📄 শত মানুষের হন্তারক যে ব্যক্তি
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- 'তোমাদের পূর্বেকার লোকদের মধ্যে এক ব্যক্তি ছিল, যে ৯৯টা খুন করেছে। তারপর সমকালের শ্রেষ্ঠ আলেম সম্পর্কে জানতে চাইল (তাওবা করার জন্য)। লোকজন তাকে একজন ধর্মগুরুর সন্ধান দিল। সে ওই ধর্মগুরুর কাছে গিয়ে সে যে ৯৯টা খুন করেছে তা উল্লেখ করে জানতে চাইল—এমতাবস্থায় তার জন্য তাওবার সুযোগ আছে কি না। ধর্মগুরু বললেন, “না।” তখন সে ধর্মগুরুকেও হত্যা করে ফেলল। তাকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে খুনের সংখ্যা সে একশ' পূর্ণ করে নিল। অতঃপর সমকালের শ্রেষ্ঠ আলেম সম্পর্কে সে আবারও জানতে চাইল। লোকজন তাকে একজন আলেমের সন্ধান দিল। ফলে ওই আলেমের কাছে গিয়ে সে যে ১০০টা খুন করেছে তা উল্লেখ করে জানতে চাইল—এমতাবস্থায় তার জন্য তাওবার সুযোগ আছে কি না। আলেম বললেন, “হ্যাঁ। এমন কে আছে যে ব্যক্তি তার মধ্যে ও তার তাওবার মধ্যে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করবে! তুমি অমুক এলাকায় যাও। সেখানে কিছু লোক আল্লাহর ইবাদাতে নিমগ্ন আছে। তুমিও তাদের সঙ্গে আল্লাহর ইবাদাতে লিপ্ত হও। নিজের ভূমিতে আর কখনোই প্রত্যাবর্তন কোরো না। কেননা এ দেশটি ভয়ংকর খারাপ।” তারপর সে চলতে লাগল। যখন সে মাঝপথে পৌঁছুল তখন তার সামনে মৃত্যু এসে হাজির। এবার রহমতের ফেরেশতা ও আযাবের ফেরেশতার মধ্যে বিতর্ক দেখা গেল। রহমতের ফেরেশতারা বললেন, “সে আন্তরিকভাবে আল্লাহর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাওবার উদ্দেশে বেরিয়েছে।” আর আযাবের ফেরেশতারা বললেন, “সে তো কখনোই কোনো সৎ কাজ করেনি।” এমতাবস্থায় মানুষের আকৃতিতে এক ফেরেশতা এলেন। তারা তাকে তাদের মধ্যস্থতাকারী বানালেন। তিনি বিতর্করত উভয় ফেরেশতা বললেন, “তোমরা উভয় স্থান পরিমাপ করো (নিজ ভূখণ্ড ও যাত্রাকৃত ভূখণ্ড)। এ দুই ভূখণ্ডের মধ্যে যা নিকটবর্তী হবে সে অনুযায়ী তার ফায়সালা হবে।” তারপর উভয়ে পরিমাপ করে দেখলেন যে, সে ঐ ভূখণ্ডেরই বেশি নিকটবর্তী যেখানে পৌঁছার জন্যে সংকল্প করেছে। অতঃপর রহমতের ফেরেশতা তার রুহ কবজ করে নিলেন।' [১]
প্রথম পাঠ
ধর্মীয় কোনো বিষয়ে আপনার সন্দেহ হলে আলেমের দরজায় করাঘাত করুন, আবেদের দরজায় নয়। আবেদ নিজের জন্য ইবাদত করে থাকে আর মানুষের জন্য মুর্খতা বিলিয়ে থাকে। আর আলেম অনেক সময় বাহ্যিক ইবাদত কম করে নিজের ক্ষতি করে থাকে। কিন্তু মানুষের জন্য সে নিজ ইলম বিলিয়ে থাকে। আমাদের কেউ অসুস্থ হলে ডাক্তারের দরজায় করাঘাত করে। কারও গাড়ি নষ্ট হলে সে সবচেয়ে অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার তালাশ করে। কোনো টেবিল সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে অভিজ্ঞ কাঠমিস্ত্রির পাত্তা জানতে চায়। দ্বীন তো এ সমস্ত কিছুর তুলনায় অনেক বেশি দামি, তাই দ্বীনের ক্ষেত্রে আমরা অবশ্যই দ্বীন বিষয়ে বিশেষজ্ঞকে জিজ্ঞেস করব।
মসজিদে আসা-যাওয়া করনেওয়ালা প্রত্যেক ব্যক্তিই আলেম ও ফকিহ নয়। ইবাদত প্রশংসনীয় বিষয় বটে, কিন্তু তা এক বিষয় আর ইলম আরেক বিষয়। সাহাবায়ে কেরামের সকলেই ফাতোয়া প্রদানকারী ছিলেন না। তাদের একেক জন একেক বিষয়ে বিজ্ঞ ছিলেন। উবাই ইবনে কাব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কথাই ধরুন না! সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে সবচেয়ে বড় কারী ছিলেন। মুয়ায ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে হালাল-হারাম সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জানতেন। আবু বকর সিদ্দিক এবং তার পরে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন কুরআনুল কারিম একত্রিত করতে চাইলেন তখন তারা যায়েদ ইবনে সাবেত রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে এর দায়িত্বভার ন্যস্ত করেন, খালেদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে নয়। আর যখন তারা মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছেন তখন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে মুসলমানদের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। বিশ্বজগত তো বহু টুকরো বিষয়ের সমষ্টি। আর এ প্রত্যেক বিষয়েই একেকজন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি রয়েছেন।
যাবারকান ইবনে আদি উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কাছে নালিশ নিয়ে এসেছিলেন—হুতিয়া তাকে এই বলে নিন্দে করেছিল— ‘তুমি সম্মান ছেড়ে দাও, তা পাবার জন্য সফর করো না, তুমি বসে থাকো, কেননা তুমি আহার্য গ্রহণকারী এবং পোশাক পরিধানকারী।’ উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন তাকে বললেন, 'আমি তো এতে নিন্দের কিছু দেখি না।' যাবারকান বললেন, 'খাবার-পোশাকই কি আমার সম্মানের জন্য যথেষ্ট?' উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বিষয়টি ভালোভাবে বুঝতে চাইলেন। তিনি তখন কুরআনুল কারিমের সবচেয়ে বড় কারী উবাই ইবনে কাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে ডাকেননি, কুরআনের ব্যাখ্যাকার ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু-কেও না, হালাল-হারাম সম্পর্কে সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহু-কেও না, সবচেয়ে বেশি হাদিস বর্ণনাকারী আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু-কেও না, বরং তিনি হাসসান ইবনে সাবেত রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে ডেকে আনেন। কেননা বিষয়টি কবিতা-সংক্রান্ত। কবিতা-সংক্রান্ত বিষয়ে কবিরাই ফতোয়া প্রদান করবেন। হাসসান ইবনে সাবেত রাদিয়াল্লাহু আনহু এসে বললেন, 'এ কবিতার মাধ্যমে তার শুধু নিন্দেই জ্ঞাপন করা হয়নি; বরং তার ওপর পেশাব করে দেওয়া হয়েছে।' অর্থাৎ তার মারাত্মক নিন্দা জ্ঞাপন করা হয়েছে। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন হুতিয়াকে বন্দী করেন।
দ্বিতীয় পাঠ
যে ব্যক্তি বলল-আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন-সে বস্তুত ফতোয়াই প্রদান করল। তাই কোনো মাসআলায় আল্লাহ তাআলার হুকুম কী, তা না জানলে 'আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন' বলতে সংকোচ বোধ করবেন না। 'আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন' বলতে লজ্জাবোধ করে মানুষের গুনাহ নিজ কাঁধে বয়ে আনবেন না। শা'বি রহমতুল্লাহি আলাইহি'র কথাই ধরুন না! তিনি একাধারে একজন আলেম, মুহাদ্দিস, ফকিহ ও কাজি। তাকে এক মাসআলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।' লোকেরা তাকে বলল, 'আপনি ইরাকের বড় ফকিহ, “আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন”-এ কথা বলতে কি আপনার লজ্জা লাগে না?' তিনি উত্তরে বললেন, 'ফেরেশতারা তো এটা বলতে লজ্জাবোধ করেননি যে- ‘আপনি পবিত্রতম সত্তা! আপনি যা শিক্ষা দিয়েছেন তা ছাড়া আমাদের কোনো ইলম নেই। নিশ্চয় আপনিই প্রকৃত জ্ঞানী, হেকমতবান।[১]’
মালেক ইবনে আনাস রহমতুল্লাহি আলাইহি'র কথাই ধরুন না! তিনি ছিলেন দারুল হিজরাহ মদিনার ইমাম। যাঁর ব্যাপারে বলা হতো—মালেক মদিনায় থাকাবস্থায় কারও ফতোয়া প্রদানের সাহস নেই। একবার ইরাক থেকে এক ব্যক্তি তার কাছে কিছু প্রশ্ন নিয়ে এল। তিনি কিছুর উত্তর দেন আর বাকিগুলো সম্পর্কে চুপ করে থাকেন। লোকটি তখন বলল, 'হে মালিক, আমি ইরাকবাসীকে গিয়ে কী বলব?' তিনি বললেন, 'তাদেরকে গিয়ে বোলো, মালিক এগুলো সম্পর্কে জ্ঞান রাখে না!'
তৃতীয় পাঠ
গুনাহ যতই বেশি হোক না কেন আপনি এই ধারণা করা থেকে বেঁচে থাকবেন যে, আপনার গুনাহ আল্লাহ তাআলার রহমতের চেয়ে বেশি হয়ে গেছে। শয়তান তো আপনার থেকে এটাই চায়! সে আপনার চোখে গুনাহকে বড় করে দেখাতে চায়। আল্লাহ তাআলার রহমতকে ছোট করে দেখাতে চায়। অথচ আল্লাহর রহমত আপনার গুনাহর চেয়ে বহুগুণ বিস্তৃত এবং বড়। আপনি এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিত থাকুন। উল্লিখিত লোকটি ৯৯জন মানুষকে খুন করে তাওবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরপর সে আগের অবস্থানে চলে গেছে। আরেক জনকে হত্যা করে শত সংখ্যা পূরণ করেছে। আল্লাহ তাআলা যখন তার অন্তরে কল্যাণ দেখতে পেয়েছেন তখন তার জন্য তাওবার উপকরণের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। সে আল্লাহর ব্যাপারে সঠিক পথ অবলম্বন করেছে। তাই আল্লাহ তাআলা তাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। সে নিজের জিনিসপত্র ও পাথেয় নিয়ে সফরে বের হয়ে গেছে। রাস্তায় তার মৃত্যু এসে হাজির হয়েছে। সহিহ বুখারিতে এসেছে—ফেরেশতারা দূরত্ব পরিমাপ করে দেখলেন লোকটি রাস্তার ঠিক মধ্যখানে রয়েছে। আল্লাহ তাআলা তখন মাটিকে নির্দেশ দেন—'তুমি নিকটবর্তী হয়ে যাও!' এভাবে সে নেককারদের ভূখণ্ডের নিকটবর্তী হয়ে যায়।
এই তাওবাকারী প্রকৃতপক্ষেই এক খুনি ছিল। সামান্য থেকে সামান্য কারণে সে লোকজনকে হত্যা করত। ধর্মগুরুর ফতোয়া তার পছন্দ হয়নি, তো তাকে হত্যা করে ফেলেছে। শিরকের পর হত্যার চেয়ে বড় কোনো গুনাহ নেই, তবুও আল্লাহ তার তাওবা কবুল করেছেন। মনে রাখবেন, হারাম কাজের সঙ্গে আপনার সম্পৃক্ততা আল্লাহর রহমতের চেয়ে বেশি নয়। আপনার ঘুষ আল্লাহর রহমতের চেয়ে বেশি নয়। আপনার মদ্যপান আল্লাহর রহমতে চেয়ে অধিক নয়। [১] সাহাবায়ে কেরামের প্রতি লক্ষ করুন। যাঁরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে জীবনযাপন করেছেন, তারা কেমন ছিলেন? উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কথাই ধরুন না! তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে হত্যা করার জন্য বের হয়েছিলেন! ইকরামার কথা মনে করুন! মক্কা বিজয়ের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাঁর রক্ত হালাল ঘোষণা করেছিলেন! খালিদ ইবনে ওয়ালিদের কথা! উহুদের দিন তিনি মুসলমানদের বিজয়কে এক প্রকার পরাজয়ে পর্যবসিত করেছিলেন!
এবার আল্লাহর রহমতের দিকে দৃষ্টিপাত করুন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু পৃথিবীকে ইনসাফ এবং রহমত দ্বারা পূর্ণ করে দিয়েছেন। ইকরিমা রাদিয়াল্লাহু আনহু ইয়ারমুকের যুদ্ধে ডান বাহুর নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং শহিদ হয়েছেন। 'আল্লাহর উন্মুক্ত তরবারি' উপাধিতে ভূষিত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু'র মাধ্যমে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু রোম ও পারসিকদের শায়েস্তা করেছেন। মানুষের স্বভাব খনিজ পদার্থের মতো। জাহেলি যুগে যারা উত্তম ছিলেন ইসলাম আসার পরও দ্বীনের বুঝ গ্রহণের মাধ্যমে তারা উত্তমই থেকেছেন। বর্তমান যুগেও আমরা বিভিন্ন ব্যক্তি সম্পর্কে শুনতে পাই। দেখতে পাই যে, তারা একসময় ইসলামের কট্টর দুশমন ছিলেন। কিন্তু তাওবা করে এখন ইসলামের সবচেয়ে বড় রক্ষকে পরিণত হয়েছেন। যদি আপনি পাপাচারের মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করে থাকেন তাহলে জেনে রাখুন, আনুগত্যের মাধ্যমে প্রসিদ্ধি লাভ করার দরজা সবসময়ের জন্য খোলা রয়েছে।
চতুর্থ পাঠ
আপনি মানুষ এবং মানুষের স্রষ্টা আল্লাহর মধ্যে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবেন না। বহু মানুষ এমন রয়েছে যাদেরকে হাত ধরে আল্লাহ তাআলার পথে নিয়ে আসতে হয়। তাহলে কেন আপনি এসব মানুষকে আল্লাহর কাছে পৌঁছার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াচ্ছেন? পাপাচারীদের কাছে আল্লাহর আযাবের পূর্বে তার রহমতের কথা আলোচনা করুন। তার প্রতিশোধগ্রহণের গুণের পূর্বে তার ইনসাফ এবং ক্ষমাশীল গুণের আলোচনা করুন। জান্নাতে সকলেরই সংকুলান হবে! আপনি নিজের স্থানের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হবেন না। পাপাচারীদের সঙ্গে সদয় আচরণ করুন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বাতিল ধর্মের ওপর এক পাদ্রীকে রাত্রি-জাগরণ করতে দেখে ক্রন্দন শুরু করেন। জিজ্ঞাসা করা হয়, 'আমিরুল মুমিনিন! কোন জিনিস আপনাকে কাঁদাচ্ছে?' তিনি বলেন, 'ক্লিষ্ট ক্লান্ত এক ব্যক্তি, যে পরিশ্রম করা সত্ত্বেও জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে!' অন্য ধর্মের মানুষ জাহান্নামে প্রবেশ করাটা উমরের কাছে আনন্দদায়ক ছিল না। তাহলে কি ইসলাম ধর্মের কেউ জাহান্নামে প্রবেশ করাটা তার কাছে আনন্দদায়ক হতে পারে?
এক ইহুদি মৃত্যু শয্যায় কাতরাচ্ছিল, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে মুহূর্তে তাকে ইসলামের দাওয়াত দেন। লোকটি ইসলাম গ্রহণ করে নেয়। তিনি বলেন, 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি আমার মাধ্যমে এক ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করলেন।' [১] আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় বান্দা হলো সে, যে আল্লাহর বান্দাদেরকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। গুনাহ মানুষজনকে পরিবেষ্টন করে আছে, শয়তান তাদের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে আছে এটাই কি যথেষ্ট নয়, তবুও আমরা কেন তাদের ওপর চেপে বসতে যাব! রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার একটি মাত্র আয়াত তিলাওয়াত করতে করতেই সারাটি রাত কাটিয়ে দেন- ‘যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি দেন, তবে তারা আপনার দাস এবং যদি আপনি তাদেরকে ক্ষমা করেন, তবে আপনিই পরাক্রান্ত, মহাবিজ্ঞ।’[১] এরপর আল্লাহ তাকে এই সংবাদ দিয়েছেন-'অবশ্যই আমি আপনাকে আপনার উম্মতের ব্যাপারে সন্তুষ্ট করব।' [২] এই রহমতকে সবসময় আমাদের নজরে রাখা আবশ্যক। আমরা তো গুনাহকে অপছন্দ করি, গুনাহগারকে নয়। হাদিসে এসেছে, এক নবীকে তার সম্প্রদায় প্রহার করে রক্তাক্ত করে ফেলেছে। এরপর তিনি চেহারা থেকে রক্ত মুছতে মুছতে বলতে লাগলেন, 'হে আল্লাহ আপনি আমার সম্প্রদায়কে ক্ষমা করে দিন। তারা তো জানে না।' [৩]
পঞ্চম পাঠ
মৃত্যু হঠাৎ করে উপস্থিত হয়ে যায়। আমাদের আলোচ্য ব্যক্তিটি রাস্তায়ই মারা গেল। সে ভাবতেও পারেনি যে, চলতে চলতে তার মৃত্যু চলে আসবে। কিন্তু এই মৃত্যু কত সুমিষ্ট আর এই রাস্তা কত চমৎকার! আল্লাহর রাস্তায় তার মৃত্যু হলো... আপনি জীবনটাকে আল্লাহর পথের সফর বানিয়ে নিন। তাহলে যখনই মৃত্যু আসুক এতে আপনার কোনো ক্ষতি হবে না। আপনার আশপাশে তাকিয়ে দেখুন! কত শস্য ও ফসলাদি রয়েছে, মালিকেরা তা কাটতে পারেনি। কত বাড়ি নির্মিত হয়েছে, বাড়িওয়ালা তাতে থাকতে পারেনি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কত সিট রয়েছে ছাত্ররা সেখান থেকে বের হওয়ার পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেছে। কত শিশুকে দাফন করা হলো! কত বালকের জানাজা কাঁধে করে নিয়ে যাওয়া হলো! পূর্ণিমার চাঁদের মতো সুন্দরী কত যুবতী রয়েছে, তাদেরকে বাসরঘরে নয়, বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কবরে। আপনি এটা বলবেন না যে, আগামীকাল আমি তাওবা করব। আগামীকালটি আপনার কাছে নাও আসতে পারে। এ পর্যন্ত যারা মারা গেছে তারা প্রত্যেকেই ধারণা করত যে, এই সময়টিতে তারা মারা যাবে না।
ষষ্ঠ পাঠ
নিয়তই আমল কবুলের ভিত্তিমূল। আমরা আমল না করলেও শুধু নিয়তই আমাদের মর্যাদা উঁচু করে দিতে পারে। মুসা আলাইহিস সালাম-এর সমকালে বনি ইসরাইলে একবার দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। মুসা পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, এক দরিদ্র ব্যক্তি বলছে—‘হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি জানেন, যদি আমার এই পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ হতো তাহলে আমি তা আপনার বান্দাদেরকে দান করে দিতাম।’ আল্লাহ তাআলা মুসা আলাইহিস সালাম-কে বলেন, ‘তুমি আমার বান্দাকে বলো আমি তার সাদাকাহ কবুল করেছি।’ পক্ষান্তরে আমল করা সত্ত্বেও নিয়ত আমাদেরকে নিচে নামিয়ে দিতে পারে। মুনাফিকদের সরদার ইবনে সালুলের কথাই ধরুন না! রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পেছনে ফজরের নামাজ পড়ছে। অথচ সে জাহান্নামের সবচেয়ে নিকৃষ্ট স্থানে নিক্ষিপ্ত হবে। আপনার নিয়ত পরিশুদ্ধ করুন, আপনার আমল ঠিক হয়ে যাবে। আপনি সেই ব্যক্তির মতো হবেন না যে সমুদ্রে গম চাষাবাদ করে। তার এ চাষাবাদ নিছক পণ্ডশ্রম বৈ কিছু নয়। এতে সে কোনো সওয়াব (ফসল) পায় না।
টিকাঃ
[১] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৭৬৬
[১] সুরা বাকারা, আয়াত-ক্রম : ৩২
[১] বলা বাহুল্য এগুলো জঘন্যতম অপরাধ। কুরআন-হাদিসে এসবের ব্যাপারে মারাত্মক আযাবের হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে। হাদিসে উল্লিখিত ঘটনাটি যেহেতু আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া সংক্রান্ত এ জন্য লেখক এসব গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিদের আল্লাহর রহমতের আশার আলো দেখাচ্ছেন। এ জঘন্যতম গুনাহগুলোর সরলীকরণ করা আদৌ এখানে উদ্দেশ্য নয়।- অনুবাদক
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ১৩৫৬
[১] সুরা মায়িদাহ, আয়াত-ক্রম: ১১৮
[২] সুনানে নাসায়ি, হাদিস-ক্রম: ১০১;, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস-ক্রম: ১৩৫০
[৩] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৪৭৭
📄 গুহায় আটকে-পড়া তিন ব্যক্তি
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
'একবার (পূর্ববর্তী যুগের) তিন লোক পদব্রজে চলছিল। চলন্ত অবস্থায় ঝড়-বৃষ্টি নেমে গেল। তখন তারা একটি পাহাড়ের গর্তে আশ্রয় নিল। ইতিমধ্যে পাহাড় থেকে একটি পাথরখণ্ড খসে পড়ে তাদের গর্তে মুখ ঢেকে দিল। ফলে গর্তের মুখ বন্ধ হয়ে গেল। সে মুহূর্তে তারা পরস্পরকে বলতে লাগল, "নিজ নিজ সৎ আমলের প্রতি খেয়াল করো যা তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করেছ এবং সে সৎকর্মকে ওসিলা বানিয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করতে থাকো। এমন হতে পারে, আল্লাহ তাআলা তোমাদের এ মহাবিপদ থেকে (পাথরটি সরিয়ে) নিষ্কৃতি দান করবেন।”
'তখন তাদের একজন বলল, “হে আল্লাহ! আমার পিতা-মাতা ছিলেন বয়োবৃদ্ধ। আমার এক স্ত্রী ও ছোট ছোট সন্তান-সন্ততি ছিল। আমি তাদের (জীবিকার) জন্য মেষ-বকরি মাঠে চরাতাম। (সন্ধ্যায়) ঘরে ফিরে এসে তাদের জন্য আমি সেগুলোর দুধ দোহন করতাম এবং আমার সন্তানদের পূর্বে প্রথমেই পিতা-মাতাকে পান করাতাম। একদিন একটি গাছের সন্ধানে অনেক দূরে যেতে হলো, ফলে আমার ঘরে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। (ফিরে এসে) আমি তাদের (পিতা-মাতাকে) দুজনকে ঘুমন্ত অবস্থায় পাই। আমি আগের মতই দুধ দোহন করি এবং তা নিয়ে পিতা-মাতার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে থাকি। ভাবি, তাদের ঘুম ভাঙানো ঠিক হবে না। এদিকে তাদেরকে পান না করিয়ে সন্তানদেরকে পান করানোটাও পছন্দ করছিলাম না। কিন্তু সন্তানেরা ক্ষুধার তাড়নায় আমার দুপায়ের কাছে কাতরাচ্ছিল। তাদের ও আমার এ অবস্থা চলতে থাকল। এ অবস্থায় ভোর হয়ে গেল। যদি আপনি মনে করেন যে, আমি এ কাজ আপনার সন্তুষ্টি লাভের নিমিত্তে করেছি, তাহলে আমাদের জন্য (গর্তের মুখ) কিছুটা ফাঁকা করে দাও, যাতে আমরা আকাশ দেখতে পাই।” আল্লাহ তাআলা তার এই দুআয় একটু ফাঁকা করে দিলেন। ফলে তারা আকাশ দেখতে পেল।
'দ্বিতীয়জন বলল, “হে আল্লাহ! আমার আমার কাহিনি হলো, এক চাচাতো বোন ছিল আমার। কোনো পুরুষ কোনো নারীকে যেভাবে ভালোবাসে, আমি তাকে তারচেয়েও বেশি ভালোবাসতাম। একদিন (যৌন তিয়াস মেটানোর জন্য) তাকে একান্তে কাছে পেতে চাইলাম, কিন্তু সে প্রথমে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল। পরে ১০০ দিনারের রাজি হলো। অতঃপর আমি কষ্ট করে ১০০ দিনার জমা করলাম। তারপর সেগুলো নিয়ে তার কাছে আসলাম। যখন আমি তার দুপায়ের মধ্যখানে বসলাম, এমন সময় সে বলল, হে আল্লাহর বান্দা! আল্লাহকে ভয় করো। বিয়ে-বহিভূর্তভাবে সতিত্ব নষ্ট করো না। এ কথা শুনে আমি তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ালাম। আপনি যদি মনে করেন, কেবল আপনার সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তেই আমি এ কাজ করেছি তবে আমাদের জন্য একটু ফাঁকা করে দিন।” আল্লাহ তাআলা তখন তাদের জন্য আরেকটু ফাঁকা করে দিলেন।
'তৃতীয়জন বলল, “হে আল্লাহ! আমি এক 'ফারাক' (প্রায় সাত কিলোগ্রাম সমপরিমাণ) শস্যের বিনিময়ে একজন মজদুর নিযুক্ত করেছিলাম। সে তার কাজ শেষ করে বলল, আমাকে আমার প্রাপ্য দিয়ে দিন। আমি এক ফারাক (শস্য) তার সামনে পেশ করলাম। কিন্তু সে তা না নিয়ে চলে গেল। আমি সে শস্য জমিনে চাষ করতে থাকলাম। শেষ অবধি তা দিয়ে গরু-বকরি ও রাখাল সংগ্রহ করলাম। অনেকদিন পর সে আমার কাছে এল এবং বলল, আল্লাহকে ভয় করো। আর আমার পাওনা আদায় করতে আমার ওপর অবিচার করো না। আমি বললাম, তুমি এ (সমস্ত) গরু ও রাখাল নিয়ে যাও। সে বলল, আল্লাহকে ভয় করো, আমার সঙ্গে উপহাস করো না। আমি বললাম, সত্যিই আমি তোমার সঙ্গে উপহাস করছি না। এ গরু ও রাখাল নিয়ে যাও। অতঃপর সে তা নিয়ে চলে গেল। আপনি যদি জানেন, এ কাজটি কেবল আপনার সন্তুষ্টি লাভের নিমিত্তেই করেছি তাহলে অবশিষ্টাংশও ফাঁকা করে দিন।” আল্লাহ তাআলা তখন গুহার মুখের বাকি অংশটুকু ফাঁকা করে দিলেন।'[১]
প্রথম পাঠ
ঘটনাটির স্থান কাল ব্যক্তি—কিছুই পরিচিত নয়। এর কারণ হলো ঘটনার বিবরণ মুখ্য উদ্দেশ্য নয়; বরং চিন্তা-চেতনা আমল-আখলাক সংশোধনই এর মূল উদ্দেশ্য। কুরআন ও হাদিসের সকল ঘটনার ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য। কুরআন আমাদেরকে আদম আলাইহিস সালাম-এর দুই পুত্রের আলোচনা করতে গিয়ে তাদের নাম বলেনি। আমরা পূর্ববর্তী জাতির ইতিহাস থেকে তা জানতে পেরেছি। তারা হাবিল কাবিল হোন বা আহমদ খালেদ হোন এতে কিছুই আসে-যায় না। এই দুজনের ব্যক্তিত্ব আমাদের কীসের জানান দেয়? একজন হলো হিংসুক, লোভী, আল্লাহ তাআলার বিধান পরিত্যাগকারী এবং ভাইয়ের হন্তারক। অপরজন মুমিন, মুত্তাকি ও অত্যন্ত পরহেজগার। ভাই তাকে হত্যা করতে উদ্যত হলেও তিনি ভাইকে হত্যার জন্য হাত প্রসারিত করেননি।
কুরআন যখন আমাদের কাছে ফিরআউনের বংশের মুমিন ব্যক্তির কথা আলোচনা করেছে তখনও তার নাম বলেনি। কেননা উল্লিখিত অবস্থাটিই শিক্ষণীয়। আবার যখন কুরআন ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর পবিত্রতার ব্যাপারে সাক্ষ্যদাতা সম্পর্কে আলোচনা করেছে তখন তাকে শুধু 'জুলাইখার পরিবার থেকে একজন সাক্ষ্য দিল' বলে উল্লেখ করেছে। আর হাদিস ও সাহাবায়ে কেরামের উক্তি থেকে আমরা তার পরিচয় জানতে পেরেছি। কেননা তার বিস্তারিত পরিচয় প্রদান সাধারণ এক বিষয় আর তার অবস্থা হলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নবীদের সাহায্যের জন্য যে ব্যক্তি শহরের এক প্রান্ত থেকে দৌড়ে এসেছিলেন, সুরা ইয়াসিনে তাকে 'একজন লোক' বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা ব্যক্তির চেয়ে অবস্থাই গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন যখন আমাদের কাছে নমরুদের কথা আলোচনা করেছে তখন তার নাম উল্লেখ করেনি। কেননা অবাধ্যতার অবস্থা জানাটাই গুরুত্বপূর্ণ। অবাধ্য ব্যক্তির পরিচয় নয়। তেমনিভাবে কুরআন যখন আমাদের কাছে ইসমাইল যাবিহুল্লাহ'র কথা আলোচনা করেছে তখন তার নাম উল্লেখ করেনি। কেননা এখানে পুণ্যের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
কুরআন-হাদিসে ঘটনার ক্ষেত্রে কেবল ব্যক্তির অবস্থান তুলে ধরার জন্যই তার নাম বলা হয়ে থাকে। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-কে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সমকালের রুগ্ন সমাজ এবং সে-সমাজে একজন মুমিনের দৃঢ়তা সম্পর্কে সংবাদ দেওয়ার জন্যই নাম উল্লেখ করা হয়েছে; ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর ব্যক্তিগত জীবনী কিংবা পূর্বকার জাতির ইতিহাস টানার জন্য নয়; যদিও ঘটনার ফাঁকে এ বিষয়টিও জানা হয়ে যায়। কুরআন আমাদের কাছে নুহ আলাইহিস সালাম-এর প্লাবন সম্পর্কে আলোচনা করেছে। কুরআন এর মাধ্যমে আমাদেরকে এই সংবাদ দিয়েছে, মানুষ কীভাবে জীবজন্তুর চেয়েও নিকৃষ্ট হয়ে যেতে পারে! মাত্র একটি ডাকেই জীবজন্তুরা জাহাজে উঠে গেল। কিন্তু টানা সাড়ে নয়শত বছর ডাকাডাকি সত্ত্বেও মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ জাহাজে উঠল! কুরআন এর মাধ্যমে আমাদেরকে এই সংবাদ দিতে চেয়েছে, আল্লাহর পথের দাঈরা কখনো ক্লান্ত হন না। কেননা তারা ফলাফলের দিকে তাকান না। সবসময় আল্লাহর পথে চলাটাই হলো মুখ্য বিষয়। কুরআন আমাদের কাছে ফিরআউনের সঙ্গে মুসা আলাইহিস সালাম-এর ঘটিত অবস্থাদি নিয়ে আলোচনা করেছে। এর মাধ্যমে আমাদেরকে সংবাদ দিতে চেয়েছে যে, অত্যাচারী ও অবাধ্যদের অনিচ্ছাসত্ত্বেও নিশ্চিতভাবেই আল্লাহ তাআলার ফায়সালা কার্যকরী। ফিরআউন মুসা আলাইহিস সালাম-এর খুঁজে হাজার হাজার শিশুকে হত্যা করেছে, কিন্তু যখন মুসা এসেছেন তখন তাকে নিজ প্রাসাদে লালন-পালন করেছে! আল্লাহ তাআলা এর মাধ্যমে আমাদেরকে সংবাদ দিতে চেয়েছেন যে, উপায়-উপকরণ মানুষের ক্ষতি করতে পারে কিন্তু আল্লাহর কোনো ক্ষতি করতে পারে না। কোনো লাঠি তো কখনো সমুদ্র বিদীর্ণ করতে পারে না। কিন্তু যখন আল্লাহ চান তখন ঠিকই লাঠির আঘাতে সমুদ্র বিদীর্ণ হয়ে যায়। এই কারণে প্রত্যেক ঘটনায় প্রত্যেক অবস্থায় আপনাকে কাজ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে; কর্তাকে নিয়ে নয়। আপনি জীবন নিয়ে ভালোভাবে চিন্তা-ভাবনা করলে বুঝতে পারবেন, হক-বাতিলের মধ্যে যুগে যুগে একই যুদ্ধ চলমান ছিল এবং আছে। শুধু যোদ্ধার পরিবর্তন ঘটেছে। প্রত্যেক যুগের অবাধ্য ব্যক্তিটি সেই ফিরআউন আর নমরুদের মতোই। প্রত্যেক যুগের দাঈ সেই ইবরাহিম আর মুসার মতোই। বাতিলের সকল বাহিনী তো সেই আবরাহা আর বদর-দিবসের কুরাইশ বাহিনীই। পক্ষান্তরে দ্বীনের জন্য কুরবান প্রতিটি বাহিনী তো ইউশা ইবনে নুন আলাইহিস সালাম এবং সাহাবায়ে কেরামের বাহিনী।
দ্বিতীয় পাঠ
আপনাকে আল্লাহর নামে স্মরণ করানো হলে ভয়ে কম্পিত হয়ে উঠুন। সম্মানে আঘাত লেগেছে বলে অধিক পরিমাণে গুনাহে প্রবৃত্ত হবেন না। গুনাহে লিপ্ত হওয়ার পর তা নিয়ে অহংকার করাটা কখনো কখনো গুনাহের চেয়েও বড় গুনাহ হয়ে থাকে। লক্ষ করে দেখুন, আদম ও ইবলিস—উভয়েই তাদের রবের অবাধ্যতা করেছেন। ইবলিস সাময়িক সময়ের জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা করেছে; আদম আলাইহিস সালাম-কে সিজদাহর নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করেছে। আদম আলাইহিস সালাম সামান্য সময় রবের অবাধ্যতা করেছেন; নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়েছেন। বাহ্যিকভাবে উভয়ের অবাধ্যতা একইরকম হলেও পরিণাম কিন্তু সমান হয়নি। ইবলিসকে যখন তিরস্কার করা হয়েছে তখন সে অহংকার করেছে। আদম আলাইহিস সালাম-কে যখন তিরস্কার করা হয়েছে তখন তিনি ইস্তেগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করেছেন। অহংকারী আর ক্ষমা প্রার্থনাকারীর মধ্যে কত বিশাল ব্যবধান! আল্লাহর নাম স্মরণ করানো হলে কখনো অবাধ্যতা করবেন না। কেননা উদাসীনভাবে গুনাহ করার তুলনায় হটকারিতার মাধ্যমে গুনাহ করাটা অনেক বেশি জঘন্য।
যখন আপনি কোনো কথা বলে নিকটভাজন কাউকে রাগিয়ে দেন আর সে- ক্ষেত্রে কেউ যদি আপনাকে আপনার অপরাধ ধরিয়ে দেয়, তাহলে ভুলে মন্দ কথা বলা এবং ভুলে অহংকার করা—এ দুটি ভুল একত্রিত করবেন না। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেলে কেউ যদি আপনাকে আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় করার কথা স্মরণ করিয়ে দেয় তাহলে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার গুনাহ এবং অহংকারের গুনাহকে একত্রিত করবেন না। আল্লাহর হক সংক্রান্ত কোনো গুনাহ করে ফেললে-যেমন নামাজ-রোজা ছেড়ে দেওয়ার পর আপনাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হলে-অহংকার করবেন না। আল্লাহ তাআলা ওয়ালিদ ইবনে মুগিরার ব্যাপারে বলেছেন, 'সে পশ্চাদপসরণ করল এবং অহংকার করল।' গুনাহ করার পর অনুশোচনাবোধ তৈরি হওয়াটা আল্লাহর কাছে সেই আনুগত্য থেকে উত্তম হতে পারে যা আপনার মধ্যে অহমিকা তৈরি করে। এটি গুনাহ করার পরের কথা। গুনাহ করার পূর্বে কোনো ধরনের ওজর-আপত্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা এতে আল্লাহর ওপর দাম্ভিকতা প্রদর্শন করা হয়। যদি গচ্ছিত ধনসম্পদ আত্মসাৎ করার ইচ্ছা পোষণ করেন এরপর যদি আপনাকে আল্লাহর নাম স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় তাহলে আপনি ভীত হয়ে পড়ুন। কেননা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পরও যা করা হয়ে থাকে তা সবচেয়ে নিকৃষ্টতম গুনাহ। কেননা এতে চ্যালেঞ্জের মতো বিষয় চলে আসে।
স্মরণ রাখুন হকের সামনে বড়রাও ছোট। উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কথাই ধরুন না! তিনি বিশাল বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে শাসন করতেন। একবার মোহরের ক্ষেত্রে মানুষের বাড়াবাড়ি দেখে মিম্বরে আরোহণ করেন। মোহরের পরিমাণ নির্ধারণ করে দিতে চান। তখন শিফা বিনতে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা দাঁড়িয়ে বলেন, আপনার এটা করার অধিকার নেই। আল্লাহ তাআলা তো বলেছেন- ‘তাদের একজনকে প্রচুর ধন-সম্পদ প্রদান করে থাকো, তবে তা থেকে কিছুই ফেরত গ্রহণ কোরো না।’[১] আল্লাহ তাআলার এ ঘোষণা সত্ত্বেও আপনি কোন অধিকার-বলে মোহর নির্ধারিত করে দেবেন? উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'এই নারী সঠিক বলেছেন আর উমর ভুল করেছে।' তিনি খলিফা হওয়া সত্ত্বেও জনসম্মুখে হক মেনে নিতে সংকোচবোধ করেননি। তাহলে আমাদের কী হলো—কেউ আমাদের উপদেশ দিলে আমরা সে ক্ষেত্রে হক পরিত্যাগ করে ফেলি! আমাদের আলোচ্য ঘটনার বীরপুরুষ তার চাচাতো বোনকে অত্যন্ত ভালোবাসত। একজন পুরুষ একজন নারীকে যে পরিমাণ ভালোবাসতে পারে সে তেমনি বাসত। তাকে পাবার জন্য নিজের ধন-সম্পদ আর সময় ব্যয় করেছে। সামনে যাওয়ার পর তাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, 'আল্লাহকে ভয় করো, অন্যায়ভাবে সতিত্ব নষ্ট করো না।' লোকটি সঙ্গে সঙ্গে সরে গিয়েছে। অথচ মেয়েটি তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয়তমা নারী ছিল।
তৃতীয় পাঠ
মানুষের হক বিনষ্ট করা থেকে বিরত থাকুন। আল্লাহ নিজের হক ক্ষমা করে থাকেন কিন্তু মানুষের হকের ক্ষেত্রে তিনি কোনো ছাড় দেন না। শহিদের রক্তের ফোঁটা জমিনে পড়ামাত্রই তার সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়, কিন্তু ঋণ ক্ষমা করা হয় না। কেননা ঋণ হলো মানুষের হক। হারাম দ্বারা যে গোশত তৈরি হয় জাহান্নাম তার উপযুক্ত স্থান। হাদিসে এসেছে, 'আমি তো একজন মানুষ। তোমরা আমার কাছে বিচার নিয়ে আসো। হতে পারে তোমাদের কেউ দলিল-প্রমাণ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে অপরের তুলনায় পটু। তখন আমি যা শুনি সে অনুযায়ী ফায়সালা করে দিই। আমি যদি কারও জন্য তার ভাইয়ের কোনো হকের ফায়সালা করে দিই তাহলে সে যেন তা গ্রহণ না করে। আমি এর মাধ্যমে তার জন্য জাহান্নামের অংশের ফায়সালা করে দিই।' [১] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফায়সালা করলেও যখন অন্যের হক হালাল হয়ে যায় না, তখন মানুষের প্রতিষ্ঠিত আদালতের কথা চিন্তা করুন! আদালত এ ধরনের ফায়সালা করলে বিষয়টা কেমন হতে পারে? দুনিয়ার সকল আদালত ফায়সালা করলেও সেটা আপনার জন্য বৈধ নয় বরং হারাম।
স্মরণ করুন, আখেরাতে এমন বিচার হবে, যেখানে সকলের হৃত হক ও অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হবে। সেখানে কোনো দিনার, দিরহাম (টাকা-পয়সা) থাকবে না। হিসাব মেটানো হবে পুণ্য-কাজ এবং আমল দ্বারা। অথচ আমরা তখন এসবের প্রতি সবচেয়ে বেশি মুখাপেক্ষী থাকব। আইন-কানুন তৈরি করে দুর্বলদের ওপর শক্তি প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকুন। কেউ সরল-সোজা হলেই তার সম্পদ চুরি করা হালাল হয়ে যায় না। যার থেকে চুরি করা হলো সে সরল-সোজা নাকি বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়; বরং চুরি সর্বাবস্থায়ই হারাম। বর্তমান যুগে মানুষজন লোক-দেখানোর ফ্যাশনে নিপতিত হয়ে গেছে। কেউ হোটেল-বয়কে হাজার টাকা বখশিশ দিতে পারে কিন্তু আপন কর্মচারীকে বেতন দিতে পারে না; উল্টো তা কেটে নেয়। অথচ ওই বেতন ভালো মানের কোনো রেস্টুরেন্টের এককাপ চায়ের দামের সমপরিমাণও নয়! প্রকৃত বদান্যতা হলো আপনার ওপর মানুষের যে অধিকার রয়েছে তা আদায় করে দেওয়া। পরিচারক/পরিচারিকা থেকে চুরি করে কাউকে হাদিয়া-বখশিশ দেওয়াটা বদান্যতা নয়। অন্যের অধিকার প্রদান করাটাই হলো প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব ও সৌন্দর্য। বন্ধুদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে চলাফেরা করা এবং চমৎকার সুগন্ধি মাখা সৌন্দর্য নয়। হায় আফসোস! লোকেরা এখন সৌন্দর্য বলতে শুধু পোশাক-আশাককেই বুঝে থাকে। তাদের রুহ ও অন্তরের দিকে তাকালে দেখা যাবে তা পচা এবং দুর্গন্ধময়।
আমাদের আলোচ্য ঘটনায় লক্ষ করুন, শ্রমিক তার মজুরি না নিয়েই চলে গেছে। মালিক তা দিয়ে চাষাবাদ করেছে; তার প্রবৃদ্ধি ঘটিয়েছে। এরপর শ্রমিক যখন ফিরে এসেছে তখন তাকে সব দিয়ে দিয়েছে। অথচ আমরা সাধারণ মানুষ এবং হতদরিদ্রদের বেতনই দিতে চাই না। এই সামান্য বেতন চুরি করে আমাদের কোনো লাভও হবে না আর তা দিয়ে দিলেও আমরা ফকির হয়ে যাব না। আপনি ধন-সম্পদের গোলাম হয়ে যাবেন না। গোলামরা শক্তি খাটানো ব্যতীত অধিকার প্রদান করে না। স্বাধীন মানুষের মতো হোন। তাদের কাছে কেউ না চাইলেও তারা স্বেচ্ছায় অন্যের অধিকার প্রদান করে থাকে।
চতুর্থ পাঠ
দুআ মুমিনের অস্ত্র। একে তুচ্ছ ভাববেন না। হাদিসে এসেছে, একমাত্র দুআই তাকদিরকে পরিবর্তন করতে পারে। [১] আল্লাহর দরজায় কড়া নাড়ার সর্বশেষ দরজাই হলো দুআ। রিজিক, সুস্থতা, সন্তান-সন্ততি, স্ত্রী এবং সার্বিক সাহায্য কবে থেকে মানুষের হাতে চলে এল! সবই তো আল্লাহর হাতে। মানুষ তো কেবল উপকরণ মাত্র। আমাদের কী হলো যে আমরা উপকরণ নিয়েই পড়ে থাকি আর উপকরণের স্রষ্টা আল্লাহ তাআলাকে পরিত্যাগ করে ফেলি! উপকরণ গ্রহণ করাটা শরিয়তসম্মত, বরং আবশ্যকীয় এক বিষয়। কিন্তু উপকরণকে নিশ্চিত ভাববেন না। ওষধ সুস্থতার মাধ্যম কিন্তু সুস্থতা প্রদানকারী হলেন আল্লাহ। কাজকর্ম করাটা রিজিকের মাধ্যম কিন্তু রিজিকদাতা হলেন আল্লাহ। বিয়ে সন্তান লাভের মাধ্যম কিন্তু সন্তানদাতা হলেন আল্লাহ। কত মানুষ চিকিৎসা গ্রহণ করেছে কিন্তু সুস্থ হয়নি! কত মানুষ কাজকর্ম করে থাকে কিন্তু প্রাচুর্য লাভ করতে পারেনি! কত মানুষ বিয়ে করল কিন্তু তাদের সন্তান হয়নি!
আল্লাহ তাআলা এটা পছন্দ করেন যে, তার কাছে যেন চাওয়া হয়। আর মানুষ পছন্দ করে, যেন তাকে দেওয়া হয়। অতএব আপনার যা পছন্দ তা আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করুন। আর আল্লাহর যা পছন্দ আপনি তাকে সেটা প্রদান করুন। আল্লাহ আপনাকে উপকরণ-নির্ভর পেলে তিনি আপনাকে উপকরণের হাতেই ছেড়ে দেবেন। পক্ষান্তরে আপনাকে তার ওপর নির্ভরশীল দেখলে তিনি আপনার জন্য উপকরণের ব্যবস্থা করে দেবেন। মানুষকে আপনার অধীনস্থ করে দেবেন। আদম আলাইহিস সালাম এবং তার স্ত্রীর কথাই ধরুন না! ভুল করে অনুতপ্ত হয়ে তারা আল্লাহকে ডাকছেন— ‘হে আমাদের রব, আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি। আপনি যদি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করেন, তবে আমরা অবশ্যই অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যাব।’ [১] তাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। নুহ আলাইহিস সালাম যখন তার কওমের কারণে সংকীর্ণতা অনুভব করলেন, তখন তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করলেন— ‘হে আমার রব, আপনি পৃথিবীতে কোনো কাফের গৃহবাসীকে রেহাই দেবেন না।’ [২] তার এই দুআয় প্লাবন নেমে আসে। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম যখন নিজ পরিবারকে আল্লাহর হাতে ন্যস্ত করলেন, তখন দুআ করেছেন— ‘আপনি কিছু লোকের অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করে দিন।’ [৩] তার এই দুআর ফলে যুগে যুগে মক্কা সকল মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন হয়ে রয়েছে।
লুত আলাইহিস সালাম! যখন তার ভূখণ্ড তার কাছে সংকীর্ণ হয়ে আসে তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করলেন— ‘হে আমার রব, দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করুন।’[১] জিবরাইল আলাইহিস সালাম তখন সে এলাকাটিকে ডানায় করে উপরে উঠিয়ে নিয়ে যান। এমনকি তা আকাশের এত কাছাকাছি হয়ে গিয়েছিল যে, ফেরেশতারা পর্যন্ত কুকুরের ঘেউঘেউ আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলেন। এরপর তিনি এটাকে সম্পূর্ণ উল্টো করে ফেলে দেন। ইউসুফ আলাইহিস সালাম! তার সামনে যখন সকল দরজা বন্ধ হয়ে গেল তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করলেন— ‘যদি আপনি তাদের চক্রান্ত আমার ওপর থেকে প্রতিহত না করেন, তবে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।’[২] এরপর তিনি মিশরের বাদশাহ হয়ে গেছেন! মুসা আলাইহিস সালাম-এর কাঁধে এক দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি সে কারণে বোঝা অনুভব করতে থাকেন। তাই তিনি দুআ করেন— ‘হে আমার রব, আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন এবং আমার কাজ সহজ করে দিন। আমার জিহ্বা থেকে জড়তা দূর করে দিন; যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে। এবং আমার পরিবারবর্গের মধ্য থেকে আমার একজন সাহায্যকারী করে দিন। আমার ভাই হারুনকে।[৩]’ সঙ্গে সঙ্গেই আল্লাহ তাআলা সংবাদ পাঠালেন— ‘হে মুসা, তুমি যা চেয়েছ তা তোমাকে দেয়া হলো।'[১] সুলাইমান আলাইহিস সালাম! তিনি যখন জানতে পারলেন একজন ন্যায়-পরায়ণ শাসক অনেক উত্তম, আল্লাহর কাছে দুআ করলেন— ‘আমাকে এমন সাম্রাজ্য দান করুন যা আমার পরে আর কেউ পেতে পারবে না। নিশ্চয় আপনি মহাদাতা।'[২] এই দুআর পর আল্লাহ তাআলা তাকে জিন জাতির ওপরও রাজত্ব দান করেন। ইউনুস আলাইহিস সালাম! সমুদ্র, রাত্রি, মাছের পেট—এই তিন অন্ধকারের ভেতর থেকে আল্লাহ তাআলাকে ডাক দিলেন— ‘আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই; সমস্ত পবিত্রতা আপনার, আমিই অন্যায়কারী।'[৩] যাকারিয়া আলাইহিস সালাম-এর পিতা হওয়ার আগ্রহ তৈরি হলো। তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করলেন— ‘হে আমার রব! আপনার পক্ষ থেকে আমাকে পুত-পিবত্র সন্তান দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী।'[৪] তিনি মেহরাবে নামাজ পড়ছিলেন, ফেরেশতারা তাকে ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম-এর সুসংবাদ প্রদান করলেন। দুনিয়া হলো এক যুদ্ধক্ষেত্র আর দুআ হলো মুমিনের অস্ত্র। বুদ্ধিমান যোদ্ধা কখনো অস্ত্র ছাড়া যুদ্ধের ময়দানে নামে না।
পঞ্চম পাঠ
বান্দার প্রতি আল্লাহ তাআলার বিশেষ রহমত হলো—মানুষ কল্যাণকর কাজ না করলেও শুধু তা করার ইচ্ছা পোষণ করলেই আমলনামায় পূর্ণ একটি সওয়াব লিখে দেওয়া হয়। কাজটি করলে ১০টি সওয়াব লেখা হয়। তেমনিভাবে যখন সে কোনো খারাপ কাজের ইচ্ছা করে কিন্তু তা আর না করে তখন তার আমলনামায় একটি পূর্ণ সওয়াব লেখা হয়। আলোচ্য ঘটনায় ওই লোকটি ব্যভিচারের ইচ্ছা করেছিল। কিন্তু যখন তাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে সে প্রকম্পিত হয়ে উঠেছে। এই কারণে সে এ মর্যাদা লাভ করেছে এবং এ কাজের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা গুহার মুখ থেকে বিশাল পাথর সরিয়ে দিয়েছেন। গুনাহ করার সময় যদি স্মরণ হয়ে যায় যে, এটা আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা তাহলে বিশ্বাস করুন, আল্লাহ তাআলা আপনাকে ভালোবাসেন। ভালোবাসেন বলেই তিনি আপনাকে গুনাহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা যাদের প্রতি ক্রোধান্বিত থাকেন তাদেরকে তিনি উদাসীনতার মাধ্যমে পরীক্ষায় ফেলে দেন। প্রবৃত্তি তাদেরকে যে দিকে নিয়ে যায় তারা শুধু তাই দেখতে পায়। তাই গুনাহ করে আল্লাহ তাআলার ভালোবাসাকে বিদূরিত করবেন না। আপনি হারাম কাজের দিকে পা ফেলতে গিয়ে যখন আল্লাহর ভয়ে কম্পিত হয়ে উঠবেন তখন আপনার আমলনামায় হালাল ক্ষেত্রে পা ফেলার সওয়াব লেখা হবে। হারাম কাজে দিনার-দিরহাম ব্যয় করতে গিয়ে আল্লাহর ভয়ে যখন তা থেকে বিরত হয়ে যাবেন আপনার আমলনামায় তখন একটি দিরহাম সাদাকাহ করার সওয়াব লেখা হবে। আল্লাহর ভয়ে বাতিল কথা বলা থেকে বিরত হয়ে গেলে আপনার আমলনামায় একটি হক কথা বলার সওয়াব লেখা হবে। [১] আহ, আল্লাহর রহমত কত অসীম! জাহান্নামের পথে না চলার সিদ্ধান্তই জান্নাতে পেঁৗছার পথে রূপান্তরিত হয়ে যায়।
ষষ্ঠ পাঠ
সবসময় নেককার লোকদের সংস্পর্শে অবলম্বন করুন। আসহাবে কাহাফের কুকুরটার কথাই চিন্তা করুন! আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমে তাকে উল্লেখ করে তার আলোচনা চিরস্থায়ী করে দিয়েছেন। কারণ সে শুধু কিছু নেককার লোকের সান্নিধ্য অবলম্বন করেছিল। মনে রাখবেন, সাথিসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে কুকুর যেন আমাদের তুলনায় বিচক্ষণ না হয়ে যায়! উল্লিখিত ঘটনায় গুহায় আটকে-পড়া তিন ব্যক্তির প্রতি একটু লক্ষ করুন। যদি তাদের কোনো একজনের কাছে আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার মতো আমল না থাকত, তাহলে তারা সকলেই গুহায় আটকে পড়ে ধ্বংস হয়ে যেত। কিন্তু তাদের প্রত্যেকেরই কিছু নেক আমল ছিল। ফলে সকলেই মুক্তি পেয়ে যায়। প্রবাদ আছে, সৎ সঙ্গ স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গ সর্বনাশ। যে সঙ্গী হাত ধরে জান্নাতের দিকে নিয়ে যায় আর যে সঙ্গী জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায় দুজনের মধ্যে কত বিশাল ব্যবধান!
টিকাঃ
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-করম: ২৩৩৩, সহিহ মুসলিম ২৭৪৩
[১] সুরা নিসা, ৪: ২০
[১] সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস-ক্রম : ১৮৯০
[১] আল জামিউস সাগীর, হাদিস-ক্রম : ৪২৪৫
[১] সুরা আরাফ, আয়াত-ক্রম : ২৩
[২] সুরা নূহ, আয়াত-ক্রম : ২৬
[৩] সুরা ইবরাহিম, আয়াত-ক্রম : ৩৭
[১] সুরা আনকাবূত, ২৯: ৩০
[২] সুরা ইউসুফ, ১২: ৩৩
[৩] সুরা ত্বহা, ২০: ২৫-৩০
[১] সুরা ত্বহা, ২০: ৩৬
[২] সুরা ছ-দ, ৩৮: ৩৫
[৩] সুরা আম্বিয়া, আয়াত-ক্রম: ৮৭
[৪] সুরা আলে ইমরান, আয়াত-ক্রম: ৩৮
[১] সুনানে তিরমিযি, হাদিস-ক্রম : ১৬২৫
📄 সুলাইমান আলাইহিস সালাম-এর ফয়সালা
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
'দুজন নারী ছিল। তাদের সঙ্গে দুটি সন্তানও ছিল। হঠাৎ একটি বাঘ এসে তাদের একজনের ছেলেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল। সঙ্গী নারীটি বলল, “তোমার ছেলেটিকেই বাঘে নিয়ে গেছে।” অন্যজন বলল, “না, বাঘে তোমার ছেলেকে নিয়েছে।' অবশেষে তারা উভয়েই দাউদ (আলাইহিস সালাম)-এর কাছে এ বিরোধ মীমাংসার জন্য বিচারপ্রার্থী হলো। দাউদ বয়স্কা নারী পক্ষে রায় দিলেন। বিচারশেষে তারা উভয়ে বেরিয়ে দাউদের পুত্র সুলাইমান (আলাইহিস সালাম)-এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিল এবং (যাবার সময়) তারা দুজনেই তাকে ব্যাপারটি জানাল। তিনি লোকদেরকে বললেন, “তোমরা আমার কাছে একখানা ছোরা নিয়ে আসো। আমি ছেলেটিকে দুটুকরো করে তাদের দুজনের মধ্যে ভাগ করে দিই।” এ কথা শুনে অল্প বয়স্কা নারীটি বলে উঠল, “তা করবেন না, আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন, ছেলেটি তারই।” সুলাইমান তখন ছেলেটি সম্পর্কে অল্প বয়স্কা নারীটির পক্ষে রায় দিলেন।' [১]
প্রথম পাঠ
আল্লাহ তাআলা নবী-রাসুলগণের একজনকে অন্যজনের ওপর একেক বিষয়ে প্রাধান্য দান করেছেন। সাধারণ নবীগণের তুলনায় ‘উলুল আযম’ তথা কঠিন বিপদাপদে ধৈর্যধারণকারী নবী-রাসুলগণ অধিক মর্যাদাবান। এ ছাড়া আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে কোনো কোনো নবীকে এমন কিছু বিষয় প্রদান করেছেন যা অন্য কোনো নবীকে প্রদান করেননি। এর মাধ্যমে অবশ্য নবীগণের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ণিত হয় না। যেমন মুসা আলাইহিস সালাম-এর তুলনায় তার ভাই হারুন আলাইহিস সালাম বাগ্মী ছিলেন। এ ব্যাপারে মুসা আলাইহিস সালাম নিজেই সাক্ষ্য দিয়েছেন। কুরআনুল কারিমে সুস্পষ্টভাবেই বিষয়টি বিবৃত হয়েছে। সুলাইমান আলাইহিস সালাম-কে এমন রাজত্ব প্রদান করা হয়েছিল যা ইতিপূর্বে কাউকে প্রদান করা হয়নি। আর তার পরেও কাউকে প্রদান করা হবে না। আবার ঈসা আলাইহিস সালাম দরিদ্র ছিলেন, কিন্তু তিনি সুলাইমান আলাইহিস সালাম- এর চেয়ে মর্যাদাবান ছিলেন। তবে তারা উভয়েই ছিলেন শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ তাআলা দাউদ আলাইহিস সালাম-এর জন্য লোহাকে নরম করে দিয়েছিলেন, আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য তা নরম করেননি। কিন্তু তিনি সকল সৃষ্টির তুলনায় সর্বোত্তম।
নবীদের ব্যাপারে যা বলা হলো তা তাদের পরের স্তরের মানুষদের ব্যাপারেও প্রযোজ্য। যেমন খালেদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে সামরিক যোগ্যতা দেওয়া হয়েছিল; যা আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে (সেভাবে) দেওয়া হয়নি। অথচ কোনো সাহাবিই আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সমতুল্য নন। উবাই ইবনে কা'ব রাদিয়াল্লাহু আনহু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু'র চেয়ে শ্রেষ্ঠ কারী ছিলেন। কিন্তু এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু উবাই ইবনে কাব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র তুলনায় শ্রেষ্ঠ ছিলেন। মুয়ায ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু'র চেয়ে হালাল-হারামে অধিক জ্ঞান রাখতেন। কিন্তু উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহু'র চেয়ে অধিক মর্যাদাবান ছিলেন। শুধু একটি বিষয়ের মাধ্যমে নয় বরং সামগ্রিক বিষয়ের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ণিত হয়। উপরোল্লিখিত ঘটনাটি অধ্যায়নের সময় এই বিষয়টি আমাদের মাথায় থাকা উচিত। দাউদ আলাইহিস সালাম-এর সিদ্ধান্তকে নিরেট ভুল মনে করা যাবে না। সন্দেহ নেই, তিনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ইজতিহাদ করেছেন এবং তার সামনে যেসব দলিল-প্রমাণ ছিল এর মাধ্যমেই তিনি ফায়সালা করেছেন। বয়স্কা নারীটি অল্পবয়স্কা নারীর চেয়ে কথাবার্তায় পটু ছিল। যেহেতু কারও পক্ষেই সুস্পষ্ট দলিল ছিল না এই কারণে যা হওয়ার তাই হয়েছে।
দ্বিতীয় পাঠ
বিচার-আচারের ক্ষেত্রে সুলাইমান আলাইহিস সালাম-এর আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল। আলোচ্য ঘটনাটিই একমাত্র ঘটনা নয়, এ ছাড়া আরও অনেক ঘটনা রয়েছে। তার পিতা দাউদ আলাইহিস সালাম শস্যক্ষেত্রের ব্যাপারে ফায়সালা করেছিলেন। কুরআন এ ঘটনা উল্লেখ করতে গিয়ে সুলাইমান আলাইহিস সালাম-এর বিচারকার্যে বিচক্ষণতার কথা উল্লেখ করেছে এভাবে- ‘এবং স্মরণ করুন দাউদ ও সুলাইমানকে, যখন তারা শস্যক্ষেত্র সম্পর্কে বিচার করছিলেন। তাতে রাত্রিকালে কিছু লোকের মেষ ঢুকে পড়েছিল। তাদের বিচার আমার সম্মুখে ছিল।[১]’ ঘটনাটি হলো-রাতের বেলা এক ব্যক্তির ছাগল অপর ব্যক্তির ক্ষেতে ঢুকে পড়েছিল। ছাগল বেশ কিছু ফসল খেয়েছে, বেশ কিছু নষ্ট করেছে। দাউদ আলাইহিস সালাম-এর কাছে এ বিচার আসে। তিনি ফায়সালা করেন, ক্ষেতের ক্ষতিপূরণ স্বরূপ ছাগলটি ক্ষেতের মালিককে প্রদান করা হবে। দাউদ আলাইহিস সালাম-এর মজলিস থেকে বের হওয়ার পর সুলাইমান আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গে তাদের দেখা হয়। তিনি উভয়ের বক্তব্য শোনার পর বলেন, 'এটি ফায়সালা হতে পারে না। ক্ষেতের মালিক কেবল ছাগলের দুধ দ্বারা উপকৃত হবে। আর যা ক্ষতি হয়েছে ছাগলের মালিক ক্ষেতে কাজ করে সে-ক্ষতি পূরণ করবে। এভাবে ক্ষেত যখন পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসবে ক্ষেতের মালিক তখন জমি নিয়ে নেবে আর ছাগলের মালিক তার ছাগল ফিরিয়ে আনবে।' এ ফায়সালার কারণে সুলাইমান আলাইহিস সালাম-এর প্রশংসা করে আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘অতঃপর আমি সুলাইমানকে সে ফায়সালা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম।।১’ এ ক্ষেত্রেও দাউদ আলাইহিস সালাম-এর শ্রেষ্ঠত্বের কথা ভুলে যাওয়া হয়নি, আল্লাহ তাআলা বলেছেন- ‘এবং আমি উভয়কে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দিয়েছিলাম।।২’
সুলাইমান আলাইহিস সালাম-এর বিচক্ষণতার আরেকটি উদাহরণ হলো-এক ব্যক্তি তার কাছে এসে বলল, 'হে আল্লাহর নবী! এক প্রতিবেশী আমার রাজহাঁস চুরি করে নিয়ে গেছে।' তখন সুলাইমান আলাইহিস সালাম ঘোষণা করেন, আসসালাতু জামিআহ (সকলে নামাজ পড়তে আসো)। এরপর তিনি মিম্বরে দাঁড়িয়ে খুতবা প্রদান করেন। বলেন, 'তোমাদের কী হলো-তোমাদের একজন প্রতিবেশীর রাজহাঁস চুরি করে মসজিদে প্রবেশ করেছে! তার মাথায় এখনো হাঁসের পশম লেগে আছে।' চোরটি তখন মাথায় হাত বুলাতে লাগল। তখন সুলাইমান আলাইহিস সালাম বললেন, 'একে ধরো, সেই হাঁস চুরি করেছে।'
শরিয়াহ-আইন সম্পর্কে বিচারকের জ্ঞান থাকতে হবে। কিছু মাসআলা এমন রয়েছে যেখানে ইজতিহাদ এবং চিন্তাভাবনার তুলনায় জ্ঞানের প্রয়োজন অনেক বেশি। কেননা শরিয়ত এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে। যেমন পরিত্যক্ত সম্পত্তি বণ্টনের বিষয়টি। তবে বিচারক কখনোই বিচক্ষণতা ও কৌশল থেকে অমুখাপেক্ষী হতে পারেননা। আমরা সুলাইমান আলাইহিস সালাম-এর বিচারকার্য সম্পর্কে তিনটি ঘটনা উল্লেখ করলাম। এ ক্ষেত্রগুলোতে শরিয়তের পক্ষ থেকে কোনো বিধান দেওয়া ছিল না। তিনি বুদ্ধি খাটিয়ে সমাধান বের করেছেন। যেহেতু বিচারকার্য এবং বিচক্ষণতা সংক্রান্ত আলোচনা চলে এল তাই প্রাসঙ্গিক হিসেবে বিচক্ষণতার অধিকারী আরও দুই বিচারকের আলোচনা করা সঙ্গত হবে। তাদের কথা ভুলে গেলে চলবে না। তারা হলেন ইয়াস ইবনে মুআবিয়া ও কাযী শুরাইহ রহমতুল্লাহি আলাইহিমা। উভয়েই অত্যন্ত বিচক্ষণ বিচারক ছিলেন। বেশ কিছু বিস্ময়কর বিধান তারা লিপিবদ্ধ করেছেন।
ইয়াস ইবনে মুআবিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহমতুল্লাহি আলাইহি'র কাজি ছিলেন। তার বুদ্ধিমত্তার ঘটনা উল্লেখ করতে গিয়ে ইবনুল জাওযি রহমতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন- এক ব্যক্তি গাছের কাছে কিছু সম্পদ লুকিয়ে রাখে। ঐ সময় বন্ধুও তার সঙ্গে ছিল। ব্যক্তিটি পরে এ সম্পদ খুঁজে না পেয়ে বন্ধুকে অভিযুক্ত করে। সে কাজি ইয়াস রহমতুল্লাহি আলাইহি'র কাছে বিচার দায়ের করে। বন্ধু বলল, 'আমি তো এ ধন-সম্পদ সম্পর্কে কিছুই জানি না।' ইয়াস রহমতুল্লাহি আলাইহি ঐ ব্যক্তিকে বললেন, 'তুমি সে গাছটির কাছে যাও, আশা করি সম্পদ রাখার জায়গাটি তোমার স্মরণ হয়ে যাবে।' আর লোকটির বন্ধুকে বললেন, 'সে ফিরে আসা পর্যন্ত তুমি আমার কাছে বসে থাকো।' এরপর ইয়াস রহমতুল্লাহি আলাইহি অন্যান্য মানুষের বিচারকার্য পরিচালনা করতে থাকেন। হঠাৎ তিনি বসিয়ে রাখা বিবাদীকে বললেন, 'তোমার কী মনে হয়? সে কি এতক্ষণে গাছের কাছে পৌঁছতে পেরেছে?' সে বলল, 'না, স্থানটি আরও দূরে।' তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর দুশমন! তুমি-না একটু আগেই সেই ধন-সম্পদ এবং গাছ সম্পর্কে কোনো কিছুই না-জানার কথা বলেছিলে!' এরপর তিনি তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করে বিচার নিষ্পত্তি করেন।
তার অপর এক বুদ্ধিমত্তার ঘটনা হলো- একবার তিনি এক জায়গায় অবস্থান করছিলেন। তিনজন নারী সেখানে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে প্রবেশ করে। তিনি সঙ্গীদের বললেন, 'এ নারীটি গর্ভবতী, ঐ নারীটি দুগ্ধদানকারী আর এই নারীটি বন্ধ্যা।' যাচাই করে তার বক্তব্যকে সঠিক পেয়ে সঙ্গীরা জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কীভাবে তা জানতে পারলেন?' তিনি বললেন, 'প্রথম নারীটি হাত পেটে রেখেছিল। দ্বিতীয়জন বুকে হাত রেখেছিল। তৃতীয়জনের হাত ছিল লজ্জাস্থানে। আর ভীত- সন্ত্রস্ত হয়ে গেলে মানুষ সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস হেফাজতের চেষ্টা করে।'
মদের বৈধতা প্রমাণের জন্য এক ব্যক্তি তার কাছে এসে বলল, 'আঙুর খেলে কি আপনি আমাকে বেত্রাঘাত করবেন?' তিনি বললেন, 'না।' লোকটি বলল, 'আমি যদি পানি পান করি তাহলে কি বেত্রাঘাত করবেন?' তিনি বললেন, 'না।' এরপর লোকটি বলল, 'তাহলে আমি আঙুরের মধ্যে পানি ঢাললে সেটা যখন মদ হয়ে যায় তখন আমাকে কেন বেত্রাঘাত করবেন?' ইয়াস রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, 'আমি যদি তোমাকে বালু নিক্ষেপ করি তাহলে কি তুমি ব্যথা পাবে?' লোকটি বলল, 'না।' এরপর তিনি বললেন, 'যদি আমি তোমাকে পানি নিক্ষেপ করি তাহলে কি ব্যথা পাবে?' লোকটি বলল, 'না।' তিনি বললেন, 'এখন আমি যদি মাটি ও পানি দ্বারা তৈরি এই পাত্রের মাধ্যমে তোমাকে আঘাত করি তাহলে কি তুমি ব্যথা পাবে?' লোকটি বলল, 'হ্যাঁ, কারণ এ পাত্রটি এখন আর পূর্বের সেই পানি আর বালু নয়।' তিনি বললেন, 'তেমনিভাবে মদও পূর্বের আঙুর আর পানি নয়।'
একবার তাকে বলা হলো- 'আমরা আপনার তিনটি দোষ দেখতে পাচ্ছি।' তিনি বললেন, 'সেগুলো কী?' তারা বলল, 'আপনি কুৎসিত। আপনি নিজের কথায় নিজেই মুগ্ধ হয়ে যান। আর আপনি অতি দ্রুত বিচার নিষ্পত্তি করেন।' তিনি বললেন, 'চেহারা-আকৃতি কুৎসিত হওয়াটা আমার আওতার ভেতরে নয়। আমি নিজের কথায় নিজে মুগ্ধ হই, ঠিক আছে, আচ্ছা, তোমরা কি মুগ্ধ হও না?' তারা বলল, 'হ্যাঁ।” তিনি বললেন, 'তাহলে তো আমি আরও আগেই মুগ্ধ হতে পারি।' এরপর তিনি বললেন, 'তোমাদের হাতে কয়টি আঙুল রয়েছে?' সঙ্গে সঙ্গেই তারা বলল, 'পাঁচটি।' তিনি বললেন, 'এখন উত্তর প্রদানের ক্ষেত্রে তোমরা কেন দ্রুততা অবলম্বন করলে?' তারা বলল, 'যে বিষয়ের জ্ঞান রয়েছে সে বিষয়ে বিলম্ব করতে নেই।' তিনি বললেন, 'আমিও তোমাদের মতোই।'
তিনি সবসময় হকের অনুসরণ করে চলতেন। তিনি বলেন, বিচারকার্যের ক্ষেত্রে কেউই আমাকে পরাজিত করতে পারেনি শুধু একজন ছাড়া। আমি একবার বসরার মজলিসে বসা ছিলাম। এক লোক এক মুকাদ্দামা সম্পর্কে সাক্ষ্য প্রদান করে যে, অমুক বাগান, তার পরিমাণ এমন, সেটি অমুক ব্যক্তির মালিকানাধীন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'বাগানের গাছ সংখ্যা কত?' লোকটি একটু চুপ থেকে বলল, 'আমাদের কাজি সাহেব কত বছর ধরে এই মজলিসে বিচারকার্য সম্পাদন করেন?' আমি একটি সংখ্যা উল্লেখ করে বললাম, এত বছর যাবত। লোকটি বলল, 'এই ছাদের কতটি খুঁটি রয়েছে। আমি উত্তর দিতে পারলাম না। তাকে বললাম, 'তুমি সত্য বলেছ।' অতঃপর আমি তার সাক্ষ্য গ্রহণ করি।
কাজি শুরাইহও আপন যুগের সবচেয়ে বিচক্ষণ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সমকালীন ছিলেন। শা'বি রহমতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন, কাজি শুরাইহের কাছে এক নারী তার স্বামীর ব্যাপারে নালিশ নিয়ে হাজির হয়। নারীটি তখন কাঁদছিল। আমি শুরাইহকে বললাম, 'হে আবু উমাইয়া (শুরাইহের উপনাম), আমি তো কান্নারত এই মহিলাকে মাজলুম মনে করছি।' তিনি বললেন, 'শাবি! ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর ভাইয়েরা পিতার কাছে কান্না করতে করতেই হাজির হয়েছিল।'
একবার কাজি শুরাইহ বিচারের এজলাসে বসে ছিলেন। এমন সময় আদি ইবনে আরতাত নামক এক ব্যক্তি তার কাছে আসে। শুরাইহ বললেন, 'আপনি কোথায় ছিলেন?' তিনি বললেন, 'আপনার এবং দেয়ালের মধ্যে।' লোকটি বলল, 'আমার কথা শুনুন।' তিনি বললেন, 'এ কারণেই তো আমি এখানে বসে আছি।' সে বলল, 'আমি শামের অধিবাসী।' তিনি বললেন, 'তাহলে তো তুমি আমার নিকটতম ও পছন্দনীয় মানুষ।' লোকটি বলল, 'আমি আমার সম্প্রদায়ের এক নারীকে বিয়ে করেছি।' তিনি বললেন, 'আল্লাহ তাআলা তোমাকে সন্তান- সন্ততিতে ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে বরকত দান করুন।' লোকটি বলল, 'আমি সেখান (শাম) থেকে বের না হওয়ার শর্তে তাকে বিয়ে করেছি।' তিনি বললেন, 'শর্ত পালন করা উচিত।' লোকটি বলল, 'আমি এখন বের হতে চাই।' তিনি বললেন, 'আল্লাহ তাআলার নিরাপত্তায় থাকো।' লোকটি বলল, 'এখন আমাদের মধ্যে ফায়সালা করে দিন।' তিনি বললেন, 'ফায়সালা তো করে দিয়েছি।' অর্থাৎ এই শর্ত ভঙ্গ হলে যেহেতু সে তালাকের ওয়াদা করেনি, তাই বের হলেও বিয়ে ভাঙবে না।
কাজি শুরাইহ এবং উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র মধ্যে একটি ঘটনা ঘটে। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এক বেদুইনের কাছ থেকে ঘোড়া খরিদ করে মূল্য পরিশোধ করে দেন। তারপর ঘোড়ায় আরোহণ করে কিছু সময় তাতে চলেন। এরপর ঘোড়াটিতে ত্রুটি দেখতে পান। ফিরে এসে বিক্রেতাকে বলেন, 'তোমার ঘোড়া নিয়ে নাও। এটি ত্রুটিপূর্ণ।' লোকটি বলল, 'আমি আপনার কাছে ত্রুটিমুক্ত হিসেবে বিক্রি করেছি। এখন তা ফেরত নিতে পারবে না।' উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'কাউকে বিচারক বানাও।' লোকটি বলল, 'শুরাইহ ইবনে হারেস আল-কিন্দি আমাদের মধ্যে ফায়সালা করবেন।' উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'ঠিক আছে, আমি রাজি।' শুরাইহ বেদুইন ও উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কাছ থেকে বিষয়টি শুনে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে আমিরুল মুমিনিন! আপনি কি তার কাছ থেকে ত্রুটিমুক্ত ঘোড়া নিয়েছিলেন?' উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'হ্যাঁ।' শুরাইহ বললেন, 'যা ক্রয় করেছেন তা আপনার কাছেই রাখুন কিংবা যেভাবে নিয়েছিলেন সেভাবে ফেরত দিন।' উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু অবাক হয়ে শুরাইহের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'এটাই তো বিচার, চমৎকার ফায়সালা, ন্যায়ানুগ বিচার। তুমি কুফা নগরীতে চলো। আমি তোমাকে কুফার বিচারক নিয়োগ করলাম।'
তৃতীয় পাঠ
একেকজনের বিচার একেকরকম হয়ে থাকে। কারণ, প্রত্যেকের বুদ্ধিমত্তায় ভিন্নতা রয়েছে। এই কারণে একাধিক ফিকহি মাজহাব তৈরি হয়েছে। প্রত্যেক ইমাম কুরআন-হাদিসে নিজের বিবেক-বুদ্ধি খাটান এবং সেখান থেকে নতুন নতুন মাসআলা উদঘাটন করেন। এ ক্ষেত্রে তাদের ভুল-ত্রুটি হতেই পারে। কেননা নবীগণই কেবল ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে। এমনকি নবীগণ ইজতিহাদের মাধ্যমে ফায়সালা করলে তাদেরও মানবিক ভুল হতে পারে। ওহির মাধ্যমে ফায়সালা করলে নিঃসন্দেহে তারা সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে থাকেন। এটি অনেক দীর্ঘ আলোচনার বিষয়। এ বিষয়ক কিছু কথা পূর্বে গত হয়েছে। আলোচ্য ক্ষেত্রে দুইজন সম্মানিত নবী দুটি মাসআলায় নিজেদের বিবেক-বুদ্ধি খাটিয়েছেন। সন্তানের ফয়সালা দাউদ আলাইহিস সালাম করেছেন বয়স্কা নারীর জন্য, আর সুলাইমান আলাইহিস সালাম করেছেন অল্পবয়স্কা নারীর জন্য। দাউদ আলাইহিস সালাম শস্যক্ষেত্রের ব্যাপারে এক ফায়সালা দিয়েছেন, সুলাইমান আলাইহিস সালাম দিয়েছেন ভিন্ন ফায়সালা। তারা তো নবী!
এ কারনেই ফুকাহায়ে কেরামের বক্তব্য, তাদের ইজতিহাদ এবং মাজহাব নিয়ে অন্যায় পক্ষপাতিত্ব করার সুযোগ নেই। তাদের মতানৈক্য তো রহমত। আল্লাহ তাআলা সকলকে একই আমল করাতে চাইলে এ ব্যাপারে সুনিশ্চিত ফায়সালা দিয়ে দিতেন। যেমন মিরাসের ক্ষেত্রে পুরুষরা নারীর দ্বিগুণ পাবে, এখানে ইজতিহাদের কোনো সুযোগ নেই। চোরের হাত কেটে দেওয়া হবে, এ বিধানে ইজতিহাদের সুযোগ নেই। তবে বিধানের প্রকৃতির ক্ষেত্রে ইজতিহাদ হতে পারে। বহু বিষয় রয়েছে আল্লাহ তাআলা ভুলে নয় বরং রহমত স্বরূপ ইচ্ছা করেই নীরবতা অবলম্বন করেছেন। তাই সকল ফিকহি মাজহাবের ক্ষেত্রে আমাদেরকে প্রশস্ত হৃদয়ের অধিকারী হতে হবে। ইমামদের পরস্পর শিষ্টাচারের প্রতি লক্ষ করুন। আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি! তিনি ইমাম শাফেয়ির ছাত্র ছিলেন। তাকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। কিন্তু এর পাশাপাশি মাসআলা-মাসায়েলের ক্ষেত্রে তার সঙ্গে মতানৈক্য করতেন। তেমনিভাবে ইমাম শাফেয়ি রহমতুল্লাহি আলাইহি ইমাম আহমদ রহমতুল্লাহি আলাইহি'র সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করতেন। কিন্তু তাকে ঠিকই সম্মান জানাতেন। তাই অন্যায় পক্ষপাতিত্ব করা থেকে বিরত থাকা উচিত!
টিকাঃ
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৪২; সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ১৭২০
[১] সুরা আম্বিয়া, আয়াত-ক্রম : ৭৮
[১] সুরা আম্বিয়া, আয়াত-ক্রম : ৭৯
[২] সুরা আম্বিয়া, আয়াত-ক্রম: ৭৯
📄 বংশীয় গৌরব
উবাই ইবনে কাব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন- 'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সমকালে দুই ব্যক্তি বংশ নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়ে একজন বলল, "আমি অমুকের পুত্র অমুক। তুমি কে?” এই প্রেক্ষিতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, মুসা আলাইহিস সালাম-এর যুগে দুই ব্যক্তি বংশ নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিল। একজন বলল, “আমি অমুকের পুত্র অমুক।” এভাবে সে ৯ পুরুষের নাম উল্লেখ করল। এরপর বলল, "তুমি কে? তোমার তো কোনো পরিচয়ই নেই!” অপরজন বলল, "আমি অমুকের পুত্র অমুক, যে ইসলামের পুত্র।” আল্লাহ তাআলা তখন মুসা আলাইহিস সালাম-এর কাছে ওহি প্রেরণ করলেন, “আপনি বংশ নিয়ে বিতর্ক করা এ দুই ব্যক্তিকে বলুন, যে ব্যক্তি নিজের ৯ পুরুষ পর্যন্ত নাম উল্লেখ করেছে তার ৯ পুরুষই জাহান্নামি আর সে হলো জাহান্নামে-যাওয়া দশম পুরুষ। আর যে ব্যক্তি নিজের ঊর্ধ্বতন দুই পুরুষের নাম উল্লেখ করেছে সেই দুই পুরুষ জান্নাতি আর সে হলো জান্নাতে-যাওয়া তৃতীয় পুরুষ।”[১]
প্রথম পাঠ
মানুষের পরিচয় নির্ণিত হয় অন্তর ও আচার-ব্যবহারের মাধ্যমে, অর্থ-বিত্ত কিংবা পোষাক-আশাকের মাধ্যমে নয়। তারা কীভাবে জমিনে চলাচল করছে সেটাই লক্ষণীয় বিষয়, কে কার ঔরস থেকে এল সেটা দেখার বিষয় নয়। বংশের মাধ্যমে যদি কেউ উপকৃত হতো তাহলে হাশেমি বংশের আবু লাহাব উপকৃত হতো। আর বংশের মাধ্যমে কারও ক্ষতি সাধন হলে বিলাল ইবনে রাবাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু ক্ষতির সম্মুখীন হতেন। কেননা তিনি গোলাম ছিলেন। কুরআনুল কারিমে লুকমান হাকিমের কথা এসেছে। তিনিও একজন গোলাম ছিলেন। বংশ যতই উঁচু হোক, কেউ যেন নিজেকে সে পরিচয়ে প্রকাশ না করে। বংশ যতই নীচু হোক, কেউ যেন এ কারণে কাউকে হেয় না করে। প্রত্যেকে একাকী মৃত্যুবরণ করবে। তাকে একাকী দাফন করা হবে। তার হিসাব হবে একাকী। নবীর পুত্র হওয়া সত্ত্বেও নুহ আলাইহিস সালাম-এর ছেলের কোনো উপকার হয়নি। মুশরিকের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর কোনো ক্ষতি হয়নি। হাদিসে এসেছে, 'হে মুহাম্মদের বেটি ফাতেমা, নিজে আমল করো। কেননা আল্লাহর কাছে আমি তোমার কোনো কাজে আসব না। হে মুহাম্মদের চাচা আব্বাস! আপনি আমল করুন। আল্লাহর কাছে আমি আপনার কোনো কাজে আসব না।'[২]
দ্বিতীয় পাঠ
পিতৃপুরুষ নিয়ে গর্ব করার অধিকার মানুষের আছে। গর্ব ও অহংকারের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। আপনার বংশ কুলীন হলে এমন কাজ করবেন না যাতে আপনার বংশ কলঙ্কিত হয়ে যায়। আবার, বংশ নীচু হলে তার সঙ্গে নীচু মানসিকতার কাজকে মিলিয়ে দেবেন না। বংশ সম্ভ্রান্ত হলে তাতে কখনো নিকৃষ্ট কাজের অনুপ্রবেশ ঘটাবেন না। বংশকে নীচু করার পাশাপাশি নিজেও কাজে কর্মে নীচু হয়ে যাবেন না। সুলাইমান ইবনে দাউদ আলাইহিমাস সালাম। নবীর ঔরসে নবী। তিনি তার রবের কাছে প্রার্থনা করেন— ‘হে আমার পালনকর্তা, আপনি আমাকে সামর্থ দান করুন যাতে আমি আপনার সেই নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি, যা আপনি আমাকে প্রদান করেছেন।’[১] পিপীলিকার কথা শুনে তিনি মুচকি হাসেন। হুদহুদের অনুপস্থিতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত পৃথিবী শাসন করেছেন। কিন্তু বংশ তাকে অহংকারী বানিয়ে দেয়নি। রাজত্ব তাকে ইবনেষ্ট করে দিতে পারেনি। শুধু মনের প্রশান্তি ও আনন্দ নয় বরং তাদের ঘটনায় অফুরন্ত শিক্ষা রয়েছে। ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর কথাই ধরুন না! যাঁর বংশ মানবজাতির মধ্যে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট। তার পিতা ছিলেন ইয়াকুব আলাইহিস সালাম। তার পিতা ছিলেন ইসহাক আলাইহিস সালাম। তার পিতা ছিলেন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম। নিজে নবী ছিলেন। পিতা নবী ছিলেন। দাদা নবী ছিলেন। পরদাদাও নবী ছিলেন। তিনি মিসকিনদের খাবার খাওয়াতেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘আপনি খাদ্যভাণ্ডার দায়িত্বশীল হওয়া সত্ত্বেও রোজা রাখেন কেন?’ তিনি বলেন, ‘যেন আমি ক্ষুধার্তদের ভুলে না যাই!’
তৃতীয় পাঠ
আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে ন্যায়পরায়ণ। সন্তানের কারণে তিনি পিতাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন না, আবার পিতার কারণে সন্তানকেও জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন না। আলোচ্য হাদিসের বিষয়টি আল্লাহর পক্ষ থেকে আগাম সংবাদ। তিনি জানেন, এই অহংকারী বংশ তাকেও জাহান্নামের দিকে টেনে নিয়ে যাবে। এই সকল আয়াত ও ঘটনা অধ্যায়নের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার প্রতি আমাদের উত্তম ধারণা রাখা উচিত। আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ। তার ন্যায়-নিষ্ঠতার ক্ষেত্রে আমাদের কোনো সন্দেহে নিপতিত হওয়ার অবকাশ নেই। আল্লাহ তাআলা পরম দয়ালু। তিনি যদি আমাদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেন তবু তার ব্যাপারে আমাদের কোনো সন্দেহ প্রকাশের অবকাশ নেই। মানুষের প্রতিই যখন আমাদেরকে সুধারণা পোষণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তখন আল্লাহর বিষয়টি কেমন হতে পারে! মানুষের কাজকর্ম দিয়ে আল্লাহকে তুলনা করা যাবে না। তেমনিভাবে আল্লাহ তাআলার কাজকর্ম দিয়ে মানুষকে তুলনা করা যাবে না। তিনি তো এমন রব যিনি আঙুল-পরিমাণও জুলুম করেন না। তিনি তো মানুষ নন, যারা রাগের বশে ভালো মানুষের সঙ্গেও নিকৃষ্ট মানুষের মতো আচরণ করে। বরং অনুগ্রহ বশতঃ তিনি অপরাধীকে ক্ষমা করে দিয়ে থাকেন। একটি তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে তিনি ব্যভিচারিণীকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন। যে কখনো কোনো ভালো কাজ করত না কিন্তু লেনদেনের ক্ষেত্রে মানুষকে ছাড় দিত তিনি তাকেও ছাড় দিয়ে দেন। তিনি তো পিতা নেককার হওয়ায় সন্তানকেও সম্মানিত করে থাকেন। নবী মুসা এবং খিজির আলাইহিমাস সালাম-কে দুই বালকের দেওয়াল উঠিয়ে দেওয়ার জন্য কেবল এই কারণেই তো পাঠিয়েছিলেন যে, তাদের পিতা ছিলেন সৎ। কিন্তু তিনি বংশ ও আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণে ভালো ব্যক্তিকে পাকড়াও করেন না।
চতুর্থ পাঠ
জান্নাত নম্র-ভদ্র ও সহজ-সরল মানুষের ঠিকানা, আর জাহান্নাম অহংকারী ও অবাধ্যদের ঠিকানা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিনয় এত অধিক ছিল যে, তিনি তার সম্মানার্থে সাহাবিগণকে দাঁড়াতে নিষেধ করতেন। একবার তার জন্য সাহাবাগণ দাঁড়িয়ে গেলে তিনি রাগান্বিত হয়ে যান। রাগের সময় তার চেহারায় রাগের চিহ্ন ফুটে উঠত। কিন্তু এমতাবস্থায় তিনি কাউকে বকাঝকা বা তিরস্কার করতেন না। তো, নবীজি ওই সময় রাগান্বিত হওয়ায় হাসসান ইবনে সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহু পরিস্থিতিটা একটু স্বাভাবিক করতে চাইলেন। তিনি পঙক্তি আকারে বললেন— 'প্রিয় ব্যক্তির জন্য দাঁড়ানোটা আমার জন্য ফরজ। ফরজ পরিত্যাগ করা তো আমাদের জন্য শোভা পায় না। যার জ্ঞান-বুদ্ধি রয়েছে তাকে দেখে আশ্চর্য হই এমন সৌন্দর্য দেখা সত্ত্বেও সে কীভাবে না দাঁড়িয়ে থাকতে পারে!' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সঙ্গে সঙ্গে মুচকি হেসে দেন। তিনি রাগান্বিত হতেন অনেক দেরি করে আর খুশি হয়ে যেতেন খুব দ্রুত। বেদুইনরা তার কাছে এলে ভীত হয়ে যেত। তিনি ভীতি দূর করার জন্য বলতেন, 'শান্ত হও! আমি তো মক্কার এক সাধারণ নারীর সন্তান, যে শুকনো রুটি ও গোশত খেতো।'
একবার তিনি বসে আছেন আর সাত বছরের ছোট্ট মেয়ে হাত ধরে তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তিনিও তার সঙ্গে হাঁটছেন। জানেন না, আসলে কোথায় হেঁটে চলেছেন! এরপর মেয়েটি তাকে মনিবের কাছে সুপারিশ করতে বলল। কেননা তারা তাকে কোনো এক প্রয়োজনে পাঠিয়েছিল। আসতে বিলম্ব হয়ে গেছে। তিনি মেয়েটির জন্য সুপারিশ করলেন! আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু'র ছোট্ট এক ভাই ছিলেন। নাম আবদুল্লাহ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সঙ্গে খেলাধুলা করতেন। তিনি তাকে আবু উমায়ের উপাধি দিয়েছিলেন। আবু উমায়রের একটি ছোট্ট পাখি ছিল। নাম ছিল নুগাইর। উমায়ের নুগাইরের সঙ্গে খেলাধুলা করতেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিছুদিন পর তাকে জিজ্ঞেস করেন, 'আবু উমায়ের, তোমার নুগায়ের কোথায় গেল?' আবু উমায়ের তখন কাঁদতে লাগলেন। কারণ, নুগায়ের মারা গিয়েছিল। নবীজি তখন (সান্ত্বনা দিতে) তার গলা জড়িয়ে ধরলেন।[১] নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর আমার মাতা-পিতা যেন কুরবান হন। তিনি খুব সহজেই মানুষের সাথে মিশে যেতেন। তাদের সুখ-দুঃখের অংশীদার হতেন। ছিলেন সাধারণ মানুষের প্রতি নমনীয় ও সহানুভূতিশীল। তার সাহাবিদের অবস্থাও এমনই ছিল।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে বিনয় আর নম্রতার দীক্ষায় গড়ে তুলেছিলেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু খলিফা হওয়া সত্ত্বেও এক বৃদ্ধের ঘর পরিষ্কার করতেন। তিনি রাস্তায় হাঁটতেন আর ছোট্ট শিশু তার কাপড় ধরে টেনে বলত, 'আব্বু... আব্বু...' হকের ক্ষেত্রে উমর অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। কিন্তু প্রজাদের ক্ষেত্রে তার অন্তর ছিল একজন স্নেহপ্রবণ মায়ের মতো। এক বেদুইন নারী। আল্লাহ ব্যতীত তার আর কোনো সহায় ছিল না। তার সন্তান প্রসবের জন্য উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজ স্ত্রীকে সাহায্যকারী হিসেবে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি নিজ পিঠে করে আটার বস্তা বহন করে নিয়ে গেছেন। আর নিজ হাতে এতিম শিশুদের রান্না করে খাইয়েছেন। পারস্যের দূত এসে তার রাজপ্রাসাদ খুঁজতে থাকে। সে কোনো প্রাসাদ বা রাজসিংহাসন কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। লোকদেরকে জিজ্ঞেস করল। দেখতে পেল উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এক গাছের নিচে ঘুমিয়ে আছেন।
তার নাতি উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহিমাহুল্লাহ অন্ধকারে মসজিদে যাচ্ছিলেন। তখন এক অসতর্ক ব্যক্তির পায়ের সঙ্গে তার পা লেগে যায়। লোকটি রাগান্বিত হয়ে বলে উঠল, 'আপনি কি অন্ধ?' উমর ইবনে আবদুল আজিজ বললেন, 'না।' খলিফার সঙ্গে থাকা লোকজন রাগান্বিত হয়ে যান। উমর ইবনে আবদুল আজিজ বললেন, 'তাকে ছেড়ে দাও। সে তো আমাদেরকে একটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছে আর আমরা তার উত্তর দিয়েছি মাত্র।' এক রাতে তার (কামরার) বাতিটি নিভে যায়। তিনি বাতিতে তেল ঢালার জন্য উঠলেন। লোকজন বলল, 'আমিরুল মুমিনিন! অন্যকে যদি কাজটি করার সুযোগ দিতেন!' তিনি বললেন, 'কাজটি আমি নিজে করলেও যেই উমর ইবনে আবদুল আজিজ ছিলাম সেই উমর ইবনে আবদুল আজিজই থাকব।' তাদের ঘটনায় বহু শিক্ষা রয়েছে।
টিকাঃ
[১] মুসনাদে আহমদ, হাদিস-ক্রম: ২১১৭৮। সনদ সহিহ।
[২] মাজমাউয যাওয়ায়েদ, ১/৫৪
[১] সুরা নামল, ২৭: ১৯
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৬২০৩