশাপাশি আপনার মর্যাদার বৃদ্ধি ঘটবে।
টিকাঃ
[১] মুয়াত্তা মালেক, হাদিস-ক্রম: ৮১১
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩০০৭
[১] সুরা আলে ইমরান, ৩: ১৪৪
📄 সালেহ আলাইহিস সালাম-এর উটনী
জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন-রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হিজর উপত্যকা দিয়ে অতিক্রম করছিলেন তখন বলেন-
'তোমরা নিদর্শন চেয়ো না, সালেহের সম্প্রদায় নিদর্শন চেয়েছিল, সেই নিদর্শনটি (উটনী) এই স্থান থেকে বের হতো এবং এই স্থান দিয়ে চলে যেত। তারা তাদের রবের অবাধ্যতা করে সেটিকে হত্যা করে ফেলেছে। তা একদিন তাদের পানি পান করত আর তারা একদিন তার দুধ পান করত। তারা সেটিকে হত্যা করে ফেলে। তখন এক বিকট আওয়াজ তাদেরকে গ্রাস করে নেয়। আল্লাহ তাআলা আকাশ থেকে তাদেরকে নির্বাপিত করে দেন। তবে এক ব্যক্তি ব্যতীত, যে হারামে ছিল।' জিজ্ঞেস করা হলো, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! লোকটি কে?' তিনি বললেন, 'সে হলো আবু রিগাল। হারাম থেকে বের হওয়ার পর তার সম্প্রদায় যার মাধ্যমে আক্রান্ত হয়েছিল সেও তার মাধ্যমে আক্রান্ত হয়।' [১]
প্রথম পাঠ
বহুকাল অতিবাহিত হয়ে গেলও বাতিল কখনোই স্থায়িত্ব লাভ করে না। তাবুক-যদ্ধে যাওয়ার পথে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজর উপত্যকা অতিক্রম করেন। এই উপত্যকায় সামুদ সম্প্রদায় বসবাস করত। তিনি এর নিকটস্থ এক স্থানে সেনাবাহিনী নিয়ে অবস্থান করেন। সামুদ সম্প্রদায় যেসব কূপ থেকে পানি পান করত সাহাবায়ে কেরাম সেসব কূপের কাছে গেলেন। কূপ থেকে তারা পানি তুললেন এবং রান্নাবান্নার ইনতেজামে ব্যস্ত হয়ে হাঁড়ি-পাতিল চড়ালেন। রুটি বানানোর জন্য আটা-খামিরা করলেন। এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসে তাদেরকে এসব হাড়ি-পাতিল উল্টে দেওয়ার জন্য বললেন। আটাগুলো উটকে খেতে দিতে বললেন। সাহাবায়ে কেরামকে সামুদ সম্প্রদায়ের পানি পানের স্থানে আসাকে তিনি অপছন্দ করলেন। যে সম্প্রদায়কে আজাব স্পর্শ করেছে তিনি তাদের পানি পান করাটাকেও অপছন্দ করলেন। তিনি আমাদের শিক্ষা দিলেন, শরিয়ত ভিন্ন ভিন্ন হলেও আমাদের সকলের ধর্ম এক। তিনি আমাদেরকে জীবিতদের পূর্বে মৃত জালেমদের ব্যাপারে দায়মুক্তির বিষয়টি শিক্ষা দিয়েছেন। সত্যকে আড়াল করে রাখা যায় কিন্তু তাকে স্তিমিত করে দেওয়া যায় না।
দ্বিতীয় পাঠ
নেয়ামত অস্বীকার করাটা মানুষের স্বভাব। উটটি যে কূপ থেকে পানি পান করত তিনি তাদেরকে নিয়ে সেখানে যাত্রা করলেন। উট যে রাস্তা দিয়ে যাওয়া-আসা করত তিনি সে রাস্তার দিকে ইঙ্গিত করলেন। তাদেরকে জানালেন যে, কূপের পানি উটনী এবং সামুদ সম্প্রদায়ের মধ্যে বণ্টিত ছিল। উটনীটি একদিন কূপ থেকে পানি পান করত আর তারা একদিন কূপ থেকে পানি পান করত। তারা যেদিন কূপে পানি পানের জন্য আসত না, সেদিন তারা উটনী থেকে এই পরিমাণ দুধ গ্রহণ করত যা তাদের সকল গোত্রের জন্য যথেষ্ট হয়ে যেত। কিন্তু নেয়ামত অস্বীকার করাটা মানুষের স্বভাব। এই নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করার পরিবর্তে, যে নবী মৃত পাথর থেকে জীবিত উটনী বের করে আনলেন তাকে সত্যায়ন করার পরিবর্তে তারা সকলে মিলে উটনীটিকে হত্যা করে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়।
এই কাজের দায়িত্ব নেয় নেতাগোছের এক ব্যক্তি। যার চেহারায় লাল চিহ্ন ছিল। [১] রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলি ইবনে আবু তালেব রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলেন, 'আমি কি তোমাকে দুই হতভাগা ব্যক্তির সংবাদ দেব?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ!' রাসুল বললেন, 'সে হলো সামুদ সম্প্রদায়ের লাল-চেহারা-বিশিষ্ট ব্যক্তি; যে উটনীকে হত্যা করেছিল।' তারপর তিনি ঘাড়ের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, 'এবং যে ব্যক্তি তোমার এই স্থানে আঘাত করবে।'
তৃতীয় পাঠ
তারা উটনীকে হত্যা করে ফেললে আল্লাহ তাআলা নবীকে ওহি প্রেরণ করে জানিয়ে দেন, তিনদিন পর অবশ্যই তাদের উপর আজাব অবতীর্ণ হবে। তৃতীয় দিন এক বিকট আওয়াজে তারা সকলেই মারা যায়। যারা তখন হিজর উপত্যাকায় উপস্থিত ছিল এবং যারা সফর কিংবা কোনো প্রয়োজনে এখান থেকে বের হয়েছিল তারা সকলেই মারা যায়। তবে এক ব্যক্তি ব্যতীত; যার উপনাম ছিল আবু রুগাল। সে তখন কাবায় অবস্থান করছিল। সে শুরুতে ধ্বংস হয়নি। কাবা থেকে বের হওয়ার পর তার সম্প্রদায় যে আজাবে নিপতিত হয়েছিল সেও সেই আজাবে নিপতিত হয়।
চতুর্থ পাঠ
আল্লাহর পথে দাওয়াত দানের সুযোগ খুঁজতে থাকুন। দিনগুলো প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। অন্য কিছুর তুলনায় মানুষ নিজেদের বিষয়ে উপদেশ শুনতে অধিক আগ্রহী হয়ে থাকে। এটা নবীদের রীতি। এই তো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। হিজর উপত্যকা অতিক্রমের সময়কে তিনি এখানে ঘটিত বিষয়ের সংবাদ দেওয়ার এক মোক্ষম সময় হিসেবে বেছে নেন। তিনি সাহাবায়ে কেরামকে সাধারণভাবে শুধু ঘটনা বলে ক্ষান্ত হননি; বরং যেই কূপ থেকে উটনী পানি পান করত সেখানে তাদেরকে নিয়ে গেছেন। তাদেরকে সে উটনীর চলাফেরার রাস্তা দেখিয়েছেন।
তেমনিভাবে আমাদের ক্ষেত্রে বৃষ্টি হলো আল্লাহর রহমত সম্পর্কে আলোচনার সুবর্ণ সুযোগ। মৃত্যু হলো আমাদের সকলের একদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব—এই নসিহতের সুবর্ণ সুযোগ। আল্লাহ তাআলা আমাদের থেকে স্ত্রীদের সৃষ্টি করার নিদর্শন সম্পর্কে আলোচনার জন্য বিয়ে এক সুবর্ণ সুযোগ। আল্লাহ তাআলার দয়া, অনুগ্রহ ও শুকরিয়া আদায়ের আলোচনা করার জন্য সন্তান জন্মগ্রহণ করার সময়টি একটি সুযোগ। আল্লাহ তাআলার কুদরত, তার ক্রোধ এবং ধৈর্যধারণের ফজিলত সম্পর্কে আলোচনা করার জন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ এক সুবর্ণ সুযোগ। বিশ্বজগতের সকল কিছু আল্লাহ তাআলার হাতে, তা আলোচনা করার জন্য চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণের সময়টা সুবর্ণ সুযোগ। ইসলামের আনন্দগুলো আনুগত্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত, এই বিষয়টি আলোচনা করার জন্য ঈদ এক সুবর্ণ সুযোগ। লক্ষ করুন, রোজার পরে ঈদুল ফিতর আসে, হজের পরে আসে ঈদুল আজহা। তাই উপদেশের সময় ও বিষয়বস্তু নির্বাচন করুন। আনন্দের সময় তাদের কাছে মৃত্যুর আলোচনা করবেন না। কারও মৃত্যুর সময় আনন্দের আলোচনা করবেন না। আপনি বিচক্ষণ হোন, মনে রাখবেন, প্রতিটি সময় ও স্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত আলাদা আলাদা আলোচনা রয়েছে।
পঞ্চম পাঠ
ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর পূর্বেও কাবা ছিল। ফেরেশতারা বহু পূর্বে তা নির্মাণ করেছেন। ফুকাহায়ে কেরামের নির্ভরযোগ্য ভাষ্য হলো-নুহ আলাইহিস সালাম-এর প্লাবনের সময় তা ধ্বসে হয়ে গিয়েছিল। এরপর ইমারত না থাকলেও এর ভিত্তিটুকু দৃশ্যমান ছিল। এর উপর ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এবং ইসমাইল আলাইহিস সালাম পূর্বের মতো কাবা নির্মাণ করেন। এটি আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বাণীর ব্যাখ্যা—
'স্মরণ করুন, যখন ইবরাহিম ও ইসমাইল কাবাগৃহের ভিত্তি স্থাপন করছিলেন। তারা দুআ করেছিলেন, পরওয়ারডেগার! আমাদের থেকে কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞ।' [১]
মুসলমানদের কাছে এ ব্যাপারে কোনো মতবিরোধ নেই যে, সামুদ সম্প্রদায় ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর পূর্বের জাতি। নুহ আলাইহিস সালাম-এর প্লাবনের পর কাবার যে ভিত্তি বাকি ছিল হতভাগা আবু রুগাল তার নিকটবর্তী থাকায় শুরুতে ধ্বংস হওয়া থেকে বেঁচে গিয়েছিল।
ষষ্ঠ পাঠ
আল্লাহ তাআলা কাবা শরিফের সম্মানার্থে গোটা সম্প্রদায়কে শাস্তি দিলেও আবু রুগালকে শাস্তি দেননি, অথচ তখন কাবা-ইমারত বিশিষ্ট ছিল না। এর মাধ্যমে আমরা কাবা শরিফের সম্মান এবং তাতে অবস্থানকারীর মর্যাদার বিষয়টি বুঝতে পারি। একজন হতভাগা যখন তাতে অবস্থানের কারণে নিরাপদ থাকতে পারে, তাহলে একজন মুমিন তো অবশ্যই নিরাপদ থাকবে। বর্তমানে আমাদের জন্য তাকে নিরাপদ রাখা আবশ্যক। এখানে নারীদের সংখ্যা অনেক হলেও এটি উত্তেজিত হওয়ার স্থান নয়। এক তাওবাকারী বলেছিল—আমার তাওবার কারণ হলো কাবায় এসে আমি এক নারীর প্রতি উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিলাম, তখন সে আমাকে বলল, 'আমরা পৃথিবীর শেষ প্রান্ত থেকে এখানে এসেছি নিজেদের গুনাহ ও পাপাচার ধুয়ে মুছে সাফ করার জন্য; কিন্তু তুমি তোমার গুনাহ কোথায় ধৌত করবে?'
এটা ভালো কাজ করে প্রসিদ্ধি লাভের জায়গা নয়। বাতিল কাজ তো আরও দূরের বিষয়। কাবায় সুন্দরী নারীরা গেলেও এটি প্রেমপ্রীতির স্থান নয়। এক্ষেত্রে একটি চমৎকার বিষয় উল্লেখ করা হয়। ঘটনাটি প্রসিদ্ধ উমাইয়া-কবি উমর ইবনে আবু রবিআর সঙ্গে ঘটেছিল। হজের উদ্দেশ্যে এক সুন্দরী নারী মক্কায় আসে। সে কংকর নিক্ষেপের জন্য গেলে উমর ইবনে আবু রবিআ তার মাধ্যমে ফেতনায় পড়ে যায়। সে নিকটে গেলে নারীটি তার আহ্বানে সাড়া দেয়নি। দ্বিতীয় রাতে যখন সে ওই নারীর সামনে যায় তখন নারীটি চিৎকার করে বলে ওঠে, 'নির্বোধ কোথাকার! আমার থেকে দূরে সরে যাও। কেননা আমি আল্লাহর হারামে রয়েছি।' তৃতীয় রাতে ওই নারী আশঙ্কা করে যে দুশ্চরিত্র পুরুষ তার কাছে আসতে পারে। তাই সে তার ভাইকে বলে, 'আমার সঙ্গে তুমি চলো। আমাকে হজের কাজগুলো দেখিয়ে দেবে।' এরপর উমর ইবনে আবু রবিআ নারীটির সঙ্গে তার ভাইকে দেখে আর সামনে আসেনি। খলিফা আবু জাফর মনসুর ঘটনাটি শুনে বলেন, 'হায়, যদি কুরায়েশের কোনো যুবতী এ ঘটনাটি না শুনতে পেত!'
কাবা শরিফ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব মেটানো এবং রক্তপাতের জায়গা নয়। যেমনটা রক্তপিপাসু হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সঙ্গে করেছিল। সংক্ষেপে ঘটনাটির বিবরণ এরকম- ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া যখন তার পিতার কাছ থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লাভ করে আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যান। এরপর একসময় ইয়াজিদ মারা যায়। তার ছেলেরও মৃত্যু হয়। তখন মারওয়ান ইবনে হাকাম শাসন ক্ষমতা লাভ করে। আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন হিজায, ইয়ামান, খোরাসান এবং ইরাকের কিছু অংশ শাসন করতেন। মারওয়ান ইবনে হাকামের মৃত্যুর পর তার ছেলে আবদুল মালিক স্থলাভিষিক্ত হয়। সে তখন শামবাসীদেরকে জিজ্ঞেস করে, 'তোমাদের মধ্যে কে আছে যে ইবনে যুবায়েরের জন্য যথেষ্ট হবে?' হাজ্জাজ বলে, 'আমিরুল মুমিনীন! আমি।' এরপর হাজ্জাজ আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে কাবায় প্রায় সাত মাস অবরুদ্ধ করে রেখে চরম ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে। কাবা শরিফে সে মিনজানিক দিয়ে পাথর নিক্ষেপ করে। এতে লোকজন আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে ছেড়ে চলে যায়। তিনি তখন তার মা আসমা বিনতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহা'র কাছে যান। তাকে বলেন, 'আম্মা, মানুষ আমাকে অপদস্থ করেছে। এমনকি আমার পরিবার-পরিজনের লোকজনও। এখন শুধু মুষ্টিমেয় কিছু লোক অবশিষ্ট আছে। এ পরিস্থিতিতে আপনার মতামত কী?'
আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, 'বেটা, তুমি নিজের ব্যাপারে ভালো জানো। যদি তুমি মনে করো যে, তুমি হকের ওপর আছ তাহলে হকের ওপরই থাকো। তোমার সঙ্গী তাহলে হকের ওপরই নিহত হয়েছে। আর যদি তুমি দুনিয়ার আশায় এমনটি করে থাক তাহলে তুমি কতই-না নিকৃষ্ট! নিজেকেও ধ্বংস করলে তোমার সাথিদেরও ধ্বংস করলে। আর যদি তুমি বলো আমি হকের ওপর রয়েছি কিন্তু সাথি-সঙ্গীরা আমাকে ছেড়ে দিয়েছে, তাহলে এটি কোনো স্বাধীন ব্যক্তির কাজ হতে পারে না। তারা তোমাকে কতদিন দুনিয়ায় চিরস্থায়ী করে রাখবে? মৃত্যুই তোমার জন্য উত্তম।' তিনি তখন বললেন, 'আম্মাজান, আমি আশঙ্কা করি যে তারা আমাকে হত্যা করে আমার অঙ্গপ্রতঙ্গ বিকৃত করবে।' মা বললেন, 'বকরি জবাইয়ের পর তার চামড়া ছিলে ফেললে তাতে কোনো সমস্যা হয় না।'
আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের এবার তার মাকে বললেন, 'আমি এতদিন পর্যন্ত এই বিষয়ের প্রতিই মানুষকে আহ্বান করে আসছি। আমি দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকিনি আর দুনিয়ার জন্যও বের হইনি। আল্লাহ তাআলার সম্মানিত বিষয়ের মানহানি করেছে, একমাত্র আল্লাহর স্বার্থে রাগান্বিত হয়েই আমি এ পথে এসেছি। আমি আপনার মতামত শুনতে চাইলাম। আপনার কথার মাধ্যমে আপনি আমার অন্তর্দৃষ্টিই বাড়িয়ে দিলেন। আমি আজই নিহত হয়ে যাব, আপনি ধৈর্যধারণ করুন।'
তারপর তিনি লড়াই করে শহিদ হয়ে যান। হাজ্জাজ তখন তার মাথা কেটে আবদুল মালিকের কাছে প্রেরণ করে। তারপর সে লোক পাঠিয়ে আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে আসতে বলে। তিনি আসতে অস্বীকৃতি জানান। হাজ্জাজ তখন বলে, 'তাকে জানিয়ে দাও, হয়তো সে নিজেই আমার কাছে আসবে অন্যথায় আমি চুল ধরে তাকে টেনে আনব।' আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর শপথ, সে যতক্ষণ পর্যন্ত আমার চুল ধরে টেনে আনার জন্য কাউকে না পাঠাবে ততক্ষণ আমি তার কাছে যাব না।' তখন হাজ্জাজ নিজে তার কাছে এসে বলে, 'তোমার পুত্র হারামে ধর্মবিরোধী কাজ করেছে।' তিনি বলেন, 'হে হাজ্জাজ! তুমি মিথ্যা বলেছ। আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের মদিনায় জন্মগ্রহণ-করা সর্বপ্রথম মুসলিম সন্তান ছিল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার মাধ্যমে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছেন। নিজ হাতে তাকে তাহনিক (খেজুর চিবিয়ে মুখে দেওয়ার কাজ) করেছেন। মুসলমানরা সেদিন তাকবির-ধ্বনিতে মদিনায় আলোড়ন তৈরি করেছিল। আর আজ তুমি এবং তোমার সঙ্গীরা তাকে হত্যা করে আনন্দ করছ! যারা তার হত্যার কারণে আনন্দিত তাদের চেয়ে ঐ সকল লোক কতই-না উত্তম যাঁরা তার জন্মের কারণে আনন্দিত হয়েছিলেন!'
এরপর তিনি হাজ্জাজকে বলেন, 'ওই সত্তার কসম, যিনি মুহাম্মাদকে সত্য দিয়ে প্রেরণ করেছেন! আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, সাকিফ গোত্র থেকে মিথ্যুক ও রক্তপাতকারী বের হবে। মিথ্যুক ব্যক্তিকে আমরা চিনি, সে হলো মুখতার সাকাফি। আর আমি মনে করি রক্তপাতকারী হলে তুমি।' [১]
হাজ্জাজের কাছে এ সংবাদ পৌঁছুলে সে লজ্জিত হয়ে যায় এবং আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে শূলী থেকে নামিয়ে দিতে বলে। তিনি তখন তাকে গোসল করিয়ে দাফন করে দেন।
টিকাঃ
[১] মুসনাদে আহমাদ (১৪১৬০)
[১] মুসনাদে আহমদ, হাদিস-ক্রম: ১৮৩২১
[১] সুরা বাকারা, আয়াত-ক্রম : ১২৭
[১] সুরা আলে ইমরান, আয়াত-ক্রম : ১৭
[১] মাজমাউয য়াওয়ায়েদ, ৭/২৫৯
📄 হাজেরা ও ইসমাইল আলাইহিমাস সালাম
নারী জাতি সর্বপ্রথম কোমরবন্ধ বানানো শিখেছে ইসমাইলের মায়ের কাছে থেকে। হাজেরা কোমরবন্ধ লাগাতেন সারাহ'র কাছ থেকে নিজের মর্যাদা গোপন রাখার জন্য। [১]
প্রথম পাঠ
কোমরবন্ধ হচ্ছে ঘরের কাজের সময় নারীরা যা শরীরের মাঝখানে বেঁধে রাখে। হাদিসের উদ্দেশ্য হলো হাজেরাই সর্বপ্রথম এটি বানিয়েছিলেন। প্রকৃত বিষয় হলো একদিন তিনি স্বামীর সঙ্গে ছেলে ইসমাইলকে নিয়ে বের হন। সারাকে তখন নেওয়া হয়নি। পদচিহ্ন গোপন রাখার জন্য তিনি কোমরবন্ধ হালকা করে দিয়েছিলেন। ফলে তিনি কোথায় যাচ্ছেন সারা তা জানতে পারবেন না। তিনি নিজের ওপর আশংকা করে এ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। ঘটনার শুরু-অংশের মাধ্যমে আমরা সতীনদের মধ্যকার ঈর্ষা সম্পর্কে বুঝতে পারি। সতীনদের মধ্যকার ঈর্ষা বিশেষত সারার বিষয়টি আলোচনার পূর্বে আমাদেরকে তার চেষ্টা-মুজাহাদার বিষয়টি ভুলে গেলে চলবে না। তিনি সেই নারী, যখন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর প্রতি কেউ ঈমান আনেনি তিনি তার প্রতি ঈমান এনেছেন। তিনি সেই নারী মিশরের বাদশাহ যাকে নিজের জন্য গ্রহণ করতে চেয়েছিল, কিন্তু তিনি নিজের পবিত্রতার হেফাজত করেছেন।
সতীনের প্রতি ঈর্ষা নারীদের স্বভাবজাত বিষয়। ইবনু হাজার রহিমাহুল্লাহ ফাতহুল বারিতে বলেছেন, নারীদের ঈর্ষাবোধ কারও ক্ষমতাধীন বিষয় নয়। এটি তাদের স্বভাবজাত বিষয়। তারা কখনো এটা থেকে মুক্ত হতে পারবে না। এটা যতক্ষণ পর্যন্ত অনুভূতির পর্যায়ে থাকবে আল্লাহ তাআলা ততক্ষণ এগুলোর হিসাব নেবেন না। কিন্তু যখন এই অনুভূতি থেকে মন্দ কিছু প্রকাশ পাবে তখন এ জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। সারা ছিলেন স্বামী-ভক্ত, দীর্ঘকাল তিনি তার স্বামীকে নিয়েই কাটিয়েছেন। এখন সেই স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী হওয়ায় এবং সেই স্ত্রী থেকে সন্তান জন্মগ্রহণ করায় তিনি তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হওয়াটাই স্বাভাবিক।
দ্বিতীয় পাঠ
কাজ অনুযায়ী প্রতিদান হয়ে থাকে। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর কাছে সারা নিজেই হাজেরাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন। এই ঘরে ইসমাইল আলাইহিস সালাম-এর জন্ম হয়। আল্লাহ তাআলা সন্তানহীনা সারাকেও সুস্থ করে দেন। তার গর্ভে নবী ইসহাক আলাইহিস সালাম-এর জন্ম হয়। ইসহাক আলাইহিস সালাম-এর বংশ থেকেই পরবর্তীতে বনি ইসরাইলের সকল নবী প্রেরিত হয়েছেন। তবে ইসমাইল আলাইহিস সালাম-এর বংশে শুধু আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাই এমন এক নবী, যদি অন্যসকল মানুষ ও নবীকে এক জায়গায় রাখা হয় তাহলে তিনি তাদের সকলকে ছাড়িয়ে যাবেন।
'অতঃপর ইবরাহিম হাজেরা ও তার শিশু-ছেলে ইসমাইলকে সঙ্গে নিয়ে বের হলেন এ অবস্থায় যে, হাজেরা শিশুকে দুধ পান করাতেন। অবশেষে যেখানে কাবাঘর অবস্থিত, ইবরাহিম তাদের উভয়কে সেখানে নিয়ে এসে মসজিদের উঁচু অংশে জমজম কূপের উপরে অবস্থিত একটি বড় গাছের নিচে তাদেরকে রাখলেন। তখন মক্কায় না ছিল কোনো মানুষ, না ছিল কোনোরূপ পানির ব্যবস্থা। পরে তিনি তাদেরকে সেখানেই রেখে গেলেন। এ ছাড়া তিনি তাদের কাছে রেখে গেলেন একটি থলের মধ্যে কিছু খেজুর আর একটি মশকে অল্প পরিমাণ পানি। অতঃপর ফিরে চললেন। তখন ইসমাইলের মা পিছু পিছু এলেন এবং বলতে লাগলেন, “হে ইবরাহিম! আপনি কোথায় চলে যাচ্ছেন? আমাদেকে এমন এক ময়দানে রেখে যাচ্ছেন, যেখানে না আছে কোনো সাহায্যকারী আর না আছে কোনো ব্যবস্থা।” তিনি এ কথা তাকে বারবার বললেন। কিন্তু ইবরাহিম তার দিকে তাকালেন না। হাজেরা বললেন, “এর আদেশ কি আপনাকে আল্লাহ দিয়েছেন?” তিনি বললেন, "হ্যাঁ।” হাজেরা বললেন, "তাহলে আল্লাহ আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না।"
অতঃপর তিনি ফিরে আসলেন। আর ইবরাহিমও সামনে চললেন। চলতে চলতে যখন তিনি গিরিপথের বাঁকে পৌঁছলেন, যেখানে স্ত্রী ও সন্তান তাকে আর দেখতে পাচ্ছেন না, তখন তিনি কাবাঘরের দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন। অতঃপর দুহাত তুলে এ দুআ করলেন, আর বললেন-
“হে আমাদের রব! আমি নিজের এক সন্তানকে আপনার পবিত্র গৃহের সন্নিকটে চাষাবাদহীন উপত্যকায় পুনর্বাসন করেছি; হে আমাদের রব! যাতে তারা নামাজ কায়েম রাখে। অতঃপর আপনি কিছু লোকের অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করুন এবং তাদেরকে ফল-ফলাদি দ্বারা রিজিক দান করুন, যাতে তারা শুকরিয়া আদায় করে।” [১]
তৃতীয় পাঠ
ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও তার পরিবারের ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনটি বেশি বিস্ময়কর তা নির্ধারণ করতে আপনি হিমশিম খেয়ে যাবেন। তিনি ছিলেন সন্তানহীন। বার্ধক্য পর্যন্ত তিনি এর ওপর ধৈর্যধারণ করেছেন। তারপর সর্বশেষে যখন তাকে এক সন্তান দান করা হয় তখন সেই স্ত্রী এবং কলিজার টুকরো সন্তানকে চাষাবাদহীন উপত্যকায় রেখে আসতে বলা হয়। যেখানে কোনো মানুষ বা কাফেলার আগমন ঘটে না। কিন্তু ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এসবের কোনো চিন্তাই করেননি। আল্লাহ তাআলা আদেশ করেছেন, অবশ্যই তার আদেশ এবং ইচ্ছা বাস্তবায়িত হবে। নাকি আপনি সন্তানকে স্তন্যদানকারিণী মমতাময়ী মায়ের কথা ভেবে আশ্চর্য হবেন? যিনি জানতে পারলেন এটি আল্লাহর নির্দেশ, তখন তিনি পূর্ণ বিশ্বাসের সঙ্গে বললেন, তাহলে আল্লাহ আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না।
চতুর্থ পাঠ
ছেলেকে দূরে রেখে এসে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম পিতৃত্বের অনুভূতিতে কোনো সমস্যা অনুভব করেননি। আর হাজেরা স্বামী থেকে দূরে অবস্থান করেও কোনো সমস্যা অনুভব করেননি। এর দ্বারা বুঝে আসে, আল্লাহর কাছে পৌঁছার রাস্তা কখনো মনের বিপরীত হয়ে থাকে। যারা নিজেদের মনের উপর বিজয়ী হতে পারে তারাই কেবল আল্লাহর কাছে পৌঁছতে পারে।
পঞ্চম পাঠ
ইবরাহিম আলাইহিস সালাম কেন তার প্রতি এবং সন্তানের প্রতি তাকালেন না? তিনি দুর্বল হয়ে যেতে চাননি। আপন স্ত্রী এবং সন্তানদেরকে রেখে চলে যাচ্ছেন, এ সময় যেন তার মন বিগলিত না হয়ে যায়, তাদের ভালোবাসায় যেন তিনি আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়নে অক্ষম হয়ে না পড়েন, এজন্য তিনি এমন করেছিলেন। বড়রা এমনই হয়ে থাকেন। তারা রবের ভালোবাসায় নিজেদের ভালোবাসাকে বিসর্জন দেন। দুআ মুমিনের অস্ত্র। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এ অস্ত্র প্রয়োগ করেন। তিনি বলেন-
'অতঃপর আপনি কিছু লোকের অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করুন।' [১]
তার দুআর ফলে সেই প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ কাবার প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকে। উঁচু-নিচু সকল স্থান থেকেই সেখানে মানুষের ঢল নামে। একজন মাত্র নারী, তার দেখাশোনার জন্য পুরো একটি গোত্র (জুরহুম গোত্র) চলে আসে। যে ছেলেকে পিতা একাকী রেখে গেছে এখন তাকে দশ দশ জন মানুষ দেখাশোনা করে। আপনার সমস্যার ফাইলটি (দুআর মাধ্যমে) আসমানে পাঠিয়ে দিন।
ষষ্ঠ পাঠ
আল্লাহ কি আপনাকে আদেশ করেছেন? কত চমৎকার সেই ঈমান... যখন আমরা কেবল আল্লাহ তাআলার নির্দেশের কারণে কোনো কাজ করি। এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকুন, যে আল্লাহর আদেশ পালন করে আল্লাহ তাআলা তার দেখাশোনা করেন। যে হারাম থেকে নিজের হাত গুটিয়ে নেয় আল্লাহ হালাল থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন।
'আর ইসমাইলের মা ইসমাইলকে স্বীয় স্তন্যের দুধ পান করাতেন এবং নিজে ঐ মশক থেকে পানি পান করতেন। অবশেষে মশকে যা পানি ছিল তা ফুরিয়ে গেল। তিনি নিজে তৃষ্ণার্ত হলেন এবং তার শিশু-পুত্রটিও তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়ল। তৃষ্ণায় তার বুক ধড়ফড় করছে অথবা সে মাটিতে পড়ে ছটফট করছে। শিশু-পুত্রের এ করুণ অবস্থার দিকে তাকানো অসহনীয় হয়ে পড়ায় তিনি সরে গেলেন আর সাফা পর্বত থেকে নেমে পড়লেন। নিজের কামিজের এক প্রান্ত তুলে ধরে একজন ক্লান্ত-শ্রান্ত মানুষের মতো ছুটে চললেন। ময়দান অতিক্রম করে 'মারওয়া' পাহাড়ের কাছে এসে তার উপর উঠে দাড়ালেন। এমনিভাবে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করলেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'এ জন্যই মানুষ এ পর্বতদ্বয়ের মধ্যে সাঈ করে থাকে।' অতঃপর তিনি যখন মারওয়া পাহাড়ে উঠলেন, তখন একটি শব্দ শুনতে পেলেন। হঠাৎ সেখানে তিনি একজন ফেরেশতাকে দেখতে পেলেন। সেই ফেরেশতা আপন পায়ের গোড়ালি দ্বারা আঘাত করলেন। ফলে পানি বের হতে লাগল। হাজেরা'র চারপাশে নিজ হাতে বাঁধ দিয়ে এক হাউজের মতো করে দিলেন এবং হাতের কোষভরে তার মশকটিতে পানি ভরতে লাগলেন।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ইসমাইলের মাকে আল্লাহ রহম করুন। যদি তিনি বাঁধ না দিয়ে জমজমকে এভাবে ছেড়ে দিতেন, তাহলে জমজম একটি প্রবহমান ঝরনায় পরিণত হতো। হাজেরা পানি পান করলেন, শিশু-পুত্রকেও দুধ পান করালেন, তখন ফেরেশতা তাকে বললেন, “আপনি ধ্বংসের কোনো আশংকা করবেন না। কেননা এখানেই আল্লাহর ঘর রয়েছে। এ শিশুটি এবং তার পিতা দুজনে মিলে এখানে ঘর নির্মাণ করবে এবং আল্লাহ তার আপনজনকে কখনো ধ্বংস করেন না।”
সপ্তম পাঠ
হাজেরা ভাঙতে জানেন না। সঙ্গে সঙ্গে তিনি সাফা পাহাড়ে উঠে যান দেখতে থাকেন কেউ আসে কি না। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সবক। আপনার পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক, কখনো তা হাজেরার চেয়ে কঠিন হবে না। নবীর স্ত্রী ও নবীর মা হওয়া সত্ত্বেও তিনি সবকিছু মেনে নিয়ে বিকল হয়ে বসে থাকেননি। দুনিয়াটা চেষ্টা-প্রচেষ্টার ঘর।
অষ্টম পাঠ
প্রতিটি কাজেই কষ্ট অনুযায়ী প্রতিদান অর্জিত হয়ে থাকে। যে নারী বলেছিলেন— 'আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না'— আল্লাহ তাআলা সেই নারীর কাছে এক ফেরেশতা পাঠিয়ে বলেন— 'নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তার নিকটতম বান্দাদের ধ্বংস করেন না।' মানুষ বিপদের সময় সান্ত্বনাদানকারী লোকের মুখাপেক্ষী থাকে। আপনি অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গেলে তাকে সুস্থ হওয়ার আশার বাণী শোনান। ঘের অমানিশাপূর্ণ অন্ধকার রজনীর পরই দিগন্ত ভেদ করে আলোর আভা ফুটে ওঠে।
নবম পাঠ
গোটা বিশ্বজগত আল্লাহর হাতে। পানির দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা চাইলে হাজেরার জন্য পানি বের করে আনতে পারতেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তার জন্য জিবরাইল আলাইহিস সালাম-কে পাঠালেন। কারণ তিনি বিপদ অনুযায়ী সান্ত্বনা দিতে চেয়েছেন। জিবরাইল আলাইহিস সালাম মানুষের আকৃতিতে হাজেরার কাছে এসেছিলেন। ফেরেশতাগণ অন্য আকৃতি ধারণ করলেও নিজেদের শক্তি বিদ্যমান থাকে।
দশম পাঠ
যদি হাজেরা আলাইহাস সালাম মশকে পানি না ভরতেন এবং তাকে চারদিক থেকে বেষ্টন না করতেন তাহলে জমজম একটি প্রবহমান ঝরনা হয়ে যেত। মুত্তাকিদেরকে ফেরেশতা মনে করে আচরণ করা যাবে না। ভুলে যাবেন না যে তারাও আপনার মতো মানুষ। হাজেরা আলাইহাস সালাম খুবই পিপাসার্ত ছিলেন। তাই তিনি স্বভাবগতভাবেই সে পানিকে চারদিক থেকে বেষ্টন করে দিয়েছেন।
একাদশ পাঠ
যিনি ধূ-ধূ মরুভূমি থেকে পানি বের করতে পারেন তিনি অবশ্যই মানুষকে বহু সমস্যা-সংকট থেকেও উদ্ধার করতে পারেন। যিনি পাথর থেকে উটনী বের করতে পারেন তিনি আপনার জন্য মানুষের অন্তর থেকে দয়া-মমতা বের করতে পারেন। আপনার সকল জটিল সমস্যার বিষয়গুলো আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে দিন।
'জুরহুম গোত্রের একদল লোক তাদের কাছ দিয়ে অতিক্রম করছিল। তারা মক্কায় নিচু ভূমিতে অবতরণ করল এবং দেখতে পেল একঝাঁক পাখি চক্রাকারে উড়ছে। তারা সেখানে গিয়েই পানি দেখতে পেল। ইসমাইল আলাইহিস সালাম-এর মা পানির কাছে ছিলেন। তারা তাকে বলল, “আমরা আপনার নিকটবর্তী স্থানে বসবাস করতে চাই। আপনি আমাদের কি অনুমতি দেবেন?” তিনি জবাব দিলেন, "হ্যাঁ। তবে, এ পানির উপর তোমাদের কোনো অধিকার থাকবে না।” তারা “হ্যাঁ” বলে তাদের মত প্রকাশ করল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এ ঘটনা ইসমাইলের মাকে একটি সুযোগ এনে দিল। অতঃপর তারা সেখানে বসতি স্থাপন করল। ইসমাইল যৌবনে উপনীত হলেন এবং তাদের থেকে আরবি ভাষা শিখলেন। তারা তার সঙ্গে তাদেরই একটি মেয়েকে বিয়ে দিল।'
দ্বাদশ পাঠ
জুরহুম গোত্রের লোকজন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর ধর্মের উপর ছিল না, কিন্তু তাদের মধ্যে কার্যত ইসলামের চরিত্র বিদ্যমান ছিল। তারা কোনো কিছুই গ্রহণ না করার শর্তে রাজি হয়ে যাওয়াটা আমাদের হৃদয়কে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে! অথচ আমরা অবৈধভাবে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করে থাকি! তারা মনে করত শক্তির চেয়ে অধিকার বড়।
ত্রয়োদশ পাঠ
মানুষকে এ জন্যই ইনসান বলা হয় যে, সে অন্যের মাধ্যমে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। ক্ষুধার্তরা আমাদের কাছে রুটি পাবে। দুঃখ-ভারাক্রান্ত ব্যক্তি আমাদের কাছে সান্ত্বনা পাবে। আপনার মানবতাবোধ পরখ করে দেখুন।
চতুর্দশ পাঠ
বেড়ে ওঠা এবং প্রতিপালনের দিক থেকে ইসমাইল আলাইহিস সালাম আরব; কিন্তু বংশগতভাবে তিনি আরব নন। আমরা সকলেই আদম-সন্তান, আর আদম মাটির তৈরি। আরবের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি বানিয়ে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সম্মানিত করেছেন। কিন্তু এটা অন্যদের ওপর নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে গর্ব করার বিষয় নয়। আকিদা হলো গোত্র, মাটি এমনকি রক্ত থেকেও দামি।
'এরই মধ্যে ইসমাইলের মা হাজেরা ইন্তেকাল করেন। ইবরাহিম তার পরিত্যক্ত পরিজনের অবস্থা দেখার জন্য এখানে আসলেন। কিন্তু তিনি ইসমাইলকে পেলেন না। তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, সে বলল, "আমরা নিদারুণ কষ্টে আছি।” তিনি বললেন, "তোমার স্বামী বাড়ি এলে তাকে বোলো, সে যেন তার ঘরের দরজার চৌকাঠ বদলিয়ে নেয়।” ইসমাইল বাড়ি এসে জানতে পেরে বললেন, “ইনি আমার পিতা। এ কথা দ্বারা তিনি নির্দেশ দিয়েছেন আমি যেন তোমাকে পৃথক করে দিই।” অতঃপর ইসমাইল অন্য একটি মেয়েকে বিয়ে করেন। ইবরাহিম পরে আবার দেখতে এলেন। এবার ইসমাইলের স্ত্রী বলল, "আমরা ভালো এবং স্বচ্ছল অবস্থায় আছি।” সাথে সে আল্লাহর প্রশংসাও করল। ইবরাহিম দুআ করলেন, “হে আল্লাহ! তাদের গোশত ও পানিতে বরকত দিন।” ইবরাহিম বললেন, “তোমার স্বামী যখন ফিরে আসবে, তাকে সালাম বোলো আর হুকুম কোরো, সে যেন তার ঘরের দরজার চৌকাঠ ঠিক রাখে।” ইসমাইল ফিরে এসে বললেন, “ইনিই আমার পিতা। আর তুমি হলে আমার ঘরের দরজার চৌকাঠ।”'
পঞ্চদশ পাঠ
কত চমৎকার ইঙ্গিত—তাকে আদেশ দাও, যেন সে তার দরজার চৌকাঠ পাল্টে ফেলে! ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বহু উঁচুমানের মানুষ। বার্তা পৌঁছে দিতে তিনি ইঙ্গিতপূর্ণ পন্থা অবলম্বন করেছেন। ইঙ্গিতবহ কথাবার্তার ক্ষেত্রে আপনাকে অত্যন্ত সুক্ষদর্শী হতে হবে।
ষোড়শ পাঠ
তাকদিরের ওপর সন্তুষ্টির মধ্যেই আসল প্রাচুর্য রয়েছে। ইসমাইল আলাইহিস সালাম-এর প্রথম স্ত্রীর দৃষ্টি ছিল না-পাওয়া জিনিসের প্রতি, আর দ্বিতীয় স্ত্রী যা পেয়েছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট ও কৃতজ্ঞ থেকেছে। অকৃতজ্ঞদের সঙ্গে ওঠাবসা করার চেয়ে কঠিন আর কিছু নেই। কৃতজ্ঞতার সঙ্গে ওঠাবসা করার চেয়ে সুমিষ্ট আর কিছু নেই।
সপ্তদশ পাঠ
আমাদেরকে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নিছক পিতার নির্দেশে স্ত্রীকে তালাক প্রদান করা কি কল্যাণকর কাজ? সকল পিতাই ইবরাহিম আলাইহিস সালাম নয়। ছেলে নিজেই নিজের জীবনপদ্ধতি নির্ধারণ করবে।
'ইবরাহিম পরে আবার এলেন। দেখতে পেলেন ইসমাইল তার একটি তির মেরামত করছেন। ইবরাহিম বললেন, “আল্লাহ আমাকে এখানে একটি ঘর বানাতে নির্দেশ দিয়েছেন।” এরপর তারা উভয়ে কাবাঘরের দেয়াল তুলতে লেগে গেলেন। ইসমাইল পাথর আনতেন আর ইবরাহিম নির্মাণ করতেন। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম মাকামে ইবরাহিম পাথরের উপর দাঁড়িয়ে নির্মাণ কাজ করতে লাগলেন। সেসময় তারা উভয়ে এ দুআ করলেন— “হে আমাদের রব! আমাদের তরফ থেকে কবুল করুন।”'
অষ্টাদশ পাঠ
ইসমাইল আলাইহিস সালাম অত্যন্ত দক্ষ তিরন্দাজ ছিলেন। এই ধর্ম যেহেতু জিহাদ ও বিজয়ের ধর্ম তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তির-চালনা শিখতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। 'জেনে রাখ শক্তি হলো নিক্ষেপে।' [১]
ঊনবিংশ পাঠ
নিঃসন্দেহে সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্যে নির্ধারিত হয়েছে, সেটাই হচ্ছে এ ঘর, যা মক্কায় অবস্থিত। [১]
বিংশ পাঠ
ইবরাহিম আলাইহিস সালাম যে আকৃতিতে কাবা নির্মাণ করেছিলেন বর্তমানে কি তা সে অবস্থায় আছে? উত্তর হলো-না। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর সময় কাবার দুটি দরজা ছিল এবং হাতিম তার অন্তর্ভুক্ত ছিল। কুরাইশদের সময় অর্থের সংকুলান না থাকায় তারা হাতিমকে বাইরে রেখে দেয়। আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু এটিকে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর সময় যেমন ছিল সেভাবে নির্মাণ করেছিলেন, পরে তা আবার কুরাইশদের নির্মাণের ওপর বহাল করা হয়।
একবিংশ পাঠ
কাবা শরিফের বিভিন্ন অংশ:
এক. হাজরে আসওয়াদ: ফেরেশতারা জান্নাত থেকে পাথরটি এনেছিলেন। এটি বরফের চেয়েও সাদা ছিল। মুশরিকদের গুনাহ একে কালো বানিয়ে ফেলেছে। মানুষের গুনাহ যখন জান্নাতের একটি সাদা পাথরকে কালো বানিয়ে দিতে পারে তখন গুনাহ অন্তরের কী অবস্থা করতে পারে!
দুই. হাতিমে কাবা: এটি কাবার পাশে অর্ধবৃত্তাকার অংশ। বিধানগত দিক থেকে এটা কাবার অংশ।
তিন. মাকামে ইবরাহিম: ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এই পাথরটিতে দাঁড়িয়ে কাবা নির্মাণ করতেন। আল্লাহ তাআলা পাথরটিকে তার জন্য নরম বানিয়ে দিয়েছিলেন।
টিকাঃ
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৩৬৪
[১] সুরা ইবরাহিম, আয়াত-ক্রম: ৩৭; সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৩৬৪
[১] সুরা ইবরাহিম, আয়াত-ক্রম: ৩৭
[১] মুসনাদে আহমদ, হাদিস-ক্রম: ১৩৭৭; সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৫২২৫
[১] রাসূল সা. বলেন, আমি তো কেবল উৎকৃষ্ট চরিত্রের পূর্ণতা দানের জন্য প্রেরিত হয়েছি। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস-ক্রম: ৮৯৫২)
[১] সুনানে আবু দাউদ, হাদিস-ক্রম: ৩৯৮৪
[১] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম : ১৯১৭
[১] সুরা আলে ইমরান, আয়াত-ক্রম: ৯৬
[১] সুরা আলে ইমরান, আয়াত-ক্রম : ১৭
[২] সুনানে তিরমিযি, হাদিস-ক্রম : ৮৭৭