📘 নবীজির ﷺ পাঠশালা 📄 কুষ্ঠ, টাক ও অন্ধ ব্যক্তি

📄 কুষ্ঠ, টাক ও অন্ধ ব্যক্তি


রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'বনি ইসরাইলের মধ্যে তিনজন লোক ছিল। একজন শ্বেতরোগী, একজন মাথায় টাকওয়ালা আর একজন অন্ধ। মহান আল্লাহ তাদেরকে পরীক্ষা করতে চাইলেন। কাজেই, তিনি তাদের কাছে একজন ফেরেশতা পাঠালেন। ফেরেশতা প্রথমে শ্বেত রোগীটির কাছে এলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার কাছে কোন জিনিস অধিক প্রিয়?” সে জবাব দিল, "সুন্দর রং ও সুন্দর চামড়া। কেননা, মানুষ আমাকে ঘৃণা করে।” ফেরেশতা তার শরীরের উপর হাত বুলিয়ে দিলেন। ফলে তার রোগ সেরে গেল। তাকে সুন্দর রং এবং সুন্দর চামড়া দান করা হলো। অতঃপর ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "কোন ধরনের সম্পদ তোমার কাছে অধিক প্রিয়?” সে জবাব দিল, "উট।” অতএব তাকে একটি দশ মাসের গর্ভবতী উটনী দেয়া হলো। তখন ফেরেশতা বললেন, "এতে তোমার জন্য বরকত হোক।”

এরপর ফেরেশতা টাকওয়ালার কাছে গেলেন এবং বললেন, “তোমার কাছে কোন জিনিস অধিক পছন্দনীয়?” সে বলল, "সুন্দর চুল এবং আমার থেকে যেন এ রোগ চলে যায়। মানুষ আমাকে ঘৃণা করে।” ফেরেশতা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এবং তৎক্ষণাৎ মাথার টাক চলে গেল। তাকে সুন্দর চুল দেয়া হলো। ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন, "কোন সম্পদ তোমার কাছে অধিক প্রিয়?” সে জবাব দিল, "গরু।” অতঃপর তাকে একটি গর্ভবতী গাভী দান করলেন। এবং ফেরেশতা দুআ করলেন, "এতে তোমাকে বরকত দান করা হোক।”

অতঃপর ফেরেশতা অন্ধের কাছে আসলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কোন জিনিস তোমার কাছে অধিক প্রিয়?” সে বলল, “আল্লাহ যেন আমার চোখের জ্যোতি ফিরিয়ে দেন, যাতে আমি মানুষকে দেখতে পারি।” তখন ফেরেশতা তার চোখের উপর হাত বুলিয়ে দিলেন, তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলেন। ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কোন সম্পদ তোমার কাছে অধিক প্রিয়?” সে বলল, “ছাগল।” অতঃপর তাকে একটি গর্ভবতী ছাগী দান করা হলো। অতঃপর পশুগুলো বাচ্চা প্রসব করল। উট ও গাভী বাচ্চা দিল। অল্পদিনের ব্যবধানে উটের মালিকের একটি মাঠ উটে ভরে গেল। গাভীর মালিকের একটি মাঠ গরুতে ভরে গেল এবং ছাগলের মালিকের একটি মাঠ ছাগলে ভরে গেল।

কিছুদিন পর ফেরেশতা তার পূর্বের সেই রূপে (দরিদ্রবেশে) কুষ্ঠ রোগীর কাছে এলেন এবং বললেন, “আমি একজন নিঃস্ব ব্যক্তি। সফরে আমার সমস্ত সম্পদ শেষ হয়ে গেছে। আজ আল্লাহর সাহায্য ছাড়া বাড়ি পৌঁছার কোনো উপায় নেই। তাই আমি তোমার কাছে ঐ আল্লাহর দোহাই দিয়ে একটি উট চাচ্ছি যিনি তোমাকে সুন্দর গায়ের রং, সুন্দর চামড়া এবং অনেক সম্পদ দান করেছেন, যেন আমি আমার এ সফরে বাড়ি পৌঁছতে পারি।” সে উত্তর দিল, “আমার ওপর মানুষের অনেক হক রয়েছে (তাই তোমাকে উট দেওয়া সম্ভব নয়)।” ফেরেশতা বললেন, “আমি মনে হয় তোমাকে চিনি। তুমি কি সেই কুষ্ঠ রোগী ছিলে না যাকে মানুষ ঘৃণা করত? তুমি কি নিঃস্ব ছিলে না, অতঃপর আল্লাহ তোমাকে অনেক সম্পদ দিয়েছেন?” সে বলল, “এ সম্পদ তো আমি বংশপরম্পরায় লাভ করেছি।” ফেরেশতা বললেন, “তুমি যদি মিথ্যাবাদী হও তবে আল্লাহ যেন তোমাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেন।”

এরপর ফেরেশতা টাকওয়ালার কাছে তার সেই পূর্বের আকৃতিতে (টাকপড়া দরিদ্র ব্যক্তি হিসেবে) গেলেন এবং তাকেও অনুরূপ বললেন। সে-ও শ্বেতরোগী লোকটির মতো জবাব দিল। তখন ফেরেশতা বললেন, “তুমি যদি মিথ্যাবাদী হও তবে আল্লাহ যেন তোমাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেন।” অতঃপর ফেরেশতা অন্ধ লোকটির কাছে তার সেই পূর্বের আকৃতিতে (অন্ধ ও নিঃস্ব লোক হিসেবে) এলেন এবং বললেন, “আমি এক মুসাফির ও নিঃস্ব ব্যক্তি। সফরে আমার সমস্ত সম্বল শেষ হয়ে গেছে। আজ আল্লাহর সাহায্য ছাড়া বাড়ি পৌঁছার কোনো উপায় নেই। আজ আমি তোমার কাছে ঐ আল্লাহর দোহাই দিয়ে একটি ছাগল প্রার্থনা করছি যিনি তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন আর আমি এ ছাগীটি নিয়ে আমার এ সফরে বাড়ি পৌঁছতে পারব।"

সে বলল, "প্রকৃতপক্ষেই আমি অন্ধ ছিলাম। আল্লাহ আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমি ফকির ছিলাম। আল্লাহ আমাকে সম্পদশালী করেছেন। এখন তুমি যা চাও নিয়ে যাও। আল্লাহর কসম, আল্লাহর জন্য তুমি যা কিছু নেবে, তার জন্যে আজ আমি তোমার কাছে কোনো প্রশংসাই দাবি করব না।" তখন ফেরেশতা বললেন, "তোমার সম্পদ তুমি রেখে দাও। তোমাদের তিনজনের পরীক্ষা নেয়া হলো মাত্র। আল্লাহ তোমার ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তোমার অপর দুই সাথির ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন।” [১]

প্রথম পাঠ
শুধু অকল্যাণের মাধ্যমে পরীক্ষা হয় না বরং কল্যাণ দিয়েও পরীক্ষা হয়। অকল্যাণমূলক পরীক্ষায় ধৈর্যধারণ হলো সফলতা। কল্যাণমূলক পরীক্ষায় শুকরিয়া তথা কৃতজ্ঞতা হলো সফলতা। এই তো সুলাইমান আলাইহিস সালাম। তিনি রানি বিলকিস আসার সংবাদ পেয়ে মানুষ ও জিন উভয় শ্রেণির সভাসদদের একত্রিত করলেন। তাদেরকে ইয়ামান থেকে বিলকিসের সিংহাসন নিয়ে আসতে বললেন। শক্তিশালী জিন তা করতে সক্ষম হয়নি। একজন মুমিন ব্যক্তি এক্ষেত্রে সফল হয়েছেন। তিনি আল্লাহ তাআলার ইসমে আজম জানতেন। যার মাধ্যমে তার কাছে দুআ করা হলে তিনি সাড়া দিয়ে থাকেন। চোখের পলকেই সিংহাসন তার সামনে উপস্থিত হয়ে যায়। সুলাইমান আলাইহিস সালাম বুঝতে পারলেন, তাকে পরীক্ষা করা হচ্ছে। তাই তিনি অহংকার করেননি। শুধু বলেছেন- ‘এটা আমার পালনকর্তার অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করেন যে, আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, নাকি অকৃতজ্ঞতা। যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, সে নিজের উপকারের জন্যেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং যে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সে জানুক যে, আমার পালনকর্তা অভাবমুক্ত কৃপাশীল।’ [১]

প্রাচুর্যের পরীক্ষায় সফলতা হলো নিজের জন্য প্রয়োজন-মাফিক খরচ করা আর অন্যান্য মানুষের জন্য অবারিত দানের দরজা খোলা রাখা। এ পরীক্ষায় ব্যর্থতা হলো কার্পণ্য করা। ফকিরের মতো জীবনযাপন করা আর ধনীর মতো হিসাব করা। শক্তি পরীক্ষার সফলতা হলো ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। দুর্বলকে সাহায্য করা। অকৃতকার্যতা হলো সীমালংঘন করা। অন্যের ওপর জুলুম করা। মিথ্যা অপবাদ দেওয়া। আপনার শক্তি যদি আপনাকে ধোঁকা দেয়, আপনি যদি মানুষের ওপর জুলুম করেন তাহলে মনে রাখবেন, আপনার ওপর শক্তিমান আল্লাহ রয়েছেন।

বিয়ে বিলম্বিত হওয়াটাও একটা পরীক্ষা। আল্লাহ তাআলা দেখতে চান যে, আপনি কী করেন। আপনি কি আল্লাহর অনুগ্রহ পাওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ করেন নাকি অশ্লীল কাজে জড়িয়ে পড়েন। দুআ কবুলে দেরি হওয়াটাও পরীক্ষা। আল্লাহ তাআলা দেখতে চান, এ-ক্ষেত্রে আপনি কী করেন। ধৈর্য ধারণ করেন, ইস্তেগফার পড়েন, নাকি রাগান্বিত হয়ে দাজ্জাল (তাগুতের) কাছে ধরনা দেন। স্মরণ করুন, যখন যাকারিয়া আলাইহিস সালাম-এর সন্তান হচ্ছিল না, তিনি সিজদায় লুটিয়ে দুআ করেন। মেহরাবে থাকা অবস্থায় সন্তানের সুসংবাদ আসে। আমরা তো এমন জাতি যারা সিজদায় পড়ে প্রার্থনা করে আর মেহরাবে তাদের সুসংবাদ শোনানো হয়।

দ্বিতীয় পাঠ
জিহ্বা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে শুকরিয়া আদায় করতে হবে। একটি অপরটির স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না। আল্লাহ তাআলা আপনার জবান থেকে প্রশংসা শুনতে চান। আল্লাহ তাআলা বান্দার জবানে নিজের প্রশংসাকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন। দেখতে চান, তার নেয়ামত পেয়ে আপনি কী করেন? শুধু ধন-সম্পদের ক্ষেত্রেই কৃপণতা হয় না। যদিও ধন-সম্পদই কৃপণতার মূল। আপনি জানেন, কোনো একটি পরামর্শ কারও উপকার করতে পারে, তাহলে তাকে সেটা না বলা কৃপণতা। কোনো বিষয়ে সাক্ষ্য না দেওয়া হলে হয়তো কারও হক ছিনিয়ে নেওয়া হবে, তা জানা সত্ত্বেও সাক্ষ্য না দেওয়া কৃপণতা। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাদ মিটিয়ে দিতে পারেন কিন্তু সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা না মেটানো কৃপণতা। কোনো বৃদ্ধের ভারী বোঝা বহন না করা কৃপণতা। পথহারা মুসাফিরকে গাড়িতে আরোহণ না করানো কৃপণতা। আপনার কাছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম স্মরণ করা হলো কিন্তু আপনি তার ওপর দুরুদ পাঠ করলেন না, এটাও কৃপণতা।

বদান্যতা সর্বক্ষেত্রেই উত্তম গুণ। চিন্তা-চেতনা, আচার-আচরণ ও সহযোগিতা-সর্বক্ষেত্রে... ধন-সম্পদের ক্ষেত্রে বদান্যতা সর্বোত্তম। যদিও অন্যগুলোর মূল্যও কম নয়। আলোচ্য ঘটনায় কৃপণের পরিণাম দেখুন। এই কুষ্ঠরোগীর কাছে উপত্যকা-ভর্তি উট ছিল। কিন্তু যখন তাকে বলা হলো, আল্লাহর পর আপনাকে ছাড়া আমার আর কোনো সাহায্যকারী নেই, তখন সে মাত্র একটি উট প্রদান করতেই কৃপণতা করেছে। তাই আল্লাহ তার সকল উট নিয়ে নিয়েছেন। টাকওয়ালা লোকটির প্রতি লক্ষ করে দেখুন। তার পরিণাম কী হলো! উপত্যাকা-ভর্তি গরু থাকা সত্ত্বেও সে একটি মাত্র গরু দিতে কৃপণতা করেছে, আল্লাহ তার সকল গরু নিয়ে গেছেন। কিন্তু যে নিজের পূর্বের অবস্থা স্মরণ করে ফেরেশতাকে দিতে চেয়েছে, বলা হয়েছে আল্লাহ তোমার ধন-সম্পদে বারাকাহ দান করুন! একটি ঘটনাই আপনাকে চিরদিনের জন্য উঁচুতে উঠিয়ে দিতে পারে। আবার একটি ঘটনাই আপনাকে চিরকালের জন্য নীচে নামিয়ে দিতে পারে। জীবন তো বহু ঘটনার সমষ্টি মাত্র। তাই ব্যর্থতা থেকে বেঁচে থাকতে হবে।

তৃতীয় পাঠ
ধন-সম্পদ আল্লাহ তাআলা বান্দাকে ভালোবাসার দলিল নয়। এ ব্যাপারে সবচেয়ে চমৎকার বিষয় হলো, আল্লাহ তাআলা সুলাইমান আলাইহিস সালাম ও নমরুদ উভয়কে গোটা দুনিয়া দিয়েছিলেন। যদি ধন-সম্পদ মানুষের মর্যাদার মানদণ্ড হতো তাহলে একজন নবী এবং এক অবাধ্যকে সমান সম্পদ দেওয়া হতো না। রোমের রাজা-বাদশাহরা রেশমের উপর ঘুমাত। স্বর্ণের থালা-বাসনে পানাহার করত। আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চুলায় কয়েকদিন পর্যন্ত আগুন জ্বলত না। খন্দকের দিন তিনি পেটে পাথর বেঁধেছিলেন। ছোটকালে ধনাঢ্য কুরাইশদের ছাগল চড়িয়েছেন। দরিদ্র অবস্থায় জীবন যাপন করেছেন। আর দরিদ্র অবস্থায়ই তার মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর সময় ঋণের কারণে তার বর্ম এক ইহুদির কাছে বন্ধক হিসেবে ছিল। অথচ আল্লাহর তাআলার কাছে তিনি ছিলেন গোটা বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি।

অতএব কোনো নেয়ামত প্রাপ্ত হলে শুকরিয়া আদায় করুন। নেয়ামত না পেলে ধৈর্য ধারণ করুন। আল্লাহ যদি আপনাকে নেয়ামত দিয়ে থাকেন তাহলে তিনি সেই নেয়ামতই দিয়েছেন যা অন্যের জন্য নয়; বরং কেবল আপনার জন্য। আর তিনি কোনো নেয়ামত না দিয়ে থাকলে তাই দেননি যা আসলেই আপনার নয়; বরং তা অন্যের জন্য। মানুষের সম্পদের দিকে তাকাবেন না। কেননা আপনি জানেন না যে, তাকে আসলে সম্পদ দেওয়া হয়েছে নাকি বড় কিছু থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। যুগে যুগে কাফেরদের হাতে ধন-সম্পদ ছিল। মুমিনদের চেয়ে তাদের ধন-সম্পদ বেশি ছিল। ধনাঢ্যতা প্রকৃতপক্ষে নিন্দনীয় নয়। হালাল মাল যদি মুমিন বান্দার হাতে থাকে তাহলে তা কতই-না উত্তম! কিন্তু আপনি এই ধারণা করা থেকে বেঁচে থাকুন যে আল্লাহ আপনাকে অপছন্দ করেন বলে আপনার রিজিক সংকীর্ণ করে দিয়েছেন। আল্লাহ আপনাকে শাস্তি দিতে চান বলে আপনাকে অসুস্থ করেছেন। মনে রাখবেন, আল্লাহ তাআলা যা দেন তা হেকমতের ভিত্তিতেই দেন, আর যা থেকে বঞ্চিত করেন তাও হেকমতের ভিত্তিতেই করেন। আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারব না যতক্ষণ না এই বিশ্বাস করতে পারব যে, আল্লাহ তাআলার না-দেওয়াটাও এক ধরনের দান।

চতুর্থ পাঠ
প্রকৃত চিকিৎসক তো আকাশে। বৃদ্ধা বন্ধ্যা নারীকে (ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর স্ত্রী) আল্লাহ তাআলা মুহূর্তের মধ্যেই নবী (ইসহাক আলাইহিস সালাম)-প্রসবের যোগ্যতা দিয়ে দেন। বহু বছর তিনি (আইয়ুব আলাইহিস সালাম) রোগাক্রান্ত ছিলেন। রব তাকে বললেন— ‘তুমি পা দিয়ে ভূমিতে আঘাত করো। এটি তো গোসল করার এবং পানি পান করার ঠান্ডা ঝরনা। [১]’ সঙ্গে সঙ্গে তিনি পূর্বের চেয়েও সুস্থ হয়ে ওঠেন। যাকারিয়া আলাইহিস সালাম তার রবকে ডাক দিয়েছেন— ‘হে আমার রব! আমাকে একা রাখবেন না।'[২] তখন তাকে ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম-এর সুসংবাদ দেয়া হয়।

কুষ্ঠ রোগী, দুনিয়ার সকল ডাক্তার মিলেও যাকে সুস্থ করতে পারেনি, আল্লাহ তাআলা শুধু বলেছেন, তুমি সুস্থ হয়ে যাও। সঙ্গে সঙ্গে সে সুস্থ হয়ে গেছে। এভাবে টাক ব্যক্তির চুল তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন, অন্ধ ব্যক্তির দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। তবু চিকিৎসার জন্য ডাক্তারদের কাছে যেতে হবে। কেননা আমরা এমন জাতি যাদেরকে চিকিৎসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রোগ দূর করার জন্য ডাক্তারদের কাছে যাওয়াটা আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়। কেননা তা তো তাকদির অনুযায়ী হবে। যদি আল্লাহ চান তাহলে মানুষের হাতে মানুষকে সুস্থ করে তুলবেন। আর যদি তিনি না চান তাহলে দুনিয়ার সকল ডাক্তার মিলেও কিছু করতে পারবে না। কিন্তু তারপরও আমাদেরকে উপায়-উপকরণ গ্রহণ করতে হবে। তাই চলুন, আমরা প্রকৃত ডাক্তারকে স্মরণ করি। বিশ্ব জগতের সকল কিছুর জন্য তিনি যথেষ্ট। ঔষধ সেবন করতে হবে, কেননা এটা সুস্থতা লাভের মাধ্যম। তবে এসবের পূর্বে আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা শিক্ষা দিয়েছেন, তা পড়ুন- ‘হে আমাদের রব, আপনি রোগব্যাধি দূর করে দিন। আপনি তাকে সুস্থ করুন। আপনিই তো কেবল সুস্থ করতে পারেন। আপনি এমন সুস্থ করুন যারপর কোনো রোগ ব্যাধি হবে না’[১]।

টিকাঃ
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৪৬৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৯৬৪। (ঈষৎ পরিমার্জিত)।
[১] সুরা নমল, আয়াত-ক্রম: ৪০
[১] সুরা সোয়াদ, আয়াত-ক্রম: ৪২
[২] সুরা আম্বিয়া, আয়াত-ক্রম: ৮৯
[১] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২১৯১

📘 নবীজির ﷺ পাঠশালা 📄 মদ

📄 মদ


উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- 'তোমরা মাদকদ্রব্য পরিত্যাগ করো, কেননা তা নানা প্রকার অপকর্মের প্রসূতি। তোমাদের পূর্ববর্তী যুগে এক আবেদ ব্যক্তি ছিল। এক চরিত্রহীনা রমণী তাকে নিজের ধোঁকাবাজির জালে আবদ্ধ করতে মনস্থ করে। এজন্য সে তার এক দাসীকে তার কাছে প্রেরণ করে তাকে সাক্ষ্যদানের জন্য ডেকে পাঠায়। তখন ঐ আবেদ ব্যক্তি ঐ দাসীর সঙ্গে গেল। সে যখনই কোনো দরজা অতিক্রম করত, দাসী পেছন থেকে সেটি বন্ধ করে দিত। এভাবে সেই আবেদ ব্যক্তি এক অতি সুন্দরী নারীর সামনে উপস্থিত হলো আর তার সামনে ছিল একটি ছেলে এবং এক পেয়ালা মদ। সেই নারী আবেদকে বলল, “আল্লাহর শপথ! আমি আপনাকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডেকে পাঠাইনি, বরং এজন্য ডেকে পাঠিয়েছি যে, আপনি আমার সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হবেন, অথবা এই মদ পান করবেন, অথবা এই ছেলেকে হত্যা করবেন।” সেই আবেদ বলল, "আমাকে এই মদের একটি মাত্র পেয়ালা দাও। ঐ নারী তাকে এক পেয়ালা মদ পান করাল। তখন সে বলল, "আরও দাও।” মোটকথা ঐ আবেদ আর থামল না, এমনকি সে তার সঙ্গে ব্যভিচার করল এবং ঐ ছেলেকেও হত্যা করল। অতএব তোমরা মদ পরিত্যাগ করো। কেননা আল্লাহর শপথ! মদ ও ঈমান কখনো সহাবস্থান করে না। এর একটি অন্যটিকে বের করে দেয়।' [১]

প্রথম পাঠ
জীবন যদি সব সময় আমাদেরকে ভালো-মন্দের মধ্যে ইচ্ছাধিকার প্রদান করত তাহলে আমাদের ওপর অনেক অনুগ্রহ করত। তবে এই ধরনের ইচ্ছাধিকার হলো সৌখিনতা। সবসময় এর সুযোগ মেলে না। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে জীবন আমাদেরকে দুটি বিষয়ের মধ্যে ইচ্ছাধিকার প্রদান করে; যার সবচেয়ে সুমিষ্ট জিনিসও তিক্ত হয়ে থাকে। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'যে ব্যক্তি অকল্যাণ থেকে কল্যাণকে বুঝতে পারে সে জ্ঞানী নয়, বরং যে ব্যক্তি দুটি অকল্যাণের মধ্যে কোনটি তুলনামূলক কল্যাণকর তা বুঝতে পারে সেই জ্ঞানী।' কম ক্ষতিকর বিষয়টি নির্বাচন করা শরিয়তের একটি মূলনীতি। কিন্তু প্রবৃত্তির মাধ্যমে কম ক্ষতিকর বিষয়টি নির্বাচন করা যায় না; বরং পরিণাম এবং ফলাফল দেখে তা নির্ধারণ করতে হয়। যদিও দুটি মন্দের কোনোটিই না করার সুযোগ রয়েছে। কেননা যাকে অন্যের তুলনায় ছোট মনে করা হচ্ছে সেটাও কখনো প্রকৃতপক্ষে বড় অনিষ্টের এবং প্রজ্বলিত জাহান্নামের দ্বার হতে পারে। উল্লিখিত ঘটনার প্রতি লক্ষ করুন, এই আবেদ লোকটি মনে করেছিল মদপান করাটা হত্যা ও ব্যভিচার থেকে কম ক্ষতিকর। কিন্তু সে মদ পান করার পর হত্যাও করেছে আবার ব্যভিচারও করেছে। সে শুরুতে যা থেকে বিরত থাকতে চেয়েছে পরে তাতেই লিপ্ত হয়েছে।

দ্বিতীয় পাঠ
যারা আপনার সামনে বিভিন্ন সুযোগ রাখছে তারা এর মাধ্যমে আপনার চিন্তা- চেতনাকে আবদ্ধ করে ফেলছে। দুটি বিষয়ের মধ্যে আপনার বিবেককে বন্দী করে ফেলছে। তারা আপনার মধ্যে একটা ধারণা তৈরি করে দিচ্ছে যে তারা যে বিকল্পগুলো পেশ করেছে সেটাই একমাত্র সুযোগ। জীবনের সর্বক্ষেত্রেই এমনটি ঘটে। একটি সাধারণ উদাহরণ লক্ষ করুন। মনে করুন, আপনি কোনো বন্ধুর কাছে গেলেন আর বন্ধু আপনাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি চা খাবে না কফি? সে এর মাধ্যমে আপনার সামনে দুটি বিষয়ে ইচ্ছাধিকার প্রদান করেছে। তৃতীয় কোনো অপশন রাখেনি। কিন্তু সবসময় পেশকৃত দুটি বিকল্প লক্ষ্য পূরণ করতে পারে না। কখনো উভয়টিই ভুল হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে সে আপনাকে বুঝাতে চায় যে, এ দুটির যে কোনো একটি অপরটি তুলনায় কল্যাণকর বা কম ক্ষতিকর। তারা আপনাকে ভুল পথে হাঁটাতে চায়। কিন্তু সর্বক্ষেত্রেই তৃতীয় একটি পথ থাকে, যা আপনি সে মুহূর্তে দেখতে পারেন না। যা আপনার চিন্তা থেকে উবে যায়। কেননা আপনার সামনে পেশকৃত সুযোগের মধ্যে তা ছিল না। আপনি বুদ্ধিমান হোন। এ-জাতীয় সমস্যার সম্মুখীন হলে পেশকৃত বিষয় দুটি ব্যতীত তৃতীয় আরেকটি বিষয় গ্রহণ করুন। যা আপনাকে মুক্তির পথ দেখাবে।

তৃতীয় পাঠ
আল্লাহ তাআলা উদ্ভিদের মধ্যে জীবন রেখেছেন। কিন্তু তাদের কোনো জ্ঞান-বুদ্ধি ও চলৎশক্তি নেই। আর তিনি জীবজন্তুর মধ্যে জীবনীশক্তি এবং রুহ দিয়েছেন। কিন্তু তাদেরকে জ্ঞান বুদ্ধি দেননি। আর তিনি মানুষের মধ্যে জীবনীশক্তি, রুহ, জ্ঞান-বুদ্ধি-সবকিছু দিয়েছেন। জ্ঞান-বুদ্ধিবিহীন মানুষ জীবজন্তুতুল্য। কেননা সে জীবজন্তুর মতোই নিজের প্রবৃত্তির চাহিদা চরিতার্থ করে থাকে। আকলকে এই কারণে আকল বলা হয় যে, সে আকলবানকে বিভিন্ন কাজ থেকে বাধা দিয়ে থাকে। অর্থাৎ মানুষের জন্য যেটা অনুপোযোগী সে তা করা থেকে বাধা প্রদান করে থাকে। এই কারণে পাগলের উপর থেকে সকল বিধি-বিধান উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। আকল তথা জ্ঞান-বুদ্ধি বিধি-বিধান আবশ্যক হওয়ার মূল। যার জ্ঞান-বুদ্ধি নেই তার কোনো হিসাব-নিকাশ নেই। এটা সেই ক্ষেত্রে যখন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কারও জ্ঞান-বুদ্ধি হরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়। যে ব্যক্তি নিজেই আপন বিবেক-বুদ্ধি বিদূরিত করে ফেলে সে জ্ঞান-বুদ্ধি না থাকা অবস্থায় যা করবে এর জন্য তাকে হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে। কেউ মদ পান করে মাতাল হয়ে কাউকে হত্যা করলে তাকে কেসাস স্বরূপ হত্যা করা হবে। আমি বুঝি না, মানুষ কেন নিজে নিজেই জীবজন্তু হয়ে যায়? আল্লাহ তাআলা তো নিজেই তাদেরকে জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে মানুষ হিসেবে সম্মানিত করেছেন! কুরায়েশি ঈগল আবদুর রহমান আদ-দাখিল যখন আন্দালুসে প্রবেশ করেন তখন তার কাছে এক পেয়ালা মদ আনা হয়, তিনি তাদের বলেন, 'যে জিনিস আমার জ্ঞানের প্রবৃদ্ধি ঘটাবে আমার সে জিনিসের প্রয়োজন, যা আমার জ্ঞান কমিয়ে দেবে তার কোনো প্রয়োজন নেই।' এটা সঠিক কথা যে, মদপান করা কবিরা গুনাহ, কিন্তু এই কারণে কেউ ধর্ম থেকে বের হয়ে যায় না। তবে হাদিসে মানুষের অন্তরকে ঘরের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। ঈমান এবং মদপান এ ঘরের ছাদের নিচে কখনো একত্রিত হতে পারে না। যদি কখনো অবস্থান করে তাহলে অচিরেই একটি অপরটিকে বের করে দেবে।

চতুর্থ পাঠ
এই দুনিয়াটা ফেতনা ও পরীক্ষায় পূর্ণ। কেননা এটি পরীক্ষাগার। মানুষ সবসময় পরীক্ষার সম্মুখীন হয়ে থাকে। যা কখনো তার স্বভাবের অনুকূল হয় আবার কখনো প্রতিকূল। ইউসুফ আলাইহিস সালাম দুটি বিষয়ের সম্মুখীন হয়েছিলেন। মারাত্মক ঘৃণার মাধ্যমে পরীক্ষা, পরম ভালোবাসার মাধ্যমে পরীক্ষা। মারাত্মক ঘৃণা তাকে কূপে নিক্ষেপ করেছিল। আর পরম ভালোবাসা ফেলে দিয়েছিল কারাগারে। ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গে লোকেরা এসব দুর্ব্যবহার করেছিল। কিন্তু তিনি তাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করেছিলেন? যখন তিনি অপছন্দকারীদের মাধ্যমে পরীক্ষায় নিপতিত হয়েছেন তখন ধৈর্য ধারণ করেছেন, যখন ভালোবাসার মাধ্যমে পরীক্ষায় পড়েছেন তখনও ধৈর্যকেই অবলম্বন বানিয়েছেন। কট্টর বিদ্বেষ তাকে তার ভাইদের স্তরে নামিয়ে দিতে পারেনি। তেমনিভাবে প্রচণ্ড ভালোবাসা তাকে বাদশাহর স্ত্রীর আনুগত্যে বাধ্য করতে পারেনি। আমার মতে বিদ্বেষ ও শত্রুতাপূর্ণ পরীক্ষা ভালোবাসাময় পরীক্ষার চেয়ে সহজ। কেননা শত্রুর মাধ্যমে পরীক্ষায় নিপতিত হওয়ার ক্ষেত্রে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে আমাদেরকে অপছন্দনীয় বিষয়ে ইচ্ছাধিকার প্রদান করবে। কিন্তু যদি আমরা ভালোবাসার পাত্র দ্বারা পরীক্ষায় নিপতিত হই তাহলে অধিকাংশ সময়ই সে আমাদের সামনে হারাম বিষয় পেশ করবে, প্রবৃত্তির তাড়নায় তখন আমরা তাতে ধাবিত হয়ে যাব। ইউসুফ আলাইহিস সালাম একজন সুঠাম ও শক্তিশালী যুবক ছিলেন। অন্যান্য পুরুষের যেমন প্রবৃত্তি-চাহিদা ছিল তেমনই তারও ছিল। আর আল্লাহ তাআলা মানুষকে বাসনা দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু তিনি ধৈর্যধারণ করেছেন। আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়েছেন। বাদশাহর স্ত্রীর আবেদনে ধৈর্যধারণ করাটা তার কাছে ভাইদের দেওয়া কষ্টে ধৈর্যধারণের চেয়ে কষ্টসাধ্য ছিল।

টিকাঃ
[১] সুনানে নাসায়ি, হাদিস-ক্রম: ৫৬৮২। সনদ মওকুফ সহিহ।

📘 নবীজির ﷺ পাঠশালা 📄 কাঠের পা

📄 কাঠের পা


নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- 'বনি ইসরাইলে খাটো আকৃতির এক নারী দুজন দীর্ঘাঙ্গী নারীর সঙ্গে হেঁটে যাচ্ছিল। সে (উঁচু হওয়ার জন্য) এবং লোকদের চোখে ধরা না পড়ার জন্যে কাঠের দুটি পা তৈরি করে নেয় এবং সোনা দিয়ে একটি বড় আংটি তৈরি করে এর ভেতরে মেশক ভরে দেয়। আর তা হলো সুগন্ধিসমূহের মধ্যে সেরা সুগন্ধি। পরে সে ঐ দুই মেয়েলোকের মধ্য থেকে চলতে লাগল এবং লোকেরা তাকে চিনতে পারল না। সে-সময় তার হাত দিয়ে এভাবে ঝাড়া দিল। (এ কথা বলে বর্ণনাকারী শু'বাহ্ রহিমাহুল্লাহ তার হাত ঝাড়া দিলেন এবং ওই নারীর হাত ঝাড়ার ধরন নকল করলেন।)'[১]

প্রথম পাঠ
এক বেদুইন বিয়ের নিকটবর্তী তার মেয়েকে উপদেশ দিয়ে বলল, 'স্বামী যেন সদা তোমার মধ্যে সুন্দর বিষয় দেখতে পায় আর যেন তোমার থেকে উত্তম ঘ্রাণ পায়। জেনে রাখো, সর্বোত্তম সুগন্ধি হলো পানি (আতর)। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক ওসিয়ত; যাতে দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা নিংড়ে পড়েছে। সৌন্দর্য অবলম্বন করা উচিত। আর আতরই সর্বোত্তম সৌন্দর্য। নারী এর মাধ্যমে একজন পুরুষের চিন্তা-চেতনা, অনুভূতি, চোখ-নাক এবং হৃদয়ে মোহনীয় হয়ে ওঠে। যদিও হাদিসে সুগন্ধি ব্যবহার করাকে নিন্দনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়েছে। তবে এটি সুগন্ধি খারাপ হওয়ার কারণে নয় বরং সুগন্ধি ব্যবহারের স্থান-কালের কারণে। নারীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন সে একমাত্র স্বামী এবং মাহরাম ব্যতীত কারও সামনে নিজের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে।

হাদিসে এসেছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- ‘যে মহিলা সুগন্ধি লাগিয়ে এই উদ্দেশ্যে লোকের মধ্যে গমন করে যে, তারা তার সুগন্ধির ঘ্রাণ পাবে, সে ব্যভিচারিণী।[১]’ তাকে ভীতি প্রদর্শনের জন্য এমনটা বলা হয়েছে, তার ওপর ব্যভিচারের দণ্ড প্রয়োগ করার জন্য নয়। ইসলামে বিশাল একটি দরজা রয়েছে, যার নাম হল 'ছাদ্দুয যারায়ে' (অর্থাৎ বিপদ সংঘটিত হওয়ার পূর্বে তার দ্বার রুদ্ধ করে দেওয়া)। ইসলাম আগুন প্রজ্জ্বলিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চায় না যে, আগে আগুন লাগুক পরে নেভানো হবে। বরং আগুন লাগার পূর্বে শুরুতেই ইসলাম তা বন্ধ করার চেষ্টা করে থাকে। যে জিনিস মানুষকে খারাপ কাজের দিকে নিয়ে যায় সেটাও খারাপ কাজ।

দ্বিতীয় পাঠ
বাহ্যিক অবস্থা দেখে নারীরা দুই কারণে প্রভাবিত হয়ে যায়। এক. তারমধ্যে প্রবৃত্তির বাসনা তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। দুই. পুরুষের প্রতি নারীর আকর্ষণ তুলনামূলক বেশি। এটি নারীর কোনো নিন্দনীয় বিষয় নয়; বরং আল্লাহ তাআলাই তাকে এ স্বভাব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। প্রত্যেক সৃষ্টিকে কোনো এক জিনিস থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তার আচার-ব্যবহার-চরিত্র তা দ্বারাই প্রভাবিত হয়ে থাকে। প্রথম পুরুষ আদম আলাইহিস সালামকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ-কারণে পুরুষরা কম সংবেদনশীল। আর চেষ্টা-প্রচেষ্টা ও উৎপাদনে তারা অধিক আগ্রহী। পক্ষান্তরে হাওয়া আলাইহাস সালাম (নারী)-কে আদম আলাইহিস সালাম থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এই কারণে নারীজাতি পুরুষের প্রতি অধিক আকৃষ্ট হয়ে থাকে। সমষ্টিগত বিষয় খণ্ডিত বিষয়ের প্রতি যেভাবে আকর্ষিত হয় পুরুষও নারীর প্রতি সেভাবে আকর্ষিত হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে খণ্ডিত বিষয় সমষ্টিগত বিষয়ের প্রতি যেভাবে আকর্ষিত হয়ে থাকে নারীও পুরুষের প্রতি সেভাবে আকর্ষিত হয়ে থাকে।

এই কারণে নারীরা পুরুষের তত্ত্বাবধানে জীবনযাপন করতে কোনো কষ্টবোধ করে না। পুরুষ তার দেখাশোনা করে থাকে। তার প্রতি সংবেদনশীল হয়ে থাকে। সে এক্ষেত্রে কোনো ত্রুটিবোধ করে না। কেননা তাকে কাজকর্ম এবং পরিশ্রম করার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। পক্ষান্তরে নারী পুরুষের দেখাশোনা করা, তার খরচ চালানো সৃষ্টিগতভাবেই পুরুষের কাছে সমস্যাকর। স্বামী স্বভাবগত জটিল রোগাক্রান্ত হলে পরেই কেবল এই বিষয়টা মেনে নিতে পারে যে, স্ত্রীও সংসারের খরচ বহন করুক। তবে কোনো পুরুষ সম্পূর্ণভাবে স্ত্রীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়াটা বেশ মুশকিল বিষয়। কারণ, উপরে বর্ণিত সবই আল্লাহ কর্তৃক সৃষ্ট স্বভাব। যা দিয়ে তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। এই কথার অর্থ এটা নয় যে, পুরুষ নারীর প্রতি আকর্ষণবোধ করে না, কিংবা নারী তাদের চোখ ও অন্তরের কাঙ্ক্ষিত বিষয় নয়; বরং এ কথার উদ্দেশ্য হলো কোনো পুরুষের জীবন নারীর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হওয়া অসম্ভব। কিন্তু এটা খুব সম্ভব যে, পুরুষ কোনো নারীর একমাত্র জীবন ও দুনিয়া হবে।

তৃতীয় পাঠ
নারীর জন্য তার মনোবাসনাকে ধর্মের ওপর প্রাধান্য না দেওয়া আবশ্যক। যদিও মনোবাসনাকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করা সম্ভব নয়, ধর্ম তো মানুষের মনোবাসনাকে নিঃশেষ করে দিতে আসেনি বরং তা সংশোধন ও পরিমার্জন করার জন্য এসেছে। নারীকে পুরুষের প্রতি ভালোবাসা ও মমতা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এর অর্থ এটা নয় যে, তার এ মনোবাসনা সকল পুরুষের জন্যই নিবেদিত হবে। ইসলাম যখন পুরুষের জন্য একাধিক স্ত্রী রাখার বৈধতা দান করেছে এর দ্বারা নিশ্চিতভাবেই বোঝা যায় যে, আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তাকে এই কাজের সক্ষমতা দান করেছেন। এটি এমন এক বিষয় পুরুষেরা বহুচেষ্টা করলেও নারীদের কাছে তা ব্যাখ্যা করে বোঝাতে পারবে না। তেমনিভাবে নারীরা বহু চেষ্টা করলেও তা পুরুষদেরকে বোঝাতে পারবে না। কেননা তাদেরকে এক স্বামী নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার প্রবৃত্তি দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। নারী যদি এক পুরুষের তত্ত্বাবধানে জীবনযাপন করে যায় তাহলে সে সওয়াবের উপযুক্ত হবে। যদি সে নিজের সৃষ্টিজাত প্রবৃত্তিকে নষ্ট করে বহু পুরুষের প্রবৃত্তি-বাসনা পূরণ করতে যায় তাহলে সে গুনাহগার হবে। প্রকৃত নারী হলো যে তার স্বামীকে নিয়েই জীবনযাপন করে।

চতুর্থ পাঠ
পুরুষেরা শুধু নারীর সৌন্দর্য দেখতে চায় এবং তার সুঘ্রাণ শুঁকতে চায়। তাই স্ত্রী স্বামীর জন্য এটা করলে সে সাওয়াব লাভ করবে। ফলে এতে স্বামী পরিতৃপ্ত হবে এবং তার চরিত্র পবিত্র থাকবে। পাশাপাশি স্বামী যা পছন্দ করে সেও সেটা পছন্দ করবে। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু তো বলেছেন, সে যেমন আমার জন্য সৌন্দর্য অবলম্বন করে আমিও তার জন্য সৌন্দর্য গ্রহণ করি। স্বামী যখন স্ত্রীর মনোবাসনা, তার ইচ্ছা ও প্রয়োজনপূরণে সাড়া দেয় তখন সে সওয়াব লাভ করে থাকে। পুরুষের দায়িত্বপালনে অবহেলা নারীকে অন্য পুরুষের প্রতি ভ্রুক্ষেপের অনুমতি দেয় না। যেমনভাবে স্ত্রীর দায়িত্বপালনে অবহেলা পুরুষকে স্ত্রী ভিন্ন কোনো হারাম ক্ষেত্রে ভ্রুক্ষেপের অনুমোদন দেয় না। আমাদেরকে গুনাহের পথ রুদ্ধ করার আদেশ দেয়া হয়েছে। পুরুষেরা কেন নিজেদের বেশভূষা এবং সৌন্দর্যের প্রতি অধিক লক্ষ রাখবে? কারণ, আপনার স্ত্রী এমন পুরুষকে দেখলে বলবে, 'কেন আপনি তার মতো নন?' নারীরা কেন নিজেদের নারীত্বকে অধিক রূপে ফুটিয়ে তুলবে? কারণ আপনার স্বামী এমন নারীকে দেখলে আফসোস করবে, কেন তার স্ত্রী ওই নারীর মতো নয়! বিয়ের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে আনন্দ ভোগ করে থাকে। যার সামনে সকল সমস্যাই তুচ্ছ। বিয়ের মাধ্যমে পরিতৃপ্তকরণ অর্জিত না হলে তার কারণে বহু সমস্যা ও সংকট তৈরি হবে। প্রকৃতপক্ষে যা মনোমালিন্যের কারণেই ঘটে থাকে। আমি একটি বড় মূলনীতি বলে দিই, দেখবেন, ঘরের বড় বড় সমস্যাগুলো শোবার খাট থেকেই উদ্ভূত হয়।

পঞ্চম পাঠ
আগেকার যুগে সাধারণত কাঠ দ্বারা জুতার তলদেশ বিশেষভাবে উঁচু করা হতো। (বর্তমানে যাকে হাই হিল বলে।) আগেকার যুগে আতরের আংটি বর্তমান যুগের সুগন্ধির মতোই হতো (স্প্রেয়ারের মতো)। যা মানুষের অন্তরকে উত্তেজিত করে তোলে। যুগে যুগে মানুষ আগের মতোই রয়ে গেছে। সময়ে সময়ে শুধু তাদের উপায়-উপকরণে পরিবর্তন ঘটেছে। আগের উপকরণগুলো এ যুগের সঙ্গে অধিক কার্যকরী ও উপকারী হয়ে থাকে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সত্য বলেছেন- ‘অবশ্যই অবশ্যই তোমরা তোমাদের আগের লোকেদের নীতি-পদ্ধতিকে বিঘতে বিঘতে, হাতে হাতে অনুকরণ করবে। এমনকি তারা যদি সাপের গর্তে ঢুকে, তাহলে তোমরাও তাদের অনুকরণ করবে। আমরা (উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম) বললাম, “হে আল্লাহর রাসুল, এরা কি ইহুদি-নাসারা?” তিনি বললেন, "আর কারা?”” [1]

বনি ইসরাইলের সর্বপ্রথম ফেতনা সংঘটিত হয়েছিল নারীকে কেন্দ্র করে। তাই পুরুষেরা যেন নারীদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করে। কেননা তারা কমনীয় সত্তা। পুরুষের ওপর তাদের জন্য বহু অধিকার রয়েছে। সৌন্দর্য-উপকরণ-সুগন্ধি-সুরমা-এগুলো হারাম নয়। এগুলো তো শুধু কিছু উপকরণ, ব্যবহারের ভিত্তিতে যার হালাল-হারামের দিকটি নির্ণিত হয়। প্রত্যেক সুগন্ধি আপন স্থানে পুণ্যের কাজ। প্রত্যেক সুরমা-কাঠি আপন স্থানে গুনাহ নয়। এমনকি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে (এর ব্যবহারে) সওয়াব রয়েছে। আবু যর গিফারি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একবার কিছু লোক রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে ধনীরা আমলে এগিয়ে যাচ্ছে বলে অনুযোগ করেন। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাদাকাহর বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন- ‘এমনকি তোমাদের শরীরের অংশে সাদাকাহ রয়েছে। অর্থাৎ আপন স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করাও একটি সাদাকাহ। সাহাবিগণ বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের কেউ তার কাম-প্রবৃত্তি চরিতার্থ করবে বৈধ পথে আর এতেও কি তার সাওয়াব হবে?" তিনি বললেন, " তোমরা বলো দেখি, যদি তোমাদের কেউ হারাম পথে নিজের চাহিদা মেটাত বা ব্যভিচার করত তাহলে কি তার গুনাহ হতো না? অনুরূপভাবে যখন সে হালাল বা বৈধ পথে কামাচার করবে তাতে তার সাওয়াব হবে।” [১]

টিকাঃ
[১] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২২৫২
[১] আবু দাউদ, হাদিস-ক্রম: ৪১৭৩
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৭৩২০
[১] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ১০০৬

📘 নবীজির ﷺ পাঠশালা 📄 সারা এবং ফিরআউন

📄 সারা এবং ফিরআউন


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
'ইবরাহিম আলাইহিস সালাম তিনবার ছাড়া কখনও মিথ্যা বলেননি। তন্মধ্যে দুবার ছিল আল্লাহর ব্যাপারে। তার উক্তি 'ইন্নী সাক্বীম' 'আমি অসুস্থ'।[১] এবং তার অন্য এক উক্তি 'বাল ফাআলাহু কাবীরুহুম হাযা' বরং এ কাজ করেছে, এই তো তাদের বড়টি।[২] বর্ণনাকারী বলেন, একদা তিনি (ইবরাহিম আলাইহিস সালাম) এবং সারা কোনো এক অত্যাচারী শাসকের এলাকায় এসে পৌঁছলেন। তখন শাসককে জানানো হলো, এ এলাকায় জনৈক ব্যক্তি এসেছে। তার সঙ্গে একজন পরমা সুন্দরী নারী আছে। শাসক তার কাছে লোক পাঠাল। লোকটি আগন্তুক (ইবরাহিম)-কে নারী সম্পর্কে জানতে চেয়ে বলল, "নারীটি কে?” তিনি উত্তর দিলেন, 'আমার বোন।” অতঃপর তিনি সারার কাছে এলেন এবং বললেন, “হে সারা! তুমি আর আমি ব্যতীত পৃথিবীর ওপর আর কোনো মুমিন নেই। এ লোকটি আমাকে তোমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিল। তখন আমি তাকে জানিয়েছি যে, তুমি আমার বোন। কাজেই তুমি আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন কোরো না।” অতঃপর সারাকে আনার জন্য শাসক লোক পাঠাল। তিনি যখন তার কামরায় প্রবেশ করলেন এবং সে তার দিকে হাত বাড়াল তখনই (আল্লাহর আযাবে) পাকড়াও হলো। অত্যাচারী এই শাসক তখন সারাকে বলল, “আমার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করো, আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না।” সারা তখন আল্লাহর কাছে দুআ করলেন। ফলে সে মুক্তি লাভ করল। অতঃপর দ্বিতীয়বার তাকে ধরতে চাইল। এবার সে পূর্বের মতো বা তার চেয়ে কঠিনভাবে পাকড়াও হলো। এবারও সে বলল, “আল্লাহর কাছে আমার জন্য দুআ করো। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না।” আবারও তিনি দুআ করলেন, ফলে সে মুক্তি লাভ করল। অতঃপর শাসক তার এক প্রহরীকে ডাকল। সে (এলে) তাকে বলল, “তুমি তো আমার কাছে কোনো মানুষ আনোনি। বরং এনেছ এক শয়তান।” অতঃপর সে সারার খেদমতের জন্য হাজেরাকে দান করল। (হাজেরকে নিয়ে) সারা ফিরে এলেন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর কাছে। ইবরাহিম তখন নামাজে দাঁড়ানো। (নামাজ থেকেই) হাত দ্বারা ইশারা করে সারাকে বললেন, “কী ঘটেছে?” সারা বললেন, “আল্লাহ কাফির বা ফাসিকের চক্রান্ত তারই বুকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আর সে হাজেরাকে খিদমতের জন্য দান করেছে।””[১]

প্রথম পাঠ
উল্লিখিত হাদিসের প্রেক্ষিতে নবীদের নিষ্পাপ হওয়ার বিষয়টি চলে আসে। এ ব্যাপারে আলেমদের দুটি প্রসিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য বক্তব্য রয়েছে। প্রথম বক্তব্য হলো, নবীগণ ধর্মীয় এবং পার্থিব উভয় ক্ষেত্রে নিষ্পাপ। তাদের থেকে কোনো ভুলত্রুটি সংঘটিত হয় না। দ্বিতীয় বক্তব্য, নবীগণ ধর্মীয় ব্যাপারে এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হেদায়েতের বাণী পৌঁছার ব্যাপারে নিষ্পাপ। তবে পার্থিব ক্ষেত্রে তাদের ভুল হতে পারে। ভুল আর গুনাহ এক নয়। সমস্ত গুনাহই এক প্রকার ভুল। কিন্তু সমস্ত ভুল গুনাহ নয়। নবী-রাসুলগণের মানবিক ভুল গুনাহ নয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে যদিও দ্বিতীয় মতটি প্রাধান্য দেওয়ার পক্ষপাতী তবুও মনে করি না যে, পার্থিব ক্ষেত্রে নবীদের থেকে মিথ্যা সংঘটিত হতে পারে। কেননা যদি বলা হয় যে, তাদের পক্ষ থেকে মিথ্যা সংঘটিত হতে পারে তাহলে দাওয়াতের ক্ষেত্রে নবীগণ মিথ্যা বলতে পারেন-এই সন্দেহের দ্বার খুলে যাবে। অথচ নবীগণ এ থেকে মুক্ত ও সম্মানিত।

আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম যে দুটি মিথ্যা বলেছিলেন সেগুলো তো তার কওমের বিরুদ্ধে দলিল-প্রমাণ দাঁড় করাবার জন্য বলেছিলেন, এরচেয়ে বেশি কিছু নয়। আর অত্যাচারী বাদশাহর সঙ্গে যে মিথ্যা বলেছিলেন, আমি মনে করি এটি তাওরিয়ার (দুটি অর্থ প্রদানকারী কোনো শব্দের নিকটবর্তী অর্থ গ্রহণ না করে দূরবর্তী অর্থ গ্রহণ করার) অন্তর্ভুক্ত। মুসলমান মুসলমানের ভাই। এই দৃষ্টিকোণ থেকে সারা বংশীয়ভাবে নয়; বরং ধর্মীয়ভাবে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর বোন ছিলেন। আর দ্বিমুখী শব্দের মাধ্যমে বাহ্যত মিথ্যা বলার সুযোগ রয়েছে। যেমন আমাদের সাইয়েদ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সঙ্গে যখন হিজরত করছিলেন তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, 'আপনার আপনারা কোন গোত্রের?' নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেন, 'আমরা মা (পানি) থেকে।' বেদুইন বলল, 'আরবে তো বহু গোত্র রয়েছে!' নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মাধ্যমে উদ্দেশ্য নিয়েছেন যে, মানুষকে যে পানি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে তিনি সেই পানি থেকে।

দ্বিতীয় পাঠ
মিথ্যা সম্পর্কে যেহেতু আলোচনা এল তাই প্রাসঙ্গিকভাবে আমরা এখানে যেসব স্থানে মিথ্যা বলা বৈধ তা উল্লেখ করছি। ইসলাম তিন অবস্থায় মিথ্যা বলার বৈধতা প্রদান করে। এক. শত্রুর সঙ্গে মিথ্যা বলা। <sup>[১]</sup> এটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বিষয় যে, আমাদের শত্রু কাফেররা কোনো মুসলমানকে বন্দী করে নিয়ে যাবে আর তারা জিজ্ঞেস করলে তাদের সঙ্গে সত্য কথা বলতে হবে! মুসলমানদেরকে ক্ষতি থেকে বাঁচানোর জন্য এই ক্ষেত্রে মিথ্যা বলার বৈধতা প্রদান করা হয়েছে। দুই. মীমাংসা করার জন্য মিথ্যা বলা। এই ক্ষেত্রে মীমাংসাকারী ব্যক্তি বিবদমান দুই ব্যক্তির ব্যাপারে এমন উত্তম কথা বলতে পারে যা আসলে তাদের কেউই অপরের ব্যাপারে বলেনি। পার্থিব বিষয়ে সংশোধন এবং মানুষের ঝগড়া-বিবাদ দূর করার লক্ষ্যে এর সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তিন. স্ত্রীর সঙ্গে স্বামী কিংবা স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীর মিথ্যা বলা। অন্তর জয় করা, সদাচরণ এবং সৌজন্যতার জন্য এ সুযোগ রাখা হয়েছে।

কিন্তু ক্ষতি, ধোঁকা বা প্রতারণার জন্য এসব স্থানে মিথ্যা বলা যাবে না। যেমন স্ত্রীর রান্নার প্রশংসা করা। তার সুনাম করা। অথচ বাস্তবতা এর বিপরীত। কিংবা তার প্রশংসা করা, তার সঙ্গে প্রেমালাপ করা। তাকে বলা যে, সে-ই দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দরী নারী। অথচ আসলে তেমনটা নয়। পুরুষদের ব্যাপারে যা বলা হলো নারীদের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করল, সে কি তাকে সত্যিই ভালোবাসে। সত্য কথার বলার জন্য সে আল্লাহর দোহাইও দিল। স্ত্রী তাকে বলল, 'তুমি যখন আমাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে সত্য বলতে বললে, তাহলে শোনো, আমি তোমাকে ভালবাসি না।' লোকটি তখন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কাছে অভিযোগ দায়ের করল। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ওই নারীকে ডেকে পাঠান এবং তাকে সতর্ক করে দেন। ওই নারী বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি কি এটা চান যে আমি তার সঙ্গে মিথ্যা বলি?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, তার সঙ্গে তুমি মিথ্যা বলবে। সকল ঘর তো ভালোবাসার উপরই গড়ে উঠেছে। জেনে রাখো, মানবতা এবং সম্মানের ভিত্তিতে লোকেদের সঙ্গে আচরণ করতে হয়।'

তৃতীয় পাঠ
এক রাতে প্রচণ্ড বাতাস বয়ে যায়। পরদিন সকালে আমি ব্যায়াম করতে বের হই। বের হয়ে দেখি বহু গাছপালা ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। কিন্তু পাখির বাসাগুলো পূর্বের অবস্থায় সম্পূর্ণ নিরাপদ রয়েছে। এটা থেকে আমি এক চমকপ্রদ শিক্ষা লাভ করি যে, মানুষকে কখনো নিচু হতে হয়। জ্ঞানীরা অবস্থা যাচাই করেন। তারা শুধু শুধু বৃথা হৈ-হল্লা করেন না। তাই আমাদেরকে কখনও কখনও খুব ভালোভাবে প্রতিপক্ষের শক্তি সম্পর্কে জানতে হবে। কেননা হিসাবে কোনো ধরনের ভুল হলে তা আমাদের ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। কখনো কখনো বিবাদ-বিসংবাদে সফলতার একটি মাত্র রাস্তাই বাকি থাকে। সেটি হলো তাতে কোনোভাবেই জড়িত না হওয়া। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ছিলেন অত্যন্ত জ্ঞানী একজন মানুষ। তিনি জানতেন, তিনি যদি মিশরের বাদশাহর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যান তাহলে সে তাকে মেরে ফেলবে। আর তিনি শহিদ হয়ে যাবেন। তিনি কোনো ভীতু মানুষ ছিলেন না। শাহাদাতের অনাকাঙ্ক্ষী ছিলেন না। কিন্তু তিনি জানতেন যে, বাদশাহর বাড়াবাড়ির প্রতিবাদের তুলনায় অন্য এক বড় বিষয়ের জন্য তাকে পাঠানো হয়েছে। তাই তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করেন এবং আল্লাহর কাছে বিষয়টি ন্যস্ত করে দেন। কেননা চেষ্টা-প্রচেষ্টা অনুযায়ীই কাজের ফল হয়ে থাকে। অত্যাচারী বাদশাহ তার স্ত্রীকে গ্রহণ করতে চেয়েছিল। তিনি ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর কাছে সম্পূর্ণ নিরাপদে সম্মানিত অবস্থায় ফিরে আসেন। তার সঙ্গে আরেকজন নারীও আসেন যিনি পরবর্তী সময়ে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর দ্বিতীয় স্ত্রীর মর্যাদা লাভ করেছিলেন।

চতুর্থ পাঠ
বংশগতভাবে অভিজাত নারীরা স্বামীকে কখনো খোঁটা দেয় না। সারা আলাইহাস সালাম তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী রমণী ছিলেন। তাফসির বিশারদগণ বলেছেন, ইউসুফ আলাইহিস সালাম তার দাদি সারা থেকেই সৌন্দর্য লাভ করেছেন। তার এত সৌন্দর্য সত্ত্বেও তিনি ভদ্র এবং স্বামী-ভক্ত ছিলেন। হক কাজে স্বামীকে সহায়তা করতেন। আল্লাহ-প্রদত্ত সৌন্দর্যের কারণে স্বামীর ওপর অহংকার করতেননা। তেমনিভাবে আমাদের মা খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা বংশগতভাবে অভিজাত ছিলেন। তার অঢেল সম্পত্তি ছিল, আর স্বামী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন নিতান্ত দরিদ্র, খাদিজা নিজের সমস্ত ধন-সম্পদ স্বামীর হাতে তুলে দেন।

এই পার্থিব ও বস্তুগত পার্থক্য তাদের বিয়ের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়নি। ফলে তিনি স্বামীর কাছে যেমন মর্যাদাবান হয়েছেন তেমনি মৃত্যুর পরেও মর্যাদাবান থেকেছেন। তিনি মাটির নিচে কবরে শায়িত হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ব্যাপারে কোনো বিরূপ কথা সহ্য করতে পারতেন না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বেশি বেশি স্মরণ করতেন। এ কারণে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা'র ঈর্ষা হতো। একদিন তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলে বসেন, 'আপনি এখনো তাকে স্মরণ করেন অথচ তিনি ছিলেন পুরনো দিনের এক বৃদ্ধা নারী। আল্লাহ আপনাকে তার চেয়ে উত্তম স্ত্রী দান করেছেন।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আল্লাহর শপথ, আল্লাহ আমাকে খাদিজার চেয়ে উত্তম স্ত্রী দান করেননি। সে এমন এক নারী ছিল আমাকে যার ভালোবাসা প্রদান করা হয়েছে। মানুষ যখন আমাকে বঞ্চিত করেছে সে তখন আমাকে দান করেছে। মানুষ যখন আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে সে তখন আমাকে আশ্রয় দিয়েছে। তারা যখন আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে সে তখন আমার প্রতি ঈমান এনেছে।' [১]

পঞ্চম পাঠ
মুসলমান অত্যন্ত মর্যাদাবান, তার মান-সম্মান রক্ষা করা শরিয়তের দাবি। তবে মুসলমান ভীতু নয়। সে সবসময় মৃত্যুকে স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত থাকে। কিন্তু মানুষ নিজে নিজে কখনো আত্মহত্যা করতে পারে না। আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু'র বিজয়াভিযানের মাধ্যমে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু খুবই আনন্দিত হয়েছিলেন। আর এটা সকলেই জানে যে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু একজন কুশলী মানুষ ছিলেন। তিনি বন্ধুত্ব ও মিত্রতায় বিশ্বাসী ছিলেন। ঝগড়া-বিবাদ এড়িয়ে চলতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি শত্রুর জন্য পলায়নের রাস্তা রেখে আসতেন না। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তার ব্যাপারে বলেছেন, 'শপথ! এটাই তো বিজয়।' তিনি সম্ভব হলে তার এবং শত্রুপক্ষের রক্ত-ঝরানো ব্যতীতই লক্ষ্য অর্জন করতে পারাটা পছন্দ করতেন। সেনা-কমান্ডারদের জন্য এই বাস্তবতা কখনো ভুলে যাওয়া উচিত নয়। তারা যেন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর গৃহীত কৌশল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। তেমনিভাবে তারা যেন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কুশীলব-চিন্তা এবং উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু'র প্রশংসার মাধ্যমে শিক্ষা লাভ করে।

টিকাঃ
[১] সুরা সাফফাত, আয়াত-ক্রম: ৮৯
[২] সুরা আম্বিয়া, আয়াত-ক্রম: ৬৩
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৩৫৮
<sup>[১]</sup> শত্রু বলতে এখানে দারুল হারবের কাফেরদের কথা বলা হচ্ছে। যুদ্ধাবস্থায় তাদের সঙ্গে মিথ্যা বলা বৈধ। হাদীসে এসেছে, যুদ্ধ হলো ধোঁকা। (সুনানে তিরমিযি, হাদিস-ক্রম: ১৯৩৯) - অনুবাদক।
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৮২১

ফন্ট সাইজ
15px
17px