📄 কাঠের পা
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- 'বনি ইসরাইলে খাটো আকৃতির এক নারী দুজন দীর্ঘাঙ্গী নারীর সঙ্গে হেঁটে যাচ্ছিল। সে (উঁচু হওয়ার জন্য) এবং লোকদের চোখে ধরা না পড়ার জন্যে কাঠের দুটি পা তৈরি করে নেয় এবং সোনা দিয়ে একটি বড় আংটি তৈরি করে এর ভেতরে মেশক ভরে দেয়। আর তা হলো সুগন্ধিসমূহের মধ্যে সেরা সুগন্ধি। পরে সে ঐ দুই মেয়েলোকের মধ্য থেকে চলতে লাগল এবং লোকেরা তাকে চিনতে পারল না। সে-সময় তার হাত দিয়ে এভাবে ঝাড়া দিল। (এ কথা বলে বর্ণনাকারী শু'বাহ্ রহিমাহুল্লাহ তার হাত ঝাড়া দিলেন এবং ওই নারীর হাত ঝাড়ার ধরন নকল করলেন।)'[১]
প্রথম পাঠ
এক বেদুইন বিয়ের নিকটবর্তী তার মেয়েকে উপদেশ দিয়ে বলল, 'স্বামী যেন সদা তোমার মধ্যে সুন্দর বিষয় দেখতে পায় আর যেন তোমার থেকে উত্তম ঘ্রাণ পায়। জেনে রাখো, সর্বোত্তম সুগন্ধি হলো পানি (আতর)। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক ওসিয়ত; যাতে দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা নিংড়ে পড়েছে। সৌন্দর্য অবলম্বন করা উচিত। আর আতরই সর্বোত্তম সৌন্দর্য। নারী এর মাধ্যমে একজন পুরুষের চিন্তা-চেতনা, অনুভূতি, চোখ-নাক এবং হৃদয়ে মোহনীয় হয়ে ওঠে। যদিও হাদিসে সুগন্ধি ব্যবহার করাকে নিন্দনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়েছে। তবে এটি সুগন্ধি খারাপ হওয়ার কারণে নয় বরং সুগন্ধি ব্যবহারের স্থান-কালের কারণে। নারীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন সে একমাত্র স্বামী এবং মাহরাম ব্যতীত কারও সামনে নিজের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে।
হাদিসে এসেছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- ‘যে মহিলা সুগন্ধি লাগিয়ে এই উদ্দেশ্যে লোকের মধ্যে গমন করে যে, তারা তার সুগন্ধির ঘ্রাণ পাবে, সে ব্যভিচারিণী।[১]’ তাকে ভীতি প্রদর্শনের জন্য এমনটা বলা হয়েছে, তার ওপর ব্যভিচারের দণ্ড প্রয়োগ করার জন্য নয়। ইসলামে বিশাল একটি দরজা রয়েছে, যার নাম হল 'ছাদ্দুয যারায়ে' (অর্থাৎ বিপদ সংঘটিত হওয়ার পূর্বে তার দ্বার রুদ্ধ করে দেওয়া)। ইসলাম আগুন প্রজ্জ্বলিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চায় না যে, আগে আগুন লাগুক পরে নেভানো হবে। বরং আগুন লাগার পূর্বে শুরুতেই ইসলাম তা বন্ধ করার চেষ্টা করে থাকে। যে জিনিস মানুষকে খারাপ কাজের দিকে নিয়ে যায় সেটাও খারাপ কাজ।
দ্বিতীয় পাঠ
বাহ্যিক অবস্থা দেখে নারীরা দুই কারণে প্রভাবিত হয়ে যায়। এক. তারমধ্যে প্রবৃত্তির বাসনা তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। দুই. পুরুষের প্রতি নারীর আকর্ষণ তুলনামূলক বেশি। এটি নারীর কোনো নিন্দনীয় বিষয় নয়; বরং আল্লাহ তাআলাই তাকে এ স্বভাব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। প্রত্যেক সৃষ্টিকে কোনো এক জিনিস থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তার আচার-ব্যবহার-চরিত্র তা দ্বারাই প্রভাবিত হয়ে থাকে। প্রথম পুরুষ আদম আলাইহিস সালামকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ-কারণে পুরুষরা কম সংবেদনশীল। আর চেষ্টা-প্রচেষ্টা ও উৎপাদনে তারা অধিক আগ্রহী। পক্ষান্তরে হাওয়া আলাইহাস সালাম (নারী)-কে আদম আলাইহিস সালাম থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এই কারণে নারীজাতি পুরুষের প্রতি অধিক আকৃষ্ট হয়ে থাকে। সমষ্টিগত বিষয় খণ্ডিত বিষয়ের প্রতি যেভাবে আকর্ষিত হয় পুরুষও নারীর প্রতি সেভাবে আকর্ষিত হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে খণ্ডিত বিষয় সমষ্টিগত বিষয়ের প্রতি যেভাবে আকর্ষিত হয়ে থাকে নারীও পুরুষের প্রতি সেভাবে আকর্ষিত হয়ে থাকে।
এই কারণে নারীরা পুরুষের তত্ত্বাবধানে জীবনযাপন করতে কোনো কষ্টবোধ করে না। পুরুষ তার দেখাশোনা করে থাকে। তার প্রতি সংবেদনশীল হয়ে থাকে। সে এক্ষেত্রে কোনো ত্রুটিবোধ করে না। কেননা তাকে কাজকর্ম এবং পরিশ্রম করার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। পক্ষান্তরে নারী পুরুষের দেখাশোনা করা, তার খরচ চালানো সৃষ্টিগতভাবেই পুরুষের কাছে সমস্যাকর। স্বামী স্বভাবগত জটিল রোগাক্রান্ত হলে পরেই কেবল এই বিষয়টা মেনে নিতে পারে যে, স্ত্রীও সংসারের খরচ বহন করুক। তবে কোনো পুরুষ সম্পূর্ণভাবে স্ত্রীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়াটা বেশ মুশকিল বিষয়। কারণ, উপরে বর্ণিত সবই আল্লাহ কর্তৃক সৃষ্ট স্বভাব। যা দিয়ে তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। এই কথার অর্থ এটা নয় যে, পুরুষ নারীর প্রতি আকর্ষণবোধ করে না, কিংবা নারী তাদের চোখ ও অন্তরের কাঙ্ক্ষিত বিষয় নয়; বরং এ কথার উদ্দেশ্য হলো কোনো পুরুষের জীবন নারীর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হওয়া অসম্ভব। কিন্তু এটা খুব সম্ভব যে, পুরুষ কোনো নারীর একমাত্র জীবন ও দুনিয়া হবে।
তৃতীয় পাঠ
নারীর জন্য তার মনোবাসনাকে ধর্মের ওপর প্রাধান্য না দেওয়া আবশ্যক। যদিও মনোবাসনাকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করা সম্ভব নয়, ধর্ম তো মানুষের মনোবাসনাকে নিঃশেষ করে দিতে আসেনি বরং তা সংশোধন ও পরিমার্জন করার জন্য এসেছে। নারীকে পুরুষের প্রতি ভালোবাসা ও মমতা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এর অর্থ এটা নয় যে, তার এ মনোবাসনা সকল পুরুষের জন্যই নিবেদিত হবে। ইসলাম যখন পুরুষের জন্য একাধিক স্ত্রী রাখার বৈধতা দান করেছে এর দ্বারা নিশ্চিতভাবেই বোঝা যায় যে, আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তাকে এই কাজের সক্ষমতা দান করেছেন। এটি এমন এক বিষয় পুরুষেরা বহুচেষ্টা করলেও নারীদের কাছে তা ব্যাখ্যা করে বোঝাতে পারবে না। তেমনিভাবে নারীরা বহু চেষ্টা করলেও তা পুরুষদেরকে বোঝাতে পারবে না। কেননা তাদেরকে এক স্বামী নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার প্রবৃত্তি দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। নারী যদি এক পুরুষের তত্ত্বাবধানে জীবনযাপন করে যায় তাহলে সে সওয়াবের উপযুক্ত হবে। যদি সে নিজের সৃষ্টিজাত প্রবৃত্তিকে নষ্ট করে বহু পুরুষের প্রবৃত্তি-বাসনা পূরণ করতে যায় তাহলে সে গুনাহগার হবে। প্রকৃত নারী হলো যে তার স্বামীকে নিয়েই জীবনযাপন করে।
চতুর্থ পাঠ
পুরুষেরা শুধু নারীর সৌন্দর্য দেখতে চায় এবং তার সুঘ্রাণ শুঁকতে চায়। তাই স্ত্রী স্বামীর জন্য এটা করলে সে সাওয়াব লাভ করবে। ফলে এতে স্বামী পরিতৃপ্ত হবে এবং তার চরিত্র পবিত্র থাকবে। পাশাপাশি স্বামী যা পছন্দ করে সেও সেটা পছন্দ করবে। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু তো বলেছেন, সে যেমন আমার জন্য সৌন্দর্য অবলম্বন করে আমিও তার জন্য সৌন্দর্য গ্রহণ করি। স্বামী যখন স্ত্রীর মনোবাসনা, তার ইচ্ছা ও প্রয়োজনপূরণে সাড়া দেয় তখন সে সওয়াব লাভ করে থাকে। পুরুষের দায়িত্বপালনে অবহেলা নারীকে অন্য পুরুষের প্রতি ভ্রুক্ষেপের অনুমতি দেয় না। যেমনভাবে স্ত্রীর দায়িত্বপালনে অবহেলা পুরুষকে স্ত্রী ভিন্ন কোনো হারাম ক্ষেত্রে ভ্রুক্ষেপের অনুমোদন দেয় না। আমাদেরকে গুনাহের পথ রুদ্ধ করার আদেশ দেয়া হয়েছে। পুরুষেরা কেন নিজেদের বেশভূষা এবং সৌন্দর্যের প্রতি অধিক লক্ষ রাখবে? কারণ, আপনার স্ত্রী এমন পুরুষকে দেখলে বলবে, 'কেন আপনি তার মতো নন?' নারীরা কেন নিজেদের নারীত্বকে অধিক রূপে ফুটিয়ে তুলবে? কারণ আপনার স্বামী এমন নারীকে দেখলে আফসোস করবে, কেন তার স্ত্রী ওই নারীর মতো নয়! বিয়ের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে আনন্দ ভোগ করে থাকে। যার সামনে সকল সমস্যাই তুচ্ছ। বিয়ের মাধ্যমে পরিতৃপ্তকরণ অর্জিত না হলে তার কারণে বহু সমস্যা ও সংকট তৈরি হবে। প্রকৃতপক্ষে যা মনোমালিন্যের কারণেই ঘটে থাকে। আমি একটি বড় মূলনীতি বলে দিই, দেখবেন, ঘরের বড় বড় সমস্যাগুলো শোবার খাট থেকেই উদ্ভূত হয়।
পঞ্চম পাঠ
আগেকার যুগে সাধারণত কাঠ দ্বারা জুতার তলদেশ বিশেষভাবে উঁচু করা হতো। (বর্তমানে যাকে হাই হিল বলে।) আগেকার যুগে আতরের আংটি বর্তমান যুগের সুগন্ধির মতোই হতো (স্প্রেয়ারের মতো)। যা মানুষের অন্তরকে উত্তেজিত করে তোলে। যুগে যুগে মানুষ আগের মতোই রয়ে গেছে। সময়ে সময়ে শুধু তাদের উপায়-উপকরণে পরিবর্তন ঘটেছে। আগের উপকরণগুলো এ যুগের সঙ্গে অধিক কার্যকরী ও উপকারী হয়ে থাকে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সত্য বলেছেন- ‘অবশ্যই অবশ্যই তোমরা তোমাদের আগের লোকেদের নীতি-পদ্ধতিকে বিঘতে বিঘতে, হাতে হাতে অনুকরণ করবে। এমনকি তারা যদি সাপের গর্তে ঢুকে, তাহলে তোমরাও তাদের অনুকরণ করবে। আমরা (উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম) বললাম, “হে আল্লাহর রাসুল, এরা কি ইহুদি-নাসারা?” তিনি বললেন, "আর কারা?”” [1]
বনি ইসরাইলের সর্বপ্রথম ফেতনা সংঘটিত হয়েছিল নারীকে কেন্দ্র করে। তাই পুরুষেরা যেন নারীদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করে। কেননা তারা কমনীয় সত্তা। পুরুষের ওপর তাদের জন্য বহু অধিকার রয়েছে। সৌন্দর্য-উপকরণ-সুগন্ধি-সুরমা-এগুলো হারাম নয়। এগুলো তো শুধু কিছু উপকরণ, ব্যবহারের ভিত্তিতে যার হালাল-হারামের দিকটি নির্ণিত হয়। প্রত্যেক সুগন্ধি আপন স্থানে পুণ্যের কাজ। প্রত্যেক সুরমা-কাঠি আপন স্থানে গুনাহ নয়। এমনকি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে (এর ব্যবহারে) সওয়াব রয়েছে। আবু যর গিফারি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একবার কিছু লোক রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে ধনীরা আমলে এগিয়ে যাচ্ছে বলে অনুযোগ করেন। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাদাকাহর বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন- ‘এমনকি তোমাদের শরীরের অংশে সাদাকাহ রয়েছে। অর্থাৎ আপন স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করাও একটি সাদাকাহ। সাহাবিগণ বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের কেউ তার কাম-প্রবৃত্তি চরিতার্থ করবে বৈধ পথে আর এতেও কি তার সাওয়াব হবে?" তিনি বললেন, " তোমরা বলো দেখি, যদি তোমাদের কেউ হারাম পথে নিজের চাহিদা মেটাত বা ব্যভিচার করত তাহলে কি তার গুনাহ হতো না? অনুরূপভাবে যখন সে হালাল বা বৈধ পথে কামাচার করবে তাতে তার সাওয়াব হবে।” [১]
টিকাঃ
[১] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২২৫২
[১] আবু দাউদ, হাদিস-ক্রম: ৪১৭৩
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৭৩২০
[১] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ১০০৬
📄 সারা এবং ফিরআউন
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
'ইবরাহিম আলাইহিস সালাম তিনবার ছাড়া কখনও মিথ্যা বলেননি। তন্মধ্যে দুবার ছিল আল্লাহর ব্যাপারে। তার উক্তি 'ইন্নী সাক্বীম' 'আমি অসুস্থ'।[১] এবং তার অন্য এক উক্তি 'বাল ফাআলাহু কাবীরুহুম হাযা' বরং এ কাজ করেছে, এই তো তাদের বড়টি।[২] বর্ণনাকারী বলেন, একদা তিনি (ইবরাহিম আলাইহিস সালাম) এবং সারা কোনো এক অত্যাচারী শাসকের এলাকায় এসে পৌঁছলেন। তখন শাসককে জানানো হলো, এ এলাকায় জনৈক ব্যক্তি এসেছে। তার সঙ্গে একজন পরমা সুন্দরী নারী আছে। শাসক তার কাছে লোক পাঠাল। লোকটি আগন্তুক (ইবরাহিম)-কে নারী সম্পর্কে জানতে চেয়ে বলল, "নারীটি কে?” তিনি উত্তর দিলেন, 'আমার বোন।” অতঃপর তিনি সারার কাছে এলেন এবং বললেন, “হে সারা! তুমি আর আমি ব্যতীত পৃথিবীর ওপর আর কোনো মুমিন নেই। এ লোকটি আমাকে তোমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিল। তখন আমি তাকে জানিয়েছি যে, তুমি আমার বোন। কাজেই তুমি আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন কোরো না।” অতঃপর সারাকে আনার জন্য শাসক লোক পাঠাল। তিনি যখন তার কামরায় প্রবেশ করলেন এবং সে তার দিকে হাত বাড়াল তখনই (আল্লাহর আযাবে) পাকড়াও হলো। অত্যাচারী এই শাসক তখন সারাকে বলল, “আমার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করো, আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না।” সারা তখন আল্লাহর কাছে দুআ করলেন। ফলে সে মুক্তি লাভ করল। অতঃপর দ্বিতীয়বার তাকে ধরতে চাইল। এবার সে পূর্বের মতো বা তার চেয়ে কঠিনভাবে পাকড়াও হলো। এবারও সে বলল, “আল্লাহর কাছে আমার জন্য দুআ করো। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না।” আবারও তিনি দুআ করলেন, ফলে সে মুক্তি লাভ করল। অতঃপর শাসক তার এক প্রহরীকে ডাকল। সে (এলে) তাকে বলল, “তুমি তো আমার কাছে কোনো মানুষ আনোনি। বরং এনেছ এক শয়তান।” অতঃপর সে সারার খেদমতের জন্য হাজেরাকে দান করল। (হাজেরকে নিয়ে) সারা ফিরে এলেন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর কাছে। ইবরাহিম তখন নামাজে দাঁড়ানো। (নামাজ থেকেই) হাত দ্বারা ইশারা করে সারাকে বললেন, “কী ঘটেছে?” সারা বললেন, “আল্লাহ কাফির বা ফাসিকের চক্রান্ত তারই বুকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আর সে হাজেরাকে খিদমতের জন্য দান করেছে।””[১]
প্রথম পাঠ
উল্লিখিত হাদিসের প্রেক্ষিতে নবীদের নিষ্পাপ হওয়ার বিষয়টি চলে আসে। এ ব্যাপারে আলেমদের দুটি প্রসিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য বক্তব্য রয়েছে। প্রথম বক্তব্য হলো, নবীগণ ধর্মীয় এবং পার্থিব উভয় ক্ষেত্রে নিষ্পাপ। তাদের থেকে কোনো ভুলত্রুটি সংঘটিত হয় না। দ্বিতীয় বক্তব্য, নবীগণ ধর্মীয় ব্যাপারে এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হেদায়েতের বাণী পৌঁছার ব্যাপারে নিষ্পাপ। তবে পার্থিব ক্ষেত্রে তাদের ভুল হতে পারে। ভুল আর গুনাহ এক নয়। সমস্ত গুনাহই এক প্রকার ভুল। কিন্তু সমস্ত ভুল গুনাহ নয়। নবী-রাসুলগণের মানবিক ভুল গুনাহ নয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে যদিও দ্বিতীয় মতটি প্রাধান্য দেওয়ার পক্ষপাতী তবুও মনে করি না যে, পার্থিব ক্ষেত্রে নবীদের থেকে মিথ্যা সংঘটিত হতে পারে। কেননা যদি বলা হয় যে, তাদের পক্ষ থেকে মিথ্যা সংঘটিত হতে পারে তাহলে দাওয়াতের ক্ষেত্রে নবীগণ মিথ্যা বলতে পারেন-এই সন্দেহের দ্বার খুলে যাবে। অথচ নবীগণ এ থেকে মুক্ত ও সম্মানিত।
আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম যে দুটি মিথ্যা বলেছিলেন সেগুলো তো তার কওমের বিরুদ্ধে দলিল-প্রমাণ দাঁড় করাবার জন্য বলেছিলেন, এরচেয়ে বেশি কিছু নয়। আর অত্যাচারী বাদশাহর সঙ্গে যে মিথ্যা বলেছিলেন, আমি মনে করি এটি তাওরিয়ার (দুটি অর্থ প্রদানকারী কোনো শব্দের নিকটবর্তী অর্থ গ্রহণ না করে দূরবর্তী অর্থ গ্রহণ করার) অন্তর্ভুক্ত। মুসলমান মুসলমানের ভাই। এই দৃষ্টিকোণ থেকে সারা বংশীয়ভাবে নয়; বরং ধর্মীয়ভাবে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর বোন ছিলেন। আর দ্বিমুখী শব্দের মাধ্যমে বাহ্যত মিথ্যা বলার সুযোগ রয়েছে। যেমন আমাদের সাইয়েদ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সঙ্গে যখন হিজরত করছিলেন তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, 'আপনার আপনারা কোন গোত্রের?' নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেন, 'আমরা মা (পানি) থেকে।' বেদুইন বলল, 'আরবে তো বহু গোত্র রয়েছে!' নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মাধ্যমে উদ্দেশ্য নিয়েছেন যে, মানুষকে যে পানি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে তিনি সেই পানি থেকে।
দ্বিতীয় পাঠ
মিথ্যা সম্পর্কে যেহেতু আলোচনা এল তাই প্রাসঙ্গিকভাবে আমরা এখানে যেসব স্থানে মিথ্যা বলা বৈধ তা উল্লেখ করছি। ইসলাম তিন অবস্থায় মিথ্যা বলার বৈধতা প্রদান করে। এক. শত্রুর সঙ্গে মিথ্যা বলা। <sup>[১]</sup> এটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বিষয় যে, আমাদের শত্রু কাফেররা কোনো মুসলমানকে বন্দী করে নিয়ে যাবে আর তারা জিজ্ঞেস করলে তাদের সঙ্গে সত্য কথা বলতে হবে! মুসলমানদেরকে ক্ষতি থেকে বাঁচানোর জন্য এই ক্ষেত্রে মিথ্যা বলার বৈধতা প্রদান করা হয়েছে। দুই. মীমাংসা করার জন্য মিথ্যা বলা। এই ক্ষেত্রে মীমাংসাকারী ব্যক্তি বিবদমান দুই ব্যক্তির ব্যাপারে এমন উত্তম কথা বলতে পারে যা আসলে তাদের কেউই অপরের ব্যাপারে বলেনি। পার্থিব বিষয়ে সংশোধন এবং মানুষের ঝগড়া-বিবাদ দূর করার লক্ষ্যে এর সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তিন. স্ত্রীর সঙ্গে স্বামী কিংবা স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীর মিথ্যা বলা। অন্তর জয় করা, সদাচরণ এবং সৌজন্যতার জন্য এ সুযোগ রাখা হয়েছে।
কিন্তু ক্ষতি, ধোঁকা বা প্রতারণার জন্য এসব স্থানে মিথ্যা বলা যাবে না। যেমন স্ত্রীর রান্নার প্রশংসা করা। তার সুনাম করা। অথচ বাস্তবতা এর বিপরীত। কিংবা তার প্রশংসা করা, তার সঙ্গে প্রেমালাপ করা। তাকে বলা যে, সে-ই দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দরী নারী। অথচ আসলে তেমনটা নয়। পুরুষদের ব্যাপারে যা বলা হলো নারীদের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করল, সে কি তাকে সত্যিই ভালোবাসে। সত্য কথার বলার জন্য সে আল্লাহর দোহাইও দিল। স্ত্রী তাকে বলল, 'তুমি যখন আমাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে সত্য বলতে বললে, তাহলে শোনো, আমি তোমাকে ভালবাসি না।' লোকটি তখন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কাছে অভিযোগ দায়ের করল। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ওই নারীকে ডেকে পাঠান এবং তাকে সতর্ক করে দেন। ওই নারী বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি কি এটা চান যে আমি তার সঙ্গে মিথ্যা বলি?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, তার সঙ্গে তুমি মিথ্যা বলবে। সকল ঘর তো ভালোবাসার উপরই গড়ে উঠেছে। জেনে রাখো, মানবতা এবং সম্মানের ভিত্তিতে লোকেদের সঙ্গে আচরণ করতে হয়।'
তৃতীয় পাঠ
এক রাতে প্রচণ্ড বাতাস বয়ে যায়। পরদিন সকালে আমি ব্যায়াম করতে বের হই। বের হয়ে দেখি বহু গাছপালা ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। কিন্তু পাখির বাসাগুলো পূর্বের অবস্থায় সম্পূর্ণ নিরাপদ রয়েছে। এটা থেকে আমি এক চমকপ্রদ শিক্ষা লাভ করি যে, মানুষকে কখনো নিচু হতে হয়। জ্ঞানীরা অবস্থা যাচাই করেন। তারা শুধু শুধু বৃথা হৈ-হল্লা করেন না। তাই আমাদেরকে কখনও কখনও খুব ভালোভাবে প্রতিপক্ষের শক্তি সম্পর্কে জানতে হবে। কেননা হিসাবে কোনো ধরনের ভুল হলে তা আমাদের ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। কখনো কখনো বিবাদ-বিসংবাদে সফলতার একটি মাত্র রাস্তাই বাকি থাকে। সেটি হলো তাতে কোনোভাবেই জড়িত না হওয়া। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ছিলেন অত্যন্ত জ্ঞানী একজন মানুষ। তিনি জানতেন, তিনি যদি মিশরের বাদশাহর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যান তাহলে সে তাকে মেরে ফেলবে। আর তিনি শহিদ হয়ে যাবেন। তিনি কোনো ভীতু মানুষ ছিলেন না। শাহাদাতের অনাকাঙ্ক্ষী ছিলেন না। কিন্তু তিনি জানতেন যে, বাদশাহর বাড়াবাড়ির প্রতিবাদের তুলনায় অন্য এক বড় বিষয়ের জন্য তাকে পাঠানো হয়েছে। তাই তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করেন এবং আল্লাহর কাছে বিষয়টি ন্যস্ত করে দেন। কেননা চেষ্টা-প্রচেষ্টা অনুযায়ীই কাজের ফল হয়ে থাকে। অত্যাচারী বাদশাহ তার স্ত্রীকে গ্রহণ করতে চেয়েছিল। তিনি ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর কাছে সম্পূর্ণ নিরাপদে সম্মানিত অবস্থায় ফিরে আসেন। তার সঙ্গে আরেকজন নারীও আসেন যিনি পরবর্তী সময়ে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর দ্বিতীয় স্ত্রীর মর্যাদা লাভ করেছিলেন।
চতুর্থ পাঠ
বংশগতভাবে অভিজাত নারীরা স্বামীকে কখনো খোঁটা দেয় না। সারা আলাইহাস সালাম তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী রমণী ছিলেন। তাফসির বিশারদগণ বলেছেন, ইউসুফ আলাইহিস সালাম তার দাদি সারা থেকেই সৌন্দর্য লাভ করেছেন। তার এত সৌন্দর্য সত্ত্বেও তিনি ভদ্র এবং স্বামী-ভক্ত ছিলেন। হক কাজে স্বামীকে সহায়তা করতেন। আল্লাহ-প্রদত্ত সৌন্দর্যের কারণে স্বামীর ওপর অহংকার করতেননা। তেমনিভাবে আমাদের মা খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা বংশগতভাবে অভিজাত ছিলেন। তার অঢেল সম্পত্তি ছিল, আর স্বামী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন নিতান্ত দরিদ্র, খাদিজা নিজের সমস্ত ধন-সম্পদ স্বামীর হাতে তুলে দেন।
এই পার্থিব ও বস্তুগত পার্থক্য তাদের বিয়ের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়নি। ফলে তিনি স্বামীর কাছে যেমন মর্যাদাবান হয়েছেন তেমনি মৃত্যুর পরেও মর্যাদাবান থেকেছেন। তিনি মাটির নিচে কবরে শায়িত হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ব্যাপারে কোনো বিরূপ কথা সহ্য করতে পারতেন না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বেশি বেশি স্মরণ করতেন। এ কারণে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা'র ঈর্ষা হতো। একদিন তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলে বসেন, 'আপনি এখনো তাকে স্মরণ করেন অথচ তিনি ছিলেন পুরনো দিনের এক বৃদ্ধা নারী। আল্লাহ আপনাকে তার চেয়ে উত্তম স্ত্রী দান করেছেন।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আল্লাহর শপথ, আল্লাহ আমাকে খাদিজার চেয়ে উত্তম স্ত্রী দান করেননি। সে এমন এক নারী ছিল আমাকে যার ভালোবাসা প্রদান করা হয়েছে। মানুষ যখন আমাকে বঞ্চিত করেছে সে তখন আমাকে দান করেছে। মানুষ যখন আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে সে তখন আমাকে আশ্রয় দিয়েছে। তারা যখন আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে সে তখন আমার প্রতি ঈমান এনেছে।' [১]
পঞ্চম পাঠ
মুসলমান অত্যন্ত মর্যাদাবান, তার মান-সম্মান রক্ষা করা শরিয়তের দাবি। তবে মুসলমান ভীতু নয়। সে সবসময় মৃত্যুকে স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত থাকে। কিন্তু মানুষ নিজে নিজে কখনো আত্মহত্যা করতে পারে না। আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু'র বিজয়াভিযানের মাধ্যমে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু খুবই আনন্দিত হয়েছিলেন। আর এটা সকলেই জানে যে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু একজন কুশলী মানুষ ছিলেন। তিনি বন্ধুত্ব ও মিত্রতায় বিশ্বাসী ছিলেন। ঝগড়া-বিবাদ এড়িয়ে চলতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি শত্রুর জন্য পলায়নের রাস্তা রেখে আসতেন না। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তার ব্যাপারে বলেছেন, 'শপথ! এটাই তো বিজয়।' তিনি সম্ভব হলে তার এবং শত্রুপক্ষের রক্ত-ঝরানো ব্যতীতই লক্ষ্য অর্জন করতে পারাটা পছন্দ করতেন। সেনা-কমান্ডারদের জন্য এই বাস্তবতা কখনো ভুলে যাওয়া উচিত নয়। তারা যেন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর গৃহীত কৌশল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। তেমনিভাবে তারা যেন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কুশীলব-চিন্তা এবং উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু'র প্রশংসার মাধ্যমে শিক্ষা লাভ করে।
টিকাঃ
[১] সুরা সাফফাত, আয়াত-ক্রম: ৮৯
[২] সুরা আম্বিয়া, আয়াত-ক্রম: ৬৩
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৩৫৮
<sup>[১]</sup> শত্রু বলতে এখানে দারুল হারবের কাফেরদের কথা বলা হচ্ছে। যুদ্ধাবস্থায় তাদের সঙ্গে মিথ্যা বলা বৈধ। হাদীসে এসেছে, যুদ্ধ হলো ধোঁকা। (সুনানে তিরমিযি, হাদিস-ক্রম: ১৯৩৯) - অনুবাদক।
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৮২১
📄 আদম ও মুসা আলাইহিমাস সালাম-এর আলাপচারিতা
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- 'আদম ও মুসা (আলাইহিমাস সালাম) তাদের রবের কাছে বিতর্ক করলেন। অতঃপর আদম আলাইহিস সালাম মুসা আলাইহিস সালাম এর ওপর জয়ী হলেন। মুসা আলাইহিস সালাম বললেন, “আপনি তো সেই আদম যাকে আল্লাহ তাআলা নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন এবং আপনার মধ্যে তিনি তাঁর রুহকে ফুঁকে দিয়েছেন, তিনি তাঁর ফেরেশতাদের দিয়ে আপনাকে সিজদাহ করিয়েছেন এবং তাঁর জান্নাতে আপনার আবাসন বানিয়ে দিয়েছেন। তারপর আপনি আপনার ভুলের কারণে মানবজাতিকে দুনিয়াতে নামিয়ে দিয়েছেন।” আদম আলাইহিস সালাম বললেন, “আপনি তো সেই মুসা, যাকে আল্লাহ তাআলা রিসালাত দিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলার জন্য বাছাই করেছেন এবং দান করেছেন (বিশেষ সহিফা-লেখা) কয়েকটি কাষ্ঠখণ্ড, তাতে সব বিষয়ের বর্ণনা লিখিত রয়েছে এবং নির্জনে আলাপচারিতার জন্যে নৈকট্য দান করেছেন। কিন্তু আমার জন্মের কত বছর পূর্বে আল্লাহ তাআলা তাওরাত লিপিবদ্ধ করেছেন তা-কি আপনি দেখেছেন?” মুসা বললেন, “৪০ বছর পূর্বে।” আদম বললেন, “আপনি কি তাতে পাননি - ‘আদম (ভুল করে) তার রবের আদেশ অমান্য করেছেন এবং পথহারা হয়েছেন!'?" [১] আদম বলেন, “এরপরও আপনি আমাকে আমার এমন কর্মের জন্য কেন ভর্ৎসনা করছেন যা আমাকে সৃষ্টি করার ৪০ বছর পূর্বে আল্লাহ তাআলা আমার জন্য লিখে রেখেছেন?” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এরপর আদম আলাইহিস সালাম মুসা আলাইহিস সালাম এর ওপর বিজয় লাভ করেন।” [২]
প্রথম পাঠ
অভিজাত লোকেরা মানুষের মর্যাদা অনুযায়ী তার সঙ্গে আচরণ করে থাকে। মর্যাদাবান ব্যক্তিরাই কেবল মর্যাদাবান ব্যক্তির সম্মান-মর্যাদাকে সংরক্ষণ করতে পারে। তাই আপনি অভিজাত হোন। একটি ঘটনার মাধ্যমে অভিজাত ব্যক্তির সুনাম-সুখ্যাতির ইতিহাস মুছে ফেলবেন না। বদান্যতার অধিকারী ব্যক্তি একবার দান না করলেই তার পূর্বের বদান্যতা ভুলে যাওয়া উচিত হবে না। সহনশীল ব্যক্তি একবার রাগান্বিত হয়ে গেলেই তার পূর্বের সহনশীলতাকে অস্বীকার করা যাবে না। অধ্যবসায়ী ও পরিশ্রমী মানুষ একবার ক্লান্ত হয়ে গেলেই তার পূর্বের পরিশ্রমকে অস্বীকার করা যাবে না।
দুই অভিজাত ব্যক্তি-আদম এবং মুসা আলাইহিমাস সালাম-এর আলাপচারিতা লক্ষ করুন, তারা বিশ্ব জগতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জান্নাতের ব্যাপারে বিতর্ক করছেন। কিন্তু মুসা আলাইহিস সালাম আদম আলাইহিস সালাম-কে তিরস্কার করতে গিয়ে আদমের শ্রেষ্ঠত্বের কথা ভুলে যাননি। তেমনিভাবে আদম আলাইহিস সালাম আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে মুসা আলাইহিস সালাম-এর মর্যাদার কথা ভুলে যাননি। তাই তর্ক-বিতর্কের ক্ষেত্রেও প্রত্যেকের মান-মর্যাদা রক্ষা করুন।
দ্বিতীয় পাঠ
আমরা গায়েবে বিশ্বাসী উম্মত। দেখে বিশ্বাস স্থাপন করা জিনিসের তুলনায় না-দেখে বিশ্বাস স্থাপন সংক্রান্ত জিনিসের পরিমাণ বেশি। আমরা জান্নাত-জাহান্নাম, পুনরুত্থান, হিসাব-নিকাশ, পুলসিরাত, ফেরেশতা প্রভৃতি বিষয়ের ওপর ঈমান রাখি। আর এসবই গায়েবি বিষয়। কুরআনে উল্লিখিত মুত্তাকিদের সর্বপ্রথম গুণ হলো তারা গায়েবের প্রতি ঈমান আনেন। আল্লাহ তাআলা সুরা বাকারার শুরুতেই বলেছেন- ‘এ সেই কিতাব যাতে কোনো সন্দেহ নেই। পথ প্রদর্শনকারী পরহেজগারদের জন্য, যারা গায়েবের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং নামাজ প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি তাদেরকে যে রিজিক দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে। [১]’ আয়াতে গায়েবের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করার বিষয়টি নামাজ জাকাত এবং সাদাকার পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। ঈমানবিহীন ইবাদত পণ্ডশ্রম বৈ কিছু নয়। এর কোনো সওয়াব মিলবে না। আদম ও মুসা আলাহিমাস সালাম-এর উল্লিখিত আলাপচারিতা গায়েবি জগতে হয়েছিল। পরম সত্যবাদী বিশ্বস্ত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সংবাদ প্রদান করেছেন। অন্য সকল গায়েবি বিষয়ের প্রতি যেমন আমরা কেন কখন কীভাবে প্রভৃতি প্রশ্ন ব্যতীত ঈমান এনে থাকি তেমনি এর প্রতিও ঈমান আনি।
তৃতীয় পাঠ
আপনার সিদ্ধান্তও ভুল হতে পারে। তাই আপনি নিজেকে নির্ভুল নিষ্পাপ মনে করে পৃথিবীতে চলাফেরা করবেন না। মানুষের ব্যাপারে আপনার অবস্থান তো নিছক অনুমান। যদি আপনি তাদের অবস্থান বুঝতেন, বিরোধীদের পক্ষ থেকে নয় বরং তাদের পক্ষ থেকেই যদি আসল বিষয় শুনতেন তাহলে বুঝতে পারতেন যে, আপনি এক ভুলের প্রাসাদ নির্মাণ করেছেন। মুসা আলাইহিস সালাম-এর কথাই ধরুন না! তিনি ভেবেছিলেন আদম আলাইহিস সালাম ভুল করেছেন। এই ভাবনা থেকেই তিনি আদমের কাছে এসেছিলেন। কিন্তু আলাপচারিতা শেষ না হতেই আদম আলাইহিস সালাম মুসা আলাইহিস সালাম-কে তর্কে পরাস্ত করে দেন। তাই নিজে নিজেই কোনো অবস্থান তৈরি করবেন না। তা থেকে নিজেই কোনো মতামত বের করবেন না। এবং এটাকেই দ্বীন ভেবে বসে থাকবেন না।
চতুর্থ পাঠ
চিন্তার মাধ্যমে অন্য চিন্তাকে আঘাত করা যায়। দলিলের মাধ্যমে অন্য দলিলের সঙ্গে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা যায়। তরবারি রক্ত ঝরাতে পারলেও কখনো সঠিক সিদ্ধান্তকে ভুল প্রমাণ করে দিতে পারে না। বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কখনো হককে বাতিল বানানো যায় না। যদিও সাময়িকের জন্য তার ওপর প্রভাব বিস্তার করা যায়। তাই ভবিষ্যৎ নিয়ে কখনো চিন্তিত হবেন না। যেখানে লাঠি ব্যবহার করা সম্ভব সেখানে তরবারি ব্যবহার করাটা আহাম্মকী। যেখানে মুখ ব্যবহার করা সম্ভব সেখানে লাঠি ব্যবহার করাটা নির্বুদ্ধিতা। যেখানে দৃষ্টি ক্ষেপণ যথেষ্ট সেখানে মুখ ব্যবহার করাটা দ্রুত-প্রবণতা। আপনি শক্তিশালী হোন, নির্বোধ হবেন না। সবসময় স্মরণ রাখুন, অবস্থার তুলনায় ব্যক্তির মূল্য অনেক। যে ব্যক্তি সর্বক্ষেত্রেই বিজয় লাভের আশা করে তার সঙ্গে কেউই থাকে না।
পঞ্চম পাঠ
কুরআনুল কারিম হেফাজত করার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা এই উম্মতকে সম্মানিত করেছেন। পূর্ববর্তী কিতাবসমূহ সংরক্ষণ না করাটা তার অক্ষমতা নয় বরং তিনি পূর্ব থেকেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে রেখেছেন। আপনি যদি তাওরাত খুলে খুঁজেন যে— ‘আদম (ভুল করে) তার রবের আদেশ অমান্য করেছেন এবং পথহারা হয়েছেন’। [১] তাহলে আপনি তাওরাতে কখনোই এ বাক্য পাবেন না। যদিও হাদিসে বলা হয়েছে, এক নবী অপর নবীকে এটা তাওরাতে বিদ্যমান থাকার কথা বলছেন, কিন্তু বনি ইসরাইলের পাদ্রীরা তাওরাত বিকৃত করে ফেলেছে। যেভাবে খ্রিষ্টান যাজকরা ইঞ্জিল বিকৃত করেছে।
আল্লাহ তাআলার চিরসত্য কিতাব—কুরআন তিলাওয়াত করতে পারাটা আমাদের জন্য নেয়ামত। আমরা এমন এক কিতাব পাঠ করছি যেটা আল্লাহর কালাম। যা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। এটি একটি জীবন সঞ্চারকারী কিতাব। যাদের অন্তর জীবিত তাদেরকে সতর্ক করার জন্য এ কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে। মৃতদের সামনে পাঠ করে টাকা উপার্জনের জন্য নয়। অন্ধ ও মৃত ব্যক্তিরা এ কিতাব দ্বারা উপকৃত হয় কিনা আমি এই বিষয়ে বিতর্কে যেতে চাই না। এটি অত্যন্ত দীর্ঘ আলোচনা, এর স্থান এটি নয়। কিন্তু জীবিত থাকা অবস্থায় যে ব্যক্তি এর দ্বারা উপকৃত হয়নি সে মৃত্যুর পরও এর মাধ্যমে উপকৃত হতে পারবে বলে মনে হয় না।
ষষ্ঠ পাঠ
আল্লাহ তাআলা সকল জিনিস লাওহে মাহফুজে লিখে রেখেছেন। যা লিখে রেখেছেন তা অবশ্যই ঘটবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। আল্লাহ তাআলা নিজের অসীম জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষের কর্মকাণ্ডের বিবরণ লিখে রাখার কারণে তারা জিজ্ঞাসার ঊর্ধ্বে উঠে যায় না। অন্যথায় সওয়াব ও শাস্তির বিষয়টি তিরোহিত হয়ে যাবে। আর তখন আমরা নিজেদের অজান্তেই আল্লাহ তাআলাকে দোষারোপ করা শুরু করে দেব।
প্রশ্ন উঠবে যে, আল্লাহ মানুষের ব্যাপারে যা লিখে রেখেছেন মানুষ তা করলে কেন সে হিসাব-নিকাশের সম্মুখীন হবে? উত্তর হচ্ছে আল্লাহ তাআলার জ্ঞান অসীম। তার কখনো কোনো ধরনের ভুল-ভ্রান্তি হতে পারে না। বিষয়টি বোঝার জন্য একটি উদাহরণ দিই। মনে করুন, আল্লাহ তাআলা আপনাকে একটি সন্তান দান করেছেন। দীর্ঘ কয়েক বছর আপনি চোখের সামনেই তাকে লালনপালন করেছেন। আপনি তার স্বভাব-চরিত্র আচার-উচ্চারণ-প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। এইসবের মাধ্যমে আপনি ভবিষ্যদ্বাণী করলেন যে, আপনার সন্তানটি একসময় চুরি করবে। এ ভবিষ্যদ্বাণী সত্যও হতে পারে মিথ্যাও হতে পারে। ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হওয়ার অর্থ কি এটা যে, আপনি তাকে চুরি করতে বাধ্য করেছেন? নাকি আপনি বিভিন্ন বিষয় অনুমান করে একটি বিষয় বলেছেন আর তা সঠিক হয়ে গেছে। লাওহে মাহফুজে লিখে রাখার বিষয়টি এমনই। তবে এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। যা আমাদের জন্য ভুলে যাওয়া উচিত নয়। তা হলো আমাদের জ্ঞান সসীম। আর আল্লাহর জ্ঞান অসীম। আমাদের জ্ঞান অনুমান-নির্ভর আর আল্লাহর জ্ঞান সুনিশ্চিত। কোনো কিছু করা বা না-করার ক্ষেত্রে আমরা যতই স্বাধীন হই না কেন আমাদের জন্য কখনো তাকদিরের মাধ্যমে নিজেদের কাজকর্মের দলিল-প্রমাণ পেশ করা ঠিক নয়।
দ্বিতীয়তঃ কোনো ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পরই কেবল আমরা আল্লাহ তাআলার তাকদির সম্পর্কে জানতে পারি। কেউ কাউকে হত্যা করা বা চুরি করাটা আল্লাহ তাআলার লিখিত তাকদির অনুযায়ী হয়ে থাকে। তবে এ কাজে সে বাধ্য নয়। অন্যথায় দ্বীন-ধর্ম বলতে কিছুই বাকি থাকবে না। নবী-রাসুল পাঠানোরও তখন কোনো উদ্দেশ্য রইবে না। আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করার পূর্বেই জানেন যে, কারা জান্নাতি হবে আর কারা জাহান্নামি। তবুও আল্লাহ তাআলা নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন যাতে মানুষ স্বাধীনভাবে তাদের তাকদিরের পরিক্রমায় জীবনযাপন করতে পারে।
টিকাঃ
[১] সুরা ত্ব-হা, আয়াত-ক্রম: ১২১
[২] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৬৫২; সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৬৬১৪
[১] সুরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ২৩
[১] সুরা ত্ব-হা, আয়াত-ক্রম: ১২১
📄 শত মানুষের হন্তারক যে ব্যক্তি
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- 'তোমাদের পূর্বেকার লোকদের মধ্যে এক ব্যক্তি ছিল, যে ৯৯টা খুন করেছে। তারপর সমকালের শ্রেষ্ঠ আলেম সম্পর্কে জানতে চাইল (তাওবা করার জন্য)। লোকজন তাকে একজন ধর্মগুরুর সন্ধান দিল। সে ওই ধর্মগুরুর কাছে গিয়ে সে যে ৯৯টা খুন করেছে তা উল্লেখ করে জানতে চাইল—এমতাবস্থায় তার জন্য তাওবার সুযোগ আছে কি না। ধর্মগুরু বললেন, “না।” তখন সে ধর্মগুরুকেও হত্যা করে ফেলল। তাকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে খুনের সংখ্যা সে একশ' পূর্ণ করে নিল। অতঃপর সমকালের শ্রেষ্ঠ আলেম সম্পর্কে সে আবারও জানতে চাইল। লোকজন তাকে একজন আলেমের সন্ধান দিল। ফলে ওই আলেমের কাছে গিয়ে সে যে ১০০টা খুন করেছে তা উল্লেখ করে জানতে চাইল—এমতাবস্থায় তার জন্য তাওবার সুযোগ আছে কি না। আলেম বললেন, “হ্যাঁ। এমন কে আছে যে ব্যক্তি তার মধ্যে ও তার তাওবার মধ্যে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করবে! তুমি অমুক এলাকায় যাও। সেখানে কিছু লোক আল্লাহর ইবাদাতে নিমগ্ন আছে। তুমিও তাদের সঙ্গে আল্লাহর ইবাদাতে লিপ্ত হও। নিজের ভূমিতে আর কখনোই প্রত্যাবর্তন কোরো না। কেননা এ দেশটি ভয়ংকর খারাপ।” তারপর সে চলতে লাগল। যখন সে মাঝপথে পৌঁছুল তখন তার সামনে মৃত্যু এসে হাজির। এবার রহমতের ফেরেশতা ও আযাবের ফেরেশতার মধ্যে বিতর্ক দেখা গেল। রহমতের ফেরেশতারা বললেন, “সে আন্তরিকভাবে আল্লাহর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাওবার উদ্দেশে বেরিয়েছে।” আর আযাবের ফেরেশতারা বললেন, “সে তো কখনোই কোনো সৎ কাজ করেনি।” এমতাবস্থায় মানুষের আকৃতিতে এক ফেরেশতা এলেন। তারা তাকে তাদের মধ্যস্থতাকারী বানালেন। তিনি বিতর্করত উভয় ফেরেশতা বললেন, “তোমরা উভয় স্থান পরিমাপ করো (নিজ ভূখণ্ড ও যাত্রাকৃত ভূখণ্ড)। এ দুই ভূখণ্ডের মধ্যে যা নিকটবর্তী হবে সে অনুযায়ী তার ফায়সালা হবে।” তারপর উভয়ে পরিমাপ করে দেখলেন যে, সে ঐ ভূখণ্ডেরই বেশি নিকটবর্তী যেখানে পৌঁছার জন্যে সংকল্প করেছে। অতঃপর রহমতের ফেরেশতা তার রুহ কবজ করে নিলেন।' [১]
প্রথম পাঠ
ধর্মীয় কোনো বিষয়ে আপনার সন্দেহ হলে আলেমের দরজায় করাঘাত করুন, আবেদের দরজায় নয়। আবেদ নিজের জন্য ইবাদত করে থাকে আর মানুষের জন্য মুর্খতা বিলিয়ে থাকে। আর আলেম অনেক সময় বাহ্যিক ইবাদত কম করে নিজের ক্ষতি করে থাকে। কিন্তু মানুষের জন্য সে নিজ ইলম বিলিয়ে থাকে। আমাদের কেউ অসুস্থ হলে ডাক্তারের দরজায় করাঘাত করে। কারও গাড়ি নষ্ট হলে সে সবচেয়ে অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার তালাশ করে। কোনো টেবিল সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে অভিজ্ঞ কাঠমিস্ত্রির পাত্তা জানতে চায়। দ্বীন তো এ সমস্ত কিছুর তুলনায় অনেক বেশি দামি, তাই দ্বীনের ক্ষেত্রে আমরা অবশ্যই দ্বীন বিষয়ে বিশেষজ্ঞকে জিজ্ঞেস করব।
মসজিদে আসা-যাওয়া করনেওয়ালা প্রত্যেক ব্যক্তিই আলেম ও ফকিহ নয়। ইবাদত প্রশংসনীয় বিষয় বটে, কিন্তু তা এক বিষয় আর ইলম আরেক বিষয়। সাহাবায়ে কেরামের সকলেই ফাতোয়া প্রদানকারী ছিলেন না। তাদের একেক জন একেক বিষয়ে বিজ্ঞ ছিলেন। উবাই ইবনে কাব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কথাই ধরুন না! সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে সবচেয়ে বড় কারী ছিলেন। মুয়ায ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে হালাল-হারাম সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জানতেন। আবু বকর সিদ্দিক এবং তার পরে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন কুরআনুল কারিম একত্রিত করতে চাইলেন তখন তারা যায়েদ ইবনে সাবেত রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে এর দায়িত্বভার ন্যস্ত করেন, খালেদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে নয়। আর যখন তারা মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছেন তখন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে মুসলমানদের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। বিশ্বজগত তো বহু টুকরো বিষয়ের সমষ্টি। আর এ প্রত্যেক বিষয়েই একেকজন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি রয়েছেন।
যাবারকান ইবনে আদি উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কাছে নালিশ নিয়ে এসেছিলেন—হুতিয়া তাকে এই বলে নিন্দে করেছিল— ‘তুমি সম্মান ছেড়ে দাও, তা পাবার জন্য সফর করো না, তুমি বসে থাকো, কেননা তুমি আহার্য গ্রহণকারী এবং পোশাক পরিধানকারী।’ উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন তাকে বললেন, 'আমি তো এতে নিন্দের কিছু দেখি না।' যাবারকান বললেন, 'খাবার-পোশাকই কি আমার সম্মানের জন্য যথেষ্ট?' উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বিষয়টি ভালোভাবে বুঝতে চাইলেন। তিনি তখন কুরআনুল কারিমের সবচেয়ে বড় কারী উবাই ইবনে কাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে ডাকেননি, কুরআনের ব্যাখ্যাকার ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু-কেও না, হালাল-হারাম সম্পর্কে সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহু-কেও না, সবচেয়ে বেশি হাদিস বর্ণনাকারী আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু-কেও না, বরং তিনি হাসসান ইবনে সাবেত রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে ডেকে আনেন। কেননা বিষয়টি কবিতা-সংক্রান্ত। কবিতা-সংক্রান্ত বিষয়ে কবিরাই ফতোয়া প্রদান করবেন। হাসসান ইবনে সাবেত রাদিয়াল্লাহু আনহু এসে বললেন, 'এ কবিতার মাধ্যমে তার শুধু নিন্দেই জ্ঞাপন করা হয়নি; বরং তার ওপর পেশাব করে দেওয়া হয়েছে।' অর্থাৎ তার মারাত্মক নিন্দা জ্ঞাপন করা হয়েছে। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন হুতিয়াকে বন্দী করেন।
দ্বিতীয় পাঠ
যে ব্যক্তি বলল-আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন-সে বস্তুত ফতোয়াই প্রদান করল। তাই কোনো মাসআলায় আল্লাহ তাআলার হুকুম কী, তা না জানলে 'আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন' বলতে সংকোচ বোধ করবেন না। 'আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন' বলতে লজ্জাবোধ করে মানুষের গুনাহ নিজ কাঁধে বয়ে আনবেন না। শা'বি রহমতুল্লাহি আলাইহি'র কথাই ধরুন না! তিনি একাধারে একজন আলেম, মুহাদ্দিস, ফকিহ ও কাজি। তাকে এক মাসআলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।' লোকেরা তাকে বলল, 'আপনি ইরাকের বড় ফকিহ, “আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন”-এ কথা বলতে কি আপনার লজ্জা লাগে না?' তিনি উত্তরে বললেন, 'ফেরেশতারা তো এটা বলতে লজ্জাবোধ করেননি যে- ‘আপনি পবিত্রতম সত্তা! আপনি যা শিক্ষা দিয়েছেন তা ছাড়া আমাদের কোনো ইলম নেই। নিশ্চয় আপনিই প্রকৃত জ্ঞানী, হেকমতবান।[১]’
মালেক ইবনে আনাস রহমতুল্লাহি আলাইহি'র কথাই ধরুন না! তিনি ছিলেন দারুল হিজরাহ মদিনার ইমাম। যাঁর ব্যাপারে বলা হতো—মালেক মদিনায় থাকাবস্থায় কারও ফতোয়া প্রদানের সাহস নেই। একবার ইরাক থেকে এক ব্যক্তি তার কাছে কিছু প্রশ্ন নিয়ে এল। তিনি কিছুর উত্তর দেন আর বাকিগুলো সম্পর্কে চুপ করে থাকেন। লোকটি তখন বলল, 'হে মালিক, আমি ইরাকবাসীকে গিয়ে কী বলব?' তিনি বললেন, 'তাদেরকে গিয়ে বোলো, মালিক এগুলো সম্পর্কে জ্ঞান রাখে না!'
তৃতীয় পাঠ
গুনাহ যতই বেশি হোক না কেন আপনি এই ধারণা করা থেকে বেঁচে থাকবেন যে, আপনার গুনাহ আল্লাহ তাআলার রহমতের চেয়ে বেশি হয়ে গেছে। শয়তান তো আপনার থেকে এটাই চায়! সে আপনার চোখে গুনাহকে বড় করে দেখাতে চায়। আল্লাহ তাআলার রহমতকে ছোট করে দেখাতে চায়। অথচ আল্লাহর রহমত আপনার গুনাহর চেয়ে বহুগুণ বিস্তৃত এবং বড়। আপনি এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিত থাকুন। উল্লিখিত লোকটি ৯৯জন মানুষকে খুন করে তাওবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরপর সে আগের অবস্থানে চলে গেছে। আরেক জনকে হত্যা করে শত সংখ্যা পূরণ করেছে। আল্লাহ তাআলা যখন তার অন্তরে কল্যাণ দেখতে পেয়েছেন তখন তার জন্য তাওবার উপকরণের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। সে আল্লাহর ব্যাপারে সঠিক পথ অবলম্বন করেছে। তাই আল্লাহ তাআলা তাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। সে নিজের জিনিসপত্র ও পাথেয় নিয়ে সফরে বের হয়ে গেছে। রাস্তায় তার মৃত্যু এসে হাজির হয়েছে। সহিহ বুখারিতে এসেছে—ফেরেশতারা দূরত্ব পরিমাপ করে দেখলেন লোকটি রাস্তার ঠিক মধ্যখানে রয়েছে। আল্লাহ তাআলা তখন মাটিকে নির্দেশ দেন—'তুমি নিকটবর্তী হয়ে যাও!' এভাবে সে নেককারদের ভূখণ্ডের নিকটবর্তী হয়ে যায়।
এই তাওবাকারী প্রকৃতপক্ষেই এক খুনি ছিল। সামান্য থেকে সামান্য কারণে সে লোকজনকে হত্যা করত। ধর্মগুরুর ফতোয়া তার পছন্দ হয়নি, তো তাকে হত্যা করে ফেলেছে। শিরকের পর হত্যার চেয়ে বড় কোনো গুনাহ নেই, তবুও আল্লাহ তার তাওবা কবুল করেছেন। মনে রাখবেন, হারাম কাজের সঙ্গে আপনার সম্পৃক্ততা আল্লাহর রহমতের চেয়ে বেশি নয়। আপনার ঘুষ আল্লাহর রহমতের চেয়ে বেশি নয়। আপনার মদ্যপান আল্লাহর রহমতে চেয়ে অধিক নয়। [১] সাহাবায়ে কেরামের প্রতি লক্ষ করুন। যাঁরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে জীবনযাপন করেছেন, তারা কেমন ছিলেন? উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কথাই ধরুন না! তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে হত্যা করার জন্য বের হয়েছিলেন! ইকরামার কথা মনে করুন! মক্কা বিজয়ের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাঁর রক্ত হালাল ঘোষণা করেছিলেন! খালিদ ইবনে ওয়ালিদের কথা! উহুদের দিন তিনি মুসলমানদের বিজয়কে এক প্রকার পরাজয়ে পর্যবসিত করেছিলেন!
এবার আল্লাহর রহমতের দিকে দৃষ্টিপাত করুন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু পৃথিবীকে ইনসাফ এবং রহমত দ্বারা পূর্ণ করে দিয়েছেন। ইকরিমা রাদিয়াল্লাহু আনহু ইয়ারমুকের যুদ্ধে ডান বাহুর নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং শহিদ হয়েছেন। 'আল্লাহর উন্মুক্ত তরবারি' উপাধিতে ভূষিত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু'র মাধ্যমে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু রোম ও পারসিকদের শায়েস্তা করেছেন। মানুষের স্বভাব খনিজ পদার্থের মতো। জাহেলি যুগে যারা উত্তম ছিলেন ইসলাম আসার পরও দ্বীনের বুঝ গ্রহণের মাধ্যমে তারা উত্তমই থেকেছেন। বর্তমান যুগেও আমরা বিভিন্ন ব্যক্তি সম্পর্কে শুনতে পাই। দেখতে পাই যে, তারা একসময় ইসলামের কট্টর দুশমন ছিলেন। কিন্তু তাওবা করে এখন ইসলামের সবচেয়ে বড় রক্ষকে পরিণত হয়েছেন। যদি আপনি পাপাচারের মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করে থাকেন তাহলে জেনে রাখুন, আনুগত্যের মাধ্যমে প্রসিদ্ধি লাভ করার দরজা সবসময়ের জন্য খোলা রয়েছে।
চতুর্থ পাঠ
আপনি মানুষ এবং মানুষের স্রষ্টা আল্লাহর মধ্যে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবেন না। বহু মানুষ এমন রয়েছে যাদেরকে হাত ধরে আল্লাহ তাআলার পথে নিয়ে আসতে হয়। তাহলে কেন আপনি এসব মানুষকে আল্লাহর কাছে পৌঁছার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াচ্ছেন? পাপাচারীদের কাছে আল্লাহর আযাবের পূর্বে তার রহমতের কথা আলোচনা করুন। তার প্রতিশোধগ্রহণের গুণের পূর্বে তার ইনসাফ এবং ক্ষমাশীল গুণের আলোচনা করুন। জান্নাতে সকলেরই সংকুলান হবে! আপনি নিজের স্থানের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হবেন না। পাপাচারীদের সঙ্গে সদয় আচরণ করুন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বাতিল ধর্মের ওপর এক পাদ্রীকে রাত্রি-জাগরণ করতে দেখে ক্রন্দন শুরু করেন। জিজ্ঞাসা করা হয়, 'আমিরুল মুমিনিন! কোন জিনিস আপনাকে কাঁদাচ্ছে?' তিনি বলেন, 'ক্লিষ্ট ক্লান্ত এক ব্যক্তি, যে পরিশ্রম করা সত্ত্বেও জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে!' অন্য ধর্মের মানুষ জাহান্নামে প্রবেশ করাটা উমরের কাছে আনন্দদায়ক ছিল না। তাহলে কি ইসলাম ধর্মের কেউ জাহান্নামে প্রবেশ করাটা তার কাছে আনন্দদায়ক হতে পারে?
এক ইহুদি মৃত্যু শয্যায় কাতরাচ্ছিল, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে মুহূর্তে তাকে ইসলামের দাওয়াত দেন। লোকটি ইসলাম গ্রহণ করে নেয়। তিনি বলেন, 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি আমার মাধ্যমে এক ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করলেন।' [১] আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় বান্দা হলো সে, যে আল্লাহর বান্দাদেরকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। গুনাহ মানুষজনকে পরিবেষ্টন করে আছে, শয়তান তাদের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে আছে এটাই কি যথেষ্ট নয়, তবুও আমরা কেন তাদের ওপর চেপে বসতে যাব! রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার একটি মাত্র আয়াত তিলাওয়াত করতে করতেই সারাটি রাত কাটিয়ে দেন- ‘যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি দেন, তবে তারা আপনার দাস এবং যদি আপনি তাদেরকে ক্ষমা করেন, তবে আপনিই পরাক্রান্ত, মহাবিজ্ঞ।’[১] এরপর আল্লাহ তাকে এই সংবাদ দিয়েছেন-'অবশ্যই আমি আপনাকে আপনার উম্মতের ব্যাপারে সন্তুষ্ট করব।' [২] এই রহমতকে সবসময় আমাদের নজরে রাখা আবশ্যক। আমরা তো গুনাহকে অপছন্দ করি, গুনাহগারকে নয়। হাদিসে এসেছে, এক নবীকে তার সম্প্রদায় প্রহার করে রক্তাক্ত করে ফেলেছে। এরপর তিনি চেহারা থেকে রক্ত মুছতে মুছতে বলতে লাগলেন, 'হে আল্লাহ আপনি আমার সম্প্রদায়কে ক্ষমা করে দিন। তারা তো জানে না।' [৩]
পঞ্চম পাঠ
মৃত্যু হঠাৎ করে উপস্থিত হয়ে যায়। আমাদের আলোচ্য ব্যক্তিটি রাস্তায়ই মারা গেল। সে ভাবতেও পারেনি যে, চলতে চলতে তার মৃত্যু চলে আসবে। কিন্তু এই মৃত্যু কত সুমিষ্ট আর এই রাস্তা কত চমৎকার! আল্লাহর রাস্তায় তার মৃত্যু হলো... আপনি জীবনটাকে আল্লাহর পথের সফর বানিয়ে নিন। তাহলে যখনই মৃত্যু আসুক এতে আপনার কোনো ক্ষতি হবে না। আপনার আশপাশে তাকিয়ে দেখুন! কত শস্য ও ফসলাদি রয়েছে, মালিকেরা তা কাটতে পারেনি। কত বাড়ি নির্মিত হয়েছে, বাড়িওয়ালা তাতে থাকতে পারেনি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কত সিট রয়েছে ছাত্ররা সেখান থেকে বের হওয়ার পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেছে। কত শিশুকে দাফন করা হলো! কত বালকের জানাজা কাঁধে করে নিয়ে যাওয়া হলো! পূর্ণিমার চাঁদের মতো সুন্দরী কত যুবতী রয়েছে, তাদেরকে বাসরঘরে নয়, বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কবরে। আপনি এটা বলবেন না যে, আগামীকাল আমি তাওবা করব। আগামীকালটি আপনার কাছে নাও আসতে পারে। এ পর্যন্ত যারা মারা গেছে তারা প্রত্যেকেই ধারণা করত যে, এই সময়টিতে তারা মারা যাবে না।
ষষ্ঠ পাঠ
নিয়তই আমল কবুলের ভিত্তিমূল। আমরা আমল না করলেও শুধু নিয়তই আমাদের মর্যাদা উঁচু করে দিতে পারে। মুসা আলাইহিস সালাম-এর সমকালে বনি ইসরাইলে একবার দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। মুসা পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, এক দরিদ্র ব্যক্তি বলছে—‘হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি জানেন, যদি আমার এই পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ হতো তাহলে আমি তা আপনার বান্দাদেরকে দান করে দিতাম।’ আল্লাহ তাআলা মুসা আলাইহিস সালাম-কে বলেন, ‘তুমি আমার বান্দাকে বলো আমি তার সাদাকাহ কবুল করেছি।’ পক্ষান্তরে আমল করা সত্ত্বেও নিয়ত আমাদেরকে নিচে নামিয়ে দিতে পারে। মুনাফিকদের সরদার ইবনে সালুলের কথাই ধরুন না! রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পেছনে ফজরের নামাজ পড়ছে। অথচ সে জাহান্নামের সবচেয়ে নিকৃষ্ট স্থানে নিক্ষিপ্ত হবে। আপনার নিয়ত পরিশুদ্ধ করুন, আপনার আমল ঠিক হয়ে যাবে। আপনি সেই ব্যক্তির মতো হবেন না যে সমুদ্রে গম চাষাবাদ করে। তার এ চাষাবাদ নিছক পণ্ডশ্রম বৈ কিছু নয়। এতে সে কোনো সওয়াব (ফসল) পায় না।
টিকাঃ
[১] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৭৬৬
[১] সুরা বাকারা, আয়াত-ক্রম : ৩২
[১] বলা বাহুল্য এগুলো জঘন্যতম অপরাধ। কুরআন-হাদিসে এসবের ব্যাপারে মারাত্মক আযাবের হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে। হাদিসে উল্লিখিত ঘটনাটি যেহেতু আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া সংক্রান্ত এ জন্য লেখক এসব গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিদের আল্লাহর রহমতের আশার আলো দেখাচ্ছেন। এ জঘন্যতম গুনাহগুলোর সরলীকরণ করা আদৌ এখানে উদ্দেশ্য নয়।- অনুবাদক
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ১৩৫৬
[১] সুরা মায়িদাহ, আয়াত-ক্রম: ১১৮
[২] সুনানে নাসায়ি, হাদিস-ক্রম: ১০১;, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস-ক্রম: ১৩৫০
[৩] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৪৭৭