📄 বংশীয় গৌরব
উবাই ইবনে কাব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন- 'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সমকালে দুই ব্যক্তি বংশ নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়ে একজন বলল, "আমি অমুকের পুত্র অমুক। তুমি কে?” এই প্রেক্ষিতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, মুসা আলাইহিস সালাম-এর যুগে দুই ব্যক্তি বংশ নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিল। একজন বলল, “আমি অমুকের পুত্র অমুক।” এভাবে সে ৯ পুরুষের নাম উল্লেখ করল। এরপর বলল, "তুমি কে? তোমার তো কোনো পরিচয়ই নেই!” অপরজন বলল, "আমি অমুকের পুত্র অমুক, যে ইসলামের পুত্র।” আল্লাহ তাআলা তখন মুসা আলাইহিস সালাম-এর কাছে ওহি প্রেরণ করলেন, “আপনি বংশ নিয়ে বিতর্ক করা এ দুই ব্যক্তিকে বলুন, যে ব্যক্তি নিজের ৯ পুরুষ পর্যন্ত নাম উল্লেখ করেছে তার ৯ পুরুষই জাহান্নামি আর সে হলো জাহান্নামে-যাওয়া দশম পুরুষ। আর যে ব্যক্তি নিজের ঊর্ধ্বতন দুই পুরুষের নাম উল্লেখ করেছে সেই দুই পুরুষ জান্নাতি আর সে হলো জান্নাতে-যাওয়া তৃতীয় পুরুষ।”[১]
প্রথম পাঠ
মানুষের পরিচয় নির্ণিত হয় অন্তর ও আচার-ব্যবহারের মাধ্যমে, অর্থ-বিত্ত কিংবা পোষাক-আশাকের মাধ্যমে নয়। তারা কীভাবে জমিনে চলাচল করছে সেটাই লক্ষণীয় বিষয়, কে কার ঔরস থেকে এল সেটা দেখার বিষয় নয়। বংশের মাধ্যমে যদি কেউ উপকৃত হতো তাহলে হাশেমি বংশের আবু লাহাব উপকৃত হতো। আর বংশের মাধ্যমে কারও ক্ষতি সাধন হলে বিলাল ইবনে রাবাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু ক্ষতির সম্মুখীন হতেন। কেননা তিনি গোলাম ছিলেন। কুরআনুল কারিমে লুকমান হাকিমের কথা এসেছে। তিনিও একজন গোলাম ছিলেন। বংশ যতই উঁচু হোক, কেউ যেন নিজেকে সে পরিচয়ে প্রকাশ না করে। বংশ যতই নীচু হোক, কেউ যেন এ কারণে কাউকে হেয় না করে। প্রত্যেকে একাকী মৃত্যুবরণ করবে। তাকে একাকী দাফন করা হবে। তার হিসাব হবে একাকী। নবীর পুত্র হওয়া সত্ত্বেও নুহ আলাইহিস সালাম-এর ছেলের কোনো উপকার হয়নি। মুশরিকের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর কোনো ক্ষতি হয়নি। হাদিসে এসেছে, 'হে মুহাম্মদের বেটি ফাতেমা, নিজে আমল করো। কেননা আল্লাহর কাছে আমি তোমার কোনো কাজে আসব না। হে মুহাম্মদের চাচা আব্বাস! আপনি আমল করুন। আল্লাহর কাছে আমি আপনার কোনো কাজে আসব না।'[২]
দ্বিতীয় পাঠ
পিতৃপুরুষ নিয়ে গর্ব করার অধিকার মানুষের আছে। গর্ব ও অহংকারের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। আপনার বংশ কুলীন হলে এমন কাজ করবেন না যাতে আপনার বংশ কলঙ্কিত হয়ে যায়। আবার, বংশ নীচু হলে তার সঙ্গে নীচু মানসিকতার কাজকে মিলিয়ে দেবেন না। বংশ সম্ভ্রান্ত হলে তাতে কখনো নিকৃষ্ট কাজের অনুপ্রবেশ ঘটাবেন না। বংশকে নীচু করার পাশাপাশি নিজেও কাজে কর্মে নীচু হয়ে যাবেন না। সুলাইমান ইবনে দাউদ আলাইহিমাস সালাম। নবীর ঔরসে নবী। তিনি তার রবের কাছে প্রার্থনা করেন— ‘হে আমার পালনকর্তা, আপনি আমাকে সামর্থ দান করুন যাতে আমি আপনার সেই নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি, যা আপনি আমাকে প্রদান করেছেন।’[১] পিপীলিকার কথা শুনে তিনি মুচকি হাসেন। হুদহুদের অনুপস্থিতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত পৃথিবী শাসন করেছেন। কিন্তু বংশ তাকে অহংকারী বানিয়ে দেয়নি। রাজত্ব তাকে ইবনেষ্ট করে দিতে পারেনি। শুধু মনের প্রশান্তি ও আনন্দ নয় বরং তাদের ঘটনায় অফুরন্ত শিক্ষা রয়েছে। ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর কথাই ধরুন না! যাঁর বংশ মানবজাতির মধ্যে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট। তার পিতা ছিলেন ইয়াকুব আলাইহিস সালাম। তার পিতা ছিলেন ইসহাক আলাইহিস সালাম। তার পিতা ছিলেন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম। নিজে নবী ছিলেন। পিতা নবী ছিলেন। দাদা নবী ছিলেন। পরদাদাও নবী ছিলেন। তিনি মিসকিনদের খাবার খাওয়াতেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘আপনি খাদ্যভাণ্ডার দায়িত্বশীল হওয়া সত্ত্বেও রোজা রাখেন কেন?’ তিনি বলেন, ‘যেন আমি ক্ষুধার্তদের ভুলে না যাই!’
তৃতীয় পাঠ
আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে ন্যায়পরায়ণ। সন্তানের কারণে তিনি পিতাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন না, আবার পিতার কারণে সন্তানকেও জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন না। আলোচ্য হাদিসের বিষয়টি আল্লাহর পক্ষ থেকে আগাম সংবাদ। তিনি জানেন, এই অহংকারী বংশ তাকেও জাহান্নামের দিকে টেনে নিয়ে যাবে। এই সকল আয়াত ও ঘটনা অধ্যায়নের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার প্রতি আমাদের উত্তম ধারণা রাখা উচিত। আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ। তার ন্যায়-নিষ্ঠতার ক্ষেত্রে আমাদের কোনো সন্দেহে নিপতিত হওয়ার অবকাশ নেই। আল্লাহ তাআলা পরম দয়ালু। তিনি যদি আমাদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেন তবু তার ব্যাপারে আমাদের কোনো সন্দেহ প্রকাশের অবকাশ নেই। মানুষের প্রতিই যখন আমাদেরকে সুধারণা পোষণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তখন আল্লাহর বিষয়টি কেমন হতে পারে! মানুষের কাজকর্ম দিয়ে আল্লাহকে তুলনা করা যাবে না। তেমনিভাবে আল্লাহ তাআলার কাজকর্ম দিয়ে মানুষকে তুলনা করা যাবে না। তিনি তো এমন রব যিনি আঙুল-পরিমাণও জুলুম করেন না। তিনি তো মানুষ নন, যারা রাগের বশে ভালো মানুষের সঙ্গেও নিকৃষ্ট মানুষের মতো আচরণ করে। বরং অনুগ্রহ বশতঃ তিনি অপরাধীকে ক্ষমা করে দিয়ে থাকেন। একটি তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে তিনি ব্যভিচারিণীকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন। যে কখনো কোনো ভালো কাজ করত না কিন্তু লেনদেনের ক্ষেত্রে মানুষকে ছাড় দিত তিনি তাকেও ছাড় দিয়ে দেন। তিনি তো পিতা নেককার হওয়ায় সন্তানকেও সম্মানিত করে থাকেন। নবী মুসা এবং খিজির আলাইহিমাস সালাম-কে দুই বালকের দেওয়াল উঠিয়ে দেওয়ার জন্য কেবল এই কারণেই তো পাঠিয়েছিলেন যে, তাদের পিতা ছিলেন সৎ। কিন্তু তিনি বংশ ও আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণে ভালো ব্যক্তিকে পাকড়াও করেন না।
চতুর্থ পাঠ
জান্নাত নম্র-ভদ্র ও সহজ-সরল মানুষের ঠিকানা, আর জাহান্নাম অহংকারী ও অবাধ্যদের ঠিকানা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিনয় এত অধিক ছিল যে, তিনি তার সম্মানার্থে সাহাবিগণকে দাঁড়াতে নিষেধ করতেন। একবার তার জন্য সাহাবাগণ দাঁড়িয়ে গেলে তিনি রাগান্বিত হয়ে যান। রাগের সময় তার চেহারায় রাগের চিহ্ন ফুটে উঠত। কিন্তু এমতাবস্থায় তিনি কাউকে বকাঝকা বা তিরস্কার করতেন না। তো, নবীজি ওই সময় রাগান্বিত হওয়ায় হাসসান ইবনে সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহু পরিস্থিতিটা একটু স্বাভাবিক করতে চাইলেন। তিনি পঙক্তি আকারে বললেন— 'প্রিয় ব্যক্তির জন্য দাঁড়ানোটা আমার জন্য ফরজ। ফরজ পরিত্যাগ করা তো আমাদের জন্য শোভা পায় না। যার জ্ঞান-বুদ্ধি রয়েছে তাকে দেখে আশ্চর্য হই এমন সৌন্দর্য দেখা সত্ত্বেও সে কীভাবে না দাঁড়িয়ে থাকতে পারে!' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সঙ্গে সঙ্গে মুচকি হেসে দেন। তিনি রাগান্বিত হতেন অনেক দেরি করে আর খুশি হয়ে যেতেন খুব দ্রুত। বেদুইনরা তার কাছে এলে ভীত হয়ে যেত। তিনি ভীতি দূর করার জন্য বলতেন, 'শান্ত হও! আমি তো মক্কার এক সাধারণ নারীর সন্তান, যে শুকনো রুটি ও গোশত খেতো।'
একবার তিনি বসে আছেন আর সাত বছরের ছোট্ট মেয়ে হাত ধরে তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তিনিও তার সঙ্গে হাঁটছেন। জানেন না, আসলে কোথায় হেঁটে চলেছেন! এরপর মেয়েটি তাকে মনিবের কাছে সুপারিশ করতে বলল। কেননা তারা তাকে কোনো এক প্রয়োজনে পাঠিয়েছিল। আসতে বিলম্ব হয়ে গেছে। তিনি মেয়েটির জন্য সুপারিশ করলেন! আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু'র ছোট্ট এক ভাই ছিলেন। নাম আবদুল্লাহ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সঙ্গে খেলাধুলা করতেন। তিনি তাকে আবু উমায়ের উপাধি দিয়েছিলেন। আবু উমায়রের একটি ছোট্ট পাখি ছিল। নাম ছিল নুগাইর। উমায়ের নুগাইরের সঙ্গে খেলাধুলা করতেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিছুদিন পর তাকে জিজ্ঞেস করেন, 'আবু উমায়ের, তোমার নুগায়ের কোথায় গেল?' আবু উমায়ের তখন কাঁদতে লাগলেন। কারণ, নুগায়ের মারা গিয়েছিল। নবীজি তখন (সান্ত্বনা দিতে) তার গলা জড়িয়ে ধরলেন।[১] নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর আমার মাতা-পিতা যেন কুরবান হন। তিনি খুব সহজেই মানুষের সাথে মিশে যেতেন। তাদের সুখ-দুঃখের অংশীদার হতেন। ছিলেন সাধারণ মানুষের প্রতি নমনীয় ও সহানুভূতিশীল। তার সাহাবিদের অবস্থাও এমনই ছিল।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে বিনয় আর নম্রতার দীক্ষায় গড়ে তুলেছিলেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু খলিফা হওয়া সত্ত্বেও এক বৃদ্ধের ঘর পরিষ্কার করতেন। তিনি রাস্তায় হাঁটতেন আর ছোট্ট শিশু তার কাপড় ধরে টেনে বলত, 'আব্বু... আব্বু...' হকের ক্ষেত্রে উমর অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। কিন্তু প্রজাদের ক্ষেত্রে তার অন্তর ছিল একজন স্নেহপ্রবণ মায়ের মতো। এক বেদুইন নারী। আল্লাহ ব্যতীত তার আর কোনো সহায় ছিল না। তার সন্তান প্রসবের জন্য উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজ স্ত্রীকে সাহায্যকারী হিসেবে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি নিজ পিঠে করে আটার বস্তা বহন করে নিয়ে গেছেন। আর নিজ হাতে এতিম শিশুদের রান্না করে খাইয়েছেন। পারস্যের দূত এসে তার রাজপ্রাসাদ খুঁজতে থাকে। সে কোনো প্রাসাদ বা রাজসিংহাসন কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। লোকদেরকে জিজ্ঞেস করল। দেখতে পেল উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এক গাছের নিচে ঘুমিয়ে আছেন।
তার নাতি উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহিমাহুল্লাহ অন্ধকারে মসজিদে যাচ্ছিলেন। তখন এক অসতর্ক ব্যক্তির পায়ের সঙ্গে তার পা লেগে যায়। লোকটি রাগান্বিত হয়ে বলে উঠল, 'আপনি কি অন্ধ?' উমর ইবনে আবদুল আজিজ বললেন, 'না।' খলিফার সঙ্গে থাকা লোকজন রাগান্বিত হয়ে যান। উমর ইবনে আবদুল আজিজ বললেন, 'তাকে ছেড়ে দাও। সে তো আমাদেরকে একটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছে আর আমরা তার উত্তর দিয়েছি মাত্র।' এক রাতে তার (কামরার) বাতিটি নিভে যায়। তিনি বাতিতে তেল ঢালার জন্য উঠলেন। লোকজন বলল, 'আমিরুল মুমিনিন! অন্যকে যদি কাজটি করার সুযোগ দিতেন!' তিনি বললেন, 'কাজটি আমি নিজে করলেও যেই উমর ইবনে আবদুল আজিজ ছিলাম সেই উমর ইবনে আবদুল আজিজই থাকব।' তাদের ঘটনায় বহু শিক্ষা রয়েছে।
টিকাঃ
[১] মুসনাদে আহমদ, হাদিস-ক্রম: ২১১৭৮। সনদ সহিহ।
[২] মাজমাউয যাওয়ায়েদ, ১/৫৪
[১] সুরা নামল, ২৭: ১৯
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৬২০৩
📄 দুগ্ধপোষ্য সন্তান
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
'বনি ইসরাইলের এক নারী তার শিশুকে দুধ পান করাচ্ছিল। তার পাশ দিয়ে একজন সুদর্শন পুরুষ আরোহী চলে গেল। নারীটি দুআ করল, “হে আল্লাহ! আমার ছেলেটিকে তার মত বানাও।” শিশুটি তখনই তার মায়ের স্তন ছেড়ে দিল এবং আরোহীটির দিকে মুখ ফেরাল। আর বলল, “হে আল্লাহ! আমাকে তার মতো কোরো না।” অতঃপর মুখ ফিরিয়ে স্তন্য পান করতে লাগল।' আবু হুরায়রা বলেন, “আমি যেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখতে পাচ্ছি তিনি আঙুল চুষছেন।” অতঃপর সেই নারীর পাশ দিয়ে এক দাসী গেল। নারী বলল, “হে আল্লাহ! আমার শিশুটিকে এর মতো কোরো না।” শিশুটি তাৎক্ষণিক তার মায়ের স্তন্য ছেড়ে দিল এবং বলল, “হে আল্লাহ! আমাকে তার মত কোরো।” তার মা বলল, “কেন?” শিশুটি বলল, "সেই আরোহীটি ছিল জালেমদের একজন। আর এ দাসীকে মানুষজন চুরি ও ব্যভিচারের অপবাদ দেওয়ার পরও সে তাদের কিছুই করেনি।””
প্রথম পাঠ
কিছু বিষয় এমন রয়েছে, তা যখনই আনা হোক, উপকারী হয়ে থাকে। মনীষীগণ বলেছেন, একেবারে না আসার চেয়ে শেষে আসাটাও ভালো। অবিরাম কয়েকদিন ভারী বর্ষণের চেয়ে বিলম্বে বৃষ্টি আসাটা উপকারী। ঘটনা নসিহতমূলক হোক বা অন্তরের প্রশান্তি দানকারী হোক, মানুষের কাছে তা প্রিয়। ঘটনা অন্তরে প্রভাব সৃষ্টি করে থাকে। মানুষ মনোযোগ সহযোগে শোনে। কুরআনে যেসব ঘটনা বিবৃত হয়েছে নিঃসন্দেহে সেগুলো সংঘটিত হয়েছে। যদিও তা সাধারণ রীতিবিরুদ্ধ হোক।
ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-কে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি পুড়ে যাননি। মুসা আলাইহিস সালাম লাঠির আঘাতে সমুদ্র বিদীর্ণ করেছিলেন। ইউনুস আলাইহিস সালাম মাছের পেটে অবস্থান করেছিলেন। সুলাইমান আলাইহিস সালাম-এর পাখির সঙ্গে কথাবার্তা বলা এবং জিনদের শাসন করাটা বাস্তব বিষয়। নুহ আলাইহিস সালাম কিশতি বানিয়েছিলেন। পাহাড়ের মতো উঁচু ঢেউয়ে তাতে আরোহণ করেছিলেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই। ইসমাইল আলাইহিস সালাম-কে দুম্বার মাধ্যমে জবাইয়ের হাত থেকে রক্ষা করা হয়েছে। এ নিয়ে বিতর্কের কোনো সুযোগ নেই। অতি আশ্চর্যজনক হবার কারণে কুরআন ও হাদিসে এসব ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা এর ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখি।
তেমনিভাবে আমরা এ সকল ঘটনা বর্ণনাকারী এবং যাঁদের থেকে বর্ণিত হয়েছে তাদের সত্যতার ব্যাপারেও বিশ্বাস রাখি। আমরা বিস্ময়কর এই ঘটনাগুলোর প্রতি বিশ্বাস রাখি কারণ, সবকিছুর আগে আমরা এই বিশ্বাস রাখি যে, সবকিছুই আল্লাহর হাতে। তাই আল্লাহ এবং তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে যেসব সংবাদ দেন সে বিষয়ে যথাযথ আদব রক্ষা করা আমাদের জন্য আবশ্যক। কুরআনুল কারিম এবং হাদিসের ঘটনাগুলো আলিফ-লায়লার মতো আনন্দ-উপভোগের জন্য নয়। আবু জায়েদ হেলালির ঘটনার মতো নয়; যাতে বীরত্ব ও হিংস্রতা উপস্থাপিত হয়েছে। এমনিভাবে এগুলো শাহনামা এবং মিশরীয় বাদশাহদের মৃত্যুকাহিনি সম্বলিত গ্রন্থের মতোও নয়। এগুলো তো প্রথমে শিক্ষা অর্জনের জন্য... উপদেশ গ্রহণের জন্য...
'আপনি ঘটনা বর্ণনা করুন, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে।' [১]
কুরআন ও হাদিসের ঘটনায় যেসব ব্যক্তির নাম এসেছে সেগুলো কিছু দৃষ্টান্ত মাত্র। যুগে যুগে এ নামগুলো পরিবর্তিত হতে থাকে। প্রত্যেক যুগেই মুসা-ফিরআউন, ইবরাহিম ও নমরুদ ছিল। প্রত্যেক যুগেই অবাধ্য এবং আসহাবুল উখদুদ ছিল। প্রত্যেক যুগে মুহাম্মদ ও আবু জেহেল ছিল। প্রত্যেক যুগেই যুদ্ধক্ষেত্রে স্বল্প সংখ্যক বদরি মুসলমান এবং বহু সংখ্যক কুরাইশের উপস্থিতি ছিল। প্রত্যেক যুগেই জুরাইজের মতো আবেদ এবং তার সম্প্রদায়ের মতো পাপাচারী লোক ছিল। প্রত্যেক যুগেই সরল-সহজ মানুষ ছিলেন। যাদের ঈমান ছিল ফিরআউনের চুল-আঁচড়ানো বাঁদির মতো পাহাড়সম সুদৃঢ়। প্রত্যেক যুগেই ফিরআউনের মতো পাপিষ্ঠ স্বামী ছিল। প্রত্যেক যুগেই নুহ ও লুত আলাইহিস সালাম-এর স্ত্রীর মতো দুরাচারী স্ত্রী ছিল। প্রত্যেক যুগেই নুহ আলাইহিস সালাম-এর সন্তানের মতো অবাধ্য সন্তান ছিল। প্রত্যেক যুগেই আবু লাহাবের মতো জালেম চাচা ছিল। উল্লিখিত এ সকল ঘটনা থেকে আমাদেরকে এই শিক্ষা নিতে হবে যে, আমরাই শুরু নই। আবার আমরাই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির শেষ ব্যক্তি নই।
দ্বিতীয় পাঠ
বস্তুর চাকচিক্য যেন আপনাকে ধোঁকায় ফেলে না দেয়। কখনো কখনো বস্তুর বিপরীত দিকটা ভেসে ওঠে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু একবার খেজুরগাছে উঠলেন। তার সরু উড়ু দুটি দেখে সাহাবায়ে কেরাম হেসে ফেললেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে বললেন, 'ইবনে মাসউদের উরু দুটি মিজানের পাল্লায় উহুদ পাহাড়ের চেয়েও অধিক ভারী হবে।' [২]
আমিরুল মুমিনিন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু'র জামায় ১৭টি তালি ছিল। আমাদের কেউ তার এই অবস্থা দেখলে মুখ ফিরিয়ে নিত। যদি আমাদের কেউ আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে দেখত যে তিনি মদিনার অলিগলিতে হাঁটছেন, আর ছেলেপেলেরা তার কাপড় টেনে বলছে 'আব্বু...আব্বু...' তাহলে তাকে নগণ্য কিছু মনে করত! যদি আমাদের কেউ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে মসজিদ ঝাড়ুদার নারীর প্রতি একবার তাকাত তাহলে আর তার দিকে তাকানোর চেষ্টা করত না। যদি কেউ বারা ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে দেখত, এলোমেলো চুল, ধুলিমলিন চেহারা, দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, তাকে কেউ পাত্তাই দেয় না, [১] তাহলে সেও তাকে কোনো গুরুত্ব দিত না। বাহ্যিক রূপ মানুষকে ধোঁকায় ফেলে দেয়। মানুষকে তো পোশাক-আশাক দিয়ে নয়; বরং অন্তরের (আমল ও আখলাকের) মাধ্যমে যাচাই করতে হয়।
আমি পোশাক আশাক ও উত্তম বেশভূষা ও সৌন্দর্য অবলম্বনের বিরোধী নই। বরং তার সম্পূর্ণ বিপরীত। কেননা আল্লাহ তাআলা বান্দার গায়ে তার নেয়ামতের চিহ্ন দেখাটা পছন্দ করেন। [২]
কিন্তু বাহ্যিক দিকটাই সবকিছু নয়। আমাদের উল্লিখিত ঘটনায় নেতাগোছের এক ঘোড়সাওয়ার ছিল। যার প্রসিদ্ধি ছিল মুখে মুখে। মহিলাটি আকাঙ্ক্ষা করেছিল, ছেলেটি যেন তার মতোই হয়। সে তার বাহ্যিক অবস্থা দেখে ধোকায় পড়ে গিয়েছিল। আমাদের সকলের অবস্থাই এমন। আমরা কারও হাতে ধন সম্পদ, শক্তি-সামর্থ্য দেখতে পেলে ধোঁকা খেয়ে যাই। আলোচ্য শিশুটি মায়ের দুআ প্রত্যাখ্যান করতে পেরেছে, কারণ আল্লাহ তাআলা তাকে বাকশক্তি দান করেন। ধন-সম্পদ, সৌন্দর্য আমাদেরকে অহংকারী বানিয়ে দিলে এর কী মূল্য আছে? ওই কালো বাঁদি, যাকে চুরি ও ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছিল। মা দুআ করেছিল, সন্তানটি যেন এ বাঁদির মতো না হয়। আল্লাহ তাআলা তখন শিশুটিকে বাকশক্তি দান করেছেন। সে বলেছে, হে আল্লাহ! আপনি আমাকে তার মত বানান। কেননা জালেম হওয়ার চাইতে মাজলুম হওয়াটা কল্যাণকর। যদি আপনি আকাশে পরিচিত হতে পারেন তাহলে জমিনে অপরিচিত থাকাটা কোনো সমস্যাই না।
তৃতীয় পাঠ
ঘরগুলো রহস্যময়। মানুষগুলো বন্ধ বাক্স। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে জন্মদিন পালনের চিত্রটা মাথায় আনুন। জন্মদিন পালনের জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান দ্বারা কিন্তু এটা বুঝে আসে না যে, সন্তানের মাতা-পিতা, তারা স্বামী স্ত্রী অত্যন্ত সুখী। ইন্সট্রাগ্রামের সুস্বাদু খাবারের চিত্রটা স্মরণ করুন। এতে কিন্তু এটা বুঝে আসে না যে, মানুষ যা খুশি তাই বানাতে পারে। কখনো কখনো সুখ স্বল্পতার কারণেও মানুষ আমাদেরকে বলে থাকে যে, আমরা সুখী।
এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে নিয়ে চিড়িয়াখানায় গেল। তারা বানরের খাঁচার পাশ দিয়ে অতিক্রম করল। তারা দেখতে পেলো, পুরুষ বানর নারী নারী বানরকে নিয়ে খেলাধুলা করছে। স্ত্রী তখন বলল, আহ তাদের ভালোবাসা কত মধুর! এরপর তারা সিংহের খাঁচার কাছে দিয়ে অতিক্রম করল। তারা দেখতে পেল, পুরুষ সিংহটি একাকী নিশ্চুপ বসে আছে আর নারী সিংহটি দূরে গিয়ে খেলাধুলা করছে। স্ত্রী তখন বলল, তাদের ভালোবাসা কত বিষাদ! তখন মহিলাটির স্বামী ছোট্ট লাঠি নিয়ে নারী সিংহের উপর মারলো। এতে পুরুষ সিংহটি উত্তেজিত হয়ে উঠলো। সিংহীকে রক্ষার জন্য সে দৌড়ে আসলো। এরপর তারা বানরের খাঁচার কাছে ফিরে আসলো। পুরুষ লোকটি নারী বানরের উপর একটি ছোট্ট লাঠি নিক্ষেপ করল। কিন্তু দেখা গেল পুরুষ বানরটি তখনো খেলাধুলায় মত্ত রয়েছে। যেন কোনো কিছু ঘটেনি। আমরা যা দেখি তার চেয়ে বেশি ভাবা থেকে বিরত থাকতে হবে।
চতুর্থ পাঠ
কখনো কখনো মানুষ এমন জিনিস প্রার্থনা করে থাকে যাতে তাদের জন্য ক্ষতি রয়েছে। তারা জানে না যে, আল্লাহ তাআলার না দেওয়াটাও এক ধরনের দান। কিছু মানুষ এমন রয়েছে, দরিদ্রতাই যার উপযোগী। কিছু মানুষ এমন রয়েছে, প্রাচুর্য তাকেই মানায়। বহু অসুস্থ মানুষ রয়েছে যদি তারা সুস্থ হতো তাহলে অহংকারী হয়ে যেত। বহু ধনী রয়েছে যারা আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করে থাকে। যদি তারা দরিদ্র হতো তাহলে আল্লাহর শানে কুফরি করত। বহু সুস্থ আবেদ রয়েছে যদি তারা অসুস্থ হতো তাহলে পাপাচারে লিপ্ত হয়ে যেত।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কথাটি সবসময় স্মরণ করুন। তিনি বলেন, যদি গায়েবের পর্দা উন্মোচিত হয়ে যেত তাহলে আমাদের প্রত্যেকেই নিজের জন্য তাই নির্বাচন করত যা আল্লাহ আমাদের জন্য নির্বাচন করে রেখেছেন।
এক দরিদ্র ব্যক্তি এক হাকিমের কাছে উপস্থিত হয়ে তার দুরবস্থার অভিযোগ করে। তিনি প্রতিদিন তাকে স্মরণ করিয়ে দিতেন যে, তিনি মানুষের অবস্থা সম্পর্কে জানেন না। কিন্তু যখন এ ব্যক্তির বারংবার অভিযোগের কারণে তিনি বিরক্ত হয়ে গেলেন তখন তাকে হাতে কলমে বিষয়টি বুঝিয়ে দিতে চাইলেন। এই উপলক্ষ্যে তিনি গ্রামের সকল মানুষকে জমায়েত করলেন। প্রত্যেককে তাদের সমস্যাগুলো লিখে দিতে বললেন। প্রত্যেকেই নিজেদের নাম উল্লেখ করা ব্যতীত সমস্যাগুলো লিখে পাঠাল। হাকিম সাহেব এ কাগজগুলো একটি বাক্সে ভরে রাখলেন। পরদিন লোকটি এলে তাকে বললেন, এই তো তোমার সামনেই মানুষের জীবন উপস্থিত। এগুলোর মধ্যে থেকে কোনো একটা জীবন তুমি নিজের জন্য নির্বাচন করে নাও। লোকটি কাগজ ওঠানো শুরু করল। প্রথম কাগজটি নিল, তা তার ভালো লাগল না। ফেলে দিল। এরপর দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ এভাবে করে সবগুলো কাগজ তুলে পড়ে ফেলে দিল। এবার সে হাকিম সাহেবকে বলল, 'আমার জীবন নিয়েই আমি সন্তুষ্ট।'
তাকদিরের ওপর সন্তুষ্টির মধ্যেই আসল প্রাচুর্য রয়েছে। আল্লাহর শপথ, অল্পে সন্তুষ্টিই দুনিয়ার আসল প্রাচুর্য।
টিকাঃ
[১] সুরা আরাফ, আয়াত-ক্রম: ১৭৬
[২] মুসনাদে আহমদ, ৯২০
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৪৩৬
[১] সুনানে তিরমিযি, ৩৮৫৪
[২] সুনানে তিরমিযি, ২৮১৯
📄 স্বপ্ন
সামুরাহ ইবনু জুনদুব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রায়ই সহাবিদেরকে বলতেন, ' তোমাদের কেউ কোনো স্বপ্ন দেখেছ কি?' কেউ স্বপ্ন দেখলে তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে তা বর্ণনা করতেন। এমনই এক সকালে তিনি আমাদেরকে বললেন, 'গত রাতে আমার কাছে দুজন আগন্তুক এসেছিল। তারা আমাকে উঠাল। আর বলল, “চলুন।” আমি তাদের সঙ্গে চললাম। আমরা কাত হয়ে শুয়ে থাকা এক লোকের কাছে পৌঁছুলাম। দেখলাম, অন্য এক লোক তার কাছে পাথর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে তার মাথায় পাথর নিক্ষেপ করছে। লোকটির মাথা ফেটে যাচ্ছে। আর পাথরটি অন্যত্র গিয়ে পড়ছে। এরপর সে আবার পাথরটি নিয়ে আসছে। ফিরে আসতে না আসতেই লোকটির মাথা আগের মতো আবার ভালো হয়ে যাচ্ছে। ফিরে এসে তেমনি আচরণ করতে থাকে, যা সে পূর্বে প্রথমবার করেছিল।' তিনি বলেন, 'আমি তাদের বললাম, “সুবহান্নাল্লাহ! এরা কারা?” তারা আমাকে বলল, "চলুন, সামনে চলুন।”
তিনি বলেন, এরপর আমরা চিৎ হয়ে শোয়া এক ব্যক্তির কাছে পৌঁছুলাম। তার কাছে এক লোক লোহার কাঁচি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর সে তার চেহারার একদিকে এসে এটা দ্বারা মুখমণ্ডলের একদিক থেকে মাথার পিছনের দিক পর্যন্ত এবং অনুরূপভাবে নাসারন্ধ্র ও চোখ থেকে মাথার পেছন দিক পর্যন্ত চিরে ফেলছে। এরপর ঐ লোকটি শায়িত লোকটির অপরদিকে যায় এবং প্রথম দিকের সঙ্গে যেমন আচরণ করেছে তেমনি আচরণই অপরদিকের সঙ্গেও করে। ঐ দিক থেকে অবসর হতে না হতেই প্রথম দিকটি আগের মতো ভালো হয়ে যায়। তারপর আবার প্রথমবারের মতো আচরণ করে। আমি বললাম, “সুবহানাল্লাহ! এরা কারা?” তারা আমাকে বলল, “চলুন, সামনে চলুন।”
'আমরা চললাম এবং চুলার মতো একটি গর্তের কাছে পৌঁছালাম। তাতে উঁকি মারতেই দেখলাম, বেশ কিছু উলঙ্গ নারী-পুরুষ। নিচ থেকে উঠে আসা আগুনের লেলিহান শিখা তাদেরকে স্পর্শ করছে। যখনই লেলিহান শিখা তাদেরকে স্পর্শ করে, তখনই তারা উচ্চস্বরে চিৎকার করে ওঠে। আমি সাথিদের বললাম, "এরা কারা?” তারা বলল, "চলুন, সামনে চলুন।””
তিনি বলেন, 'আমরা চললাম এবং একটা নদীর (তীরে) গিয়ে পৌঁছালাম। নদীটি ছিল রক্তের মতো লাল। দেখলাম, তাতে এক ব্যক্তি সাঁতার কাটছে। আর নদীর তীরে আরেক লোক অনেকগুলো পাথর একত্রিত করে রেখেছে। নদীর লোকটি বেশ কিছুক্ষণ সাঁতার কাটার পর পাথর একত্র করে রাখা ব্যক্তির কাছে পৌঁছে। এখানে এসে সে তার মুখ খুলে দেয় আর ঐ লোক তার মুখে একটি পাথর ঢুকিয়ে দেয়। এরপর সে চলে যায়, সাঁতার কাটতে থাকে। আবার তার কাছে ফিরে আসে। যখনই সে তার কাছে ফিরে আসে তখনই সে তার মুখ খুলে দেয়, আর ঐ ব্যক্তি তার মুখে একটা পাথর ঢুকিয়ে দেয়।' তিনি বলেন, 'আমি জানতে চাইলাম, “এরা কারা?” সাথিরা বলল, “চলুন, সামনে চলুন।”
'আমরা চললাম এবং এমন একজন কুশ্রী লোকের কাছে পৌঁছলাম, যাকে তোমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে কুশ্রী বলে মনে হয়। দেখতে পেলাম সে আগুন জ্বালাচ্ছে আর তার চতুর্দিকে দৌড়াচ্ছে। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, “এ লোকটি কে?” তারা বলল, “চলুন, সামনে চলুন।”
আমরা চললাম এবং একটা সজীব-শ্যামল বাগানে হাজির হলাম। যেখানে বসন্তের হরেক রকম ফুলের কলি রয়েছে। আর বাগানের মধ্যে আকাশসম উঁচু দীর্ঘকায় একজন পুরুষ রয়েছেন। তার মাথা যেন আমি দেখতেই পাচ্ছি না। তার চারপাশে বহু বালক-বালিকা। এত বেশি বালক-বালিকা আমি আর কখনো দেখিনি। আমি সাথিদে বললাম, "উনি কে? এরা কারা?” তারা বলল, "চলুন, সামনে চলুন।”
'আমরা চললাম এবং একটা বিরাট বাগানে গিয়ে পৌঁছুলাম। এমন বড় এবং সুন্দর বাগান আমি ইতিপূর্বে দেখিনি। তারা আমাকে বলল, “এর উপরে চড়ুন।” আমরা উপরে চড়লাম। হাজির হলাম স্বর্ণ ও রৌপ্যের ইট দ্বারা তৈরি একটি শহরে। আমরা শহরের দরজায় পৌঁছে দরজা খুলতে বললাম। দরজা খুলে দেয়া হলো। আমরা তাতে প্রবেশ করলাম। তখন সেখানে আমাদের সঙ্গে এমন কিছু লোক সাক্ষাৎ করল যাদের শরীরের অর্ধেক খুবই সুন্দর, যা তোমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে সুন্দর মনে হয়। আর শরীরের অর্ধেক বেশ কুশ্রী ছিল যা তোমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে কুশ্রী মনে হয়। আমার সাথিদ্বয় তাদেরকে বলল, "যাও, ঐ নদীতে গিয়ে নেমে পড়ো।” নদীটা ছিল প্রশস্ত ও প্রবাহমান, পানি ছিল দুধের মতো সাদা। তারা তাতে গিয়ে নেমে পড়ল। এরপর আমাদের কাছে ফিরে এল। দেখা গেল তাদের এ কুৎসিত ভাবটুকু দূর হয়ে গেছে। তারা খুবই সুন্দর আকৃতির হয়ে গেছে।
'তারা আমাকে বলল, “এটা জান্নাতে আদন এবং এটা আপনার বাসস্থান।”” তিনি বলেন, 'আমি বেশ উপরের দিকে তাকালাম, দেখলাম ধবধবে সাদা মেঘের মতো একটি প্রাসাদ। তারা আমাকে বলল, "এটা আপনার বাসগৃহ।”
'আমি তাদেরকে বললাম, “আল্লাহ তোমাদের বরকত দিন! আমাকে সুযোগ দাও, আমি এতে প্রবেশ করি।” তারা বলল, “অবশ্যই আপনি এতে প্রবেশ করবেন। তবে এখন নয়।”
'আমি তাদের বললাম, "পেছনে অনেক বিস্ময়কর বিষয় দেখলাম, এগুলোর তাৎপর্য কী?” তারা বলল, “আচ্ছা, তাৎপর্য এখন আপনাকে বলি। ঐ যে প্রথম ব্যক্তি যার কাছে আপনি পৌঁছেছিলেন, যার মাথা পাথর দিয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হচ্ছিল, সে কুরআন জেনে তা ছেড়ে দিয়েছে, আর সে ফরজ নামাজ ছেড়ে ঘুমিয়ে থাকত।
"আর যাকে দেখেছেন, মুখের এক ভাগ মাথার পেছন দিক পর্যন্ত, এমনিভাবে নাসারন্ধ্র ও চোখ মাথার পিছন দিক পর্যন্ত চিঁড়ে ফেলা হচ্ছিল সে সকালে ঘর থেকে বের হয়ে কোনো মিথ্যা বলত, যা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত।
"চুলা সদৃশ গর্তের ভেতরে থাকা উলঙ্গ নারী-পুরুষরা ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীর দল।
"আর যাকে নদীতে সাঁতার কাটতে ও মুখে পাথর নিতে দেখেছেন, সে হলো সুদখোর। "কুশ্রী লোকটি, যে আগুন জ্বালিয়ে তার চারপাশে দৌড়াচ্ছিল, তিনি হলেন জাহান্নামের দারোগা, মালিক ফেরেশতা।
“বাগানে অবস্থান করা দীর্ঘকায় লোকটি হলেন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম। তার সঙ্গে-থাকা বালক-বালিকারা হলো সেসব শিশু, যারা ফিতরাত তথা স্বভাবজাত ধর্ম ইসলামের ওপর মৃত্যুবরণ করেছে।” কয়েকজন সাহাবি জিজ্ঞেস করলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল! মুশরিকদের শিশু-সন্তানরাও কি?' তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'মুশরিকদের শিশু-সন্তানরাও।'
(সাহাবিদের এই জিজ্ঞাসার পর নবীজি স্বপ্নের দুই লোকের অসম্পূর্ণ কথা সম্পূর্ণ করতে গিয়ে বললেন,) "যাদের অর্ধাংশ অতি সুন্দর ও অর্ধাংশ অতি কুশ্রী দেখেছেন তারা হলো ঐ সম্প্রদায় যারা সৎ-অসৎ উভয় কাজ মিশ্রিতভাবে করেছে। আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।” [১]
প্রথম পাঠ
নবীদের স্বপ্ন ওহি। এটি আমাদের বিশ্বাস ও আকিদা। হাদিসের মাধ্যমেই তা বুঝে আসে। এটাই উম্মতের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। এ ব্যাপারে কারও কোনো দ্বিমত নেই। আর কেউ দ্বিমত পোষণ করলেও কুরআনের মাধ্যমে তা প্রত্যাখ্যাত হবে। কেননা ইবরাহিম আলাইহিস সালাম তার ছেলেকে বলেছেন—
'বেটা! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে জবাই করছি।'
তখন ইসমাইল আলাইহিস সালাম বলেন—
'বাবা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তাই করুন। [১]
এটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট একটি আয়াত। এর মাধ্যমে সবধরনের সন্দেহ-অভিযোগ বিদূরিত হয়ে যায়। সাধারণ মানুষের স্বপ্ন তিন প্রকার।
উত্তম স্বপ্ন। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মুমিনকে সুসংবাদ দেওয়া হয় কিংবা মানুষকে ভবিষ্যতের কোনো বিষয় জানিয়ে দেওয়া হয়। যেমন মিশরের বাদশাহর স্বপ্ন। ইউসুফ আলাইহিস সালাম যার ব্যাখ্যা করেছেন।
দুঃস্বপ্ন। এটা শয়তানের পক্ষ থেকে দেখানো হয়। সে এর মাধ্যমে মুমিনকে ভারাক্রান্ত করে দিতে চায়।
মনের জল্পনা। মানুষ যা করে থাকে এবং মনে মনে যা বলে থাকে সেটাই সে ঘুমের মধ্যে দেখতে পায়। আল্লাহ তাআলা যাদেরকে ক্ষমতা দিয়েছেন তারা প্রথম প্রকারের স্বপ্ন ব্যাখ্যা করতে পারে। স্বপ্নের ব্যাখ্যা হলো ফতোয়ার মতো। আর আমাদেরকে না জেনে কোনো ফতোয়া দিতে নিষেধ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় পাঠ
স্বপ্নের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত আলোচনায় প্রাসঙ্গিকভাবে একটি প্রশ্ন চলে আসে যে, স্বপ্নের ব্যাখ্যা কি এমন কোনো জ্ঞান যা আল্লাহ তাআলা মানুষের অন্তরে ঢেলে দেওয়ার মাধ্যমে অর্জিত হয়ে থাকে? নাকি এটা ব্যাকরণ, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান প্রভৃতি শাস্ত্রের মতোই সাধারণ কোনো শাস্ত্র, চেষ্টা-প্রচেষ্টার মাধ্যমে যা অর্জিত হয়? এই বিষয়ে দীর্ঘ অধ্যয়নের পর আমি যে সার-নির্যাস বের করেছি তা হলো- স্বপ্নের ব্যাখ্যা এতদুভয়ের মাঝামাঝি একটি বিষয়। তবে অধিকাংশিই আল্লাহ-প্রদত্ত। কিছু কিছু মানুষকে আল্লাহ তাআলা তা দান করে থাকেন। ইউসুফ আলাইহিস সালাম-কে আল্লাহ তাআলা নিজেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়েছেন।
কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে- 'এমনিভাবে তোমার পালনকর্তা তোমাকে মনোনীত করবেন এবং তোমাকে বাণীসমূহের নিগূঢ় তত্ত্ব শিক্ষা দেবেন।' [১]
আর কিছু স্বপ্ন এমন রয়েছে যেগুলো বিভিন্ন মূলনীতি এবং নিয়ম-কানুনের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা যায়। এগুলো আমাদের বোঝা জরুরি। তা হলো, দর্শকের দৃষ্টিকোণ থেকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা হবে। এক ব্যক্তি মুহাম্মাদ ইবনে সিরিন রহিমাহুল্লাহর কাছে এসে বলল, 'স্বপ্নে আমি আজান দিতে দেখেছি।' তিনি বললেন, 'অচিরেই তুমি বাইতুল্লাহ শরিফে হজ করতে যাবে।' আরেক ব্যক্তি এসে বলল, 'স্বপ্নে আমি আজান দিতে দেখেছি।' তিনি তাকে বললেন, 'তুমি চুরি করে কারাগারে বন্দী হবে।'
ছাত্ররা তার এই ব্যাখ্যায় আশ্চর্যবোধ করলে তিনি তাদের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট করে দেন। তিনি বলেন, প্রথম ব্যক্তির মধ্যে আমি কল্যাণের বৈশিষ্ট্য দেখতে পেয়েছি। তাই আল্লাহ তাআলার বাণীর মাধ্যমে তার ব্যাখ্যা করেছি-
'এবং মানুষের মধ্যে হজের জন্যে ঘোষণা প্রচার করো। [১]
আর দ্বিতীয় ব্যক্তির মধ্যে পাপাচারের চিহ্ন দেখতে পেয়েছি। তাই আমি আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বাণীর মাধ্যমে তার ব্যাখ্যা করেছি-
'অতঃপর একজন ঘোষক ডেকে বলল, হে কাফেলার লোকজন, অবশ্যই তোমরা চোর।' [২]
এ ছাড়াও কিছু স্বপ্ন রয়েছে যা সকলেই দেখে না। যেমন মিশরের বাদশাহ দুর্ভিক্ষের স্বপ্ন দেখেছিল। এটি রাজা-বাদশাহ ও প্রশাসকগণের স্বপ্ন। সাধারণ মানুষ তা দেখে না।
আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু এক স্বপ্ন দেখেন। তখন তিনি সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রহিমাহুল্লাহর কাছে এক ব্যক্তিকে স্বপ্নের ব্যাখ্যার জন্য পাঠান। তাকে বলেন, 'তুমি আমার কথা বলবে না। বলবে, এটা আমার নিজের স্বপ্ন।' সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রহিমাহুল্লাহ তাকে বলেন, 'তোমার মতো ব্যক্তি এ ধরনের স্বপ্ন দেখতে পারে না। স্বপ্নটি কার-আমিই কি তোমাকে তা বলে দেবো না তুমি আমাকে বলবে?' লোকটি বলল, 'আপনিই বলুন।' সাঈদ বললেন, 'স্বপ্নটি আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়েরের।' স্বপ্নটি হলো, আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু দেখেন যে, তিনি আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের সঙ্গে লড়াই করছেন। আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান তাকে ধরাশায়ী করে তার শরীরে চারটি পেরেক বসিয়ে দিয়েছে। সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব এর ব্যাখ্যা করেন এভাবে, আবদুল মালিক অচিরেই ইবনে যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে হত্যা করবে। মারওয়ানের মৃত্যুর পর একে একে তার চার ছেলে খলিফা হবে। আর বাস্তবে এমনটাই ঘটেছে। আবদুল মালিকের গভর্নর হাজ্জাজের হাতে আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু শাহাদাত বরণ করেন। আর আবদুল মালিকের চার ছেলে ইয়াযিদ, হিশাম, ওয়ালিদ ও সুলাইমান পরবর্তীতে খলিফা হয়েছিলেন।
ঋতু, আরবি ভাষা, প্রবাদ-বাক্য প্রভৃতির মাধ্যমেও স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে। আমি আমার কিতাব 'হাদিসুস সবাহ'-এ উদাহরণসহ এ বিষয়ে আলোচনা করেছি। সেগুলো এখানে পুনরায় উল্লেখ করতে চাই না। জ্ঞান-ভাণ্ডারে নতুন কিছু বিষয় যুক্ত হওয়ায় সেগুলো এখানে উল্লেখ করে দিলাম।
তৃতীয় পাঠ
আলিমগণের মতে হাদিসে বারযাখের কথা বলা হয়েছে। মৃত্যু এবং পুনরুত্থানের মধ্যবর্তী সময়টি হলো বারযাখ। কবরের আজাবের ব্যাপারে ১০টি নয় বরং শত শত দলিল রয়েছে। কবর হলো পরকালের সর্বপ্রথম ঘাঁটি। এটা হয়তো জাহান্নামের গর্ত হবে কিংবা জান্নাতের বাগান। যারা কুরআন-হাদিস বাদ দিয়ে যুক্তি খাটায় তারাই কেবল হঠকারিতা বশতঃ কবরের নেয়ামত এবং এর আজাব অস্বীকার করতে পারে। কবরে তারা কেবল চূর্ণ-বিচূর্ণ হাড়গোড় দেখে বলে, কবরের সুখ-শান্তি এবং আজাব-শাস্তি কোথায়? বাস্তবতা হলো, শরীর এবং আত্মার মধ্যকার সংযোগের কথা তারা ভুলে গেছে। অবস্থার স্তরভেদে এ সংযোগে তারতম্য ঘটে থাকে। মৃত্যুর পর আমরা বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে থাকি। প্রতিটি স্তরে শরীরের সঙ্গে রুহের সম্পর্কের ভিন্নতা ঘটে। মৃত্যুর পূর্বেই মানুষ বহু স্তর অতিক্রম করে আর মৃত্যুর পর আরও কিছু স্তর রয়ে যায়। নিম্নে এ স্তরগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র দাঁড় করানো হলো।
প্রথম : অস্তিত্বহীনতার স্তর। আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টির পূর্বে এই স্তরটি ছিল। তখন একমাত্র আল্লাহ তাআলার ইলমেই মানুষের অস্তিত্ব ছিল।
দ্বিতীয় : অনু স্তর। আল্লাহ তাআলা এই সময় সকল আদম সন্তানের রুহ একসঙ্গে সৃষ্টি করেন। এসময় তাদের কাছ থেকে তার রুবুবিয়্যাতের ব্যাপারে সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। তারা সকলেই তখন আল্লাহ তাআলার একত্ববাদের সাক্ষ্য দিয়েছিল। কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে-
'আর যখন তোমার পালনকর্তা বনি আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের সন্তানদেরকে বের করলেন এবং নিজের ওপর তাদেরকে প্রতিজ্ঞা করালেন, আমি কি তোমাদের পালনকর্তা নই? তারা বলল, অবশ্যই, আমরা অঙ্গীকার করছি। (এট এ জন্য যাতে) কেয়ামতের দিন আবার বলতে শুরু না করো যে, এ বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না।' [১]
এরপর রুহ ফুঁকে দেওয়ার মাধ্যমে তিনি মানুষের মধ্যে জীবন সঞ্চার করেন।
তৃতীয় : পৃথিবীতে অস্তিত্ব লাভের স্তর। রুহ ফুঁকে দেওয়া থেকে নিয়ে জন্ম হওয়া পর্যন্ত এ স্তরটি বিস্তৃত।
চতুর্থ : বারযাখের স্তর। এটি মৃত্যু থেকে পুনরুত্থানকাল পর্যন্ত বিস্তৃত।
পঞ্চম : চিরস্থায়ী হওয়ার স্তর। আল্লাহ তাআলা বান্দাদের হিসাব-নিকাশ শেষ করা থেকে নিয়ে তা শুরু হবে। যা আর কখনো শেষ হবে না। এরপর কেউ জাহান্নামে যাবে, কেউ জান্নাতে।
সন্দেহ নেই, উল্লিখিত স্তরগুলোতে শরীরের সঙ্গে রুহের সম্পর্ক বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। অস্তিত্বহীনতার স্তরে দেহের সঙ্গে রুহের কোনো সম্পর্ক থাকে না। কেননা এই সময় দেহ ও রুহ কিছুই থাকে না। অনু স্তরে রুহ থাকে কিন্তু দেহ থাকে না। বাস্তব অস্তিত্বের স্তরে দেহ সরাসরিভাবে শাস্তি এবং নেয়ামত ভোগ করে থাকে। রুহ তার অনুগামী হয়। কাউকে প্রহার করলে তার দেহে আঘাত লাগে কিন্তু দেহের সঙ্গে রুহের সম্পর্ক থাকায় রুহ তার যাতনা ভোগ করে। পক্ষান্তরে কবর-জগতে নেয়ামত ও আজাব উভয়টি রুহের ওপর হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে দেহ রুহের অনুগামী হয়। আর চিরস্থায়িত্বের স্তরে (জান্নাত-জাহান্নাম) দেহ ও আত্মা উভয়ের ওপর সমান সমান করে নেয়ামত ও শাস্তি প্রদান করা হবে।
চতুর্থ পাঠ
আল্লাহ তাআলার এক এক ইনসাফ হলো-তিনি কাজের ধরন-প্রকৃতি থেকেই প্রতিদান দিয়ে থাকেন। বারযাখে শাস্তি ভোগকারী লোকগুলোর প্রতি লক্ষ করে দেখুন, যে যে ধরনের অপরাধ করেছে তাকে সে ধরনের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। কুরআন পাওয়া সত্ত্বেও যে তা পরিত্যাগ করে, নামাজ না পড়ে ঘুমিয়ে থাকে তার মাথায় আঘাত করা হচ্ছে। কারণ, মাথা হলো সিজদা দেওয়ার মাধ্যম। তাকে যখন সিজদা করতে বলা হয়েছিল তখন যেহেতু সে সিজদা করতে অস্বীকার করেছে তাই তার মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়া হচ্ছে। আমি মনে করি কুরআন পরিত্যাগ করা এবং ফরজ নামাজ ছেড়ে ঘুমিয়ে যাওয়া উভয়টির কারণেই এই শাস্তি হবে। আর কুরআন পরিত্যাগ করার অর্থ হলো কুরআন অনুযায়ী আমল না করা। তেলাওয়াত নয় বরং অন্তরের মাধ্যমে তা পরিত্যাগ করা।
তাই কেউ এ কথা বলতে পারে না যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ, রাসুল, পুনরুত্থান, হিসাব-নিকাশ এবং ইসলামের অন্যান্য বিধিবিধান পালন করে কিন্তু কুরআনুল কারিম তেলাওয়াত করে না তাকে শাস্তি দেওয়া হবে! মানুষের অবস্থান এবং তাদের কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে কুরআনুল কারিম পরিত্যাগের বিষয়টি নির্ণিত হয়। যেমন শাসকের কুরআনুল কারিম পরিত্যাগ হলো বিচারকার্যে তা বাস্তবায়ন না করা। সাধারণ মানুষের কুরআনুল কারিম পরিত্যাগ হলো দৈনন্দিন জীবনে তার বিধি-বিধান পালন না করা। যেমন পুরুষরা মিরাসের (পরিত্যক্ত সম্পদ) বিধি-বিধান পালন না করা। মিরাসের হকদারদের ওপর জুলুম করা। নারীরা পর্দা পালন না করা।
নামাজ না পড়ে ঘুমিয়ে থাকাটা যদিও হালকা কোনো বিষয় নয়, তবু হাদিসের আলোকে বলা যায় যে, এটি কুরআন পরিত্যাগের মতো নয়। হাদিসে এসেছে, ঘুমের কারণে কিংবা ভুলে যাওয়ায় যার নামাজ ছুটে যায় তাহলে স্মরণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন সে তা আদায় করে নেয়। কেননা এটিই তার কাফফারা। [১]
এক সাহাবির স্ত্রী রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে তার স্বামী অভিযোগ করেন যে, তার স্বামী ফজর-নামাজের সময় ঘুমিয়ে থাকেন। সাহাবি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলেন, আমি এমন সম্প্রদায়ের লোক যাদের ঘুম অনেক বেশি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, 'তাহলে যখন তুমি জাগ্রত হবে তখনই নামাজ পড়ে নিয়ো।' [২]
আল্লাহ মাফ করুন, ঘুমের প্রতি উৎসাহিত করবার জন্য আমি তা বলিনি, বরং এই সংক্রান্ত সঠিক বিষয়টি যাতে গোপন না হয়ে যায়, তাই উল্লেখ করেছি।
মিথ্যা বলার মাধ্যম—চোয়াল বিদির্ণ করে দেওয়াই হলো মিথ্যাবাদীর শাস্তি। ব্যভিচারীরা উলঙ্গ হয়ে হাশর করবে। তাদেরকে চুল্লিতে নিক্ষেপ করা হবে। ব্যভিচারের মাধ্যম লজ্জাস্থান আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হবে। সুদখোরকে রক্ত-নদীতে ফেলে তার মুখে পাথর দিয়ে দেওয়া হবে। কারণ সে মুখ দিয়ে সুদ খেয়েছে।
পঞ্চম পাঠ
আল্লাহ তাআলার রহমতের ব্যাপারে কোনোরকম সংশয়ে ভোগা যাবে না। রহমতের পূর্বে এই কথা স্মরণ রাখুন যে, আল্লাহ তাআলা ইনসাফকারী। ইনসাফ গুণের কারণেই তিনি বান্দাদের পরস্পরের মধ্যে কেসাস (সমতা-বিধান) করে থাকেন। যদি মিথ্যুকের প্রতি আপনি দয়াদ্র হয়ে থাকেন তাহলে স্মরণ করুন, মিথ্যা দুনিয়াতে কীসব করেছে! মিথ্যার কারণে কত মানুষের সম্মানহানি হয়েছে! কত মানুষের অধিকার আত্মসাৎ হয়েছে! কত ফেতনা সৃষ্টি হয়েছে! কত ঘরবাড়ি তছনছ হয়েছে! কত রক্ত ঝরানো হয়েছে! আপনি কি চান যে, কোনো হিসাব-নিকাশ আর শাস্তি ছাড়াই এই সকল ব্যক্তি পার পেয়ে যাক? যদি আপনি ব্যভিচারীর প্রতি দয়াদ্র হয়ে থাকেন তাহলে স্মরণ করুন, দুনিয়ার জীবনে ব্যভিচারীরা কী করেছে। কত সন্তান জারজ হয়েছে! কত সম্ভ্রম লুট হয়েছে! কত মর্যাদাহানি ঘটেছে! আপনি কি চান, এরা কোনো হিসাব-নিকাশ আর শাস্তি ছাড়াই পার পেয়ে যাক? সুদখোরের প্রতি আপনি নমনীয় হলে স্মরণ করুন, সুদ সমাজের কী নাকাল দশা করেছে! কত হতদরিদ্র মানুষ ঋণের দ্বিগুণ সুদ প্রদান করেছে! ঋণ নিয়ে সুদ আদায় করতে না পারায় কত মানুষের ভিটেমাটি ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে! সুদের বিষাক্ত ছোবলে কত বৈধ খাত বন্ধ হয়ে গেছে! মূলধন-স্বল্পতার কারণে কত যুবকের কাজের সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে! আপনি কি চান, এ সকল ব্যক্তি কোনো শাস্তি ছাড়াই মুক্তি পেয়ে যাক?
এই হাদিসে শাস্তি ও ইনসাফের পর রহমতের আলোচনা এসেছে। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম। যেসব শিশুরা শৈশবে মারা গেছে তাদেরকে তিনি দেখাশোনা করছেন। এমনকি মুশরিকদের সন্তানদেরকেও। আল্লাহ তাআলা নিজ রহমতগুণে পিতার শিরকের কারণে সন্তানকে পাকড়াও করেননি। তেমনিভাবে যার কাছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী পৌঁছেনি তাকেও শাস্তি দেওয়া হবে না।
'কোনো রাসুল না পাঠানো পর্যন্ত আমি কাউকে শাস্তি প্রদান কবি না।' [১]
যারা ভালো এবং মন্দ কাজের মিশ্রণ ঘটিয়ে থাকে তাদের ক্ষেত্রেও আল্লাহ তাআলার রহমত পরিলক্ষিত হয়েছে। তাদেরকেও আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে দিয়েছেন। হাদিসের বিপরীত দিকের প্রতি লক্ষ করলে বুঝা যায়, যাদেরকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে তাদের কোনো নেক কাজ নেই। তাদের দুনিয়ার জীবন পুরোটাই ছিল জুলুম আর পাপাচারে ভরপুর।
ষষ্ঠ পাঠ
আমাদেরকে অবশ্যই বুঝতে হবে, আল্লাহ তাআলা শুধু মৃতদের ওপর পাঠ করবার জন্য কুরআন অবতীর্ণ করেননি, বরং জীবিতদের ফায়সালা জন্য অবতীর্ণ করেছেন।
'যাতে তিনি সতর্ক করেন জীবিতকে।' [১]
নিশ্চয় এই কুরআন এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। কুরআন অনুযায়ী আমল করা ব্যতীত ইসলাম কখনো পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। আমরা নামাজ পড়ব, রোজা রাখব, হজ করব, জাকাত দেব, কিন্তু এরপর পশ্চিম বা পূর্ব থেকে আমাদের সংবিধান ধার করে আনব, এটা কখনো ইসলাম হতে পারে না।
ভালো লাগুক বা না লাগুক আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত সীমা অনুযায়ী আমাদেরকে জীবনযাপন করতে হবে। অবশ্যই আমাদেরকে আল্লাহর প্রণীত মিরাসের নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে, চাই তা আমাদের পছন্দ হোক বা না হোক। যখন তিনি ক্রয়-বিক্রয় হালাল রেখেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন তখন অবশ্যই আমাদের তা পালন করতে হবে। যখন তিনি বিয়ের ব্যবস্থা রেখেছেন তখন অবশ্যই আমাদের তা কার্যকর করতে হবে। যখন তিনি প্রতিবেশীর হক নির্ধারণ করেছেন তখন অবশ্যই আমাদের তা পালন করতে হবে। যেহেতু তিনি নিকটাত্মীয়দের অধিকার নির্ধারণ করেছেন, অবশ্যই আমাদেরকে আত্মীয়তার সম্পর্ক বহাল রাখতে হবে। কুরআনুল কারিম কবুল করে নেওয়ার অর্থ কখনই এটা নয় যে, তা শুধু তেলাওয়াতই করা হবে। কুরআন কবুল করবার অর্থ হলো তেলাওয়াতের পাশাপাশি এতে বিবৃত বিধি-নিষেধ যথাযথভাবে পালন করা। যারা বলে, আমরা অবশ্যই নামাজ পড়ব, রোজা রাখব, হজ করব, জাকাত দেব, তবে আমরা ব্যবসা-বাণিজ্য করব পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মুতাবিক, তাহলে এসব লোক এখনও ইসলামকে বুঝতে পারেনি। যে ব্যক্তি ইসলাম-বহির্ভূত বিচারব্যবস্থা কার্যকর করতে চায়, সে যেন আল্লাহর উপর মন্দ শরীয়ত প্রণয়নের অপবাদ আরোপ করল। যে ব্যক্তি ইসলাম-বহির্ভূত অন্য কোনো অর্থব্যবস্থা চেয়ে থাকে সে যেন নিজের অজান্তেই বলে যে, নিয়মকানুন তৈরি করার ক্ষেত্রে আল্লাহর চেয়ে মানুষই বেশি জ্ঞান রাখে। নাউজুবিল্লাহ।
সপ্তম পাঠ
মিথ্যা হারাম হওয়ার বিষয়টি উপেক্ষা করলেও এটি অবশ্যই মানুষের ব্যক্তিত্বকে কলুষিত করে। জাহেলি যুগের আরবরা অত্যন্ত আত্মমর্যাদাশীল লোক ছিল। আবু জেহেলের কথাই ধরুন না! আরবের লোকেরা তাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ঘর ধ্বংস করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। তখন সে বলেছিল, 'তোমরা কি চাচ্ছ যে, আরবের লোকেরা বলুক, আমি মুহাম্মদের মেয়েদের আতঙ্কিত করে তুলেছি?' সে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু'র মেয়ে আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে চড় মেরে বলে, 'তোমরা এটা গোপন রাখবে। আরবের লোকেরা যেন তা জানতে না পারে।' আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহু'র বিষয়টা দেখুন! তিনি মুশরিক থাকাবস্থায় রোমের বাদশাহ তাকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিল। তখন তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সততা ও বিশ্বস্ততার সাক্ষ্য দিয়েছেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে কোনো মিথ্যা বলেননি।
কোনো কাজ হারাম হওয়ায় তা পরিত্যাগ করা কিংবা হালাল হওয়ায় তা গ্রহণ করা, ব্যক্তির পূর্ণতার পরিচয় বহন করে। কিন্তু এর পাশাপাশি যাচাই করলে দেখা যাবে যে, জায়েজ জিনিসের মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিত্ব বৃদ্ধি পায় আর না-জায়েজ কাজের কারণে ব্যক্তিত্ব কলুষিত হয়। একজন ব্যক্তির নিজের প্রতি খারাপ আচরণ করাটাই হলো জীবনের সবচেয়ে দুঃখজনক ট্রাজেডি। হাদিসে কত চমৎকার বলা হয়েছে- 'সত্য বলতে থাকলে এবং সত্যের উপর অটল থাকলে একসময় সে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে সিদ্দিক হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে যায়।' [১]
অষ্টম পাঠ
মানুষের সম্মানহানি করবেন না। যার শক্তি নেই আল্লাহ তাআলাই তার শক্তি। যার অস্ত্র নেই আল্লাহ তাআলাই তার অস্ত্র। যে ব্যক্তি কারও মানহানি করবে অচিরেই এমন ব্যক্তি আসবে যে তারও মানহানি করবে। দুনিয়া ঋণ গ্রহণ আর পরিশোধের চক্রে চলছে। অর্থাৎ যেমন কর্ম করবেন তেমন ফলই আপনি পাবেন। তাই কারও মানহানি করার মাধ্যমে আপনি নিজের সম্মানের উপর আঘাত করবেন না। স্মরণ করুন, ক্ষমা করার মাধ্যমেই ইউসুফ আলাইহিস সালাম উপরে উঠতে পেরেছেন। তিনি নিকৃষ্ট কাজকে প্রত্যাখ্যান করেছেন বলেই রাজত্ব তার হাতে এসে ধরা দিয়েছে। নিশ্চয়ই তাদের ঘটনায় বহু শিক্ষা রয়েছে।
নবম পাঠ
সবচেয়ে কুৎসিত ব্যক্তি জাহান্নামের দারোগা মালেক ফেরেশতার ব্যাপারে একটু বলি। আল্লাহ তাআলা তাকে সুন্দর করে সৃষ্টি করতে অক্ষম ছিলেন বলে কুৎসিত করে সৃষ্টি করেছেন তা নয়। তার এই সিদ্ধান্তের পেছনে বিশেষ হেকমত রয়েছে।
মালেক দারোগাকে এই আকৃতিতে সৃষ্টি করার হেকমত হলো এর মাধ্যমে জাহান্নামিদের শাস্তির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়া। কারণ মানুষ যেমনভাবে সুন্দর চেহারা এবং উত্তম গঠনাকৃতির মাধ্যমে আনন্দ লাভ করে থাকে তেমনিভাবে কুৎসিত চেহারার দ্বারা কষ্টবোধ করে থাকে। পিলে চমকে যায়। মালেক ফেরেশতা যেন নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেন এ জন্য আল্লাহ তাআলা তাকে এই আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। তিনি জাহান্নামের দায়িত্বশীল ব্যক্তি। তাকে উত্তম আকৃতিতে সৃষ্টি করাটা তার দায়িত্বের উপযোগী নয়। এর বিপরীত দিকে রেজওয়ান হলেন জান্নাতের দায়িত্বশীল ফেরেশতা। তিনি সবচেয়ে সুন্দর। জান্নাতিদের নেয়ামত বৃদ্ধির জন্যই এমনটি করা হয়েছে।
কিন্তু দুনিয়াতে সুন্দর হওয়া এবং কালো হওয়া উভয়টাই আল্লাহ তাআলার দান। আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বান্দাদের মধ্যে সৌন্দর্য এবং অসৌন্দর্য বন্টন করে দিয়েছেন। এর উদ্দেশ্য কেবল তিনিই জানেন। তাই আল্লাহ তাআলার ক্ষেত্রে আমাদেরকে শিষ্টাচার রক্ষা করে চলতে হবে। কারণ শিল্পে খুঁত আছে বললে প্রকৃতপক্ষে শিল্পীকেই দোষারোপ করা হয়। অথচ আমাদের প্রতিপালক অক্ষমতা এবং ত্রুটি থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র।
আমরা রিজিকের প্রতি তাকিয়ে দেখি যে, তাতে মানুষের স্তরভেদ রয়েছে। কেউ ধনী, কেউ দরিদ্র। কারও সন্তান-সন্ততি রয়েছে আবার কারও সন্তান-সন্ততি নেই। কারও হায়াত অনেক দীর্ঘ হয়ে থাকে আবার কারও হায়াত অত্যন্ত স্বল্প হয়ে থাকে। কেউ খুশি, কেউ দুঃখী। কেউ আনন্দিত, কেউ চিন্তিত। তেমনিভাবে কেউ সুন্দর, কেউ তুলনামূলক অসুন্দর। তাই কেউ সুন্দর হলে সে যেন শুকরিয়া আদায় করে। আর কেউ কুৎসিত আকৃতির হলে সে যেন সবর করে। দুনিয়া তো কেবল পরীক্ষার জায়গা।
টিকাঃ
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৭০৪৭
[১] সুরা সাফফাত, আয়াত-ক্রম: ১০২
[১] সুরা ইউসুফ, আয়াত-ক্রম : ৬
[১] সুরা হজ, আয়াত-ক্রম: ২৭
[২] সুরা ইউসুফ, আয়াত-ক্রম: ৭০
[১] সুরা আরাফ, আয়াত-ক্রম: ১৭২
[১] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ৬৮৪
[২] সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস-ক্রম: ১৪৮৮
[১] সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত-ক্রম: ১৫
[১] সুরা ইয়াসিন, আয়াত-ক্রম: ৭০
[১] সুনানে তিরমিজি, হাদিস-ক্রম: ১৯৭১
📄 উট হারিয়ে ফেলা সেই ব্যক্তিটি
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'আল্লাহ তাআলা তার মুমিন বান্দার তাওবার কারণে ওই ব্যক্তির চেয়ে অধিক আনন্দিত হন, যে নিজের পাথেয় নিয়ে উটে আরোহণ করে সফরে বের হয়ে যায়। এক বিজন প্রান্তরে পৌঁছে তার ঘুম চলে আসে। সে তখন উট থেকে নেমে এক গাছের নিচে ঘুমিয়ে যায়। এরই মধ্যে তার উটটি চলে যায়। জাগ্রত হওয়ার পর সে একটি টিলায় চড়ে উট খুঁজতে থাকে। কিন্তু উটের কোনো দেখা পায় না। এরপর আরেক টিলায় যায়। সেখান থেকেও কিছু দেখতে পায় না। এরপর তৃতীয় এক টিলায় যায়। সেখানেও কিছু দেখতে পায় না। এর মধ্যেই পিপাসার্ত হয়ে গেলে সে বলে, আমি যেখানে ছিলাম সেখানেই ফিরে যাব। মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই ঘুমিয়ে থাকব। মৃত্যুর জন্য সে তার মাথা বাহুর উপর রেখে শুয়ে পড়ে। একসময় জাগ্রত হয়ে দেখতে পায়, তার বাহনটি তার পাশেই উপস্থিত রয়েছে। আর তাতে তার খাবার-পানীয় এবং পাথেয়ও রয়েছে। তখন সে আনন্দের অতিশয্যে বলে ওঠে, “হে আল্লাহ, আপনি আমার বান্দা আমি আপনার রব!” আনন্দের আতিশয্যে সে ভুল করে বসে। এই ব্যক্তিটি তার বাহন এবং পাথেয় পেয়ে যে পরিমাণ আনন্দিত হয়েছে আল্লাহ তাআলা তার মুমিন বান্দার তাওবার কারণে তার চেয়েও বেশি আনন্দিত হন।' [১]
প্রথম পাঠ
যদি সমস্ত সৃষ্টি আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা করে তাতে আল্লাহর ক্ষমতার কোনোই ঘাটতি হবে না। আর যদি সমস্ত সৃষ্টি তার আনুগত্য করে তাতেও তার রাজত্বে কোনো প্রবৃদ্ধি ঘটবে না। বান্দার গুনাহ যেমন আল্লাহর কোনো ক্ষতিসাধন করতে পারে না, তেমনিভাবে আনুগত্যও তার কোনো উপকার বয়ে আনে না।
কিন্তু তিনি অত্যন্ত দয়ালু। অনেক সময় তার দয়া ও অনুগ্রহের আশায় মানুষ গাফেল হয়ে পড়ে। তার বদান্যতায় বান্দা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়। দ্বীনের আলোয় পাপাচারে লিপ্ত ব্যক্তিদের তাওবার জন্য তিনি রাতে আপন হস্ত প্রসারিত করে রাখেন। আর রাতের পাপীরা যাতে তাওবা করতে পারে এজন্য তিনি দিনের বেলা সে হাত প্রসারিত করে রাখেন। যদি কেউ পাহাড়সম অপরাধ নিয়ে আসে তবুও তিনি তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেন না। যে ব্যক্তি তার দরজায় কড়া নাড়ে তার জন্য দরজা খুলে দেওয়া হয়। যে ব্যক্তি তার দিকে হেঁটে হেঁটে আসে তিনি (তার রহমত) তার দিকে দৌড়ে আসেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। ক্ষমা করতেই তিনি ভালোবাসেন। তিনি দয়াময়। অপরাধ এড়িয়ে যেতেই তিনি পছন্দ করেন।
আপনার গুনাহ যত বড় হোক না কেন তার ক্ষমা তারচেয়েও বড়। আপনার অপরাধ যত বেশিই হোক না কেন তার বদান্যতা এরচেয়েও বেশি। বান্দা যতক্ষণ পর্যন্ত তাওবা থেকে বিরক্ত না হয়ে যায় ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি তার বদান্যতা থেকে হাত গুটান না। গুনাহ বেশি হয়ে গেলে শয়তান আপনার সামনে অপরাধসমূহকে সুসজ্জিত করে তুলবে। তখন স্মরণ করুন, আপনি আল্লাহ তাআলার দরবারে এসে তাকে ডাক দিলে তিনি কতটা খুশি হন!
'হে আমার রব, আমি গুনাহ করেছি, আপনি ছাড়া আমার আর কোনো রক্ষাকারী নেই। আপনার বান্দা তো অনেক; কিন্তু আপনি ছাড়া আমার আর কোনো রব নেই।' তিনি সন্তুষ্ট হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট। সামান্য সময়ের তাওবার মাধ্যমে তিনি বহু বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেন। তাই শয়তান যেন তার রহমত থেকে আপনাকে নিরাশ করে না রাখে। আপনার অবস্থা যেমনই হোক, তার দরজায় করাঘাতের ব্যাপারে লজ্জাবোধ করবেন না। তিনি তো আল্লাহ! তিনি পৃথিবীর কোনো রাজা-বাদশাহ নন! যাদের প্রতি আপনি এক যুগ ভালো আচরণ করলেও কোনো একবার মন্দ আচরণ করে ফেললে তারা আপনাকে শাস্তি না দিয়ে ছাড়বে না। কিন্তু তিনি তো পরম ক্ষমাশীল। পৃথিবীর রাজা বাদশাহদের চরিত্র দিয়ে আসমানের বাদশাহকে পরিমাপ করবেন না।
বর্ণিত আছে, দুনিয়ার কোনো এক বাদশাহর কিছু হিংস্র কুকুর ছিল। যারা বাদশাহর কাজে গাফলতি করত তাদেরকে সেই কুকুরগুলোর মুখে নিক্ষেপ করা হতো। বাদশাহর এক উজির ছিল। বহু বছর সে তার কাজ করেছে। একবার এই উজির বাদশাহর কোনো এক কাজে ভুল করে ফেলল। বাদশাহ তখন তাকে কুকুরের মুখে ফেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। উজির বাদশাহর কাছে এক সপ্তাহ সময় চাইল। বাদশাহ তা প্রদান করলেন। উজির তখন কুকুর দেখাশোনাকারী কর্মচারীকে বলল, 'তুমি বাড়ি ফিরে যাও। তোমার পক্ষ থেকে আমি এক সপ্তাহ কুকুরগুলো দেখাশোনা করব।' উজির কুকুরগুলোকে খানা খাওয়াতে থাকে, এগুলোর যত্ন নিতে থাকে। এভাবে কুকুরগুলো তাকে ভালোবাসতে শুরু করে।
এক সপ্তাহ পর বাদশাহ-উজিরকে কুকুরের মুখে ফেলে দেয়। কিন্তু কুকুর তাকে খেলো না। বাদশাহ তখন আশ্চর্য হয়ে বলল, 'তুমি কি কুকুরকে জাদু করেছ?' উজির বলল, 'কখনোই নয়; বরং আমি এক সপ্তাহ এগুলোর সেবা-যত্ন করেছি। তাই তারা আমার সঙ্গে ভালো আচরণ করেছে। অথচ এক যুগ ধরে আপনার সেবা করলাম কিন্তু আপনি আমার সঙ্গে এতটুকু ভালো আচরণ করলেন না!' এটাই পৃথিবীর বাদশাহর চরিত্র। আসমানের বাদশাহর চরিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেউ যুগ যুগ ধরে তার অবাধ্যতা করলেও তিনি মুহূর্তেই তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। কেউ জীবনভর তার প্রতি দুঃসাহসিকতা দেখালেও চোখের পলকেই তিনি তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যেতে পারেন। তাই আপনি তার থেকে বিমুখ হবেন না, কারণ তিনি তো আপনার থেকে বিমুখ হন না।
দ্বিতীয় পাঠ
দুনিয়া হলো উপায়-উপকরণের জগত। উপকরণ গ্রহণ করাটা মোটেও তাওয়াক্কুল-পরিপন্থী নয়। বরং আমাদেরকে তো উপকরণ গ্রহণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ এসব তাকদিরের ভিত্তিতে ঘটে থাকে। যদি ঈমানি শক্তির কারণে কেউ উপকরণ গ্রহণ করার ব্যাপারে অমুখাপেক্ষী হতো, তাহলে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই এ ব্যাপারে অমুখাপেক্ষী হতেন। কারণ কেউই তার চেয়ে অধিক ঈমানদার ছিল না।
হিজরতের সময় মদিনার পথ প্রদর্শনের জন্য তিনি একজন পথপ্রদর্শক ভাড়া নিয়েছিলেন। তিনি এ কথা বলেননি যে, আমি তো নবী, তাই যে অবস্থায় থাকি না কেন অবশ্যই আমি মদিনায় পৌঁছতে পারব। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি বর্ম পরিধান করতেন। তিনি বলেননি যে, আমি তো নবী। যে অবস্থায়ই থাকি না কেন, আল্লাহ তাআলা আমাকে রক্ষা করবেন। তিনি যুদ্ধে বের হওয়ার সময় এর সংবাদ গোপন রাখতেন। শত্রুর উপর যেন আকস্মিক হামলা করা যায় এজন্য তিনি ভিন্ন পথ গ্রহণ করতেন। তিনি বলেননি যে, আমি তো নবী, যে অবস্থায়ই থাকি না কেন, আল্লাহ আমাকে সাহায্য করবেন।
উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু দেখলেন, এক বেদুইন তার খোসপাঁচড়াযুক্ত উটের সুস্থতার জন্য আকাশের দিকে হাত তুলে আল্লাহর কাছে দুআ করছে। তখন তিনি বললেন, 'তুমি কিছু আলকাতরার মাধ্যমে তোমার দুআকে শক্তিশালী করো।' অর্থাৎ তুমি উপকরণ গ্রহণ করো। চিকিৎসা অবলম্বন করো। দুআ পরিত্যাগ করো না।
উমর রাদিয়াল্লাহু সিরিয়াতে প্রবেশ করার ইচ্ছে পোষণ করলেন। এমন সময় তার কাছে খবর গেল, সেখানে মহামারি দেখা দিয়েছে। খবর শুনে তিনি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন বলেন, 'হে আমীরুল মুমিনিন, আল্লাহ তাআলার তাকদির থেকে কি পালায়ন করতে চাচ্ছেন?' উমর রাদিয়ালহু আনহু তখন বলেন, 'আল্লাহর এক তকদির থেকে অপর তাকদিরের দিকে পলায়ন করছি।'
যদি কোনো ব্যক্তি এমন কোনো উপত্যকায় উপনীত হয় যার দুটি উঁচু জায়গা রয়েছে, একটি অনুর্বর অপরটি উর্বর, সে যদি অনুর্বর ভূমিতে পশু চড়ায় তাহলে কি আল্লাহর তাকদিরে সে পশু চড়াল না? আর যদি সে উর্বর ভূমিতে পশু চড়ায় তাহলে কি সে আল্লাহর তাকদিরে পশু চড়াল না?
এরপর আবদুর রহমান ইবনে আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যখন তোমরা কোনো ভূখণ্ডে মহামারি ছড়িয়ে পড়ার কথা শুনবে তখন সেখানে যাবে না। আর যখন এমন ভূখণ্ডে মহামারি ছড়াবে যেখানে তোমরা অবস্থান করছ তাহলে তা থেকে পলায়ন করে বের হয়ে যাবে না। [১]
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় স্বরূপ সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। তিনি বলেন, 'সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি উমরের অন্তরে হক ঢেলে দিয়েছেন।' [২]
আমাদের আলোচ্য হাদিসে উল্লিখিত ব্যক্তি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের ক্ষেত্রে ভুল করেছে। বাহন ছেড়ে দিয়ে তার এভাবে ঘুমিয়ে যাওয়া উচিত হয়নি। যদি সে তা বেঁধে ঘুমাত তাহলে ঘুম থেকে উঠে তা পেত। তাই যথাসম্ভব উপকরণ গ্রহণ করুন। কিন্তু উপায়-উপকরণকে বিশ্বাস করে বসে থাকবেন না। তরবারি যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয় এনে দিতে পারে না, কিন্তু তরবারি ফেলে দেওয়াটা বোকামি। কাজকর্ম মানুষের রিজিক এনে দিতে পারে না, কিন্তু কাজকর্ম ছেড়ে দেওয়াটা নির্বুদ্ধিতা। ঔষধ মানুষকে সুস্থ করে তুলতে পারে না, কিন্তু এটি সুস্থ হওয়ার মাধ্যম। আমাদেরকে তা গ্রহণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাহায্যকারী, রিজিকদাতা, সুস্থকারী তো আল্লাহ। কিন্তু এই পৃথিবীটা এক বস্তুজগত। তাই বস্তু ও উপায়-উপকরণ থেকে বিমুখ হওয়া যাবে না।
তৃতীয় পাঠ
তাই বলে শব্দে শব্দে অক্ষরে অক্ষরে মানুষের ভুল ধরে বসে থাকবেন না। লাগামহীন উচ্ছ্বাস বিবেক-বুদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণহীন করে ফেলে। আবার তীব্র শোকও মানুষের বিবেক হরণ করে নেয়। হাদিসে উল্লিখিত ব্যক্তিটি বলে ফেলেছে, 'হে আল্লাহ আপনি আমার বান্দা আমি আপনার রব!' এ বাক্যের প্রকৃত অর্থের প্রতি লক্ষ করলে তো এটা সুস্পষ্ট কুফরি। কিন্তু দয়াময়ের চিত্র দেখুন, তিনি সে ব্যক্তির হয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলছেন, 'আনন্দের আতিশয্যে সে ভুল করে ফেলেছে।' তাই ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি আলোচনা না করে কোনো কথার কারণে কাউকে কাফের আখ্যা দেবেন না। কেননা এটি কুফরি বাক্য হওয়ার ব্যাপারে তার জ্ঞান নাও থাকতে পারে। সে কখনো অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কিংবা আনন্দিত অবস্থায় থাকতে পারে।
আমি আনন্দ ও দুঃখাবস্থায় খারাপ কথা বলার সাফাই গাইছি না, বরং বলতে চাচ্ছি, আমরা তো মানুষ, কখনো কখনো আমাদের অন্তর এবং জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের আকিদার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। এরপরও এই ব্যক্তির মানসিক অবস্থাকে তিনি বিবেচনায় নিয়েছেন। তাহলে আমাদের অবস্থা কেমন হওয়া দরকার? এ হাদিসে আমাদের জন্য আরেকটি শিক্ষা রয়েছে। সেটা হলো অত্যন্ত আনন্দের সময় কাউকে কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া যাবে না। আনন্দের সময় আমরা এমন জিনিসের ওয়াদা করে ফেলি, যার সক্ষমতা আমরা রাখি না। আবার কষ্টের সময় আমরা এমন বিষয়ের হুমকি প্রদান করি, যার ক্ষমতা আমরা রাখি না। আনন্দের উচ্ছ্বাস শেষ হতে দিন। রাগের পারদ নেমে আসতে দিন। এরপর নিজের বিষয়াদির প্রতি নজর ফেলুন। সেসব ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত হবেন না, খারাপ কাজ যাদেরকে পরিচালিত করে থাকে।
চতুর্থ পাঠ
আমাদেরকে কোনো কথার বক্তা এবং তার বর্ণনাকারীর মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। কোনো কথায় বিশ্বাসকারী এবং সে কথা উদ্ধৃতিকারীর মধ্যে গোলমাল বাঁধানো যাবে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি কুফরি বাক্য উদ্ধৃত করছেন, যার উপর তিনি কস্মিনকালেও বিশ্বাস রাখেন না। কুরআনুল কারিমেও পূর্ববর্তী জাতির কুফরি-কথা উদ্ধৃত করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা কি বলেননি-
'আল্লাহ হচ্ছেন অভাবগ্রস্ত আর আমরা বিত্তবান!' [১]
তিনি কি বলেননি-
'আর ইহুদিরা বলে আল্লাহর হাত বন্ধ হয়ে গেছে।' [২]
মুসলমানদের ব্যাপারে আমাদের উত্তম ধারণা রাখতে হবে। তাদের কথাগুলোর উত্তম ব্যাখ্যা করব আমরা। এক বুজুর্গ বলেছেন, যদি আমি কোনো ভাইকে পাহাড়ে উঠে এটা বলতে শুনি যে-
'আমি তোমাদের সবচেয়ে বড় রব।'
তাহলে আমি বলব, সে একটি আয়াত তিলাওয়াত করছে। যদি আমি তার দাড়ি থেকে মদ টপকে পড়তে দেখি তাহলে আমি বলব সম্ভবত তার দাড়িতে মদ ঢেলে দেওয়া হয়েছে।
টিকাঃ
[১] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৭৪৪-২৭৪৭
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৬৯৭৩
[২] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২২২৯
[১] সুরা আলে ইমরান, আয়াত-ক্রম: ১৮১
[২] সুরা মায়িদাহ, আয়াত-ক্রম: ৬৪